ভূমিকা
বিশ্বের অন্যতম প্রধান আব্রাহামিক ধর্ম ইসলামের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস হলো—মক্কায় অবস্থিত ঐতিহাসিক জমজম কূপের পানির তথাকথিত ‘অলৌকিক’ গুণাগুণ। ধর্মীয় প্রথা ও জনশ্রুতি অনুযায়ী দাবি করা হয়, এই পানি কেবল তৃষ্ণা মেটায় না, বরং এটি সকল ব্যাধির নিরাময়ক এবং এর মধ্যে এমন এক ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ খাদ্য উপাদান’ বিদ্যমান যা কোনো প্রকার কঠিন খাদ্য গ্রহণ ছাড়াই মানুষকে দীর্ঘকাল জীবিত রাখতে সক্ষম। মূলত এই বিশ্বাসটি দাঁড়িয়ে আছে সপ্তম শতাব্দীর কিছু বর্ণনা এবং স্থানীয় লোকজ উপকথার ওপর। বর্তমান গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে আমরা জমজম পানির এই ঔষধি ও পুষ্টিগুণ সংক্রান্ত দাবিগুলোকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান (Medical Science) এবং পুষ্টিবিজ্ঞানের (Nutritional Science) আলোকে যৌক্তিকভাবে যাচাই করে দেখার চেষ্টা করব।
ইসলাম কী বলে?
জমজমের পানি সম্পর্কে আমাদের দেশসহ পৃথিবীর মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে নানা ধরণের উদ্ভট আজগুবি কথা প্রচলিত আছে। এগুলো প্রায় সবই এসেছে ইসলামিক নানা ধরণের গ্রন্থ এবং পুরনো দিনের কুসংস্কার থেকে। আসুন শুরুতেই ওয়াজের কিছু কথা শুনে নিই,
এবারে আসুন প্রাসঙ্গিক হাদিস পড়ি নিই,
হাদীস সম্ভার
১০/ হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ যমযমের পানির মাহাত্ম্য
(১২০১) আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় তা (যমযমের পানি) বরকতপূণ। তা তৃপ্তিকর খাদ্য এবং রোগনিরাময়ের ঔষধ।
(ত্বাবারানীর স্বাগীর ২৯৫, বাযযার ৩৯২৯, সহীহুল জামে’ ২৪৩৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ)
বিজ্ঞান কী বলে?
পানি মানবদেহের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু পানি নিজে কোনো পূর্ণাঙ্গ খাদ্য নয়। বিশুদ্ধ পানি ক্যালরি, প্রোটিন, অপরিহার্য ফ্যাটি অ্যাসিড এবং মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ ভিটামিন-খনিজসমষ্টি সরবরাহ করে না। প্রাকৃতিক পানিতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়ামসহ বিভিন্ন দ্রবীভূত খনিজ থাকতে পারে; কিন্তু খনিজের উপস্থিতি কোনো পানিকে “তৃপ্তিকর খাদ্য” বা “রোগনিরাময়ের ঔষধ” বানায় না। এই দুটি দাবি পরীক্ষাযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক দাবি, এবং সেগুলোর জন্য নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় পুষ্টিগত ও চিকিৎসাগত কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে হয়। জমজম পানির রাসায়নিক গঠন নিয়ে একাধিক গবেষণা থাকলেও কোনো নির্ভরযোগ্য মানব-পর্যায়ের clinical trial দেখায়নি যে এই পানি খাদ্যের বিকল্প হিসেবে মানুষকে দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখতে পারে অথবা সাধারণভাবে রোগ নিরাময় করে।
প্রাচীন যুগে পৃথিবীর প্রায় সকল প্যাগান ধর্মে সূর্য, চাঁদ, গাছপালা এবং প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর উপাসনা করা হতো। সেই সময়ের মানুষদের কাছে এসব শক্তির প্রকৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না, তাই তারা ধারণা করত যে, এসব শক্তি একেকটি স্বতন্ত্র সত্তা। এই সত্তাগুলোকে তারা মানুষের মতো সচেতন সত্তা হিসেবে কল্পনা করতো, যারা খায়, ঘুমায়, রাগ করে, খুশি হয়, দুঃখ পায় এবং অন্যান্য মানবীয় অনুভূতি প্রকাশ করে। এই বিশ্বাস থেকেই বিভিন্ন দেবদেবীর সৃষ্টি হয়েছিল। লক্ষ্য করলে দেখবেন, এখনো বিশেষভাবে শিশুরা এই কাজগুলো করে। কোন পাথরে ব্যাথা পেলে তারা পাথরটিকে মারে। কিন্তু পাথর যে সেই মারে ব্যাথা পাচ্ছে না, সেটি শিশুরা বোঝে না।
তবে সময়ের সাথে মানুষ বুঝতে শুরু করে যে, প্রকৃতির এই শক্তিগুলো আসলে মানুষের মতো নয়। মানুষ জীব হিসেবে ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করে, প্রেম-ভালোবাসার দ্বারা বংশবিস্তারের প্রয়োজনে আবেগ প্রকাশ করে। কিন্তু জড় বস্তু যেমন চেয়ারের ভালোবাসার অনুভূতি নেই, তেমনি কোনো অলৌকিক সত্তারও মানবীয় আবেগ থাকা সম্ভব নয়। ঈশ্বর বা দেবতারা যদি রক্ত-মাংসের মানুষ না হন, তাহলে তাদের রাগ, দুঃখ, হিংসা কিংবা ভালোবাসার প্রয়োজনও থাকার কথা নয়। একইভাবে, তাদের উপাসনা বা প্রশংসার প্রয়োজনীয়তাও অমূলক।
একসময় বিশ্বাস করা হতো, মৃত মানুষের আত্মারা আমাদের চারপাশে আছে। কিন্তু চিন্তা করা, দেখা বা স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটি জৈবিক মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং রক্তপ্রবাহ প্রয়োজন। আত্মার এসব উপাদান না থাকলে, তার চিন্তা বা দেখার ক্ষমতা থাকার প্রশ্নই আসে না। প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে পানি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে মানুষ পানিকে এক ধরনের সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিল, কারণ নদীর তীরে সভ্যতা গড়ে ওঠে, কূপের আশেপাশে নগরী বিকশিত হয়। এর ফলে পানির পবিত্রতা নিয়ে নানা উপকথা সৃষ্টি হয়। যেমন প্রাচীন মিশরে নীল নদকে প্রথমে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এই নদীর পানিকে আইসিস দেবীর অশ্রু বলে প্রচার করা হয়। পরবর্তীতে, খ্রিস্টানরাও এই পবিত্র পানির ধারণা গ্রহণ করে নিজেদের গল্প তৈরি করে। ভারতে গঙ্গা নদীকে পবিত্র বলে বিবেচনা করা হয়। হিন্দু মিথলজিতে দেবী গঙ্গাকে গুরুত্বপূর্ণ দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তবে, এই বিশ্বাস সভ্যতা গড়ে ওঠার পরেই তৈরি হয়েছে। গঙ্গার তীরে বসতি স্থাপনের পর, নদীটিকে বিশেষ মর্যাদা দিতে নানা কাহিনী সৃষ্টি হয়। তবে এসব গল্পের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
মক্কার কোরাইশরা জমজম কূপের পাশে তাদের বসতি গড়ে তুলেছিল। এই কূপকে গুরুত্বপূর্ণ করার জন্য নানা কাহিনী প্রচার করা হয়। আব্রাহামিক ধর্মগুলো তখন সম্মানিত হওয়ায়, মক্কার অধিবাসীরা ইব্রাহিমকে মক্কার সঙ্গে যুক্ত করে গল্প তৈরি করে। মুহাম্মদের জন্ম মক্কায় হওয়ার কারণে ইসলাম ধর্মে জমজমের পানি পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। যদি তিনি ভারতে জন্মাতেন, তাহলে হয়তো গঙ্গার পানি হতো মুসলমানদের জন্য পবিত্র। অথবা ইউরোপে জন্ম নিলে টেমস কিংবা রাইন নদীকেই পবিত্র পানি বলা হতো। যেকোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বসতি বা সভ্যতা আগে গড়ে ওঠে, এরপর তার মাহাত্ম্য বাড়াতে নানান কাহিনী রচিত হয়। আজ যদি ঢাকায় কোনো নবী জন্মাতেন, তাহলে হয়তো বলা হতো, বুড়িগঙ্গার পানিই পবিত্র, এবং তার নাম রাখা হতো “বুড়িহাজেরা।” এবং তখনো অনেকে দাবী করতো, বুড়িগঙ্গার পানি পান করেই তারা অসুখমুক্ত হয়েছে!
পানি, খাদ্য ও পুষ্টি—দাবিটির মৌলিক সমস্যা
“জমজমের পানি তৃপ্তিকর খাদ্য”—এই দাবিটির প্রধান সমস্যা পানিতে খনিজ থাকা নয়; সমস্যা হলো পানি এবং পূর্ণাঙ্গ খাদ্যকে এক জিনিস হিসেবে উপস্থাপন করা। মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার জন্য শক্তি বা ক্যালরি, অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, অপরিহার্য ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন এবং বিভিন্ন খনিজের নির্দিষ্ট মাত্রা প্রয়োজন। পানি hydration নিশ্চিত করে, কিন্তু এই macronutrient ও micronutrient-এর পূর্ণাঙ্গ চাহিদা পূরণ করে না।
জমজমে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য দ্রবীভূত উপাদান পাওয়া গেছে—এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভূ-গর্ভস্থ পানির বৈশিষ্ট্য। ২০২১ সালের Heliyon গবেষণায় জমজমের tap water-এর TDS প্রায় 814 mg/L এবং bottled sample-এ 812 mg/L পাওয়া হয়। এই mineralization কোনোভাবেই প্রোটিন, চর্বি বা পর্যাপ্ত ক্যালরির বিকল্প নয়। [1]
অতএব “পানিতে খনিজ আছে” থেকে “পানিটি খাদ্য” সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একটি category error। একইভাবে, কোনো পানিতে কিছু mineral বা antioxidant উপাদান পাওয়া গেলেই সেটি “রোগনিরাময়ের ঔষধ” হয়ে যায় না। ঔষধি কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট রোগ, নির্দিষ্ট outcome, dose, control group এবং যথাযথ clinical trial প্রয়োজন।
জমজমের পানি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী দেখিয়েছে?
জমজম পানির রাসায়নিক গঠন নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাগুলোর ফল একরকম নয়। বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহ করা নমুনায় আর্সেনিক, নাইট্রেট, TDS এবং জীবাণুর মাত্রায় পার্থক্য পাওয়া গেছে। এই পরিবর্তনশীল ফলাফল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে: জমজম একটি বাস্তব ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎস এবং এর নমুনাকে অন্য যেকোনো পানির মতোই রাসায়নিক ও microbiological পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে হয়।
শোমার ২০১২: আর্সেনিক ও নাইট্রেট WHO সীমার প্রায় তিনগুণ
হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute of Earth Sciences-এর গবেষক Basem Shomar-এর Chemosphere-এ প্রকাশিত গবেষণায় জমজম পানির ৩০টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় আর্সেনিকের গড় ঘনত্ব পাওয়া যায় 27 μg/L এবং নাইট্রেট 150 mg/L। গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত WHO guideline-এর তুলনায় উভয় গড়ই প্রায় তিনগুণ বেশি। গবেষক এ কারণে বিভিন্ন উৎস ও স্থানের জমজম পানি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করার আহ্বান জানান। [2]
২০১৬ সালের গবেষণা: আর্সেনিক কম, কিন্তু নমুনাভেদে পার্থক্য
২০১৫ সালে মক্কার Haram-এর ভেতর ও বাইরে, tap, main source এবং Zamzam Water Company-এর bottled water থেকে সংগ্রহ করা ২৯টি নমুনা নিয়ে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় আর্সেনিকের গড় পাওয়া যায় 6.18 μg/L, যা ব্যবহৃত WHO guideline 10 μg/L-এর নিচে। নাইট্রেটের গড় ছিল 35.48 mg/L; তবে সর্বোচ্চ পরিমাপ ছিল 52.79 mg/L, যেখানে গবেষণাটিই WHO reference value হিসেবে 50 mg/L ব্যবহার করেছে। একই গবেষণায় ২৯টি নমুনার মধ্যে দুইটিতে, অর্থাৎ 6.9%-এ total coliform contamination পাওয়া যায়। [3]
২০২১ Heliyon গবেষণা: আর্সেনিক detection limit-এর নিচে
২০২১ সালে Heliyon-এ প্রকাশিত Donia ও Mortada-র গবেষণায় মক্কার জমজম tap থেকে ছয়টি এবং একটি official bottled sample পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষিত নমুনাগুলোতে আর্সেনিক instrumental detection limit-এর নিচে ছিল। Tap sample-এর গড় TDS ছিল 814 mg/L এবং bottled sample-এর 812 mg/L। গবেষকেরা নিজেরাই উল্লেখ করেছেন যে জমজমের আর্সেনিক নিয়ে পূর্ববর্তী গবেষণার ফল conflicting। [4]
এই ফলাফলগুলোর অর্থ খুব সরল: জমজমের বিভিন্ন নমুনায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাসায়নিক ফল পাওয়া গেছে। কোথাও elevated arsenic ও nitrate, কোথাও guideline-এর নিচের মাত্রা, কোথাও coliform contamination, আবার কোথাও পরীক্ষিত chemical parameters গ্রহণযোগ্য সীমায় পাওয়া গেছে। এগুলো কোনো অলৌকিক বা অপরিবর্তনীয় রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ নয়; এগুলো একটি ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎসের laboratory measurements।
পানির নিরাপত্তা কীভাবে নির্ধারিত হয়?
কোনো পানিকে পবিত্র, ঐশ্বরিক বা বরকতময় বলা laboratory standard নয়। পানীয় জল নিরাপদ কি না নির্ধারণ করতে নির্দিষ্ট chemical ও microbiological parameter পরীক্ষা করতে হয়। আর্সেনিক, নাইট্রেট, সীসা, ক্ষতিকর microorganisms এবং অন্যান্য contaminant-এর মাত্রাই জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন নির্ধারণ করে।
জমজম নিয়ে ২০১৬ সালের গবেষণায় ব্যবহৃত WHO reference অনুযায়ী আর্সেনিকের guideline value ছিল 10 μg/L এবং nitrate-এর 50 mg/L। একই গবেষণায় ২৯টি নমুনার দুইটিতে total coliform পাওয়া যায়। অর্থাৎ “পবিত্র পানি” পরিচয় laboratory testing-এর বিকল্প নয়। [5]
TDS-কে বিষাক্ততার সরাসরি মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। ২০২১ সালের গবেষণায় জমজমের TDS প্রায় 812–814 mg/L ছিল। এটি EPA-এর 500 mg/L secondary guideline অতিক্রম করলেও গবেষণাপত্রটি নিজেই উল্লেখ করেছে যে EPA-এর এই মান non-enforceable; এটি মূলত taste, deposits এবং aesthetic/operational quality-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। [4]
একইভাবে, পানির pH বা mineral content একা কোনো পানিকে ঔষধ বানায় না। নিরাপত্তা এবং চিকিৎসাগত কার্যকারিতা সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন: কোনো পানি drinking-water standard পূরণ করতে পারে, অথচ তার কোনো রোগনিরাময় ক্ষমতা নাও থাকতে পারে।
‘পবিত্র’ জমজমের পানিতে ফিল্টার ও জীবাণুনাশক প্রযুক্তি কেন?
জমজমের পানিকে ধর্মীয়ভাবে “বরকতময়”, “রোগনিরাময়ের ঔষধ” এবং বিশেষ ঐশ্বরিক পানি হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে মক্কার কর্তৃপক্ষ এই পানি কূপ থেকে তুলে সরাসরি হাজিদের পান করতে দেয় না। সৌদি সরকারের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, কূপ থেকে পানি প্রথমে শক্তিশালী পাম্পের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়, stainless-steel পাইপের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়, বৃহৎ reservoir-এ সংরক্ষণ করা হয় এবং এরপর একটি নির্দিষ্ট purification, filtration and sterilization plant-এ পাঠানো হয়। পরিশোধনের বিভিন্ন পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ করে পানির রাসায়নিক ও microbiological পরীক্ষা করা হয়। [6] [7]
সৌদি কর্তৃপক্ষের বর্ণনায় জমজমের পানি ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে বালি ও অন্যান্য অপদ্রব্য সরানো হয়, তারপর closed reservoir-এ নেওয়া হয় এবং sterilization devices-এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। Saudi Press Agency-এর নথিতে জমজমের পানি পরিশোধনে আরও নির্দিষ্টভাবে sand filter, carbon filter এবং ultraviolet sterilization-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ “আল্লাহপ্রদত্ত রোগনিরাময়কারী পানি” মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগে আধুনিক প্রকৌশল ব্যবস্থায় তার দৃশ্যমান অপদ্রব্য সরানো, filtration এবং জীবাণুনাশের ব্যবস্থা করতে হয়। [8] [9]
জীবাণুনাশনের ব্যবস্থাটিও কোনো প্রতীকী প্রক্রিয়া নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জমজমের পানিকে ultraviolet radiation-এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয় যাতে আলো bacteria, viruses ও অন্যান্য microorganisms-এর বহিরাবরণ ভেদ করে তাদের DNA ধ্বংস করে। ২০২৪ সালে Saudi Press Agency জানায়, এই UV ব্যবস্থা bacteria ও virus-এর বিরুদ্ধে 99.77% sterilization rate অর্জন করে। অর্থাৎ যে জীবাণুগুলোকে “পবিত্রতা” বা “বরকত” ধ্বংস করছে না, সেগুলোকে ধ্বংস করতে low-pressure mercury UV lamps এবং বিদ্যুৎচালিত sterilization system ব্যবহার করা হচ্ছে। [10]
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই পরিশোধন একবার করেই শেষ করা হয় না। সৌদি সরকারের বর্ণনা অনুসারে, পানি Kudi reservoir থেকে মসজিদুল হারামের দিকে পাঠানোর সময় আবার ultraviolet radiation দিয়ে পরিশোধন করা হয়। একই সঙ্গে যাত্রাপথের প্রধান ধাপগুলোর আগে পানির নমুনা নিয়ে physical, chemical এবং bacteriological analysis করা হয়। পানি থেকে microorganisms শনাক্ত করতে bacterial culture, incubator, microscope এবং অন্যান্য laboratory equipment ব্যবহার করা হয়। [11]
এখানে একটি সরল বাস্তবতা সামনে আসে। কোনো পানিকে যদি বাস্তব অর্থেই নিজের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যে “রোগনিরাময়কারী” এবং বিশেষভাবে সুরক্ষিত ঐশ্বরিক পানি বলা হয়, তাহলে তার পানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বালি ছাঁকার filter, carbon filter, UV sterilizer, sealed reservoir, microbiological culture এবং পুনঃপুন laboratory testing-এর প্রয়োজনীয়তা সেই দাবির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। আধুনিক সৌদি প্রশাসন বাস্তবে জমজমকে অলৌকিক self-purifying liquid হিসেবে পরিচালনা করে না; তারা এটিকে অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ groundwater supply-এর মতোই পরিশোধন, জীবাণুমুক্ত, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত সরল: যদি জমজম নিজেই রোগনিরাময়ের ঔষধ হয়, তাহলে সেই “ঔষধের” bacteria ও virus মারতে UV sterilizer লাগে কেন? যদি পানি নিজেই বিশেষভাবে বিশুদ্ধ হয়, তাহলে sand filter ও carbon filter লাগে কেন? যদি এর নিরাপত্তা ঐশ্বরিক বৈশিষ্ট্য হয়, তাহলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে chemical ও bacteriological laboratory testing লাগে কেন? বাস্তব ব্যবস্থাপনাই এখানে ধর্মীয় দাবির চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট উত্তর দেয়—নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে আধুনিক filtration, sterilization, laboratory science এবং water-management engineering।
অপবিজ্ঞান, বিষক্রিয়া ও ভূ-তাত্ত্বিক বাস্তবতা
জমজমের পানিকে অলৌকিক প্রমাণ করার জন্য আধুনিক যুগে ধর্মীয় প্রচারকরা প্রায়ই অপবিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। একই সাথে এই পানির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি:
অনেক প্রচারক দাবি করেন যে জাপানি গবেষক মাসারু ইমোটো প্রমাণ করেছেন জমজমের পানির দানাগুলো সুন্দর। প্রকৃতপক্ষে, ইমোটোর এই “ওয়াটার মেমরি” তত্ত্বটি আধুনিক বিজ্ঞানে একটি স্বীকৃত অপবিজ্ঞান (Pseudoscience)। মূলধারার কোনো বিজ্ঞানী বা গবেষণাগারে ইমোটোর এই পরীক্ষা কখনোই সফলভাবে পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব হয়নি। পানির কোনো চিন্তা বা অনুভূতি সংরক্ষণের ক্ষমতা নেই—এই দাবিটি বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত। ইমোটোর গবেষণা পদ্ধতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি কোনো পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
২০১১ সালে BBC শুধু যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া অজ্ঞাত উৎসের বোতল পরীক্ষা করেনি; একজন হাজির মাধ্যমে মক্কার জমজম taps এবং মক্কায় পাওয়া bottled water-এর নমুনাও সংগ্রহ করেছিল। পরীক্ষায় elevated nitrate, potentially harmful bacteria এবং অনুমোদিত সীমার প্রায় তিনগুণ arsenic পাওয়ার কথা BBC জানায়। [12]
জমজমের পানি কখনও ফুরায় না—এই যুক্তি দিয়ে একে অলৌকিক বলা হলেও এর একটি সাধারণ ভূ-তাত্ত্বিক (Hydydrogeological) ব্যাখ্যা রয়েছে। মক্কার ভৌগোলিক গঠন অনুযায়ী, এই কূপটি আশেপাশের উপত্যকা বা ‘ওয়াদি’ থেকে বৃষ্টির পানি ও ভূ-গর্ভস্থ অ্যাকুইফার (Aquifer) দ্বারা নিয়মিত রিচার্জ হয়। এটি কোনো অসীম উৎস নয়, বরং বৃষ্টির পানি চুয়ানো একটি প্রাকৃতিক আধার। আধুনিক পাম্পিং প্রযুক্তি আসার পর এই কূপের স্তর যাতে নিচে না নামে, তার জন্য কৃত্রিম তদারকিও করা হয়। মক্কার ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা এবং অ্যাকুইফার রিচার্জিং সিস্টেমই এই কূুপের স্থায়িত্বের বৈজ্ঞানিক কারণ।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জমজমের পানি ultraviolet sterilization ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয় এবং এই প্রযুক্তি bacteria ও virus-এর বিরুদ্ধে 99.77% sterilization rate অর্জন করে। অর্থাৎ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগে তথাকথিত “রোগনিরাময়ের পানি”-র microorganisms ধ্বংস করতে আধুনিক UV প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যদি পানিটি নিজস্ব অলৌকিক বৈশিষ্ট্যেই রোগনিরাময়কারী ও জীবাণুমুক্ত হতো, তাহলে bacteria ও virus ধ্বংস করতে আলাদা sterilization system-এর প্রয়োজন পড়ত না। [10]
সুতরাং, তথাকথিত ‘পানির স্মৃতি’, ‘অক্ষয় কূপ’ বা ‘অলৌকিক রাসায়নিক গঠন’—কোনোটির জন্যই গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। জমজম একটি ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎস; এর রাসায়নিক গঠন laboratory measurement-এর বিষয় এবং বিভিন্ন গবেষণায় বিভিন্ন সময়ে arsenic, nitrate, TDS ও microbial parameter-এর ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে। কোনো নমুনা নিরাপদ পাওয়া যেমন তাকে অলৌকিক বানায় না, তেমনি কোনো নমুনায় contamination পাওয়া তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অস্বাভাবিকও নয়। পানির প্রকৃতি নির্ধারণ করে ভূতত্ত্ব, hydrology, পরিবেশ এবং water-management system—ধর্মীয় উপকথা নয়।
BBC বিতর্ক, সৌদি অস্বীকৃতি এবং পরবর্তী গবেষণা
২০১১ সালের BBC তদন্ত প্রকাশের পর সৌদি কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রতিবাদ জানায়। Saudi Geological Survey-এর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট Zuhair Nawab দাবি করেন যে তাদের বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন জমজমের তিনটি নমুনা পরীক্ষা করেন এবং contamination পাননি। একই প্রতিবেদনে সম্ভাব্য contamination-এর জন্য অননুমোদিত bottling ও container-কে দায়ী করার কথাও বলা হয়। কিন্তু প্রতিবেদনটিতে সেই দৈনিক পরীক্ষাগুলোর raw laboratory data, individual arsenic measurements বা পূর্ণ analytical dataset প্রকাশ করা হয়নি। [13]
এই অস্বীকৃতির পরেই Basem Shomar-এর peer-reviewed Chemosphere গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে arsenic-এর average 27 μg/L এবং nitrate-এর average 150 mg/L পাওয়া হয়—গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত WHO guideline-এর প্রায় তিনগুণ। ফলে BBC-র ফলাফলকে কেবল “যুক্তরাজ্যের নকল বোতলের সমস্যা” বলে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট ছিল না। [14]
পরবর্তী গবেষণায় আবার ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের ২৯টি Saudi sample-এ arsenic-এর mean ছিল 6.18 μg/L এবং ২০২১ সালের ছয়টি tap ও একটি bottled sample-এ arsenic detection limit-এর নিচে ছিল। [5] [4]
এই ধারাবাহিক গবেষণাগুলো কোনো “অপরিবর্তনীয় অলৌকিক রাসায়নিক গঠন” দেখায় না। বরং নমুনা, সময়, সংগ্রহের স্থান এবং distribution system অনুসারে পরিমাপের পার্থক্য দেখায়। ঠিক এ কারণেই আধুনিক জনস্বাস্থ্যে পানির নিরাপত্তা ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, পুনরাবৃত্ত laboratory monitoring-এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা, নাকি আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তার পক্ষে প্রমাণ খোঁজা?
২০২০ সালে American Journal of Blood Research-এ প্রকাশিত একটি গবেষণার শিরোনামেই জমজমের পানিকে “pathogen-free”, “uricosuric”, “hypolipidemic” এবং “tissue-protective” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। গবেষণায় মোট ১৮টি white albino mouse ব্যবহার করা হয়—tap water, distilled water এবং Zamzam water group-এ মাত্র ছয়টি করে। পরীক্ষার সময়কাল ছিল ৯০ দিন। Zamzam samples সরাসরি মক্কার কূপ থেকে নয়, মদিনার Prophet’s Mosque-এর public drinking tanks থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। [15]
এখানে প্রথমেই একটি মৌলিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যা চোখে পড়ে। বিজ্ঞানের কাজ কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করা নয়; বিজ্ঞানের কাজ হলো একটি falsifiable hypothesis দাঁড় করিয়ে সেটিকে এমনভাবে পরীক্ষা করা, যাতে ফলাফল পক্ষে বা বিপক্ষে—দুই দিকেই যেতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় apologetics-প্রভাবিত গবেষণায় প্রায়ই এর উল্টো কাঠামো দেখা যায়: আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ধর্মীয় দাবিটি সত্য, এরপর সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারে এমন biomarker, animal model বা chemical property খোঁজা হয়। এটি hypothesis testing নয়; এটি confirmation bias এবং motivated reasoning-এর একটি পরিচিত রূপ।
এই গবেষণাতেও হাদিসের আসল দাবিটি পরীক্ষা করা হয়নি। হাদিসের দাবি হলো জমজম “তৃপ্তিকর খাদ্য” এবং “রোগনিরাময়ের ঔষধ”। অথচ গবেষকরা ছয়টি করে ইঁদুরের serum uric acid, cholesterol, triglyceride, কিছু liver-related marker এবং renal histology পর্যবেক্ষণ করেছেন। কোনো মানুষের রোগ নিরাময় হয়েছে কি না পরীক্ষা করা হয়নি, কোনো randomized clinical trial করা হয়নি, কোনো রোগের therapeutic endpoint নির্ধারণ করা হয়নি, এবং জমজম খাদ্যের বিকল্প হিসেবে মানুষকে পুষ্টি দিতে পারে কি না তাও পরীক্ষা করা হয়নি। অর্থাৎ ধর্মীয় দাবিটি ছিল এক জিনিস, আর পরীক্ষাটি ছিল সম্পূর্ণ অন্য জিনিসের ওপর।
এ ধরনের গবেষণায় একটি পরিচিত কৌশল হলো claim substitution: বড় এবং কঠিন দাবিকে সরাসরি পরীক্ষা না করে তার জায়গায় ছোট, সহজে positive result পাওয়া যায় এমন surrogate outcome বসিয়ে দেওয়া। “সকল রোগের ঔষধ” পরীক্ষা না করে cholesterol কিছুটা বদলেছে কি না দেখা হলো; “তৃপ্তিকর খাদ্য” পরীক্ষা না করে kidney tissue দেখা হলো; তারপর সেই সীমিত ফলাফলকে ধর্মীয় দাবির পক্ষে ব্যবহার করা হলো। এতে মূল দাবিটি একবারও পরীক্ষিত হয় না, কিন্তু পাঠকের কাছে “বিজ্ঞান জমজমের উপকারিতা প্রমাণ করেছে” এমন একটি বিভ্রান্তিকর impression তৈরি হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই paper Shomar-এর chemical measurement-এর replication ছিল না। Shomar-এর প্রশ্ন ছিল: পানির নমুনায় arsenic ও nitrate কত? এই গবেষণার প্রশ্ন ছিল: ছয়টি ইঁদুরের কিছু নির্বাচিত biomarker ৯০ দিনে কী পরিবর্তন দেখায়? দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে প্রথম প্রশ্নকে বাতিল করা যায় না। একটি chemical-analysis study এবং একটি tiny animal experiment epistemically একই ধরনের evidence নয়।
বিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম হলো: প্রমাণ থেকে সিদ্ধান্তে যেতে হয়; সিদ্ধান্ত থেকে প্রমাণের দিকে নয়। কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ, নবী, পবিত্র বস্তু বা অলৌকিক দাবিকে সত্য ধরে নিয়ে তার পক্ষে supportive data খোঁজা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ধরনের গবেষণা ধর্মীয় বিশ্বাসকে পরীক্ষার মুখে ফেলে না; বরং বিশ্বাসটিকে আগেই সত্য ধরে নিয়ে তার চারপাশে বৈজ্ঞানিক ভাষা নির্মাণ করে। ফলস্বরূপ গবেষণাটি science-এর ভাষা ব্যবহার করলেও এর epistemic structure অনেকাংশে apologetic validation-এর মতো হয়ে যায়।
সুতরাং ছয়টি ইঁদুরের ছোট একটি group-এ ৯০ দিনের selected biomarker পরিবর্তন থেকে “জমজম রোগনিরাময়ের ঔষধ”—এই সিদ্ধান্ত টানা বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। একটি সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা শুরু হতো এই প্রশ্ন দিয়ে: জমজম কি সত্যিই নির্দিষ্ট কোনো রোগ নিরাময় করে? তারপর নির্দিষ্ট রোগ, যথেষ্ট sample size, control group, blinding, predefined endpoint এবং reproducible human clinical outcome দিয়ে সেটি পরীক্ষা করা হতো। এর বদলে ছোট animal study-র সীমিত ফলাফলকে ধর্মীয় দাবির পক্ষে সাজিয়ে দেওয়া প্রমাণ নয়; এটি দাবিটিকে বৈজ্ঞানিকতার আবরণ দেওয়া মাত্র।
নিরাপদ পানি আর অলৌকিক ঔষধ এক দাবি নয়
এখানেই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি রয়েছে: কোনো জমজম sample-এ arsenic WHO guideline-এর নিচে পাওয়া গেলে সেটি ওই sample-এর রাসায়নিক নিরাপত্তা সম্পর্কে তথ্য দেয়। এটি কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে পানি রোগ সারায়, খাদ্যের বিকল্প, অলৌকিক অথবা ঐশ্বরিক। Safety ≠ therapeutic efficacy ≠ nutritional completeness.
একটি পানির নমুনা arsenic-free হতে পারে এবং একই সঙ্গে তার কোনো বিশেষ ঔষধি ক্ষমতা না-ও থাকতে পারে। আবার কোনো পানিতে calcium, magnesium বা অন্যান্য mineral থাকাও সম্পূর্ণ সাধারণ ঘটনা। রোগনিরাময়ের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট রোগের রোগীদের ওপর যথেষ্ট sample size-এর randomized controlled clinical trial, objective outcome এবং reproducible therapeutic effect দেখাতে হবে। জমজম নিয়ে উপরে আলোচিত chemical-analysis ও animal studies সেই প্রমাণ দেয় না। [16] [17]
অতএব কোনো পরবর্তী গবেষণায় জমজমের বিশুদ্ধ নমুনা পাওয়া গেলে হাদিসের দাবি সত্য হয়ে যায় না। হাদিসের দাবিটি অনেক বড়: পানি “তৃপ্তিকর খাদ্য” এবং “রোগনিরাময়ের ঔষধ”। সেই দাবির প্রমাণের মানদণ্ড হলো পুষ্টিবিজ্ঞান ও clinical medicine—শুধু একটি water chemistry report নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জমজমের পানিকে “তৃপ্তিকর খাদ্য” এবং “রোগনিরাময়ের ঔষধ” বলা একটি পরীক্ষাযোগ্য চিকিৎসা ও পুষ্টিবৈজ্ঞানিক দাবি। উপলব্ধ গবেষণায় জমজমের mineral composition, arsenic, nitrate, TDS, microbial quality এবং কিছু সীমিত animal biomarker পরীক্ষা করা হয়েছে; কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য মানব clinical evidence দেখায়নি যে জমজম খাদ্যের বিকল্প, মানুষের পূর্ণাঙ্গ পুষ্টি সরবরাহ করতে সক্ষম, অথবা সাধারণভাবে রোগ নিরাময় করে। পানি নিরাপদ কি না এবং পানি ঔষধ কি না—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। প্রথমটির উত্তর chemical ও microbiological testing দেয়; দ্বিতীয়টির উত্তর দিতে হয় clinical trials দিয়ে।
হাজার বছরের ধর্মীয় বিশ্বাস কোনো পানির রাসায়নিক গঠন, পুষ্টিমান বা চিকিৎসাগত কার্যকারিতার প্রমাণ নয়। জমজমের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য: পানিতে কী আছে তা laboratory analysis বলে, পানি নিরাপদ কি না তা drinking-water standard বলে, আর পানি কোনো রোগ সারায় কি না তা clinical evidence বলে। ২০১১–২০২১ সালের গবেষণাগুলো জমজমের বিভিন্ন নমুনার chemical composition সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে; কিন্তু “তৃপ্তিকর খাদ্য” ও “রোগনিরাময়ের ঔষধ”—এই ধর্মীয় দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেয়নি। অতএব অলৌকিকতার দাবি নয়, পুনরাবৃত্ত পরীক্ষা, প্রমাণ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডই কোনো পানির স্বাস্থ্যগত মূল্য নির্ধারণের একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি।
তথ্যসূত্রঃ
- Donia & Mortada, Heliyon, 2021 — Chemical composition of Zamzam water ↩︎
- Basem Shomar, “Zamzam water: concentration of trace elements and other characteristics”, Chemosphere, 2012 ↩︎
- Al-Barakah et al., 2016 — Nitrate and arsenic concentration status in Zamzam water ↩︎
- Donia & Mortada, Heliyon, 2021 1 2 3
- Al-Barakah et al., 2016 1 2
- Saudipedia — List of Zamzam Water Extraction Stages ↩︎
- Saudipedia — How Is Zamzam Water Purified? ↩︎
- Saudi Press Agency — Zamzam bottling, sand filtration, carbon filtration and UV sterilization ↩︎
- Saudipedia — Sterilization Procedures for Zamzam Water ↩︎
- Saudi Press Agency, 2024 — UV sterilization of Zamzam water 1 2
- Saudi Press Agency — Zamzam purification, repeated UV treatment and laboratory analysis ↩︎
- BBC News, 5 May 2011 — Contaminated Zamzam holy water from Mecca sold in UK ↩︎
- Kingdom rejects BBC claim of Zamzam water contamination — Saudi response reported by Arab News ↩︎
- Shomar, Chemosphere, 2012 ↩︎
- Mahmoud et al., 2020 — Zamzam water is pathogen-free, uricosuric, hypolipidemic and exerts tissue-protective effects ↩︎
- Heliyon chemical-composition study, 2021 ↩︎
- Zamzam mouse study, 2020 ↩︎

