Ya-Sin
ইয়া-সীন: 77
মূল আরবি
أَوَلَمْ يَرَ ٱلْإِنسَـٰنُ أَنَّا خَلَقْنَـٰهُ مِن نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ
English Translations
Does man not consider that We created him from a [mere] sperm-drop - then at once he is a clear adversary?
Does not man see that We have created him from Nutfah (mixed male and female discharge semen drops). Yet behold! He (stands forth) as an open opponent.
Did man not see that We have created him from a drop of semen? Then suddenly he stood as an open adversary (to Us).
Does man not see that We created him of a sperm drop, and lo! he is flagrantly contentious?
Hath not man seen that We have created him from a drop of seed? Yet lo! he is an open opponent.
Doth not man see that it is We Who created him from sperm? yet behold! he (stands forth) as an open adversary!
বাংলা অনুবাদ
মানুষ কি দেখে না যে আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু হতে? অতঃপর সে হয়ে গেল সুস্পষ্ট ঝগড়াটে।
মানুষ কি দেখেনি যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে? অথচ সে (বনে যায়) একজন প্রকাশ্য কুটতর্ককারী।
মানুষ কি দেখেনা যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্র বিন্দু হতে? অথচ পরে সে হয়ে পড়ে প্রকাশ্য বিতন্ডাকারী।
মানুষ কি দেখে না যে, আমরা তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে? অথচ পরে সে হয়ে পড়ে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী।
মানুষ কি লক্ষ্য করে না যে, আমি তাকে শুক্রবিন্দু থেকে সৃষ্টি করেছি? অতঃপর সে হয়ে পড়ল প্রকাশ্য বিতর্ককারী।
৭৭. যে মানুষ মৃত্যুর পরের পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে সেকি চিন্তা করে না যে, আমি তাকে ধাতু থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর সে বহু ধাপ অতিক্রম করে জন্ম লাভ করে ও প্রতিপালিত হয়। অতঃপর সে অতি ঝগড়াটে ও তর্কবাগিশ হয়ে ওঠে। সেকি পুনরুত্থান সম্ভব হওয়ার উপর এটি দেখে প্রমাণ গ্রহণ করে না?
তাফসীর
৭৭-৮০ নং আয়াতের তাফসীর: মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং কাতাদা (রঃ) বলেন যে, একদা অভিশপ্ত উবাই ইবনে খালফ একটি দুর্গন্ধময় পচা সড়া হাড় হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আসে। হাড়টির ক্ষুদ্রাংশগুলো বাতাসে উড়ছিল। এসে সে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ “বল তো, এগুলোতে আল্লাহ পুনর্জীবন দান করবেন?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হ্য। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে ধ্বংস করবেন। এরপর তোমাকে তিনি পুনর্জীবিত করবেন এবং তোমার হাশর হবে জাহান্নামে। ঐ সময় এই সূরার শেষের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, সড়া হাড়টি নিয়ে আগমনকারী লোকটি ছিল আসী ইবনে ওয়ায়েল।
আর একটি বর্ণনায় আছে যে, এটা ছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর ঘটনা। কিন্তু এতে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, এটা মক্কী সূরা। আর আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তো ছিল মদীনায়। যাই হোক, এ আয়াতগুলো সাধারণভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে। (আরবী)-এর উপর যে আলিফ-লাম রয়েছে তা জিনসী। যে কেউই পুনরুত্থানকে অস্বীকারকারী হবে তার জন্যেই এটা জবাব হবে। ভাবার্থ হলোঃ এ লোকগুলোর নিজেদের সৃষ্টির সূচনার প্রতি চিন্তা করা উচিত যে, তাদেরকে এক ঘৃণ্য ও তুচ্ছ শুক্রবিন্দু হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। এর পূর্বে তো তাদের কোন অস্তিত্বই ছিল না। এর পরেও মহামহিমান্বিত আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে অস্বীকার করার কি অর্থ হতে পারে?
মহান আল্লাহ এ বিষয়টিকে আরো বহু আয়াতে বর্ণনা করেছেন। যেমন এক জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে তুচ্ছ পানি (শুক্র) হতে সৃষ্টি করিনি? অতঃপর আমি ওটাকে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে।”(৭৭:২০-২১) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে।”(৬৭:২) হযরত বিশর ইবনে জাহহাশ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হস্তে থুথু ফেলেন। অতঃপর তিনি তাতে অঙ্গুলী রেখে বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে আদম সন্তান! তোমরা কি আমাকেও অপারগ ও শক্তিহীন করতে পার? আমি তোমাদেরকে এরূপ (থুথুর মত তুচ্ছ)।
জিনিস হতে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তোমাদেরকে ঠিক ঠাক করে দিয়েছি। তারপর তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে চলাফেরা করতে শুরু করেছে এবং ধন-সম্পদ জমা করতে ও দরিদ্রদেরকে সাহায্যদানে বিরত রাখতে চলেছে। অতঃপর প্রাণ যখন কণ্ঠাগত হয়েছে তখন বলতে শুরু করেছেঃ “এখন আমি আমার মাল আল্লাহর পথে সাদকা করছি। কিন্তু এখন সাদকা করার সময় কোথায়?” মোটকথা, নিকৃষ্ট শুক্রবিন্দু হতে সৃষ্ট মানুষ যুক্তিবাদী হচ্ছে এবং পুনর্জীবনকে অস্বীকার করছে ও অসম্ভব বলছে। তারা এখন ঐ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর শক্তিকে অস্বীকার করছে যিনি আসমান, যমীন এবং সমস্ত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। যদি তারা চিন্তা করতো তবে এই আযীমুশশান মাখলুকের সৃষ্টি ছাড়াও নিজেদেরই জন্মলাভকে আল্লাহ তা'আলার দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার ক্ষমতার এক বড় নিদর্শনরূপে পেতো।
কিন্তু তার জ্ঞান চক্ষুর উপর তো পর্দা পড়ে গেছে। মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বল- এই অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি এটা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, একদা হযরত উকবা ইবনে আমর (রাঃ) হযরত হুযাইফা (রাঃ)-কে বলেনঃ “আপনি রাসূলুল্লাহ (সঃ) হতে শুনেছেন এমন কোন হাদীস আমাদেরকে শুনিয়ে দিন।” তখন হযরত হুযাইফা (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “একটি লোকের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে সে তার ওয়ারিশদেরকে অসিয়ত করে যে, তারা যেন তার মৃত্যুর পর বহু কাঠ সংগ্রহ করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং তাতে তার মৃত দেহকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়।
তারপর যেন ঐ ভষ্ম সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়। তার কথামত ওয়ারিশরা তাই করে। এরপর আল্লাহ তাআলা যখন তার ভঙ্গুলো একত্রিত করতঃ তাকে পুনর্জীবন দান করেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কেন এরূপ করেছিলে?" সে উত্তরে বলেঃ “আপনার ভয়ে (আমি এরূপ করেছিলাম। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। হযরত উকবা ইবনে আমর (রাঃ) তখন বলেনঃ “আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এটা বলতে শুনেছি। পথ চলতে চলতে তিনি এটা বর্ণনা করেছিলেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) তাদের সহীহ গ্রন্থে এটা তাখরীজ করেছেন)একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, লোকটি বলেছিলঃ “আমার ভষ্মগুলো বাতাসে উড়িয়ে দিবে।
কিছু বাতাসে উড়াবে এবং কিছু সমুদ্রে ভাসিয়ে দিবে।” সমুদ্রে যতগুলো ভষ্ম ছিল সমুদ্র ওগুলো আল্লাহর নির্দেশক্রমে জমা করে দেয় এবং অনুরূপভাবে বাতাসও তা জমা করে। অতঃপর আল্লাহ পাকের ফরমান হিসেবে লোকটি জীবিতাবস্থায় দাড়িয়ে যায় (শেষ পর্যন্ত)।এরপর প্রবল পরাক্রান্ত আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতার আরো নিদর্শন বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ তিনি তোমাদের জন্যে সবুজ বৃক্ষ হতে অগ্নি উৎপাদন করেন এবং তোমরা তা দ্বারা প্রজ্বলিত কর। প্রথমে এ গাছ ঠাণ্ডা ও সিক্ত ছিল। অতঃপর আমি ওকে শুকিয়ে দিয়ে তা হতে অগ্নি উৎপাদন করেছি। সুতরাং আমার কাছে কোন কিছুই ভারী ও শক্ত নয়।
সিক্তকে শুষ্ক করা, শুষ্ককে সিক্ত করা, জীবিতকে মৃত করা এবং মৃতকে জীবিত করা প্রভৃতি সবকিছুরই ক্ষমতা আমার আছে। একথাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা মিরখ ও ইফার গাছকে বুঝানো হয়েছে যা হিজাযে জন্মে। ওর সবুজ শাখাগুলোকে পরস্পর ঘর্ষণ করলে চকমকির মত আগুন বের হয়। যেমন আরবে একটি বিখ্যাত প্রবাদ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক গাছেই আগুন আছে এবং মিরখ ও ইফার মর্যাদা লাভ করেছে।” বিজ্ঞ ব্যক্তিদের উক্তি এই যে, আঙ্গুর গাছ ছাড়া সব গাছেই আগুন রয়েছে।
মানুষ কি দেখে না যে, আমরা তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে? অথচ পরে সে হয়ে পড়ে প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী।
[সূরা ইয়াসিন (৩৬): আয়াত ৭৭] পূর্ণ পৃষ্ঠা
তাদের জন্য যদি তাদের ওপর কোনো আজাব নেমে আসে। আরবদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন: "হয়তো সে করবে।" "তারা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম হবে না" অর্থাৎ উপাস্যরা। এখানে 'ওয়াও' এবং 'নুন' সহযোগে বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ তাদের সম্পর্কে মানুষের মতো করে সংবাদ প্রদান করা হয়েছে। "এবং তারা" অর্থাৎ কাফিররা "তাদের জন্য" অর্থাৎ উপাস্যদের জন্য "উপস্থিত বাহিনী।" হাসান (রাহ.) বলেন: তারা উপাস্যদের রক্ষা করে এবং তাদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করে। কাতাদাহ (রাহ.) বলেন: অর্থাৎ তারা দুনিয়াতে তাদের জন্য ক্রোধান্বিত হয়। আরও বলা হয়েছে: এর অর্থ হলো তারা উপাস্যদের ইবাদত করে এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকে, তাই তারা তাদের জন্য বাহিনীর মর্যাদায় আসীন, অথচ সেই উপাস্যরা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম নয়।
এই তিনটি মতামতের অর্থ কাছাকাছি। আরও বলা হয়েছে: নিশ্চয়ই উপাস্যরা ইবাদতকারীদের জন্য এমন এক বাহিনী যারা তাদের সাথে জাহান্নামে উপস্থিত থাকবে। ফলে কেউ কারো থেকে আজাব হটাতে পারবে না। আরও বলা হয়েছে: এর অর্থ হলো, এই মূর্তিগুলো জাহান্নামে এই কাফিরদের বিরুদ্ধে আল্লাহর বাহিনী হিসেবে গণ্য হবে, কারণ তারা তাদের অভিশাপ দেবে এবং তাদের ইবাদত থেকে নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করবে। আরও বলা হয়েছে: উপাস্যরা কিয়ামতের দিন তাদের জন্য উপস্থিত বাহিনী হিসেবে থাকবে যাতে তাদের ধারণা অনুযায়ী তারা সাহায্য পেতে পারে। বর্ণনায় এসেছে: "নিশ্চয়ই দুনিয়াতে আল্লাহ ব্যতীত মানুষ যাদের ইবাদত করত, কিয়ামতের দিন তাদের সেই প্রতিকৃতি উপস্থাপন করা হবে, অতঃপর তারা তাদের অনুসরণ করে জাহান্নামে যাবে; সুতরাং তারা হবে তাদের জন্য উপস্থিত বাহিনী।" আমি (গ্রন্থকার) বলছি: এই বর্ণনার অর্থ তা-ই যা সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে এবং তিরমিযিতেও তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সা.) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মানুষকে এক বিশাল সমতলে একত্রিত করবেন, অতঃপর রব্বুল আলামিন তাদের সামনে প্রকাশিত হবেন এবং বলবেন: সাবধান!
প্রত্যেক ব্যক্তি যেন তার অনুসরণ করে যার সে ইবাদত করত। তখন ক্রুশ পূজারীর জন্য ক্রুশ, প্রতিকৃতি পূজারীর জন্য প্রতিকৃতি এবং অগ্নি পূজারীর জন্য আগুন মূর্ত করে তোলা হবে। ফলে তারা যার উপাসনা করত তারই অনুসরণ করবে এবং কেবল মুসলিমরা অবশিষ্ট থাকবে।" এরপর তিনি দীর্ঘ হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। "সুতরাং তাদের কথা যেন আপনাকে ব্যথিত না করে" এটিই সর্বাধিক প্রাঞ্জল ভাষা। আরবদের মধ্যে কেউ কেউ 'ইউহযিনুকা'ও বলেন। এর উদ্দেশ্য হলো তাঁর নবী (সা.)-কে সান্ত্বনা প্রদান করা, অর্থাৎ তাদের এই কথা যে, 'সে একজন কবি' বা 'জাদুকর'—তা যেন আপনাকে ব্যথিত না করে।
এখানে কথা সমাপ্ত হয়েছে, এরপর পুনরায় শুরু করে বলা হয়েছে: "নিশ্চয়ই আমি জানি যা তারা গোপন করে এবং যা তারা প্রকাশ করে" অর্থাৎ তাদের কথা ও কাজ এবং যা তারা প্রকাশ্যে করে, আমি তার বিনিময় প্রদান করব। [সূরা ইয়াসিন (৩৬): আয়াত ৭৭]মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে শুক্রাণু থেকে সৃষ্টি করেছি? অতঃপর সে হঠাৎ প্রকাশ্য বিতণ্ডাকারী হয়ে গেল (৭৭)প্রকাশ্য। আল্লাহ তাআলার বাণী: "মানুষ কি দেখে না" ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: এখানে মানুষ বলতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-কে বোঝানো হয়েছে। সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাহ.) বলেন: সে হলো আস ইবনে ওয়ায়েল আস-সাহমি। হাসান (রাহ.) বলেন: সে হলো উবাই ইবনে খালাফ আল-জুমাহি।
