ভূমিকা: অনার কিলিং ও পুরুষাধিপত্যের বৈধতা
একজন নারীর জীবন তাঁর স্বামীর সম্মানরক্ষার উপকরণ নয়। দাম্পত্যের যৌনবিশ্বস্ততা ভঙ্গের অভিযোগ উঠলে সম্পর্ক ভাঙতে পারে, বিচ্ছেদ হতে পারে; সেই অভিযোগকে মানুষের শরীর কেটে ফেলার অধিকার বানানো বর্বরতা। ইসলামি গাইরাতের বয়ান এবং ব্যভিচারের অভিযোগে হত্যার কিছু ফিকহি বিধানে এই বর্বরতাই ধর্মীয় মর্যাদা ও আইনি অব্যাহতির ভাষা পেয়েছে। সা’দ ইবনু উবাদাহ অন্য পুরুষকে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে পেলে তরবারির ধারালো দিক দিয়ে আঘাত করার ঘোষণা দেন; সেই ঘোষণার পর মুহাম্মদ নিজের ও আল্লাহর গাইরাতকে সা’দের চেয়েও বেশি বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তী ফিকহে স্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট পুরুষকে হত্যার পর হত্যাকারীর কিসাস ও দিয়াত থেকে অব্যাহতির স্পষ্ট বিধানও পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থায় নারীর যৌন আচরণ স্বামীর প্রাণঘাতী প্রতিশোধের বিষয় হয়ে ওঠে।
চার সাক্ষী, আদালতে প্রমাণ, নিহতের অভিভাবকের স্বীকৃতি—এসব শর্তের পাশাপাশি ফিকহে এমন একটি সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে আছে: নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রী ও অন্য পুরুষকে হত্যা করেও স্বামী কিসাস ও দিয়াত থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন। আদালতের প্রমাণসংক্রান্ত প্রশ্ন আর হত্যাকে অনুমোদনযোগ্য মনে করার প্রশ্ন এখানে পৃথক। প্রথমটি নির্ধারণ করে হত্যাকারীর দাবি আদালত গ্রহণ করবে কি না; দ্বিতীয়টি নির্ধারণ করে সত্যিই সেই যৌন সম্পর্ক ঘটলে মানুষ দুটিকে হত্যা করার জন্য তাঁকে কীভাবে বিচার করা হবে। আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে সেই বিধান, যা যৌন সম্পর্কের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে হত্যাকারীর জন্য অব্যাহতির পথ খুলে দেয়।
সুন্নাহর উৎস ও মৌন সম্মতি: বিচারবহির্ভূত সহিংসতার আদর্শায়ন
সা’দের তরবারি চালানোর ঘোষণার পর গাইরাতের যে তুলনা এসেছে, সেখানে স্বামীসুলভ যৌন ঈর্ষা নবী ও আল্লাহর গুণের সঙ্গে একই ধারায় স্থান পেয়েছে। একটি প্রাণঘাতী হুমকির পর এমন প্রতিক্রিয়া সহিংস প্রতিশোধকে মর্যাদার ভাষা দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্কের সমাধান হিসেবে অন্য মানুষকে কেটে ফেলার আকাঙ্ক্ষা এখানে ঘৃণ্য নিষ্ঠুরতার পরিচয়ে উন্মোচিত হয় না; আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে হুমকিদাতার প্রবল আত্মমর্যাদা। ফলে যাঁদের প্রাণ বিপন্ন, তাঁদের জীবনকে ছাপিয়ে ওঠে স্বামীর যৌন অধিকারের অনুভূতি।
হাদিসের একই বর্ণনায় চার সাক্ষীর অপেক্ষার নির্দেশ এবং সা’দের গাইরাতসংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া দুটিই আছে। পরবর্তী ফকিহরা এই বক্তব্য থেকে হত্যার অনুমতি, আদালতে প্রমাণ এবং হত্যার পর কিসাসের প্রশ্নে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ইবন কাইয়িম সা’দের প্রতি প্রতিক্রিয়াকে আল্লাহর কাছে হত্যার অনুমতি এবং আদালতের প্রকাশ্য বিধানে প্রমাণের প্রয়োজন—এই দুই স্তরে ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনাও আলোচনা করেছেন। তাই এই ঐতিহ্যের সহিংসতা শুধু একজন সাহাবির ক্রোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই ক্রোধকে ঘিরে মানুষের প্রাণ নেওয়ার অধিকার এবং হত্যাকারীর অব্যাহতির ফিকহি কাঠামো গড়ে উঠেছে।
নারীর দেহের ওপর এই কর্তৃত্বের নৈতিক অর্থ নির্মম। যৌন সম্পর্কের জন্য একজন নারীকে হত্যার শাস্তি থেকে স্বামীকে অব্যাহতি দেওয়া তাঁর জীবনকে স্বামীর যৌন একচ্ছত্রতার অধীন করে। এখানে নারীর সম্মতি সম্পর্কে অনুসন্ধানও হত্যার অব্যাহতি নির্ধারণের অংশ: তিনি বাধ্য হয়েছিলেন, নাকি নিজের ইচ্ছায় অংশ নিয়েছিলেন। নিজের ইচ্ছায় অংশ নেওয়াই যখন তাঁর হত্যাকারীর অব্যাহতির শর্ত হয়, তখন নারীকে তাঁর যৌন সিদ্ধান্তের জন্য প্রাণ দিয়ে মূল্য দিতে হয়। এটি পুরুষাধিপত্যের এক নগ্ন রূপ, যেখানে স্বামীর প্রতিশোধ নারীর জীবনের বিরুদ্ধে আইনি সুবিধা লাভ করে।
হাদিসের বর্ণনা: তরবারির হুমকি, চার সাক্ষী ও গাইরাত
আবু হুরায়রার বর্ণনায় সা’দ প্রথমে চার সাক্ষী আনার আগে সংশ্লিষ্টদের স্পর্শ না করার বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। মুহাম্মদ সম্মতি জানানোর পর সা’দ অপেক্ষা না করে তরবারি চালানোর ঘোষণা দেন। বর্ণনাটি সেই ঘোষণার পর গাইরাতের তুলনা পর্যন্ত সম্পূর্ণ বক্তব্য সংরক্ষণ করেছে। [1] [2]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ قَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوْ وَجَدْتُ مَعَ أَهْلِي رَجُلاً لَمْ أَمَسَّهُ حَتَّى آتِيَ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” نَعَمْ ” . قَالَ كَلاَّ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ إِنْ كُنْتُ لأُعَاجِلُهُ بِالسَّيْفِ قَبْلَ ذَلِكَ . قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” اسْمَعُوا إِلَى مَا يَقُولُ سَيِّدُكُمْ إِنَّهُ لَغَيُورٌ وَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي ” .
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু উবাদাহ বললেন: হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে পাই, তবে চারজন সাক্ষী না আনা পর্যন্ত কি তাকে স্পর্শ করব না? আল্লাহর রাসুল বললেন: হ্যাঁ। সা’দ বললেন: কখনোই নয়! যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ, তার আগেই আমি তার ওপর তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আল্লাহর রাসুল বললেন: তোমাদের নেতা কী বলছেন, শোনো। তিনি প্রবল গাইরাতসম্পন্ন; আমি তাঁর চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন, আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন।
মুগিরা ইবনু শু‘বার বর্ণনায় তরবারির ধারালো দিক দিয়ে আঘাত করার ঘোষণার পর মুহাম্মদ নিজের এবং আল্লাহর গাইরাতের কথা বলেন। এরপর প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা নিষিদ্ধ হওয়া, ওজর পছন্দ করা, রাসুল পাঠানো এবং জান্নাতের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ এসেছে। [3] [4]
عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ ، قَالَ قَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ لَوْ رَأَيْتُ رَجُلاً مَعَ امْرَأَتِي لَضَرَبْتُهُ بِالسَّيْفِ غَيْرَ مُصْفِحٍ عَنْهُ . فَبَلَغَ ذَلِكَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ” أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ فَوَاللَّهِ لأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي مِنْ أَجْلِ غَيْرَةِ اللَّهِ حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلاَ شَخْصَ أَغْيَرُ مِنَ اللَّهِ وَلاَ شَخْصَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعُذْرُ مِنَ اللَّهِ مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ بَعَثَ اللَّهُ الْمُرْسَلِينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَلاَ شَخْصَ أَحَبُّ إِلَيْهِ الْمِدْحَةُ مِنَ اللَّهِ مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ وَعَدَ اللَّهُ الْجَنَّةَ ” .
বাংলা অনুবাদ: মুগিরা ইবনু শু‘বা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু উবাদাহ বললেন: আমি যদি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে দেখি, তবে তরবারির চ্যাপ্টা পাশ দিয়ে নয়, ধারালো দিক দিয়েই তাকে আঘাত করব। এই কথা আল্লাহর রাসুলের কাছে পৌঁছালে তিনি বললেন: তোমরা কি সা’দের গাইরাত দেখে বিস্মিত হচ্ছ? আল্লাহর শপথ, আমি তাঁর চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন, আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন। আল্লাহর গাইরাতের কারণেই তিনি প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীল কাজগুলো নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহর চেয়ে বেশি গাইরাতসম্পন্ন কেউ নেই এবং আল্লাহর চেয়ে বেশি ওজর পছন্দকারী কেউ নেই; এ কারণেই আল্লাহ রাসুলদের সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। আল্লাহর চেয়ে বেশি প্রশংসা পছন্দকারীও কেউ নেই; এ কারণেই আল্লাহ জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সা’দের বক্তব্যের সরাসরি লক্ষ্য স্ত্রীর সঙ্গে পাওয়া পুরুষটি। আরবি لَضَرَبْتُهُ শব্দের পুরুষবাচক সর্বনামও তাকেই নির্দেশ করছে। স্ত্রী হত্যার বিধান পরবর্তী ফিকহের আলোচনায় স্পষ্টভাবে এসেছে। হাদিসে প্রাণঘাতী হুমকির সঙ্গে গাইরাতের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, ফিকহে তা আরও বিস্তৃত হয়ে সংশ্লিষ্ট নারী ও পুরুষ উভয়কে হত্যার পর শাস্তি থেকে অব্যাহতির বিধানে রূপ পেয়েছে। এই দুই স্তরের যোগসূত্রেই ব্যক্তিগত যৌন প্রতিশোধের ধর্মীয় মর্যাদা ও আইনি পরিণতি ধরা পড়ে।
আইনি বৈপরীত্য ও প্রাণের বিনিময়ে ‘পুরুষের অহম’ রক্ষার আইনী ভিত্তি
সূরা আন-নূরে সতী নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে চার সাক্ষী হাজির করতে না পারলে আশিটি বেত্রাঘাত ও সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য হওয়ার বিধান আছে। নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে একই সূরার পরবর্তী আয়াতগুলোতে লি‘আনের আলাদা পদ্ধতি দেওয়া হয়েছে: স্বামীর শপথের বিপরীতে স্ত্রীও শপথ করে শাস্তি প্রতিহত করতে পারেন। এই বিধানে স্ত্রীর বক্তব্যের একটি নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। [5]
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ٤ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَٰلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ ٥ وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ ٦ وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ ٧ وَيَدْرَأُ عَنْهَا الْعَذَابَ أَنْ تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ ٨ وَالْخَامِسَةَ أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِنْ كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ ٩
বাংলা অনুবাদ: (৪) যারা সতী নারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, তারপর চারজন সাক্ষী আনে না, তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না; তারাই অবাধ্য। (৫) এরপর যারা তওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে, তারা ব্যতিক্রম; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। (৬) যারা নিজেদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এবং নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোনো সাক্ষী থাকে না, তাদের প্রত্যেকে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে সে অবশ্যই সত্যবাদীদের একজন। (৭) পঞ্চমবার বলবে, সে মিথ্যাবাদীদের একজন হলে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। (৮) আর স্ত্রী আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দিলে যে স্বামী অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের একজন, তা তার ওপর থেকে শাস্তি দূর করবে। (৯) পঞ্চমবার সে বলবে, স্বামী সত্যবাদীদের একজন হলে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ বর্ষিত হোক।
লি‘আনের এই পদ্ধতিতে অভিযোগ ও প্রত্যাখ্যানের ভাষা আছে, স্বামী ও স্ত্রীর পৃথক বক্তব্য আছে। এর বিপরীতে ব্যভিচাররত অবস্থায় পেয়ে হত্যার পর অব্যাহতির ফিকহি বিধানে স্বামী প্রথমে প্রাণঘাতী আঘাত করেন, পরে আদালতে সেই হত্যার কারণ বিচার করা হয়। ফলে বিচারটির কেন্দ্রে থাকে হত্যাকারী অব্যাহতি পাবেন কি না। নারীকে হত্যা করার আগেই তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগটি স্বামীর তরবারি কেড়ে নেয়। একই ধর্মীয় আইনব্যবস্থার মধ্যে এই দুই প্রক্রিয়ার সহাবস্থান নারীর জীবনের জন্য ভয়াবহ: একটি প্রক্রিয়ায় তাঁর শপথের জায়গা আছে, অন্যটিতে তাঁকে হত্যা করার পর হত্যাকারীর অব্যাহতির পথ আছে।
আল-মুগনি: স্ত্রী হত্যার পর দায় থেকে অব্যাহতি
হানবলি ফকিহ ইবন কুদামা আল-মুগনিতে স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচাররত পুরুষকে হত্যার পর কিসাস ও দিয়াত না হওয়ার বিধান উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় স্ত্রী স্বেচ্ছায় অংশ নিয়ে থাকলে তাঁকে হত্যার জন্যও দায় না থাকার কথা বলেছেন। তিনি উমরের নামে একটি সহিংস ঘটনার বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, তারপর হত্যাকারীর দাবি অস্বীকৃত হলে প্রমাণের প্রয়োজন এবং দুই বনাম চার সাক্ষীর মতভেদ আলোচনা করেছেন। [6]
( 7386 ) وإذا وجد رجلا يزني بامرأته فقتله ، فلا قصاص عليه ، ولا دية ; لما روي أن عمر رضي الله عنه بينما هو يتغدى يوما ، إذ أقبل رجل يعدو ، ومعه سيف مجرد ملطخ بالدم ، فجاء حتى قعد مع عمر ، فجعل يأكل ، وأقبل جماعة من الناس ، فقالوا : يا أمير المؤمنين ، إن هذا قتل صاحبنا مع امرأته . فقال عمر : ما يقول هؤلاء ؟ قال : ضرب الآخر فخذي امرأته بالسيف ، فإن كان بينهما أحد فقد قتله . فقال لهم عمر : ما يقول ؟ قالوا ضرب بسيفه ، فقطع فخذي امرأته ، فأصاب وسط الرجل ، فقطعه باثنين . فقال عمر : إن عادوا فعد . رواه هشيم ، عن مغيرة ، عن إبراهيم . أخرجه سعيد . وإذا كانت المرأة مطاوعة ، فلا ضمان عليه فيها ، وإن كانت مكرهة ، فعليه القصاص . وإذا قتل رجلا ، وادعى أنه وجده مع امرأته ، فأنكر وليه ، فالقول قول الولي ; لما روي عن علي رضي الله عنه ، أنه سئل عن رجل دخل بيته ، فإذا مع امرأته رجل ، فقتلها وقتله . قال علي : إن جاء بأربعة شهداء ، وإلا فليعط برمته . ولأن الأصل عدم ما يدعيه ، فلا يسقط حكم القتل بمجرد الدعوى . واختلفت الرواية في البينة ، فروي أنها أربعة شهداء ; لخبر علي ، ولما روى أبو هريرة ، { أن سعدا قال : يا رسول الله ، أرأيت إن وجدت مع امرأتي رجلا ، أمهله حتى آتي بأربعة شهداء ؟ فقال النبي صلى الله عليه وسلم : نعم } . وروي أنه يكفي شاهدان ; لأن البينة تشهد على وجوده على المرأة ، وهذا يثبت بشاهدين ، وإنما الذي يحتاج إلى الأربعة الزنى ، وهذا لا يحتاج إلى إثبات الزنى .
বাংলা অনুবাদ: যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে ব্যভিচাররত অবস্থায় পায় এবং তাকে হত্যা করে, তবে তার ওপর কিসাস ও দিয়াত নেই। কারণ, বর্ণিত হয়েছে যে উমর একদিন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন; তখন এক ব্যক্তি দৌড়ে এল, তার হাতে খোলা তরবারি, রক্তে মাখা। সে এসে উমরের সঙ্গে বসে খেতে শুরু করল। একদল লোক এসে বলল: হে মুমিনদের নেতা, এই ব্যক্তি আমাদের সঙ্গীকে তার স্ত্রীর সঙ্গে থাকা অবস্থায় হত্যা করেছে। উমর বললেন: এরা কী বলছে? লোকটি বলল: ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীর দুই ঊরুতে তরবারি চালিয়েছে; তাদের মাঝখানে কেউ থাকলে সে তাকে হত্যা করেছে। উমর তাদের বললেন: সে কী বলছে? তারা বলল: সে তরবারি চালিয়ে তার স্ত্রীর দুই ঊরু কেটে ফেলেছে; তরবারি ওই পুরুষের দেহের মাঝখানে লেগে তাকে দুই টুকরা করেছে। উমর বললেন: তারা আবার করলে তুমিও আবার করো। হুশাইম মুগিরার সূত্রে, তিনি ইবরাহিমের সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন; সাঈদ তা সংকলন করেছেন। আর নারী যদি স্বেচ্ছায় অংশ নিয়ে থাকে, তবে তাকে হত্যার জন্যও তার ওপর দায় নেই; নারীকে বাধ্য করা হয়ে থাকলে তার ওপর কিসাস প্রযোজ্য। যদি কোনো পুরুষকে হত্যা করে সে দাবি করে যে তাকে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে পেয়েছিল, আর নিহতের অভিভাবক তা অস্বীকার করে, তবে অভিভাবকের কথাই গ্রহণযোগ্য। কারণ, আলির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে তাঁকে এমন এক ব্যক্তির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে ঘরে ঢুকে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে একজন পুরুষকে পেয়ে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়কে হত্যা করেছিল। আলি বললেন: সে চারজন সাক্ষী আনতে পারলে আনুক; অন্যথায় তাকে দড়িসহ সমর্পণ করা হোক। কারণ, তার দাবিকৃত বিষয়টি ঘটেনি—এটাই প্রাথমিক অবস্থান; স্রেফ দাবির কারণে হত্যার বিধান রহিত হয় না। প্রমাণের বিষয়ে বর্ণনায় মতভেদ রয়েছে। এক বর্ণনায় চারজন সাক্ষীর কথা আছে, আলির বর্ণনা এবং আবু হুরায়রার বর্ণিত এই হাদিসের কারণে: সা’দ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে পাই, তবে চারজন সাক্ষী আনা পর্যন্ত কি তাকে অবকাশ দেব? নবী বললেন: হ্যাঁ। আরেক বর্ণনায় দুইজন সাক্ষীই যথেষ্ট বলা হয়েছে; কারণ, সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে তাকে নারীর ওপর পাওয়ার বিষয়ে, যা দুইজন সাক্ষীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। চারজন সাক্ষী প্রয়োজন ব্যভিচার প্রতিষ্ঠার জন্য; এখানে ব্যভিচার প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন নেই।
এই বিধানের নৃশংসতা স্ত্রীর সম্মতির সঙ্গে হত্যাকারীর অব্যাহতি যুক্ত করার মধ্যে বিশেষভাবে স্পষ্ট। নারী স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্কে অংশ নিলে তাঁকে হত্যার জন্য দায় নেই; বাধ্য করা হয়ে থাকলে হত্যাকারীর কিসাস হবে। নারীর নিজের ইচ্ছা এখানে তাঁর জীবন রক্ষার ভিত্তি হয়ে ওঠে না; সেই ইচ্ছাই তাঁকে হত্যার দায় থেকে স্বামীকে অব্যাহতি দেওয়ার শর্ত হয়। যৌনবিশ্বস্ততা ভঙ্গের জন্য মানুষকে হত্যা করা বর্বরতা, আর সেই হত্যার জন্য অব্যাহতির বিধান লেখা বর্বরতাকে আইনের ভাষা দেওয়া।
উমরের উদ্ধৃত বর্ণনায় স্ত্রীকে তরবারি দিয়ে আঘাত করে ঊরু কেটে ফেলা এবং সংশ্লিষ্ট পুরুষকে দুই টুকরা করার কথা আছে। ইবন কুদামা বর্ণনাটিকে হত্যাকারীর অব্যাহতির বিধানের সমর্থনে ব্যবহার করেছেন। এই উদ্ধৃতি ফিকহি গ্রন্থে সহিংসতার অনুমোদনমূলক ব্যবহার দেখায়; ঐতিহাসিক ঘটনাটির সংঘটন আলাদাভাবে যাচাই করার প্রশ্ন থেকে গ্রন্থের এই আইনি অবস্থান পৃথক। নারীর শরীর ছিন্নভিন্ন করার বিবরণ একটি আইনি আলোচনায় এমনভাবে স্থান পেয়েছে, যেখানে মূল সিদ্ধান্ত হত্যাকারীকে কিসাস ও দিয়াত থেকে মুক্ত করা।
কাশশাফ আল-কিনা: উভয়কে হত্যা, প্রমাণ ও দুই সাক্ষীর বিধান
বুহুতির কাশশাফ আল-কিনায় স্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট পুরুষ উভয়কে হত্যার কথা সরাসরি আছে। এখানে ব্যভিচাররত অবস্থায় পাওয়ার প্রমাণ অথবা নিহতের অভিভাবকের স্বীকৃতি থাকলে কিসাস ও দিয়াত থেকে অব্যাহতির বিধান দেওয়া হয়েছে। একই অনুচ্ছেদে আল্লাহর কাছে বাস্তব অবস্থার বিচার এবং আদালতের প্রকাশ্য বিচারের পার্থক্যও এসেছে। সাক্ষীর সংখ্যার আলোচনায় একটি মত দুইজন সাক্ষীকেই যথেষ্ট বলেছে, কারণ প্রমাণের বিষয়কে ব্যভিচারের বদলে পুরুষটিকে নারীর সঙ্গে পাওয়া হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে। [7]
( وإذا وجد رجلا يزني بامرأته فقتلهما فلا قصاص عليه ، ولا دية ) رواه سعيد عن عمر ( إلا أن تكون المرأة مكرهة فعليه القصاص ) ويأثم لسقوط الحد عليها بالإكراه فهي معصومة ( هذا إذا كانت بينة ) أنه وجده يزني بها ( أو صدقه الولي ) على ذلك ( وإلا ) أي وإن لم تكن بينة ولم يصدقه الولي ( فعليه الضمان في الظاهر ) لأن الأصل العصمة وأما في نفس الأمر إن كان صادقا فلا قصاص عليه ( وتقدم في شروط القصاص بعض ذلك والبينة شاهدان اختاره أبو بكر ) لأن البينة تشهد على وجوده مع المرأة وهذا يثبت بشاهدين وإنما الذي يحتاج إلى أربعة الزنا ، وهذا لا يحتاج إلى إثبات الزنا وعنه أربعة لقول علي .
বাংলা অনুবাদ: যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে ব্যভিচাররত অবস্থায় পায় এবং উভয়কে হত্যা করে, তবে তার ওপর কিসাস ও দিয়াত নেই। সাঈদ উমরের সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন। নারীকে বাধ্য করা হয়ে থাকলে তার ওপর কিসাস প্রযোজ্য এবং সে পাপী হবে; কারণ, জবরদস্তির কারণে নারীর ওপর থেকে হদ রহিত হয়, ফলে তার প্রাণ সুরক্ষিত। এই বিধান তখন, যখন সে তাকে ওই নারীর সঙ্গে ব্যভিচাররত অবস্থায় পেয়েছিল বলে প্রমাণ থাকে, অথবা নিহতের অভিভাবক এ বিষয়ে তার কথা সত্য বলে মেনে নেয়। তা না হলে—অর্থাৎ প্রমাণ না থাকলে এবং অভিভাবকও তার কথা সত্য বলে না মানলে—প্রকাশ্য বিচারে তার ওপর দায় বর্তাবে; কারণ, প্রাথমিক বিধান হলো প্রাণের সুরক্ষা। আর বাস্তবে সে সত্যবাদী হলে তার ওপর কিসাস নেই। কিসাসের শর্তাবলির আলোচনায় এর কিছু বিবরণ আগে এসেছে। প্রমাণ হলো দুইজন সাক্ষী; আবু বকর এই মত গ্রহণ করেছেন। কারণ, সাক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে ওই পুরুষকে নারীর সঙ্গে পাওয়ার বিষয়ে, যা দুইজন সাক্ষীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। চারজন সাক্ষী লাগে ব্যভিচার প্রমাণ করতে; এখানে ব্যভিচার প্রমাণের প্রয়োজন নেই। আর তাঁর সূত্রে আরেক বর্ণনায় আলির বক্তব্যের কারণে চারজন সাক্ষীর কথা এসেছে।
চার সাক্ষীর প্রশ্নে এই ফিকহি পার্থক্যের ফল গুরুতর। ব্যভিচার প্রতিষ্ঠার জন্য চার সাক্ষীর যে শর্ত, হত্যাকারীর অব্যাহতির আলোচনায় প্রমাণের বিষয় বদলে দিয়ে দুই সাক্ষীর মত গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট যৌন ঘটনার নামে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, অথচ হত্যাকারীর অব্যাহতির জন্য সেই ঘটনাকে ব্যভিচারের পূর্ণ প্রমাণের মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন নেই—উদ্ধৃত মতটির বক্তব্য এমনই। এতে মৃত নারী ও পুরুষের জীবন হারানোর পর হত্যাকারীর জন্য তুলনামূলক কম সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অব্যাহতির সুযোগ তৈরি হয়।
প্রমাণ ও নিহতের অভিভাবকের স্বীকৃতির শর্ত এই বিধানের কার্যপদ্ধতির অংশ। সেগুলো নির্ধারণ করে আদালত কখন হত্যাকারীকে অব্যাহতি দেবে এবং কখন তাঁর ওপর দায় আরোপ করবে। মূল বিধানটি তবু অত্যন্ত স্পষ্ট: নির্ধারিত যৌন পরিস্থিতি ও প্রমাণের শর্ত পূরণ হলে স্ত্রীকে হত্যা করেও কিসাস ও দিয়াত থেকে মুক্ত থাকা যায়। মানুষের প্রাণের মূল্যকে এভাবে দাম্পত্যের যৌন একচ্ছত্রতা ভঙ্গের সঙ্গে শর্তযুক্ত করা পুরুষতান্ত্রিক প্রতিশোধকে আইনি সুবিধা দেওয়া।
ইবন কাইয়িম: আল্লাহর কাছে অনুমতি ও আদালতের প্রমাণের পৃথক বিচার
ইবন কাইয়িম জাদ আল-মাআদে সা’দের হাদিস নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় একটি প্রশ্ন হলো বাস্তবে ওই পরিস্থিতি ঘটলে আল্লাহর কাছে হত্যাটি অনুমোদিত কি না, আরেকটি হলো আদালত হত্যাকারীর দাবি গ্রহণ করবে কি না। তিনি সা’দের প্রতি প্রতিক্রিয়ার দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং শেষে উভয় অর্থ উদ্দেশ্য হয়ে থাকতে পারে বলে মত দিয়েছেন। এই আলোচনা দেখায়, গাইরাতসংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া থেকে হত্যার অনুমতি ও কিসাসের প্রশ্ন তোলা পরবর্তী ফিকহি ঐতিহ্যেরই অংশ। [8]
فإن قيل: فما تقولون في الحديث المتفق على صحته، عن أبي هريرة رضي الله عنه، أن سعد بن عبادة رضي الله عنه قال: يا رسولَ الله: أرأيتَ الرجلَ يَجِدُ مع امرأته رجلًا أيقتُلُه؟ فقال رسول الله ﷺ: “لا”، فقال سَعْدٌ: بَلَى والذي بَعَثَكَ بالحَقِّ، فقال رسولِ الله ﷺ: “اسْمَعُوا إلى مَا يَقُولُ سًيِّدُكُم”. وفي اللفظ الآخر: “إِنْ وَجَدْتُ مَعَ امرأتِي رَجُلًا أُمْهِلُهُ حَتَّى آتى بأَرْبَعَةِ شُهَدَاء؟ قال: “نعم” قال: والذي بَعَثَكَ بالحَقِّ إِنْ كُنْتُ لأُعَاجِلُهُ بالسَّيْفِ قَبْلَ ذلِكَ، قال رسولُ الله ﷺ: “اسْمَعُوا إِلى مَا يَقُولُ سَيِّدُكُم إِنَّهُ لَغَيُورٌ وأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ، واللهُ أَغْيَرُ مِنِّي؟”. قلنا: نتلقاه بالقبول والتسليم، والقول بموجبه، وآخِرُ الحديث دليل على أنه لو قتله لم يُقد به، لأنه قال: بلى والذي أكرمَكَ بالحق، ولو وجب عليه القصاصُ بقتله، لما أقره على هذا الحلف، ولما أثنى على غَيْرَته، ولقال: لو قتلَته قُتِلتَ به وحديث أبي هريرة صريحٌ في هذا، فإن رسول الله ﷺ قال: “أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَة سَعْدٍ فَوَاللهِ لأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ واللهُ أَغْيَرُ مِنِّي”، ولم ينكر عليه، ولا نهاه عن قِتله لأن قولَه ﷺ حُكم ملزم، وكذلكَ فتواه حكم عام للأمة، فلو أذن له في قتله، لكان ذلك حكمًا منه بأن دمه هدرٌ في ظاهر الشرع وباطنه، ووقعت المفسدةُ التي درأها اللهُ بالقِصاص، وتهالك الناس في قتل من يريدون قتله في دورهم، ويدَّعونَ أنهم كانُوا يَرَوْنَهُم على حريمهم، فسدَّ الذَّرِيعَةَ، وحَمى المفسدَة، وصان الدماء، وفى ذلك دليل على أنه لا يُقبل القاتل، ويُقاد به في ظاهر الشرع، فلما حلف سعد أنه يقتلُه ولا ينتظر به الشهود، عَجِبَ النبي ﷺ من غَيْرَتِه، وأخبر أنه غَيُورٌ، وأنه ﷺ أغيرُ منه، واللهُ أشدُّ غَيرةً، وهذا يحتمِلُ معنيين. أحدهما: إقراره وسكوُته على ما حلف عليه سعدٌ أنه جائز له فيما بينَه وبَيْنَ اللهِ، ونهيه عن قتله في ظاهر الشرع، ولا يناقض أولُ الحديث آخِرَه. والثاني: أن رسولَ الله ﷺ قال ذلك كالمنكِرِ على سعد، فقال: “أَلا تَسْمَعُونَ إلى مَا يَقُولُ سَيِّدُكُم ” يعني: أنا أنهاه عن قتلِه وهو يقُول: بلى، والذي أكرمك بالحق، ثم أخبر عن الحامل له على هذه المخالفة، وأنه شِدَّةُ غَيْرَتِه، ثم قال: أنا أغيرُ مِنْهُ، والله أغيرُ منى. وقد شرع إِقامة الشهداء الأربعة مع شِدَّةِ غيرته سبحانه، فهي مقرونةٌ بحكمة ومصلحة، ورحمة وإحسان، فالله سبحانه مع شدّة غَيرته أعلم بمصالح عباده، وما شرعه لهم من إقامة الشهود الأربعة دون المبادرة إلى القتل، وأنا أغيرُ من سعد، وقد نهيته عن قتله، وقد يُريد رسولُ الله ﷺ كلا الأمرين، وهو الأليقُ بكلامه وسياق القصة.
বাংলা অনুবাদ: যদি প্রশ্ন করা হয়: আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণিত যে হাদিসের শুদ্ধতার বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, সে সম্পর্কে তোমরা কী বলো? তাতে সা’দ ইবনু উবাদাহ বলেন: হে আল্লাহর রাসুল, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য পুরুষকে পেলে কি তাকে হত্যা করবে? আল্লাহর রাসুল বলেন: না। সা’দ বলেন: অবশ্যই করব, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ। আল্লাহর রাসুল বলেন: তোমাদের নেতা কী বলছেন, শোনো। অন্য শব্দরূপে এসেছে: আমি যদি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো পুরুষকে পাই, তবে চারজন সাক্ষী আনা পর্যন্ত কি তাকে অবকাশ দেব? তিনি বলেন: হ্যাঁ। সা’দ বলেন: যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ, তার আগেই আমি তার ওপর তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আল্লাহর রাসুল বলেন: তোমাদের নেতা কী বলছেন, শোনো। তিনি প্রবল গাইরাতসম্পন্ন; আমি তাঁর চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন, আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন। আমরা বলি: আমরা এটি গ্রহণ করি, মেনে নিই এবং এর তাৎপর্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিই। হাদিসের শেষাংশ প্রমাণ করে যে সে তাকে হত্যা করলে তার বদলে তাকে কিসাসে হত্যা করা হতো না। কারণ, সে বলেছে: অবশ্যই করব, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে সম্মানিত করেছেন তাঁর শপথ। তাকে হত্যার কারণে কিসাস আবশ্যক হলে নবী তাকে এই শপথের ওপর বহাল রাখতেন না, তার গাইরাতের প্রশংসাও করতেন না; বরং বলতেন, তুমি তাকে হত্যা করলে তোমাকেও তার বদলে হত্যা করা হবে। আবু হুরায়রার হাদিসও এ বিষয়ে স্পষ্ট; আল্লাহর রাসুল বলেছেন: তোমরা কি সা’দের গাইরাত দেখে বিস্মিত হচ্ছ? আল্লাহর শপথ, আমি তাঁর চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন, আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন। তিনি তাকে তিরস্কার করেননি এবং তাকে হত্যা করতে নিষেধ করেননি। কারণ, তাঁর কথা বাধ্যতামূলক বিধান, তাঁর ফতোয়াও গোটা উম্মতের জন্য সাধারণ বিধান। তিনি তাকে হত্যার অনুমতি দিলে তা প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত শরিয়তি বিচারে ওই ব্যক্তির রক্ত মূল্যহীন হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে যেত। তখন সেই অনিষ্ট ঘটত, যা আল্লাহ কিসাসের মাধ্যমে প্রতিরোধ করেছেন; মানুষ নিজেদের ঘরে যাদের হত্যা করতে চায় তাদের হত্যা করে দাবি করত, তারা তাদের নারীদের সঙ্গে ওই লোকদের দেখেছিল। তাই তিনি সেই পথ রুদ্ধ করেছেন, অনিষ্ট প্রতিহত করেছেন এবং রক্ত রক্ষা করেছেন। এতে প্রমাণ রয়েছে যে হত্যাকারীর দাবি গ্রহণ করা হবে না এবং প্রকাশ্য শরিয়তি বিচারে তার কিসাস হবে। সা’দ যখন শপথ করলেন যে তিনি তাকে হত্যা করবেন এবং সাক্ষীদের জন্য অপেক্ষা করবেন না, নবী তাঁর গাইরাত দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেন এবং জানালেন, তিনি গাইরাতসম্পন্ন; নবী তাঁর চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন, আর আল্লাহর গাইরাত আরও প্রবল। এর দুটি অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, সা’দ যে বিষয়ে শপথ করেছেন, তার ওপর তাঁকে বহাল রাখা ও নীরব থাকার অর্থ হলো, আল্লাহর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিচারে তা তাঁর জন্য অনুমোদিত; আর হত্যার নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ্য শরিয়তি বিচারের জন্য। এতে হাদিসের প্রথম ও শেষাংশ পরস্পরবিরোধী হয় না। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রাসুল কথাটি সা’দের প্রতি আপত্তি প্রকাশের মতো করে বলেছেন: তোমাদের নেতা কী বলছেন, শুনছ না? অর্থাৎ আমি তাকে হত্যা করতে নিষেধ করছি, আর সে বলছে, অবশ্যই করব, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে সম্মানিত করেছেন তাঁর শপথ। এরপর তিনি এই বিরোধিতার কারণ হিসেবে তাঁর প্রবল গাইরাতের কথা বলেছেন এবং বলেছেন: আমি তাঁর চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন, আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন। আল্লাহ তাঁর প্রবল গাইরাত থাকা সত্ত্বেও চার সাক্ষীর বিধান দিয়েছেন; তাঁর গাইরাত প্রজ্ঞা, কল্যাণ, দয়া ও সদাচারের সঙ্গে যুক্ত। আল্লাহ তাঁর প্রবল গাইরাতসহ বান্দাদের কল্যাণ এবং তাদের জন্য সরাসরি হত্যার বদলে চার সাক্ষী উপস্থিত করার যে বিধান দিয়েছেন, তা সবচেয়ে ভালো জানেন। আমি সা’দের চেয়েও বেশি গাইরাতসম্পন্ন, আর আমি তাঁকে হত্যা করতে নিষেধ করেছি। আল্লাহর রাসুল উভয় অর্থই উদ্দেশ্য করে থাকতে পারেন; তাঁর বক্তব্য ও ঘটনার ধারার সঙ্গে সেটিই বেশি সংগত।
এই ব্যাখ্যার একটি ধারায় হত্যাকারী আদালতে প্রমাণ দিতে না পারলে কিসাসের মুখোমুখি হতে পারেন, অথচ বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য সত্য হলে আল্লাহর কাছে হত্যাটি অনুমোদিত হতে পারে। অর্থাৎ ধর্মীয় অনুমতি ও আদালতের অব্যাহতি একই বিষয় নয়। এর সামাজিক অর্থ বিপজ্জনক: হত্যাকারী নিজের কাজের পক্ষে ধর্মীয় অনুমোদনের দাবি করতে পারেন, যদিও আদালতে তাঁর দাবির প্রমাণ অনুপস্থিত। ব্যক্তিগত যৌন প্রতিশোধ এভাবে মানুষের প্রাণ নেওয়ার ধর্মীয় অধিকার হিসেবে ধারণা করা সম্ভব হয়।
হাদিসে চার সাক্ষীর অপেক্ষার নির্দেশ থেকে শুরু করে ফিকহে দুই সাক্ষীর ভিত্তিতে অব্যাহতির মত, স্ত্রীকে হত্যার পর দায় না থাকা এবং আল্লাহর কাছে অনুমতি বনাম আদালতে প্রমাণের পার্থক্য—সমালোচনার ভিত্তি এই নির্দিষ্ট বিধানগুলো। এগুলোতে হত্যার আগে সংশ্লিষ্ট মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকারের চেয়ে হত্যার পর স্বামীর অব্যাহতির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন নারীর জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর যৌন আচরণ নিয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করে হত্যাকারীকে মুক্ত করার ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের নামে প্রাণঘাতী পুরুষাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
উপসংহার: বীরত্বের আবরণে বর্বরতা ও সমকালীন মানবাধিকারের সংকট
সা’দের হত্যার হুমকির পর গাইরাতকে নবী ও আল্লাহর গুণের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ফিকহে স্ত্রী হত্যার পর অব্যাহতির বিধান—এই দুইয়ের মিলনে যৌন প্রতিশোধ ধর্মীয় মর্যাদা ও আইনি আশ্রয় পায়। এখানে একজন নারী তাঁর স্বামীর যৌন একচ্ছত্রতা রক্ষার অধীন। সেই একচ্ছত্রতা ভঙ্গের ঘটনায় স্বামীর হাতে তাঁর মৃত্যু ঘটলে নির্দিষ্ট শর্তে হত্যাকারীর কিসাস ও দিয়াত থাকে না। পুরুষের সম্মান রক্ষার নামে হত্যাকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে নৈতিক সমস্যা অনার কিলিংয়ের কেন্দ্রে রয়েছে, তার সুস্পষ্ট উপাদান এই বিধানগুলোতে উপস্থিত।
কোনো সম্পর্কের ভাঙন, বিশ্বাসভঙ্গ কিংবা যৌন ঈর্ষা মানুষের শরীর কেটে ফেলার অধিকার সৃষ্টি করে না। একজন নারীর জীবন তাঁর সম্পর্কের স্থায়িত্ব, তাঁর স্বামীর সন্তুষ্টি বা তাঁর যৌনবিশ্বস্ততার পুরস্কার নয়। সম্পর্ক ভাঙার অধিকার এবং মানুষকে হত্যা করার ক্ষমতার মধ্যে সীমারেখা টানতে হয় মানুষের প্রাণের মর্যাদার ভিত্তিতে। যে ফিকহি বিধান সেই সীমা অতিক্রম করে হত্যাকারীকে অব্যাহতি দেয়, তা স্পষ্টভাবেই অমানবিক। ধর্মীয় পবিত্রতার দাবি এই নৃশংস বিধানকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলার দাবি; মানুষের জীবনের পক্ষে অবস্থান তার সরাসরি প্রত্যাখ্যান।
তথ্যসূত্রঃ
- সহিহ মুসলিম ১৪৯৮গ; কিতাবুল লি‘আন ↩︎
- বাংলা সংস্করণ: হাদিস একাডেমী ৩৬৫৫ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১৪৯৯ক; কিতাবুল লি‘আন ↩︎
- বাংলা সংস্করণ: হাদিস একাডেমী ৩৬৫৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা আন-নূর ২৪:৪–৯ ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃ. ১৫৪, অনুচ্ছেদ ৭৩৮৬ ↩︎
- বুহুতি, কাশশাফ আল-কিনা, খণ্ড ৬, পৃ. ১৫৬ ↩︎
- ইবন কাইয়িম, জাদ আল-মাআদ, খণ্ড ৫, “সা’দ ইবনু উবাদাহর হাদিস থেকে প্রাপ্ত বিধান” অংশ ↩︎

