জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

নবীর যুগেই দজ্জাল জীবিত ছিল: অদৃশ্য দ্বীপ, ব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণী ও সহিহ হাদিসের সংঘাত

প্রকাশিত: জুন 27, 2024 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 30 মিনিট পড়া

সারসংক্ষেপ

ইসলামের সবচেয়ে অদ্ভুত শেষযুগীয় বিশ্বাসগুলোর একটি হলো, দজ্জাল কোনো ভবিষ্যৎ সময়ে জন্ম নেবে না; নবী মুহাম্মদের যুগেই সে জীবিত ছিল এবং পৃথিবীর কোনো এক দ্বীপে লোহার শিকলে বন্দী অবস্থায় অপেক্ষা করছিল। সহিহ হাদিসে তামীম দারী নামের একজন প্রাক্তন খ্রিষ্টানের সমুদ্রযাত্রার যে কাহিনি পাওয়া যায়, সেখানে তিনি ও তার ত্রিশজন সঙ্গী ঝড়ের কবলে পড়ে একটি রহস্যময় দ্বীপে পৌঁছান। সেখানে তাদের সামনে হাজির হয় সর্বাঙ্গ লোমে ঢাকা জাসসাসা নামের এক বিচিত্র প্রাণী। সেই প্রাণী তাদের একটি প্রাসাদ বা গির্জার ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে তারা অস্বাভাবিক বিশালদেহী এক ব্যক্তিকে দেখতে পায়, যার হাত ঘাড়ের সঙ্গে এবং পা হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত লোহার শিকলে বাঁধা। লোকটি বায়সানের খেজুরবাগান, তাবারিয়া হ্রদের পানি, যুগার ঝরনা এবং আরবের উম্মী নবীর অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। এরপর সে নিজেকে মাসীহ দজ্জাল হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানায়, শিগগিরই তাকে মুক্ত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে এবং সে মক্কা ও মদিনা ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত জনপদে প্রবেশ করবে। মুহাম্মদ এই কাহিনি জনসমক্ষে বর্ণনা করেন এবং ঘোষণা করেন, তামীম দারীর বক্তব্য দজ্জাল সম্পর্কে তার আগের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে গেছে। এর ফলে একজন সমুদ্রযাত্রীর অলৌকিক অভিজ্ঞতা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রমাণে পরিণত হয়।

এই কাহিনিকে আক্ষরিক সত্য বলে গ্রহণ করলে একসঙ্গে অসংখ্য সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। প্রথম সমস্যা সময়ের। সপ্তম শতাব্দীতে জীবিত একজন বিশালদেহী মানুষকে আজও জীবিত ধরে নিলে তার বয়স প্রায় দেড় হাজার বছর হতে হয়। দ্বিতীয় সমস্যা ভূগোলের। হাদিসে দ্বীপটির অবস্থান প্রথমে সিরিয়া সাগর, পরে ইয়েমেন সাগর এবং শেষে পূর্বদিক বলে নির্দেশ করা হয়েছে। একটি বাস্তব দ্বীপ একই সঙ্গে এই অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকতে পারে না। তৃতীয় সমস্যা অনুসন্ধানযোগ্যতার। পৃথিবীর দ্বীপ, উপকূল, জনমানবহীন ভূমি ও সমুদ্রাঞ্চলের প্রায় সম্পূর্ণ মানচিত্র তৈরি হয়েছে; উপগ্রহচিত্র, আকাশ পর্যবেক্ষণ, সমুদ্র অভিযান, সামরিক নজরদারি এবং বৈজ্ঞানিক জরিপ পৃথিবীর অজানা ভূখণ্ডকে প্রায় বিলুপ্ত করেছে। অথচ বিশাল প্রাসাদ, অতিকায় বন্দী মানুষ, লোহার শিকল এবং কথা বলতে সক্ষম লোমশ প্রাণীসহ সেই দ্বীপের কোনো স্বাধীন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। চতুর্থ সমস্যা ভবিষ্যদ্বাণীর ভাষা। দজ্জাল বলেছিল, তাকে অতি শিগগির বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। প্রায় চৌদ্দশ বছর পার হয়ে গেলেও সেই ‘অতি শিগগির’ শেষ হয়নি। পঞ্চম সমস্যা অন্য হাদিসগুলোর সঙ্গে সংঘাত। কোথাও মুহাম্মদ মদিনার কিশোর ইবন সাইয়াদকে দজ্জাল বলে সন্দেহ করেছেন, কোথাও দজ্জালের জন্ম, পিতা-মাতা ও শৈশবের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, কোথাও বলা হয়েছে সে খোরাসান বা পূর্বাঞ্চল থেকে আবির্ভূত হবে, আবার তামীম দারীর কাহিনিতে সে আগে থেকেই অজ্ঞাত দ্বীপে পূর্ণবয়স্ক ও শিকলবন্দী। এই বর্ণনাগুলোকে একসঙ্গে সত্য রাখতে হলে প্রতিটি বিরোধের জন্য নতুন নতুন অনুমান তৈরি করতে হয়। তখন প্রমাণের বদলে বিশ্বাসকে বাঁচানোই ব্যাখ্যার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। দজ্জালের দ্বীপের কাহিনি তাই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞানের প্রমাণ নয়; এটি ভৌগোলিক অস্পষ্টতা, লোককাহিনি, শেষযুগীয় ভয় এবং পরবর্তী ধর্মীয় স্বীকৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি পরীক্ষাযোগ্য কিন্তু প্রমাণহীন দাবি।


ভূমিকা: পৃথিবীর কোন দ্বীপে শিকলবন্দী দজ্জাল?

কোনো ধর্মীয় কাহিনিতে যদি বলা হয়, অদৃশ্য জগতে একটি অশরীরী সত্তা অবস্থান করছে, সেই দাবিকে সরাসরি ভৌগোলিক অনুসন্ধানে পরীক্ষা করা কঠিন। কিন্তু দজ্জালের দ্বীপের কাহিনি এমন কোনো অস্পষ্ট অতিপ্রাকৃত দাবি নয়। এখানে একটি বাস্তব সমুদ্র, একটি বাস্তব জাহাজ, ত্রিশজন আরব নাবিক, এক মাসব্যাপী ঝড়, একটি দৃশ্যমান দ্বীপ, দ্বীপের ভেতরে একটি স্থাপনা, লোহার শিকলে বাঁধা বিশালদেহী মানুষ এবং তার সঙ্গে মুখোমুখি কথোপকথনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। দজ্জালকে কোনো আত্মা, প্রতীক বা অদৃশ্য শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। সে প্রশ্ন করে, উত্তর শোনে, নিজের পরিচয় দেয়, মুক্তির অপেক্ষা করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে সশরীরে প্রবেশ করার পরিকল্পনা জানায়। অতএব কাহিনিটির দাবি স্পষ্টভাবে ভৌত ও ঐতিহাসিক। দ্বীপটি যদি পৃথিবীতে থাকে, তবে তার একটি অবস্থান থাকার কথা। স্থাপনাটি যদি বাস্তব হয়, তবে তার বস্তুগত অস্তিত্ব থাকার কথা। শিকলবন্দী মানুষটি যদি জীবিত থাকে, তবে তাকে জীবিত রাখার কোনো ব্যবস্থা থাকার কথা। আর ঘটনাটি যদি ত্রিশজন মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়, তবে একজন ব্যক্তির ধর্মান্তরের পর তার মুখে শোনা কাহিনির বাইরে স্বাধীন সাক্ষ্য থাকার কথা। কিন্তু কাহিনিটি যত বিশদ, তার পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ ততটাই শূন্য।

এই প্রমাণশূন্যতার জায়গা পূরণ করা হয়েছে ‘সহিহ’ শব্দ দিয়ে। মুসলিম বিশ্বাসে কোনো বর্ণনার সনদ গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলে সাধারণত তার বিষয়বস্তুকেও সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বর্ণনাশৃঙ্খল সম্পর্কে পরবর্তী হাদিসবিশারদদের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত কোনো দ্বীপের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না, কোনো মানুষের দেড় হাজার বছরের আয়ু সম্ভব করে না এবং একটি সমুদ্রকাহিনিকে প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করা ইতিহাসে রূপান্তরিত করে না। সনদ বিশ্লেষণ সর্বোচ্চ যা বলতে পারে তা হলো, নির্দিষ্ট কয়েকজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে একটি বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে এবং পরবর্তী মুহাদ্দিসরা সেই বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্য মনে করেছেন। বক্তব্যটি বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে মেলে কি না, তার জন্য আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। একজন বিশ্বস্ত মানুষও ভুল শুনতে পারেন, লোককাহিনি বিশ্বাস করতে পারেন, স্মৃতিকে পরিবর্তিত করতে পারেন অথবা এমন একটি কাহিনি প্রচার করতে পারেন যার উৎস তিনি নিজেও যাচাই করেননি। বহু গ্রন্থে একই কাহিনি পাওয়া গেলেও তা বহু স্বাধীন সাক্ষ্য তৈরি করে না, যদি গ্রন্থগুলো একই মূল বর্ণনাকারী ও একই বর্ণনাধারার ওপর নির্ভর করে। একই গল্পের একাধিক অনুলিপি গল্পটির প্রচলন প্রমাণ করে; ঘটনাটির সত্যতা নয়।

তামীম দারীর কাহিনিতে জ্ঞানের প্রবাহটিও অস্বাভাবিক। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে মুহাম্মদ আল্লাহর কাছ থেকে অদৃশ্য জগতের সংবাদ পেতেন। কিন্তু এই ঘটনায় দজ্জালের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত সংবাদ নিয়ে আসেন একজন প্রাক্তন খ্রিষ্টান সমুদ্রযাত্রী। মুহাম্মদ জানান, তামীমের কাহিনি তার আগের বক্তব্যকে সত্যায়িত করেছে। আবার তামীমের কাহিনি সত্য বলে গণ্য হয়, কারণ মুহাম্মদ সেটিকে অনুমোদন করেছেন। ফলে একটি বৃত্তাকার প্রমাণ তৈরি হয়। মুহাম্মদের বক্তব্য সত্য, কারণ তামীমের গল্প তার সঙ্গে মেলে; তামীমের গল্প সত্য, কারণ মুহাম্মদ সেটিকে সমর্থন করেছেন। অথচ দুই দাবির বাইরে এমন কোনো স্বাধীন তথ্য নেই যা দ্বীপ, জাসসাসা বা শিকলবন্দী ব্যক্তিটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। আরও লক্ষণীয়, মুহাম্মদ দ্বীপটির সুনির্দিষ্ট অবস্থানও দিতে পারেননি। তিনি প্রথমে সিরিয়া বা শাম অঞ্চলের সমুদ্রের কথা বলেন, তারপর ইয়েমেনের সমুদ্রের সম্ভাবনা তোলেন, শেষে দুটিকেই সরিয়ে পূর্বদিকে ইঙ্গিত করেন। ঐশী জ্ঞানের দাবি যেখানে সুনির্দিষ্টতা দাবি করে, সেখানে পাওয়া যায় অনুমান, সংশোধন এবং অনির্ধারিত দিকনির্দেশ।

‘পূর্বদিকে’ কোনো ভৌগোলিক ঠিকানা নয়। মদিনা থেকে পূর্বদিকে আরব উপদ্বীপ, পারস্য উপসাগর, ইরান, মধ্য এশিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল অঞ্চল পড়ে। সিরিয়া সাগর বলতে ভূমধ্যসাগর বোঝানো হলে তা মদিনার উত্তর-পশ্চিমে; ইয়েমেনের সমুদ্র দক্ষিণে; আর পূর্বদিক সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক। একটি দ্বীপের অবস্থান সম্পর্কে এই তিন ধরনের নির্দেশকে মানচিত্রে এক জায়গায় বসানো যায় না। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা বলতে পারেন, মুহাম্মদ প্রথম দুটি সম্ভাবনা বাতিল করে শেষে পূর্বদিক নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু সেটি সমস্যার সমাধান নয়। আল্লাহর কাছ থেকে দজ্জাল সম্পর্কে সংবাদ পাওয়া নবীকে যদি একজন নাবিকের গল্প শোনার পর প্রথমে এক সমুদ্র, পরে আরেক সমুদ্র এবং শেষে একটি বিস্তৃত দিকের মধ্যে অবস্থান খুঁজতে হয়, তবে তার জ্ঞান কোনো নির্ভুল ভৌগোলিক সংবাদ ছিল না। আর যদি দ্বীপটির অবস্থান ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়ে থাকে, তবে সিরিয়া, ইয়েমেন ও পূর্বদিক নিয়ে এই নাটকীয় অনুমানের প্রয়োজন ছিল না।

আধুনিক পৃথিবী এই কাহিনিকে আরও গুরুতর সমস্যায় ফেলেছে। সপ্তম শতাব্দীর একজন শ্রোতার কাছে অজানা দ্বীপে বন্দী অতিকায় মানুষের গল্প বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারত। সে সময় পৃথিবীর বিপুল অংশ সম্পর্কে আরবদের কোনো নির্ভুল মানচিত্র ছিল না; সমুদ্রযাত্রা ছিল বিপজ্জনক; অজানা দ্বীপ, অদ্ভুত প্রাণী ও দূরদেশের দৈত্য সম্পর্কে গল্প বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত ছিল। কিন্তু সেই ভৌগোলিক অজ্ঞতা এখন আর নেই। উপগ্রহ পৃথিবীর স্থলভাগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে, সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে, দূরবর্তী দ্বীপেও গবেষক ও পর্যটক পৌঁছান, আর সামান্য ভূমিখণ্ড পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নথিভুক্ত হয়। এই বাস্তবতায় দজ্জালের দ্বীপকে রক্ষা করার জন্য সাধারণত দাবি করা হয়, আল্লাহ দ্বীপটিকে মানুষের চোখ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন অথবা দ্বীপটি এমন কোনো অতিপ্রাকৃত প্রতিবন্ধকের ভেতরে আছে যা প্রযুক্তি শনাক্ত করতে পারে না। কিন্তু এই উত্তর হাদিসের দাবিকে রক্ষা করে না; দাবিটিকে পরীক্ষার বাইরে সরিয়ে নেয়। তামীম ও তার সঙ্গীরা যদি সাধারণ নৌকায় সেখানে পৌঁছাতে পারেন, তবে আধুনিক জাহাজ, বিমান ও উপগ্রহ কেন পারবে না, তার কোনো উত্তর এতে পাওয়া যায় না।

দজ্জালের কাহিনির মূল্যায়নে তাই ভক্তি নয়, একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে যা অন্য যেকোনো অসাধারণ ঐতিহাসিক দাবির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। দাবিটির উৎস কী, সাক্ষ্যগুলো স্বাধীন কি না, বিবরণের ভেতরে বিরোধ আছে কি না, ভৌগোলিক নির্দেশ বাস্তব মানচিত্রের সঙ্গে মেলে কি না, সময়সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ হয়েছে কি না এবং দাবিটিকে ভুল প্রমাণ করার কোনো সম্ভাব্য উপায় রাখা হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নই নির্ধারণ করবে কাহিনিটি বিশ্বাসযোগ্য কি না। কোনো দাবি ব্যর্থ হলেই যদি বলা যায় দ্বীপটি অদৃশ্য, দজ্জালের বার্ধক্য আলৌকিকভাবে থামানো, ‘অতি শিগগির’ বলতে হাজার হাজার বছর বোঝানো হয়েছে এবং পরস্পরবিরোধী সব হাদিসই ভিন্ন পর্যায়ের ঘটনা বর্ণনা করছে, তবে দাবিটি আর প্রমাণনির্ভর থাকে না। তখন যেকোনো ফলাফলকেই বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করা সম্ভব। যে বক্তব্যের বিরুদ্ধে কোনো সম্ভাব্য প্রমাণকেই গ্রহণ করা হয় না, সেই বক্তব্য ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বিশ্বাসকে অক্ষত রাখার জন্য নির্মিত একটি অভেদ্য কাহিনি।


হাদিসসমূহের বিবরণ

বেশ কয়েকটি সহিহ হাদিস অনুসারে, নবী মুহাম্মদের সময়েই দজ্জাল জীবিত ছিল, এবং একটি দ্বীপে বন্দী অবস্থায় ছিল। [1] [2]

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩২/ যুদ্ধ-বিগ্রহ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. দাজ্জালের গোয়েন্দা সম্পর্কে।
৪২৭৫. হাজ্জাজ ইব্‌ন ইয়াকুব (রহঃ) …. ফাতিমা বিনত কায়স (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুআয্‌যিন-কে বলতে শুনি, ’সালাত একত্রকারী; (অর্থাৎ সালাতের জন্য একত্রিত হও।) এরপর আমি বের হয়ে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সালাত আদায় করি। সালাত শেষে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসি মুখে মিম্বরের উপর আরোহণ করে বলেনঃ সবাই নিজ-নিজ স্থানে বসে থাক। এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করেনঃ তোমরা কি জান, কি জন্য আমি তোমাদের একত্রিত করেছি? তাঁরা বলেনঃ আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রাসূল এ ব্যাপারে অধিক অবগত। তিনি বলেনঃ এখন আমি তোমাদের দীনের কাজে উৎসাহিত ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য একত্রিত করিনি, বরং আমি তোমাদের (একটি ঘটনা শুনাবার জন্য) একত্রিত করেছি।
তাহলোঃ তামীমদারী খৃষ্টান ছিল, সে এসে বায়আত হয়ে ইসলাম কবূল করেছে। আমি দাজ্জাল সম্পর্কে তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করেছি, সে বলেছেঃ একবার সে ’লাখাম’ ও ’জুযাম’ গোত্রের ত্রিশজন লোকের সাথে জাহাজ যোগে সমুদ্র ভ্রমণে বের হয়। এক মাস সমুদ্রে চলার পর তাদের জাহাজটি একটি দ্বীপে গিয়ে পৌছায়। সেখানে তাঁরা লম্বা চুল বিশিষ্ট একটি আশ্চর্য ধরনের প্রাণীর সাক্ষাৎ পায়। তারা তাকে বলেঃ তুমি ধ্বংস হও, তুমি কে? তখন সে বলেঃ আমি একজন গোয়েন্দা। তোমরা এই প্রসাদে অবস্থানকারী ব্যক্তির কাছে চলো; কেননা, সে তোমাদের খবরের জন্য খুবই উদগ্রীব।
রাবী বলেনঃ যখন সে আমাদের কাছে সে ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে, তখন আমরা সে প্রাণী সম্পর্কে শংকিত হয়ে পড়ি যে, হয়তো সে শয়তান। আমরা সেখান থেকে দ্রুত চলে যাই এবং উক্ত প্রসাদে প্রবেশ করি এবং সেখানে বিশাল আকৃতির এমন এক ব্যক্তিকে দেখি, যার মত আর কাউকে এর আগে দেখিনি। সে শিকলে বাধা ছিল এবং তার দু’হাত ঘাড়ের সাথে আবদ্ধ ছিল। এরপর পূর্ববতী হাদীছের অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে।
এরপর সে তাদের কাছে ’বায়সান’ নামক স্থানের খেজুর, ’যাআর নামক কূপ এবং উম্মী-নবী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। সে বলেঃ আমি মাসীহ দাজ্জাল। অতি সত্বর আমাকে বের হওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া হবে।
তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দাজ্জাল শাম অথবা ইয়ামনের সমুদ্রে অবস্থিত একটি দ্বীপে বন্দী অবস্থায় আছে। এরপর তিনি বলেনঃ না, বরং সে পূর্বের দিকে আছে, আর তিনি তার হাত দিয়ে সে দিকে দু’বার ইশারা করেন। ফাতিমা (রাঃ) বলেনঃ আমি এ হাদীছ রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি এবং মনে রেখেছি।

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ফাতিমা বিনত কায়স (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২০. দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ এবং দুনিয়াতে তার অবস্থান, ঈসা (আঃ) এর অবতরণ এবং তার দ্বারা দাজ্জালকে হত্যা করা, দুনিয়া থেকে ভাল লোক এবং ঈমানের বিদায় গ্রহন, এবং মন্দ লোকদের অবস্থান, তাদের মূর্তিপূজা, শিঙ্গায় ফুৎকার এবং কবর থেকে সকলের উত্থান
৭১১৯। আবদুল ওয়ারিস ইবনু আবদুস সামাদ ইবনু আবদুল ওয়ারিস ও হাজ্জাজ ইবনু শাঈর (রহঃ) … আমির ইবনু শারাহীল শা’বী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি যাহহাক ইবনু কায়সের বোন ফাতিমা বিনত কায়স (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন। যে সমন্ত মহিলাগণ প্রথমে হিজরত করেছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। তিনি বলেন, আপনি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে হাদীস শুনেছেন, অন্যের দিকে সন্মোধন করা ব্যতিরেকে, এমন একটি হাদীস আপনি আমার নিকট বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, আচ্ছা, তুমি যদি শুনতে চাও, তবে অবশ্যই আমি বর্ণনা করবো। সে বলল, হ্যাঁ আপনি বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, আমি ইবনু মুগীরাকে বিবাহ করেছি। তখন তিনি কুরায়শী যুবকদের উত্তম ব্যক্তি ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে প্রথম যুদ্ধে শরীক হয়েই তিনি শহীদ হয়ে যান। আমি বিধবা হয়ে যাবার পর আবদুল রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) আমার নিকট বিবাহের পয়গাম পাঠান। পয়গাম পাঠান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরো কতিপয় সাহাবী।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তাঁর আযাদকৃত গোলাম উসামা ইবনু যায়িদের জন্য পয়গাম পাঠান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ হাদীসটি আমি পূর্বেই শুনেছিলাম যে, তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাকে ভালবাসে সে যেন উসামাকেও ভালবাসে। ফাতিমা (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে আমার সাথে আলোচনা করার পর আমি তাকে বলেছি, আমার বিষয়টি আপনার ইখতিয়ারে ছেড়ে দিলাম। আপনি যার সাথে ইচ্ছা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিন। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি উম্মে শারীকের নিকট চলে যাও। উম্মে শারীক একজন আনসারী বিত্তশালী মহিলা। আল্লাহর পথে সে অধিক ব্যয় করে এবং তার নিকট অধিক অতিথি আসে। একথা শুনে আমি বললাম, আমি তাই করব।
তখন তিনি বললেন, তুমি উম্মে শারীকের নিকট যেয়ো না। কেনানা উম্মে শারীকের কাছে অনেক মেমমানের আনাগোনা এবং আমি এটাও পছন্দ করিনা যে, তোমার উড়না পড়ে যাক বা তোমার পায়ের গোছা হতে কাপড় খসে যাক আর লোকেরা তোমার শরীরের এমন স্থান দেখে নিক যা তুমি কখনো পছন্দ করনা। তবে তুমি তোমার চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনু মাকতুমর নিকট চলে যাও। তিনি বনী ফিহরের এক ব্যক্তি। ফিহর কুরায়শেরই একটি শাখা গোত্র। ফাতিমা যে খান্দানের লোক তিনিও সে খান্দানেরই মানুষ।
আমি তার নিকট চলে গেলাম। অতঃপর আমার ইদ্দত সমাপ্ত হলে আমি জনৈক আহবানকারীর আওয়াজ শুনতে পেলাম। বস্তুতঃ তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত আহবানকারী ছিলেন। তিনি এ মর্মে আহবান করছিলেন যে সালাতের উদ্দেশ্যে তোমরা একত্রিত হয়ে যাও। অতঃপর আমি মসজিদের দিকে রওয়ানা হলাম এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সালাত আদায় করলাম। তিনি বলেন, কাওমের পেছনে যে কাতারে মহিলাগণ ছিলেন আমি সে কাতারেই ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযান্তে হাসিমুখে মিম্বরে বসে গেলেন। অতঃপর বললেনঃ প্রত্যেকেই আপন আপন স্থানে বসে যাও। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জান, আমি কি জন্য তোমাদেরকে একত্রিত করেছি? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে কোন আশা বা ভীতি প্রদর্শনের জন্য একত্রিত করিনি। তবে আমি তোমাদেরকে কেবল এ জন্য একত্রিত করেছি যে, তামীমদারী (রাঃ) প্রথমে খ্রীষ্টান ছিল। সে আমার নিকট এসে বায়আত গ্রহণ করেছে এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। সে আমার কাছে এমন একটি কাহিনী বর্ণনা করেছে যদ্বারা আমার সেই বর্ণনার সত্যায়ন হয়ে যায়, যা আমি দাজ্জাল সম্পর্কে তোমাদের বর্ণনা করেছিলাম।
সে আমাকে বলেছে যে, একবার সে লাখম ও জুযাম গোত্রের ত্রিশজন লোকসহ একটি সামুদ্রিক নৌকায় আরোহণ করেছিল। সামুদ্রিক তুফান এক মাস পর্যন্ত তাদেরকে নিয়ে খেলা করতে থাকে। অতঃপর (একদিন) সূর্যাস্তের সময় তারা সমুদ্রের এক দ্বীপে আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপর তারা ছোট ছোট নৌকায় বসে ঐ দ্বীপে প্রবেশ করে। দ্বীপে নামতেই একটি জন্তু তাদের দৃষ্টিগোচর হল। তার সমগ্র দেহ লোমে আবৃত ছিল। লোমের কারণে তার সম্মুখ অঙ্গ ও পশ্চাত অঙ্গ চিনা যাচ্ছিল না। লোকেরা তাকে বলল, হতভাগা, তুই কে? সে বলল, আমি দাজ্জালের গুপ্তচর। লোকেরা বলল, গুপ্তচর আবার কি? সে বলল! লোক সকল! ঐ যে গীর্জা দেখা যায় সেখানে চল। সেখানে এক ব্যক্তি অধীর আগ্রহে তোমাদের অপেক্ষা করছে।
তামীমদারী (রাঃ) বলেন, তার মুখে এক ব্যক্তির কথা শুনে আমরা ভীত ছিলাম যে, সে আবার শয়তান তো নয়! আমরা দ্রুত হেটে গীর্জায় প্রবেশ করতঃ এক বিশালদেহী ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। ইতিপূর্বে এমন আমরা আর কখনো দেখিনি। লোহার শিকলে বাধা অবস্থায় দুই হাঁটুর মধ্য দিয়ে তার উভয় হাত ঘাড়ের সাথে মিলানো। আমরা তাকে বললাম, তোর সর্বনাশ হোক, তুই কে? সে বলল, তোমরা আমার সন্ধান কিছু না কিছু পেয়েই গেছ। এখন তোমরা বল, তোমাদের পরিচয় কি? তারা বলল, আমরা আরবের বাসিন্দা। আমরা সমুদ্রে নৌকায় চড়ে ভ্রমণ করছিলাম। আমরা সমূদ্রকে উত্তাল তরঙ্গে উদ্বেলিত অবস্থায় পেয়েছি। এক মাস পর্যন্ত ঝাড়ের কবলে থেকে আমরা তোমার এ দ্বীপে এসে পৌছেছি। অতঃপর ছোট ছোট নৌকায় আরোহণ করে এ দ্বীপে আমরা প্রবেশ করেছি। এখানে আমরা একটি সর্বাঙ্গ লোমে আবৃত জন্তুকে দেখতে পেয়েছি। লোমের আধিক্যের কারণে আমরা তার সম্মুখ অঙ্গ ও পশ্চাত অঙ্গ চিহ্নিত করতে পারছিলাম না। আমরা তাকে বলেছি, তোর সর্বনাশ হোক, তুই কে? সে বলেছে, সে নাকি দাজ্জালের গুপ্তচর। আমরা বললাম, গুপ্তচর আবার কি! তখন সে বলেছে, ঐ যে গীর্জা দেখা যায়, তোমরা সেখানে চল। সেখানে এক ব্যক্তি অধীর আগ্রন্থে তোমাদের অপেক্ষায় আছে। তাই আমরা দ্রুত তোর কাছে এসে গেছি।
আমরা তার কথায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি; না জানি এ আবার কোন শয়তান (জ্বীন ভূত) কিনা? অতঃপর সে বলল, তোমরা আমাকে বায়সানের খেজুর বাগানের খবর বল। আমরা বললাম, এর কোন বিষয়টি সম্পর্কে তুই সংবাদ জানতে চাচ্ছিস? সে বলল, বায়সানের খেজুর বাগানে ফল আসে কি না, এ সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করছি। তাকে আমরা বললাম, হ্যাঁ, আছে। সে বলল, সেদিন নিকটেই যেদিন এগুলোতে ফল ধরবে না। অতঃপর সে বলল, আচ্ছা, তাবারিয়া সমুদ্র সম্পর্কে আমাকে অবগত কর। আমরা বললাম, এর কোন বিষয় সম্পর্কে তুই আমাদের থেকে জানতে চাচ্ছিস! সে বলল, এর মধ্যে পানি আছে কি? তারা বলল, হ্যাঁ, সেখানে বহু পানি আছে। অতঃপর সে বলল, সেদিন বেশী দূরে নয়, যখন এ সাগরে পানি থাকবে না।
সে আবার বলল, যুগার এর ঝর্ণা সম্পর্কে তোমরা আমাকে অবহিত কর। তারা বলল, তুই এর কি সম্পর্কে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিস। সে বলল, এতে পানি আছে কি? এবং এ জনপদের লোকেরা তাদের ক্ষেত্রে এ ঝর্ণার পানি দেয় কি! আমরা বললাম- হাঁ, এ তে বহু পানি আছে এবং এ জনপদের লোকেরা এ পস্রবনের পানি দ্বারা চাষাবাদ করে কি? সে পূনরায় বলল, তোমরা আমাকে উম্মীদের নবী সম্পর্কে সংবাদ দাও। সে এখন কি করছে? তারা বলল, তিনি মক্কা থেকে হিজরত করে মদ্বীনায় চলে এসেছেন। সে জিজ্ঞেস করল, আরবের লোকেরা তার সাথে যুদ্ধ করছে কি? আমরা বললাম, হ্যাঁ, করেছে। সে বলল, সে তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছে। আমরা তাকে সংবাদ দিলাম যে, তিনি আরবের পার্শ্ববর্তী এলাকায় জয়ী হয়েছেন এবং তারা তার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। সে বলল, এ কি হয়েই গেছে? আমরা বললাম, হ্যাঁ। সে বলল, বশ্যতা স্বীকার করে নেয়াই জনগণের জন্য মঙ্গলজনক ছিল।
এখন আমি নিজের সম্পর্কে তোমাদেরকে বলছি, আমিই মাসীহ দাজ্জাল। অতিসত্ত্বরই আমি এখান থেকে বাইরে যাবার অনুমতি পেয়ে যাব। বাইরে যেয়ে আমি সমগ্র ভূ-পৃষ্ঠ প্রদক্ষিণ করবো। চল্লিশ দিনের ভেতর এমন কোন জনপদ থাকবে না, যেখানে আমি প্রবেশ না করব। তবে মক্কা ও তায়বা এ দু’টি স্থানে আমি প্রবেশ করব না। যখন আমি এ দুটির কোন একটিতে প্রবেশের ইচ্ছা করব, তখন এক ফিরিশতা উন্মুক্ত তরবারি হাতে সামনে এসে আমাকে বাধা দিবে। এ দুটি স্থানের সকল রাস্তায় ফিরিশতাদের পাহারা থাকবে।
বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছড়ি দ্বারা মিম্বরে আঘাত করে বললেন, এই হচ্ছে তায়বা, এই হচ্ছে তায়বা, এই হচ্ছে তায়বা। অর্থাৎ তায়বা অর্থ এই মদীনাই। সাবধান! আমি কি এ কথাটি ইতিপূর্বে তোমাদেরকে বলিনি? তখন লোকেরা বলল, হ্যাঁ, আপনি বলেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তামীমদারীর বর্ণনাটি আমাকে বিমোহিত করেছে। যেহেতু তা সামঞ্জস্যপূর্ণ আমার ঐ বর্ণনার, যা আমি তোমাদেরকে দাজ্জাল, মদীনা ও মক্কা সম্পর্কে ইতিপূর্বে বলেছি। তিনি আরো বললেন, সিরিয়া সাগরে অথবা ইয়ামান সাগরে বরং পূর্বদিকে রয়েছে, পূর্বদিকে রয়েছে, পূর্বদিকে রয়েছে। এসময় তিনি তার হাত দ্বারা পূর্ব দিকে ইশারাও করলেন।
বর্ণনাকারী ফাতিমা বিনত কায়স (রাঃ) বলেন, এ হাদীস আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুখস্থ করেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ শা‘বী (রহঃ)


সিরিয়া সাগর, ইয়েমেন সাগর, না পূর্বদিক: হারিয়ে যাওয়া দ্বীপের ভৌগোলিক গোলকধাঁধা

তামীম দারীর কাহিনিতে দজ্জালের দ্বীপ কোনো প্রতীকী স্থান নয় যে, মেটাফোর হিসেবে এটিকে চালিয়ে দেয়া যাবে। ত্রিশজন মানুষ সাধারণ জাহাজে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছেছিল, ছোট নৌকায় দ্বীপে নেমেছিল, স্থলভাগের ভেতরে হেঁটেছিল এবং একটি স্থাপনার মধ্যে শিকলবন্দী মানুষটিকে দেখেছিল। ফলে দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান থাকার কথা। কিন্তু মুহাম্মদ যখন সেই অবস্থান জানাতে গেলেন, তখন একটি নির্দিষ্ট স্থানের বদলে পরপর তিনটি ভিন্ন নির্দেশ পাওয়া গেল। প্রথমে বলা হলো, দ্বীপটি সিরিয়া সাগরে অথবা ইয়েমেন সাগরে। সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুমান প্রত্যাহার করে বলা হলো, না, বরং পূর্বদিকে। আরবি বাক্যের গঠন এখানে অস্পষ্ট নয়। ‘আও’ অর্থ ‘অথবা’; ‘লা বাল’ অর্থ পূর্ববর্তী বক্তব্য বাতিল করে ‘না, বরং’। অর্থাৎ একই দ্বীপকে একই সঙ্গে তিন স্থানে রাখা হয়নি; প্রথমে দুটি সম্ভাব্য সমুদ্রের নাম বলা হয়েছে, তারপর সেগুলো সরিয়ে একটি বিস্তৃত দিক নির্দেশ করা হয়েছে। এই সংশোধনই মূল সমস্যা। দজ্জালের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভুল ঐশী সংবাদ থাকলে প্রথমে ভূমধ্যসাগর বা লোহিত সাগরের সম্ভাবনা উত্থাপন করে পরে তা প্রত্যাহার করার প্রয়োজন ছিল না। [3]

আরবি: وَإِنَّهُ فِي بَحْرِ الشَّامِ أَوْ بَحْرِ الْيَمَنِ، لَا بَلْ مِنْ قِبَلِ الْمَشْرِقِ.
বাংলা: সে সিরিয়া সাগরে অথবা ইয়েমেন সাগরে রয়েছে। না, বরং সে পূর্বদিকের দিকে রয়েছে।

পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা এই সংশোধনকে ভাষাগত অলংকারে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। কেউ বলেছেন, মুহাম্মদ শ্রোতাদের কাছে বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখতে চেয়েছিলেন; কেউ বলেছেন, প্রথমে তার সন্দেহ বা অনুমান ছিল, পরে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন; আবার কেউ দাবি করেছেন, বক্তব্য দেওয়ার মধ্যেই ওহির মাধ্যমে তাকে সঠিক দিক জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাদিসে মাঝবাক্যে নতুন ওহি আসার কোনো কথা নেই। সেখানে জিবরাইলের আগমন, আল্লাহর পক্ষ থেকে সংশোধন অথবা মুহাম্মদের কাছে নতুন তথ্য পৌঁছানোর কোনো বিবরণও দেওয়া হয়নি। এগুলো মূল ঘটনার অংশ নয়; পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের তৈরি অনুমান। ইসলামওয়েবের একটি উত্তরেও আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদের ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে স্বীকার করা হয়েছে, বাক্যটির বাহ্যিক রূপ এমন যে মুহাম্মদ প্রথমে দ্বীপটি এখানে না সেখানে, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন এবং পরে পূর্বদিকের কথা বলেছেন। অর্থাৎ সমস্যাটি সমালোচকের চাপিয়ে দেওয়া নয়; ইসলামি ব্যাখ্যাতেই প্রাথমিক অনিশ্চয়তা স্বীকার করা হয়েছে। [4]

আরবি: فَكَأَنَّهُ قَبْلُ كَانَ مُتَرَدِّدًا هَلْ هُوَ هُنَا أَوْ هُنَا، وَلَكِنَّهُ بَعْدَ ذَلِكَ أَخْبَرَ بِأَنَّهُ فِي جِهَةِ الشَّرْقِ.
বাংলা: যেন এর আগে তিনি দ্বিধায় ছিলেন, সে এখানে না সেখানে; কিন্তু পরে তিনি জানান যে সে পূর্বদিকে রয়েছে।

এই ব্যাখ্যা সমস্যাটিকে দূর না করে আরও স্পষ্ট করে। একজন সাধারণ মানুষ অজানা দ্বীপের অবস্থান অনুমান করতে গিয়ে প্রথমে দুটি সমুদ্রের নাম নিয়ে পরে একটি দিকের কথা বললে সেটিকে স্বাভাবিক অনিশ্চয়তা বলা যায়। কিন্তু একই বক্তব্যকে যখন নবুয়তের সত্যতার নিদর্শন এবং অদৃশ্য জগতের নির্ভুল সংবাদ হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন এই অনিশ্চয়তা গ্রহণযোগ্য থাকে না। ‘পূর্বদিক’ বলাও কোনো সুনির্দিষ্ট সংশোধন নয়। মদিনা থেকে পূর্বদিকে আরব উপদ্বীপের অবশিষ্ট অংশ, পারস্য উপসাগর, ইরান, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বিপুল অঞ্চল রয়েছে। একটি গোলাকার পৃথিবীতে পূর্বদিকে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত আবার যাত্রার সূচনাস্থলের কাছেই ফিরে আসা যায়। ফলে ‘পূর্বদিকে’ এমন একটি বিস্তৃত নির্দেশ, যার সাহায্যে কোনো দ্বীপ চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। এটি ঠিকানা নয়; মানচিত্রহীন একটি দিক মাত্র।

সিরিয়া সাগর বলতে সাধারণত ভূমধ্যসাগরের সিরীয় উপকূলসংলগ্ন অংশ এবং ইয়েমেন সাগর বলতে ইয়েমেনের উপকূলবর্তী লোহিত সাগর, আরব সাগর বা এডেন উপসাগর বোঝানো হতে পারে। এই অঞ্চলগুলো পরস্পর থেকে বিপুল দূরত্বে অবস্থিত। মদিনা থেকে সিরিয়া উত্তর-পশ্চিমে, ইয়েমেন দক্ষিণে এবং পূর্বদিক এই দুই অবস্থানের কোনোটিই নয়। তাই ‘সিরিয়া অথবা ইয়েমেন, না, বরং পূর্ব’ বাক্যকে একটি ধারাবাহিক নির্ভুল নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। প্রথম দুটি স্থান ভুল হলে প্রশ্ন ওঠে, সেগুলো বলা হয়েছিল কেন। আর প্রথম দুটি কেবল অনুমান হলে প্রশ্ন ওঠে, দজ্জালের অবস্থান সম্পর্কে মুহাম্মদের জ্ঞানের উৎস কী ছিল। একজন প্রাক্তন খ্রিষ্টান সমুদ্রযাত্রীর গল্প শোনার পরও যদি দ্বীপটি কোথায়, তা নির্ধারণ করা না যায়, তবে গল্পটি আগের ঐশী জ্ঞানের সত্যায়ন নয়; বরং গল্প শোনার পর অজানা অবস্থান অনুমান করার দৃষ্টান্ত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, দজ্জাল বর্তমানে কোথায় বন্দী এবং ভবিষ্যতে কোন অঞ্চল থেকে প্রকাশ্যে আবির্ভূত হবে, এই দুটি এক প্রশ্ন নয়। কোনো মানুষ একটি স্থানে বন্দী থেকে মুক্ত হওয়ার পর অন্য অঞ্চল দিয়ে জনসমক্ষে আবির্ভূত হতে পারে। পরবর্তী বর্ণনায় দজ্জাল পূর্বাঞ্চল বা খোরাসানের দিক থেকে বের হবে বলা হলেও তা তামীমের দেখা দ্বীপটির অবস্থান প্রমাণ করে না। আবির্ভাবের অঞ্চল দিয়ে বন্দিশালার ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না। অথচ ব্যাখ্যাকারীরা প্রায়ই এই দুই প্রশ্নকে এক করে ‘পূর্বদিক’ শব্দ দিয়ে দ্বীপটির অবস্থানসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ঢাকার চেষ্টা করেন। এতে একটি নতুন অনুমান প্রয়োজন হয়: দজ্জাল দ্বীপ থেকে মুক্ত হয়ে অদৃশ্যভাবে পূর্বাঞ্চলে যাবে, তারপর সেখান থেকে প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু তামীমের কাহিনিতে বলা হয়েছে, মুক্তির অনুমতি পাওয়ার পর সে বের হবে এবং পৃথিবীর জনপদগুলোতে চলতে শুরু করবে। দ্বীপ থেকে গোপনে অন্য দেশে স্থানান্তরের কোনো মধ্যবর্তী ঘটনা সেখানে নেই।

এই সমস্যাটি শুধু আধুনিক সংশয়বাদীদের চোখে ধরা পড়েনি। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত তাফসির আল-মানারে রশিদ রিদা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, সিরিয়া বা ইয়েমেনের সমুদ্রে এমন দ্বীপ থাকলে নাবিকদের অনুসন্ধানে তা অজানা থাকার কথা নয়। তিনি আরও বলেছেন, দজ্জালকে এক সমুদ্র থেকে অন্য সমুদ্রে বা ইসফাহানে স্থানান্তরের যেসব ব্যাখ্যা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা কিংবা গ্রহণযোগ্য যুক্তি নেই; এগুলো পরস্পরবিরোধী বর্ণনাকে জোড়া দেওয়ার জন্য উদ্ভাবিত অনুমান। এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তামীম ও তার সঙ্গীরা কোনো অলৌকিক বাহনে দ্বীপে পৌঁছায়নি। তারা সাধারণ জাহাজ ও ছোট নৌকা ব্যবহার করেছিল। সাধারণ মানুষ সাধারণ নৌযাত্রায় যেখানে পৌঁছাতে পারে, সেই স্থানকে পরে মানুষের অনুসন্ধানের বাইরে রাখা যায় না। [5]

আরবি: فَلَوْ كَانَ فِي أَحَدِهِمَا جَزِيرَةٌ فِيهَا دَيْرٌ أَوْ قَصْرٌ حُبِسَ فِيهِ الدَّجَّالُ، لَعُرِفَ ذَلِكَ كُلُّهُ كُلَّ النَّاسِ.
বাংলা: ওই দুই সমুদ্রের কোনো একটিতে যদি এমন দ্বীপ থাকত, যেখানে কোনো গির্জা বা প্রাসাদে দজ্জাল বন্দী রয়েছে, তবে সব মানুষই তার কথা জানতে পারত।

এই যুক্তির বিরুদ্ধে শেষ আশ্রয় হলো, আল্লাহ অলৌকিকভাবে দ্বীপটিকে লুকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু হাদিসে এমন কোনো অদৃশ্য আবরণ, অন্য মাত্রা, বিশেষ প্রতিবন্ধক বা মানুষের দৃষ্টিশক্তি বন্ধ করে দেওয়ার কথা নেই। বরং কাহিনির মূল শর্তই হলো, তামীমের দল দ্বীপটি দেখেছে, সেখানে নেমেছে এবং আবার ফিরে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করেছে। যে দ্বীপ একদল পথভ্রষ্ট নাবিকের কাছে দৃশ্যমান ও প্রবেশযোগ্য ছিল, সেটি পরবর্তী সব নাবিক, মানচিত্রকার, অভিযাত্রী, বিমান, জাহাজ এবং উপগ্রহের কাছে কেন অদৃশ্য হয়ে গেল, তার ব্যাখ্যা হাদিস দেয় না। ‘আল্লাহ লুকিয়ে রেখেছেন’ বক্তব্যটি কোনো প্রমাণ থেকে পাওয়া সিদ্ধান্ত নয়; দ্বীপটি পাওয়া যায়নি বলে বিশ্বাস রক্ষার জন্য তৈরি অপ্রমাণযোগ্য অজুহাত। এই অজুহাত গ্রহণ করলে পৃথিবীর যেকোনো অনুপস্থিত বস্তু সম্পর্কে একই দাবি করা যায়। প্রমাণহীন কিছুকে অদৃশ্য ঘোষণা করা তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না; কেবল প্রমাণের দায় এড়িয়ে যায়।


“অতি সত্বর” মুক্তি: যে নৈকট্য চৌদ্দশ বছরেও এল না

দজ্জাল শুধু নিজের ভবিষ্যৎ মুক্তির কথা বলেনি; মুক্তির সময় যে খুব কাছে, সেটিও ঘোষণা করেছিল। তার ব্যবহৃত বাক্য ছিল, “আমি অচিরেই মুক্তির অনুমতি পেতে যাচ্ছি।” এরপর সে জানায়, অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে পৃথিবীর জনপদগুলোতে প্রবেশ করবে। বাক্যের ক্রমে কোনো দীর্ঘ বিরতি, নতুন বন্দিত্ব বা হাজার বছরের অপেক্ষার ইঙ্গিত নেই। অনুমতি, মুক্তি এবং পৃথিবী ভ্রমণকে ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে। ইসলামকিউএও সহিহ মুসলিমের এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে দজ্জালের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। [6]

আরবি: وَإِنِّي أُوشِكُ أَنْ يُؤْذَنَ لِي فِي الْخُرُوجِ، فَأَخْرُجَ فَأَسِيرَ فِي الْأَرْضِ.
বাংলা: আমি অচিরেই বের হওয়ার অনুমতি পেতে যাচ্ছি; তারপর বের হয়ে পৃথিবীতে চলতে শুরু করব।

এখানে কেন্দ্রীয় শব্দ ‘উশিকু’। এটি আরবি ভাষার নৈকট্যসূচক ক্রিয়া। কোনো ঘটনা ঘটার কাছাকাছি এসেছে, দ্রুত ঘটতে যাচ্ছে বা আসন্ন অবস্থায় রয়েছে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এটি নির্দিষ্ট দিন, মাস বা বছর ঘোষণা করে না; কিন্তু সীমাহীন ভবিষ্যৎও বোঝায় না। কেউ যদি বলে, “বৃষ্টি অচিরেই নামবে”, তার অর্থ আগামী সহস্রাব্দে কোনো একদিন বৃষ্টি হতে পারে নয়। ‘নিকট’ শব্দের অর্থ ক্যালেন্ডারে নির্দিষ্ট তারিখ না হলেও বক্তব্যের সময়ের সঙ্গে একটি যুক্তিসঙ্গত নৈকট্য থাকা আবশ্যক। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত লিসানুল আরবও হাদিসে ব্যবহৃত ‘ইউশিকু’ শব্দের অর্থ কাছে আসা, নিকটবর্তী হওয়া এবং দ্রুত ঘটা বলে ব্যাখ্যা করেছে। [7]

আরবি: يُوشِكُ أَنْ يَكُونَ كَذَا وَكَذَا، أَيْ يَقْرُبُ وَيَدْنُو وَيُسْرِعُ.
বাংলা: ‘অমুক বিষয়টি অচিরেই ঘটবে’ অর্থ হলো, সেটি কাছে আসে, নিকটবর্তী হয় এবং দ্রুত ঘটে।

তামীম দারীর কাহিনি সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগের ঘটনা। সেই সময় শিকলবন্দী ব্যক্তি বলেছিল, তার মুক্তির অনুমতি অতি নিকটে। তারপর প্রায় চৌদ্দশ বছর পার হয়েছে। অসংখ্য সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন ঘটেছে, পৃথিবীর মানচিত্র বদলেছে, অজানা মহাদেশ আবিষ্কৃত হয়েছে, শিল্পবিপ্লব ঘটেছে, মানুষ মহাকাশে পৌঁছেছে; কিন্তু দজ্জালের সেই আসন্ন অনুমতি আসেনি। ‘অতি সত্বর’ যদি চৌদ্দশ বছর বা তারও বেশি সময়কে ধারণ করতে পারে, তবে শব্দটির আর কোনো সময়গত অর্থ থাকে না। একই নিয়মে দশ হাজার বা দশ লক্ষ বছর পরের ঘটনাকেও ‘অতি সত্বর’ বলা যাবে। তখন বক্তব্যটি কোনো তথ্য দেয় না; শুধু অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতে একটি ঘটনা ঘটবে বলে অপেক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে।

এই ব্যর্থতার সামনে ইসলামি ব্যাখ্যা দজ্জালের বক্তব্যকে ভুল বলে না; বরং সময়ের সীমা তুলে দেয়। ইসলামকিউএ একদিকে বলেছে, তামীম দারীর হাদিস প্রমাণ করে দজ্জাল মুহাম্মদের যুগে জীবিত ছিল এবং এখনও জীবিত অবস্থায় সেই দ্বীপে বন্দী রয়েছে। অন্যদিকে তার ব্যতিক্রমী দীর্ঘ আয়ুকে সরাসরি অলৌকিক ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ‘অতি সত্বর’ পূরণ না হওয়ার কারণে ভবিষ্যদ্বাণী বাতিল হয়নি; বরং দজ্জালের বন্দিত্বকে যত দীর্ঘ প্রয়োজন তত দীর্ঘ করা হয়েছে। কোনো নতুন প্রমাণ দিয়ে নয়, হাদিসকে অবশ্যই সত্য রাখতে হবে এই পূর্বসিদ্ধান্ত থেকেই এই সমাধান তৈরি হয়েছে। [8]

আরবি: الدَّجَّالُ حَيٌّ مَوْجُودٌ الآنَ، وَفِي زَمَنِ النَّبِيِّ، وَأَنَّهُ سَيَظَلُّ مَحْبُوسًا حَتَّى يُؤْذَنَ لَهُ فِي الْخُرُوجِ.
বাংলা: দজ্জাল এখন জীবিত রয়েছে, নবীর যুগেও জীবিত ছিল এবং বের হওয়ার অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত বন্দী থাকবে।

এই ব্যাখ্যার বৃত্তাকার প্রকৃতি পরিষ্কার। দজ্জাল কেন এখনও বের হয়নি? কারণ আল্লাহ এখনও অনুমতি দেননি। কীভাবে জানা গেল সে এখনও জীবিত? কারণ হাদিসে বলা হয়েছে, অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত সে বন্দী থাকবে। কীভাবে জানা গেল হাদিসের ‘অতি সত্বর’ বক্তব্য ব্যর্থ হয়নি? কারণ ভবিষ্যতে কোনো একদিন তাকে অনুমতি দেওয়া হবে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে একই কাহিনিকে আবার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দ্বীপের কোনো চিহ্ন নেই, বন্দীর কোনো চিহ্ন নেই, মুক্তির কোনো লক্ষণ নেই এবং ‘অতি সত্বর’ সময়সীমাও বহু শতাব্দী আগে সাধারণ অর্থ হারিয়েছে; তবু কাহিনি সত্য, কারণ কাহিনিটিকে মিথ্যা হওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি।

ইসলামকিউএর আরেকটি উত্তরে বলা হয়েছে, দজ্জাল, মাহদি ও ঈসার আবির্ভাব যে কাছাকাছি, ধর্মীয় বক্তব্যগুলো তা নির্দেশ করে; কিন্তু ঘটনাগুলো বর্তমান মানুষের জীবদ্দশায় ঘটবে, না আরও পরে ঘটবে, সেটি অজানা। এই বক্তব্য একই সঙ্গে নৈকট্য দাবি করে এবং নৈকট্যের সব ব্যবহারিক সীমা বাতিল করে। ঘটনা কাছাকাছি, কিন্তু কত কাছে তা বলা যাবে না; বর্তমান প্রজন্মে না হলেও কাছাকাছি; শত শত বছর পর হলেও কাছাকাছি। এই পদ্ধতিতে ‘নিকট’ এমন একটি শব্দে পরিণত হয় যার বিপরীত কোনো সম্ভাব্য সময় নেই। [9]

আরবি: النُّصُوصُ الشَّرْعِيَّةُ تَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ، لَكِنْ هَلْ هُوَ فِي حَيَاتِنَا أَمْ بَعْدَ ذَلِكَ فَهَذَا غَيْبٌ.
বাংলা: ধর্মীয় বক্তব্যগুলো ঘটনাটি নিকটবর্তী বলে নির্দেশ করে; কিন্তু তা আমাদের জীবদ্দশায়, না তার পরে ঘটবে, সেটি অদৃশ্য জ্ঞানের বিষয়।

কোনো ভবিষ্যদ্বাণীর মূল্য নির্ভর করে তার ব্যর্থ হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা আছে কি না তার ওপর। ‘অতি সত্বর’ বলা ঘটনার জন্য যদি কোনো সর্বোচ্চ সময়সীমা না থাকে, তবে এক বছর, এক শতাব্দী বা এক সহস্রাব্দ পার হওয়াও তাকে ভুল প্রমাণ করবে না। প্রতিটি ব্যর্থ প্রজন্মের পর বলা যাবে, ঘটনাটি পরবর্তী প্রজন্মে ঘটবে। এইভাবে অপেক্ষা অনন্তকাল চলতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী কখনো পরীক্ষিত হবে না। দজ্জালের মুক্তির ঘোষণায় ঠিক এই কৌশল কাজ করছে। সপ্তম শতাব্দীর আসন্ন বিপদকে প্রতিটি পরবর্তী যুগ নিজের জন্য আসন্ন বলে পুনরাবৃত্তি করেছে। সময় যত পেরিয়েছে, ‘অতি সত্বর’ শব্দের অর্থ তত ফাঁকা হয়েছে; কিন্তু বিশ্বাসটি বাতিল হয়নি। এটি নির্ভুল ভবিষ্যৎজ্ঞান নয়। এটি এমন একটি স্থগিত ঘোষণা, যার নির্ধারিত সময় কখনো আসে না এবং যার ব্যর্থতা স্বীকার করার কোনো অনুমোদিত মুহূর্ত নেই।


দ্বীপের দজ্জাল, মদিনার ইবন সাইয়াদ এবং পরস্পরবিরোধী হাদিস

তামীম দারীর কাহিনি অনুযায়ী মুহাম্মদের যুগে আসল দজ্জাল ছিল সমুদ্রের একটি দ্বীপে শিকলবন্দী। কিন্তু অন্য একাধিক সহিহ হাদিসে মুহাম্মদ মদিনায় বসবাসকারী ইবন সাইয়াদ নামের এক কিশোরকে সম্ভাব্য দজ্জাল বলে সন্দেহ করেছেন। মুহাম্মদ তার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেছেন, তাকে গোপনে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং এমনভাবে পরীক্ষা করেছেন যেন তিনি নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না ছেলেটি আসল দজ্জাল কি না। উমর ইবনুল খাত্তাব ইবন সাইয়াদকে হত্যা করার অনুমতি চাইলে মুহাম্মদ সরাসরি বলেননি যে আসল দজ্জাল বহু দূরের দ্বীপে শিকলবন্দী রয়েছে, অতএব এই কিশোর দজ্জাল হতে পারে না। বরং তিনি বলেন, ছেলেটি যদি সেই দজ্জাল হয়, তবে উমর তাকে হত্যা করতে পারবেন না; আর যদি সে দজ্জাল না হয়, তবে তাকে হত্যা করে কোনো লাভ নেই। এই উত্তর সন্দেহ দূর করে না; সন্দেহটিকেই স্বীকার করে। [10]

আরবি: إِنْ يَكُنْهُ فَلَنْ تُسَلَّطَ عَلَيْهِ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْهُ فَلَا خَيْرَ لَكَ فِي قَتْلِهِ.
বাংলা: সে যদি সেই ব্যক্তি হয়, তবে তুমি তার ওপর ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে না; আর যদি সে সেই ব্যক্তি না হয়, তবে তাকে হত্যা করে তোমার কোনো কল্যাণ নেই।

এই ঘটনাটি তামীম দারীর কাহিনির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি করে। আসল দজ্জাল যদি তখন একটি দ্বীপে লোহার শিকলে এমনভাবে বাঁধা থাকে যে তার দুই হাত ঘাড়ের সঙ্গে এবং পা হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত আবদ্ধ, তবে একই সময়ে মদিনার একটি কিশোরকে আসল দজ্জাল বলে সন্দেহ করার কোনো কারণ থাকে না। দ্বীপের বন্দী এবং মদিনায় শিশুদের সঙ্গে খেলা করা কিশোর একই ব্যক্তি হতে পারে না। মুহাম্মদ যদি আগে থেকেই দজ্জালের শারীরিক বর্ণনা, কার্যকলাপ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ঐশী সংবাদ পেয়ে থাকেন, তবে তিনি ইবন সাইয়াদের পরিচয় নির্ধারণ করতে পারলেন না কেন, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। ইসলামকিউএর ব্যাখ্যা হলো, মুহাম্মদের কাছে দজ্জালের কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হয়েছিল, কিন্তু ইবন সাইয়াদ আসল দজ্জাল কি না, সে বিষয়ে কোনো ওহি আসেনি। ফলে তিনি নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেননি। এই ব্যাখ্যার সরল ফল হলো, দজ্জাল সম্পর্কে মুহাম্মদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ ছিল। অথচ একই ধর্মীয় কাঠামোতে তার দজ্জালসংক্রান্ত বক্তব্যকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভুল নবুয়তি জ্ঞান হিসেবে প্রচার করা হয়।

সমস্যাটি শুধু মুহাম্মদের সন্দেহে সীমাবদ্ধ ছিল না। জাবির ইবন আবদুল্লাহ আল্লাহর নামে শপথ করে বলতেন যে ইবন সাইয়াদই দজ্জাল। তাকে যখন বলা হয়, ইবন সাইয়াদ মারা গেছে, তিনি উত্তর দেন, মারা গেলেও সে দজ্জাল। বলা হয়, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে; জাবির বলেন, ইসলাম গ্রহণ করলেও সে দজ্জাল। বলা হয়, সে মক্কায় প্রবেশ করেছে; জাবির বলেন, মক্কায় প্রবেশ করলেও সে দজ্জাল। অথচ দজ্জালসংক্রান্ত অন্য হাদিসে মক্কা ও মদিনায় তার প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। অর্থাৎ সাহাবিদের মধ্যেই দজ্জালের পরিচয় সম্পর্কে এমন বিভ্রান্তি ছিল যে দৃশ্যমান বাস্তবতাকেও পূর্ববিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। একজন মানুষ মারা গেছে, মুসলিম হয়েছে বা মক্কায় প্রবেশ করেছে, এসবের কোনোটিই তার দজ্জাল হওয়ার বিশ্বাস বাতিল করতে পারেনি। এটি প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়; যেকোনো বিপরীত তথ্যের পরও অক্ষত রাখা বিশ্বাস।

তামীম দারীর কাহিনি গ্রহণ করার পর এই দুই দজ্জালের সমস্যা আরও প্রকট হয়। একদিকে দ্বীপের প্রাপ্তবয়স্ক ও বিশালদেহী বন্দীকে আসল দজ্জাল বলতে হয়; অন্যদিকে ইবন সাইয়াদকে ঘিরে মুহাম্মদ, উমর, জাবির ও অন্যদের সন্দেহকেও সহিহ বর্ণনা হিসেবে রাখতে হয়। ইবন হাজার আল-আসকালানি এই বিরোধ মেলানোর জন্য যে সমাধান প্রস্তাব করেছেন, তা সমস্যাটির চেয়েও বেশি কল্পনাপ্রসূত। তার মতে, তামীম যে শিকলবন্দী ব্যক্তিকে দেখেছিল, সে আসল দজ্জাল; আর ইবন সাইয়াদ ছিল একটি শয়তান, যে সাময়িকভাবে দজ্জালের রূপ ধারণ করেছিল। পরে সেই শয়তান ইসফাহানে গিয়ে নিজের সঙ্গীর সঙ্গে আত্মগোপন করে। ইসলামকিউএ এই ব্যাখ্যাকে পরস্পরবিরোধী বর্ণনাগুলোর সমন্বয় হিসেবে উদ্ধৃত করেছে। [11]

আরবি: الدَّجَّالُ بِعَيْنِهِ هُوَ الَّذِي شَاهَدَهُ تَمِيمٌ مُوثَقًا، وَأَنَّ ابْنَ صَيَّادٍ شَيْطَانٌ تَبَدَّى فِي صُورَةِ الدَّجَّالِ.
বাংলা: আসল দজ্জাল সেই ব্যক্তি, যাকে তামীম শিকলবন্দী অবস্থায় দেখেছিল; আর ইবন সাইয়াদ ছিল একটি শয়তান, যে দজ্জালের রূপে আবির্ভূত হয়েছিল।

কোনো সহিহ হাদিসে বলা হয়নি যে ইবন সাইয়াদ আসলে দজ্জালের রূপ ধারণকারী শয়তান ছিল। কোনো হাদিসে তার ইসফাহানে গিয়ে আরেক সঙ্গীর সঙ্গে লুকিয়ে থাকার কথাও নেই। দ্বীপের দজ্জাল এবং মদিনার দজ্জালকে একসঙ্গে রক্ষা করার প্রয়োজন থেকেই এই অতিরিক্ত কাহিনি তৈরি হয়েছে। প্রথমে দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ বর্ণনা গ্রহণ করা হয়েছে, তারপর সেই অসামঞ্জস্য দূর করতে তৃতীয় একটি প্রমাণহীন বর্ণনা কল্পনা করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে ধর্মীয় কাহিনি কখনো ভুল হয় না, কারণ বিরোধ দেখা দিলেই অদৃশ্য শয়তান, রূপান্তর, গোপন স্থানান্তর অথবা অজ্ঞাত পরিকল্পনা যোগ করা যায়। কিন্তু একটি অনুমান দিয়ে দুটি বিরোধী দাবিকে জোড়া দিলেই অনুমানটি সত্য হয়ে যায় না।

দজ্জালের অস্বাভাবিক দীর্ঘ জীবন আরেকটি সহিহ হাদিসের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে। জীবনের শেষদিকে মুহাম্মদ একটি রাতের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, সেই রাতে পৃথিবীর ওপর যারা জীবিত ছিল, একশ বছর পর তাদের কেউ বেঁচে থাকবে না। বক্তব্যটির ভাষা সার্বিক। কিন্তু তামীমের কাহিনি মানলে সেই সময় জীবিত দজ্জালকে অন্তত চৌদ্দশ বছর ধরে বেঁচে থাকতে হয়। ইসলামকিউএ এই সংঘাতের দুটি সমাধান দিয়েছে। প্রথমটি হলো, শত বছরের বক্তব্যটি সাধারণ হলেও দজ্জাল তার বিশেষ ব্যতিক্রম। দ্বিতীয়টি হলো, দজ্জাল সমুদ্রে ছিল বলে ‘পৃথিবীর ওপর’ থাকা মানুষের অন্তর্ভুক্ত নয়। [12]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবঃ)
৯/ সালাতের সময়সমূহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/২০. ‘ইশা ও আতামাহ-এর বর্ণনা এবং যিনি এতে কোনো আপত্তি করেন না।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন যে, মুনাফিকদের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর সালাত হল ’ইশা ও ফজর। তিনি আরও বলেছেন যে, তারা যদি জানতো, আতামা (ইশা) ও ফজরে কি কল্যাণ নিহিত আছে। ইমাম বুখারী (রহ.) বলেন, ’ইশা শব্দ ব্যবহার করাই উত্তম। কেননা, আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ ’’’ইশা সালাতের পর’’- (সূরাহ্ আন-নূর ২৪/৫৮)।
আবূ মূসা (রাযি.) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমরা পালাক্রমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর এখানে ’ইশার সালাতের সময় যেতাম। একবার তিনি তা দেরী করে আদায় করেন। ইবনু ’আব্বাস ও ’আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে (এরূপ) বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’ইশা দেরী করে আদায় করেন। বর্ণনাকারীদের কেউ কেউ বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আতামাহ্কে দেরী করে আদায় করেন। জাবির (রাযি.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’ইশার সালাত আদায় করলেন। আবূ বারযা (রাযি.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’ইশার সালাত বিলম্বে আদায় করতেন। আনাস (রাযি.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ ’ইশা বিলম্বে আদায় করলেন। ইবনু উমর, আবূ আইয়ূব ও ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ’ইশার সালাত আদায় করেন।
৫৬৪. ’আবদুল্লাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিয়ে ’ইশার সালাত আদায় করেন, যে সালাতকে লোকেরা ’আতামা’ বলে থাকে। অতঃপর তিনি ফিরে আমাদের দিকে মুখ করে বললেন, আজকের এ রাত সম্পর্কে তোমরা জান কি? এ রাত হতে নিয়ে একশ’ বছরের শেষ মাথায় আজ যারা ভূপৃষ্ঠে আছে তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। (১১৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৫৩১, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫৩৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

প্রথম সমাধানটি সরাসরি একটি অঘোষিত ব্যতিক্রম তৈরি করে। মুহাম্মদ বলেননি, একশ বছর পর কেউ জীবিত থাকবে না, তবে অজ্ঞাত দ্বীপের দজ্জাল ছাড়া। সর্বজনীন বক্তব্য ব্যর্থ হওয়ার পর অন্য একটি কাহিনির ভিত্তিতে ব্যতিক্রম যোগ করা হয়েছে। দ্বিতীয় সমাধানটি ভাষার বিকৃতি। তামীমের বর্ণনায় দজ্জাল সমুদ্রের পানির নিচে ছিল না; সে সমুদ্রের একটি দ্বীপের স্থাপনায় বন্দী ছিল। দ্বীপ পৃথিবীরই ভূমি এবং সেখানে অবস্থানকারী ব্যক্তি পৃথিবীর ওপরই অবস্থান করে। ‘পৃথিবীর ওপর’ কথাটিকে শুধু মহাদেশের শুকনো মাটিতে দাঁড়ানো মানুষ বোঝালে দ্বীপবাসী, জাহাজের যাত্রী এবং সমুদ্রে অবস্থানকারী সবাইকে বক্তব্যটির বাইরে ফেলতে হয়। কোনো স্বাভাবিক শ্রোতা বাক্যটি এভাবে বুঝবে না। ব্যাখ্যাটি ভাষার স্বাভাবিক অর্থ থেকে পাওয়া নয়; বিরোধ দূর করার জন্য শব্দের সীমানা পাল্টে দেওয়া।

দজ্জালের আসন্ন মুক্তি বিচ্ছিন্ন কোনো সময়গত সমস্যা নয়। মুহাম্মদের কিয়ামতসংক্রান্ত আরও বহু বক্তব্যে শেষ সময়কে অত্যন্ত নিকটবর্তী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোথাও একটি বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত ঘটার ভাষা এসেছে, কোথাও মুহাম্মদ ও কিয়ামতকে পাশাপাশি দুটি আঙুলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আবার কোথাও একটি সূর্যগ্রহণ দেখে তিনি কিয়ামত শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন। এই বৃহত্তর সময়গত সমস্যার বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য পড়ুন: নবীর ভুল ভবিষ্যদ্বাণী: বালকের বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে কিয়ামত হবে। দজ্জালের ‘অতি সত্বর’ মুক্তির ঘোষণা একই আসন্ন-প্রলয়ের প্রত্যাশার অংশ। প্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটার পর প্রতিটি শব্দকে সীমাহীন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।


উপসংহার

দজ্জালের দ্বীপের কাহিনি নিজেকে একটি বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে। সাধারণ জাহাজে ভ্রমণকারী ত্রিশজন মানুষ একটি দ্বীপে পৌঁছায়, কথা বলা লোমশ প্রাণীর সাক্ষাৎ পায়, একটি স্থাপনায় প্রবেশ করে এবং সেখানে লোহার শিকলে বাঁধা অতিকায় মানুষকে দেখে। সেই মানুষ নিজেকে দজ্জাল বলে পরিচয় দেয়, নিজের আসন্ন মুক্তির কথা জানায় এবং পৃথিবীর প্রায় সব জনপদে প্রবেশের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এই বিবরণকে প্রতীক, স্বপ্ন বা রূপক হিসেবে পড়ার সুযোগ মূল কাহিনি দেয় না। তাই এর সত্যতা পরীক্ষা করতে হলে বাস্তব দ্বীপ, বাস্তব অবস্থান, বাস্তব সময় এবং বাস্তব মানুষের মানদণ্ডেই পরীক্ষা করতে হবে।

সেই পরীক্ষায় কাহিনিটি ব্যর্থ। দ্বীপের অবস্থান জানাতে গিয়ে সিরিয়া সাগর, ইয়েমেন সাগর এবং পূর্বদিকের মধ্যে বক্তব্য বদলেছে। ‘পূর্বদিক’ কোনো অনুসন্ধানযোগ্য ঠিকানা দেয়নি। সাধারণ নাবিকেরা যেখানে পৌঁছেছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী অনুসন্ধানের পরও সেই স্থান পাওয়া যায়নি। ‘অতি সত্বর’ মুক্তির ঘোষণা প্রায় চৌদ্দশ বছরেও বাস্তব হয়নি। একটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে এই পুরো সময় জীবিত রাখতে অলৌকিক আয়ু যোগ করতে হয়েছে। একশ বছরের মধ্যে সে সময়ের সব জীবিত মানুষের মৃত্যু হবে, এমন বক্তব্য থেকে দজ্জালকে অঘোষিত ব্যতিক্রম বানাতে হয়েছে। আবার দ্বীপে শিকলবন্দী দজ্জালের পাশাপাশি মদিনার ইবন সাইয়াদকে সম্ভাব্য দজ্জাল মনে করার বিরোধ দূর করতে তাকে দজ্জালের রূপ নেওয়া শয়তান হিসেবে কল্পনা করতে হয়েছে।

প্রতিটি সমস্যার জন্য নতুন একটি অদৃশ্য অনুমান তৈরি হয়েছে। দ্বীপ পাওয়া যায় না, কারণ আল্লাহ সেটি লুকিয়ে রেখেছেন। দজ্জাল মারা যায় না, কারণ তাকে অলৌকিক আয়ু দেওয়া হয়েছে। ‘অতি সত্বর’ সত্য হয় না, কারণ আল্লাহর সময় মানুষের সময়ের মতো নয়। মুহাম্মদ ইবন সাইয়াদ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না, কারণ তাকে সম্পূর্ণ ওহি দেওয়া হয়নি। একই সময়ে দ্বীপে ও মদিনায় দুই সম্ভাব্য দজ্জাল পাওয়া যায়, কারণ একজন নাকি দজ্জালের রূপধারী শয়তান। এসবের কোনোটি মূল বর্ণনার স্বাধীন প্রমাণ নয়। এগুলো কাহিনিকে ভুল প্রমাণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পরে যোগ করা সুরক্ষা-বেষ্টনী।

‘সহিহ’ শ্রেণিবিভাগ এই সমস্যাগুলোর সমাধান করে না। সেটি পরবর্তী হাদিসবিশারদদের কাছে একটি বর্ণনাশৃঙ্খল গ্রহণযোগ্য ছিল বলে জানায়; বর্ণিত দ্বীপ পৃথিবীতে আছে, মানুষটি এখনও জীবিত অথবা লোমশ জাসসাসা সত্যিই কথা বলেছিল, তা প্রমাণ করে না। কোনো গল্প বহুবার বর্ণিত হলে তার প্রচলন প্রমাণিত হয়, বাস্তবতা নয়। বাস্তবতার জন্য স্বাধীন প্রমাণ, অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য এবং যাচাইযোগ্য ফল প্রয়োজন। দজ্জালের দ্বীপের কাহিনিতে এই তিনটির কোনোটিই নেই।

সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত হলো, এটি সপ্তম শতাব্দীর সমুদ্রভীতি, অজানা দ্বীপের লোককাহিনি, খ্রিষ্টীয় ও মধ্যপ্রাচ্যীয় শেষযুগের কল্পনা এবং ইসলামের আসন্ন কিয়ামতবিশ্বাসের সমন্বয়ে তৈরি একটি প্রলয়কাহিনি। একজন প্রাক্তন খ্রিষ্টানের মুখে শোনা গল্প মুহাম্মদের অনুমোদনে ধর্মীয় সত্যের মর্যাদা পেয়েছে, তারপর ‘সহিহ’ সনদের সিলমোহরে প্রশ্নের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় মর্যাদা কোনো দাবিকে ভৌগোলিক সত্যে পরিণত করে না। অদৃশ্য দ্বীপ, দেড় সহস্রাব্দের বন্দী, ব্যর্থ ‘অতি সত্বর’ এবং পরস্পরবিরোধী দজ্জাল-বর্ণনার সমষ্টি নবুয়তি ভবিষ্যৎজ্ঞানের প্রমাণ নয়। এটি এমন একটি গল্প, যার প্রতিটি ব্যর্থতার পরে নতুন অজুহাত তৈরি হয়েছে, অথচ যার পক্ষে আজও একটি স্বাধীন প্রমাণও হাজির করা যায়নি।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪২৭৫ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১১৯ ↩︎
  3. ইসলামওয়েব: আউনুল মাবুদ, জাসসাসার সংবাদসংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
  4. ইসলামওয়েব: দজ্জালের অবস্থান সম্পর্কে নবীর দ্বিধার অভিযোগ ও তার উত্তর ↩︎
  5. ইসলামওয়েব: তাফসির আল-মানার, জাসসাসা ও দজ্জালের দ্বীপের সমালোচনা ↩︎
  6. ইসলামকিউএ: মক্কা ও মদিনা ছাড়া সব দেশে দজ্জালের প্রবেশ ↩︎
  7. ইসলামওয়েব: লিসানুল আরব, ‘ওয়াশাকা’ শব্দের অর্থ ↩︎
  8. ইসলামকিউএ: দজ্জাল জীবিত এবং দ্বীপে বন্দী থাকার দাবি ↩︎
  9. ইসলামকিউএ: দজ্জালের আবির্ভাব কতটা নিকট ↩︎
  10. ইসলামকিউএ: ইবন সাইয়াদ কে এবং সে কি আসল দজ্জাল ↩︎
  11. ইসলামকিউএ: ইবন সাইয়াদ ও জাসসাসার হাদিসের সমন্বয় ↩︎
  12. ইসলামকিউএ: শত বছরের হাদিসের সঙ্গে জীবিত দজ্জালের সমন্বয় ↩︎

Preferred Sources

  • Sunan Abu Dawud 4275 — HadithBD তামীম দারীর সমুদ্রযাত্রা, জাসসাসা, দ্বীপের প্রাসাদ এবং শিকলবন্দী দজ্জালের বাংলা বর্ণনা
  • Sahih Muslim 7119 — HadithBD দজ্জালের দ্বীপ, বায়সানের খেজুরবাগান, তাবারিয়া হ্রদ, যুগার ঝরনা, আসন্ন মুক্তি এবং পূর্বদিকের পূর্ণ বর্ণনা
  • IslamQA 82643 — The Hadith of Tamim al-Dari and the Dajjal জাসসাসার পূর্ণ আরবি হাদিস, বর্ণনাটির সহিহ মর্যাদা এবং দজ্জালের অবস্থানসংক্রান্ত বক্তব্য
  • Awn al-Ma‘bud — Report of al-Jassasa সিরিয়া সাগর, ইয়েমেন সাগর ও পূর্বদিকসংক্রান্ত বাক্যের ধ্রুপদি ব্যাখ্যা
  • Tafsir al-Manar — Critical Analysis of the Dajjal Island দ্বীপের ভৌগোলিক অনুপস্থিতি, সমুদ্র জরিপ এবং বিরোধী বর্ণনা মেলাতে উদ্ভাবিত অনুমানের বিস্তারিত সমালোচনা
  • IslamWeb 256588 — Muhammad’s Uncertainty About the Dajjal’s Location দজ্জাল সিরিয়া, ইয়েমেন না পূর্বদিকে রয়েছে, এই বক্তব্যের পরিবর্তন ও পরবর্তী ইসলামি প্রতিরক্ষা
  • Lisan al-Arab — Meaning of Yushiku ‘ইউশিকু’ শব্দের নিকটবর্তী হওয়া, দ্রুত ঘটা ও অচিরেই সংঘটিত হওয়ার প্রামাণ্য আরবি অর্থ
  • IslamQA 117550 — The Living Dajjal and the Hundred-Year Hadith দজ্জাল মুহাম্মদের যুগে জীবিত ছিল এবং এখনও বন্দী আছে, এমন দাবি ও শত বছরের হাদিসের সঙ্গে তার সমন্বয়ের চেষ্টা
  • IslamQA 228493 — Is the Dajjal Still Chained? দজ্জাল এখনও লোহার শিকলে বন্দী এবং মুক্তির অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকবে, এই সমকালীন ইসলামি অবস্থান
  • IslamQA 8301 — Who Was Ibn Sayyad? ইবন সাইয়াদকে দজ্জাল সন্দেহ করা, মুহাম্মদের অনিশ্চয়তা, জাবিরের শপথ এবং সাহাবিদের বিরোধী অবস্থানের সংকলন
  • IslamQA 274431 — Reconciling Ibn Sayyad with the Island Dajjal দ্বীপের বন্দীকে আসল দজ্জাল এবং ইবন সাইয়াদকে দজ্জালের রূপধারী শয়তান হিসেবে ব্যাখ্যা করার পরবর্তী সমন্বয়
  • Mirqat al-Mafatih — The Story of Ibn Sayyad ইবন সাইয়াদের পরিচয়, তার অন্তর্ধান এবং তাকে দজ্জাল মনে করার ধ্রুপদি বর্ণনাগুলোর আলোচনা
  • IslamWeb 204022 — Dispute over the Hadith of al-Jassasa জাসসাসার হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইবন উসাইমিন ও অন্য মুহাদ্দিসদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বিতর্ক
  • IslamQA 3259 — Is the Appearance of the Dajjal Near? দজ্জালের আবির্ভাবকে নিকটবর্তী বলা হলেও তার জন্য কোনো যাচাইযোগ্য সময়সীমা নির্ধারণ না করার ইসলামি অবস্থান
  • Shongshoy — Muhammad’s Failed Prophecy About the Hour কিয়ামতের আসন্নতা, বালকের বৃদ্ধ হওয়ার আগের সময়সীমা এবং ব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণীর পর অর্থ পরিবর্তনের বিস্তৃত বিশ্লেষণ

About This Article

Genre: Hadith Criticism, Islamic Eschatology Critique, Failed Prophecy Analysis, Dajjal Narrative Study, Source Criticism, Internal Contradiction Analysis, and Historical Evaluation of Islamic Apocalyptic Traditions

Epistemic Position: Rational Skepticism, Secular Humanism, Evidentialism, Historical Criticism, Textual Criticism, Falsifiability, Logical Consistency, and Anti-Apologetic Analysis

This article examines the sahih hadith claim that the Dajjal was already alive during Muhammad’s lifetime and imprisoned in iron chains on an unidentified island. According to the report attributed to Tamim al-Dari, thirty sailors reached the island, encountered the hairy creature known as al-Jassasa, and found a gigantic chained man who identified himself as the Dajjal and declared that he would soon be permitted to emerge.

The central argument is that the narrative fails as a verifiable historical and prophetic claim. The island is variously associated with the Sea of Syria, the Sea of Yemen, and the east; the promised imminent release has not occurred after approximately fourteen centuries; no independently verifiable trace of the island, prison, creature, or captive has been discovered; and preserving the story requires an undocumented miraculous lifespan and the permanent suspension of ordinary geographical and evidential standards.

The article also analyzes the conflict between the island narrative and the reports concerning Ibn Sayyad, whom Muhammad and several companions suspected of being the Dajjal. It examines later attempts to resolve the contradiction by claiming that Ibn Sayyad was a devil temporarily appearing in the form of the Dajjal. It further addresses the conflict with the hadith stating that no person then living on the face of the earth would remain alive after one hundred years, as well as the reinterpretation of the Arabic word yushiku, which indicates proximity and imminence.

This article should be evaluated through the wording of the relevant hadith reports, comparison of parallel narrations, chronology, geography, Arabic lexical usage, internal consistency, independent corroboration, historical plausibility, and falsifiability, rather than through the prior assumption that every report classified as sahih must describe a real event.

Leave a comment

Your email will not be published.