ভূমিকা
মুহাম্মদের নবুয়তের দাবি যাচাই করার জন্য সমসাময়িক বিরোধীদের প্রশ্ন এবং দৃশ্যমান অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শনের দাবি প্রাচীন ইসলামি সিরাত, তাফসির ও হাদিসের একাধিক বর্ণনায় সংরক্ষিত আছে। দাবিটি ছিল অসাধারণ—একজন মানুষের মাধ্যমে সর্বজ্ঞ ঈশ্বর কথা বলছেন। এমন দাবির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্নের উত্তর, নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিশ্রুতি, স্বাধীনভাবে শনাক্তযোগ্য তথ্য এবং দাবি অনুযায়ী প্রকাশ্য প্রমাণের গুরুত্বও অনেক বেশি।
ইহুদি পণ্ডিতদের পরামর্শে কুরাইশদের তিনটি প্রশ্ন, পরদিন উত্তর দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পর দীর্ঘ বিলম্ব, গুহাবাসী যুবক ও যুলকারনাইনের অস্পষ্ট ঐতিহাসিক পরিচয়, রূহের সংজ্ঞার অভাব, সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ এবং বনূ নাদীরের সঙ্গে প্রস্তাবিত আলোচনার পর সামরিক সংঘাত—সব ক্ষেত্রেই নবুয়তের দাবি ও তার পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণের মধ্যে একটি ব্যবধান রয়েছে। ধর্মীয় বয়ানে এই ব্যবধান পূরণ করতে ঐশী অসন্তোষ, ভবিষ্যৎ শাস্তির আশঙ্কা, অদৃশ্য সংবাদ ও অবিশ্বাসীদের সম্ভাব্য আচরণকে কারণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু এসব কারণও একই বয়ানের অন্তর্গত দাবি; প্রকাশ্য পরীক্ষার বিকল্প নয়।
কোরআনের আয়াত কিংবা পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যা একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করতে পারে। কিন্তু একটি দাবি, সেই দাবির পক্ষে স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ এবং দাবির পরীক্ষায় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল—এগুলো পৃথক বিষয়। বিশেষত যে ঘটনাগুলোতে প্রতিপক্ষ প্রকাশ্যে যাচাইয়ের শর্ত দিয়েছে, সেখানে পরীক্ষার ফলাফলকে পরবর্তী অলৌকিক কাহিনির সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যুক্তিগতভাবে প্রশ্নটির মীমাংসা করে না।
ইহুদি পণ্ডিতদের তিন প্রশ্ন ও ওহি-বিলম্বের বর্ণনা
ইবনে ইসহাকের সংরক্ষিত সিরাত-বর্ণনায় কুরাইশ প্রতিনিধিরা মদিনার ইহুদি পণ্ডিতদের কাছে গিয়ে মুহাম্মদের নবুয়ত যাচাইয়ের উপায় জানতে চায়। ইহুদি পণ্ডিতেরা গুহাবাসী যুবকদের ঘটনা, পূর্ব-পশ্চিমে ভ্রমণকারী ব্যক্তির সংবাদ এবং রূহের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে বলেন। তাঁদের ঘোষিত শর্ত ছিল—এসব বিষয়ে সন্তোষজনক সংবাদ দিতে পারলে মুহাম্মদকে নবী হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ তিনটি প্রশ্ন কেবল ধর্মীয় কৌতূহল ছিল না; এগুলোকে প্রকাশ্য নবুয়ত-পরীক্ষা হিসেবে হাজির করা হয়েছিল। অথচ পরবর্তী কাহিনি থেকে কোন তথ্য ঐতিহাসিকভাবে শনাক্ত করা যায় এবং কোন অংশ কেবল ধর্মীয় বর্ণনার মধ্যেই সীমিত, সেই প্রশ্নের সমাধান সেখানে পাওয়া যায় না। [1]
سلوه عن فتية ذهبوا في الدهر الأول ما كان أمرهم
বাংলা অনুবাদ: অতীত যুগে হারিয়ে যাওয়া কয়েকজন যুবকের কী ঘটনা ঘটেছিল, তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করো।
- ১) অতীত যুগের গুহাবাসী যুবকদের কী অসাধারণ ঘটনা ঘটেছিল?
- ২) পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ভ্রমণকারী ব্যক্তির কী ঘটনা বা সংবাদ?
- ৩) রূহ কী?
ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় মুহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর পরদিন দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন, অথচ পনেরো রাত পর্যন্ত কোনো উত্তর দিতে পারেননি। প্রতিপক্ষের সামনে পরদিন উত্তর দেওয়ার কথা বলে দীর্ঘ সময় অনুত্তরিত থাকা নবুয়তের দাবির পরীক্ষায় একটি সরাসরি ব্যর্থতা। পরে এই বিলম্বকে ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার কারণে ঈশ্বরের অসন্তোষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের পক্ষ থেকে কথা বলার দাবিদার ব্যক্তি কেন প্রতিশ্রুত সময়ে উত্তর দিতে পারলেন না, ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার ব্যাখ্যাটি তার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয় না। বরং ব্যর্থতার পর ব্যর্থতাকেই ঐশী সিদ্ধান্ত বলে ঘোষণা করে।
ইবনে ইসহাকের পনেরো রাতের বর্ণনার পাশাপাশি সালিহি যুহরি ও মুসা ইবনে উকবার ধারায় তিন দিনের বিলম্বের কথাও সংরক্ষণ করেছেন। বিলম্বের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য সম্পর্কে বর্ণনাকারীদের অমিল থাকলেও উভয় হিসাবই প্রতিশ্রুত ‘আগামীকাল’-এর চেয়ে বেশি। প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত সময়ে না আসার ঘটনাটি তাই উভয় বিবরণেই বহাল থাকে। [2]
وفي سير الزهري وموسى بن عقبة : أن الوحي إنما أبطأ عنه ثلاثة أيام
বাংলা অনুবাদ: আর যুহরি ও মুসা ইবনে উকবার সিরাত-বর্ণনায় আছে, ওহি তাঁর কাছে আসতে তিন দিন বিলম্ব করেছিল।
তাফসিরে মাযহারীর বাংলা সংস্করণেও ইহুদি পণ্ডিতদের নির্ধারিত প্রশ্ন, আগামীকাল উত্তর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, পনেরো দিনের ওহি-বিরতি এবং ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার ব্যাখ্যা একসঙ্গে এসেছে। বর্ণনাটি অনুসারে এই দীর্ঘ সময়ে বিরোধীরা মুহাম্মদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং তিনি নিজেও বিচলিত হন। এখানে একদিনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ব্যাখ্যা হিসেবে এমন এক ঐশী যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা দেখানো হয়েছে, যা কেবল মুহাম্মদের পরবর্তী ধর্মীয় বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল। [3]
জনৈক মিসরী শায়েখের বরাত দিয়ে ইকরামা সূত্রে ইসহাকের মাধ্যমে ইবনে জারীর বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, কুরায়েশ গোত্রাধিনায়কেরা একবার নজর বিন হারেছ এবং উকবা বিন আবী মুয়ীতকে মদীনার ইহুদী আলেমদের কাছে পাঠালো। তাদেরকে বলে দিলো, তোমরা ইহুদী পণ্ডিতদেরকে মোহাম্মদ ও তার কথাবার্তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে দেখো। তারা গ্রন্থধারী। তাই তারা মোহাম্মদ সম্পর্কে সঠিক তথ্য বলতে পারবে। তারা যা বলে তা শুনে এসে তোমরা আমাদেরকে জানিয়ো। নজর ও উকবা পৌঁছে গেলো মদীনায়। রসুল স. সম্পর্কে সব কথা তারা খুলে বললো ইহুদী পণ্ডিতদের নিকট । পণ্ডিতেরা বললো, তোমরা তাকে এই তিনটি প্রশ্ন কোরো। প্রশ্ন তিনটির জবাব দিতে পারলে, মনে করবে তিনি সত্য নবী। আর জবাব দিতে না পারলে মনে করবে, সে ভণ্ড। প্রশ্ন তিনটি এই— ১. অতীত যুগের ওই সকল যুবক কারা, যারা পৃথিবীতে ঘটিয়েছিলো একটি অসাধারণ ঘটনা। ২. ওই ব্যক্তির পরিচয় কী, যে পরিভ্রমণ করেছিলো পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত। ৩. রূহ কী ? নজর ও উকবা ফিরে এলো মক্কায়। গোত্রাধিনায়কদের বললো, এবার তবে মোহাম্মদের সঙ্গে একটা চূড়ান্ত মীমাংসা হয়েই যাক। তোমরা তাঁকে এই তিনটি প্রশ্ন করে দেখো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হলেন রসুল স. স্বয়ং। তারা তখন একে একে রসুল স.কে বর্ণিত প্রশ্ন তিনটি করলো। রসুল স. বললেন, তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দিবো আমি আগামীকাল। কিন্তু একথার সঙ্গে তিনি স. ইনশা আল্লাহ্ (আল্লাহ্ যদি চান) কথাটি উচ্চারণ করলেন না। পরিণতি হলো এই যে, একাধারে পনেরো দিন পর্যন্ত হজরত জিবরাইল আবির্ভূত হলেন না । অবতীর্ণ হলো না কোনো প্রত্যাদেশও। রসুল স. বড়ই পেরেশান হয়ে পড়লেন । অংশীবাদিরা করতে লাগলো নানা রকম অপমন্তব্য। এমতাবস্থায় সুরা কাহ্ফ নিয়ে অবতীর্ণ হলেন হজরত জিবরাইল। এতে সন্নিবেশিত করা হলো অংশীবাদিদের প্রশ্নত্রয়ের উত্তর। সেই সঙ্গে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা হলো অংশীবাদিদেরকে।

তিন প্রশ্নের “উত্তর” আদৌ কি উত্তর ছিল?
ইহুদি পণ্ডিতদের নির্ধারিত প্রথম দুই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে কোরআন গুহাবাসী যুবক ও যুলকারনাইনের কাহিনি বর্ণনা করেছে। কিন্তু কোনো কাহিনি শোনানো এবং তার সত্যতার পক্ষে শনাক্তযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য দেওয়া এক নয়। কোরআনের ওই দুই বর্ণনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট পরিচয়, ঘটনাস্থলের নির্ভরযোগ্য অবস্থান ও ঘটনার স্বাধীন সাক্ষ্য অনুপস্থিত। তৃতীয় প্রশ্নে রূহের প্রকৃতি ব্যাখ্যার পরিবর্তে মানুষকে অল্প জ্ঞান দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে নবুয়তের পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত এমন কিছু বক্তব্যের ওপর দাঁড়ায়, যেগুলোর সত্যতা ওই বক্তব্যের বাইরে থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
গুহাবাসী যুবকদের কী ঘটনা ঘটেছিল? — (আসহাবে কাহফ)
গুহাবাসী যুবকদের অসাধারণ ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে কোরআন একটি কাহিনি হাজির করেছে। সেখানে ঈশ্বর তাঁদের দীর্ঘদিন ঘুম পাড়িয়ে রাখেন এবং পরে জাগিয়ে তোলেন। কিন্তু কারা এই যুবক, কোন নগর বা কোন যুগে ঘটনাটি ঘটেছে এবং এমন অস্বাভাবিক ঘটনার স্বাধীন সাক্ষ্য কী—সেসব প্রশ্ন অনির্দিষ্ট থেকে গেছে। একটি প্রচলিত কাহিনি পুনর্বর্ণনা করা অলৌকিক জ্ঞান প্রদর্শনের সমতুল্য নয়।
সূরা কাহফ ১৮:৯–২৬-এ যুবকদের কাহিনি বর্ণনা করা হলেও তাঁদের নাম, সুনির্দিষ্ট সময়, স্থান ও পরিচয় প্রতিষ্ঠার মতো তথ্য দেওয়া হয়নি। এমনকি সংখ্যা সম্পর্কে ১৮:২২ আয়াতে তিন, পাঁচ ও সাতজনের ভিন্ন মত উল্লেখ করে চূড়ান্ত জ্ঞান ঈশ্বরের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রশ্ন ও বিতর্ক থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। যে দাবির বিশেষত্ব ছিল অজানা অতীতের সংবাদ জানা, সেখানে অজ্ঞাত পরিচয় ও অমীমাংসিত সংখ্যাকে অলৌকিক জ্ঞানের নির্ণায়ক প্রমাণ বলা যায় না। [4]
কতক লোক বলবে, ‘তারা ছিল তিনজন, তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর।’ আর কতক লোক বলবে, ‘তারা ছিল পাঁচ জন, তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর’, (এ কথা তারা বলবে) অজানা বিষয়ে সন্দেহপূর্ণ অনুমানের ভিত্তিতে। আবার তাদের কতক লোক বলবে, ‘তারা ছিল সাতজন, আর তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর।’ বল, ‘তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আমার প্রতিপালকই বেশি জানেন।’ অল্প কয়জন ছাড়া তাদের সংখ্যা সম্পর্কে কেউ জানে না। কাজেই সাধারণ কথাবার্তা ছাড়া তাদের ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক করো না, আর তাদের সম্পর্কে কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেসও করো না।
— Taisirul Quran
অজানা বিষয়ে অনুমানের উপর নির্ভর করে কেহ কেহ বলেঃ তারা ছিল তিন জন, তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর; এবং কেহ কেহ বলেঃ তারা ছিল পাঁচ জন, ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর; আবার কেহ কেহ বলেঃ তারা ছিল সাত জন, অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর; বলঃ আমার রাব্বই তাদের সংখ্যা ভাল জানেন; তাদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে; সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি তাদের বিষয়ে বিতর্ক করনা এবং তাদের কেহকেও তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
বিতর্ককারীরা বলবে, ‘তারা ছিল তিন জন, চতুর্থ হল তাদের কুকুর’। আর কতক বলবে, ‘তারা ছিল পাঁচজন, ষষ্ঠ হল তাদের কুকুর’। এসবই অজানা বিষয়ে অনুমান করে। আর কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল সাত জন; অষ্টম হল তাদের কুকুর’। বল, ‘আমার রবই তাদের সংখ্যা সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত’। কম সংখ্যক লোকই তাদেরকে জানে। সুতরাং স্পষ্ট আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের ব্যাপারে বিতর্ক করো না। আর তাদের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে কারো কাছে জানতে চেয়ো না।
— Rawai Al-bayan
কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল তিনজন, তাদের চতুর্থটি ছিল তাদের কুকুর এবং কেউ কেউ বলবে, তারা ছিল পাঁচজন, তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর, গায়েবী বিষয়ে অনুমানের উপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল সাতজন, তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর।’ বলুন, ‘আমার রবই তাদের সংখ্যা ভালো জানেন; তাদের সংখ্যা কম সংখ্যক লোকই জানে [১]। সুতরাং সাধারণ আলোচনা ছাড়া আপনি তাদের বিষয়ে বিতর্ক করবেন না এবং এদের কাউকেও তাদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন না [২]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
“পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভ্রমণকারীর ঘটনা কী?”
পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ভ্রমণকারী ব্যক্তির সংবাদ জানতে চাওয়া হয়েছিল। কোরআন তাঁর পরিচিতি দিয়েছে ‘যুলকারনাইন’ উপাধিতে এবং বর্ণনা করেছে ভ্রমণ, শাসন ও এক বিশাল প্রতিবন্ধক নির্মাণের ঘটনা। কিন্তু উপাধিটির আড়ালে কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন এবং তাঁর অভিযানের বাস্তব অবস্থান কোথায়—তার কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় বা স্বতন্ত্র প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
সূরা কাহফ ১৮:৮৩–৯৮-এ যুলকারনাইনের ক্ষমতা, পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ভ্রমণ, সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের স্থান এবং ইয়াজুজ-মাজুজকে ঠেকাতে নির্মিত বিশাল বাঁধের বিবরণ আছে। অথচ কোরআনে তাঁর যুগ, বংশ, সাম্রাজ্য কিংবা উল্লিখিত স্থানগুলোর ভূগোল শনাক্ত করার মতো তথ্য নেই। পরবর্তী ব্যাখ্যায় আলেকজান্ডার, সাইরাস বা অন্য ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় মিলিয়ে দেখার চেষ্টা এই অনির্দিষ্টতাই প্রকাশ করে। অত্যন্ত অস্বাভাবিক ভ্রমণ ও নির্মাণকর্মের দাবি যত বিস্ময়কর, তার ইতিহাসগত প্রমাণের প্রয়োজনও তত বেশি।
তোমাকে তারা যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘আমি তার বিষয় তোমাদের নিকট কিছু বর্ণনা করব।’
— Taisirul Quran
তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি বলে দাওঃ আমি তোমাদের নিকট তার বিষয় বর্ণনা করব।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে। বল, ‘আমি এখন তার সম্পর্কে তোমাদের নিকট বর্ণনা দিচ্ছি’।
— Rawai Al-bayan
আর তারা আপনাকে যুল-কারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে [১]। বলুন, ‘অচিরেই আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করব।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আমি তাকে পৃথিবীতে আধিপত্য দান করেছিলাম আর তাকে সব রকমের উপায় উপাদান দিয়েছিলাম।
— Taisirul Quran
আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায় ও পন্থা নির্দেশ করেছিলাম।
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি তাকে যমীনে কর্তৃত্ব দান করেছিলাম এবং সববিষয়ের উপায়- উপকরণ দান করেছিলাম।
— Rawai Al-bayan
আমরা তো তাকে যমীনে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
একবার সে এক রাস্তা ধরল (অর্থাৎ একদিকে একটা অভিযান চালাল)।
— Taisirul Quran
সে এক পথ অবলম্বন করল।
— Sheikh Mujibur Rahman
অতঃপর সে একটি পথ অবলম্বন করল।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর সে এক পথ অবলম্বন করল।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
চলতে চলতে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে অস্বচ্ছ জলাশয়ে ডুবতে দেখল আর সেখানে একটি জাতির লোকেদের সাক্ষাৎ পেল। আমি বললাম, ‘হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার কিংবা তাদের সঙ্গে (সদয়) ব্যবহারও করতে পার।’
— Taisirul Quran
চলতে চলতে যখন সে সূর্যের অস্তগমন স্থানে পৌঁছল তখন সে সূর্যকে এক পংকিল পানিতে অস্ত যেতে দেখল এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললামঃ হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশেষে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে একটি কর্দমাক্ত পানির ঝর্ণায় ডুবতে দেখতে পেল এবং সে এর কাছে একটি জাতির দেখা পেল। আমি বললাম, ‘হে যুলকারনাইন, তুমি তাদেরকে আযাবও দিতে পার অথবা তাদের ব্যাপারে সদাচরণও করতে পার’।
— Rawai Al-bayan
চলতে চলতে সে যখন সূর্যের অস্ত গমন স্থানে পৌছল [১] তখন সে সূর্যকে এক পংকিল জলাশয়ে অস্তগমন করতে দেখল [২] এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল। আমরা বললাম, ‘হে যুল-কারনাইন! তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা এদের ব্যাপার সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তারপর সে আরেক পথ ধরল।
— Taisirul Quran
আবার সে এক পথ ধরল।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর সে আরেক পথ অবলম্বন করল।
— Rawai Al-bayan
তারপর সে এক উপায় অবলম্বন করল,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
চলতে চলতে সে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছল। সে সূর্যকে এমন এক জাতির উপর উদয় হতে দেখতে পেল, আমি যাদের জন্য সূর্য থেকে বাঁচার কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি।
— Taisirul Quran
চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছল তখন সে দেখলো – ওটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য সূর্য তাপ হতে আত্মরক্ষার কোন অন্তরাল আমি সৃষ্টি করিনি।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশেষে সে যখন সূর্যোদয়ের স্থানে এসে পৌঁছল তখন সে দেখতে পেল, তা এমন এক জাতির উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যের বিপরীতে কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি।
— Rawai Al-bayan
চলতে চলতে যখন সে সূর্যদয়ের স্থলে পৌছল তখন সে দেখল সেটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য সূর্যতাপ হতে কোনো অন্তরাল আমরা সৃষ্টি করিনি;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
যুলকারনাইনের লোহা-তামার বাঁধের ঐতিহাসিক প্রমাণ কোথায়?
যুলকারনাইনের কাহিনিতে শুধু দূরবর্তী ভ্রমণের অস্পষ্ট সংবাদ নেই; একটি বিশাল বস্তুগত নির্মাণকর্মের নির্দিষ্ট দাবিও আছে। সূরা কাহফ ১৮:৯৩–৯৮-এ দুই পাহাড়ের মাঝখানে লোহার খণ্ড সাজিয়ে উত্তপ্ত করার এবং তার ওপর গলিত তামা ঢেলে ইয়াজুজ-মাজুজের জন্য দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধক তৈরির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তাবারি ১৮:৯৬ আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘কিতর’ শব্দের অর্থ তামা এবং ‘সাদাফাইন’ বলতে দুই পাহাড়ের পার্শ্ব বোঝানোর ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন। এত বড় নির্মাণের অবস্থান, নির্মাণকাল, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী বা শনাক্তযোগ্য অবশেষের তথ্য কোরআনের ওই বিবরণ দেয় না। ফলে এই বাঁধের কাহিনিকে নবুয়তের অলৌকিক জ্ঞানের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করলে প্রথমেই সেই নির্মাণকর্মের স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন ওঠে। [5]
آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ ۖ حَتَّىٰ إِذَا سَاوَىٰ بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انفُخُوا ۖ حَتَّىٰ إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا
বাংলা অনুবাদ: আমাকে লোহার খণ্ড এনে দাও। অতঃপর যখন সে দুই পাহাড়ের মাঝখান সমান করে ফেলল, তখন বলল, তোমরা হাওয়া দিতে থাকো। অবশেষে যখন সে সেটিকে আগুনের মতো উত্তপ্ত করল, তখন বলল, আমাকে গলিত তামা এনে দাও, আমি এর ওপর ঢেলে দিই।
উক্ত প্রতিবন্ধক সম্পর্কে ১৮:৯৭ আয়াতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী সেটি অতিক্রম করতে বা তাতে ছিদ্র করতে পারেনি; পরের আয়াতে সেটিকে ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত সময় পর্যন্ত স্থায়ী রাখার কথা এসেছে। অর্থাৎ কাহিনি একদিকে নির্দিষ্ট উপাদানে নির্মিত বাস্তব স্থাপনার দাবি করছে, অন্যদিকে তার অবস্থান শনাক্তের কোনো উপায় সরবরাহ করছে না। অলৌকিক জ্ঞানের পরীক্ষায় অসংজ্ঞায়িত ভৌগোলিক বর্ণনা কোনো স্বাধীন প্রমাণ নয়। [6]
“রূহ কী?” — সংজ্ঞার পরিবর্তে জ্ঞানের সীমা
তৃতীয় প্রশ্নে রূহের প্রকৃতি জানতে চাওয়া হয়। কোরআনের ১৭:৮৫ আয়াতে জবাব আসে—রূহ ঈশ্বরের আদেশঘটিত এবং মানুষকে অল্প জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। রূহ কী, তার গঠন বা কার্যপ্রণালি কী এবং জীবদেহের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী—কোনোটিরই ব্যাখ্যা এখানে নেই। একটি অজানা বিষয়ের ব্যাখ্যা দাবি করা হলে ‘এটি ঈশ্বরের আদেশের অন্তর্গত’ বলা আসলে অজানাকে আরেকটি অপ্রমাণিত ধারণার ওপর ন্যস্ত করা। তিরমিজির ৩১৪০ নম্বর বর্ণনায় কুরাইশদের এই প্রশ্ন শেখাতে ইহুদি পণ্ডিতদের ভূমিকার কথাও এসেছে। [7] [8]
তোমাকে তারা রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, ‘রূহ হচ্ছে আমার প্রতিপালকের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত (একটি হুকুম)। এ সম্পর্কে তোমাকে অতি সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।’
— Taisirul Quran
তোমাকে তারা রূহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তুমি বলঃ রূহ্ আমার রবের আদেশ ঘটিত; এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, ‘রূহ আমার রবের আদেশ থেকে, আর তোমাদেরকে জ্ঞান থেকে অতি সামান্যই দেয়া হয়েছে’।
— Rawai Al-bayan
আর আপনাকে তারা রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে [১]। বলুন, ‘রূহ আমার রবের আদেশঘটিত [২] এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে অতি সামান্যই।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৪/ তাফসীরুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ ১৮. সূরা বানী ইসরাঈল
৩১৪০। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরাইশরা ইয়াহুদীদের বলল, তোমরা আমাদেরকে এমন কিছু শিখিয়ে দাও যে প্রসঙ্গে আমরা এই ব্যক্তিকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) প্রশ্ন করতে পারি। ইয়াহুদীরা বলল, তোমরা রূহ প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন কর। বর্ণনাকারী বলেনঃ তারা রূহ (বা প্রাণ) বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করল। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “লোকেরা রূহ প্রসঙ্গে তোমার নিকট প্রশ্ন করে। বল, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশ ঘটিত। জ্ঞানের খুব সামান্যই তোমাদেরকে প্রদান করা হয়েছে”- (সূরা বনী ইসরাঈল ৮৫)।
ইয়াহুদীরা বলল, “আমাদের বিরাট বা প্রচুর জ্ঞান দান করা হয়েছে। আমাদেরকে তাওরাত কিতাব দেয়া হয়েছে। আর যাদেরকে তাওরাত গ্রন্থ দেয়া হয়েছে তাদেরকে প্রভূত কল্যাণ দেয়া হয়েছে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “বল, আমার প্রতিপালকের কথাগুলো লেখার জন্য সমুদ্রের সমস্ত পানি যদি কালি হয়ে যায় তবুও তা আমার প্রভুর কথাগুলো লিখে শেষ করার পূর্বেই নিঃশেষ হয়ে যবে। আমরা যদি আবার একই রকম কালি নিয়ে আসি তুবও তা যথেষ্ট হবে না”- (সূরা কাহফ ১০৯)।
সহীহঃ আত্তা’লীকাত আল-হাসসান (৯৯)
আবূ ঈসা বলেন, উল্লেখিত সনদসূত্রে এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
তিন প্রশ্নের জবাব: ধর্মীয় বয়ান ও প্রমাণগত ঘাটতি
| প্রশ্ন | যা জানতে চাওয়া হয়েছিল | কোরআন ও হাদিসের বক্তব্য | উৎস | প্রমাণগত সমস্যা |
|---|---|---|---|---|
| ১) “অতীত যুগের অসাধারণ ঘটনার যুবকদের কী হয়েছিল?” (আসহাবে কাহফ) | ঘটনা ও তার অসাধারণতার বিবরণ; পরিচয় যাচাইয়ের স্বাধীন সূত্র নেই | কাহিনি-ভিত্তিক বর্ণনা; নাম-পরিচয় নির্দিষ্ট নয়; সংখ্যা নিয়ে মানুষের অনুমান উল্লেখ; শেষে বলা হয় “আমার রবই ভালো জানেন… তর্ক করো না” | [কোরআন ১৮:৯–২৬] বিশেষত [কোরআন ১৮:২২] | কাহিনি-ভিত্তিক উত্তর আছে, কিন্তু ঘটনাটির স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক সত্যতা বা চরিত্রগুলোর শনাক্তযোগ্য পরিচয়ের প্রমাণ নেই। |
| ২) “পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভ্রমণকারীর ঘটনা কী?” (যুলকারনাইন) | পূর্ব-পশ্চিমে ভ্রমণকারীর ঘটনা ও সংবাদ | বলা হয়—“আমি তার বিষয়ে কিছু বর্ণনা করব”; এরপর কাহিনি: ক্ষমতা, ভ্রমণ, শাসন, ইয়াজুজ-মাজুজ বাধ নির্মাণ ইত্যাদি; কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তিনি ঠিক কে—কোরআনে সে সম্পর্কে কিছুই বলা হয় না | [কোরআন ১৮:৮৩–৯৮] | বর্ণনায় ঘটনা আছে, কিন্তু চরিত্রের ঐতিহাসিক পরিচয় ও ভ্রমণস্থানের নির্ভরযোগ্য স্বাধীন যাচাই নেই। |
| ৩) “রূহ কী?” | সংজ্ঞা/ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত: রূহের প্রকৃতি কী, কীভাবে কাজ করে ইত্যাদি | সরাসরি বলা হয়: “রূহ আমার রবের আদেশ থেকে; তোমাদের জ্ঞান অল্প” — অর্থাৎ বিস্তারিত ব্যাখ্যা/সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি | [কোরআন ১৭:৮৫] এবং প্রশ্ন-প্রেক্ষাপট সহ [সুনান আত-তিরমিজী, ৩১৪০] | রূহের প্রকৃতির সংজ্ঞা নেই; ঈশ্বরের আদেশের দাবি একই দাবি থেকে পৃথক কোনো প্রমাণও দেয় না। |
রূহের প্রশ্নে উত্তর না দেওয়াকেই সাফল্য গণনার সমস্যা
ইবনে আতিয়্যা তাঁর আল-মুহাররারুল ওয়াজিজ-এ রূহের প্রশ্ন নিয়ে এমন একটি বর্ণনা সংরক্ষণ করেছেন, যেখানে ইহুদিদের একটি দল বলেছিল—মুহাম্মদ যদি রূহ সম্পর্কে উত্তর দেন, তাহলে বুঝতে হবে তিনি নবী নন। একই আলোচনায় মক্কায় তিন প্রশ্ন করার আরেকটি বর্ণনাও এসেছে। এখানে পরীক্ষার নিয়মের গুরুতর সমস্যা প্রকাশ পায়: কোনো অজ্ঞাত বিষয়ের ব্যাখ্যা না দেওয়াকেই যদি নবুয়তের পক্ষে নিদর্শন ধরা হয়, তাহলে ব্যাখ্যা করার অক্ষমতা এবং ইচ্ছাকৃত নীরবতার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার উপায় থাকে না। যে কেউ ‘এই জ্ঞান ঈশ্বরের কাছে’ বলে একই ধরনের উত্তর দিতে পারে। অথচ এমন উত্তর নিজে থেকে ঐশী যোগাযোগের প্রমাণ হয় না। [9]
سلوه عن الروح، فإن أجاب فيه عرفتم أنه ليس بنبي.
বাংলা অনুবাদ: তাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করো; যদি সে এ বিষয়ে উত্তর দেয়, তাহলে বুঝবে সে নবী নয়।
প্রকাশ্য অলৌকিক প্রমাণের চ্যালেঞ্জ: কোরআনের সরাসরি সাক্ষ্য
সূরা ইসরা ১৭:৯০–৯৩-এ বিরোধীরা মুহাম্মদের কাছে সরাসরি দৃশ্যমান এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি নিদর্শন দাবি করে: ভূমি থেকে পানির উৎস বের করে দেওয়া, খেজুর ও আঙুরের বাগানে নদী প্রবাহিত করা, আকাশের অংশ পতিত করা, আল্লাহ ও ফেরেশতাদের সামনে হাজির করা, সোনার ঘর নির্মাণ, অথবা আকাশে উঠে সেখান থেকে পড়ার উপযোগী কিতাব এনে দেওয়া। এটি কোনো পরবর্তী জীবনীকারের কল্পিত প্রশ্ন নয়; কোরআন নিজেই এমন দাবি উত্থাপিত হওয়ার কথা সংরক্ষণ করেছে। এই দাবিগুলোর কোনোটি ওই সংলাপের জবাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে আয়াতগুলো জানায় না। শেষ আয়াতে নির্দিষ্ট কাজ করে দেখানোর পরিবর্তে মুহাম্মদকে তাঁর মানুষ ও রাসুল হওয়ার কথা বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [10]
قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولًا
বাংলা অনুবাদ: বলো, আমার প্রতিপালক পবিত্র; আমি কি একজন মানুষ-রাসুল ছাড়া অন্য কিছু?
সূরা আনকাবুত ২৯:৫০–৫১-এও একই সমস্যা পাওয়া যায়। প্রশ্নকারীরা কেন মুহাম্মদের কাছে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না, তা জানতে চেয়েছিল। জবাবে অলৌকিক নিদর্শনের ক্ষমতা আল্লাহর কাছে ন্যস্ত করা হয় এবং পরের আয়াতে আবৃত্তিকৃত কিতাবকেই যথেষ্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। গ্রন্থের নিজের বক্তব্যকে গ্রন্থটির ঐশী উৎসের স্বতন্ত্র প্রমাণ হিসেবে ধরলে যুক্তি বৃত্তাকার হয়: যে দাবিটি পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটিকেই পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রমাণ বানানো হচ্ছে। [11]
قُلْ إِنَّمَا الْآيَاتُ عِنْدَ اللَّهِ وَإِنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُبِينٌ
বাংলা অনুবাদ: বলো, নিদর্শনসমূহ কেবল আল্লাহর কাছেই রয়েছে; আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।
মুহাম্মদের নানা অলৌকিক কীর্তির দাবি হাদিস ও সিরাত সাহিত্যে পাওয়া যায়। কিন্তু এক স্থানে অন্য একটি অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা থাকা নির্দিষ্ট পরীক্ষাস্থলে উত্থাপিত নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জটি পূরণ হয়েছিল—এমন প্রমাণ নয়। কোরআনে সংরক্ষিত এই সংলাপগুলোতে প্রত্যক্ষ প্রমাণের দাবির পরিবর্তে আল্লাহর সিদ্ধান্ত এবং কোরআনের কর্তৃত্বকেই শেষ জবাব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নিদর্শন দেখানোর আগেই অবিশ্বাসের সিদ্ধান্ত: সূরা আনআম ৬:১০৯–১১১
কোরআনের সূরা আনআম ৬:১০৯-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিরোধীরা জোর দিয়ে শপথ করেছিল—মুহাম্মদ তাঁদের সামনে কোনো নিদর্শন হাজির করলে তাঁরা বিশ্বাস করবে। উত্তরে বলা হয়, নিদর্শন আল্লাহর এখতিয়ারে এবং তা এলেও তারা বিশ্বাস না-ও করতে পারে। তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুহাম্মদ বিন কাব আল-কুরাজির সূত্রে সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করার দাবিটিও সংরক্ষণ করেছেন। অর্থাৎ নিদর্শন প্রদর্শনের শর্ত এবং সেই শর্ত পূরণ না হওয়ার ঘটনা কোরআনের বক্তব্য ও ধ্রুপদী তাফসিরে সরাসরি আলোচিত হয়েছে। [12]
وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِن جَاءَتْهُمْ آيَةٌ لَّيُؤْمِنُنَّ بِهَا ۚ قُلْ إِنَّمَا الْآيَاتُ عِندَ اللَّهِ ۖ وَمَا يُشْعِرُكُمْ أَنَّهَا إِذَا جَاءَتْ لَا يُؤْمِنُونَ
বাংলা অনুবাদ: তারা আল্লাহর নামে দৃঢ়ভাবে শপথ করেছে যে, তাদের কাছে কোনো নিদর্শন এলে তারা অবশ্যই তাতে বিশ্বাস করবে। বলো, নিদর্শনসমূহ আল্লাহর কাছেই রয়েছে। আর তোমাদের কে জানায় যে, তা এলেও তারা বিশ্বাস করবে?
পরের ৬:১১১ আয়াতে আরও কঠোর দাবি এসেছে। ফেরেশতাদের সামনে নামিয়ে দেওয়া, মৃত ব্যক্তিদের কথা বলানো কিংবা সমস্ত বিষয় প্রত্যক্ষ উপস্থিত করানো হলেও আল্লাহ না চাইলে বিরোধীরা বিশ্বাস করবে না—এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষার প্রত্যাশিত ফল আগেই বাতিল করা হয়েছে। প্রমাণ দেখালে তা গ্রহণ করা হবে কি না, সেটি মানুষের সামনে প্রমাণের শক্তি বা দুর্বলতা দিয়ে নির্ধারণ না করে ঈশ্বরের অদৃশ্য ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। প্রমাণের অনুপস্থিতিকে এভাবে প্রতিপক্ষের পূর্বঘোষিত অবিশ্বাস দিয়ে ব্যাখ্যা করলে নবুয়তের দাবির প্রকাশ্য পরীক্ষা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। [13]
وَلَوْ أَنَّنَا نَزَّلْنَا إِلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةَ وَكَلَّمَهُمُ الْمَوْتَىٰ وَحَشَرْنَا عَلَيْهِمْ كُلَّ شَيْءٍ قُبُلًا مَّا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ
বাংলা অনুবাদ: যদি আমরা তাদের কাছে ফেরেশতাদের নামিয়ে দিতাম, মৃতরা তাদের সঙ্গে কথা বলত এবং সবকিছু তাদের সামনে সমবেত করতাম, তবু আল্লাহ ইচ্ছা না করলে তারা বিশ্বাস করত না; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।
তাবারি ৬:১১১-এর ব্যাখ্যায় ঘটনাটিকে আরও স্পষ্ট করেছেন: আল্লাহর পক্ষ থেকে নিদর্শন, ফেরেশতা ও পুনর্জীবিত মৃতের সাক্ষ্য প্রদর্শিত হলেও ঈশ্বর যাকে বিশ্বাসের উপযোগী করবেন না, সে বিশ্বাস করবে না। এখানে নবুয়তের দাবির সত্যতা যাচাইয়ের চেয়ে অবিশ্বাসীদের মানসিক পরিণতিকে ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণাধীন ঘোষণা করা হয়েছে। একজন ব্যক্তি প্রমাণ দাবি করলেও কেন তাঁকে সেই প্রমাণ দেওয়া হলো না—এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর ভবিষ্যৎ অবিশ্বাস নিশ্চিত ধরে নেওয়া হতে পারে না; কারণ পরীক্ষাটি আদৌ অনুষ্ঠিত হয়নি। [14]
সাফা পাহাড়কে সোনার পাহাড়ে পরিণত করা
মক্কার বিরোধীরা মুহাম্মদের কাছে একটি প্রকাশ্য ও প্রত্যক্ষভাবে যাচাইযোগ্য অলৌকিক নিদর্শন চেয়েছিল—সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করা। তাফসিরে মাযহারীতে সংরক্ষিত বর্ণনায় তাঁরা মুসা, ঈসা ও সালেহের অলৌকিক কীর্তির সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের চোখের সামনে একই রকম প্রমাণ দাবি করে। মুহাম্মদ জানতে চান, তিনি এই কাজ করলে তাঁরা বিশ্বাস করবেন কি না; উত্তরে তাঁরা সম্মিলিতভাবে বিশ্বাস করার প্রতিশ্রুতি দেন। অথচ সাফা পাহাড় সোনায় রূপান্তরিত করার ঘটনাটি ঘটেনি। এর বদলে বর্ণনায় জিব্রাইলের নামে জানানো হয়, নিদর্শন দেখানোর পর কেউ অবিশ্বাস করলে ভয়াবহ শাস্তি দেওয়া হবে। কোনো পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগেই পরীক্ষার্থীর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণকে কারণ দেখিয়ে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। [15]
মোহাম্মদ বিন কা’ব কারাজী থেকে ইবনে জারীর এবং বাগবী বর্ণনা করেছেন, (কালাবী সূত্রেও বাগবী এ রকম লিখেছেন)- একবার কুরায়েশ নেতারা রসুল স.কে উদ্দেশ্য করে বললো, হে মোহাম্মদ! তুমি বলে থাকো মুসার হাতে ছিলো একটি লাঠি। ওই লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করলে তা থেকে বেরিয়ে আসতো বারোটি পানির প্রস্রবণ। আরো বললো, ঈসা মৃতকে জীবিত করতে পারতেন। এ কথাও তুমি বলে থাকো যে, সালেহ্ তার সম্প্রদায়ের জন্য পাথরের মধ্য থেকে একটি উট বের করে দিয়েছিলেন। তুমিও এ রকম একটি মোজেজা দেখাও। যদি দেখাতে পারো তবে আমরা তোমাকে সত্য বলে মেনে নেবো। রসুল স. বললেন, কী মোজেজা দেখতে চাও তোমরা? কুরায়েশেরা বললো, এই সাফা পাহাড়টিকে আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে সোনার পাহাড়ে পরিণত করে দাও। বাগবীর বর্ণনায় আরো রয়েছে, অবিশ্বাসীরা তখন এ কথাও বলেছিলো, আমাদের মৃত পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোনো কোনো ব্যক্তিকে জীবিত করে দেখাও যেনো আমরা তাদের নিকট জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতে পারি যে, তুমি যা বলছো তা সত্য। অথবা ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে নিয়ে এসো- যেনো তারা তোমার সত্যতার সাক্ষ্য দেয়।
ইবনে জারীর ও বাগবী কর্তৃক আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রসুল স. তখন বললেন, তোমাদের আবেদন যদি আমি বাস্তবায়ন করি, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা সমস্বরে বললো, আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি এ রকম করতে পারো, তবে আমরা সকলেই তোমার অনুসারী হয়ে যাবো। সাহাবীগণও বললেন, তাদের আবেদন পূর্ণ করা হোক। তাহলে তারাও ইসলাম গ্রহণ করবে। রসুল স. দোয়া করার জন্য দণ্ডায়মান হলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিলো সাফা পাহাড়কে সোনার পাহাড়ে পরিণত করার জন্য তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাবেন। অকস্মাৎ সেখানে আবির্ভূত হলেন হজরত জিব্রাইল। বললেন, হে আল্লাহ্র রসুল!। আপনি প্রার্থনা করলে সাফা পাহাড় সোনার পাহাড় হয়ে যাবে। কিন্তু এরপরেও আবেদনকারী জনতা যদি ইমান না আনে, তবে তাদের প্রতি আপতিত হবে আল্লাহ্র গজব। সুতরাং আপনি ক্ষান্ত হন। তাদের আবেদনে সাড়া দেবেন না। এতে করে যারা প্রকৃতই সত্যান্বেষী তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য তওবা করবে। আর যারা তা নয় তারা পূর্ববৎ অবিশ্বাসে নিমগ্ন থাকবে। রসুল স. বললেন, আমি চাই তাদেরকে ইমান গ্রহণের সুযোগ দেয়া হোক যাতে করে তারা আল্লাহ্ আযাব থেকে রক্ষা পায়। সুতরাং যারা তওবা করতে চায় তারা যেনো তওবার পথে এগিয়ে আসে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হলো নিম্নের আয়াত।

জালালুদ্দিন সুয়ুতি আদ-দুররুল মানসুর-এ সাঈদ ইবনে জুবাইরের সূত্রে এমন একটি বর্ণনা সংকলন করেছেন, যেখানে কুরাইশরা ইহুদিদের কাছে মুসার এবং খ্রিস্টানদের কাছে ঈসার অলৌকিক নিদর্শনের কথা জেনে মুহাম্মদকে সাফা পাহাড় সোনায় পরিণত করতে বলে। তাঁদের বক্তব্যে এই দৃশ্যমান নিদর্শন বিশ্বাসের নিশ্চয়তা বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে হাজির করা হয়েছে। কোনো কিছুর সত্যতা যাচাইয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ চাওয়ার পর প্রমাণ না দেখিয়ে শুধু তার সম্ভাব্য বিপদের কথা বলা পরীক্ষার সফলতা নয়। [16]
ادع الله أن يجعل لنا الصفا ذهبا؛ فنزداد به يقينا، ونتقوى به على عدونا
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো, যেন তিনি আমাদের জন্য সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করেন; তাহলে আমাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তি অর্জন করব।
সূরা ইসরা ১৭:৫৯-এ পূর্ববর্তী জাতিগুলোর নিদর্শন প্রত্যাখ্যানকে নতুন নিদর্শন না পাঠানোর কারণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে। ইবনে কাসিরও সাফা পাহাড় সোনায় পরিণত করার দাবির সঙ্গে এই আয়াতের সম্পর্ক বর্ণনা করেছেন। অথচ অতীতে অন্যেরা কোনো নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছিল—এই দাবি বর্তমান প্রশ্নকারীদের সামনে প্রমাণ প্রদর্শন অপ্রয়োজনীয় করে না। আর সাফা পাহাড়ের রূপান্তর প্রত্যক্ষভাবে ঘটলে তা ঘটেছিল কি না যাচাই করার সুযোগ থাকত; রূপান্তর না ঘটায় সেই সুযোগই তৈরি হয়নি। নবুয়তের প্রমাণ প্রদর্শনের বদলে শাস্তির সম্ভাবনার কাহিনি হাজির হয়েছে। [17] [18]
وَمَا مَنَعَنَا أَنْ نُرْسِلَ بِالْآيَاتِ إِلَّا أَنْ كَذَّبَ بِهَا الْأَوَّلُونَ
বাংলা অনুবাদ: পূর্ববর্তীরা নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছিল বলেই নিদর্শন পাঠানো থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
বনূ নাদীরের নবুয়ত-পরীক্ষার প্রস্তাব থেকে সামরিক সংঘাত
বনূ নাদীরের সঙ্গে মুহাম্মদের সংঘাতের বর্ণনায় ইহুদি পণ্ডিতদের সামনে তাঁর নবুয়তের দাবি উপস্থাপনের প্রস্তাব এবং তার পরপরই সামরিক সংঘাতের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবু দাউদের বর্ণনায় ত্রিশজন ইহুদি আলেমের সঙ্গে ত্রিশজন মুসলিম সঙ্গীর সাক্ষাতের প্রস্তাব রয়েছে: পণ্ডিতেরা তাঁর কথা শুনে বিশ্বাস করলে গোত্রের অন্যরাও বিশ্বাস করবে। কিন্তু সেখানে প্রশ্নোত্তর সম্পন্ন করে নবুয়তের সত্যতা প্রতিষ্ঠার কোনো বিবরণ নেই; পরদিনের ঘটনা হিসেবে সৈন্যদল নিয়ে অবরোধের কথা এসেছে। অন্যদিকে ইবনে কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তে বনূ নাদীরের এক বৈঠক থেকে মুহাম্মদের একা মদিনায় ফিরে যাওয়ার বর্ণনা আছে। সেখানে ছাদ থেকে পাথর ফেলে হত্যার ষড়যন্ত্রের সংবাদ পাওয়ার দাবি করা হয়। নিজের সঙ্গীদের কিছু না জানিয়ে তাঁর চলে যাওয়া, সঙ্গীদের তাঁকে খুঁজতে থাকা এবং পরে তাঁর কাছ থেকেই ষড়যন্ত্রের সংবাদ শোনা—এগুলোই সেই কাহিনির প্রত্যক্ষ বর্ণিত ঘটনা। গোপন ঐশী সংবাদের দাবি এ ঘটনাগুলোর কোনো স্বাধীন সাক্ষ্য নয়। [19] [20]
রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাদের একটি ঘরের দেয়ালের পাশে বসা ছিলেন। তারা বলল, কে আছে যে, ছাদে উঠে ওখান থেকে একটি পাথর ফেলে দিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করে আমাদেরকে তাঁর হাত থেকে নিষ্কৃতি দেবে? আমর ইবন জাহহাশ এগিয়ে এসে বলল, আমি এ জন্যে প্রস্তুত আছ। সে মতে পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে সে স্থানে উঠে । রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখনও সেখানে একদল সাহাবীসহ বসা ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবু বকর (রা) উমর (রা) এবং আলী (রা)। ওদের দুরভিসন্ধি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আসমানী সংবাদ এসে যায়। তিনি কাউকে কিছু না বলে উঠে পড়েন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দীর্ঘক্ষণ ঘটনাস্থলে ফিরে না আসায় সাহাবীগণ তাঁর খোঁজে বের হন, মদীনার দিক থেকে আগত এক লোককে দেখে তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কথা তাকে জিজ্ঞেস করে। সে ব্যক্তি বলেছিল যে, আমি তো তাঁকে মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। এ সংবাদ পেয়ে সাহাবীগণ সকলে মদীনায় ফিরে এলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট সমবেত হলেন। তিনি ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা তাঁদেরকে অবহিত করলেন।

ত্রিশজন আলেমের সাক্ষাতের প্রস্তাব ও গোপন হামলার বর্ণনা
মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালিহির সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ-এ ত্রিশজন করে আলোচনার আয়োজনের পর ইহুদি পক্ষের তিনজন আলেমের সঙ্গে মুহাম্মদের তিনজন সঙ্গীর সাক্ষাতের আরেকটি প্রস্তাবের কথা আছে। সেখানে কয়েকজন ইহুদির গোপনে ছুরি বহন করা এবং বনূ নাদীরের এক নারী তাঁর মুসলিম ভাইকে সতর্ক করে দেওয়ার বর্ণনাও পাওয়া যায়। এরপর মুহাম্মদ মদিনায় ফিরে যান। এই বর্ণনায়ও নবুয়ত-পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর শেষ হওয়ার বা ইহুদি পণ্ডিতদের কাছে কোনো নির্দিষ্ট অলৌকিক প্রমাণ প্রদর্শনের ঘটনা নেই। বরং ধর্মীয় আলোচনার ঘোষিত সম্ভাবনা দ্রুত শত্রুতা ও সামরিক সংঘাতের ঘটনায় রূপ নিয়েছে। [21]
واشتملوا على الخناجر ، وأرادوا الفتك برسول الله صلى الله عليه وسلم
বাংলা অনুবাদ: তারা নিজেদের কাছে গোপনে ছুরি রেখেছিল এবং মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল।
আবু দাউদের বনূ নাদীর-সংক্রান্ত বর্ণনায় ত্রিশজন ইহুদি আলেমের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাবের পরদিন মুহাম্মদের সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ ও অবরোধের বিবরণ রয়েছে। নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর সম্পন্ন করে পণ্ডিতদের বিশ্বাসে আনতে পারার কোনো ঘটনা সেখানে বর্ণিত হয়নি। আলোচনার ঘোষিত শর্ত ছিল যুক্তি ও বক্তব্যের মাধ্যমে নবুয়তের সত্যতা যাচাই; পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এসেছে সশস্ত্র অভিযান, অবরোধ এবং শেষ পর্যন্ত বনূ নাদীরের উচ্ছেদ। ধর্মীয় সত্যতার পরীক্ষা আর প্রতিপক্ষকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়; সামরিক বিজয় কখনো নবুয়তের দাবির অলৌকিক সত্যতার প্রমাণ হয় না। [22]
فلما كان الغد غدا عليهم رسول الله صلى الله عليه وسلم بالكتائب فحصرهم
বাংলা অনুবাদ: পরদিন মুহাম্মদ সৈন্যদল নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে তাদের অবরোধ করেন।
আবু দাউদের পূর্ণ বর্ণনায় ত্রিশজনের সাক্ষাতের প্রস্তাবের পরদিন সামরিক পদক্ষেপ, বনূ কুরাইজার সঙ্গে অঙ্গীকার এবং বনূ নাদীরের উচ্ছেদের ঘটনাপ্রবাহ এসেছে। সেই সংঘাতের পর বনূ নাদীরের খেজুরবাগান ও সম্পদ মুহাম্মদের কর্তৃত্বে চলে আসে বলেও বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। যে সূত্রটি ইহুদি পণ্ডিতদের সঙ্গে ধর্মীয় সত্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব নথিবদ্ধ করেছে, সেটিই পরবর্তী ফলাফল হিসেবে ধর্মান্তর নয়, সামরিক পরাজয়, উচ্ছেদ ও সম্পদ হস্তান্তরের কথা বলেছে। [23]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৪/ কর, খাজনা, অনুদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পর্কে
পরিচ্ছেদঃ ১৬১. বনূ নযীরের ঘটনা সম্পর্কে।
২৯৯৪. মুহাম্মদ ইবন দাঊদ ইবন সুফইয়ান (রহঃ) ……. আবদুর রহমান ইবন কা’ব ইবন মালিক (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন যে, কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তি-পূজক সাথীদের, যারা আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোক, এ মর্মে পত্র লেখে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের আগে মদীনায় অবস্থান করছিলেনঃ তোমরা আমাদের সাথী (মুহাম্মদ) কে জায়গা দিয়েছ। এ জন্য আমরা আল্লাহ্র নামে শপথ করে বলছি, হয়তো তাঁর সাথে যুদ্ধ কর, নয়তো তাঁকে বের করে দাও। অন্যথায় আমরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীদের আমাদের দখলে আনব।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার মূর্তিপূজারী সাথীরা এ খবর পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এ খবর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌছবার পর তিনি তাদের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বলেনঃ তোমরা কুরায়শদের নিকট হতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী চিঠি পেয়েছ, কিন্তু তা তোমাদের জন্য এত মারাত্মক নয়, যত না ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করবে। কেননা, তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সংকল্প করছ।
তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এরূপ কথা শুনলো, তখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। এ খবর কুরায়শ কাফিরদের কাছে পৌছলে তারা বদর যুদ্ধের পর ইয়াহুদীদের নিকট লিখলোঃ তোমরা ঘরবাড়ী ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সাথী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে যুদ্ধ করা। অন্যথায় আমরা তোমাদের সাথে এরূপ করব, সেরূপ করব। আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।
যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তারা এরূপ চিঠি পেল, তখন বনূ নযীরের ইয়াহুদীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ মর্মে অবহিত করে যে, আপনি আপনার সাথীদের থেকে ত্রিশজন নিয়ে আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করবে। তারা আপনার কথা শুনবে, যদি তারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনব।
পরদিন সকাল বেলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের উপর হামলা করেন এবং তাদের অবরোধ করে বলেনঃ আল্লাহ্র শপথ! তোমরা যতক্ষণ অঙ্গীকার না করবে, ততক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তখন তারা (ইয়াহুদীরা) অঙ্গীকার করতে অস্বীকার করে। ফলে তিনি সেদিন তাদের সাথে দিনভর যুদ্ধে রত থাকেন। পরদিন তিনি বনূ নযীরকে বাদ দিয়ে বনূ কুরাইযার উপর আক্রমণ করেন এবং তাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বলেন। ফলে তারা তাঁর সংগে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। তখন তিনি তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করে পুনরায় বনূ নযীরকে অবরোধ করেন এবং তাদের সাথে ততক্ষণ যুদ্ধ করেন, যতক্ষণ না তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
বনূ নযীরের লোকেরা তাদের উটের পিঠে ঘরের দরজা, চৌকাঠ ইত্যাদি যে পরিমাণ মালামাল নেওয়া সম্ভব ছিল, তা নিয়ে যায়। এবার বনূ নযীরের খেজুরের বাগান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিকারে আসে, যা আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে প্রদান করেন। যেমন আল্লাহ্ বলেনঃ
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلاَ رِكَابٍ
অর্থাৎ আল্লাহ্ কাফিরদের মাল হতে যে সস্পদ তাঁর রাসূলকে প্রদান করেন, তা হাসিলের জন্য তোমরা তোমাদের ঘোড়া অথবা উট হাঁকাও নি, অর্থাৎ ঐ সম্পদ বিনা যুদ্ধে হাসিল হয়।
অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মালের অধিকাংশই মুহাজিরদের মাঝে বণ্টন করে দেন এবং অভাবগ্রস্ত দু’জন আনসারকে তা হতে অংশ প্রদান করেন। এ দু’জন ছাড়া অন্য আনসার সাহাবীদের মাঝে এ মাল বিতরণ করা হয়নি। অবশিষ্ট মাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য সাদকা স্বরূপ ছিল, যা বনূ ফাতিমার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বৃষ্টির অনুরোধে তিরস্কার: বিপন্ন মানুষের প্রার্থনার বদলে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক
এক বেদুঈন মুহাম্মদের কাছে এসে মানুষের দুর্ভোগ, পরিবারের অনাহার এবং গবাদি পশুর ক্ষতির কথা জানিয়ে বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে অনুরোধ করেন। তিনি মুহাম্মদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে এবং আল্লাহর মাধ্যমে মুহাম্মদের কাছে সুপারিশ চাওয়ার কথাও বলেন। দ্বিতীয় বাক্যটি শুনেই মুহাম্মদ তাঁকে কঠোরভাবে তিরস্কার করেন এবং ঈশ্বরের মর্যাদা ও আরশের অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিতে থাকেন। উদ্ধৃত বর্ণনায় দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য বৃষ্টির প্রার্থনা করা কিংবা বৃষ্টি হওয়ার কোনো ঘটনা নেই। অনাহার ও খরার জরুরি আবেদনটি ঈশ্বরের মর্যাদা রক্ষার ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় চাপা পড়ে গেছে। বেদুঈনের সাহায্যের আবেদন ও তার জবাবে আরশের কাঠামো নিয়ে বক্তব্যের এই বিপরীতমুখীতা কাহিনিটির গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সমস্যা। [24] [25]
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৫৫
অর্থাৎ- “আকাশ ও পৃথিবীর মাঝের দূরত্ব কতটুকু তা কি তোমরা জান? তাঁরা বলল, আমরা তো জানি না। তিনি বললেন, উভয়ের মাঝে একাত্তর কিংবা বাহাত্তর কিংবা তিহাত্তর বছরের দূরত্ব। ১ অবশিষ্টগুলোর দূরত্ব অনুরূপ।”
ইমাম আবূ দাউদ (র) সাহাবী জুবায়র ইবন মুতইম (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি
বলেছেন: জনৈক বেদুঈন একদা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরবারে এসে বলল:
يا رسول الله جهدت الأنفس وجاعت العيال ونهكت الأموال وهلكت الأنعام، فاستسق الله لنا فانا نستشفع بك على الله و نستشفع بالله
عليك .
অর্থাৎ-হে আল্লাহর রাসূল! মানুষগুলো সংকটে পড়ে গেছে, পরিবার-পরিজন অনাহারে দিনপাত করছে এবং ধন-সম্পদ ও গবাদি পশুগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। অতএব, আপনি আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য বৃষ্টির দু’আ করুন। আমরা আপনার উসিলা দিয়ে আল্লাহর নিকট এবং আল্লাহর উসিলা দিয়ে আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : ه ويحك أتدرى ما تقولক তোমাকে, তুমি কি বুঝতে পারছো, কী বলছ! এই বলে রাসূলুল্লাহ (সা) অনবরত আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকেন। এমনকি সাহাবীগণের মুখমণ্ডলে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তারপর তিনি বললেন:
ويحك أنه لا يستشفع بالله علي احد من خلفه شان الله اعظم من
ذالك ويحك اتدرى ما الله ان عرشه على سموته هكذا .
অর্থাৎ-ধিক তোমাকে! আল্লাহর উসিলা দিয়ে তাঁর সৃষ্টির কারো সাহায্য প্রার্থনা করা চলে না। আল্লাহর শান তার অনেক ঊর্ধ্বে। ধিক তোমাকে! তোমার কি জানা আছে যে, আল্লাহর আরশ তার আকাশসমূহের উপরে এভাবে আছে। এ বলে তিনি তাঁর অঙ্গুলিসমূহের দ্বারা ইশারা করে গম্বুজের মত করে দেখান। তারপর বললেন:
وانه ليئط به أطيط الرحل بالراكب.
অর্থাৎ-বাহন তার আরোহীর ভারে যেমন মচমচ করে উঠে আরশও তেমনি মচমচ করে উঠে। ইবন বাশার (র)-এর বর্ণনায় রয়েছে:
ان الله فوق عرشه والعرش فوق سموته.
অর্থাৎ-আল্লাহ আছেন তাঁর আরশের উপর আর আরশ আছে তাঁর আকাশসমূহের উপর।
হাফিজ আবুল কাসিম ইব্ন আসাকির দামেশকী (র) এ হাদীসের বিরুদ্ধে “বায়ানুল ওহমি . ওয়াত তাখলীতিল ওয়াকিয়ি ফী হাদীসিল আতীত” নামক একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা রচনা করেছেন

উপসংহার
মুহাম্মদের নবুয়তের দাবিকে ঘিরে সংরক্ষিত ঘটনাগুলোর মূল দ্বন্দ্ব হলো, নির্দিষ্ট প্রশ্ন ও প্রকাশ্য প্রমাণের দাবির বিপরীতে বারবার এমন জবাব এসেছে যা নিজে থেকে পরীক্ষণযোগ্য নয়। কুরাইশদের তিন প্রশ্নের ক্ষেত্রে পরদিন উত্তর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি; গুহাবাসী যুবক ও যুলকারনাইনের কাহিনিতে অজানা ঘটনার বর্ণনা থাকলেও সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শনাক্তকরণ অনুপস্থিত; রূহের প্রকৃতির প্রশ্নে সংজ্ঞার বদলে ঈশ্বরের আদেশ ও মানুষের সীমিত জ্ঞানকে সামনে আনা হয়েছে। এসব বক্তব্য ধর্মীয় কাহিনির অংশ, কিন্তু অলৌকিক জ্ঞান অর্জনের স্বাধীন প্রমাণ নয়।
সূরা ইসরা ১৭:৯০–৯৩ ও সূরা আনআম ৬:১০৯–১১১-এ বিরোধীদের দৃশ্যমান অলৌকিক নিদর্শনের দাবি স্বয়ং কোরআনে সংরক্ষিত। সাফা পাহাড়কে সোনায় পরিণত করার দাবির পর রূপান্তরের ঘটনা নয়, শাস্তির আশঙ্কা হাজির হয়েছে। এমনকি ৬:১১১ আয়াতে ফেরেশতা অবতরণ ও মৃতের কথা বলার মতো নিদর্শন হাজির হলেও আল্লাহ না চাইলে বিরোধীরা বিশ্বাস করবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে প্রমাণের বাস্তব প্রদর্শনকে পাশ কাটিয়ে এক অদৃশ্য, অপরীক্ষিত অনুমানকে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরীক্ষা না করেই পরীক্ষার্থীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে ফলাফল ধরে নেওয়া নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ নয়।
বনূ নাদীরের ধর্মীয় আলোচনার প্রস্তাবের পরিণতিতে সামরিক অভিযান ও উচ্ছেদের বিবরণ পাওয়া যায়; প্রস্তাবিত নবুয়ত-পরীক্ষা সম্পন্ন করে অলৌকিক সত্যতা প্রতিষ্ঠার ঘটনা পাওয়া যায় না। বেদুঈনের বৃষ্টির আবেদনেও উদ্ধৃত কাহিনিতে অনাহারপীড়িত মানুষের প্রয়োজনের সমাধান অনুপস্থিত; এর বদলে ঈশ্বরের মর্যাদা ও আরশ নিয়ে তিরস্কার এসেছে। ঘটনাগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও প্রমাণগত সমস্যাটি অভিন্ন—যেখানে প্রকাশ্য ও নির্দিষ্ট প্রমাণ দাবি করা হয়েছিল, সেখানে যাচাইযোগ্য ফলের পরিবর্তে কাহিনি, অদৃশ্য আদেশ, সম্ভাব্য শাস্তি অথবা কর্তৃত্বমূলক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। একটি দাবিকে সত্য প্রমাণ করার জন্য দাবিটিই পুনরাবৃত্তি করা যথেষ্ট নয়।
তথ্যসূত্রঃ
- মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালিহি, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, নবুয়তের পরীক্ষা-সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ ↩︎
- মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালিহি, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৪–২০৫ ↩︎
- সূরা কাহফ ১৮:২২ ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা কাহফ ১৮:৯৬-এর তাফসির ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা কাহফ ১৮:৯৮-এর তাফসির ↩︎
- কোরআন, সূরা ইসরা ১৭:৮৫ ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ৩১৪০ ↩︎
- ইবনে আতিয়্যা, আল-মুহাররারুল ওয়াজিজ, সূরা ইসরা ১৭:৮৫-এর তাফসির ↩︎
- কোরআন, সূরা ইসরা ১৭:৯০–৯৩ ↩︎
- কোরআন, সূরা আনকাবুত ২৯:৫০–৫১ ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:১০৯-এর তাফসির ↩︎
- কোরআন, সূরা আনআম ৬:১১১; তাবারি, জামিউল বায়ান ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা আনআম ৬:১১১-এর তাফসির ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া প্রকাশনী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮১ ↩︎
- জালালুদ্দিন সুয়ুতি, আদ-দুররুল মানসুর, সূরা বাকারা ২:১৬৪-এর তাফসির ↩︎
- কোরআন, সূরা ইসরা ১৭:৫৯ ↩︎
- ইবনে কাসিরের বর্ণনার উদ্ধৃতি, ইসলাম প্রশ্নোত্তর ২৯১৩৭৯ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৮ ↩︎
- আবু দাউদ, সুনান, বনূ নাদীরের ঘটনা ↩︎
- মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালিহি, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, বনূ নাদীর অভিযান ↩︎
- আবু দাউদ, সুনান, বনূ নাদীরের ঘটনা, ইসলামওয়েব সংস্করণে ৩০০৪ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণ, হাদিস ২৯৯৪; ইসলামওয়েবের আরবি সংস্করণে ৩০০৪ ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৫ ↩︎
- সিদ্দিক হাসান খান, আদ-দিনুল খালিস, আল্লাহকে সুপারিশকারী বানানো-সংক্রান্ত পরিচ্ছেদ ↩︎

