ভূমিকা
নবুওয়াতের আগের জীবনে মুহাম্মদ তাঁর চাচা আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন—এমন বিবরণ ইসলামি জীবনী ও ইতিহাসগ্রন্থে সংরক্ষিত আছে। উম্মে হানী ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন। একই সময়ে মাখজুম গোত্রের হুবায়রাও তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। আবু তালিব মুহাম্মদের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি; মেয়ের বিয়ে দেন হুবায়রার সঙ্গে। মুহাম্মদ সেই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে চাচাকে প্রশ্ন করেন, হুবায়রার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাঁকে বাদ দেওয়া হলো কেন। এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে ব্যক্তিগত বিবাহেচ্ছা, প্রত্যাখ্যানের অসন্তোষ এবং অভিভাবকের পারিবারিক হিসাব একই সঙ্গে প্রকাশ পায়। এখানে মুহাম্মদ নিজের পছন্দের বিয়ের জন্য চাচার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল একজন যুবক; তাঁর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে কি না, তা নির্ধারিত হচ্ছে পরিবারের অন্য একজন পুরুষের নির্বাচনে [1]।
আবু তালিবের উত্তরে পুরোনো বৈবাহিক সম্পর্ক এবং তার প্রতিদান দেওয়ার কথা এসেছে। মার্টিন লিংসের বর্ণনায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হুবায়রার সম্পদ, কবিত্ব এবং মক্কার গোত্রীয় ক্ষমতার হিসাব। ফলে ঘটনাটি শুধু অপূর্ণ বিবাহেচ্ছার কাহিনি নয়; মানুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ওপর সম্পদ, সামাজিক অবস্থান ও পারিবারিক স্বার্থের কর্তৃত্বের একটি দৃষ্টান্তও। পাত্রদের ইচ্ছা এবং অভিভাবকের যুক্তি সংরক্ষিত হয়েছে, কিন্তু প্রথম প্রস্তাবের এই বিবরণে উম্মে হানীর নিজের পছন্দের বক্তব্য নেই। যাঁর বিয়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত, তাঁর কণ্ঠের এই অনুপস্থিতি এবং পুরুষ অভিভাবকের সম্পর্ক রক্ষার যুক্তি ঘটনাটির সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সামাজিক প্রশ্ন তৈরি করে।
আসমাউর রিজাল
মুফতি গোলাম রাব্বানী ভুঁইয়ার আসমাউর রিজাল গ্রন্থে উম্মে হানীর পরিচয় এবং নবুওয়াতের আগে মুহাম্মদের বিবাহপ্রস্তাবের বিবরণ রয়েছে। তাঁর পিতা আবু তালিব, মাতা ফাতেমা বিনতে আসাদ এবং মুহাম্মদের সঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাইবোনের সম্পর্ক এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল গ্রন্থের উদ্ধৃতিটি হলো [2] —
উম্মে হানী বিনতে আবু তালেব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা
নামঃ ফাখতা, বা হিন্দ।
উপনাম- উম্মে হানী। পুত্র হানীর নামানুসারে তিনি উম্মে হানী নামে প্রসিদ্ধ।
পিতার নাম- আবু তালেব।
মাতার নাম- ফাতেমা বিনতে আসাদ।
তিনি হলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো বোন এবং হযরত আলী ও জাফর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার সহোদরা বোন।
ইসলাম গ্রহণঃ মক্কা বিজয়ের সময় ৮ম হিজরীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
তাঁর ঘরে রাসুল সা. এর অবস্থানঃ মক্কা বিজয়ের সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হানীর ঘরে অবস্থান করে গোসল করেন এবং চাশতের নামাজ আদায় করেন। শিআবে আবু তালেবে বন্দী থাকাকালীন উম্মে হানীর ঘরে রাত যাপন অবস্থায় মিরাজের ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয় ।
বিবাহঃ নবুয়তের পূর্বে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন । কিন্তু তখন আবু তালেব হুবাইবা ইবনে আবু ওহাব মাখযুমীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ দেন। মক্কা বিজয়ের পর তাঁর স্বামী হুবাইবা ইসলাম গ্রহণ না করে পালিয়ে যায়। তখন পুনরায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। উম্মে হানী এই বলে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন যে, আমি এখন অনেক সন্তানের জননী হয়ে গেছি।
হাদীস বর্ণনায় তাঁর অবদানঃ তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ৪৬টি হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন। বুখারী ও মুসলিমে যৌথভাবে তাঁর বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ আছে।
মৃত্যুঃ তিনি ৫০ হিজরীর পরে ইন্তেকাল করেন।
………………………
তথ্যসূত্র- ১. সিয়ার ৩/৫৩৭, ২. উসদুল গাবা ৫/৫০১, ৩. আলইসাবা ৪/৫০৩, ৪. তাযকিরা ১/৩৮ ।

এই পরিচয় থেকে পারিবারিক নৈকট্যটি স্পষ্ট হয়। উম্মে হানী মুহাম্মদের পরিচিত পরিবারের সদস্য; তাঁর পিতা ছিলেন মুহাম্মদের নিজের চাচা। প্রস্তাবটি সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্য দিয়েই গিয়েছিল। পরিবারের নৈকট্য থাকা সত্ত্বেও আবু তালিব অন্য পাত্র নির্বাচন করেন। ব্যক্তিগত পরিচয় ও আত্মীয়তা মুহাম্মদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের নিশ্চয়তা দেয়নি। পাত্র নির্বাচন করার ক্ষমতা যাঁর হাতে ছিল, তিনি আত্মীয় যুবকের ইচ্ছার বদলে অন্য বিবাহসম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
আসহাবে রাসুলের জীবনকথা
মুহাম্মদ আবদুল মাবুদের আসহাবে রাসুলের জীবনকথা গ্রন্থে প্রথম বিবাহপ্রস্তাবের কথোপকথন আরও বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়। এখানে মুহাম্মদের প্রস্তাবের পাশাপাশি হুবায়রার প্রস্তাব, আবু তালিবের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের প্রশ্ন সংরক্ষিত হয়েছে [3] —
উম্মু হানী বিন্ত আবী তালিব (রা)
ইতিহাসে তিনি উম্মু হানী – এ ডাকনামে প্রসিদ্ধ । আসল নাম ফাতা, মতান্তরে হিন্দ। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) মুহতারাম চাচা আবূ তালিব এবং মুহতারামা চাচী ফাতিমা বিত আসাদের কন্যা। ‘আকীল, জা’ফার, তালিব ও আলীর (রা) সহোদরা(১)। তাঁর শৈশব-কৈশোর জীবনের কথা তেমন কিছু জানা যায় না। তবে বিয়ে সম্পর্কে দু’একটি বর্ণনা দেখা যায়। যেমন রাসূল (সা) নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে চাচা আবূ তালিবের নিকট উম্মু হানীর বিয়ের পয়গাম পাঠান। একই সংগে হুবায়রা ইবন ‘আমর ইবন ‘আয়িয আল-মাখযূমীও পাঠান । চাচা হুবায়রার প্রস্তাব গ্রহণ করে উম্মু হানীকে তার সাথে বিয়ে দেন। নবী (সা) বললেন : চাচা! আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হুবায়রার সাথে তার বিয়ে দিলেন? চাচা বললেন : ভাতিজা! আমরা তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করেছি। সম্মানীয়দের সমকক্ষ সম্মানীয়রাই হয়ে থাকে(২)। এতটুকু বর্ণনা। এর অতিরিক্ত কোন কথা কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় না। তবে হুবায়রা ইবন ‘আমরের সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, সে কথা বিভিন্নভাবে জানা যায়(৩)।
উম্মু হানী কখন ইসলাম গ্রহণ করেন সে ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে একটু ভিন্নতা দেখা যায়। ইমাম আয-যাহাবী বলেনঃ(৪)
تأخر اسلامها وأسلمت يوم الفتح
“তাঁর ইসলাম গ্রহণ বিলম্বে হয়। তিনি মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন।’
তবে রাসূলুল্লাহর (সা) মি’রাজ সম্পর্কিত যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায় তার মধ্যে উম্মু হানীর (রা) একটি বর্ণনাও বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যায়। তাতে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহর (সা) মি’রাজ উম্মু হানীর ঘর থেকে হয়েছিল এবং তিনি তখন একজন মুসলমান। আর এটা হিজরাতের পূর্বের ঘটনা। তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহর (সা) ইসরা’ (মক্কা থেকে বাইতুল মাকদাসে রাত্রিকালীন ভ্রমণ) আমার ঘর থেকেই হয়। সে রাতে তিনি ‘ঈশার নামায আদায় করে আমার ঘরে ঘুমান। আমরাও ঘুমিয়ে পড়ি। ফজরের অব্যবহিত পূর্বে তিনি আমাদের ঘুম থেকে জাগান। তারপর তিনি ফজরের নামায পড়েন এবং আমরাও তাঁর সাথে নামায পড়ি। তারপর তিনি বলেন : উম্মু হানী! তুমি দেখেছিলে, গতরাতে আমি এই উপত্যকায় ‘ঈশার নামায আদায় করেছিলাম। তারপর আমি বাইতুল মাকদাসে যাই এবং সেখানে নামায আদায় করি। আর এখন আমি ফজরের নামায তোমাদের সাথে…
১. সীরাতু ইবন হিশাম, ২/৪২০; আ’লাম আন-নিসা, ৪/১৪ আল-ইসতী আব, ২/৭৭২ ২. আ’লাম আন-নিসা-৪/১৪ ৩. উসুদুল গাবা- ৫/624 ৪. সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা-২/৩১

“আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হুবায়রার সাথে তার বিয়ে দিলেন?”—প্রশ্নটি নির্বাচিত না হওয়ার অসন্তোষ প্রকাশ করে। প্রস্তাব দেওয়ার পরে ঘটনাটির নিষ্পত্তি মুহাম্মদের কাছে নিছক উদাসীনতার বিষয় ছিল না; তিনি চাচার কাছে কারণ জানতে চেয়েছিলেন। এই প্রতিক্রিয়াই বিবাহেচ্ছার ব্যক্তিগত গুরুত্ব প্রকাশ করে। একই সঙ্গে কথোপকথনের দুই পক্ষই পুরুষ: একজন বিয়ে করতে চান, অন্যজন কন্যার বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করেন। উম্মে হানীকে ঘিরে সিদ্ধান্ত হলেও এই অংশে তাঁর নিজের কোনো বক্তব্য উদ্ধৃত হয়নি।
বাংলা গ্রন্থের “সম্মানীয়দের সমকক্ষ সম্মানীয়রাই হয়ে থাকে” বাক্যটির সঙ্গে মূল আরবি বিবরণের অর্থগত পার্থক্য রয়েছে। আরবিতে আবু তালিব পূর্ববর্তী বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতিদান দেওয়ার যুক্তি দিয়েছেন। মর্যাদার তুলনা এবং উদারতার প্রতিদান—দুটি আলাদা বক্তব্য। এই পার্থক্যের ওপর নির্ভর করছে প্রত্যাখ্যানের কারণ কীভাবে বোঝা হবে: মুহাম্মদকে অসম্মানীয় ঘোষণা করা হয়েছে, নাকি অন্য পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ধ্রুপদি আরবি সূত্রে প্রথম বিবাহপ্রস্তাব
ইবনে সাদের তাবাকাত
ইবনে সাদের আত-তাবাকাতুল কুবরা-তে ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত সংবাদটির প্রথম অংশে প্রস্তাব, প্রতিদ্বন্দ্বী পাত্র, বিয়ে এবং আপত্তির ধারাবাহিকতা রয়েছে। নবুওয়াত-পূর্ব ঘটনাটির প্রাসঙ্গিক অংশ নিচে দেওয়া হলো [4] —
أَخْبَرَنَا هِشَامُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ السَّائِبِ الْكَلْبِيُّ عَنْ أَبِيهِ عَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: خَطَبَ النَّبِيُّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – إِلَى أَبِي طَالِبٍ ابْنَتَهُ أُمَّ هَانِئٍ فِي الْجَاهِلِيَّةِ. وَخَطَبَهَا هُبَيْرَةُ بْنُ أَبِي وهب بن عمرو بن عائذ بن عمران بن مخزوم. فتزوجها هبيرة فقال النبي. ص: يا عم زوجت هبيرة وتركتني؟ فقال: يا ابن أَخِي إِنَّا قَدْ صَاهَرْنَا إِلَيْهِمْ وَالْكَرِيمُ يُكَافِئُ الْكَرِيمَ.
বাংলা অনুবাদ: হিশাম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আস-সায়িব আল-কালবি আমাদের জানিয়েছেন, তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি আবু সালিহের সূত্রে, তিনি ইবনে আব্বাসের সূত্রে। তিনি বলেন: জাহেলি যুগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালিবের কাছে তাঁর কন্যা উম্মে হানীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। হুবায়রা ইবনে আবি ওয়াহব ইবনে আমর ইবনে আয়িয ইবনে ইমরান ইবনে মাখজুমও তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। হুবায়রার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তখন নবী বলেন: চাচা, আপনি হুবায়রার সঙ্গে বিয়ে দিলেন, আমাকে বাদ দিলেন? তিনি বলেন: ভাতিজা, আমরা তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করেছি; উদার ব্যক্তি উদার ব্যক্তির প্রতিদান দেন।
ইবনে হাবিবের আল-মুহাব্বার
ইবনে হাবিবের আল-মুহাব্বার গ্রন্থেও একই প্রথম প্রস্তাব ও প্রত্যাখ্যানের বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে উম্মে হানীর নাম হিন্দ বলা হয়েছে এবং হুবায়রার মাখজুমি বংশপরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ঘটনার অংশটি হলো [5] —
وممن لم يتزوجها (أم هانئ) وهي هند بنت أبي طالب. وكان صلى الله عليه خطبها في الجاهلية إلى أبي طالب وخطبها هبيرة بن أبي وهب بن [عمرو بن] عائذ بن عمران بن مخزوم. فزوج هبيرة. فقال له صلى الله عليه: «يا عم! أزوجت هبيرة وتركتني؟» فقال: «يا ابن أخي! إنا قد صاهرنا إليهم والكريم يكافئ الكريم».
বাংলা অনুবাদ: যাঁদের তিনি বিয়ে করেননি, তাঁদের মধ্যে উম্মে হানীও ছিলেন; তাঁর নাম হিন্দ বিনতে আবি তালিব। জাহেলি যুগে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি আবু তালিবের কাছে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। হুবায়রা ইবনে আবি ওয়াহব ইবনে [আমর ইবনে] আয়িয ইবনে ইমরান ইবনে মাখজুমও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আবু তালিব হুবায়রার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি তাঁকে বলেন: “চাচা! আপনি হুবায়রার সঙ্গে বিয়ে দিলেন, আমাকে বাদ দিলেন?” তিনি বলেন: “ভাতিজা! আমরা তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করেছি; উদার ব্যক্তি উদার ব্যক্তির প্রতিদান দেন।”
হাকিমের মুসতাদরাক
হাকিমের আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন-এ মুহাম্মদ ইবনে উমরের নামে সংরক্ষিত বিবরণে ঘটনাটির সময় সরাসরি “ওহি আসার আগে” বলা হয়েছে। প্রথম প্রস্তাবের অংশটি হলো [6] —
حدثنا أبو عبد الله الأصبهاني ، ثنا الحسن بن الجهم ، ثنا الحسين بن الفرج ، ثنا محمد بن عمر ، قال : وفيما ذكر أن رسول الله – صلى الله عليه وآله وسلم – خطب إلى عمه أبي طالب أم هانئ قبل أن يوحى إليه ، وخطبها معه هبيرة بن أبي وهب فزوجها هبيرة ، فقال له النبي – صلى الله عليه وآله وسلم – : ” يا عم ، زوجت هبيرة وتركتني ” ، فقال : يا ابن أخي أنا صاهرت إليهم والكريم يكافئ الكريم
বাংলা অনুবাদ: আবু আবদুল্লাহ আল-আসবাহানি আমাদের বর্ণনা করেছেন; হাসান ইবনে জাহম, হুসাইন ইবনে ফারাজ এবং মুহাম্মদ ইবনে উমরের সূত্রে। তিনি বলেন: বর্ণিত আছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম ওহি আসার আগে তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে উম্মে হানীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তাঁর সঙ্গে হুবায়রা ইবনে আবি ওয়াহবও প্রস্তাব দেন। আবু তালিব হুবায়রার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন: “চাচা, আপনি হুবায়রার সঙ্গে বিয়ে দিলেন, আমাকে বাদ দিলেন।” তিনি বলেন: “ভাতিজা, আমি তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করেছি; উদার ব্যক্তি উদার ব্যক্তির প্রতিদান দেন।”
বর্ণনাগুলোর অভিন্ন কেন্দ্রে রয়েছে দুটি প্রস্তাব, হুবায়রাকে নির্বাচন, মুহাম্মদের আপত্তি এবং বৈবাহিক প্রতিদানের যুক্তি। ইবনে সাদের উদ্ধৃতিতে সংবাদটি কালবি-পরম্পরায় এসেছে; হাকিমের উদ্ধৃতিতে মুহাম্মদ ইবনে উমরের নাম রয়েছে। পরবর্তী বাংলা জীবনী ও আধুনিক ইংরেজি জীবনী এই পূর্ববর্তী সাহিত্যিক ধারার পুনর্কথন। ফলে গ্রন্থের সংখ্যা এবং স্বাধীন ঘটনার সাক্ষ্যের সংখ্যা এক নয়; একই কথোপকথনের পুনরাবৃত্তি এখানে বর্ণনাটির প্রচার ও গ্রহণের বিস্তার প্রকাশ করে।
মার্টিন লিংসের লাইফ অফ মুহাম্মদ
মার্টিন লিংসের Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources গ্রন্থের দ্বাদশ পরিচ্ছেদে মুহাম্মদের বয়স বিশ বছর পার হওয়ার পরের কর্মজীবন ও বিবাহের সম্ভাবনার আলোচনা এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় উম্মে হানীর সঙ্গে অনুরাগ এবং তাঁকে বিয়ের প্রস্তাবের বিবরণ রয়েছে। লিংস হুবায়রার সম্পদ, কবিত্ব ও মাখজুমের রাজনৈতিক অবস্থান উল্লেখ করেছেন; আবু তালিবের উত্তরের পেছনে পারিবারিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রস্তুতির ব্যাখ্যাও দিয়েছেন [7] —
Abū Ṭālib also had daughters, and one of these was already of marriageable age. Her name was Fākhitah, but later she was called Umm Hani’, and it is by that name that she is always known. A great affection had grown up between her and Muḥammad, who now asked his uncle to let him marry her. But Abū Ṭālib had other plans for his daughter: his cousin Hubayrah, the son of his mother’s brother, of the clan of Makhzūm, had likewise asked for the hand of Umm Hani’; and Hubayrah was not only a man of some substance but he was also, like Abū Ṭālib himself, a gifted poet. Moreover the power of Makhzüm in Mecca was as much on the increase as that of Hashim was on the wane; and it was to Hubayrah that Abu Talib married Umm Häni’. When his nephew mildly reproached him, he simply replied: “They have given us their daughters in marriage” – no doubt referring to his own mother “and a generous man must requite generosity.” The answer was unconvincing inasmuch as ‘Abd al-Muttalib had already more than repaid the debt in question by marrying two of his daughters, ‘Atikah and Barrah, to men of Makhzūm. Muḥammad no doubt took his uncle’s words as a courteous and kindly substitute for telling him plainly that he was not yet in a position to marry. That, at any rate, is what he now decided for himself; but unexpected circumstances were soon to induce him to change his mind.
বাংলা অনুবাদ: আবু তালিবের কন্যাও ছিল এবং তাঁদের মধ্যে একজন বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছেছিলেন। তাঁর নাম ছিল ফাখিতাহ; পরে তিনি উম্মে হানী নামে পরিচিত হন এবং এই নামেই সর্বদা পরিচিত। তাঁর ও মুহাম্মদের মধ্যে গভীর অনুরাগ গড়ে উঠেছিল। মুহাম্মদ তখন তাঁকে বিয়ে করার অনুমতি চেয়ে চাচাকে অনুরোধ করেন। কিন্তু আবু তালিব তাঁর মেয়ের জন্য অন্য পরিকল্পনা করেছিলেন: মাখজুম গোত্রের তাঁর মাতুলভাই হুবায়রা—তাঁর মায়ের ভাইয়ের পুত্র—উম্মে হানীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। হুবায়রা কেবল সচ্ছল ব্যক্তিই ছিলেন না; আবু তালিবের মতো তিনিও একজন প্রতিভাবান কবি ছিলেন। তাছাড়া মক্কায় মাখজুমের ক্ষমতা যতটা বাড়ছিল, হাশিমের ক্ষমতা ততটাই কমছিল। এই হুবায়রার সঙ্গেই আবু তালিব উম্মে হানীর বিয়ে দেন।
ভাতিজা মৃদু অনুযোগ করলে তিনি শুধু বলেন: “তারা আমাদের তাদের কন্যাদের বিয়ে দিয়েছে”—নিঃসন্দেহে নিজের মায়ের কথা উল্লেখ করে—“আর একজন উদার মানুষকে উদারতার প্রতিদান দিতে হয়।” উত্তরটি বিশ্বাসযোগ্য ছিল না; কারণ আবদুল মুত্তালিব তাঁর দুই কন্যা আতিকাহ ও বাররাহকে মাখজুমের পুরুষদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ঋণের চেয়েও বেশি প্রতিদান আগেই দিয়েছিলেন। মুহাম্মদ নিঃসন্দেহে চাচার কথাকে সরাসরি এই কথা বলার একটি সৌজন্যমূলক ও সদয় বিকল্প হিসেবে নিয়েছিলেন যে, তিনি তখনো বিয়ে করার অবস্থায় পৌঁছাননি। অন্তত তখন তিনি নিজের জন্য এই সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন; কিন্তু অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি শিগগিরই তাঁকে সিদ্ধান্ত বদলাতে উদ্বুদ্ধ করবে।

লিংস এই ঘটনাকে যৌবনের বিবাহপ্রসঙ্গে স্থাপন করেছেন। তাঁর পরিচ্ছেদের শুরুতে বিশ বছর পার হওয়ার কথা থাকায় এই বিবরণকে “শিশু মুহাম্মদের প্রেম” হিসেবে চিহ্নিত করলে সময়কাল বদলে যায়। একইভাবে নবুওয়াত-পূর্ব হওয়া এবং শৈশবে ঘটা সমার্থক নয়। এখানে সুনির্দিষ্ট বছর বা উম্মে হানীর বয়স দেওয়া হয়নি; পাওয়া যাচ্ছে বিবাহযোগ্য একজন নারী, যুবক মুহাম্মদের প্রস্তাব এবং তাঁর প্রথম বিবাহের আগের জীবনের ধারাবাহিকতা। এই সময়নির্দেশে ঘটনাটির কেন্দ্র হলো যৌবনের বিবাহেচ্ছা ও প্রত্যাখ্যান।
লিংসের বর্ণনায় দুটি স্তর রয়েছে। প্রস্তাব ও আবু তালিবের উত্তরের সঙ্গে তিনি ইবনে সাদের সূত্র যুক্ত করেছেন; সচ্ছলতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং চাচার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে নিজের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তাঁর “মুহাম্মদ নিঃসন্দেহে” কথাটি মুহাম্মদের নিজের কোনো সংরক্ষিত স্বীকারোক্তি নয়, জীবনীকারের ব্যাখ্যা। সেই ব্যাখ্যায় আর্থিক প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ: একই পরিবারের পরিচিত যুবক হওয়া সত্ত্বেও পাত্র হিসেবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য মুহাম্মদের অবস্থান যথেষ্ট ছিল না বলে লিংস বুঝেছেন। ব্যক্তিগত অনুরাগের ওপর অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রভাব নিয়ে তাঁর পাঠের ভিত্তি সেখানেই।
সম্পদ, গোত্রীয় স্বার্থ ও পাত্র নির্বাচনের ক্ষমতা
লিংস হুবায়রার তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে এনেছেন: তিনি সচ্ছল, কবি এবং প্রভাবশালী মাখজুম গোত্রের সদস্য। আবু তালিবের নিজের কবিত্বের সঙ্গে হুবায়রার মিলও তিনি উল্লেখ করেছেন। ফলে এই চিত্রে পাত্রের গ্রহণযোগ্যতা কেবল নারী-পুরুষের পারস্পরিক অনুরাগে নির্ধারিত হচ্ছে না; সম্পদ, ব্যক্তিগত সামাজিক পরিচিতি এবং বৃহত্তর গোত্রের অবস্থানও কার্যকর। মুহাম্মদ ও উম্মে হানীর মধ্যে অনুরাগের কথা বলার পরেই জীবনীকার এই সুবিধাগুলো সাজিয়েছেন। তাঁর বর্ণনাকাঠামোয় হুবায়রাকে নির্বাচন একটি পারিবারিক ও সামাজিক হিসাবের ফল হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
দুই প্রস্তাবের ফলাফলে ক্ষমতার অসমতা স্পষ্ট। মুহাম্মদ নিজের ইচ্ছা জানানোর সুযোগ পেয়েছেন; সেই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। আবু তালিবকে রাজি করানোই ছিল বিয়ের পথ। হুবায়রার প্রস্তাব গ্রহণের পরে এই পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং মুহাম্মদ প্রশ্ন তোলেন। এখানে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়া কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি করেনি। পরিবারের অভিভাবক কাকে নিজের সম্পর্কের জন্য বেশি উপযোগী মনে করছেন, সেই বিচার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার পরিণতি নির্ধারণ করেছে। মানুষের অন্তরঙ্গ জীবনের ওপর সামাজিক ক্ষমতা এভাবেই কার্যকর হয়: প্রত্যাশা একজনের, অনুমোদন অন্যজনের হাতে।
লিংস আবু তালিবের প্রতিদানের যুক্তিকে অবিশ্বাস্য বলেছেন, কারণ তাঁর বর্ণনায় আবদুল মুত্তালিব আগেই দুই কন্যার বিয়ের মাধ্যমে মাখজুমের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতিদান দিয়েছিলেন। এই আপত্তির সঙ্গে তিনি মুহাম্মদের বিয়ের আর্থিক প্রস্তুতির ব্যাখ্যা যুক্ত করেছেন। ফলে চাচার প্রকাশ্য কারণ এবং জীবনীকারের ব্যাখ্যা একই নয়। প্রকাশ্য কথায় সম্পর্কের ঋণ; ব্যাখ্যায় অর্থনৈতিক অপ্রস্তুতি। দুই ক্ষেত্রেই একজন যুবকের পছন্দের বিয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে এমন মানদণ্ডে, যার নিয়ন্ত্রণ তাঁর নিজের হাতে নেই। সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য মানুষের সম্পর্ককে ছেঁকে নেওয়ার উপকরণ হয়ে উঠেছে।
উম্মে হানীর নিজের পছন্দ কোথায়
প্রথম প্রস্তাবের কথোপকথনে মুহাম্মদ প্রস্তাব দেন, হুবায়রা প্রস্তাব দেন, আবু তালিব হুবায়রাকে নির্বাচন করেন এবং মুহাম্মদ সেই নির্বাচনে আপত্তি জানান। উম্মে হানী এই সব কাজের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি, অথচ সিদ্ধান্তের বর্ণনায় তাঁর নিজের বক্তব্য অনুপস্থিত। তিনি কাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, দুটি প্রস্তাব সম্পর্কে কী বলেছিলেন অথবা পিতার সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা কতটুকু ছিল—এই প্রথম ঘটনার বিবরণে সেসব জানা যায় না। বর্ণনার এই বিন্যাসে নারীর বৈবাহিক ভবিষ্যৎ পুরুষদের ইচ্ছা ও পারিবারিক সম্পর্কের ভাষায় সংরক্ষিত হয়েছে।
লিংস পারস্পরিক অনুরাগের কথা বলেছেন; তবু তাঁর বর্ণনাতেও বিয়ের নিষ্পত্তি ঘটান আবু তালিব। অনুরাগ এবং বিয়ের সিদ্ধান্তের মধ্যে ক্ষমতার একটি দরজা রয়েছে, যার চাবি অভিভাবকের কাছে। পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার যুক্তিতে সেই দরজা বন্ধ হলে ব্যক্তিগত পছন্দ কার্যকর থাকে না। স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে নারীর নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এই বর্ণনার দৃশ্যমান সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় স্থান পায়নি। পাত্রদের মর্যাদা ও পরিবারের প্রতিদানের ভাষা যত বিস্তারিত, যাঁর বিয়ে তাঁর পছন্দের ভাষা ততটাই অনুপস্থিত। এই বৈষম্যই ব্যক্তিকে পারিবারিক স্বার্থের বাহন হিসেবে দেখার গভীর সমস্যাটি উন্মোচন করে।
প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়া ও অপূর্ণ বিবাহেচ্ছা
ইবনে হাজার আল-ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা-তে প্রথম ঘটনার বর্ণনায় “ফাআতাবাহু” শব্দটি ব্যবহার করেছেন—অর্থাৎ মুহাম্মদ আবু তালিবকে অনুযোগ বা ভর্ৎসনা করেছিলেন। এটি সিদ্ধান্তের পর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ার স্পষ্ট ভাষা। প্রথম প্রস্তাবের অংশটি হলো [8] —
فذكر بن الكلبي عن أبيه عن أبي صالح عن بن عباس قال خطب النبي صلى الله عليه وسلم إلى أبي طالب أم هانئ وخطبها منه هبيرة فزوج هبيرة فعاتبه النبي صلى الله عليه وسلم فقال أبو طالب يا بن أخي إنا قد صاهرنا إليهم والكريم يكافىء الكريم
বাংলা অনুবাদ: ইবনুল কালবি তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি আবু সালিহের সূত্রে, তিনি ইবনে আব্বাসের সূত্রে উল্লেখ করেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালিবের কাছে উম্মে হানীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। হুবায়রাও তাঁর কাছে প্রস্তাব দেন। তিনি হুবায়রার সঙ্গে বিয়ে দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অনুযোগ করেন। আবু তালিব বলেন: ভাতিজা, আমরা তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করেছি; উদার ব্যক্তি উদার ব্যক্তির প্রতিদান দেন।
এই অনুযোগের মধ্যে প্রত্যাশা ব্যর্থ হওয়ার ব্যক্তিগত আঘাত রয়েছে। মুহাম্মদ এমন একজনের কাছে প্রশ্ন করছেন, যিনি একই সঙ্গে তাঁর চাচা এবং প্রস্তাবিত কনের পিতা। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রত্যাখ্যানকে তাঁর কাছে প্রশ্নহীন করে তোলেনি; তিনি নিজের বাদ পড়ার কারণ জানতে চেয়েছেন। কথোপকথনটি তাই একদিকে বিবাহেচ্ছার গুরুত্ব, অন্যদিকে পারিবারিক ক্ষমতার সীমা প্রকাশ করে। চাচার সঙ্গে নৈকট্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর নির্বাচনের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের তাৎক্ষণিক ক্ষমতা ছিল আপত্তি জানানোর মধ্যে সীমিত; বিয়ের ফলাফল হয়ে গেছে অন্য পাত্রের পক্ষে।
বিবরণগুলোর তুলনামূলক চিত্র
প্রথম বিবাহপ্রস্তাবের মূল ঘটনাক্রম বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যার পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ: বাংলা জীবনীতে সমকক্ষতার ভাষা এসেছে, মূল আরবি বিবরণে প্রতিদানের ভাষা, আর লিংসের রচনায় এর সঙ্গে সম্পদ ও ক্ষমতার ব্যাখ্যা যুক্ত হয়েছে।
| উৎস | প্রথম প্রস্তাবের বিবরণ | বিশেষ বক্তব্য বা ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| আসমাউর রিজাল | নবুওয়াতের আগে প্রস্তাব; আবু তালিব অন্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেন | পরিচয় ও প্রস্তাবের সংক্ষিপ্ত বিবরণ; মূল মুদ্রিত উদ্ধৃতি সংরক্ষিত |
| আসহাবে রাসুলের জীবনকথা | দুটি প্রস্তাব, হুবায়রাকে নির্বাচন, মুহাম্মদের প্রশ্ন | আরবি প্রতিদানের বাক্যটি বাংলায় সমকক্ষতার ভাষায় অনূদিত হয়েছে |
| ইবনে সাদের তাবাকাত | ইবনে আব্বাসের নামে কালবি-পরম্পরায় প্রথম ঘটনার বর্ণনা | বৈবাহিক সম্পর্ক এবং উদারতার প্রতিদানের যুক্তি |
| ইবনে হাবিবের আল-মুহাব্বার | উম্মে হানীর পরিচয়, দুই পাত্র এবং চাচার উত্তর | একই বিবাহপ্রস্তাবের ঘটনাক্রমের আরেকটি সংরক্ষিত পাঠ |
| হাকিমের মুসতাদরাক | ওহি আসার আগে প্রস্তাব, হুবায়রার সঙ্গে বিয়ে, মুহাম্মদের আপত্তি | মুহাম্মদ ইবনে উমরের নামে সংবাদ; প্রতিদানের একই যুক্তি |
| ইবনে হাজারের আল-ইসাবা | প্রথম প্রস্তাব ও হুবায়রাকে নির্বাচন | মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া বোঝাতে অনুযোগের শব্দ ব্যবহার |
| মার্টিন লিংস | বিশ বছর পার হওয়ার পরের বিবাহপ্রসঙ্গে ঘটনাটি স্থাপন | অনুরাগ, হুবায়রার সচ্ছলতা, গোত্রীয় ক্ষমতা ও আর্থিক প্রস্তুতির ব্যাখ্যা |
উপসংহার
উম্মে হানীকে বিয়ের প্রথম প্রস্তাবের বিবরণে মুহাম্মদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, হুবায়রার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রস্তাব এবং আবু তালিবের নির্বাচনের মধ্যে সংঘাত স্পষ্ট। মুহাম্মদ বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, চাচা অন্য পাত্রকে বেছে নিয়েছিলেন, এবং মুহাম্মদ নিজের বাদ পড়ার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। চাচার উত্তরে পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিদানের যুক্তি রয়েছে। লিংসের ব্যাখ্যায় তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সম্পদ, গোত্রীয় প্রভাব ও বিয়ের অর্থনৈতিক প্রস্তুতি। ব্যক্তিগত অনুরাগের ওপর পরিবার ও সামাজিক অবস্থানের কর্তৃত্ব এই ঘটনাক্রমের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য।
এই ব্যবস্থায় প্রস্তাবকারী পুরুষের আকাঙ্ক্ষাও অভিভাবকের অনুমোদনের অধীন, আর নারীর নিজের পছন্দ সিদ্ধান্তের সংরক্ষিত কথোপকথনে অনুপস্থিত। একটি পরিবারের সম্পর্কের প্রতিদান দেওয়া হচ্ছে অন্য একজনের বৈবাহিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। মানুষের অন্তরঙ্গ জীবনকে সম্পদ, মর্যাদা ও পারিবারিক পাওনা-দেনার অধীন করার নৈতিক সমস্যাটি সেখানেই। উম্মে হানীর সঙ্গে মুহাম্মদের অপূর্ণ বিবাহেচ্ছার বিবরণ একই সঙ্গে সেই সামাজিক ক্ষমতার দৃশ্যও: ব্যক্তির পছন্দের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে অভিভাবকের নির্বাচন এবং পরিবারের সম্পর্ক রক্ষার হিসাব।
তথ্যসূত্রঃ
- উম্মে হানী- মুহাম্মদের গোপন প্রণয় ↩︎
- আসমাউর রিজাল, মুফতি গোলাম রাব্বানী ভুঁইয়া, প্রকাশকঃ জনাব লোকমান হোসাইন, পৃষ্ঠা ৫১, ৫২ ↩︎
- আসহাবে রাসুলের জীবনকথা, মহিলা সাহাবী, মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৮ ↩︎
- ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, উম্মে হানীর জীবনী; দার সাদির সংস্করণ, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৫১–১৫২ ↩︎
- ইবনে হাবিব, আল-মুহাব্বার, পৃষ্ঠা ৯৭–৯৮; শামেলা-প্রস্তুত পাঠের অনুলিপি ↩︎
- হাকিম, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, ইসলামওয়েবের নম্বর ৬৯৫৬; অন্য সংস্করণে খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৩ ↩︎
- MUHAMMAD his life based on the earliest sources, Martin lings, Page 33 ↩︎
- ইবনে হাজার, আল-ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা, উম্মে হানীর জীবনী; এই সংস্করণে খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৮৭; শামেলা-প্রস্তুত পাঠের অনুলিপি ↩︎
