জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

আল্লাহ বা ঈশ্বরের সর্বজ্ঞানী সর্বদ্রষ্টা হওয়ার দার্শনিক ও যৌক্তিক সমস্যা

প্রকাশিত: জুন 12, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন33 মিনিট পড়া

ভূমিকা

“ঈশ্বর সর্বজ্ঞ”—এই ঘোষণা প্রায় সকল একেশ্বরবাদী ধর্মে, বিশেষ করে ইসলামে, একটি মৌলিক বিশ্বাস। কোরআন আল্লাহকে পরিচিত করায় ‘আল-আলিম’ (সর্বজ্ঞ), যিনি সকল দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সকল জ্ঞানের অধিকারী। অর্থাৎ, তার জ্ঞান সীমাহীন এবং সময় ও স্থান থেকে মুক্ত। আল্লাহর জ্ঞানকে এমন এক অবস্থা হিসেবে ধরা হয় যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সকল বিষয়বস্তু জুড়ে বিস্তৃত।

কিন্তু যদি এই সর্বজ্ঞানের ধারণা বিচার করা হয় দার্শনিক অর্থে, বিশেষ করে ‘অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান’ (experiential knowledge) বা ‘প্রত্যক্ষজ্ঞান’ (knowledge by experience) এর আলোকে, তাহলে আমরা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হই। অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান বলতে আমরা বোঝাই কোনো ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করা, কোনো অনুভূতি বা বেদনা সরাসরি উপলব্ধি করা। উদাহরণস্বরূপ,

১
সন্তানহারা মায়ের শোক ও যন্ত্রণা

সন্তান হারানো মায়ের অন্তরাত্মার এই তীব্র যন্ত্রণা কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি অস্তিত্বের এক গভীর সংকট। এই পর্যায়ের শোক যখন কোনো প্রতিকার বা কারণ ছাড়াই ঘটে, তখন তা প্রকৃতির এক চরম নিষ্ঠুরতা ও উদাসীনতাকে ফুটিয়ে তোলে। মনোবিজ্ঞানী এলিজাবেথ কুবলার-রস শোকের যে পর্যায়গুলো বর্ণনা করেছেন, সেখানে সন্তান হারানোকে মানুষের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণার স্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২
ধর্ষিত শিশুর একাকীত্ব ও আতঙ্ক

একটি শিশুর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা তার শৈশবকে কেবল ধ্বংস করে না, বরং তাকে এক অনন্ত আতঙ্ক ও একাকীত্বের অন্ধকারে নিক্ষেপ করে। এই নিরপরাধ সত্তার আর্তনাদ যখন কোনো দৈব বা প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয় না, তখন তা মহাবিশ্বের নৈতিক শৃঙ্খলা বা ‘জাস্ট ওয়ার্ল্ড’ হাইপোথিসিসকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ট্রমা স্টাডিজ অনুযায়ী, শৈশবের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ব্যক্তির স্নায়বিক বিকাশ এবং সামাজিক বিশ্বাসের ভিত্তি চিরতরে তছনছ করে দিতে পারে।

৩
ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ ও কষ্ট

ক্ষুধার্ত মানুষের তীব্র আর্তনাদ ও হাহাকার পৃথিবীর অন্যতম নগ্ন সত্য। যখন প্রাচুর্যের বিপরীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্রেফ খাবারের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করে, তখন তা সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব এবং প্রাকৃতিক সংস্থানের নিষ্ঠুর সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে। এই কষ্ট কোনো আধ্যাত্মিক পরীক্ষার অংশ হতে পারে না, বরং এটি একটি গভীর মানবিক ও জৈবিক সংকট। সমাজবিজ্ঞানী জঁ জিয়েগলার ক্ষুধার্ত মানুষের এই মৃত্যুকে ‘নীরব গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা মূলত অবকাঠামোগত ব্যর্থতার ফল।


এই মানবিক অভিজ্ঞতাগুলো কেবল ‘জ্ঞাত’ (known) নয়, বরং ‘অনুভূত’ (felt) ও ‘অভিজ্ঞত’ (experienced)। অর্থাৎ এই মানবিক অভিজ্ঞতাগুলো সম্পর্কে জানাশোনা এগুলো সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান দান করে না। এগুলো সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হলে এই সব অভিজ্ঞতাকে ‘অনুভূত’ (felt) ও ‘অভিজ্ঞত’ (experienced) করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল্লাহ কি এই সকল অভিজ্ঞতাকে শুধুমাত্র ধারণা হিসেবে জানেন, নাকি তিনি সেগুলোকে অনুভবও করতে পারেন? যদি তিনি কেবল ‘জ্ঞাত’ হন, অর্থাৎ তথ্যের স্তরে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তবে কি তিনি সত্যিকার অর্থে সর্বজ্ঞ? ‘সর্বজ্ঞ’ শব্দটি তো আমাদের ধারণা দেয় যে তিনি শুধু তথ্য জানেন না, বরং মানুষের জীবন ও মানসিকতায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রাখেন। যদি মানুষের অনুভূতির সূক্ষ্মতা, বেদনা, প্রেম, ভালোবাসা, শোক, আতঙ্ক—এসব তার কাছে কেবলই তাত্ত্বিক জ্ঞান হয়, তাহলে কি তিনি প্রকৃত সর্বজ্ঞ?

এই দ্বন্দ্ব আমাদের সামনে একটি মৌলিক সমস্যা তুলে ধরে: সর্বজ্ঞতার অর্থ কী? শুধুমাত্র তথ্যগত জ্ঞান, নাকি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্তি? এবং যদি সর্বজ্ঞতা অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে কি ঈশ্বরের ঐ অভিজ্ঞতা মানব অভিজ্ঞতার অনুরূপ হতে পারে? এই প্রশ্নগুলো ইসলামিক ঈশ্বরতত্ত্বের ভিত্তিতে আমাদেরকে চিন্তা করতে বাধ্য করে যে, আল্লাহর সর্বজ্ঞতা কি শুধু একটি অন্ধবিশ্বাসীদের যুক্তিহীন ধর্মীয় দাবী, নাকি তা মানব জীবনের অভিজ্ঞতাগত গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত? এই লেখায় আমরা বিশ্লেষণ করবো কিভাবে ইসলামের আল্লাহর ধারণা এই অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এবং কেন এই দ্বন্দ্ব ঈশ্বরতত্ত্বে এক মৌলিক সমস্যা সৃষ্টি করে।


সর্বজ্ঞ কাকে বলে, এর অর্থ কী

‘সর্বজ্ঞ’ শব্দটি অনেক সময়েই আমরা ব্যবহার করি অত্যন্ত অবলীলায়, বিশেষত ঈশ্বরবিষয়ক আলোচনায়। কিন্তু দর্শন এবং যুক্তিবিদ্যার পরিভাষায় ‘সর্বজ্ঞ’ (omniscient) সত্তার ধারণা একটি জটিল ও গভীর বিষয়। এখানে ‘জ্ঞান’ বলতে কেবল কিছু তথ্য জানা বোঝায় না; বরং এর ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন স্তরের ও প্রকৃতির জ্ঞান। ‘সর্বজ্ঞ’ সত্তা বলতে বোঝানো হয় এমন একজন, যিনি সকল সত্য—অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সম্পর্কে নিখুঁত ও পরিপূর্ণভাবে অবগত [1]। এই জ্ঞানের পরিধি কেবল বাহ্যিক ঘটনার তথ্য নয়, বরং প্রত্যেক জীবের মনের অন্তর্জালে যে অনুভব, আবেগ, যন্ত্রণা বা আনন্দ প্রবাহিত হচ্ছে—তাও এতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, ঈশ্বর যদি সত্যিকার অর্থে ‘সর্বজ্ঞ’ হন, তবে তিনি শুধু জানেন না যে কেউ কষ্টে আছে, বরং সেই কষ্টটি কেমন লাগে, তা-ও তিনি অনুভব করেন [2]। যদি অনুভব না করেন, তবে তা কেবল তথ্যগত সর্বজ্ঞতা—যা দর্শনের দৃষ্টিতে খণ্ডিত। তাই ‘সর্বজ্ঞ’ শব্দটির অর্থ হতে হবে এমন এক পরিপূর্ণ জানার ক্ষমতা, যা অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং বাস্তবতার প্রতিটি সূক্ষ্ম স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত।


যৌক্তিক জ্ঞান বনাম উপলব্ধিগত জ্ঞান

এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা জ্ঞানকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি—প্রস্তাবনামূলক জ্ঞান (propositional knowledge) এবং অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান (experiential knowledge) [3]।

প্রস্তাবনামূলক জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান যা যুক্তি, উপাত্ত এবং তত্ত্বের মাধ্যমে অর্জিত হয়, যার জন্য সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। যেমন, “বরফ ঠাণ্ডা” এটি একটি তথ্যগত সত্য। ধরা যাক, আমাদের কাছে দুটি পাত্র আছে এবং প্রতিটিতে দুটি করে আপেল আছে। আমরা যদি পাত্র দুটির আপেলগুলো যোগ করি, তবে গাণিতিক নিয়ম অনুযায়ী মোট চারটি আপেল পাবো। এই একই যৌক্তিক কাঠামো ব্যবহার করে আমরা বলতে পারি যে, দুটি পাত্রে দুটি করে কমলা থাকলেও মোট চারটি কমলাই হবে—এর জন্য আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কমলা দেখার বা পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। এটি একটি বস্তুনিষ্ঠ এবং যৌক্তিক অনুমান যা নিছক আবেগের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং গাণিতিক ধ্রুবকের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

অন্যদিকে, অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান (experiential knowledge) বা ‘কোয়ালিয়া’ (Qualia) হলো সরাসরি কোনো বিষয় বা অনুভূতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান [3]।বরফ স্পর্শ করার মাধ্যমে যে শীতলতার অনুভূতি মস্তিষ্কে তৈরি হয়, তা কেবল বর্ণনার মাধ্যমে অর্জন করা অসম্ভব। যিনি জন্ম থেকে শীতলতার অনুভূতির সাথে পরিচিত নন, তাকে হাজারো তত্ত্ব দিয়েও সেই অনুভূতির প্রকৃত স্বাদ বোঝানো সম্ভব নয়।

এই উপলব্ধিগত বা অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান কীভাবে প্রাণীর মধ্যে তৈরি হয়, তা বুঝতে হলে আমাদের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ কোষীয় কাঠামো সম্পর্কে জানতে হবে, যাকে বলা হয় ‘মিরর নিউরন’ (Mirror Neurons)। মিরর নিউরন হলো এমন এক ধরনের মস্তিষ্ক-কোষ যা কোনো প্রাণী নিজে যখন কোনো কাজ করে তখন যেমন সক্রিয় হয়, ঠিক একইভাবে অন্য কাউকে সেই একই কাজ করতে দেখলেও সক্রিয় হয়ে ওঠে [4]। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইতালির পারমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বানরের মস্তিষ্কে প্রথম এই নিউরনের অস্তিত্ব খুঁজে পান। তারা দেখেন যে, একটি বানর যখন কোনো ফল হাতে নেয়, তখন তার মস্তিষ্কের যে অংশটি সক্রিয় হয়, অন্য একটি বানরকে ফলটি নিতে দেখলেও তার মস্তিষ্কের ঠিক সেই একই অংশটি একইভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

মানুষ এবং অন্যান্য উচ্চতর সামাজিক প্রাণীর ক্ষেত্রে এই মিরর নিউরনগুলো ‘এম্প্যাথি’ বা সহমর্মিতা তৈরির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে। যখন আমরা কাউকে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখি, আমাদের মস্তিষ্কের মিরর নিউরনগুলো সেই যন্ত্রণার দৃশ্যটিকে আমাদের নিজেদের স্নায়ুতন্ত্রে ‘সিমুলেট’ বা অনুকরণ করে [5]। এর ফলে আমরা অন্যের কষ্ট দেখে নিজেরাও এক ধরনের অস্বস্তি বা ব্যথা বা মূল ব্যথার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ অনুভব করি। এটি কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয় নয়, বরং বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার জন্য প্রাণীর ভেতরে গড়ে ওঠা একটি জৈবিক মেকানিজম। এই মিরর নিউরনের কারণেই আমরা সিনেমায় কোনো বিয়োগান্তক দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেলি বা অন্যকে আঘাত পেতে দেখে শিউরে উঠি। প্রাণিজগতে টিকে থাকার জন্য একে অপরের অবস্থা বুঝতে পারা এবং অন্যের অনুভূতির ভাগ নেওয়া অপরিহার্য ছিল, যা এই নিউরনগুলোর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।

সুতরাং, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কেবল সেই মা-ই প্রকৃত অর্থে বুঝতে পারেন যার মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। অন্যের কষ্ট দেখে আমাদের মিরর নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে একটি ধারণা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার সামগ্রিকতা বা কোয়ালিয়া কেবল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না হলে সেই জ্ঞানটি খণ্ডিত, কোনভাবেই পরিপূর্ণ জ্ঞান নয়। পরিপূর্ণ জ্ঞান হতে হলে অবশ্যই সেই মা যেই কষ্ট অনুভব করেছেন, তা হুবুহু ঈশ্বরেরও বোধ করতে হবে।

এখন এই বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট থেকে একটি গভীর মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: যদি কোনো সত্তা (যেমন সৃষ্টিকর্তা) জৈবিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ না হন এবং তার যদি কোনো স্নায়বিক কাঠামো বা মিরর নিউরন না থাকে, তবে তিনি কি মানুষের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার প্রকৃত ‘অনুভূতি’ অনুধাবন করতে সক্ষম? আল্লাহ যদি নিজে কোনো মানবিক দুঃখ, ক্ষুধা, যৌন আকাঙ্ক্ষা বা মৃত্যুর ভয়ে ভীত হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না যান, তবে কি তার পক্ষে সেই অনুভূতিগুলো বাস্তব অর্থে জানা সম্ভব? যদি তিনি কেবল তথ্যগতভাবে জানেন যে “মানুষ কষ্ট পাচ্ছে”, তবে তা হবে প্রস্তাবনামূলক জ্ঞান; কিন্তু সেই কষ্টের ‘স্বাদ’ বা ‘অনুভূতি’ (Qualia) জৈবিক অভিজ্ঞতা ছাড়া অর্জন করা কি যৌক্তিকভাবে সম্ভব? যদি তিনি নিজেই সেই অনুভূতি বোধ না করেন, তবে তাকে কি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বা সর্বজ্ঞানী বলা চলে?


প্রথম-পুরুষ জ্ঞানের সংকট: নরম্যান ক্রেটজম্যানের সর্বজ্ঞতাবিরোধী যুক্তি

সর্বজ্ঞতার ধারণার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন নরম্যান ক্রেটজম্যান (Norman Kretzmann)। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত তাঁর Omniscience and Immutability গবেষণায় তিনি দেখান, একজন ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং অন্য কোনো ব্যক্তির তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান এক নয়। দর্শনে এই বিশেষ জ্ঞানকে বলা হয় Knowledge de se বা প্রথম-পুরুষ আত্মসম্পর্কিত জ্ঞান। এটি কেবল কোনো ব্যক্তির পরিচয়, অবস্থান বা মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য জানার বিষয় নয়; বরং ব্যক্তি নিজেই যে সেই অভিজ্ঞতার অধিকারী, সেই অবস্থান থেকে নিজেকে জানার বিষয়। ক্রেটজম্যানের যুক্তি অনুসারে, মানুষের এই একান্ত প্রথম-পুরুষ জ্ঞান সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের ধারণার জন্য একটি মৌলিক সমস্যা সৃষ্টি করে। [6] [7]

He held that each of us possesses special “first-person” knowledge, knowledge not available to anyone else.

বাংলা অনুবাদ: তাঁর মতে, আমাদের প্রত্যেকের এমন বিশেষ প্রথম-পুরুষ জ্ঞান রয়েছে, যা অন্য কারও কাছে একইভাবে উপলব্ধ নয়।

ক্রেটজম্যান তাঁর যুক্তি ব্যাখ্যা করতে হাসপাতালে ভর্তি একজন ব্যক্তির উদাহরণ দেন। ধরা যাক, জোনস নামের একজন ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স কিংবা অন্য কোনো পর্যবেক্ষক নিখুঁতভাবে জানতে পারেন যে জোনস হাসপাতালে আছেন। তাঁরা তাঁর শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা, অবস্থান এবং অসুস্থতার সমস্ত তথ্য জানতে পারেন। কিন্তু জোনসের নিজের জ্ঞানটি হলো, “আমি হাসপাতালে আছি।” এই বক্তব্যে কেবল জোনসের অবস্থানের তথ্য নেই; রয়েছে নিজের পরিচয় সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ সচেতনতা। কেউ জোনসের সম্পর্কে সমস্ত তথ্য জানলেও জোনসের নিজের প্রথম-পুরুষ অবস্থান থেকে নিজেকে জানছেন না। ক্রেটজম্যানের যুক্তির কেন্দ্রীয় সমস্যা এখানেই: একজন ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে যে বিশেষ জ্ঞান ধারণ করেন, সম্পূর্ণ পৃথক আরেকটি সত্তা কীভাবে সেই একই প্রথম-পুরুষ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেন?

এই যুক্তি আল্লাহর সর্বজ্ঞতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে সমস্যাটি আরও তীব্র হয়। একজন সন্তানহারা মা জানেন, “আমি আমার সন্তান হারিয়েছি; আমার বুকের ভেতরে এই অসহ্য শোক হচ্ছে।” আল্লাহ যদি সমস্ত সত্য জানেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই জানবেন যে ওই নারী সন্তান হারিয়েছেন, তিনি শোকাহত এবং তাঁর মনে বিশেষ ধরনের যন্ত্রণা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মায়ের নিজের প্রথম-পুরুষ জ্ঞান হলো তাঁর নিজের অস্তিত্বের অবস্থান থেকে সেই শোক উপলব্ধি করা। আল্লাহ ওই মায়ের থেকে স্বতন্ত্র একটি সত্তা হলে, তাঁর কাছে মায়ের অভিজ্ঞতার সমস্ত তথ্য উপস্থিত থাকা এবং সেই মায়ের নিজের প্রথম-পুরুষ জ্ঞান উপস্থিত থাকা এক বিষয় নয়। আল্লাহ জানেন যে মা কষ্ট পাচ্ছেন—এই বক্তব্য থেকে আল্লাহ নিজেও মায়ের অবস্থান থেকে সেই কষ্ট অনুভব করছেন, এমন সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না।

একই সমস্যা ক্ষুধা, মৃত্যুভয়, শারীরিক যন্ত্রণা, যৌনানন্দ, অপমান এবং আতঙ্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন নির্যাতিত ব্যক্তি শুধু জানেন না যে তাঁর শরীরে আঘাত করা হচ্ছে; তিনি নিজের শরীরের ভেতর থেকে সেই আঘাতের যন্ত্রণা অনুভব করেন। তাঁর অভিজ্ঞতার এই প্রথম-পুরুষ চরিত্রটি বাইরের পর্যবেক্ষকের তৃতীয়-পুরুষ বর্ণনার সমার্থক নয়। একজন সর্বজ্ঞ সত্তা যদি এই সমস্ত অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান দাবি করেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, তিনি কি প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তির নিজস্ব প্রথম-পুরুষ জ্ঞানও ধারণ করেন? যদি ধারণ না করেন, তাহলে অন্যদের কাছে উপস্থিত এক বিশেষ ধরনের জ্ঞান তাঁর কাছে অনুপস্থিত। আর যদি ধারণ করেন, তাহলে অসংখ্য পৃথক ব্যক্তির স্বতন্ত্র প্রথম-পুরুষ চেতনা কীভাবে একই ঈশ্বরীয় চেতনায় উপস্থিত থাকে, তার একটি সুসংগত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

ক্রেটজম্যানের যুক্তি অনুসারে, আল্লাহর সর্বজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর প্রত্যেক মানুষের থেকে স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা হওয়ার দাবির সংঘাত তৈরি হয়। যদি সমস্ত জ্ঞান বলতে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব প্রথম-পুরুষ জ্ঞানও বোঝায়, তাহলে আল্লাহকে শুধু জোনস সম্পর্কে জানতে হবে না, জোনসের নিজের অবস্থান থেকেও জানতে হবে। একইভাবে তাঁকে প্রত্যেক সন্তানহারা মা, প্রত্যেক নির্যাতিত শিশু এবং প্রত্যেক মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত মানুষের প্রথম-পুরুষ অভিজ্ঞতার অধিকারী হতে হবে। সমস্ত মানুষের সম্পর্কে সব তথ্য জানা এবং সমস্ত মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ধারণ করা এক নয়। সর্বজ্ঞতার দাবিতে এই দুই অবস্থাকে অভিন্ন ধরে নেওয়া হলে প্রথম-পুরুষ চেতনার মৌলিক পার্থক্যটি অস্বীকার করা হয়।


ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বে আল্লাহর ধারণা

ইসলামে আল্লাহ হলেন অতুলনীয়—“لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ” (তার মতো কোনো কিছুও নেই) [8]। তিনি আদি ও অনন্ত, সময় ও স্থান থেকে মুক্ত, এবং সমস্ত জ্ঞান ও বোধের অধিকারী। কোরআনের বর্ণনায় আল্লাহ সবকিছু জানেন, মস্তিষ্কের গভীরতম কোণ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের তথ্য সম্পর্কে তার অবগতির অভাব নেই। মানব মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিসহ সমস্ত বিষয় তিনি জানেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উপলব্ধি ছাড়া সেই জানার প্রকৃতি কেমন?

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, আল্লাহর পক্ষে কোনো শারীরিক বা মানসিক মানবিক যন্ত্রণা ভোগ করা সম্ভব নয়। কারণ ঈশ্বর সর্বোচ্চ, পূর্ণতায় অঙ্গীভূত এবং সীমাবদ্ধতার বাইরে। তিনি সময় ও স্থানের ঊর্ধ্বে, সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ।

এখন ভাবুন, একটি শিশুর পেটে প্রচণ্ড ব্যাথা হচ্ছে। এই ব্যাথার তীব্রতা, অবস্থান (ডানপাশে না বামপাশে), ব্যথার প্রকৃতি—এসব কেবল ঐ শিশুরই জানা সম্ভব। কারণ এটি একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যার সঙ্গে কেউ অন্য কেউ সরাসরি মিলিয়ে দেখতে পারে না। এর কোন পরিমাণ হয় না, এর কোন রেকর্ড সম্ভব নয়। তাহলে প্রশ্ন উঠে: এই শিশুর ব্যথার সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতি আল্লাহর জানা কি রকম হতে পারে? যদি আল্লাহ শুধুমাত্র “জানেন,” অর্থাৎ তথ্যগত জ্ঞান রাখেন, তবে কি তিনি সত্যিকার অর্থে “সর্বজ্ঞ” — যিনি সব অভিজ্ঞতার গভীরতায় প্রবেশ করেন? উপলব্ধি করেন? আল্লাহ কি শিশুর সেই ব্যথা অনুভবও করেন?

যদি আল্লাহ সেই ব্যথার অনুভূতি না পান, তাহলে শিশুর সেই ব্যথার পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান আল্লাহর কাছে থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে, আল্লাহর “সর্বজ্ঞতা” কেবল গালভরা বুলিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, যা মানব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির গভীরতা স্পর্শ করতে পারে না। এই যুক্তি আমাদের সামনে ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বের এক জটিল ও মৌলিক সমস্যা উত্থাপন করে—অর্থাৎ, উপলব্ধি ছাড়া সর্বজ্ঞতার দাবী কীভাবে হয়?


আল্লাহর অসুস্থতা, ক্ষুধা, কষ্ট ও আনন্দ: ইসলামি বর্ণনায় অভিজ্ঞতার সমস্যা

আল্লাহর সর্বজ্ঞতা এবং মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সম্পর্ক নিয়ে ইসলামি হাদিসসাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য পাওয়া যায়। একদিকে আল্লাহকে এমন সত্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি খাদ্য গ্রহণ করেন না, ঘুমান না এবং কোনো শারীরিক প্রয়োজনের অধীন নন। অন্যদিকে হাদিসে আল্লাহ নিজেই অসুস্থ হওয়ার, খাদ্য ও পানীয় চাওয়ার, মানুষের আচরণে কষ্ট পাওয়ার এবং মানুষের নির্দিষ্ট কাজে আনন্দিত হওয়ার ভাষা ব্যবহার করেছেন। এসব বর্ণনায় আল্লাহর অভিজ্ঞতার প্রকৃতি সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়: আল্লাহ যদি মানুষের মতো ক্ষুধা, অসুস্থতা ও যন্ত্রণা অনুভব না করেন, তাহলে এসব অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাঁর কীভাবে রয়েছে? আর তাঁর নিজের মধ্যে যদি আনন্দ, কষ্ট ও অনুভূতিগত পরিবর্তন বাস্তবেই উপস্থিত থাকে, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার প্রকৃতি এবং তাঁর অপরিবর্তনীয় ও মানবিক সীমাবদ্ধতামুক্ত সত্তার সম্পর্ক কী?


আল্লাহর অসুস্থতা, খাদ্য ও পানীয় চাওয়ার বর্ণনা

সহিহ মুসলিমের ২৫৬৯ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ বলেন যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষকে সম্বোধন করে বলবেন, তিনি অসুস্থ ছিলেন অথচ মানুষ তাঁকে দেখতে যায়নি। মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করবে, কারণ আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক। উত্তরে আল্লাহ জানাবেন, তাঁর এক বান্দা অসুস্থ ছিল এবং তাকে দেখতে গেলে আল্লাহকে তার কাছে পাওয়া যেত। একই বর্ণনায় আল্লাহ খাদ্য ও পানীয় চাওয়ার কথাও বলবেন; পরে জানাবেন, তাঁর বান্দা খাদ্য ও পানীয় চেয়েছিল। এখানে আল্লাহ মানুষের অসুস্থতা ও অভাবকে নিজের প্রথম-পুরুষ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। [9]

إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَا ابْنَ آدَمَ مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِي

বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয় আল্লাহ কিয়ামতের দিন বলবেন: হে আদমসন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে দেখতে আসোনি।

হাদিসটির সম্পূর্ণ ঘটনাক্রমে অসুস্থতা, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতা আল্লাহর বান্দাদের বলে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ প্রথম-পুরুষে অসুস্থতা ও প্রয়োজনের কথা বলেছেন, কিন্তু সেই অবস্থাগুলোর প্রকৃত অধিকারী হিসেবে মানুষের পরিচয় দিয়েছেন। এখানেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন অসুস্থ মানুষ নিজের দেহের মধ্যে ব্যথা, দুর্বলতা ও অস্বস্তি অনুভব করেন। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষেত্রে ক্ষুধার অনুভূতি তাঁর নিজস্ব শরীর ও চেতনার অভিজ্ঞতা। আল্লাহ যখন বলেন, তাঁর বান্দা অসুস্থ বা ক্ষুধার্ত ছিল, তখন তিনি বান্দার অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান প্রকাশ করছেন। কিন্তু এই জ্ঞান কি অসুস্থ ব্যক্তির নিজের ব্যথা অথবা ক্ষুধার্ত মানুষের নিজের ক্ষুধার অনুভূতির সমার্থক? হাদিসে বান্দার অসুস্থতার সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক ঘোষণা করা হয়েছে; বান্দার দেহজ অভিজ্ঞতা আল্লাহ নিজে অনুভব করেছেন—এমন কোনো বিবরণ নেই।

কোরআনের সূরা আনআমের ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহকে খাদ্যদাতা বলা হয়েছে, যিনি নিজে খাদ্য গ্রহণ করেন না। সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতে তাঁর তন্দ্রা ও নিদ্রাহীনতার কথা রয়েছে। এসব বক্তব্যে মানুষের কয়েকটি মৌলিক শারীরিক অবস্থাকে আল্লাহর অস্তিত্ব থেকে পৃথক করা হয়েছে। অথচ ক্ষুধা, ক্লান্তি, ঘুমের প্রয়োজন এবং অসুস্থতার অভিজ্ঞতা মানুষের সচেতন জীবনের বাস্তব অংশ। যে সত্তা কখনো ক্ষুধার্ত হন না, তাঁর সমস্ত ক্ষুধার্ত মানুষের প্রত্যক্ষ ক্ষুধাজ্ঞান থাকার দাবিটি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়? ক্ষুধার কারণ, শরীরের প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ সম্পর্কে সমস্ত তথ্য জানা আর নিজে ক্ষুধার অভিজ্ঞতা লাভ করা এক নয়। এই পার্থক্য অস্বীকার করলে তথ্যগত জ্ঞান ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। [10] [11]


মানুষ আল্লাহকে কষ্ট দেয়: হাদিসের সরাসরি বক্তব্য

সহিহ বুখারির ৪৮২৬ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ আল্লাহর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে আল্লাহ বলেন যে আদমসন্তান তাঁকে কষ্ট দেয়। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় মানুষ সময়কে গালি দেয় এবং আল্লাহ বলেন, সময়ের কর্তৃত্ব তাঁর হাতে; তিনিই রাত ও দিন পরিবর্তন করেন। এখানে ব্যবহৃত আরবি শব্দ «يُؤْذِينِي»—অর্থাৎ আমাকে কষ্ট দেয় বা পীড়া দেয়। এই শব্দটি মানুষের আচরণ এবং আল্লাহর প্রতি সংঘটিত কষ্টের সম্পর্ক সরাসরি প্রকাশ করছে। [12]

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِينِي ابْنُ آدَمَ، يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ، بِيَدِي الأَمْرُ، أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ বলেছেন: আদমসন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। সে সময়কে গালি দেয়, অথচ আমিই সময়; সমস্ত কর্তৃত্ব আমার হাতে, আমিই রাত ও দিন পরিবর্তন করি।

কষ্ট পাওয়ার বক্তব্যটির সঙ্গে আল্লাহর স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও অপরিবর্তনীয়তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের কাছে কষ্ট পাওয়ার অভিজ্ঞতা একটি অনুভূতিগত অবস্থা। কেউ আগে স্বাভাবিক ছিলেন, পরে কারও আচরণে আহত বা অপমানিত হলেন—তখন তাঁর মানসিক অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে। আল্লাহর ক্ষেত্রে «يُؤْذِينِي» যদি বাস্তব অনুভূতিগত কষ্ট নির্দেশ করে, তাহলে মানুষের আচরণের সঙ্গে আল্লাহর নিজস্ব অভিজ্ঞতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আর বক্তব্যটি যদি কেবল মানুষের আচরণের ধর্মীয় নিন্দা প্রকাশ করে, তাহলে সেখানে আল্লাহর নিজস্ব কষ্টের অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রথম ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুভূতিগত অবস্থার প্রশ্ন ওঠে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মানুষের অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ প্রত্যক্ষ জ্ঞান সেই বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় না।


আল্লাহর আনন্দ: অনুভূতি ও অপরিবর্তনীয়তার প্রশ্ন

সহিহ মুসলিমের ২৭৪৭ নম্বর হাদিসে আল্লাহর আনন্দের একটি নির্দিষ্ট তুলনা পাওয়া যায়। মুহাম্মদ বলেছেন, কোনো বান্দা তওবা করলে আল্লাহ তার তওবায় অত্যন্ত আনন্দিত হন। এই আনন্দের তীব্রতা বোঝাতে এমন একজন মানুষের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যিনি খাদ্য ও পানীয়সহ নিজের উট মরুভূমিতে হারিয়ে ফেলেন। বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়ার পরে হঠাৎ উটটি ফিরে পেয়ে তিনি অসাধারণ আনন্দ অনুভব করেন। মুহাম্মদের বক্তব্য অনুসারে, বান্দার তওবায় আল্লাহ সেই ব্যক্তির চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। এখানে মানুষের চরম হতাশা থেকে আনন্দে উত্তরণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আল্লাহর আনন্দের তুলনা করা হয়েছে। [13]

لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ

বাংলা অনুবাদ: তোমাদের কারও আনন্দের চেয়েও আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় অধিক আনন্দিত হন, যখন বান্দা তাঁর কাছে তওবা করে।

এই বর্ণনায় আল্লাহর আনন্দ কেবল একটি বিমূর্ত গুণ নয়; মানুষের একটি নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত অনুভূতি হিসেবে প্রকাশিত। তওবা করার আগে এবং তওবা করার পরে বান্দার অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। আল্লাহর আনন্দও সেই নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্ণিত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়, আল্লাহর এই আনন্দ কি তাঁর চেতনার বাস্তব অভিজ্ঞতা? বাস্তব অভিজ্ঞতা হলে সেই আনন্দের অনুভূতিগত প্রকৃতি কী এবং বান্দার পরিবর্তিত আচরণের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার সম্পর্ক কী? আবার মানুষের আনন্দের সঙ্গে তুলনা করলেই মানুষের আনন্দের প্রথম-পুরুষ অভিজ্ঞতা আল্লাহর নিজের অভিজ্ঞতায় উপস্থিত হয়ে যায় না। একটি আনন্দের সঙ্গে আরেকটি আনন্দের তীব্রতার তুলনা এবং দুটি সত্তার অভিজ্ঞতার অভিন্নতা সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়।

এই তিনটি হাদিস একত্রে রাখলে ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যা স্পষ্ট হয়। অসুস্থতা, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সম্পর্কে আল্লাহ মানুষের অভিজ্ঞতাকে নিজের বক্তব্যে উপস্থাপন করেছেন; মানুষের আচরণে কষ্ট পাওয়ার কথা বলেছেন; আবার বান্দার তওবায় আনন্দিত হওয়ার কথাও বলেছেন। কিন্তু এগুলো থেকে সমস্ত মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ প্রথম-পুরুষ জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয় না। নিজে অনুভব করা, অন্যের অনুভূতি সম্পর্কে জানা এবং অন্যের অভিজ্ঞতাকে নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা—এই তিনটি আলাদা অবস্থা। আল্লাহর সর্বজ্ঞতার দাবি এই পার্থক্যগুলো বিলুপ্ত করে না। বরং তাঁর দেহজ প্রয়োজনমুক্ত সত্তা, বর্ণিত অনুভূতিগত অবস্থা এবং সমস্ত সচেতন জীবের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জ্ঞান—এই তিনটির সম্পর্কের একটি সুসংগত ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৈরি করে।


তানযিহ বনাম সর্বজ্ঞতা

ইসলামী কালামে আল্লাহকে সাধারণত তানযিহ বা সৃষ্টির সমস্ত বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত হিসেবে কল্পনা করা হয় [14]। তিনি দেহধারী নন, ক্ষুধার্ত হন না, যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন না, ক্লান্ত হন না, অসহায় হন না, মৃত্যুভয় পান না [15]। কিন্তু এখানেই সমস্যা: মানুষ যে অভিজ্ঞতাগুলোর মাধ্যমে মানুষ, আল্লাহ সেগুলোর কোনোটিরই অংশীদার নন। অথচ একই সঙ্গে দাবি করা হয় তিনি মানুষের অন্তরতম অভিজ্ঞতাও সম্পূর্ণ জানেন। ফলে ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্ব একই সঙ্গে দুইটি পরস্পরবিরোধী দাবি করে: আল্লাহ মানুষের মতো নন, আবার মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ জানেন [16]। যদি তিনি মানুষের মতো না হন, তবে মানুষের অভিজ্ঞতার অভ্যন্তরীণ রূপ তার নেই; আর যদি সেই অভ্যন্তরীণ রূপ থাকে, তবে তিনি সৃষ্টির অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন।


অভিজ্ঞতাহীন সর্বজ্ঞতার সংকট: ইউজিন নাগাসাওয়ার আলোচিত জ্ঞানতাত্ত্বিক যুক্তি

ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা ও তাঁর অন্যান্য ঐশ্বরিক গুণাবলির মধ্যে সংঘাত নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক আলোচনা রয়েছে ইউজিন নাগাসাওয়ার (Yujin Nagasawa) ২০০৮ সালে Cambridge University Press থেকে প্রকাশিত God and Phenomenal Consciousness: A Novel Approach to Knowledge Arguments গ্রন্থে। গ্রন্থটির তৃতীয় অধ্যায়, The Argument from Concept Possession (1)-এ এমন একটি যুক্তি বিশ্লেষিত হয়েছে, যার ভিত্তি হলো: কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জনের জন্য যদি সেই অভিজ্ঞতা নিজে লাভ করা অপরিহার্য হয়, তাহলে যে সত্তা স্বভাবগতভাবে সেই অভিজ্ঞতা লাভ করতে অক্ষম, তিনি সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেন না। এই যুক্তিতে ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তা এবং সর্বজ্ঞতার মধ্যে সংঘাত দেখানো হয়েছে। কারণ সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ভয়, হতাশা কিংবা অসহায়ত্বের মতো অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অবস্থাতেই কখনো পড়েন না। অথচ মানুষের সচেতন অভিজ্ঞতার জগতে এই অনুভূতিগুলো বাস্তব এবং স্বতন্ত্র অস্তিত্বসম্পন্ন। [17]

God’s other attributes preclude Him from understanding fully certain concepts, possession of which requires Him to have particular experiences.

বাংলা অনুবাদ: ঈশ্বরের অন্যান্য গুণাবলি তাঁকে এমন কিছু ধারণা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে বাধা দেয়, যেগুলো অর্জনের জন্য তাঁর নিজস্ব বিশেষ অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন।

এই যুক্তির তাৎপর্য বোঝার জন্য ভয় ও অসহায়ত্বের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা যায়। একজন মানুষ যখন প্রাণনাশের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হন, তখন তাঁর চেতনায় শুধু মৃত্যুর সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি তথ্য উপস্থিত থাকে না। তিনি নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অসহায়ত্ব এবং তীব্র শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান। এই সম্মিলিত অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ অন্তর্গত অনুভূতি রয়েছে। অন্যদিকে সর্বশক্তিমান ও অমর ঈশ্বরের নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকার কথা নয়। কোনো শক্তি তাঁকে পরাজিত করতে পারে না, কোনো ঘটনা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁর জীবন কেড়ে নিতে পারে না। ফলে মানুষের মৃত্যুভয়ের যে অভিজ্ঞতা নিজের অসহায়ত্ব এবং অস্তিত্ব হারানোর আশঙ্কা থেকে জন্মায়, সেই অভিজ্ঞতার বাস্তব শর্তগুলো ঈশ্বরের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।

এখানে পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুভয় কী কারণে তৈরি হয়, মানুষের মস্তিষ্কে তার ফলে কী পরিবর্তন ঘটে এবং আতঙ্কিত মানুষ কী আচরণ করেন—এসব সম্পর্কে সমস্ত তথ্য জানা মৃত্যুভয়ের অভিজ্ঞতা নিজে অর্জন করার সমার্থক নয়। কোনো ব্যক্তি জীবনে কখনো ক্ষুধার্ত না হয়েও ক্ষুধার শারীরবৃত্তীয় কারণ, পাকস্থলীর কার্যক্রম এবং অপুষ্টির ফলাফল সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। কিন্তু সেই জ্ঞান নিজে ক্ষুধার্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা নয়। একইভাবে জন্ম থেকে ব্যথা অনুভব করতে অক্ষম একজন বিজ্ঞানী ব্যথার সমস্ত স্নায়ুবৈজ্ঞানিক তথ্য জানতে পারেন; কিন্তু তাঁর নিজের চেতনায় ব্যথার প্রত্যক্ষ অনুভূতি উপস্থিত হয় না। এই পার্থক্যই অভিজ্ঞতাভিত্তিক জ্ঞানের সমস্যার কেন্দ্র।

ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বে সমস্যাটি আরও বিস্তৃত। আল্লাহকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, যৌন আকাঙ্ক্ষা, মৃত্যুভয় এবং অন্যান্য দেহজ প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে ধরা হয়। তিনি অসহায় হন না, কারও ওপর নির্ভরশীল নন এবং তাঁর অস্তিত্ব বিপন্ন হয় না। অথচ মানুষের জীবনের বিশাল অংশ গঠিত হয়েছে ঠিক এই অভিজ্ঞতাগুলোর মাধ্যমে। ক্ষুধার্ত শিশুর যন্ত্রণা, মৃত্যুপথযাত্রীর আতঙ্ক, যৌনতার শারীরিক আনন্দ, সন্তানহারা মায়ের অসহ্য শোক কিংবা অপমানিত মানুষের লজ্জা—এসবের প্রত্যেকটির নিজস্ব অনুভূতিগত চরিত্র রয়েছে। আল্লাহ যদি এই অভিজ্ঞতাগুলোর কোনোটি নিজে অনুভব না করেন, তাহলে সমস্ত অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাঁর রয়েছে—এমন দাবির ভিত্তি কোথায়? আর যদি প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতা তিনি নিজেই অনুভব করেন, তাহলে তিনি কীভাবে একই সঙ্গে সমস্ত দেহজ প্রয়োজন, দুর্বলতা ও অনুভূতিগত সীমাবদ্ধতার সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন?

এখানে সর্বজ্ঞতার সঙ্গে সর্বশক্তিমত্তার একটি বিশেষ সংঘাতও তৈরি হয়। ভয় ও অসহায়ত্বের অভিজ্ঞতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিজের নিয়ন্ত্রণের সীমা উপলব্ধি করা। কিন্তু সর্বশক্তিমান সত্তার ক্ষেত্রে সেই নিয়ন্ত্রণহীনতার অবস্থা অনুপস্থিত। যে সত্তা কখনো পরাজিত হতে পারেন না, তাঁর নিজের পরাজয়ের অনিবার্য আশঙ্কা কেমন হতে পারে? যাঁর অস্তিত্ব ধ্বংস করা অসম্ভব, তিনি নিজের অনিবার্য মৃত্যুর আতঙ্ক কীভাবে অনুভব করবেন? এই অভিজ্ঞতাগুলোর প্রথম-পুরুষ জ্ঞান যদি সর্বজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে সর্বশক্তিমত্তার দাবি সেই জ্ঞান অর্জনের শর্তকেই বাধাগ্রস্ত করে। একটি ঐশ্বরিক গুণ অন্য ঐশ্বরিক গুণের পূর্ণ বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে সর্বজ্ঞতার সমস্যাটি কেবল আল্লাহ মানুষের কষ্ট সম্পর্কে কত তথ্য জানেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমস্যাটি হলো, যে অভিজ্ঞতার অস্তিত্বই নির্ভর করে নির্দিষ্ট অনুভূতিগত অবস্থার ওপর, সেই অভিজ্ঞতা কখনো অর্জন না করেও তার সমস্ত জ্ঞান ধারণ করার দাবি কতটা সুসংগত। সর্বজ্ঞতা যদি সত্যিই সব ধরনের জ্ঞানের পূর্ণতা বোঝায়, তাহলে মানুষের অভিজ্ঞতার এই স্বতন্ত্র অংশগুলো বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। আর ঈশ্বরের অপরিবর্তনীয়, অদেহী, অমর ও সর্বশক্তিমান পরিচয়ের কারণে যদি সেসব অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ উপলব্ধি অসম্ভব হয়, তাহলে সর্বজ্ঞতার নিঃশর্ত দাবি এবং ঈশ্বরের অন্যান্য গুণাবলি পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।


মানব অভিজ্ঞতার পুনঃনির্মাণ

ভাবুন, যদি এমন একটি মেশিন তৈরি করা যায়… (কাল্পনিক চিত্রকল্প) যদি এমন একটি মেশিন তৈরি করা যায়, যা কোনো মানুষের প্রতিটি অনুভূতি, আবেগ, ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা—যেমন ত্বকের স্পর্শানুভূতি, চোখের অশ্রু, হৃদয়ের আতঙ্ক, প্রেমে পড়ার উত্তাপ, প্রথম প্রেমের প্রেমিকার হাত ধরার কাঁপা অনুভূতি, নিজের কন্যাকে প্রথমবার কোলে নেয়ার অনুভূতি, কিংবা সন্তান হারানোর অসহ্য বেদনা—সব কিছু রেকর্ড করে রাখতে পারে, এবং সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে ঐ ব্যক্তির মানসিক অবস্থার প্রতিটি সূক্ষ্ম দিক বুঝে ফেলতে পারে, তাহলে সেই মেশিনটির কাছে ঐ ব্যক্তির অভিজ্ঞতাগুলো সম্পূর্ণভাবে “জানা” হয়ে যাবে। সেই জ্ঞান কেবল বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ নয়—তা হবে অভ্যন্তরীণ জ্ঞানের পুনঃনির্মাণ। এই মেশিন কোনো কিছুই এড়িয়ে যেতে পারবে না; সে সব কিছু জানতে বাধ্য হবে।

এখানে এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে। বিখ্যাত দার্শনিক থমাস ন্যাগেল তাঁর প্রবন্ধ “What is it like to be a bat?” (১৯৭৪) তে আলোচনায় আনে যে, প্রত্যেক জীবের অভিজ্ঞতার একটি ‘সাবজেক্টিভ’ দিক থাকে — অর্থাৎ, একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থার অনুভূতি, যেটা বাইরে থেকে কেবল তথ্যগতভাবে বোঝা বা রেকর্ড করা সম্ভব নয়। ন্যাগেল বলেন, অন্য কারো অভিজ্ঞতার ‘মনের ভিতরকার ভাব’ বা ‘what it is like’ বুঝতে পারা সম্ভব নয় শুধুমাত্র বাহ্যিক তথ্যের মাধ্যমে [2]।

অর্থাৎ, একটি মেশিন যতই ডেটা সংগ্রহ করুক না কেন, সেটা ‘অভিজ্ঞতার প্রকৃত গভীরতা’ উপলব্ধি করতে পারবে না—কারণ ‘অভিজ্ঞতা’ কেবল তথ্য নয়, এটি একটি প্রত্যক্ষতাস্বরূপ অনুভূতি যা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত [18]।

এবার, যদি ঈশ্বর সত্যিকার অর্থে সর্বজ্ঞ হন, তাহলে তার জ্ঞান অবশ্যই এই অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে—সেখানে কোনো অভিজ্ঞতা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, তা যত যন্ত্রণাদায়ক বা লজ্জাজনকই হোক না কেন। অন্যথায়, ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা হবে আধা-জ্ঞান, তথ্যগত সীমাবদ্ধতা যুক্ত জ্ঞান।

এখন, এখানে আবার রেনে দেকার্তের ‘কার্তেসিয়ান ডুয়ালিজম’ (Cartesian Dualism) এর কথা স্মরণ রাখা জরুরি, যেখানে তিনি বলেছিলেন মনের অভিজ্ঞতা শারীরিক শরীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যদি ঈশ্বর শুধু একজন বহিরাগত পর্যবেক্ষক হন, তাহলে তার পক্ষে মানুষের অভ্যন্তরীণ মনের অনুভূতি পূর্ণাঙ্গভাবে জানা সম্ভব নয়।


অপরিবর্তনীয় সর্বজ্ঞতা ও পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সংঘাত

সর্বজ্ঞতার সঙ্গে ঈশ্বরের অপরিবর্তনীয়তার সম্পর্ক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কোনো সত্তা যদি সমস্ত সত্য সম্পর্কে সর্বদা নিখুঁত জ্ঞান ধারণ করেন, তাহলে সময়ের প্রবাহে পরিবর্তিত বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের অবস্থান কী হবে? একজন মানুষ এখন কষ্ট পাচ্ছেন, কিছুক্ষণ পরে তাঁর কষ্ট বন্ধ হয়ে গেল; একটি শিশু এখন ক্ষুধার্ত, পরে খাদ্য গ্রহণ করে তৃপ্ত হলো; একজন মা এখন সন্তান হারানোর শোকে কাতর, কিন্তু সন্তান মারা যাওয়ার আগের মুহূর্তে তাঁর অভিজ্ঞতা ভিন্ন ছিল। এসব পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক ঘটনা নয়, সচেতন জীবের বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিবর্তন। সর্বজ্ঞ ঈশ্বর যদি প্রতিটি মুহূর্তের সমস্ত সত্য এবং সমস্ত অভিজ্ঞতার পরিপূর্ণ জ্ঞান ধারণ করেন, তাহলে তাঁর জ্ঞানের সঙ্গে এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সম্পর্ক একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

এই সমস্যা নিয়ে নরম্যান ক্রেটজম্যান ১৯৬৬ সালের Omniscience and Immutability গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো, বর্তমান সময় সম্পর্কে সত্য বক্তব্য ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। আজ যে ঘটনা ভবিষ্যতের, আগামীকাল সেটিই বর্তমান এবং পরশু অতীত। সর্বজ্ঞ সত্তাকে প্রতিটি সময়ের সত্য জানতে হলে পরিবর্তিত সময়সম্পর্কিত সত্যেরও জ্ঞান থাকতে হবে। কিন্তু ঈশ্বরের জ্ঞান যদি কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তিত না হয়, তাহলে পরিবর্তনশীল বর্তমান সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান কীভাবে নির্ধারিত হবে? এই যুক্তি সর্বজ্ঞতা এবং অপরিবর্তনীয়তার সম্মিলিত দাবিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। [6] [19]


ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বে অপরিবর্তনীয় জ্ঞানের ঘোষণা

ইসলামি ধর্মতত্ত্বেও আল্লাহর জ্ঞানকে পূর্বনির্ধারিত এবং অপরিবর্তনীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ইসলামওয়েবের ৫৪৫৩২ নম্বর আলোচনায় ইমাম নববি, ইবনে হাজার, ইবনে তাইমিয়া এবং সাদির বক্তব্য উদ্ধৃত করে আল্লাহর পূর্বজ্ঞান ও পরিবর্তনশীল পার্থিব ঘটনার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে ইবনে হাজারের বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহর পূর্বজ্ঞানে যা রয়েছে তা পরিবর্তিত হয় না; পরিবর্তনের বিষয়টি মানুষের কাজ বা ফেরেশতাদের নথিতে উপস্থিত হতে পারে। ইবনে তাইমিয়ার নামে উদ্ধৃত বক্তব্যে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহর জ্ঞানে কোনো পরিবর্তন ঘটে না এবং আগে অজানা ছিল এমন নতুন কিছু তাঁর কাছে প্রকাশিত হয় না। অর্থাৎ মানুষের জীবনে ঘটনা পরিবর্তিত হলেও আল্লাহর জ্ঞানকে সেই পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে স্থির বলে ঘোষণা করা হয়েছে। [20]

وأما علم الله سبحانه فلا يختلف ولا يبدو له ما لم يكن عالما به فلا محو فيه ولا إثبات.

বাংলা অনুবাদ: আর আল্লাহর জ্ঞানে কোনো পার্থক্য ঘটে না; আগে তাঁর অজানা ছিল, এমন কিছু নতুন করে প্রকাশিত হয় না। ফলে সেই জ্ঞানে কোনো মুছে ফেলা বা নতুন করে স্থির করার ঘটনা নেই।

এখানে দুটি দাবি পাশাপাশি দাঁড়ায়। প্রথম দাবি, আল্লাহর জ্ঞান অপরিবর্তনীয়। দ্বিতীয় দাবি, আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা জানেন। একজন মানুষের ব্যথা শুরু হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া, তীব্রতম অবস্থায় পৌঁছানো এবং শেষ হওয়ার প্রতিটি মুহূর্ত বাস্তব অভিজ্ঞতার পৃথক অবস্থা। একজন মানুষের নিজের চেতনায় “আমি এখন ব্যথা পাচ্ছি” এবং পরের মুহূর্তে “আমার ব্যথা বন্ধ হয়েছে”—এই দুটি বক্তব্যের সময়সম্পর্কিত সত্য একই নয়। সর্বজ্ঞতার দাবি যদি প্রতিটি মুহূর্তের বর্তমান অভিজ্ঞতার জ্ঞানও অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে আল্লাহর জ্ঞানে প্রত্যেক পরিবর্তিত অবস্থার বর্তমান পরিচয় থাকতে হবে। অথচ অপরিবর্তনীয় জ্ঞানের দাবি অনুযায়ী তাঁর জ্ঞান কোনো নতুন অবস্থায় প্রবেশ করে না। সমস্ত পরিবর্তনশীল বর্তমানকে জানা এবং জানার অবস্থার কোনো পরিবর্তন না-ঘটার দাবি একই সঙ্গে কীভাবে কার্যকর হয়—এটিই মূল অসংগতি।


ইব্রাহিম আজাদেগানের গবেষণা: ইসলামি দর্শনে সংঘাতের প্রত্যক্ষ স্বীকৃতি

এই সমস্যাটি আধুনিক একাডেমিক ইসলামি দর্শনেও সরাসরি আলোচিত হয়েছে। ইব্রাহিম আজাদেগান (Ebrahim Azadegan) তাঁর On the Incompatibility of God’s Knowledge of Particulars and the Doctrine of Divine Immutability: Towards a Reform in Islamic Theology গবেষণায় যুক্তি দিয়েছেন যে পরিবর্তনশীল নির্দিষ্ট ঘটনাসমূহ সম্পর্কে ঈশ্বরের জ্ঞান এবং ঐশ্বরিক অপরিবর্তনীয়তার মতবাদ অসংগতিপূর্ণ। গবেষণায় তিনি ইবনে সিনা ও গাজালির ঐতিহাসিক বিতর্ক বিশ্লেষণ করেছেন এবং পরবর্তী সদরীয় দর্শনের আলোচনাও পরীক্ষা করেছেন। তাঁর প্রস্তাবিত সমাধান হলো ঐশ্বরিক অপরিবর্তনীয়তার মতবাদ প্রত্যাখ্যান করা। অর্থাৎ সমস্যাটিকে শুধু ভাষাগত পার্থক্য হিসেবে বিবেচনা না করে তিনি ঈশ্বরের একটি প্রচলিত গুণের সঙ্গে অন্য গুণের অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করেছেন। গবেষণাটি ২০২০ সালে অনলাইনে প্রকাশিত হয় এবং ২০২২ সালে Religious Studies জার্নালের ৫৮তম খণ্ডের দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। [21]

Affirming that divine knowledge of occurrent changes among particulars is incompatible with the doctrine of divine immutability

বাংলা অনুবাদ: নির্দিষ্ট ঘটনাসমূহের চলমান পরিবর্তন সম্পর্কে ঐশ্বরিক জ্ঞান অপরিবর্তনীয় ঈশ্বরের মতবাদের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ—এই অবস্থান গ্রহণ করে।

আজাদেগানের গবেষণার তাৎপর্য হলো, এখানে ইসলামি দর্শনের নিজস্ব সর্বজ্ঞতা ও অপরিবর্তনীয়তার দাবির মধ্যে সংঘাত সরাসরি শনাক্ত করা হয়েছে। ইবনে সিনা ও গাজালির বিতর্কের কেন্দ্রেও রয়েছে পরিবর্তনশীল নির্দিষ্ট বস্তু ও ঘটনা সম্পর্কে ঈশ্বরের জ্ঞানের প্রকৃতি। কোনো ব্যক্তি এখন যে অবস্থায় রয়েছেন, পরে তাঁর অবস্থা বদলে গেলে আল্লাহর জ্ঞানে সেই পরিবর্তনের সম্পর্ক কীভাবে উপস্থিত থাকবে—এই প্রশ্ন শুধু আধুনিক দর্শনের উদ্ভাবন নয়। ইসলামি দার্শনিক ঐতিহ্যেও নির্দিষ্ট ঘটনাসমূহের জ্ঞান এবং অপরিবর্তনীয় ঐশী সত্তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়। আজাদেগান সেই পুরোনো সমস্যাটিকে আধুনিক বিশ্লেষণধর্মী দর্শনের কাঠামোয় নতুন করে মূল্যায়ন করেছেন।

মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রশ্ন যুক্ত করলে অসংগতিটি আরও গভীর হয়। প্রতিটি সচেতন মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। কেউ এখন আতঙ্কিত, পরের মুহূর্তে নিরাপদ বোধ করছেন; কেউ এখন যৌনানন্দ অনুভব করছেন, কিছুক্ষণ পরে সেই অনুভূতি শেষ হয়েছে; কেউ এখন অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর, পরে অচেতন হয়ে গেছেন। এসব অবস্থার পরিবর্তন শুধু সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বাহ্যিক তথ্যের পরিবর্তন নয়; তাঁর নিজের চেতনার অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতাও বদলেছে। আল্লাহ যদি প্রত্যেক ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নিজে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেন, তাহলে সেই অনুভূতিগুলোর উপস্থিতি, অনুপস্থিতি ও পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার সম্পর্কও নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু তাঁর নিজস্ব অনুভূতিগত অবস্থাকে সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় বলা হলে পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ অংশীদার হওয়ার দাবি নতুন অসংগতি তৈরি করে।

এই সমস্যার সঙ্গে সর্বজ্ঞতার প্রথম-পুরুষ জ্ঞানের সংকটও যুক্ত। একটি শিশুর বর্তমান আতঙ্ক কেবল তার সম্পর্কে একটি তথ্য নয়, তার নিজের চেতনায় সংঘটিত একটি অভিজ্ঞতা। সেই আতঙ্কের মুহূর্তে শিশুটি কী অনুভব করছে এবং আতঙ্ক শেষ হওয়ার পরে সে কী অনুভব করছে—এ দুটি ভিন্ন অবস্থা। সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের জ্ঞানে এই দুই অবস্থার সমস্ত সত্য উপস্থিত থাকার দাবি করা হয়। কিন্তু প্রথম-পুরুষ অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান দাবি করলে শুধু শিশুটির পরিবর্তিত অবস্থার তথ্য জানাই যথেষ্ট নয়; সেই অভিজ্ঞতার অভ্যন্তরীণ চরিত্রও জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রশ্ন ওঠে। আল্লাহর জ্ঞান অপরিবর্তনীয়, অথচ সমস্ত সচেতন জীবের পরিবর্তনশীল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর জ্ঞানে সম্পূর্ণ উপস্থিত—এই সম্মিলিত দাবির দার্শনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত নয়।

সর্বজ্ঞতার ধারণা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের মুখে পড়ে। যদি আল্লাহর জ্ঞান প্রতিটি পরিবর্তনশীল বর্তমানের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তাহলে অপরিবর্তনীয় জ্ঞানের দাবি অক্ষত থাকে না। আর যদি তাঁর জ্ঞান চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে প্রতিটি পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার বর্তমান অবস্থা এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সেই মুহূর্তের প্রথম-পুরুষ উপলব্ধিকে একইভাবে জানার দাবি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। পূর্বনির্ধারিত সমস্ত ঘটনার তথ্য জানা এবং প্রতিটি ঘটনার বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়া এক নয়। প্রথমটি সর্বকালের ঘটনাসম্পর্কিত জ্ঞানের দাবি; দ্বিতীয়টি অসংখ্য সচেতন সত্তার পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধির দাবি। এই দুই ধরনের জ্ঞানকে অভিন্ন ধরে নেওয়ার মধ্যেই সর্বজ্ঞতার প্রচলিত ধারণার মৌলিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যা নিহিত।


একটি নীতিকথা: বীরবল ও প্রহরীর গল্প

এখানে একটি চতুর নীতিকথা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। একবার নাকি আকবর এক শিকার অভিযানে গিয়ে বীরবলের সাথে প্রথম মুখোমুখি হন। তার কোনো এক বুদ্ধিদীপ্ত কাজে খুশি হয়ে সম্রাট তাকে একটি আংটি দিয়ে প্রাসাদে এসে দেখা করতে বলেন। বীরবল যখন প্রাসাদের প্রধান ফটকে উপস্থিত হন, তখন তার জীর্ণবস্ত্র দেখে প্রহরীরা তাকে বাধা দেয়। সম্রাটের আংটি দেখে তারা বুঝতে পারে যে তিনি সম্রাটের কাছ থেকে কোনো পুরস্কারের দাবীদার। প্রাপ্ত পুরষ্কারের অর্ধেক তাদের দিতে হবে এই শর্তে প্রহরীরা তাকে ভেতরে যেতে দেয়।

দরবারে সম্রাট যখন বীরবলকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কী পুরষ্কার আশা করেন, তখন বীরবল নিজের জন্য একশোটি চাবুকের আঘাত চেয়ে বসেন। এই বিস্ময়কর আব্দারের কারণ জানতে চাইলে বীরবল পুরো ঘটনা খুলে বলেন। বুদ্ধিমান বীরবল এই পুরষ্কারটি চান, কারণ তিনি সেই প্রহরীকে উচিত শিক্ষা দিতে চাচ্ছিলেন। তার উপস্থিত বুদ্ধিতে চমৎকৃত হয়ে আকবর তৎক্ষণাৎ সেই প্রহরীদের পঞ্চাশটি করে চাবুকের আঘাত করতে নির্দেশ দেন এবং বীরবলকে তার একজন উপদেষ্টা হিসেবে গ্রহণ করেন।

এই গল্প আমাদের একটি গভীর দার্শনিক বিষয় শেখায়—যে কোন জ্ঞানের দাবি করবে, তাকেও সেই অভিজ্ঞতার দায়ও বহন করতে হবে। যদি ঈশ্বর দাবি করেন যে তিনি মানবিক অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ জ্ঞান রাখেন, তবে তাকে কেবল সেটির ধারণাগত দিক নয়, বরং সেই অভিজ্ঞতার ব্যথা, শোক, অবসাদ, লজ্জা ও অপমানকেও ধারণ করতে হবে।


সন্তানহারা মায়ের কষ্টের উপলব্ধি

যদি আল্লাহ সর্বজ্ঞ হন, তাহলে তার কাছে একজন সন্তানহারা মায়ের মনের হাহাকার, বেদনা ও অসহ্য কষ্টের পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি থাকতে হবে। অর্থাৎ, আল্লাহ শুধুমাত্র ‘জানেন’ বললেই হবে না, তার ‘অভিজ্ঞতা’ এবং একইসাথে ‘উপলব্ধি’ বা অন্তরগত অনুভূতিও সেই একই গভীরতায় উপস্থিত থাকতে হবে।

এখানে দর্শনে ‘ইন্টারস্পেকশন’ বা আত্মপর্যালোচনার ধারণা প্রাসঙ্গিক [22]। ইন্টারস্পেকশন হলো নিজের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বা অনুভূতি সম্পর্কে স্ব-জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া। একজন সন্তানহারা মা নিজের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণাকে গভীরভাবে অনুভব করেন, যা কেবল বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ বা তথ্য-জ্ঞান দ্বারা জানা বোঝা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

আবার, ‘এমপ্যাথি’ বা সহানুভূতির তত্ত্ব বলছে অন্যের অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য কেবল তথ্য থাকা যথেষ্ট নয়, অন্তত কিছু মাত্রায় সেই অভিজ্ঞতা ‘মনের ভিতর থেকে’ অনুভব করাও জরুরি। অর্থাৎ, অন্য কারো যন্ত্রণাকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে গেলে সেই যন্ত্রণার ‘মনস্তাত্ত্বিক পুনঃঅভিজ্ঞতা’ প্রয়োজন [23]। যদি আল্লাহ সন্তানের বেদনা উপলব্ধি করতে না পারেন, অর্থাৎ তার সেই অভ্যন্তরীণ মানসিক অনুভূতির দ্বারা তৈরি হওয়া ‘এমপ্যাথি’ না থাকে, তাহলে আল্লাহর সর্বজ্ঞতা অপূর্ণ থাকবে। এ কারণে এই ধারণা ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, যেখানে আল্লাহকে সর্বজ্ঞ এবং সর্বদর্শী বলে বিবেচনা করা হয়।


সমকামী পুরুষের যৌনানন্দের উপলব্ধি

ধরে নিই, একজন সমকামী পুরুষ যিনি নিজের শরীরে অন্য পুরুষের পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করিয়ে যৌন তৃপ্তি অনুভব করেন। তিনি যদি বহুজনের সঙ্গে সহবাস করেন, এবং প্রতিবারই সেই যৌনক্রিয়ার প্রতিটি মুহূর্ত—আবেগ, উত্তেজনা, শারীরিক সংবেদন, অভ্যন্তরের চাপ ও রিলিজের অনুভব—সবই তার মস্তিষ্কে সঞ্চিত হয়, তবে এই প্রতিটি অভিজ্ঞতা কি সর্বজ্ঞ আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়? আল্লাহ কি সেগুলোও উপলব্ধি করেন? অনুভব করেন? সেই উপলব্ধী, অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান, অনুভূতি ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞান আল্লাহর না থাকলে, আল্লাহ কীভাবে সর্বজ্ঞানী বলে নিজেকে দাবী করেন? প্রতিবার কোন পুরুষ যখন তার শরীরে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করান, প্রতিবারই তো একই অনুভূতি ও উপলব্ধী আল্লাহরও হবে, যদি তিনি সর্বজ্ঞ বলে নিজেকে দাবী করেন।

এই প্রশ্ন ধর্মতত্ত্বের একটা স্পর্শকাতর অথচ এড়িয়ে যাওয়ার অযোগ্য দিক উন্মোচন করে: সর্বজ্ঞতার দাবি কি এমন সব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির জ্ঞানও দাবি করে, যা ধর্মীয়ভাবে ‘পাপ’ বা ‘অশুচি’ বলে বিবেচিত হয়?

দর্শনের ভাষায়, এখানে উঠে আসে “knowledge by acquaintance” (পরিচয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান) বনাম “knowledge by description” (বর্ণনার মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান) তত্ত্ব [24]। বার্ট্রান্ড রাসেল এই দুইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টেনেছেন। তার মতে, কারো অভ্যন্তরীণ অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সত্যিকার জ্ঞান কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি যিনি তা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেছেন—তিনিই অর্জন করতে পারেন। বর্ণনার মাধ্যমে কেবল একটা ছায়া পাওয়া যায়, মূল জ্ঞান নয়।

যদি আমরা বলি, ঈশ্বর কেবল “বর্ণনার মাধ্যমে” সেই অভিজ্ঞতাগুলি জানেন, তাহলে তার জ্ঞান সীমিত—তার অভিজ্ঞতা সেকেন্ডহ্যান্ড [25]। পক্ষান্তরে, যদি তিনি সত্যিকার অর্থে তা জানেন, তাহলে তার জ্ঞান ওই সমকামী পুরুষের মনের ভেতরকার শিহরণ ও আনন্দসহ অভ্যন্তরীণ অনুভবও ধারণ করে। তাহলে ঈশ্বরের চেতনাতেও সেই যৌনানন্দের একধরনের অংশগ্রহণ থাকে।

এক্ষেত্রে উদ্ভব হয় আরেকটি সমস্যা, যেটি বিশেষ করে ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে—আল্লাহ পবিত্র, নিষ্পাপ ও ‘অশুচি’ থেকে মুক্ত। তাহলে, কিভাবে তিনি এমন এক অভিজ্ঞতার পুরোটা ধারণ করতে পারেন, যেটি ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী বলে বিবেচিত?

এই দ্বন্দ্বের ফলাফল আমাদের টেনে নিয়ে আসে একটি গভীর ও দার্শনিক সিদ্ধান্তে: সর্বজ্ঞতা যদি এমন অভিজ্ঞতাও ধারণ করে যা একজন ঈশ্বরের জন্য ‘অশোভন’ বা ‘অনভিপ্রেত’, তবে ঈশ্বরের পবিত্রতা ও সর্বজ্ঞতার ধারণা পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে।

সুতরাং বলা যায়, সর্বজ্ঞতা নিজেই একটি ধরনের দার্শনিক অভিশাপ—একটি অবস্থা, যেখানে ঈশ্বর নিজের ইচ্ছায়ও নিজেকে কিছু জানা থেকে বিরত রাখতে পারেন না, এমনকি যদি সেই জ্ঞান তার স্বভাব ও নৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধেও যায়।


ধর্ষিত শিশুর উপলব্ধি

ধরি, পাঁচ বা ছয় বছরের একটি মাদ্রাসার শিশু তার মাদ্রাসার শিক্ষকের হাতে ধর্ষিত হলো। এতে তার পায়ুপথ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, রক্ত বের হয়ে তার প্রচণ্ড কষ্ট হতে লাগলো। এই শিশুটির ঠিক কেমন লাগছে, ব্যাথা ও যন্ত্রণার পরিমাণ ঠিক কত, তা শুধুমাত্র এই শিশুটির পক্ষেই জানা সম্ভব। যার এই অভিজ্ঞতা নেই, তার পক্ষে পরিপূর্ণভাবে সেটি কোনদিনই জানা সম্ভব নয়। বাইরে থেকে সেই শিশুটির যন্ত্রণা দেখে তার আসলেই কতটা যন্ত্রণা, তা কোনভাবেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এবং আল্লাহও যদি সেটি জেনে থাকেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার জ্ঞানটি আল্লাহও হতে হবে, অর্থাৎ উপলব্ধিতেও থাকতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞানেও সেই দেহজ যন্ত্রণার অভ্যন্তরীণ অনুভূতি উপস্থিত থাকতে হবে। আল্লাহ ঠিক একই ব্যাথা অনুভব করবেন, নতুবা সেই জ্ঞানটি কিছুতেই পরিপূর্ণ জ্ঞান হবে না।


সর্বজ্ঞতার তিনটি অসম্ভব বিকল্প

এই যুক্তির কেন্দ্রে একটি সহজ কিন্তু নির্মম দার্শনিক বিভাজন আছে। আল্লাহর সর্বজ্ঞতা সম্পর্কে তিনটির বেশি যৌক্তিক বিকল্প নেই। প্রথমত, আল্লাহ মানুষের সব অভিজ্ঞতা কেবল তথ্য হিসেবে জানেন; সেক্ষেত্রে তিনি জানেন যে কেউ ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে, কেউ ধর্ষণের আতঙ্কে ভেঙে পড়ছে, কেউ সন্তান হারিয়ে উন্মত্ত শোকে ডুবে যাচ্ছে—কিন্তু তিনি জানেন না সেই অভিজ্ঞতাগুলো ভেতর থেকে কেমন লাগে। এতে তার জ্ঞান তথ্যগত হলেও অভিজ্ঞতাগত নয়; ফলে সর্বজ্ঞতা অপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ এই সব অভিজ্ঞতা সত্যিই ভেতর থেকে অনুভব করেন; সেক্ষেত্রে তার চেতনার ভেতর প্রতিটি ধর্ষিত শিশুর আতঙ্ক, প্রতিটি ক্ষুধার্ত মানুষের পাকস্থলীর জ্বালা, প্রতিটি যৌন অভিজ্ঞতার দেহজ সংবেদন, প্রতিটি অপমানিত মানুষের লজ্জা এবং প্রতিটি মৃত্যুপথযাত্রীর ভয় উপস্থিত থাকতে হবে। এতে আল্লাহর পবিত্র, নির্বিকার, অদেহী ও পরম সত্তার ধারণা ভেঙে পড়ে। তৃতীয়ত, বলা যেতে পারে আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের মতো নয়; কিন্তু এই উত্তর আসলে সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে ভাষার কুয়াশায় লুকিয়ে ফেলা। কারণ ‘জানে, কিন্তু কীভাবে জানে তা বোঝা যায় না’—এটি কোনো ব্যাখ্যা নয়, এটি ব্যাখ্যার স্থানে রহস্য আরোপ করা।


অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিহীন জ্ঞানের অপূর্ণতা

জ্ঞানের পূর্ণতা কেবল তথ্যের ওপর নির্ভর করে কি না, এটি দর্শনের একটি ধ্রুপদী বিতর্ক। এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা যদি কোনো সত্তার (যেমন ঈশ্বর) “সর্বজ্ঞতা” বা Omniscience-এর দাবিকে বিশ্লেষণ করি, তবে কয়েকটি গুরুতর যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক সংকট দৃশ্যমান হয়।

👁️‍🗨️
১
কোয়ালিয়া এবং মেরি’র কামরা (Mary’s Room Argument)
দার্শনিক ফ্রাঙ্ক জ্যাকসন তার বিখ্যাত ‘মেরি’র কামরা’ (Mary’s Room) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, তথ্যের সমাহার আর উপলব্ধির অভিজ্ঞতা এক নয় [26]। মেরি একজন বিজ্ঞানী, যিনি রঙের সমস্ত পদার্থবিদ্যা (Physics) জানেন—কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কোন রং হয়, চোখের স্নায়ু কীভাবে সংকেত পাঠায়—সবই তার মুখস্থ। কিন্তু মেরি জন্ম থেকে একটি সাদাকালো ঘরে বড় হয়েছেন। যখন তিনি প্রথমবার ঘর থেকে বের হয়ে একটি লাল গোলাপ দেখলেন, তখন তিনি নতুন কিছু শিখলেন—তা হলো ‘লাল রঙের অনুভূতি’ বা কোয়ালিয়া (Qualia)।

একই যুক্তিতে, একজন সর্বজ্ঞাতা সত্তা যদি কেবল তথ্যগতভাবে জানেন যে “ধর্ষিত শিশুটি আতঙ্কিত”, তবে সেই জ্ঞান কেবল প্রস্তাবনামূলক (Propositional)। কিন্তু আতঙ্কের সেই সুতীব্র শারীরিক ও মানসিক ‘অনুভূতি’ বা কোয়ালিয়াটি যদি সেই সত্তার অভিজ্ঞতায় না থাকে, তবে তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ, “আতঙ্ক কী” তা জানা আর “আতঙ্ক অনুভব করা” এক বিষয় নয়।

🧠
২
এম্প্যাথি ও মিরর নিউরনের অনুপস্থিতি
স্নায়ুবিজ্ঞান অনুযায়ী, সহমর্মিতা বা এম্প্যাথি (Empathy) মূলত দুটি স্তরে কাজ করে:
  • কগনিটিভ এম্প্যাথি: অন্যের কষ্ট কেবল বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারা।
  • অ্যাফেক্টিভ এম্প্যাথি: অন্যের কষ্ট নিজের স্নায়ুতন্ত্রে অনুভব করা।
মানুষের মস্তিষ্কের মিরর নিউরন এবং অ্যান্টিরিয়র ইনসুলা (Anterior Insula) আমাদের অন্য প্রাণীর কষ্টকে নিজের ভেতরে ‘সিমুলেট’ করতে সাহায্য করে [27]। যদি কোনো সত্তা দেহহীন বা জৈবিক বিবর্তনের ঊর্ধ্বে হন, তবে তার পক্ষে এই ‘অ্যাফেক্টিভ এম্প্যাথি’ থাকা জৈবিকভাবে অসম্ভব। যদি ঈশ্বর ক্ষুধার্ত মানুষের পাকস্থলীর জ্বলন কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের হাহাকার নিজের স্নায়ুতন্ত্রে (যদি থেকে থাকে) অনুভব না করেন, তবে তার “রহমান” বা “রাহিম” (পরম দয়ালু ও করুণাময়) হওয়ার দাবিটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারণ, সহানুভূতির আদি শর্তই হলো অন্যের যন্ত্রণাকে নিজের ভেতরে ধারণ করা। যে যন্ত্রণা অনুভব করা যায় না, তার প্রতি প্রকৃত করুণা প্রদর্শন কেবল একটি যান্ত্রিক বা গাণিতিক দয়া হতে পারে, মানবিক বা আবেগীয় সহমর্মিতা নয়।
⏳
৩
সীমাবদ্ধতার জ্ঞান বনাম অসীম সত্তা
সর্বজ্ঞানী হওয়ার জন্য একটি যৌক্তিক প্যারাডক্স বা কূটাভাস তৈরি হয়। পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো:
  • ভয় পাওয়া বা আতঙ্কের অনুভূতি।
  • শারীরিক লালসা বা যৌন তৃপ্তির অভিজ্ঞতা।
  • সীমাবদ্ধ হওয়ার বা মৃত্যুভয়ের অভিজ্ঞতা।
যদি ঈশ্বর অসীম এবং অমর হন, তবে তার পক্ষে ‘মরণশীলতার ভয়’ অনুভব করা অসম্ভব। যদি তিনি অভীষ্ট বা কামনার ঊর্ধ্বে হন, তবে ‘লোভ’ বা ‘লালসা’র অনুভূতি তার কাছে অপরিচিত। ফলে, মানুষের জীবনের একটি বিশাল অংশের অভিজ্ঞতা (যা আবেগ ও দেহজ অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে) সেই সত্তার কাছে কেবল ‘বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ’ হিসেবে থাকে, ‘অন্তর্নিহিত উপলব্ধি’ হিসেবে নয়।

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত: যদি কোনো সত্তা ক্রোধ, ঘৃণা, যৌন আনন্দ কিংবা অসহায়ত্বের মতো তীব্র দেহজ ও মানসিক অনুভূতিগুলো নিজে সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে না জানেন, তবে তার “সর্বজ্ঞতা” কেবল তাত্ত্বিক বা ডাটাবেজ-ভিত্তিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ। এই ধরনের জ্ঞানকে “পরিপূর্ণ জ্ঞান” বলা চলে না, কারণ এতে মহাবিশ্বের সচেতন প্রাণীদের অভিজ্ঞতার নির্যাস বা ‘কোয়ালিয়া’ অনুপস্থিত থাকে।


উপসংহার

সুতরাং ইসলামী আল্লাহ ধারণা সর্বজ্ঞতার প্রশ্নে এক কঠিন দার্শনিক ফাঁদে আটকে যায়। যদি আল্লাহ মানুষের দুঃখ, আতঙ্ক, ক্ষুধা, যৌনতা, অপমান, ধর্ষণ-আঘাত, মৃত্যুভয়—এসব অভিজ্ঞতা কেবল তথ্য হিসেবে জানেন, তবে তিনি সর্বজ্ঞ নন; তিনি কেবল মহাজাগতিক তথ্যভাণ্ডার। যদি তিনি এগুলো সত্যিই অভ্যন্তরীণভাবে অনুভব করেন, তবে তার চেতনা প্রতিটি মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত যন্ত্রণা, পাপ, লজ্জা, নিষিদ্ধ আনন্দ এবং অসহায়তার দ্বারা আক্রান্ত। তখন তার পবিত্র, নির্বিকার, পরম ও অদেহী সত্তার ধারণা ভেঙে পড়ে। আর যদি বলা হয়, আল্লাহ এসব ‘অন্যভাবে’ জানেন—যা মানুষ বুঝতে পারে না—তবে সেটি কোনো ব্যাখ্যা নয়, বরং যুক্তি এড়ানোর ধর্মীয় কৌশল। অতএব, সর্বজ্ঞতার দাবি এখানে ঈশ্বরের মহিমা নয়; বরং ঈশ্বরতত্ত্বের অভ্যন্তরীণ অসংগতির নগ্ন প্রকাশ।



তথ্যসূত্রঃ
  1. Wierenga, E. R. (2021). Omniscience. In E. N. Zalta (Ed.), The Stanford Encyclopedia of Philosophy. Stanford University. ↩︎
  2. Nagel, T. (1974). What Is It Like to Be a Bat? The Philosophical Review, 83(4), 435–450. 1 2
  3. Jackson, F. (1982). Epiphenomenal Qualia. The Philosophical Quarterly, 32(127), 127–136. 1 2
  4. Rizzolatti, G., & Craighero, L. (2004). The Mirror-Neuron System. Annual Review of Neuroscience, 27, 169–192. ↩︎
  5. Iacoboni, M. (2009). Imitation, Empathy, and Mirror Neurons. Annual Review of Psychology, 60, 653–670. ↩︎
  6. Norman Kretzmann (1966), Omniscience and Immutability, The Journal of Philosophy, 63(14), 409–421 1 2
  7. Stanford Encyclopedia of Philosophy, Omniscience, Section 4.2: Omniscience and Knowledge de se ↩︎
  8. Quran 6:59; Quran 50:16; Quran 57:3. ↩︎
  9. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৬৯; কিয়ামতের দিন অসুস্থতা, খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে আল্লাহর বক্তব্য ↩︎
  10. কোরআন, সূরা আনআম ৬:১৪ ↩︎
  11. কোরআন, সূরা বাকারা ২:২৫৫ ↩︎
  12. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৮২৬; আল্লাহকে কষ্ট দেওয়ার বর্ণনা ↩︎
  13. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৪৭ক; বান্দার তওবায় আল্লাহর আনন্দের বর্ণনা ↩︎
  14. Al-Ghazālī. (2000). The Incoherence of the Philosophers. Translated by Michael E. Marmura. Brigham Young University Press. ↩︎
  15. Quran 42:11; Quran 112:1–4. ↩︎
  16. Wolfson, H. A. (1976). The Philosophy of the Kalam. Harvard University Press. ↩︎
  17. Yujin Nagasawa (2008), God and Phenomenal Consciousness: A Novel Approach to Knowledge Arguments, Chapter 3: The Argument from Concept Possession (1), Cambridge University Press, pp. 36–57 ↩︎
  18. Chalmers, D. J. (1995). Facing Up to the Problem of Consciousness. Journal of Consciousness Studies, 2(3), 200–219. ↩︎
  19. Stanford Encyclopedia of Philosophy, Omniscience, Section 4.1: Omniscience and Immutability ↩︎
  20. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৫৪৫৩২: আল্লাহর পূর্বজ্ঞান, তাকদির ও পরিবর্তন; ইবনে হাজার ও ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য ↩︎
  21. Ebrahim Azadegan (2022), On the Incompatibility of God’s Knowledge of Particulars and the Doctrine of Divine Immutability: Towards a Reform in Islamic Theology, Religious Studies, 58(2), 327–344; online publication: 2020 ↩︎
  22. Schwitzgebel, E. (2019). Introspection. In E. N. Zalta (Ed.), The Stanford Encyclopedia of Philosophy. Stanford University. ↩︎
  23. Decety, J., & Jackson, P. L. (2004). The Functional Architecture of Human Empathy. Behavioral and Cognitive Neuroscience Reviews, 3(2), 71–100. ↩︎
  24. Russell, B. (1911). Knowledge by Acquaintance and Knowledge by Description. Proceedings of the Aristotelian Society, 11, 108–128. ↩︎
  25. Hasan, A., & Fumerton, R. (2024). Knowledge by Acquaintance versus Description. In E. N. Zalta & U. Nodelman (Eds.), The Stanford Encyclopedia of Philosophy. Stanford University. ↩︎
  26. Jackson, F. (1982). Epiphenomenal Qualia. Philosophical Quarterly, 32, 127–136. ↩︎
  27. Decety, J., & Jackson, P. L. (2004). The Functional Architecture of Human Empathy. Behavioral and Cognitive Neuroscience Reviews, 3(2), 71–100. ↩︎

About This Article

Genre: Philosophical, Theological, Consciousness-Based, and Religion-Critical Analysis of Divine Omniscience

Epistemic Position: Rational Skepticism, Philosophy of Mind, Qualia Theory, Empathy Studies, Islamic Theology Critique, and Source-Based Criticism of Omniscience Claims

This article examines whether Allah's claimed omniscience can include not only factual knowledge, but also the inner experiential reality of human pain, grief, fear, shame, desire, trauma, and bodily suffering.

Its scope includes propositional knowledge, experiential knowledge, qualia, Mary’s Room, Thomas Nagel’s subjective-experience argument, mirror neurons, empathy, Islamic tanzih, divine purity, and the tension between an incorporeal God and embodied human experience.

The central argument is simple: if Allah only knows human suffering as information, then his knowledge is incomplete. If he actually feels every human experience from within, then his purity, transcendence, and non-human nature become philosophically unstable.

The article rejects the vague apologetic escape that “Allah knows in a way we cannot understand.” That is not an explanation; it is a retreat into mystery after the contradiction becomes visible.

This article should be evaluated through philosophy of mind, logical consistency, experiential knowledge, Islamic theology, consciousness studies, and the problem of divine attributes—not through devotional reverence, mystery-based evasion, theological intimidation, or the demand that “omniscience” be accepted without defining what complete knowledge actually means.

Leave a comment

Your email will not be published.