ভূমিকাঃ কোরআনের হাফস ইবন সুলাইমানের কিরাআত
ইসলামে কোরআন ও হাদিসের প্রামাণ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে বর্ণনাসূত্র বা সনদকে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। কে কার কাছ থেকে শুনেছেন বা শিখেছেন, বর্ণনাকারী সত্যবাদী কি না, শোনা কথা ঠিকভাবে মনে রাখতে বা লিখে রাখতে পারতেন কি না—এসব বিচার করেই একটি বর্ণনা গ্রহণ বা বর্জনের সিদ্ধান্ত হয়। হাদিসের ক্ষেত্রে এই বিচার এত কঠোর হতে পারে যে, কোনো বর্ণনাকারীর বক্তব্য লিখে রাখতেও নিষেধ করা হয়। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত কোরআন-পাঠের বর্ণনাকারী হাফস ইবন সুলাইমানের সম্পর্কে প্রাচীন সমালোচকদের এমন রায়ই সংরক্ষিত আছে।
হাফস ইবন সুলাইমান আল-কূফীর নামেই পরিচিত হাফস ‘আন ‘আসিম পাঠ আজ বিপুলসংখ্যক মুসলমান অনুসরণ করেন। অথচ হাদিসের রিজাল-শাস্ত্রে—বর্ণনাকারীদের জীবনী ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যে শাস্ত্র—তাঁকে দুর্বল, অনির্ভরযোগ্য ও মাতরুক বা পরিত্যাজ্য বলা হয়েছে। কয়েকটি সূত্রে মিথ্যাচার ও হাদিস তৈরির অভিযোগও আছে। একই ব্যক্তির হাদিস প্রত্যাখ্যাত, তাঁর কোরআন-পাঠ অত্যন্ত মর্যাদাবান: এই পার্থক্য ইসলামের বর্ণনাসূত্রভিত্তিক প্রামাণ্যতার দাবিকে কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলে। এক বিষয়ে বেশি অনুশীলন দক্ষতার পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু সততার অভিযোগের নিষ্পত্তি, একটি নির্দিষ্ট শব্দের উৎস এবং সেই শব্দের অভ্রান্ত সংরক্ষণের দাবি—প্রত্যেকটির জন্য নিজস্ব প্রমাণ লাগে।
হাফসকে নিয়ে সমস্যার কেন্দ্রে আছে কোরআনের পাঠসংরক্ষণ সম্পর্কে দুটি ভিন্ন বক্তব্য। একটি হলো, প্রাচীন শিক্ষক ও লিখিত মুশাফের সাহায্যে একটি পাঠধারা দীর্ঘকাল ধরে শেখানো হয়েছে। অন্যটি হলো, আজকের মুশাফের প্রত্যেকটি উচ্চারিত শব্দ ও স্বরচিহ্ন নিশ্চিতভাবে মুহাম্মদের উচ্চারণ বহন করে এবং তাতে মানুষের ভুলের কোনো সুযোগ নেই। দ্বিতীয় বক্তব্য প্রথমটির চেয়ে অনেক বড় দাবি। পাঠভেদ, শিক্ষকের বিপরীতে শিষ্যের নির্বাচন, পণ্ডিতদের অনুমোদন এবং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ—এসবের ইতিহাস সেই দাবির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কেবল “সংরক্ষিত” শব্দ ব্যবহার করে এই আলাদা বিষয়গুলো ঢেকে দিলে বিশ্বাসের ঘোষণা ইতিহাসের প্রমাণ সেজে বসে।
কিরাআত ও হাদিসঃ ভিন্ন মূল্যায়নের দ্বৈত মানদণ্ড
কিরাআত মানে কোরআনের স্বীকৃত পাঠপদ্ধতি। এতে কোন শব্দ কীভাবে উচ্চারিত হবে, কোথায় স্বর দীর্ঘ হবে, কোন ব্যাকরণগত রূপ ব্যবহৃত হবে—এসবের বিবরণ থাকে। হাদিসের মতো কিরাআতের ইতিহাসেও শিক্ষক, ছাত্র ও বর্ণনাসূত্র গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গে আছে লিখিত মুশাফের রসম, অর্থাৎ মূল বর্ণকাঠামো। প্রথম যুগের লেখায় আজকের মতো সব যের-জবর-পেশ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ আলাদা করার বিন্দু নিয়মিতভাবে লেখা হতো না। ফলে একই বর্ণকাঠামো একাধিকভাবে পড়া সম্ভব। কোনো পুরোনো পাণ্ডুলিপিতে বর্ণগুলো মিলে গেলেই আজকের একটি নির্দিষ্ট উচ্চারণ তার সমস্ত স্বরসহ প্রমাণিত হয় না। এই ব্যবধানেই মৌখিক শিক্ষাপরম্পরা ও তার নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে মানুষ কাজ করেছেন: শুনেছেন, মুখস্থ করেছেন, লিখেছেন, অন্য পাঠের সঙ্গে মিলিয়েছেন এবং ছাত্রদের শিখিয়েছেন। ভুল শুনে রাখা, ভুল মনে থাকা এবং জেনেশুনে ভুল বলা আলাদা সমস্যা। হাদিসশাস্ত্রে তাই সততা ও তথ্য সংরক্ষণের ক্ষমতা আলাদাভাবে বিচার করা হয়। কোনো মানুষ একটি বিদ্যায় বেশি দক্ষ হতে পারেন; তাঁর অন্য বিদ্যায় দুর্বলতার কারণও খুঁজে দেখা যায়। কিন্তু “কিরাআতের ইমাম” উপাধি দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রত্যেকটি আপত্তির উত্তর হয়ে যায় না। উপাধির পেছনে কী মূল্যায়ন আছে এবং নির্দিষ্ট পাঠটির পক্ষে কী সাক্ষ্য আছে, সেই তথ্যই তাঁর ভূমিকা বিচার করার ভিত্তি।
হাফসের ক্ষেত্রে আপত্তি ছিল গুরুতর। আলী ইবনুল মাদিনী বলেছেন, তিনি জেনেশুনে তাঁকে বর্জন করেছেন; বুখারি লিখেছেন, মুহাদ্দিসরা তাঁকে বর্জন করেছেন; নাসায়ী বলেছেন, তাঁর হাদিস লেখা যাবে না। আবার কিছু পণ্ডিত কিরাআতে তাঁর দক্ষতার প্রশংসা করেছেন। এই বিভিন্ন রায়ের কারণ পরীক্ষা করার বদলে কোরআনের ধর্মীয় মর্যাদা দিয়ে হাফসকে সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে তুলে দিলে দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হয়। মানুষের বর্ণনা হওয়ার কারণে হাদিসে যে ভুল ও অসততার প্রশ্ন তোলা হয়, কোরআনের পাঠ বহনের ক্ষেত্রেও সেই মানুষের কাজ পরীক্ষা করার অধিকার থাকে।
হাফসের অধিকাংশ পাঠ অন্য পাঠকদের সঙ্গে মিলতে পারে, লিখিত মুশাফও বহু ক্ষেত্রে সমর্থন দিতে পারে। কোন সাক্ষ্য কোন অংশকে সমর্থন করছে, সেটি নির্দিষ্ট করলেই পরীক্ষাটি অর্থবহ হয়। একটি আয়াতের প্রায় সব শব্দ সবার মধ্যে এক হলেও একটি স্বর বা শব্দরূপ আলাদা থাকতে পারে। পুরো আয়াতের পরিচিতি সেই আলাদা রূপটির উৎসের প্রমাণ নয়। একইভাবে এক শিক্ষকের বহু শিষ্য থাকলেই তাঁদের প্রত্যেকের প্রত্যেকটি বর্ণনা স্বাধীন সাক্ষ্য হয় না। শিক্ষকের কাছে পৌঁছানোর পথ, পাঠের অমিল এবং পরবর্তী সংকলনের বিবরণ মিলিয়েই সেই স্বাধীনতা বিচার করতে হয়।
হাফসঃ একই মানুষের দ্বৈত পরিচয়
হাফস ছিলেন কুফার পাঠক ও শিক্ষক। তাঁর মৃত্যুর প্রসিদ্ধ সাল ১৮০ হিজরি বা ৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দ; আল-মিযযির জীবনীতে ১৯০ হিজরির কাছাকাছি মৃত্যুর আরেকটি মতও সংরক্ষিত আছে। মুহাম্মদের মৃত্যুর বহু পরে জীবিত এই বর্ণনাকারীর কাছে পাঠ পৌঁছেছে পূর্ববর্তী শিক্ষকদের মাধ্যমে; তাঁর কাছ থেকেও তা আরও কয়েক প্রজন্মের শিক্ষক ও সংকলকের হাতে গেছে। ফলে হাফসের নামের সঙ্গে পরিচিতি এবং মুহাম্মদের যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের ইতিহাস জানা এক বিষয় নয়। তাঁর জীবনী, শিক্ষকের সঙ্গে সম্পর্ক এবং শিষ্যদের বর্ণনা সেই ইতিহাসের নির্দিষ্ট উপাদান।
কোরআনের বর্ণনাকারী হিসেবে হাফস
হাফস ছিলেন কুফার কোরআন-পাঠের শিক্ষক আসিম ইবন আবি আন-নাজুদএর ছাত্র ও সৎপুত্র। আল-মিযযির জীবনী অনুযায়ী, তাঁরা একই বাড়িতে থাকতেন। আসিমের কাছে শেখা পাঠ তাঁর মাধ্যমে পরবর্তী শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায় এবং “হাফস ‘আন ‘আসিম”—অর্থাৎ আসিমের সূত্রে হাফসের বর্ণনা—নামে পরিচিত হয়। আসিমের আরেক প্রধান ছাত্র ছিলেন আবু বকর শু‘বা ইবন আইয়াশ। দুজনের পাঠ পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, একই শিক্ষকের নামে সংরক্ষিত ধারার ভেতরেও শব্দ ও স্বরের পার্থক্য রয়েছে।
এই পরিচয়ে তিনটি স্তর আছে। আসিমের নামে যে সামগ্রিক পাঠধারা, সেটি কিরাআত; সেই ধারার হাফস বা শু‘বার বর্ণনাকে বলা হয় রিওয়ায়াত; আর হাফসের পরবর্তী কোন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে কোন পথ এসেছে, সেটি তরীক। সহজভাবে: আসিম → হাফস → হাফসের পরবর্তী নির্দিষ্ট ছাত্র। শেষের ছাত্রদের বর্ণনাতেও কোথাও ভিন্নতা আছে। তাই “হাফসের পাঠ” বললে একটি পরিচিত ধারা বোঝায়; নামটি নিজে সেই ধারার প্রতিটি শব্দের সমস্ত পথ জানিয়ে দেয় না। সূরা রুমের পাঠ নিয়ে ইবন আল-জাযারির বিবরণে উবাইদ ও আমরের মতো পরবর্তী বর্ণনাকারীদের পথ আলাদাভাবে এসেছে।
হাফসের পাঠ উসমানি সাম্রাজ্যে প্রচলিত ছিল; আধুনিক মিশরীয় মুশাফ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রণ ও বিতরণ তার বিস্তার আরও বাড়িয়েছে। আজ এটাই সর্বাধিক ব্যবহৃত ধারা। পাশাপাশি উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকায় ওয়ারশ, অন্য অঞ্চলে কালুন ও দুরির মতো স্বীকৃত পাঠও ব্যবহৃত হয়। হাফসের বর্তমান প্রাধান্য বুঝতে এই শিক্ষা ও মুদ্রণের ইতিহাস জরুরি: একটি পুরোনো ধারার বিপুল বিস্তার কীভাবে ঘটেছে, তার ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যায়।
হাফস বনাম শু‘বাঃ একই শিক্ষকের দুই ছাত্র, দুই ভিন্ন পাঠভেদ
আসিমের প্রধান দুই ছাত্র হাফস ও শু‘বা একই শিক্ষকের কাছে শিখলেও তাঁদের নামে সংরক্ষিত পাঠ সব স্থানে অভিন্ন নয়। এই পার্থক্য শুধু সুর, গলার টান বা আবৃত্তির সৌন্দর্য নিয়ে নয়। কোথাও স্বর বদলে শব্দের অর্থ বদলেছে, কোথাও একবচনের জায়গায় বহুবচন এসেছে। একজন শিক্ষকের একাধিক পাঠ জানা এবং ছাত্রদের আলাদা রূপ শেখানোর বিবরণও ঐতিহ্যের মধ্যে আছে। ফলে একই শিক্ষকের নাম শুনেই তাঁর দুই ছাত্র সর্বত্র একই উচ্চারণ পৌঁছে দিয়েছেন ধরে নেওয়া ভুল।
এই পার্থক্যের নির্দিষ্ট উদাহরণ সূরা রূম ৩০:২২। হাফসের পাঠে لِلْعَالِمِينَ অর্থ “জ্ঞানীদের জন্য”; শু‘বাসহ অন্যদের পাঠে لِلْعَالَمِينَ অর্থ “জগৎসমূহের জন্য” বা প্রসঙ্গ অনুযায়ী সমস্ত মানুষের জন্য। আবার ৩০:৫০-এ হাফসের آثَارِ বহুবচন—রহমতের “নিদর্শনসমূহ”; শু‘বার أَثَرِ একবচন—“নিদর্শন”। এগুলো শুধু গলার টান বা সুরের পার্থক্য নয়; শব্দের রূপ ও নির্দেশিত অর্থ আলাদা। একই শিক্ষকের নামে সংরক্ষিত দুই ধারাতেও যে একটিমাত্র অভিন্ন শব্দবিন্যাস নেই, তার সরাসরি উদাহরণ এগুলো। [1]
واختلفوا في : للعالمين ، فروى حفص بكسر اللام
বাংলা অনুবাদ: “লিল-আলামীন” শব্দের পাঠে মতভেদ হয়েছে; হাফস লাম অক্ষরে যের দিয়ে বর্ণনা করেছেন।
যাহাবির আসিম-জীবনীতে দুই ছাত্রের আলাদা পাঠের ব্যাখ্যা সংরক্ষিত আছে। হাফসের সূত্রে বর্ণিত বক্তব্যে আসিম জানান, আবদুর রহমান আস-সুলামির কাছে শেখা পাঠটি তিনি হাফসকে শিখিয়েছেন, আর যির ইবন হুবাইশের কাছে শেখা পাঠটি আবু বকর ইবন আইয়াশকে শিখিয়েছেন। একই জীবনীতে সুলামির সূত্র আলী এবং যিরের সূত্র ইবন মাসউদের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। অর্থাৎ ঐতিহ্যের নিজের ব্যাখ্যাতেই আসিমের কাছে একাধিক পূর্ববর্তী ধারা ছিল। দুই ছাত্রের পার্থক্য ঢেকে দিয়ে “এক শিক্ষক, তাই এক অভিন্ন পাঠ” বললে সেই বিবরণই বাদ পড়ে। [2]
وروي عن حفص بن سليمان ، قال : قال لي عاصم : ما كان من القراءة التي قرأت بها على أبي عبد الرحمن ، فهي التي أقرأتك بها ، وما كان من القراءة التي أقرأت بها أبا بكر بن عياش ، فهي القراءة التي عرضتها على زر عن ابن مسعود .
বাংলা অনুবাদ: হাফস ইবন সুলাইমানের সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন: আসিম আমাকে বলেছেন, আবু আবদুর রহমানের কাছে আমি যে পাঠ পড়েছি, সেটিই তোমাকে শিখিয়েছি। আর আবু বকর ইবন আইয়াশকে যে পাঠ শিখিয়েছি, সেটি যিরের কাছে পড়ে শুনিয়েছি, ইবন মাসউদের সূত্রে।
হাদিস বর্ণনাকারী হিসেবে হাফস
হাদিসের ক্ষেত্রে হাফসের মূল্যায়ন আরও কঠোর। আল-মিযযির সংকলনে স্মৃতিশক্তি, বর্ণনার যথার্থতা ও সততা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচকের আপত্তি একত্রে আছে। সবার বক্তব্য একই নয়: কেউ হাদিসে দুর্বল বলেছেন, কেউ বর্ণনা বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন, কেউ সরাসরি মিথ্যাচারের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের নিজস্ব শব্দগুলো থেকেই আপত্তির প্রকৃতি বোঝা যায়।
| সমালোচক | সংরক্ষিত মূল্যায়ন | উৎস ও অবস্থান |
|---|---|---|
| বুখারি | تركوه — মুহাদ্দিসরা তাঁকে বর্জন করেছেন | তাহযীবুল কামাল, ৭/১৪; আল-দুয়াফা আস-সাগির-এর বক্তব্য |
| মুসলিম | متروك — পরিত্যক্ত | তাহযীবুল কামাল, ৭/১৪ |
| আহমদ ইবন হাম্বল | متروك الحديث — হাদিসে পরিত্যক্ত; একই জীবনীতে তাঁর নামে ইতিবাচক মূল্যায়নও সংরক্ষিত | তাহযীবুল কামাল, ৭/১৩ |
| ইয়াহইয়া ইবন মাঈন | ليس بثقة — নির্ভরযোগ্য নন; অন্য একটি সূত্রে মিথ্যাবাদী বলার বর্ণনা আছে | তাহযীবুল কামাল, ৭/১৩ ও ১৫ |
| নাসায়ী | ليس بثقة ولا يكتب حديثه — নির্ভরযোগ্য নন, তাঁর হাদিস লেখা যাবে না; অন্যত্র মাতরুক | তাহযীবুল কামাল, ৭/১৪ |
| আবু হাতিম আর-রাযি | ضعيف الحديث لا يصدق متروك الحديث — হাদিসে দুর্বল, বিশ্বাসযোগ্য নন, হাদিসে পরিত্যক্ত | তাহযীবুল কামাল, ৭/১৫ |
| ইবন খিরাশ | كذاب متروك يضع الحديث — মিথ্যাবাদী, পরিত্যক্ত, হাদিস তৈরি করেন | তাহযীবুল কামাল, ৭/১৫ |
ইসলামকিউএতে প্রকাশিত ৩৪০৩৩৬ নম্বর উত্তরের সংকলক হাফসকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলার কয়েকটি সূত্রের মধ্যবর্তী বর্ণনাকারীর পরিচিতি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। ইবন খিরাশের রায় প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে তাঁর শিয়া মতাদর্শ এবং কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচয়ও ব্যবহার করেছেন। বর্ণনাসূত্রের নির্দিষ্ট দুর্বলতা একটি যাচাইযোগ্য আপত্তি; সমালোচকের মতাদর্শ তাঁর বক্তব্য মিথ্যা হওয়ার স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ নয়। একই উত্তরে হাফসের হাদিস পরিত্যক্ত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। ফলে ‘মিথ্যাবাদী’ কথার সূত্র নিয়ে বিরোধ এবং হাদিসে তাঁর বর্জনীয়তার রায় দুটি পৃথক তথ্য। প্রথমটির ওপর বিতর্ক দেখিয়ে দ্বিতীয়টি মুছে ফেলা যায় না। [3]
الثانية : أنه على فرض صحته عن ابن خراش، فهو مردود عليه قوله من أمرين : الأول : أنه متهم بالرفض، وقد صح ذلك فيه .
বাংলা অনুবাদ: দ্বিতীয়ত: ইবন খিরাশের সূত্রে কথাটি সঠিক বলে ধরে নিলেও তাঁর বক্তব্য দুটি কারণে প্রত্যাখ্যাত। প্রথমটি হলো, তিনি রাফিদি মতাবলম্বী বলে অভিযুক্ত, এবং তাঁর সম্পর্কে তা প্রমাণিত।
মাতরুক মানে বর্ণনাকারীর হাদিস পরিত্যাজ্য; কাযযাব মানে মিথ্যাবাদী। শব্দ দুটি আলাদা অভিযোগ বহন করে। গুরুতর ভুল বা অমনোযোগের কারণে একজনের হাদিস বর্জিত হতে পারে; মিথ্যাচারের অভিযোগে ইচ্ছাকৃত অসততার প্রশ্ন ওঠে। হাফসের জীবনীতে দুই ধরনের বক্তব্যই আছে। এই পার্থক্য তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনার ধার কমায় না; বরং কোন সমালোচক কী বলেছেন, তা স্পষ্ট করে। কিরাআতে বিশেষ অনুশীলন তাঁর স্মৃতির একটি ক্ষেত্র ব্যাখ্যা করতে পারে। অসততার অভিযোগের সত্যাসত্য নির্ধারণে অভিযোগের সূত্র ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের পরীক্ষা লাগে।
হাফসের নির্দিষ্ট পাঠগুলোর পক্ষে স্বাধীন সাক্ষ্য কতখানি—এটাই মূল প্রশ্ন। অন্য পাঠকের সঙ্গে মিল কোথায়, লিখিত মুশাফ কোন শব্দরূপকে সমর্থন করে, আর কোন ভিন্ন রূপ শুধু তাঁর একটি পথে এসেছে—এই হিসাব তাঁর ভূমিকার বাস্তব মূল্যায়ন দেয়। “কোরআন বলেই নির্ভুল” বললে সেই পরীক্ষা আগেই বন্ধ হয়ে যায়। তখন যে পাঠের প্রামাণ্যতা যাচাই করার কথা, তার ধর্মীয় মর্যাদাই যাচাইয়ের ফল স্থির করে দেয়।
হাদিস ও কিরাআতের নিয়ম এক না-হওয়ার কথাটি নিজেই অনুসন্ধানের বিষয়। গ্রহণযোগ্য হাদিসের জন্য সততা ও সংরক্ষণক্ষমতা জরুরি হলে কিরাআতে এগুলো কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে? রসম ও অন্য পাঠকের সাক্ষ্য কোন ঘাটতি পূরণ করেছে? কোনো পাঠ শাস্ত্রের নিয়মে অনুমোদিত হওয়া থেকে তার প্রতিটি উচ্চারণের নিশ্চিত ঐশ্বরিক উৎস কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বর্ণনাসূত্র ও পাঠের ইতিহাসে খুঁজতে হয়। দুই বিদ্যার আলাদা নাম সেই ইতিহাসের বিকল্প নয়।
হাফস বিন সুলাইমান-এর ‘মাতরুক’ হওয়ার দলিল
হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘মাতরুক’ মানে এমন গুরুতর দুর্বলতা, যার কারণে বর্ণনাকারীর হাদিস গ্রহণ করা হয় না। হাফসের বিরুদ্ধে আপত্তির মাত্রা বুঝতে ইবন হাজরের সংক্ষিপ্ত রায়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ: কিরাআতে ইমাম হওয়া সত্ত্বেও তিনি হাদিসে পরিত্যক্ত। একই বাক্যে দুই শাস্ত্রের বিপরীত মূল্যায়ন হাজির। ফলে এই দ্বৈত পরিচয় আধুনিক সমালোচকের বানানো অভিযোগ নয়; মুসলিম রিজাল-শাস্ত্রের নিজের ভাষাতেই তা সংরক্ষিত আছে। [4]
متروك الحديث مع إمامته في القراءة
বাংলা অনুবাদ: কিরাআতে ইমাম হওয়া সত্ত্বেও তিনি হাদিসে পরিত্যক্ত।
হাদিসশাস্ত্রে সততাকে বলা হয় আদালত, আর মুখস্থ বা লিখিত তথ্য যথাযথ ধরে রাখার ক্ষমতাকে বলা হয় দাবত। সানাউল্লাহ নজির আহমদের হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতিতে মাতরুকের আলোচনায় মিথ্যার অভিযোগ, সমাজে মিথ্যুক হিসেবে পরিচিতি, অধিক ভুল ও অমনোযোগের মতো কারণ এসেছে। ফলে একই বর্জনসূচক রায়ের পেছনে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হাফসের ক্ষেত্রে বুখারির “তাঁরা তাঁকে বর্জন করেছেন”, নাসায়ীর “তাঁর হাদিস লেখা যাবে না” এবং ইবন খিরাশের “হাদিস তৈরি করেন”—প্রত্যেকটি বক্তব্য তার নিজের অর্থ বহন করে। একটি অভিযোগের ভাষা বদলে আরেকটি বানালে দলিলের যথার্থতা নষ্ট হয়। [5]
সবার নিকট দুর্বল রাবির একলা বর্ণিত হাদিস মাতরুক এবং পরিত্যক্ত।

আল-মিযযির তাহযীবুল কামাল ফী আসমাঈর রিজালএর হাফস-জীবনীতে তাঁর পরিচয়, শিক্ষক-শিষ্য, সমালোচকদের মূল্যায়ন ও মৃত্যু-সংক্রান্ত মতগুলো একত্রে আছে। আহমদ ইবন হাম্বলের নামে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের রায়, ওয়াকির প্রশংসা এবং বুখারি, মুসলিম, নাসায়ী ও আবু হাতিমের কঠোর বক্তব্য একই জীবনীতে সংরক্ষিত। ফলে পরবর্তী ধর্মীয় মর্যাদা দিয়ে একরঙা চরিত্রচিত্রণ তৈরি করার সুযোগ নেই। জীবনীতে সংরক্ষিত এই বিরোধী মূল্যায়নগুলো হাফসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের প্রত্যক্ষ দলিল। [6]
1390 – (ت عس ق) : حفص بن سليمان الأسدي أبو عمر البزاز الكوفي القارئ ، ويقال له : الغاضري ، ويعرف بحفيص ، وهو حفص بن أبي داود صاحب عاصم بن أبي النجود في القراءة ، وابن امرأته ، وكان معه في دار واحدة . وقيل في نسبه : حفص بن سليمان بن المغيرة . روى عن : إسماعيل بن عبد الرحمن السدي ، وأيوب السختياني ، وثابت البناني ، وحماد بن أبي سليمان ، وحميد الخصاف ، وسالم الأفطس ، وسماك بن حرب ، وطلحة بن يحيى بن طلحة بن عبيد الله ، وعاصم بن أبي النجود (عس) ، وعاصم الأحول ، وعبد الله بن يزيد النخعي ، وعبد الملك عمير ، وأبي حصين عثمان بن عاصم ، وعلقمة بن مرثد ، وقيس بن مسلم ، وكثير بن زاذان (ت ق) ، وكثير بن شنظير (ق) ، وليث بن أبي سليم ، ومحارب بن دثار ، ومحمد بن سوقة ، ومحمد بن عبد الرحمن بن أبي ليلى ، وموسى بن أبي كثير ، وموسى الصغير ، والهيثم بن حبيب الصراف ، ويزيد بن أبي زياد ، وأبي إسحاق السبيعي ، وأبي إسحاق الشيباني . روى عنه : أحمد بن عبدة الضبي ، وآدم بن أبي إياس ، وأبو إبراهيم إسماعيل بن إبراهيم الترجماني ، وبكر بن بكار ، وجعفر بن حميد الكوفي ، والحسن بن محمد بن أعين ، وأبو عمر حفص بن عبد الله الحلواني الضرير ، وحفص بن غياث ، وسعد بن محمد بن الحسن بن عطية والد محمد بن سعد العوفي ، وسليمان بن داود أبو الربيع الزهراني ، وصالح بن مالك الأزدي الخوارزمي ، وصالح بن محمد الترمذي ، وأبو شعيب صالح بن محمد القواس ، وهو ممن روى عنه القراءة ، وعبد الله بن السري الأنطاكي ، وعبد الرحمن بن حماد الطلحي ، وعبد الغفار بن الحكم ، وعبيد بن الصباح بن أبي سريج النهشلي الخزاز ، وعثمان بن اليمان ، وأبو منصور عصام بن الوضاح البصري ، وعلي بن حجر المروزي (ت) ، وعلي بن عياش الحمصي ، وعلي بن يزيد الصدائي (عس) ، وعمرو بن حماد بن طلحة القناد ، وعمرو بن الصباح بن صبيح الكوفي المقرئ ، وعمرو بن عثمان الرقي ، وعمرو بن عون الواسطي ، وعمرو بن محمد الناقد ، ومحمد بن بكار بن الريان ، ومحمد بن حرب الخولاني (ق) ، ومحمد بن الحسن ابن التل الأسدي ، ومحمد بن سليمان لوين ، وأبو عمر هبيرة بن محمد التمار المقرئ ، وهشام بن عمار الدمشقي (ق) ، ويحيى بن سعيد العطار الحمصي ، ويسرة بن صفوان اللخمي الدمشقي . قال محمد بن سعد العوفي عن أبيه : حدثنا حفص بن سليمان : لو رأيته لقرت عيناك فهما ، وعلما . وقال أبو علي ابن الصواف : عن عبد الله بن أحمد بن حنبل عن أبيه : صالح . وقال عبد الرحمن بن أبي حاتم عن عبد الله بن أحمد فيما كتب إليه عن أبيه : متروك الحديث . وكذلك قال عمر بن محمد بن شعيب الصابوني ، عن حنبل بن إسحاق ، عن أحمد بن حنبل . وقال عثمان بن أحمد بن السماك عن حنبل بن إسحاق عن أحمد بن حنبل : ما به بأس . وقال علي بن الحسين بن حبان فيما قرأه بخط أبيه عن يحيى بن معين زعم أيوب بن متوكل قال : أبو عمر البزاز أصح قراءة من أبي بكر بن عياش ، وأبو بكر أوثق من أبي عمر . قال يحيى : وكان أيوب بن متوكل بصريا من القراء سمعته يقول هذا . وقال أبو قدامة السرخسي وعثمان بن سعيد الدارمي عن يحيى بن معين : ليس بثقة . وقال علي ابن المديني : ضعيف الحديث ، وتركته على عمد . وقال إبراهيم بن يعقوب الجوزجاني : قد فرغ منه من دهر . وقال البخاري : تركوه . وقال مسلم : متروك . وقال النسائي : ليس بثقة ولا يكتب حديثه . وقال في موضع آخر : متروك . وقال صالح بن محمد البغدادي : لا يكتب حديثه ، وأحاديثه كلها مناكير . وقال زكريا بن يحيى الساجي : يحدث عن سماك ، وعلقمة بن مرثد ، وقيس بن مسلم ، وعاصم أحاديث بواطيل . وقال أبو زرعة : ضعيف الحديث . وقال عبد الرحمن بن أبي حاتم : سألت أبي عنه فقال : لا يكتب حديثه هو ضعيف الحديث ، لا يصدق ، متروك الحديث . قلت : ما حاله في الحروف ؟ قال : أبو بكر بن عياش : أثبت منه . وقال عبد الرحمن بن يوسف بن خراش : كذاب متروك يضع الحديث . وقال الحاكم أبو أحمد : ذاهب الحديث . وقال يحيى بن سعيد عن شعبة : أخذ مني حفص بن سليمان كتابا فلم يرده ، وكان يأخذ كتب الناس فينسخها . وقال أبو أحمد بن عدي عن الساجي عن أحمد بن محمد البغدادي عن يحيى بن معين : كان حفص بن سليمان ، وأبو بكر بن عياش من أعلم الناس بقراءة عاصم ، وكان حفص أقرأ من أبي بكر ، وكان كذابا ، وكان أبو بكر صدوقا ؟ قال أبو أحمد : ولحفص غير ما ذكرت من الحديث ، وعامة حديثه عمن روى عنهم غير محفوظة . قيل : إنه مات سنة ثمانين ومائة ، وله تسعون سنة . وقيل : مات قريبا من سنة تسعين ومائة . قاله أبو عمرو الداني . المقرئ ، وقال : قال وكيع : كان ثقة . روى له الترمذي ، والنسائي في مسند علي متابعة ، وابن ماجه .
বাংলা অনুবাদ: তাহযীবুল কামাল ফী আসমাঈর রিজাল
আল-মিযযি — জামাল উদ্দিন আবুল হাজ্জাজ আল-মিযযি
খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ১১-১৬
১৩৯০ – (ত, উস, ক্ব): হাফস বিন সুলাইমান আল-আসাদি, আবু উমর আল-বাযযায
তিনি কূফার অধিবাসী এবং একজন ক্বারী (কুরআন পাঠকারী)। তাঁকে ‘আল-গাদ্বিরি’ বলা হয় এবং ‘হাফীস’ নামেও তিনি পরিচিত। তিনি হাফস বিন আবি দাউদ এবং কিরাআত শাস্ত্রে আসিম বিন আবি আন-নুজূদের সহচর ও তাঁর স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান (সৎ ছেলে)। তিনি আসিমের সাথে একই ঘরে বসবাস করতেন। তাঁর বংশপরিচয় সম্পর্কে এ-ও বলা হয়েছে যে, তিনি হাফস বিন সুলাইমান বিন আল-মুগীরা। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১১)
যাঁদের নিকট থেকে তিনি বর্ণনা করেছেন (শিক্ষকবৃন্দ):
তিনি ইসমাইল বিন আবদুর রহমান আস-সুদ্দী, আইয়ুব আস-সাখতিয়ানি, সাবিত আল-বুনানি, হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান, হুমায়দ আল-খাসসাফ, সালিম আল-আফতাস, সিমাক বিন হারব, তালহা বিন ইয়াহইয়া বিন তালহা বিন উবাইদুল্লাহ, আসিম বিন আবি আন-নুজূদ, আসিম আল-আহওয়াল, আবদুল্লাহ বিন ইয়াযিদ আন-নাখয়ি, আবদুল মালিক ইবনে উমাইর, আবু হাসিন উসমান বিন আসিম, আলকামা বিন মারসাদ, কায়েস বিন মুসলিম, কাসীর বিন যাযান, কাসীর বিন শিনযীর, লাইস বিন আবি সুলিম, মুহারিব বিন দিসার, মুহাম্মদ বিন সাওক্বাহ, মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন আবি লায়লা, মুসা বিন আবি কাসীর, মুসা আস-সাগীর, হায়সাম বিন হাবিব আস-সাররাফ, ইয়াযিদ বিন আবি যিয়াদ, আবু ইসহাক আস-সাবি’য়ি এবং আবু ইসহাক আশ-শায়বানি প্রমুখের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১১)
যাঁরা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন (ছাত্রবৃন্দ):
তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন আহমদ বিন আবদাহ আদ-দব্বি, আদম বিন আবি ইয়াস, আবু ইব্রাহিম ইসমাইল বিন ইব্রাহিম আত-তারজুমানি, বকর বিন বক্কার, জাফর বিন হুমায়দ আল-কূফি, হাসান বিন মুহাম্মদ বিন আয়ুন, আবু উমর হাফস বিন আবদুল্লাহ আল-হুলওয়ানি আদ-দরীর, হাফস বিন গিয়াস, মুহাম্মদ বিন সাদ আল-আউফির পিতা সাদ বিন মুহাম্মদ, সুলাইমান বিন দাউদ আবু রাবি’ আয-যাহরানি, সালিহ বিন মালিক আল-আযদি আল-খাওয়ারিযমি, সালিহ বিন মুহাম্মদ আত-তিরমিযি, আবু শুআইব সালিহ বিন মুহাম্মদ আল-কাওয়াস (যিনি তাঁর নিকট থেকে কিরাআতও বর্ণনা করেছেন), আবদুল্লাহ বিন আস-সাররি আল-আন্তাকি, আবদুর রহমান বিন হাম্মাদ আত-তালহি, আবদুল গাফফার বিন আল-হাকাম, উবাইদ বিন আস-সাব্বাহ আন-নাহশালি আল-খাযযায, উসমান বিন আল-ইয়ামান, আবু মনসুর ইসাম বিন আল-ওয়াদদাহ আল-বাসরি, আলী বিন হাজার আল-মারওয়াযি, আলী বিন আইয়াশ আল-হিমসি, আলী বিন ইয়াযিদ আস-সাদায়ি, আমর বিন হাম্মাদ আল-কান্নাদ, আমর বিন আস-সাব্বাহ আল-কূফি (মুক্রি), আমর বিন উসমান আর-রাক্কি, আমর বিন আউন আল-ওয়াসিতি, আমর বিন মুহাম্মদ আন-নাক্বিদ, মুহাম্মদ বিন বক্কার বিন আর-রায়্যান, মুহাম্মদ বিন হারব আল-খাওলানি, মুহাম্মদ বিন আল-হাসান আস-আসাদি, মুহাম্মদ বিন সুলাইমান লুয়াইন, আবু উমর হুবাইরা বিন মুহাম্মদ আত-তাম্মার, হিশাম বিন আম্মার আদ-দিমাশকি, ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-আত্তার এবং ইয়াসরা বিন সাফওয়ান আল-লাখমি প্রমুখ। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২)
ইমামদের মতামত (জরহ ও তা’দীল):
মুহাম্মদ বিন সাদ আল-আউফি তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি হাফস বিন সুলাইমান সম্পর্কে বলেছেন: “তুমি যদি তাঁকে দেখতে, তবে তাঁর সমঝ ও জ্ঞানের গভীরতা দেখে তোমার চোখ জুড়িয়ে যেত।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২)
আবু আলী ইবন আস-সাওয়াফ আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বলের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তাঁকে ‘সালিহ’ (ভালো/গ্রহণযোগ্য) বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
তবে আবদুর রহমান বিন আবি হাতিম, আবদুল্লাহ বিন আহমদের বরাতে লিখেছেন যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তাঁকে ‘মাতরুকুল হাদিস’ (যাঁর হাদিস বর্জন করা হয়েছে) বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
একই কথা উমর বিন মুহাম্মদ আস-সাবূনি, হাম্বল বিন ইসহাকের সূত্রে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
আবার উসমান বিন আহমদ ইবনে সাম্মাক, হাম্বল বিন ইসহাকের সূত্রে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “তাঁর মধ্যে কোনো সমস্যা নেই (মা বিহি বা’স)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
ইয়াহইয়া বিন মা’ঈন বলেন, আইয়ুব বিন মুতাওয়াক্কিল মনে করতেন যে, আবু বকর বিন আইয়াশের চেয়ে হাফস বিন সুলাইমান অধিক বিশুদ্ধ কিরাআত সম্পন্ন ছিলেন, তবে আবু বকর হাফসের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য (আওসাক্ব)। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
আবু কুদামা আস-সারাক্বসি এবং উসমান বিন সাঈদ আদ-দারিমি ইয়াহইয়া বিন মা’ঈনের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হাফস ‘সিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য) নন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩)
আলী ইবনুল মাদিনী বলেছেন: “তিনি হাদিসে দুর্বল এবং আমি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে বর্জন করেছি।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইব্রাহিম বিন ইয়াকুব আল-জুযজানি বলেছেন: “তাঁর বিষয় বহু আগেই চুকে গেছে (অর্থাৎ তিনি পরিত্যক্ত)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম বুখারী বলেছেন: “তাঁরা (মুহাদ্দিসগণ) তাঁকে বর্জন করেছেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম মুসলিম বলেছেন: “তিনি মাতরুক (পরিত্যক্ত)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম নাসায়ী বলেছেন: “তিনি নির্ভরযোগ্য নন এবং তাঁর হাদিস লেখা যাবে না।” অন্য স্থানে তিনি তাঁকে ‘মাতরুক’ বলেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
সালিহ বিন মুহাম্মদ আল-বাগদাদী বলেছেন: “তাঁর হাদিস লেখা যাবে না এবং তাঁর বর্ণিত সকল হাদিসই মুনকার (অস্বীকৃত)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
যাকারিয়া বিন ইয়াহইয়া আস-সাজি বলেছেন: “তিনি সিমাক, আলকামা ইবন মারসাদ, কায়েস ইবন মুসলিম এবং আসিম থেকে বাতিল (ভিত্তিহীন) হাদিস বর্ণনা করেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
আবু যুরআ বলেছেন: “তিনি হাদিসে দুর্বল।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৪)
ইমাম আবু হাতিম বলেছেন: “তাঁর হাদিস লেখা যাবে না, তিনি হাদিসে দুর্বল, বিশ্বাসযোগ্য নন এবং মাতরুকুল হাদিস।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
আবদুর রহমান বিন ইউসুফ বিন খিরাশ বলেছেন: “তিনি কذاب (চরম মিথ্যাবাদী), মাতরুক এবং হাদিস জাল করেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
হাকিম আবু আহমদ বলেছেন: “হাদিসে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে (যাহিবুল হাদিস)।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
শু’বা ইবনুল হাজ্জাজের সূত্রে ইয়াহইয়া বিন সাঈদ বর্ণনা করেন: “হাফস বিন সুলাইমান আমার কাছ থেকে একটি বই নিয়েছিলেন কিন্তু আর ফেরত দেননি; তিনি মানুষের বই নিয়ে সেগুলো নকল করতেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
ইবন আদি আস-সাজি → আহমদ ইবন মুহাম্মদ আল-বাগদাদি → ইয়াহইয়া ইবন মাঈন সূত্রে বর্ণনা করেন: “আসিমের কিরাআত সম্পর্কে হাফস এবং আবু বকর বিন আইয়াশ সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন; হাফস কিরাআতে আবু বকরের চেয়ে দক্ষ ছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন মিথ্যাবাদী, আর আবু বকর ছিলেন সত্যবাদী।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
ইবন আদি নিজের মূল্যায়নে বলেন: “তিনি যাঁদের থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁদের সূত্রে তাঁর অধিকাংশ হাদিস যথাযথভাবে সংরক্ষিত নয়।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
মৃত্যু:
বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ১৮০ হিজরিতে ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। আবু আমর আদ-দানি বলেন, তিনি ১৯০ হিজরির কাছাকাছি সময়ে ইন্তেকাল করেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৫)
ওয়াকী বিন আল-জাররাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: “তিনি নির্ভরযোগ্য ছিলেন।” (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৬)
তিরমিযি ও ইবন মাজাহ তাঁর থেকে বর্ণনা সংকলন করেছেন; নাসায়ী মুসনাদে আলী-তে তাঁর বর্ণনা মুতাবাআত বা সমর্থক সূত্র হিসেবে এনেছেন। (তাহযীবুল কামাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৬)
এই জীবনীতে হাফসের হাদিসের বিরুদ্ধে আপত্তির বিস্তার স্পষ্ট। বুখারি ও মুসলিমের বর্জনের রায়, নাসায়ীর হাদিস না-লেখার নির্দেশ এবং ইবন আদির অধিকাংশ বর্ণনা যথাযথ সংরক্ষিত না-থাকার মন্তব্য পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও আলাদা মূল্যায়ন। ইবন খিরাশের নামে আবার ইচ্ছাকৃত হাদিস তৈরির অভিযোগ আছে। তাঁর কিরাআতের মর্যাদা তুলে এই পুরো সমালোচনার ইতিহাস মুছে দেওয়া মানে একই ঐতিহ্যের সুবিধাজনক অংশ গ্রহণ করে অসুবিধাজনক অংশ বর্জন করা।
আবু হাতিমের বক্তব্যে কিরাআত সম্পর্কেও সরাসরি তুলনা আছে। তাঁর ছেলে আবদুর রহমান প্রথমে হাফসের হাদিস সম্পর্কে জানতে চান; তারপর আলাদাভাবে কোরআনের পাঠে তাঁর অবস্থা জিজ্ঞেস করেন। আবু হাতিমের উত্তর, আবু বকর ইবন আইয়াশ তাঁর চেয়ে বেশি সুদৃঢ়। অতএব কিরাআতে হাফসের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও প্রাচীন মূল্যায়ন একরকম ছিল না। আজকের বিশ্বব্যাপী প্রাধান্যকে প্রাচীন পণ্ডিতদের সর্বসম্মত শ্রেষ্ঠত্বের রায় বলে চালানো ঐতিহাসিকভাবে ভুল। [7]
وقال عبد الرحمن بن أبي حاتم : سألت أبي عنه فقال : لا يكتب حديثه هو ضعيف الحديث ، لا يصدق ، متروك الحديث . قلت : ما حاله في الحروف ؟ قال : أبو بكر بن عياش : أثبت منه .
বাংলা অনুবাদ: আবদুর রহমান ইবন আবি হাতিম বলেন: তাঁর সম্পর্কে আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেন, তাঁর হাদিস লেখা যাবে না। তিনি হাদিসে দুর্বল, বিশ্বাসযোগ্য নন, হাদিসে পরিত্যক্ত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোরআনের পাঠে তাঁর অবস্থা কী? তিনি বললেন, আবু বকর ইবন আইয়াশ তাঁর চেয়ে বেশি সুদৃঢ়।
উসুলুল হাদিস বনাম উসুলুল কিরাআতঃ দ্বিচারিতা?
একটি হাদিসকে সহিহ বলার পরিচিত পাঁচ শর্তে বর্ণনাকারীর সততা ও সংরক্ষণক্ষমতার পাশাপাশি পুরো সূত্রের সংযোগ এবং অন্য বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করা হয়। ভালো খ্যাতির একজন মানুষও ভুল সূত্র দিতে পারেন; বাহ্যিকভাবে সুন্দর সনদের ভেতরেও গোপন সমস্যা থাকতে পারে। এই শর্তগুলোর তাৎপর্য হলো, বিশ্বাসযোগ্যতা কোনো উপাধি দিয়ে স্থির করা হয় না। নির্দিষ্ট বর্ণনা, নির্দিষ্ট পথ এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের কাজ পরীক্ষা করা হয়।
বর্ণনাকারীর সততা ও নৈতিক নির্ভরযোগ্যতা। ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার এবং সত্য বলেও ভুল করা এক সমস্যা নয়; এই শর্ত প্রথমটির সঙ্গে সম্পর্কিত।
শোনা বিষয় মুখস্থ বা লিখিতভাবে যথাযথ ধরে রাখার ক্ষমতা। শুধু অসাধারণ স্মৃতিশক্তি নয়, নির্ভরযোগ্য নথি সংরক্ষণও এর অন্তর্ভুক্ত।
বর্ণনাটি অধিক নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যের বিরোধী না হওয়া। শুধু বিরল বা একক হলেই তা বাতিল হয় না; বিরোধের ধরন ও সাক্ষ্যের শক্তি বিচার করা হয়।
সনদের অবিচ্ছিন্ন সংযোগ। বর্ণনাকারীদের যোগাযোগ, সাক্ষাৎ বা গ্রহণযোগ্য উপায়ে তথ্য গ্রহণের সুযোগ এবং সূত্রের প্রকৃতি পরীক্ষা করা হয়।
বাহ্যিকভাবে ঠিক দেখালেও বর্ণনায় গ্রহণযোগ্যতা নষ্টকারী গোপন ত্রুটি না থাকা। সূত্রের অদলবদল বা ভুলভাবে বক্তব্য আরোপের মতো ত্রুটি তুলনামূলক পরীক্ষায় ধরা পড়তে পারে।
এই পাঁচ শর্তের প্রত্যেকটির কাজ আলাদা। একজন সত্যবাদী মানুষ ভুল মনে রাখতে পারেন; একজন নির্ভুলভাবে মুখস্থকারীও কোথা থেকে শুনেছেন, সেই পরিচয় ভুল দিতে পারেন; ঠিক নামের সনদেও দুজনের দেখা না-হওয়ার সমস্যা থাকতে পারে। ফলে একটি শর্তে প্রশংসা বাকি সব শর্তের নিশ্চয়তা দেয় না। হাফসের কিরাআত-দক্ষতার মূল্যায়ন তাঁর পাঠ মনে রাখার ক্ষমতা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তা দিয়ে তাঁর পূর্বসূত্র, পরবর্তী ছাত্রদের বর্ণনা এবং নির্দিষ্ট পাঠভেদের সাক্ষ্য একসঙ্গে প্রমাণ করা যায় না।
দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতার সম্পর্ক তাই নির্দিষ্ট কাজ ধরে বিচার করতে হয়। একজন শিক্ষক একটি পাঠ ভালোভাবে শেখাতে পারেন, অথচ সেই পাঠের প্রাচীন উৎস সম্পর্কে তাঁর কাছে সীমিত তথ্য থাকতে পারে। আবার একটি শব্দ তিনি নিজের বিবেচনায় অন্য রূপে পড়তে পারেন। প্রথম ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা আছে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ইতিহাসের দাবি, তৃতীয় ক্ষেত্রে নির্বাচন। তিনটিকে একই “ইমাম” উপাধির মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে শিক্ষক কী সংরক্ষণ করেছেন আর কী বেছে নিয়েছেন, সেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হারিয়ে যায়। সূরা রুম ৩০:৫৪-এ হাফসের নিজের নির্বাচন এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উদাহরণ।
হাফসের কোনো বর্ণনার সাধারণ অংশ এবং তার স্বতন্ত্র অংশের সাক্ষ্যও আলাদা হতে পারে। একটি আয়াতের বিশটি শব্দ সব পাঠে মিলে গেলে সেই মিল বিশটি শব্দের পক্ষে তথ্য দেয়। একুশতম শব্দে স্বর বা রূপ আলাদা হলে তার জন্য আলাদা ব্যাখ্যা ও সূত্র লাগে। জ্ঞানার্জন ফরজ হওয়ার হাদিসের প্রথম বাক্য অন্য সূত্রে সমর্থিত, অথচ হাফসের পূর্ণ বর্ণনার অতিরিক্ত অংশ বর্জিত—এমন মূল্যায়নেও একই যুক্তি কাজ করেছে। সমর্থনের পরিমাণ নির্ধারিত হয় কোন বক্তব্য সমর্থিত হয়েছে তার দ্বারা; বর্ণনাকারীর সমস্ত বক্তব্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কিরাআতের গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে ভাষা, লিখিত মুশাফ ও বর্ণনাসূত্র পরস্পরকে নিয়ন্ত্রণ করে। আরবিতে একটি রূপ সম্ভব হলেই তা কোরআনের পাঠ হয় না। মুশাফে রূপটি বসতে পারলেও কেউ বাস্তবে তা শিখিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্ন থাকে। বর্ণনা প্রচলিত হলেও লিখিত কাঠামোর সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে অনুমোদনের প্রশ্ন ওঠে। এই যাচাইয়ের ইতিহাস দেখায়, পণ্ডিতেরা সম্ভাব্য রূপগুলোর মধ্যে বাছাই করেছেন। ফলে বর্তমান স্বীকৃত তালিকার পেছনে তুলনা, গ্রহণ ও বর্জনের কাজ আছে; তালিকাটি নিজে সেই কাজের ইতিহাসকে অপ্রয়োজনীয় করে না।
স্বরচিহ্নহীন লেখার সীমা সূরা রুম ৩০:২২-এ সরাসরি ধরা পড়ে। لِلْعَالِمِينَ ও لِلْعَالَمِينَ লিখতে মূল বর্ণগুলো একই থাকে। যের-জবর যোগ করলে একটিতে “জ্ঞানী”, অন্যটিতে “জগৎসমূহ” বোঝায়। একটি পুরোনো অনুলিপিতে শুধু মূল বর্ণের মিল পাওয়া গেলে দুই রূপই তার সঙ্গে মানিয়ে যায়। কোন রূপ কোন শিক্ষকের মাধ্যমে এসেছে, তার জন্য পাঠের অন্য সাক্ষ্য লাগে। তাই পাণ্ডুলিপির তারিখ এবং নির্দিষ্ট স্বরের ইতিহাস সম্পর্কিত হলেও এক প্রমাণ দিয়ে দুই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর পাওয়া যায় না।
সূত্রের স্বাধীনতাও একইভাবে ধাপ ধরে বোঝা যায়। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে একশ ছাত্র শিখলে সেই একশজন শিক্ষকের বক্তব্য বহন করছেন। তাঁদের সংখ্যা শিক্ষকের আগের ধাপে একশ স্বাধীন উৎস তৈরি করে না। আবার দুই ছাত্রের পাঠ এক হলে মিল পাওয়া যায়, আলাদা হলে তাঁদের ভিন্ন রূপের কারণ খুঁজতে হয়। হাফস ও শু‘বার পাঠভেদে এই তুলনা জরুরি। পরবর্তী প্রজন্মের বিপুল শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে প্রথম দিকের অমিল বা সীমিত সূত্র মুছে ফেলা যায় না।
লিখিত বর্ণকাঠামো আর সম্পূর্ণ পাঠ: একই প্রমাণ নয়
মারাইন ভান পুটেনের ২০১৯ সালের গবেষণায় চৌদ্দটি প্রাচীন কোরআন-পাণ্ডুলিপির বানান তুলনা করা হয়েছে। “আল্লাহর অনুগ্রহ” ধরনের বাক্যে نعمة ও نعمت—একই শব্দের দুই বানান—কোন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে, তিনি তা পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন অনুলিপিতে একই স্থানে একই বানান পাওয়া তাঁর যুক্তির ভিত্তি। স্বাধীনভাবে শুনে লিখলে এমন অবস্থানগত মিলের ব্যাখ্যা কঠিন; একই লিখিত আদল থেকে নকল হলে তা বোধগম্য হয়। এই ফল প্রথম হিজরি শতকে উসমানি বর্ণকাঠামোর একটি লিখিত আদল গড়ে ওঠার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। [8]
all these manuscripts come from a single written archetype
বাংলা অনুবাদ: এই সমস্ত পাণ্ডুলিপি একটি সাধারণ লিখিত পূর্বপ্রতি থেকে এসেছে।
উদাহরণটি সহজ: একই শব্দের দুই বানানই সম্ভব। কয়েকটি স্বাধীন অনুলিপিতে বারবার একই নির্দিষ্ট জায়গায় একই বানান থাকলে বোঝা যায়, নকলকারীরা একটি সাধারণ লিখিত পূর্বসূত্র অনুসরণ করেছেন। এই গবেষণা লিখিত নকলের সম্পর্ক শনাক্ত করে। আজকের হাফস-পাঠের প্রত্যেকটি যের-জবর-পেশের উৎস এর পরীক্ষার বিষয় নয়। ফাতিহার ملك বর্ণকাঠামো “মালিক” ও “রাজা”—দুই উচ্চারণের সঙ্গে মেলে। ফলে লিখিত কাঠামোর প্রাচীনত্ব এবং তার ভেতরে নির্দিষ্ট উচ্চারণ বেছে নেওয়ার ইতিহাস আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়।
“একটি অক্ষরও বদলায়নি” কথায় অক্ষর বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তা এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। মূল বর্ণের মিল, সম্পূর্ণ উচ্চারিত শব্দের মিল এবং প্রতিটি পাঠের নবী পর্যন্ত নিশ্চিত সূত্র—তিনটি আলাদা দাবি। পাণ্ডুলিপিতে যে স্বর লেখা নেই, সেই স্বরের পক্ষে পাণ্ডুলিপির নীরবতা প্রমাণ হয়ে যায় না। লিখিত ঐক্যকে পূর্ণ উচ্চারণের ঐক্য বলে প্রচার করলে গবেষণার ফলের অর্থ বদলে যায়।
কিরাআতের ইতিহাস ও প্রভাব
কিরাআতের ইতিহাসে মদিনা, মক্কা, কুফা, বসরা ও শাম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। এসব অঞ্চলের প্রসিদ্ধ শিক্ষকদের নামে আলাদা পাঠধারা পরিচিত হয়েছে। একই অঞ্চলেও একজনের বেশি শিক্ষক ছিলেন, তাঁদের ছাত্রদের বর্ণনাতেও ভিন্নতা ছিল। পরবর্তী গ্রন্থে এই বিপুল উপাদান নির্বাচিত কয়েকজন পাঠকের নামে সাজানো হয়েছে। ফলে বর্তমানের সংক্ষিপ্ত তালিকা বোঝার জন্য কোন নগরে কার পাঠ চলত এবং কোন সংকলক কাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন—দুই ইতিহাসই প্রাসঙ্গিক। আজকের একটি মুশাফের পরিচিত চেহারা দিয়ে সেই বহুত্ব বোঝা যায় না।
“সাত কিরাআত” ও “দশ কিরাআত” একই সময়ে তৈরি দুটি নাম নয়। নির্দিষ্ট পাঠকদের নির্বাচন, তাঁদের বর্ণনাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রত্যেকের দুই প্রধান বর্ণনাকারী শেখানোর ছক—এসব ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই পরবর্তী বিন্যাসকে মুহাম্মদের যুগের একটি প্রস্তুত তালিকা ধরে নিলে সংকলক ও শিক্ষকসমাজের কাজ অদৃশ্য হয়ে যায়। কোন ধারা কত পুরোনো এবং কোন সময়ে তা অনুমোদিত তালিকায় ঢুকেছে, সেই প্রশ্ন আলাদাভাবে উত্তর দাবি করে।
চতুর্থ হিজরি শতকে ইবন মুজাহিদ তাঁর কিতাব আস-সাবআতে সাতজন পাঠকের ধারা সংকলন করেন। আসিম তাঁদের একজন; হাফস তাঁর বর্ণনাকারী। সাতের বাইরে থাকা ইয়াকুবের মতো পাঠক পরে দশ কিরাআতের স্বীকৃত পরিসরে স্থান পান। অতএব ইবন মুজাহিদের তালিকার বাইরে থাকা এবং চিরস্থায়ীভাবে অগ্রহণযোগ্য হওয়া সমার্থক ছিল না। পরবর্তী অনুমোদন আগের সীমা বিস্তৃত করেছে। স্বীকৃতির এই পরিবর্তন কিরাআতের ইতিহাসে পণ্ডিতদের নির্বাচনের বাস্তব ভূমিকা দেখায়।
অঞ্চলভেদে পাঠের ব্যবহারও আলাদা। উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার বহু অঞ্চলে ওয়ারশ, সুদান ও পূর্ব আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে আবু আমরের সূত্রে দুরির পাঠ ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন পাঠকের নগরপরিচয় আর বর্তমান ব্যবহারকারীর অবস্থানও আলাদা তথ্য: ইবন কাসির মক্কার এবং নাফি মদিনার পাঠক বলে পরিচিত, কিন্তু আজ সেই নগরের সবাই তাঁদের পাঠ অনুসরণ করেন—এ কথা সেই পরিচয় থেকে আসে না। শিক্ষকের পুরোনো কেন্দ্র, পরবর্তী বিস্তার এবং আজকের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবহারকে এক করে দেখলে সময়ের পার্থক্য মুছে যায়।
ওয়ারশ ‘আন নাফি’
দুরি ‘আন আবু আমর’
ইবন কাসির
নাফি
এই বাস্তবতা দেখায় যে, ইসলামের ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে কোরআনের পাঠ একক ছিল না; বরং আঞ্চলিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন রীতি সমান্তরালভাবে টিকে ছিল।
১৯২৪ সালের কায়রো মুশাফ এবং পাঠের মানদণ্ডীকরণ
১৯২৪ সালের কায়রো মুশাফ রাজা ফুয়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রস্তুত হয়। এটি আগে থেকেই প্রচলিত হাফসের পাঠ অনুসরণ করে স্বরচিহ্ন, আয়াতসংখ্যা ও পাঠের নির্দেশ সুসংবদ্ধভাবে মুদ্রণ করে। মাইকেল মার্ক্সের বিবরণে সংস্করণটির প্রভাব এবং উসমানি সাম্রাজ্যে প্রচলিত পাঠের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্পষ্ট। [9]
The Egyptian edition was characterised by precise vocalisation and verse numbering.
বাংলা অনুবাদ: মিশরীয় সংস্করণটির বৈশিষ্ট্য ছিল সুস্পষ্ট স্বরচিহ্নায়ন এবং আয়াতের সংখ্যায়ন।
মুদ্রণের ফলে একই নির্বাচিত বানান, স্বরচিহ্ন ও বিরামনির্দেশ অসংখ্য মানুষের হাতে পৌঁছায়। এর সাহায্যে পাঠ শেখানো ও সংশোধন সহজ হয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও একই আদল অনুসরণ করতে পারে। এই ব্যবস্থা বর্তমান ব্যবহারকে একরূপ করার শক্তিশালী উপায়। সেই একরূপতার কারণ যখন একটি সাধারণ মুদ্রিত আদল, তখন তাকে প্রথম যুগের সব অঞ্চলে একই রূপ প্রচলিত থাকার স্বাধীন প্রমাণ বলা যায় না। যে ফল মুদ্রণ নিজেই তৈরি করতে পারে, সেই ফল দেখিয়ে মুদ্রণের বহু শতাব্দী আগের ইতিহাস নিশ্চিত করা যুক্তিগত ভুল।
মদিনার কিং ফাহদ মুদ্রণকেন্দ্র ১৯৮৪ সালে উদ্বোধিত হয়। আন্তর্জাতিক বিতরণের পাশাপাশি এই কেন্দ্র হাফস, ওয়ারশ, কালুন ও দুরির মতো ভিন্ন পাঠও মুদ্রণ করে।
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও তাত্ত্বিক প্রশ্ন
একাধিক পাঠকে ওহি হিসেবে মান্য করার ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান এবং সর্বত্র একটি অভিন্ন শব্দরূপ থাকার দাবি ভিন্ন। “মালিক” ও “রাজা” দুটিকে অনুমোদন করলে দুই শব্দের অস্তিত্বই স্বীকার করা হয়। তারপর উভয় শব্দ মুহাম্মদ উচ্চারণ করেছিলেন—এমন দাবি করলে উভয়ের বর্ণনাসূত্রের প্রশ্ন ওঠে। অর্থের মধ্যে সামঞ্জস্য দেখানো সেই প্রশ্নের উত্তর নয়: একটি মানুষ রাজা ও মালিক দুটোই হতে পারেন, কিন্তু দুটি বিশেষ্য তাতে এক শব্দ হয়ে যায় না। শব্দগত অভিন্নতার দাবি রক্ষার সময় অর্থগত সামঞ্জস্যের যুক্তি ব্যবহার করলে আলোচনার বিষয় বদলে যায়।
পাঠের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে মৌখিক শিক্ষা, লিখিত মুশাফ ও পণ্ডিতদের অনুমোদন একসঙ্গে কাজ করেছে। শিক্ষক কোনো রূপ শেখানোর সময় আগের মুশাফের সঙ্গে মিলিয়েছেন; সংকলক পূর্বসূরির বর্ণনা বেছে নিয়েছেন; মুদ্রণকেন্দ্র অনুমোদিত একটি ধারা প্রকাশ করেছে। ফলে এই তিন মাধ্যমের মিলকে সব সময় তিনটি স্বাধীন উৎস ধরা যায় না। তারা একই পূর্বসূত্র অনুসরণ করলে মিলটি সেই নির্ভরতার ফলও হয়। কতজন আজ একই পাঠ পড়ছেন, তার সঙ্গে কতটি স্বাধীন প্রাচীন সূত্র আছে—এই দুই হিসাব গুলিয়ে ফেললেই তাওয়াতুরের দাবি অতিরঞ্জিত হয়।
“মুতাওয়াতির কিরাআত” দাবির যৌক্তিকতা
মুতাওয়াতির বলতে এমন বহুসূত্রে বর্ণনা বোঝানো হয়, যাতে প্রতিটি প্রজন্মের বর্ণনাকারী এত বেশি এবং তাঁদের অবস্থান এমন যে, সবাই মিলে মিথ্যা বানিয়েছেন ধরে নেওয়া অসম্ভব বিবেচিত হয়। দাবিটি শুধু বর্তমানের বহু মানুষের একমত হওয়া নিয়ে নয়। প্রথম, দ্বিতীয় ও পরবর্তী প্রতিটি ধাপে সেই বহুত্ব থাকতে হয়। একজনের কাছ থেকে হাজারজন শিখলে হাজারজনের সাক্ষ্য পাওয়া যায় যে তিনি কী শিখিয়েছেন; তাঁর আগের উৎস সম্পর্কে হাজারটি স্বাধীন সাক্ষ্য তৈরি হয় না। কিরাআতে তাওয়াতুর দাবি করলে এই পার্থক্য প্রত্যেকটি সংশ্লিষ্ট পাঠের জন্য পরীক্ষা করতে হয়।
ইবন আল-জাযারি কিরাআতের সনদ সহিহ হওয়ার অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন: ন্যায়পরায়ণ ও যথাযথভাবে সংরক্ষণকারী ব্যক্তির কাছ থেকে একই গুণের ব্যক্তি পাঠটি বর্ণনা করবেন; সেই পাঠ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে পরিচিত হবে এবং ভুল হিসেবে গণ্য হবে না। এরপর তিনি প্রত্যেকটি পাঠভেদে তাওয়াতুর বাধ্যতামূলক করার মত প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি তীক্ষ্ণ: তাওয়াতুর থাকলে রসম ও অন্য শর্তের দরকারই থাকে না; আর প্রতিটি ভিন্ন রূপে তাওয়াতুর চাইলে সাত ইমাম ও অন্যদের নামে প্রতিষ্ঠিত অনেক পাঠ বাদ পড়ে। তিনি একসময় সেই কঠোর মতের দিকে ঝুঁকেছিলেন, পরে তা ত্যাগ করেছেন বলেও জানান। [10]
( وقولنا ) وصح سندها فانا نعنى به أن يروى تلك القراءة العدل الضابط عن مثله كذا حتى تنتهى وتكون مع ذلك مشهورة عند أئمة هذا الشأن الضابطين له غير معدودة عندهم من الغلط أو مما شذ بها بعضهم ؛ وقد شرط بعض المتأخرين التواتر في هذا الركن ولم يكتف فيه بصحة السند وزعم أن القرآن لا يثبت إلا بالتواتر وأن ما جاء مجىء الآحاد لا يثبت به قرآن وهذا مما لا يخفى ما فيه فان التواتر إذا ثبت لا يحتاج فيه إلى الركنين الأخيرين من الرسم وغيره ، إذ ما ثبت من أحرف الخلاف متواترا عن النبي صلى اللّه عليه وسلم وجب قبوله وقطع بكونه قرآنا سواء وافق الرسم أم خالفه ، وإذا اشترطنا التواتر في كل حرف من حروف الخلاف انتفى كثير من أحرف الخلاف الثابت عن هؤلاء الأئمة السبعة وغيرهم ولقد كنت قبل أجنح إلى هذا القول ثم ظهر فساده وموافقة أئمة السلف والخلف
বাংলা অনুবাদ: “সনদ সহিহ হওয়া” বলতে আমরা বুঝি, ন্যায়পরায়ণ ও যথাযথভাবে সংরক্ষণকারী বর্ণনাকারী তাঁর মতো আরেকজনের কাছ থেকে পাঠটি বর্ণনা করবেন; এভাবে সূত্র শেষ পর্যন্ত পৌঁছাবে। সেই সঙ্গে পাঠটি এই শাস্ত্রের দক্ষ ইমামদের কাছে পরিচিত হবে এবং তাঁরা একে ভুল বা কারও বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করবেন না। কিছু পরবর্তী পণ্ডিত এই শর্তে তাওয়াতুর আবশ্যক করেছেন; শুধু সনদ সহিহ হওয়াকে যথেষ্ট মনে করেননি। তাঁদের দাবি, তাওয়াতুর ছাড়া কোরআন প্রতিষ্ঠিত হয় না; একক সূত্রে আসা বর্ণনা দিয়ে কোরআন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এই বক্তব্যের সমস্যা অস্পষ্ট নয়। তাওয়াতুর প্রতিষ্ঠিত হলে রসম ও অন্য বিষয়ের বাকি দুই শর্তের প্রয়োজন থাকে না। নবীর কাছ থেকে কোনো ভিন্ন পাঠ মুতাওয়াতিরভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে তা গ্রহণ করা এবং কোরআন হিসেবে নিশ্চিত করা আবশ্যক—রসমের সঙ্গে মিলুক বা না মিলুক। প্রত্যেকটি ভিন্ন পাঠে তাওয়াতুর শর্ত করলে এই সাত ইমাম ও অন্যদের নামে প্রতিষ্ঠিত বহু পাঠভেদ বাদ পড়বে। আগে আমিও এই মতের দিকে ঝুঁকেছিলাম; পরে এর অসারতা স্পষ্ট হয়েছে এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামদের সঙ্গে একমত হয়েছি।
শাদি হেকমত নাসের তাঁর ২০১১ সালের হার্ভার্ড অভিসন্দর্ভে কিরাআতের স্বীকৃতি ও বর্ণনাপদ্ধতির পরিবর্তন পরীক্ষা করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত, উসুলবিদদের নির্ধারিত তাওয়াতুরের শর্ত স্বীকৃত পাঠধারাগুলোর বর্ণনাপরম্পরা পূরণ করে না। লিখিত বর্ণকাঠামো পৌঁছানো এবং সেই কাঠামোর বিশেষ বিশেষ উচ্চারণ পৌঁছানোকে তিনি আলাদা করেছেন। সহজভাবে, একটি পাণ্ডুলিপির মূল বর্ণ বহু অনুলিপিতে টিকে থাকতে পারে, অথচ তার একটি নির্দিষ্ট স্বর সম্পর্কে বর্ণনাসূত্র সীমিত হতে পারে। গবেষণাটি তাই একজন রাবির চরিত্রের প্রশ্ন ছাড়িয়ে পুরো ব্যবস্থার দাবিকৃত নিশ্চয়তা পরীক্ষা করে। [11]
the transmission of the system Readings of the Qur’an failed to meet the conditions of tawātur set by the uṣūlīs
বাংলা অনুবাদ: কোরআনের স্বীকৃত পাঠধারাগুলোর বর্ণনাপরম্পরা উসুলবিদদের নির্ধারিত তাওয়াতুরের শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
মারাইন ভান পুটেনের Finding Dūrī গবেষণায় আদ-দানির আত-তাইসির থেকে দুটি বর্ণনাপথ তুলনা করা হয়েছে। শিক্ষকের কাছে সম্পূর্ণ কোরআন পড়ে শেখার পথটি দুরি → আবু আয-যা‘রা ইবন আবদুস → ইবন মুজাহিদ ধরে আসে। কিন্তু পাঠভেদের লিখিত বর্ণনার পথ দুরির সমসাময়িক আবু খাল্লাদের মাধ্যমে যায়। একই পাঠধারার নামের অধীনে শেখার পথ ও বিবরণ বর্ণনার পথ আলাদা। [12]
his riwāya transmission for al-Dūrī does not go through al-Dūrī at all.
বাংলা অনুবাদ: দুরির পাঠের জন্য তাঁর রিওয়ায়াতের বর্ণনাসূত্র আদৌ দুরির মধ্য দিয়ে যায় না।
সূরা যুমার ৩৯:৭-এ يَرْضَهْ—শেষে স্বরহীন “হ্”—ও يَرْضَهُۥ—শেষে দীর্ঘ “হূ”—এই দুই রূপে সমস্যাটি দেখা যায়। আদ-দানি প্রথম রূপ দুরি ও সুসির সূত্রে, দ্বিতীয়টি “ইরাকের পাঠকসমাজ” এবং ইবন আল-ইয়াযিদি ও আবু হামদুনের সূত্রে উল্লেখ করেছেন। পরে শাতিবি ভিন্নতাটি দুরির বর্ণনার মতভেদ হিসেবে সাজান। ভান পুটেন দেখিয়েছেন, বৃহত্তর পাঠকসমাজের বিবরণ এভাবে একজন বর্ণনাকারীর নামের অধীনে এসেছে। ফলে “দুরির পাঠ” নামটিকে প্রতিটি উপাদানের অবিকল ব্যক্তিগত বংশতালিকা ধরে নেওয়া বিভ্রান্তিকর।
আদ-দানির নিজস্ব বাক্যে এখানে ব্যক্তির নামের পাশাপাশি সমষ্টিগত পরিচয় আছে—“ইরাকের লোকদের পথ”। নির্দিষ্ট উচ্চারণের বর্ণনায় তিনি নিজের পাঠ শেখার অভিজ্ঞতা এবং আগের রাবিদের নাম দুই-ই দিয়েছেন। [13]
قَرَأَ نَافِع وَعَاصِم وَحَمْزَة وَهِشَام بِخِلَاف عَنهُ {يرضه لكم} باختلاس ضمة الْهَاء وَهِشَام من قراءتي على ابي الْفَتْح وابو شُعَيْب وابو عَمْرو وَغَيرهمَا عَن اليزيدي باسكانها وقرأت على الْفَارِسِي وَغَيره من طَرِيق اهل الْعرَاق بصلتها بواو وَهِي رِوَايَة ابي عبد الرَّحْمَن وابي حمدون وَغَيرهمَا عَن اليزيدي وَالْبَاقُونَ يصلونها بواو
বাংলা অনুবাদ: নাফি, আসিম, হামজা এবং হিশামের সূত্রে মতভেদসহ—এঁরা “ইয়ারদাহু লাকুম”-এ হা অক্ষরের পেশ সংক্ষিপ্ত করে পড়েছেন। আবু আল-ফাতহের কাছে আমার শেখা পাঠে হিশাম এবং আল-ইয়াযিদির সূত্রে আবু শুয়াইব, আবু আমর ও অন্যরা হা অক্ষর স্বরহীন করে পড়েছেন। আল-ফারিসি ও অন্যদের কাছে ইরাকের লোকদের পথে আমি হা-এর সঙ্গে ওয়াও যুক্ত করে দীর্ঘ স্বরে পড়েছি। এটি আল-ইয়াযিদির সূত্রে আবু আবদুর রহমান, আবু হামদুন ও অন্যদের বর্ণনা। বাকি পাঠকেরাও ওয়াও যুক্ত করে পড়েন।
তাওয়াতুরের সাক্ষ্য, নাকি বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা?
ইবন আল-জাযারির গ্রন্থেই তাজউদ্দিন আবদুল ওয়াহহাব আস-সুবকির একটি লিখিত উত্তর আছে, যেখানে দাবি অনেক দূর গিয়েছে। সুবকি দশ কিরাআত এবং দশ পাঠকের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র রূপকে ধর্মের অপরিহার্য জ্ঞানের বিষয় বলেছেন। তাঁর ভাষায়, যে সাধারণ মুসলমান একটি অক্ষরও মুখস্থ জানেন না, তাঁর কাছেও এই তাওয়াতুর প্রতিষ্ঠিত। শেষে প্রত্যেক মুসলমানকে এ বিষয়ে সংশয়হীন বিশ্বাস রাখার কর্তব্য জানিয়েছেন। উত্তরটির পূর্ণ অনুচ্ছেদে সাক্ষ্য সম্পর্কে দাবি এবং বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা পাশাপাশি এসেছে। [14]
الحمد لله ؛ القراءات السبع التي اقتصر عليها الشاطبي والثلاث التي هي قراءة أبي جعفر وقراءة يعقوب وقراءة خلف متواترة معلومة من الدين بالضرورة وكل حرف انفرد به واحد من العشرة معلوم من الدين بالضرورة أنه منزل على رسول الله – صلى الله عليه وسلم – لا يكابر في شيء من ذلك إلا جاهل ، وليس تواتر شيء منها مقصورا على من قرأ بالروايات ، بل هي متواترة عند كل مسلم يقول أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا رسول الله ، ولو كان مع ذلك عاميا جلفا لا يحفظ من القرآن حرفا ، ولهذا تقرير طويل وبرهان عريض لا يسع هذه الورقة شرحه وحظ كل مسلم وحقه أن يدين لله تعالى ويجزم نفسه بأن ما ذكرناه متواتر معلوم باليقين لا يتطرق الظنون ولا الارتياب إلى شيء منه والله أعلم . كتبه عبد الوهاب بن السبكي الشافعي .
বাংলা অনুবাদ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। শাতিবি যে সাত কিরাআতে সীমাবদ্ধ থেকেছেন এবং আবু জাফর, ইয়াকুব ও খালাফের যে তিন কিরাআত—সবই মুতাওয়াতির এবং ধর্মের অপরিহার্য জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। দশজনের যেকোনো একজনের স্বতন্ত্র প্রতিটি পাঠ সম্পর্কে ধর্মে অপরিহার্যভাবে জানা যে, তা আল্লাহর রাসুলের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। অজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া কেউ এর কোনোটি অস্বীকার করে না। এগুলোর কোনো একটির তাওয়াতুরও শুধু বর্ণনাপরম্পরা অনুসারে পাঠ শেখা লোকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এগুলো প্রত্যেক মুসলমানের কাছে মুতাওয়াতির, যে বলে: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল—এমনকি সে যদি এমন অশিক্ষিত ও অমার্জিত সাধারণ লোক হয়, যে কোরআনের একটি অক্ষরও মুখস্থ জানে না। এর দীর্ঘ ব্যাখ্যা ও বিস্তৃত প্রমাণ আছে, যা এই পাতায় ব্যাখ্যা করার জায়গা নেই। প্রত্যেক মুসলমানের প্রাপ্য ও কর্তব্য হলো, আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যে, আমরা যা উল্লেখ করেছি তা মুতাওয়াতির এবং নিশ্চিতভাবে জানা; এর কোনোটি সম্পর্কে অনুমান বা সংশয়ের অবকাশ নেই। আল্লাহই ভালো জানেন। লিখেছেন আবদুল ওয়াহহাব ইবন আস-সুবকি আশ-শাফিঈ।
এখানে সাক্ষ্যের জায়গায় ধর্মীয় আনুগত্য বসানো হয়েছে। যে মানুষ পাঠটি জানেন না, তার ভিন্ন রূপও চেনেন না, তাঁর মুসলিম পরিচয় থেকে সেই রূপের ইতিহাস সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান বের করা যায় না। সুবকি বিস্তৃত প্রমাণ আছে বলেছেন, কিন্তু এই উত্তরে তা উপস্থাপন করেননি; উপস্থাপন করেছেন সংশয়হীন বিশ্বাসের নির্দেশ। একটি ধর্মীয় কর্তব্য ঘোষণা করলে প্রথম যুগের বর্ণনাকারীদের সংখ্যা, তাঁদের স্বাধীনতা বা নির্দিষ্ট পাঠের পথ জানা হয়ে যায় না। বিশ্বাসীর অজ্ঞতা দূর না করেই তাঁকে নিশ্চিত বলে গণ্য করা ঐতিহাসিক পরীক্ষাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায়।
হাফসের কিরাআত বনাম অন্যান্য কিরাআতঃ পাঠভেদ, অর্থগত প্রভাব
হাফস ও ওয়ারশের স্বীকৃত পাঠ পাশাপাশি রাখলে কোথাও বিশেষ্য, কোথাও ক্রিয়ার পুরুষ, কোথাও একবচন-বহুবচন বদলাতে দেখা যায়। কিছু পার্থক্য কাছাকাছি অর্থ বহন করে, কিছুতে বক্তব্যের নির্দিষ্ট রূপ বদলে যায়। এই তথ্য “কোরআন শব্দে শব্দে, হরফে হরফে সর্বত্র একই” দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দুটি অর্থ সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু দুটি উচ্চারিত শব্দকে তাতে অভিন্ন বলা যায় না।
পাঠভেদের ধর্মতাত্ত্বিক অনুমোদনে বলা হয়, একাধিক রূপই ওহি। সেই বক্তব্যে বহুপাঠ স্বীকার করা হয়। “পাঠভেদ নেই” বক্তব্যে সেই বহুত্বই অস্বীকার করা হয়। একই আলোচনায় সুবিধামতো এই দুই অবস্থান পাল্টে নিলে দাবিটি পরীক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে কোন কোন শব্দ আছে, তাদের অর্থ কী এবং প্রত্যেকটি রূপের বর্ণনাসূত্র কী—এই স্পষ্ট প্রশ্নগুলোই অস্পষ্ট সংরক্ষণ-স্লোগানের আসল পরীক্ষা।
উদাহরণ: হাফস ও ওয়ারশের স্বীকৃত পাঠে শব্দগত পার্থক্য
| আয়াত | হাফসের পাঠ | ওয়ারশের পাঠ | উচ্চারণ ও অর্থ | নির্দিষ্ট পার্থক্য ও উৎস |
|---|---|---|---|---|
| সূরা বাকারা ২:১৮৪ | فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ | فِدْيَةُ طَعَامِ مَسَاكِينَ | হাফস: ফিদইয়াতুন তাআমু মিসকীন—ফিদয়া, একজন অভাবীর খাদ্য। ওয়ারশ: ফিদইয়াতু তাআমি মাসাকীন—অভাবীদের খাদ্যের ফিদয়া। | ওয়ারশে إطعام শব্দ নেই। সংযোগরীতি ও মিসকিনের একবচন-বহুবচন আলাদা। আল-ওয়াহিদি বহুবচনকে একাধিক রোজাদারের প্রত্যেকের একজনকে খাওয়ানোর সঙ্গেও ব্যাখ্যা করেন। এই ব্যাখ্যায় বিধানের সম্পর্ক বোঝানো হয়েছে; একবচন-বহুবচনের পাঠগত পার্থক্য রয়ে গেছে। আল-ওয়াহিদি, আল-বাসিত, ২:১৮৪ |
| সূরা ফাতিহা ১:৪ | مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ | مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ | হাফস: মালিকি ইয়াওমিদ্দীন—বিচারদিনের মালিক। ওয়ারশ: মালিকি ইয়াওমিদ্দীন—বিচারদিনের রাজা; প্রথম রূপে “মা” দীর্ঘ, দ্বিতীয়টিতে সংক্ষিপ্ত। | মালিক ও রাজা ভিন্ন বিশেষ্য, যদিও একই সত্তার দুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ গুণ হতে পারে। অর্থের সামঞ্জস্য শব্দগত অভিন্নতা তৈরি করে না। আত-তাবারি, জামিউল বায়ান, ১:৪ |
| সূরা মারইয়াম ১৯:১৯ | لِأَهَبَ لَكِ | لِيَهَبَ لَكِ | হাফস: লি-আহাবা লাকি—যাতে আমি তোমাকে দান করি। ওয়ারশ: লি-ইয়াহাবা লাকি—যাতে তিনি তোমাকে দান করেন। | প্রথম পাঠে বক্তা ফেরেশতার “আমি”; দ্বিতীয়টিতে দাতা “তিনি”। ব্যাখ্যায় ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহর দান বলা গেলেও বাক্যের কর্তা ও ক্রিয়ার পুরুষ অভিন্ন থাকে না। মাইকেল মার্ক্স, The Quran—The First Arabic Book, পাঠভেদের আলোচনা |
সূরা বাকারা ২:১৮৪-এ “একজন অভাবী” ও “অভাবীরা”—একবচন-বহুবচন এবং শব্দের সংযোগ বদলেছে। আল-ওয়াহিদি বহুবচনকে একাধিক রোজাদারের প্রত্যেকের একজনকে খাওয়ানোর সঙ্গেও ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ ব্যাখ্যা দিয়ে বিধানের সম্পর্ক বোঝানো যায়, কিন্তু পাঠে একবচন ও বহুবচনের পার্থক্য থেকেই যায়। সূরা মারইয়ামে “আমি দান করি” থেকে “তিনি দান করেন” হলে ক্রিয়ার পুরুষ বদলায়। ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহর দান—এই ব্যাখ্যা দুই বক্তব্যকে মিলিয়ে দিতে পারে; প্রথম পুরুষ ও তৃতীয় পুরুষকে এক শব্দ বানায় না।
ফাতিহার “মালিক” ও “রাজা” পাঠে আত-তাবারি শুধু দুটি রূপ নথিবদ্ধ করেননি; বিচার করে “রাজা” অর্থবাহী مَلِكِ রূপটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, রাজত্বের মধ্যে মালিকানাও আছে, অথচ মালিক হলেই রাজা হওয়া হয় না। আগের আয়াতে আল্লাহর মালিকানা ও প্রতিপালনের কথা এসেছে বলেও তিনি ব্যাখ্যা করেন। এখানে ভাষা ও অর্থের বিচার দিয়ে পাঠ নির্বাচন করা হয়েছে। পরবর্তী অনুমোদনে দুই রূপই স্থান পেয়েছে বলে তাবারির এই অগ্রাধিকারের ইতিহাস অদৃশ্য হয় না। [15]
قال أبو جعفر: وأولى التأويلين بالآية، وأصحُّ القراءتين في التلاوة عندي، التأويلُ الأول، وهي قراءةُ من قرأ “مَلِكِ” بمعنى “المُلك”. لأن في الإقرار له بالانفراد بالمُلك، إيجابًا لانفراده بالمِلْك، وفضيلة زيادة المِلك على المالك، إذْ كان معلومًا أن لا مَلِك إلا وهو مالكٌ، وقد يكون المالكُ لا ملكًا. وبعدُ، فإن الله جلّ ذكره، قد أخبر عبادَه في الآية التي قبل قوله ﴿ملِكِ يوم الدين﴾ أنه مالكُ جميع العالمين وسيَّدهم، ومُصلحُهم، والناظرُ لهم، والرحيم بهم في الدنيا والآخرة، بقوله: ﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ﴾ .
বাংলা অনুবাদ: আবু জাফর বলেন: আমার বিচারে আয়াতটির দুই ব্যাখ্যার মধ্যে অধিক উপযুক্ত এবং তিলাওয়াতে দুই পাঠের মধ্যে অধিক সঠিক হলো প্রথম ব্যাখ্যাটি—অর্থাৎ রাজত্ব বোঝাতে “মালিক” বা রাজা অর্থে مَلِكِ পড়ার পাঠ। কারণ তাঁর একচ্ছত্র রাজত্ব স্বীকার করার মধ্যে তাঁর একচ্ছত্র মালিকানাও স্বীকার করা হয়; মালিকের তুলনায় রাজার মর্যাদায় বাড়তি অর্থ আছে। প্রত্যেক রাজাই মালিক, কিন্তু একজন মালিক রাজা না-ও হতে পারেন। তা ছাড়া, “বিচারদিনের রাজা” বলার আগের আয়াতেই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জানিয়েছেন যে, তিনি সমস্ত জগতের মালিক ও প্রভু, তাদের কল্যাণসাধক, তত্ত্বাবধায়ক এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের প্রতি দয়ালু। সেটি বলেছেন এই কথায়: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক, পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।”
তাবারির পছন্দ আজকের সর্বাধিক প্রচলিত হাফস-পাঠের পছন্দ থেকে আলাদা। এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, প্রাচীন তাফসিরে পাঠের মূল্যায়ন নিয়ে বিচার ও মতভেদ ছিল। পরবর্তী স্বীকৃত তালিকা দেখিয়ে সব যুগে সব পণ্ডিত প্রতিটি রূপকে সমানভাবে বিবেচনা করেছেন বলা যায় না। কোন রূপ বেশি অর্থবহ, কোনটিতে অতিরিক্ত তাৎপর্য আছে—এসব প্রশ্নে পণ্ডিতেরা যুক্তি দিয়েছেন। পাঠসংরক্ষণের ইতিহাসে সেই মানবিক বিচারও নথিবদ্ধ তথ্য।
দুটি পাঠের অর্থ মিলিয়ে ব্যাখ্যা করা এবং উভয়ের প্রথম উৎস প্রতিষ্ঠা করা ভিন্ন কাজ। “মালিক” ও “রাজা” একই সত্তার গুণ হতে পারেন—এটি শব্দের অর্থ নিয়ে যুক্তি। মুহাম্মদ দুই রূপই উচ্চারণ করেছিলেন—এটি অতীতের ঘটনা সম্পর্কে দাবি। প্রথম যুক্তি দ্বিতীয় ঘটনার সাক্ষী নয়। তাই অর্থগত সামঞ্জস্য দিয়ে প্রতিটি পাঠের বর্ণনাসূত্র পরীক্ষা বন্ধ করা যায় না।
হাফসের হাদিস: নামসহ সনদ ও সমালোচনার নির্দিষ্ট উদাহরণ
হাফস সম্পর্কে কঠোর রায়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট হাদিসের সম্পর্ক ইবন মাজাহ ও তিরমিযিতে সরাসরি দেখা যায়। একটি বর্ণনায় জ্ঞানার্জনের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে অতিরিক্ত উপমা আছে; অন্যটিতে কোরআন মুখস্থকারীর দশ আত্মীয়ের জন্য সুপারিশের প্রতিশ্রুতি। উভয়ের সনদে হাফসকে নাম ধরে চিহ্নিত করা যায়। তিরমিযি নিজের মন্তব্যে তাঁর দুর্বলতার কথাও বলেছেন। ফলে পরবর্তী জীবনীকারের সাধারণ মূল্যায়নের পাশাপাশি হাদিস সংকলনের ভেতরেই অভিযোগের নির্দিষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়।
উদাহরণ ১: জ্ঞানার্জন ফরজ—ইবন মাজাহ ২২৪-এর পূর্ণ বর্ণনা
ইবন মাজাহ ২২৪-এর সূত্র হলো হিশাম ইবন আম্মার → হাফস ইবন সুলাইমান → কাসির ইবন শিনযির → মুহাম্মদ ইবন সিরিন → আনাস ইবন মালিক। এখানে হাফসের পূর্ণ নাম আছে। হাদিসে জ্ঞানার্জন ফরজ হওয়ার সঙ্গে অযোগ্য ব্যক্তিকে জ্ঞান দেওয়াকে শূকরকে অলংকার পরানোর উপমায় তুলনা করা হয়েছে। সুন্নাহ ডটকমে প্রদর্শিত দারুসসালামের মূল্যায়নে এই সনদ অত্যন্ত দুর্বল। সম্পাদনাগত টীকায় প্রথম বাক্যের অন্য সূত্রে সমর্থন আছে বলা হলেও পরের অংশ অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। পূর্ণ সনদ ও বক্তব্য একসঙ্গে থাকলে কোন অংশ নিয়ে সমস্যা, তা স্পষ্ট হয়। [16]
حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عَمَّارٍ ، حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ سُلَيْمَانَ ، حَدَّثَنَا كَثِيرُ بْنُ شِنْظِيرٍ ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ” طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ وَوَاضِعُ الْعِلْمِ عِنْدَ غَيْرِ أَهْلِهِ كَمُقَلِّدِ الْخَنَازِيرِ الْجَوْهَرَ وَاللُّؤْلُؤَ وَالذَّهَبَ ” .
বাংলা অনুবাদ: হিশাম ইবন আম্মার আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাফস ইবন সুলাইমান আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, কাসির ইবন শিনযির আমাদের বর্ণনা করেছেন, মুহাম্মদ ইবন সিরিনের সূত্রে, আনাস ইবন মালিকের কাছ থেকে। আনাস বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: জ্ঞান অন্বেষণ প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ। আর যে ব্যক্তি জ্ঞান তার অনুপযুক্ত লোকের কাছে রাখে, সে যেন শূকরকে রত্ন, মুক্তা ও সোনার মালা পরায়।
একটি বর্ণনার আংশিক সমর্থন কীভাবে কাজ করে, এটি তার পরিষ্কার উদাহরণ। অন্য সূত্রে “জ্ঞানার্জন ফরজ” কথাটি পাওয়া গেলে সেই বাক্য সমর্থিত হয়। অন্য সূত্রে শূকরকে অলংকার পরানোর উপমা না-থাকলে একই সমর্থন উপমাটিকে প্রমাণ করে না। হাফসের কিরাআত মূল্যায়নেও এই যুক্তি প্রযোজ্য। বহু শব্দ অন্য পাঠে মেলে বলে তাঁর একটি স্বতন্ত্র স্বর বা শব্দরূপও একইভাবে প্রতিষ্ঠিত ধরে নেওয়া যায় না। সেই রূপটির জন্য কোন বর্ণনা আছে, প্রশ্নটি সেখানেই থাকে।
উদাহরণ ২: কোরআন মুখস্থকারীর দশ আত্মীয়ের জন্য সুপারিশ—তিরমিযি ২৯০৫
তিরমিযি ২৯০৫-এর সূত্র আলী ইবন হুজর → হাফস ইবন সুলাইমান → কাসির ইবন যাযান → আসিম ইবন দামরা → আলী ইবন আবি তালিব। এখানে আসিম ইবন দামরা হাফসের কিরাআতের শিক্ষক আসিম ইবন আবি আন-নাজুদ থেকে আলাদা ব্যক্তি। বক্তব্যে কোরআন পড়ে মুখস্থ করা এবং তার হালাল-হারাম মানার বিনিময়ে জান্নাত ও জাহান্নাম-প্রাপ্য দশ আত্মীয়ের জন্য সুপারিশের প্রতিশ্রুতি আছে। কোরআনের মর্যাদা নিয়ে আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি হলেও তিরমিযি এই সনদ সহিহ বলেননি। বক্তব্যের ধর্মীয় মাহাত্ম্য বর্ণনাকারীর দুর্বলতা দূর করেনি।
তিরমিযির মন্তব্যে তিনটি তথ্য একত্রে আছে: বর্ণনাটি গরিব, এই পথ ছাড়া অন্য পথ তাঁর জানা নেই, এবং হাফস হাদিসে দুর্বল। এখানে “গরিব” বলতে অপরিচিত গল্প বোঝায় না; বর্ণনার পথ সীমিত হওয়ার শাস্ত্রীয় পরিচয় বোঝায়। পূর্ণ হাদিসের পরে সংকলকের নিজের মূল্যায়নও রয়েছে। [17]
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ ، قَالَ أَخْبَرَنَا حَفْصُ بْنُ سُلَيْمَانَ ، عَنْ كَثِيرِ بْنِ زَاذَانَ ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ ضَمْرَةَ ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَاسْتَظْهَرَهُ فَأَحَلَّ حَلاَلَهُ وَحَرَّمَ حَرَامَهُ أَدْخَلَهُ اللَّهُ بِهِ الْجَنَّةَ وَشَفَّعَهُ فِي عَشَرَةٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ كُلُّهُمْ وَجَبَتْ لَهُ النَّارُ ” . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ وَلَيْسَ إِسْنَادٌ صَحِيحٍ . وَحَفْصُ بْنُ سُلَيْمَانَ أَبُو عُمَرَ بَزَّازٌ كُوفِيٌّ يُضَعَّفُ فِي الْحَدِيثِ .
বাংলা অনুবাদ: আলী ইবন হুজর আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, হাফস ইবন সুলাইমান আমাদের জানিয়েছেন, কাসির ইবন যাযানের সূত্রে, আসিম ইবন দামরার কাছ থেকে, আলী ইবন আবি তালিবের সূত্রে। আলী বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: যে কোরআন পড়ে মুখস্থ করে, তার হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম মানে, আল্লাহ তাকে এর মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন দশজনের জন্য সুপারিশের সুযোগ দেবেন, যাদের সবার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়েছে। আবু ঈসা বলেন: এটি একটি গরিব হাদিস। এই পথ ছাড়া আমরা একে অন্য কোনো পথ থেকে জানি না, এবং এর সনদ সহিহ নয়। হাফস ইবন সুলাইমান আবু উমর, কুফার বস্ত্রবিক্রেতা, হাদিসে দুর্বল বিবেচিত হন।
একই বর্ণনা একাধিক গ্রন্থে: পুনরাবৃত্তি স্বাধীন সাক্ষ্য নয়
দশ আত্মীয়ের জন্য সুপারিশের বক্তব্য ইবন মাজাহ ২১৬-তেও আছে। সেখানে সনদ আমর ইবন উসমান → মুহাম্মদ ইবন হারব → আবু উমর → কাসির ইবন যাযান → আসিম ইবন দামরা → আলী। হাফসের কুনিয়া আবু উমর, এবং আল-মিযযির জীবনীতে মুহাম্মদ ইবন হারব তাঁর বর্ণনাগ্রহীতাদের একজন। তিরমিযির সনদে আলী ইবন হুজর সরাসরি হাফস থেকে বর্ণনা করেন; ইবন মাজাহর পথে মুহাম্মদ ইবন হারবের পর হাফস আসেন। দুটি পথই হাফস → কাসির → আসিম → আলী অংশে এসে এক হয়ে যায়। ফলে দুটি বইয়ে উপস্থিতি সেই অংশে দুটি স্বাধীন উৎস নয়।[18][19]
حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ عُثْمَانَ بْنِ سَعِيدِ بْنِ كَثِيرِ بْنِ دِينَارٍ الْحِمْصِيُّ ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ حَرْبٍ ، عَنْ أَبِي عُمَرَ ، عَنْ كَثِيرِ بْنِ زَاذَانَ ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ ضَمْرَةَ ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ” مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَحَفِظَهُ أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ وَشَفَّعَهُ فِي عَشَرَةٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ كُلُّهُمْ قَدِ اسْتَوْجَبُوا النَّارَ ” .
বাংলা অনুবাদ: আমর ইবন উসমান ইবন সাঈদ ইবন কাসির ইবন দিনার আল-হিমসি আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, মুহাম্মদ ইবন হারব আমাদের বর্ণনা করেছেন, আবু উমরের সূত্রে, কাসির ইবন যাযানের কাছ থেকে, আসিম ইবন দামরার সূত্রে, আলী ইবন আবি তালিবের কাছ থেকে। আলী বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন: যে কোরআন পড়ে মুখস্থ করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন দশজনের জন্য সুপারিশের সুযোগ দেবেন, যারা সবাই জাহান্নাম প্রাপ্য হয়েছে।
হাফসের মূল্যায়ন থেকে যে পদ্ধতিগত প্রশ্নগুলো ওঠে
ইবন মাজাহ ও তিরমিযির তুলনায় স্বাধীন সাক্ষ্যের প্রশ্নটি নাম ধরে বোঝা যায়। তাঁদের কাছে পৌঁছানোর পরের দিকের পথ আলাদা, কিন্তু উভয়টি হাফস → কাসির → আসিম → আলী অংশে এসে মিলেছে। হাফসের বক্তব্যে ভুল থাকলে তাঁর পরের দুই শাখা সেই ভুল একইভাবে বহন করতে পারে। তাই দুটি গ্রন্থে ছাপা হওয়া মানে হাফসের আগে দুটি স্বাধীন সাক্ষ্য নয়। কিরাআতের ক্ষেত্রেও একজন পুরোনো বর্ণনাকারীর পরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া তাঁর আগের সূত্রকে বহুগুণ করে না।
ইবন আদির মূল্যায়নে হাফস যাঁদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁদের সূত্রে তাঁর অধিকাংশ হাদিস যথাযথ সংরক্ষিত নয়। ইবন মাজাহ ও তিরমিযির উদাহরণে তাঁর নামসহ দুর্বল বর্ণনাও চিহ্নিত হয়। ফলে সংরক্ষণক্ষমতার সমস্যা এখানে কেবল কল্পিত ঝুঁকি নয়; নির্দিষ্ট সমালোচনা ও বর্জিত বর্ণনা দুটোই আছে। কিরাআতে তাঁর বেশি অনুশীলন ভিন্ন কাজে দক্ষতার ব্যাখ্যা দেয়। কোন নির্দিষ্ট পাঠের পক্ষে অন্য সাক্ষ্য আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর আলাদা করে দিতে হয়।
হাফসকে মিথ্যাবাদী বলার অভিযোগ এবং তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে সত্যবাদী বলার রায় পাশাপাশি সংরক্ষিত আছে। অভিযোগের সূত্র প্রত্যাখ্যান করলে তার নির্দিষ্ট কারণ পরীক্ষা করা যায়; অন্য সমালোচকের পৃথক বক্তব্যও তার নিজের ভিত্তিতে বিচার করতে হয়। কিরাআতের মর্যাদা দেখিয়ে সমস্ত নেতিবাচক রায় বাতিল করলে ধর্মীয় অনুমোদন চরিত্রের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার মাতরুক শব্দকে সরাসরি মিথ্যাবাদীর অনুবাদ করলে অভিযোগের ভাষা বিকৃত হয়। নির্দিষ্ট রায়গুলো যথাযথভাবে রাখলেই বিরোধের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়।
বুখারির একটি রায় আল-মিযযি, ইবন হাজর ও পরবর্তী ফতোয়ায় উদ্ধৃত হলে তিনটি নতুন প্রাচীন রায় তৈরি হয় না; একটি রায়ের পরবর্তী উপস্থিতি বাড়ে। আবার বুখারি, মুসলিম ও নাসায়ীর নিজস্ব বক্তব্য থাকলে সেগুলো পৃথক সমালোচকের মূল্যায়ন। কোনটি আগের বক্তব্যের উদ্ধৃতি এবং কোনটি নতুন রায়—এই হিসাব রাখলে অভিযোগের বাস্তব বিস্তার বোঝা যায়। বইয়ের সংখ্যা দিয়ে সাক্ষীর সংখ্যা বাড়ানো এবং বিভিন্ন সমালোচকের বক্তব্যকে এক করে ফেলা—দুটিই প্রমাণের চিত্র বিকৃত করে।
সহিহ, হাসান ও জইফ হাদিস-ঐতিহ্যের নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাস। ইতিহাসের প্রশ্নে কোনো বর্ণনার সময়কাল, প্রাচীন পাঠে তার উপস্থিতি, অন্য সূত্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরবর্তী পরিবর্তনও পরীক্ষা করা হয়। দুর্বল সনদযুক্ত বিবরণ একটি পুরোনো বিতর্কের সাক্ষ্য হতে পারে; একটি সহিহ সনদও তার প্রতিটি তথ্যকে সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলে না। ফলে ইতিহাসের কোনো ঘটনা শুধু “জইফ” বলে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা “সহিহ” বলে পরীক্ষা বন্ধ করা—দুটিই অনুসন্ধানকে অসম্পূর্ণ রাখে। কিরাআতের ক্ষেত্রেও শাস্ত্রীয় অনুমোদন কীভাবে এসেছে, সেই ইতিহাস আলাদা করে পড়তে হয়।
আসিম ইবন আবি আন-নাজুদের নির্ভরযোগ্যতা ও হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ড
হাফসের শিক্ষক আসিম ইবন আবি আন-নাজুদ সম্পর্কে যাহাবি কিরাআতে সুদৃঢ় এবং হাদিসে সত্যবাদী হওয়ার মূল্যায়ন দিয়েছেন। আবু যুরআ ও অন্যদের ইতিবাচক রায়ের সঙ্গে দারাকুতনির স্মৃতি-সংক্রান্ত আপত্তি এবং নাসায়ীর “মুখস্থে সুদৃঢ় নন” মন্তব্যও সংরক্ষিত। যাহাবি দারাকুতনির আপত্তি হাদিসের প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেছেন। আসিমের মূল্যায়ন তাই হাফসের মাতরুক পরিচয়ের মতো নয়। শিক্ষক ও ছাত্রের আলাদা রায় থেকেই বোঝা যায়, কেবল একটি পরম্পরার নাম ধরে তার সব ব্যক্তির নির্ভরযোগ্যতা সমান ঘোষণা করা চলে না। [20]
قلت : كان عاصم ثبتا في القراءة ، صدوقا في الحديث ، وقد وثقه أبو زرعة وجماعة ، وقال أبو حاتم : محله الصدق ، وقال الدارقطني : في حفظه شيء يعني : للحديث لا للحروف ، وما زال في كل وقت يكون العالم إماما في فن مقصرا في فنون . وكذلك كان صاحبه حفص بن سليمان ثبتا في القراءة ، واهيا في الحديث ، وكان الأعمش بخلافه كان ثبتا في الحديث ، لينا في الحروف ، فإن للأعمش قراءة منقولة في كتاب ” المنهج ” وغيره لا ترتقي إلى رتبة القراءات السبع ، ولا إلى قراءة يعقوب وأبي جعفر . والله أعلم . قال النسائي : عاصم ليس بحافظ .
বাংলা অনুবাদ: আমি বলি: আসিম কিরাআতে সুদৃঢ় এবং হাদিসে সত্যবাদী ছিলেন। আবু যুরআ ও একদল পণ্ডিত তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন। আবু হাতিম বলেছেন, তাঁর স্থান সত্যবাদীদের মধ্যে। দারাকুতনি বলেছেন, তাঁর মুখস্থে কিছু সমস্যা আছে—অর্থাৎ হাদিসে, কোরআনের পাঠে নয়। সব যুগেই এমন হয়েছে যে, কোনো পণ্ডিত একটি বিদ্যায় ইমাম, অথচ অন্য বিদ্যাগুলোতে ঘাটতি আছে। তাঁর সহচর হাফস ইবন সুলাইমানও কিরাআতে সুদৃঢ় এবং হাদিসে দুর্বল ছিলেন। আল-আমাশের অবস্থা ছিল উল্টো: তিনি হাদিসে সুদৃঢ়, কোরআনের পাঠে দুর্বল ছিলেন। আল-মানহাজ ও অন্যান্য গ্রন্থে তাঁর একটি পাঠ সংরক্ষিত আছে, যা সাত কিরাআতের মর্যাদায় কিংবা ইয়াকুব ও আবু জাফরের পাঠের মর্যাদায় পৌঁছায় না। আল্লাহই ভালো জানেন। নাসায়ী বলেছেন: আসিম মুখস্থে সুদৃঢ় নন।
আসিমের দুই প্রধান ছাত্রের পাঠভেদ এবং তাঁর পূর্বসূত্রের বিবরণ একত্রে একটি বহুধারার ছবি দেয়। সুলামি ও যিরের মাধ্যমে আলী ও ইবন মাসউদের আলাদা পাঠের কথা আছে; পরবর্তী বর্ণনায় হাফস ও শু‘বার অমিলও আছে। শিক্ষকের সামগ্রিক প্রশংসা এই প্রতিটি ভিন্ন রূপের আলাদা ইতিহাস লিখে দেয় না। তাঁর নামে কী শেখানো হয়েছে, ছাত্রেরা কোন রূপ বর্ণনা করেছেন এবং সংকলকরা কোনটি অনুমোদন করেছেন—এই নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলো থেকেই আসিমের পাঠধারার বাস্তব কাঠামো বোঝা যায়।
বিশেষজ্ঞতার যুক্তি: দক্ষতা, সততা ও বর্ণনার নিশ্চয়তা
যাহাবি তাঁর মিযানুল ইতিদালএ হাফসকে কিরাআতে সুদৃঢ়, হাদিসে দুর্বল এবং ব্যক্তিগতভাবে সত্যবাদী বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, হাফস হাদিস ভালোভাবে আয়ত্ত করতেন না, কোরআন আয়ত্ত করতেন। এটি একজন সমালোচকের ইতিবাচক মূল্যায়ন এবং দুর্বলতার কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্য সমালোচকের কঠোর রায়ও সংরক্ষিত আছে। ফলে যাহাবির বক্তব্য অভিযোগগুলোর সঙ্গে তুলনা করার তথ্য দেয়; ধর্মীয় উপাধির বলে সেই তুলনাকে অপ্রয়োজনীয় করে না। [21] [22]
حفص بن سليمان [ت، ق] ، وهو حفص بن أبي داود، أبو عمر الأسدي، مولاهم الكوفي الغاضرى صاحب القراءة، وابن امرأة عاصم. ويقال له حفيص. روى عن شيخه في القراءة عاصم، وعن قيس بن مسلم، وعلقمة بن مرثد، ومحارب بن دثار، وعدة. وأقرأ الناس مدة، وكان ثبتا في القراءة واهيا في الحديث، لانه كان لا يتقن الحديث ويتقن القرآن ويجوده ، وإلا فهو في نفسه صادق. قرأ عليه هبيرة التمار، وعبيد بن الصباح، وأبو شعيب القواس. وحدث عنه لوين، وعلى بن حجر، وجماعة.
বাংলা অনুবাদ: হাফস ইবন সুলাইমান—তিনি হাফস ইবন আবি দাউদ, আবু উমর আল-আসাদি, তাঁদের মাওলা, কুফাবাসী আল-গাদিরি, কোরআনের পাঠক এবং আসিমের স্ত্রীর সন্তান। তাঁকে হুফাইসও বলা হয়। তিনি কিরাআতে তাঁর শিক্ষক আসিম, কায়েস ইবন মুসলিম, আলকামা ইবন মারসাদ, মুহারিব ইবন দিসার এবং আরও কয়েকজনের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। দীর্ঘ সময় মানুষকে কোরআন পড়িয়েছেন। তিনি কিরাআতে সুদৃঢ় এবং হাদিসে দুর্বল ছিলেন; কারণ হাদিস ভালোভাবে আয়ত্ত করতেন না, কিন্তু কোরআন আয়ত্ত করতেন ও সুন্দরভাবে পড়তেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সত্যবাদী ছিলেন। হুবাইরা আত-তাম্মার, উবাইদ ইবন আস-সাব্বাহ ও আবু শুয়াইব আল-কাওয়াস তাঁর কাছে পাঠ শিখেছেন। লুওয়াইন, আলী ইবন হুজর ও একদল লোক তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
এক বিষয়ে বেশি অনুশীলন করলে সেই বিষয়ে ভালো দক্ষতা তৈরি হয়—যাহাবির ব্যাখ্যার এই অংশ বোধগম্য। এর পরেও দুটি প্রশ্ন থাকে। প্রথমত, অসততার অভিযোগ থাকলে তার সত্যাসত্য অনুশীলনের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দ্বিতীয়ত, দক্ষ একজন পাঠক নিজে কোন রূপ নির্বাচন করেছেন এবং তাঁর ছাত্রেরা কোন রূপ বর্ণনা করেছেন, তার ইতিহাস পরীক্ষা করতে হয়। সূরা রুমের ঘটনায় হাফসের নির্বাচন এবং তাঁর নামে দুই রূপ সংরক্ষিত থাকা—দুটিই আছে। কাজেই দক্ষতার প্রশংসাকে প্রতিটি পাঠের অভ্রান্ত উৎসের নিশ্চয়তা বানানো যুক্তিসংগত নয়।
তাকিউদ্দিন আস-সুবকি তাঁর শিফাউস সিকামএ ভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। ইসলামকিউএতে প্রকাশিত ৩৪০৩৩৬ নম্বর উত্তরে সংরক্ষিত উদ্ধৃতিতে তিনি ইবন খিরাশের অভিযোগকে বাড়াবাড়ি বলেছেন। কারণ হিসেবে হাফসের কিরাআতের ইমাম হওয়া এবং মানুষের তাঁর পাঠ গ্রহণে একমত হওয়ার কথা তুলেছেন। তাঁর মতে, হাফস হাদিসবিশেষজ্ঞ না-হওয়ায় প্রচুর ভুল ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা ঘটেছে। অর্থাৎ এখানে কিরাআতের সামাজিক স্বীকৃতি ব্যবহার করে মিথ্যাচারের অভিযোগ অবিশ্বাস করা হয়েছে। [23]
وعندي أن هذا القول سرف، فإن هذا الرجل إمام قراءة، وكيف يعتقد أنه يقدم على وضع الحديث والكذب، ويتفق الناس على الأخذ بقراءته، وإنما غايته أنه ليس من أهل الحديث، فذلك وقعت المنكرات والغلط الكثير في روايته
বাংলা অনুবাদ: আমার মতে, এই বক্তব্য বাড়াবাড়ি। এই ব্যক্তি তো কিরাআতের ইমাম। কীভাবে বিশ্বাস করা যায় যে তিনি হাদিস তৈরি ও মিথ্যাচারে এগোবেন, অথচ মানুষ তাঁর পাঠ গ্রহণে একমত হবে? তাঁর ব্যাপারে সর্বোচ্চ যা বলা যায়, তা হলো তিনি হাদিসবিশেষজ্ঞ ছিলেন না। সে কারণেই তাঁর বর্ণনায় অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য ও প্রচুর ভুল ঘটেছে।
সুবকির যুক্তির সমস্যা হলো, মানুষের গ্রহণ করাকেই গ্রহণযোগ্যতার নিশ্চয়তা বানানো। একটি পাঠ সবাই গ্রহণ করেছেন—এই তথ্য থেকে তার বর্ণনাকারী মিথ্যা বলতে পারেন না সিদ্ধান্ত আসে না। পাঠটি গ্রহণের পেছনে কী প্রমাণ ছিল, সেটিই পরীক্ষা করতে হয়। বর্ণনাকারীর সততা দিয়ে পাঠের নির্ভরযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে আবার পাঠের স্বীকৃতি দিয়ে সেই সততা প্রমাণ করলে দুই সিদ্ধান্ত পরস্পরকে ধরে দাঁড়ায়। এই বৃত্ত ভাঙার উপায় স্বাধীন সাক্ষ্য। “ইমাম” উপাধি বা অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে অভিযোগের সূত্র ও পাঠের ইতিহাস এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
হাফস যখন নিজের শিক্ষকের পাঠ থেকে সরে যান: সূরা রূম ৩০:৫৪
সূরা রুম ৩০:৫৪-এ “দুর্বলতা” বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ তিনবার এসেছে। দাদ অক্ষরে জবর দিলে ضَعْف—“দা‘ফ”, পেশ দিলে ضُعْف—“দু‘ফ”। এখানে দুটি রূপের অর্থ কাছাকাছি; প্রশ্নটি কোন উচ্চারণ কীভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ইবন আল-জাযারি জানান, আসিমের জবরযুক্ত পাঠের বিপরীতে হাফস পেশ বেছে নিয়েছিলেন। নির্বাচনের কারণ হিসেবে এসেছে ইবন উমরের সূত্রে বর্ণিত উচ্চারণ সংশোধনের হাদিস। ফলে হাফস শিক্ষকের পাঠ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আরেক বর্ণনার ভিত্তিতে একটি বিকল্প উচ্চারণ বেছে নিয়েছেন। “হাফস ‘আন ‘আসিম” নামের মধ্যেই বর্ণনা ও ব্যক্তিগত নির্বাচনের পার্থক্য সংরক্ষিত আছে। [24]
( واختلفوا ) في : من ضعف ، و من بعد ضعف ، و ضعفا فقرأ عاصم وحمزة بفتح الضاد في الثلاثة ، واختلف عن حفص فروى عنه عبيد وعمرو أنه اختار فيها الضم خلافا لعاصم للحديث الذي رواه عن الفضيل بن مرزوق عن عطية العوفي عن ابن عمر مرفوعا ، وروينا عنه من طرق أنه قال : ما خالفت عاصما في شيء من القرآن إلا في هذا الحرف ، وقد صح عنه الفتح والضم جميعا ، فروى عنه عبيد وأبو الربيع الزهراني والفيل عن عمرو عنه الفتح رواية وروى عنه ابن هبيرة والقواس وزرعان عن عمرو عنه الضم اختيارا . قال الحافظ أبو عمرو : واختياري في رواية حفص من طريق عمرو وعبيد الأخذ بالوجهين الفتح والضم ، فأتابع بذلك عاصما على قراءته وأوافق به حفصا على اختياره . ( قلت ) : وبالوجهين قرأت له ، وبهما آخذ ، وقرأ الباقون بضم الضاد فيها ،
বাংলা অনুবাদ: “মিন দা‘ফ”, “মিন বা‘দি দা‘ফ” ও “দা‘ফান”—এই তিন স্থানে মতভেদ হয়েছে। আসিম ও হামজা তিনটিতেই দাদ অক্ষরে জবর দিয়ে পড়েছেন। হাফসের সূত্রে মতভেদ আছে। উবাইদ ও আমর তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, আসিমের বিপরীতে তিনি পেশ বেছে নিয়েছিলেন। এর কারণ সেই হাদিস, যা তিনি ফুদাইল ইবন মারযুক → আতিয়্যা আল-আওফি → ইবন উমর সূত্রে নবীর বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একাধিক সূত্রে তাঁর কাছ থেকে আমরা বর্ণনা করেছি যে, তিনি বলেছেন: কোরআনের এই একটি পাঠ ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আমি আসিমের বিরোধিতা করিনি। তাঁর সূত্রে জবর ও পেশ—উভয় পাঠই সঠিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। উবাইদ, আবু রাবি আয-যাহরানি এবং আমরের মাধ্যমে আল-ফিল তাঁর কাছ থেকে জবরকে বর্ণিত পাঠ হিসেবে জানিয়েছেন। ইবন হুবাইরা, আল-কাওয়াস এবং আমরের মাধ্যমে যরআন তাঁর কাছ থেকে পেশকে নির্বাচিত পাঠ হিসেবে জানিয়েছেন। হাফিজ আবু আমর বলেন: আমর ও উবাইদের পথে হাফসের বর্ণনায় আমার পছন্দ হলো জবর ও পেশ—উভয় রূপ গ্রহণ করা। এতে আসিমের পাঠ অনুসরণ করি এবং হাফসের নির্বাচনের সঙ্গেও মিল রাখি। আমি বলি: হাফসের নামে আমি দুই রূপেই পড়েছি এবং দুটিই গ্রহণ করি। বাকি পাঠকেরা এই স্থানগুলোতে দাদ অক্ষরে পেশ দিয়ে পড়েছেন।
ইবন আল-জাযারির ভাষায় জবর হলো হাফসের রিওয়ায়াত বা বর্ণিত পাঠ; পেশ তাঁর ইখতিয়ার বা নির্বাচিত পাঠ। উবাইদ, আবু রাবি আয-যাহরানি ও আমরের মাধ্যমে আল-ফিলের পথে জবর এসেছে; ইবন হুবাইরা, আল-কাওয়াস ও আমরের মাধ্যমে যরআনের পথে পেশ এসেছে। আদ-দানি দুই রূপ গ্রহণ করে বলেছেন, একটিতে আসিমের পাঠ অনুসরণ করছেন, অন্যটিতে হাফসের নির্বাচন। ইবন আল-জাযারিও দুই রূপে পড়ার কথা বলেছেন। এখানে শুধু একটি অক্ষর মুখস্থ করে পরের জনকে দেওয়া হয়নি; শিক্ষকের পাঠ, শিষ্যের পছন্দ এবং পরবর্তী অনুমোদন একসঙ্গে কাজ করেছে।
আবু দাউদ ৩৯৭৮-এ নির্বাচনের পেছনে ব্যবহৃত হাদিসটির বিবরণ পাওয়া যায়। আতিয়্যা আল-আওফি ইবন উমরের কাছে শব্দটি জবর দিয়ে পড়েন। ইবন উমর পেশ দিয়ে সংশোধন করে বলেন, তিনিও মুহাম্মদের কাছে একইভাবে পড়ে সংশোধিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ বর্ণনায় মুহাম্মদ থেকে ইবন উমর এবং ইবন উমর থেকে আতিয়্যা—সংশোধনের দুই ধাপ আছে। সুন্নাহ ডটকমে প্রদর্শিত আলবানির মূল্যায়নে হাদিসটি হাসান। [25]
حَدَّثَنَا النُّفَيْلِيُّ ، حَدَّثَنَا زُهَيْرٌ ، حَدَّثَنَا فُضَيْلُ بْنُ مَرْزُوقٍ ، عَنْ عَطِيَّةَ بْنِ سَعْدٍ الْعَوْفِيِّ ، قَالَ قَرَأْتُ عَلَى عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ { اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ ضَعْفٍ } فَقَالَ { مِنْ ضُعْفٍ } قَرَأْتُهَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَمَا قَرَأْتَهَا عَلَىَّ فَأَخَذَ عَلَىَّ كَمَا أَخَذْتُ عَلَيْكَ .
বাংলা অনুবাদ: আন-নুফাইলি আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, যুহাইর আমাদের বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, ফুদাইল ইবন মারযুক আমাদের বর্ণনা করেছেন, আতিয়্যা ইবন সাদ আল-আওফির সূত্রে। আতিয়্যা বলেন: আবদুল্লাহ ইবন উমরের কাছে আমি “আল্লাহুল্লাযি খালাকাকুম মিন দা‘ফ”—দাদ অক্ষরে জবর দিয়ে—পড়লাম। তিনি বললেন, “মিন দু‘ফ”—পেশ দিয়ে। তারপর বললেন: তুমি আমার কাছে যেভাবে পড়েছ, আমিও আল্লাহর রাসুলের কাছে সেভাবেই পড়েছিলাম। আমি তোমাকে যেভাবে সংশোধন করেছি, তিনিও আমাকে সেভাবেই সংশোধন করেছিলেন।
ইউসুফ আল-কারাদাবি আতিয়্যা আল-আওফির দুর্বলতার কারণে একই হাদিসের সনদ দুর্বল বলেছেন, যদিও তিরমিযির হাসান বলার রায় উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি দুই পাঠই নিশ্চিত তাওয়াতুরে প্রতিষ্ঠিত ঘোষণা করেছেন। হাদিসটি নিয়ে শ্রেণিবিন্যাসে মতভেদ আছে, অথচ পাঠ নির্বাচনের ইতিহাসে সেটির ভূমিকা নথিবদ্ধ। ফলে হাদিস ও কিরাআতকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলে এই নির্বাচন ব্যাখ্যা করা যায় না। হাফস কোন উচ্চারণ বেছে নিলেন, তার ঘোষিত কারণই একটি হাদিস। সেই কারণের মূল্যায়ন এবং দুই পাঠের নিশ্চিত উৎসের দাবি—দুটির প্রমাণ আলাদাভাবে পরীক্ষা করার প্রশ্ন থাকে। [26]
والحديث إسناده ضعيف، وإن حسنه الترمذي. لضعف عطية العوفي (3)، والقراءتان ثابتتان بالتواتر المستيقن، ولا اعتراض على واحدة منهما.
বাংলা অনুবাদ: আতিয়্যা আল-আওফির দুর্বলতার কারণে হাদিসটির সনদ দুর্বল, যদিও তিরমিযি একে হাসান বলেছেন। আর দুটি পাঠ নিশ্চিত তাওয়াতুরে প্রতিষ্ঠিত; কোনোটির বিরুদ্ধেই আপত্তি নেই।
ইবন আশুর দুটি উচ্চারণকে কুরাইশ ও তামিমের ভাষারীতি দিয়ে মিলিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, আসিম ও হামজার জবরযুক্ত পাঠের পক্ষে “নিশ্চয়” এমন সনদ আছে, যা ইবন উমরের হাদিসের বিপরীতে দাঁড়ায়। এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন, মুহাম্মদ নিজের গোত্রের পেশযুক্ত রূপ পড়েছেন এবং অন্য গোত্রের ভাষায় জবরও অনুমোদিত। এই ব্যাখ্যায় বিদ্যমান দুই পাঠ ও সংশোধনের বর্ণনাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। “নিশ্চয় সনদ আছে” বলা এবং সেই নির্দিষ্ট সনদ হাজির করা আলাদা কাজ। তাঁর সমন্বয় একটি তাফসিরি ব্যাখ্যা; উচ্চারণের প্রথম ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নয়। [27]
الله الذي خلقكم من ضعف ثم جعل من بعد ضعف قوة ثم جعل من بعد قوة ضعفا وشيبة يخلق ما يشاء وهو العليم القدير
هذا رابع استئناف من الأربعة المتقدمة رجوع إلى الاستدلال على عظيم القدرة في مختلف المصنوعات من العوالم لتقرير إمكانية البعث وتقريب حصوله إلى عقول منكريه لأن تعدد صور إيجاد المخلوقات وكيفياته من ابتدائها عن عدم أو من إعادتها بعد انعدامها ويتطور وبدونه مما يزيد إمكان البعث وضوحا عند منكريه ، فموقع هذه الآية كموقع قوله الله الذي يرسل الرياح فتثير سحابا ونظائرها كما تقدم ; ولذلك جاءت فاتحتها على أسلوب فواتح نظائرها وهذا ما يؤذن به تعقيبها بقوله ويوم تقوم الساعة يقسم المجرمون الآية .
ثم قوله الله الذي خلقكم مبتدأ وصفة ، وقوله يخلق ما يشاء هو الخبر ، أي يخلق ما يشاء مما أخبر به وأنتم تنكرون .
والضعف بضم الضاد في الآية وهو أفصح وهو لغة قريش . ويجوز في ضاده الفتح وهو لغة تميم . وروى أبو داود والترمذي عن عبد الله بن عمر قال : قرأتها على رسول الله ( الذي خلقكم من ضعف ) يعني لفتح الضاد فأقرأني ( من ضعف ) يعني بضم الضاد . وقرأ الجمهور ألفاظ ضعف الثلاثة بضم الضاد في الثلاثة . وقرأها عاصم وحمزة بفتح الضاد ، فلهما سند لا محالة يعارض حديث ابن عمر . والجمع بين هذه القراءة وبين حديث ابن عمر أن النبيء صلى الله عليه وسلم نطق بلغة الضم لأنها لغة قومه ، وأن الفتح رخصة لمن يقرأ بلغة قبيلة أخرى ، ومن لم يكن له لغة تخصه فهو مخير بين القراءتين . والضعف : الوهن واللين .
و ( من ) ابتدائية ، أي مبتدأ خلقه من ضعف ، أي من حالة ضعف ، وهي حالة كونه جنينا ثم صبيا إلى أن يبلغ أشده ، وهذا كقوله خلق الإنسان من [ ص: 128 ] عجل يدل على تمكن الوصف من الموصوف حتى كأنه منتزع منه ، قال تعالى وخلق الإنسان ضعيفا .
والمعنى : أنه كما أنشأكم أطوارا تبتدئ من الوهن وتنتهي إليه فكذلك ينشئكم بعد الموت إذ ليس ذلك بأعجب من الإنشاء الأول وما لحقه من الأطوار ، ولهذا أخبر عنه بقوله يخلق ما يشاء .
وذكر وصف العلم والقدرة لأن التطور هو مقتضى الحكمة وهي من شئون العلم ، وإبرازه على أحكم وجه هو من أثر القدرة .
وتنكير ( ضعف وقوة ) للنوعية ; ف ” ضعف ” المذكور ثانيا هو عين ضعف المذكور أولا ، و ” قوة ” المذكورة ثانيا عين ” قوة ” المذكورة أولا . وقولهم : النكرة إذا أعيدت نكرة كانت غير الأولى ، يريدون به التنكير المقصود منه الفرد الشائع لا التنكير المراد به النوعية .
وعطف ” وشيبة ” للإيماء إلى أن هذا الضعف لا قوة بعده وأن بعده العدم بما شاع من أن الشيب نذير الموت .
والشيبة : اسم مصدر الشيب . وقد تقدم في قوله تعالى واشتعل الرأس شيبا في سورة مريم .
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহই তোমাদের দুর্বলতা থেকে সৃষ্টি করেছেন; তারপর দুর্বলতার পরে শক্তি দিয়েছেন; তারপর শক্তির পরে দুর্বলতা ও বার্ধক্য দিয়েছেন। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন; তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।
এটি আগের চারটি আলোচনার চতুর্থ নতুন সূচনা। বিভিন্ন জগতের সৃষ্টবস্তুর মধ্যে বিরাট ক্ষমতার নিদর্শন দেখিয়ে পুনরুত্থানের সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠা এবং অস্বীকারকারীদের বোধের কাছে তা সহজ করার যুক্তিতে এখানে ফিরে আসা হয়েছে। কোনো কিছুকে অনস্তিত্ব থেকে সৃষ্টি করা, বিলুপ্তির পর ফিরিয়ে আনা এবং বিবর্তিত বা অপরিবর্তিত নানা অবস্থায় সৃষ্টির বহুবিধ রূপ পুনরুত্থানের সম্ভাবনাকে অস্বীকারকারীদের কাছে আরও স্পষ্ট করে। এই আয়াতের অবস্থান “আল্লাহই বাতাস পাঠান, তারপর তা মেঘ তোলে” এবং আগের অনুরূপ আয়াতগুলোর মতো। তাই একই ধরনের সূচনা এসেছে; এর পরে “যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, অপরাধীরা শপথ করবে”—এই বক্তব্য আসাও তার ইঙ্গিত।
“আল্লাহ যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন”—এখানে আল্লাহ বাক্যের উদ্দেশ্য, পরের অংশ তাঁর বিশেষণ। “তিনি যা চান সৃষ্টি করেন” হলো বিধেয়; অর্থাৎ তোমরা যে সংবাদ অস্বীকার করছ, তিনি তার মধ্য থেকেও যা চান সৃষ্টি করেন।
আয়াতে “দুর্বলতা” শব্দের দাদ অক্ষরে পেশ দিয়ে উচ্চারণ অধিক বিশুদ্ধ এবং কুরাইশের ভাষারীতি। দাদে জবর দেওয়াও বৈধ; তা তামিমের ভাষারীতি। আবু দাউদ ও তিরমিযি আবদুল্লাহ ইবন উমরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন: তিনি শব্দটি রাসুলকে জবর দিয়ে পড়ে শোনান; রাসুল তাঁকে পেশ দিয়ে পড়ান। অধিকাংশ পাঠক তিনবারই শব্দটি পেশ দিয়ে পড়েছেন; আসিম ও হামজা জবর দিয়ে পড়েছেন। তাঁদের নিশ্চয় এমন সনদ আছে, যা ইবন উমরের হাদিসের বিপরীতে দাঁড়ায়। এই পাঠ ও ইবন উমরের হাদিসের সমন্বয় হলো, নবী পেশের ভাষারীতিতে উচ্চারণ করেছিলেন, কারণ সেটি তাঁর গোত্রের ভাষারীতি; অন্য গোত্রের ভাষারীতিতে পড়ার লোকের জন্য জবর অনুমোদিত। যার নিজস্ব কোনো বিশেষ ভাষারীতি নেই, সে দুই পাঠের যেকোনোটি বেছে নিতে পারে। দুর্বলতার অর্থ ক্ষীণতা ও কোমলতা।
“মিন” সূচনাবোধক: অর্থাৎ দুর্বল অবস্থা থেকে তাঁর সৃষ্টির সূচনা। এটি ভ্রূণ, তারপর শিশুকাল থেকে পূর্ণ শক্তি অর্জনের আগের অবস্থা। “মানুষকে তাড়াহুড়া থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে”—এই বক্তব্যের মতোই এখানে গুণটির প্রবল উপস্থিতি বোঝানো হয়েছে, যেন মানুষকে সেই গুণ থেকেই বের করে আনা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন: মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে।
অর্থ হলো, তিনি যেমন তোমাদের বিভিন্ন পর্যায়ে সৃষ্টি করেছেন, যার শুরু দুর্বলতা এবং শেষও দুর্বলতায়, তেমনি মৃত্যুর পর তোমাদের আবার সৃষ্টি করবেন। প্রথম সৃষ্টি ও তার পরবর্তী পর্যায়গুলোর চেয়ে তা বেশি বিস্ময়কর নয়। তাই বলা হয়েছে, তিনি যা চান সৃষ্টি করেন।
জ্ঞান ও ক্ষমতার গুণের উল্লেখ এসেছে, কারণ বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন প্রজ্ঞার দাবি, যা জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত; আর তাকে সর্বোত্তমভাবে বাস্তবায়িত করা ক্ষমতার ফল।
“দুর্বলতা” ও “শক্তি” শব্দ দুটি অনির্দিষ্ট রূপে এসেছে প্রকার বোঝাতে। দ্বিতীয়বার উল্লিখিত দুর্বলতা প্রথমবার উল্লিখিত দুর্বলতার একই প্রকার; দ্বিতীয়বার উল্লিখিত শক্তিও প্রথমবারের শক্তির একই প্রকার। “অনির্দিষ্ট বিশেষ্য আবার অনির্দিষ্টভাবে এলে তা প্রথমটির থেকে আলাদা”—এই নিয়মের উদ্দেশ্য অনির্দিষ্ট ব্যক্তিবিশেষ বোঝানো, প্রকার বোঝানো নয়।
“এবং বার্ধক্য” যুক্ত করা ইঙ্গিত দেয়, এই দুর্বলতার পরে আর শক্তি নেই; এরপর অনস্তিত্ব। কারণ পাকা চুল মৃত্যুর পূর্বসংবাদ—এই ধারণা প্রচলিত। “শাইবা” হলো চুল পেকে যাওয়ার ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য। সূরা মারইয়ামে “মাথা পাকা চুলে জ্বলে উঠেছে” বক্তব্যে এর আলোচনা আগে এসেছে।
এই ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট শব্দের ইতিহাস পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান: আসিমের পাঠ, হাফসের বিপরীত নির্বাচন, সেই নির্বাচনের পেছনে হাদিস এবং পরবর্তী পণ্ডিতদের দুই রূপ অনুমোদন। ফলে পাঠপরম্পরাকে মানুষের বিচার ছাড়া চলা নিছক অনুলিপির শৃঙ্খল হিসেবে দেখানো ভুল। এখানে বর্ণনাকারী প্রমাণের মধ্যে অগ্রাধিকার স্থির করেছেন, সংকলক বর্ণিত ও নির্বাচিত রূপ আলাদা করেছেন, ব্যাখ্যাকারী বিরোধ মেলানোর চেষ্টা করেছেন। ধর্মীয় অনুমোদন এই মানবিক কাজগুলোকে ঘটেনি করে দেয় না।
কায়রো থেকে মদিনা: মুদ্রিত একরূপতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রাধান্য
মুশাফ মুদ্রণের সময় পাঠের নামের পাশাপাশি বানান, স্বরচিহ্ন, আয়াতসংখ্যা ও থামার নির্দেশও নির্দিষ্ট করতে হয়। একই পাঠ অনুসরণ করেও পাতার বিন্যাস ও চিহ্নের ব্যবহার আলাদা হতে পারে। একজন সাধারণ পাঠক ছোটবেলা থেকে যে পাতার সঙ্গে পরিচিত হন, সেটির দৃশ্যমান রূপকে কোরআনের একমাত্র স্বাভাবিক রূপ মনে করতে পারেন। কিন্তু একটি চিহ্নের প্রচলন, একটি লিপির ব্যবহার এবং শব্দের প্রাচীন উৎস ভিন্ন ইতিহাস বহন করে। পরিচিত পাতার নিশ্চয়তা দিয়ে সেই ইতিহাসের সব প্রশ্ন মিটে যায় না।
মার্ক্স জানান, কায়রোর বানান নির্ধারণে আদ-দানি ও ইবন নাজাহর গ্রন্থ ব্যবহৃত হয়েছে। মদিনার সংস্করণ সেই বানান অনুসরণ করে; উসমান তাহা তা নতুন করে লিখেছেন এবং বিরামনির্দেশের অনেকগুলো সৌদি পাঠপ্রথার উপযোগী করে বদলানো হয়েছে। [28]
The orthography of the printed edition follows that of the Cairo edition
বাংলা অনুবাদ: মুদ্রিত সংস্করণটির বানানরীতি কায়রো সংস্করণের বানানরীতি অনুসরণ করে।
এক আদল থেকে লক্ষ মুশাফ ছাপা হলে লক্ষ কপিতে মিল থাকবে। সেই মিল এক সাধারণ আদলের অনুসরণের ফল; লক্ষ স্বাধীন প্রাথমিক সাক্ষীর ফল নয়। একই পাঠ্যবই অনুসরণ করা হাজার শিক্ষার্থীর উত্তর এক হওয়ার সঙ্গে এই সম্পর্ক তুলনীয়। তাঁদের মিল বইটি কী শেখায়, তার সাক্ষ্য দেয়; বইয়ের লেখকের আগের প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করে না। তাই বর্তমানের অনুলিপির সংখ্যা দিয়ে প্রথম যুগের সাক্ষীর সংখ্যা গণনা করলে একই প্রমাণ বারবার গোনা হয়।
একই মুদ্রণকেন্দ্র ভিন্ন স্বীকৃত পাঠ প্রকাশ করলে পাঠের বহুত্ব মুদ্রিত বইয়েও দৃশ্যমান হয়। কোথাও হাফস বেশি পৌঁছায়, কোথাও ওয়ারশ বা অন্য ধারা। এর সঙ্গে বিতরণ, স্থানীয় শিক্ষা ও দীর্ঘ অভ্যাসের সম্পর্ক আছে। আজ কোন পাঠ বেশি মানুষ পড়েন, তার উত্তর থেকে মুহাম্মদ কোন নির্দিষ্ট রূপ উচ্চারণ করেছিলেন, সেই অতীত ঘটনার উত্তর বের হয় না। জনপ্রিয়তার অনুপাত বদলালেও অতীত ঘটনাটি বদলে যায় না।
এই ব্যবস্থার সামাজিক ফল হলো, একটি অনুমোদিত রূপ অত্যন্ত পরিচিত এবং অন্য অনুমোদিত রূপ অপরিচিত হয়ে ওঠা। পাঠক মুশাফের পাতায় স্বরচিহ্ন দেখেন; হাফস ও শু‘বার অমিল, হাফসের বিরুদ্ধে হাদিস-সমালোচনা কিংবা পাঠ নির্বাচনের বিবরণ সেখানে দেখা যায় না। ফলে মুশাফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচিতি থেকেও তার বর্ণনাপরম্পরা সম্পর্কে অল্প জানা সম্ভব। প্রচলিত পাঠের প্রতি দৃঢ় আস্থা এবং পুরো ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান একই অভিজ্ঞতা নয়।
অপরিচিত স্বীকৃত পাঠকেও বিকৃত কোরআন ভাবার প্রবণতা
মুহাম্মদ ইবন সালিহ আল-উসাইমিন তাঁর মুখতাসার আত-তাহরিরএর পাঠে এই অপরিচিতির একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন। তাঁর ধারণা, মরক্কোর কেউ তাঁর এলাকার সাধারণ মানুষের সামনে ওয়ারশের পাঠ পড়তে চাইলে তারা বাধা দেবে; মাগরিবি রীতিতে লেখা নিজের মুশাফ আনলে সেটি ছিঁড়েও ফেলবে। এটি কোনো ঘটে-যাওয়া ঘটনার প্রতিবেদন নয়, তাঁর দেওয়া উদাহরণ। কিন্তু উদাহরণের বিষয়টি স্পষ্ট: স্বীকৃত পাঠ ও লিপি অচেনা হওয়ার কারণে সেগুলোকেও বিকৃতি ভাবা সম্ভব। [29]
ولو جاء بالمصحف الذي يقرأ به والمكتوب على قاعدة المغرب لمزقوه
বাংলা অনুবাদ: আর যদি সে মাগরিবের রীতিতে লেখা যে মুশাফ পড়ে, সেটি নিয়ে আসে, তাহলে তারা তা ছিঁড়ে ফেলবে।
এই প্রতিক্রিয়ায় পরিচিতিই সত্য চেনার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যা পড়েনি বা দেখেনি, সেটিকে ভুল ভাবছে, অথচ সেটিও অনুমোদিত হতে পারে। ফলে “বিকৃত কোরআন আমি দেখলেই চিনব” ধরনের নিশ্চয়তা পাঠসমূহের জ্ঞানের ওপর নাও দাঁড়াতে পারে; স্থানীয় অভ্যাসই তার ভিত্তি হতে পারে। ইবন উসাইমিনের উদাহরণ দেখায়, স্বীকৃত বহুপাঠ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং নিজের পরিচিত পাঠের প্রতি প্রবল আস্থা একই মানুষের মধ্যে সহাবস্থান করতে পারে।
‘শায’ পাঠ, স্বীকৃতির শর্ত এবং হাফসের স্বতন্ত্র পাঠ
হাদিসশাস্ত্রে শায সাধারণত গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীর বক্তব্য অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিরোধী হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিরাআতে শব্দটি গ্রহণযোগ্য পাঠের শর্ত হারানোর অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইবন আল-জাযারির নিয়মে তিনটি শর্ত আছে: আরবি ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য, উসমানি মুশাফগুলোর কোনো একটির রসমে সম্ভাব্য স্থান এবং সহিহ সনদ। এগুলো পূরণ হলে সাত বা দশের বাইরের গ্রহণযোগ্য ইমামের পাঠও মান্য; শর্ত হারালে সাতজনের নামে বর্ণিত রূপও দুর্বল, শায বা বাতিল। ফলে অনুমোদিত ব্যক্তির নাম এবং তাঁর নামে বর্ণিত প্রতিটি রূপের গ্রহণযোগ্যতা এক করে দেখার সুযোগ নেই। [30]
كل قراءة وافقت العربية ولو بوجه ، ووافقت أحد المصاحف العثمانية ولو احتمالا وصح سندها ، فهي القراءة الصحيحة التي لا يجوز ردها ولا يحل إنكارها ، بل هي من الأحرف السبعة التي نزل بها القرآن ووجب على الناس قبولها ، سواء كانت عن الأئمة السبعة ، أم عن العشرة ، أم عن غيرهم من الأئمة المقبولين ، ومتى اختل ركن من هذه الأركان الثلاثة أطلق عليها ضعيفة أو شاذة أو باطلة ، سواء كانت عن السبعة أم عمن هو أكبر منهم ، هذا هو الصحيح عند أئمة التحقيق من السلف والخلف ، صرح بذلك الإمام الحافظ أبو عمرو عثمان بن سعيد الداني ، ونص عليه في غير موضع الإمام أبو محمد مكي بن أبي طالب ، وكذلك الإمام أبو العباس أحمد بن عمار المهدوي ، وحققه الإمام الحافظ أبو القاسم عبد الرحمن بن إسماعيل المعروف بأبي شامة ، وهو مذهب السلف الذي لا يعرف عن أحد منهم خلافه .
বাংলা অনুবাদ: যে পাঠ আরবি ভাষার কোনো গ্রহণযোগ্য রীতির সঙ্গে মেলে, উসমানি মুশাফগুলোর একটির সঙ্গে সম্ভাব্যভাবেও মেলে এবং যার সনদ সহিহ, সেটিই সঠিক পাঠ। তা প্রত্যাখ্যান করা যায় না এবং অস্বীকার করা বৈধ নয়। বরং তা কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সাত আহরুফের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষের গ্রহণ করা আবশ্যক—সাত ইমামের সূত্রে আসুক, দশজনের সূত্রে আসুক কিংবা অন্য গ্রহণযোগ্য ইমামদের সূত্রে আসুক। এই তিন শর্তের কোনো একটি নষ্ট হলে পাঠটিকে দুর্বল, শায বা বাতিল বলা হয়—সাতজনের সূত্রে আসুক কিংবা তাঁদের চেয়েও মর্যাদাবান কারও সূত্রে আসুক। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনুসন্ধানী ইমামদের কাছে এটিই সঠিক অবস্থান। হাফিজ আবু আমর উসমান ইবন সাঈদ আদ-দানি স্পষ্টভাবে বলেছেন; আবু মুহাম্মদ মাক্কি ইবন আবি তালিব একাধিক স্থানে উল্লেখ করেছেন; আবুল আব্বাস আহমদ ইবন আম্মার আল-মাহদাওয়িও বলেছেন। আবুল কাসিম আবদুর রহমান ইবন ইসমাইল, যিনি আবু শামা নামে পরিচিত, এ অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি পূর্বসূরিদের মত, যাঁদের কারও ভিন্নমত জানা যায় না।
এই নিয়মে বিরল হওয়া এবং অগ্রহণযোগ্য হওয়া আলাদা। হাফসের একটি স্বতন্ত্র পাঠ অনুমোদিত থাকতে পারে, অন্যদের অধিক প্রচলিত পাঠ থেকে ভিন্ন হলেও। তার গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে তখন ঘোষিত শর্তগুলো দেখাতে হয়। শুধু “সবাই পড়েন” বললে বিরল অনুমোদিত পাঠের ব্যাখ্যা হয় না; শুধু “হাফস বলেছেন” বললেও শর্তের পরীক্ষা শেষ হয় না। নাম ও সংখ্যার বদলে পাঠটির নির্দিষ্ট অবস্থা বিচার করার কথা নীতিটির মধ্যেই আছে।
রুম ৩০:২২-এর লাম অক্ষরের যের-জবর এই পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। হাফসের রূপটি স্বতন্ত্র হলেও স্বীকৃত; একই স্বরচিহ্নহীন রসমে অন্যদের রূপও বসে। ফলে রসমের সঙ্গে মিল দেখিয়ে নির্দিষ্ট স্বরটির উৎস একা নির্ধারণ করা যায় না। আবার সংখ্যায় বেশি পাঠক অন্য রূপ পড়েন বলে হাফসের রূপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্জিতও হয় না। এখানে অনুমোদনের নির্দিষ্ট কারণ ও বর্ণনাপথই পরীক্ষার বিষয়।
ইবন মুজাহিদের ভূমিকা এবং সাত কিরাআতের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা
ইবন মুজাহিদ ৩২৪ হিজরি বা ৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান—মুহাম্মদের যুগের প্রায় তিন শতাব্দী পরে। তাঁর সাত পাঠকের নির্বাচন পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু তালিকার বাইরে থাকা ইয়াকুবের পাঠ পরে দশের তালিকায় অনুমোদিত হয়। ফলে সাতের সীমা কোনো অপরিবর্তনীয় নবুওয়াতি তালিকা ছিল না; স্বীকৃতির পরিসর পরে বিস্তৃত হয়েছে। সংকলকের সিদ্ধান্ত এবং তার পরবর্তী প্রতিষ্ঠা ধর্মীয় ইতিহাসে মানুষের কর্তৃত্বের দৃশ্যমান কাজ।
প্রত্যেক পাঠকের দুই প্রধান বর্ণনাকারীর পরিচিত ছকও ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত বিন্যাস। আসিমের পাশে হাফস ও শু‘বা লেখা থাকলে শিক্ষার্থী প্রধান পরিচয়গুলো সহজে মনে রাখেন। কিন্তু ওই দুই নামের আগে ও পরে কত পথ, কোথায় অমিল, কোন উপাদান বৃহত্তর পাঠকসমাজ থেকে এসেছে—এসব ছকে দেখা যায় না। দুরির উদাহরণে ব্যক্তির নামের অধীনে সমবেত পরম্পরার উপাদান আসার বিষয়টি স্পষ্ট। শিক্ষার সুবিধার জন্য তৈরি নামের তালিকাকে সমস্ত বর্ণনাপথের পূর্ণ ইতিহাস বলে পড়লে সেই সংক্ষেপই বিভ্রান্তির কারণ হয়।
সাত কিরাআত ও হাদিসে উল্লিখিত সাত আহরুফকে এক করে দেখার সমস্যা আরও সরাসরি। প্রথমটি পরবর্তী যুগের সাতজন নির্বাচিত পাঠকের তালিকা; দ্বিতীয়টি নবীর নামে বর্ণিত একটি ধারণা। শুধু সংখ্যা মিলে যাওয়ায় দুটিকে একই বললে এমন দাঁড়ায়, পরে জন্মানো ব্যক্তিদের নির্বাচনই আগের হাদিসের বিষয় নির্ধারণ করেছে। ইসমাইল আল-কাররাব এই যুক্তির অসংগতি বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন।
ইবন আল-জাযারি আল-কাররাবের আল-শাফি থেকে দীর্ঘ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, শুধু সাত পাঠকে আঁকড়ে ধরার পক্ষে আসার বা সুন্নাহ নেই; একটি প্রসিদ্ধ সংকলনের সীমাকে মানুষ ধর্মীয় সীমা ভেবেছে। তিনি আরও দেখিয়েছেন, সাত আহরুফ যদি পরে জন্মানো সাত পাঠককে বোঝায়, তাহলে সাহাবিদের পাঠও সেই ভবিষ্যৎ ব্যক্তিদের নির্বাচনের ওপর নির্ভর করত। তাঁর সমালোচনা মানুষের তৈরি তালিকাকে ঐশ্বরিক বিধান বলে ভাবার বিরুদ্ধে। [31]
ثم التمسك بقراءة سبعة من القرآن دون غيرهم ليس فيه أثر ولا سنة ، وإنما هو من جمع بعض المتأخرين لم يكن قرأ بأكثر من السبع فصنف كتابا وسماه السبع فانتشر ذلك في العامة وتوهموا أنه لا تجوز الزيادة على ما ذكر في ذلك الكتاب لاشتهار ذكر مصنفه ، وقد صنف غيره كتبا في القراءات وبعده وذكر لكل إمام من هؤلاء الأئمة روايات كثيرة وأنواعا من الاختلاف ، ولم يقل أحد إنه لا يجوز القراءة بتلك الروايات من أجل أنها غير مذكورة في كتاب ذلك المصنف ، ولو كانت القراءة محصورة بسبع روايات لسبعة من القراء لوجب أن لا يؤخذ عن كل واحد منهم إلا رواية ، وهذا لا قائل به ، وينبغي أن لا يتوهم متوهم في قوله – صلى الله عليه وسلم – : أنزل القرآن على سبعة أحرف ، أنه منصرف إلى قراءة سبعة من القراء الذين ولدوا بعد التابعين ; لأنه يؤدي أن يكون الخبر متعريا عن الفائدة إلى أن يولد هؤلاء الأئمة السبعة فيؤخذ عنهم القراءة ويؤدي أيضا إلى أنه لا يجوز لأحد من الصحابة أن يقرأ إلا بما يعلم أن هؤلاء السبعة من القراء إذا ولدوا وتعلموا اختاروا القراءة به ، وهذا تجاهل من قائله ، قال : وإنما ذكرت ذلك لأن قوما من العامة يقولونه جهلا ويتعلقون بالخبر ويتوهمون أن معنى السبعة الأحرف المذكورة في الخبر اتباع هؤلاء الأئمة السبعة وليس ذلك على ما توهموه ، بل طريق أخذ القراءة أن تؤخذ عن إمام ثقة لفظا عن لفظ إماما عن إمام إلى أن يتصل بالنبي – صلى الله عليه وسلم – والله أعلم بجميع ذلك .
বাংলা অনুবাদ: অন্যদের বাদ দিয়ে কোরআনের সাতজন পাঠকের পাঠেই সীমাবদ্ধ থাকার পক্ষে কোনো আসার বা সুন্নাহ নেই। এটি কিছু পরবর্তী ব্যক্তির সংকলনের ফল: তিনি সাতের বেশি পাঠ শেখেননি, তারপর একটি বই লিখে তার নাম দিয়েছেন “সাত”। সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সংকলকের প্রসিদ্ধির কারণে তারা ধারণা করে, ঐ গ্রন্থে উল্লেখিত পাঠের বাইরে বাড়তি কিছু গ্রহণ করা বৈধ নয়। অন্যরা এবং তাঁর পরবর্তী লেখকেরাও কিরাআতের গ্রন্থ রচনা করেছেন; এই ইমামদের প্রত্যেকের বহু বর্ণনা ও নানা পাঠভেদ উল্লেখ করেছেন। ঐ সংকলকের বইয়ে নেই বলে এসব বর্ণনা অনুসারে পড়া নিষিদ্ধ—এ কথা কেউ বলেননি। পাঠ যদি সাত পাঠকের সাতটি বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ হতো, তাহলে প্রত্যেকের কাছ থেকে শুধু একটি বর্ণনা গ্রহণ করতে হতো। এমন কথা কেউ বলেন না। নবীর “কোরআন সাত আহরুফে অবতীর্ণ হয়েছে” বক্তব্যকে তাবেয়িদের পরে জন্মানো সাত পাঠকের পাঠ বোঝায় বলে ধারণা করা চলে না। তাহলে এই সাত ইমাম জন্ম নিয়ে তাঁদের কাছ থেকে পাঠ শেখার আগপর্যন্ত বক্তব্যটির কোনো কার্যকারিতা থাকত না। আরও দাঁড়াত, এই সাতজন জন্ম নিয়ে শিক্ষা লাভের পর কোন পাঠ বেছে নেবেন, তা না-জানা পর্যন্ত সাহাবিদের কেউ কোনো পাঠ পড়তে পারতেন না। এমন বক্তব্য অজ্ঞতার পরিচয়। আমি বিষয়টি উল্লেখ করেছি, কারণ কিছু সাধারণ লোক অজ্ঞতাবশত এমন বলে এবং হাদিসটিকে আঁকড়ে ধরে ভাবে, সেখানে উল্লিখিত সাত আহরুফের অর্থ এই সাত ইমামকে অনুসরণ করা। তাদের ধারণা সঠিক নয়। বরং পাঠ গ্রহণের উপায় হলো নির্ভরযোগ্য ইমামের কাছ থেকে শব্দে শব্দে শেখা, ইমামের কাছ থেকে ইমাম—এভাবে নবী পর্যন্ত সংযোগ পৌঁছানো। আল্লাহই সব ভালো জানেন।
পাঠের সীমানা নির্ধারণে প্রহার: ইবন শানাবুযের ঘটনা
স্বীকৃত পাঠের সীমানা শুধু বই লিখে ও বিতর্ক করে নির্ধারিত হয়নি; শারীরিক শাস্তিও ব্যবহৃত হয়েছে। ইবন আল-জাওযির আল-মুনতাযামএ ইবন শানাবুযের জীবনীতে ৩২৩ হিজরি বা ৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা আছে। ইবন মাসউদ, উবাই ও অন্যদের সূত্রে বর্ণিত বলে বিবেচিত, কিন্তু উসমানি মুশাফের বিরোধী কিছু পাঠ জনসমক্ষে পড়ানোর কারণে তাঁকে আটক করা হয়। উজির ইবন মুকলার সভায় বিচারক, ফকিহ ও পাঠবিশেষজ্ঞদের সামনে তিনি অবস্থান ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। এরপর পোশাক খুলে প্রহার করে তাঁকে ফিরে আসতে বাধ্য করা হয় এবং লিখিত তওবায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়। [32]
أخبرنا القزاز ، قال : أخبرنا الخطيب ، قال : أخبرني إبراهيم بن مخلد فيما أذن لي أن أرويه عنه ، قال : أخبرنا إسماعيل بن علي الخطبي ، قال : أشتهر ببغداد أمر رجل يعرف بابن شنبوذ يقرئ الناس ويقرأ في المحراب بحروف تخالف المصاحف مما يروى عن ابن مسعود وأبي وغيرهما مما كان يقرأ به قبل جمع المصحف الذي جمعه عثمان ، ويتبع الشواذ [فيقرأ بها ] ويجادل حتى عظم أمره وفحش ، وأنكره الناس فوجه السلطان فقبض عليه في يوم السبت [لست خلون ] من ربيع الآخر سنة ثلاث وعشرين وثلاثمائة ، وحمل إلى دار الوزير محمد بن علي ابن مقلة ، وأحضر القضاة والفقهاء والقراء ، وناظره – يعني الوزير – بحضرتهم ، فأقام على ما ذكر عنه ونصره ، واستنزله الوزير عن ذلك فأبى أن ينزل عنه أو يرجع عما يقرأ به من هذه الشواذ المنكرة التي تزيد على المصحف وتخالفه ، فأنكر ذلك جميع من حضر المجلس ، وأشاروا بعقوبته ومعاملته بما يضطره إلى الرجوع ، فأمر بتجريده وإقامته بين الهنبازين وضربه بالدرة على قفاه ، فضرب نحو العشر درر ضربا شديدا ، فلم يصبر واستغاث وأذعن بالرجوع والتوبة ، فخلي عنه وأعيدت عليه ثيابه واستتيب ، فكتب عليه كتاب بتوبته ، وأخذ عليه خطه بالتوبة .
বাংলা অনুবাদ: আল-কাযযায আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, আল-খতিব আমাদের জানিয়েছেন; তিনি বলেন, ইবরাহিম ইবন মাখলাদ আমাকে তাঁর অনুমতি দেওয়া বর্ণনায় জানিয়েছেন; তিনি বলেন, ইসমাইল ইবন আলী আল-খুতবি আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন: বাগদাদে ইবন শানাবুয নামে এক ব্যক্তির কথা প্রসিদ্ধ হয়। তিনি মানুষকে শেখাতেন এবং মিহরাবে এমন পাঠ পড়তেন, যা মুশাফগুলোর বিরোধী এবং ইবন মাসউদ, উবাই ও অন্যদের সূত্রে বর্ণিত—উসমান সংকলিত মুশাফ তৈরির আগে যে পাঠ পড়া হতো। তিনি শায পাঠ অনুসরণ করে পড়তেন এবং তার পক্ষে বিতর্ক করতেন। বিষয়টি বড় আকার নিলে মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করে। শাসক তাঁকে আটক করার নির্দেশ দেন। ৩২৩ হিজরির রবিউস সানি মাসের ছয় তারিখ, শনিবার তাঁকে আটক করে উজির মুহাম্মদ ইবন আলী ইবন মুকলার বাড়িতে আনা হয়। বিচারক, ফকিহ ও কোরআনের পাঠকদের উপস্থিত করা হয়। উজির তাঁদের সামনে তাঁর সঙ্গে বিতর্ক করেন। তিনি নিজের বক্তব্যে অটল থাকেন এবং তার সমর্থন করেন। উজির তাঁকে অবস্থান ত্যাগ করতে বলেন; তিনি নিজের পড়া সেই অস্বীকৃত শায পাঠ থেকে ফিরে আসতে অস্বীকার করেন, যা মুশাফের অতিরিক্ত ও তার বিরোধী ছিল। সভার সবাই তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং এমন শাস্তি ও আচরণের পরামর্শ দেন, যা তাঁকে ফিরে আসতে বাধ্য করবে। তখন তাঁর পোশাক খুলে হানবাযাইন নামের নির্যাতনযন্ত্রে দাঁড় করিয়ে ঘাড়ের পেছনে বেত্রাঘাতের নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁকে প্রায় দশ ঘা কঠোর বেত্রাঘাত করা হয়। তিনি সহ্য করতে না পেরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন এবং ফিরে আসা ও তওবায় সম্মত হন। এরপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাঁর পোশাক ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে তওবা করতে বলা হয়। তাঁর তওবার একটি দলিল লেখা হয় এবং সেই তওবায় তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
এই বিবরণে উপস্থিত পণ্ডিতেরা এমন শাস্তির পরামর্শ দিয়েছেন, যা তাঁকে মত ত্যাগ করতে বাধ্য করবে। বেত্রাঘাত সহ্য করতে না পেরে তাঁর সম্মতি এবং লিখিত স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রত্যাহারের প্রকৃতি স্পষ্ট: এটি শাস্তির মুখে বাধ্যতামূলক আনুগত্য। স্বাধীনভাবে দলিল বিচার করে মত পরিবর্তন এবং প্রহার থামাতে মত ছাড়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। এমন প্রত্যাহারকে স্বতঃস্ফূর্ত পাণ্ডিত্যিক ঐকমত্যের সাক্ষ্য বানানো প্রমাণের বিকৃতি।
ঘটনাটি আরও দেখায়, কোন পাঠ প্রকাশ্যে শেখানো যাবে, তা নির্ধারণে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞের কর্তৃত্ব একত্রে কাজ করেছে। অনুমোদিত সীমার বাইরে থাকা শিক্ষক আটক, প্রকাশ্য অপমান ও প্রহারের মুখে পড়েছেন। ফলে পরে অনুমোদিত পাঠের ব্যাপক প্রাধান্য ব্যাখ্যা করতে শিক্ষা ও বর্ণনার পাশাপাশি দমনের ইতিহাসও প্রাসঙ্গিক। যে ব্যবস্থায় ভিন্ন পাঠ শেখানো শাস্তিযোগ্য, সেখানে টিকে থাকা পাঠের প্রাধান্যকে কেবল অবাধ ও স্বাধীন সাক্ষীদের স্বতঃস্ফূর্ত মিল বলে প্রচার করা ইতিহাসকে বিকৃত করে।
উপসংহার: হাফসের দ্বৈত সত্তা
হাফসের জীবনীতে হাদিস বর্জনের কঠোর রায় এবং কিরাআতে দক্ষতার স্বীকৃতি পাশাপাশি আছে। কিছু সূত্রে সততার অভিযোগ, অন্য মূল্যায়নে সত্যবাদিতার স্বীকৃতিও আছে। এসব বিরোধ বিচার করার উপায় নির্দিষ্ট দলিল ও বর্ণনাপথ পরীক্ষা করা। ধর্মীয় মর্যাদা দিয়ে অভিযোগ মুছে ফেলা কিংবা দক্ষতার প্রশংসা দিয়ে প্রতিটি উচ্চারণের উৎস নিশ্চিত ঘোষণা করলে সেই পরীক্ষা হয় না। একই মানুষের ক্ষেত্রে এক শাস্ত্রে কঠোর সমালোচনা এবং অন্য ক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত নিশ্চয়তা দাবি করার দ্বৈত মানদণ্ড এখানেই ধরা পড়ে।
স্বীকৃত পাঠগুলোর মধ্যে বাস্তব শব্দভেদ আছে; হাফসের নিজের নির্বাচন শিক্ষকের পাঠ থেকে আলাদা হয়েছে; পরবর্তী পণ্ডিতেরা কোন রূপ গ্রহণ করবেন, তা বিচার করেছেন। প্রতি পাঠে তাওয়াতুরের শর্ত নিয়ে বিরোধ, সাতের তালিকার সীমা নিয়ে সমালোচনা এবং পাঠের সীমানা রক্ষায় প্রহারের ঘটনাও নথিবদ্ধ। এসবের ওপর “হরফে হরফে সর্বত্র একই” স্লোগান বসালে ইতিহাসের তথ্যই অস্বীকার করা হয়। বহুপাঠকে অনুমোদন করা আর বহুপাঠ নেই বলা একই অবস্থান নয়।
হাফসের পাঠের বর্তমান বিপুল প্রচলন তার সমস্ত পূর্বসূত্রের স্বাধীন প্রমাণ নয়। প্রাচীন লিখিত বর্ণকাঠামোর সাক্ষ্য আছে, কিন্তু সেই সাক্ষ্য প্রতিটি স্বরচিহ্নের ইতিহাস একা জানায় না। কায়রো ও মদিনার মুদ্রণ একটি পরিচিত রূপের বিস্তার ঘটিয়েছে; তা বহু শতাব্দী আগের প্রতিটি বর্ণনাকারীকে অভ্রান্ত করে দেয়নি। কোরআনের পাঠসংরক্ষণের নথিবদ্ধ ইতিহাসে মানুষ শিখিয়েছেন, লিখেছেন, তুলনা করেছেন, বেছে নিয়েছেন এবং ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। এই কাজগুলোকে অলৌকিক নিশ্চয়তার আড়ালে সরিয়ে দেওয়া ধর্মীয় প্রচার; প্রমাণের ভিত্তিতে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নয়।
তথ্যসূত্রঃ
- ইবন আল-জাযারি, আন-নাশর ফিল কিরাআতিল আশর, ২/৩৪৪–৩৪৫, সূরা রূম ↩︎
- আয-যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/২৫৬–২৬১, আসিমের জীবনী ↩︎
- ইসলামকিউএতে প্রকাশিত উত্তর ৩৪০৩৩৬, “ثانيا: الرد على اتهام الإمام حفص بالكذب في الرواية”: ইবন খিরাশের রায় প্রত্যাখ্যানের কারণ ↩︎
- ইসলামকিউএ ৩৪০৩৩৬-এ উদ্ধৃত ইবন হাজর, তাকরিবুত তাহযিব, জীবনী ১৪০৫ ↩︎
- সানাউল্লাহ নজির আহমদ, হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা পরিচিতি, সম্পাদনা: আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ; ইসলামহাউজ, পৃ. ৩২০–৩২১ ↩︎
- আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল ফী আসমাঈর রিজাল, খণ্ড ৭, পৃ. ১১–১৬, জীবনী ১৩৯০ ↩︎
- আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল, ৭/১৫: আবু হাতিমের মূল্যায়ন ↩︎
- মারাইন ভান পুটেন, “The Grace of God as evidence for a written Uthmanic archetype”, BSOAS ৮২(২), ২০১৯, পৃ. ২৭১–২৮৮; DOI: 10.1017/S0041977X19000338 ↩︎
- মাইকেল মার্ক্স, “The Quran—The First Arabic Book”, বিশেষত পৃ. ২০২–২০৩: কায়রো মুশাফ ও আধুনিক মুদ্রণ ↩︎
- ইবন আল-জাযারি, আন-নাশর ফিল কিরাআতিল আশর, ১/১৩: প্রতি পাঠে তাওয়াতুরের শর্ত নিয়ে আলোচনা ↩︎
- শাদি হেকমত নাসের, The Transmission of the Variant Readings of the Qurʾān: The Problem of Tawātur and the Emergence of Shawādhdh, ২০১১, অভিসন্দর্ভের সারসংক্ষেপ, পৃ. iii–iv ↩︎
- মারাইন ভান পুটেন, “Finding Dūrī: Communal Transmission of Abū ʿAmr among the People of ʿIrāq”, Al-Qanṭara ৪৬(২), ২০২৫, প্রবন্ধ ৮৮৭; অনলাইনে প্রকাশ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; DOI: 10.3989/alqantara.2025.887 ↩︎
- আবু আমর আদ-দানি, আত-তাইসির ফিল কিরাআতিস সাবআ, সূরা যুমার ৩৯:৭; প্রচলিত সংস্করণে পৃ. ১৮৯ ↩︎
- ইবন আল-জাযারি, আন-নাশর, ১/৪৫–৪৬-এ সংরক্ষিত আবদুল ওয়াহহাব আস-সুবকির লিখিত উত্তর ↩︎
- আত-তাবারি, জামিউল বায়ান, সূরা ফাতিহা ১:৪: দুই পাঠের মধ্যে অগ্রাধিকার ↩︎
- ইবন মাজাহ, সুনান, হাদিস ২২৪; দারুসসালাম মূল্যায়ন ও সম্পাদনাগত টীকা ↩︎
- আত-তিরমিযি, আল-জামি, ২৯০৫: সংকলকের মন্তব্য ↩︎
- ইবন মাজাহ, সুনান, হাদিস ২১৬: আবু উমরের সূত্রে একই সুপারিশের বর্ণনা ↩︎
- আল-মিযযি, তাহযীবুল কামাল, ৭/১১–১২: হাফসের কুনিয়া ও ছাত্রদের তালিকা ↩︎
- আয-যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/২৫৬–২৬১: আসিম ইবন আবি আন-নাজুদ ↩︎
- ইসলামওয়েবে প্রকাশিত ফতোয়া ১০০৮১২-এ উদ্ধৃত আয-যাহাবি, মিযানুল ইতিদাল: হাফসের মূল্যায়ন ↩︎
- আয-যাহাবি, মিযানুল ইতিদাল, ১/৫৫৮, জীবনী ২১২১: মূল জীবনী ↩︎
- ইসলামকিউএ ৩৪০৩৩৬-এ উদ্ধৃত তাকিউদ্দিন আস-সুবকি, শিফাউস সিকাম, পৃ. ২৫ ↩︎
- ইবন আল-জাযারি, আন-নাশর ফিল কিরাআতিল আশর, ২/৩৪৫–৩৪৬: সূরা রূম ৩০:৫৪ ↩︎
- আবু দাউদ, সুনান, হাদিস ৩৯৭৮; আলবানির মূল্যায়ন: হাসান ↩︎
- ইউসুফ আল-কারাদাবি, “في قراءات القرآن الكريم”: আতিয়্যার সূত্রের মূল্যায়ন এবং দুই পাঠের নিশ্চয়তার দাবি ↩︎
- মুহাম্মদ আত-তাহির ইবন আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানওয়ির, সূরা রূম ৩০:৫৪ ↩︎
- মাইকেল মার্ক্স, “The Quran—The First Arabic Book”, পৃ. ২০২–২০৩: কায়রো ও মদিনার সংস্করণের বানান ও বিরামচিহ্ন ↩︎
- মুহাম্মদ ইবন সালিহ আল-উসাইমিন, মুখতাসার আত-তাহরির, পাঠ ৬৪: সাত কিরাআতের তাওয়াতুর ↩︎
- ইবন আল-জাযারি, আন-নাশর, প্রথম খণ্ড: গ্রহণযোগ্য পাঠের শর্ত ↩︎
- ইবন আল-জাযারি, আন-নাশর, ১/৪৬–৪৭-এ উদ্ধৃত ইসমাইল আল-কাররাব, আল-শাফি ↩︎
- ইবন আল-জাওযি, আল-মুনতাযাম, খণ্ড ১৩, পৃ. ৩৯২–৩৯৩, ৩২৮ হিজরিতে মৃতদের মধ্যে ইবন শানাবুযের জীবনী; বর্ণিত ঘটনা ৩২৩ হিজরির ↩︎

