সারসংক্ষেপ
কোরআনের সূরা নিসায় (১১ ও ১২ নং আয়াতে) উত্তরাধিকারীদের জন্য যে নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ (যেমন: ১/২, ২/৩, ১/৮) নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, একাধিক বাস্তব ক্ষেত্রে সেগুলোর যোগফল মূল সম্পত্তির (১ বা ১০০%) চেয়ে বেশি হয়ে যায়। গাণিতিকভাবে ১-এর অধিক সম্পত্তি বণ্টন করা অসম্ভব। এই গাণিতিক ত্রুটি নিরসনে পরবর্তীতে খলিফা উমর ‘আউল’ (Awl) পদ্ধতি চালু করেন, যার মাধ্যমে ওয়ারিশদের কোরআন-নির্ধারিত অংশ থেকে আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেওয়া হয়। ইসলামি উসুলুল ফিকহের একটি মূলনীতি হলো— “লা ইজতিহাদা ফি মাওরিদিন নস” (لا اجتهاد في مورد النص)। অর্থাৎ, কোনো নসের উৎস ও তার নির্দিষ্ট অর্থ উভয়ই অকাট্য হলে ইজতিহাদ, ইজমা বা কিয়াসের নামে সেই নির্ধারিত বিধান বদলানো যায় না। উত্তরাধিকারের ঘোষিত ভগ্নাংশ ও আউলের পরের বাস্তব প্রাপ্যের ব্যবধান এই নীতির সঙ্গেই সংঘাতের প্রশ্ন তোলে।
যেহেতু কোরআনে ওয়ারিশদের অংশ একেবারেই সুনির্দিষ্ট ‘নস’, তাই উমর বা কোনো মানুষের পক্ষে ইজতিহাদ করে সেই সংখ্যা পরিবর্তন করার এখতিয়ার নেই। সুতরাং, ‘আউল’ পদ্ধতি প্রয়োগ করা স্পষ্টতই কোরআনের লঙ্ঘন। এই পরিস্থিতি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে- হয় কোরআনের গাণিতিক হিসাবে মৌলিক ভুল আছে যা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধানযোগ্য নয়, অথবা বর্তমানে প্রচলিত ‘আউল’ ভিত্তিক উত্তরাধিকার আইন ইসলামি শরিয়তের নিজস্ব নীতির মানদণ্ডেই কোরআনের নির্দিষ্ট নসকে কার্যত সংশোধন করে। অর্থাৎ, হয় কোরআনের হিসাব মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কার্যকর নয়, নয়তো আউল পদ্ধতি কোরআনের ঘোষিত অংশকে বাস্তবে পরিবর্তন করে—দুই অবস্থাতেই “নিখুঁত ঐশী উত্তরাধিকার আইন” দাবিটি টেকে না। আসুন এই ডায়াগ্রামটি শুরুতে দেখে নেয়া যাক,
- কোনো নসের উৎস ও নির্দিষ্ট অর্থ উভয়ই অকাট্য হলে ইজতিহাদ, ইজমা বা কিয়াস দিয়ে সেই নির্ধারিত বিধান বদলানো যায় না।
- আরেকটি ইসলামিক বিধান হচ্ছে, সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে কোনো মানুষের বিধান নয়, কোরআনের বিধান অনুসরণ করতে হবে।
- সূরা নিসা-তে সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন হবে তা স্পষ্ট বলা আছে। [1]
- কোরআনের আয়াত অনুসরণ করলে, কিছু গাণিতিক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অংশগুলোর যোগফল সম্পূর্ণ সম্পত্তির (১ অংশ) চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে নির্দিষ্ট নিয়মটি কার্যকর করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
- এই অসামঞ্জস্যতা দূর করতে দ্বিতীয় খলিফা উমর ‘আউল’ (Awl) পদ্ধতির প্রবর্তন করেন, যা কোরআনের কোনো আয়াত বা সরাসরি নসে পাওয়া যায় না। [2]
- যেহেতু নসের ওপর মানুষের যুক্তি বা ইজতিহাদ প্রাধান্য পাওয়ার সুযোগ নেই, তাই আউল পদ্ধতির প্রয়োগ ইসলামের মৌলিক বিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ আউল পদ্ধতি অবলম্বন করলে কোরআনের বিধান অনুসারে ভাগ হচ্ছে না।
ভূমিকা: নির্দিষ্ট ভাগ ও অসম্ভব মোট দাবি
কোরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকার আইন মূলত সম্পত্তি ভাগ করার একটি ত্রুটিপূর্ণ এবং ভুল পদ্ধতি। উত্তরাধিকার আইনের মত আইন প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে যেই অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, এই আইনটি পড়লেই বোঝা যায়, যিনি এই আইনটি করেছেন তার এই সম্পর্কে বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান নেই। কারণ এই ধরনের আইন প্রণয়নের পূর্বে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা এবং বিভিন্ন সংখ্যক পারিবারিক সদস্যের ক্ষেত্রে আইনটি কীভাবে প্রয়োগ হবে, তার বিবেচনা থাকা জরুরি। কারণ এক একটি পরিবারে এক এক রকম সদস্য থাকে, কোনো পরিবারে দুই ছেলে, কোনো পরিবারে তিন মেয়ে, কোনো পরিবারে এক ছেলে তিন মেয়ে, কোনো পরিবারে তিন ছেলে এক মেয়ে, সাথে বাবা মা ইত্যাদি। উত্তরাধিকার আইন করলে প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই আইনটি কাজ করবে কিনা, সেটি জেনেবুঝে আইনটি করার দরকার হয়। কিন্তু কোরআনের এই নিয়মের মধ্যে এমন গাণিতিক ত্রুটি রয়েছে যা স্পষ্টভাবে আল্লাহ ও নবীর গণিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। গাণিতিক এই ভুল শুধুমাত্র একটি সাধারণ হিসাবের ভুল নয়, বরং এটি এক গভীর অসঙ্গতি, যা কোনো সর্বজ্ঞানী সত্তার পক্ষ থেকে আসা হতে পারে না। সপ্তম শতকের আরব সমাজের সীমিত আইনগত অভিজ্ঞতা, সীমিত গাণিতিক কাঠামো এবং অপরিণত বিধান-প্রণয়ন পদ্ধতির ছাপ এই উত্তরাধিকার আইনে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যেহেতু এরকম ভুল কোনো সর্বশক্তিমান সত্তার কাছ থেকে আসা হতে পারে না, তাই এই ভুলটি স্পষ্টভাবেই ইসলামের সত্যতা নিয়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কোরআনের উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, যখন সম্পত্তি ভাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ বর্ণিত হয়। কিন্তু কিছু বাস্তব ক্ষেত্রে, এসব ভগ্নাংশ যখন যোগ করা হয়, সেটি মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, একজন মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতা, স্ত্রী এবং সন্তানদের মধ্যে ভাগ করলে দেখা যায়, নির্ধারিত অংশগুলো যোগ করলে ১০০% এর বেশি হয়। এই ধরনের ত্রুটি কোনো নিখুঁত সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনায় থাকার কথা নয়। গণিত সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান থাকা একজন ব্যক্তির পক্ষেও, সম্পত্তি ভাগের এরকম বিধান দেওয়া অসম্ভব। এ থেকে বোঝা যায়, এই নির্দেশনার পেছনে সর্বজ্ঞ, সর্বকালদর্শী আইনপ্রণেতার নিখুঁত গাণিতিক পরিকল্পনার বদলে সপ্তম শতকের আরব সমাজের সীমিত আইনগত ও গাণিতিক ধারণার ছাপই বেশি স্পষ্ট।
গাণিতিক নিয়ম খুবই স্পষ্ট। কোনো সম্পত্তির ওপর নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ আরোপ করলে সেই নির্দিষ্ট অংশগুলোর যোগফল ১ অতিক্রম করতে পারে না। যোগফল ১-এর বেশি হলে বাস্তব সম্পত্তির চেয়ে বেশি সম্পত্তি বণ্টনের দাবি তৈরি হয়, যা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। কোরআনে বর্ণিত নিয়মগুলোতে এই সরল নিয়মটি মানা হয়নি, যা স্পষ্ট করে দেয় যে এই আইন কোনো অলৌকিক জ্ঞান থেকে আসেনি। বরং এটি সেই সময়ের মানুষের অপরিপক্ব জ্ঞানের প্রতিফলন।
এই বিষয়ে আমাদের যে বিষয়টি জানা থাকা জরুরি তা হচ্ছে, কোনো কিছু ভাগ করার সময় নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ দিয়ে সম্পূর্ণ সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে যোগফল ১ অতিক্রম করলে তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব হয়ে যায়। যোগফল ১-এর কম হলে অবশিষ্ট অংশ বণ্টনের জন্য আলাদা নিয়ম থাকতে পারে; কিন্তু যোগফল ১-এর বেশি হলে মৃত ব্যক্তি যত সম্পত্তি রেখে গেছে, তার চেয়েও বেশি সম্পত্তি বণ্টনের দাবি তৈরি হয়। কারণ সম্পূর্ণ সম্পত্তিকেই এক হিসেবে ধরে ভাগ করা হয়।
বাস্তবতা: অনেক ক্ষেত্রে যোগফল ১-এর বেশি হয়। যেমন: স্বামী (১/২) + ২ বোন (২/৩) = ৭/৬।
কোরআনে এই ৭/৬ বা প্রায় ১.১৬৬৭ অংশের কোনো সমাধান বা গাণিতিক দিকনির্দেশনা দেওয়া নেই। [3]
প্রভাব: ওয়ারিশদের প্রত্যেকের নির্ধারিত অংশ কোরআনের ভগ্নাংশ থেকে কমিয়ে দেওয়া হয় যাতে যোগফল ১ হয়। এতে কোরআনের ‘নস’ বা নির্ধারিত সংখ্যাটি পরিবর্তিত হয়ে যায়। [2]
যুক্তি: নির্দিষ্ট কিছু ওয়ারিশের অংশ কোনোভাবেই কমানো যাবে না। বরং যাদের অংশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীল, কেবল তাদের অংশ থেকেই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। তিনি উমরের দেওয়া “সবার অংশ কমানো” নীতিকে অস্বীকার করেন।
পার্থক্য: তারা মা-বাবা এবং স্বামী/স্ত্রীর অংশকে ‘স্থির’ রাখে। বণ্টনে ঘাটতি দেখা দিলে তারা কেবল সন্তানদের (বিশেষ করে কন্যাদের) অংশ থেকে তা কেটে সমন্বয় করে।
উপসংহার: আলোচিত ক্ষেত্রে সুন্নি ও ইমামি বণ্টনে ঘোষিত ভগ্নাংশগুলোর কোনো না কোনোটি কমানো হয়; কার অংশ কাটা হবে, তা নিয়ে দুই পদ্ধতির মধ্যে মৌলিক সংঘাত বিদ্যমান।
আউল ও রদ্দ: ঘোষিত অংশের পরবর্তী সমন্বয়
‘আউল’ মানে ‘বৃদ্ধি’। যখন অংশগুলোর যোগফল একটি ভগ্নাংশ হয় যার লব বড়, হর ছোট, তখন হরকে লবের সমান করে নিতে হয় তথা হরের মধ্যে বৃদ্ধি করতে হয় এটাকে ‘আউল’ বলে। যেমন, মৃত ব্যক্তি রেখে গেছেন স্বামী ও তিন সহোদর বোন। তাহলে স্বামীর অংশ + তিন সহোদর বোনের অংশ = ১/২ + ২/৩ = ৭/৬ । এ অবস্থায় স্বামীকে দিতে হবে ৩/৭ এবং তিন সহোদর বোনকে দিতে হবে ৪/৭ । ‘রদ্দ’ অর্থ ‘ফেরত দেওয়া বা ফিরিয়ে দেওয়া’। ‘রদ্দ’ হলো আউলের বিপরীত। যখন অংশগুলোর যোগফল একটি ভগ্নাংশ হয় যার লব ছোট, হর বড়, তখন হরকে হ্রাস করে লবের সমান করতে হয়। এটাকে ‘রদ্দ’ বলে।
ইবনে কুদামা আউলের সংজ্ঞাতেই উত্তরাধিকারীদের অংশ কমার কথা বলেছেন। অংশসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাপ্য হ্রাস একই হিসাবের দুটি দিক। ছয়কে সাত করা সম্পত্তি বাড়ায় না; একই সম্পত্তিকে নতুন সাত ভাগে ভাগ করে প্রত্যেকের আগের দাবিকে ছোট অংশে রূপান্তর করে। ফলে “আউল মানে বৃদ্ধি” বলার সঙ্গে কী বাড়ছে এবং কার প্রাপ্য কমছে—সেই ব্যাখ্যাও প্রয়োজন। [4]
ويدخل العول هذا الأصل، لازدحام الفروض فيه، وهو أكثرها عولا. والعول زيادة في السهام، ونقصان في أنصباء الورثة.
বাংলা অনুবাদ: নির্ধারিত অংশগুলোর সংঘর্ষের কারণে এই মূল হিসাবে আউল ঘটে এবং এই হিসাবেই সবচেয়ে বেশি আউল হয়। আউল হলো অংশসংখ্যার বৃদ্ধি এবং উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অংশের হ্রাস।
রদ্দের ক্ষেত্রেও অবশিষ্ট বণ্টনের জন্য যোগ্য উত্তরাধিকারী কারা, তা আগে নির্ধারিত হয়। সব উত্তরাধিকারীকে সব মাযহাবে একইভাবে রদ্দ দেওয়া হয় না; স্বামী–স্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি নিয়েও মতপার্থক্য আছে। তাই হর কমানোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনাটি রদ্দের সাধারণ গাণিতিক দিক বোঝায়; কোন ওয়ারিশ বাস্তবে অতিরিক্ত অংশ পাবেন, সেই প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধানও কার্যকর হয়। [5]
قال رحمه الله ( وما فرض يرد على ذوي الفروض بقدر فروضهم إلا على الزوجين ) أي يرد ما فضل من فرض ذوي الفروض إذا لم يكن في الورثة عصبة فلو كان فيهم فالفاضل بعد الفروض للعصبة إلا على الزوجين فإنه لا يرد عليهما وهو قول عامة الصحابة رضي الله عنهم وبه أخذ أصحابنا ، وقال زيد بن ثابت رضي الله عنه : الفاضل لبيت المال وبه أخذ مالك والشافعي رحمهما الله وقال عثمان بن عفان : يرد على الزوجين أيضا
বাংলা অনুবাদ: তিনি রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “নির্ধারিত অংশীদারদের কাছে তাদের অংশের অনুপাতে অবশিষ্ট ফেরত দেওয়া হবে, স্বামী–স্ত্রী ছাড়া।” অর্থাৎ নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পরে যা অবশিষ্ট থাকে তা ফেরত দেওয়া হবে, যদি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কোনো আসাবা না থাকে। আসাবা থাকলে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পরে অবশিষ্ট তাদের প্রাপ্য। স্বামী–স্ত্রীকে ফেরত দেওয়া হয় না; এটি সাধারণ সাহাবিদের মত এবং আমাদের ফকিহরা তা গ্রহণ করেছেন। যায়দ ইবনে সাবিত বলেছেন, অবশিষ্ট বায়তুল মালের প্রাপ্য; মালিক ও শাফেয়ি সেই মত গ্রহণ করেছেন। উসমান ইবনে আফফান বলেছেন, স্বামী–স্ত্রীকেও অবশিষ্ট ফেরত দেওয়া হবে।
খলিফা উমরের আমলে যখন এই গাণিতিক সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে, তখন তিনি “আউল নীতি” প্রবর্তন করেন, যা কোরআনের ভগ্নাংশের ভুলগুলোকে সংশোধন করার একটি মানবিক প্রচেষ্টা মাত্র। কোনো সীমিত জ্ঞানের অধিকারী মরণশীল মানুষ যখন আল্লাহর বিধানকে যথাযথভাবে অনুসরণ না করে, উল্টো ঠিক করার চেষ্টা করে, সংশোধিত কোনো নতুন আইন প্রবর্তন করে, যা কোরআনের আইনকে বদলে দেয় বা পরিমার্জনা করে ফেলে, তখনই সেখানে আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের কাছে পরাজিত হয়ে যায়। আল্লাহর সংজ্ঞা অনুসারে, আল্লাহ যেহেতু সর্বজ্ঞানী, তাই তার দেওয়া উত্তরাধিকার আইন সমস্ত ক্ষেত্রেই সঠিক হওয়ার কথা। কিন্তু সেই আইনের যেকোনো প্রকার সংশোধনী আনাই, মূলত ইসলামের মৌলিক দাবিকেও ভুল প্রমাণ করে ফেলে। আউল নীতি অনুসারে, প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য অংশকে সামঞ্জস্য করে মূল সম্পত্তির মধ্যে ভাগ করা হয়। এটি কোরআনের আয়াতের ওপর একটি পরিবর্তনশীল নীতি, যা মূল আয়াতের ভুলকে ঢাকার চেষ্টা করে। এই ধরনের পরিবর্তন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কোরআন নিখুঁত কোনো দলিল নয় এবং এর মধ্যে গাণিতিক ভুল রয়েছে।
উত্তরাধিকারের মূল বিধান: সূরা নিসার আয়াত
উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশগুলোর মূল বিধান সূরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে রয়েছে। কন্যা, পিতা-মাতা ও দাম্পত্য উত্তরাধিকারীর ভাগ কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা আয়াতগুলোর ভাষাতেই স্পষ্ট। [6]
আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেনঃ একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু`এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের সন্তান থাকে। যদি সন্তান না থাকে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয়, তবে মাতা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ ওছিয়্যতের পর, যা করে মরেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ। (কুরআন-৪:১১)
স্বামী–স্ত্রী এবং কালালাহ অবস্থায় মাতৃসূত্রের ভাই-বোনদের অংশ পরবর্তী আয়াতে নির্ধারিত হয়েছে। [7]
আর, তোমাদের হবে অর্ধেক সম্পত্তি, যা ছেড়ে যায় তোমাদের স্ত্রীরা যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের হবে এক-চতুর্থাংশ ঐ সম্পত্তির, যা তারা ছেড়ে যায়; ওছিয়্যতের পর, যা তারা করে এবং ঋণ পরিশোধের পর। স্ত্রীদের জন্যে এক-চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, যা তোমরা ছেড়ে যাও ওছিয়্যতের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর। যদি কোনো পুরুষ বা নারীর উত্তরাধিকার কালালাহ অবস্থায় বণ্টিত হয় এবং তার এক ভাই বা এক বোন থাকে, তবে তাদের প্রত্যেকে ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে। আর যদি ততোধিক থাকে, তবে তারা এক তৃতীয়াংশ অংশীদার হবে ওছিয়্যতের পর, যা করা হয় অথবা ঋণের পর এমতাবস্থায় যে, অপরের ক্ষতি না করে। এ বিধান আল্লাহর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
(কুরআন-৪:১২)
এই আয়াতে স্বামী বা স্ত্রী না থাকাকে কালালাহর শর্ত বলা হয়নি। স্বামী–স্ত্রীর উপস্থিতি এবং বংশগত উত্তরাধিকারীর অনুপস্থিতি পৃথক বিষয়। ৪:১২-এর ভাই-বোনের বিধান ও ৪:১৭৬-এর ভাই-বোনের বিধানও এক শ্রেণির উত্তরাধিকারীর জন্য নয়; ফিকহি বণ্টনে প্রথমটি মাতৃসূত্রের ভাই-বোন এবং দ্বিতীয়টি সহোদর বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পিতৃসূত্রের ভাই-বোনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিচের হিসাবগুলোতে এই পার্থক্য অনুসরণ করা হয়েছে। [8]
কন্যাদের নির্দিষ্ট ভাগ ও অবশিষ্টাংশ: হাদিসের বণ্টন
উত্তরাধিকার বণ্টনে “নির্ধারিত অংশ” এবং “অবশিষ্ট অংশ” দুটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। কাউকে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ দেওয়ার নির্দেশ এবং অন্যদের দেওয়ার পরে যা থাকে তা দেওয়ার নির্দেশের ফল এক নয়। প্রথম ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তিকে ভিত্তি ধরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারিত হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অন্য উত্তরাধিকারীদের উপস্থিতি ও তাদের অংশের ওপর প্রাপ্য পরিমাণ নির্ভর করে। কন্যাদের নির্ধারিত অংশকে অবশিষ্টাংশে পরিণত করলে এই দুই ব্যবস্থার পার্থক্য মুছে দেওয়া হয়। অথচ হাদিসের বণ্টনসংক্রান্ত বর্ণনাতেই নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ এবং অবশিষ্টাংশের জন্য আলাদা ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।
সাদের দুই কন্যা: দুই-তৃতীয়াংশ কন্যাদের, অবশিষ্ট চাচার
জাবির ইবনে আবদুল্লাহর বর্ণনায় সাদ ইবনুর রাবির স্ত্রী তার দুই কন্যার উত্তরাধিকার নিয়ে মুহাম্মদের কাছে অভিযোগ করেন। কন্যাদের চাচা সম্পত্তি নিয়ে নিয়েছিলেন। বর্ণনা অনুযায়ী, মুহাম্মদ পরে সেই চাচাকে দুই কন্যার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ, তাদের মায়ের জন্য এক-অষ্টমাংশ এবং অবশিষ্ট নিজের জন্য রাখার নির্দেশ দেন। এখানে কন্যাদের প্রাপ্য এবং চাচার প্রাপ্য পৃথক ভাষায় নির্ধারিত: কন্যাদের জন্য নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ, চাচার জন্য অবশিষ্ট। [9]
حَدَّثَنَا عَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ، قال حَدَّثَنِي زَكَرِيَّاءُ بْنُ عَدِيٍّ، أَخْبَرَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَقِيلٍ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ جَاءَتِ امْرَأَةُ سَعْدِ بْنِ الرَّبِيعِ بِابْنَتَيْهَا مِنْ سَعْدٍ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَاتَانِ ابْنَتَا سَعْدِ بْنِ الرَّبِيعِ قُتِلَ أَبُوهُمَا مَعَكَ يَوْمَ أُحُدٍ شَهِيدًا وَإِنَّ عَمَّهُمَا أَخَذَ مَالَهُمَا فَلَمْ يَدَعْ لَهُمَا مَالاً وَلاَ تُنْكَحَانِ إِلاَّ وَلَهُمَا مَالٌ. قَالَ «يَقْضِي اللَّهُ فِي ذَلِكَ». فَنَزَلَتْ آيَةُ الْمِيرَاثِ فَبَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى عَمِّهِمَا فَقَالَ «أَعْطِ ابْنَتَىْ سَعْدٍ الثُّلُثَيْنِ وَأَعْطِ أُمَّهُمَا الثُّمُنَ وَمَا بَقِيَ فَهُوَ لَكَ». قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ حَدِيثِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَقِيلٍ وَقَدْ رَوَاهُ شَرِيكٌ أَيْضًا عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَقِيلٍ.
বাংলা অনুবাদ: আবদ ইবনে হুমাইদ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, জাকারিয়্যা ইবনে আদি আমাকে বর্ণনা করেছেন। উবাইদুল্লাহ ইবনে আমর আমাদের জানিয়েছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আকিলের সূত্রে, তিনি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন। জাবির বলেন, সাদ ইবনুর রাবির স্ত্রী সাদের ঔরসজাত তার দুই কন্যাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, এই দুজন সাদ ইবনুর রাবির কন্যা। তাদের পিতা উহুদের দিনে আপনার সঙ্গে থাকা অবস্থায় শহীদ হয়েছেন। তাদের চাচা তাদের সম্পত্তি নিয়ে নিয়েছেন, তাদের জন্য কোনো সম্পত্তি রাখেননি। সম্পত্তি না থাকলে তাদের বিয়েও হবে না।” তিনি বললেন, “আল্লাহ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।” এরপর উত্তরাধিকারের আয়াত নাজিল হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চাচার কাছে লোক পাঠিয়ে বললেন, “সাদের দুই কন্যাকে দুই-তৃতীয়াংশ দাও, তাদের মাকে এক-অষ্টমাংশ দাও; আর যা অবশিষ্ট থাকবে তা তোমার।” আবু ঈসা বলেন, এটি হাসান সহিহ হাদিস। আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আকিলের বর্ণনা ছাড়া আমরা এটি জানি না। শারিকও আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আকিলের সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন।
এই বণ্টনে কন্যাদের দুই-তৃতীয়াংশ এবং তাদের মায়ের এক-অষ্টমাংশ যোগ করলে হয় ১৯/২৪। অবশিষ্ট থাকে ৫/২৪, যা চাচার প্রাপ্য। সম্পত্তি ২৪০ টাকা হলে দুই কন্যা পাবে ১৬০ টাকা, তাদের মা পাবে ৩০ টাকা এবং চাচা পাবে ৫০ টাকা। এখানে “অবশিষ্ট” কথাটির নির্দিষ্ট গাণিতিক কাজ আছে। সেটি প্রথমে ঘোষিত দুই-তৃতীয়াংশের অর্থ বদলায় না; নির্ধারিত অংশগুলো দেওয়ার পরে পড়ে থাকা সম্পত্তির প্রাপক শনাক্ত করে।
| উত্তরাধিকারী | বর্ণনায় নির্ধারিত প্রাপ্য | ২৪০ টাকা হলে | প্রাপ্যের ধরন |
|---|---|---|---|
| সাদের দুই কন্যা | ২/৩ = ১৬/২৪ | ১৬০ টাকা | নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ |
| সাদের স্ত্রী, অর্থাৎ কন্যাদের মা | ১/৮ = ৩/২৪ | ৩০ টাকা | নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ |
| কন্যাদের চাচা | অবশিষ্ট ৫/২৪ | ৫০ টাকা | নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট |
| মোট | ২৪/২৪ | ২৪০ টাকা | সম্পূর্ণ সম্পত্তি |
সব সন্তানকে অবশিষ্টভোগী বানালে বণ্টনই বদলে যায়
“আগে অন্যদের দাও, তারপর সন্তানদের অবশিষ্ট দাও”—এটিকে সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম বানালে সাদের দুই কন্যার এই বণ্টনও অক্ষত থাকে না। তাদের মাকে ১/৮ দেওয়ার পরে অবশিষ্ট থাকে ৭/৮। সেই অবশিষ্ট পুরোটা দুই কন্যাকে দিলে তারা পাবে ৭/৮, অথচ বর্ণনায় তাদের জন্য দেওয়া হয়েছে ২/৩। আবার অবশিষ্টের দুই-তৃতীয়াংশ দিলে পাওয়া যাবে ৭/১২, যা মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশের চেয়ে কম। অর্থাৎ “মোট সম্পত্তির অংশ”, “অবশিষ্ট সম্পত্তির অংশ” এবং “সম্পূর্ণ অবশিষ্ট”—এই তিনটির ফল আলাদা। সুবিধামতো একটিকে অন্যটির জায়গায় বসালে মূল নির্দেশের অর্থই পরিবর্তিত হয়।
এই পার্থক্য আউলের বিতর্কে মৌলিক। কন্যাদের নির্ধারিত অংশের সঙ্গে স্বামী বা স্ত্রী ও পিতা-মাতার নির্ধারিত অংশ একত্র হলে যোগফল বেশি হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে। তখন কন্যাদের হঠাৎ সাধারণ অবশিষ্টভোগী ঘোষণা করলে তাদের নির্ধারিত ভগ্নাংশ আর কার্যকর থাকে না। কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সন্তান অবশিষ্ট পায়—সেই বিধান দিয়ে সব পরিস্থিতিতে কন্যাদের ঘোষিত অংশকে অবশিষ্টে নামিয়ে আনা যায় না। কোন উত্তরাধিকারী নির্দিষ্ট অংশ পাবে এবং কোন উত্তরাধিকারী অবশিষ্ট পাবে, সেই শ্রেণিবিন্যাসই বদলে দেওয়া হচ্ছে।
ফলে বণ্টনের সমস্যা সম্পর্কে “সন্তানদের শেষে দিলেই তো হিসাব মিলে যায়” বলা অত্যন্ত অসম্পূর্ণ উত্তর। হিসাব মেলাতে কোন অধিকার পরিবর্তিত হলো, সেটিই আসল প্রশ্ন। একটি সম্পত্তির অবশিষ্ট অন্য কাউকে দিয়ে দিলে যোগফল অবশ্যই সম্পত্তির মধ্যে রাখা যায়। কিন্তু সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে পূর্বঘোষিত দুই-তৃতীয়াংশ, অর্ধেক বা এক-ষষ্ঠাংশ সত্যিই দেওয়া হলো কি না, তা আলাদাভাবে হিসাব করতে হয়। ভগ্নাংশের নির্দেশ বাদ দিয়ে যোগফল মেলানো সহজ; কঠিন হলো সেই ভগ্নাংশগুলো অক্ষত রেখে একই সঙ্গে বণ্টন সম্পন্ন করা।
পিটজার উদাহরণ: ভাগ কমালেই ঘোষিত অংশ বদলায়
একটি পিটজা ভাগ করার সময় যদি ১/৮ করে ভাগ করা হয়, তবে মোট ৮টি টুকরো হবে। যদি ১/৮ করে ভাগ করার পরে দেখা যায়, নবম বা দশম মানুষ এসে যুক্ত হয়, তাহলে শেষে যুক্ত হওয়া ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা আর কোনো পিটজার অংশ পাবেন না। কারণ ১/৮ করে টুকরো করা পিটজাকে ৮ জনার বেশি মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যাবে না। ৯ জনার মধ্যেও এটি ভাগ করা সম্ভব, কিন্তু তখন পিটজাটি পুনরায় ভাগ করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে প্রতিটি ভাগ ১/৯ করে হবে, এবং প্রত্যেককে ঐ ১/৯ করে দিতে হবে। ৯টি ১/৯ অংশ যোগ করলে যেন ১ হয়। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে মোট যোগফল ১ হতে হবে। সেই সময়ে মোট টুকরোগুলোর ভগ্নাংশের যোগফল যদি ১ এর বেশি হয়ে যায়, তাহলে ১ এর বেশি হয়ে যাওয়া অংশটুকু আর কাউকে দেওয়া যাবে না। এগুলো স্কুলজীবনেই মানুষ পাটিগণিত করলে শিখে যায়। আসুন ৮ জনার মধ্যে ভাগ করে দিলে যোগফল কেমন হবে দেখে নিই,
বা
এবার ধরুন, ৯ জন ব্যক্তির মধ্যে সেই একই পিটজা, যেটি ১/৮ অংশে ভাগ করা হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে ভাগ করার চেষ্টা করা হল। যেহেতু পিটজা ৮টি টুকরো আছে, ৯ জনের মধ্যে সমানভাবে পিটজা ভাগ করা সম্ভব হবে না। শেষ ব্যক্তি পিটজা থেকে বঞ্চিত হবে। অথবা অন্য সকলের অংশ কমিয়ে দিয়ে সেই অংশটি তাকে দিতে হবে। কিন্তু অন্যদের অংশ কমিয়ে দিলে, তাদের অংশ আর ১/৮ থাকবে না। তাদের অংশ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এই বিষয়টি গাণিতিকভাবে একটি সাধারণ ধারণা। অথচ কোরআনের আয়াতগুলোর মধ্যে এরকম গাণিতিক সমস্যা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা একটি আদর্শিক, নিখুঁত সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসা নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আবুল মিয়ার উত্তরাধিকার: ১০০ টাকার ওপর ১১২.৫০ টাকার দাবি
উপরে বর্ণিত কোরআনের আয়াতগুলো ইসলামে সম্পত্তির হিসেবের মৌলিক আয়াত। ছেলে মেয়ে স্বামী স্ত্রী কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন তার হিসেব। আচ্ছা, এবারে আসুন ধরি, জনাব আবুল মিয়ার পরিবারে রয়েছে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতা, তার স্ত্রী, এবং তিন কন্যা। আবুল মিয়া মারা গেলেন, এবং উনার সম্পত্তি কোরআনের উপরের আয়াত মোতাবেক ভাগ বাটোয়ারা করা হবে। হিসেব করার সুবিধার জন্য ধরে নিচ্ছি আবুল মিয়া ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত নিষ্পত্তির পরে নিট বণ্টনযোগ্য ১০০ টাকার সম্পত্তি রেখে গেছেন। এখন ভাগ বাটোয়ারা কীভাবে করবো?
১। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের সন্তান থাকে।
এই আয়াত অনুসারে যেহেতু মৃতের সন্তান আছে, তাই তার বৃদ্ধ পিতা মাতা প্রত্যেকে পাবেন ছয় ভাগের এক ভাগ করে। অর্থাৎ এক একজন পাবেন (১০০÷৬ = ১৬.৬৬৬… ≈ ১৬.৬৭) টাকা করে। দুইজনের সম্মিলিত নির্ভুল অংশ ১০০×(১/৬+১/৬) = ৩৩.৩৩৩… টাকা, অর্থাৎ দুই দশমিক ঘর পর্যন্ত প্রায় ৩৩.৩৩ টাকা।
২। আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেনঃ একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু`এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক।
এবারে আসুন তার তিন কন্যা কতটুকু সম্পত্তি পাবে তার হিসেবে। উপরের আয়াত থেকে বোঝা যায়, আবুল সাহেবের তিন কন্যা পাবে মালের তিনভাগের দুই ভাগ। অর্থাৎ ( ১০০× ২/৩ = ৬৬.৬৭) টাকা।
৩। স্ত্রীদের জন্যে এক-চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, যা তোমরা ছেড়ে যাও ওছিয়্যতের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর।
এবারে মৃত আবুল মিয়ার স্ত্রীর হিসেব। উপরের আয়াত মোতাবেক তিনি পাবেন আট ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ (১০০÷৮ = ১২.৫০) টাকা।
এভাবে আসুন হিসেব করি। আবুল সাহেব মোট ১০০ টাকা রেখে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে কোরআনের এই নিয়ম অনুসারে
| যারা পাবেন | যত পাবেন |
| পিতা-মাতা | ৩৩.৩৩ টাকা |
| তিন কন্যা | ৬৬.৬৭ টাকা |
| স্ত্রী | ১২.৫০ টাকা |
| মোট | ৩৩.৩৩ + ৬৬.৬৭ + ১২.৫০ = ১১২.৫০ টাকা |
কিন্তু টাকাগুলো ভাগ করে দেওয়ার সময় দেখা যাচ্ছে, ১২.৫০ টাকা কম হয়ে যাচ্ছে। মোট টাকা আছে ১০০, অথচ সবাইকে দিতে হবে ১১২.৫০। এই বাড়তি ১২.৫০ টাকা কোথা থেকে আসবে? আল্লাহ পাক নাজিল করবেন? এরকম বড় ধরনের গাণিতিক ভুল দিয়ে সম্পত্তির হিসেব করা খুবই বিপদজনক।

বিলকিস বেগমের উত্তরাধিকার: স্বামী, কন্যা ও পিতা-মাতার হিসাব
ধরে নিই, বিলকিস বেগম মারা গেছেন। মৃত্যুর সময় তিনি ১০ লক্ষ টাকা রেখে গেছেন। তার এক কন্যা, পিতা-মাতা এবং স্বামী ছাড়া আর কোনো উত্তরাধিকারী নেই। এখন আসুন, কোরআন অনুসারে তার সম্পত্তির ভাগ করি। এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, ঋণ ও ওসিয়ত পরিশোধের পর নিট ত্যাজ্য সম্পত্তি ১০ লক্ষ টাকা।
কোরআনের সূরা নিসা ৪:১২ অনুসারে, স্ত্রী যদি সন্তান রেখে মারা যান, তাহলে স্বামী পাবে স্ত্রীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ। যেহেতু বিলকিস বেগমের এক কন্যা আছে, তাই তার স্বামী পাবেন ১/৪ অংশ।
১০,০০,০০০ × ১/৪ = ২,৫০,০০০ টাকা
সূরা নিসা ৪:১১ অনুসারে, মৃত ব্যক্তির যদি একমাত্র কন্যা থাকে, তাহলে সেই কন্যা পাবে অর্ধেক সম্পত্তি। সুতরাং বিলকিস বেগমের একমাত্র কন্যা পাবে ১/২ অংশ।
১০,০০,০০০ × ১/২ = ৫,০০,০০০ টাকা
একই আয়াতে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা-মাতার প্রত্যেকে পাবে ত্যাজ্য সম্পত্তির ১/৬ অংশ। যেহেতু বিলকিস বেগমের সন্তান আছে, তাই তার পিতা পাবেন ১/৬ এবং মাতা পাবেন ১/৬ অংশ।
পিতা পাবেন: ১০,০০,০০০ × ১/৬ = ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা
মাতা পাবেন: ১০,০০,০০০ × ১/৬ = ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা
এবার মোট হিসাব দাঁড়াচ্ছে:
স্বামী: ২,৫০,০০০ টাকা
এক কন্যা: ৫,০০,০০০ টাকা
পিতা: ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা
মাতা: ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ টাকা
মোট = ২,৫০,০০০ + ৫,০০,০০০ + ১,৬৬,৬৬৬.৬৭ + ১,৬৬,৬৬৬.৬৭
= ১০,৮৩,৩৩৩.৩৪ টাকা
অর্থাৎ বিলকিস বেগম রেখে গেছেন ১০ লক্ষ টাকা, কিন্তু কোরআনের নির্ধারিত ভগ্নাংশগুলো সরাসরি প্রয়োগ করলে উত্তরাধিকারীদের দিতে হবে ১০,৮৩,৩৩৩.৩৪ টাকা। এখানে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮৩,৩৩৩.৩৪ টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে?
গাণিতিকভাবে একই হিসাব আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যায়:
১/৪ + ১/২ + ১/৬ + ১/৬
= ৩/১২ + ৬/১২ + ২/১২ + ২/১২
= ১৩/১২
অর্থাৎ মোট দাবি দাঁড়াচ্ছে ১৩/১২, যা ১-এর বেশি। শতাংশ হিসেবে এটি ১০৮.৩৩%। অথচ বাস্তবে সম্পত্তি আছে মাত্র ১০০%। তাই এখানে কোরআনের নির্ধারিত অংশগুলো একসাথে সরাসরি কার্যকর করা অসম্ভব। যদি সবাইকে কোরআন-নির্ধারিত অংশ দেওয়া হয়, তাহলে সম্পত্তির চেয়ে বেশি টাকা দরকার হবে। আর যদি আউল পদ্ধতিতে সবার অংশ কমিয়ে ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে হিসাব মেলানো হয়, তাহলে স্বামী ১/৪ পাবে না, কন্যা ১/২ পাবে না, পিতা-মাতা প্রত্যেকে ১/৬ পাবে না। অর্থাৎ কোরআনের ঘোষিত ভগ্নাংশগুলো বাস্তবে পরিবর্তিত হয়ে যাবে।
এই উদাহরণটি দেখায়, সমস্যাটি কোনো বিরল বা কল্পিত জটিলতা নয়। একজন নারী মারা গেছেন, তার স্বামী, এক কন্যা ও পিতা-মাতা জীবিত—এটি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্ভব পারিবারিক পরিস্থিতি। অথচ এমন সাধারণ ক্ষেত্রেও কোরআনের উত্তরাধিকার-ভগ্নাংশ সরাসরি প্রয়োগ করলে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবির সৃষ্টি হয়। ফলে আউল ছাড়া এই হিসাব মেলানো যায় না, আর আউল প্রয়োগ করলেই কোরআনের নির্দিষ্ট অংশগুলো আর অক্ষত থাকে না।
আউলের বিস্তৃত হিসাব: অতিরিক্ত দাবি ও আনুপাতিক কর্তন
উত্তরাধিকারীদের ঘোষিত অংশ মোট সম্পত্তিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সমস্যা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন উদাহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধ্রুপদি ফারায়েজশাস্ত্রে আউলযোগ্য মূল হিসাবগুলো আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কোন মূল হিসাব কত পর্যন্ত বাড়বে, কোন পরিবারে কোন বণ্টন হবে এবং কোন উত্তরাধিকারীর অংশ কতটা কমবে—এসবের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি হয়েছে। এই বিশদ শ্রেণিবিন্যাস দেখায়, নির্ধারিত অংশগুলো একসঙ্গে পূরণ করতে না পারার পরিস্থিতি উত্তরাধিকার আইনের একটি স্বীকৃত ব্যবহারিক সমস্যা।
হানাফি ফকিহ আল-মাওসিলি মূল হিসাবের সাতটি ভিত্তি উল্লেখ করে বলেছেন, এর মধ্যে ৬, ১২ এবং ২৪ আউলযোগ্য। ৬ বাড়তে পারে ৭, ৮, ৯ ও ১০ পর্যন্ত; ১২ বাড়তে পারে ১৩, ১৫ ও ১৭ পর্যন্ত; ২৪ বাড়ে ২৭-এ। অর্থাৎ ২৪ থেকে ২৭ করার বহুল আলোচিত উদাহরণ ছাড়াও আরও বেশি মাত্রার ঘাটতির জন্য সম্পূর্ণ একটি হিসাবব্যবস্থা রয়েছে। [10]
واعلم أن أصول المسائل سبعة: اثنان وثلاثة وأربعة وستة وثمانية واثنا عشر وأربعة وعشرون، فأربعة منها لا تعول: الاثنان والثلاثة والأربعة والثمانية، وثلاثة تعول: الستة والاثنا عشر والأربعة والعشرون، فالستة تعول إلى عشرة وترا وشفعا، واثنا عشر تعول إلى ثلاثة عشر وخمسة عشر وسبعة عشر، وأربعة وعشرون تعول إلى سبعة وعشرين لا غير.
বাংলা অনুবাদ: জেনে রাখো, মূল হিসাব সাতটি: দুই, তিন, চার, ছয়, আট, বারো ও চব্বিশ। এর মধ্যে চারটিতে আউল হয় না: দুই, তিন, চার ও আট। আর তিনটিতে আউল হয়: ছয়, বারো ও চব্বিশ। ছয় জোড় ও বিজোড় উভয়ভাবে দশ পর্যন্ত আউল হয়। বারো আউল হয় তেরো, পনেরো ও সতেরোতে। আর চব্বিশ কেবল সাতাশে আউল হয়।
ভিন্ন পরিবার, একই সম্পত্তির ওপর অতিরিক্ত দাবি
নিচের হিসাবগুলোতে প্রতিটি পরিবারের প্রাসঙ্গিক উত্তরাধিকারীদের দেখানো হয়েছে; তাদের অংশ পরিবর্তন বা তাদের বঞ্চিত করেন এমন অন্য উত্তরাধিকারী উপস্থিত নেই। “সহোদর বোন” বলতে একই পিতা-মাতার বোন এবং “মাতৃসূত্রের বোন” বলতে একই মা কিন্তু ভিন্ন পিতার বোন বোঝানো হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রথমে ঘোষিত অংশগুলো মোট সম্পত্তির ভগ্নাংশ হিসেবে যোগ করা হয়েছে। এরপর দেখানো হয়েছে, আউল প্রয়োগ করলে সেই মূল হিসাবের পরিবর্তে কোন নতুন হিসাব ব্যবহার করতে হয়।
| প্রাসঙ্গিক উত্তরাধিকারী | ঘোষিত অংশগুলোর যোগফল | মোট সম্পত্তির তুলনায় দাবি | আউলে মূল হিসাবের পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| স্বামী, মা এবং এক সহোদর বোন | ১/২ + ১/৩ + ১/২ = ৮/৬ | প্রায় ১৩৩.৩৩% | ৬ থেকে ৮ |
| স্বামী, দুই সহোদর বোন এবং মাতৃসূত্রের দুই বোন | ১/২ + ২/৩ + ১/৩ = ৯/৬ | ১৫০% | ৬ থেকে ৯ |
| স্বামী, মা, দুই সহোদর বোন এবং মাতৃসূত্রের দুই বোন | ১/২ + ১/৬ + ২/৩ + ১/৩ = ১০/৬ | প্রায় ১৬৬.৬৭% | ৬ থেকে ১০ |
| স্ত্রী, উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত দাদি বা নানি এবং দুই সহোদর বোন | ১/৪ + ১/৬ + ২/৩ = ১৩/১২ | প্রায় ১০৮.৩৩% | ১২ থেকে ১৩ |
| স্ত্রী, দুই সহোদর বোন এবং মাতৃসূত্রের দুই বোন | ১/৪ + ২/৩ + ১/৩ = ১৫/১২ | ১২৫% | ১২ থেকে ১৫ |
| স্ত্রী, মা, দুই সহোদর বোন এবং মাতৃসূত্রের দুই বোন | ১/৪ + ১/৬ + ২/৩ + ১/৩ = ১৭/১২ | প্রায় ১৪১.৬৭% | ১২ থেকে ১৭ |
এখানে পারিবারিক সদস্যের সামান্য পরিবর্তনেই একই ধরনের ঘাটতি ভিন্ন মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। স্বামী, মা ও এক বোনের ক্ষেত্রে মূল হিসাব ৬ থেকে ৮ করতে হচ্ছে। আরও বোন যুক্ত হলে সেটি ৯ বা ১০ পর্যন্ত যাচ্ছে। স্ত্রীসহ অন্য বিন্যাসে ১২ থেকে ১৩, ১৫ বা ১৭ করতে হচ্ছে। ফলে বণ্টন চালানোর জন্য ঘোষিত ভগ্নাংশগুলোর বদলে নতুন হর গ্রহণ করা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার বিস্তৃতি মূল ভগ্নাংশগুলোর অক্ষুণ্ণ কার্যকারিতা প্রমাণ করে না; বরং কোন কোন অবস্থায় সেগুলো কমাতে হয়, তার তালিকা তৈরি করে।
উম্মুল ফুরুখ: ঘোষিত অংশের চল্লিশ শতাংশ কর্তন
স্বামী, মা, দুই সহোদর বোন ও মাতৃসূত্রের দুই বোনের ক্ষেত্রে মোট দাবি হয় ১০/৬। এই বিন্যাসে স্বামীর অর্ধেক, মায়ের এক-ষষ্ঠাংশ, সহোদর বোনদের দুই-তৃতীয়াংশ এবং মাতৃসূত্রের বোনদের এক-তৃতীয়াংশ একসঙ্গে দেওয়ার মতো সম্পত্তি নেই। ছয় অংশের সম্পত্তির ওপর দাবি তৈরি হয় দশ অংশের। তাই আউলে মূল ছয়কে দশে উন্নীত করা হয়। স্বামী তখন পায় ৩/১০, মা ১/১০, সহোদর বোনেরা একত্রে ৪/১০ এবং মাতৃসূত্রের বোনেরা একত্রে ২/১০।
এই পরিবর্তনের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। স্বামীর ১/২ থেকে ৩/১০ হওয়া মানে তার ঘোষিত অংশের ৪০ শতাংশ কমে যাওয়া। মায়ের ১/৬ থেকে ১/১০ হওয়া এবং সহোদর বোনদের ২/৩ থেকে ২/৫ হওয়াতেও একই আনুপাতিক হ্রাস ঘটে। এখানে অতি ক্ষুদ্র কোনো গোলকরণ বা দশমিকের শেষে সামান্য অমিল সামলানো হচ্ছে না। ঘোষিত অংশগুলোর প্রত্যেকটিকে বড় মাত্রায় কমিয়ে সম্পত্তির মধ্যে নামিয়ে আনা হচ্ছে। মূল হিসাবের ভাষায় “ছয় থেকে দশ” কথাটি নিরীহ শোনালেও উত্তরাধিকারীর প্রাপ্যের ভাষায় সেটি চল্লিশ শতাংশ কর্তন।
আউলের হিসাব নতুন অংশগুলো যোগ করে সম্পত্তির সমান করতে পারে। সেই গাণিতিক দক্ষতা এবং প্রথমে ঘোষিত অংশগুলো সত্যিই দেওয়া হয়েছে কি না—এ দুটি আলাদা বিচার। ৩/১০, ১/১০, ৪/১০ ও ২/১০ যোগ করলে ১ হয়; কিন্তু ৩/১০ কখনো অর্ধেক হয় না, ১/১০ কখনো এক-ষষ্ঠাংশ হয় না। সুতরাং চূড়ান্ত যোগফল ঠিক হয়েছে বলেই পূর্বঘোষিত ভগ্নাংশগুলো অক্ষত ছিল—এ দাবি করা সরাসরি ভুল।
স্বামী–স্ত্রী ছাড়াও আউল: মা ও দুই শ্রেণির বোনের ভাগ
আউলের সমস্যা কেবল স্বামী বা স্ত্রীর অংশ অন্য উত্তরাধিকারীদের অংশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে ঘটে না। সুন্নি ফিকহে এমন উদাহরণও রয়েছে, যেখানে কোনো স্বামী বা স্ত্রী উপস্থিত নেই। মৃত ব্যক্তির মা, একই পিতা-মাতার দুই বোন এবং একই মা কিন্তু ভিন্ন পিতার দুই বোন থাকলেই নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল সম্পত্তিকে অতিক্রম করতে পারে। এই বিন্যাসে মায়ের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ, সহোদর বোনদের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ এবং মাতৃসূত্রের বোনদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ গণনা করা হয়। যোগফল হয় ১/৬ + ২/৩ + ১/৩ = ৭/৬।
সরাখসি এই নির্দিষ্ট উদাহরণটি আল-মাবসুত-এর আউল অধ্যায়েই উল্লেখ করেছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, ছয়ের মধ্যে মায়ের এক অংশ, সহোদর বোনদের চার অংশ এবং মাতৃসূত্রের বোনদের দুই অংশ—সব মিলিয়ে সাত অংশ হয়। ফলে মূল ছয়ের হিসাবে এক অংশ বাড়িয়ে আউল প্রয়োগ করতে হয়। [11]
والتي تعول بسهم صورتها إذا ترك أختين لأب وأم وأختين لأم وأما فللأختين لأب وأم الثلثان أربعة وللأختين لأم الثلث سهمان وللأم السدس سهم فتعول بسهم.
বাংলা অনুবাদ: যে হিসাব এক অংশ আউল হয়, তার উদাহরণ হলো: মৃত ব্যক্তি একই পিতা-মাতার দুই বোন, মাতৃসূত্রের দুই বোন এবং মা রেখে গেলেন। একই পিতা-মাতার দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ চার অংশ; মাতৃসূত্রের দুই বোনের জন্য এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ দুই অংশ; এবং মায়ের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ, অর্থাৎ এক অংশ। ফলে হিসাবটি এক অংশ আউল হয়।
চার লাখ বিশ হাজার টাকার ওপর চার লাখ নব্বই হাজার টাকার দাবি
ধরা যাক, ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত নিষ্পত্তির পরে নিট বণ্টনযোগ্য সম্পত্তি রয়েছে ৪,২০,০০০ টাকা। এর এক-ষষ্ঠাংশ ৭০,০০০ টাকা, দুই-তৃতীয়াংশ ২,৮০,০০০ টাকা এবং এক-তৃতীয়াংশ ১,৪০,০০০ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত অংশগুলো সরাসরি দিতে গেলে প্রয়োজন ৪,৯০,০০০ টাকা। ঘাটতি ৭০,০০০ টাকা। সম্পত্তির পরিমাণ বাড়িয়ে বা কমিয়ে এই কাঠামোগত অমিল দূর করা যায় না, কারণ সমস্যা টাকার মোট অঙ্কে নয়; একই সম্পত্তির ওপর আরোপিত ভগ্নাংশগুলোর যোগফলে।
| উত্তরাধিকারী | ঘোষিত অংশ | সেই হিসাবে টাকার পরিমাণ | আউলের পরে অংশ | আউলের পরে টাকা |
|---|---|---|---|---|
| মা | ১/৬ | ৭০,০০০ টাকা | ১/৭ | ৬০,০০০ টাকা |
| দুই সহোদর বোন | ২/৩ = ৪/৬ | ২,৮০,০০০ টাকা | ৪/৭ | ২,৪০,০০০ টাকা |
| মাতৃসূত্রের দুই বোন | ১/৩ = ২/৬ | ১,৪০,০০০ টাকা | ২/৭ | ১,২০,০০০ টাকা |
| মোট | ৭/৬ | ৪,৯০,০০০ টাকা | ৭/৭ | ৪,২০,০০০ টাকা |
আউল প্রয়োগের ফলে মা ১০,০০০ টাকা, সহোদর বোনেরা ৪০,০০০ টাকা এবং মাতৃসূত্রের বোনেরা ২০,০০০ টাকা কম পাচ্ছেন। এই কর্তনের পরে মোট টাকা সম্পত্তির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কিন্তু মায়ের এক-ষষ্ঠাংশ এক-সপ্তমাংশে, সহোদর বোনদের দুই-তৃতীয়াংশ চার-সপ্তমাংশে এবং মাতৃসূত্রের বোনদের এক-তৃতীয়াংশ দুই-সপ্তমাংশে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ দাম্পত্য উত্তরাধিকারী ছাড়াই ঘোষিত অংশ হ্রাসের একই প্রক্রিয়া কার্যকর হচ্ছে।
সুতরাং “আউল শুধু স্বামী বা স্ত্রী থাকলেই ঘটে”—বক্তব্যটি সুন্নি ফিকহের সাধারণ নিয়ম হিসেবে ভুল। সরাখসির উদাহরণেই তার প্রত্যক্ষ খণ্ডন রয়েছে। এই উদাহরণ আরও দেখায়, সমস্যাটিকে শুধু স্বামী–স্ত্রীর অংশের বিশেষ ব্যতিক্রম বলে সরিয়ে রাখা যায় না। মা ও দুই শ্রেণির বোনের মতো ভিন্ন পারিবারিক বিন্যাসেও একই সম্পত্তির ওপর অতিরিক্ত দাবির সৃষ্টি হয়। ফলে আউলের প্রয়োজনীয়তা নির্দিষ্ট একটি সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ নয়; একাধিক নির্ধারিত অংশ একত্র হওয়ার কাঠামোর সঙ্গেই যুক্ত।
আউলের প্রবর্তন: উমরের সিদ্ধান্ত ও সাহাবিদের মতভেদ
উত্তরাধিকারের নির্ধারিত ভগ্নাংশগুলো মুহাম্মদের সময়ে প্রচারিত হলেও আউল প্রয়োগের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে। মুহাম্মদ নিজে আউল প্রয়োগ করেছেন—এমন হাদিস বর্ণিত হয়নি বলে ইসলামওয়েবের ফতোয়াতেও উল্লেখ রয়েছে। আবু বকরের আমলের পরিবর্তে উমরের আমলকেই ধ্রুপদি ফারায়েজশাস্ত্র আউলের সূচনাকাল হিসেবে চিহ্নিত করে। উত্তরাধিকারের একাধিক নির্ধারিত দাবি একই সম্পত্তিতে একত্র হওয়ার পর খলিফা ও সাহাবিদের সামনে বণ্টনের সংকট দেখা দেয়। [12]
আউলের সূচনাসংক্রান্ত প্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, উমরের শাসনকালে একজন মহিলার মৃত্যু হয়। তিনি স্বামী ও দুই বোন রেখে গিয়েছিলেন। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুসারে, এই অবস্থায় স্বামী পাবেন এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোন পাবেন দুই-তৃতীয়াংশ। কিন্তু এই হিসেবটি সমস্যার সৃষ্টি করল। যদি স্বামীকে এক-অর্ধাংশ দেওয়া হয়, তবে দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ বাকি থাকবে না, এবং যদি দুই বোনকে তাদের অংশ দেওয়া হয়, তবে স্বামীর এক-অর্ধাংশ সম্পূর্ণভাবে দেওয়া সম্ভব হবে না।
এই বিবরণ অনুযায়ী, খলিফা উমর এই জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার জন্য বিশিষ্ট সাহাবিদের একত্রিত করলেন। তিনি তাদের সামনে কোরআনের নির্দেশগুলো উপস্থাপন করে বলেন, “আল্লাহ স্বামীর জন্য এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু এখন আমি কীভাবে এই সম্পদ বণ্টন করব? যদি স্বামীর অংশ দিয়ে শুরু করি, তবে দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ থাকবে না, আর যদি দুই বোনকে আগে দেই, তাহলে স্বামীর জন্য তার প্রাপ্য অংশ থাকবে না। আমাকে পরামর্শ দিন।”
বর্ণনা অনুযায়ী, উপস্থিত সাহাবিদের মধ্যে কেউ কেউ ‘আউল’ পদ্ধতির পরামর্শ দেন—অর্থাৎ নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির বেশি হয়ে গেলে প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ‘আউল’-এর মূল ধারণা ছিল, সম্পত্তি কম হলে উত্তরাধিকারীদের প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে সম্পদ বণ্টন করা। কিন্তু এই ‘আউল’ পদ্ধতি মানতে গেলে, কোরআনে যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবে দেওয়া যাচ্ছে না, তার চাইতে কমিয়ে দিতে হচ্ছে।
ইবনে আব্বাস আউল পদ্ধতির প্রবল বিরোধী ছিলেন। তবে তিনি উমরের সেই পরামর্শসভাতেই প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছিলেন কি না, এ বিষয়ে বর্ণনাগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে। একটি বর্ণনায় তাকে উমরের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে দেখা যায়, আবার ইসলামওয়েবের উদ্ধৃত বর্ণনায় বলা হয়েছে, উমরের মৃত্যুর পরে তিনি ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তবে তার মূল অবস্থান স্পষ্ট ছিল: সকল উত্তরাধিকারীর কোরআন-নির্ধারিত অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়ার আউল পদ্ধতি তিনি গ্রহণ করেননি; বরং নির্দিষ্ট কিছু উত্তরাধিকারীর অংশ অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবর্তনশীল অংশ থেকেই ঘাটতি সমন্বয়ের পক্ষে ছিলেন।
এভাবে খলিফা উমর প্রথমবারের মতো ‘আউল’-এর নিয়ম প্রয়োগ করলেন। স্বামীর প্রাপ্য এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোনের প্রাপ্য দুই-তৃতীয়াংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে সকলের মধ্যে বণ্টন করা হলো। এই সিদ্ধান্ত ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়। পরবর্তীতে, চারটি সুন্নি মাযহাবও উমরের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেয় এবং ‘আউল’-এর ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। কিন্তু স্পষ্টতই, এই আইনটি কোরআনে আল্লাহর হুকুমের সরাসরি বরখেলাপ। কারণ এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে কোরআনের বিধানকে বদলে দিতে হয়।
পরবর্তীতে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস আউল পদ্ধতির বিরোধী অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন; তবে উমরের প্রবর্তিত পদ্ধতিই পরবর্তী সুন্নি ফিকহে প্রতিষ্ঠিত হয়। উমর বুঝতে পেরেছিলেন, কোরআনে সম্পত্তি ভাগে সমস্যা রয়েছে। নতুবা কোরআনের বাইরে তার নতুন কোনো সংশোধিত বিধান দেওয়ার প্রয়োজনই ছিল না, যেখানে কোরআনেই এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে। সমস্যাটি হচ্ছে, কোরআনের আয়াতটি তো রয়েই গেছে, সেটি তো আর বদলে দেওয়া যায়নি। সেটি দেখলেই তো পরিষ্কার হয় যে, এই আইনটিতে সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু নবীর মৃত্যুর পরে ওহী আসা তো বন্ধ হয়ে গেছে, তাহলে কোরআনে আল্লাহর হুকুম উমর কীভাবে সংশোধন করতে পারেন? সম্পত্তি ভাগের এই নতুন বিধানের অর্থই হচ্ছে, কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর বিধানের ওপর মাতব্বরি করা, তাই না?
উমরের সিদ্ধান্ত: নিজের বিচার ও পরবর্তী অনুসরণ
আল-মাওসিলির সংরক্ষিত একটি বর্ণনায় উমরের সিদ্ধান্তকে তার নিজের বিচার হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তিনি বলেন, সঠিক হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং ভুল হলে নিজের পক্ষ থেকে; এরপর সবার ওপর ঘাটতি প্রয়োগের মত দেন। একই অনুচ্ছেদে ইবনে আব্বাসের পরবর্তী বিরোধিতা এবং কাদের অংশ অক্ষত রেখে কাদের ওপর ঘাটতি চাপানো হবে, সেই বিকল্প বিচারও এসেছে। [13]
وفي رواية أنه قال: لا أجد لكم فرضا في كتاب الله ولا أدري من قدمه الله تعالى فأقدمه، ولا من أخره فأؤخره، ولكني رأيت رأيا فإن كان صوابا فمن الله، وإن كان خطأ فمني، أرى أن أدخل النقص على الكل فقسم بالعول ولم يخالفه أحد في ذلك إلى أن انتهى الأمر إلى عثمان، فأظهر ابن عباس الخلاف وقال: لو قدموا من قدمه الله وأخروا من أخره الله ما عالت فريضة قط، فقيل له: من قدمه الله ومن أخره الله؟ قال: الزوج والزوجة والأم والجدة ممن قدمه الله، وأما من أخره الله فالبنات وبنات الابن والأخوات لأب وأم، والأخوات لأب، فتارة يفرض لهن وتارة يكن عصبة ويدخل النقص على هؤلاء الأربع، ثم قال: من شاء باهلته إن شاء الله تعالى.
বাংলা অনুবাদ: একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছিলেন: “আল্লাহর কিতাবে তোমাদের এই বণ্টনের নির্ধারিত সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না। আল্লাহ কাকে আগে রেখেছেন যে তাকে আগে দেব, কিংবা কাকে পরে রেখেছেন যে তাকে পরে দেব, তা জানি না। তবে আমি একটি মত গ্রহণ করেছি। সেটি সঠিক হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে; ভুল হলে আমার নিজের পক্ষ থেকে। আমার মত হলো, সবার ওপর ঘাটতি প্রয়োগ করব।” এরপর তিনি আউল অনুযায়ী বণ্টন করলেন। উসমানের সময় আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে কেউ তার বিরোধিতা করেননি; তখন ইবনে আব্বাস বিরোধিতা প্রকাশ করে বললেন, “আল্লাহ যাদের আগে রেখেছেন তাদের আগে এবং যাদের পরে রেখেছেন তাদের পরে রাখলে কোনো ফরজের হিসাবে আউল হতো না।” তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, “আল্লাহ কাদের আগে ও কাদের পরে রেখেছেন?” তিনি বললেন, “স্বামী, স্ত্রী, মা ও দাদি বা নানি তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের আল্লাহ আগে রেখেছেন। আর যাদের পরে রেখেছেন তারা হলো কন্যা, পুত্রের কন্যা, সহোদর বোন এবং পিতৃসূত্রের বোন। কখনো তাদের জন্য নির্ধারিত অংশ থাকে, আবার কখনো তারা আসাবা হয়; এই চার শ্রেণির ওপরই ঘাটতি প্রয়োগ হবে।” এরপর তিনি বললেন, “যে চায়, আল্লাহ চাইলে আমি তার সঙ্গে মুবাহালা করব।”
এই বর্ণনায় মতভেদের কেন্দ্র গোপন নেই। সবার অংশ কমানো হবে, নাকি কিছু অংশ অক্ষত রেখে নির্দিষ্ট ওয়ারিশের অংশ থেকে ঘাটতি নেওয়া হবে—সেই সিদ্ধান্তই বিচারাধীন। উমরের পদ্ধতিতে আনুপাতিক কর্তন এবং ইবনে আব্বাসের পদ্ধতিতে অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্তন কার্যকর হয়। দুটি পদ্ধতি সম্পত্তি বণ্টনের ভিন্ন ফল তৈরি করে। ফলে পরবর্তী আইনের হিসাব নির্ধারণে আয়াতের ভগ্নাংশের পাশাপাশি কোন মানবিক সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটিও অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।
শুরাইহের বিচার: অর্ধেকের বদলে তিন-দশমাংশ ও অভিযোগকারীর শাস্তি
ঘোষিত অংশ কমে যাওয়ার প্রশ্নটি শুধু পরবর্তী যুগের সমালোচকের তৈরি বিতর্ক নয়। ফিকহি সাহিত্যে সংরক্ষিত বর্ণনায় উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও তার পাওয়া অংশ নিয়ে আপত্তি করতে দেখা যায়। সরাখসি বিচারক শুরাইহের একটি রায়ের বিবরণ দিয়েছেন, যেখানে একজন স্বামী অর্ধেকের বদলে তিন-দশমাংশ পাওয়ার পরে বিভিন্ন ফকিহের কাছে প্রশ্ন করছিলেন। তার প্রশ্নে স্ত্রীর মৃত্যু ও সন্তান না থাকার কথা ছিল; পূর্ণ পারিবারিক বিন্যাসটি উল্লেখ করা হচ্ছিল না। ফকিহরা অর্ধেকের কথা বললে তিনি অভিযোগ করতেন, তাকে অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশও দেওয়া হয়নি। বর্ণনার পরবর্তী অংশে বিচারকের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রচারের অভিযোগে তাকে তাজির দেওয়ার কথা রয়েছে।
এই বিবরণের পটভূমি ‘উম্মুল ফুরুখ’ বা ‘শুরাইহিয়্যা’ নামে পরিচিত হিসাব। মৃত নারী স্বামী, মা, দুই সহোদর বোন এবং মাতৃসূত্রের দুই বোন রেখে গেছেন। আউল প্রয়োগে স্বামীর তিন অংশ আর ছয়ের মধ্যে থাকে না; দশের মধ্যে তিন অংশে পরিণত হয়। ফলে তার প্রাপ্তি ১/২ থেকে ৩/১০ হয়ে যায়। সরাখসির সংরক্ষিত বিবরণে হিসাব, অভিযোগ এবং শাস্তির প্রসঙ্গ একসঙ্গেই এসেছে। [14]
والتي تعول بأربعة صورتها فيما قدمنا إذا تركت أختين لأب وأم وأختين لأم وأما وزوجا فأنها تعول بنصيب الأم وبنصيب الزوج ثلاثة فعرفنا أنها تعول بأربعة ولا تعول الفرائض بأكثر من هذا وتسمى هذه المسألة أم الفروخ لكثرة العول فيها وتسمى الشريحية لأنها رفعت إلى شريح رحمه الله فقضى بهذا فجعل الزوج يسأل الفقهاء بالعراق فيقول امرأة ماتت وتركت زوجا ولم تترك ولدا فماذا يكون للزوج فقالوا النصف فقال والله ما أعطيت نصفا ولا ثلثا فبلغ مقالته إلى شريح فدعاه وقال للرسول قل له قد بقي عندنا شيء فلما أتاه عزره وقال أنت تشنع على القاضي وتنسب القاضي بالحق إلى الفاحشة فقال الرجل هذا الذي كان بقي لي عندك.
বাংলা অনুবাদ: যে হিসাব চার অংশ আউল হয়, তার উদাহরণ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে: কোনো নারী একই পিতা-মাতার দুই বোন, মাতৃসূত্রের দুই বোন, মা এবং স্বামী রেখে মারা গেলেন। এতে মায়ের অংশ এবং স্বামীর তিন অংশ যুক্ত হয়; ফলে বোঝা যায়, মোট চার অংশ আউল হয়। এই ছয়ভিত্তিক হিসাব এর চেয়ে বেশি আউল হয় না। অধিক আউল হওয়ার কারণে এই সমস্যাটির নাম ‘উম্মুল ফুরুখ’। একে ‘শুরাইহিয়্যা’ও বলা হয়, কারণ এটি শুরাইহের কাছে পেশ করা হয়েছিল এবং তিনি এভাবেই রায় দিয়েছিলেন। এরপর স্বামী ইরাকের ফকিহদের জিজ্ঞাসা করতে থাকেন, “এক নারী মারা গেছেন; তিনি স্বামী রেখে গেছেন, সন্তান রেখে যাননি। স্বামী কত পাবে?” তারা বলতেন, “অর্ধেক।” তখন তিনি বলতেন, “আল্লাহর কসম, আমাকে অর্ধেকও দেওয়া হয়নি, এক-তৃতীয়াংশও দেওয়া হয়নি।” তার এই বক্তব্য শুরাইহের কাছে পৌঁছালে তিনি তাকে ডেকে পাঠালেন এবং দূতকে বললেন, “তাকে বলো, আমাদের কাছে তার জন্য আরও কিছু বাকি আছে।” লোকটি এলে তিনি তাকে তাজির দিলেন এবং বললেন, “তুমি বিচারকের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রচার করছ এবং ন্যায়ানুগ বিচারকারীকে অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করছ।” লোকটি বললেন, “তাহলে আপনার কাছে আমার জন্য এই জিনিসটিই বাকি ছিল!”
বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রাপ্য অংশের হিসাব
এই বিরোধে দুটি বিষয় পাশাপাশি উপস্থিত। লোকটি অন্য ফকিহদের কাছে পূর্ণ পারিবারিক বিবরণ না দিয়ে প্রশ্ন করছিলেন; বিচারকের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রচারের অভিযোগ সেই আচরণের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে তার প্রাপ্ত টাকার হিসাবেও একটি অনস্বীকার্য সত্য রয়েছে: তিন-দশমাংশ অর্ধেক নয়, এমনকি এক-তৃতীয়াংশও নয়। আউল প্রয়োগের ফলে তিনি যে ঘোষিত অর্ধেকের চেয়ে কম পেয়েছেন, তা হিসাবেই দৃশ্যমান। তার প্রশ্ন করার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি থাকলেও ৩/১০-কে ১/২ বানানো যায় না।
এখানে শাস্তির উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিতর্কের মধ্যে বিচারকের মর্যাদা ও আদালতের কর্তৃত্ব প্রবেশ করেছে; অভিযোগকারীর আচরণকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। কিন্তু আদালতের কর্তৃত্ব কোনো ভগ্নাংশের মান নির্ধারণ করে না। বিচারক আউল প্রয়োগ করে রায় দিতে পারেন, সেই রায় প্রতিষ্ঠিত ফিকহের সঙ্গে মিলতে পারে, এবং অভিযোগকারীকে তাজিরও দেওয়া হতে পারে—তাতেও অর্ধেকের বদলে তিন-দশমাংশ দেওয়ার ঘটনাটি অপরিবর্তিত থাকে। আইনগত অনুমোদন এবং সংখ্যাগত অভিন্নতা এক বিষয় নয়।
ফলে “আউল প্রয়োগে কারও নির্ধারিত অংশ বদলায় না”—এমন বক্তব্য এই বর্ণনার হিসাবের সঙ্গেই মেলে না। স্বামীর দাবির ভিত্তি ছিল অর্ধেক; রায়ে তার প্রাপ্তি হলো তিন-দশমাংশ। আউলের পক্ষে প্রশ্ন তখন দাঁড়ায়, এই হ্রাস কোন আইনগত ব্যাখ্যায় অনুমোদিত। অংশ কমেনি বলে বিষয়টি অস্বীকার করলে আলোচনার শুরুতেই সংখ্যার অর্থ বদলে ফেলতে হয়। অর্ধেক পাওয়ার ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবে কম পাওয়ার অভিজ্ঞতার সংঘাতই এই বর্ণনাকে উত্তরাধিকার-বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত করেছে।
উমরের নজিরে পরবর্তী বিচারকের আস্থা
বর্ণনার পরবর্তী অংশে শুরাইহের নিজের ভয় এবং পূর্ববর্তী রায়ের ওপর নির্ভরতার কথা এসেছে। সরাখসি উল্লেখ করেছেন, একজন ন্যায়পরায়ণ ও পরহেজগার ইমাম আগে একই রায় না দিলে এই বিচার নিয়ে শুরাইহ কতটা ভীত হতেন। এরপর তিনি সেই ইমামকে উমর ইবনুল খাত্তাব হিসেবে শনাক্ত করেছেন। এখানে আউলের বিচারিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে খলিফার প্রতিষ্ঠিত নজিরের সম্পর্ক সরাসরি দৃশ্যমান। [15]
فقال شريح ما أخوفني من هذا القضاء لولا أنه سبقني به إمام عادل ورع. يعني عمر بن الخطاب رضي الله عنه.
বাংলা অনুবাদ: শুরাইহ বললেন, “এই বিচার নিয়ে আমি কতই না ভীত হতাম, যদি একজন ন্যায়পরায়ণ ও পরহেজগার ইমাম আমার আগে এই রায় না দিতেন।” অর্থাৎ উমর ইবনুল খাত্তাব, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।
এই বক্তব্যে আস্থার ভিত্তি হিসেবে পূর্ববর্তী ইমামের বিচার সামনে আসে। একজন সম্মানিত শাসক আগে একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন—এই নজির পরবর্তী বিচারককে রায় দেওয়ার নিশ্চয়তা জোগাচ্ছে। ফলে উত্তরাধিকার বণ্টনের কার্যকর রূপ গঠনে শুধু আয়াতের ভগ্নাংশ নয়, খলিফার সিদ্ধান্ত, বিচারকের অনুসরণ এবং প্রতিষ্ঠিত আইনগত প্রথাও প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করছে। কোরআনের ঘোষিত অংশ থেকে বাস্তবে কত দেওয়া হবে, সেই ব্যবধান পূরণ করছে মানুষের তৈরি ও অনুসৃত এই বিচারিক ব্যবস্থা।
আউলের ইতিহাসে তাই হিসাব এবং কর্তৃত্ব একসঙ্গে কাজ করেছে। প্রথমে নির্ধারিত অংশগুলোর সংঘর্ষ দেখা দিয়েছে; এরপর আনুপাতিক হ্রাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে; সেই সিদ্ধান্ত পূর্ববর্তী শাসকের নজির হিসেবে পরবর্তী আদালতে কার্যকর হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় বাস্তব বণ্টন সম্পন্ন হয়, কিন্তু আয়াতে ঘোষিত ভগ্নাংশ ও প্রাপকের হাতে পৌঁছানো ভগ্নাংশ অভিন্ন থাকে না। শুরাইহের বিবরণে স্বামীর অর্ধেক থেকে তিন-দশমাংশে নেমে যাওয়াই সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট উদাহরণ।
আউল সম্পর্কে ফকিহ ও ফতোয়ার বক্তব্য
এবারে আসুন বিখ্যাত কয়েকটি ইসলামি ওয়েবসাইট থেকে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক, [16]

Al-‘Awl
‘Awl is applied where the shares exceed the heritage, such as where the decedent leaves behind a wife, parents and two daughters (the shares being, the wife’s one-eighth, the parents’ one-third, the two daughters’ two-thirds; here the estate falls short of the sum of one-eighth, one-third and two-thirds [27/24]). Similarly, if a woman dies and leaves behind her husband and two agnate sisters, the share of the husband is one-half, and that of the sisters two-thirds; here the estate falls short of the sum of half and two-thirds (7/6). ‘Awl occurs only if the husband or the wife is present.
The schools differ regarding the issue. Will he deficit, in such a case, be diminished proportionately from the shares of all the sharers, or will it be diminished from the shares of only some of them?
The four Sunni schools accept the doctrine of ‘awl, the rule that all the shares will be diminished proportionately, exact like the creditors’ claims when the assets fall short of meeting them. Hence the heirs are wife, parents and two daughters, according to these schools it will be an instance of ‘awl. The obligation is met by dividing the heritage into 27 parts, though it earlier comprised 24 parts. The wife will take 3/27 (i.e. her share becomes 1/9 instead of 1/8), the parents take 8/27 and the daughter 16/27.
The Imamiyyah do not accept the doctrine of ‘awl and keep the corpus (in the previous example) fixed at 24 parts by diminishing the share of the two daughters. Hence the wife takes her complete share of 1/8 (which is 3/24), the parents take 1/3 (which is 8/24), and the remainder goes to the two daughters.
The four schools argue in favour of the validity of ‘awl and the reduction of all the shares by citing the precedent of a woman who died during the reign of the Second Caliph, ‘Umar, leaving behind a husband and two agnate sisters. The Caliph gathered the Companions and said: “The shares determined by God for the husband and the two sisters are a half and two-thirds respectively. Now if I start with the husband’s share, the two-thirds will not remain for the two sisters, and if I start with the two sisters, the half will not remain for the husband. So give me advice.”
Some advised him to follow ‘awl by diminishing all the shares proportionately, while Ibn ‘Abbas vehemently opposed it. But ‘Umar did not accept his view and acted according to the opinion of others, telling the heirs: “I do not see any better way regarding this estate but to distribute it amongst you in proportion to your shares.” Hence ‘Umar was the first person to apply ‘awl to the shares and all the Sunni schools followed him.
The Imamiyyah argue regarding the invalidity of the doctrine of ‘awl by observing that it is impossible for Allah, subhanahu, to divide an estate into shares of half and two-thirds, or shares of one-eighth, one-third and two-thirds, because, otherwise, ignorance and frivolity would be attributed to Him, while He is too exalted to deserve such attributes. Hence, it has been narrated from ‘Ali (‘a) and his pupil ‘Abd Allah ibn ‘Abbas that they said: “He Who can count the number of sand grains (in the universe) surely knows that the number of shares do not exceed six.”
The Imamiyyah always diminish the share of the daughters or sisters, and the shares of the husband, the wife and the parents remain unaltered; because the daughters and the sisters have been assigned a single share and do not face a reduction from a higher to a lower share. They, therefore, inherit as sharers in the absence of a male heir and as residuaries in his presence, and at times they are entitled along with him to less than what they are entitled to when alone.
However, the share of the husband is reduced from a half to one-fourth, the wife’s from one-fourth to one-eighth, the mother’s from one-third to one-sixth, and in certain cases the father, inherits one-sixth as a sharer; the share of none of them further diminishes from its determined minimum, and nothing is reduced from it. Hence, when the shares exceed the corpus, a start will be made from this minimum limit and the remainder will go to the daughters or sisters.
Al-Shaykh Abu Zuhrah, in al-Mirath ‘inda al-Ja’fariyyah, quotes Ibn Shihab al-Zuhri1 as having said, “If it were not for the preference given to the fatwa of the just leader ‘Umar ibn al-Khattab over the fatwa of Ibn ‘Abbas, the observation of lbn ‘Abbas is worthy of being followed by every scholar and worthy of consensus over it.” The Imamiyyah have adopted the opinion of Ibn ‘Abbas –may God be pleased with both of them– which is a good rule, as pointed out by Ibn Shihab al-Zuhri, who was an ocean of knowledge.
……………………………………………
1.The famous and great Tabi’i faqih who has been highly eulogized by the Sunni ‘ulama’. He had met ten Sahabah.
বঙ্গানুবাদঃ
যখন উত্তরাধিকারের অংশগুলো মোট সম্পদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন ‘আউল প্রয়োগ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মৃত ব্যক্তি স্ত্রী, বাবা-মা এবং দুই কন্যা রেখে গেলে (যেখানে স্ত্রীর অংশ এক-অষ্টমাংশ, বাবা-মায়ের এক-তৃতীয়াংশ, এবং দুই কন্যার দুই-তৃতীয়াংশ হয়; এখানে মোট অংশ এক-অষ্টমাংশ, এক-তৃতীয়াংশ এবং দুই-তৃতীয়াংশের যোগফল সম্পদের চেয়ে বেশি হওয়ায় সম্পদ অপর্যাপ্ত হয় [২৭/২৪])। একইভাবে, যদি একজন নারী মারা যান এবং তার স্বামী ও দুই বোন রেখে যান, তবে স্বামীর অংশ এক-অর্ধাংশ এবং বোনদের অংশ দুই-তৃতীয়াংশ হয়; এখানে এক-অর্ধাংশ ও দুই-তৃতীয়াংশের যোগফল সম্পদের চেয়ে বেশি হওয়ায় সম্পদ অপর্যাপ্ত হয় (৭/৬)। ‘আউল কেবল তখনই ঘটে যখন স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকে।
এই বিষয়ে বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে, কি সমস্ত উত্তরাধিকারীর অংশ আনুপাতিক হারে কমানো হবে, নাকি কেবল কিছু উত্তরাধিকারীর অংশ কমানো হবে?
চারটি সুন্নি মাযহাব ‘আউল-এর মতবাদ মেনে নেয়, যেখানে সমস্ত উত্তরাধিকারীর অংশ আনুপাতিক হারে কমানো হয়, ঠিক যেমন ঋণদাতাদের দাবি তখন কমে যায় যখন সম্পদ তাদের দাবি পূরণের জন্য যথেষ্ট হয় না। তাই স্ত্রীর অংশ, বাবা-মায়ের অংশ এবং দুই কন্যার অংশ প্রয়োগ করা হলে এটি ‘আউল-এর একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। সম্পদকে ২৪ অংশের পরিবর্তে ২৭ অংশে ভাগ করে এই দাবিগুলো পূরণ করতে হয়। স্ত্রী ৩/২৭ অংশ পাবেন (অর্থাৎ তার অংশ এক-অষ্টমাংশের পরিবর্তে এক-নবমাংশ হবে), বাবা-মা ৮/২৭ পাবেন এবং দুই কন্যা ১৬/২৭ পাবেন।
ইমামিয়্যাহ ‘আউল-এর মতবাদ গ্রহণ করে না এবং সম্পদকে ২৪ অংশেই স্থির রাখে, দুই কন্যার অংশ কমিয়ে। তাই স্ত্রী তার পুরো এক-অষ্টমাংশ (যা ৩/২৪) পাবেন, বাবা-মা তাদের এক-তৃতীয়াংশ (যা ৮/২৪) পাবেন, এবং অবশিষ্ট অংশ দুই কন্যার মধ্যে বণ্টিত হবে।
চারটি সুন্নি মাযহাব ‘আউল-এর বৈধতার পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন, যেখানে দ্বিতীয় খলিফা উমর (রাযি.) এর শাসনকালে এক মহিলার মৃত্যু হয়, যিনি স্বামী ও দুই বোন রেখে যান। খলিফা সাহাবিদের একত্রিত করে বললেন, “আল্লাহ স্বামীর জন্য এক-অর্ধাংশ এবং দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন। এখন যদি আমি স্বামীর অংশ দিয়ে শুরু করি, তবে দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ থাকবে না, এবং যদি আমি দুই বোনের অংশ দিয়ে শুরু করি, তবে স্বামীর জন্য এক-অর্ধাংশ থাকবে না। তাই আমাকে পরামর্শ দিন।”
কিছু সাহাবি পরামর্শ দিলেন ‘আউল অনুসরণ করার, যেখানে সমস্ত অংশ আনুপাতিক হারে কমানো হবে। ইবনে আব্বাস (রাযি.) কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করলেন। তবে উমর (রাযি.) তার মতামত গ্রহণ করেননি এবং অন্যান্যদের মতামত অনুযায়ী কাজ করেন। তিনি উত্তরাধিকারীদের বললেন, “আমি এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় দেখি না যাতে তোমাদের অংশ অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করা হয়।” তাই উমর (রাযি.) প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি ‘আউল প্রয়োগ করেন এবং চারটি সুন্নি মাযহাব তার অনুসরণ করেন।
ইমামিয়্যাহ ‘আউল-এর অগ্রহণযোগ্যতার পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন, তারা বলেন, আল্লাহ (সুবহানাহু) কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন না যেখানে সম্পদের ভাগ এক-অর্ধাংশ এবং দুই-তৃতীয়াংশ বা এক-অষ্টমাংশ, এক-তৃতীয়াংশ এবং দুই-তৃতীয়াংশ হয়। কারণ এতে অজ্ঞতা এবং খেয়ালীপনা তার প্রতি আরোপ করা হয়, যা আল্লাহর মহিমার সাথে মানানসই নয়। তাই আলী (আ.) এবং তার ছাত্র আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তারা বলেছেন, “যিনি পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণার সংখ্যা জানেন, নিশ্চয়ই জানেন যে অংশগুলো কখনো ছয়টির বেশি হবে না।”
ইমামিয়্যাহ সবসময় কন্যা বা বোনদের অংশ কমান, আর স্বামী, স্ত্রী ও বাবা-মায়ের অংশ অপরিবর্তিত থাকে। কারণ কন্যা ও বোনদের জন্য একটিমাত্র নির্দিষ্ট অংশ উল্লেখ করা হয়েছে; স্বামী, স্ত্রী বা মাতার মতো তাদের জন্য উচ্চতর নির্দিষ্ট অংশ থেকে নিম্নতর নির্দিষ্ট অংশে নেমে যাওয়ার পৃথক স্তর নির্ধারিত নেই। তারা একজন পুরুষ উত্তরাধিকারীর অনুপস্থিতিতে ভাগীদার হিসেবে এবং তার উপস্থিতিতে রেসিডুয়ারি হিসেবে উত্তরাধিকার পায়। মাঝে মাঝে তারা পুরুষ উত্তরাধিকারীর সাথে একসাথে কম উত্তরাধিকার পায়।
তবে স্বামীর অংশ এক-অর্ধাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশে এবং স্ত্রীর অংশ এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-অষ্টমাংশে কমে যায়। মায়ের অংশ এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-ষষ্ঠাংশে এবং কিছু ক্ষেত্রে বাবার অংশ এক-ষষ্ঠাংশে কমে যায়। তাদের নির্ধারিত সর্বনিম্ন অংশ কখনো আরও কমে না এবং তা থেকে কিছুই কমানো হয় না। তাই যখন অংশগুলো মোট সম্পদের চেয়ে বেশি হয়, তখন এই সর্বনিম্ন সীমা থেকে শুরু করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ কন্যা বা বোনদের কাছে যায়।
আল-শাইখ আবু জুহরা আল-মিরাথ ‘ইন্দা আল-জাফারিয়্যাহ-তে ইবনে শিহাব আল-জুহরির উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যিনি বলেছেন, “যদি ন্যায়পরায়ণ নেতা উমর ইবনে আল-খাত্তাবের ফতোয়াকে ইবনে আব্বাসের ফতোয়ার উপর অগ্রাধিকার না দেওয়া হত, তাহলে ইবনে আব্বাসের মতামত এমন ছিল যা প্রতিটি আলেম অনুসরণ করতেন এবং তার উপর ইজমা সংঘটিত হত।” ইমামিয়্যাহ ইবনে আব্বাসের মতামত গ্রহণ করেছেন, যা ইবনে শিহাব আল-জুহরি দ্বারা প্রমাণিত যে এটি একটি উত্তম নিয়ম।
উদ্ধৃত গ্রন্থের “আউল কেবল তখনই ঘটে যখন স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকে”—বাক্যটি সুন্নি আউলের সাধারণ নিয়ম হিসেবে ভুল। সরাখসির আল-মাবসুত-এ মা, দুই সহোদর বোন ও মাতৃসূত্রের দুই বোনের উদাহরণে স্বামী–স্ত্রী ছাড়াই ৬ থেকে ৭-এ আউল দেখানো হয়েছে। এই পরিবারের পূর্ণ হিসাব আগের পরিচ্ছেদে দেওয়া হয়েছে। ফলে গ্রন্থটির এই সাধারণীকরণ এবং তার বর্ণিত নির্দিষ্ট পারিবারিক উদাহরণগুলোর হিসাব পৃথকভাবে বিচার্য। [17]
এবারে আসুন বিখ্যাত ফতোয়ার ওয়েবসাইট ইসলামওয়েব থেকে এই সম্পর্কে পড়ি, [18]

The origion of ‘Awl in inheritance law
222526
2-10-2013 – Thul-Qi’dah 28, 1434
515
Question
Assalamu Alaykum, Scholars apply concept of Awl when the total inheritance shares shoots up more than what is available. Is there any Marfoo’ ahadith which says that the Prophet(pbuh) applied the doctrine of Awl. Why Allah mentioned shares in the Quran in such a way that in many cases, when we add up becomes greater than what is available?. Please explain.
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, is His Slave and Messenger.
There is no Hadeeth reported from the Prophet, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, that indicates that he, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, applied ‘Awl (which means that the shares of inheritors exceed the whole of the inheritance) regarding the issues of inheritance. However, he sallallaahu ‘alayhi wa sallam, urged us to act according to the Sunnah (way) of the rightly-guided caliphs and stated that that Sunnah and the consensus of scholars are sources of legislation, saying: “You must follow my Sunnah and that of the rightly-guided caliphs. Abide by it and hold on tight to it [as if] with your molar teeth…” [Abu Daawood, At-Tirmithi, Al-Haakim who graded it Saheeh (sound), and Ath-Thahabi and Al-Albaani agreed with him]
He, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, also said: “Allaah will not cause my Ummah (or he said: the Ummah of Muhammad) to agree on misguidance; and the Hand of Allaah is with the Jamaa’ah (the group which follows the Quran and authentic Sunnah); and whoever deviates from that will be in Hell.” [At-Tirmithi]
The Prophet, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, also said: “I asked my Lord for four things and He gave me three and refused to give me the fourth. I asked my Lord not to let my nation agree on misguidance and He gave me that……” [Ahmad narrated it as Marfoo‘, i.e. traceable to the Prophet sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention )]
‘Awl was applied by the rightly-guided caliph ‘Umar may Allaah be pleased with him and the Companions during his time agreed with that. However, Ibn ‘Abbaas may Allaah be pleased with him held another opinion after the death of ‘Umar, an opinion that has become nearly obsolete. Ibn Qudaamah said in Al-Mughni: “The opinion of applying ‘Awl has been adopted by all Muslim scholars except Ibn ‘Abbaas and a small group that held another opinion… We do not know at the present time anyone who adopts the opinion of Ibn ‘Abbaas. We do not know of any disagreement among the jurists of the Islamic states regarding applying ‘Awl. All perfect praise be to Allaah.”
The cause of ‘Awl presented itself during the time of the rightly-guided caliph ‘Umar ibn Al-Khattaab may Allaah be pleased with him. It was stated in the Al-Mawsoo‘ah Al-Fiqhiyyah:
“The first case of ‘Awl was for a woman who died and left behind a husband and two sisters. This occurred during the beginning of the caliphate of ‘Umar. He consulted the Companions and said: “By Allaah, I do not know which of you comes first and which comes next. If I start with the husband and give him his right in full, the two sisters will not take their right in full; and if I start with the two sisters and give them their right in full, the husband will not take his right in full.” According to the most recognized accounts, Al-‘Abbaas ibn ‘Abdul Muttalib may Allaah be pleased with him suggested that he could apply ‘Awl. Other accounts have it that it was ‘Ali ibn Abi Taalib or Zayd ibn Thaabit. It was narrated that Al-‘Abbaas said: “O Leader of the Believers, tell me: If a man passed away and left six dirhams, and he owed three dirhams to one man and four to another, what would you do? Would you not make the wealth into seven parts?” He said, “Yes.” Upon this, Al-‘Abbaas said: “It is the same thing.” Thus, ‘Umar applied the principle of ‘Awl.”
This is indeed justice because if the deceased is in debt to some persons and leaves wealth that cannot pay off his debt, it will not be fair to give some of them while depriving the others. Rather, what justice dictates is to decrease the share of each. Thus, someone who is entitled to one third of the total debt should take one-third of the existing assets, and someone who is entitled to one-sixth should take one-sixth of the existing assets, and so on.
Ibn Al-Qayyim may Allaah have mercy upon him said in I‘laam Al-Muwaqqi‘een: “The Companions applied ‘Awl in inheritance and applied decrease to all heirs by drawing analogy from the decrease applied to the shares of creditors in case where the total assets of a bankrupt person cannot pay off all entitlements. Moreover, the Prophet, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, said to creditors: ‘Take what you find and that is all that you are entitled to.’ This is pure justice, while exclusively depriving some creditors and giving some of them their full share is not just.”
Indeed, the principle of ‘Awl reflects the beauty of Islam in terms of its justice in matters and its suitability for dealing with new developments.
Allaah Knows best.
বঙ্গানুবাদঃ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয়, এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর দাস ও রাসূল।
কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি যে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মীরাসের ক্ষেত্রে ‘আউল (যা উত্তরাধিকারীদের অংশ মোট সম্পদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়) প্রয়োগ করেছেন। তবে তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে খলিফায়ে রাশেদীনদের সুন্নাহ অনুযায়ী চলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে তাদের সুন্নাহ ও বিদ্বানদের ইজমা শরিয়তের উৎস। তিনি বলেন: “তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাহ এবং খলিফায়ে রাশেদীনদের সুন্নাহ অনুসরণ করবে। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, যেন তোমরা তোমাদের কশ দাঁত দিয়ে এটি ধরে রেখেছো…” [আবু দাউদ, তিরমিজী, আল-হাকিম (যিনি এটিকে সহীহ বলেছেন) এবং তার সঙ্গে ইমাম যাহাবী ও শাইখ আলবানী একমত হয়েছেন]।
তিনি আরও বলেন: “আল্লাহ আমার উম্মাহকে (বা তিনি বলেছেন: মুহাম্মাদের উম্মাহ) পথভ্রষ্টতার ওপর ঐক্যবদ্ধ হতে দেবেন না; এবং আল্লাহর হাত জামাআতের সঙ্গে থাকে; আর যে কেউ তা থেকে বিচ্যুত হবে, সে জাহান্নামে থাকবে।” [তিরমিজী]
আরও বলেছেন: “আমি আমার প্রভুর কাছে চারটি বিষয় চেয়েছিলাম, যার মধ্যে তিনটি আমাকে দেওয়া হয়েছে এবং একটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমি আমার প্রভুর কাছে আবেদন করেছিলাম যেন আমার জাতি পথভ্রষ্টতায় একমত না হয়, এবং তিনি আমাকে সেটি দিয়েছেন…” [আহমাদ মারফু‘ হিসেবে এটি বর্ণনা করেছেন, অর্থাৎ যার বর্ণনাসূত্র নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত সম্পৃক্ত]।
‘আউল প্রথমবার খলিফায়ে রাশেদীন উমর (রাযি.) এর শাসনকালে প্রয়োগ করা হয়, এবং সেসময়ের সাহাবিগণ এতে সম্মত হন। তবে ইবনে আব্বাস (রাযি.) উমর (রাযি.) এর মৃত্যুর পর ভিন্ন মত পোষণ করেন, যা পরে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইবনে কুদামাহ আল-মুগনীতে বলেছেন: “‘আউল প্রয়োগের মতামত সকল মুসলিম ফকিহগণের মধ্যে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য হয়েছে, ইবনে আব্বাস এবং কিছু ক্ষুদ্র দল ছাড়া… বর্তমানে আমরা জানি না যে ইবনে আব্বাসের মতামত কেউ অনুসরণ করেন। ‘আউল প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের ফকিহদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।”
প্রথমবার ‘আউল-এর প্রয়োগ খলিফা উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রাযি.) এর শাসনকালে ঘটে। আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহতে বলা হয়েছে:
“প্রথম ‘আউল এর ঘটনা ঘটে এক মহিলার ক্ষেত্রে, যিনি স্বামী ও দুই বোন রেখে যান। এটি উমরের (রাযি.) খেলাফতের শুরুর সময় ঘটে। তিনি সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন এবং বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি জানি না কে আগে আসে আর কে পরে আসে। যদি আমি স্বামীকে পুরো অধিকার দেই, তবে দুই বোন তাদের অধিকার পুরো পাবেন না; আর যদি আমি দুই বোনকে পুরো অধিকার দেই, তবে স্বামী তার অধিকার পুরো পাবেন না।’ সর্বাধিক স্বীকৃত বর্ণনা অনুযায়ী, আল-আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাযি.) তাকে ‘আউল প্রয়োগের পরামর্শ দেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, এই পরামর্শ দিয়েছিলেন আলী ইবনে আবি তালিব অথবা যায়দ ইবনে সাবিত। বর্ণিত হয়েছে, আল-আব্বাস বলেছিলেন, “হে আমিরুল মুমিনিন, বলুন তো, কোনো ব্যক্তি মারা গিয়ে ছয় দিরহাম রেখে গেলে এবং একজনের কাছে তার তিন দিরহাম ও অন্যজনের কাছে চার দিরহাম ঋণ থাকলে আপনি কী করতেন? সম্পদটিকে কি সাত অংশ করতেন না?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” তখন আল-আব্বাস বললেন, “এটিও একই বিষয়।” ফলে উমর আউলের নীতি প্রয়োগ করলেন।”
এটি প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার; কারণ মৃত ব্যক্তি কয়েকজনের কাছে ঋণী হলে এবং রেখে যাওয়া সম্পদ দিয়ে তার সব ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব না হলে কাউকে দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা ন্যায়সংগত হবে না। বরং ন্যায়বিচারের দাবি হলো প্রত্যেকের অংশ কমানো। ফলে মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের দাবিদার বিদ্যমান সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ নেবে এবং এক-ষষ্ঠাংশের দাবিদার বিদ্যমান সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ নেবে; অন্যদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন-এ বলেছেন, “সাহাবিরা উত্তরাধিকারে আউল প্রয়োগ করেছেন এবং সব উত্তরাধিকারীর অংশে ঘাটতি প্রবেশ করিয়েছেন। দেউলিয়া ব্যক্তির মোট সম্পদ দিয়ে সব দাবি পূরণ করা সম্ভব না হলে ঋণদাতাদের অংশ কমানোর সঙ্গে সাদৃশ্য বিচার করে তারা এটি করেছেন। তদুপরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঋণদাতাদের বলেছেন, ‘তোমরা যা পাও তা নিয়ে নাও; এর বেশি তোমাদের প্রাপ্য নেই।’ এটি বিশুদ্ধ ন্যায়বিচার। কিছু ঋণদাতাকে পুরো প্রাপ্য দিয়ে অন্যদেরই বঞ্চিত করা ন্যায়বিচার নয়।”
বস্তুত আউলের নীতি বিষয়গুলোর ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি এবং নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার উপযুক্ততার ক্ষেত্রে ইসলামের সৌন্দর্য প্রতিফলিত করে।
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
জাকির নায়েকের যুক্তি: বণ্টনের ক্রম বদলে কি সমস্যা মেটে?
জাকির নায়েক-ধাঁচের BODMAS যুক্তিটি আসলে সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাকে আড়াল করার একটি অত্যন্ত দুর্বল কৌশল বা বলা ভাল, নির্লজ্জ মিথ্যাচার। কোরআনের উত্তরাধিকার আয়াত কোনো বীজগাণিতিক সমীকরণ নয়, যেখানে bracket, division, multiplication, addition, subtraction-এর ক্রম না জানলে ভুল উত্তর আসবে। এখানে বিষয়টি অত্যন্ত সরল: কোরআন নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ ঘোষণা করেছে। স্ত্রী ১/৮, পিতা ১/৬, মাতা ১/৬, দুই বা ততোধিক কন্যা ২/৩—এগুলো যদি মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তির অংশ হয়, তাহলে এদের যোগফল কোনোভাবেই ১ বা ১০০% ছাড়াতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে যোগ করলে দাঁড়ায় ১/৮ + ১/৬ + ১/৬ + ২/৩ = ২৭/২৪, অর্থাৎ ১১২.৫%। এখানে BODMAS টেনে আনা নিছক বাগাড়ম্বর; এটি গাণিতিক আপত্তির জবাব নয়।
আসুন জাকির নায়েকের বক্তব্য শুনি, যিনি সম্পূর্ণ মিথ্যাচারের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফুল ভিডিও ট্রান্সক্রিপ্টঃ
Brother has posed the question that according to Arun Shourie, in the Qur’an, in chapter 4, verses 11 and 12, if you add up the different parts of inheritance given to the heirs, the sum total becomes more than one. Therefore, Arun Shourie claims that the author of the Qur’an does not know mathematics.
As I mentioned in my talk, there are hundreds of people who have tried to find faults in the Qur’an. But if you analyze all of them, they are not true. None of them are true. Not a single one is true.
Regarding inheritance, the Qur’an speaks about inheritance in several places: in Surah Al-Baqarah, chapter 2, verse 180; Surah Al-Baqarah, chapter 2, verse 240; Surah An-Nisa, chapter 4, verse 9; Surah An-Nisa, chapter 4, verse 19; Surah Al-Ma’idah, chapter 5, verse 105; and in several other places.
But regarding the detailed explanation of the shares, it is mentioned in the Qur’an in Surah An-Nisa, chapter 4, verses 11 and 12, and in Surah An-Nisa, chapter 4, verse 176.
Regarding the translation of the verses quoted by Arun Shourie, that is Surah An-Nisa, chapter 4, verses 11 and 12, it says that regarding the shares of inheritance for your children, the male gets a share equal to that of two females. If there are only daughters, two or more, they share two-thirds. If there is only one daughter, she gets half.
The verse continues: regarding the parents, each gets one-sixth if the deceased has children. If there are no children, then the mother gets one-third, after payment of legacies and debts.
Verse 12 says that regarding what your wives leave, you get half if there are no children, and one-fourth if there are children, after payment of debts and legacies. Regarding what you leave for your wives, they get one-fourth if there are no children, and one-eighth if there are children.
It may sound confusing. Do not get confused; you can go home and refer to it.
In short, in verse 11 of Surah An-Nisa, chapter 4, the first share mentioned is that of the children, then of the parents, and later in verse 12 it gives the share of the spouses.
Now regarding inheritance, Islam speaks in great detail. The Qur’an only gives the basic outline. For the details, you have to refer to the hadith. A person can spend his full life only doing research on inheritance, and Arun Shourie expects to know about this just by quoting two verses.
It is somewhat similar to a person who wants to solve an arithmetic equation but does not know basic arithmetic. That is bad mathematics.
According to the rule of BODMAS, irrespective of whichever arithmetic sign comes first or last, first you have to solve the brackets, then division, then multiplication, then addition, and then subtraction. If you do not know the rule of BODMAS and you first do subtraction, then multiplication, then addition, and then solve the brackets, you will surely get the answer wrong.
In the same way, Arun Shourie himself does not know mathematics, because according to Islamic law for the division of inheritance, the first share goes to the spouses and the parents. After that, whatever remains is shared between the children.
If you follow this rule, the sum total can never be more than 100 percent.
আসুন ভিডিওটি দেখি,
“আগে স্বামী/স্ত্রী ও পিতা-মাতার অংশ দাও, তারপর বাকি সম্পত্তি সন্তানদের দাও”—এই যুক্তিও সরাসরি কোরআনের ঘোষিত অংশকে বাতিল করে। কারণ কোরআন কন্যাদের “বাকি যা থাকে” দিতে বলেনি; বলেছে দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা ২/৩ পাবে। এখন স্ত্রী, পিতা, মাতা ও দুই কন্যার উদাহরণে স্ত্রী-পিতা-মাতাকে আগে দিলে অবশিষ্ট থাকে ১৩/২৪। কিন্তু কোরআন অনুযায়ী কন্যাদের পাওয়ার কথা ১৬/২৪। তাহলে প্রশ্নটি স্পষ্ট: কন্যারা কি কোরআনের ১৬/২৪ পাবে, নাকি এপোলোজিস্টদের বাঁচানো ১৩/২৪ পাবে? যদি ১৬/২৪ পায়, মোট সম্পত্তি ২৭/২৪ হয়ে যায়। আর যদি ১৩/২৪ পায়, তাহলে কোরআনের ২/৩ অংশ মিথ্যা হয়ে যায়। এই দ্বন্দ্ব থেকে পালানোর কোনো সৎ পথ নেই।
এই যুক্তির সবচেয়ে হাস্যকর দিক হলো—এপোলোজিস্টরা গাণিতিক ভুল ঢাকতে গিয়ে উল্টো নিজেরাই স্বীকার করে নেয় যে কোরআনের ভগ্নাংশগুলো সরাসরি কার্যকর করা যায় না। তারা বলে, কোরআন “basic outline” দিয়েছে, বিস্তারিত ফিকহে আছে। কিন্তু অভিযোগ তো ফিকহের বই নিয়ে নয়; অভিযোগ কোরআনের নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলো নিয়ে। যদি সর্বজ্ঞ ঈশ্বর ১/৮, ১/৬, ১/৬, ২/৩ বলে দেন, তাহলে সেই সংখ্যাগুলো যোগ করলে ১১২.৫% হওয়া উচিত নয়। পরে উমর, ফকিহ, মাজহাব বা আউল এসে সেটিকে ১০০%-এ নামিয়ে আনতে পারে—কিন্তু সেটি মূল গাণিতিক অসামঞ্জস্যের সমাধান নয়; সেটি মূল সমস্যার পরবর্তী মানবিক প্যাচ।
সুতরাং BODMAS যুক্তি একটি স্পষ্ট red herring এবং category error। এটি উত্তরাধিকার-গণিতের প্রশ্নকে arithmetic-order-এর প্রশ্নে বদলে দেয়, যেন শ্রোতারা আসল সমস্যাটি ভুলে যায়। আসল সমস্যা এখনো আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে: কোরআন যে fixed shares দিয়েছে, সেগুলো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এপোলোজিস্টরা যতই “ক্রম”, “ফিকহ”, “হাদিস”, “basic outline” বা “গভীর জ্ঞান” শব্দ ব্যবহার করুক, ২৭/২৪ কখনো ১ হয় না। ১১২.৫% সম্পত্তি বণ্টন করা যায় না। এই সরল সত্যই পুরো এপোলোজেটিক কাঠামোকে ভেঙে দেয়।
আলেম আসিমের যুক্তি: সংশোধন স্বীকার, ভুল অস্বীকার
এবারে আসুন একজন প্রখ্যাত সালাফি আলেম আসিমের বক্তব্য পড়ি। তার মূল বক্তব্যঃ
So my question was about inheritance in the Qur’an, specifically the ratios. I know this is mentioned in Surah An-Nisa, verse 11, but many non-Muslims are saying that this verse is an example of a mistake in the Qur’an.
For example, they give a case where a man dies with one hundred dollars and leaves behind a wife, three daughters, and parents. The shares would be one-eighth to the wife, two-thirds to the daughters, and one-sixth to each of the parents. But when you add these up, they do not equal one hundred dollars. They become more than one hundred percent, so we would need to give one hundred and twelve and a half dollars.
So my question is: how would such a situation be solved, and how can we respond to people who say this is a mistake?
First of all, we address the non-Muslims and say to them: is this the only mistake you found in the whole of Islam? Eureka! That is good. That is fine. And we will have an answer for that as well.
But if it is the only mistake, would it be logical that the 99.9 percent which is all correct, valid, and foolproof would be covered and overwhelmed by this single mistake that your minds could not comprehend?
Or, if we look at your own religion and find that it is 75 percent filled with errors, or even 60 percent filled with errors and 40 percent correct, what logic and what ratio are you talking about?
What you have mentioned, along with other cases in the laws of inheritance, is solved by, if I am not mistaken, the word “awl.” It means recalculating the percentages, because this is an offshoot—something that is not normal or regular.
So they deduct proportionally from all the parties so that the shares would be equivalent and the ratio would remain the same. This is a correction that the Companions did, may Allah be pleased with them, and they never doubted the Qur’an or the Sunnah. The Tabi‘in and Muslims for fifteen centuries have been applying it. It is not something new.
It is also found in some cases when the wife and the parents are left, or when the husband and the parents are left; when the wife dies or the husband dies. There is also a form of correction between the ratio of the father and the mother of the deceased, where it should have been different.
This is all fixed and known by the Companions, and there is consensus among the Companions and the Muslims regarding fixing this ratio. So there is no mistake.
And again, we say to the non-Muslims: is this the only thing you found wrong in the Shariah? Alhamdulillah. The other overwhelming correct, logical, fair, and just rules of Shariah should overwhelm this thing that your head could not comprehend.
ভিডিওটি আসুন দেখি,
এই আলেমের বক্তব্যে প্রথমেই একটি স্পষ্ট কুযুক্তি দেখা যায়: “পুরো ইসলামে কি এই একটাই ভুল পেয়েছ?”—এটি কোনো জবাব নয়, এটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। একটি ব্যবস্থায় ৯৯টি দাবি সঠিক হলেও একটি নির্দিষ্ট দাবির গাণিতিক ভুল ভুলই থাকে। গণিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোট চলে না। ১/৮ + ২/৩ + ১/৬ + ১/৬ = ২৭/২৪ হলে সেটি ১ হয় না, ১১২.৫% হয়। তাই “অন্য সব ঠিক আছে” বা “তোমাদের ধর্মে আরও ভুল আছে”—এসব tu quoque ও red herring। এগুলো উত্তরাধিকার-গণিতের মূল সমস্যাকে এক বিন্দুও খণ্ডন করে না।
বরং বক্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি হলো তিনি নিজেই বলেছেন, এই সমস্যার সমাধান হলো “আউল”—অর্থাৎ percentages পুনরায় গণনা করা এবং প্রত্যেকের অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া। এটিই আসল পয়েন্ট। যদি কোরআনের ঘোষিত ভগ্নাংশগুলো নিজে থেকেই নিখুঁত ও সরাসরি প্রয়োগযোগ্য হতো, তাহলে পরে “recalculating the percentages” দরকার হতো না। স্ত্রী ১/৮ পাবে বলা হলে বাস্তবে তাকে ১/৯ দেওয়া, কন্যাদের ২/৩ বলা হলে বাস্তবে কম দেওয়া—এগুলো তাফসির নয়; এগুলো সংখ্যাগত সংশোধন। আলেমটি “correction” শব্দ ব্যবহার করে অজান্তেই মূল অভিযোগকে শক্তিশালী করেছেন।
“সাহাবিরা করেছেন”, “তাবেঈনরা করেছেন”, “১৫ শতাব্দী ধরে মুসলিমরা করছে”, “ইজমা আছে”—এসবও গাণিতিক সমস্যার উত্তর নয়। ঐতিহ্য কোনো ভগ্নাংশকে বদলে দিতে পারে না। হাজার বছর ধরে কেউ ২৭/২৪-কে ১ বললেও ২৭/২৪ কখনো ১ হয় না। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম ফকিহরা আউল পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন—এটি প্রমাণ করে যে একটি ব্যবহারিক আইনগত প্যাচ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি প্রমাণ করে না যে মূল কোরআনিক ভগ্নাংশগুলো গাণিতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। বরং আউলের প্রয়োজনীয়তাই দেখায় যে সরাসরি আয়াত-নির্ধারিত অংশগুলো নির্দিষ্ট বাস্তব কেসে একসাথে কার্যকর করা যায় না।
সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো বক্তার শেষ দাবি—“তোমাদের মাথা বুঝতে পারেনি।” এটি যুক্তি নয়, অহংকারী হাত নাড়ানো। সমস্যা বোঝার জন্য জটিল ফিকহ লাগে না; সাধারণ ভগ্নাংশের যোগ জানলেই যথেষ্ট। কোরআন যদি নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ দেয়, তাহলে সেই অংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হতে পারে না। আর যদি বেশি হয়, তবে দুটি পথ: হয় কোরআনিক অংশগুলো কমাতে হবে, নয়তো অসম্ভব ১১২.৫% সম্পত্তি বানাতে হবে। আউল প্রথম পথটাই নেয়—অর্থাৎ কোরআনের ঘোষিত অংশগুলোকে বাস্তবে কমিয়ে দেয়। তাই এই বক্তব্য কোরআনের উত্তরাধিকার-সমস্যা খণ্ডন করে না; বরং নিজেই স্বীকার করে যে সমস্যাটি ফিকহি “correction” ছাড়া চালানো যায় না।
আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আলেম নিজেই বক্তব্যের মাঝখানে আসল সত্যটি স্বীকার করে ফেলেছেন: এটি ছিল “a correction that the Companions did”—অর্থাৎ সাহাবিরা একটি সংশোধন করেছিলেন। এই স্বীকারোক্তিই পুরো এপোলোজেটিক যুক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ যদি কোরআনের উত্তরাধিকার-হিসাব শুরু থেকেই নিখুঁত, সম্পূর্ণ ও গাণিতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো, তাহলে সাহাবিদের “সংশোধন” করার কোনো প্রয়োজনই থাকত না। সংশোধন শব্দটি নিজেই প্রমাণ করে যে মূল বিধান সরাসরি প্রয়োগ করলে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল, এবং সেই সমস্যা মেটাতে পরবর্তী মানবিক আইনগত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। সাহাবিরা করেছেন বলেই সেটি ভুল নয়—এই যুক্তি হাস্যকর; বরং সাহাবিদের সংশোধন করতেই হয়েছে, এটাই দেখায় যে কোরআনিক ভগ্নাংশগুলো নির্দিষ্ট বাস্তব কেসে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। সংশোধন তখনই দরকার হয়, যখন মূল নিয়ম সরাসরি প্রয়োগ করলে ফল মেলে না।
আউলের গাণিতিক ফল ও নসের সঙ্গে সংঘাত
কোরআনের সূরা নিসায় বর্ণিত উত্তরাধিকার-বণ্টনের হারগুলো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে; অর্থাৎ নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল ১ বা ১০০% ছাড়িয়ে যায়। প্রত্যেক ভগ্নাংশকে একই মোট সম্পত্তির অংশ হিসেবে কার্যকর করতে গেলে সেই সম্পত্তির বাইরেও অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন পড়ে। যেমন: একজন মৃত ব্যক্তির স্বামী এবং দুই বোন থাকলে অংশ হয়:
গাণিতিকভাবে ১ এর বেশি সম্পত্তি বণ্টন করা অসম্ভব। এই ত্রুটি নিরসনে খলিফা উমর ‘আউল’ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যা মূলত একটি গাণিতিক রি-স্কেলিং (Rescaling)। কিন্তু এটি করতে গিয়ে কোরআনের সুনির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলোকে পরিবর্তন করতে হয় [2]।
ইসলামি আইনের মূলনীতি হলো— “লা ইজতিহাদা ফি মাওরিদিন নস”। সুস্পষ্ট ও অকাট্য নসে নির্ধারিত বিধানকে ইজতিহাদ দিয়ে বদলানো যায় না। ‘আউল’ পদ্ধতি প্রয়োগ করার অর্থ হলো—বাস্তবতার প্রয়োজনে কোরআনের ‘নস’ বা অকাট্য বিধানকে সংশোধন করা। এটি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া যে, মূল টেক্সটের গাণিতিক নকশাটি প্রয়োগযোগ্য নয়।
আল্লাহর নির্ধারিত অংশ ও খলিফার সংশোধিত বণ্টন
হযরত উমরের শাসনামলে যেই বিধানটি প্রবর্তন হয়েছিল, সেটি আল্লাহর দেওয়া কোরআনের বিধানের সাথে স্পষ্টতই আলাদা একটি বিধান। তাহলে একজন ঈমানদার মুসলিম আল্লাহর বিধান মানবে, নাকি উমরের বিধান? আসুন আহমদুল্লাহর একটি বক্তব্য শুনি,
সামঞ্জস্যপূর্ণ বণ্টনের দুটি বিকল্প নকশা
সূরা নিসা ৪:১১: বণ্টনবিধির সারাংশ
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে নির্দেশ দেন: পুরুষের ভাগ নারীর দ্বিগুণ। যদি কেবল কন্যা থাকে দুই বা ততোধিক, তবে তারা পাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। যদি একজন কন্যা থাকে, তবে সে পাবে অর্ধেক। মৃতের বাবা-মা যদি জীবিত থাকে: প্রত্যেকে পাবে এক-ষষ্ঠাংশ যদি তার সন্তান থাকে। সন্তান না থাকলে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিশ হলে মা পাবে এক-তৃতীয়াংশ; আর মৃতের ভাই-বোন থাকলে মা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ…” ইত্যাদি।
এখানে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভাগ আছে, এবং একাধিক স্থানে ভগ্নাংশের যোগফল ১-এর বেশি বা কম হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো—এই সমস্যা এড়িয়ে এমন একটি বিধান লেখা কি আদৌ সম্ভব ছিল, যেখানে প্রত্যেক বৈধ পারিবারিক বিন্যাসের জন্য আগে থেকেই সম্পূর্ণ বণ্টনবিধি নির্ধারণ করে যোগফল গাণিতিকভাবে ঠিক ১ রাখা যাবে—কোনো পরবর্তী “আউল” বা “রদ্দ” প্যাচ ছাড়াই? উত্তর হলো, হ্যাঁ, এবং এর অন্তত দুটি স্বতন্ত্র নকশা-দর্শন সম্ভব ছিল। নিচে দুটোই দেখানো হলো, এবং আগের আলোচিত সমস্যাযুক্ত উদাহরণগুলোতে (স্বামী+দুই বোন, স্ত্রী+পিতা-মাতা+দুই কন্যা, আবুল মিয়ার কেস) পরীক্ষা করে দেখানো হলো।
নকশা এক: স্থির অংশের পরে অবশিষ্ট বণ্টন
এই মডেলের নীতি সরল: ওয়ারিশদের দুটি স্তরে ভাগ করা হবে।
| বণ্টনের স্তর | নিয়ম |
|---|---|
| স্তর ১ (স্থির অংশীদার): | স্বামী/স্ত্রী এবং পিতা-মাতা—এদের অংশ সবসময় মোট সম্পত্তি থেকে সরাসরি ও অপরিবর্তনীয়ভাবে কাটা হবে। |
| স্তর ২ (অবশিষ্টভোগী): | সন্তান (বা সন্তান না থাকলে ভাই-বোন)—স্তর ১ কেটে নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, তারা ঠিক ততটুকুই পাবে। কোরআনে উল্লেখিত “দুই-তৃতীয়াংশ” বা “অর্ধেক” সংখ্যাটি তখন একটি প্রত্যাশিত নির্দেশিকা হবে, পরম গ্যারান্টি নয়। |
আয়াতটি যদি এভাবে লেখা হতো:
“স্বামী বা স্ত্রীর অংশ এবং পিতা-মাতার অংশ সর্বদা সম্পূর্ণ ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে সরাসরি নির্ধারিত হবে। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা সন্তানদের মধ্যে বণ্টিত হবে—পুত্র কন্যার দ্বিগুণ অংশ পাবে। সন্তান না থাকলে অবশিষ্ট অংশ ভাই-বোনের মধ্যে একই নীতিতে বণ্টিত হবে।”
তাহলে হিসাব দাঁড়াতো এভাবে:
কেস ১ — স্বামী + দুই বোন (ভাই নেই):
স্বামী (স্তর ১) = ১/২। বোনেরা (স্তর ২, অবশিষ্ট) = ১ − ১/২ = ১/২।
যোগফল = ১/২ + ১/২ = ১ ✓
(বোনেরা এখানে “দুই-তৃতীয়াংশ”-এর বদলে বাস্তবে ১/২ পাবে, কিন্তু কোনো ওভারফ্লো তৈরি হচ্ছে না, এবং কোনো উমরকে পরে এসে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে না—নিয়মটাই শুরু থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ)
কেস ২ — স্ত্রী + পিতা-মাতা + দুই কন্যা:
স্তর ১: স্ত্রী ১/৮ (= ৩/২৪), পিতা ১/৬ (= ৪/২৪), মাতা ১/৬ (= ৪/২৪)। মোট স্তর ১ = ১১/২৪।
স্তর ২ (কন্যা): অবশিষ্ট = ২৪/২৪ − ১১/২৪ = ১৩/২৪।
যোগফল = ১১/২৪ + ১৩/২৪ = ১ ✓
কেস ৩ — আবুল মিয়া (পিতা-মাতা + স্ত্রী + তিন কন্যা, সম্পত্তি ১০০ টাকা):
স্তর ১: পিতা-মাতা ১/৩ = ৩৩.৩৩ টাকা, স্ত্রী ১/৮ = ১২.৫০ টাকা। মোট = ৪৫.৮৩ টাকা।
স্তর ২: কন্যারা অবশিষ্ট = ১০০ − ৪৫.৮৩ = ৫৪.১৭ টাকা।
যোগফল = ১০০ টাকা, ঠিক যত সম্পত্তি রেখে গেছেন তত-ই ✓, কোনো ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত তৈরি হচ্ছে না।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই মডেলে স্তর ১-এর ওয়ারিশরা (স্বামী/স্ত্রী, পিতা-মাতা) সবসময় পূর্ণ ও অপরিবর্তিত অংশ পান—একটি নিশ্চিত ফ্লোর (floor) থাকে তাদের জন্য। কিন্তু সন্তানদের কোনো নিশ্চিত ন্যূনতম নেই; পরিস্থিতিভেদে তাদের অংশ ওঠানামা করে।
এই ধরনের নকশাকে পূর্ণাঙ্গ আইন করতে হলে প্রথম স্তরের প্রত্যেক পারিবারিক অবস্থার ভাগও আগেই নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই স্তরের মোট বরাদ্দ ১-এর বেশি হওয়া নিষিদ্ধ রাখতে হবে। দ্বিতীয় স্তরের কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে অবশিষ্ট কার কাছে যাবে, সেটিও বিধানে লেখা থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, অবশিষ্ট নির্দিষ্ট অনুপাতে প্রথম স্তরের জীবিত প্রাপকদের ফেরত দেওয়া অথবা নির্ধারিত জনকল্যাণ তহবিলে দেওয়ার মধ্যে একটি নিয়ম শুরুতেই বেছে নেওয়া যায়। কোনো পারিবারিক ওয়ারিশই না থাকলে পুরো সম্পত্তির নির্ধারিত প্রাপকও একই আইনে উল্লেখ থাকবে। তখন প্রথম স্তরের বরাদ্দকে ক ধরলে, দ্বিতীয় স্তর বা নির্ধারিত বিকল্প প্রাপকের বরাদ্দ হবে ১−ক; মোট বণ্টন ক+(১−ক)=১। এখানে শেষ পর্যায়ের নিয়মটি পূর্বঘোষিত আইনের অংশ, সংকট দেখা দেওয়ার পরে আমদানি করা অঘোষিত সংশোধনী নয়।
নকশা দুই: ঘোষিত ওজনের আনুপাতিক বণ্টন
দ্বিতীয় নকশায় প্রতিটি ওয়ারিশ-শ্রেণিকে একটি নির্দিষ্ট ওজন (weight) দেওয়া হবে, সরাসরি ভগ্নাংশ নয়। চূড়ান্ত অংশ নির্ণিত হবে এই সূত্রে:
চূড়ান্ত অংশ = (নিজের ওজন) ÷ (উপস্থিত সকল ওয়ারিশের ওজনের সমষ্টি)
অন্তত একজন যোগ্য প্রাপক এবং প্রত্যেকের ধনাত্মক ওজন থাকলে এই সূত্রে যোগফল সবসময়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে, বীজগাণিতিক নিয়মেই ১ হবে—এটি কোনো পরবর্তী সংশোধনী নয়, বরং সূত্রের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য।
আয়াতটি যদি এভাবে লেখা হতো:
“আল্লাহ প্রত্যেক ওয়ারিশের জন্য একটি আপেক্ষিক অংশ-সংখ্যা (নিসাব) নির্ধারণ করেছেন। প্রকৃত বণ্টনকালে, উপস্থিত ওয়ারিশদের নিসাবসমূহ যোগ করে প্রত্যেকের নিসাবকে সেই সমষ্টি দ্বারা ভাগ করে প্রকৃত অংশ নির্ণয় করতে হবে, যেন সর্বমোট বণ্টন সম্পূর্ণ সম্পত্তির সমান হয়—না কম, না বেশি।”
আলোচিত উদাহরণগুলোর মূল ভগ্নাংশ থেকে সাধারণ হর ২৪ ধরে নিচের ওজনগুলো নেওয়া যায়। এটি এই উদাহরণগুলোর জন্য ব্যবহৃত ছক; পূর্ণাঙ্গ আইনে অন্য পারিবারিক অবস্থার যোগ্যতা ও ওজনও স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে:
| ওয়ারিশ | ওজন |
|---|---|
| স্বামী—এই উদাহরণে সন্তান নেই | ১২ |
| স্ত্রী (সন্তান থাকলে) | ৩ |
| পিতা—এই উদাহরণে সন্তান আছে | ৪ |
| মাতা—এই উদাহরণে সন্তান আছে | ৪ |
| দুই+ কন্যা (একত্রে) | ১৬ |
| দুই+ বোন (একত্রে) | ১৬ |
কেস ১ — স্বামী + দুই বোন:
ওজন: স্বামী ১২, বোনেরা ১৬। মোট ওজন = ২৮।
স্বামী = ১২/২৮ = ৩/৭, বোনেরা = ১৬/২৮ = ৪/৭। যোগফল = ১ ✓
(এই সংখ্যাগুলো লক্ষ করুন—এটি হুবহু সুন্নি মাযহাবের আউল-প্রয়োগের ফলাফল, ৩/৭ ও ৪/৭। পার্থক্য শুধু এই: এখানে সংখ্যাটি প্রথম থেকেই ঘোষিত সূত্রের ফল, উমরের পরবর্তী মানবিক সংশোধনী নয়)
কেস ২ — স্ত্রী + পিতা-মাতা + দুই কন্যা:
ওজন: স্ত্রী ৩, পিতা ৪, মাতা ৪, কন্যা ১৬। মোট = ২৭।
স্ত্রী = ৩/২৭, পিতা = ৪/২৭, মাতা = ৪/২৭, কন্যা = ১৬/২৭। যোগফল = ২৭/২৭ = ১ ✓
এই মডেলে কারো জন্য কোনো নিশ্চিত ফ্লোর নেই—প্রত্যেকেই আনুপাতিকভাবে সমন্বিত হয়, পরিস্থিতি যা-ই হোক।
ওজনের পদ্ধতিতে মোট ওজনকে ও এবং প্রত্যেক প্রাপকের ওজনকে ও₁, ও₂, … ধরলে সব অংশের যোগফল হয় (ও₁+ও₂+…)/ও = ও/ও = ১। এর জন্য সম্পত্তির ওপর প্রথমে স্বতন্ত্র নিশ্চিত ভগ্নাংশ চাপিয়ে পরে তা কাটার প্রয়োজন নেই। কোন ব্যক্তি উত্তরাধিকারী, কোন পরিস্থিতিতে তার কত ওজন এবং কোনো ওয়ারিশ না থাকলে সম্পত্তি কার কাছে যাবে—এই তিনটি বিষয় শুরুতেই নির্দিষ্ট করলে নিয়মটি সম্পূর্ণ হয়। ফলে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন লেখার সুযোগটি গাণিতিকভাবেই উপস্থিত ছিল।
দুই নকশার ফল: বিধানেই সমাধান লেখা সম্ভব
দুটো নকশাই প্রমাণ করে—যৌক্তিকভাবে এমন একটি টেক্সট লেখা সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল, যা কখনো ১ অতিক্রম করত না এবং যার জন্য পরবর্তীতে কোনো “আউল” বা “রদ্দ” জাতীয় সংশোধনী আবিষ্কারের প্রয়োজনই হতো না। এবং এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো: আলোচিত আউলযুক্ত উদাহরণগুলোতে নকশা একের সংখ্যাগত ফল ইবনে আব্বাসের অগ্রাধিকারভিত্তিক সমাধান ও ইমামি ফিকহের উল্লিখিত বণ্টনের সঙ্গে মেলে; নকশা দুইয়ের ফল মেলে উমরের আউলের সঙ্গে। অর্থাৎ ইতিহাসে যে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ফিকহি সমাধান তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর আলোচিত ফল দুটি ভিন্ন বণ্টননীতির মাধ্যমে পাওয়া যায়—যা মূল কোরআনের টেক্সটে কোথাও স্পষ্টভাবে ঘোষিত ছিল না।
এখানেই মূল যুক্তিটি সবচেয়ে জোরালো রূপ পায়। যদি কোরআনের টেক্সট নিজেই একটি নির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট গাণিতিক নকশা-নীতি (হয় “স্থির অংশ + অবশিষ্ট”, নয়তো “ওজন-অনুপাত”) ঘোষণা করত, তাহলে সাহাবিদের মধ্যে উমরের আমলে এমন দোটানা তৈরি হতো না, ইবনে আব্বাসের বিরোধিতারও প্রয়োজন হতো না, এবং শিয়া-সুন্নি ফিকহেও এত মৌলিক বিভাজন ঘটত না। বিধানটি দেয়ার পূর্বে শুধুমাত্র কয়েকটি কেইস স্টাডি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। সর্বজ্ঞানী আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিখুঁত গ্রন্থের তথাকথিত নিখুঁত বিধানে আর মানবীয় সংশোধনীর দরকার হতো না। বাস্তবে যা ঘটেছে তা হলো—মূল বিধান কোনো একক নকশা-নীতি বেছে নেয়নি; সেই পছন্দটি পরে, মানুষকেই করতে হয়েছে—এবং দুটি ভিন্ন মানবগোষ্ঠী দুটি ভিন্ন পছন্দে পৌঁছেছে। কোন অংশ অক্ষত থাকবে এবং কোন অংশ কমবে, সেই নির্বাচনের ওপরই উত্তরাধিকারীর বাস্তব প্রাপ্য নির্ভর করছে।
ইমামি ফিকহে আউল প্রত্যাখ্যান: ঘাটতি কার অংশে পড়বে?
ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের গাণিতিক জটিলতা নিরসনে শিয়া বা ইমামিয়্যাহ মাযহাবের অবস্থান অত্যন্ত কট্টর; তারা খলিফা উমর কর্তৃক প্রবর্তিত ‘আউল’ (Awl) নীতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। শিয়া ফকিহদের মতে, আল্লাহ যেহেতু সর্বজ্ঞ, তাই তাঁর দেওয়া বিধানে এমন কোনো গাণিতিক ভুল থাকা অসম্ভব যেখানে অংশগুলোর যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যায়। তারা মনে করেন, একই অংকে সবার অংশ সমানুপাতিক হারে কমিয়ে দেওয়া (যা সুন্নিরা করে) মূলত আল্লাহর সুনির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণের ‘নস’ বা অকাট্য বিধানকে লঙ্ঘন করার শামিল।
অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্তন: কন্যা ও বোনদের ভাগ
শিয়া ফিকহ অনুযায়ী, যখন অংশীদারদের ভাগের যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যায়, তখন সবার অংশ না কমিয়ে কেবল নির্দিষ্ট কিছু ওয়ারিশের (যেমন: কন্যা বা বোন) অংশ থেকে সেই ঘাটতিটুকু কমানো হয়। শিয়াদের যুক্তি হলো—উত্তরাধিকারীদের দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
| উত্তরাধিকারীর শ্রেণি | বণ্টনের নীতি |
|---|---|
| অপরিবর্তনীয় অংশীদার (Fixed Heirs): | যাদের অংশ কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ প্রদত্ত সীমার নিচে নামতে পারে না (যেমন: মা, বাবা, স্বামী বা স্ত্রী)। |
| পরিবর্তনশীল অংশীদার (Variable Heirs): | যাদের অংশ বিশেষ পরিস্থিতিতে কমতে পারে (যেমন: কন্যা বা বোন)। |
গাণিতিক উদাহরণ:
যদি কোনো মৃত ব্যক্তির পিতা, মাতা, স্ত্রী এবং দুই কন্যা থাকে, তবে কোরআনিকভাবে ঘোষিত অংশগুলো দাঁড়ায়:
এখানে যোগফল ১-এর বেশি হওয়ায় সুন্নিরা ‘আউল’ পদ্ধতিতে হর ২৪-কে বাড়িয়ে ২৭ করে দেয়। কিন্তু শিয়া পদ্ধতিতে পিতা, মাতা এবং স্ত্রী তাদের পূর্ণ অংশই পাবেন। যা অবশিষ্ট থাকবে, তা দুই কন্যা পাবেন। অর্থাৎ কন্যাদের নির্ধারিত বা অংশ থেকে ৩ ভাগ কেটে নেওয়া হবে, ফলে তারা পাবেন অংশ।
আলী ও ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত আপত্তি
শিয়াগণ তাদের এই পদ্ধতির সপক্ষে আলী এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। ইবনে আব্বাস এই সমস্যার গাণিতিক দায় সরাসরি টেক্সটের ওপর না চাপিয়ে মানুষের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর চাপিয়েছেন। মুগনিয়্যার গ্রন্থে আলী ও ইবনে আব্বাসের নামে বর্ণিত বক্তব্যটি হলো: [19]
“He Who can count the number of sand grains (in the universe) surely knows that the number of shares do not exceed six.”
বাংলা অনুবাদ: “যিনি মহাবিশ্বের বালুকণার সংখ্যা গণনা করতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই জানেন যে অংশসংখ্যা ছয় অতিক্রম করে না।”
ইবনে আব্বাসের আপত্তি ও তার মতের অনুসারীরা
ইবনে আব্বাসের বিরোধিতাকে একজন ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী আপত্তি হিসেবে সরিয়ে দিলে পরবর্তী মতভেদের ইতিহাসও অসম্পূর্ণ থাকে। সরাখসি তার আউল প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যা এবং আলী ইবনুল হুসাইনের সেই মত গ্রহণের উল্লেখ করেছেন। আলী ইবনুল হুসাইনই যাইনুল আবিদীন নামে পরিচিত। ফলে এই মতের অনুসারীদের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের ব্যক্তিরাও ছিলেন। [20]
وكان ابن عباس رضي الله عنه ينكر العول في الفرائض أصلا وأخذ بقوله محمد بن الحنفية وعلي بن الحسين وزين العابدين.
বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস উত্তরাধিকারের ফরজ অংশে আউলকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করতেন। তার মত গ্রহণ করেছিলেন মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যা এবং আলী ইবনুল হুসাইন যাইনুল আবিদীন।
সুন্নি আইনচর্চায় সংখ্যাগরিষ্ঠের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং বিরোধী মতের অস্তিত্ব না থাকা এক ঘটনা নয়। একইভাবে কোনো পরবর্তী লেখক নিজের পরিচিত ফকিহদের মধ্যে বিরোধিতা দেখেননি বললে সেই পর্যবেক্ষণ দিয়ে আগে সংরক্ষিত মতভেদ কিংবা ইমামি ফিকহে বহাল প্রত্যাখ্যান বিলুপ্ত হয় না। আউলের ইতিহাসে কোন পরিসরে ঐকমত্যের দাবি করা হচ্ছে—সাহাবিদের মধ্যে, পরবর্তী সুন্নি ফকিহদের মধ্যে, না সমগ্র মুসলিম আইনচর্চায়—এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
শিয়াদের এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা টেক্সটের গাণিতিক ত্রুটি ঢাকার জন্য এক ধরনের ‘প্রায়োরিটি লজিক’ ব্যবহার করে। তবে এটিও প্রকারান্তরে প্রমাণ করে যে, কোরআনের আক্ষরিক ভগ্নাংশগুলো (যেমন: ২/৩ বা ১/২) কোনো অলৌকিক গাণিতিক ভারসাম্যের ওপর নয়, বরং একটি প্রশাসনিক সমঝোতার ওপর টিকে আছে—যেখানে শিয়ারা কন্যাদের অংশ কমিয়ে ভারসাম্য আনে, আর সুন্নিরা সবার অংশ কমিয়ে ভারসাম্য আনে [19]।
এই বিভাজনটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কোরআনের গাণিতিক নকশাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; যদি এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো, তবে নবী পরবর্তী যুগে শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে কার অংশ কাটা হবে তা নিয়ে এমন মৌলিক মতভেদ তৈরি হতো না। শিয়াদের এই ভিন্ন অবস্থান মূলত ‘আউল’-এর মাধ্যমে কোরআনের ভুল সংশোধনের আরেকটি বিকল্প মানবিক প্রচেষ্টা মাত্র।
আপেক্ষিক অধিকারের ব্যাখ্যা: ভগ্নাংশ থেকে অনুপাতে সরে যাওয়া
কোরআনের উত্তরাধিকার আইনে যখন দেখা যায় নির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির ১ বা ১০০% অতিক্রম করছে, তখন কিছু ইসলামি এপোলোজিস্ট আনুপাতিক অধিকারের একটি ব্যাখ্যা হাজির করেন। তারা বলেন, কোরআনে উল্লিখিত ১/২, ১/৪, ১/৮, ১/৬ বা ২/৩ অংশগুলো নাকি মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তির চূড়ান্ত বা পরম অংশ নয়; এগুলো আসলে উত্তরাধিকারীদের পারস্পরিক “আপেক্ষিক অধিকার” বা “অনুপাত” মাত্র। তাই বাস্তবে যখন মোট অংশ ১-এর বেশি হয়ে যায়, তখন আউল পদ্ধতিতে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া নাকি কোরআনের বিরুদ্ধে যায় না।
এই যুক্তিটি শুনতে চাতুর্যপূর্ণ মনে হলেও, বাস্তবে এটি একটি স্পষ্ট পোস্ট-হক রেশনালাইজেশন—অর্থাৎ ভুল ধরা পড়ার পরে সেই ভুলকে রক্ষা করার জন্য পরে বানানো ব্যাখ্যা। কোরআনের ভাষা, ফিকহি ইতিহাস, সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া এবং সাধারণ গাণিতিক যুক্তি—চার দিক থেকেই এই “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্ব ভেঙে পড়ে। কারণ কোরআন কোথাও বলেনি, “স্ত্রীর অংশ কন্যাদের অংশের তুলনায় এত”, বা “মায়ের অংশ বোনদের অংশের অনুপাতে এত”। বরং কোরআন সরাসরি মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে, তার ওপর নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ আরোপ করেছে। এখানেই এপোলোজিস্টদের অনুপাত তত্ত্বের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।
আনুপাতিক কর্তনের ধ্রুপদি যুক্তি: নসের নিহিত দাবি
আনুপাতিক হ্রাসের ব্যাখ্যার ধ্রুপদি ফিকহি ভিত্তিও রয়েছে। আল-মাওসিলি আউলকে শুধু ব্যবহারিক সুবিধা হিসেবে উপস্থাপন করেননি; তিনি দাবি করেছেন, একই সম্পত্তিতে সব অংশ একত্র হওয়া থেকেই সবার ওপর ঘাটতি প্রয়োগের অর্থ পাওয়া যায়। তার বক্তব্যে এটি “নসের নিহিত দাবি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ ঘোষিত ভগ্নাংশগুলোর পরে একটি ব্যাখ্যাগত ধাপ যোগ করে আনুপাতিক হ্রাসের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে। [21]
العول: هو زيادة السهام على الفريضة، فتعول المسألة إلى سهام الفريضة ويدخل النقصان عليهم بقدر حصصهم، لعدم ترجيح البعض على البعض كالديون والوصايا إذا ضاقت التركة عن إيفاء الكل يقسم عليهم على قدر حقوقهم، ويدخل النقص على الكل كذا هذا، ولأن الله تعالى لما جمع هذه السهام في مال لا يتسع للكل علمنا أن المراد إلحاق النقص بالكل عملا بإطلاق الجمع فكان ثابتا مقتضى جمع هذه السهام، والثابت بمقتضى النص كالثابت بالنص، وعلى ذلك إجماع الصحابة رضي الله عنهم، إلا ابن عباس على ما نبينه إن شاء الله تعالى.
বাংলা অনুবাদ: আউল হলো নির্ধারিত মূল হিসাবের তুলনায় অংশসংখ্যা বেড়ে যাওয়া। তখন হিসাবটি মোট অংশসংখ্যা পর্যন্ত বাড়ে এবং প্রত্যেকের অংশ অনুপাতে ঘাটতি প্রবেশ করে। কাউকে অন্যের ওপর অগ্রাধিকার না দেওয়াই এর কারণ। ঋণ ও ওসিয়তের সব দাবি পূরণের জন্য সম্পত্তি অপর্যাপ্ত হলে যেমন অধিকার অনুপাতে বণ্টন করা হয় এবং সবার ওপর ঘাটতি পড়ে, এখানেও তা-ই। আল্লাহ যখন এই অংশগুলো এমন সম্পত্তিতে একত্র করেছেন, যা সব অংশ পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়, তখন আমরা বুঝেছি যে সবার ওপর ঘাটতি প্রয়োগই উদ্দেশ্য—একত্র করার সাধারণ অর্থ অনুযায়ী। এই অংশগুলো একত্র করার নিহিত দাবি হিসেবে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়; আর নসের নিহিত দাবি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিষয় নস দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিষয়ের মতো। এ বিষয়ে সাহাবিদের ঐকমত্য রয়েছে, ইবনে আব্বাস ছাড়া; আল্লাহ চাইলে তার বিষয় পরে ব্যাখ্যা করব।
এখানেই ঘোষিত সংখ্যা এবং ব্যাখ্যার মাধ্যমে গৃহীত বণ্টনের পার্থক্যটি স্পষ্ট। “সবার ওপর ঘাটতি প্রয়োগই উদ্দেশ্য”—এই বাক্যটি কোরআনের উত্তরাধিকার আয়াতের উদ্ধৃতি নয়; অংশগুলো একত্র হওয়ার পর ফকিহের গৃহীত সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে ঋণ ও ওসিয়তের উপমা এবং কাউকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার নীতি ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে “নসের নিহিত দাবি” বলার পরেও নির্ধারিত অর্ধেক কীভাবে তিন-সপ্তমাংশ বা তিন-দশমাংশে পরিণত হলো, তার সংখ্যাগত প্রশ্ন বহাল থাকে। ব্যাখ্যার নাম দিয়ে কর্তনের প্রকৃতি বদলে যায় না।
‘মিম্মা তারাক’: মোট ত্যাজ্য সম্পত্তির ওপর নির্ধারিত ভাগ
সূরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণের সময় বারবার বলা হয়েছে—مِمَّا تَرَكَ বা مَا تَرَكَ, অর্থাৎ “সে যা রেখে গেছে তা থেকে”। এই বাক্যাংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি স্পষ্ট করে দেয়, নির্ধারিত ভগ্নাংশের ভিত্তি হচ্ছে মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি—অন্য কোনো ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ নয়, এবং কোনো বিমূর্ত পারস্পরিক অনুপাতও নয়। [22]
যেমন, কোরআন বলে, দুইয়ের অধিক কন্যা থাকলে তারা পাবে মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ। আবার স্ত্রীদের ক্ষেত্রে বলা হয়, সন্তান থাকলে তারা পাবে মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে তার আট ভাগের এক ভাগ। এখানে ভাষাটি সরাসরি সম্পত্তিভিত্তিক। “সে যা রেখে গেছে” কথাটি মৃত ব্যক্তির মোট ত্যাজ্য সম্পত্তিকে নির্দেশ করছে। যদি কোরআনের উদ্দেশ্য সত্যিই শুধু পারস্পরিক অনুপাত বোঝানো হতো, তাহলে ভাষাটি হতো ভিন্নরকম—যেমন, “কন্যাদের অংশের তুলনায় স্ত্রীর অংশ এত”, অথবা “মায়ের অংশ পিতার অংশের তুলনায় এত”। কিন্তু কোরআন তা বলেনি।
অতএব, “এগুলো পরম অংশ নয়, আপেক্ষিক অনুপাত”—এই দাবি কোরআনের নিজস্ব বাক্যগঠনের বিরুদ্ধে যায়। ভগ্নাংশ যখন সরাসরি “মৃত ব্যক্তি যা রেখে গেছে” তার ওপর বসানো হয়, তখন সেটি মোট সম্পত্তির অংশ হিসেবেই বোঝা হবে। পরে হিসাব না মেলায় সেটিকে “অনুপাত” বলে চালিয়ে দেওয়া ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নয়; এটি টেক্সট বাঁচানোর কৃত্রিম কৌশল।
হুদুদুল্লাহ: নির্ধারিত সীমা ও পরিবর্তিত প্রাপ্য
উত্তরাধিকার বণ্টনের এই আয়াতগুলোর পরপরই সূরা নিসার ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা”—تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ। অর্থাৎ এই বিধানগুলোকে কোরআন নিজেই আল্লাহর নির্ধারিত সীমানা হিসেবে ঘোষণা করছে। [23]
এখন প্রশ্ন হলো, কোনো অংশ যদি সত্যিই আল্লাহর নির্ধারিত সীমা হয়, তাহলে মানুষের তৈরি আউল পদ্ধতিতে সেটি কমে যায় কীভাবে? কোরআন যদি স্ত্রীকে ১/৮ দেয়, আর আউল প্রয়োগের পরে বাস্তবে স্ত্রী পায় ১/৯, তাহলে ১/৮ অংশটি আর কার্যকর থাকল না। কোরআন যদি দুই কন্যাকে ২/৩ দেয়, আর আউলের পরে তারা পায় ১৬/২৭, তাহলে ২/৩ অংশটিও বাস্তবে বাতিল হয়ে গেল। নামমাত্র বলা হচ্ছে কোরআন মানা হচ্ছে, কিন্তু কার্যত কোরআনের সংখ্যা পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এখানে সমস্যাটি সরল। সীমা যদি পরিস্থিতি অনুযায়ী কমে যায়, তাহলে সেটি নির্ধারিত সীমা নয়। যদি ১/৮ চাপ পড়লে ১/৯ হয়ে যায়, ২/৩ চাপ পড়লে ১৬/২৭ হয়ে যায়, তাহলে এগুলোকে “অলঙ্ঘনীয় আল্লাহর সীমা” বলা অর্থহীন। সীমা যদি রাবারের মতো টানাটানি করে বদলানো যায়, তাহলে সেটি সীমা নয়; সেটি মানুষের সুবিধামতো সংশোধনযোগ্য একটি আনুমানিক নির্দেশনা মাত্র। কিন্তু কোরআন নিজে এই অংশগুলোকে আনুমানিক নির্দেশনা বলেনি—বলেছে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। এখানেই আউল এবং “হুদুদুল্লাহ” ধারণার মধ্যে মৌলিক স্ববিরোধ তৈরি হয়।
উমরের দ্বিধা ও সাহাবিদের ভিন্ন সমাধান
যদি কোরআনের ভগ্নাংশগুলো আরবদের ভাষা ও আইন-সংস্কৃতিতে স্বাভাবিকভাবেই “আপেক্ষিক অনুপাত” হিসেবে বোঝা হতো, তাহলে খলিফা উমরের আমলে এই সমস্যা দেখা দিলে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার কথা নয়। উপস্থিত সাহাবিরা সহজেই বলতেন—এগুলো তো অনুপাত, তাই মোট যোগফল ১-এর বেশি হলে অনুপাত রেখে কমিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা যায়, ঘটনা মোটেও এত সরল ছিল না। উমর নিজেই সমস্যাটি নিয়ে বিপাকে পড়েন এবং সাহাবিদের পরামর্শ চান।
উমরের বক্তব্যের সারকথা ছিল: আল্লাহ স্বামীর জন্য অর্ধেক এবং দুই বোনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করেছেন; এখন স্বামীকে আগে দিলে দুই বোনের অংশ পূর্ণ হয় না, আর দুই বোনকে আগে দিলে স্বামীর অংশ পূর্ণ হয় না। তাই কীভাবে বণ্টন করা হবে, এ বিষয়ে তিনি সাহাবিদের পরামর্শ চান। [24]
এই ঘটনাটিই এপোলোজিস্টদের “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্বের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ঐতিহাসিক প্রমাণ। কারণ ভগ্নাংশগুলো যদি শুরু থেকেই অনুপাত হিসেবে বোঝা হতো, তাহলে উমরের এই দোটানা তৈরি হতো না। সাহাবিদের আলোচনাও প্রয়োজন হতো না। ইবনে আব্বাসের বিরোধিতাও অর্থহীন হয়ে যেত। বাস্তবে এই বিতর্ক দেখায়, তারা কোরআনের অংশগুলোকে পরম, নির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবেই বুঝতেন। সমস্যাটি তৈরি হয়েছিল কারণ কোরআনের নির্দিষ্ট অংশগুলো একসাথে প্রয়োগ করলে গাণিতিকভাবে সম্পত্তি যথেষ্ট হচ্ছিল না।
অতএব, আউল কোনো পূর্বনির্ধারিত কোরআনিক পদ্ধতি ছিল না; এটি ছিল পরবর্তী মানবিক সমন্বয়। আর মানবিক সমন্বয়ের প্রয়োজনই প্রমাণ করে যে মূল বিধানে এমন একটি বাস্তব সমস্যা ছিল, যা কোরআন নিজে সমাধান করেনি।
মোট সম্পত্তির ভগ্নাংশ ও পারস্পরিক অনুপাতের পার্থক্য
এপোলোজিস্টদের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো—ভগ্নাংশ এবং অনুপাতকে গুলিয়ে দেওয়া। কিন্তু গণিতে ভগ্নাংশ এবং অনুপাত এক জিনিস নয়। যখন বলা হয়, কেউ মোট সম্পত্তির ১/২ পাবে, কেউ ১/৬ পাবে, কেউ ১/৮ পাবে—তখন এগুলো মোট ১ বা পূর্ণ সম্পত্তির অংশ। এই অংশগুলো একসাথে যোগ করলে সর্বোচ্চ ১ হওয়া বাধ্যতামূলক। যোগফল ১-এর বেশি হলে তার অর্থ দাঁড়ায়, মৃত ব্যক্তি যত সম্পত্তি রেখে গেছে, তার চেয়ে বেশি সম্পত্তি বণ্টনের দাবি তৈরি হয়েছে। এটি অনুপাতের সমস্যা নয়; এটি হিসাবের সমস্যা।
কোনো সর্বজ্ঞ সত্তা যদি সত্যিই শুধু অনুপাত বোঝাতে চাইতেন, তাহলে তিনি সরাসরি অনুপাতের ভাষা ব্যবহার করতে পারতেন। যেমন, “এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী, পিতা-মাতা ও কন্যাদের অনুপাত হবে ৩:৮:১৬”—এভাবে বললে কোনো গাণিতিক সমস্যা থাকত না। কিন্তু কোরআন তা করেনি। কোরআন নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ দিয়েছে, এবং সেই ভগ্নাংশগুলো বাস্তব কিছু ক্ষেত্রে ১-এর বেশি হয়ে যায়। পরে সেই ভগ্নাংশগুলোকে অনুপাত বলে চালিয়ে দেওয়া মূল সমস্যাকে দূর করে না; বরং দেখায় যে টেক্সটের সরল অর্থ রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
একটি উদাহরণ নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মৃত ব্যক্তি যদি স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং দুই কন্যা রেখে যায়, তাহলে স্ত্রী পাবে ১/৮, পিতা-মাতা মিলিয়ে পাবে ১/৩, এবং দুই কন্যা পাবে ২/৩। যোগফল দাঁড়ায়: ১/৮ + ১/৩ + ২/৩ = ২৭/২৪। অর্থাৎ ২৪ অংশের সম্পত্তিতে ২৭ অংশ দাবি তৈরি হচ্ছে। সুন্নি আউল পদ্ধতিতে তখন ২৪-কে ২৭ বানিয়ে অংশগুলো কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে স্ত্রী আর ১/৮ পায় না; পায় ৩/২৭ বা ১/৯। পিতা-মাতা এবং কন্যাদের অংশও তাদের কোরআন-নির্ধারিত ভগ্নাংশ থেকে কমে যায়।
এখানে “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্ব কোনো সমাধান দেয় না। কারণ আউল প্রয়োগের আগে যে অংশগুলো কোরআনে ছিল, আউল প্রয়োগের পরে সেগুলো আর থাকে না। অর্থাৎ বাস্তব বণ্টন কোরআনের সংখ্যার সঙ্গে মেলে না। তাই সরল সিদ্ধান্ত হলো: হয় কোরআনের ভগ্নাংশগুলো বাস্তব সব অবস্থার জন্য গাণিতিকভাবে যথেষ্ট নয়, অথবা আউল প্রয়োগ করে কোরআনের নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন করা হচ্ছে। দুই অবস্থাতেই “কোরআনের উত্তরাধিকার আইন নিখুঁত”—এই দাবি টেকে না।
অনুপাতের ব্যাখ্যায় ঘোষিত ভাগের পরিবর্তন
“আপেক্ষিক অধিকার” তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য হলো কোরআনের গাণিতিক সমস্যাকে ভাষার খেলায় ঢেকে দেওয়া। কিন্তু এই কৌশল ব্যর্থ। কোরআনের ভাষা মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তির ওপর নির্দিষ্ট অংশ আরোপ করে; পরের আয়াতগুলো সেই অংশগুলোকে আল্লাহর সীমা বলে ঘোষণা করে; সাহাবিদের ঐতিহাসিক বিতর্ক দেখায় তারা এগুলোকে বাস্তব ও পরম অংশ হিসেবেই বুঝতেন; এবং গণিত দেখায়, এই অংশগুলো কিছু ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবি তৈরি করে।
অতএব, আউল কোনো “অলৌকিক গাণিতিক প্রজ্ঞা” নয়; এটি একটি পরবর্তী মানবিক প্যাচ। আর “আপেক্ষিক অনুপাত” তত্ত্ব সেই প্যাচকে ধর্মতাত্ত্বিকভাবে বৈধ দেখানোর চেষ্টা মাত্র। ভুলকে “আপেক্ষিকতা” নাম দিলে ভুলটি শুদ্ধ হয় না। বরং এতে আরও পরিষ্কার হয়, কোরআনের উত্তরাধিকার আইন বাস্তব জটিলতা সামলানোর মতো নিখুঁতভাবে নির্মিত ছিল না, এবং সেটিকে চালু রাখতে মানুষের তৈরি সংশোধনী পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হয়েছে।
ঋণদাতার উপমা: লেনদেনের ঘাটতি ও বিধানের অসামঞ্জস্য
আউল পদ্ধতিকে বৈধ দেখানোর জন্য ইসলামি এপোলোজিস্টরা আরেকটি জনপ্রিয় উপমা ব্যবহার করেন। তারা বলেন, কোনো মৃত বা দেউলিয়া ব্যক্তির সম্পদ যদি তার সব ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে ঋণদাতাদের প্রত্যেকের পাওনা আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। একজনের পুরো পাওনা দিয়ে আরেকজনকে বঞ্চিত করা হয় না। সুতরাং, উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রেও যদি নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তাহলে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত। ইসলামওয়েবের ফতোয়াতেও এই যুক্তিই দেওয়া হয়েছে; সেখানে ঋণদাতাদের দাবির সঙ্গে উত্তরাধিকারীদের অংশ কমানোর তুলনা করে আউলকে “ন্যায়বিচার” এবং ইসলামের সৌন্দর্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [25]
কিন্তু এই উপমাটি মূলত একটি false analogy—ভুল তুলনা। কারণ ঋণদাতাদের দাবি এবং কোরআনিক উত্তরাধিকার অংশ একই ধরনের বিষয় নয়। ঋণ তৈরি হয় মানুষের পারস্পরিক লেনদেন থেকে। কেউ ধার নেয়, কেউ ধার দেয়, কেউ বেশি পাওনা রাখে, কেউ কম পাওনা রাখে। পরে দেখা যেতে পারে, ঋণগ্রহীতার সম্পদ সব ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট নয়। সেখানে সম্পদ কম পড়ে যাওয়া ঋণগ্রহীতার অর্থনৈতিক অক্ষমতা; আইনপ্রণেতার গাণিতিক ভুল নয়। কিন্তু কোরআনের উত্তরাধিকার অংশ কোনো মানুষের লেনদেন-জাত দাবি নয়; এগুলো কোরআনের দাবি অনুযায়ী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারিত অংশ। তাই এই দুই ক্ষেত্রকে এক করে দেখা যুক্তিগতভাবে অসৎ তুলনা।
দেউলিয়া ব্যক্তির ঋণের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো—বাস্তব সম্পদ ঋণের মোট দাবির তুলনায় কম। কিন্তু উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর। এখানে কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত দাবি তৈরি করেনি; বরং কোরআন নিজেই বিভিন্ন ওয়ারিশের জন্য নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ ঘোষণা করেছে। সেই ভগ্নাংশগুলো একসাথে যোগ করলে কিছু ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি ওয়ারিশদের দাবিতে নয়, আইনটির গাণিতিক নির্মাণে। দেউলিয়া ব্যক্তি সম্পদ কম রেখে গেছে—এটি এক ধরনের বাস্তব অর্থনৈতিক সংকট; কিন্তু আল্লাহর নামে ঘোষিত আইনে ১-এর বেশি অংশ বণ্টনের নির্দেশ তৈরি হওয়া—এটি আইন-প্রণয়নের ভেতরের গাণিতিক সংকট।
ঋণদাতা-উপমা আরও একটি কারণে ব্যর্থ। ঋণদাতাদের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের পাওনা আগে থেকেই মোট সম্পদের নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ হিসেবে ঘোষিত থাকে না। একজনের পাওনা ৩০০ টাকা, আরেকজনের ৪০০ টাকা, আরেকজনের ৫০০ টাকা হতে পারে। পরে যদি দেখা যায় মোট সম্পদ মাত্র ৮০০ টাকা, তখন বাস্তবতার কারণে সবার পাওনা আনুপাতিকভাবে কমানো হয়। কিন্তু কোরআনের উত্তরাধিকার আইনে বলা হয়েছে, অমুক পাবে ১/২, অমুক পাবে ১/৬, অমুক পাবে ১/৮, অমুক পাবে ২/৩। এগুলো সরাসরি মোট ত্যাজ্য সম্পত্তির অংশ হিসেবে ঘোষিত। তাই পরে এগুলো কমিয়ে দেওয়া মানে পাওনা সমন্বয় নয়; বরং ঘোষিত ভগ্নাংশ বদলে দেওয়া।
এখানে এপোলোজিস্টদের কৌশলটি পরিষ্কার। তারা এমন একটি মানবিক সংকটের উপমা আনে, যেখানে সম্পদ অপর্যাপ্ত হওয়া স্বাভাবিক এবং ঋণদাতাদের মধ্যে আনুপাতিক হ্রাস বাস্তবসম্মত। তারপর সেই উপমা টেনে এনে কোরআনের গাণিতিক অসামঞ্জস্য ঢাকার চেষ্টা করে। কিন্তু সর্বজ্ঞ সত্তার আইনকে দেউলিয়া মানুষের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করাই মূল সমস্যাকে আরও নগ্ন করে দেয়। একজন দেউলিয়া মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না, সম্পদের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সব ঋণ শোধ করার সক্ষমতাও রাখে না। কিন্তু আল্লাহকে যদি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান এবং সর্বোত্তম আইনপ্রণেতা বলা হয়, তাহলে তাঁর দেওয়া উত্তরাধিকার আইন এমনভাবে হওয়া উচিত ছিল যাতে কোনো বাস্তব অবস্থাতেই মোট অংশ ১-এর বেশি না হয়।
অতএব, ঋণদাতা-দেউলিয়া উপমা আউলকে বৈধ করে না। বরং এই উপমা অনিচ্ছাকৃতভাবে স্বীকার করে নেয় যে কোরআনের উত্তরাধিকার আইনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ঘোষিত দাবিগুলো পূরণ করার মতো সম্পত্তি নেই। ঋণদাতাদের ক্ষেত্রে এটি অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব; কোরআনের ক্ষেত্রে এটি গাণিতিক দেউলিয়াত্ব। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো—প্রথমটি মানুষের সীমাবদ্ধতা, দ্বিতীয়টি সর্বজ্ঞতার দাবির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ। তাই আউলকে “ন্যায়বিচার” বলা হলেও, সেটি কোরআনের ভুল দূর করে না; শুধু ভুলটি প্রশাসনিকভাবে সামলে নেয়।
ঋণদাতার উপমার বিরুদ্ধে ইমামি ফিকহের আপত্তি
ঋণদাতা ও উত্তরাধিকারীদের এক নিয়মে বিচার করার বিরুদ্ধে ইমামি ফিকহেও সরাসরি আপত্তি পাওয়া যায়। ইবনে ইদরিস আল-হিল্লির আস-সারাইর-এ সংরক্ষিত আলোচনায় বলা হয়েছে, ঋণদাতাদের দাবি আদায়ের অবস্থান সমপর্যায়ের; অথচ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কার অংশ কমানো যাবে এবং কারটি যাবে না, সেই পার্থক্য রয়েছে। এই যুক্তি ঋণদাতা-উপমার আইনগত ভিত্তিকেই প্রশ্ন করে। [26]
والفرق بين ما نحن فيه، وبين الديون على التركة، ان الغرماء مستوون في وجوب استيفاء حقوقهم منها، ولا مزية لبعضهم على بعض في ذلك، وليس كذلك مسائل العول، لأنا قد بيّنا ان في الورثة من لا يجوز أن ينقص عن سهمه، وفيهم من هو اولى بالنقص من غيره، فخالفت حالهم حال الغرماء.
বাংলা অনুবাদ: আলোচ্য বিষয় এবং ত্যাজ্য সম্পত্তির ওপর ঋণের মধ্যে পার্থক্য হলো, ঋণদাতারা সেখান থেকে নিজেদের অধিকার আদায়ের আবশ্যকতার ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের; এ বিষয়ে কেউ অন্যের ওপর বিশেষ অগ্রাধিকার রাখে না। আউলের সমস্যাগুলো তেমন নয়। কারণ আমরা দেখিয়েছি, উত্তরাধিকারীদের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছেন যার অংশ কমানো যায় না; আবার এমন ব্যক্তিও আছেন যার ওপর অন্যের তুলনায় ঘাটতি প্রয়োগ বেশি প্রযোজ্য। ফলে তাদের অবস্থা ঋণদাতাদের অবস্থা থেকে পৃথক।
ঋণদাতাদের উদাহরণ থেকে সবার অংশ কমানোর সিদ্ধান্ত তখনই পাওয়া যাবে, যখন দুই ক্ষেত্রের অধিকার ও অগ্রাধিকারের কাঠামোও একই বলে প্রতিষ্ঠিত হবে। অথচ কোন অংশ অক্ষত থাকবে, সেটি নিয়েই উত্তরাধিকার-বিতর্কে মতভেদ রয়েছে। যে প্রশ্নটি আগে সমাধান করা দরকার, উপমাটি সেই প্রশ্নের উত্তর আগেই ধরে নিচ্ছে। ইমামি ফকিহদের আপত্তি এই অনুপস্থিত সংযোগকে সামনে আনে। একই সঙ্গে দুই ব্যবস্থার উৎসগত পার্থক্যও থেকে যায়: ঋণের অঙ্ক মানুষের লেনদেনে তৈরি হয়; উত্তরাধিকার-ভগ্নাংশগুলো আইনপ্রণেতার নিজের নির্ধারণ বলে ঘোষিত।
ইজমা ও খলিফার নজির: সংখ্যা পরিবর্তনের কর্তৃত্ব কোথায়?
আউল পদ্ধতিকে রক্ষা করার শেষ আশ্রয় হিসেবে সাধারণত আরেকটি যুক্তি দেওয়া হয়। বলা হয়, আউল কোরআনে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব সাহাবিদের পরামর্শে এটি চালু করেছিলেন; পরে অধিকাংশ ফকিহ ও আলেমও তা গ্রহণ করেছেন। অতএব, এটি খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ, সাহাবিদের ইজমা এবং উম্মাহর গৃহীত ফিকহি সমাধান। তাই কোরআনের আয়াতে সরাসরি আউল না থাকলেও, ইসলামী আইনশাস্ত্রের বৃহত্তর কাঠামোর ভেতরে আউল বৈধ।
সাহাবিদের ইজমা, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠের মত?
আউল বিষয়ে সাহাবিদের ইজমার দাবিই সুন্নি আলেমদের মধ্যে অবিসংবাদিত নয়। আবদুর রহমান আল-বাররাক ইবনে আব্বাসের বিরোধিতা থাকার কারণে ইজমা সংঘটিত হয়নি বলে জানিয়েছেন। তার ব্যাখ্যায়, সাহাবিদের ইজমা বলার পরিবর্তে সাহাবিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত বলতে হবে। এখানে ইজমা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার পার্থক্যটি একজন আউলসমর্থক সুন্নি আলেমের নিজের বক্তব্যেই স্বীকৃত। [27]
ما دام أنه خالف فلم يتحقق الإجماع.
বাংলা অনুবাদ: তিনি বিরোধিতা করায় ইজমা সংঘটিত হয়নি।
সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে ইজমা বলে উপস্থাপন করলে মতভেদকে ঐকমত্যের নামে সরিয়ে দেওয়া হয়। ইবনে আব্বাসের আপত্তি সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় “সবাই একমত ছিলেন” এবং “অধিকাংশ একই পদ্ধতি নিয়েছিলেন”—বাক্য দুটির তথ্যগত অর্থ এক নয়। একইভাবে পরবর্তী কোনো নির্দিষ্ট ফিকহি পরিসরে একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া আগের বিরোধিতাকে অনস্তিত্বে পরিণত করে না। আউলের বৈধতার পক্ষে ইজমা ব্যবহার করতে হলে সেই ইজমার সময়, অংশগ্রহণকারী এবং বিরোধী মতের অবস্থান ব্যাখ্যা করার দায় থেকেই যায়।
এই যুক্তিটি প্রথমে শক্তিশালী মনে হতে পারে, কারণ ইসলামী ফিকহে কোরআনের পাশাপাশি সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসকেও আইনগত উৎস হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এখানেই মূল বিভ্রান্তি স্পষ্ট হয়। ইজমা বা ইজতিহাদ কোনো অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে পারে; কোনো সাধারণ বিধানকে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করতে পারে; নতুন পরিস্থিতিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কিন্তু ইজমা বা ইজতিহাদ কোরআনের সরাসরি ঘোষিত সংখ্যাকে বদলে দিতে পারে না। কারণ সরাসরি নস বা ব্যাখ্যা আর সংশোধন এক জিনিস নয়।
যদি কোরআন বলে স্ত্রী পাবে ১/৮, আর আউল প্রয়োগের পরে স্ত্রী বাস্তবে পায় ১/৯, তাহলে এটি ১/৮-এর ব্যাখ্যা নয়। ১/৯ কখনো ১/৮-এর তাফসির হতে পারে না। যদি কোরআন বলে দুই কন্যা পাবে ২/৩, আর আউলের পরে তারা বাস্তবে পায় ১৬/২৭, তাহলে এটিও ২/৩-এর ব্যাখ্যা নয়। এটি কোরআনিক সংখ্যার বাস্তব পরিবর্তন। অর্থাৎ আউল কোরআনের বিধান ব্যাখ্যা করছে না; বরং কোরআনের ঘোষিত ভগ্নাংশকে কমিয়ে নতুন বণ্টন তৈরি করছে।
এখানে ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি মৌলিক নীতি স্মরণীয়: لا اجتهاد مع النص—সুস্পষ্ট ও অকাট্য নসে নির্ধারিত বিধান বদলাতে ইজতিহাদ চলে না। কোনো বিধানের উৎস ও নির্দিষ্ট অর্থ উভয়ই অকাট্য হলে মানুষের ইজতিহাদ দিয়ে সেই নির্ধারণ পাল্টানো যায় না। উত্তরাধিকার আয়াতগুলোতে অংশগুলো অস্পষ্ট ভাষায় দেওয়া হয়নি; সেগুলো নির্দিষ্ট সংখ্যায় দেওয়া হয়েছে—অর্ধেক, এক-তৃতীয়াংশ, এক-চতুর্থাংশ, এক-ষষ্ঠাংশ, এক-অষ্টমাংশ, দুই-তৃতীয়াংশ। এগুলো অনুমান, নীতি বা দিকনির্দেশনা নয়; এগুলো সরাসরি ভগ্নাংশ। তাই এখানে ইজতিহাদের কাজ ব্যাখ্যা হতে পারে, কিন্তু সংখ্যা বদলানো হতে পারে না।
সুস্পষ্ট ও অকাট্য নসে ইজতিহাদের সীমা
আবদুল ওয়াহহাব খাল্লাফের উসুলুল ফিকহের আলোচনায় ইজতিহাদের সীমা নির্ধারিত হয়েছে নসের সুস্পষ্টতা ও অকাট্যতার মাধ্যমে। কোনো বিধানের উৎস এবং তার নির্দিষ্ট অর্থ উভয়ই অকাট্য হলে সেই নির্ধারণ বদলানোর জন্য ইজতিহাদ চলে না। তিনি নির্ধারিত শাস্তির সংখ্যার উদাহরণও দিয়েছেন। অর্থ বা প্রমাণ অনিশ্চিত হলে অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্র আলাদা। ফলে শুধু একটি হাদিসকে সহিহ বলা এবং তার প্রত্যেক সম্ভাব্য প্রয়োগকে অকাট্য বলা একই সিদ্ধান্ত নয়। [28]
لا مساغ للاجتهاد فيما فيه نص صريح قطعي.
বাংলা অনুবাদ: সুস্পষ্ট ও অকাট্য নসের ক্ষেত্রে ইজতিহাদের অবকাশ নেই।
আউলের সমর্থকেরা আনুপাতিক হ্রাসকে নসের নিহিত দাবি হিসেবে গ্রহণ করেন; সমালোচনার কেন্দ্র হলো সেই ব্যাখ্যাগত ধাপেই ভগ্নাংশের ব্যবহারিক পরিবর্তন। স্ত্রীকে মোট সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ দেওয়ার নির্দেশ এবং আউলের পরে এক-নবমাংশ দেওয়ার মধ্যে যে ব্যবধান, সেটি অঙ্কেই নির্ণীত। ঘোষিত সংখ্যার নির্দিষ্টতা এবং অংশগুলোর সংঘর্ষ সামলাতে পরবর্তী বিধান গ্রহণের সম্পর্ক নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। ফিকহে পদ্ধতিটি বৈধ বলে গ্রহণ করা এবং সংখ্যাগতভাবে এক-অষ্টমাংশ অক্ষত থাকা আলাদা দাবি।
সমস্যাটি আরও পরিষ্কার হয় যদি প্রশ্নটি এভাবে করা হয়: কোরআনের নির্দিষ্ট অংশ ভুল নয়, তাহলে আউল দরকার কেন? আর আউল দরকার হলে, কোরআনের নির্দিষ্ট অংশগুলো সব বাস্তব পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নয়—এ কথা স্বীকার করতে হবে। এপোলোজিস্টরা একদিকে বলেন, কোরআনের উত্তরাধিকার আইন নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ; অন্যদিকে বলেন, সেই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে খলিফা উমরের ইজতিহাদ প্রয়োজন হয়েছে, কারণ কোরআনের অংশগুলো সরাসরি প্রয়োগ করলে বণ্টন মেলে না। এই দুই দাবি একসাথে সত্য হতে পারে না। কোনো আইন একইসাথে “পূর্ণাঙ্গ” এবং “মানবিক প্যাচ ছাড়া অচল”—দুই-ই হতে পারে না।
খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহর দোহাইও এখানে সমস্যার সমাধান করে না। কারণ কোনো খলিফার সিদ্ধান্ত যদি কোরআনের অস্পষ্ট প্রয়োগ পরিষ্কার করত, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু আউলের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে খলিফার সিদ্ধান্ত কোরআনের ভাষা ব্যাখ্যা করছে না; বরং কোরআনের নির্ধারিত সংখ্যাগুলো বাস্তবে কমিয়ে দিচ্ছে। ১/৮-কে ১/৯ বানানো, ২/৩-কে ১৬/২৭ বানানো, কিংবা ১/৬-কে কমিয়ে দেওয়া—এসব কোনো ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নয়; এগুলো বাস্তব গাণিতিক সংশোধন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। যদি আউল সত্যিই আল্লাহর বিধানের অংশ হতো, তাহলে কোরআন নিজেই কেন সেটি উল্লেখ করল না? উত্তরাধিকার বিষয়ে কোরআন এত নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ দিল, এত বিস্তারিতভাবে কে কত পাবে তা বলল, কিন্তু এমন একটি মৌলিক পরিস্থিতির কথা বলল না যেখানে মোট অংশ ১-এর বেশি হয়ে যাবে এবং সবাইকে আনুপাতিকভাবে কমাতে হবে। অথচ বাস্তবে এই সমস্যা এত গুরুত্বপূর্ণ যে পরবর্তী ফিকহে আউল ছাড়া বহু বণ্টন করা যায় না। তাহলে কি ধরে নিতে হবে, আল্লাহ এমন একটি আইন দিলেন যার জরুরি সংশোধনী মানুষ পরে আবিষ্কার করল?
ইজমার যুক্তিও শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় এসে ভেঙে পড়ে। কারণ ইজমা কোনো ভুলকে সত্যে পরিণত করতে পারে না। বহু মানুষ কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করলেই সেটি কোরআনিক হয়ে যায় না। ইতিহাসে কোনো মানবিক সমাধান ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়া আর সেটি আল্লাহর মূল বিধান হওয়া এক কথা নয়। আউল হয়তো একটি প্রশাসনিকভাবে কার্যকর সমাধান; কিন্তু সেটি কার্যকর বলেই কোরআনের গাণিতিক সমস্যাকে মুছে দেয় না। বরং আউলের প্রয়োজনীয়তাই দেখায়, কোরআনের নির্দিষ্ট ভগ্নাংশগুলো সব উত্তরাধিকার পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট ছিল না।
অতএব, “উমরের ইজতিহাদ”, “সাহাবিদের ইজমা” বা “খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ”—কোনোটিই মূল সমস্যাকে দূর করে না। এগুলো সর্বোচ্চ যা প্রমাণ করে তা হলো, সাহাবিরা কোরআনিক বণ্টনের একটি বাস্তব গাণিতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং তা সামলাতে মানবিক সমাধান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু মানবিক সমাধান তৈরি হওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে, মূল বিধান নিজে নিজে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করছিল না। তাই আউলকে ইসলামী ফিকহের অংশ বলা যেতে পারে, কিন্তু সেটিকে কোরআনের নিখুঁত গাণিতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ বলা যায় না। বরং এটি কোরআনিক উত্তরাধিকার আইনের সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।
উপসংহার
কোরআনের উত্তরাধিকার আইনকে সাধারণত “নিখুঁত” ও “আল্লাহ নির্ধারিত” বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এই প্রবন্ধের আলোচনায় দেখা যায়—কিছু বাস্তব পারিবারিক কনফিগারেশনে কোরআন নির্ধারিত অংশগুলো যোগ করলে মোট যোগফল ১ (সম্পূর্ণ সম্পত্তি)-কে ছাড়িয়ে যায়, ফলে সরল গাণিতিক নিয়মেই একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়। এই অসঙ্গতি কেবল “হিসাবের ছোট ভুল” নয়; উত্তরাধিকার আইনের মতো নীতিগত বিধানে এটি কার্যকরতা ও নির্ভুলতার মৌলিক শর্তকে আঘাত করে।
এই সমস্যার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরেই এর সমাধান হিসেবে ‘আউল’ নীতির উদ্ভব, যা মূলত খলিফা উমরের আমলে প্রয়োগ/প্রবর্তিত হয়। অর্থাৎ যেখানে কোরআনের ভগ্নাংশগুলো বাস্তবে “ওভারফ্লো” তৈরি করে, সেখানে সম্পত্তি বণ্টন চালাতে গিয়ে আয়াতে নির্ধারিত অংশগুলোকে কমিয়ে-সমন্বয় করতে হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে: যদি আইনটি সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে নিখুঁতভাবে নাজিল হত, তবে তা কি এমন পরিস্থিতি তৈরি করত—যেখানে বাস্তব প্রয়োগ টিকিয়ে রাখতে মানবিক সংশোধনী অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়?
আরও লক্ষণীয় হলো—পরবর্তী যুগে বহু আলেম ‘আউল’-কে প্রতিষ্ঠিত সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং ইবনে আব্বাসের ভিন্ন মতকে প্রায় “অচল” অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ সমাধানটি কেবল সাময়িক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—পরবর্তীতে এটি ফিকহি ঐকমত্যের মতো কাঠামোর ভেতর স্থায়ীভাবে ঢুকে পড়ে। এতে কোরআনের আয়াত ও বাস্তব প্রয়োগের মাঝখানে এক ধরনের টানাপড়েন দেখা যায়: “আল্লাহর অংশ” বলেই যে ভাগগুলো দেওয়া—বাস্তবে বণ্টন করতে হলে সেই অংশগুলোই অনুপাত বদলে ফেলতে হয়।
সুতরাং, এই আলোচনার শেষ কথা দাঁড়ায় এভাবে: ‘আউল’ আসলে কোরআনের উত্তরাধিকার বিধানের “চূড়ান্ত প্রমাণ” নয়; বরং এটি সেই ভুলকে কার্যকরভাবে ঢেকে দিয়ে চালু রাখার মানবিক কৌশল—যা নিজেই ইঙ্গিত করে যে মূল টেক্সটের ভগ্নাংশ-ডিজাইন সর্বক্ষেত্রে গাণিতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এক অর্থে, উত্তরাধিকার বিধানের এই সমস্যা ধর্মীয় দাবির একটি কেন্দ্রীয় দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে: “সর্বজ্ঞ বিধান সব ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে কাজ করবে”—বাস্তবতা সেখানে একটি ব্যতিক্রম তৈরি করে। এই কারণেই প্রবন্ধে দেখানো “গাণিতিকভাবে নিখুঁত” পুনর্লিখন-ধাঁচের প্রস্তাব (যেখানে যোগফল সর্বদা ১ থাকে)—এটি কেবল বিকল্প ভাষ্য নয়, বরং সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে একটি বিশ্লেষণাত্মক আয়না।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা নিসা, আয়াত: ১১; আয়াত: ১২ ↩︎
- আল-মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার, আউল ও মূল হিসাবসমূহ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৯৫–৫৯৮ 1 2 3
- সূরা নিসা: ৪:১২; ৪:১৭৬ ↩︎
- ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, কিতাবুল ফারায়েজ, মাসআলা ৪৮৪৪ ↩︎
- তক্মিলাতুল বাহরির রায়িক, কিতাবুল ফারায়েজ, রদ্দ, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৫৮৮ ↩︎
- কোরআন, সূরা নিসা ৪:১১ ↩︎
- কোরআন, সূরা নিসা ৪:১২ ↩︎
- আল-ইখতিয়ার, আউলের উদাহরণে মাতৃসূত্রের ও সহোদর বোনদের পৃথক অংশ ↩︎
- জামি আত-তিরমিজি, কিতাবুল ফারায়েজ, কন্যাদের উত্তরাধিকার, হাদিস ২০৯২ ↩︎
- আল-মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার লি-তালিলিল মুখতার, খণ্ড ৫, আউল ও মূল হিসাবসমূহ, পৃষ্ঠা ৫৯৫ ↩︎
- সরাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ২৯, কিতাবুল ফারায়েজ, বাবুল আউল, পৃষ্ঠা ১৬৪ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২২২৫২৬; নিচে পূর্ণ উদ্ধৃতি ↩︎
- আল-মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৯৭; উমরের সিদ্ধান্ত ও ইবনে আব্বাসের বিরোধিতা ↩︎
- সরাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ২৯, বাবুল আউল, পৃষ্ঠা ১৬৪–১৬৫; শুরাইহিয়্যা বা উম্মুল ফুরুখের বিবরণ ↩︎
- সরাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ২৯, বাবুল আউল; শুরাইহের রায় ও উমরের নজির ↩︎
- Al-‘Awl, Wayback Machine Archive link; মূল প্রকাশনা: আল-আউল, Al-Islam.org ↩︎
- সরাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ২৯, পৃষ্ঠা ১৬৪; স্বামী–স্ত্রী ছাড়া আউল ↩︎
- The origion of ‘Awl in inheritance law ↩︎
- মুহাম্মদ জাওয়াদ মুগনিয়্যা, ইনহেরিটেন্স একর্ডিং টু ফাইভ স্কুলস অফ ইসলামিক ল, আল-আউল 1 2
- সরাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ২৯, বাবুল আউল, পৃষ্ঠা ১৬১ ↩︎
- আল-মাওসিলি, আল-ইখতিয়ার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৫৯৫–৫৯৬; আউলকে নসের নিহিত দাবি হিসেবে বৈধ করার যুক্তি ↩︎
- সূরা নিসা, ৪:১১; ৪:১২ ↩︎
- সূরা নিসা, ৪:১৩; ৪:১৪ ↩︎
- আল-বায়হাকি, সুনান আল-কুবরা, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৫৩; আরও দেখুন: The Origin of ‘Awl in Inheritance Law, IslamWeb ↩︎
- IslamWeb, “The origin of ‘Awl in inheritance law”, Fatwa No. 222526 ↩︎
- ইবনে ইদরিস আল-হিল্লি, আস-সারাইর, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫২; আউল ও ঋণদাতাদের দাবির পার্থক্য ↩︎
- আবদুর রহমান আল-বাররাক, আউল বিষয়ে ইবনে আব্বাসের বিরোধিতা ও ইজমার দাবি, ১৩ নভেম্বর ২০২২ ↩︎
- আবদুল ওয়াহহাব খাল্লাফ, ইলম উসুলিল ফিকহ, ইজতিহাদের ক্ষেত্রসংক্রান্ত তৃতীয় মূলনীতি ↩︎


🔹 অভিযোগটি কী
নাস্তিকদের একটি পরিচিত যুক্তি হলো: কোনো ব্যক্তি মারা গেলে যদি তার উত্তরাধিকারী হন তিন কন্যা, পিতা-মাতা ও স্ত্রী — তাহলে কুরআনের নির্ধারিত অংশগুলো যোগ করলে সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। যেমন —
কন্যাদের অংশ ২/৩, কারণ: 📖 “কিন্তু যদি কন্যা সন্তান দুই বা ততোধিক হয়, তবে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ” (আন-নিসা ৪:১১)
পিতা-মাতা প্রত্যেকে ১/৬ করে, মোট ১/৩, কারণ: 📖 “সন্তান থাকলে পিতা-মাতার প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ” (আন-নিসা ৪:১১)
স্ত্রীর অংশ ১/৮, কারণ: 📖 “…তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ তাদের প্রাপ্য…” (আন-নিসা ৪:১২)
এই তিনটি যোগ করলে দাঁড়ায় ২/৩ + ১/৩ + ১/৮ = ৯/৮ — অর্থাৎ সম্পত্তির চেয়ে বেশি। এখান থেকেই অভিযোগ, “কুরআনে গাণিতিক ভুল আছে।”
🔹 প্রকৃত সমাধান: “আওল” (العول)
ইসলামি উত্তরাধিকার শাস্ত্রে (ফারায়েজ) এই পরিস্থিতির নাম “আওল” — যখন নির্ধারিত অংশগুলোর সমষ্টি সম্পত্তির পুরো অংশ (১) ছাড়িয়ে যায়, তখন প্রতিটি অংশীদারের অংশ একই অনুপাত বজায় রেখে আনুপাতিক হারে (proportionally) হ্রাস করা হয়।
গণনা করলে —
সবচেয়ে ছোট সাধারণ হর (LCD) হলো ২৪
স্ত্রী: ১/৮ = ৩/২৪
পিতা: ১/৬ = ৪/২৪
মাতা: ১/৬ = ৪/২৪
কন্যারা: ২/৩ = ১৬/২৪
যোগফল = ৩+৪+৪+১৬ = ২৭/২৪ (২৪-এর চেয়ে বেশি)
তাই মূল হর ২৪-এর বদলে ২৭ ব্যবহার করা হয় (অংশগুলোর numerator অপরিবর্তিত রেখে):
স্ত্রী: ৩/২৭ (= ১/৮ এর বদলে কার্যত ১/৯)
পিতা: ৪/২৭
মাতা: ৪/২৭
কন্যারা: ১৬/২৭
যোগফল = ২৭/২৭ = ১ (পুরো সম্পত্তি, নির্ভুল)
🔹 তথ্যগত স্বচ্ছতা
কুরআনের আয়াতে (৪:১১-১২) সরাসরি “আওল” পদ্ধতির নাম বা পদ্ধতি বলা হয়নি। কুরআন প্রতিটি উত্তরাধিকারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বেঁধে দিয়েছে। “আওল” পদ্ধতিটি সাহাবীদের (বিশেষত হযরত উমর রা.-এর নেতৃত্বে) ইজতিহাদ — যখন প্রথমবার এমন কেস সামনে আসে, সাহাবীগণ পরামর্শ করে আনুপাতিক হ্রাসের এই সমাধানে ইজমায় পৌঁছান। অর্থাৎ যুক্তিটি সঠিক ও ন্যায়সংগত — এটি কুরআনের নির্ধারিত অনুপাতের যৌক্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক প্রয়োগ, যা সাহাবীদের ইজমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
🔹 কেন এটি “গাণিতিক ভুল” নয়
নাস্তিকদের যুক্তির মূল সমস্যা হলো তারা কুরআনের বেঁধে দেওয়া অংশগুলোকে “নিরঙ্কুশ স্থির সংখ্যা” মনে করেন। অথচ বাস্তবে এগুলো একে অপরের সাপেক্ষে “আপেক্ষিক অনুপাত” নির্দেশ করে — যেমন স্ত্রী ও কন্যাদের অনুপাত সবসময় ৩:১৬ থাকে, সম্পত্তি যত কমই হোক না কেন। এটি গণিতের সুপরিচিত নিয়ম (রেশিও-ভিত্তিক আনুপাতিক বণ্টন), যা প্রায় সব উত্তরাধিকার ও দেউলিয়া-বণ্টন আইনেই ব্যবহৃত হয়।
🔹 কুরআনের ন্যায়বিচারের নীতি
📖 (২:১৮৫) “এটি হেদায়াত ও ন্যায়বিচারের জন্য অবতীর্ণ” — এই মূলনীতির আলোকেই ফকীহগণ আওলের সমাধানে পৌঁছান।
সম্পত্তি বণ্টনের আগে বাধ্যতামূলক দুটি ধাপ —
১) মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ
২) তার ওয়াসিয়াত (উইল) কার্যকর করা — সর্বোচ্চ ১/৩ পর্যন্ত হতে পারে
📖 “…ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়ত পালনের পর…” (আন-নিসা ৪:১১, ৪:১২)
তাছাড়া —
📖 “বণ্টনকালে আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম ও মিসকীন উপস্থিত থাকলে তাদেরও কিছু দাও এবং তাদের সাথে ন্যায়সংগত কথা বলো” (আন-নিসা ৪:৮)
এটি আওলের বিকল্প নয়, বরং মূল উত্তরাধিকারের বাইরেও ইসলামের ন্যায়বিচারের বাড়তি একটি দিক প্রদর্শন করে।
🔹 কুরআনের মূল কথা: কুরআনের অংশগুলো নির্দিষ্ট অনুপাত নির্দেশ করে, অপরিবর্তনীয় দশমিক সংখ্যা নয়। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে (দাবিদার বেশি, সম্পত্তি সীমিত) সেই অনুপাত বজায় রেখে আনুপাতিক বণ্টনই প্রকৃত ইনসাফ। এটি কুরআনবিরোধী কোনো সমঝোতা নয় বরং কুরআনের প্রদত্ত ন্যায়নীতির বাস্তবসম্মত প্রয়োগ, যা সাহাবীদের ইজমা দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত।
কুরআনে ভুল আছে। এটি নিচের লিংকে প্রমাণসহ দিয়েছি। লিংকটি কপি করে গুগলে নিয়ে ঢুকে সম্পূর্ণ লেখাটা পড়েন। তারপর কমেন্ট করবেন। তার আগে কমেন্ট না করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
https://nusratmim456.blogspot.com/2026/06/blog-post.html
ধন্যবাদ।
কুরআনে গাণিতিক ভুল আছে। তার সুস্পষ্ট প্রমাণ নিচের লিংকে দেয়া হলো। লিংকটি কপি করে গুগলে নিয়ে খুলুন।
https://nusratmim456.blogspot.com/2026/06/blog-post.html
ধন্যবাদ।
@
Md. Nuruzzaman Khan
কুরআনের আয়াতে অংশগুলোকে কোনো “আপেক্ষিক অনুপাত” (Relative Ratio) হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি; বরং সরাসরি মোট পরিত্যক্ত সম্পত্তিকে ভিত্তি (Base) ধরে ভগ্নাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।সূরা নিসা ৪:১২-এ বলা হয়েছে: “…তাদের প্রাপ্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ ($১/৮$)” (مِمَّا تَرَكْتُمْ)।’আওল’ প্রয়োগ করলে স্ত্রী পান সম্পত্তির $১/৯$ অংশ ($৩/২৭$), যা সরাসরি পাঠের ($১/৮$) চেয়ে গাণিতিকভাবে কম। সমালোচকদের মতে, পাঠে যা বলা হয়েছে, মানুষ আইন প্রণয়ন করে তার চেয়ে কমিয়ে দিয়েছে।