জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামে দাসীবাজার ও নারীদাসী কেনাবেচা: নারীর শরীরের উন্মুক্ত নিলাম

প্রকাশিত: এপ্রিল 10, 2026 · লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন · 41 মিনিট পড়া

সারসংক্ষেপ

ইসলামের ইতিহাসে দাসবাজার কেবল মানুষ কেনাবেচার কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক প্রথা ছিল না; ধ্রুপদী ইসলামি ফিকহ এটিকে একটি সুসংগঠিত আইনগত ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল। দাস ও বিশেষত নারীদাসীদের ক্রয়-বিক্রয়, শরীর পরীক্ষা, ত্রুটি নির্ধারণ, ফেরত দেওয়া, মূল্যহ্রাস হিসাব করা এবং যৌন ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাই—এসব বিষয়ে বিস্তারিত বিধান তৈরি হয়েছিল। দাসীকে যৌন সম্ভোগের উদ্দেশ্যে কেনা হতে পারে বলে ফিকহে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে; এমনকি তার মুখ বা বগলের দুর্গন্ধ, কুমারীত্ব কিংবা শারীরিক অবস্থাও ক্রয়কৃত পণ্যের ত্রুটি ও বাজারমূল্যের প্রশ্ন হিসেবে বিচার করা হয়েছে।

দাসী কেনার সময় তার বুক, পিঠ, পায়ের নলি, নিতম্ব বা উরুর মধ্যবর্তী অংশ স্পর্শ ও পরীক্ষা করার বর্ণনা ধ্রুপদী উৎসে পাওয়া যায়। ইবনে উমরের মতো ব্যক্তিকে দাসবাজারে নারীদেহ স্পর্শ করে “এ তো কেবল একটি পণ্য” বলতে দেখা যায়। কিশোরী দাসীদের ক্ষেত্রেও শরীর উন্মুক্ত করে বাজারে প্রদর্শনের ফিকহি বিধান ছিল। একইভাবে কুমারী হিসেবে বিক্রি করা দাসী বাস্তবে কুমারী কি না তা যাচাই করার জন্য তার লজ্জাস্থান পরীক্ষা করার অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ধ্রুপদী ফিকহে কুমারীত্বকে সরাসরি আর্থিক মূল্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং সহবাসে কুমারীত্ব নষ্ট হলে দাসীর বাজারদর কত কমল তার হিসাব পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। [1] [2]

এই পণ্যায়ন যৌন ব্যবহারের পরেও শেষ হতো না। দাসীর সঙ্গে সহবাস করার পর কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তাকে ফেরত দেওয়ার বিধান ছিল; কুমারী হলে সহবাসের কারণে তার মূল্য যতটা কমেছে সেই অর্থ হিসাব করা হতো। সাহাবীদের বর্ণনাতেও এমন দাসী পাওয়া যায় যার সঙ্গে মালিক সহবাস ও আযল করার পর তাকে আবার বিক্রি করে দিয়েছেন। বনু মুস্তালিকের বন্দিনী নারীদের ক্ষেত্রেও মুসলিম যোদ্ধারা একই সঙ্গে তাদের যৌনভাবে ব্যবহার করতে এবং তাদের অর্থমূল্য বা মুক্তিপণের সম্ভাবনা অক্ষুণ্ণ রাখতে গর্ভধারণ এড়াতে চেয়েছিলেন। নবীর নির্দেশে দাস বিক্রি এবং একজন বন্দিনী নারীকে একাধিক দাসের বিনিময়ে হস্তান্তরের বর্ণনাও প্রাথমিক ইসলামি উৎসে সংরক্ষিত রয়েছে।

ফলে ইসলামের দাসবাজারকে “আশ্রয়”, “পুনর্বাসন” বা মানবিক কল্যাণের কোনো ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিক দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই আইনব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল মালিকানা এবং বাজারমূল্য: একজন মানুষকে কেনা যেত, বিক্রি করা যেত, অন্য মানুষের বিনিময়ে দেওয়া যেত, তার শরীর ক্রেতার সামনে পরীক্ষা করা যেত এবং তার যৌন ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা যেত। আধুনিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এটি মানুষের ব্যক্তিসত্তার সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি এবং মানবদেহকে বাণিজ্যযোগ্য সম্পদে পরিণত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। একবিংশ শতাব্দীতে আইসিস যখন ইয়াজিদি নারী ও শিশুদের বন্দী করে যৌনদাসী ও বাজারযোগ্য সম্পদে পরিণত করেছিল, তখন তারা শূন্য থেকে কোনো নতুন মতবাদ আবিষ্কার করেনি; তারা ধ্রুপদী দাসত্বের এমন একটি আইনি কাঠামোকেই পুনর্জীবিত করার দাবি করেছিল, যার বিধান আজও ইসলামি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে।


ভূমিকা: ধর্মের আবরণে এক অন্ধকার ইতিহাস

আধুনিক বিশ্বের নাগরিক হিসেবে আমরা যখন ‘মানবাধিকার’ বা ‘ব্যক্তিগত মর্যাদা’র কথা বলি, তখন আমাদের চেতনার মূলে থাকে প্রতিটি মানুষের সার্বভৌমত্ব। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ সবসময় এতটা মসৃণ বা মানবিক ছিল না। বিশেষ করে মধ্যযুগীয় সমাজব্যবস্থায় ‘দাসপ্রথা’ ছিল একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদণ্ড। আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে অনেক ধর্মতাত্ত্বিক বা ইতিহাসবিদ সেই সময়কার দাসপ্রথাকে ‘সহমর্মিতা’ বা ‘নিরাপত্তা’র মোড়কে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। দাবি করা হয় যে, আশ্রয়হীন নারী বা যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতেই নাকি তাঁদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আনা হয়েছিল। কিন্তু ধ্রুপদী উৎস এবং ইসলামী ফিকহ্ শাস্ত্রের (আইনশাস্ত্র) দালিলিক ব্যবচ্ছেদ করলে এক অত্যন্ত রূঢ় এবং বীভৎস সত্য বেরিয়ে আসে।

সেই সত্যটি হলো—প্রাচীন ও মধ্যযুগের দাসবাজারগুলো আসলে কোনো মানবিক আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের মাংসের এক বিশাল পণ্যশালা। সেখানে একজন নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং স্রেফ একটি ‘দ্রব্য’ বা ‘অংশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যার উপযোগিতা নির্ধারিত হতো তাঁর রূপ, বয়স এবং যৌন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। আধুনিক যুগের কোনো শিক্ষিত মানুষ যখন শোনেন যে, প্রকাশ্য বাজারে একজন নারীর বুক, পেট বা উরু স্পর্শ করে তাঁর ‘মান’ যাচাই করা আইনিভাবে বৈধ ছিল, তখন তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। একইসাথে প্রবল ঘৃণায় তারা আচ্ছন্ন হবেন, সেটিই স্বাভাবিক।

এই প্রবন্ধের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামের ইতিহাসে লুকিয়ে থাকা সেইসব ধ্রুপদী আইনগ্রন্থগুলোর (যেমন: আশরাফুল হিদায়া, মুখতাসারুল কুদুরী) আলোকে সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে তুলে ধরা, যা যুগের পর যুগ ‘আল্লাহর বিধানের’ দোহাই দিয়ে টিকে ছিল। আমরা দেখব কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিসত্তাকে পণ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং কীভাবে দয়া বা ইনসাফের বুলির আড়ালে একটি সুসংগঠিত যৌন লালসার বাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। যখন কোনো আইন বলে যে, কুমারীত্বের পর্দা অক্ষত না থাকলে ক্রেতা সেই ‘দ্রব্য’ বা নারীকে ফেরত দিতে পারবে, তখন বোঝা যায় সেই সমাজের নৈতিক মানদণ্ড কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।

আসুন, আমরা সাহসের সাথে ইতিহাসের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করি এবং নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করি—যেখানে মানুষ হয়ে উঠেছিল স্রেফ কেনাবেচার সামগ্রী।


ইসলামি বর্বরতার আধুনিক পুনরুত্থান: ISIS এবং যৌন দাসত্বের কালো অধ্যায়

অনেকে মনে করেন, মধ্যযুগীয় দাসপ্রথা বা নারী কেনাবেচার ইতিহাস কেবল কিতাব বা প্রাচীন লিপিতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছে ‘ইসলামিক স্টেট’ বা আইসিসের উত্থান, যারা আক্ষরিক অর্থেই ধ্রুপদী ফিকহ্ শাস্ত্রের সেইসব বিধানকে পুনরায় জীবিত করেছিল। ২০১৪ সালে উত্তর ইরাকের সিনজার পাহাড়ে ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর ওপর যে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, তা আধুনিক যুগের ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত নিধনের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ। আইসিস কেবল ইয়াজিদি পুরুষদের হত্যাই করেনি, বরং হাজার হাজার নারীকে বন্দী করে তাঁদের ওপর ‘সাবাওয়া’ (Sabaya) বা যুদ্ধবন্দী দাসীর বিধান কার্যকর করেছিল।

১. আইসিসের ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনি ভিত্তিঃ আইসিস তাদের এই কর্মকাণ্ডকে কেবল একটি অপরাধ হিসেবে দেখেনি, বরং তারা দাবি করেছিল যে তারা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ‘সুন্নত’ বা ধর্মীয় বিধানকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করছে। তাদের দাপ্তরিক ম্যাগাজিন ‘দাবিক’ (Dabiq)-এ তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে, অমুসলিম নারীদের দাসী বানানো এবং তাঁদের ওপর যৌন আধিপত্য বিস্তার করা একটি ঐশী পুরস্কার [3] [4] । তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, যে বিধান স্বয়ং নবীর সাহাবীরা আমল করেছেন এবং চার মাজহাবের চারজন ইমাম সহকারে সকল ধ্রুপদী আলেম ওলামাদের যে বিষয়ে ঐক্যমত্য আছে, যা ইসলামি ফিকহের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এখনো গ্রন্থগুলোর পাতায় পাতায় আছে, একইসাথে ইমাম কুদুরী বা হিদায়ার মতো প্রামাণ্য কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে, তা কখনও অবৈধ হতে পারে না। এই দাবিটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ফিকহ্ শাস্ত্রের সেই প্রাচীন বিধানগুলো আধুনিক অপরাধীদের জন্য কতটা শক্তিশালী ‘আইনি ঢাল’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

২. আধুনিক দাসবাজারের দৃশ্যপটঃ আইসিসের নিয়ন্ত্রিত রাক্কা বা মসুলের বাজারে ইয়াজিদি নারীদের যেভাবে নিলামে তোলা হয়েছিল, তা ছিল মধ্যযুগীয় দাসবাজারের এক কার্বন কপি। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও এবং বেঁচে ফেরা নারীদের বয়ান অনুযায়ী, বাজারে ক্রেতারা নারীদের মুখ, দাঁত এবং শরীর পরীক্ষা করে দেখত। আইসিসের জারি করা একটি মূল্য তালিকায় দেখা গিয়েছিল, ৯ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের দাম সবচেয়ে বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল—প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ইরাকি দিনার বা ১৭০ ডলারের কাছাকাছি [5]। এটি সরাসরি সেই ফিকহী মাসআলার কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে বলা হয়েছে যে সাত বা নয় বছরের কিশোরী যদি কামভাবের পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে তাঁকে বাজারে পেশ করাতে কোনো দোষ নেই।

৩. যৌন দাসত্ব ও পদ্ধতিগত নির্যাতনঃ আইসিস যোদ্ধাদের জন্য একটি হ্যান্ডবুক বা নির্দেশিকা তৈরি করেছিল, যেখানে বন্দিনী নারীদের সাথে সহবাসের নিয়মাবলী লেখা ছিল। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছিল যে, বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়নি এমন নাবালিকা দাসীর সাথেও যৌন মিলন করা বৈধ, যদি সে শারীরিকভাবে সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। এই বিধানটি মূলত ধ্রুপদী ফিকহ্ শাস্ত্রের সেইসব মাসআলারই আধুনিক সংস্করণ, যা আমরা আশরাফুল হিদায়া বা মুখতাসারুল কুদুরীতে পাই। অর্থাৎ, এক হাজার বছর আগে যে আইনগুলো বাজারে পণ্য যাচাইয়ের দোহাই দিয়ে বুক বা পেট স্পর্শ করাকে বৈধ করেছিল, আধুনিক আইসিস সেই একই যুক্তি ব্যবহার করে হাজার হাজার নারীর জীবন ধ্বংস করেছে।

৪. নৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াঃ আইসিসের এই বর্বরতা প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় নصوص বা আইনের যখন কোনো মানবিক সংস্কার হয় না, তখন তা যেকোনো সময় আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়ে আধুনিক সভ্যতাকে গ্রাস করতে পারে। ইয়াজিদি নারীরা যখন তাঁদের ওপর চলা গণধর্ষণ ও কেনাবেচার বর্ণনা দেন, তখন তা কেবল আইসিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে না, বরং সেই বিচারব্যবস্থার প্রতিও বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—যা একজন মানুষকে পণ্য হিসেবে গণ্য করার স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করলেও, এই অপরাধের তাত্ত্বিক শেকড়গুলো কিন্তু আজও অনেক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘অপরিবর্তনীয় ঐশী বিধান’ হিসেবে পড়ানো হয়।


মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক: সাহাবিদের দাসী-পরীক্ষা

দাসবাজারে নারীর শরীর উন্মুক্ত করা ও স্পর্শ করার বিধান শুধু পরবর্তী যুগের ফকিহদের তাত্ত্বিক আলোচনা ছিল না। প্রাচীনতম হাদিস ও আছারসংকলনগুলোর অন্যতম মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক-এ দাসী কেনাবেচার বাস্তব দৃশ্যও সংরক্ষিত হয়েছে। গ্রন্থটির সংকলক আবদুর রাযযাক ইবনু হাম্মাম আস-সানআনী (১২৬–২১১ হিজরি) নববী হাদিসের পাশাপাশি সাহাবি ও তাবেঈদের বক্তব্য এবং প্রাথমিক ইসলামি আইনচর্চা লিপিবদ্ধ করেছেন। গ্রন্থটির পরপর কয়েকটি বর্ণনায় দেখা যায়, দাসী কেনার আগে তার পায়ের গোছা, পেট, পিঠ ও নিতম্ব উন্মুক্ত করা, বুক ও নিতম্ব স্পর্শ করা এবং তাকে ঝাঁকিয়ে পরীক্ষা করাকে বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে। [6]

হাদিস ১৩,২০২–১৩,২০৪ একই ঘটনার পরস্পর-সমর্থনকারী কয়েকটি পাঠ। মুজাহিদের বর্ণনা অনুসারে, একদল ক্রেতা একটি দাসীকে উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করছিল। ইবনু উমরকে দেখে তারা থেমে গেলে ইবনু উমর নিজেই দাসীটির পায়ের গোছা উন্মুক্ত করেন, তার বুকে হাত দেন এবং ক্রেতাদের তাকে কিনতে বলেন। অপর পাঠে বলা হয়েছে, তিনি দাসীটির দুই স্তনের মাঝখানে হাত রেখে তাকে ঝাঁকিয়েছিলেন।

মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক
দাসী কেনার আগে তাকে পরীক্ষা করা প্রসঙ্গে
হাদিস ১৩,২০২
মূল আরবি
عَنْ مَعْمَرٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: مَرَّ ابْنُ عُمَرَ عَلَى قَوْمٍ يَبْتَاعُونَ جَارِيَةً، فَلَمَّا رَأَوْهُ وَهُمْ يُقَلِّبُونَهَا، أَمْسَكُوا عَنْ ذَلِكَ، فَجَاءَهُمُ ابْنُ عُمَرَ، فَكَشَفَ عَنْ سَاقِهَا، ثُمَّ دَفَعَ فِي صَدْرِهَا، وَقَالَ: «اشْتَرُوا». قَالَ مَعْمَرٌ، وَأَخْبَرَنِي ابْنُ أَبِي نَجِيحٍ، عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: وَضَعَ ابْنُ عُمَرَ يَدَهُ بَيْنَ ثَدْيَيْهَا، ثُمَّ هَزَّهَا
বাংলা অনুবাদ
মুজাহিদ বলেন: ইবনু উমর একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা একটি দাসী কিনছিল। তারা দাসীটিকে উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করার সময় ইবনু উমরকে দেখে সেই কাজ বন্ধ করে দিল। ইবনু উমর তাদের কাছে গিয়ে দাসীটির পায়ের গোছা উন্মুক্ত করলেন, এরপর তার বুকে ধাক্কা দিয়ে বললেন, “তোমরা কিনে নাও।” মা‘মার আরও বলেন, ইবনু আবি নাজিহ আমাকে মুজাহিদ থেকে জানিয়েছেন: ইবনু উমর দাসীটির দুই স্তনের মাঝখানে হাত রাখলেন, এরপর তাকে ঝাঁকালেন।

মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক
হাদিস ১৩,২০৩
মূল আরবি
عَنِ ابْنِ عُيَيْنَةَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: كُنْتُ مَعَ ابْنِ عُمَرَ فِي السُّوقِ، فَأَبْصَرَ بِجَارِيَةٍ تُبَاعُ، فَكَشَفَ عَنْ سَاقِهَا، وَصَكَّ فِي صَدْرِهَا، وَقَالَ: «اشْتَرُوا». يُرِيهِمْ أَنَّهُ لَا بَأْسَ بِذَلِكَ
বাংলা অনুবাদ
মুজাহিদ বলেন: আমি ইবনু উমরের সঙ্গে বাজারে ছিলাম। তিনি একটি দাসীকে বিক্রি হতে দেখলেন। তখন তিনি তার পায়ের গোছা উন্মুক্ত করলেন, তার বুকে আঘাত করলেন এবং বললেন, “তোমরা কিনে নাও।” তিনি তাদের দেখাচ্ছিলেন যে, এই কাজে কোনো দোষ নেই।

বর্ণনাটির শেষ বাক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: ইবনু উমর ক্রেতাদের দেখাচ্ছিলেন যে, দাসীটির শরীর উন্মুক্ত করা ও বুকে হাত দেওয়ায় “কোনো দোষ নেই”। অর্থাৎ ঘটনাটি কোনো অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ বা ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম হিসেবে বর্ণিত হয়নি; এটি ক্রেতাদের সামনে বৈধ বাজারি আচরণের প্রদর্শন। হাদিস ১৩,২০৪-এ একই ঘটনার সংক্ষিপ্ত পাঠে আবার বলা হয়েছে, ইবনু উমর দাসীটির দুই স্তনের মাঝখানে হাত রেখে তাকে ঝাঁকিয়েছিলেন। [7]

মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক
হাদিস ১৩,২০৫
মূল আরবি
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ نَافِعٍ، أَنَّ ابْنَ عُمَرَ: «كَانَ يَكْشِفُ عَنْ ظَهْرِهَا، وَبَطْنِهَا، وَسَاقِهَا، وَيَضَعُ يَدَهُ عَلَى عَجُزِهَا»
বাংলা অনুবাদ
নাফি থেকে বর্ণিত, ইবনু উমর দাসীটির পিঠ, পেট ও পায়ের গোছা উন্মুক্ত করতেন এবং তার নিতম্বের ওপর হাত রাখতেন।

এখানে দাসীটির শরীরের যেসব অংশের তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যপরীক্ষার সীমায় আবদ্ধ নয়: পিঠ, পেট, পায়ের গোছা, স্তনের মধ্যবর্তী অংশ এবং নিতম্ব। ক্রেতার দৃষ্টি ও স্পর্শের সামনে নারীটির শরীরকে একটি পরীক্ষাযোগ্য পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। তার অনুমতি, আপত্তি কিংবা ব্যক্তিগত সীমার কোনো উল্লেখ নেই। বাজারে উপস্থিত পুরুষদের ক্রয়-সিদ্ধান্তই একমাত্র বিবেচ্য বিষয়; যে নারীকে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার শরীরের ওপর তার নিজের কোনো কর্তৃত্ব স্বীকৃত হয়নি।

পরবর্তী দুটি বর্ণনা এই আচরণকে আরও সাধারণ আইনগত ভাষায় প্রকাশ করেছে। ইবনুল মুসাইয়িবের নামে সংরক্ষিত বর্ণনায় লজ্জাস্থান ছাড়া দাসীটির পুরো শরীর দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শা‘বীর বক্তব্যে বিষয়টি আরও সরাসরি: কোনো পুরুষ দাসী কিনতে গেলে সে তার লজ্জাস্থান ছাড়া সম্পূর্ণ শরীর দেখতে পারবে।

মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক
হাদিস ১৩,২০৬
মূল আরবি
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ رَجُلٍ، عَنِ ابْنِ الْمُسَيِّبِ، أَنَّهُ قَالَ: «يَحِلُّ لَهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى كُلِّ شَيْءٍ فِيهَا، مَا عَدَا فَرْجَهَا»
বাংলা অনুবাদ
ইবনুল মুসাইয়িব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: তার জন্য দাসীটির লজ্জাস্থান ছাড়া শরীরের সমস্ত অংশের দিকে তাকানো বৈধ।

হাদিস ১৩,২০৭
মূল আরবি
عَنِ الثَّوْرِيِّ، عَنْ جَابِرٍ، عَنِ الشَّعْبِيِّ قَالَ: «إِذَا كَانَ الرَّجُلُ يَبْتَاعُ الْأَمَةَ، فَإِنَّهُ يَنْظُرُ إِلَى كُلِّهَا إِلَّا الْفَرْجَ»
বাংলা অনুবাদ
শা‘বী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: কোনো পুরুষ যখন একটি দাসী ক্রয় করে, তখন সে তার লজ্জাস্থান ছাড়া সম্পূর্ণ শরীর দেখতে পারবে।

এই বিধানকে কোনো চিকিৎসা, নিরাপত্তা বা নারীর কল্যাণের ব্যবস্থা বলা মিথ্যা। উদ্দেশ্যটি বর্ণনার মধ্যেই পরিষ্কার—পুরুষটি নারীকে কিনছে, তাই কেনার আগে তার শরীর দেখছে। স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে যে দেহগত গোপনীয়তা ও পর্দাকে ধর্মীয় মর্যাদার বিষয় বানানো হয়েছে, দাসীর ক্ষেত্রে বাজারি স্বার্থের সামনে সেটিই বিলুপ্ত। তার লজ্জাস্থানটুকু বাদ দিয়ে অবশিষ্ট শরীরকে ক্রেতার পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষ ও পণ্যের মধ্যকার আইনি সীমারেখা এখানে কার্যত মুছে গেছে।

আলীর নামে সংরক্ষিত পরবর্তী বর্ণনাটি এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত মানসিকতাকে সবচেয়ে নগ্ন ভাষায় প্রকাশ করে। বিক্রির জন্য দাঁড় করানো দাসীর পায়ের গোছা, নিতম্ব ও পেট দেখা যাবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “তার কোনো মর্যাদা বা দেহগত গোপনীয়তা নেই; তাকে দর-কষাকষির জন্যই দাঁড় করানো হয়েছে।”

মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক
হাদিস ১৩,২০৮
মূল আরবি
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ قَالَ: أَخْبَرَنِي مَنْ أُصَدِّقُ عَمَّنْ، سَمِعَ عَلِيًّا، يُسْأَلُ عَنِ الْأَمَةِ تُبَاعُ أَيَنْظُرُ إِلَى سَاقِهَا، وَعَجُزِهَا، وَإِلَى بَطْنِهَا؟ قَالَ: «لَا بَأْسَ بِذَلِكَ، لَا حُرْمَةَ لَهَا، إِنَّمَا وَقَفَتْ لِنُسَاوِمَهَا»
বাংলা অনুবাদ
আলীর কাছে বিক্রিযোগ্য দাসী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো: ক্রেতা কি তার পায়ের গোছা, নিতম্ব ও পেটের দিকে তাকাতে পারবে? তিনি বললেন: “এতে কোনো দোষ নেই। তার কোনো মর্যাদা বা দেহগত গোপনীয়তা নেই; তাকে তো দাঁড় করানোই হয়েছে যাতে আমরা তাকে নিয়ে দর-কষাকষি করতে পারি।”

মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক
হাদিস ১৩,২০৯
মূল আরবি
عَنِ الثَّوْرِيِّ، عَنْ عُبَيْدِ الْمَكْتَبِ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ بَعْضِ أَصْحَابِ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّهُ قَالَ فِي الْأَمَةِ: «تُبَاعُ مَا أُبَالِي إِيَّاهَا مَسَسْتُ، أَوِ الْحَائِطَ»
বাংলা অনুবাদ
আবদুল্লাহর কয়েকজন অনুসারীর সূত্রে দাসী সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে: “তাকে বিক্রি করা হবে। আমি তাকে স্পর্শ করেছি, নাকি দেয়াল স্পর্শ করেছি—তাতে আমার কিছু আসে যায় না।”

শেষ বক্তব্যটি দাসীটির ব্যক্তিসত্তা মুছে দেওয়ার চূড়ান্ত ভাষাগত প্রকাশ। একজন রক্ত-মাংসের নারীকে স্পর্শ করা এবং একটি নিষ্প্রাণ দেয়াল স্পর্শ করাকে একই স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই মানসিকতার ভেতরেই দাসবাজারের প্রকৃত নৈতিকতা ধরা পড়ে: দাসীর অনুভূতি, সম্মতি, লজ্জা বা শারীরিক সার্বভৌমত্বের কোনো মূল্য নেই; মূল্য আছে শুধু তার বিক্রয়যোগ্য শরীরের। ক্রেতা তাকে দেখবে, উন্মুক্ত করবে, স্পর্শ করবে, ঝাঁকিয়ে পরীক্ষা করবে এবং এরপর দর-কষাকষি করে কিনবে।

উৎস-সমালোচনার দিক থেকে বর্ণনাগুলোর সব সনদ একই শক্তির নয়। বিশেষত আলীর নামে বর্ণিত ১৩,২০৮ নম্বর আছারের সনদে অনির্দিষ্ট বর্ণনাকারী রয়েছে; তাই আলীর ব্যক্তিগত আচরণ প্রমাণের নিশ্চিত দলিল হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে না। কিন্তু অন্যান্য ঘটনা পরম্পরা পর্যালচনা করার পরে এতে মূল তথ্য বদলায় না। ইবনু উমরের ঘটনা মুজাহিদ থেকে একাধিক সূত্রে ১৩,২০২–১৩,২০৪ নম্বর বর্ণনায় এসেছে; নাফির সূত্রে ১৩,২০৫ নম্বর বর্ণনায়ও তার দাসীর পিঠ, পেট ও পায়ের গোছা উন্মুক্ত করা এবং নিতম্ব স্পর্শ করার কথা সংরক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি ১৩,২০৬–১৩,২০৭ নম্বর ফিকহি বক্তব্যগুলো দেখায় যে দাসী কেনার সময় তার শরীর দেখার অনুমোদন কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি প্রাথমিক ইসলামি যুগ, সেই যুগের সাহাবী-তাবেতাবেইন ও পরবর্তী সময়ে আইনচর্চার একটি স্বীকৃত বিষয় ছিল।

এই দলিলগুলোর সামনে দাসবাজারকে “মানবিক পুনর্বাসন”, “আশ্রয়দান” কিংবা দাসীদের সম্মান রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা নির্লজ্জ ইতিহাসবিকৃতি। আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের স্তনের মাঝখানে হাত দিয়ে ঝাঁকানো হয় না, নিতম্ব স্পর্শ করে মূল্য নির্ধারণ করা হয় না এবং তাদের শরীরকে দর-কষাকষির জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় না। এগুলো একটি সুসংগঠিত মানুষের বাজারের বৈশিষ্ট্য—যেখানে পুরুষ ছিল ক্রেতা ও মালিক, আর বন্দিনী নারী ছিল পরীক্ষা, ভোগ ও পুনর্বিক্রয়ের জন্য রাখা জীবন্ত পণ্য।


ইসলামিক আইনশাস্ত্র: ফিকাহ গ্রন্থগুলোর নির্লজ্জ প্রমাণ

পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি আইসিস কীভাবে মধ্যযুগীয় দাসপ্রথাকে আধুনিক যুগে ফিরিয়ে এনেছিল। এখন আমাদের প্রবেশ করতে হবে সেই আইনি প্রকোষ্ঠে, যা একজন মানুষকে কেবল একটি ‘দ্রব্য’ বা ‘অংশ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ধ্রুপদী ফিকহ গ্রন্থে দাসপ্রথা কেবল কোনো ‘উদ্ধার অভিযান’ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত ভোক্তা অধিকারের (Consumer Rights) মতো বিষয়, যেখানে ক্রেতার যৌন সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা দেওয়া হতো।


তাফসীরে মাযহারী: যুদ্ধবন্দিনী থেকে মালিকানাধীন যৌনসম্পত্তি

দাসবাজারের ক্রয়-বিক্রয়, মূল্য নির্ধারণ বা শরীর পরীক্ষার আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি মৌলিক প্রশ্ন পরিষ্কার করা জরুরি—এই নারীরা প্রথমে কীভাবে এমন মালিকানাধীন সম্পত্তিতে পরিণত হতেন, যাদের পরে কেনা, বিক্রি, দান বা যৌনভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতো? কোরআনের সূরা নিসার ২৪ নম্বর আয়াত এবং আওতাসের যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ব্যাখ্যায় তাফসীরে মাযহারী এই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। সেখানে বিবাহিত যুদ্ধবন্দিনী নারীদের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী স্বামী থাকা নতুন মালিকের সহবাসের পথে বাধা হিসেবে গণ্য করা হয়নি। যুদ্ধবন্দিত্বের মাধ্যমে নারীর ওপর যে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই মালিকানাই তার পূর্ববর্তী বৈবাহিক সম্পর্ক অকার্যকর করে নতুন মালিকের যৌন অধিকারের ভিত্তি তৈরি করে। [8]

তিবরানী হজরত ইবনে আব্বাসের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন এভাবে—এই আয়াত নাজিল হয়েছে হুনাইন যুদ্ধের সময়। যুদ্ধজয়ের পর আহলে কিতাবদের কতিপয় রমণী মুসলমানদের অধিকারাধীনা হয়। তারা ছিলো সধবা। মুসলমানদের মধ্যে যাঁরা তাদেরকে পেয়েছিলেন, তাঁরা তাদেরকে সম্ভোগ করতে চাইলে তারা বলে উঠলো, আমাদের তো স্বামী আছে। একথা রসুল স. কে জানানো হলো। তখন অবতীর্ণ হলো এই আয়াত।
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, যুদ্ধবন্দিনীদের সঙ্গে তাদের মালিকেরা সহবাস করতে পারবে। তাদের স্বামী থাকলেও তারা বিবাহবিচ্যুতা বলে গণ্য হবে। স্বামী না থাকলেতো হবেই।
বন্দিনীদের মালিকেরা তাদের অধিকৃতাদেরকে অন্যত্র বিয়েও দিয়ে দিতে পারে। অধিকৃতা বলেই পারে (অধিকার অর্থ বন্দিনীর অস্তিত্বের উপর বন্দীকারীর সার্বিক অধিকার)। ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদ এরকমই বলেছেন।

তাফসীরে মাযহারী—যুদ্ধবন্দিনী নারীর ওপর মালিকানা ও সহবাসের বিধান

এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি হলো “বন্দিনীর অস্তিত্বের উপর বন্দীকারীর সার্বিক অধিকার”। অর্থাৎ যুদ্ধজয়ের ফলে শুধু নারীর শ্রম বা কোনো নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর অধিকার সৃষ্টি হচ্ছে না; নারীটির অস্তিত্বকেই মালিকানার অধীন বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আর সেই মালিকানার প্রত্যক্ষ আইনি ফল হচ্ছে তার পূর্ববর্তী বিবাহ ভেঙে যাওয়া, নতুন মালিকের জন্য তার সঙ্গে সহবাস বৈধ হওয়া এবং মালিকের ইচ্ছায় তাকে অন্যত্র বিবাহ দেওয়ার ক্ষমতা। এরপর যখন একই নারীকে দাসবাজারে কেনা-বেচা, শরীর পরীক্ষা, যৌন উপযোগিতা যাচাই বা পুনর্বিক্রয়ের বিধানগুলোতে দেখি, তখন সেগুলো আর বিচ্ছিন্ন কিছু মাসআলা থাকে না; সেগুলো এই মৌলিক মালিকানার ধারণারই অর্থনৈতিক ও যৌন পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়।


নারীর শরীরের উন্মুক্ত প্রদর্শনী: যৌনদাসী ক্রয়ের ‘রিটার্ন পলিসি’

ইমাম কুদুরী তাঁর গ্রন্থে দাসীকে সরাসরি একটি ‘দ্রব্য’ (Goods) হিসেবে গণ্য করেছেন। আধুনিক যুগে আমরা যেমন কোনো ত্রুটিপূর্ণ পণ্য ফেরত দিই, ফিকহ শাস্ত্রেও দাসীর ক্ষেত্রে ঠিক একই নিয়ম রাখা হয়েছে। যদি কোনো দাসী ক্রয় করার পর দেখা যায় তার মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ আছে, তবে ক্রেতা সেই ‘পণ্য’ বা নারীকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দিতে পারবেন।

এর পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত অবমাননাকর: বলা হয়েছে, দাসী যেহেতু যৌন সম্ভোগের (Sexual Intercourse) উদ্দেশ্যে কেনা হয়, তাই শারীরিক দুর্গন্ধ সেই মিলনের পথে একটি ‘দোষ’ বা অন্তরায়। পক্ষান্তরে, পুরুষ দাসের ক্ষেত্রে এই দুর্গন্ধ তেমন বড় কোনো ত্রুটি নয়, কারণ তার প্রধান কাজ হলো হাড়ভাঙা খাটুনি দেওয়া। অর্থাৎ, একজন নারীর সত্তাকে এখানে কেবল তার সুগন্ধ বা যৌন লালসা মেটানোর ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয়েছে। [9]

والبخر والذفر عيب الخ -এর আলোচনা: অর্থাৎ কোন দাসী ক্রয় করার পর যদি তার মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ
অনুভূত হয় অথবা সে ব্যভিচারিণী বা জারজ বলে প্রমাণিত হয়; তবে তাকে ফেরত দেয়া যাবে। কারণ অনেক সময় দাসী যৌন সম্ভোগের উদ্দেশ্যেও ক্রয় করা হয়। আর শারীরিক ও চারিত্রিক এ সব দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা তখন মিলনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং দাসীর ক্ষেত্রে এগুলো দোষ। পক্ষান্তরে গোলাম দ্বারা উদ্দেশ্য থাকে গৃহস্থালীর কাজকর্ম সম্পন্ন করা। আর এ সকল ত্রুটি সাধারণত গৃহস্থালীর কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না। তদুপরি দুর্গন্ধ যদি অতিশয় হয় অথবা ব্যভিচার তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে থাকে, তবে তা দোষের মধ্যে গণ্য হবে। এতে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, দ্রব্যের মধ্যকার ত্রুটি যদি এমন হয় যা থেকে দ্রব্য সাধারণত মুক্ত হতে পারে না, যেমন এক মণ সরিষার মধ্যে পোয়া, দেড় পোয়া ধান বা কলাই থাকা- দূষণীয় নয়। কিন্তু ধুলাবালি বা কলাইর পরিমাণ যদি এক-দুই কেজি হয়, তবে অবশ্যই তা দোষের মধ্যে পরিগণিত হবে।

দাস 130

এই ‘রিটার্ন পলিসি’ যে কেবল দুর্গন্ধ বা বাহ্যিক ত্রুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, ইমাম মালিকের আল-মুওয়াত্তা-র একটি বিধান তা আরও নগ্নভাবে দেখায়। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি একটি দাসী কেনার পর তার সঙ্গে সহবাস করে এবং পরে দাসীটির মধ্যে এমন কোনো পূর্ববর্তী ত্রুটি আবিষ্কার করে যার কারণে তাকে ফেরত দেওয়ার অধিকার সৃষ্টি হয়, তাহলে সহবাস হয়ে যাওয়ার পরও তাকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়া যাবে। কিন্তু দাসীটি যদি কুমারী হয়ে থাকে, তাহলে ক্রেতার সহবাসের কারণে তার বাজারমূল্য যতটা কমেছে ক্রেতাকে সেই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। আর দাসীটি যদি আগে থেকেই অকুমারী হয়ে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করার জন্য ক্রেতাকে কোনো অর্থ দিতে হবে না। অর্থাৎ এখানে একজন নারীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কের পর হিসাব করা হচ্ছে তার মানসিক অবস্থা, ইচ্ছা বা অপমানের ক্ষতি নয়; হিসাব করা হচ্ছে যৌন ব্যবহারের ফলে ক্রয়কৃত ‘সম্পত্তিটির’ বাজারদর কতটা কমেছে। [10]

قال مالك الأمر المجتمع عليه عندنا أن من رد وليدة من عيب وجده بها وكان قد أصابها أنها إن كانت بكرا فعليه ما نقص من ثمنها وإن كانت ثيبا فليس عليه في إصابته إياها شيء لأنه كان ضامنا لها
বাংলা অনুবাদ: ইমাম মালিক বলেন, আমাদের নিকট স্বীকৃত বিধান হলো—কোনো ব্যক্তি যদি একটি দাসীর মধ্যে ত্রুটি পাওয়ার কারণে তাকে ফেরত দেয় এবং ইতোমধ্যে তার সঙ্গে সহবাস করে থাকে, তাহলে দাসীটি কুমারী হলে তার সহবাসের কারণে দাসীর মূল্য যতটা কমেছে তা তাকে পরিশোধ করতে হবে। আর সে যদি অকুমারী হয়ে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করার কারণে ক্রেতার ওপর কিছুই বর্তাবে না; কারণ সে তখন তার দায়ভার বহনকারী মালিক ছিল।

এই বিধানের ভাষা দাসবাজারের অর্থনৈতিক চরিত্রকে অস্পষ্ট রাখে না। একই অধ্যায়ে দাস-দাসীর ত্রুটি, ত্রুটির কারণে মূল্য কতটা কমবে, কোন অবস্থায় ক্রয় বাতিল হবে এবং এমনকি একজন দাসীর বিনিময়ে দুইজন দাসী দেওয়া হলে তাদের পৃথক বাজারমূল্যের অনুপাত কীভাবে হিসাব করা হবে—এসব নিয়েও বিস্তারিত বিধান রয়েছে। একজন মানুষ এখানে আইনগত লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ পণ্য: তাকে কেনা যায়, ব্যবহার করা যায়, তার শরীরের পরিবর্তনে আর্থিক অবচয় হিসাব করা যায় এবং প্রয়োজন হলে আবার বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়া যায়। আধুনিক বাজারে ব্যবহৃত পণ্যের depreciation হিসাব করার সঙ্গে এর কাঠামোগত পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কঠিন; পার্থক্য শুধু এতটুকু যে এখানে ‘পণ্যটি’ একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। [11]

কুদুরী (আরবি-বাংলা) ২৩০ কিতাবুল বুয়ুই
… এর আলোচনাঃ ক্রয়কৃত বস্তুতে দোষ-ত্রুটি দেখা দেয়ার পর তা ফিরিয়ে দেয়া বা পূর্ণ থাকার কারণ হল, মতলক আকদের চাহিদা হল, তা ত্রুটিমুক্ত হওয়া। তবে এ টা কয়েকটি শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। (১) সে ত্রুটি বিক্রেতার নিকট থাকতেই ছিল, ক্রেতার হস্তক্ষেপের পর সৃষ্টি হয়নি। (২) ক্রেতার ক্রয় করার সময় ত্রুটি সম্পর্কে অনবগত হওয়া (৩) এবং হস্তগত করার সময়ও সে ত্রুটি সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকা। (৪) ক্রেতা কষ্ট ব্যতীত ত্রুটি বিদূরীত করতে সক্ষম না হওয়া। (৫) এ ত্রুটি এবং সকল ত্রুটিমুক্ত হওয়ার শর্ত যদি না করা হয় এবং আবূদ ভঙ্গ হওয়ার পূর্বে তা দূর হওয়া যদি সম্ভব না হয় ।
লো তা JS, -এর আলোচনা ঃ পণ্য দ্রব্যের যে কোন দোষ-ত্রুটিকে মনগড়া ভাবে ‘দোষ’ বলে অভিহিত করা যাবে না; বরং ব্যবসায়ীদের রীতি-রেওয়াজে যেটা ‘দোষ’ বলে স্বীকৃত তাই কেবল ‘দোষ’ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা ‘দোষ’ থাকলে দ্রব্যের মান ও মূল্যে কমতি দেখা দেয়। আর কোন দ্রব্যের মূল্য কমতি হল কিনা তার বিচার করার ভার ব্যবসায়ীদের ওপর। মনে রাখতে হবে আয়েব বা দোষ সম্পর্কিত এ ব্যাখ্যা বস্তুত একটি মূল সূত্র। এ সূত্র ধরে আরো অনেক মাসায়েল সংকলন করা সম্ভব। স্বয়ং গ্রন্থকারও এ সূত্রে সংকলনকৃত কয়েকটি মাসআলা পেশ করেছেন।
…-এর আলোচনাঃ কোন ক্রীতদাসের মধ্যে পলায়ন প্রভৃতি বদ অভ্যাসগুলো শৈশবে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যদি বালেগ হওয়ার পর মালিকের নিকট পুনরায় তা প্রকাশ পেয়ে না থাকে, তবে ক্রেতার অধিকারে এসে এর পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা দোষ হবে না। অর্থাৎ এটা দোষ তো বটেই, কিন্তু বিক্রেতার নিকট হতে উদ্ভূত দোষ বলে দাবি করা যাবে না এবং গোলামও ফেরত দেয়া যাবে না; বরং ধরে নিতে হবে এগুলো নব সৃষ্ট দোষ। অপর দিকে শৈশবকালীন এ কু-অভ্যাস গুলো যদি ক্রেতার নিকট নাবালেগ অবস্থায়ই প্রকাশ পায় কিংবা বালেগ অবস্থায় বিক্রেতার নিকট প্রকাশ পাওয়ার পর ক্রেতার নিকট এসে তার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা ফেরতযোগ্য দোষ বলে গণ্য হবে। কারণ এ সমস্ত দোষের শৈশবকালীন উৎস এবং বালেগ অবস্থার উৎস এক নয়; বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা শৈশবে পলায়ন করে থাকে খেলাধুলার মোহে, পক্ষান্তরে বালেগ হওয়ার পর তা করে চুরি বা বেপরোয়া মনোভাবের বশবর্তী হয়ে। উৎসের ভিন্নতার কারণে দোষও ভিন্ন হয়ে যায় । সুতরাং ক্রেতার নিকট প্রকাশিত দোষ তখন পূর্বের দোষ বলে দাবি করা চলে না ।
…-এর আলোচনাঃ অর্থাৎ কোন দাসী ক্রয় করার পর যদি তার মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ অনুভূত হয় অথবা সে ব্যভিচারিণী বা জারজ বলে প্রমাণিত হয়; তবে তাকে ফেরত দেয়া যাবে। কারণ অনেক সময় দাসী যৌন সম্ভোগের উদ্দেশ্যেও ক্রয় করা হয়। আর শারীরিক ও চারিত্রিক এ সব দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা তখন মিলনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় । সুতরাং দাসীর ক্ষেত্রে এগুলো দোষ। পক্ষান্তরে গোলাম দ্বারা উদ্দেশ্য থাকে গৃহস্থালীর কাজকর্ম সম্পন্ন করা। আর এ সকল ত্রুটি সাধারণত গৃহস্থালীর কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে না। তদুপরি দুর্গন্ধ যদি অতিশয় হয় অথবা ব্যভিচার তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে থাকে, তবে তা দোষের মধ্যে গণ্য হবে। এতে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, দ্রব্যের মধ্যকার ত্রুটি যদি এমন হয় যা থেকে দ্রব্য সাধারণত মুক্ত হতে পারে না, যেমন এক মণ সরিষার মধ্যে পোয়া, দেড় পোয়া ধান বা কলাই থাকা- দূষণীয় নয় । কিন্তু ধুলাবালি বা কলাইর পরিমাণ যদি এক-দুই কেজি হয়, তবে অবশ্যই তা দোষের মধ্যে পরিগণিত হবে।


স্পর্শ ও প্রদর্শনী: লাজলজ্জার সকল সীমার বিলুপ্তি

ইসলামী নীতিশাস্ত্রে ‘হায়া’ বা লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হলেও, দাসবাজারের ক্ষেত্রে সেই হায়া বা পর্দা কোথায় ছিল—তা একটি বড় প্রশ্ন। আশরাফুল হিদায়ার মাসআলা অনুযায়ী, ক্রেতা যদি কোনো দাসী কেনার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে সে দাসীর সেই সব অঙ্গ স্পর্শ করতে পারবে যা দেখা জায়েজ। এর মধ্যে রয়েছে বুক, পিঠ এবং পায়ের নলি। এমনকি স্পর্শের ফলে ক্রেতার মনে তীব্র যৌন উত্তেজনা বা কামভাব জাগ্রত হলেও শাস্ত্রীয়ভাবে একে ‘জায়েজ’ বা বৈধ বলা হয়েছে।

এই প্রদর্শনীর বীভৎসতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় কিশোরী দাসীদের ক্ষেত্রে। বালেগা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কিশোরী দাসীদের ঊর্ধ্বাংশ (বুক ও পিঠ) খোলা অবস্থায় বাজারে প্রদর্শন করা যেত। এমনকি সঙ্গমের উপযোগী ছোট শিশুদের (যাদের বয়স সাত বা নয় হতে পারে) বাজারে কেবল নিম্নাংশ ঢেকে প্রদর্শন করা হতো। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে মানুষের মর্যাদাকে এখানে ক্রয়-বিক্রয়ের মুনাফার নিচে বলি দেওয়া হয়েছিল। [12]

ইমাম কুদুরী (রহ.) তাঁর মুখতাসারুর কুদুরী গ্রন্থে বলেন, যদি কেউ দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করে তার জন্য দাসীর ঐ সকল অঙ্গসমূহ স্পর্শ করা জায়েজ, যা দেখা জায়েজ। এমনকি যদি স্পর্শ করার দ্বারা ক্রেতার মধ্যে কামভাব জাগ্রত হয়, তবুও।
মুসান্নিফ (রহ.) বলেন, ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) তাঁর জামিউস সাগীরের মধ্যে এইভাবেই মাসআলাটি বর্ণনা করেছেন। জামিউস সাগীরের ইবারত এই- “ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ও আবু ইউসুফ (রহ.) এ দুজন ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি কোন দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করেছে তার জন্য দাসীর পায়ের নলি, বুক ও হাত স্পর্শ করাতে কোন ক্ষতি বা দোষ নেই এবং এসব অঙ্গ অনাবৃত অবস্থায় দেখাতেও কোন সমস্যা নেই”। “কামভাব জাগ্রত হলেও স্পর্শ করা বৈধ হবে”।
“স্পর্শ করার দ্বারা কামভাব জাগ্রত হওয়ার আশংকা থাকলেও স্পর্শ করা জায়েজ। তাদের মতে ক্রয় করার উদ্দেশ্যে দাসীর দিকে তাকানো বৈধ, যদিও এতে উত্তেজিত হওয়ার আশংকা থাকে”।
“পূর্বযুগের ইমামগণ দাসী ক্রয় করার সময় তাদের ত্বক সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার উদ্দেশ্যে স্পর্শ করাকে বৈধ বলতেন, কেননা সেই সময়ের লোকজন সাধারণভাবে নেক ছিলেন”।
“পরবর্তীকালে ওলামাগণ কামভাব না থাকা অবস্থায় স্পর্শ করার অনুমতি দিয়েছেন। আর এর উপরেই বর্তমান ফতোয়া”।
“যখন কোন কিশোরী দাসী প্রথম ঋতুমতী হয় তারপর থেকে উক্ত দাসীকে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাজারে নিয়ে নিম্নাঙ্গ আবৃত হয় এমন এক কাপড় পরিয়ে তাকে দর্শন করানো যাবে না। কারণ ঋতুমতী হওয়ার অর্থ হল সে বালেগা হয়েছে। আর বালেগা দাসীর পেট ও পিঠ সতরের অন্তর্ভুক্ত যা ইতঃপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এখন যদি শুধুমাত্র নিম্নাঙ্গের পোশাক পরিধান করানো হয় তাহলে বুক ও পিঠ খোলা থাকবে তাই তাকে উর্ধাঙ্গের কামিস তথা পোশাক পরতে হবে। উল্লেখ্য যে ইজার এমন পোশাককে বলা হয় যার দ্বারা শুধুমাত্র নাভি থেকে নিচের অংশ ঢাকা যায়”।
“এ আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল এর চেয়ে কম বয়সী দাসীদের বুক পিঠ খোলা অবস্থায় বাজারে নিয়ে যাওয়াতে কোন দোষ নেই”।
“যে কিশোরী দাসী কামভাবের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে (অর্থাৎ সঙ্গমের উপযুক্ত হয়েছে, এতে সাত বা নয় বছর বয়সের কোন শর্ত নেই) তাকে বিক্রির জন্য এক কাপড়ে পেশ করা যাবে না”।

দাসীবাজার
দাসীবাজার 2

দাসী কেনার সময় যোনী পরীক্ষা করে কেনা

বিশ্ব মানবতার পথপ্রদর্শক নবী মুহাম্মদের সাহাবীগণ দাসবাজার থেকে সুন্দরী ভার্জিন বা কুমারী দাসী কিনে আনতো ভোগের জন্য। তাদের বাজারে কুমারী দাসীদের বাজার মূল্যও ছিল বেশি। কিন্তু মাঝে মাঝে কিনে আনা ক্রীতদাসীকে দেখা যেত, তারা ঠিক কুমারী নন। কুমারী যোনি যেহেতু মুহাম্মদের সাহাবীদের খুবই পছন্দের ছিল (আল্লাহ পাক বেহেশতেও কুমারী যোনির হুরের লোভ দেখিয়েছেন), দাসীদের এনে বিছানায় তোলার পরে যদি দেখা যেতো কুমারী যোনির পর্দা ফেটে যথেষ্ট রক্তরক্তি হচ্ছে না, অথবা সাহাবীরা সঙ্গম করে ঠিক মজা পাচ্ছে না যোনি যথেষ্ট টাইট না হওয়ার জন্য, তখন নবীর সাহাবীগণ ক্ষেপে যেতো। কারণ তারা তো পয়সা দিয়েছিল কুমারী বা ভার্জিন মেয়ের জন্য! মানে তারা ভাবতো, পুরো টাকাই গচ্চা গেল!

এই বিষয়ে আশরাফুল হিদায়াতে যে মাসআলাটি দেওয়া আছে, সেটি হচ্ছে, এরকম হলে যাচাই করার জন্য মালিক দাসীর লজ্জাস্থান বা যোনি পরীক্ষা করে দেখতে পারবে। এসব ফিকহি বিধান পড়লে বোঝা যায়, সাহাবীদের মধ্যে দাসবাজারে ‘ভার্জিন’ বা কুমারী দাসীদের চাহিদা ও মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। আর এই চাহিদাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আরও এক পৈশাচিক আইনি বিধান। যদি কোনো মালিক কুমারী হিসেবে কোনো নারীকে ক্রয় করার পর দাবি করেন যে তিনি কুমারী নন, তবে বিষয়টি যাচাই করার জন্য ওই নারীর লজ্জাস্থান বা যোনি পরীক্ষা করা বৈধ করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পরীক্ষাটি কীভাবে করা হতো? টু ফিঙ্গার টেস্ট?

কুমারী দাসীর বাজারমূল্য বেশি ছিল—এই কথাটি কোনো আধুনিক সমালোচকের অনুমানও নয়। হানাফি মাযহাবের অন্যতম প্রধান ফকিহ শামসুল আইম্মা সারাখসী তাঁর বিখ্যাত আল-মাবসুত গ্রন্থে দাসীর কুমারীত্ব সম্পর্কে সরাসরি লিখেছেন, “البكارة في حكم جزء من المالية”—অর্থাৎ “কুমারীত্বকে আর্থিক মূল্যের একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্রেতার সহবাসের কারণে কোনো কুমারী দাসীর কুমারীত্ব নষ্ট হলে তার মালিয়াত বা আর্থিক মূল্যের একটি অংশ নষ্ট হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং সে অনুযায়ী ক্রয়মূল্যের অংশ হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ দাসীর কুমারীত্ব এখানে কোনো ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা বা তার নিজস্ব যৌন ইতিহাস নয়; এটি ক্রয়কৃত সম্পত্তির এমন একটি মূল্যবান বৈশিষ্ট্য, যার ক্ষতিকে মুদ্রায় পরিমাপ করা যায়। [13]

وإن كانت بكرا أو كان الوطء نقصها … لأنه فات جزء من ماليتها بفعل المشتري … وهذا لأن البكارة في حكم جزء من المالية
বাংলা অনুবাদ: যদি সে কুমারী হয় অথবা সহবাসের কারণে তার মূল্য কমে যায়, তাহলে সহবাসের ফলে তার আর্থিক মূল্যের যে অংশ নষ্ট হয়েছে সেই অনুপাতে ক্রয়মূল্যের অংশ ক্রেতার ওপর বর্তাবে। কারণ কুমারীত্বকে আর্থিক মূল্যের একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

শাফিঈ ফিকহেও একই অর্থনৈতিক মূল্যায়ন আরও সরাসরি ভাষায় পাওয়া যায়। ইমাম নববীর আল-মাজমূ‘ শরহুল মুহাযযাব-এ এমন দাসীর আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অকুমারী হিসেবে একটি দাসী ক্রয় করল কিন্তু পরে তাকে কুমারী অবস্থায় পেল—এই কারণে ক্রেতা তাকে ফেরত দিতে পারবে না। কারণ ফিকহের ভাষায়, “البكر أفضل من الثيب في الثمن”“দামের ক্ষেত্রে কুমারী অকুমারীর চেয়ে অধিক মূল্যবান।” আরও বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত পছন্দ এখানে বিচার্য নয়; বিচার্য হলো কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে বাজারদর বৃদ্ধি পায়। ফলে কুমারীত্ব পরীক্ষা, কুমারী হিসেবে বিক্রি, কুমারীত্ব নষ্ট হলে পণ্য ফেরত এবং মূল্যহ্রাসের হিসাব—এগুলো একই বাণিজ্যিক কাঠামোর পরস্পরসংযুক্ত অংশ। একটি নারীর যোনির অবস্থাও সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় নয়, বরং বাজারমূল্য নির্ধারণের একটি ‘বৈশিষ্ট্য’। [14]

وَإِنْ اشْتَرَاهَا عَلَى أَنَّهَا ثَيِّبٌ فَوَجَدَهَا بِكْرًا لَمْ يَثْبُتْ لَهُ الرَّدُّ … وَإِنَّمَا الِاعْتِبَارُ بِمَا يَزِيدُ فِي الثَّمَنِ، وَالْبِكْرُ أَفْضَلُ مِنْ الثَّيِّبِ فِي الثَّمَنِ
বাংলা অনুবাদ: যদি কেউ তাকে অকুমারী হিসেবে ক্রয় করে পরে কুমারী পায়, তাহলে তার ফেরত দেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না… কারণ এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ বিবেচ্য নয়; বিবেচ্য হলো কোন বৈশিষ্ট্য মূল্য বৃদ্ধি করে। আর দামের ক্ষেত্রে কুমারী অকুমারীর তুলনায় অধিক মূল্যবান।

ভেবে দেখুন, যে নারী যুদ্ধে তাঁর পরিবার হারিয়েছেন, তাঁকে এখন এক অপরিচিত পুরুষের সামনে স্রেফ তাঁর ‘পণ্যমূল্য’ যাচাইয়ের জন্য জননেন্দ্রিয় উন্মুক্ত করে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আধুনিক নীতিশাস্ত্রে একে সরাসরি Sexual Assault বা যৌন নিপীড়ন বলা হয়, অথচ ফিকহ শাস্ত্র একে ‘ব্যবসায়িক ইনসাফ’ হিসেবে বৈধতা দিয়েছে। এখানে নারীর সতীত্ব কোনো সম্মান নয়, বরং এটি কেবল একটি ‘মানদণ্ড’ যা দিয়ে তাঁর বাজারদর নির্ধারিত হতো। [15]

৬. অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো দাসীকে কুমারী হিসেবে ক্রয় করে। অতঃপর দেখে যে, উক্ত দাসীর কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু বিক্রেতা কুমারীত্ব নষ্ট হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তাহলে এরূপ অবস্থায় বিষয়টি যাচাই করার জন্য এক পর্যায়ে দাসীর লজ্জাস্থান পরীক্ষার উদ্দেশ্যে দেখা বৈধ

দাসীবাজার 4

ইসলামওয়েবঃ সর্বাধিক প্রভাবশালী ইসলামিক ওয়েবসাইট

এবারে আসুন বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী ইসলামিক ফতোয়া ওয়েবসাইট islamweb.net এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ পড়ি, [16]

المصنف
ابن أبي شيبة – عبد الله بن محمد بن أبي شيبة
جزء
5
صفحة
33
إظهار / إخفاء التشكيل بحث في الكتاب
2662 ( 29 ) الرجل يريد أن يشتري الجارية فيمسها
( 1 ) حدثنا جرير عن منصور عن مجاهد قال : كنت مع ابن عمر أمشي في السوق فإذا نحن بناس من النخاسين قد اجتمعوا على جارية يقلبونها ، فلما رأوا ابن عمر تنحوا وقالوا : ابن عمر قد جاء ، فدنا منها ابن عمر فلمس شيئا من جسدها وقال : أين أصحاب هذه الجارية ، إنما هي سلعة .
( 2 ) نا علي بن مسهر عن عبيد الله عن نافع عن ابن عمر أنه كان إذا أراد أن يشتري الجارية وضع يده على أليتيها أو بين فخذها وربما كشف عن ساقيها [ ص: 33 ]
( 3 ) حدثنا وكيع عن سفيان عن عبيد المكتب عن إبراهيم عن رجل من أصحاب عبد الله أنه قال : ما أبالي مسستها أو مسست هذا الحائط .
( 4 ) حدثنا وكيع عن عبد الله بن حبيب عن أبي جعفر أنه ساوم بجارية فوضع يده على ثدييها وصدرها .
( 5 ) حدثنا ابن مبارك عن الأوزاعي قال : سمعت عطاء وسئل عن الجواري اللاتي يبعن بمكة فكره النظر إليهن إلا لمن يريد أن يشتري .
( 6 ) حدثنا أزهر السمان عن ابن عون قال : كان محمد إذا بعث إليه بالجارية ينظر إليها كشف بين ساقيها وذراعيها .
( 7 ) حدثنا هشيم عن مغيرة عن إبراهيم أن صديقا له أسود كتب إليه أن يشتري له جارية ، ففعل فعاب شيئا من ساق الجارية ، قال : فبلغ ذلك الأسود من قوله فقال : ما أحب أني نظرت إلى ساقيها ولا إلى كذا وكذا .
( 8 ) حدثنا وكيع عن حماد بن سلمة عن حكيم الأثرم عن أبي تميمة عن أبي موسى أنه خطبهم فقال : لا أعلم رجلا اشترى جارية فنظر إلى ما دون الجارية وإلى ما فوق الركبة إلا عاقبته .

দাসীবাজার 6

বাংলা অনুবাদঃ মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌
অনুচ্ছেদ নং: ২৬৬২ (২৯) — কোনো ব্যক্তি যখন দাসী কেনার ইচ্ছা করে তখন তাকে স্পর্শ করা প্রসঙ্গে
১. মুজাহিদ থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি ইবনে ওমরের সাথে বাজারের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমরা দেখলাম যে একদল দাস ব্যবসায়ী (নখাসিন) একটি দাসীকে ঘিরে ধরেছে এবং তাকে উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করছে (যাচাই করছে)। যখন তারা ইবনে ওমরকে দেখল, তারা সরে দাঁড়াল এবং বলল, “ইবনে ওমর এসেছেন।” তখন ইবনে ওমর সেই দাসীটির নিকটবর্তী হলেন এবং তার শরীরের কোনো একটি অংশ স্পর্শ করলেন। এরপর তিনি বললেন, “এই দাসীটির মালিকরা কোথায়? এটি তো কেবলই একটি পণ্য (Commodity)।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২০ )
২. আলী ইবনে মুসহির থেকে বর্ণিত (নাফে’র সূত্রে): ইবনে ওমর যখন কোনো দাসী কেনার ইচ্ছা করতেন, তখন তিনি তার নিতম্বের ওপর অথবা তার দুই উরুর মাঝখানে হাত রাখতেন এবং মাঝেমধ্যে তার দুই পায়ের নলা (Shins) উন্মোচিত করতেন। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২১ )
৩. ওকি’ থেকে বর্ণিত (ইব্রাহিমের সূত্রে): আব্দুল্লাহ (ইবনে মাসউদ)-এর একজন সঙ্গী বলতেন, “আমি তাকে (দাসীকে) স্পর্শ করলাম নাকি এই দেয়ালটি স্পর্শ করলাম—তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২২ )
৪. ওকি’ থেকে বর্ণিত (আবু জাফরের সূত্রে): আবু জাফর এক দাসীর দামাদামি করার সময় তার স্তনদ্বয় এবং বুকের ওপর হাত রাখলেন। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৩ )
৫. ইবনে মুবারক থেকে বর্ণিত (আতা’র সূত্রে): মক্কায় বিক্রয়যোগ্য দাসীদের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, যারা কেনার ইচ্ছা রাখে না তাদের জন্য এদের দিকে তাকানো অপছন্দনীয় (অর্থাৎ ক্রেতার জন্য তাকানো বৈধ)। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৪ )
৬. আজহার আস-সাম্মান থেকে বর্ণিত (ইবনে আউনের সূত্রে): মুহাম্মদ (ইবনে সীরীন)-এর কাছে যখন কোনো দাসী পাঠানো হতো, তখন তিনি তাকে দেখার সময় তার দুই পায়ের নলা এবং দুই বাহু উন্মুক্ত করে দেখতেন। ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৫ )
৭. হুশাইম থেকে বর্ণিত (ইব্রাহিমের সূত্রে): জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি ইব্রাহিমকে একটি দাসী কিনে দেওয়ার জন্য লিখেছিলেন। তিনি তা করলেন (দাসী কিনলেন) এবং সেই দাসীর পায়ের নলার কোনো একটি ত্রুটির সমালোচনা করলেন। যখন সেই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিটির কাছে এই কথা পৌঁছাল, তিনি বললেন, “আমি চাই না যে আমি তার পায়ের নলার দিকে কিংবা অমুক অমুক (অঙ্গের) দিকে তাকাই।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৬ )
৮. ওকি’ থেকে বর্ণিত (আবু মুসা আল-আশআরীর সূত্রে): আবু মুসা (রা.) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, “আমি যদি জানতে পারি যে কোনো ব্যক্তি দাসী কেনার সময় তার নাভির নিচের অংশ বা হাঁটুর ওপরের অংশের দিকে তাকিয়েছে, তবে আমি তাকে শাস্তি দেব।” ( মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ্‌, হাদিস নং: ২৬৬২৭ )
সারসংক্ষেপ: এই বর্ণনাগুলো স্পষ্ট করে যে, তৎকালে দাসী কেনা-বেচার সময় তাদের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঙ্গ (বুক, নিতম্ব, উরু) ক্রেতা বা পরীক্ষক হিসেবে সরাসরি স্পর্শ করা বা উন্মুক্ত করে দেখার প্রচলন ছিল। ইবনে ওমরের মতো ব্যক্তিদের উক্তি থেকে পরিষ্কার হয় যে, দাসীদের মানুষের পরিবর্তে নিছক ক্রয়যোগ্য ‘পণ্য’ বা ‘সামগ্রী’ হিসেবে গণ্য করা হতো।


যৌন ব্যবহার থেকে পুনর্বিক্রয়: নারী একইসাথে যৌনদাসী ও বাজারের পণ্য

দাসবাজারের ভয়াবহতা শুধু এই নয় যে, একজন নারীকে বাজারে দাঁড় করিয়ে তাঁর বুক, নিতম্ব, উরু বা শরীরের অন্য অংশ পরীক্ষা করা হতো। আরও ভয়াবহ সত্য হলো—ক্রেতা তাঁকে কিনে যৌনভাবে ব্যবহার করার পরও তিনি বাজারের পণ্য হিসেবেই থেকে যেতেন। সংশয়ের ইসলাম আর্কাইভে সংরক্ষিত সহিহ বুখারীর একটি বর্ণনায় এই অর্থনৈতিক ও যৌন সম্পর্কটি একই বাক্যে প্রকাশিত হয়েছে। আবু সাঈদ খুদরীর বর্ণনায় সাহাবীরা মুহাম্মদকে বলেন, “আমরা বন্দী দাসীর সাথে সংগত হই। কিন্তু আমরা তাদের (বিক্রয় করে) মূল্য হাসিল করতে চাই।” এরপরই তারা আযল সম্পর্কে জানতে চান। অর্থাৎ একই নারীকে যৌনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার তার গর্ভধারণ ঠেকিয়ে ভবিষ্যতে বিক্রি করে অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনাও রক্ষা করা হচ্ছে। নারীটি এখানে কোনো স্বাধীন যৌনসঙ্গী নন; তিনি একইসঙ্গে যৌন ব্যবহারের শরীর এবং পুনর্বিক্রয়যোগ্য অর্থনৈতিক সম্পদ। [17]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২০৮৮. আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, একদা তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বসা ছিলেন, তখন তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা বন্দী দাসীর সাথে সংগত হই। কিন্তু আমরা তাদের (বিক্রয় করে) মূল্য হাসিল করতে চাই। এমতাবস্থায় আযল (নিরুদ্ধ সঙ্গম) সম্পর্কে আপনি কি বলেন? তিনি বললেন, তোমরা কি এরূপ করে থাক? তোমরা যদি তা (আযল) না কর, তাতে তোমাদের কোনো ক্ষতি নেই। কারণ মহান আল্লাহ তা’আলা যে সন্তান জন্ম হওয়ার ফায়সালা করে রেখেছেন, তা অবশ্যই জন্মগ্রহণ করবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

এই হাদিসে আযল এবং দাসী বিক্রির অর্থনৈতিক সম্পর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাহাবীদের উদ্দেশ্য শুধু বন্দিনী নারীদের সঙ্গে সহবাস করা ছিল না; একই নারীদের পরবর্তীতে বিক্রি করে অর্থ লাভের বাসনাও ছিল। কিন্তু সহবাসের ফলে দাসী গর্ভবতী হয়ে সন্তান জন্ম দিলে সে উম্মে ওয়ালাদ হয়ে যেতে পারে এবং তখন তাকে বিক্রি করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আযল ছিল একই নারীকে যৌনভাবে ব্যবহার করার পাশাপাশি তার গর্ভধারণ ঠেকিয়ে ভবিষ্যৎ বাজারমূল্য এবং বিক্রিযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখার একটি উপায়। অর্থাৎ নারীটি একই সঙ্গে যৌন ব্যবহারের বস্তু এবং ভবিষ্যতে নগদ অর্থে রূপান্তরযোগ্য সম্পত্তি—এই দুই অর্থনৈতিক ও যৌন স্বার্থ একই হাদিসে একত্রিত হয়েছে। ইসলামি হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোও এই কারণটি সরাসরি উল্লেখ করেছে। [18] [19]

সহজ নসরুল বারীর ব্যাখ্যাঃ
আমরা যদি বাঁদীর সাথে আযল না করি, তাহলে বাঁদী উম্মে ওয়ালাদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ আমাদের মালের প্রতি মহব্বত আছে। আমরা তাকে বিক্রি করে তার মূল্য দ্বারা উপকৃত হতে চাই। কিন্তু উম্মে ওয়ালাদ হয়ে গেলে তাকে বিক্রয় করতে পারব না। এজন্য আমরা বাঁদীর সাথে আযল করতে চাই, যাতে বাঁদীর গর্ভ সঞ্চার না হয়।

দাসীবাজার 8
দাসীবাজার 10

এখানে বিষয়টি আর কোনো অনুমান নয়। প্রথমে দাসীর সঙ্গে সহবাস করা হচ্ছে; একই সঙ্গে তাকে গর্ভবতী হতে না দেওয়ার চেষ্টা চলছে; আর সেই গর্ভনিরোধের পেছনে ঘোষিত অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবিষ্যতে তাকে বিক্রি করে মূল্য লাভ করা। অর্থাৎ যৌন ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণ পরস্পরের বিপরীত ছিল না—বরং একই দাসীকে যৌনভাবে ব্যবহার করেও তার পুনর্বিক্রয়মূল্য সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা ছিল আযল। একজন নারীর গর্ভধারণও এখানে তার নিজের জীবন বা মাতৃত্বের প্রশ্ন হিসেবে নয়, মালিকের সম্পত্তির ভবিষ্যৎ বাজারযোগ্যতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মানুষের এই পুনর্বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তিগত অবস্থান মুহাম্মদের সময়ের একটি বিচ্ছিন্ন বাজার-প্রথা ছিল না। সংশয় ইসলাম আর্কাইভে সংরক্ষিত সুনান আবু দাউদের সহিহ বর্ণনায় জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ এবং আবু বকরের যুগে উম্মে ওয়ালাদ বাঁদীদেরকে বিক্রি করেছি। পরবর্তীতে উমরের যুগে তিনি আমাদের বারণ করায় আমরা বিরত হই।” একই অধ্যায়ের পরের সহিহ বর্ণনায় একজন ব্যক্তি নিজের একমাত্র দাসকে মুদাব্বার করেছিলেন—অর্থাৎ মালিকের মৃত্যুর পর তাকে মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু লোকটির অন্য কোনো সম্পদ না থাকায় মুহাম্মদ সেই দাসকে বিক্রি করার নির্দেশ দেন এবং তাকে সাতশ অথবা নয়শ আরবি মুদ্রায় বিক্রি করা হয়। অর্থাৎ এমনকি ভবিষ্যৎ মুক্তির প্রতিশ্রুতি পাওয়া একজন মানুষকেও আর্থিক প্রয়োজনের কারণে পুনরায় নগদ মূল্যে রূপান্তরযোগ্য সম্পদ হিসেবে বাজারে তোলা হয়েছে। [20]

সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৯৫৫:
“আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বাক্‌রের যুগে উম্মু ওয়ালাদ বাঁদীদেরকে বিক্রি করেছি। পরবর্তীতে ‘উমারের (রাঃ) যুগে তিনি আমাদের বারণ করায় আমরা বিরত হই।”
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৯৫৬:
“এক লোক তার কৃতদাসকে এরূপ শর্ত দিয়ে রাখলো যে, সে মারা গেলে সে আযাদ। অথচ গোলাম ব্যতীত তার কোনো সম্পদ ছিলো না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে এ গোলাম বিক্রি করার আদেশ দিলেন। অতঃপর তাকে সাতশো অথবা নয়শো আরবী মুদ্রায় বিক্রি করা হয়।”

তাফসীর আল-কুরতুবীর বক্তব্য এই সম্পত্তিগত যুক্তিকে আরও নগ্নভাবে প্রকাশ করে। বারবার ব্যভিচার করা দাসীকে বিক্রি করার নববী নির্দেশ আলোচনা করতে গিয়ে কুরতুবী প্রশ্ন তোলেন, বিক্রেতাকে যদি দাসীর এই ‘ত্রুটি’ ক্রেতাকে জানাতেই হয়, তাহলে অন্য কেউ তাকে কিনবে কেন? উত্তরে তিনি বলেন, “সে একটি সম্পদ”فَإِنَّهَا مَالٌ—তাই সম্পদ নষ্ট করা নিষিদ্ধ বলে তাকে ফেলে দেওয়া যাবে না; তাকে স্থায়ীভাবে আটকে রাখলেও মালিক তার উপযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবে; ফলে “তাকে বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না।” এখানে একজন নারীর জীবন নিয়ে ফিকহি সমাধানটি হচ্ছে নতুন একজন মালিক খুঁজে দেওয়া, যাতে সম্পত্তিটির আর্থিক ও ব্যবহারিক উপযোগিতা নষ্ট না হয়। [21]

মানুষ যে কেবল অর্থের বিনিময়েই নয়, অন্য মানুষের বিনিময়েও লেনদেনযোগ্য সম্পদ ছিল, খায়বারের সাফিয়্যার ঘটনাও তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। সংশয় ইসলাম আর্কাইভে সংরক্ষিত সহিহ ইবন হিব্বানের বর্ণনায় বলা হয়েছে, দিহয়া আল-কালবীর ভাগে একটি সুন্দরী দাসী পড়েছিল এবং মুহাম্মদ “সাতজন দাসের বিনিময়ে” তাকে দিহয়ার কাছ থেকে গ্রহণ করেন—فَاشْتَرَاهَا رَسُولُ اللَّهِ ... بِسَبْعَةِ أَرْؤُسٍ। এরপর সেই নারী সাফিয়্যাকে উম্মু সুলাইমের কাছে প্রস্তুত করার জন্য পাঠানো হয়। অর্থাৎ একজন যুদ্ধবন্দিনী নারীর মূল্য এখানে সরাসরি আরও সাতজন মানুষের সমপরিমাণ বিনিময়মূল্যে প্রকাশিত হয়েছে। টাকা, দাস, দাসী—সবই একই সম্পত্তিগত লেনদেনের ভেতরে বিনিময়যোগ্য। [22]

হাদিস ৭,২১২
মূল আরবি
أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفْيَانَ، قَالَ: حَدَّثَنَا هُدْبَةُ بْنُ خَالِدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: كُنْتُ رَدِيفَ أَبِي طَلْحَةَ يَوْمَ خَيْبَرَ، وَإِنَّ قَدَمِي لَتَمَسُّ قَدَمَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَتَيْنَا خَيْبَرَ وَقَدْ خَرَجُوا بِمَسَاحِيهِمْ وَفُؤُوسِهِمْ وَمَكَاتِلِهِمْ، وَقَالُوا: مُحَمَّدٌ وَالْخَمِيسُ، فَقَالَ رَسُولُ [ص:195] اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللَّهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ، إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِينَ»، فَقَاتَلَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَهَزَمَهُمْ، فَلَمَّا قُسِمَتِ الْمَغَانِمُ قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّهُ وَقَعَ فِي سَهْمِ دَحِيَّةَ الْكَلْبِيِّ جَارِيَةٌ جَمِيلَةٌ، فَاشْتَرَاهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبْعَةِ أَرْؤُسٍ، ثُمَّ دَفَعَهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى أُمِّ سُلَيْمٍ تُهَيِّئُهَا، وَكَانَتْ أُمُّ سُلَيْمٍ تَغْزُو مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَدَعَا بِالْأَنْطَاعِ، فَأُحْضِرَتْ، فَوَضَعَ الْأَنْطَاعَ وَجِيءَ بِالتَّمْرِ وَالسَّمْنِ، فَأَوْسَعَهُمْ حَيْسًا، فَأَكَلَ النَّاسُ حَتَّى شَبِعُوا، فَقَالَ النَّاسُ: تَزَوَّجَهَا أَمِ اتَّخَذَهَا أُمَّ وَلَدٍ؟ فَقَالُوا: إِنْ حَجَبَهَا فَهِيَ امْرَأَتُهُ، وَإِنْ لَمْ يَحْجُبْهَا فَهِيَ أُمُّ وَلَدٍ، فَلَمَّا أَرَادَتْ أَنْ تَرْكَبَ حَجَبَهَا حَتَّى قَعَدَتْ عَلَى عَجُزِ الْبَعِيرِ خَلْفَهُ، ثُمَّ رَكِبَتْ، فَلَمَّا دَنَوْا مِنَ الْمَدِينَةِ أَوْضَعَ، وَأَوْضَعَ النَّاسُ، وَأَشْرَفَتِ النِّسَاءُ يَنْظُرْنَ، فَعَثَرَتْ بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَاحِلَتُهُ، فَوَقَعَ وَوَقَعَتْ صَفِيَّةُ، فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَحَجَبَهَا، فَقَالَتِ النِّسَاءُ: أَبْعَدَ اللَّهُ الْيَهُودِيَّةَ، وَشَمِتْنَ بِهَا، قَالَ ثَابِتٌ: فَقُلْتُ لِأَنَسٍ: يَا أَبَا حَمْزَةَ أَوَقَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ رَاحِلَتِهِ؟ فَقَالَ: إِي وَاللَّهِ وَقَعَ مِنْ رَاحِلَتِهِ يَا أَبَا مُحَمَّدِ
رقم طبعة با وزير = (7168)
تحقيق الشيخ ناصر الدين الألباني: صحيح – مضى (7425 و 7426). تنبيه!! رقم (7425) = (7468) من «طبعة المؤسسة». رقم (7426) = (7469) من «طبعة المؤسسة» لكن الحديث ليس موجود بالرقمين المشار إليهما وإنما موجود بالأرقام التالية. رقم (4725) = (4745) من «طبعة المؤسسة». رقم (4726) = (4746) من «طبعة المؤسسة» – مدخل بيانات الشاملة -.
تحقيق الشيخ شعيب الأرناؤوط: إسناده صحيح على شرط مسلم
বাংলা অনুবাদ
আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বারের দিনে আমি আবূ তালহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পিছনে সওয়ারীতে ছিলাম। আমার পা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পা স্পর্শ করছিল। আমরা যখন খায়বারে পৌঁছলাম, তখন তারা কোদাল, কুড়াল ও ঝুঁড়ি নিয়ে বেরিয়ে এল এবং বলতে লাগল: মুহাম্মাদ ও তাঁর বাহিনী (খামিস)। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “আল্লাহু আকবার! খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা যখন কোনো কওমের আঙ্গিনায় অবতরণ করি, তখন যাদের সতর্ক করা হয়েছে তাদের সকাল হবে মন্দ।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সাথে যুদ্ধ করলেন এবং তাদের পরাজিত করলেন।
যখন গণিমতের মাল বণ্টন করা হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলা হলো: দিহইয়্যা আল-কালবী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ভাগে একজন সুন্দরী বাঁদী পড়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাতটি মাথার (ক্রীতদাস বা পশুর বিনিময়ে) তা ক্রয় করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মু সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাতে তাকে অর্পণ করলেন, যেন তিনি তাকে প্রস্তুত করেন। উম্মু সুলাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধে যেতেন। এরপর তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চামড়ার দস্তরখান আনতে বললেন।
তা আনা হলো। তিনি দস্তরখান বিছালেন এবং খেজুর ও ঘি আনা হলো। তিনি তাঁদেরকে প্রচুর পরিমাণ হায়স (খেজুর, ঘি ও পনির মিশ্রিত খাবার) পরিবেশন করলেন। এরপর লোকেরা তৃপ্তি সহকারে খেল। লোকেরা বলাবলি করল: তিনি কি তাকে বিবাহ করেছেন, নাকি তাঁকে উম্মে ওয়ালাদ (সন্তানের মা/বাঁদী) বানিয়েছেন? তখন তারা বলল: যদি তিনি তাঁকে পর্দা করান, তবে তিনি তাঁর স্ত্রী; আর যদি তাঁকে পর্দা না করান, তবে তিনি উম্মে ওয়ালাদ। যখন তিনি (সাফিয়্যা) সওয়ারীতে আরোহণ করতে চাইলেন, তখন তিনি তাঁকে (সাফিয়্যাকে) এমনভাবে পর্দা করালেন যে তিনি উটের পিঠের শেষাংশে তাঁর পিছনে বসলেন।
অতঃপর তিনি আরোহণ করলেন। যখন তাঁরা মদীনার কাছাকাছি হলেন, তখন তিনি দ্রুত চললেন এবং লোকেরাও দ্রুত চলল। নারীরা দেখার জন্য উঁকি মারতে লাগল। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সওয়ারী তাঁকে নিয়ে আছাড় খেল। ফলে তিনি পড়ে গেলেন এবং সাফিয়্যা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-ও পড়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁকে (সাফিয়্যাকে) পর্দা করালেন। তখন নারীরা বলতে লাগল: আল্লাহ এই ইহুদী নারী থেকে দূর করুন এবং তারা তাঁর সাথে খুশি প্রকাশ করল। সাবিত (রহঃ) বলেন: আমি আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললাম: হে আবূ হামযা!
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি তাঁর সওয়ারী থেকে পড়ে গিয়েছিলেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর সওয়ারী থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, হে আবূ মুহাম্মাদ।

এই দলিলগুলো একত্রে পড়লে দাসবাজারের পূর্ণ অর্থনৈতিক চক্রটি পরিষ্কার হয়ে যায়: একজন নারী যুদ্ধবন্দী বা ক্রয়ের মাধ্যমে মালিকানায় আসতে পারেন; ক্রেতা তাঁর শরীর পরীক্ষা করতে পারে; তাঁকে যৌনভাবে ব্যবহার করতে পারে; কুমারীত্ব বা শারীরিক ত্রুটির ভিত্তিতে তাঁর বাজারদর ওঠানামা করতে পারে; গর্ভধারণ হলে ভবিষ্যৎ বিক্রির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; আবার তাকে বিক্রি, ফেরত, দান বা অন্য মানুষের বিনিময়ে হস্তান্তরও করা যায়। এটি কোনো ‘আশ্রয়ব্যবস্থা’ নয়, বরং মানুষের শরীর, শ্রম, যৌনতা ও প্রজননক্ষমতাকে একই মালিকানাভিত্তিক বাজারব্যবস্থার অধীনে আনার একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান।


দাসবাজারের শরীরতত্ত্ব: নারী দেহের অনাবৃত প্রদর্শনী ও স্পর্শের আইনি বৈধতা

মধ্যযুগীয় দাসবাজারের যে চিত্রটি আমাদের সামনে ধ্রুপদী আইনগ্রন্থগুলো তুলে ধরে, তা স্রেফ কোনো বাজার নয়, বরং এক ভয়াবহ অমানবিক প্রদর্শনী। এখানে একজন নারীর শরীরকে কেবল একটি ‘ব্যক্তি’ হিসেবে নয়, বরং একটি ‘পণ্য’ বা ‘সম্পত্তি’ (মাল) হিসেবে দেখা হতো। আধুনিক নীতিশাস্ত্রে ‘সম্মতি’ (Consent) এবং ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ (Privacy) যেখানে প্রধান শর্ত, সেখানে ফিকহী বিধানগুলো ক্রেতাকে অধিকার দিয়েছিল একজন বিক্রেয় নারীর শরীরের গোপনীয়তা ছিন্নভিন্ন করার।

১. ক্রয়-বিক্রয়ের দোহাইয়ে স্পর্শের অধিকারঃ আশরাফুল হিদায়ার মতো প্রামাণ্য গ্রন্থে অত্যন্ত সরাসরি ভাষায় বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি একটি দাসী ক্রয় করার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে তার জন্য সেই নারীর নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ স্পর্শ করা জায়েজ। বিস্ময়কর এবং ভয়াবহ বিষয় হলো, এই স্পর্শের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এমনকি তখনো, যখন ক্রেতা জানে যে স্পর্শের ফলে তার মধ্যে কামভাব জাগ্রত হতে পারে [23]। ইমাম মুহাম্মদ এবং ইমাম আবু ইউসুফের মতো প্রভাবশালী ফকীহদের মতে, ক্রেতা চাইলে সেই দাসীর বুক, পিঠ, হাতের কবজি এমনকি পায়ের নলি পর্যন্ত অনাবৃত অবস্থায় দেখতে এবং স্পর্শ করতে পারতেন। আধুনিক নৈতিকতার আয়নায় এটি কেবল শ্লীলতাহানি নয়, বরং একটি সুসংগঠিত যৌন নিপীড়ন—যাকে আইনের মোড়কে বৈধ করা হয়েছে।

২. পণ্য যাচাইয়ের নামে লাঞ্ছনাঃ এই বিধানের পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা আরও বেশি অপমানজনক। বলা হয়েছে, ক্রেতা যেহেতু পয়সা দিয়ে পণ্য কিনছে, তাই তার অধিকার আছে পণ্যের ‘ত্বক’ বা গুণাগুণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার। এখানে একজন নারীর শরীরকে ঠিক পশুর হাটের গবাদি পশুর মতো বিবেচনা করা হয়েছে। মানুষের মর্যাদাকে এখানে ‘পণ্যের মানের’ নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। যদিও পরবর্তী যুগের আলেমগণ কামভাব না থাকা অবস্থায় স্পর্শের কথা বলেছেন, কিন্তু মূল শাস্ত্রীয় অধিকারটি কিন্তু ক্রেতাকে সেই আদিম বন্যতার সুযোগই করে দিয়েছে।

৩. কিশোরী দাসীদের উন্মুক্ত প্রদর্শনীঃ দাসবাজারের এই নিষ্ঠুরতা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়েও বেশি বীভৎস হয়ে উঠত কিশোরী দাসীদের ক্ষেত্রে। হিদায়ার মাসআলা অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিশোরী দাসী ঋতুমতী না হচ্ছে (অর্থাৎ বালেগা হচ্ছে না), ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে বাজারে ‘উর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত’ অবস্থায় রাখার বিধান ছিল। এমনকি সে যদি সঙ্গমের উপযুক্ত হয় (তা সাত বা নয় বছর যাই হোক), তবুও তাকে কেবল নাভি থেকে নিচ পর্যন্ত একটি কাপড়ে আবৃত করে বুক-পিঠ খোলা অবস্থায় বিক্রির জন্য পেশ করা যেত [24]। বর্তমান যুগে আমরা একে সরাসরি ‘চাইল্ড পর্নোগ্রাফি’ বা ‘পেডোফিলিয়া’র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বলতে পারি। ধর্মের আবরণে শিশুদের শরীরকে ক্রেতাদের সামনে এভাবে প্রদর্শন করা মানবিক দেউলিয়াগ্রস্ততার এক চূড়ান্ত নিদর্শন।

৪. সতর বা আবরণের দ্বিমুখী মানদণ্ডঃ ইসলামে যেখানে স্বাধীন নারীর (আযাদ নারী) জন্য কঠোর পর্দার কথা বলা হয়েছে, সেখানে দাসী নারীর ক্ষেত্রে ‘সতর’ বা ঢেকে রাখার বিধানটি করা হয়েছে অত্যন্ত শিথিল। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, একজন ক্রীতদাসীর সতর মূলত একজন পুরুষের সতরের সমান (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত)। এই বৈষম্যমূলক আইনটিই বাজারে নারীদের অর্ধনগ্ন অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখার সুযোগ করে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে সমাজকে এই বার্তাই দেওয়া হতো যে—আভিজাত্য এবং সম্মান কেবল স্বাধীন নারীদের জন্য, আর দাসীরা হলো স্রেফ ভোগ্যপণ্য যাদের কোনো লজ্জা বা সম্মানের অধিকার নেই।


আধুনিক মানবাধিকার বনাম মধ্যযুগীয় ফিকহ্: একটি আদর্শিক ও নৈতিক ব্যবচ্ছেদ

মধ্যযুগীয় ফিকহী বিধান এবং আধুনিক মানবাধিকারের মূল সংঘাতটি কেবল আইনের নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক সংজ্ঞার সংঘাত। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিটি মানুষকে ‘জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদাবান’ হিসেবে গণ্য করে। পক্ষান্তরে, আমরা যে আইনি দলিলগুলো পর্যালোচনা করেছি, সেখানে মানুষকে দেখা হয়েছে স্রেফ একটি ‘উপযোগিতা’ বা ‘পণ্য’ হিসেবে। এই দুই দর্শনের মধ্যকার ফাটলগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. ব্যক্তিসত্তা বনাম পণ্যকরণ (Commodification): আধুনিক মানবাধিকারের প্রথম অনুচ্ছেদ (UDHR, Article 1) ঘোষণা করে যে, সকল মানুষ স্বাধীনভাবে এবং সমান মর্যাদা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু মুখতাসারুল কুদুরী বা হিদায়ার মতো গ্রন্থে মানুষকে ‘মাল’ বা সম্পত্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। যখন কোনো আইন বলে যে, ‘মুখে বা বগলে দুর্গন্ধ’ থাকলে একজন নারীকে বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়া যাবে কারণ এটি ‘যৌন মিলনের পথে অন্তরায়’ [25], তখন সেই নারীর ব্যক্তিসত্তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। আধুনিক নীতিশাস্ত্রে একে বলা হয় ‘Dehumanization’ বা অমানবিকীকরণ, যেখানে একজন মানুষের মূল্য তার মেধা বা সত্তায় নয়, বরং তার শরীরের ঘ্রাণ বা অঙ্গের নিখুঁত অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

২. যৌন স্বায়ত্তশাসন বনাম মালিকানা: আধুনিক আইন ও নীতিশাস্ত্রে ‘যৌন স্বায়ত্তশাসন’ (Sexual Autonomy) একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। অর্থাৎ, নিজের শরীরের ওপর কেবল ব্যক্তির নিজেরই অধিকার রয়েছে এবং ‘সম্মতি’ (Consent) ছাড়া যেকোনো শারীরিক স্পর্শ যৌন নিপীড়ন হিসেবে গণ্য। কিন্তু ফিকহী বিধানে আমরা দেখছি, ক্রেতা কেবল কেনার ইচ্ছা করলেই একজন নারীর বুক, পিঠ বা পায়ের নলি স্পর্শ করতে পারে, এমনকি এতে ক্রেতার কামভাব জাগ্রত হলেও তা বৈধ [23]। আধুনিক নীতিশাস্ত্রের আলোকে এটি একটি কাঠামোগত ধর্ষণকামী সংস্কৃতি (Rape Culture), যেখানে নারীর শরীরের গোপনীয়তা বা সম্মতির কোনো স্থান নেই; বরং পুরুষের ‘ক্রেতা-অধিকার’ বা ‘মালিকানা-স্বত্ব’ই সেখানে মুখ্য।

৩. কুমারীত্বের বাণিজ্যিকীকরণ ও লৈঙ্গিক সহিংসতা: কুমারীত্বের পর্দা (Hymen) পরীক্ষা করার যে আইনি বৈধতা হিদায়া প্রদান করেছে, তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিতে চরম অবমাননাকর ও আক্রমণাত্মক [26]। আধুনিক জমানায় একে ‘Virginity Testing’ বলা হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং লৈঙ্গিক সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত। মধ্যযুগীয় এই বিধানটি প্রমাণ করে যে, সেখানে নারীর সতীত্ব বা কুমারীত্ব কোনো সম্মানজনক বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল পণ্যের একটি ‘মানদণ্ড’ (Quality Check), যা নষ্ট হলে ক্রেতার আর্থিক ক্ষতির প্রশ্ন উঠত। একজন মানুষের শরীরকে এভাবে ‘যান্ত্রিক পরীক্ষার’ অধীন করা আদিম বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

৪. শিশুদের সুরক্ষা বনাম শৈশব নিগ্রহ: বর্তমান বিশ্বে শিশুদের সুরক্ষা ও তাদের শারীরিক অখণ্ডতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। অথচ ফিকহী বিধান বলছে, কিশোরী দাসীদের বালেগা হওয়ার আগ পর্যন্ত বুক ও পিঠ খোলা অবস্থায় বাজারে প্রদর্শন করা যাবে [24]। এমনকি সাত বা নয় বছরের শিশুদেরও যৌন উপযোগী মনে করা হলে তাদের বাজারে পেশ করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Child Sexual Exploitation’ বা শিশু যৌন শোষণ। ধর্মের দোহাই দিয়ে শিশুদের শৈশবকে এভাবে নিলামে তোলা যেকোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের জন্য এক বিরাট নৈতিক চ্যালেঞ্জ।

৫. পর্দার দ্বিমুখী মানদণ্ড ও সামাজিক বৈষম্য: ইসলামে পর্দার বিধানকে প্রায়শই ‘নারীর সুরক্ষাকবচ’ হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু দাসীদের ক্ষেত্রে সেই একই বিধান কেন এত শিথিল? কেন একজন দাসীর পেট ও পিঠ বাজারে খোলা রাখা বৈধ ছিল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের ‘শ্রেণিবিভাগ’-এ। ফিকহী আইন অনুযায়ী, সম্মান ও গোপনীয়তা কেবল ‘স্বাধীন’ নারীদের জন্য সংরক্ষিত, আর দাসীরা হলো সাধারণ ভোগ্যপণ্য। এই দ্বিমুখী মানদণ্ড প্রমাণ করে যে, পর্দার বিধানটি আসলে আধ্যাত্মিক নয়, বরং এটি ছিল একটি সামাজিক পদমর্যাদার প্রতীক। যার টাকা নেই বা যে যুদ্ধে হেরে গিয়ে দাসী হয়েছে, তার লজ্জা বা গোপনীয়তা রক্ষার কোনো অধিকার ইসলামী আইনশাস্ত্র স্বীকার করেনি।


উপসংহার: ‘সর্বজনীন দয়া’ ও দালিলিক বাস্তবতার দ্বান্দ্বিকতা

আমরা এই দীর্ঘ আলোচনায় ধ্রুপদী ইসলামী ফিকহ্ শাস্ত্রের অন্ধকার অলিগলি অতিক্রম করেছি। আমরা দেখেছি কীভাবে একজন মানুষের রক্ত-মাংসের অস্তিত্বকে স্রেফ একটি ‘পণ্য’ বা ‘নির্জীব বস্তুর’ স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। আধুনিক যুগে অনেক মুসলিম প্রচারক দাবি করেন যে, ইসলামে দাসপ্রথা ছিল একটি ‘সহমর্মিতার ব্যবস্থা’ এবং এটি দাসদের মর্যাদা দান করেছে। কিন্তু আমরা যখন আশরাফুল হিদায়া বা মুখতাসারুল কুদুরীর মতো প্রামাণ্য আইনগ্রন্থগুলোর মাসআলাগুলো নির্মোহভাবে পাঠ করি, তখন সেই ‘দয়া’র দাবি এক বিশাল প্রহাসনে পরিণত হয়।

১. তাত্ত্বিক কুয়াশা বনাম রূঢ় বাস্তবতা
দয়ার বুলি বা ‘ক্রীতদাসকে নিজের মতো খাবার খেতে দাও’—এই ধরণের বিচ্ছিন্ন কিছু উপদেশ দিয়ে সেই পদ্ধতিগত পৈশাচিকতাকে ঢাকা সম্ভব নয়, যা দাসবাজারে আইনি রূপ পেয়েছিল। যখন একটি আইন ক্রেতাকে অনুমতি দেয় কোনো কিশোরীর বুক বা পেট অনাবৃত অবস্থায় দেখে তার ‘গুণাগুণ’ যাচাই করতে, তখন দয়ার ধারণাটি সেখানে মৃত। বাস্তব সত্য এই যে, ফিকহী বিধানে দাসী ছিল মূলত একটি ‘যৌন বিনিয়োগ’ (Sexual Investment), যার রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে তার উপযোগিতা বা ‘পণ্যমূল্য’ বজায় রাখাটাই ছিল মালিকের প্রধান লক্ষ্য।
২. নৈতিকতার পরাজয় ও পণ্যায়ন
এই প্রবন্ধের আলোচনা থেকে এটি প্রমাণিত যে, মধ্যযুগীয় এই ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোটি মানুষের মর্যাদাকে নয়, বরং ‘মালিকানা স্বত্ব’কে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কুমারীত্বের পর্দা পরীক্ষা করার আইনি বৈধতা কিংবা দুর্গন্ধের কারণে ‘ত্রুটিপূর্ণ মাল’ হিসেবে নারীকে ফেরত দেওয়ার মাসআলাগুলো প্রমাণ করে যে, সেখানে নারীর মানবিক অনুভূতির কোনো স্থান ছিল না। এটি একটি চরম নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা, যা মানুষের সত্তাকে স্রেফ একটি বাণিজ্যের বস্তুতে রূপান্তরিত করেছে।
৩. ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ও বর্তমানের সংকট
আইসিসের মতো গোষ্ঠীগুলো যখন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ইয়াজিদি নারীদের ওপর একই বর্বরতা চালায়, তখন আমরা বুঝতে পারি যে এই আইনগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় ধুলো জমা কোনো পাণ্ডুলিপি নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই আইনগুলোকে ‘ঐশী ও অপরিবর্তনীয়’ হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানবতার ওপর এই ধরণের আক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাবে। আধুনিক জমানায় দাঁড়িয়ে এই মধ্যযুগীয় বীভৎসতাকে ‘ইনসাফ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মূলত বর্তমানের উন্নত মানবিক মূল্যবোধের সাথে এক ধরণের গাদ্দারি।
চূড়ান্ত প্রতিফলন
মানুষের মর্যাদা কোনো বিশেষ ধর্ম, বর্ণ বা মালিকানার ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রতিটি মানুষের শরীর তার নিজের, তার গোপনীয়তা অলঙ্ঘনীয়। যে দর্শন বা আইনশাস্ত্র মানুষের এই মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করে তাকে ‘পণ্য’ হিসেবে হাটে তোলে, তা আধুনিক সভ্য সমাজের জন্য এক বিরাট আদর্শিক চ্যালেঞ্জ। সত্য ও ন্যায়ের আধুনিক মানদণ্ড কোনো প্রাচীন লিপির অন্ধ আনুগত্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যুক্তি এবং প্রমাণের নিরিখে এটি আজ অনস্বীকার্য যে, প্রকৃত মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের এই ধরণের মধ্যযুগীয় দস্যুবৃত্তি ও সাম্প্রদায়িক আধিপত্যবাদকে ছুড়ে ফেলে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

ইতিহাসের এই নির্মোহ ব্যবচ্ছেদই হতে পারে গোঁড়ামিমুক্ত একটি নতুন মানবিক বিশ্ব গড়ার প্রথম পদক্ষেপ। যেখানে কোনো মানুষ অন্য মানুষের মালিক হবে না এবং কারো শরীর কোনো বাজারের নিলামের বস্তু হয়ে উঠবে না।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সারাখসী, আল-মাবসুত, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১৭৯–১৮০ ↩︎
  2. ইমাম নববী, আল-মাজমূ‘ শরহুল মুহাযযাব, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫৮০ ↩︎
  3. Dabiq, Issue 4, “The Revival of Slavery Before the Hour” ↩︎
  4. The Role of Women and Girls in the Eyes of Islamic State: A Content Analysis of Dabiq and Rumiyah Magazines Stempień, Marta Sara ↩︎
  5. UN Report on ISIS Crimes against Yazidis, 2016 ↩︎
  6. সংশয় ইসলাম আর্কাইভ—মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ↩︎
  7. মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদিস ১৩,২০৪ ↩︎
  8. তাফসীরে মাযহারী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬–১৭ ↩︎
  9. আল-মিসবাহুন নূরী শরহে মুখতাসারুল কুদুরী, প্রথম খণ্ড, ইসলামিয়া কুতুবখানা, পৃষ্ঠা ২৩০ ↩︎
  10. ইমাম মালিক, আল-মুওয়াত্তা, কিতাবুল বুয়ূ, বাবুল ‘আইব ফির-রিকাক, পৃষ্ঠা ৪৬১ — Islamweb ↩︎
  11. মুওয়াত্তা মালিক — দাস-দাসীর ত্রুটি ও মূল্য নির্ধারণের বিধান, Islamweb ↩︎
  12. আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৮, ৬১৯ ↩︎
  13. সারাখসী, আল-মাবসুত, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১৭৯ — Islamweb ↩︎
  14. ইমাম নববী, আল-মাজমূ‘ শরহুল মুহাযযাব, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫৮০ — Islamweb ↩︎
  15. আশরাফুল হিদায়া, ইসলামিয়া কুতুবখানা, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৬ ↩︎
  16. ابن أبي شيبة – عبد الله بن محمد بن أبي شيبة ↩︎
  17. সংশয় ইসলাম আর্কাইভ — সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২০৮৮, আযল প্রসঙ্গে ↩︎
  18. শরহ সুনান আবু দাউদ — আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদ, আযল ও উম্মে ওয়ালাদ বিক্রির ব্যাখ্যা — Islamweb ↩︎
  19. সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ১১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৭–৫০৮ ↩︎
  20. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৯৫৫–৩৯৫৬ — সংশয় ইসলাম আর্কাইভ ↩︎
  21. তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৪৬–১৫০ — সংশয় ইসলাম আর্কাইভ ↩︎
  22. সহিহ ইবন হিব্বান, হাদিস ৭২১২ — সংশয় ইসলাম আর্কাইভ ↩︎
  23. আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৮ 1 2
  24. আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৯ 1 2
  25. আল-মিসবাহুন নূরী শরহে মুখতাসারুল কুদুরী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩০ ↩︎
  26. আশরাফুল হিদায়া, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৬ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Textual, historical, and ethical criticism grounded in classical Islamic legal sources and modern human-rights principles.

This article examines how classical Islamic jurisprudence treated enslaved women within the slave market. It analyzes legal rulings concerning the ownership, inspection, touching, sexual use, return, virginity testing, and public display of female slaves, with particular attention to works such as Hidaya, Ashraful Hidaya, and Mukhtasar al-Quduri.

The article compares these rulings with modern principles of human dignity, bodily autonomy, consent, privacy, child protection, gender equality, and freedom from sexual violence. Its central argument is that the claim that Islamic slavery represented a compassionate or dignity-preserving institution cannot withstand a direct examination of the legal texts and practices discussed here.

This analysis does not rely on apologetic summaries or modern reinterpretations that obscure the legal status of enslaved women. Instead, it evaluates the doctrine through its documentary evidence, legal classifications, market practices, and practical consequences.

The article should be evaluated according to the accuracy of its citations, the fidelity with which the legal texts are represented, the distinction between historical description and moral judgment, and the consistency between claims of “universal compassion” and the actual treatment of enslaved women's bodies, privacy, autonomy, and dignity.

Leave a comment

Your email will not be published.