ভূমিকা
ধর্মীয় কাহিনি যখন মহাবিশ্বের বর্ণনা দিতে শুরু করে, তখন সেটি আর শুধু আধ্যাত্মিক গল্প থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে একটি কসমোলজি—একটি বিশ্বতত্ত্ব। সেই বিশ্বতত্ত্বকে তখন যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, ইতিহাস ও তুলনামূলক পুরাণবিদ্যার আলোতে পরীক্ষা করাই বুদ্ধিবৃত্তিক সততার দাবি। ইসলামি মিরাজ-বর্ণনায় যে সাত আসমানের ছবি পাওয়া যায়—দরজাওয়ালা আকাশ, প্রতিটি স্তরে পাহারাদার, মৃত নবীদের অবস্থান, সপ্তম আকাশের ওপরে রহস্যময় বৃক্ষ, এবং আল্লাহর সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে নামাজের সংখ্যা কমে আসা—এসবকে কেবল “বিশ্বাসের বিষয়” বলে বিশ্লেষণের বাইরে রাখার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বরং এগুলো স্পষ্টতই সেই প্রাচীন মানুষের মহাবিশ্ব-ভাবনার অংশ, যারা আকাশকে অসীম মহাশূন্য নয়, মাথার ওপর চাপানো কোনো কঠিন ছাদ, স্তর, প্রাসাদ, দুর্গ বা রাজকীয় প্রশাসনিক ভবনের মতো কল্পনা করত। সমস্যা এখানেই: আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের যে মহাবিশ্ব দেখায়, তার সঙ্গে এই দরজা-ওয়ালা, ধাতব, পাহারাদার-নিয়ন্ত্রিত আকাশের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষা করা নয়; বরং এই প্রশ্নটি সরাসরি তোলা—এইসব কাহিনি কি সত্যিই মহাবিশ্বের কোনো বাস্তব বর্ণনা, নাকি এগুলো প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য, ইহুদি-খ্রিস্টান, জরথুস্ত্রীয় ও লোকপুরাণ-ঘেঁষা আকাশভ্রমণ মিথেরই ইসলামি সংস্করণ?
মিরাজের গল্পে আসমানের বিবরণসমূহ
ইসলামি মিরাজ-বর্ণনার সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হচ্ছে, এখানে আকাশকে কোনো বিমূর্ত আধ্যাত্মিক স্তর হিসেবে নয়, বরং প্রায় স্থাপত্যগত বাস্তবতার মতো দেখানো হয়েছে। আসমান আছে, সেই আসমানের দরজা আছে, দরজার সামনে পাহারাদার আছে, আগন্তুককে পরিচয় দিতে হয়, অনুমতি নিতে হয়, তারপর দরজা খুলে দেওয়া হয়। এই বর্ণনা পড়লে আধুনিক মহাকাশের কথা মনে হয় না; বরং মনে হয় কোনো প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, সাম্রাজ্যিক প্রশাসনিক ভবন, দুর্গ, অথবা স্তরবিন্যস্ত পৌরাণিক স্বর্গরাজ্যের কথা। জিবরীল যেন কোনো মহাজাগতিক গাইড, মুহাম্মদ যেন বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত অতিথি, আর প্রতিটি আসমান যেন আলাদা নিরাপত্তা-চৌকি। এটি মহাবিশ্বের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা নয়; এটি প্রাচীন মানুষের ক্ষমতা, রাজনীতি ও দরবারি প্রশাসনের ভাষায় বানানো এক আকাশ-পুরাণ। যে সমাজে রাজা, দরবার, প্রহরী, গেট, অনুমতি ও শ্রেণিবিন্যাস ছিল বাস্তব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সেই সমাজের কল্পনায় স্বর্গও হয়ে উঠেছে একই রকম দরজাওয়ালা, পাহারাদার-নিয়ন্ত্রিত, স্তরভিত্তিক এক অতিলৌকিক সাম্রাজ্য। সহীহ মুসলিমের মিরাজ-বর্ণনাতেই দেখা যায়, প্রতিটি আসমানে পৌঁছে জিবরীল দরজা খুলতে বলেন, ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনি কে, তার সঙ্গে কে আছে, তাকে আনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিনা; এরপর দরজা খোলা হয় এবং নির্দিষ্ট নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে [1]। এই বর্ণনার ধর্মীয় ভাষা যতই পবিত্রতার আবরণে ঢেকে রাখা হোক, এর কল্পনাকাঠামো অত্যন্ত মানবিক, অত্যন্ত প্রাচীন, এবং অত্যন্ত পৌরাণিক।
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান [বিশ্বাস]
পরিচ্ছেদঃ ৭৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মি’রাজ এবং সালাত ফরয হওয়া।
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৩০০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬২
৩০০-(২৫৯/১৬২) শাইবান ইবনু ফার্রূখ (রহঃ) ….. আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমার জন্য বুরাক পাঠানো হল[1]। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদূর দৃষ্টি যায় এক পদক্ষেপে সে ততদূর চলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এতে আরোহণ করলাম এবং বাইতুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিবায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে খুঁটির সাথে বাঁধতেন, আমি সে খুঁটির সাথে আমার বাহনটিও বাঁধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু’ রাকাআত সালাত আদায় করে বের হলাম। জিবরীল (আঃ) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আঃ) আমাকে বললেন, আপনি ফিতরাহকেই গ্রহণ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌছে দ্বার খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞেস কলা হলো, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল। সেখানে আমি আদম (আঃ) এর দেখা পাই তিনি আমাকে মুবারাকবাদ জানালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে উর্ধ্বলোক নিয়ে চললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, তাকে কি আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া (আঃ) দুই খালাত ভাইয়ের দেখা পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন, আমার জন্য কল্যাণের দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইউসুফ (আঃ) এর দেখা পেলাম। সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইদরীস (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। আল্লাহ তা’আল তার সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ “এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়” (সূরাহ আল হাদীদ ৫৭ঃ ১৯)।
তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে?”[2] তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে হারূন (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন।
তারপর জিবরীল (আঃ) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইবরাহীম (আঃ)-এর দেখা পেলাম। তিনি বাইতুল মামুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন[3]। বাইতুল মামুরে প্রত্যেহ সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফের উদ্দেশে প্রবেশ করেন যারা আর সেখানে পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায়[4] নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হাতির কানের ন্যায় আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে বৃক্ষটিকে যখন আল্লাহর নির্দেশে যা আবূত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তা’আলা আমার উপর যে ওয়াহী করার তা ওয়াহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন, এরপর আমি মূসা (আঃ) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মত এ নির্দেশ পালনে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এভাবে আমি একবার মূসা (আঃ) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! যাও দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাতে দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যক্তি কোন নেক কাজের নিয়্যাত করল এবং তা কাজে রূপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখব; আর তা কাজে রূপায়িত করলে তার জন্য লিখব দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের নিয়্যাত করল অথচ তা কাজে পরিণত করল না তার জন্য কোন গুনাহ লিখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লিখা হয় একটি মাত্র গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট নেমে এলাম এবং তাকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বিষয়টি নিয়ে বারবার আমি আমার প্রতিপালকের নিকট আসা-যাওয়া করেছি, এখন আবার যেতে লজ্জা হচ্ছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৮, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩১৯)
1. কায়ী ইয়ায (রহঃ) বলেন যে, মি’রাজ স্বশরীরে হয়েছিল না স্বপ্নযোগে হয়েছিল এটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, স্বপ্নযোগে হয়েছিল। এটা অত্যন্ত দুর্বল কথা। অধিকাংশ পূর্ব ও পরের উলামা, ফুকাহা ও মুহাদ্বিসীনের অভিমত হল প্রিয়নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল। হাদীসসমূহে প্রকাশ্যভাবে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এর বিপরীত হাদীসের অন্য ব্যাখ্যার কোন কারণ বা সুযোগ নেই যে, অন্য তা’বীল করা যাবে। (সংক্ষিপ্ত নাবাবী)
খাদীজাহ (রাযিঃ)-এর মৃত্যু মিরাজের পূর্বেই হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু নুবুওয়াতের দশম বর্ষের রমযান মাসে হয়েছিল বলে জানা যায়। কাজেই মিরাজের ঘটনা এর পরেই ঘটেছে, আগে নয়। (আর রাহীকুল মাখতুম, অনুবাদ- খাদীজাহ আক্তার রেজায়ী ১৬৬ খৃঃ)
2. ইমান নাবাবী (রহঃ) বলেন, এ হাদীস থেকে কয়েকটি কথা জানা যায়। (১) বাড়ীর মধ্যে হতে কোন আগন্তুককে যদি বলা হয় কে? তার উত্তরে বলবে নাঃ “আমি”; বরং নাম বলতে হবে। (২) আকাশের দরজা আছে। (৩) দরজার নিকটে পাহারাদার আছে। (৪) মেহমানের সম্মানে মারহাবা বলে অভিবাদন জানানো যাবে। এটাই নাবীদের আদর্শ।
3. “বাইতুল মামুর” নামে বাইতুল্লাহর সামনে আকাশের উপরে একটি ঘর আছে। বাইতুল মামুর এজন্য বলা হয় যে, সব সময় এ ঘরটি সমৃদ্ধ থাকে অর্থাৎ প্রত্যেকদিন নতুনভাবে সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদাতের জন্য আসে। যে একবার আসে সে কোনদিন পুনরায় আসার সুযোগ পাবে না। এ থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর ফেরেশতা কত আছে। বাইতুল মামূর সপ্তম আকাশে আছে। ইবরাহীম (আঃ) বাইতুল মামুর এর দিকে পিঠ ফিরে বসে ছিলেন। এ হাদীস হতে এটাও প্রমাণ হয় যে, বাইতুল্লাহর দিকে পিঠ করে বসা যাবে।
4. “সিদরাতুল মুনতাহা” সপ্তম আকাশের উপরের একটি বরই গাছ এবং ফেরেশতাদের বিচরণের শেষ সীমা। অথবা গমনের শেষ সীমা। অর্থাৎ সিদরাতুল মুনতাহার উপর কি আছে আল্লাহ ছাড়া কারও জ্ঞান নেই। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, যে সিদরাতুল মুনতাহা এজন্য বলা হয় যে, ফেরেশতাদের জ্ঞান বিচরণ ওখান পর্যন্ত শেষ হয়েছিল। তার আগে তারা যেতে পারেনি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত। আর যারা উপরে আছে তারা এখানে এসে থেমে যায়। নিচে আসতে পারে না এবং যারা নিচে আছে তারা এখানে এসে থেমে যায়। উপরে যেতে পারে না। এটা আল্লাহর নির্দেশ।
এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ আরশের উপর সমাসীন আছেন এবং প্রিয় নাবীর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। যার কোন অপব্যাখ্যার সুযোগ নেই। এ কথোপকথনের মধ্যে পঞ্চাশ ওয়াক্ত হতে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে নিয়েছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)
প্রাচীন মিথের মোহনা থেকে নতুন সংস্করণ
এই মিরাজ-কাহিনির শিকড় খুঁজতে গেলে বিষয়টি হঠাৎ করে আরবের মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন “অলৌকিক ঘটনা” বলে মনে হয় না; বরং এটি প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের আকাশ-পুরাণ, স্তরবিন্যস্ত স্বর্গ, দেবতাদের প্রাসাদ, আকাশদ্বার, পাহারাদার, আত্মার ঊর্ধ্বযাত্রা, স্বর্গ-নরক পরিদর্শন—এসব মোটিফেরই ইসলামি পুনর্গঠন বলে প্রতীয়মান হয়। মেসোপটেমীয় ও ব্যাবিলনীয় কসমোলজিতে আকাশ কোনো অসীম শূন্যস্থান ছিল না; সেটি ছিল স্তরবিন্যস্ত এক মহাজাগতিক অঞ্চল, যেখানে দেবতা, নক্ষত্র, গ্রহ, প্রাসাদ, প্রবেশপথ ও উচ্চতর জগতের ধারণা একে অপরের সঙ্গে মিশে ছিল। ব্যাবিলনীয় জ্যোতিষ-ধর্মতত্ত্বে সাত সংখ্যার বিশেষ মর্যাদা, সাত দৃশ্যমান গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে মহাজাগতিক স্তরবিন্যাসের সম্পর্ক, এবং আকাশকে দেবতাদের প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে কল্পনা করার প্রবণতা—এসবই পরবর্তী ইহুদি, খ্রিস্টীয়, গনস্টিক, মান্দায়ী এবং ইসলামি আকাশভ্রমণ সাহিত্যে নানা রূপে ফিরে আসে [2]। একইভাবে জরথুস্ত্রীয় আরদা বিরাফ-নামাগে দেখা যায়, এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের আত্মা স্বর্গ ও নরক ভ্রমণ করে, পুণ্যবান ও পাপীদের পরিণতি দেখে, এবং পরে ফিরে এসে সেই অতিলৌকিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয়—মিরাজের সঙ্গে এর কাঠামোগত মিল এতই স্পষ্ট যে এটিকে নিছক কাকতালীয় বলা দুর্বল ব্যাখ্যা হবে [3]। আবার সাবীইন নামে কুরআনে যাদের উল্লেখ আছে, তাদের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মান্দায়ী ধর্মীয় সাহিত্যে আত্মার ঊর্ধ্বযাত্রা, আকাশপথে প্রহরী বা পরীক্ষা-চৌকি, আলোকজগতের দিকে অগ্রসর হওয়ার ধারণা পাওয়া যায়; অর্থাৎ ইসলাম যে পরিবেশে জন্ম নেয়, সেই দেরি-প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য আগেই আকাশভ্রমণ, স্তরবিন্যস্ত স্বর্গ, দরজা, পাহারা ও অতিলৌকিক সাক্ষাতের গল্পে পূর্ণ ছিল [4]। ফলে মিরাজকে ইতিহাস বা মহাকাশবিজ্ঞান হিসেবে পড়ার চেয়ে প্রাচীন আকাশ-পুরাণের ইসলামি সংস্করণ হিসেবে পড়াই বেশি যুক্তিসঙ্গত: এখানে নবী, ফেরেশতা ও আল্লাহর নাম বসেছে, কিন্তু কল্পনাকাঠামোটি এসেছে সেই পুরোনো পৌরাণিক ভাণ্ডার থেকেই—যেখানে আকাশ ছিল দরজাওয়ালা রাজপ্রাসাদ, মহাবিশ্ব ছিল ধর্মীয় আমলাতন্ত্র, আর ঈশ্বরীয় জগতও মানুষের বানানো সাম্রাজ্যিক কল্পনার বাইরে যেতে পারেনি।
সাত আসমান: প্রাচীন মহাবিশ্ব-ভাবনার ইসলামি সংস্করণ
মিরাজ-বর্ণনার সাত আসমান কোনো আধুনিক বৈজ্ঞানিক মহাকাশের ধারণা নয়; এটি প্রাচীন মানুষের স্তরবিন্যস্ত মহাবিশ্ব-ভাবনার সরাসরি প্রতিফলন। আজ আমরা জানি, পৃথিবীর ওপর কোনো ধাতব ছাদ নেই, কোনো সোনার আসমান নেই, কোনো পিতলের স্তর নেই, কোনো লৌহনির্মিত আকাশ নেই, আর মহাশূন্যে এমন কোনো দরজাও নেই যেখানে ফেরেশতা দাঁড়িয়ে আগন্তুকের পরিচয় যাচাই করে। কিন্তু প্রাচীন কসমোলজিতে আকাশকে প্রায়ই কঠিন গম্বুজ, স্তর, ছাদ, প্রাসাদ বা দেবতাদের বাসস্থান হিসেবে কল্পনা করা হতো। এই কারণেই ইসলামি বর্ণনায় আসমান শুধু “উপরের দিক” নয়; এটি একটি নির্মিত জগৎ—যার উপাদান আছে, দরজা আছে, পাহারা আছে, বাসিন্দা আছে, প্রশাসনিক প্রোটোকল আছে। তাফসীরে জালালাইনে কা‘ব আল-আহবারের বরাতে যে সাত আসমানের উপাদান-বর্ণনা পাওয়া যায়—প্রথম আসমান মেঘমালার জমাট ঢেউ, দ্বিতীয় সাদা জমরদ পাথর, তৃতীয় লোহা, চতুর্থ পিতল, পঞ্চম রূপা, ষষ্ঠ সোনা, সপ্তম লাল ইয়াকুত—তা স্পষ্ট করে দেয়, এখানে আকাশকে কোনো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হিসেবে নয়, বরং রত্ন, ধাতু ও রাজকীয় স্থাপত্যের ভাষায় কল্পনা করা হয়েছে [5]।
কি বস্তু দ্বারা সাত আসমান তৈরি হয়েছে: আল্লামা বাগাবী (র.) কা’বে আহবার (র.)-এর কথার উক্তির বরাতে বলেছেন যে, পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমান মেঘমালার ঢেউয়ের জমাট আস্তরণে নির্মিত। দ্বিতীয় আসমান হলো সাদা জমরদ পাথরের, তৃতীয় আসমান হলো লৌহনির্মিত, চতুর্থ আসমান পিতলের নির্মিত, পঞ্চম আসমান রৌপ্যনির্মিত, ষষ্ঠ আসমান স্বর্ণনির্মিত, আর সপ্তম আসমান লালবর্ণের ইয়াক্ত পাথরে নির্মিত। [নূরুল কোরআন]


এই ধরনের কল্পনা ঠিক সেই প্রাচীন মানসিকতার ফল, যেখানে আকাশ মানে ছিল চোখে দেখা নীল গম্বুজের ওপারে কোনো দেব-রাজ্যের সোপান, আর মহাবিশ্ব মানে ছিল মানুষের সমাজব্যবস্থা, দরবার, ক্ষমতা, পাহারা ও শ্রেণিবিন্যাসের মহাজাগতিক প্রতিলিপি। আধুনিক টেলিস্কোপ, স্পেকট্রোস্কোপি, মহাকাশযান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান এই আসমানগুলোর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি; তাই এগুলোকে বাস্তব মহাবিশ্বের বর্ণনা বলা জ্ঞানের প্রতি অবমাননা ছাড়া আর কিছু নয়। এগুলো প্রাচীন মিথের ভাষায় লেখা ধর্মীয় কল্পনা—যেখানে মানুষ তার নিজের সীমিত পৃথিবীকে আকাশে প্রক্ষেপণ করেছে, তারপর সেটিকেই ঈশ্বরপ্রদত্ত সত্য বলে ঘোষণা করেছে।

ধ্রুপদী গ্রন্থে আসমানের নির্মাণ-উপাদান: জমাট তরঙ্গ, পাথর, ধাতু ও রত্নের স্তর
আসমানকে ধাতু ও রত্নের স্তর হিসেবে কল্পনা করার বিবরণ শুধু বাংলা তাফসিরের কোনো বিচ্ছিন্ন টীকায় সীমাবদ্ধ নয়। ধ্রুপদী আরবি গ্রন্থেও আসমানের সংখ্যা, বিন্যাস এবং নির্মাণ-উপাদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য সংকলিত হয়েছে। এসব বর্ণনায় আসমান কোনো অনির্দিষ্ট শূন্যস্থান নয়; বরং একটি স্তরের ওপরে আরেকটি স্তর বসানো নির্মিত মহাজাগতিক কাঠামো। কোথাও তার উপাদান বলা হচ্ছে আবদ্ধ তরঙ্গ, কোথাও সাদা পাথর, কোথাও লোহা, তামা, রূপা, সোনা ও ইয়াকুত। ফলে এখানে আলোচনার বিষয় শুধু আসমানের ধর্মীয় মাহাত্ম্য নয়; আসমানকে কী ধরনের বস্তু বলে কল্পনা করা হয়েছিল, সেই প্রশ্নও সরাসরি সামনে আসে।
একটির ওপরে আরেকটি আসমান: বাগাবীর স্তরবিন্যাসের ব্যাখ্যা
সূরা আল-মুলকের তৃতীয় আয়াতের “সাত আসমান স্তরে স্তরে” কথাটির ব্যাখ্যায় হুসাইন ইবন মাসউদ আল-বাগাবী আসমানগুলোকে পরস্পরের ওপরে অবস্থিত স্তর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যার সংশ্লিষ্ট বক্তব্যটি হলো: [6]
﴿الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا﴾ طَبَقًا عَلَى طَبَقٍ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ.
বাংলা অনুবাদ: “‘যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান স্তরে স্তরে’—অর্থাৎ একটি স্তরের ওপরে আরেকটি স্তর; সেগুলোর কিছু অন্যগুলোর ওপরে অবস্থিত।”
এই ব্যাখ্যায় সাত আসমানকে সাতটি নৈতিক মর্যাদা বা মানুষের মানসিক অবস্থার নাম বলা হয়নি; তাদের মধ্যে ওপর-নিচের স্থানিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি পরবর্তী উপাদান-বর্ণনাগুলো বোঝার ভিত্তি তৈরি করে: আসমানগুলো পৃথক স্তর, আর প্রতিটি স্তরকে নির্দিষ্ট পদার্থ দিয়ে নির্মিত বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। “স্তর” এবং “উপাদান”—এই দুটি ধারণা একত্র করলে যে মহাবিশ্বচিত্র পাওয়া যায়, তা একটি নির্মিত স্থাপত্যের ছবি।
সুয়ূতীর সংকলনে সাত আসমানের উপাদান-তালিকা
জালালুদ্দীন আবদুর রহমান আস-সুয়ূতী তাঁর “আল-হাইআতুস সানিয়্যা ফিল হাইআতিস সুন্নিয়্যা” গ্রন্থের “সাত আসমানের বৈশিষ্ট্য” অংশে আল-রবী ইবন আনাসের নামে একটি বিস্তারিত তালিকা সংকলন করেছেন। সেখানে নিচের আসমান থেকে সপ্তম আসমান পর্যন্ত প্রত্যেকটির জন্য আলাদা উপাদান নির্ধারণ করা হয়েছে: [7]
وأخرج إسحاق بن راهويه في مسنده، والطبراني في الأوسط، والترمذي، وابن المنذر، عن الربيع بن أنس قال: (السماء الدنيا: موج مكفوف، والثانية: مرمرة بيضاء، والثالثة: حديد، والربعة: نحاس، والخامسة: فضة، والسادسة: ذهب، والسابعة: ياقوتة حمراء).
বাংলা অনুবাদ: “ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহ তাঁর মুসনাদে, তাবারানী আল-আওসাতে, তিরমিযী এবং ইবনুল মুনযির আল-রবী ইবন আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: নিচের আসমান আবদ্ধ তরঙ্গ; দ্বিতীয়টি সাদা মার্বেল; তৃতীয়টি লোহা; চতুর্থটি তামা; পঞ্চমটি রূপা; ষষ্ঠটি সোনা; এবং সপ্তমটি লাল ইয়াকুত।”
এখানে ব্যবহৃত শব্দগুলো লক্ষণীয়। “লোহা”, “তামা”, “রূপা”, “সোনা” এবং “ইয়াকুত” মানুষের পরিচিত নির্দিষ্ট পদার্থের নাম। আসমানের পৃথক স্তরের সঙ্গে এই পদার্থগুলোর সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এগুলোকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কারের পূর্বাভাস হিসেবে উপস্থাপন করার ভিত্তি নেই। বর্ণনাটির নিজস্ব ভাষা অনুসারেই এটি ধাতু ও রত্নে নির্মিত আকাশের ধারণা। মানুষের পরিচিত নির্মাণসামগ্রী ও মূল্যবান সম্পদ দিয়ে মহাজাগতিক স্তর সাজানোর এই প্রবণতা প্রাচীন কল্পনার প্রকৃতি প্রকাশ করে: পৃথিবীর প্রাসাদ যত মূল্যবান পাথর ও ধাতুতে সমৃদ্ধ, আকাশের উচ্চতর অঞ্চলও যেন তত মূল্যবান উপাদানে নির্মিত।
একই গ্রন্থে ভিন্ন তালিকা: প্রথম আসমান তরঙ্গ, নাকি সবুজ জমরদ?
সুয়ূতীর একই গ্রন্থে পরের পৃষ্ঠাতেই সালমান আল-ফারসির নামে আসমানের উপাদান ও নামের আরেকটি তালিকা রয়েছে। এই বর্ণনার সনদকে সুয়ূতী নিজেই অত্যন্ত দুর্বল বলেছেন। এখানে প্রথম আসমানকে আবদ্ধ তরঙ্গের পরিবর্তে সবুজ জমরদ, দ্বিতীয়টিকে সাদা মার্বেলের পরিবর্তে সাদা রূপা এবং সপ্তমটিকে লাল ইয়াকুতের পরিবর্তে আলো দিয়ে নির্মিত বলা হয়েছে: [8]
وأخرج أبو الشيخ – بسند واه – عن سلمان الفارسي قال: (السماء الدنيا: من زمردة خضراء واسمها رقيعاء، والثانية: من فضة بيضاء واسمها أزقلون، والثالثة: من ياقوتة حمراء واسمها قيدوم، والرابعة: من درة بيضاء واسمها ماعونا، والخامسة: من ذهبة حمراء واسمها ريقا، والسادسة: من ياقوتة صفراء واسمها دقناء، والسابعة: من نور واسمها عريبا).
বাংলা অনুবাদ: “আবু শায়খ অত্যন্ত দুর্বল সনদে সালমান আল-ফারসি থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: নিচের আসমান সবুজ জমরদ দিয়ে তৈরি, তার নাম রাকীআ; দ্বিতীয়টি সাদা রূপা দিয়ে তৈরি, তার নাম আযকালূন; তৃতীয়টি লাল ইয়াকুত দিয়ে তৈরি, তার নাম কাইদূম; চতুর্থটি সাদা মুক্তা দিয়ে তৈরি, তার নাম মাঊনা; পঞ্চমটি লালবর্ণের সোনা দিয়ে তৈরি, তার নাম রীকা; ষষ্ঠটি হলুদ ইয়াকুত দিয়ে তৈরি, তার নাম দাকনা; সপ্তমটি আলো দিয়ে তৈরি, তার নাম আরীবা।”
এই দুটি তালিকার মধ্যে নির্মাণ-উপাদানের স্পষ্ট অমিল রয়েছে। একই আসমান এক বর্ণনায় তরঙ্গ, অন্য বর্ণনায় জমরদ; এক বর্ণনায় লোহা, অন্য বর্ণনায় ইয়াকুত। অথচ উভয় বিবরণের কল্পনাকাঠামো একই: আকাশকে সাতটি পৃথক স্তরে ভাগ করে মানুষের পরিচিত ধাতু, পাথর, রত্ন ও আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। তালিকার এই পরিবর্তনশীলতা থেকে যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা সরাসরি—আসমানের বাস্তব নির্মাণ-উপাদান জানা থাকলে একই স্তর সম্পর্কে এমন পরস্পরবিরোধী উপাদান-তালিকা কেন তৈরি হবে? কোনো পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ বা পরীক্ষার ভিত্তিতে এখানে একটি তালিকাকে অন্যটির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। ধর্মীয় বর্ণনার মর্যাদা দিয়ে বস্তুগত জ্ঞানের এই ঘাটতি পূরণ করা যায় না।
আল-রবী ইবন আনাস ও সালমান আল-ফারসির নামে সংকলিত এই বক্তব্যগুলোর ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, এগুলো ধ্রুপদী ধর্মীয় সাহিত্যে প্রচলিত আকাশ-ভাবনার নির্দিষ্ট নমুনা। আসমানের উপাদান সম্পর্কে এসব তালিকা পুনরাবৃত্তি করা আর সেই উপাদানের অস্তিত্ব প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। আকাশ লোহা, তামা, রূপা বা রত্নের স্তর দিয়ে নির্মিত—এমন দাবি বস্তুগত বাস্তবতা সম্পর্কিত দাবি; তার সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য বস্তুগত প্রমাণ প্রয়োজন। গ্রন্থে একটি তালিকা পাওয়া গেলে সেই তালিকার সাহিত্যিক অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, মহাবিশ্বে তার বর্ণিত স্থাপত্যের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না। এই পার্থক্যেই ধাতব ও রত্ননির্মিত আসমানের ধারণার মৌলিক জ্ঞানগত সংকটটি ধরা পড়ে।
ধাতব আসমান ও দরজাওয়ালা মহাবিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট
সাত আসমানকে মেঘ, জমরদ, লোহা, পিতল, রৌপ্য, স্বর্ণ ও লাল ইয়াকুত দিয়ে তৈরি বলা শুধু একটি অদ্ভুত ধর্মীয় কল্পনা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাক-বৈজ্ঞানিক মহাবিশ্বচিত্র। এখানে আকাশকে গ্যাস, প্লাজমা, নক্ষত্রমণ্ডল, ছায়াপথ, মহাজাগতিক বিকিরণ বা স্থান-কালের বিস্তার হিসেবে ভাবা হয়নি; বরং ভাবা হয়েছে মানুষের পরিচিত বস্তু—ধাতু, পাথর, রত্ন, মেঘের জমাট আস্তরণ—দিয়ে নির্মিত এক ধরনের অতিপ্রাকৃত স্থাপত্য হিসেবে। এই বর্ণনায় মহাবিশ্ব যেন কোনো পদার্থবিজ্ঞানের বাস্তবতা নয়, বরং রাজপ্রাসাদের মতো নির্মিত এক স্তরবিন্যস্ত ভবন: নিচে পৃথিবী, তার ওপর একের পর এক শক্ত আসমান, প্রতিটি স্তরে দরজা, দরজায় প্রহরী, আর সর্বোচ্চ স্তরে ঈশ্বরীয় কর্তৃত্ব। এই কল্পনাটি মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরে যায় না; বরং মানুষের বাজার, দুর্গ, দরবার, ধনরত্ন, স্থাপত্য ও প্রশাসনিক কাঠামোকেই আকাশে তুলে বসায়। এখানেই এর পৌরাণিক চরিত্র নগ্ন হয়ে ওঠে। কোনো সর্বজ্ঞ স্রষ্টা যদি সত্যিই মহাবিশ্বের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতেন, তাহলে তিনি আকাশকে লোহা-পিতল-সোনা-ইয়াকুতের স্তর বলে বর্ণনা করতেন না। এমন বর্ণনা আসে সেই মানুষের কাছ থেকে, যারা দূরবীক্ষণযন্ত্র জানত না, মহাকর্ষ জানত না, নক্ষত্রের প্রকৃতি জানত না, গ্যালাক্সি জানত না, এবং মাথার ওপরের নীল দৃশ্যটিকে বাস্তব কোনো কঠিন গম্বুজ বলে কল্পনা করাই যাদের কাছে স্বাভাবিক ছিল। তাই সাত আসমানের এই বস্তুগত তালিকা কোনো মহাজাগতিক সত্য নয়; এটি প্রাচীন মানুষের সীমিত জ্ঞান, ধনরত্নমুগ্ধ কল্পনা ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের মিশ্রণে তৈরি এক কসমিক রূপকথা।
উপসংহার
মিরাজের সাত আসমান, দরজাওয়ালা আকাশ, পাহারাদার ফেরেশতা, স্তরে স্তরে মৃত নবীদের অবস্থান, সিদরাতুল মুনতাহা, বাইতুল মামুর এবং ধাতু-রত্ন দিয়ে তৈরি আকাশ—এসবকে আধুনিক মহাবিশ্বের কোনো বাস্তব বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এগুলো এমন এক কসমোলজি, যার প্রতিটি স্তরে প্রাচীন মানুষের কল্পনা, পৌরাণিক উত্তরাধিকার এবং মানবসমাজের ক্ষমতাকাঠামোর ছাপ স্পষ্ট। এখানে মহাবিশ্বকে দেখা হয়েছে রাজপ্রাসাদের মতো: নিচে সাধারণ জগৎ, ওপরে স্তরবিন্যস্ত অভিজাত অঞ্চল, প্রতিটি স্তরে দরজা ও প্রহরী, সর্বোচ্চে ঈশ্বরীয় সিংহাসন। এটি বিজ্ঞান নয়; এটি আকাশে প্রক্ষেপিত সামন্ততান্ত্রিক প্রশাসন। মানুষের পৃথিবীর দরবার, পাহারা, অনুমতি, সিংহাসন, ধনরত্ন আর শ্রেণিবিন্যাসকে মহাবিশ্বের কাঠামো বানিয়ে দেওয়াই এই কাহিনির আসল চরিত্র।
এই কারণেই মিরাজ-কাহিনিকে “অলৌকিক সত্য” বলে অন্ধভাবে মানা আসলে জ্ঞানের বিরুদ্ধে আত্মসমর্পণ। মেসোপটেমীয়, ব্যাবিলনীয়, জরথুস্ত্রীয়, মান্দায়ী ও দেরি-প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের আকাশভ্রমণ-পুরাণের সঙ্গে এর গঠনগত মিল এত প্রবল যে এটিকে একেবারে বিচ্ছিন্ন, স্বর্গীয়, মৌলিক ঘটনা বলা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে টেকসই নয়। বরং বেশি সৎ ব্যাখ্যা হলো—ইসলাম তার নিজস্ব নবী, ফেরেশতা, আল্লাহ, সালাত ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব বসিয়ে পূর্ববর্তী আকাশ-পুরাণের একটি নতুন সংস্করণ নির্মাণ করেছে। পুরোনো পৌরাণিক কাঠামোর গায়ে ইসলামি ভাষা বসালেই সেটি মহাজাগতিক সত্য হয়ে যায় না।
আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের যে মহাবিশ্ব দেখায়, সেখানে কোনো লোহার আসমান নেই, পিতলের আসমান নেই, সোনার স্তর নেই, ইয়াকুতের আকাশ নেই, মহাশূন্যের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরী নেই। আছে নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যালাক্সি, মহাকর্ষ, বিকিরণ, অন্ধকার পদার্থ, স্থান-কালের বিস্তার এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রকৃতির কঠোর নিয়ম। ধর্মীয় কাহিনি এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে না; বরং বহু ক্ষেত্রেই প্রাচীন অজ্ঞতাকে পবিত্রতার আবরণে ঢেকে রাখে। তাই সাত আসমানের এই মডেলকে সত্য বলে আঁকড়ে ধরা মানে মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা নয়, বরং প্রাচীন মানুষের ভুল কল্পনাকে ঈশ্বরের নামে বাঁচিয়ে রাখা। যুক্তি, ইতিহাস ও বিজ্ঞান একসঙ্গে যে জায়গায় দাঁড়ায়, সেখানে সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট: এই আসমান বাস্তব মহাকাশ নয়; এটি প্রাচীন পুরাণের দরজাওয়ালা আকাশ, যার ভেতরে ঈশ্বরের চেয়ে মানুষের কল্পনাই বেশি দৃশ্যমান।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিস নম্বরঃ ৩০০ ↩︎
- Wayne Horowitz, Mesopotamian Cosmic Geography, Eisenbrauns, 1998 ↩︎
- The Book of Arda Viraf, translated by Martin Haug and E. W. West ↩︎
- Jorunn Jacobsen Buckley, The Mandaeans: Ancient Texts and Modern People, Oxford University Press, 2002 ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, ইসলামিয়া কুতুবখানা প্রকাশনী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫ ↩︎
- হুসাইন ইবন মাসউদ আল-বাগাবী, মাআলিমুত তানযীল, সূরা আল-মুলক ৬৭:৩-এর তাফসির ↩︎
- জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আসরারুল কাউন = আল-হাইআতুস সানিয়্যা ফিল হাইআতিস সুন্নিয়্যা, “সিফাতুস সামাওয়াতিস সাব্আ”, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪২৭ হিজরি/২০০৬, পৃষ্ঠা ৪৫ ↩︎
- জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আসরারুল কাউন = আল-হাইআতুস সানিয়্যা ফিল হাইআতিস সুন্নিয়্যা, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪২৭ হিজরি/২০০৬, পৃষ্ঠা ৪৬ ↩︎

