জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামে সর্বপ্রথম সৃষ্টি কী ছিল: পানি, কলম, আরশ নাকি আলো ও অন্ধকার?

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি 6, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন54 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে প্রথম সৃষ্টি কী ছিল—পানি, কলম, আরশ, নাকি অন্য কিছু? ইসলামি ধর্মগ্রন্থ ও প্রাচীন তাফসিরে সৃষ্টির সূচনা নিয়ে একাধিক বর্ণনা রয়েছে। কোরআনে আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে আরশ পানির ওপর থাকার কথা বলা হয়েছে। সহিহ হাদিসে সেই প্রাক্‌-সৃষ্টির অবস্থা এবং তাকদির লিখে রাখার বিবরণ পাওয়া যায়। অন্য একটি হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে ভবিষ্যতের সমস্ত ঘটনার তাকদির লিখতে নির্দেশ দেন। প্রাচীন তাফসিরকারীদের একটি বর্ণনায় আদিম পানি থেকে ধোঁয়া, ধোঁয়া থেকে আসমান এবং পানি শুকিয়ে পৃথিবী সৃষ্টির একটি সুস্পষ্ট ক্রমও পাওয়া যায়। এসব দাবি একত্রে পরীক্ষা করলে সৃষ্টির প্রথম পর্যায় সম্পর্কে ইসলামি বর্ণনাগুলোর বিষয়বস্তু, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা মূল্যায়ন করা সম্ভব।

আদিম মহাবিশ্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নির্ভর করে পর্যবেক্ষণযোগ্য আলোর বর্ণালি, মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ, মৌলিক পদার্থের অনুপাত, নক্ষত্রের বিবর্তন এবং পরীক্ষাযোগ্য পদার্থবিজ্ঞানের ওপর। পানি একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগ; কলম একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য ব্যবহৃত বস্তু। এই বস্তুগুলোকে যখন আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগের অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন ধর্মীয় বর্ণনার কালানুক্রম এবং প্রকৃতির ইতিহাসের মধ্যে তুলনার প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে একটি জরুরি পার্থক্য রয়েছে: ‘আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে পানি ছিল’ আর ‘সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে পানিই সর্বপ্রথম সৃষ্টি’—এই দুটি বক্তব্য এক নয়। কোরআন, হাদিস এবং তাফসিরের বক্তব্য যে স্তরে যা বলেছে, বিশ্লেষণেও সেই পার্থক্য অক্ষত থাকতে হবে।


আদিম মহাবিশ্বে প্রথম মৌল এবং পানির রাসায়নিক উৎপত্তি

মহাবিশ্বের প্রথম অবস্থাকে কোনো পরিচিত অণু বা রাসায়নিক মৌল দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না। মহাবিস্ফোরণ-পরবর্তী আদিম উত্তপ্ত পর্যায়ে আজকের অর্থে স্থিতিশীল পরমাণুও ছিল না। সম্প্রসারণের ফলে তাপমাত্রা কমার পর প্রোটন-নিউট্রন থেকে প্রথম কয়েক মিনিটে প্রধানত হালকা মৌলের নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। আরও পরে ইলেকট্রন যুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠিত হয়। তাই ‘প্রথম পদার্থ’, ‘প্রথম মৌল’, ‘প্রথম পরমাণু’ এবং ‘প্রথম অণু’ একই অর্থে ব্যবহারের সুযোগ নেই। প্রাচীন মহাবিশ্বের রাসায়নিক বিবর্তন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়ামের আদিম প্রাচুর্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। [1]

Most of the hydrogen and helium in the universe was created in about 5 minutes.

বাংলা অনুবাদ: মহাবিশ্বের অধিকাংশ হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল প্রথম প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে। পরে মহাবিশ্ব ঠান্ডা হলে সেগুলো ইলেকট্রন গ্রহণ করে পরমাণু গঠন করে।

পানি কোনো মৌল নয়; এটি দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত H2O অণু। মহাবিস্ফোরণ-পরবর্তী আদিম নিউক্লীয় সংশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য অক্সিজেন তৈরি হয়নি। প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্র গঠনের পর তাদের অভ্যন্তরীণ নিউক্লীয় বিক্রিয়া থেকে অক্সিজেনের মতো অপেক্ষাকৃত ভারী মৌল উৎপন্ন হয়। পরবর্তী সময়ে সেই মৌল আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং হাইড্রোজেনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় পানির অণু গঠনের পরিবেশ তৈরি হয়। নাসা সরাসরি হাইড্রোজেনের উৎস মহাবিস্ফোরণ এবং অক্সিজেনের উৎস নক্ষত্রের কেন্দ্র বলে চিহ্নিত করেছে। [2]

Hydrogen was created in the Big Bang, and oxygen in the cores of stars more massive than the Sun.

বাংলা অনুবাদ: হাইড্রোজেনের উৎপত্তি মহাবিস্ফোরণে, আর অক্সিজেন উৎপন্ন হয়েছে সূর্যের চেয়ে অধিক ভরবিশিষ্ট নক্ষত্রের অভ্যন্তরে। ফলে পানির রাসায়নিক উপাদানগুলোরও মহাবিশ্বের ইতিহাসে পৃথক উৎস ও গঠনের সময় রয়েছে।

পানির অস্তিত্ব যে নক্ষত্র ও ভারী মৌল সৃষ্টির পরের পর্যায়ে সম্ভব হয়েছে, তার অর্থ এই নয় যে মহাবিশ্বে পানি কেবল পৃথিবী গঠনের পরে এসেছে। পৃথিবীর বহু আগে আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস ও ধূলিকণায় পানির অণু গঠিত হতে পারে। মহাবিশ্বের প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রগুলো ছিল মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম-সমৃদ্ধ পদার্থের সমষ্টি; এগুলোর ভেতরেই পরবর্তী ভারী মৌলের উৎপত্তি শুরু হয়। মহাজাগতিক রাসায়নিক ইতিহাসে তাই পানি প্রথম উপাদান নয়, বরং পূর্বে গঠিত মৌলগুলোর সমন্বয়ে তৈরি পরবর্তী যৌগ। [3]


আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির আগে পানির ওপর আরশ

সুরা হুদের ৭ নম্বর আয়াতে ছয় দিনে আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির সঙ্গে এমন একটি পূর্ববর্তী অবস্থার উল্লেখ রয়েছে, যখন আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল। আয়াতটি সরাসরি পানিকে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম পদার্থ ঘোষণা করে না; কিন্তু আসমান-পৃথিবী গঠনের আগে পানির অস্তিত্বের ধারণা উপস্থিত করে। তাবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবীসহ প্রাচীন তাফসিরকারীরা আয়াতটিকে সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। [4]

وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا

বাংলা অনুবাদ: তিনিই সর্বশক্তিমান, যিনি সৃজন করিয়াছেন আসমান ও জমীনকে ছয় দিবসে আর তিনি সিংহাসনে আসীন ছিলেন যা ছিল পানির উপরে।

সৃষ্টির পূর্বাবস্থা সম্পর্কে সহিহ বুখারীর ৩১৯১ নম্বর হাদিসটি সরাসরি প্রাসঙ্গিক। ইয়েমেন থেকে আসা একটি দল মুহাম্মদকে সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আল্লাহ ছিলেন, তাঁর ছাড়া আর কিছু ছিল না; তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল; তিনি সবকিছু লিখে রাখেন এবং আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন। এখানে পানির ওপর আরশের অস্তিত্ব, সমস্ত ঘটনার পূর্বলিখন এবং আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির বিবরণ একই হাদিসে এসেছে। বর্ণনায় আরশ ও পানির অস্তিত্ব আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির পূর্ববর্তী অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও আরশ ও পানির নিজেদের সৃষ্টির ক্রম নির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে এই হাদিস সৃষ্টির প্রথম পর্যায় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বহন করলেও সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম কোন বস্তুটি সৃষ্টি হয়েছিল, তার একক উত্তর দেয় না। [5]

كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَىْءٌ غَيْرُهُ، وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ، وَكَتَبَ فِي الذِّكْرِ كُلَّ شَىْءٍ، وَخَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ ছিলেন এবং তাঁর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল। তিনি লিখিত স্মারকে সমস্ত বিষয় লিপিবদ্ধ করেন এবং আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন। এই বক্তব্যটি ইমরান ইবনে হুসাইনের বর্ণনায়, সৃষ্টির সূচনা জানতে আসা ইয়েমেনিদের প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদ বলেছেন।

সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আসের সূত্রে এই আদিম পানির বিবরণে একটি নির্দিষ্ট সময়ের হিসাব পাওয়া যায়। সেখানে মুহাম্মদ বলেছেন, আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টির তাকদির নির্ধারণ করেছিলেন, আর সেই সময় তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল। এখানে পানি আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির আগের একটি নির্দিষ্ট অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বর্ণনাটি সৃষ্টির কালানুক্রম বুঝতে বুখারীর বিবরণের গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক। [6]

كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلاَئِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ – قَالَ – وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সমস্ত সৃষ্টির তাকদির লিখে রেখেছিলেন। সেই সময় তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।


তাফসীরে তাবারী: পানি থেকে ধোঁয়া, ধোঁয়া থেকে আসমান ও পানি শুকিয়ে পৃথিবী

সুরা আল-বাকারার ২৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবারী সুদ্দীর সূত্রে ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ এবং কয়েকজন সাহাবির নামে সৃষ্টির একটি বিস্তারিত বিবরণ সংকলন করেছেন। এতে বলা হয়েছে, আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল এবং পানি থেকে ধোঁয়া বের করে আসমান সৃষ্টি করা হয়। এরপর পানি শুকিয়ে প্রথমে একটি পৃথিবী এবং পরে সাত পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়। একই বর্ণনায় মাছের পিঠে পৃথিবী, মাছের নিচে পানি ও পাথর এবং পাহাড়ের মাধ্যমে পৃথিবীর কম্পন থামানোর বিবরণও রয়েছে। এটি সরাসরি কোরআনের আয়াতের বাক্য নয়, বরং আয়াতের প্রাচীন তাফসিরে সংরক্ষিত একটি সৃষ্টিকাহিনি। [7]

إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى كَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ … فَلَمَّا أَرَادَ أَنْ يَخْلُقَ الْخَلْقَ، أَخْرَجَ مِنَ الْمَاءِ دُخَانًا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল। যখন তিনি সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করলেন, তখন পানি থেকে ধোঁয়া বের করলেন; সেই ধোঁয়া ওপরে উঠে আসমানের উপাদানে পরিণত হয়। এরপর পানি শুকিয়ে পৃথিবী গঠিত হয় এবং তাকে সাত পৃথিবীতে বিভক্ত করা হয়। বর্ণনাটির পরবর্তী অংশে নুন নামক মাছের ওপর পৃথিবী স্থাপন এবং মাছের নড়াচড়ায় পৃথিবী কেঁপে ওঠার কথা রয়েছে।

এই বর্ণনায় পানি প্রথম থেকেই উপস্থিত পদার্থমাত্র নয়; পৃথিবী এবং আসমান গঠনের উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ধোঁয়াকে পানির মধ্য থেকে উৎপন্ন বলা হয়েছে এবং শুকিয়ে যাওয়া পানিকে ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাস্তব রসায়নে পানির বাষ্প কিংবা ধোঁয়া ঠান্ডা হয়ে আসমান বা গ্রহের শিলাস্তরে পরিণত হয় না; গ্রহ ও নক্ষত্র গঠনের সঙ্গে মহাজাগতিক গ্যাস, ধূলিকণা, মাধ্যাকর্ষণ ও ভারী মৌলের দীর্ঘ বিবর্তন জড়িত। তাবারীর উদ্ধৃত সৃষ্টিকাহিনি এই পর্যবেক্ষিত প্রক্রিয়ার বিবরণ নয়।


কুরতুবী ও বাগাভী: আরশ ও পানির পূর্বাবস্থা

কুরতুবী সুরা হুদের ৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আয়াতটি থেকে আসমান ও পৃথিবীর আগে আরশ ও পানি সৃষ্টির কথা বোঝা যায়। একই আলোচনায় কাবের নামে একটি বর্ণনা রয়েছে: আল্লাহ একটি সবুজ ইয়াকুত সৃষ্টি করেন, সেটি পানিতে পরিণত হয়, তারপর বাতাস সৃষ্টি করে তার ওপর পানি এবং পানির ওপর আরশ স্থাপন করেন। অর্থাৎ কুরতুবীর সংকলনে পানি এবং আরশের প্রাথমিক অবস্থান ছাড়াও পানির উৎস সম্পর্কে একটি পৃথক কাহিনি পাওয়া যায়। সেই কাহিনির জলধারণা প্রাকৃতিক রাসায়নিক উৎপত্তির বদলে অলৌকিক রূপান্তরের ওপর নির্ভরশীল। [8]

وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ بَيَّنَ أَنْ خَلْقَ الْعَرْشِ وَالْمَاءِ قَبْلَ خَلْقِ الْأَرْضِ وَالسَّمَاءِ

বাংলা অনুবাদ: ‘তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল’—এই বক্তব্য দ্বারা বোঝানো হয়েছে, আরশ ও পানি পৃথিবী এবং আসমান সৃষ্টির আগেই সৃষ্টি হয়েছিল। কুরতুবী এরপর পানির নিচে বাতাস থাকার বিষয়ে ইবনে আব্বাসের বর্ণনা এবং সবুজ ইয়াকুত থেকে পানি সৃষ্টির বিষয়ে কাবের বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন।

বাগাভী একই আয়াতের ব্যাখ্যায় দমরার নামে আরও একটি ক্রম উল্লেখ করেছেন: প্রথমে আরশ পানির ওপর ছিল; তারপর আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি এবং পরে কলম দিয়ে সৃষ্টির ঘটনা লিপিবদ্ধ করার কথা এসেছে। এই বিবরণের সঙ্গে ‘কলমই সর্বপ্রথম সৃষ্টি’ বর্ণনার ক্রমগত সম্পর্ক সরল নয়। পানি, আরশ ও কলম—কোনটি কখন সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে প্রাচীন গ্রন্থগুলোর বিবরণ একই ভাষায় সাজানো হয়নি। [9]

إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى كَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ثُمَّ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ، وَخَلَقَ الْقَلَمَ فَكَتَبَ بِهِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল। এরপর তিনি আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন এবং কলম সৃষ্টি করে তার মাধ্যমে তিনি যা সৃষ্টি করবেন ও সৃষ্টিজগতে যা ঘটবে তা লিপিবদ্ধ করান।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত তাফসীরে ইবনে কাসীরের প্রথম খণ্ডে একই সৃষ্টি-ক্রমের বাংলা অনুবাদ রয়েছে। [10]

আস্ সুদ্দী স্বীয় তাফসীরে ইবন মাসউদ ও অন্যান্য সাহাবা (রা) হইতে পর্যায়ক্রমে মুরাহ, ইব্‌ন আব্বাস, আবু সালেহ ও আবূ মালিক হইতে বর্ণনা করেন- সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ্ তা’আলার আরশ পানির উপর সংস্থাপিত ছিল। পানির পূর্বে আল্লাহ্ পাক কোন বস্তুই সৃষ্টি করেন নাই। সুতরাং সৃজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বপ্রথম তিনি পানি হইতে বাষ্প সৃষ্টি করিলেন। উহা ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বলোকে উত্থিত হইল এবং উত্থিত বাষ্প ছাদরূপ পরিগ্রহ করিয়া আকাশে পরিণত হইল। এইজন্য উহার নাম হইল ماء )উর্ধ্বলোক)। অতঃপর পানি শুকাইয়া একটি ভূখণ্ড দেখা দিল। তখন উহাকে সপ্তখণ্ডে বিভক্ত করা হইল। রবি-সোম দুই দিনে এই সপ্তখণ্ড সৃষ্টি হইল। অতঃপর পৃথিবীকে সেই মৎসের উপর স্থাপন করা হইল যাহার বর্ণনা সূরা ‘নূন ওয়াল কলম’-এ আসিয়াছে। মৎসটি পানির উপর এবং পানির নীচে সকাত জাতীয় পদার্থ বা পরিচ্ছন্ন মৃত্তিকা শিলা বিদ্যমান। মৃত্তিকা শিলার ধারক হইলেন ফেরেশতা। ফেরেশতা দণ্ডায়মান প্রস্তরের আস্তরের উপর এবং প্রস্তরের আস্তরটি বায়ুমণ্ডলের উপর ভাসমান রহিয়াছে। লুকমান হাকীম এই প্রস্তর আস্তরের কথাই বলিয়াছেন। উহা আকাশ কিংবা পৃথিবীর কোথাও স্থাপিত নহে। মৎসটি নড়াচড়া করা মাত্র পৃথিবী কম্পিত হয় এবং ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। তাই পৃথিবীকে পাহাড় চাপা দেওয়া হইল। ফলে পৃথিবী সুস্থির হইল। পর্বত তাই পৃথিবীর কাছে নিজের বড়াই করিয়া থাকে।

সৃষ্ট

সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন: মেঘ, শূন্যতা এবং পানির ওপর আরশ

মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে আল্লাহর অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে প্রাচীন হাদিসশাস্ত্রে একটি বিশেষ বর্ণনা পাওয়া যায়। জামে তিরমিজির ৩১০৯ নম্বর হাদিসে আবু রাজিন আল-উকাইলি মুহাম্মদকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, সমস্ত সৃষ্টি সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন? উত্তরে মুহাম্মদ ‘আমা’ (عماء) শব্দটি ব্যবহার করেন। আরবি ভাষায় এই শব্দের একটি অর্থ মেঘ বা মেঘাচ্ছন্ন অবস্থা। এরপর এমন একটি অবস্থার কথা বলা হয়, যার ওপরে কিংবা নিচে বাতাস ছিল না। সর্বশেষ পানির ওপর আরশ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়। এই হাদিসে তাই সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে শুধু পানির অস্তিত্ব নয়, তারও পূর্ববর্তী একটি অবস্থার বিবরণ পাওয়া যায়। [11]

أَيْنَ كَانَ رَبُّنَا قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ خَلْقَهُ قَالَ كَانَ فِي عَمَاءٍ مَا تَحْتَهُ هَوَاءٌ وَمَا فَوْقَهُ هَوَاءٌ وَخَلَقَ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ

বাংলা অনুবাদ: সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করার আগে আমাদের প্রতিপালক কোথায় ছিলেন? তিনি বললেন, তিনি ‘আমা’ অবস্থায় ছিলেন; তার নিচে কোনো বাতাস ছিল না এবং ওপরেও কোনো বাতাস ছিল না। এরপর তিনি পানির ওপর তাঁর আরশ সৃষ্টি করেন।

তিরমিজি এই হাদিসকে হাসান বলেছেন। তবে হাদিসটির সনদগত মূল্যায়নে পরবর্তী মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাবারী বর্ণনাটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন; তিরমিজি, যাহাবি ও ইবনে তাইমিয়াও বিভিন্নভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে আলবানী একে দুর্বল বলেছেন। ইসলামকিউএর ১৪৫৮০৯ ও ৪৪৩৯৮৯ নম্বর আলোচনায় এই মতভেদগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং বর্ণনাটি মুহাম্মদের নিশ্চিত ঐতিহাসিক বক্তব্য কি না, সেই প্রশ্নে হাদিসশাস্ত্রীয় মতভেদ রয়েছে। কিন্তু প্রাচীন হাদিসসংকলনে সৃষ্টি-পূর্ব অবস্থার একটি নির্দিষ্ট বিবরণ হিসেবে এর উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত। [12] [13]

তাফসীরে তাবারীতেও সুরা হুদের ৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু রাজিনের সূত্রে একই প্রশ্নোত্তর সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে আল্লাহ কোথায় ছিলেন, সে প্রশ্নের উত্তরে আমা এবং পরবর্তী সময়ে পানির ওপর আরশ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। তাবারীর ১৭৯৮০ ও ১৭৯৮১ নম্বর বর্ণনায় একই ঘটনাটির ভিন্ন শব্দবিন্যাস পাওয়া যায়। এগুলো তিরমিজির হাদিস থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘটনার বিবরণ নয়; আবু রাজিনের সূত্রে প্রচলিত একই প্রশ্নোত্তরের বিভিন্ন সংকলিত রূপ। [14]


‘আমা’ কি বাস্তব মেঘ, নাকি কোনো কিছুর অনুপস্থিতি?

হাদিসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হচ্ছে ‘আমা’। শব্দটির অর্থ নির্ধারণে প্রাচীন আরবি ভাষাবিদ এবং পরবর্তী ইসলামি ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যে মতভেদ পাওয়া যায়। আবু উবাইদসহ কয়েকজন প্রাচীন ভাষাবিদ শব্দটির অর্থ মেঘ বলেছেন। অন্যদিকে তিরমিজির বর্ণনায় ইয়াজিদ ইবনে হারুনের ব্যাখ্যায় ‘আমা’ বলতে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব না থাকার কথা বোঝানো হয়েছে। ফলে একই হাদিসের শব্দকে এক ব্যাখ্যায় মেঘের মতো অবস্থার বিবরণ হিসেবে এবং অন্য ব্যাখ্যায় সৃষ্টির অনুপস্থিতির বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

ইমাম সিন্দী তাঁর ‘হাশিয়াতুস সিন্দী আলা ইবনে মাজাহ’ গ্রন্থে এই মতভেদটি আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমা’ শব্দটির সাধারণ আরবি অর্থ মেঘ। কিন্তু অন্য ব্যাখ্যায় শব্দটিকে কোনো বিদ্যমান বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। কারণ সৃষ্টির আগের অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বস্তুর অস্তিত্ব না থাকার ধারণার সঙ্গে সেই ব্যাখ্যা যুক্ত। সিন্দীর আলোচনায় এও বলা হয়েছে, হাদিসটির একটি ব্যাখ্যা অনুসারে এখানে নির্দিষ্ট কোনো স্থানের কথা নয়, বরং স্থান ও অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর অনুপস্থিতির কথা বোঝানো হয়েছে। [15]

وَالْعَمَاءُ بِالْفَتْحِ وَالْمَدِّ السَّحَابُ كَذَا فِي النِّهَايَةِ

বাংলা অনুবাদ: ‘আমা’ শব্দটি ফাতহা ও দীর্ঘ স্বরসহ উচ্চারিত হলে তার অর্থ মেঘ। ‘আন-নিহায়া’ গ্রন্থেও এই অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পার্থক্যের কারণে হাদিসটির দুটি ব্যাখ্যা একই ভৌত অবস্থার বিবরণ দেয় না। মেঘ বলতে কোনো বাস্তব পদার্থগত মেঘ বোঝালে তার অস্তিত্বের জন্য পদার্থের একটি অবস্থা প্রয়োজন। অন্যদিকে কোনো কিছুর অস্তিত্ব না থাকা বোঝালে ‘আমা’ আর স্বতন্ত্র পদার্থগত উপাদান থাকে না। দুটি ব্যাখ্যা থেকে মহাবিশ্বের সৃষ্টির আগের একই ভৌত কাঠামো নির্ধারণ করা যায় না। ফলে সৃষ্টি-পূর্ব অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনার মূল শব্দটির অর্থই অনির্দিষ্ট থেকে গেছে।

এই হাদিসের সঙ্গে সহিহ বুখারীর ৩১৯১ নম্বর হাদিসের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। বুখারীর বর্ণনায় আল্লাহর পূর্ববর্তী অস্তিত্ব এবং পানির ওপর আরশের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু আবু রাজিনের প্রশ্নোত্তরে তার আগে ‘আমা’র একটি অবস্থার উল্লেখ রয়েছে, তারপর আরশ সৃষ্টির বিবরণ এসেছে। ফলে সৃষ্টির প্রাথমিক ইতিহাস নির্ধারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন বর্ণনায় প্রথমে কোন অবস্থা ছিল এবং আরশ কখন সৃষ্টি হলো, সেই ক্রম নিয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন তৈরি হয়। এখানে কেবল দুটি গ্রন্থের নাম বা হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন নয়; বর্ণিত ঘটনাগুলোর কালানুক্রম এবং ব্যবহৃত পদার্থগত শব্দগুলোর অর্থ নির্ধারণের সমস্যাও রয়েছে।


ইবনে রজব: পানি শুধু জীবনের উপাদান নয়, সমস্ত সৃষ্টির মূল পদার্থ

প্রাচীন ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বে পানির ভূমিকা কতটা বিস্তৃত ছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য পাওয়া যায় ইবনে রজব হাম্বলীর তাফসিরে। সুরা হুদের ৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি আবু হুরায়রার সূত্রে প্রচলিত একটি হাদিস আলোচনা করেছেন, যেখানে মুহাম্মদকে সমস্ত সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে পানির কথা বলা হয়েছে। ইবনে রজব সেই বক্তব্য থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পানি সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর মূল উপাদান এবং সব সৃষ্টি তা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় পানি কেবল জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান নয়; সমগ্র সৃষ্টিজগতের পদার্থগত উৎস। [16]

الْمَاءَ أَصْلُ جَمِيعِ الْمَخْلُوقَاتِ وَمَادَّتُهَا . وَجَمِيعُ الْمَخْلُوقَاتِ خُلِقَتْ مِنْهُ

বাংলা অনুবাদ: পানি সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর মূল উৎস ও উপাদান। সমস্ত সৃষ্টি পানি থেকেই উৎপন্ন হয়েছে।

ইবনে রজবের আলোচনার ভিত্তি হিসেবে যে হাদিসটি এসেছে, সেটি মুসনাদে আহমদ ও সহিহ ইবনে হিব্বানেও সংরক্ষিত রয়েছে। আবু হুরায়রা মুহাম্মদকে বলেছিলেন, তাঁকে দেখলে তাঁর মন প্রশান্ত হয় এবং চোখ শীতল হয়; এরপর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সংবাদ জানতে চান। উত্তরে মুহাম্মদ বলেন, সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তারপর আবু হুরায়রা জান্নাতে প্রবেশের উপায় জানতে চাইলে মুহাম্মদ সালাম প্রচার, খাদ্য প্রদান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং রাতে নামাজ আদায়ের কথা বলেন। [17]

كُلُّ شَيْءٍ خُلِقَ مِنْ مَاءٍ

বাংলা অনুবাদ: সমস্ত কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

এখানে হাদিসের বক্তব্য এবং ইবনে রজবের ব্যাখ্যার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে ‘সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি’ হওয়ার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রয়েছে। ইবনে রজব সেই বক্তব্যকে সমস্ত সৃষ্ট বস্তুর মূল পদার্থ হিসেবে পানির অবস্থান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি করেছেন। এরপর তিনি ইবনে মাসউদ এবং প্রাচীন মুসলিমদের একটি দলের নামে পানি সর্বপ্রথম সৃষ্ট হয়েছিল বলে যে মত প্রচলিত ছিল, সেটিও উল্লেখ করেছেন। তাঁর আলোচনায় আবদুল্লাহ ইবনে আমরের নামে সংরক্ষিত আরেকটি বর্ণনা রয়েছে, যেখানে সৃষ্টির শুরু সম্পর্কে মাটি, পানি, কাদা, আগুন ও অন্ধকারের উল্লেখ করার পর প্রশ্ন করা হলে প্রবাহিত পানিকে প্রথম উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ইবনে রজব পানিকে সমস্ত সৃষ্টির উৎস হিসেবে গ্রহণ করার ফলে ফেরেশতার আলো থেকে এবং জিনের আগুন থেকে সৃষ্ট হওয়ার বর্ণনাগুলোর সম্পর্কও আলোচনা করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, আলো ও আগুনের চূড়ান্ত উৎসও পানি হতে পারে। অর্থাৎ তাঁর বিশ্বতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় শুধু পৃথিবী, আসমান কিংবা জীবন্ত প্রাণী নয়; আলো ও আগুনের মতো ভিন্ন উপাদানকেও পানির সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় পানি এমন একটি আদিম মৌলিক পদার্থের অবস্থান লাভ করেছে, যেখান থেকে সৃষ্টিজগতের সমস্ত উপাদান উৎপন্ন হতে পারে।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে এমন কোনো সর্বজনীন উৎস-পদার্থ হিসেবে পানির অবস্থান নেই। পানি নিজেই হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক যৌগ। হাইড্রোজেন মহাবিশ্বের আদিম পর্যায়ে উৎপন্ন হয়েছে এবং অক্সিজেন উৎপন্ন হয়েছে পরবর্তী নক্ষত্রীয় বিবর্তনে। ফলে আলো, আগুন, নক্ষত্র, মৌলিক কণা এবং সমস্ত পদার্থ পানির রাসায়নিক রূপান্তরের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়েছে—এমন ধারণা মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষিত ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষত ইবনে রজবের ব্যাখ্যায় পানি থেকে আলো ও আগুনের উৎপত্তির যে সর্বজনীন পদার্থগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেটি আধুনিক রসায়নের গ্রহণযোগ্য বিবরণ নয়।


পানি থেকে আসমানের বাষ্প, পৃথিবীর ফেনা এবং পাহাড়ের উৎপত্তি

পানিকে সমস্ত সৃষ্টির মূল উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার ধারণা থেকে প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে আসমান, পৃথিবী ও পাহাড় সৃষ্টির বিভিন্ন প্রক্রিয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। সুদ্দীর সূত্রে সংরক্ষিত একটি বর্ণনায় পানি শুকিয়ে পৃথিবী হওয়ার কথা রয়েছে। ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর নামে সংরক্ষিত পৃথক বর্ণনায় পানি থেকে বাষ্প ও ফেনা উৎপন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাষ্প থেকে আসমানসমূহ এবং ফেনা থেকে পৃথিবীগুলো সৃষ্টি হয়। এই বর্ণনাটি ইবনে রজব হাম্বলীর ‘লাতায়েফুল মাআরিফ’ গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। সালাবীর ‘আল-কাশফ ওয়াল-বায়ান’ তাফসিরেও একই কাহিনি পাওয়া যায়, তবে প্রচলিত অনলাইন পাঠগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সালাবীর একটি মুদ্রিত সংস্করণভিত্তিক পাঠে ‘فصارت دما’ অর্থাৎ রক্তে পরিণত হওয়ার কথা রয়েছে। ইবনে রজবের পাঠে ‘فصارت ماء’ অর্থাৎ পানিতে পরিণত হওয়ার কথা রয়েছে। পানির বাষ্প ও ফেনা থেকে আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির ধারাবাহিক বিবরণের সঙ্গে ইবনে রজবের সংরক্ষিত পাঠটি সরাসরি সম্পর্কিত। [18] [19]

وقال وهب: أول ما خلق الله تعالى مكانا مظلما، ثم خلق جوهرة فأضاءت ذلك المكان، ثم نظر إلى الجوهرة نظرة الهيبة فصارت ماء، فارتفع بخارها وزبدها فخلق من البخار السماوات ومن الزبد الأرضين.

বাংলা অনুবাদ: ওয়াহব বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম একটি অন্ধকার স্থান সৃষ্টি করেন। তারপর তিনি একটি রত্ন সৃষ্টি করেন, যার আলোয় সেই অন্ধকার স্থান আলোকিত হয়ে ওঠে। এরপর আল্লাহ সেই রত্নের দিকে মহিমা ও ভীতির সঞ্চারকারী দৃষ্টিতে তাকান। ফলে রত্নটি পানিতে পরিণত হয়। সেই পানি থেকে বাষ্প ও ফেনা ওপরে ওঠে। এরপর আল্লাহ বাষ্প থেকে আসমানসমূহ এবং ফেনা থেকে পৃথিবীগুলো সৃষ্টি করেন।

ওয়াহবের এই বর্ণনায় আদিম পানি নিজেও সর্বপ্রথম সৃষ্টি নয়। তার আগে একটি অন্ধকার স্থান এবং একটি আলোকোজ্জ্বল রত্ন সৃষ্টি করা হয়েছে। রত্নটি পানিতে পরিণত হওয়ার পর সেই পানি থেকে আসমান ও পৃথিবীর উপাদান উৎপন্ন হয়েছে বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে সুদ্দীর সূত্রে সংরক্ষিত বর্ণনায় পানি শুকিয়ে পৃথিবী হওয়ার কথা রয়েছে। দুই বর্ণনায় আসমান ও পৃথিবী গঠনের প্রক্রিয়াও এক নয়। একটি বর্ণনায় পানি শুকিয়ে ভূমি সৃষ্টি হয়; অন্যটিতে পানির ফেনা থেকে পৃথিবীর উৎপত্তি ঘটে। উভয় বর্ণনাই প্রাচীন ইসলামি সৃষ্টিতত্ত্বে পানিকে মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার সাক্ষ্য।

ইবনে রজব একই ধরনের বর্ণনা উল্লেখ করে পানি থেকে পৃথিবী এবং পানির ঢেউ থেকে পাহাড় সৃষ্টির কথাও লিখেছেন। এখানে পানির বাষ্প থেকে আসমান, পানির পদার্থ থেকে পৃথিবী এবং পানির ঢেউ থেকে পাহাড়ের উৎপত্তি—তিনটি পৃথক ভূতাত্ত্বিক ও মহাজাগতিক ঘটনা একই উৎস-পদার্থের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অথচ পানির ঢেউ থেকে পাহাড় সৃষ্টি হওয়ার কোনো ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া নেই। পাহাড় সাধারণত ভূত্বকের টেকটোনিক গতিশীলতা, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এবং দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত হয়। সমুদ্রের ঢেউ উপকূলের ভূমিরূপ পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু তা থেকে সমগ্র পৃথিবীর পর্বতমালা সৃষ্টি হয় না।

এই পানি থেকে ধোঁয়া উৎপন্ন হওয়ার ব্যাখ্যাটি ইবনে রজবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সুরা ফুসসিলাতের ১১ নম্বর আয়াতে আসমানকে ‘ধোঁয়া’ বলা হয়েছে। তাফসীরে বাগাভীতে সেই ধোঁয়াকে সরাসরি পানির বাষ্প হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে কাসীরও একই আয়াতের ব্যাখ্যায় পৃথিবী সৃষ্টির সময় পানি থেকে ওঠা বাষ্পকে আসমানের ধোঁয়া বলেছেন। ফলে পানি থেকে বাষ্প হয়ে আসমান সৃষ্টির ধারণাটি একাধিক মধ্যযুগীয় তাফসিরে সংরক্ষিত রয়েছে। [20] [21]

وَكَانَ ذَلِكَ الدُّخَانُ بُخَارَ الْمَاءِ

বাংলা অনুবাদ: আর সেই ধোঁয়া ছিল পানির বাষ্প।

এই ব্যাখ্যার ফলে কোরআনের ‘ধোঁয়া’ শব্দের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট পদার্থগত উৎস যুক্ত হয়েছে। কোরআনের আয়াতে সরাসরি পানি থেকে ধোঁয়া সৃষ্টির কথা নেই; কিন্তু বাগাভী ও ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় ধোঁয়ার পরিচয় পানির বাষ্প। এটি উৎসের বক্তব্য এবং পরবর্তী তাফসিরের ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। তাফসিরে পানির বাষ্পকে আসমান সৃষ্টির উপাদান হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞানে নক্ষত্র ও মহাজাগতিক কাঠামোর উৎপত্তি পানির বাষ্প ঘনীভূত হওয়ার মাধ্যমে ঘটে না। মহাজাগতিক গ্যাস, মহাকর্ষীয় সংকোচন, নক্ষত্রীয় নিউক্লীয় বিক্রিয়া এবং ভারী মৌলের উৎপত্তির দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে পানির বাষ্প থেকে আসমান সৃষ্টির এই ধারণার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে এসব বর্ণনায় পানির তিনটি পৃথক অবস্থান পাওয়া যায়। এক বর্ণনায় পানি আসমান-পৃথিবীর আগেই বিদ্যমান ছিল। অন্য বর্ণনায় একটি রত্ন পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আবার পৃথক বিবরণে সেই পানি থেকে ধোঁয়া, বাষ্প, ফেনা, পৃথিবী ও পাহাড়ের উৎপত্তি ঘটেছে। এই কাহিনিগুলোর সবগুলো একই বর্ণনাপথের নয় এবং সবগুলোর কালানুক্রমও অভিন্ন নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে: পানি মহাবিশ্বের গঠনের প্রাথমিক বা মৌলিক উপাদান। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইসলামি তাফসিরে এই ধারণা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও আধুনিক মহাজাগতিক রসায়ন ও ভূবিজ্ঞান পানি থেকে সমগ্র মহাবিশ্ব, আসমান কিংবা পর্বতমালা সৃষ্টির দাবি সমর্থন করে না।


আদিম পানি এবং মহাবিশ্বের রাসায়নিক ইতিহাস

কোরআনের বক্তব্য এবং তাফসিরের সম্প্রসারিত সৃষ্টিকাহিনির মধ্যে পৃথক দাবি রয়েছে। সুরা হুদ ১১:৭ থেকে জানা যায়, আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির আগে আরশ পানির ওপর ছিল। তাবারীর সংকলিত বর্ণনায় সেই পানি থেকে ধোঁয়া উৎপন্ন হয়ে আসমান তৈরি এবং পানি শুকিয়ে পৃথিবী হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম বক্তব্যটি সৃষ্টি-ক্রমের একটি ধর্মীয় বিবরণ; দ্বিতীয়টি বাস্তব পদার্থের উৎপত্তি ও রূপান্তর সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট দাবি। আধুনিক মহাজাগতিক রসায়নে পানি গঠনের জন্য হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন প্রয়োজন, আর অক্সিজেন উৎপন্ন হয় আদিম নক্ষত্রের পরবর্তী বিকাশে। তাই মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্র ও ভারী মৌল গঠনের আগেই রাসায়নিক পানি বিদ্যমান ছিল—এমন দাবি পর্যবেক্ষণভিত্তিক মহাবিশ্বের ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাফসিরে পানিকে শুকিয়ে মাটি কিংবা পানি থেকে ধোঁয়া বের করে আসমান সৃষ্টি করার যে ধারাবাহিকতা রয়েছে, সেটিও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো পদার্থগত প্রক্রিয়া নয়। পানি বাষ্পীভূত হলে রাসায়নিকভাবে H2O-ই থাকে; বাষ্পকে আসমান সৃষ্টি করার উপাদান বলে বর্ণনা করলে তা থেকে নক্ষত্র, মহাজাগতিক গ্যাস, শিলাময় গ্রহ ও গ্রহের রাসায়নিক উপাদানগুলোর প্রকৃত উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা যায় না। পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পদার্থকে কেবল পানি শুকানোর ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করাও ভুল।

অলৌকিকভাবে আগেই পানি তৈরি করা সম্ভব ছিল—এমন বিশ্বাসকে পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ হিসেবে হাজির করা যায় না। অলৌকিক ঘটনাকে পূর্বানুমান হিসেবে গ্রহণ করলে যে কোনো পদার্থগত ক্রমের ব্যতিক্রম কল্পনা করা সম্ভব; কিন্তু তাতে সেই নির্দিষ্ট ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল কি না, তার কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে আদিম পানির বর্ণনাকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হিসেবে উপস্থাপনের ভিত্তি নেই। ধর্মীয় বর্ণনায় পানির উপস্থিতির দাবি আছে; পানির প্রকৃত মহাজাগতিক উৎপত্তির পরীক্ষাযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নক্ষত্রের রাসায়নিক বিবর্তনের ইতিহাসে।


প্রাচীন ধর্মীয় ও দার্শনিক সাহিত্যে আদিম জলের ধারণা

সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থা হিসেবে জলরাশির উপস্থিতি ইসলামি সাহিত্যের একক বৈশিষ্ট্য নয়। মেসোপটেমীয় সৃষ্টিকাহিনি, বাইবেলের আদিপুস্তক, ঋগ্বেদ, বাল্মীকি রামায়ণ এবং মহাভারতের বিভিন্ন বর্ণনায় আদিম জল, জল থেকে ভূমির উদ্ভব কিংবা জলকে সৃষ্টির উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব বিবরণের সৃষ্টি-ক্রম ও দেবতাতত্ত্ব একই নয়; অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সৃষ্টির আদি অবস্থায় জলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এই সাদৃশ্য থেকে সরাসরি একটি গ্রন্থ অন্যটি থেকে ধার করেছে বলা যায় না, কিন্তু পানিকে আদিম উপাদান হিসেবে কল্পনা করার ধারণা ইসলামি গ্রন্থ রচনার বহু আগেই প্রচলিত ছিল। [22]

And the Spirit of God moved upon the face of the waters.

বাংলা অনুবাদ: আদিপুস্তক ১
১ শুরুতে, ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। প্রথমে পৃথিবী সম্পূর্ণ শূন্য ছিল; পৃথিবীতে কিছুই ছিল না।
২ অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি আর ঈশ্বরের আত্মা সেই জলরাশির উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
৬ তারপর ঈশ্বর বললেন,“জলকে দুভাগ করবার জন্য আকাশমণ্ডলের ব্যবস্থা হোক।”
৭ তাই ঈশ্বর আকাশমণ্ডলের সৃষ্টি করে জলকে পৃথক করলেন। এক ভাগ জল আকাশমণ্ডলের উপরে আর অন্য ভাগ জল আকাশমণ্ডলের নীচে থাকল।
৯ তারপর ঈশ্বর বললেন, “আকাশের নীচের জল এক জায়গায় জমা হোক যাতে শুকনো ডাঙা দেখা যায়।” এবং তা-ই হল।

বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের ১১০তম সর্গে আদিম পানি থেকে পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে [23] –

सर्वं सलिलमेवासीत्पृथिवी यत्र निर्मिता।
तत: स‌मभवद्ब्रह्मा स्वयम्भूर्दैवतै: स‌ह।।2.110.3।।

বাংলা অনুবাদ: আদিতে সবকিছুই জল ছিল; সেই জল থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হয়। এরপর স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা দেবতাদের সঙ্গে আবির্ভূত হন।

মূল উৎসের ইংরেজি অনুবাদ: At the beginning, all this was water from which the earth was created. Thereafter, the selfexistent Brahma along with the gods came into existence.

মহাভারতের শান্তিপর্বের মোক্ষধর্মপর্বেও জলের আদিম ভূমিকার একটি স্বতন্ত্র বিবরণ রয়েছে। ১৮৩ নম্বর পরিচ্ছেদে ভৃগু ও ভরদ্বাজের সংলাপে ব্রহ্মাকে সৃষ্টিজগতের জীবদের রক্ষার জন্য প্রথমে পানি সৃষ্টিকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই পানি থেকেই পৃথিবী, পাহাড় এবং অন্যান্য রূপবিশিষ্ট বস্তু উৎপন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এই সৃষ্টিতাত্ত্বিক ধারণায় পানি শুধু জীবের বেঁচে থাকার উপাদান নয়; জড়জগতেরও মৌলিক উৎস। ফলে পানিকে সমস্ত সৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার ধারণা প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় বিশ্বতত্ত্বেও উপস্থিত ছিল। [24]

For the protection then of all creatures, he first created water.

বাংলা অনুবাদ: সমস্ত জীবের রক্ষার জন্য তিনি প্রথমে পানি সৃষ্টি করেন। একই আলোচনায় পানি ছাড়া জীবের অস্তিত্ব অসম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং পৃথিবী, পাহাড় ও রূপবিশিষ্ট সমস্ত বস্তুকে পানির রূপান্তর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।


ঋগ্বেদে আদিম জলরাশি

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৯তম সূক্তে সৃষ্টির পূর্বাবস্থাকে অন্ধকার, অবিভক্ত অবস্থা এবং জলরাশির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। একই মণ্ডলের ১২১তম সূক্তেও বিস্তৃত জলের মধ্যে সৃষ্টির বীজের ধারণা রয়েছে। এসব বক্তব্য আধুনিক রাসায়নিক পানির উৎপত্তির ইতিহাস নয়; প্রাচীন ভারতীয় সৃষ্টিচিন্তায় জলের স্থান কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার প্রাথমিক দলিল। [25]

तम आसीत्तमसा गूळ्हमग्रेऽप्रकेतं सलिलं सर्वमा इदम् । तुच्छ्येनाभ्वपिहितं यदासीत्तपसस्तन्महिनाजायतैकम् ॥

বাংলা অনুবাদ: শুরুতে অন্ধকার অন্ধকারে আবৃত ছিল; সমস্ত কিছু ছিল অবিভক্ত জলরাশির মতো। সেই অবিভক্ত অস্তিত্ব শূন্যতার আবরণে আচ্ছন্ন ছিল এবং তাপ বা তপস্যার শক্তিতে এক সত্তার উদ্ভবের কথা বলা হয়েছে।


মেসোপটেমীয় সৃষ্টিকাহিনিতে আদিম মিঠাপানি ও লবণাক্ত সমুদ্র

ব্যাবিলনীয় এনুমা এলিশ সৃষ্টিকাহিনির সূচনাতেও আকাশ ও পৃথিবী গঠনের আগে দুটি আদিম জলসত্তার উপস্থিতি রয়েছে—মিঠাপানির আপসু এবং লবণাক্ত সমুদ্রের তিয়ামাত। তাদের জল মিশে দেবতাদের জন্মের কথা বর্ণিত হয়েছে। ফলে ইসলামি সাহিত্য রচনার বহু আগের পশ্চিম এশীয় সৃষ্টিবিশ্বাসেই জলকে সৃষ্টির পূর্ববর্তী উপাদান ও সৃষ্টির উৎস হিসেবে কল্পনা করার নজির পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিষয়গত মিল রয়েছে; কিন্তু এই মিল একা সরাসরি পাঠগত ঋণ কিংবা নির্দিষ্ট প্রভাবের ধারা প্রমাণ করে না। [26]

Tiamat is a personification of the primordial sea from which the gods were first created.

বাংলা অনুবাদ: তিয়ামাত আদিম সমুদ্রের ব্যক্তিরূপ; সেই আদিম জলরাশি থেকে প্রথম দেবতাদের সৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এনুমা এলিশের সূচনায় মিঠাপানির আপসু ও লবণাক্ত তিয়ামাতের জল মিশে যাওয়ার বিবরণ রয়েছে।


থেলিসের দর্শনে পানি: সমস্ত বস্তুর আদিম উপাদান

প্রাচীন গ্রিক দর্শনে মাইলেটাসের থেলিসের নামে প্রচলিত মতবাদ অনুযায়ী, পানি সমস্ত বস্তুর মূল উপাদান বা আদি নীতি। অ্যারিস্টটল তাঁর মেটাফিজিক্স গ্রন্থে এই মতটি সংরক্ষণ করেছেন এবং উল্লেখ করেছেন, থেলিস পৃথিবীকেও পানির ওপর ভাসমান বলে মনে করতেন। অ্যারিস্টটল থেলিসের যুক্তির সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে জীবনের সঙ্গে আর্দ্রতার সম্পর্ক, খাদ্য ও বীজের সিক্ত প্রকৃতির কথা বলেছেন। এগুলো থেলিসের নিজের সংরক্ষিত রচনা নয়; পরবর্তী অ্যারিস্টটলের উপস্থাপনায় পাওয়া থেলিসের মত। [27]

Thales, the founder of this school of philosophy, says the permanent entity is water.

বাংলা অনুবাদ: অ্যারিস্টটল বলেছেন, এই দার্শনিক ধারার প্রতিষ্ঠাতা থেলিসের মতে স্থায়ী মৌলিক সত্তা হলো পানি। অ্যারিস্টটল আরও উল্লেখ করেছেন, থেলিস পৃথিবীকে পানির ওপর ভাসমান মনে করতেন।

থেলিসের বক্তব্য, ব্যাবিলনীয় সৃষ্টি-পুরাণ, বাইবেলের আদিপুস্তক, ঋগ্বেদ ও ইসলামি তাফসিরের মধ্যে সৃষ্টির সূচনায় জলরাশির একটি সাধারণ ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু এসবের যুক্তিবিন্যাস এক নয়: থেলিস পানিকে জড়জগতের আদিম উপাদান বলেছেন, ব্যাবিলনীয় পুরাণে জলসত্তাকে দেবতাদের বংশপরম্পরার অংশ করা হয়েছে, আর ইসলামি বর্ণনায় আরশের নিচে পানি এবং পানি থেকে আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির কথা এসেছে। এই পার্থক্যসহ মিলগুলো প্রাচীন মানবসমাজে আদিম পানির ধারণার বিস্তৃতি প্রমাণ করে; কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থ থেকে সরাসরি অনুলিপি করা হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে না।

সৃষ্ট 1

প্রথম সৃষ্টি কলম: তাকদির লিখন ও সৃষ্টি-ক্রমের সমস্যা

সুনান আবু দাউদের ৪৭০০ নম্বর হাদিসে উবাদা ইবনে সামিতের সূত্রে মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন এবং তাকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত ঘটনার তাকদির লিখতে নির্দেশ দেন। কলম সেই নির্দেশ শুনে কী লিখবে তা জিজ্ঞাসাও করে। এখানে ‘প্রথম সৃষ্টি’ হিসেবে কলমের নাম স্পষ্টভাবে উপস্থিত। পানি ও আরশের পূর্বাবস্থার বর্ণনার সঙ্গে এই বিবরণের কালানুক্রম গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি বর্ণনায় আসমান-পৃথিবীর আগে পানি ও আরশ উপস্থিত, অন্যটিতে কলমের প্রথম সৃষ্টির ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। [28]

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে
৪৭০০। আবূ হাফসাহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) তার ছেলেকে বললেন, হে আমার প্রিয় পুত্র! তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না তুমি জানতে পারবে ’’যা তোমার উপর ঘটেছে তা ভুলেও এড়িয়ে যাওয়ার ছিলো না। পক্ষান্তরে, যা এড়িয়ে গেছে তা তোমার উপর ভুলেও ঘটবার ছিলো না।
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে কলম। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, লিখো! কলম বললো, হে রব! কি লিখবো? তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিখো। হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাস ছাড়া মারা যায় সে আমার (উম্মাতের) নয়।[1]
সহীহ।
[1]. তিরমিযী, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

একই বর্ণনার অনুরূপ বক্তব্য জামে তিরমিজির ৩৩১৯ নম্বর হাদিসেও রয়েছে। সেখানেও উবাদা ইবনে সামিতের সূত্রে ‘প্রথম সৃষ্টি কলম’ এবং ভবিষ্যতের সমস্ত ঘটনা লিখে রাখার বিবরণ এসেছে। দুটি সংকলনের বর্ণনাপথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় এগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুটি স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বলা যায় না। কিন্তু ‘প্রথম সৃষ্টি’ শব্দবন্ধটি আবু দাউদের কোনো বিচ্ছিন্ন অনুবাদ নয়, তা তিরমিজির আরবি পাঠেও স্পষ্ট। [29]

إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ فَجَرَى بِمَا هُوَ كَائِنٌ إِلَى الأَبَدِ

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন। তিনি তাকে বললেন, লেখো। তখন কলম ভবিষ্যতে চিরকাল যা কিছু ঘটবে, তা লিখে ফেলল।


প্রথম সৃষ্টি কী ছিল: পানি, আরশ, কলম, নাকি আলো ও অন্ধকার?

ইসলামের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধর্মতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে একাধিক পরস্পরভিন্ন বক্তব্য সংরক্ষিত রয়েছে। কোথাও প্রথম সৃষ্টি হিসেবে কলমের নাম এসেছে, কোথাও আরশ, কোথাও পানি এবং কোথাও আলো ও অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে। এই মতভেদ শুধু আধুনিক সমালোচকদের তৈরি কোনো সমস্যা নয়। তাবারী, ইবনে আসীর, ইবনে জাওযী, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়িম এবং বদরুদ্দীন আইনীসহ বিভিন্ন যুগের মুসলিম পণ্ডিতেরা সৃষ্টির প্রথমত্ব নিয়ে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এমনকি কোন সৃষ্টিটি প্রথম হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করতে গিয়ে একই হাদিসের শব্দবিন্যাসের ভিন্ন ব্যাখ্যাও তৈরি হয়েছে। মহাবিশ্বের সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে একটি নির্ভুল ঐশী জ্ঞান সংরক্ষিত থাকার দাবির সঙ্গে এই দীর্ঘস্থায়ী মতভেদ সরাসরি সম্পর্কিত।

সহিহ বুখারীর ৩১৯১ নম্বর হাদিসে আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির আগে আরশ পানির ওপর থাকার কথা রয়েছে। সহিহ মুসলিমের ২৬৫৩ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে তাকদির নির্ধারণের সময়ও আরশ পানির ওপর ছিল। অন্যদিকে সুনান আবু দাউদের ৪৭০০ এবং জামে তিরমিজির ৩৩১৯ নম্বর হাদিসে কলমকে প্রথম সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বক্তব্যগুলো আসমান-পৃথিবীর পূর্ববর্তী অবস্থার বিবরণ দিলেও পানি, আরশ ও কলমের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম অস্তিত্ব লাভ করেছিল, সে বিষয়ে একই সৃষ্টি-ক্রম প্রতিষ্ঠা করে না। সমস্যাটি আরও বিস্তৃত হয়েছে প্রাচীন তাফসিরে সংরক্ষিত আলো ও অন্ধকারের প্রথম সৃষ্টির ধারণার কারণে।


ধ্রুপদি ইসলামি পণ্ডিতদের তিনটি প্রধান মত: পানি, আরশ ও কলম

প্রথম সৃষ্ট বস্তু নিয়ে প্রাচীন মুসলিম পণ্ডিতদের মতভেদ ইসলামকিউএর একটি বিস্তারিত আলোচনাতেও স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে তিনটি প্রধান মতের উল্লেখ রয়েছে। প্রথম মতে কলম সর্বপ্রথম সৃষ্টি; তাবারী ও ইবনে জাওযী এই মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। দ্বিতীয় মতে আরশ প্রথম সৃষ্টি; ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাইয়িম এই মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তৃতীয় মতে পানি প্রথম সৃষ্টি; ইবনে মাসউদ ও প্রাচীন মুসলিমদের একটি দলের নামে এই মত সংরক্ষিত হয়েছে এবং বদরুদ্দীন আইনী একে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অর্থাৎ শুধু সৃষ্টির আগে আরশ পানির ওপর ছিল—এটুকু নয়, পানি ও আরশের নিজেদের সৃষ্টির ক্রম নিয়েও মতভেদ রয়েছে। [30]

والأقوال المعتبرة في المسألة ثلاثة : القلم ، كما يرجحه ابن جرير الطبري وابن الجوزي ، والعرش ، كما يرجحه ابن تيمية وابن القيم ، والماء

বাংলা অনুবাদ: এই বিষয়ে বিবেচনাযোগ্য তিনটি মত রয়েছে। প্রথমটি কলম, যে মতকে ইবনে জারির তাবারী ও ইবনে জাওযী অগ্রাধিকার দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি আরশ, যে মতকে ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাইয়িম অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তৃতীয়টি পানি।

এই তিনটি মতের পার্থক্য কেবল নামের পার্থক্য নয়। কলম প্রথম সৃষ্টি হলে তাকদির লেখার জন্য ব্যবহৃত বস্তুটির অস্তিত্ব আরশ ও পানির আগে হওয়ার কথা। আরশ প্রথম সৃষ্টি হলে কলম এবং পানি তার পরে সৃষ্টি হয়েছে, অথবা অন্তত আরশের প্রথমত্বের সঙ্গে তাদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। পানি প্রথম সৃষ্টি হলে আরশ স্থাপনের আগেই পানির অস্তিত্ব ছিল এবং কলম সৃষ্টির সময়ও সেই আদিম পানি উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তিনটি বস্তুই যদি সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং প্রত্যেকটির প্রথমত্বকে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে নিরঙ্কুশ প্রথমত্ব হিসেবে বোঝানো হয়, তাহলে তিনটি দাবিই একসঙ্গে সত্য হতে পারে না। ফলে এই মতভেদ সৃষ্টির ইতিহাসের একটি মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে—কোন বস্তুটি অন্য সব সৃষ্ট বস্তুর আগে অস্তিত্ব লাভ করেছিল।

ইসলামকিউএর একই আলোচনায় স্বীকার করা হয়েছে, কোরআনে আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্ট বস্তু হিসেবে পানি বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর নাম সরাসরি ঘোষণা করা হয়নি। কোরআনের সুরা হুদ ১১:৭-এ আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে আরশ পানির ওপর থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই আয়াত থেকে শুধু এটুকুই প্রতিষ্ঠিত হয় যে আসমান-পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পূর্ববর্তী কোনো অবস্থায় আরশ ও পানির অস্তিত্ব ছিল। পানি আরশের আগে সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি আরশ পানির আগে, কিংবা উভয়টি একই পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছিল—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর আয়াতটিতে নেই। পরবর্তী হাদিস, সাহাবিদের নামে বর্ণিত বক্তব্য এবং তাফসিরের ব্যাখ্যা ব্যবহার করেই এই ক্রম নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে।


তাফসীরে তাবারী: সর্বপ্রথম সৃষ্টি আলো ও অন্ধকার

পানি, আরশ ও কলমের বাইরে প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে আরও একটি ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায় তাফসীরে তাবারীতে। সুরা আল-বাকারার ২৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবারী মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের একটি দীর্ঘ সৃষ্টিবিবরণ সংকলন করেছেন। এই বিবরণের ৫৯০ নম্বর বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম আলো ও অন্ধকার সৃষ্টি করেন। এরপর তিনি আলো ও অন্ধকারকে পৃথক করে অন্ধকারকে কালো রাত এবং আলোকে উজ্জ্বল দিনে পরিণত করেন। তারপর ধোঁয়া থেকে সাত আসমান সৃষ্টি করা হয়। বর্ণনাটিতে আরও বলা হয়েছে, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র সৃষ্টি হওয়ার আগেই রাত ও দিনের ধারাবাহিকতা চলছিল। পরবর্তী পর্যায়ে পৃথিবীর বিস্তার, পাহাড় স্থাপন, জীবিকার ব্যবস্থা এবং আসমানে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র সৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। [31]

كان أوّلَ ما خلق الله تبارك وتعالى النورُ والظلمةُ، ثم ميَّز بينهما، فجعل الظلمة ليلا أسود مظلمًا، وجعل النور نهارًا مضيئًا مبصرًا

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ সর্বপ্রথম আলো ও অন্ধকার সৃষ্টি করেন। এরপর তিনি উভয়কে পৃথক করেন। অন্ধকারকে কালো, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতে এবং আলোকে উজ্জ্বল, দৃশ্যমান দিনে পরিণত করেন।

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের এই বিবরণে সৃষ্টির শুরু সম্পর্কে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি রয়েছে। প্রথমত, আলো ও অন্ধকারকে প্রথম সৃষ্ট বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র সৃষ্টির আগেই রাত ও দিনের অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ রাত ও দিনকে এখানে পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং সূর্যের আলোর সঙ্গে সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি; বরং আলো ও অন্ধকারকে পৃথক করার মাধ্যমে সৃষ্ট দুটি আদিম অবস্থা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। বাস্তবে পৃথিবীর দিনের আলোকিত অংশ ও রাতের অন্ধকার অংশ পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং সূর্য থেকে আগত আলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। সূর্য সৃষ্টির আগে পৃথিবীর পরিচিত অর্থে দিন-রাতের পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় প্রথমে আলো ও অন্ধকারের সৃষ্টি এবং পরে ধোঁয়া থেকে আসমান তৈরির কথা বলা হয়েছে। অথচ সুদ্দীর সূত্রে তাবারীর পরবর্তী ৫৯১ নম্বর বর্ণনায় শুরুতেই পানির ওপর আরশের অবস্থান রয়েছে; সেই পানি থেকে ধোঁয়া বের করে আসমান তৈরি এবং পানি শুকিয়ে পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। একই তাফসিরগ্রন্থে পাশাপাশি সংরক্ষিত এই দুটি বিবরণ একটি অভিন্ন প্রাথমিক সৃষ্টি-ক্রম উপস্থাপন করে না। প্রথমটিতে সৃষ্টির শুরুতে আলো ও অন্ধকার, অন্যটিতে পানির ওপর আরশের পূর্বাবস্থা। তাবারী দুটি বর্ণনাই সংরক্ষণ করেছেন, কিন্তু সেগুলোকে একটিমাত্র নির্ভুল কালানুক্রমে রূপান্তরিত করেননি।


ইবনে আসীর: প্রথম কলমের বক্তব্য এবং আলো–অন্ধকারের বিকল্প মত

মধ্যযুগের ঐতিহাসিক ইবনে আসীর তাঁর ‘আল-কামিল ফিত তারিখ’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে সৃষ্টির সূচনা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র আলোচনা করেছেন। এই আলোচনার শিরোনামই হচ্ছে ‘সৃষ্টির সূচনা এবং তার মধ্যে প্রথম কী ছিল’। সেখানে তিনি উবাদা ইবনে সামিতের সূত্রে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত কলমের প্রথম সৃষ্টির হাদিস উল্লেখ করেছেন। এরপর মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের আলো ও অন্ধকারের প্রথম সৃষ্টির বক্তব্য তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ তাবারীর বহু পরে রচিত এই মধ্যযুগীয় ইতিহাসগ্রন্থেও প্রথম সৃষ্টি নিয়ে দুটি পৃথক মত সংরক্ষিত ছিল। ইবনে আসীর অবশ্য কলমের প্রথম সৃষ্টির মতটিকেই হাদিসের ভিত্তিতে অধিক নির্ভরযোগ্য বলেছেন এবং ইবনে ইসহাকের বক্তব্যটি কারও সূত্রে সংযুক্ত নয় বলে উল্লেখ করেছেন। [32]

وَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ : أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ تَعَالَى النُّورُ ، وَالظُّلْمَةُ ، فَجَعَلَ الظُّلْمَةَ لَيْلًا أَسْوَدَ ، وَجَعَلَ النُّورَ نَهَارًا أَبْيَضَ مُضِيئًا . وَالْأَوَّلُ أَصَحُّ لِلْحَدِيثِ

বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম আলো ও অন্ধকার সৃষ্টি করেন। তিনি অন্ধকারকে কালো রাত এবং আলোকে সাদা উজ্জ্বল দিনে পরিণত করেন। ইবনে আসীর বলেছেন, প্রথম মতটিই হাদিসের কারণে অধিক নির্ভরযোগ্য।

ইবনে আসীরের মূল্যায়ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দুটি ভিন্ন সৃষ্টি-ক্রমের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি; বরং হাদিসশাস্ত্রের দলিলগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কলমের প্রথম সৃষ্টির মতকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু কোন বর্ণনার সূত্র অধিক গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্ন এবং বাস্তবে মহাবিশ্বের প্রথম সৃষ্টি কী ছিল, সেই প্রশ্ন এক নয়। প্রথমটি বর্ণনার প্রেরণ ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে হাদিসশাস্ত্রীয় মূল্যায়ন; দ্বিতীয়টি মহাবিশ্বের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সত্যতার প্রশ্ন। কলম প্রথম সৃষ্টি হয়েছিল—এমন বর্ণনা কোনো ধর্মীয় সংকলনে থাকা অথবা অন্য বর্ণনার তুলনায় অধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়া, মহাবিশ্বে সত্যিই কলম সর্বপ্রথম সৃষ্টি হয়েছিল—তার স্বাধীন প্রমাণ নয়।

ইবনে আসীর তাঁর আলোচনায় তাবারীর একটি সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন। ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত একটি বর্ণনায় আরশের পূর্ববর্তী অস্তিত্বের কথা রয়েছে, অথচ অন্য বর্ণনায় কলমকে প্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে। এই দুই বক্তব্যের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে গিয়ে তাবারী বর্ণনাপথের শব্দগত পার্থক্য আলোচনা করেছেন। একটি বর্ণনায় আরশের পূর্ববর্তী অস্তিত্বের উল্লেখ থাকলেও অন্য বর্ণনায় শুধু কলমের প্রথম সৃষ্টি হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ আরশের অস্তিত্বের উল্লেখ বাদ পড়া বা যুক্ত হওয়ার ওপরও সৃষ্টির প্রথমত্বের প্রশ্ন নির্ভর করছে। এই ধরনের পাঠভেদ শুধু নির্দিষ্ট কোনো শব্দের পরিবর্তন নয়; সৃষ্টিজগতের প্রথম অস্তিত্বসম্পন্ন বস্তুর পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।


বিভিন্ন সৃষ্টি-ক্রমের মৌলিক বিরোধ

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইসলামি উৎসগুলোর এসব বক্তব্য একত্র করলে প্রথম সৃষ্টির অন্তত চারটি পৃথক ধারণা পাওয়া যায়। আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে প্রথম সৃষ্টির ভাষা কলমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাবারী ও ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আলো ও অন্ধকারকে সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে। ইবনে মাসউদ এবং প্রাচীন মুসলিমদের একটি দলের নামে পানি প্রথম সৃষ্ট হওয়ার মত প্রচলিত ছিল। আবার আরশের প্রথমত্বের মতও বিভিন্ন মুসলিম পণ্ডিত গ্রহণ করেছেন। এই মতগুলোকে একই সর্বজনীন অর্থে গ্রহণ করলে সমস্যাটি অনিবার্য: চারটি পৃথক বস্তু বা সৃষ্ট অবস্থার প্রত্যেকটিই একসঙ্গে সমস্ত সৃষ্টির প্রথম হতে পারে না।

এই মতভেদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, আলো ও অন্ধকারের প্রথম সৃষ্টির বর্ণনাটি পরবর্তী ইসলামি ধর্মতত্ত্বের বাইরে কোনো অজানা উৎস থেকে উদ্ধার করা হয়নি। এটি তাবারীর মতো প্রভাবশালী প্রাচীন তাফসিরকারীর নিজের সংকলনে রয়েছে। ইবনে আসীরের মতো মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিকও একই মতের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। আর পানি, আরশ ও কলমের প্রথমত্বের প্রশ্নটি ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়িম, ইবনে জাওযী ও অন্যান্য আলেমের আলোচনায় অব্যাহত ছিল। ফলে প্রথম সৃষ্টি নিয়ে এই মতভেদ ইসলামি জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। এটি সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে একটি সর্বসম্মত, একক এবং অপরিবর্তনীয় বিবরণ সংরক্ষিত থাকার ধারণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

সহিহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির আগে আরশ ও পানির অস্তিত্ব রয়েছে। অন্যদিকে প্রথম কলম সৃষ্টির হাদিসে সবকিছুর তাকদির লিখে রাখার ঘটনা রয়েছে। বাগাভীর উদ্ধৃত দমরার বিবরণে আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির পর কলম সৃষ্টির ক্রমও পাওয়া যায়। প্রথম সৃষ্টি আলো ও অন্ধকার ছিল—ইবনে ইসহাকের এই বক্তব্য যুক্ত করলে সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে আরও একটি পৃথক ক্রম পাওয়া যায়। এসব বর্ণনার নির্দিষ্ট শব্দ ও ঘটনাক্রম এক নয়। একটি বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্যটিকে বর্জন করা ধর্মীয় বর্ণনা-বাছাইয়ের পদ্ধতি হতে পারে; কিন্তু তার মাধ্যমে নির্বাচিত বিবরণটির মহাজাগতিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

আদিম মহাবিশ্ব সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞান আলো, পদার্থ, বিকিরণ, মৌলিক কণা ও মহাজাগতিক সম্প্রসারণের পরিমাপযোগ্য ইতিহাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে মহাবিশ্বের প্রথম সৃষ্টি হিসেবে একটি লেখার কলম কিংবা পানির ওপর স্থাপিত সিংহাসনের উপস্থিতির কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। আবার আলো ও অন্ধকারকে দুটি স্বতন্ত্র বস্তু হিসেবে সৃষ্টি করে সেগুলোকে সূর্য-চন্দ্রের অস্তিত্বের আগেই রাত ও দিনে পরিণত করার বর্ণনাও পর্যবেক্ষণভিত্তিক মহাজাগতিক ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। প্রাচীন ইসলামি গ্রন্থগুলো এই বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় সৃষ্টিবিশ্বাসের সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেছে; সেগুলো মহাবিশ্বের প্রকৃত উৎপত্তির পরীক্ষাযোগ্য বিবরণ নয়।

কলমের ‘লিখে ফেলা’কে জাগতিক লেখার কাজ হিসেবে ধরলে লেখার পৃষ্ঠ, লিখিত তথ্যের প্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ ঘটনা আগেই নির্ধারিত হওয়ার যুক্তিগত প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু হাদিসের মধ্যে কালি ও কাগজের নির্দিষ্ট বিবরণ নেই; তাই কলমের সঙ্গে কাগজ-কালি অবশ্যই ছিল—এমন দাবি উৎস থেকে অনুসরণ করে না। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ভবিষ্যৎ সমস্ত ঘটনা শুরুতেই লিখিতভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকলে মানুষের কর্ম ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতার প্রকৃতি কী এবং সেই নির্ধারিত ঘটনাকে পরে নৈতিক বিচারের ভিত্তি করা কতটা সুসংগত। কলমের মানবীয় ব্যবহার থেকে তাকে মহাজাগতিক প্রথম সৃষ্টি হিসেবে প্রমাণ করা যায় না; একইভাবে কলমের কথোপকথন ও ভাগ্যলিপিকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বাধীন প্রমাণও নেই। এই বর্ণনাকে আক্ষরিকভাবে নিলে কয়েকটি যুক্তিগত প্রশ্ন ওঠে:

সচেতন সত্তার গোলকধাঁধা: কথোপকথন হাদিসে কলমকে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কলম পাল্টা প্রশ্ন করে। এই কথোপকথনকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে গ্রহণের স্বাধীন ঐতিহাসিক বা পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ নেই। এটিকে একটি অলৌকিক ঘটনার বিবরণ বলা যায়; পরীক্ষাযোগ্য পদার্থবিজ্ঞানের তথ্য বলা যায় না।
তথ্যের উৎস ও ধারা-বিবরণীর সংকট হাদিস অনুযায়ী, কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার তাকদির শুরুতেই লিখিত হয়। সেসব ঘটনা অপরিবর্তনীয় হলে মানুষের বিকল্প সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা বাস্তব এবং পূর্বনির্ধারিত কাজের জন্য নৈতিক দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে—এ প্রশ্নটি সামনে আসে।
বস্তুগত স্ববিরোধিতা: সৃষ্টির আগের মাধ্যম ‘প্রথম সৃষ্টি কলম’ বর্ণনাকে আরশ ও পানির পূর্বাবস্থার সঙ্গে মেলাতে একটি সুস্পষ্ট কালানুক্রম প্রয়োজন। অথচ মূল বর্ণনাগুলোতে প্রথমে পানি, আরশ ও কলমের সম্পর্ক সম্পর্কে একই ধরনের ক্রম পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত অনুমান ছাড়া এই পার্থক্যের নিষ্পত্তি হয় না।

ইবনে আসীরের প্রশ্ন: কলম প্রথম সৃষ্টি হলে লিখনফলক কখন সৃষ্টি হলো?

প্রথম সৃষ্টি হিসেবে কলমের উল্লেখ এবং সমস্ত ঘটনার তাকদির লিখে রাখার বিবরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, কলমটি কোথায় লিখেছিল? হাদিসে কলম সৃষ্টি হওয়ার পর তাকে লিখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লিখিত তথ্য ধারণ করার জন্য একটি মাধ্যমের অস্তিত্বও প্রয়োজন। ইসলামি বিশ্বাসে সেই সংরক্ষণমাধ্যমের নাম লাওহে মাহফুজ। কলমের সৃষ্টি এবং লাওহে মাহফুজের অস্তিত্বের ক্রম নিয়ে মধ্যযুগের মুসলিম ঐতিহাসিক ইবনে আসীর নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর ‘আল-কামিল ফিত তারিখ’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ‘কলমের পরে কী সৃষ্টি হয়েছিল’ শিরোনামের আলোচনায় প্রথমে কলম সৃষ্টি, তাকে সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনা লিখতে নির্দেশ দেওয়া এবং এরপর মেঘ সৃষ্টির বিবরণ রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা উল্লেখ করার পর ইবনে আসীর প্রশ্ন তুলেছেন, কলম লেখার সময় লিখনফলক কোথায় ছিল? তাঁর মতে, কলমের পরে লাওহে মাহফুজের উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ছিল; কারণ লেখার জন্য কলমের পাশাপাশি লিখিত বিষয় ধারণ করার মাধ্যমও প্রয়োজন। তিনি আরও বলেছেন, লেখার উল্লেখের মধ্যেই লিখনফলকের অস্তিত্ব অনিবার্যভাবে বোঝানো হয়েছে—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। তাঁর এই আলোচনা প্রথম সৃষ্টির ক্রমে একটি বাস্তব অনুল্লিখিত বিষয় চিহ্নিত করে। [33]

قُلْتُ هَذَا فِيهِ نَظَرٌ ، لِأَنَّهُ قَدْ تَقَدَّمَ أَنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ تَعَالَى الْقَلَمُ ، وَقَالَ لَهُ : اكْتُبْ . فَجَرَى فِي تِلْكَ السَّاعَةِ . ثُمَّ ذَكَرَ فِي أَوَّلِ هَذَا الْفَصْلِ أَنَّ اللَّهَ خَلَقَ بَعْدَ الْقَلَمِ ، وَبَعْدَ أَنْ جَرَى بِمَا هُوَ كَائِنٌ سَحَابًا ، وَمِنَ الْمَعْلُومِ أَنَّ الْكِتَابَةَ لَا بُدَّ فِيهَا مِنْ آلَةٍ يُكْتَبُ بِهَا ، وَهُوَ الْقَلَمُ ، وَمِنْ شَيْءٍ يُكْتَبُ فِيهِ ، وَهُوَ الَّذِي يُعَبَّرُ عَنْهُ هَهُنَا بِاللَّوْحِ الْمَحْفُوظِ . وَكَانَ يَنْبَغِي أَنْ يَذْكُرَ اللَّوْحَ الْمَحْفُوظَ ثَانِيًا لِلْقَلَمِ ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ . وَيُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ تَرَكَ ذِكْرَهُ لِأَنَّهُ مَعْلُومٌ مِنْ مَفْهُومِ اللَّفْظِ بِطَرِيقَةِ الْمُلَازَمَةِ .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আসীর বলেছেন, এখানে আপত্তির সুযোগ রয়েছে। কারণ ইতিপূর্বে বলা হয়েছে, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে বলেছেন, লেখো। তখনই কলম লিখতে শুরু করে। কিন্তু এই পরিচ্ছেদের শুরুতে বলা হয়েছে, আল্লাহ কলম সৃষ্টির পরে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটবে তা লিখে ফেলার পরে মেঘ সৃষ্টি করেছেন।

অথচ এটি জানা কথা যে লেখার জন্য এমন একটি উপকরণ প্রয়োজন, যার মাধ্যমে লেখা হবে—সেটি হচ্ছে কলম। একই সঙ্গে এমন একটি বস্তুও প্রয়োজন, যার ওপর বা যার মধ্যে লেখা হবে। এখানে সেই বস্তুটিকেই লাওহে মাহফুজ বলা হয়েছে। তাই কলমের পর দ্বিতীয় সৃষ্টি হিসেবে লাওহে মাহফুজের উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ছিল। আল্লাহই ভালো জানেন।

এমনও হতে পারে যে লাওহে মাহফুজের উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ লেখার কথা বলার মধ্যেই তার অস্তিত্ব অনিবার্যভাবে বোঝা যায়।

ইবনে আসীরের বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি কলমের প্রথম সৃষ্টি হওয়ার হাদিসকে সামনে রেখেই সৃষ্টির ক্রমের অসম্পূর্ণতা চিহ্নিত করেছেন। কলম সৃষ্টি হলো, কলমকে লেখার নির্দেশ দেওয়া হলো এবং কলম ভবিষ্যতের সমস্ত ঘটনা লিখে ফেলল—এই ধারাবাহিকতায় কোথায় লেখা হয়েছিল, সেই প্রশ্নটি অনিবার্য। তাঁর মতে, লিখনফলকের অস্তিত্বকে কলমের পরবর্তী সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। অর্থাৎ এই প্রশ্ন কোনো আধুনিক সমালোচকের কল্পিত আপত্তি নয়; মধ্যযুগের একজন মুসলিম ঐতিহাসিকের নিজের বিশ্লেষণে উপস্থিত।

ইবনে আসীর অবশ্য একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন: লেখার কথা উল্লেখ করার মধ্যেই লিখনফলকের অস্তিত্ব বোঝা যেতে পারে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা লিখনফলক সৃষ্টির নির্দিষ্ট সময় জানায় না। লাওহে মাহফুজ কলমের আগে সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি কলমের সঙ্গে, নাকি কলম সৃষ্টির অব্যবহিত পরে—এই প্রশ্নগুলোর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর ওই বক্তব্য থেকে পাওয়া যায় না। কলমকে সমস্ত সৃষ্টির প্রথম বস্তু বলা হলে তার আগে অন্য কোনো সৃষ্ট লিখনমাধ্যম থাকার সুযোগ থাকে না। আবার কলম সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত তাকদির লিখে ফেলার বর্ণনা গ্রহণ করলে সেই মুহূর্তে লিখনমাধ্যমের উপস্থিতিও প্রয়োজন। ইবনে আসীর এই সমস্যাটিই চিহ্নিত করেছেন।


কলম, কুরসি, আরশ, বাতাস, অন্ধকার এবং পানি: সম্পূর্ণ ভিন্ন সৃষ্টি-ক্রম

সৃষ্টির প্রথম পর্যায় সম্পর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ক্রম সংরক্ষিত হয়েছে ইবনে আসীরের ‘আল-কামিল ফিত তারিখ’ এবং ইবনে কাসীরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে। উভয়েই তাবারীর সূত্রে এই বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এখানে প্রথমে কলম, তারপর কুরসি, তারপর আরশ, এরপর বাতাস ও অন্ধকার এবং সবশেষে পানি সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। পানি সৃষ্টির পর আরশকে পানির ওপর স্থাপন করা হয়। এই ক্রম অনুসারে আরশ পানির ওপর থাকার ঘটনাটি সৃষ্টির একেবারে প্রথম মুহূর্তের ঘটনা নয়; তার আগেই কলম, কুরসি, আরশ, বাতাস ও অন্ধকার সৃষ্টি হয়ে গেছে। [34]

قَالَ ابْنُ جَرِيرٍ : وَقَالَ آخَرُونَ : بَلْ خَلَقَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ الْمَاءَ قَبْلَ الْعَرْشِ رَوَاهُ السُّدِّيُّ ، عَنْ أَبِي مَالِكٍ ، وَعَنْ أَبِي صَالِحٍ ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، وَعَنْ مُرَّةَ ، عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ ، وَعَنْ نَاسٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالُوا : إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ، وَلَمْ يَخْلُقْ شَيْئًا غَيْرَ مَا خَلَقَ قَبْلَ الْمَاءِ ، وَحَكَى ابْنُ جَرِيرٍ ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ أَنَّهُ قَالَ : أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ النُّورُ وَالظُّلْمَةُ ، ثُمَّ مَيَّزَ بَيْنَهُمَا فَجَعَلَ الظُّلْمَةَ لَيْلًا أَسْوَدَ مُظْلِمًا ، وَجَعَلَ النُّورَ نَهَارًا مُضِيئًا مُبْصِرًا .

قَالَ ابْنُ جَرِيرٍ : وَقَدْ قِيلَ إِنَّ الَّذِي خَلَقَ رَبُّنَا بَعْدَ الْقَلَمِ الْكُرْسِيُّ ، ثُمَّ خَلَقَ بَعْدَ الْكُرْسِيِّ الْعَرْشَ ، ثُمَّ خَلَقَ بَعْدَ ذَلِكَ الْهَوَاءَ وَالظُّلْمَةَ ، ثُمَّ خَلَقَ الْمَاءَ فَوَضَعَ عَرْشَهُ عَلَى الْمَاءِ . وَاللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ .

বাংলা অনুবাদ: ইবনে জারির তাবারী বলেছেন, অন্যরা বলেছেন যে আল্লাহ আরশের আগে পানি সৃষ্টি করেছেন। সুদ্দী আবু মালিক ও আবু সালিহের সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে, মুররার সূত্রে ইবনে মাসউদ থেকে এবং মুহাম্মদের কয়েকজন সাহাবির সূত্রে এই বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল এবং পানির আগে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছিল, তার বাইরে আর কিছু সৃষ্টি হয়নি।

ইবনে জারির মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের আরেকটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম আলো ও অন্ধকার সৃষ্টি করেন। এরপর উভয়কে পৃথক করেন। অন্ধকারকে কালো অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতে এবং আলোকে উজ্জ্বল দিনে পরিণত করেন।

ইবনে জারির আরও বলেছেন, এমন একটি মতও রয়েছে যে আল্লাহ কলমের পরে কুরসি সৃষ্টি করেন। তারপর কুরসির পরে আরশ সৃষ্টি করেন। এরপর বাতাস ও অন্ধকার সৃষ্টি করেন। তারপর পানি সৃষ্টি করে তাঁর আরশকে পানির ওপর স্থাপন করেন। আল্লাহই ভালো জানেন।

তাবারী তাঁর ‘তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক’ গ্রন্থে এই মতগুলো আলোচনা করার পর পানি ও আরশের সৃষ্টির ক্রম সম্পর্কে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, পানি আরশের আগে সৃষ্টি হওয়ার বক্তব্য অধিকতর সঠিক। যুক্তি হিসেবে তিনি আবু রাজিনের সূত্রে মুহাম্মদের হাদিস ব্যবহার করেছেন, যেখানে পানির ওপর আরশ সৃষ্টির কথা রয়েছে। ইবনে আসীর তাঁর ‘আল-কামিল ফিত তারিখ’ গ্রন্থে তাবারীর এই সিদ্ধান্ত এবং পানি বাতাসের ওপর অবস্থান করার পৃথক বর্ণনাটিও সংরক্ষণ করেছেন। ফলে ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত বিকল্প সৃষ্টি-ক্রম এবং তাবারীর নিজের সিদ্ধান্তকে পৃথক উৎসের বক্তব্য হিসেবে শনাক্ত করা যায়। [35] [36]

قَالَ أَبُو جَعْفَرَ: وَأَوْلَى الْقَوْلَيْنِ فِي ذَلِكَ عِنْدِي بِالصَّوَابِ قَوْلُ مَنْ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى خَلَقَ الْمَاءَ قَبْلَ الْعَرْشِ.

বাংলা অনুবাদ: আবু জাফর তাবারী বলেছেন, এই দুটি মতের মধ্যে আমার মতে অধিকতর সঠিক হলো তাঁদের বক্তব্য, যাঁরা বলেছেন আল্লাহ আরশের আগে পানি সৃষ্টি করেছেন।

তাবারী তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে আবু রাজিনের হাদিসে পানির ওপর আরশ সৃষ্টির বিবরণ ব্যবহার করেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, কোনো বস্তুর ওপর আরশ সৃষ্টি হয়ে থাকলে সেই বস্তুটি আরশ সৃষ্টির সময় অবশ্যই অস্তিত্বশীল ছিল। অতএব আরশ পানির আগে সৃষ্টি হওয়ার পরিবর্তে পানি আগে সৃষ্টি হওয়া অথবা উভয়ের একই সময়ে সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাবারী এই যুক্তির ভিত্তিতে পানি আগে সৃষ্ট হওয়ার মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এটি তাবারীর নিজস্ব ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত; ইবনে কাসীরের উদ্ধৃত অংশের শেষ বাক্য নয়।

এই বিবরণগুলোর মধ্যে কয়েকটি পৃথক সৃষ্টি-ক্রম সংরক্ষিত হয়েছে। একটি মতে পানি আরশের আগে সৃষ্টি হয়েছে। অন্য মতে আলো ও অন্ধকার প্রথম সৃষ্টি। আরেকটি মতে কলমের পরে কুরসি, কুরসির পরে আরশ এবং আরশের পরে বাতাস ও অন্ধকার সৃষ্টি হয়েছে; পানি এসেছে আরও পরে। ইবনে কাসীর তাবারীর সূত্রে এসব ভিন্ন মত উল্লেখ করেছেন। তাবারী তাঁর নিজের ইতিহাসগ্রন্থে আবু রাজিনের হাদিসের ভিত্তিতে পানি আরশের আগে সৃষ্টি হওয়ার মতকে অধিকতর সঠিক বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ইবনে আসীরও তাবারীর এই সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত করেছেন। ফলে বিভিন্ন সৃষ্টিক্রম সংরক্ষণ এবং সেগুলোর মধ্যে একটি ক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দুটি পৃথক কাজ এখানে পাওয়া যায়।

এখানে মৌলিক বিরোধটি পানি ও আরশের সৃষ্টির অবস্থান নিয়ে। পানি আগে সৃষ্টি হয়ে থাকলে আরশ সৃষ্টির সময় পানি উপস্থিত ছিল। কিন্তু কলম, কুরসি, আরশ, বাতাস ও অন্ধকারের পরে পানি সৃষ্টির ক্রমটি গ্রহণ করলে আরশের অস্তিত্ব পানির আগেই ছিল। একই মহাজাগতিক সৃষ্টিক্রমে পানি একই সঙ্গে আরশের আগে এবং আরশের পরে সৃষ্টি হতে পারে না। এই পার্থক্য শুধু কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনাকারীর নাম কিংবা ব্যাখ্যার শব্দচয়ন নিয়ে নয়; ঘটনাগুলোর প্রকৃত কালানুক্রম নিয়ে।

তাবারীর নামে সংরক্ষিত এই বিকল্প মত ইবনে আসীর ও ইবনে কাসীর উভয়ের গ্রন্থে পাওয়া গেলেও সেগুলোকে দুটি স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে গণনা করা যায় না। উভয়েই তাবারীর আলোচনার ওপর নির্ভর করেছেন। তবে একই বক্তব্য একাধিক প্রভাবশালী মধ্যযুগীয় গ্রন্থে সংরক্ষিত হওয়া থেকে বোঝা যায়, কলম, কুরসি, আরশ ও পানি সৃষ্টির ক্রম সম্পর্কে ভিন্ন ব্যাখ্যাগুলো পরবর্তী ইসলামি বিশ্বতত্ত্বেও আলোচিত হয়েছিল। এগুলো আধুনিক গবেষকদের উদ্ভাবিত মতভেদ নয়; প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুসলিম লেখকদের নিজেদের সংকলিত বিবরণ।


ইবনে আবি আল-ইজ্জ: ‘প্রথম সৃষ্টি কলম’ হাদিসের ব্যাকরণ পরিবর্তনে প্রথমত্বের অর্থ বদলে যায়

সৃষ্টি-ক্রমের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মধ্যযুগীয় ইসলামি ধর্মতত্ত্বে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। সেটি হচ্ছে ‘প্রথম সৃষ্টি কলম’ হাদিসের আরবি বাক্যকে ভিন্ন ব্যাকরণগত কাঠামোয় পড়া। ইবনে আবি আল-ইজ্জ তাঁর ‘শরহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা’ গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, কলম আগে সৃষ্টি হয়েছিল নাকি আরশ আগে সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর মতে, আরশ কলমের আগে সৃষ্টি হয়েছে—এই মতটিই অধিকতর সঠিক। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে গিয়ে তিনি ‘আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন’ বক্তব্যের দুটি সম্ভাব্য আরবি পাঠ বিশ্লেষণ করেছেন। একটি পাঠে কলম সমস্ত সৃষ্টির প্রথম বস্তু। অন্য পাঠে বাক্যটির অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ যখন কলম সৃষ্টি করলেন, তখনই তাকে লিখতে নির্দেশ দিলেন। দ্বিতীয় পাঠে কলমকে সমস্ত সৃষ্টির প্রথম বস্তু বলা হচ্ছে না; শুধু কলম সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে তাকে লেখার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। [37]

وَاخْتَلَفَ الْعُلَمَاءُ : هَلِ الْقَلَمُ أَوَّلُ الْمَخْلُوقَاتِ ، أَوِ الْعَرْشُ ؟ عَلَى قَوْلَيْنِ ، ذَكَرَهُمَا الْحَافِظُ أَبُو الْعَلَاءِ الْهَمَذَانِيُّ ، أَصَحُّهُمَا : أَنَّ الْعَرْشَ قَبْلَ الْقَلَمِ ، لِمَا ثَبَتَ فِي الصَّحِيحِ مِنْ حَدِيثِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا – ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : قَدَّرَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ ، وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ .

فَهَذَا صَرِيحٌ أَنَّ التَّقْدِيرَ وَقَعَ بَعْدَ خَلْقِ الْعَرْشِ ، وَالتَّقْدِيرَ وَقَعَ عِنْدَ أَوَّلِ خَلْقِ الْقَلَمِ ، بِحَدِيثِ عُبَادَةَ هَذَا . وَلَا يَخْلُو قَوْلُهُ : أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمُ ، إِلَخْ – إِمَّا أَنْ يَكُونَ جُمْلَةً أَوْ جُمْلَتَيْنِ .

فَإِنْ كَانَ جُمْلَةً ، وَهُوَ الصَّحِيحُ ، كَانَ مَعْنَاهُ : أَنَّهُ عِنْدَ أَوَّلِ خَلْقِهِ قَالَ لَهُ : اكْتُبْ ، كَمَا فِي اللَّفْظِ : أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ قَالَ لَهُ : اكْتُبْ ، بِنَصْبِ ” أَوَّلَ ” وَ ” الْقَلَمَ ” ، وَإِنْ كَانَ جُمْلَتَيْنِ ، وَهُوَ مَرْوِيٌّ بِرَفْعِ ” أَوَّلُ ” وَ ” الْقَلَمُ ” ، فَيَتَعَيَّنُ حَمْلُهُ عَلَى أَنَّهُ أَوَّلُ الْمَخْلُوقَاتِ مِنْ هَذَا الْعَالَمِ ، فَيَتَّفِقُ الْحَدِيثَانِ ، إِذْ حَدِيثُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو صَرِيحٌ فِي أَنَّ الْعَرْشَ سَابِقٌ عَلَى التَّقْدِيرِ ، وَالتَّقْدِيرُ مُقَارِنٌ لِخَلْقِ الْقَلَمِ .

وَفِي اللَّفْظِ الْآخَرِ : لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ قَالَ لَهُ : اكْتُبْ . فَهَذَا الْقَلَمُ أَوَّلُ الْأَقْلَامِ وَأَفْضَلُهَا وَأَجَلُّهَا .

বাংলা অনুবাদ: আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, কলম প্রথম সৃষ্টি নাকি আরশ প্রথম সৃষ্টি। হাফিজ আবু আলা আল-হামাদানি এই দুটি মত উল্লেখ করেছেন। অধিকতর সঠিক মত হলো, আরশ কলমের আগে সৃষ্টি হয়েছে। কারণ আবদুল্লাহ ইবনে আমরের সূত্রে সহিহ হাদিসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে আল্লাহ আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সমস্ত সৃষ্টির তাকদির নির্ধারণ করেছিলেন এবং সেই সময় তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।

এটি স্পষ্ট করে যে তাকদির নির্ধারণ আরশ সৃষ্টির পরে ঘটেছে। আর উবাদা ইবনে সামিতের হাদিস অনুযায়ী কলম সৃষ্টির শুরুতেই তাকদির নির্ধারণের ঘটনা ঘটেছে। এখন ‘আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন’ বক্তব্যটি হয় একটি বাক্য, নয়তো দুটি বাক্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

যদি এটি একটি বাক্য হয়—এবং এটিই সঠিক—তাহলে এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ যখন কলম সৃষ্টি করলেন, তখনই তাকে বললেন, লেখো। যেমন আরবি বাক্যটি ‘আওয়ালা মা খালাকাল্লাহুল কালামা, কালা লাহু উকতুব’—এখানে ‘আওয়ালা’ ও ‘আল-কালামা’ শব্দ দুটি নসব অবস্থায় রয়েছে।

আর যদি এটি দুটি বাক্য হয়, যেখানে ‘আওয়ালু’ এবং ‘আল-কালামু’ রফা অবস্থায় রয়েছে, তাহলে অর্থ দাঁড়ায় কলম এই জগতের প্রথম সৃষ্টি। এভাবে দুটি হাদিসের মধ্যে সমন্বয় করা যায়। কারণ আবদুল্লাহ ইবনে আমরের হাদিসে আরশ তাকদির নির্ধারণের আগে বিদ্যমান থাকার কথা রয়েছে, আর তাকদির নির্ধারণের ঘটনা কলম সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্য একটি পাঠে রয়েছে, ‘আল্লাহ যখন কলম সৃষ্টি করলেন, তখন তাকে বললেন, লেখো।’ ফলে এই কলম সমস্ত কলমের মধ্যে প্রথম, সর্বোত্তম এবং সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ কলম।

ইবনে আবি আল-ইজ্জের ব্যাখ্যায় আরবি শব্দের ব্যাকরণগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمُ পাঠে ‘আওয়ালু’ ও ‘আল-কালামু’ রফা অবস্থায় থাকলে কলমকে প্রথম সৃষ্ট বস্তু হিসেবে বোঝানো সম্ভব। কিন্তু أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ قَالَ لَهُ اكْتُبْ পাঠে ‘আওয়ালা’ ও ‘আল-কালামা’ নসব অবস্থায় থাকলে বাক্যটির অর্থ হয়, আল্লাহ কলম সৃষ্টি করার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে লেখার নির্দেশ দিয়েছেন। এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যায় কলমের নিরঙ্কুশ প্রথমত্বের দাবি আর থাকে না। অর্থাৎ একই ধরনের আরবি শব্দক্রমের ব্যাকরণগত পাঠ নির্ধারণের ওপর প্রথম সৃষ্ট বস্তুটির পরিচয় নির্ভর করছে।

তবে ইবনে আবি আল-ইজ্জ শুধু ব্যাকরণগত সম্ভাবনা উল্লেখ করেননি; তিনি নিজেই প্রথম ব্যাকরণগত পাঠটিকে অধিকতর সঠিক বলে নির্বাচন করেছেন, যেখানে কলম সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে লেখার নির্দেশ দেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর এই নির্বাচন আরশকে কলমের আগে সৃষ্টি হয়েছে বলে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্য পাঠটি গ্রহণ করলে তিনি কলমকে ‘এই জগতের’ প্রথম সৃষ্টি হিসেবে সীমাবদ্ধ করেছেন। এখানেও ‘প্রথম সৃষ্টি’ শব্দবন্ধটির সর্বজনীন অর্থের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট জগতের মধ্যে প্রথমত্বের অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। হাদিসটির সরাসরি শব্দ, ব্যাকরণগত সম্ভাবনা এবং পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক সমন্বয়—এই তিনটি পৃথক স্তর তাঁর আলোচনায় উপস্থিত।

এই ব্যাখ্যা একটি মৌলিক বিষয় প্রকাশ করে: প্রাচীন হাদিসগুলোর মধ্যে প্রথম সৃষ্টির ক্রম নিয়ে মতভেদ থাকায় পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিকদের শুধু বর্ণনার সত্যতা যাচাই করলেই চলেনি, সেই বর্ণনার ব্যাকরণ ও শব্দার্থ নির্ধারণের মাধ্যমেও বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়েছে। কোনো পাঠে কলম সমস্ত সৃষ্টির প্রথম বস্তু; অন্য পাঠে কলম সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে লেখার নির্দেশপ্রাপ্ত বস্তু; আবার আরেক ব্যাখ্যায় কলম শুধু একটি নির্দিষ্ট জগতের প্রথম সৃষ্টি। এই অর্থগুলো এক নয়। ফলে কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয়েছে।


প্রথম সৃষ্টির কালানুক্রম এবং লিখিত তাকদিরের সমস্যা

ইবনে আসীর ও ইবনে আবি আল-ইজ্জের আলোচনায় সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে দুটি পৃথক ধরনের সমস্যা প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি লিখনপ্রক্রিয়ার ক্রমসংক্রান্ত: কলম সমস্ত ঘটনার তাকদির লিখে থাকলে সেই লিখিত তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যম লাওহে মাহফুজ কখন সৃষ্টি হলো? দ্বিতীয়টি সৃষ্টির প্রথমত্বসংক্রান্ত: কলম যদি প্রথম সৃষ্টি হয়, তাহলে আরশ ও পানির পূর্ববর্তী অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? আরশ আগে সৃষ্টি হয়ে থাকলে কলমকে সমস্ত সৃষ্টির প্রথম বলার অর্থ কী? ইবনে আসীর প্রথম সমস্যাটি সরাসরি চিহ্নিত করেছেন। ইবনে আবি আল-ইজ্জ দ্বিতীয় সমস্যাটির নিষ্পত্তির জন্য হাদিসের ব্যাকরণগত পাঠ ও ‘প্রথমত্ব’ শব্দের সীমা পুনর্নির্ধারণ করেছেন।

এর সঙ্গে তাবারীর নামে সংরক্ষিত বিকল্প সৃষ্টি-ক্রম যুক্ত করলে মতভেদের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। কলমের পরে কুরসি, তারপর আরশ, তারপর বাতাস ও অন্ধকার এবং সবশেষে পানি সৃষ্টির একটি ধারায় আরশ পানির আগের সৃষ্টি। অন্য ধারায় পানি আরশের আগের সৃষ্টি। আবার আলো ও অন্ধকারের প্রথম সৃষ্টির বর্ণনায় সৃষ্টির সূচনাই অন্য উপাদানের সঙ্গে যুক্ত। এই বর্ণনাগুলোর কোনো একটি গ্রহণ করে অন্যগুলোকে দুর্বল বা কম গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হাদিসশাস্ত্র কিংবা ধর্মতত্ত্বের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হতে পারে; কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্বাচিত সৃষ্টি-ক্রমটি পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের প্রকৃত ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

প্রথম কলম, পূর্বলিখিত তাকদির, লাওহে মাহফুজ এবং আরশ-পানির অস্তিত্ব নিয়ে প্রাচীন ইসলামি বর্ণনাগুলো একটি ঐতিহাসিক ধর্মবিশ্বাসের কাঠামো প্রকাশ করে। এই কাঠামোতে মানুষের পরিচিত লেখার উপকরণ, লিখিত নথি, সিংহাসন এবং পানির মতো বস্তুগুলোকে মহাবিশ্বের সৃষ্টির সূচনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অথচ কলমের সৃষ্টি, তার কথোপকথন, সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনার লিখিত সংরক্ষণ কিংবা সৃষ্টির আগের মহাজাগতিক আরশের অস্তিত্বের পক্ষে স্বাধীন পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ নেই। ধ্রুপদি ইসলামি গ্রন্থগুলোর মধ্যেই প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে ভিন্ন বর্ণনা, পরস্পরবিরোধী কালানুক্রম এবং সেগুলো সমন্বয়ের জন্য পরবর্তী ব্যাখ্যা সংরক্ষিত রয়েছে। এই দলিলগুলো ইসলামি ধর্মীয় চিন্তার ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়, কিন্তু মহাবিশ্বের উৎপত্তির একটি অভিন্ন, নির্ভুল ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বিবরণ প্রদান করে না।


লাওহে মাহফুজ: পাঁচশ বছরের বিস্তার, সাদা মুক্তা ও ইয়াকুতের আবরণ

মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুতে কলম দিয়ে সমস্ত ঘটনার তাকদির লিখে রাখার বর্ণনার সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যুক্ত রয়েছে। সেটি হচ্ছে লাওহে মাহফুজ—এমন একটি সংরক্ষিত ফলক, যেখানে সমস্ত সৃষ্টির ভবিষ্যৎ এবং কোরআনের পূর্বলিখিত অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। কোরআনের সুরা আল-বুরুজের ২১–২২ নম্বর আয়াতে কোরআনকে সংরক্ষিত ফলকে অবস্থিত বলা হয়েছে। কিন্তু সেই ফলকের আকার, উপাদান এবং প্রকৃত গঠন সম্পর্কে আয়াতটিতে কোনো বিবরণ নেই। প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে এই ফলককে একটি নির্দিষ্ট গঠন ও বিস্তারসম্পন্ন মহাজাগতিক বস্তু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কোথাও তাকে সাদা মুক্তাজাতীয় রত্ন দিয়ে নির্মিত এবং তার আবরণ ইয়াকুতের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও তার বিস্তার পাঁচশ বছরের পথের সমান বলা হয়েছে। এই বিবরণগুলোতে পূর্বলিখিত তাকদির এবং সৃষ্টির সমস্ত ঘটনা সংরক্ষণের জন্য একটি বিশাল বস্তুগত মাধ্যমের ধারণা পাওয়া যায়। [38]

তাফসীরে বাগাভীর সুরা আর-রাদের ৩৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় লাওহে মাহফুজের একটি বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। বাগাভী আতা ইবনে আবি রাবাহর সূত্রে ইবনে আব্বাসের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহর একটি সংরক্ষিত ফলক রয়েছে, যার বিস্তার পাঁচশ বছরের পথের সমান। ফলকটি সাদা মুক্তাজাতীয় রত্ন দিয়ে তৈরি এবং তার দুটি আবরণ ইয়াকুতের। একই বর্ণনায় আল্লাহর প্রতিদিন তিনশ ষাটবার দৃষ্টি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে লাওহে মাহফুজকে শুধু জ্ঞানের বিমূর্ত প্রতীক হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট বিস্তার ও উপাদানবিশিষ্ট একটি সৃষ্ট বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [39]

إِنَّ لِلَّهِ تَعَالَى لَوْحًا مَحْفُوظًا مَسِيرَةَ خَمْسِمِائَةِ عَامٍ، مِنْ دُرَّةٍ بَيْضَاءَ لَهَا دَفَّتَانِ مِنْ يَاقُوتٍ.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহর একটি সংরক্ষিত ফলক রয়েছে, যার বিস্তার পাঁচশ বছরের পথের সমান। সেটি সাদা মুক্তাজাতীয় রত্ন দিয়ে নির্মিত এবং তার দুটি আবরণ ইয়াকুতের।

এই বর্ণনার গুরুত্ব শুধু ফলকটির বিশাল আকারে নয়, এর উপাদানগত পরিচয়েও রয়েছে। সাদা মুক্তাজাতীয় রত্ন এবং ইয়াকুত—উভয়ই মানুষের পরিচিত মূল্যবান পদার্থের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে পৃথিবীতে প্রচলিত রত্নের নাম ব্যবহার করে একটি মহাজাগতিক লিখনফলকের গঠন বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচশ বছরের পথের বিস্তার উল্লেখ করে সেই ফলকের জন্য একটি পরিমাপযোগ্য দূরত্বের ধারণাও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু পাঁচশ বছরের পথ কোনো নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের একক নয়; পথ অতিক্রমের গতি নির্ধারণ না করলে তা দিয়ে ফলকটির প্রকৃত দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা যায় না। ফলে বর্ণনাটি বিশালত্বের একটি ধারণা দিলেও ফলকটির পরিমাপযোগ্য প্রকৃত আকার নির্ধারণ করে না।

তাফসীরে বাগাভীর একই আলোচনায় উম্মুল কিতাব সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ সংরক্ষিত হয়েছে। ইকরিমার সূত্রে ইবনে আব্বাস বলেছেন, দুটি গ্রন্থ রয়েছে। একটি গ্রন্থ থেকে আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন। অন্যটি উম্মুল কিতাব, যেখানে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। কাবের নামে আরেকটি ব্যাখ্যায় উম্মুল কিতাবকে আল্লাহর জ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—তিনি কী সৃষ্টি করবেন এবং তাঁর সৃষ্টি কী কাজ করবে, সেই জ্ঞান। ফলে একই আয়াতের ব্যাখ্যায় উম্মুল কিতাবকে কখনো অপরিবর্তনীয় সংরক্ষিত ফলক এবং কখনো আল্লাহর জ্ঞান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [40]

এই পার্থক্যটি সৃষ্টির প্রথম কলমের আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কলম যদি সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনা একটি বাস্তব লিখনফলকে লিখে থাকে, তাহলে সেই ফলকের সৃষ্টি, তার অস্তিত্বের সময় এবং কলমের সঙ্গে তার সম্পর্ক নির্ধারণের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে উম্মুল কিতাবকে কেবল আল্লাহর জ্ঞান হিসেবে ব্যাখ্যা করলে নির্দিষ্ট কোনো ফলকে লেখার বস্তুগত প্রক্রিয়ার প্রশ্নটি অন্য রূপ নেয়। প্রাচীন তাফসিরে কিন্তু এই দুই ধরনের ব্যাখ্যাই সংরক্ষিত রয়েছে। একটি ব্যাখ্যায় মহাজাগতিক লিখনফলক সাদা মুক্তা ও ইয়াকুত দিয়ে নির্মিত বিশাল বস্তু; অন্য ব্যাখ্যায় উম্মুল কিতাব আল্লাহর জ্ঞানের পরিচয়। এই পৃথক ব্যাখ্যাগুলো একই ধরনের ভৌত দাবি করে না।

মধ্যযুগের মুসলিম ঐতিহাসিক ইবনে আসীর প্রথম কলম সৃষ্টি ও তাকদির লেখার বিবরণ আলোচনা করতে গিয়ে লিখনফলকের অবস্থান নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা এই বিবরণের মাধ্যমে আরও নির্দিষ্ট হয়। একটি বিশাল রত্ননির্মিত সংরক্ষিত ফলক সৃষ্টির ইতিহাসের অংশ হলে সেটি কখন এবং কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তারও একটি কালানুক্রম থাকার কথা। অথচ ‘প্রথম সৃষ্টি কলম’ হাদিসে কলম সৃষ্টি ও লিখতে শুরু করার কথা থাকলেও এই বিশাল ফলকের সৃষ্টি সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়নি। ফলে কলমের মাধ্যমে সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনা লিখে রাখার বিশ্বাসের সঙ্গে লিখনফলকের বস্তুগত গঠন সম্পর্কে প্রাচীন বর্ণনাগুলো যুক্ত হলেও সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংগত কালানুক্রম প্রতিষ্ঠিত হয় না।


আরশের গঠন: আলো, আগুন, বরফ, পানি এবং চারটি মহাজাগতিক নদী

সৃষ্টির আগে আল্লাহর আরশ পানির ওপর ছিল—কোরআনের এই বক্তব্যের পাশাপাশি আরশের প্রকৃতি ও গঠন সম্পর্কে মধ্যযুগের ইসলামি গ্রন্থে বহু বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। এসব বর্ণনায় আরশকে কখনো আলো থেকে সৃষ্ট, কখনো লাল ইয়াকুতের নির্মিত এবং কখনো সবুজ পান্নার তৈরি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আরশের চারপাশে বিশেষ ধরনের নদী, ফেরেশতাদের অবস্থান এবং আরশের নিজের অসংখ্য জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করার কথাও পাওয়া যায়। এই বিবরণগুলো কোরআনের সুরা হুদের ৭ নম্বর আয়াতের সরাসরি বক্তব্য নয়; বরং প্রাচীন মুসলিম ব্যক্তিদের নামে প্রচলিত বিশ্বতাত্ত্বিক বর্ণনা, যা পরবর্তী তাফসিরকারীরা সংরক্ষণ করেছেন।

জালালুদ্দীন সুয়ূতী তাঁর ‘আদ-দুররুল মানসুর’ গ্রন্থে সুরা আত-তাওবার ১২৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর নামে আরশ ও কুরসির একটি বিস্তারিত বিবরণ সংকলন করেছেন। ইবনে আবি হাতিম ও আবু শায়খের সূত্রে সংরক্ষিত এই বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর আলো থেকে আরশ ও কুরসি সৃষ্টি করেছেন। আরশ ও কুরসি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। কুরসির অভ্যন্তরে ফেরেশতাদের অবস্থান রয়েছে। আরশের চারপাশে চারটি নদী রয়েছে—একটি উজ্জ্বল আলোর নদী, একটি প্রজ্বলিত আগুনের নদী, একটি দৃষ্টিকে ঝলসে দেওয়া সাদা বরফের নদী এবং একটি পানির নদী। ফেরেশতারা এই নদীগুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করেন। [41]

وَحَوْلَ الْعَرْشِ أَرْبَعَةُ أَنْهَارٍ؛ نَهْرٌ مِنْ نُورٍ يَتَلَأْلَأُ، وَنَهْرٌ مِنْ نَارٍ تَتَلَظَّى، وَنَهْرٌ مِنْ ثَلْجٍ أَبْيَضَ تَلْتَمِعُ مِنْهُ الْأَبْصَارُ، وَنَهْرٌ مِنْ مَاءٍ.

বাংলা অনুবাদ: আরশের চারপাশে চারটি নদী রয়েছে। একটি ঝলমলে আলোর নদী, একটি প্রজ্বলিত আগুনের নদী, একটি উজ্জ্বল সাদা বরফের নদী, যার দীপ্তিতে চোখ ঝলসে যায়, এবং একটি পানির নদী।

ওয়াহবের এই বর্ণনায় আরশ শুধু একটি সিংহাসন নয়; তাকে কেন্দ্র করে বিশেষ ধরনের একটি মহাজাগতিক পরিবেশের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এখানে আলো, আগুন, বরফ ও পানিকে চারটি পৃথক নদী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আগুন ও বরফের নদী একই সঙ্গে আরশকে ঘিরে রয়েছে, ফেরেশতারা সেই নদীগুলোর মধ্যে অবস্থান করছেন এবং আরশ নিজেও অসংখ্য জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করছে। এই বিবরণে মানুষের পরিচিত প্রাকৃতিক উপাদান, শরীরের অঙ্গ এবং ধর্মীয় উপাসনার ধারণাকে মহাজাগতিক আরশের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

সুয়ূতী একই আলোচনায় আরশের উপাদান সম্পর্কে আরও কয়েকটি পৃথক বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। সাদ আত-তাঈর নামে সংরক্ষিত একটি বক্তব্যে আরশকে লাল ইয়াকুতের তৈরি বলা হয়েছে। শাবীর সূত্রে আবু শায়খের সংকলিত আরেকটি বর্ণনায় মুহাম্মদের নামে আরশ লাল ইয়াকুতের নির্মিত হওয়ার কথা রয়েছে। হাম্মাদের নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে আরশ সবুজ পান্নার তৈরি এবং তার চারটি পা লাল ইয়াকুতের বলে বর্ণিত হয়েছে। এই বিবরণগুলো একই বর্ণনাপথের নয় এবং আরশের উপাদান সম্পর্কেও একই বক্তব্য দেয় না। তবে সবগুলোতেই আরশকে মানুষের পরিচিত মূল্যবান রত্ন বা আলোকময় উপাদানের সাহায্যে বর্ণনা করা হয়েছে। [42]

আরশ আলো দিয়ে তৈরি, লাল ইয়াকুত দিয়ে তৈরি, নাকি সবুজ পান্না দিয়ে তৈরি—এই পৃথক বক্তব্যগুলোর সবগুলোকে একই বস্তুগত বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এগুলো প্রাচীন ইসলামি তাফসির ও ধর্মীয় বিশ্বতত্ত্বে প্রচলিত ভিন্ন ধারণার সাক্ষ্য। ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর বক্তব্য সরাসরি মুহাম্মদের হাদিস নয়; শাবীর সূত্রে মুহাম্মদের নামে প্রচলিত বক্তব্যটির বর্ণনাপথও পৃথকভাবে যাচাইয়ের বিষয়। একটি বর্ণনা কোনো প্রভাবশালী তাফসিরগ্রন্থে সংরক্ষিত হওয়ার অর্থ সেটি সরাসরি মুহাম্মদের নিশ্চিত বক্তব্য কিংবা পর্যবেক্ষণযোগ্য বাস্তবতার প্রমাণ নয়।

এই তথ্যগুলো বর্তমান প্রবন্ধের মূল প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির আগে পানির ওপর অবস্থানকারী আরশের অস্তিত্বকে ইসলামি গ্রন্থে সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আরশের নিজের উপাদান সম্পর্কে আলো, ইয়াকুত ও পান্নার ভিন্ন বর্ণনা এবং তার চারপাশে আগুন, বরফ, আলো ও পানির নদীর বিবরণ সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে। আরশ সৃষ্টি হওয়ার আগে এসব উপাদানের অস্তিত্ব ছিল কি না, আরশের গঠনের উপাদানগুলো কখন সৃষ্টি হলো এবং পানির ওপর আরশ স্থাপনের সময় এসব নদীর অস্তিত্ব ছিল কি না—সেসব প্রশ্নের একটি সুস্পষ্ট কালানুক্রম এই বর্ণনাগুলো দেয় না। প্রাচীন বর্ণনাকারীরা আরশের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিলেও সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ের একটি অভিন্ন পদার্থগত ইতিহাস সংরক্ষণ করেননি।


শিয়া হাদিসশাস্ত্রে প্রথম আধ্যাত্মিক সৃষ্টি: আকল বা বুদ্ধি

প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে ইসলামি বর্ণনাগুলোর বৈচিত্র্য শুধু সুন্নি হাদিস ও তাফসিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিয়া হাদিসশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব কুলাইনীর ‘আল-কাফি’-তেও সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে পৃথক বিবরণ পাওয়া যায়। গ্রন্থটির প্রথম খণ্ডের প্রথম অধ্যায় ‘কিতাবুল আকল ওয়াল জাহল’—অর্থাৎ বুদ্ধি ও অজ্ঞতার অধ্যায়। এখানে আকল বা বুদ্ধিকে আল্লাহর একটি সৃষ্টি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ তাকে কাছে আসতে এবং দূরে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন, আর আকল সেই নির্দেশ পালন করেছে। এই বর্ণনায় বুদ্ধি কেবল মানুষের মস্তিষ্কের একটি ক্ষমতা নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশ গ্রহণকারী এবং সেই নির্দেশ অনুযায়ী আচরণকারী একটি স্বতন্ত্র সৃষ্ট সত্তা। [43]

আল-কাফির একই অধ্যায়ের ১৪ নম্বর হাদিসে সামাআ ইবনে মিহরানের সূত্রে জাফর আস-সাদিকের একটি বিস্তারিত বক্তব্য সংরক্ষিত হয়েছে। এখানে আকলকে আধ্যাত্মিক সৃষ্টিগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আল্লাহ আরশের ডানদিকে তাঁর আলো থেকে আকল সৃষ্টি করেন। এরপর তাকে দূরে যেতে নির্দেশ দিলে সে দূরে যায় এবং কাছে আসতে বললে কাছে আসে। আল্লাহ তাকে মহান সৃষ্টি হিসেবে মর্যাদা দেন। এরপর লবণাক্ত ও তিক্ত সমুদ্র থেকে অজ্ঞতাকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সত্তা হিসেবে সৃষ্টি করার বিবরণ রয়েছে। এখানে বুদ্ধি ও অজ্ঞতাকে দুটি বিপরীত সৃষ্ট সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। [44]

إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خَلَقَ الْعَقْلَ وَهُوَ أَوَّلُ خَلْقٍ مِنَ الرُّوحَانِيِّينَ عَنْ يَمِينِ الْعَرْشِ مِنْ نُورِهِ، فَقَالَ لَهُ: أَدْبِرْ فَأَدْبَرَ.

বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ আকল বা বুদ্ধি সৃষ্টি করেছেন। সেটি ছিল আধ্যাত্মিক সৃষ্টিগুলোর মধ্যে প্রথম। তিনি আরশের ডানদিকে নিজের আলো থেকে তাকে সৃষ্টি করেন। এরপর তাকে বললেন, দূরে যাও; সে দূরে গেল।

এই হাদিসের ‘আধ্যাত্মিক সৃষ্টিগুলোর মধ্যে প্রথম’ কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আকলকে সমস্ত ভৌত ও অভৌত সৃষ্টির মধ্যে নিরঙ্কুশ প্রথম বলা হয়নি; বরং আধ্যাত্মিক সৃষ্টিগুলোর একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে তার প্রথমত্বের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সৃষ্টির স্থান হিসেবে আরশের ডানদিকের উল্লেখ রয়েছে। ফলে বর্ণনার নিজস্ব কাঠামোয় আরশ এবং আকলের অবস্থানগত সম্পর্ক রয়েছে। কলমের প্রথম সৃষ্টির হাদিসের সঙ্গে একে সরাসরি অভিন্ন দাবি হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না, কারণ উভয় বর্ণনায় প্রথমত্বের পরিসর একইভাবে নির্ধারিত হয়নি।

তবে শিয়া ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের পরবর্তী আলোচনায় আকলকে সমস্ত সৃষ্টির প্রথম অস্তিত্ব হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফয়েজ কাশানী তাঁর ‘আনওয়ারুল হিকমাহ’ গ্রন্থে সৃষ্টির প্রথম আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে আকলের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তাঁর আলোচনায় আকল এমন একটি প্রথম অস্তিত্ব, যার মাধ্যমে পরবর্তী সৃষ্টির ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে শিয়া ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের একটি ধারায় কলমের পরিবর্তে আকল বা বুদ্ধি সৃষ্টির প্রথম অবস্থান লাভ করেছে। এই মতটি কুলাইনীর সংকলিত হাদিসের নির্দিষ্ট শব্দের তুলনায় বিস্তৃত একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা। [45]

আল-কাফির বর্ণনায় আকল ও অজ্ঞতার পৃথক সৃষ্টি এবং অজ্ঞতার উৎস হিসেবে তিক্ত সমুদ্রের উল্লেখ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিতাত্ত্বিক ধারণা প্রকাশ করে। এখানে বুদ্ধি ও অজ্ঞতা মানুষের মানসিক ক্ষমতা কিংবা জ্ঞানের অভাবমাত্র নয়; তাদের পৃথক সৃষ্টি, আচরণ এবং নির্দেশ গ্রহণের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আকল আল্লাহর আদেশ পালন করে, অজ্ঞতা অবাধ্যতা প্রদর্শন করে। এরপর তাদের বিপরীত বৈশিষ্ট্য ও অনুসারী শক্তিগুলোর কথা বলা হয়েছে। ফলে বুদ্ধি, অজ্ঞতা, আলো ও পানির মতো ধারণাগুলো একটি অতিপ্রাকৃত সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে।

সুন্নি হাদিসে প্রথম কলম সৃষ্টি, প্রাচীন তাফসিরে পানি কিংবা আলো ও অন্ধকারের প্রথমত্ব এবং শিয়া হাদিসশাস্ত্রে আকলের আধ্যাত্মিক প্রথমত্ব—এই বিবরণগুলোর বিষয়বস্তু ও দাবি এক নয়। কিন্তু ইসলামি জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ধারায় সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে কত ধরনের ধারণা সংরক্ষিত হয়েছে, তা এগুলো থেকে স্পষ্ট হয়। একই প্রশ্নের উত্তরে কখনো একটি লেখার উপকরণ, কখনো মহাজাগতিক পানি, কখনো আলো ও অন্ধকার, আবার কখনো বুদ্ধির মতো একটি আধ্যাত্মিক সত্তাকে সৃষ্টির শুরুতে স্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিকেরা এসব ধারণার মধ্যে নির্বাচন, শ্রেণিবিভাগ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন। এগুলো প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইসলামি সৃষ্টিচিন্তার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কিন্তু মহাবিশ্বের প্রথম বাস্তব অস্তিত্ব সম্পর্কে পর্যবেক্ষণভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।


উপসংহার

মহাবিশ্বের সর্বপ্রথম সৃষ্টি কী ছিল, সেই প্রশ্নের একটি অভিন্ন উত্তর প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইসলামি গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায় না। কোরআনে আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির আগে আরশ পানির ওপর থাকার কথা বলা হয়েছে। সহিহ বুখারী ও মুসলিমে আরশ, পানি এবং পূর্বনির্ধারিত তাকদিরের বিবরণ রয়েছে। অন্যদিকে আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে কলমের প্রথম সৃষ্টি এবং সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনা লিখে রাখার কথা এসেছে। তাফসীরে তাবারীতে আলো ও অন্ধকারকে প্রথম সৃষ্টি হিসেবে চিহ্নিত করার পৃথক বর্ণনা রয়েছে। মধ্যযুগের ইবনে আসীর, ইবনে কাসীর, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়িম এবং অন্যান্য আলেমের আলোচনায় পানি, আরশ ও কলমের প্রথমত্ব নিয়ে মতভেদ সংরক্ষিত হয়েছে। শিয়া হাদিসশাস্ত্রের আল-কাফি গ্রন্থে আবার আকল বা বুদ্ধিকে আধ্যাত্মিক সৃষ্টিগুলোর প্রথম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব বর্ণনার প্রথমত্বের পরিসর সর্বত্র এক নয়; কিন্তু সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে এগুলো একটিমাত্র সর্বসম্মত কালানুক্রমও প্রতিষ্ঠা করে না।

এই মতভেদ শুধু কোন বস্তুটি আগে সৃষ্টি হয়েছিল, তার নাম নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাবারীর সূত্রে সংরক্ষিত একটি বিবরণে কলমের পরে কুরসি, তারপর আরশ, বাতাস, অন্ধকার এবং সবশেষে পানি সৃষ্টির ক্রম পাওয়া যায়। অন্য বর্ণনায় আরশের আগেই পানির অস্তিত্ব রয়েছে। ইবনে আবি আল-ইজ্জ প্রথম সৃষ্টি হিসেবে কলমের উল্লেখকে ব্যাকরণগতভাবে ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করে আরশের পূর্ববর্তী অস্তিত্বের সঙ্গে সমন্বয় করেছেন। ইবনে আসীর কলমের মাধ্যমে তাকদির লেখার বিবরণে লিখনফলক বা লাওহে মাহফুজের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাগাভীর তাফসিরে সেই লাওহে মাহফুজকে পাঁচশ বছরের পথের সমান বিস্তৃত, সাদা মুক্তা ও ইয়াকুত দিয়ে নির্মিত একটি বস্তু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার আরশের নিজের উপাদান সম্পর্কে আলো, ইয়াকুত ও পান্নার পৃথক বিবরণ পাওয়া যায়। এসব মতভেদ ও ব্যাখ্যা প্রমাণ করে, সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ের ঘটনাক্রম এবং সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোর প্রকৃতি নির্ধারণে মধ্যযুগের মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যেও একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণা প্রচলিত ছিল।

পানিকে সৃষ্টির আদিম উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার ধারণাটি প্রাচীন ইসলামি তাফসিরে আরও বিস্তৃত হয়েছে। সুদ্দীর সূত্রে সংরক্ষিত বর্ণনায় পানি থেকে ধোঁয়া, ধোঁয়া থেকে আসমান এবং পানি শুকিয়ে পৃথিবী হওয়ার কথা রয়েছে। ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর নামে প্রচলিত পৃথক বর্ণনায় পানির বাষ্প থেকে আসমান, ফেনা থেকে পৃথিবী এবং পানির ঢেউ থেকে পাহাড় সৃষ্টির ধারণা পাওয়া যায়। ইবনে রজবের আলোচনায় পানি সমস্ত সৃষ্টির মূল উপাদান হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। অন্যদিকে সৃষ্টি-পূর্ব অবস্থা সম্পর্কে আবু রাজিনের হাদিসে ‘আমা’ শব্দের ব্যবহার এবং সেই শব্দের অর্থ নিয়ে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের মতভেদ রয়েছে। এসব বিবরণে মহাবিশ্বের উৎপত্তিকে পানি, বাষ্প, ফেনা, মেঘ, আলো ও অন্ধকারের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা হলেও সেগুলো থেকে একটি সুসংগত পদার্থগত সৃষ্টিপ্রক্রিয়া নির্ধারণ করা যায় না।

আধুনিক মহাজাগতিক পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করেছে। আদিম মহাবিশ্বের উত্তপ্ত পর্যায়ে মৌলিক কণার বিকাশ এবং পরে প্রধানত হালকা মৌলের নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল। নক্ষত্রের পরবর্তী বিবর্তনে অক্সিজেনসহ ভারী মৌল উৎপন্ন হওয়ার পর পানির অণু গঠনের রাসায়নিক পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে পানি মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থের আদি উৎস নয়; এটি পূর্বে অস্তিত্ব লাভ করা মৌলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌগ। পানি শুকিয়ে পৃথিবী, পানির বাষ্প থেকে আসমান কিংবা পানির ঢেউ থেকে পর্বতমালা সৃষ্টির ধারণা প্রতিষ্ঠিত মহাজাগতিক ও ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মেলে না। একইভাবে সৃষ্টির শুরুতে একটি কলমের কথোপকথন, সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনার লিখিত সংরক্ষণ এবং রত্ননির্মিত মহাজাগতিক ফলকের অস্তিত্বের পক্ষেও স্বাধীন পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রমাণ নেই।

আদিম পানির ধারণা ইসলামি গ্রন্থ রচনার বহু আগেই মেসোপটেমীয় সৃষ্টিপুরাণ, বাইবেলের আদিপুস্তক, ঋগ্বেদ, রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন বর্ণনায় উপস্থিত ছিল। গ্রিক দার্শনিক থেলিসের নামে সংরক্ষিত মতবাদেও পানিকে সমস্ত বস্তুর মৌলিক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রাচীন ঐতিহ্যগুলোর মধ্যে সৃষ্টির ক্রম ও বিষয়বস্তুতে পার্থক্য রয়েছে; কিন্তু জলকে সৃষ্টির আদিম অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা যে বহু সভ্যতায় প্রচলিত ছিল, তা স্পষ্ট। ইসলামি তাফসিরে পানি থেকে আসমান-পৃথিবী সৃষ্টির কাহিনি এই বৃহত্তর প্রাচীন বিশ্বতাত্ত্বিক চিন্তার সঙ্গে বিষয়গত সাদৃশ্য বহন করে। সেই সাদৃশ্য সরাসরি অনুলিপির প্রমাণ নয়, কিন্তু আদিম পানির ধারণাকে স্বতন্ত্র ঐশী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হিসেবে উপস্থাপনেরও কোনো ভিত্তি দেয় না।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইসলামি উৎসগুলো সৃষ্টির প্রথম পর্যায় সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা, মতভেদ এবং পরবর্তী সমন্বয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ করেছে। কোনো বর্ণনাকে সহিহ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা, নির্দিষ্ট আলেমের মতকে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা ব্যাকরণগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে দুটি হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা—এসব ইসলামি হাদিসশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্বের অভ্যন্তরীণ পদ্ধতি। এসব পদ্ধতি নির্বাচিত বর্ণনার মহাজাগতিক সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। সৃষ্টির শুরুতে পানি, কলম, আরশ, আলো কিংবা আধ্যাত্মিক বুদ্ধির অস্তিত্ব সম্পর্কে ধর্মীয় বর্ণনা পাওয়া যায়; কিন্তু মহাবিশ্বের বাস্তব উৎপত্তির ইতিহাস নির্ধারণ করতে হয় পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। সেই মানদণ্ডে প্রাচীন ইসলামি সৃষ্টিকাহিনিগুলো মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞানের উৎস নয়; এগুলো প্রাচীন মানুষের ধর্মীয় ও বিশ্বতাত্ত্বিক চিন্তার ঐতিহাসিক নিদর্শন।


তথ্যসূত্রঃ
  1. NASA Astrobiology — Are We Really Made of Star Stuff? ↩︎
  2. NASA Science — Ocean Worlds: Origins of Oceans ↩︎
  3. European Southern Observatory — First Generation Stars and the Origin of Heavy Elements ↩︎
  4. আল-কোরআন, সুরা হুদ ১১:৭ ↩︎
  5. সহিহ বুখারী, হাদিস ৩১৯১, সৃষ্টির সূচনা অধ্যায় ↩︎
  6. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৫৩খ, তাকদির অধ্যায় ↩︎
  7. তাফসীরে তাবারী, সুরা আল-বাকারা ২:২৯, বর্ণনা ৫৯১ ↩︎
  8. তাফসীরে কুরতুবী, সুরা হুদ ১১:৭ ↩︎
  9. তাফসীরে বাগাভী, সুরা হুদ ১১:৭ ↩︎
  10. তাফসীরে ইবনে কাসীর, প্রথম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৩৬৯ ↩︎
  11. জামে তিরমিজি, হাদিস ৩১০৯, সুরা হুদের তাফসির ↩︎
  12. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৪৫৮০৯: প্রথম সৃষ্টির ক্রম ↩︎
  13. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৪৪৩৯৮৯: আমা-সংক্রান্ত হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থ ↩︎
  14. তাফসীরে তাবারী, সুরা হুদ ১১:৭, বর্ণনা ১৭৯৮০–১৭৯৮১ ↩︎
  15. সিন্দী, হাশিয়াতুস সিন্দী আলা সুনান ইবনে মাজাহ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৮, আমা শব্দের ব্যাখ্যা ↩︎
  16. ইবনে রজব হাম্বলী, তাফসীরে ইবনে রজব, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৮–৫৫২, সুরা হুদ ১১:৭ ↩︎
  17. মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১০৩৯৯; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ২৫৫৯, আবু হুরায়রার বর্ণনা ↩︎
  18. ইবনে রজব, লাতায়েফুল মাআরিফ, সৃষ্টি ও সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে আলোচনা ↩︎
  19. সালাবী, আল-কাশফ ওয়াল-বায়ান, সুরা আল-আনআম ৬:১, ভিন্ন পাঠ ↩︎
  20. তাফসীরে বাগাভী, সুরা ফুসসিলাত ৪১:১১ ↩︎
  21. তাফসীরে ইবনে কাসীর, সুরা ফুসসিলাত ৪১:১১ ↩︎
  22. বাইবেল, আদিপুস্তক ১:১–১০ ↩︎
  23. Script: Devanagari, Kanda:AYODHYAKANDA, Sarga:110, Sloka:3 ↩︎
  24. মহাভারত, শান্তিপর্ব, মোক্ষধর্মপর্ব, অনুচ্ছেদ ১৮৩, ভৃগু–ভরদ্বাজ সংলাপ ↩︎
  25. ঋগ্বেদ ১০.১২৯.৩ ↩︎
  26. University of Pennsylvania, ORACC — Tiamat and the Enūma Eliš ↩︎
  27. Aristotle, Metaphysics, 1.3, 983b ↩︎
  28. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৭০০, তাকদির অধ্যায় ↩︎
  29. জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৩১৯, সুরা আল-কলমের ব্যাখ্যা ↩︎
  30. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৪৫৮০৯: সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদানগুলোর ক্রম সম্পর্কে মতভেদ ↩︎
  31. তাফসীরে তাবারী, সুরা আল-বাকারা ২:২৯, বর্ণনা ৫৯০, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের সৃষ্টি-বিবরণ ↩︎
  32. ইবনে আসীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮, সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে আলোচনা ↩︎
  33. ইবনে আসীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯, ‘কলমের পরে কী সৃষ্টি হয়েছিল’ ↩︎
  34. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, প্রথম খণ্ড, আসমান ও পৃথিবীর সৃষ্টি ↩︎
  35. তাবারী, তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক, প্রথম খণ্ড, সৃষ্টি-ক্রম সম্পর্কে আলোচনা ↩︎
  36. ইবনে আসীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯ ↩︎
  37. ইবনে আবি আল-ইজ্জ, শরহুল আকিদাতিত তাহাবিয়্যা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৫–৩৪৬, কলম ও আরশের প্রথমত্ব নিয়ে মতভেদ ↩︎
  38. আল-কোরআন, সুরা আল-বুরুজ ৮৫:২১–২২ ↩︎
  39. তাফসীরে বাগাভী, মাআলিমুত তানজিল, সুরা আর-রাদ ১৩:৩৯, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৫–৩২৬ ↩︎
  40. তাফসীরে বাগাভী, সুরা আর-রাদ ১৩:৩৯, উম্মুল কিতাবের ব্যাখ্যা ↩︎
  41. সুয়ূতী, আদ-দুররুল মানসুর, সুরা আত-তাওবা ৯:১২৯, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৬–৬১৭; ওয়াহব ইবনে মুনাব্বিহর বর্ণনা ↩︎
  42. সুয়ূতী, আদ-দুররুল মানসুর, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৭, আরশের উপাদান সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা ↩︎
  43. কুলাইনী, আল-কাফি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০, কিতাবুল আকল ওয়াল জাহল, হাদিস ১ ↩︎
  44. কুলাইনী, আল-কাফি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০–২১, কিতাবুল আকল ওয়াল জাহল, হাদিস ১৪ ↩︎
  45. ফয়েজ কাশানী, আনওয়ারুল হিকমাহ, পৃষ্ঠা ৯১, আকলের প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.