ইসলামী শরীয়ত – প্রথম বা দ্বিতীয় স্ত্রীকে জানানো জরুরি নয়

ভূমিকা

কোরআন হাদিস, ধ্রুপদী ইসলামী ফিকহের সর্বাধিক প্রভাবশালী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ব্যাখ্যা এবং বিশুদ্ধ আকীদার আলেমদের ফতোয়া অনুসারে, একজন পুরুষ সর্বোচ্চ চারটি স্ত্রী গ্রহণ করতে পারেন, এবং এই প্রক্রিয়ায় প্রথম স্ত্রীর অনুমতি গ্রহণ বা দ্বিতীয় স্ত্রীকে পূর্ববর্তী বিবাহের তথ্য প্রকাশ করা বিবাহের বৈধতার জন্য অপরিহার্য শর্ত নয় [1] [2]। এই অবস্থানটি কোনো “পার্শ্ব-দিক” বা “গৌণ ব্যাখ্যা” নয়; বরং এটি ইসলামের এমন একটি মৌলিক কাঠামোগত নীতি, যার মাধ্যমে বিবাহকে বাস্তবে দুই পক্ষের সমান মর্যাদার অংশীদারিত্ব না ভেবে—পুরুষের একতরফা অধিকারকে একটি ধর্মীয়-আইনি ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একজন পুরুষের জন্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন (দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিবাহ) ঘটানো বৈধ; কিন্তু সেই পরিবর্তনের ফলে যে ব্যক্তি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে—প্রথম স্ত্রী—তার সম্মতি, অবহিত হওয়া, বা সম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারকে শর্ত হিসেবেই ধরা হয় না। এইখানেই সমস্যাটি কেবল “চার বিবাহ” বা “পলিগ্যামি” [3] বিষয়ক বিতর্ক নয়; সমস্যাটি হলো—কাকে মানুষ হিসেবে পূর্ণ কর্তৃত্বের নৈতিক এজেন্সি (moral agency) ধরা হচ্ছে, আর কাকে সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু (object) বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।

আধুনিক নৈতিক দর্শন, মানবাধিকার ধারণা এবং চুক্তি-নৈতিকতার মৌলিক মানদণ্ডে “সম্মতি” (consent) কেবল গালভরা বুলি বা কোনো সাজসজ্জার শব্দ নয়; এটি ব্যক্তিস্বাধীনতার কেন্দ্রীয় ভিত্তি। সম্মতি অর্থ কেবল “হ্যাঁ বলা” নয়—সম্মতি মানে “না” বলবার অধিকার, তথ্যভিত্তিক অবহিত, স্বেচ্ছায় প্রদত্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু যখন প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নেয়া বাধ্যতামূলক নয়, কিংবা দ্বিতীয় স্ত্রীকে জানানো বাধ্যতামূলক নয় যে পুরুষটি ইতোমধ্যে বিবাহিত—তখন সম্মতির ধারণাটিই ভেঙে পড়ে। কারণ এখানে দু’টি স্তরে তথ্যের অসম বণ্টন (information asymmetry) তৈরি হয়: (ক) প্রথম স্ত্রীকে অন্ধকারে রেখে তার পারিবারিক বাস্তবতা বদলে ফেলা হয়, এবং (খ) দ্বিতীয় স্ত্রীকে পূর্ণ প্রাসঙ্গিক তথ্য না জানিয়ে তার সম্মতি আদায় করা সম্ভব হয়। এই নীতিগত নকশা নারীর “right to know”—অর্থাৎ নিজের জীবন, সম্পর্ক, যৌথ সম্পদ, সন্তান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এসব সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক সত্য জানার অধিকারকে দ্বিতীয় সারির বিষয় বানিয়ে দেয়।

এখানে একটি খুব সাধারণ নৈতিক প্রশ্ন দাঁড়ায়: যে সম্পর্ককে “অর্ধেক দ্বীন” বলে নৈতিকভাবে পবিত্র করা হয়, সেই সম্পর্কেই যদি স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসকে শর্ত হিসেবে না ধরা হয়, তাহলে এই নৈতিকতার মানদণ্ড আসলে কার জন্য? বিবাহ নামের চুক্তিতে যদি এক পক্ষের (স্বামীর) সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়, আর অন্য পক্ষের (স্ত্রীর) সম্মতি/জানার অধিকার অপ্রাসঙ্গিক—তাহলে এটিকে “পারিবারিক ব্যবস্থা” নয়, বরং ভিন্নমাত্রার দাসপ্রথা বলা বেশি যুক্তিসঙ্গত। এই প্রতিষ্ঠানে পুরুষের স্বাধীনতা ‘অধিকার’, আর নারীর স্বাধীনতা ‘সহনশীলতা’ বা ‘পরীক্ষা’ হিসেবে ফ্রেম করা হয়। ফলে এই বিধানগুলোকে “ব্যক্তিগত পছন্দ”, “ইসলামী সংস্কৃতি”, বা “ধর্ম পালনের অধিকার” হিসেবে নিরীহভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই; এগুলো কাঠামোগত বৈষম্যকে আইনি-নৈতিক বৈধতা দেয় এবং নারীর মর্যাদাকে পদ্ধতিগতভাবে খাটো করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগে “ক্ষতি” কেবল মানসিক দুঃখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনুমতি বা তথ্য ছাড়া বহুবিবাহ পরিবারকে একটি স্থিতিশীল সামাজিক ইউনিট হিসেবে না গড়ে, বরং সন্দেহ, গোপনীয়তা, অবিশ্বাস, অর্থনৈতিক ঝুঁকি, উত্তরাধিকার জটিলতা, এবং সন্তানদের পরিচয়গত সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রী জানতেই পারেন না যে তার সংসার কাঠামোগতভাবে বদলে গেছে; আর দ্বিতীয় স্ত্রীও বুঝে উঠতে পারেন না—তার জীবনে যে চুক্তি কার্যকর হলো, তার সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আগে গোপন ছিল। এভাবে “ধর্মীয় বৈধতা” দেখিয়ে এমন এক ধরনের মধ্যযুগীয় “প্রভু-দাসীর” সামাজিক আচরণকে স্বাভাবিক করা হয়, যা আধুনিক নৈতিকতায় প্রতারণার (deception) নামান্তর, এবং আধুনিক আইনি দর্শনে মৌলিক ফেয়ারনেসের (fairness) বিপরীত।

উল্লেখ্য, এখানে কোনভাবেই মুসলিম আইনের প্রসঙ্গে আলোচনা হচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইনের বেশি কিছু ধারা আইয়্যুব খানের সময়ে সন্নিবেশিত, এবং আইয়্যুব খান ইসলামিক শরীয়ার কোনরকম তোয়াক্কা না করেই এইসব ইসলাম বিরোধী আইন তৈরি করেন। কিন্তু আইয়্যুব খানের আতঙ্কে কোন ইসলামিস্টই তার কঠিন বিরোধিতা করার সাহস করেনি। যার ফলে এই ইসলাম বিরোধী আইন মুসলিম আইনের নামে অনেক স্থানেই প্রচলিত। যা মৌলিকভাবে ইসলামী শরীয়তে অনুপস্থিত।


তালাক দেয়ার অধিকার শুধুমাত্র স্বামীর

ধ্রুপদী শরীয়ত-ব্যাখ্যার একটি কেন্দ্রীয় এবং সবচেয়ে ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য হলো—বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষমতা (divorce power) সমানভাবে ভাগ না করে তা ব্যাবহারিকভাবে স্বামীর হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা [4]। বাইরে থেকে এটিকে “পারিবারিক শৃঙ্খলা” বা “দায়িত্বের ভারসাম্য” বলে সাজানো হলেও বাস্তবে এটি একটি ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার: একজন পুরুষ তুলনামূলকভাবে সহজে সম্পর্ক ভাঙতে পারে, শর্ত চাপাতে পারে, এবং সম্পর্ককে “আলোচনার টেবিলে” নিজের সুবিধামতো সাজাতে পারে; কিন্তু নারীকে একই জায়গায় দাঁড় করানো হয় না। ফলে বিবাহ এখানে “সমান অধিকারভিত্তিক অংশীদারিত্ব” না হয়ে কার্যত পরিণত হয় “অসম ক্ষমতার সম্পর্ক”-এ—যেখানে সিদ্ধান্তের মালিক এক পক্ষ, এবং সিদ্ধান্তের পরিণতি বহনকারী অন্য পক্ষ। এই নকশাটি কেবল বিচ্ছেদের মুহূর্তে নয়, পুরো বৈবাহিক জীবনে একটি স্থায়ী ছায়া ফেলে: যে হাতে বিচ্ছেদের চাবি, সেই হাতই সম্পর্কের শর্ত নির্ধারণে বাড়তি সুবিধা পায়। সেই সাথে যখন যুক্ত হয় সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতের স্ত্রী প্রহারের অনুমতি, তখন ক্ষমতার কিছুই আর নারীর পক্ষে থাকে না।

এই ক্ষমতা-অসমতা বহুবিবাহের ক্ষেত্রে আরও নির্মমভাবে প্রকাশ পায়। কারণ বহুবিবাহের অনুমতি যখন আছে, তখন স্বামী একদিকে গোপনে বা সম্মতি ছাড়াই নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, অন্যদিকে প্রথম স্ত্রীকে এমন এক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়—যেখানে তার জীবনের মৌলিক বাস্তবতা বদলে যায়, কিন্তু তার হাতে কার্যকর প্রতিকার থাকে সীমিত। তিনি আপত্তি তুললে সেটিকে “স্বাভাবিক নারীসুলভ অনীহা” বলে খাটো করা যায়; তিনি ক্ষতির কথা বললে সেটিকে “ধৈর্যের পরীক্ষা” বলে নৈতিক চাপ তৈরি করা যায়; এবং তিনি বেরিয়ে যেতে চাইলে তালাক/খোলা/আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা, সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে বেরিয়ে যাওয়াটাই অনেক সময় বাস্তবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, বহুবিবাহের অনুমতি + তালাক-ক্ষমতার অসম বণ্টন—একসাথে নারীর ওপর একটি দ্বিমুখী নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে: একদিকে সম্পর্কের কাঠামো বদলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণ নেই, অন্যদিকে সেই বদলে যাওয়া সম্পর্ক থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথেও বাধা।

আধুনিক নৈতিক দর্শন ও মানবাধিকার চিন্তায় “সম্মতি” (consent) কোনো যান্ত্রিক শব্দ নয়—এটি স্বাধীন ইচ্ছা, নিরাপত্তা, এবং সমতা-ভিত্তিক সক্ষমতার উপর দাঁড়ানো একটি নীতি। তাই “বাধ্যতামূলক সম্মতি” বা “অসাম্যভিত্তিক সম্মতি”—আসল অর্থে সম্মতি হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। যে সম্পর্কে এক পক্ষের বেরিয়ে যাওয়ার পথ, বাসস্থান-নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, সন্তান-সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ, কিংবা অর্থনৈতিক টিকে থাকা অন্য পক্ষের সিদ্ধান্তে নির্ভরশীল—সেখানে ‘সম্মতি’ অনেক সময় সত্যিকার পছন্দ নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল (survival strategy)। এইখানে নারী “রাজি” হন, কারণ তিনি “তা আন্তরিকভাবে চান” বলে না—বরং কারণ তিনি জানেন, আপত্তি বা বিচ্ছেদ করলে তার ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে। তাই তালাকের ক্ষমতা যখন অসমভাবে বণ্টিত থাকে, তখন বহুবিবাহের অনুমতি নারীর জীবনে “ঝুঁকি”কে প্রাতিষ্ঠানিক করে এবং পুরুষের সুবিধাকে “অধিকার” হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়—একটি কাঠামো তৈরি করে যেখানে নারীর জীবন-নিরাপত্তা ও মানসিক স্থিতি কোনো নীতিগত অধিকার নয়, বরং পুরুষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় নৈতিক সমস্যা হলো—এটি সম্পর্ককে পারস্পরিক মর্যাদার চুক্তি না রেখে “আধিপত্যের নিরাপত্তা কাঠামো” বানায়। আধুনিক দৃষ্টিতে যে বিয়ে সমতার ভিত্তিতে যৌথ জীবন গড়ার প্রতিশ্রুতি, ধ্রুপদী ব্যাখ্যার এই তালাক-কাঠামো সেটিকে ক্ষমতার ভারসাম্যহীন খেলায় নামিয়ে আনে: পুরুষের হাতে শাস্তিমূলক অস্ত্র (একতরফা বিচ্ছেদ), আর নারীর হাতে সীমিত, জটিল, এবং সামাজিকভাবে দণ্ডনীয় বিকল্প। ফলত, এটি কেবল “ধর্মীয় বিধান” নয়; এটি নারীর ওপর কাঠামোগত পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্যের এমন একটি যন্ত্র, যা পুরো বৈবাহিক জীবনে তাকে দরকষাকষিতে দুর্বল, সিদ্ধান্তে গৌণ, এবং নিরাপত্তায় অনিশ্চিত করে রাখে। আসুন একটি ওয়াজ শুনি,

একইসাথে আসুন শুনি, বহুবিবাহকে কেন ইসলামে উৎসাহ দেয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে জানি আলেমদের মুখ থেকে,


প্রথম স্ত্রীর সম্মতির অভাব এবং অংশীদারিত্বের লঙ্ঘন

ধ্রুপদী ফিকহে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়—এই নীতিটি বাহ্যত “ফিকহি শর্ত” হিসেবে নিরপেক্ষ শোনালেও বাস্তবে এটি বিবাহকে একটি গভীরভাবে অসম চুক্তিতে নামিয়ে আনে, যেখানে এক পক্ষের (স্বামী) সিদ্ধান্তই সম্পর্কের কাঠামো, ভবিষ্যৎ, এবং নিরাপত্তা-অবস্থা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আধুনিক জীবনে বিবাহ কেবল “আইনি বৈধতা” বা “যৌন-সন্তান উৎপাদনের ব্যবস্থা” নয়—এটি যৌথ অর্থনীতি, যৌথ বাসস্থান, যৌথ সামাজিক পরিচয়, সন্তান পালনের ভাগাভাগি দায়, পারস্পরিক মানসিক নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি অংশীদারিত্ব। তাই এই অংশীদারিত্বে “সম্মতি” মানে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক শব্দ নয়; এটি সেই নৈতিক ভিত্তি, যেখানে দুই পক্ষই নিজেদের জীবন-নির্ধারণী সিদ্ধান্তে সমান ভোটাধিকার পায়। প্রথম স্ত্রীর সম্মতি বা অন্তত অবহিতকরণকে শর্ত না করে বহুবিবাহকে বৈধ করা মানে—সেই ভোটাধিকারকে নীতিগতভাবে বাতিল করে দেওয়া। ফলত, প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে বা সম্মতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিবাহ করা মানে তার জীবন, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা, এমনকি মানসিক স্থিতির ওপর একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া—যে সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ও ক্ষতির ভার মূলত তাকেই বহন করতে হয়, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কোনো ভূমিকা থাকে না।

এখানে “বিশ্বাস” (trust) এবং “স্বচ্ছতা” (transparency) ভেঙে পড়াটা কেবল আবেগী অভিযোগ নয়; এটি অংশীদারিত্বের কাঠামোগত ভাঙন। কারণ বিশ্বাস গড়ে ওঠে তখনই, যখন জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলো গোপনে নয়—আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া হয়। আর স্বচ্ছতা থাকে তখনই, যখন প্রাসঙ্গিক তথ্য দুই পক্ষের কাছেই সমানভাবে থাকে। বহুবিবাহের মতো সম্পর্ক-পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তে প্রথম স্ত্রীকে বাদ দেওয়া মানে তাকে “অংশীদার” থেকে কার্যত “সংযুক্ত পক্ষ” (secondary stakeholder)-এ নামিয়ে আনা। এর ফলে বিবাহের নৈতিক মেরুদণ্ডই বদলে যায়: সম্পর্ক তখন আর সমান মর্যাদার চুক্তি থাকে না, বরং এক পক্ষের ক্ষমতা এবং অন্য পক্ষের সহ্য করার বাধ্যবাধকতা—এই দুইয়ের মধ্যে স্থায়ী এক অসমতার বন্দোবস্ত হয়ে দাঁড়ায়। আসুন এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া পড়ি, [5]

Fatwa: It is more appropriate not to conceal second marriage from first wife
326536
18-6-2016 – Ramadan 13, 1437
421
Question
Assalaamu alaykum. I would like to know the following: does a man have to inform the first wife if he marries a second? What if he does not inform her or denies having a second wife (while he does have one) and then dies, and suddenly the second wife appears at the funeral? Or what if, without their knowledge that they are siblings, the children fall in love with each other?Please advise. Wassalaam.
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah and that Muhammad sallallaahu alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ) is His slave and Messenger. The husband is not obliged to inform his first wife that he is married to a second wife, but it is more appropriate that he does not conceal this fact from her, especially if he fears that not informing her would lead to disputes, conflicts, or something forbidden. Please refer to fataawa 82068 and 86395 with respect to the first part of your question. The answer to the second part of your question is that ignorance is one of the impediments that do not render a person accountable in general. So if a person does something that violates the sharee'ah out of ignorance and not knowing that it is forbidden, then he is not held accountable for it. Shaykh Ibn ‘Uthaymeen may Allaah have mercy upon him said, “There are some impediments for rendering someone accountable, among which are: ignorance, forgetfulness, and coercion; because the Prophet sallallaahualayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ) said, ‘Allaah has forgiven my nation for things they forget, do by mistake, or are forced to do.’ [Ibn Maajah and Al-Bayhaqi]. There is evidence from the Quran and Sunnah that indicates its authenticity. Ignorance means lack of knowledge, so if an adult person does something forbidden out of ignorance of the fact that it is forbidden, then there is no sin on him.”
Allaah knows best.

ফতোয়া নং ৩২৬৫৩৬: প্রথম স্ত্রীর কাছে দ্বিতীয় বিবাহের কথা গোপন না করাই অধিকতর শ্রেয়
তারিখ: ১৮-০৬-২০১৬ (১৩ রমজান ১৪৩৭ হিজরী)
প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। আমি নিচের বিষয়গুলো জানতে চাই: একজন পুরুষ যদি দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে কি তাকে প্রথম স্ত্রীকে তা জানাতেই হবে? যদি সে তাকে না জানায় বা দ্বিতীয় স্ত্রীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে (প্রকৃতপক্ষে থাকার পরেও) এবং এরপর সে মারা যায়, আর হঠাৎ জানাজায় দ্বিতীয় স্ত্রী উপস্থিত হয়, তবে কী হবে? অথবা যদি তাদের অগোচরে (তারা যে ভাই-বোন সেটি না জেনেই) সন্তানরা একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়, তবে কী হবে? দয়া করে পরামর্শ দিন। ওয়াসসালাম।
উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল।
১. স্বামীর জন্য এটি বাধ্যতামূলক নয় যে তিনি তার দ্বিতীয় বিবাহের কথা প্রথম স্ত্রীকে জানাবেন। তবে এই সত্যটি তার কাছে গোপন না করাই অধিকতর শ্রেয় (more appropriate); বিশেষ করে যদি তিনি আশঙ্কা করেন যে, না জানানোর ফলে ভবিষ্যতে বিবাদ, সংঘাত বা কোনো নিষিদ্ধ (হারাম) কাজের পথ প্রশস্ত হতে পারে। (আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশের জন্য অনুগ্রহ করে ফতোয়া নং ৮২০৬৮ এবং ৮৬৩৯৫ দেখুন)।
২. আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর হলো— ‘অজ্ঞতা’ (Ignorance) এমন একটি প্রতিবন্ধক যা সাধারণ অবস্থায় একজন ব্যক্তিকে (শরীয়তের বিধান লঙ্ঘনের জন্য) দায়ী বা দায়বদ্ধ করে না। সুতরাং, যদি কোনো ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত এবং বিষয়টি হারাম জানা ছাড়াই শরীয়াহ বিরোধী কোনো কাজ করে ফেলে, তবে তাকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে না।
শেখ ইবনে উসাইমিন (রহ.) বলেছেন:
“কোনো ব্যক্তিকে দায়বদ্ধ করার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধক রয়েছে, যার মধ্যে অজ্ঞতা, বিস্মৃতি এবং জবরদস্তি (Coercion) অন্যতম। কারণ রাসূল (সা.) বলেছেন— ‘আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলবশত করা কাজ, বিস্মৃতি এবং যা করতে তারা বাধ্য হয়েছে, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ [ইবনে মাজাহ ও আল-বায়হাকি]। কুরআন ও সুন্নাহতে আরও অনেক প্রমাণ রয়েছে যা এর সত্যতা নিশ্চিত করে। অজ্ঞতা মানে জ্ঞানের অভাব; সুতরাং যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো কাজ নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে না জেনে তা করে ফেলে, তবে তার কোনো গুনাহ হবে না।”
আল্লাহই ভালো জানেন।

প্রথম

উপরের ফতোয়াগুলোর ভেতরের “নৈতিক বিপদ” তাই খুব স্পষ্ট: তথ্য গোপনকে নীতিগতভাবে অপরাধ, প্রতারণা, বা বৈধতা-নষ্টকারী শর্তভঙ্গ হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং “উত্তম/শ্রেয়” (more appropriate) পর্যায়ে নামিয়ে এনে বিষয়টিকে নরম করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সম্পর্কের বাস্তবে গোপনীয়তা এখানে নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ নয়—এটি ক্ষমতার প্রয়োগ। একজন মানুষকে (প্রথম স্ত্রীকে) তার নিজের বৈবাহিক বাস্তবতা সম্পর্কে অন্ধকারে রাখা মানে তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মৌলিক অধিকার (agency) থেকে বঞ্চিত করা। এর ফলে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সন্তান-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা—কোনোটাই পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে পারেন না। “বিবাদ হতে পারে” বলে না জানানোকে যৌক্তিক করা আসলে উল্টো যুক্তি: বিবাদ কমানোর নামে স্বচ্ছতাকে বাতিল করে দেওয়া হয়, আর যে ক্ষতি, অনিশ্চয়তা এবং অপমান তৈরি হয়—তা গিয়ে পড়ে দুর্বল পক্ষের ওপর; শক্তিশালী পক্ষ meanwhile সুবিধা ভোগ করে “নৈতিকভাবে নিরাপদ” ঘোষণার ছাড়পত্র নিয়ে। আসুন আরেকটি ফতোয়া পড়ি, [6]

Fatwa: A man is not obligated to inform his wife about second marriage
257119
25-7-2014 – Ramadan 28, 1435
352
Question
I want to ask a serious question this question is life and death for me I want to say that everything in Islam is perfect and has its own reasons even four marriages in islam has its reasons and history. I know that a man can surely marry without the permission of his wife but can he marry without informing her? if yes, then it is like he liked any girl and married her without telling his first wife it will be just like that a man has four wives he is just with all of them but neither of them know that he has other wives. Don’t you think it’s a fraud? A woman after knowing that his husband has married again has two options she can bear sharing her husband and if she can not bear then she is well within her rights to seek divorce but if the husband marries again and does not tell his first wife it will be just like taking her right away from her it will consider as lie and fraud. It will be just like playing with someone’s feelings. Is it allow in Islam to play with someone’s feelings? Is it allow in Islam to keep someone in dark and lie with them? It is so painful so much painful
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad, sallallaahu ‘alayhi wa sallam, is His slave and messenger.
When the wise Sharee’ah deemed polygyny allowable, it enjoined the Muslim man to treat his wives on a footing of equality. Allaah, The Exalted, says (what means): {And if you fear that you will not deal justly with the orphan girls, then marry those that please you of [other] women, two or three or four. But if you fear that you will not be just, then [marry only] one or those your right hand possesses. That is more suitable that you may not incline [to injustice].}[Quran 4:3]
In fact, this is the only condition set by the Sharee’ah for the Muslim man who chooses to practice polygyny. We know of no evidence suggesting that Islamic Sharee’ah obliges the husband to inform his first wife of his intention to have a second wife. Please refer to Fatwa 86395.
Refraining from informing the wife of the second marriage does not constitute deception on the part of the husband. He is entitled to marry another wife as per the Sharee’ah. In most cases, the greater interest entails that the husband does not inform the first wife of his intention to remarry so as not to hurt her and to spare her the unfavorable feelings of distress. This matter does not involve any tampering with the first wife’s feelings.
In fact, polygyny abounds in many benefits that should not be missed merely because of a given wife’s refusal or aversion towards the idea. A woman is naturally averse to polygyny; however, it is not wise to let the wife’s innate aversion towards having co-wives deny the husband the benefits of polygyny. For more benefit, please refer to Fataawa 86818 and 90132.
However, a Muslim wife should see this experience as any affliction that may befall her. If she is patient, this will be a cause for the raising of her rank and atonement of her sins. Please refer to Fatwa 83577 about the merits of patience.
If the husband informs his wife of his second marriage or she finds out about of it, it is not permissible for her to seek divorce merely because her husband has another wife. But if his second marriage incurs considerable harm on the first wife, she is entitled to ask for divorce or Khul‘ because evident harm is one a legitimate reasons for seeking divorce. Please refer to Fatwa 131953.
Allaah Knows best.

ফতোয়া নং ২৫৭১১৯: স্বামী তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা স্ত্রীকে জানাতে বাধ্য নন
তারিখ: ২৫-০৭-২০১৪ (২৮ রমজান ১৪৩৫ হিজরী)
প্রশ্ন: আমি একটি গুরুতর প্রশ্ন করতে চাই যা আমার জন্য জীবন-মৃত্যুর সওয়াল। আমি বিশ্বাস করি ইসলামের সবকিছুই নিখুঁত এবং বহুবিবাহের পেছনেও নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। আমি জানি একজন পুরুষ তার স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু তিনি কি তাকে না জানিয়ে বিয়ে করতে পারেন? যদি পারেন, তবে এটি কি এক ধরণের প্রতারণা (Fraud) নয়? একজন নারী যখন জানতে পারেন তার স্বামী আবার বিয়ে করেছেন, তখন তার সামনে দুটি পথ থাকে—হয় তিনি সতীনের সাথে মানিয়ে নেবেন, নতুবা তিনি বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce) চাইবেন। কিন্তু স্বামী যদি তথ্য গোপন করেন, তবে তিনি স্ত্রীর সেই অধিকারটি কেড়ে নিচ্ছেন। এটি কি কারও অনুভূতি নিয়ে খেলা করা নয়? ইসলামে কি কাউকে অন্ধকারে রাখা বা মিথ্যা বলা জায়েজ? এটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।
উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
১. যখন বিচক্ষণ শরীয়ত বহুবিবাহকে বৈধ করেছে, তখন এটি মুসলিম পুরুষকে তার স্ত্রীদের সাথে সমতা (Equality) বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর যদি তোমরা ভয় কর যে, ইয়াতিম মেয়েদের হক আদায় করতে পারবে না, তবে তোমাদের পছন্দমত মেয়েদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে কর। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা তাদের মধ্যে ইনসাফ (সমতা) করতে পারবে না, তবে একজনকে বিয়ে কর…” [কুরআন ৪:৩]
২. প্রকৃতপক্ষে, বহুবিবাহের ক্ষেত্রে একজন মুসলিম পুরুষের জন্য শরীয়ত নির্ধারিত একমাত্র শর্ত হলো এই ‘ইনসাফ’। ইসলামী শরীয়তে এমন কোনো প্রমাণ (Evidence) নেই যা স্বামীকে তার প্রথম স্ত্রীকে দ্বিতীয় বিবাহের কথা জানাতে বাধ্য করে।
৩. দ্বিতীয় বিবাহের কথা স্ত্রীকে না জানানো স্বামীর পক্ষ থেকে ‘প্রতারণা’ (Deception) হিসেবে গণ্য হয় না। কারণ শরীয়ত অনুযায়ী তিনি আরেকটি বিয়ে করার অধিকার রাখেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, ‘বৃহত্তর স্বার্থ’ (Greater Interest) এটাই দাবি করে যে স্বামী তার প্রথম স্ত্রীকে বিষয়টি জানাবেন না, যাতে তিনি কষ্ট না পান এবং সংকীর্ণতা বা মানসিক যাতনা থেকে দূরে থাকতে পারেন। এটি স্ত্রীর অনুভূতি নিয়ে খেলা করা নয়।
৪. প্রকৃতপক্ষে, বহুবিবাহের মধ্যে অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে যা কেবল স্ত্রীর অনিচ্ছা বা বিমুখতার কারণে হাতছাড়া করা উচিত নয়। নারীরা প্রাকৃতিকভাবেই সতীনের প্রতি বিমুখ থাকে; তবে এই স্বাভাবিক অনীহার কারণে স্বামীকে বহুবিবাহের সুফল থেকে বঞ্চিত করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
৫. একজন মুসলিম স্ত্রীর উচিত এই পরিস্থিতিকে একটি ‘পরীক্ষা বা আপদ’ (Affliction) হিসেবে দেখা যা তার ওপর আসতে পারে। তিনি যদি ধৈর্য ধরেন, তবে এটি তার মর্যাদাবৃদ্ধি এবং গুনাহ মাফের কারণ হবে।
৬. স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ের কথা জানান বা স্ত্রী যদি কোনোভাবে তা জানতে পারেন, তবে স্বামী কেবল আরেকটি বিয়ে করেছে—এই অজুহাতে স্ত্রীর জন্য তালাক চাওয়া জায়েজ নয়। তবে যদি এই দ্বিতীয় বিবাহের কারণে প্রথম স্ত্রীর ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি (Considerable harm) সাধিত হয়, তবে তিনি তালাক বা খোলার আবেদন করার অধিকার রাখেন। কারণ স্পষ্ট ক্ষতি হওয়া তালাক চাওয়ার একটি বৈধ কারণ।
আল্লাহই ভালো জানেন।

প্রথম 1

এই ফতোয়ার যুক্তি-ধারা আরও এক ধাপ এগিয়ে একটি নৈতিক উল্টোপথ তৈরি করে: “স্ত্রীর কষ্ট না দিতে” তথ্য গোপনকে “বৃহত্তর স্বার্থ” (greater interest) বলা হয়, কিন্তু কষ্টের মূল কারণটাই তৈরি হয়—নারীর সম্মতি ও স্বচ্ছতার অধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে। এখানে কষ্ট কমানোর সমাধান হিসেবে যে পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়, সেটি আসলে সমস্যার কেন্দ্রে আঘাত করে: মানুষকে সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। একই সঙ্গে “প্রতারণা নয়” বলে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তা আধুনিক নৈতিকতা ও চুক্তি-নীতির সরাসরি বিপরীত—কারণ যেকোনো গভীর সম্পর্ক বা যৌথ জীবনের সিদ্ধান্তে প্রাসঙ্গিক তথ্য গোপন করা সম্পর্কের বিশ্বাসভিত্তিকে ভেঙে দেওয়ারই নাম। এইখানে “পুরুষের অধিকার”কে নৈতিকতার মানদণ্ড বানানো হয়েছে, আর নারীর অনুভূতি ও সিদ্ধান্তক্ষমতাকে “স্বাভাবিক অনীহা” বলে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে—যেন নারীর আপত্তি কোনো যুক্তিসঙ্গত নৈতিক অবস্থান নয়, বরং এক ধরনের স্বাভাবিক দুর্বলতা, যাকে পাশ কাটিয়ে পুরুষের সুবিধা নিশ্চিত করাই নাকি “বুদ্ধিমানের কাজ”। ফলত, এই কাঠামোটি নারীর মর্যাদাকে স্বীকার করে না; বরং মর্যাদা, সম্মতি ও স্বচ্ছতাকে ত্যাগ করেই পুরুষের একতরফা সুবিধাকে “বৈধ” এবং “অপ্রতারণামূলক” বলে প্রতিষ্ঠা দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বহুবিবাহ করা পরিবারের নারীরা একগামী পরিবারের নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বিষণ্নতা, উদ্বেগ, নিম্ন আত্মসম্মান এবং জীবনসন্তুষ্টির অভাব অনুভব করেন [7]। এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি আইনি কাঠামোয় উপেক্ষিত হলে তা বৈষম্যমূলক বলে প্রতীয়মান হয়, কারণ এটি পুরুষের অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাহ্য করে।


দ্বিতীয় স্ত্রীর অবহিত সম্মতির অধিকারের লঙ্ঘন

দ্বিতীয় স্ত্রীকে পূর্ববর্তী বিবাহের তথ্য গোপন করার অনুমতি আধুনিক চুক্তি আইনের মৌলিক নীতি—যেমন তথ্যের সম্পূর্ণ প্রকাশ (full disclosure)—এর পরিপন্থী। একটি বৈধ চুক্তির জন্য উভয় পক্ষের কাছে সকল প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকা আবশ্যক; অন্যথায় তা তথ্যের অসাম্য (information asymmetry) সৃষ্টি করে। যদি দ্বিতীয় স্ত্রী জানতেন যে পাত্র পূর্বে বিবাহিত বা তার ইতিমধ্যে একজন স্ত্রী আছে, তবে তিনি সম্ভবত বিবাহে রাজি হতেন না। এই গোপনীয়তা এক ধরনের নৈতিক প্রতারণা, যা নারীর স্বাধীন পছন্দকে খর্ব করে । আসুন একটি ফতোয়া দেখে নিই, [8]

প্রথম 3

যদিও ফকিহরা এটিকে বিবাহের স্তম্ভ (rukn) হিসেবে গণ্য করেন না, নৈতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্ধকারে রেখে সম্মতি আদায় করা স্বেচ্ছায় সম্মতির নীতি লঙ্ঘন করে। “বৈধতা” আর “ন্যায্যতা”—এক জিনিস নয়: কোনো সম্পর্ক আইনিভাবে বৈধ হলেই তা ন্যায্য হয়ে যায় না, বিশেষ করে যখন বৈধতার শর্তগুলোই দুর্বল পক্ষকে তথ্য-অজ্ঞতায় আটকে রেখে শক্তিশালী পক্ষকে সুবিধা দেয়।


সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা

গোপন বা অনুমতিহীন বহুবিবাহকে অনেক সময় “ব্যক্তিগত পারিবারিক সিদ্ধান্ত” বলে হালকা করে দেখানো হয়, কিন্তু বাস্তবে এর সামাজিক মূল্য অত্যন্ত উচ্চ। প্রথমত, এটি পরিবারের ভেতরে আস্থার (trust) ভিত্তিটাকেই নষ্ট করে দেয়। কারণ পরিবার একটি “জীবন-সহযোগ” কাঠামো—এখানে সিদ্ধান্তগুলো যৌথ হওয়ার কথা, আর সত্যগুলো স্বচ্ছ হওয়ার কথা। কিন্তু যখন এক পক্ষ গোপনে এমন একটি সম্পর্ক-পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তখন পরিবারের অভ্যন্তরে সন্দেহ, নজরদারি, ভীতি, লুকোচুরি এবং মানসিক নিরাপত্তাহীনতা জন্ম নেয়। ফলাফল হিসেবে পরিবার একটি “সামাজিক ইউনিট” না থেকে পরিণত হয় “ক্ষমতার ভারসাম্যহীন মিনি-রাজনীতি”-তে—যেখানে তথ্য লুকানো মানে প্রভাব বাড়ানো, এবং সত্য জানা মানে দুর্বল হয়ে পড়া।

দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকার (inheritance) এবং সম্পত্তি-বণ্টনের ক্ষেত্রে জটিলতা বহুগুণে বেড়ে যায়। গোপন বিয়ে বা অঘোষিত পরিবার কাঠামো থাকলে মৃত্যুর পর হঠাৎ নতুন স্ত্রী বা নতুন সন্তানদের আবির্ভাবে আইনগত বিরোধ, সামাজিক সংঘাত এবং পারিবারিক সম্পর্কের স্থায়ী ভাঙন দেখা দেয়। সন্তানেরা কার “সম্পর্কিত” বা কার “অংশীদার”—এই পরিচয়গত অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে গোপনীয়তার কারণে, পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত ও দ্বন্দ্বের দিকে ঠেলে দেয়। এমনকি স্বামী জীবিত থাকলেও—দুই পক্ষের সন্তানদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সম্পদের ওপর অধিকার নিয়ে টানাপোড়েন, এবং “কে বেশি প্রিয়/কে বেশি পাবে”—এই ধরনের বিষাক্ত তুলনা পরিবারে ন্যূনতম স্থিতি পর্যন্ত ভেঙে দেয়।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক স্তরে ক্ষতিটা প্রায়শই নারীদের ওপর গিয়ে পড়ে। শরীয়াহতে ‘ইনসাফ’ (ন্যায়বিচার) বাধ্যতামূলক বলা হলেও, বাস্তবে গোপনীয়তার পরিবেশে সময়, মনোযোগ, এবং অর্থনৈতিক সম্পদের সমবণ্টন কার্যত অসম্ভব হয়ে যায়। কারণ “সমবণ্টন” মানে কেবল খরচের হিসাব নয়—এটা মানে মানসিক উপস্থিতি, দৈনন্দিন যত্ন, সন্তান পালনের শ্রম, এবং সামাজিক সুরক্ষাও ভাগ করে দেওয়া। কিন্তু যখন সিদ্ধান্তটাই গোপনে নেওয়া হয়েছে, তখন সমতার প্রতিশ্রুতি একটি ফর্মাল বাক্য হয়ে দাঁড়ায়; আর বাস্তবে প্রথম স্ত্রীর জীবনে আসে অবহেলা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, এবং মর্যাদাহানি। বহু ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ের পর প্রথম স্ত্রীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কমে যায়—কারণ পরিবারের সম্পদ ভাগ হয়, দায়িত্ব বাড়ে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে না।

আরও বড় সমস্যা হলো—এই কাঠামো পরিবারকে “স্বচ্ছতার ওপর দাঁড়ানো সামাজিক ইউনিট” না বানিয়ে, “গোপনীয়তার ওপর টিকে থাকা ক্ষমতার ব্যবস্থা” বানায়। ফলে পরিবার সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গা ভেঙে পড়ে, এবং সম্পর্কগুলো একটি স্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে যায়। যেখানে স্বচ্ছতা নেই, সেখানে ন্যায়বিচারও টেকসই হয় না—কারণ ন্যায়বিচার পরিমাপ করতে হলে প্রথমে সত্যটা জানা লাগবে। গোপনীয়তা তাই কেবল নৈতিক সমস্যা নয়; এটি নীতিগতভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ‘ইনসাফ’ কথাটি উচ্চারিত হলেও তার বাস্তব ভিত্তি ধ্বসে পড়ে।


আধুনিক আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা

এই বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির কারণেই বিশ্বের বহু মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বহুবিবাহের প্রশ্নে “ধ্রুপদী অনুমতি”কে সরাসরি গ্রহণ না করে আইনগত সংস্কারের পথে গেছে। তিউনিসিয়া ও তুরস্ক বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে; মরক্কোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপিত; পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের মুসলিম ফ্যামিলি লজ অর্ডিন্যান্স অনুসারে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি এবং সালিশি পরিষদের অনুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ দণ্ডনীয় (Wikipedia, Legality of Polygamy)। এই সংস্কারগুলো আসলে একটি মৌলিক নীতিগত স্বীকৃতি: “আইনি বৈধতা” থাকা মানেই সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত হওয়া নয়; বরং ন্যায্যতার জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, এবং দুর্বল পক্ষের সুরক্ষা দরকার।

কেউ কেউ এসব সংস্কারকে “আধুনিকতার চাপ” বা “পশ্চিমা মানদণ্ড” বলে খাটো করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে আইনগত সংস্কারের যুক্তিটা খুব সরল: যখন একটি বিধান ধারাবাহিকভাবে ক্ষতি, অস্থিরতা এবং বৈষম্য তৈরি করে, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা—বিশেষ করে যেখানে ক্ষতির ভার গিয়ে পড়ে কাঠামোগতভাবে দুর্বল পক্ষের ওপর। বহুবিবাহকে অনিয়ন্ত্রিত রেখে দিলে যে ধরনের পরিবার-ভাঙন, উত্তরাধিকার-সংঘাত, মানসিক আঘাত এবং অর্থনৈতিক শোষণ ঘটে—সেগুলো শেষ পর্যন্ত সমাজের ওপরও বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই “নিয়ন্ত্রণ/অনুমতি-শর্ত/শাস্তি”—এসবকে কেবল আইনি টেকনিক্যালিটি নয়, বরং সামাজিক ক্ষতি কমানোর বাস্তব হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত।

ধর্মীয় টেক্সটের ভেতর থেকেই ন্যায্যতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্বও ধরা পড়ে। কুরআনের সুরা আন-নিসা (৪:৩) আয়াতে বহুবিবাহের জন্য ‘ইনসাফ’-এর শর্ত আরোপিত, কিন্তু একই সুরার ৪:১২৯ আয়াতে স্বীকার করা হয়েছে যে স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ন্যায়বিচার করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এই দুই আয়াতকে পাশাপাশি রাখলে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আসে: যে শর্তকে কেন্দ্র করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, সেই শর্ত পূরণ করাই যদি মানবিকভাবে অসম্ভব—তবে “অনুমতি” কার্যত কীভাবে ন্যায্য হতে পারে? সংস্কারবাদী ব্যাখ্যায় এই টানাপোড়েনকে বহুবিবাহ নিরুৎসাহিত করার যুক্তি হিসেবে দেখা হয় এবং একগামিত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার নৈতিক পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ, ‘ইনসাফ’কে যদি সত্যিই নীতিগত কেন্দ্র ধরা হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন, এবং সম্মতি-শর্ত আরোপ করা—সেই ন্যায়বিচারের নীতির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাঁড়ায়।

বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘ইনসাফ’ বজায় রাখা আরও কঠিন: জীবনযাত্রার ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা-চিকিৎসা খরচ, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ, এবং সম্পর্কের আধুনিক প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে “একাধিক সংসার” চালানো মানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একাধিক পক্ষের ওপর অবিচার অনিবার্য করা। তাই সংস্কারের যৌক্তিকতা কেবল নৈতিক তর্কে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাস্তব জীবনের হিসাব। স্বচ্ছতা, সম্মতি, এবং রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের মতো শর্তগুলো মূলত একটাই কাজ করে—ক্ষমতার একতরফা অপব্যবহার কমায়, এবং গোপনীয়তার আড়ালে যে ক্ষতি তৈরি হয়, সেটাকে দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক করে।


উপসংহার

শরীয়াহর ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নেওয়া এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে তথ্য গোপনের সুযোগ লিঙ্গবৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে। এটি পুরুষকে একতরফা ক্ষমতা প্রদান করে নারীর মানবিক মর্যাদা, স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার অধিকারকে অস্বীকার করে। আধুনিক সভ্যতায় সম্মতি ও স্বচ্ছতা মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃত হলে এই প্রাচীন বিধানগুলোর পুনর্বিবেচনা ও সংস্কার অপরিহার্য—কারণ এখানে প্রশ্ন “প্রথা বনাম আধুনিকতা” নয়; প্রশ্ন হলো ন্যায়বিচার বনাম বৈষম্য, স্বচ্ছতা বনাম প্রতারণামূলক গোপনীয়তা, এবং সমান মানুষ হিসেবে মর্যাদা বনাম একতরফা কর্তৃত্ব।


তথ্যসূত্রঃ
  1. IslamQA, Fatwa No. 115751 ↩︎
  2. IslamWeb, Fatwa No. 257119 & 326536 ↩︎
  3. ইসলামে বহুবিবাহের উৎসাহ প্রদান ↩︎
  4. তালাক দেয়ার অধিকার স্বামীর ↩︎
  5. It is more appropriate not to conceal second marriage from first wife ↩︎
  6. A man is not obligated to inform his wife about second marriage ↩︎
  7. Al-Krenawi, 2013; Shepard, 2021; Bahari et al., 2021 ↩︎
  8. Do You Have to Tell Your Second Wife that You Are Married? ↩︎