Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামি শরিয়তের একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হলো ‘হালাল’ ও ‘হারাম’-এর বিভাজন। এটিই মূলত ইসলামে বিশ্বাসীদের নৈতিকতার ভিত্তি যে, কোন বিষয়টি আল্লাহ তাদের জন্য হালাল করেছেন আর কোনটি হারাম। ইসলামে বিশ্বাসীদের দাবি অনুযায়ী, এই বিধানগুলো একাধারে ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা এবং মানব কল্যাণের চূড়ান্ত প্রতিফলন। তবে এই দাবির মূলে এক গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) সংকট বিদ্যমান। হালাল-হারাম কি কোনো বস্তুনিষ্ঠ ‘ভালো-মন্দের’ ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত, নাকি এগুলো স্রেফ একজন অতিপ্রাকৃত সত্তার অনিয়ন্ত্রিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ? যদি এই বিধানগুলো মানব কল্যাণের জন্যই হয়ে থাকে, তবে কেন অনেক ক্ষেত্রে এর যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না? এই প্রবন্ধে হালাল-হারাম নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে ধর্মতাত্ত্বিক উৎস ও যুক্তিবিদ্যার নিরিখে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।
ডিভাইন কমান্ড থিওরি ও ইউথিফ্রো ডিলেমা
হালাল-হারাম নির্ধারণের মূল ভিত্তি বুঝতে গেলে আমাদের ‘ডিভাইন কমান্ড থিওরি’ (Divine Command Theory) বুঝতে হবে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়: কোনো কিছু কি ‘ক্ষতিকর’ বলেই আল্লাহ হারাম করেছেন, নাকি আল্লাহ ‘হারাম’ করেছেন বলেই তা ক্ষতিকর?
যদি দাবি করা হয় যে কোনো বিষয় ‘ক্ষতিকর’ বলেই তা হারাম করা হয়েছে, তবে ধর্মতত্ত্ব একটি গভীর সংকটে পড়ে। এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘ক্ষতি’ বা ‘উপকার’ এমন একটি বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা যা স্রষ্টার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, বরং স্রষ্টাই সেই প্রাকৃতিক নিয়মের (Natural Law) অধীন। যদি কার্যকরণ বা Causality স্রষ্টার ঊর্ধ্বে স্থান পায়, তবে স্রষ্টা আর সর্বশক্তিমান থাকেন না। উপরন্তু, যদি মানুষের বিচারবুদ্ধি বা বিজ্ঞানের মাধ্যমেই কোনো কিছুর ক্ষতিকারক দিক নির্ণয় করা সম্ভব হয়, তবে সেখানে আলাদা করে ‘ওহী’ বা ঐশ্বরিক বার্তার কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। এক্ষেত্রে ধর্ম স্রেফ একটি সাধারণ স্বাস্থ্যবিধিতে পরিণত হয়, যা বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের কাছে তার অলৌকিক শ্রেষ্ঠত্ব হারায়।
বিপরীতভাবে, ইবনে হাজমের মতো কট্টরপন্থি ধর্মতাত্ত্বিকরা মনে করেন, আল্লাহ কোনো কারণ বা যুক্তি ছাড়াই যা ইচ্ছা হারাম করতে পারেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি নৈতিকতাকে একটি যৌক্তিক ভিত্তি থেকে সরিয়ে স্রেফ ‘অন্ধ আনুগত্যে’ রূপান্তর করে। একে দর্শনের ভাষায় Divine Command Theory বলা হয়। এর ফলে ‘ভালো’ বা ‘মন্দের’ নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব থাকে না; বরং যা আজ ভালো, তা কাল স্রষ্টার মর্জিতে মন্দ হতে পারে। এই ব্যবস্থায় নৈতিকতা কোনো শাশ্বত মানদণ্ড নয়, বরং এটি একজন পরম শাসকের স্বেচ্ছাচারী মর্জিতে পরিণত হয়। এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে রুদ্ধ করে তাকে কেবল আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
“স্বেচ্ছাচারী আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন” – অর্থ
ইসলামে নৈতিকতার ভিত্তি কী, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কথা মনে রাখতে হবে। আল্লাহ সবকিছুর মালিক,তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই হয়। এই ইচ্ছা করার ক্ষেত্রে তিনি কী সম্পূর্ণ স্বাধীন, নাকি যুক্তির অধীন? অর্থাৎ, কোন একটি কাজ যদি খারাপ না হতো, আল্লাহ কী যুক্তির বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র তার ইচ্ছা অনিচ্ছার ভিত্তিতে সেটি হারাম করতে পারতেন? বা ধরুন কোন একটি কাজ যৌক্তিকভাবে খারাপ। আল্লাহ কী সেটি চাইলেই হালাল করতে পারতেন? আল্লাহর কী এই বিষয়ে স্বেচ্ছাচারিতা বা সার্বোভৌমত্ব রয়েছে? এখানে যুক্তি প্রাধান্য পায় নাকি আল্লাহর ইচ্ছা?
ইসলামে আল্লাহর এইসব বিধানের পেছনে যুক্তি থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে। ইসলামে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়কে হারাম করার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, আবার অনেক কিছুর ক্ষেত্রে কোন কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সারা পৃথিবীর ইসলামে বিশ্বাসী মানুষেরা বিশ্বাস করে, যেগুলোর কারণ উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর কারণ তো জানা গেলই; আর যেগুলোর কারণ আল্লাহ বা নবী উল্লেখ করেনি, সেগুলোও আসলে খারাপ বলেই আল্লাহ বা নবী হারাম করেছে, আমরা শুধুমাত্র তার কারণ জানি না। কারণ আমাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ।
সমস্যা হচ্ছে, এটি সত্য বলে মেনে নিলে এটি মানতে হবে যে, আল্লাহ যুক্তির অধীন। অর্থাৎ অযৌক্তিক কোন কিছু ইচ্ছা করা আল্লাহর পক্ষে সম্ভব নয়। এবারে আসুন একটি হাদিস পড়ি। এই হাদিসে আল্লাহ বলছেন যে, তাকদীরের বিষয়াদি আল্লাহ নির্ধারণ করে রাখেন কারো পরোয়া না করেই। আল্লাহ সদম্ভে ঘোষণা করেন, তিনি কারোরই পরোয়া করেন না, যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই করেন [1]

পরিস্থিতির শিকার হয়ে ‘হারাম’ হওয়া: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ
ইসলামের হালালা হারামের বিধানটি ভালভাবে বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে, ইসলামি উৎস থেকেই ‘হারাম’ বিধানের আকস্মিকতা ও অনির্দিষ্টতা। এই প্রসঙ্গে নিচের হাদিসটি পড়া এবং বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসুন হাদিসটি পড়ি। হাদিসটিতে বলা হয়েছে যে, কিছু মুসলিমের অতিরিক্ত এবং হয়তো নবীর কাছে কিছু বিরক্তিকর প্রশ্নের কারণে নবী কিছু বিষয়কে হারাম ঘোষণা করেছিলেন। হাদিসটিতে বেশি বেশি প্রশ্ন করাকে অপছন্দনীয় বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে বেশি বেশি প্রশ্ন করা। তর্কের খাতিরে ধরেই নিচ্ছি যে, নবীকে যেসব প্রশ্ন করে বিরক্ত করা হয়েছিল সেগুলো খুবই উদ্ভট প্রশ্ন ছিল। কিন্তু হাদিসের পরের অংশে লেখা রয়েছে যে, এইসব প্রশ্নের কারণে নবী কিছু কিছু জিনিস হারাম করে দিয়েছিলেন। এবং সেই সকল জিনিস হারাম করার কারণ হিসেবে নবী সেইসব প্রশ্নকারীকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, এদের বেশি বেশি প্রশ্নের কারণেই ঐ বিষয়গুলো হারাম করে দেয়া হল। অর্থাৎ, সেইসব বিষয়ে ঐসব মুসলিম প্রশ্ন না করলে, নবীকে প্রশ্ন করে বিরক্ত না করলে, সেগুলো নবী হারাম করতেন না। সেগুলো আগে হালালই ছিল, পরেও হালালই থাকতো। শুধুমাত্র ঐসব বিরক্তিকর (নবীর কাছে) প্রশ্নের কারণেই সেগুলো হারাম হয়ে গেল! খুব অদ্ভুত বিষয়। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করুন। এই হাদিসের মধ্যে নৈতিকতার আলোচনায় বিশাল এক দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে [2]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৯৬/ কুরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে ধরে থাকা
পরিচ্ছেদঃ ৯৬/৩. বেশি বেশি প্রশ্ন করা এবং অকারণে কষ্ট করা নিন্দনীয়।
এবং আল্লাহর বাণীঃ তোমরা সেসব বিষয়ে প্রশ্ন করো না, যা প্রকাশিত হলে তোমরা দুঃখিত হবে। (সূরাহ আল-মায়িদাহ ৫/১০১)
৭২৮৯. আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলিমদের সর্বাপেক্ষা বড় অপরাধী ঐ লোক যে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করে যা আগে হারাম ছিল না, কিন্তু তার প্রশ্ন করার কারণে তা হারাম করা হয়েছে। [মুসলিম ৪৩/৩৭, হাঃ ২৩৫৮, আহমাদ ১৫৪৫] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৭৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬৭৯১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ)
আসুন এবারে হাদিসটির ব্যাখ্যা পড়ে নেয়া যাক, [3] –
সহজ তরজমা
৬৮১২. আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ মুকরী রহ. ….. আবু ওয়াক্কাস রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী সেই ব্যক্তি যে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করে যা পূর্বে হারাম ছিল না। কিন্তু তার প্রশ্নের কারনে তা হারাম হয়ে গেছে।
সহজ তাহকীক ও তাশরীহ
তরজমাতুল বাবের সাথে হাদীসের মিল: তরজমাতুল বাবের ২য় অংশের হাদীসের সাথে মিল সুস্পষ্ট।
হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি এখানে বুখারী শরীফ: ১০৮২ পৃঃ। মুসলিম শরীফ : فضائل النبي صلى الله عليه
سلم, অধ্যায়। আবু দাউদ শরীফ । অধ্যায়।
তাশরীহ: যেহেতু মূল জিনিস সমূহে বৈধতা রয়েছে, তাই যতক্ষণ পর্যন্ত কোন জিনেসের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হয়নি, ততক্ষণ পর্যন্ত তা জায়েয ছিল। এমন সময় কেউ সেই জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল আর তার হুকুম (বিধান) বর্ণনা করে দেওয়া হলো যে, তা নিষিদ্ধ এবং নাজায়েয। যার ফলে লোকেরা সংকীর্ণতায় পড়ে গেল। এই জন্য রেসালাতের যুগে অর্থাৎ, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার যুগে লোকেরা কোন জিনিসের বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা না করাটাই রীতি ছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা না আসত, ততক্ষণ পর্যন্ত এর উপর আমল করত। কিন্তু বর্তমানে যখন দীন পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেছে, হালাল হারাম নির্ধারিত, নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, তাই এখন মুসলমানদের জন্য ফারায়েজ ও ওয়াজিব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়া অত্যাবশ্যক।

এই ঘটনাটি থেকে প্রমাণিত হয় যে:
ইসলামি শরিয়তের অনেক ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ বিধানের মূলে কোনো মহাজাগতিক নৈতিকতা বা বৈজ্ঞানিক কারণের চেয়ে নবির সাময়িক মেজাজ, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা তৎকালীন পরিস্থিতির প্রভাব বেশি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বা নবির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কোনো বিষয়কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, এই বিধানগুলো কোনো পূর্বনির্ধারিত ঐশ্বরিক ব্লু-প্রিন্ট নয়, বরং নবির মানবিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার একটি সম্প্রসারিত রূপ। যখন আইন প্রণেতার সাময়িক মনস্তত্ত্ব একটি স্থায়ী আইনের জন্ম দেয়, তখন তার ‘ডিভাইন’ বা ঐশ্বরিক দাবিটি অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
ধর্মীয় ভাষ্য অনুযায়ী, যদি অনুসারীরা প্রশ্ন না করত, তবে অনেক বিষয় হয়তো কখনোই ‘হারাম’ হতো না। এই ‘যদি’ এবং ‘তবে’-র যুক্তিটি ঐশ্বরিক আইনের ‘শাশ্বত’ (Eternal) হওয়ার দাবির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। একটি শাশ্বত আইন মানুষের প্রশ্নের ওপর নির্ভর করে সৃষ্টি হতে পারে না। এটি প্রমাণ করে যে, এই আইনগুলো কোনো মহাজাগতিক মাস্টারপ্ল্যান নয়, বরং সপ্তম শতাব্দীর আরবীয় প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত কিছু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। প্রশ্ন না করলে যা বৈধ থাকত, প্রশ্ন করার কারণে তা নিষিদ্ধ হওয়া—এই বিবর্তনটি নির্দেশ করে যে, বিধানগুলো সময়ের প্রয়োজনে মানুষের হাতে বা মানুষের আচরণের প্রভাবে তৈরি হয়েছে, কোনো অলৌকিক উৎস থেকে নয়।
স্বাস্থ্যগত যুক্তির অসারতা ও ‘চেরি-পিকিং’
ইসলামি প্রচারকরা প্রায়ই দাবি করেন যে, হারাম বস্তুগুলো (যেমন শূকরের মাংস বা অ্যালকোহল) মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বলেই নিষিদ্ধ। কিন্তু এই যুক্তিটি অত্যন্ত সিলেক্টিভ বা খণ্ডিত।
যদি শারীরিক ক্ষতিই কোনো কিছু ‘হারাম’ হওয়ার একমাত্র মানদণ্ড হতো, তবে চিনি (Sugar), ট্রান্স-ফ্যাট বা আধুনিক প্রসেসড ফুড অনেক আগেই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত ছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক প্রাণঘাতী সমস্যার মূল কারণ। অথচ ধর্মীয় বিধানে অতিরিক্ত মিষ্টান্ন খেয়ে অসুস্থ হওয়া ব্যক্তিকে ‘পাপিষ্ঠ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না। বিপরীতে, সামান্য মদ বা শূকরের মাংস স্পর্শ করলেই ব্যক্তিকে চরম ধর্মীয় অবমাননা ও ‘পাপী’ সাব্যস্ত করা হয়। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, হারামের সংজ্ঞায় ‘মানব কল্যাণ’ বা ‘শারীরিক ক্ষতি’ কোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট কিছু আঞ্চলিক সংস্কৃতি বা ট্যাবু বা সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি চেরি-পিকিং ব্যবস্থা।
ধর্মীয় প্রচারকরা প্রায়ই নিষেধাজ্ঞার সপক্ষে বিজ্ঞানের দোহাই দেন, অথচ বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে অনেক নিষিদ্ধ জিনিসের নিরাপদ ব্যবহার ও বিকল্প আবিষ্কৃত হয়েছে (যেমন উন্নত স্বাস্থ্যবিধিতে শূকর পালন)। বিজ্ঞানের স্বভাব হলো পরিবর্তন ও সংশোধনের মাধ্যমে কল্যাণ নিশ্চিত করা, কিন্তু ধর্মীয় বিধান হাজার বছরের পুরনো এক জড় ধারণায় আটকে আছে। এটি স্পষ্ট করে যে, এই বিধানগুলোর ভিত্তি কোনো বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা নয়, বরং সপ্তম শতাব্দীর সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও প্রাচীন সংস্কার। যখন কোনো আইন নতুন তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিজেকে সংশোধন করতে পারে না, তখন তা প্রমাণের পরিবর্তে অন্ধ বিশ্বাসের ছাঁচে তথ্য সাজানোর একটি চেষ্টা মাত্র ।
উটের উপমা এবং চিন্তার অবদমন
ইসলামি সাহিত্যে মুমিনদের ‘নাসিয়াহ’ বা নাকে দড়ি দেওয়া উটের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে তার মালিকের নির্দেশের বাইরে এক পা-ও নড়ে না [4]। হালাল-হারাম বিধানের মূল মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য হলো এই ‘অন্ধ আনুগত্য’ তৈরি করা। নিজের জ্ঞান বুদ্ধি মেধা ব্যবহার করে কোনটি ভাল আর কোনটি মন্দ এই বিচার বিশ্লেষণ, যাচাই প্রক্রিয়া, তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষানিরীক্ষা ইত্যাদি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ধর্মীয় অনুশাসন যখন প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করে, তখন তা মানুষের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতাকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ওজুর বিধানে দেখা যায়—নখ কাটলে পবিত্রতা নষ্ট হয় না, অথচ মলদ্বার দিয়ে বায়ু নির্গত হলে মুখ ও হাত ধোয়ার মাধ্যমে পুনরায় পবিত্র হতে হয়। এই ধরনের কার্যকরণহীন (Non-causal) আচারগুলো পালনের মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করা হয় যাতে সে ‘কেন’ প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। যখন একজন ব্যক্তি যুক্তির বদলে স্রেফ আদেশের দাসত্ব করে, তখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় এবং সে একটি যন্ত্রবৎ অস্তিত্বে পরিণত হয়, যা যে কোনো অযৌক্তিক বিষয়কে সত্য বলে মেনে নিতে দ্বিধা করে না।
ধর্মীয় ব্যবস্থা নৈতিকতাকে একটি সামাজিক চুক্তির পরিবর্তে ‘শাস্তির ভয়’ এবং ‘পুরস্কারের লোভ’-এর বিষয়ে পরিণত করে। এখানে ভালো কাজ করা হয় জান্নাতের লোভে এবং খারাপ কাজ বর্জন করা হয় জাহান্নামের আগুনে পোড়ার আতঙ্কে। এর ফলে মানুষের সহজাত বিচারবোধ বা সহমর্মিতা (Empathy) গৌণ হয়ে পড়ে এবং স্রেফ ‘বইয়ের আইন’ বা টেক্সট বুক মোরালিটি মুখ্য হয়ে ওঠে। নৈতিকতা যখন স্রেফ একটি লেনদেনে পরিণত হয়, তখন মানুষের নিজস্ব বিবেক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলস্বরূপ, কোনো কাজ অন্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও যদি তা কিতাবে বৈধ থাকে, তবে একজন ধার্মিক ব্যক্তি অবলীলায় তা করতে পারে, কারণ তার নৈতিকতার উৎস মানবিক বিবেক নয় বরং প্রাচীন কিছু নথিপত্র।
উপসংহার
সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, হালাল-হারামের এই জটিল কাঠামোটি কোনো সার্বজনীন নৈতিক বা বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না। এটি মূলত একটি ‘বদ্ধ ব্যবস্থা’ (Closed System), যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে খর্ব করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর উৎসগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে কাজ করেছে তৎকালীন নবির ব্যক্তিগত বিরক্তি, আরব্য সংস্কৃতি এবং ইহুদি কোশার আইনের অনুকরণ। হালাল-হারাম কোনো স্বর্গীয় প্রজ্ঞা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রীতদাসে পরিণত করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আধুনিক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্বে এই ধরনের অযৌক্তিক বিধানের আর কোনো উপযোগিতা নেই।
তথ্যসূত্রঃ
- মিশকাতুল মাসাবীহ ( মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৭২৮৯ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী শরহে সহীহ বুখারী, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১৩৭ ↩︎
- মুমিন হচ্ছে নাকে দড়ি বাধা উট ↩︎
