Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 বিধানমূলক আইন (Prescriptive Law) বনাম বর্ণনামূলক নিয়ম (Descriptive Law)
- 3 প্রকৃতির “আইন” ধারণার ইতিহাস: কেন “Law” শব্দটা চালু হলো
- 4 “আইন” বনাম “ধর্ম/স্বভাব”: কেন এটাকে ‘আরোপিত আদেশ’ ভাবা ভুল
- 5 ল-গিভার যুক্তির যৌক্তিক ত্রুটি: Equivocation + Category mistake + Circularity
- 6 উদাহরণ ১: পানির অবস্থার পরিবর্তন—“আদেশ” নয়, আণবিক গঠন
- 7 উদাহরণ ২: ট্রাফিক আইন বনাম অভিকর্ষ—“মানা/না-মানা”র প্রশ্নই ওঠে না
- 8 উদাহরণ ৩: “আইন” বদলায় কীভাবে—নিউটন থেকে আইনস্টাইন
- 9 স্বতঃস্ফূর্ত নিয়ম, সম্ভাব্যতামূলক আইন, এবং কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা
- 10 জটিল শৃঙ্খলা কি আইনদাতা ছাড়াই গঠিত হতে পারে? বিবর্তনীয় উদাহরণ
- 11 আরও কিছু সহজবোধ্য উদাহরণ
- 12 উপসংহার
ভূমিকা
প্রাকৃতিক নিয়ম বা বৈজ্ঞানিক “আইন” (Laws of Nature)–কে মানুষের তৈরি আইনি বিধানের মতো বিধান (যা কেউ “আরোপ” করেছে এবং প্রকৃতিকে “মানতে হবে”)—এই অর্থে ধরে নেওয়া একটি প্রচলিত যুক্তিগত বিভ্রান্তি। দর্শনের ভাষায় এটি সাধারণত Equivocation Fallacy (শব্দের দ্ব্যর্থকতা-জনিত ভ্রান্তি): একই শব্দ “আইন” একবার বিধানমূলক আইন (Prescriptive Law) অর্থে এবং আরেকবার বর্ণনামূলক বৈজ্ঞানিক আইন (Descriptive Law) অর্থে ব্যবহার করে এমন সিদ্ধান্ত টানা হয় যা প্রকৃতপক্ষে যৌক্তিক পদ্ধতিকে অনুসরণ করে না। [1]
আস্তিক্যবাদী/থিয়িস্টিক আলোচনায় অনেক সময় “ল” শব্দের ওপর ভর করে “ল-গিভার” বা আইনদাতার অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা দেখা যায়—যেমন: “যেখানে আইন আছে, সেখানে আইনদাতা আছে; প্রকৃতিতেও আইন আছে; অতএব প্রকৃতিরও আইনদাতা আছে।” এই যুক্তির কেন্দ্রে আছে ভাষাগত রূপককে আক্ষরিক সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া এবং বিজ্ঞানের “আইন” ধারণাকে ভুলভাবে নৈতিক-আইনি কাঠামোর সাথে একাকার করা। বিজ্ঞানের দর্শন বা ফিলসফি-অব-সায়েন্সে ‘laws of nature’ ধারণা নিয়ে বিস্তৃত বিতর্ক আছে, কিন্তু সেই বিতর্কের কোন অবস্থান থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে “ব্যক্তিসত্তা হিসেবে আইনদাতা” অনিবার্যভাবে বেরিয়ে আসে—এটি আলাদা প্রমাণ দাবি করে, অর্থাৎ প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক নিয়মাবলী থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। [2]
নিম্নে বিষয়টি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো—ভাষাগত বিভ্রান্তি কোথায়, বৈজ্ঞানিক আইন কী অর্থে “আইন”, এবং “ল-গিভার” যুক্তিটি ঠিক কোন জায়গায় লজিক্যালি ভেঙে পড়ে।
বিধানমূলক আইন (Prescriptive Law) বনাম বর্ণনামূলক নিয়ম (Descriptive Law)
মানুষের তৈরি আইন এবং প্রাকৃতিক নিয়মের পার্থক্য কেবল “বিষয়” (মানুষ বনাম প্রকৃতি) নয়—এদের কার্যপ্রকৃতি, উদ্দেশ্য, এবং ব্যর্থ হলে কী ঘটে—সবকিছু ভিন্ন।
- বিধানমূলক আইন (Prescriptive Law): সমাজ/রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বানানো নিয়ম। এটি নির্দেশ দেয় কী করা উচিত/অনুচিত (যেমন: “চুরি করা অপরাধ”)। আইন ভাঙা সম্ভব; ভাঙলে শাস্তি হয়। আইনদাতা (পার্লামেন্ট/রাজা/রাষ্ট্র) এখানে ধারণাগতভাবেই অন্তর্নিহিত।
- বর্ণনামূলক নিয়ম (Descriptive Law): বিজ্ঞানে “আইন” বলতে বোঝায় প্রকৃতিতে দেখা নিয়মতান্ত্রিকতা/ধারাবাহিকতা–যা আমরা পর্যবেক্ষণ করে কিছু প্যাটার্ন লিপিবদ্ধ করি এবং ভবিষ্যতের জন্য সেই লিখিত প্যাটার্ন ব্যবহার করি। এরই সংক্ষিপ্ত রূপ প্রায়শই থাকে গাণিতিক, বা বৈজ্ঞানিক বর্ণনা। এটি প্রকৃতিকে “আদেশ” দেয় না; বরং প্রকৃতি যেভাবে আচরণ করে, আমরা সেটাকে মডেল/সমীকরণে নিয়ে আসি, যেন সেই প্যাটার্নকে ব্যবহার করে আমরা সত্যকে আরও ভালভাবে বুঝতে পারি। [3]
উদাহরণ (আরও স্পষ্টভাবে): “লাল বাতি জ্বললে থামতে হবে”—এটি মানুষকে উদ্দেশ্য করে বানানো বিধান। কেউ থামল না—তাতেও নিয়ম “ভুল” প্রমাণিত হয় না; বরং ব্যক্তি শাস্তি পায়। কিন্তু “গ্যাসের চাপ-আয়তন-তাপমাত্রার সম্পর্ক” (ideal gas law) বা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র—এসব আসলে নির্দিষ্ট শর্তে প্রকৃতির আচরণকে বর্ণনা করা মডেল। শর্ত বদলালে/নতুন পর্যবেক্ষণ এলে মডেল সংশোধিত হয়। [4]
অর্থাৎ, “আইন আছে → আইনদাতা আছে”—এই নিয়মটি মানুষের বিধানমূলক আইনের ক্ষেত্রে সংজ্ঞাগতভাবে সত্য হতে পারে; কিন্তু প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক ল বা আইনের ক্ষেত্রে “আইন” শব্দটি একই অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না, কেউ যদি শব্দের মারপ্যাঁচে একই অর্থ তৈরি করে তবে তা হবে equivocation। [5]
প্রকৃতির “আইন” ধারণার ইতিহাস: কেন “Law” শব্দটা চালু হলো
“Law of nature” শব্দবন্ধের ঐতিহাসিক পটভূমিতে ধর্মতাত্ত্বিক/থিওলজিক্যাল ভাষার ছাপ ছিল—প্রারম্ভিক আধুনিক ইউরোপে অনেক বিজ্ঞানী-দার্শনিক প্রকৃতিকে “ঈশ্বরের বিধান”–এর ভাষায় ব্যাখ্যা করতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। উদাহরণ হিসেবে রবার্ট বয়েলের লেখায় “Mechanical Laws” এবং সেগুলোর সাথে ঈশ্বর-প্রকৃতি সম্পর্ক নিয়ে আলাদা আলোচনা আছে। [6]
এছাড়া নিউটনের সময়েও প্রকৃতি, গতি, ঈশ্বর—এইসব প্রসঙ্গ একই বুদ্ধিবৃত্তিক আবহে আলোচিত হয়েছে; “laws” শব্দটি তখনকার দর্শন-প্রকল্পের অংশ ছিল। [7]
কিন্তু আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞানে “law” শব্দটি মূলত রূপক হিসেবে পড়া হয়: “নিয়মিততা/প্যাটার্ন” (regularity/pattern)–এর সংক্ষিপ্ত নাম। এমনকি দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্ক থাকে—আইন কি কেবল নিয়মিততার বর্ণনা (Regularity view) নাকি “গভর্নিং” ধরনের কিছু (Necessitarian/Governing view)?—তবুও “আইনদাতা ব্যক্তি” যুক্তিটি আলাদা দাবি। [8]
“আইন” বনাম “ধর্ম/স্বভাব”: কেন এটাকে ‘আরোপিত আদেশ’ ভাবা ভুল
প্রাকৃতিক ঘটনাকে “আইন মেনে চলে” বলা দৈনন্দিন ভাষায় সুবিধাজনক, কিন্তু দার্শনিকভাবে এটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতির নিয়ম আসলে পদার্থের স্বভাব/ধর্ম (disposition/propensity) এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ফল। আগুন পুড়ায়—এটি যেন কোনো বাহ্যিক আদেশ পালন নয়; বরং দহন একটি ভৌত-রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যা অণু-পরমাণুর গঠন ও শক্তি বিনিময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো: বিজ্ঞান সাধারণত “কেন” প্রশ্নকে দুইভাবে দেখে—(ক) কার্যকারণ-যান্ত্রিক ব্যাখ্যা (mechanistic/causal explanation) এবং (খ) গাণিতিক-সংক্ষিপ্তকরণ (law-like generalization)। “আইন” প্রায়ই দ্বিতীয় ধরনের: এটি একটি কম্প্রেসড সারাংশ, প্রকৃতির উপর ঝুলে থাকা কোনো নৈতিক বিধান নয়। [9]
ল-গিভার যুক্তির যৌক্তিক ত্রুটি: Equivocation + Category mistake + Circularity
ল-গিভার যুক্তির জনপ্রিয় কাঠামোটা সাধারণত এমন:
- ১) যেখানে আইন আছে, সেখানে একজন আইনদাতা আছে।
- ২) প্রকৃতিতে আইন আছে (যেমন: মহাকর্ষ, তাপগতিবিদ্যা ইত্যাদি)।
- ৩) অতএব প্রকৃতিরও আইনদাতা আছে।
এই যুক্তিতে অন্তত তিনটি সমস্যা একসাথে কাজ করে:
- (ক) Equivocation: প্রথম প্রাঙ্গণে “আইন” মানে মানব-সমাজের বিধান; দ্বিতীয় প্রাঙ্গণে “আইন” মানে প্রকৃতির নিয়মিততার বর্ণনা। একই শব্দ, দুই অর্থ—এখান থেকেই প্রতারণাপূর্ণ অবৈধ লাফ। [10]
- (খ) Category mistake: আইনি-নৈতিক কাঠামোর ধারণা (অধিকার, কর্তব্য, শাস্তি, উদ্দেশ্য)–কে ভৌত জগতের বর্ণনায় বসিয়ে দেওয়া। যেমন, “মানুষের কর্তব্য দরিদ্রকে সাহায্য করা” এর মত করে বলা হয় “পাথরের কর্তব্য নিচের দিকে পড়ে যাওয়া”—এ ধরনের বাক্য ব্যাকরণগতভাবে সম্ভব হলেও দার্শনিকভাবে ক্যাটাগরি-ভুল। কারণ পাথরের ক্ষেত্রে সেরকম কোন কর্তব্য নেই। মধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে থাকলে পাথর নিচের দিকে যাবে, তার ক্ষেত্রে কর্তব্য শব্দটি প্রযোজ্য হয় না।
- (গ) Circularity/Presupposition: প্রাঙ্গণ (১) সাধারণীকরণ হিসেবে সত্য নয়—এটি কেবল মানুষের আইন প্রসঙ্গে সত্য। প্রাকৃতিক “আইন”–কে “আইন” নাম দেওয়াটাই যদি মানুষের ভাষাগত পছন্দ হয়, তবে ওই নামের ওপর ভর করে “আইনদাতা” বের করা কার্যত নামকরণের মধ্যে সিদ্ধান্ত ঢুকিয়ে দেওয়া। (এটা অনেক ক্ষেত্রে “begging the question”–এর কাছাকাছি চলে যায়।) [11]
উদাহরণ ১: পানির অবস্থার পরিবর্তন—“আদেশ” নয়, আণবিক গঠন
স্বাভাবিক বায়ুচাপে পানি ০°C তে বরফ হয় এবং ১০০°C তে বাষ্প হয়—এই তথ্যটা শুনে অনেকেই অবচেতনে ঘটনাটিকে “বিধান” হিসেবে কল্পনা করে বসে: যেন পানি কোনো অদৃশ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানছে—“এই তাপমাত্রায় জমাট বাঁধবে, ওই তাপমাত্রায় উড়ে যাবে।” কিন্তু এই কল্পনাটাই সমস্যার মূল: এখানে আমরা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাকে উল্টো দিকে হাঁটাচ্ছি। বিজ্ঞান প্রথমে “আদেশ” ধরে নিয়ে ঘটনা ব্যাখ্যা করে না; বরং ঘটনা যেভাবে ঘটে, তার কারণ-গঠন (mechanism) বের করে এবং সেই গঠন থেকে নিয়মিততা (regularity) বোঝায়।
পানির ক্ষেত্রে “কেন ০°C/১০০°C?”—এর উত্তর কোনো বাহ্যিক নির্দেশে নয়, পানির অণু (H2O)–এর গঠন ও তাদের পারস্পরিক আন্তঃক্রিয়ায়। পানি অণুটি বৈদ্যুতিকভাবে “মেরুবিশিষ্ট” (polar): একদিকে সামান্য ঋণাত্মক, অন্যদিকে সামান্য ধনাত্মক চার্জ-প্রবণতা থাকে। ফলে এক অণুর ধনাত্মক অংশ আরেক অণুর ঋণাত্মক অংশের দিকে টান অনুভব করে—এ থেকেই হাইড্রোজেন বন্ডিং নামে পরিচিত আকর্ষণ/আবদ্ধতার প্রবণতা তৈরি হয়।
এখন তাপমাত্রা কমালে কী ঘটে? তাপ কমা মানে অণুগুলোর গতিশক্তি কমে যায়—অণুগুলো কম দৌড়ায়, কম ধাক্কাধাক্কি করে, কম “ছুটোছুটি” করতে পারে। তখন হাইড্রোজেন বন্ডিং–এর টান তুলনামূলকভাবে “জিতে যায়” এবং অণুগুলো ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল, নিয়মিত জ্যামিতিক বিন্যাসে বসে যায়—এটাই বরফের স্ফটিক কাঠামো। বিপরীতভাবে, তাপ বাড়ালে অণুগুলোর গতিশক্তি বেড়ে যায়—তারা এত দ্রুত নড়াচড়া করে যে আকর্ষণবল ধরে রাখতে পারে না; বন্ডিং আলগা হয়ে যায় বা ভাঙার প্রবণতা বাড়ে; অণুগুলো কাছাকাছি থাকলেও আর “বাঁধা” থাকে না—তাই তারা স্বাধীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে, আমরা যাকে বাষ্প বলি।
খেয়াল করুন, এই ব্যাখ্যার কোথাও “পানিকে বাধ্য করা হলো” এমন কোনো বাহ্যিক বিধানের দরকার পড়েনি। এখানে যা আছে তা হলো: গঠন → আন্তঃক্রিয়া → নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট ফল। আমরা যে “আইন” বলি, সেটা আসলে এই ধারাবাহিকতার একটি সংক্ষিপ্ত নাম—একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য প্যাটার্নের গাণিতিক/ধারণাগত সারাংশ। অর্থাৎ “আইন” এখানে প্রকৃতির ঘাড়ে ঝুলে থাকা কোনো নৈতিক আদেশ নয়; বরং প্রকৃতির ভেতরের গঠনগত বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসা নিয়মিততা।
এই কথাটাই বোঝাতে জ্যামিতির উদাহরণটি অত্যন্ত কার্যকর। ইউক্লিডীয় জ্যামিতিতে “ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি ১৮০°”—এটি কোনো রাজার ফরমান বা সংসদের পাস করা আইন নয়। এটা সত্য, কারণ আমরা ত্রিভুজ কী, সরলরেখা কী, এবং সমান্তরাল রেখার নিয়ম—এসব সংজ্ঞা ও স্বীকার্য (axioms) ধরে একটি কাঠামো তৈরি করেছি, এবং সেই কাঠামোর ভেতরে ফলাফলটি অনিবার্যভাবে বেরিয়ে আসে। ঠিক তেমনভাবেই প্রকৃতির অনেক “law-like” সম্পর্কও—গঠন, মিথস্ক্রিয়া, এবং সীমা-শর্ত (boundary conditions)–এর ভাষায়—নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে যায়।
তাই “আইন আছে” মানে “আইনদাতা আছে”—এই লাফটা প্রায়ই কেবল রূপককে আক্ষরিক করে তোলা। পানির ক্ষেত্রে যদি আপনি “আইনদাতা” ঢুকিয়ে দেন, আপনি নতুন কোনো পরীক্ষাযোগ্য ব্যাখ্যা যোগ করেন না; আপনি শুধু একটি ভাষাগত চরিত্র (agent) বসিয়ে দেন। কিন্তু বিজ্ঞান যেটা চায় তা হলো: কোন গঠনগত কারণে, কোন শর্তে, কীভাবে ঘটনা ঘটে—এই “কীভাবে”–র ব্যাখ্যা। পানির অবস্থার পরিবর্তন দেখায়, প্রকৃতির তথাকথিত “আইন” আসলে আদেশ নয়—এগুলো পদার্থের স্বভাব ও গঠন থেকে জন্ম নেওয়া নিয়মিত আচরণের সংক্ষিপ্ত নাম মাত্র।
পানির অবস্থার পরিবর্তন: “আদেশ” নয়, আণবিক গঠন
বিজ্ঞান “কেউ আদেশ দিয়েছে” ধরে শুরু করে না—প্রথমে গঠন ও আন্তঃক্রিয়া (mechanism) বোঝে, তারপর সেখান থেকে নিয়মিততা (pattern) সংক্ষেপ করে “আইন” বলে।
ভুল ফ্রেম: “০°C/১০০°C তে পানি বদলায়, তাই কেউ নির্দেশ দিয়েছে।”
সঠিক ফ্রেম: পানি যেহেতু নির্দিষ্ট গঠনের, তাই নির্দিষ্ট শর্তে নির্দিষ্ট আচরণ দেখা যায়—আমরা সেটাকেই “আইন” বলে সংক্ষেপ করি।
H2O অণু + মেরুত্ব (Polarity)
পানি অণু একদিকে সামান্য ঋণাত্মক, অন্যদিকে সামান্য ধনাত্মক প্রবণতা তৈরি করে। তাই অণুগুলোর মধ্যে আকর্ষণ-ধর্মী সম্পর্ক তৈরি হওয়ার ভিত্তি থাকে।
- কী বোঝায়: “স্বভাব/ধর্ম” (intrinsic property)
- কী বোঝায় না: বাহ্যিক “আদেশ”
Hydrogen bonding (পারস্পরিক টান/আবদ্ধতা)
মেরুত্বের কারণে অণুগুলোর মধ্যে হাইড্রোজেন-বন্ডিং তৈরি হয়—কম তাপে এটি বেশি কার্যকর, বেশি তাপে অণুগুলোর নড়াচড়া বাড়লে এটি দুর্বল/ভাঙার প্রবণতা বাড়ে।
- কীভাবে কাজ করে: আকর্ষণ বনাম গতিশক্তি—দুইটার টানাপোড়েন
- ফল: একই পদার্থ, শর্ত বদলালে ভিন্ন অবস্থা
তাপমাত্রা বদলালে অবস্থা বদলায়
“আইন” এখানে আদেশ নয়—বরং গঠন ও আন্তঃক্রিয়া থেকে জন্ম নেওয়া নিয়মিত প্যাটার্ন। আমরা সেটাকে সংক্ষেপে বলি: ০°C তে বরফ, ১০০°C তে বাষ্প (স্বাভাবিক চাপ)।
গতিশক্তি কমে → অণুগুলো কম নড়ে → বন্ডিং “ধরে রাখে” → স্থিতিশীল জাল/কাঠামো
গতিশক্তি বাড়ে → অণুগুলো দ্রুত নড়ে → বন্ডিং দুর্বল/ভাঙে → অণু ছড়িয়ে পড়ে
এনালজি (ধারণা পরিষ্কার করতে)
ইউক্লিডীয় জ্যামিতিতে ত্রিভুজের কোণসমষ্টি = ১৮০° কোনো “কর্তৃপক্ষের আদেশ” নয়—
সংজ্ঞা ও কাঠামোর ভেতর থেকেই ফলাফলটি আসে। ঠিক তেমনই অনেক “law-like” সম্পর্কও
পদার্থের গঠন ও শর্ত থেকে বেরিয়ে আসে; “আইনদাতা” বসালে ব্যাখ্যার ক্ষমতা বাড়ে না—শুধু রূপককে আক্ষরিক করা হয়।
উদাহরণ ২: ট্রাফিক আইন বনাম অভিকর্ষ—“মানা/না-মানা”র প্রশ্নই ওঠে না
দুটি তুলনা করলে পার্থক্য চোখে পড়বে:
- ট্রাফিক আইন: লাল বাতি জ্বললে থামতে হবে—মানুষ মানতে পারে/না-ও মানতে পারে। না মানলে জরিমানা, লাইসেন্স পয়েন্ট কাটা, দুর্ঘটনা ঝুঁকি—এসব সামাজিক-নীতিগত ফল।
- অভিকর্ষ (Gravity): আপনি হাত থেকে বল ছাড়লে সেটা নিচে পড়ে—এটা বলের “নৈতিক অবাধ্যতা” বা “শাস্তি” নয়। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে মহাকর্ষকে স্থান-কালের জ্যামিতির (spacetime curvature) সাথে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করা হয়; বস্তু-শক্তি থাকলে সেই জ্যামিতি এমনভাবে বক্র হয় যে মুক্তভাবে চলা বস্তু “জিওডেসিক” পথে চলে—দেখতে তা “পড়ে যাওয়া” মনে হয়। [12]
খেয়াল করুন: ট্রাফিক আইনে “কর্তৃত্ব/উদ্দেশ্য/শাস্তি” কাঠামো অনিবার্য; অভিকর্ষে সেরকম কাঠামোই নেই। তাই “অভিকর্ষের আইন আছে → আইনদাতা আছে”—এটি শব্দের রূপককে বাস্তব নৈতিক-বিধানে রূপান্তর করার চেষ্টা।
উদাহরণ ৩: “আইন” বদলায় কীভাবে—নিউটন থেকে আইনস্টাইন
বৈজ্ঞানিক “আইন” বলতে আমরা যেটা বুঝি, সেটা আসলে প্রকৃতির আচরণকে বোঝানোর জন্য মানুষের বানানো একটা মডেল বা সংক্ষিপ্ত নিয়ম। এই কারণে বৈজ্ঞানিক “আইন”–এর একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো: নতুন তথ্য এলে এগুলো বদলাতে বা আরও উন্নত হতে পারে। বদলায় প্রকৃতি না—বদলায় প্রকৃতিকে বোঝানোর আমাদের “বর্ণনা”।
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র বহু পরিস্থিতিতে খুব ভালো কাজ করে—যেমন পৃথিবীতে পড়ন্ত বস্তু, সেতু-ভবনের হিসাব, বেশির ভাগ গ্রহ-উপগ্রহের সাধারণ কক্ষপথ ইত্যাদি। কিন্তু যখন আমরা খুব সূক্ষ্ম নির্ভুলতা চাই, বা খুব বড় ভর/তীব্র মহাকর্ষের কাছে যাই (যেমন সূর্যের খুব কাছে, নিউট্রন তারা/ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে), তখন দেখা যায় নিউটনের ব্যাখ্যায় ছোট ছোট ভুল জমতে থাকে। তখন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা (General Relativity) আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে—কারণ GR মহাকর্ষকে “দূর থেকে টান” হিসেবে না দেখে “স্থান-কালের বক্রতা” হিসেবে মডেল করে। [13]
এখন গুরুত্বপূর্ণ অংশটা হলো—এটা এমন নয় যে “নিউটন ভুল ছিল, আইনস্টাইন সত্য”—বরং অনেক ক্ষেত্রে দুটোই সত্যি কাজ করে, শুধু প্রয়োগের সীমা ভিন্ন। সহজভাবে বললে:
- দৈনন্দিন জীবনে, বা সাধারণ পরিস্থিতিতে নিউটনের সূত্র “খুব ভালো আনুমানিক” ফল দেয়।
- বিশেষ পরিস্থিতিতে (খুব শক্ত মহাকর্ষ/খুব নির্ভুল মাপ) GR আরও ভালো ফল দেয়।
এই জন্যই বলা হয়, আধুনিক দৃষ্টিতে নিউটন অনেক ক্ষেত্রে GR–এর একটি “লিমিটিং কেস”—মানে বিশেষ শর্তে GR থেকে নিউটনের মতো ফল পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায় “বৈজ্ঞানিক আইন” আসলে প্রকৃতির ওপর চাপানো কোনো স্থায়ী ফরমান নয়; এটি আমাদের সবচেয়ে ভাল বোঝার পদ্ধতি, যা সময়ের সাথে উন্নত হয়। ‘laws of nature’ নিয়ে দার্শনিকদের আলোচনাতেও এই প্রশ্নটাই থাকে—আইন কি জগতের কোনো “অলৌকিক বিধান”, নাকি আমাদের সেরা বর্ণনা-ব্যবস্থার ফল? [14]
স্বতঃস্ফূর্ত নিয়ম, সম্ভাব্যতামূলক আইন, এবং কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা
অনেকে মনে করেন, “সবকিছু যদি নিয়ম মেনে চলে, তাহলে নিশ্চয়ই কেউ সবকিছু আগেই ঠিক করে রেখেছে।” কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দেখায়—প্রকৃতির সব ঘটনা সবসময় কঠোরভাবে নির্ধারিত (একই কারণ হলে একই ফল অবশ্যই) এমন নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতি কাজ করে সম্ভাবনা (probability) দিয়ে।
এটা বোঝার সহজ উদাহরণ: ধরুন আপনি একটা পাশা (dice) ছুঁড়লেন। ফল ১–৬ যেকোনোটা হতে পারে। এখানে “আইন নেই” তা নয়। আইন/নিয়ম আছে: পাশা ঠিকঠাক হলে প্রতিটি ফলের সম্ভাবনা প্রায় সমান (১/৬)। অর্থাৎ আইনটা বলে দেয়—কোন ফল কত সম্ভাবনায় ঘটবে। কিন্তু একেকবার ছুঁড়লে কোন সংখ্যা উঠবে, সেটা আপনি আগেই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না।
কোয়ান্টাম তত্ত্বে (খুব ক্ষুদ্র জগতের পদার্থবিজ্ঞান) অনেক ঘটনাকে এভাবেই সম্ভাবনার ভাষায় বোঝানো হয়। মাপজোক (measurement) করলে ফলাফল কী হবে—এ নিয়ে মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন, অনিশ্চয়তা, এবং ব্যাখ্যার বিভিন্ন ধারা আছে। [15]
এখানে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটা হলো: “র্যান্ডমনেস/দৈবতা” মানেই “কোনো আইন নেই”—এটা ঠিক নয়। অনেক সময় আইন/তত্ত্ব খুব স্পষ্টভাবে বলে—ফলাফলগুলো কোন সীমার মধ্যে হবে এবং কোনটা কত সম্ভাবনায় হবে। তাই “law-like” বর্ণনা থাকতে পারে, কিন্তু সেটি “আদেশ-ধর্মী বিধান” নয়—এটি প্রকৃতির আচরণকে মডেল করে বোঝানোর উপায়। আর শুধু এই সম্ভাব্যতামূলক নিয়ম থাকলেই “ব্যক্তিগত আইনদাতা” অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তও লজিক্যালি আসে না; সেটি আলাদা করে প্রমাণ করতে হয়।
জটিল শৃঙ্খলা কি আইনদাতা ছাড়াই গঠিত হতে পারে? বিবর্তনীয় উদাহরণ
“জটিলতা দেখলেই ডিজাইনার”—এ ধরনের ভাবনার বিপরীতে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান দেখায় যে প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection)–এর মতো প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে সরল থেকে জটিল অভিযোজন তৈরি হতে পারে। এতে মূল উপাদান হলো: (১) জনসংখ্যায় বৈচিত্র্য (variation), (২) বৈশিষ্ট্যগুলোর উত্তরাধিকার (heritability), (৩) পরিবেশ-নির্ভর সাফল্য/ফিটনেস পার্থক্য। দীর্ঘ সময়ে এগুলো মিলেই অভিযোজনের ব্যাখ্যা দেয়। [16]
এখানে “আইনদাতা” টাইপ এজেন্সি ধরে নেওয়া ছাড়াই—স্থানীয় পরিবেশ, বংশগতি, এবং বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—অত্যন্ত জটিল ফলাফল আসতে পারে। এই পয়েন্টটি “ল-গিভার/ডিজাইনার” ধরনের যুক্তির ক্ষেত্রে একটি সাধারণ সতর্কতা তৈরি করে: জটিল শৃঙ্খলা দেখলেই তা “বিধান” থেকে এসেছে—এটা অনিবার্য নয়। [17]
আরও কিছু সহজবোধ্য উদাহরণ
- Ohm’s law (V=IR): এটি কোনো “আদেশ” নয়—নির্দিষ্ট উপকরণ/তাপমাত্রায় বিদ্যুৎপ্রবাহ ও বিভব পার্থক্যের সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। উপকরণ বদলালে (ডায়োড/সেমিকন্ডাক্টর) সম্পর্ক বদলে যায়। “আইন” মানে এখানে একটি কাজের মডেল।
- Mendel’s laws: বংশগতির নির্দিষ্ট আদর্শ অবস্থায় দেখা প্যাটার্নের বর্ণনা। পরে জেনেটিক্স আরও সমৃদ্ধ হলে বোঝা যায়—অনেক বৈশিষ্ট্য মেন্ডেলীয় সরল নিয়মে ফিট করে না (polygenic traits ইত্যাদি)। তবু “law” শব্দটি টিকে আছে—কারণ এটি ইতিহাসগত নামকরণ ও শিক্ষাগত সুবিধা। [18]
- Ideal gas law (PV=nRT): “আইডিয়াল”—অর্থাৎ বাস্তব গ্যাসের জন্য আনুমানিক। উচ্চ চাপ/নিম্ন তাপমাত্রায় এটি ভাঙে; তখন সংশোধিত সমীকরণ লাগে। আইন ভাঙা মানে প্রকৃতি “অমান্য” করেছে নয়—মানে মডেলের সীমা এসেছে। [19]
উপসংহার
প্রাকৃতিক নিয়মকে মানুষের তৈরি আইনের মতো “আরোপিত বিধান” ভাবা—এবং সেখান থেকে “আইনদাতা” টেনে আনা—মূলত (১) Equivocation (আইন শব্দের দুই অর্থ গুলিয়ে ফেলা), (২) ক্যাটাগরি-ভুল (নৈতিক-আইনি কাঠামোকে ভৌত বর্ণনায় বসানো), এবং (৩) অনেক ক্ষেত্রে প্রিসাপোজিশন/সার্কুলারিটি–র ওপর দাঁড়ানো। [20]
বিজ্ঞানের “law” হলো প্রকৃতির আচরণের সংক্ষিপ্ত, পরীক্ষাযোগ্য, সংশোধনযোগ্য বর্ণনা—আর মানুষের “law” হলো মানুষের আচরণের নিয়ন্ত্রণমূলক বিধান। প্রথমটির অস্তিত্ব থেকে দ্বিতীয়টির কাঠামো (আইনদাতা/শাস্তি/উদ্দেশ্য) অনিবার্যভাবে অনুসরণ করে না। ফলে “প্রকৃতিতে আইন আছে বলেই আইনদাতা আছে”—এই দাবিটি যুক্তিগতভাবে দাঁড়ায় না; এটি ভাষাগত চাতুর্য হিসেবে আকর্ষণীয় শোনালেও প্রমাণ হিসেবে দুর্বল। [21]
তথ্যসূত্রঃ
- Equivocation fallacy সংজ্ঞা ও আলোচনা: Stanford Encyclopedia of Philosophy, “Fallacies” ↩︎
- “Laws of Nature”–এর প্রধান দার্শনিক অবস্থানসমূহ: Stanford Encyclopedia of Philosophy ↩︎
- বৈজ্ঞানিক আইন কী এবং ‘law’ মর্যাদা নিয়ে আলোচনা: Stanford Encyclopedia of Philosophy, “Laws of Nature” ↩︎
- বিজ্ঞানে অনেক ‘law’ আদতে সীমাবদ্ধ শর্তাধীন ও সংশোধনযোগ্য—SEP আলোচনা ↩︎
- Equivocation কীভাবে কাজ করে: SEP “Fallacies” ↩︎
- Robert Boyle–এর “laws” ধারণা ও “God and nature” প্রসঙ্গ: SEP “Boyle” ↩︎
- নিউটনের প্রেক্ষাপট ও সমসাময়িক দার্শনিক আলোচনা: SEP “Newton’s Philosophy” ↩︎
- Regularity বনাম Necessitarian অবস্থান: IEP “Laws of Nature” ↩︎
- কোন নিয়মকে “law” বলি এবং কেন—SEP “Laws of Nature” ↩︎
- Equivocation fallacy–র কাঠামো: SEP “Fallacies” ↩︎
- ফলাসি-থিওরিতে circularity/begging the question প্রসঙ্গ: SEP “Informal Logic” ↩︎
- General relativity–তে gravity-as-curvature সারাংশ: Wikipedia “General Relativity” ↩︎
- Newtonian gravity ও GR–এর সম্পর্ক: Wikipedia “General Relativity” ↩︎
- এই বিতর্কের রূপরেখা: SEP “Laws of Nature” ↩︎
- Quantum theory–র দার্শনিক ইস্যুসমূহ: SEP “Philosophical Issues in Quantum Theory” ↩︎
- Natural selection–এর ব্যাখ্যা ও কাঠামো: SEP “Natural Selection” ↩︎
- বিবর্তন ও ন্যাচারাল সিলেকশনের দার্শনিক গুরুত্ব: SEP “Natural Selection” ↩︎
- বিজ্ঞানে বহু ‘law’ একসময় law ভাবা হয়েছে—SEP “Laws of Nature”–এ উদাহরণ তালিকা ↩︎
- Law-like generalization ও সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গ: SEP “Laws of Nature” ↩︎
- Equivocation fallacy–র সংজ্ঞা ও উদাহরণ: SEP “Fallacies” ↩︎
- Laws of nature ধারণার মূল বিতর্ক ও ব্যাখ্যা: SEP “Laws of Nature” ↩︎
