Table of Contents
ভূমিকা
নবী মুহাম্মদের দাজ্জাল আগমন সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী এবং তার অন্ধ চোখের বিবরণ নিয়ে একটি বড় ধরনের বিভ্রান্তি বা বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। এক সাহাবীকে বলেছেন ডানচোখ কানা, আরেকজনকে বলেছেন বামচোখ কানা। বানিয়ে বানিয়ে বললে যা হয় আর কি। আগে ঠিক কী বলেছেন তা পরিষ্কার মনে থাকে না। এই নিয়ে মুমিনরা কী গোঁজামিল দেবে সেটি আগে থেকেই বলে দিতে পারি। মুমিন বাহিনী বলবে, একটি হাদিসকে পড়তে হবে দাজ্জালকে যে দেখছে তার সাপেক্ষে, আরেকটি হাদিস পড়তে হবে দাজ্জালের সাপেক্ষে। তাহলেই ডান বামের এই গণ্ডগোলকে গোঁজামিল দেয়া যাবে। কিন্তু এই গোঁজামিল কতটা হাস্যকর, সেটি আপনারা নিজেই বুঝুন।
হাদিসের বর্ণনাসমূহ
আসুন হাদিসগুলো পড়ি, [1] [2] –
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৪। বিভিন্ন ফিতনাহ ও কিয়ামতের লক্ষণসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ২০. দাজ্জাল এর বর্ণনা, তার পরিচয় এবং তার সাথে যা থাকবে
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭২৫১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৯
৭২৫১-(১০০/১৬৯) আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ ও ইবনু নুমায়র (রহঃ) ….. ইবনু উমার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত।রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মধ্যে দাজ্জালের আলাপ-আলোচনা করে বললেন, আল্লাহ তা’আলা অন্ধ নন। কিন্তু সতর্ক হও!দাজ্জালের ডান চোখ কানা হবে। আর তা আঙ্গুরের মতো ফোলা হবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭০৯৫, ইসলামিক সেন্টার ৭১৪৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৭: ফিতনাহ
পরিচ্ছেদঃ প্রথম অনুচ্ছেদ – কিয়ামতের পূর্বলক্ষণসমূহ এবং দাজ্জালের বর্ণনা
৫৪৭৪-[১১] উক্ত রাবী [হুযায়ফাহ্ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: দাজ্জালের বাম চোখ কানা, মাথার কেশ অত্যধিক। তার সঙ্গে থাকবে তার জান্নাত ও জাহান্নাম। বাস্তবে তার জাহান্নাম হবে জান্নাত এবং জান্নাত হবে জাহান্নাম। (মুসলিম)
সহীহ: মুসলিম ১০৪-(২৯৩৪), ইবনু মাজাহ ৪০৭১, সহীহুল জামি ৩৪০০, মুসনাদে আহমাদ ২৩২৯৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ হুযায়ফাহ ইবন আল-ইয়ামান (রাঃ)
ভাষাগত ব্যবচ্ছেদ ও শব্দার্থিক স্ববিরোধিতা
হাদিসের মূল টেক্সটে ব্যবহৃত শব্দগুলোর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলে তথ্যের যে বৈপরীত্য বেরিয়ে আসে তা নিম্নরূপ:
- ‘আওয়ার’ (A’war – أعور) শব্দের একক ও নির্দিষ্ট অর্থ: আরবি ভাষাতত্ত্ব অনুযায়ী, ‘আওয়ার’ শব্দটি কেবল তখনই ব্যবহৃত হয় যখন কারও একটি চোখ দৃষ্টিহীন বা ত্রুটিপূর্ণ এবং অন্যটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও দৃষ্টিসম্পন্ন থাকে। এটি একটি ‘বাইনারি’ অবস্থা নির্দেশ করে। যদি বক্তা (মুহাম্মদ) একটি হাদিসে বলেন ‘আওয়ারুল আয়নীল ইউমনা’ (ডান চোখ কানা), তার ভাষাগত অর্থই হচ্ছে বাম চোখটি সুস্থ। আবার যখন তিনি বলেন ‘আওয়ারুল আয়নীল ইউসরা’ (বাম চোখ কানা), তখন তার অর্থ দাঁড়ায় ডান চোখটি সুস্থ। একই সত্তার ক্ষেত্রে এই দুটি বর্ণনা লজিক্যালি ‘মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ’ (Mutually Exclusive); অর্থাৎ একটি সত্য হলে অন্যটি অবশ্যই মিথ্যা হতে হবে। ভাষাগতভাবে দুই চোখই খারাপ হলে ‘আওয়ার’ শব্দটির ব্যবহারই এখানে নিরর্থক হয়ে পড়ে।
- ‘ইউমনা’ (Yumna) বনাম ‘ইউসরা’ (Yusra) – সুনির্দিষ্টতার বিভ্রাট: হাদিস দুটিতে কোনো অস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। একটিতে ‘ডান’ এবং অন্যটিতে ‘বাম’ শব্দ দুটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যখন কেউ কোনো কাল্পনিক চরিত্র বা অলৌকিক ভীতি তৈরির চেষ্টা করেন, তখন শ্রোতার মনে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য তিনি অতি-সুনির্দিষ্ট বিবরণ (যেমন: ডান চোখ, আঙ্গুরের মতো ফোলা ইত্যাদি) ব্যবহার করেন। কিন্তু তথ্যের ভিত্তি যদি বাস্তব না হয়, তবে এই সুনির্দিষ্ট বিবরণগুলোই বর্ণনাকারীর জন্য কালনাগিনী হয়ে দাঁড়ায়। ‘ডান’ এবং ‘বাম’ এর মতো মৌলিক দিক নির্ণয়ে এই গুলিয়ে ফেলা প্রমাণ করে যে, তথ্যের উৎসটি কোনো অলৌকিক জ্ঞান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি অসংলগ্ন বর্ণনা।
- ‘ইনাবাতুন তফিয়াহ’ (عنبة طافئة) – বর্ণনার অসংগতি: একটি হাদিসে ডান চোখকে ‘আঙ্গুরের মতো ফোলা’ বলা হয়েছে। যদি অন্য হাদিসের ‘বাম চোখ কানা’ তত্ত্বটি গ্রহণ করা হয়, তবে এই ‘আঙ্গুর’ সদৃশ বিবরণটি কোথায় যাবে? অপোলজিস্টরা দাবি করেন দাজ্জালের দুই চোখই নষ্ট—একটি অন্ধ এবং অন্যটি আঙ্গুরের মতো ফোলা। কিন্তু হাদিসের টেক্সট তা বলছে না। টেক্সট বলছে যে চোখটি ‘আওয়ার’ বা অন্ধ, সেটিই ‘আঙ্গুরের মতো’। অর্থাৎ, একই বিশেষণ (আঙ্গুর সদৃশ অন্ধত্ব) একবার ডান চোখের ওপর এবং অন্যবার বাম চোখের ওপর চাপানো হয়েছে। এটি কোনো বাস্তব সত্তার বর্ণনা হতে পারে না; এটি কেবল তখনই সম্ভব যখন বক্তা তার কাল্পনিক চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বারবার পরিবর্তন করেন অথবা বর্ণনাকারীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন গালগল্প তৈরি করেন।
সংরক্ষণমূলক ত্রুটি এবং জোড়াতালির চেষ্টা
দাজ্জালের চোখের বর্ণনা সংক্রান্ত বৈপরীত্য কেবল ডান-বাম বিভ্রাটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভাষাগত এবং সংকলনশৈলীগত মৌলিক কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
- উৎসের অসঙ্গতি ও কাল্পনিক উদ্ভাবন (Fabrication or Improvisation): যখন কোনো ব্যক্তি কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়াই অলৌকিক কোনো চরিত্র সম্পর্কে কাল্পনিক গল্প বা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তখন সময়ের ব্যবধানে তিনি নিজের পূর্ববর্তী বিবরণের কথা ভুলে গিয়ে নতুন ও বিপরীতমুখী তথ্য দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। দাজ্জালের ডান চোখ বনাম বাম চোখের এই তালগোল পাকানো সরাসরি ইঙ্গিত দেয় যে, এটি কোনো সুনির্দিষ্ট বা অপরিবর্তনীয় তথ্য ছিল না। বরং এটি ছিল তাৎক্ষণিক উদ্ভাবিত (Improvised) কোনো বক্তব্য যা পরবর্তীতে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ধরনের মৌলিক অসঙ্গতি সাধারণত তখনই ঘটে যখন বক্তা নিজেই তার বানানো তথ্যের গভীরে স্থির থাকেন না। সুতরাং, একে কেবল ‘ভুল’ না বলে ‘আন্দাজে বলা’ বা ‘মিথ্যাচার’ হিসেবে গণ্য করার যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।
- হাদিস সংরক্ষণের নির্ভরযোগ্যতায় ফাটল: ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ‘সহীহ’ হাদিসকে অভ্রান্ত বা ঐশ্বরিক নির্দেশনার সমতুল্য মনে করা হয়। কিন্তু দাজ্জালের চোখের অবস্থান নিয়ে ‘সহীহ মুসলিম’-এর মতো শীর্ষস্থানীয় গ্রন্থে যখন দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বর্ণনা (একটি ডান চোখ কানা, অন্যটি বাম চোখ কানা) পাওয়া যায়, তখন তা বর্ণনাকারীদের (Narrators) স্মৃতিশক্তি এবং তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। এটি প্রমাণ করে যে, অতি-নির্ভরযোগ্য হিসেবে দাবিকৃত বর্ণনাকারীরাও তথ্যের মৌলিক বিবরণে বিভ্রান্ত ছিলেন, অথবা নবী মুহাম্মদ নিজেই এক এক সময়ে এক এককথা বলেছেন। যদি একজন বর্ণনাকারী দাজ্জালের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বর্ণনায় ডান এবং বাম গুলিয়ে ফেলতে পারেন, তবে সেই বর্ণনাকারীদের বর্ণিত অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্যের নির্ভরযোগ্যতাও যৌক্তিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
- হাফেজ ইবনে হাজারের ‘এড-হক’ ব্যাখ্যা ও গোলপোস্ট পরিবর্তন: বিখ্যাত হাদিস বিশারদ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি এই বৈপরীত্য মেলাতে যে যুক্তি দিয়েছিলেন—অর্থাৎ দাজ্জালের উভয় চোখই আসলে ত্রুটিপূর্ণ—তা একটি ধ্রুপদী ‘এড-হক ফ্যালাসি’। তিনি দাবি করেছিলেন যে, একটি হাদিসে ‘কানা’ বলতে দৃষ্টিশক্তিহীনতা বোঝানো হয়েছে এবং অন্যটিতে ‘কানা’ বলতে চোখের শারীরিক বিকৃতি বোঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটি মূলত মূল টেক্সটে (Text) নেই, বরং পরস্পরবিরোধী দুটি বক্তব্যকে কোনোভাবে রক্ষা করার জন্য পরবর্তী সময়ে জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। যদি মুহাম্মদ সত্যিই দুই চোখের ত্রুটির কথা বোঝাতে চাইতেন, তবে তিনি ‘আওয়ার’ শব্দের পরিবর্তে ‘আ’মা’ (অন্ধ) বা অন্য কোনো দ্বিবচনবাচক শব্দ ব্যবহার করতেন। এই ধরনের ব্যাখ্যা মূলত যৌক্তিক বিপর্যয় ঢাকার একটি অপচেষ্টা মাত্র।
রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি
যখন কোনো ধর্মীয় দাবি, ভবিষ্যদ্বাণী বা বক্তব্য তার স্বাভাবিক অর্থে (plain reading) বাস্তবতার সাথে মেলে না, তখন প্রায়শই “এটা আসলে রূপক”, “এলেগরি”, “ভিন্ন স্তরের অর্থ”, “ছোট সংস্করণ”, “ব্যক্তিগত প্রেক্ষিতভিত্তিক” বা “আধ্যাত্মিক অর্থে”—এই জাতীয় ব্যাখ্যা এনে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। এই ব্যাখ্যাগুলো সাধারণত শুরুতে বলা হয় না; বরং ফলাফল জানার পরে ব্যর্থতার চাপ তৈরি হওয়ার পরে যোগ করা হয়। ফলে মূল বক্তব্যের স্পষ্ট অর্থ, সময়-সীমা এবং শর্তগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন অর্থ বসানো হয়—যা যুক্তিগতভাবে এড হক ফ্যালাসি (ad hoc fallacy) বা “পরবর্তী রক্ষাকবচ ব্যাখ্যা” হিসেবে পরিচিত।
এড হক ফ্যালাসি কী? এটি ঘটে যখন কোনো দাবি দুর্বল বা ভুল প্রমাণিত হওয়ার মুখে পড়লে, তাকে রক্ষা করার জন্য নতুন শর্ত, নতুন অর্থ বা নতুন ব্যাখ্যা যোগ করা হয়—যেগুলো (১) মূল বক্তব্য থেকে স্বাভাবিকভাবে উদ্ভূত হয় না, (২) স্বাধীন প্রমাণে দাঁড়ায় না, এবং (৩) দাবিটিকে এমনভাবে অস্পষ্ট করে যে আর তা ফালসিফাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দাবিটি আর পরীক্ষাযোগ্য থাকে না; এটি যেকোনো ফলাফলের সাথে “মিলিয়ে” নেওয়া যায়।
অনেকে “রূপক”কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, কারণ সাহিত্যে বা প্রাচীন গ্রন্থে রূপকের ব্যবহার আছে। কিন্তু যুক্তিতর্কে প্রশ্নটি ভিন্ন: এই রূপক-ব্যাখ্যা কি মূল বক্তব্যের ভাষা, কাঠামো, সময়-ইঙ্গিত এবং শ্রোতার স্বাভাবিক প্রত্যাশা থেকে যুক্তিযুক্তভাবে বের হয়? নাকি এটি কেবল ব্যর্থতা সামাল দিতে পরে যোগ করা হয়েছে? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে “রূপক” আর সত্যিকারের ব্যাখ্যা নয়—এটি যুক্তিগত ফাঁকি হয়ে দাঁড়ায়।
এড হক উদ্ধার-ব্যাখ্যার সাধারণ কায়দা
- অর্থ-স্থানান্তর (Meaning shift): মূল বক্তব্যে “X ঘটবে” বলা হয়েছে; না ঘটলে পরে বলা হয় “X মানে আসলে Y” বা “পূর্বের বক্তব্যে X বলতে আসলে Y বোঝানো হয়েছিল”। অথচ পূর্বে Y-এর কোনো ইঙ্গিত ছিল না।
- গোলপোস্ট সরানো (Moving the goalposts): পরীক্ষার মানদণ্ড বদলে দেওয়া—যা আগে স্পষ্ট ও পরিমাপ্য ছিল, তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা।
- বিশেষ শর্ত যোগ করা (Auxiliary assumptions): “শুধু এই শর্তে”, “আসলে ওই প্রেক্ষিতে”, “কেবল বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য”—এই ধরনের নতুন শর্ত যোগ করা, যার স্বাধীন ভিত্তি নেই।
- সিলেক্টিভ পাঠ (Selective reading): বক্তব্যের অসুবিধাজনক অংশ (যেমন সময়-সীমা) বাদ দিয়ে কেবল সুবিধাজনক অংশ নিয়ে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো।
- অব্যর্থতার পূর্বধারণা (Presumed infallibility): শুরুতেই ধরে নেওয়া যে বক্তব্য ভুল হতেই পারে না; তাই যেকোনো অমিলকে “বোঝা ভুল” বলে চালিয়ে দেওয়া।
বাস্তব উদাহরণসমূহ
উদাহরণ ১: বন্যার ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ বললেন, “আগামী বছর পৃথিবীব্যাপী মহাপ্লাবন হবে।” বছর শেষে কোনো বিশ্বব্যাপী বন্যা হলো না—কেবল কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিক মৌসুমি বন্যা। তখন বলা হলো, “পৃথিবী বলতে আমি আসলে ওই অঞ্চলই বুঝিয়েছিলাম” বা “এটা আসলে রূপক—মানুষের পাপের বন্যা”।
বিশ্লেষণ: মূল বক্তব্যে “পৃথিবীব্যাপী” স্পষ্ট ছিল; পরে অর্থ সংকুচিত বা রূপক করা হলো। এটি গোলপোস্ট সরানো এবং অর্থ-স্থানান্তর উভয়ই। যদি শুরুতেই রূপক বা সীমিত অর্থ উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ভাষা সেভাবে নির্দিষ্ট হতো।
উদাহরণ ২: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনের আগে একজন নেতা বললেন, “আমি ক্ষমতায় এলে বেকারত্ব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনব।” ক্ষমতায় এসে বেকারত্ব কমল কিন্তু শূন্য হলো না। তখন বলা হলো, “আসলে আমি বুঝিয়েছিলাম যে বেকারত্ব অনেক কমবে” বা “এটা ছিল একটা রূপক—মানুষের মনের বেকারত্ব দূর করা”।
বিশ্লেষণ: “শূন্যের কোঠায়” একটি পরিমাপ্য দাবি ছিল; পরে তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা হলো। এটি ক্লাসিক গোলপোস্ট সরানো।
উদাহরণ ৩: বিনিয়োগের পরামর্শ
একজন বিশ্লেষক বললেন, “এই স্টকের দাম আগামী ছয় মাসে দ্বিগুণ হবে।” ছয় মাস পর দাম বাড়েনি। তখন বলা হলো, “আসলে ছয়মাস বলতে দীর্ঘ সময়কাল বুঝিয়েছিলাম” বা “দ্বিগুণ বলতে আমি মূল্যের বৃদ্ধি বুঝিয়েছিলাম”।
বিশ্লেষণ: সময়-সীমা স্পষ্ট ছিল; পরে তা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এটি সিলেক্টিভ পাঠ এবং বিশেষ শর্ত যোগ করা।
উদাহরণ ৪: নস্ট্রাদামাস-স্টাইলের অস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ একটি অস্পষ্ট কবিতা লিখলেন যাতে “আগামী বছর আগুনের পাখি আকাশ থেকে নামবে”। পরে কোনো বড় ঘটনা (যেমন বিমান দুর্ঘটনা) ঘটলে বলা হয়, “দেখো, এটাই পূরণ হয়েছে”। আবার বিমান দুর্ঘটনা না হয়ে যদি কোথাও উল্কাপাত হয়, তখন বলা হবে, দেখো ভবিষ্যতবাণী মিলে গেছে।
বিশ্লেষণ: অস্পষ্টতা থেকেই এড হক ব্যাখ্যা সহজ হয়; যেকোনো ঘটনার সাথে মিলিয়ে নেওয়া যায়। এটি দাবিকে চিরকাল “সত্য” রাখে কিন্তু কোনো প্রকৃত ভবিষ্যদ্বাণী ক্ষমতা প্রমাণ করে না।
কেন এটি যুক্তিগতভাবে গুরুতর সমস্যা?
যেকোনো নির্ভরযোগ্য দাবি বা জ্ঞানের জন্য তিনটি জিনিস অপরিহার্য: (১) স্পষ্ট অর্থ, (২) স্পষ্ট পরীক্ষার মানদণ্ড (ফালসিফায়েবিলিটি), (৩) ব্যর্থতার সম্ভাবনা স্বীকার করা। এড হক ব্যাখ্যা এই তিনটিকেই ধ্বংস করে। ফলে দাবিটি আর “ভুল হতে পারে” এই ঝুঁকি নেয় না—এটি সবসময় “সত্য” থাকে, কিন্তু কোনো নতুন তথ্য দেয় না। এটি যুক্তির পরিবর্তে মানসিক সান্ত্বনা দেয়।
যদি কোনো দাবি সত্যিই শক্তিশালী প্রমাণ বা যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে বারবার অর্থ পরিবর্তন বা উদ্ধার-ব্যাখ্যার প্রয়োজন কেন? এই প্রশ্নটিই এড হক ফ্যালাসির মূল দুর্বলতা প্রকাশ করে।
উপসংহার
উপরের দুইটি সহিহ বর্ণনা একসাথে ধরলে যে সমস্যাটি চোখে পড়ে, তা খুব সরল: একই নবী দাজ্জালের ডান চোখ কানা বলেছেন, আবার বাম চোখ কানা বলেছেন—দুটি বক্তব্য একই সাথে সত্য হতে পারে না। ফলে বাস্তবতা মিলাতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই “উদ্ধার-ব্যাখ্যা” তৈরি হবে—কেউ বলবে, একবার নবী দাজ্জালকে সরাসরি দেখেছে, আরেকবার আয়নায় বা কোনো ভিন্ন প্রেক্ষিতে দেখেছে; কিংবা বলবে, “দাজ্জালের দুই চোখই আসলে কানা—নবী একেকবার একেক দিক উল্লেখ করেছেন”; অথবা বলবে, “ডান/বাম বলতে আসলে ‘ভাল/খারাপ’—রূপক” ইত্যাদি। কিন্তু এসব ব্যাখ্যা যদি এই হাদিসগুলোকে ‘সঠিক প্রমাণ’ করার উদ্দেশ্যে এখন তৈরি করে বলা হয়, তাহলে তা যুক্তিগতভাবে এড হক ফ্যালাসি হবে—কারণ এগুলো শুরুতে বলা হয়নি।
শুরুতে যা বলা হয়েছে, সেগুলো পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায় যে বক্তব্যগুলোকে স্বাভাবিক পাঠে (plain reading) নেওয়ারই কথা—“ডান চোখ কানা”/“বাম চোখ কানা” কথাগুলো কোনো “আয়না-দৃষ্টি”, “দেখার কোণ”, “দুই চোখই কানা”, “রূপক”—এমন শর্ত-সংযুক্ত ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপিত নয়। এই অতিরিক্ত শর্তগুলো আসে অমিল ধরা পড়ার পরে—শুধু যাতে দুই বর্ণনাকে জোর করে “মিলিয়ে” দেওয়া যায়। অর্থাৎ ব্যাখ্যাগুলো কোনো স্বাধীন প্রমাণ বা পূর্বঘোষিত কাঠামো থেকে আসে না; আসে মিলাবার তাগিদে। ফলাফল হিসেবে দাবিটি আর পরিষ্কার/পরীক্ষাযোগ্য থাকে না—এটি “যেভাবেই হোক ঠিক” হয়ে যায়। আর যে দাবি সব অবস্থায় “ঠিক” করে নেওয়া যায়, সেটি যুক্তির মানদণ্ডে ভবিষ্যদ্বাণী বা নির্ভরযোগ্য বর্ণনা হিসেবে শক্ত প্রমাণ দিতে পারে না; বরং দেখায়, কীভাবে ব্যর্থতার চাপ তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে অর্থ-স্থানান্তর ও অতিরিক্ত শর্ত যোগ করে কথাকে বাঁচানো হয়।
