নবীর ভুল ভবিষ্যতবাণী: কেয়ামত কবে হবে

ভূমিকা

ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী বা “কেয়ামতের সময়”-সম্পর্কিত বক্তব্যের একটি বড় দাবি হলো এক ধরণের নলেজ ক্লেইম, যেগুলো আসলে আধ্যাত্মিক কোন ব্যাপার হিসেবে ব্যাখ্যা না করে বাস্তব জগত দিয়েই ব্যাখ্যা করতে হয়। জ্বীন ফেরেশতা জান্নাত জাহান্নামের মত এগুলো যেহেতু আধ্যাত্মিক নয়, বাস্তব জগতের সাথে সম্পর্কিত, তাই এইসব ক্ষেত্রে ধার্মিকরা “এগুলো আধ্যাত্মিক” বা “এগুলো মেটাফিজিক্যাল” – বলে এড়িয়ে যেতে পারবে না। এসব যাচাইয়ের মৌলিক মানদণ্ড হচ্ছে: বক্তব্যটি কি তার আসলেই পরবর্তীতে ঘটেছে, নাকি নতুন কিছু ব্যাখ্যা এবং শব্দের অর্থ বদলে দিয়ে এগুলো প্রমাণ-অযোগ্য করে রাখা হয়েছে? এই অংশে আমরা কিছু প্রসিদ্ধ হাদিসের ভাষা ও বর্ণনা ধরে দেখব—“কিয়ামত” ঘনিয়ে আসার দাবি, যুদ্ধের রূপকল্প, এবং নির্দিষ্ট সময়-সীমা (যেমন “বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগে”)—এসবের মধ্যে আসলে কতটা ভবিষ্যতজ্ঞান আছে, আর কতটা সমকালীন কল্পনা ও পরবর্তীকালের ডিফেন্সিভ ব্যাখ্যা।


কিয়ামতের পূর্বের যুদ্ধে অশ্বারোহী?

আমরা যারা নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখি, তারা সবাই বুঝি যে, ভবিষ্যতের পৃথিবী এবং যুদ্ধবিগ্রহগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হবে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, রোবট, বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বারা। মজার বিষয় হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ কেয়ামতের পূর্বে যেই যুদ্ধ হবে তার ভবিষ্যতবাণী করতে গিয়ে বহুস্থানেই ঘোড়ায় চড়ে, বর্শা এবং তরবারির সাহায্যে যুদ্ধের কথা বলা আছে। অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ কখনো ভাবতেও পারেনি, পৃথিবী এতদিন পর্যন্ত টিকবে, জ্ঞান বিজ্ঞানের এত প্রসার ঘটবে এবং মানুষ এত এত আবিষ্কার করবে। নইলে ঘোড়ায় চড়ে, বর্শা ঢাল আর তরবারি নিয়ে যুদ্ধের কথা বলতেন না। আসুন অতীতের যুদ্ধ বনাম ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেমন হবে তার দুইটি AI দ্বারা তৈরি কাল্পনিক ছবি দেখি,

ভুল
ভুল 1

এবারে আসুন একটি হাদিস পড়ি,

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১০. রোমনদের সংখ্যাধিক্যের অবস্থায় কিয়ামত সংঘটিত হবে
৭০১৭। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা ও আলী ইবনু হুজর (রহঃ) … উসায়র ইবনু জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার কুফা নগরীতে লাল (উত্তপ্ত) ঝঞ্ঝা বায়ু প্রবাহিত হল। এ সময় এক ব্যক্তি কুফায় আসল। তার কথার ’মুদ্রাদোষ’ ছিল ’আলা’ হে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ! কিয়ামত এসে গেছে। তিনি (আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ) যেভাবে বসে ছিলেন সেভাবেই বসে রইলেন এবং বললেন কিয়ামত কায়িম হবে না, যতক্ষন না উত্তরাধিকার সম্পদ অবণ্টিত থাকবে এবং যতক্ষন না লোক গনীমতে আনন্দিত হবে না। অতঃপর তিনি তার হস্ত দ্বারা সিরিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, আল্লাহর শত্রুরা সমবেত হবে মুসলিমদের সাথে লড়াই করার জন্য এবং মুসলিমগণও তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হবে।
(এ কথা শুনে) আমি বললাম, আল্লাহর শত্রু বলে আপনাদের উদ্দেশ্য হল রোমীয় খ্রীষ্টান সম্প্রদায়। তিনি বললেন, হ্যাঁ এবং তখন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তখন মুসলিম সম্প্রদায় একটি দল অগ্রে প্রেরণ করবে, তারা মৃত্যুর জন্য সামনে অগ্রসর হবে। জয়লাভ করা ব্যতিরেকে তারা পেছনে ফিরবে না। এরপর পরস্পর তাদের মাঝে যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ করতে করতে রাত হয়ে যাবে। অতঃপর উভয় পক্ষের সৈন্য জয়লাভ করা ব্যতিরেকেই ফিরে চলে যাবে। যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের যে দলটি অগ্রে এগিয়ে গিয়েছিল তারা সকলেই মরে যাবে। অতঃপর পূর্ববর্তী দিন মুসলিমগণ মৃত্যুর জন্য অপর একটি দল অগ্রে প্রেরণ করবে। তারা বিজয়ী না হয়ে প্রত্যাবর্তন করবে না। এদিনও পরস্পরের মাঝে মারাত্মক যুদ্ধ হবে। অবশেষে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। উভয় বাহিনী জয়লাভ করা ব্যতীতই নিজ নিজ শিবিরে ফিরে আসবে। দলটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। অতঃপর তৃতীয় দিন পুনঃরায় মুসলিমগণ মৃত্যুর জন্য একটি বাহিনী পাঠাবে। যারা বিজয়ী না হয়ে ফিরবে না। সে দিন পৃথিবীর সর্বোত্তম অশ্বারোহী দলের অন্তর্ভুক্ত হবে তারা।
এ যুদ্ধ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকবে। অবশেষে জয়লাভ করা ব্যতিরেকেই এ দল ও ঐ দল ফিরে যাবে। (তবে মুসলিম বাহিনীর সামনের) সেনাদলটি শেষ হয়ে যাবে। এরপর যুদ্ধের চতুর্থ দিবসে অবশিষ্ট মুসলিমগণ সকলেই যুদ্ধের জন্য সম্মুখ পানে এগিয়ে যাবে। সেদিন কাফিরদের উপর আল্লাহ তায়ালা অমঙ্গল চক্র চাপিয়ে দিবেন। অতঃপর এমন যুদ্ধ হবে যা জীবনে কেউ দেখবেনা অথবা যা জীবনে কেউ দেখেনি। অবশেষে তাদের শরীরের উপর পাখী উড়তে থাকবে। পাখী তাদেরকে অতিক্রম করবে না; এমতাবস্থায় তা মাটিতে পড়ে মরে যাবে। একশ মানুষ বিশিষ্ট পূর্ন পুরুষদের একটি গোত্র, এদের থেকে মাত্র এক ব্যক্তি বেঁচে থাকবে। এমতাবস্থায় কেমন করে গনীমতের সম্পদ নিয়ে লোকেরা আনন্দ উৎসব করবে এবং কেমন করে উত্তরাধিকার সম্পদ বন্টন করা হবে।
মুসলিমগণ এ সময় আরেকটি ভয়াবহ বিপদের সংবাদ শুনতে পাবে এবং এ মর্মে একটি আওয়াজ তাদের নিকট পৌছবে যে, দাজ্জাল তাদের পেছনে তাদের পরিবার পরিজনের মধ্যে চলে এসেছে। এ সংবাদ শুনতেই তারা হাতের সমস্ত কিছু ফেলে দিয়ে রওয়ানা হয়ে যাবে এবং দশজন অশ্বারোহী ব্যক্তিকে সংবাদ সংগ্রাহক দল হিসাবে প্রেরণ করবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দাজ্জালের সংবাদ সংগ্রাহক দলের প্রতিটি ব্যক্তির নাম, তাদের বাপ-দাদার নাম এবং তাদের অশ্বের রং সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। এ এ পৃথিবীর সর্বোত্তম অশ্বারোহী দল সেদিন তারাই হবে। অথবা (বলেছেন) ইবন আবু শায়বা (তার) রিওয়ায়াতের মধ্যে يُسَيْرِ بْنِ جَابِرٍ এর পরিবর্তে أُسَيْرِ بْنِ جَابِرٍ বর্ণনা করে ছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উসায়র ইবনু জাবির (রাঃ)

উপরের এই হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, মুহাম্মদের ধারণা ছিল, ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করার সময়কালের মধ্যেই কেয়ামত হয়ে যাবে। তার এই বিষয়টি বোধগম্য হয়নি যে, ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের যুগ একদিন শেষ হয়ে যাবে, আর কেউ ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধে যাবে না।


কিয়ামত সন্নিকটে

বিভিন্ন হাদিস থেকে নবী মুহাম্মদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, কিয়ামত খুবই সন্নিকটে। নবী মুহাম্মদ বলেছিলেন, কিয়ামত খুবই কাছে [1]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪০। আবূ গাসসান মিসমাঈ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এবং কিয়ামত প্রেরিত হয়েছি এ দুটির মত। রাবী বলেন (এ সময়) তিনি তার শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুলিকে একত্রিত করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আবার, নবী মুহাম্মদই একবার সূর্যগ্রহণ দেখে এমন ভয় পেয়েছিল যে, সে ভেবেছিল কেয়ামত বুঝি হয়েই যাচ্ছে। আজকালকার বাচ্চা ছেলেপেলেরাও সূর্যগ্রহণ কী তা জানে এবং বোঝে। তারা সূর্যগ্রহণের সময় কোন ভয় পায় না। সূর্যগ্রহণ দেখে তাকে কেয়ামত ভেবে নবীর এরকম আতঙ্কে অস্থির হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, সেই তার জীবদ্দশাতেই কেয়ামত হয়ে যাবে এরকম ভয় করছিলেন। কেন, সেই সময়ে জিবরাইল কোথায় ছিল? তার তো এসে বলা উচিত ছিল, হে নবী, এটি একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা, ভয়ের কিছু নেই। আসুন হাদিসটি পড়ি, [2] [3]

মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী
১৬. কিতাবুল কুসুফ (সূর্যগ্রহণের বর্ণনা)
পরিচ্ছেদঃ সূর্যগ্রহণের সময় যিকির করা
আলোকিত প্রকাশনী নাম্বারঃ ৫৬০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৫৯
৫৬০: আবু মুসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা সূর্যগ্রহণ হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দন্ডায়মান হলেন। তিনি কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাওয়ার ভয় করছিলেন। তিনি মসজিদে আগমণ করলেন। তিনি এত লম্বা কিয়াম, রুকূ এবং সিজদা করলেন যা আমি তাঁকে আর কখনও এরূপ করতে দেখিনি। তিনি বললেনঃ এ সমস্ত নিদর্শন কারো জন্ম গ্রহণ বা মৃত্যু বরণ করার কারণে প্রেরিত হয় না; বরং আল্লাহ তাআলা এগুলোর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকেন। তোমরা যখন কোন নিদর্শন দেখতে পাবে তখন তোমরা আল্লাহর যিকির, তাঁর নিকট দু’আ করা এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার দিকে ধাবিত হও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)

ভুল 3

কিয়ামত কবে হবে?

এবারে আসুন দেখি সেই হাদিসটি, যেখানে নবীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কেয়ামত কবে হবে। উত্তরে একজন বালককে দেখিয়ে নবী বলেছিলেন, এই বালকের বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই কিয়ামত হবে। কিন্তু সেই বালক মরে ভুত হয়ে গেল, এখনো কিয়ামত হলো না [4] [5] [6] [7]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪২। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামত কবে হবে? তখন তাঁর নিকট মুহাম্মাদ নামক এক আনসারী বালক উপিস্থিত ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বালক যদি বেঁচে থাকে তবে সে বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই কিয়ামত সংগঠিত হয়ে যাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪৩। হাজ্জাজ ইবনু শাঈর (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন যে, কিয়ামত কবে হবে? এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ পর্যন্ত চুপ করে থাকেন। অতঃপর তিনি সম্মুখস্থ আয্দ-শানু’আ গোত্রের এক বালকের প্রতি তাকালেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ এ বালক যদি দীর্ঘ হায়াত পায় তবে তার বার্ধক্যে পদার্পণ করার পূর্বেই কিয়ামত সংগঠিত হয়ে যাবে। আনাস (রাঃ) বলেন, তখন এ বালক আমার সমবয়স্ক ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪৪। হারুন ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) এর এক গোলাম একদা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, সে ছিল আমার সমবয়স্কা। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি তার হায়াত দীর্ঘায়িত হয় তবে সে বার্ধক্যে পৌছার পূর্বেই কিয়ামত কায়িম সংগঠিত হবে।
হাদিসের মানঃ সহih (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ভুল 5

রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি

এখানে “রূপক” বা “এলেগরি” ঢুকিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা সাধারণত করা হয়। বলা হয়—“কেয়ামত” বলতে নাকি “ব্যক্তির মৃত্যু” বোঝানো হয়েছে, বা “ছোট কেয়ামত” বোঝানো হয়েছে, বা প্রশ্নকারীর “শেষ সময়” বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো—হাদিসে প্রশ্নটা কেয়ামতই, আর উত্তরটাও কেয়ামতই; উপরন্তু “বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগে”—এটা সময়-সীমা নির্ধারণ। এগুলো যে খুব স্পষ্টভাবেই এড হক ফ্যালাসি (Ad Hoc Fallacy), তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এড হক ফ্যালাসি হলো এমন একটি কুযুক্তি যেখানে কোনো একটি দাবিকে রক্ষা করার জন্য বা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নতুন ব্যাখ্যা, অপ্রমাণিত বা রহস্যময় শর্ত জুড়ে দেওয়া; এটি মূলত ‘পোস্ট হক এরগো প্রপটার হক’ (Post Hoc Ergo Propter Hoc) বা ‘এরপরে, তাই এর কারণে’ – এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়, যা দুটি ঘটনার ক্রমকে ভুলবশত কার্যকারণ সম্পর্কে পরিণত করে।

এড হক ফ্যালাসি কীভাবে কাজ করে:

অতিরিক্ত ব্যাখ্যা: যখন কোনো তত্ত্ব বা ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকে না, তখন সেটিকে বাঁচাতে ‘বিশেষ’ বা ‘অতিরিক্ত’ কিছু শর্ত যোগ করা হয়, বা শব্দগুলোর কিছু নতুন ব্যাখ্যা সৃষ্টি করা হয়, যার উদ্দেশ্য থাকে যেভাবেই হোক শুরুর দাবীটিকে রক্ষা করা।

‘এরপরে, তাই এর কারণে’ (Post Hoc): একটি ঘটনা ঘটার ঠিক পরে আরেকটি ঘটনা ঘটলে, প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যদিও তাদের মধ্যে কোনো প্রকৃত কার্যকারণ সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।

উদাহরণঃ ধরুন আমি বললাম, আগামী বছর বন্যায় পুরো পৃথিবী ডুবে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, সেই বছর পুরো পৃথিবী জুড়ে কোন বন্যা হলো না, শুধুমাত্র বাংলাদেশের নোয়াখালীতে বন্যা হলো। তখন আমি আমার ভবিষ্যতবাণীকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করলাম। বললাম, আমি আগে যেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলাম, সেখানে আমি পুরো পৃথিবী বলতে পুরো পৃথিবী নয়, নোয়াখালীকে বুঝিয়েছিলাম। কারণ নোয়াখালী জেলার অনেক মানুষ আছে যারা নোয়াখালী জেলাটিকেই পুরো পৃথিবী মনে করে। আমি সেই মানুষদের সাপেক্ষে বলেছিলাম।

অর্থাৎ, আমি আমার ভবিষ্যতবাণীর অর্থ পরিবর্তন করলাম, পরবর্তী ঘটনার সাপেক্ষে। এটি হবে একটি ফ্যালাসি, যাকে বলা হয় এড হক ফ্যালাসি (Ad Hoc Fallacy)। মূল বিষয় হচ্ছে, এই ধরনের ভবিষ্যৎবাণী যদি সত্যিই “ঐশী জ্ঞান” থেকে আসে, তাহলে এত বড় টাইমলাইন ভুল হওয়ার কথা না, নতুন ব্যাখ্যা- শব্দের নতুন অর্থ তৈরি করে বিষয়টি শুদ্ধ করার মানসিক কসরত করতে হতো না। আর যদি ভুল হয়—তাহলে পরের প্রশ্ন আসে: ভবিষ্যৎবাণীকে “ঐশী প্রমাণ” হিসেবে কেন দেখানো হবে?


হিশামের বক্তব্য সম্পর্কে

এই হাদিসটির আরেকটি ভার্শন আসুন লক্ষ্য করি।

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬৮/ কোমল হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ২৭২৩. মৃত্যুযন্ত্রনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৬০৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৫১১
৬০৬৭। সাদাকা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কিছু সংখ্যক কঠিন মেজাজের গ্রাম্য লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করতো কিয়ামত কবে হবে? তখন তিনি তাদের সর্ব-কনিষ্ঠ ব্যাক্তির দিকে তাকিয়ে বলতেনঃ যদি এ ব্যাক্তি কিছু দিন বেঁচে থাকে তবে তার বুড়ো হওয়ার আগেই তোমাদের কিয়ামত এসে যাবে। হিশাম বলেন যে, এ কিয়ামতের অর্থ হলো, তাদের মৃত্যু।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

জেনে রাখা জরুরি যে, হিশাম নামে যার কথা এখানে বলা হচ্ছে, হিশাম ইবনে উরওয়াহ ৬৮০–৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন সাহাবী যুবাইর ইবনুল আওয়াম এর নাতি, তার দাদি ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর এর কন্যা আসমা বিনতে আবি বকর। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ৬১ হিজরি সনে (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৪৬ হিজরিতে (৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)। অর্থাৎ মুহাম্মদের মৃত্যুর প্রায় ৫০ বছর পরে তার জন্ম। স্বাভাবিকভাবেই, তিনি এই বিষয়টি জানতেন যে, ঐ বালকটি ততদিনে মারা গেছে, কিয়ামতও সংঘটিত হয়নি। তাই তার জন্য খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, হাদিসটিকে তিনি অন্য একটি ব্যাখ্যা দেবেন। তার ব্যাখ্যাটি ছিল, এখানে কিয়ামত বলতে নাকি তাদের মৃত্যু বোঝানো হয়েছে। অথচ হাদিসে কিন্তু কিয়ামতের কথাই বলা হয়েছিল। এই ব্যাখ্যাটিই যে ইসলামের মান সম্মান রক্ষার্থে একজন ইসলামপন্থীর ডিফেন্স হবে, সেটি বলাই বাহুল্য। এ কারণে হিশামের পক্ষে তো এই ব্যাখ্যাটি তৈরি করা ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিল না। নইলে নবীর বক্তব্য তো ভুল প্রমাণিত হবে।


উপসংহার

উপরের বর্ণনাগুলোকে একত্রে দেখলে একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন উঠে আসে: কিয়ামতের “সন্নিকটতা” বারবার ঘোষিত, যুদ্ধের কল্পচিত্র রয়ে গেছে ঘোড়া-তরবারি-অশ্বারোহী যুগের সীমার মধ্যে, এবং “বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগে” ধরনের বাক্যে একটি বাস্তব সময়-সীমার ইঙ্গিতও উপস্থিত। কিন্তু বাস্তব ইতিহাসে কেয়ামত ঘটেনি—ফলে পরবর্তীতে “এটা আসলে কেয়ামত নয়, ব্যক্তির মৃত্যু/ছোট কেয়ামত”—জাতীয় ব্যাখ্যা যোগ করে বক্তব্যকে রক্ষা করার প্রবণতা দেখা যায়, যা যুক্তিগতভাবে এড হক ব্যাখ্যার ক্লাসিক উদাহরণ। যদি কোনো দাবিকে “ঐশী জ্ঞান”-এর নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তার ভাষা ও সময়-সংকেতগুলো এত সহজে ভুল প্রমাণিত হওয়ার কথা নয়, এবং ভুল ঢাকতে পরবর্তীকালে অর্থ পাল্টানোর মানসিক কসরতও দরকার পড়ার কথা নয়। এখানেই মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়: ভুল বা সময়-সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ ভবিষ্যতবাণীকে—কী যুক্তিতে—অলৌকিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে?


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪০ ↩︎
  2. মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী, হাদিসঃ ৫৬০ ↩︎
  3. মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী, ইসলামী দাওয়া সেন্টার উম্মুল হামাম রিয়াদ সৌদি আরব, পৃষ্ঠা ২৩১ ↩︎
  4. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪২ ↩︎
  5. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪৩ ↩︎
  6. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪৪ ↩︎
  7. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠাঃ ৪৩৫ ↩︎