ভুল ভবিষ্যদ্বাণীঃ মদিনায় মহামারী প্রবেশ করবে না

ভূমিকা

ইসলামের বিভিন্ন হাদিসে বলা হয়েছে যে, মদিনা শহরে মহামারী বা প্লেগের মতো রোগ প্রবেশ করতে পারবে না, এবং এই শহর সব ধরনের মহামারী থেকে সুরক্ষিত থাকবে। নবী মুহাম্মদ -এর সময়কালে এমন দাবির ভিত্তিতে অনেকেই মনে করতেন যে, মদিনা একটি বিশেষ নিরাপদ স্থান, যেখানে আল্লাহর ইচ্ছায় কোন রোগ বা মহামারী আসবে না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, মদিনাতে বহুবার প্লেগ ও অন্যান্য মহামারীর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি, উমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামলেও মদিনায় মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বহু মানুষ এতে মৃত্যুবরণ করেছিল। এই ধরনের ঘটনার ফলে ইসলামের এইসকল মৌলিক বিশ্বাসগুলোর ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এবং এটি প্রমাণ করে যে, মদিনায় মহামারী প্রবেশ করবে না—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং অসত্য।

সাম্প্রতিককালের মহামারী কোভিড-১৯ এর সময়ও মদিনা শহরকে সম্পূর্ণরূপে লকডাউন করতে হয়েছিল এবং জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, মদিনা অন্যান্য শহর থেকে ভিন্ন কিছু নয়, একে পাহারা দেয়া বিশেষ কোন ফেরেশতা বাহিনীও নেই এবং এই শহর মহামারী থেকে মুক্ত নয়। সত্যিকার অর্থে এমন দাবি করার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক বা বাস্তবভিত্তিক যুক্তি নেই। ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আবেগের জায়গা থেকে এমন দাবি করা হয়তো কিছু মানুষের মনে এক ধরণের নিরাপত্তার অনুভূতি এনে দেয়, কিন্তু এই বিশ্বাসের ফলে মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর চরম আঘাত হানে। মহামারী প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরিবর্তে যদি মানুষ এমন অমূলক ধারণায় বিশ্বাসী হয়, তবে তা শুধু নিজেদের জীবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না, বরং গোটা সমাজকেই বিপদের মুখে ঠেলে দেবে। তাই, এই ধরনের হাস্যকর হাদিসের ওপর ভিত্তি করে বাস্তবতা অস্বীকার না করে, আমাদের উচিত বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা এবং প্রমাণের ওপর নির্ভর করে নিজেদের এবং সমাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

মদিনা শহরকে মহামারী থেকে সুরক্ষিত বলে বর্ণনা করা ইসলামী হাদিসের এই দাবি শুধু বাস্তবতার সাথেই সাংঘর্ষিক নয়, বরং এটি ধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের প্রচারও করে। যদি মদিনা সত্যিই মহামারী প্রবেশের জন্য নিষিদ্ধ থাকত, তবে কেন সেখানে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে প্লেগের মতো ভয়াবহ রোগ ছড়িয়েছে? কেন করোনার মতো মহামারী থেকে রক্ষা পেতে মদিনা শহরকে লকডাউন করতে হয়েছিল? এটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞানের কোনো নিয়মই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল নয়। রোগ ব্যাধি আল্লাহ বা ফেরেশতাদের তোয়াক্কা করে না। রোগ বা মহামারী কোন ধর্ম, স্থান বা জাতি নির্বিশেষে যে কোন স্থানে ছড়াতে পারে এবং তা প্রতিরোধের জন্য বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোন কার্যকর পন্থা নেই।


হাদিসের বর্ণনাসমূহ

আসুন দেখে নিই, ইসলামের এই বিশ্বাসের দলিলগুলো। নবী মুহাম্মদ ঘোষনা করেছিলেন, মদিনা শহরে কোনদিনই মহামারী বা প্লেগ প্রবেশ করবে না [1] [2]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৩০১. প্লেগ রোগের বর্ণনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫৩২০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৭৩১
৫৩২০। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসূফ (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদিনা নগরীতে প্রবেশ করতে পারবে না মাসীহ দাজ্জাল, আর না মহামারী।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৬/ জাহ্‌মিয়াদের মতের খণ্ডন ও তাওহীদ প্রসঙ্গ
পরিচ্ছেদঃ ৩১৩৩. আল্লাহ্‌র ইচ্ছা ও চাওয়া। মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ তোমরা ইচ্ছা করবে না যদি না আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করেন (৭৬ঃ ৩০)। আল্লাহ্‌ তা’আলার বাণীঃ তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর (৩ঃ ২৬)। মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ কখনই তুমি কোন বিষয়ে বলবে না, ‘আমি তা আগামী কাল করব, আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে,’ এ কথা না বলে (১৮ঃ ২৩-২৪)। মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ তুমি যাকে ভালবাস, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহ্‌ যাকে চান তাকে সৎপথে আনয়ন করেন। (২৮ঃ ৫৬)। সাঈদ ইব্নুল মুসাইয়্যাব (রহঃ) তাঁর পিতা মুসাইয়্যাব থেকে বলেন, উপরোক্ত আয়াত আবূ তালিব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। মহান আল্লাহ্‌র বাণীঃ আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্য কষ্টকর তা চান না (২ঃ ১৮৫)
৬৯৬৫। ইসহাক ইবনু আবূ ঈসা (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দাজ্জাল মদিনার উদ্দেশ্যে আসবে, তবে সে ফেরেশতাদেরকে মদিনা পাহারারত দেখতে পাবে। সুতরাং দাজ্জাল ও প্লেগ মদিনার কাছেও আসতে পারবে না ইনশা আল্লাহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)


হাদিসের ব্যাখ্যাসমূহ

এবারে আসুন এই হাদিসটির ব্যাখ্যা পড়ে নিই, [3]

মহামারী

হাদিসেই হাদিসের বিরোধ

একইসাথে বুখারী শরীফেরই আরেকটি সহিহ হাদিসেই বলা আছে, উমরের আমলেই মদিনায় ছড়িয়ে পরে। হাদিসটি পড়ার সময় লক্ষ্য করুন, উমরকে আমীরুল মুমিনীন সম্বোধন করা হয়েছে, যার অর্থ সময়টি উমরের খিলাফতে [4]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৪/ শাহাদাত
পরিচ্ছেদঃ ১৬৪৭. কারো সততা প্রমাণের ক্ষেত্রে ক’জনের সাক্ষ্য প্রয়োজন
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৪৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৬৪৩
২৪৬৭। মূসা ইবনু ইসমাঈল (রহঃ) … আবূল আসওয়াদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি মদিনায় আসলাম, সেখানে তখন মহামারী দেখা দিয়েছিল। এতে ব্যাপক হারে লোক মারা যাচ্ছিল। আমি উমর (রাঃ) এর কাছে বসাছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা অতিক্রম করলো এবং তার সম্পর্কে ভালো ধরনের মন্তব্য করা হল। তা শুনে উমর (রাঃ) বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। এরপর আরেকটি জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং তার সম্পর্কেও ভালো মন্তব্য করা হল। তা শুনে তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। এরপর তৃতীয় জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা হল। এবারও তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কি ওয়াজিব হয়ে গেছে, হে আমীরুল মু’মিনীন? তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলেছিলেন, আমি তেমন বললাম। (তিনি বলেছিলেন) কোন মুসলিম সম্পর্কে চার জন লোক ভাল সাক্ষ্য দিলে আল্লাহ্‌ তাঁকে জান্নাতে দাখিল করবেন। তিনি বললেন, তিনজন সাক্ষ্য দিলেও। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, দু’জন সাক্ষ্য দিলে? তিনি বললেন, দু’জন সাক্ষ্য দিলেও। এরপর আমরা একজনের সাক্ষ্য সম্পর্কে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবুল আসওয়াদ (রহঃ)


সাম্প্রতিককালে মহামারী

এবারে আসি সাম্প্রতিক সময়ে। দেখুন, মক্কা মদিনায় করোনার প্রাদুর্ভাবের সময় কারফিউ জাড়ি করেছিল সৌদি সরকার। কেন? সৌদি সরকারের কী হাদিসের প্রতি ঈমান নেই? নবী নিজে যেখানে বলেছেন, মদিনায় কখনো মহামারী প্রবেশ করবে না, সেখানে সৌদি সরকার কেন মদিনায় কারফিউ জাড়ি করবে? [5]। সেইসাথে, মদিনায় করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেল কীভাবে? [6]

মহামারী 1
মহামারী 3

রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি

যখন কোনো ধর্মীয় দাবি, ভবিষ্যদ্বাণী বা বক্তব্য তার স্বাভাবিক অর্থে (plain reading) বাস্তবতার সাথে মেলে না, তখন প্রায়শই “এটা আসলে রূপক”, “এলেগরি”, “ভিন্ন স্তরের অর্থ”, “ছোট সংস্করণ”, “ব্যক্তিগত প্রেক্ষিতভিত্তিক” বা “আধ্যাত্মিক অর্থে”—এই জাতীয় ব্যাখ্যা এনে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়। এই ব্যাখ্যাগুলো সাধারণত শুরুতে বলা হয় না; বরং ফলাফল জানার পরে ব্যর্থতার চাপ তৈরি হওয়ার পরে যোগ করা হয়। ফলে মূল বক্তব্যের স্পষ্ট অর্থ, সময়-সীমা এবং শর্তগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন অর্থ বসানো হয়—যা যুক্তিগতভাবে এড হক ফ্যালাসি (ad hoc fallacy) বা “পরবর্তী রক্ষাকবচ ব্যাখ্যা” হিসেবে পরিচিত।

এড হক ফ্যালাসি কী? এটি ঘটে যখন কোনো দাবি দুর্বল বা ভুল প্রমাণিত হওয়ার মুখে পড়লে, তাকে রক্ষা করার জন্য নতুন শর্ত, নতুন অর্থ বা নতুন ব্যাখ্যা যোগ করা হয়—যেগুলো (১) মূল বক্তব্য থেকে স্বাভাবিকভাবে উদ্ভূত হয় না, (২) স্বাধীন প্রমাণে দাঁড়ায় না, এবং (৩) দাবিটিকে এমনভাবে অস্পষ্ট করে যে আর তা ফালসিফাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দাবিটি আর পরীক্ষাযোগ্য থাকে না; এটি যেকোনো ফলাফলের সাথে “মিলিয়ে” নেওয়া যায়।

অনেকে “রূপক”কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, কারণ সাহিত্যে বা প্রাচীন গ্রন্থে রূপকের ব্যবহার আছে। কিন্তু যুক্তিতর্কে প্রশ্নটি ভিন্ন: এই রূপক-ব্যাখ্যা কি মূল বক্তব্যের ভাষা, কাঠামো, সময়-ইঙ্গিত এবং শ্রোতার স্বাভাবিক প্রত্যাশা থেকে যুক্তিযুক্তভাবে বের হয়? নাকি এটি কেবল ব্যর্থতা সামাল দিতে পরে যোগ করা হয়েছে? যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে “রূপক” আর সত্যিকারের ব্যাখ্যা নয়—এটি যুক্তিগত ফাঁকি হয়ে দাঁড়ায়।


এড হক উদ্ধার-ব্যাখ্যার সাধারণ কায়দা

  • অর্থ-স্থানান্তর (Meaning shift): মূল বক্তব্যে “X ঘটবে” বলা হয়েছে; না ঘটলে পরে বলা হয় “X মানে আসলে Y” বা “পূর্বের বক্তব্যে X বলতে আসলে Y বোঝানো হয়েছিল”। অথচ পূর্বে Y-এর কোনো ইঙ্গিত ছিল না।
  • গোলপোস্ট সরানো (Moving the goalposts): পরীক্ষার মানদণ্ড বদলে দেওয়া—যা আগে স্পষ্ট ও পরিমাপ্য ছিল, তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা।
  • বিশেষ শর্ত যোগ করা (Auxiliary assumptions): “শুধু এই শর্তে”, “আসলে ওই প্রেক্ষিতে”, “কেবল বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য”—এই ধরনের নতুন শর্ত যোগ করা, যার স্বাধীন ভিত্তি নেই।
  • সিলেক্টিভ পাঠ (Selective reading): বক্তব্যের অসুবিধাজনক অংশ (যেমন সময়-সীমা) বাদ দিয়ে কেবল সুবিধাজনক অংশ নিয়ে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো।
  • অব্যর্থতার পূর্বধারণা (Presumed infallibility): শুরুতেই ধরে নেওয়া যে বক্তব্য ভুল হতেই পারে না; তাই যেকোনো অমিলকে “বোঝা ভুল” বলে চালিয়ে দেওয়া।

বাস্তব উদাহরণসমূহ

উদাহরণ ১: বন্যার ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ বললেন, “আগামী বছর পৃথিবীব্যাপী মহাপ্লাবন হবে।” বছর শেষে কোনো বিশ্বব্যাপী বন্যা হলো না—কেবল কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিক মৌসুমি বন্যা। তখন বলা হলো, “পৃথিবী বলতে আমি আসলে ওই অঞ্চলই বুঝিয়েছিলাম” বা “এটা আসলে রূপক—মানুষের পাপের বন্যা”
বিশ্লেষণ: মূল বক্তব্যে “পৃথিবীব্যাপী” স্পষ্ট ছিল; পরে অর্থ সংকুচিত বা রূপক করা হলো। এটি গোলপোস্ট সরানো এবং অর্থ-স্থানান্তর উভয়ই। যদি শুরুতেই রূপক বা সীমিত অর্থ উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ভাষা সেভাবে নির্দিষ্ট হতো।

উদাহরণ ২: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনের আগে একজন নেতা বললেন, “আমি ক্ষমতায় এলে বেকারত্ব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনব।” ক্ষমতায় এসে বেকারত্ব কমল কিন্তু শূন্য হলো না। তখন বলা হলো, “আসলে আমি বুঝিয়েছিলাম যে বেকারত্ব অনেক কমবে” বা “এটা ছিল একটা রূপক—মানুষের মনের বেকারত্ব দূর করা”
বিশ্লেষণ: “শূন্যের কোঠায়” একটি পরিমাপ্য দাবি ছিল; পরে তাকে অস্পষ্ট করে ফেলা হলো। এটি ক্লাসিক গোলপোস্ট সরানো।

উদাহরণ ৩: বিনিয়োগের পরামর্শ
একজন বিশ্লেষক বললেন, “এই স্টকের দাম আগামী ছয় মাসে দ্বিগুণ হবে।” ছয় মাস পর দাম বাড়েনি। তখন বলা হলো, “আসলে ছয়মাস বলতে দীর্ঘ সময়কাল বুঝিয়েছিলাম” বা “দ্বিগুণ বলতে আমি মূল্যের বৃদ্ধি বুঝিয়েছিলাম”
বিশ্লেষণ: সময়-সীমা স্পষ্ট ছিল; পরে তা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এটি সিলেক্টিভ পাঠ এবং বিশেষ শর্ত যোগ করা।

উদাহরণ ৪: নস্ট্রাদামাস-স্টাইলের অস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী
কেউ একটি অস্পষ্ট কবিতা লিখলেন যাতে “আগামী বছর আগুনের পাখি আকাশ থেকে নামবে”। পরে কোনো বড় ঘটনা (যেমন বিমান দুর্ঘটনা) ঘটলে বলা হয়, “দেখো, এটাই পূরণ হয়েছে”। আবার বিমান দুর্ঘটনা না হয়ে যদি কোথাও উল্কাপাত হয়, তখন বলা হবে, দেখো ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেছে।
বিশ্লেষণ: অস্পষ্টতা থেকেই এড হক ব্যাখ্যা সহজ হয়; যেকোনো ঘটনার সাথে মিলিয়ে নেওয়া যায়। এটি দাবিকে চিরকাল “সত্য” রাখে কিন্তু কোনো প্রকৃত ভবিষ্যদ্বাণী ক্ষমতা প্রমাণ করে না।


কেন এটি যুক্তিগতভাবে গুরুতর সমস্যা?

যেকোনো নির্ভরযোগ্য দাবি বা জ্ঞানের জন্য তিনটি জিনিস অপরিহার্য: (১) স্পষ্ট অর্থ, (২) স্পষ্ট পরীক্ষার মানদণ্ড (ফালসিফায়েবিলিটি), (৩) ব্যর্থতার সম্ভাবনা স্বীকার করা। এড হক ব্যাখ্যা এই তিনটিকেই ধ্বংস করে। ফলে দাবিটি আর “ভুল হতে পারে” এই ঝুঁকি নেয় না—এটি সবসময় “সত্য” থাকে, কিন্তু কোনো নতুন তথ্য দেয় না। এটি যুক্তির পরিবর্তে মানসিক সান্ত্বনা দেয়।

যদি কোনো দাবি সত্যিই শক্তিশালী প্রমাণ বা যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে বারবার অর্থ পরিবর্তন বা উদ্ধার-ব্যাখ্যার প্রয়োজন কেন? এই প্রশ্নটিই এড হক ফ্যালাসির মূল দুর্বলতা প্রকাশ করে।


ডায়াগ্রাম: “না মেলা” থেকে “উদ্ধার-ব্যাখ্যা” — এড হক সাইকেল
ব্যবহারবিধি: এটি একটি সাধারণ বিশ্লেষণী ফ্রেমওয়ার্ক। যেকোনো দাবি/ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্লেষণ করতে “মূল পাঠ”, “পর্যবেক্ষণ” এবং “পরবর্তী ব্যাখ্যা” আলাদা করে দেখুন।
মূল দাবি/পাঠ যাচাই/পর্যবেক্ষণ অমিল/চাপ উদ্ধার-ব্যাখ্যা (Ad Hoc) ফলাফল/নীতিগত শিফট
ধাপ ১ মূল দাবি/স্বাভাবিক পাঠ
বক্তব্যটি সাধারণ শ্রোতার কাছে যে অর্থ দেয়—বিশেষ করে সময়-ইঙ্গিত, শর্ত এবং প্রত্যাশিত ফলাফল।
চেকলিস্ট: অর্থ স্পষ্ট? সময়-সীমা আছে? শ্রোতা কী বুঝবে?
ধাপ ২ সময়/বাস্তবতার পরীক্ষা
বাস্তবে কী ঘটলো? মূল প্রত্যাশিত অর্থে দাবিটি পূরণ হলো কি না।
চেকলিস্ট: পূর্বানুমান কী? পর্যবেক্ষণ কী?
ধাপ ৩ অমিল/ব্যাখ্যাগত চাপ
না মিললে চাপ তৈরি হয়—“তাহলে দাবিটি কীভাবে সত্য থাকবে?”
পথ দুটি: (ক) দাবি সংশোধন/প্রত্যাখ্যান, (খ) নতুন ব্যাখ্যা যোগ।
ধাপ ৪ উদ্ধার-ব্যাখ্যা (Ad Hoc)
নতুন অর্থ/শর্ত যোগ: “রূপক”, “ভিন্ন স্তর”, “ছোট সংস্করণ” ইত্যাদি।
রেড ফ্ল্যাগ: ব্যাখ্যা কি আগে থেকে স্পষ্ট? স্বাধীন প্রমাণ আছে?
ধাপ ৫ ফলাফল: দাবি অধরা হয়
দাবি আর স্পষ্টভাবে ভুল প্রমাণিত হয় না; পরীক্ষাযোগ্যতা হারায়।
নীতিগত শিফট: “ভুল নয় → বোঝা ভুল → নতুন অর্থই সত্য”।

ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

মদিনা শহরটি ফেরেশতা দ্বারা সুরক্ষিত এবং এখানে কোনো মহামারী প্রবেশ করবে না—মুহাম্মদের এই দাবিটি ঐতিহাসিক তথ্য এবং বাস্তবতার নিরিখে একটি স্পষ্ট মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়। প্রথমত, ইসলামের বর্ণনাগুলোতেই মদিনাকে একটি রোগাক্রান্ত এবং অস্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে পাওয়া যায়, যেখানে মুহাজিররা হিজরত করার পর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে মুহাম্মদ দোয়া করেছিলেন যাতে মদিনার সেই জ্বর বা রোগব্যাধি ‘আল-জুহফা’ নামক স্থানে স্থানান্তরিত হয়। যদি মদিনা সত্যিই অলৌকিকভাবে মহামারী থেকে সুরক্ষিত থাকতো, তবে সেখান থেকে রোগ সরানোর জন্য এমন দোয়ার কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে, মদিনা আদতে একটি সাধারণ ভৌগোলিক এলাকা ছিল যা অন্যান্য শহরের মতোই রোগব্যাধির শিকার হতো। উল্লেখ্য, হাদিসে কিন্তু এটি বলা নেই যে, মুহাম্মদ এই হাদিসটি বলার পর থেকেই তা কার্যকর হবে। হাদিসে যেহেতু বলা আছে মদিনা শহরের সাথে ফেরেশতাদের ঐশ্বরিক সুরক্ষা একীভূত, সেহেতু সেটি অতীত কালেও থাকার কথা।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক অপোলজিস্টরা ভবিষ্যদ্বাণীর এই ব্যর্থতা ঢাকতে ‘ত্বউন’ (প্লেগ) এবং ‘ওয়াবা’ (সাধারণ মহামারী)-র মধ্যে একটি কৃত্রিম পার্থক্য তৈরি করার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, মদিনায় ‘ত্বউন’ বা ব্যাকটেরিয়াঘটিত প্লেগ প্রবেশ করবে না, কিন্তু অন্য মহামারী প্রবেশ করতে পারে। এটি একটি ধ্রুপদী ‘এড-হক ফ্যালাসি’কারণ, ভাষাগতভাবে ‘ত্বউন’ হলো মহামারীরই একটি বিশেষ রূপ। যদি অলৌকিক পাহারাদার ফেরেশতারা কেবল নির্দিষ্ট একটি ব্যাকটেরিয়াকে (Yersinia pestis) চিনতে পারে এবং ভাইরাসঘটিত কোভিড-১৯ বা কলেরার মতো ভয়াবহ মহামারীগুলোকে মদিনায় প্রবেশ করতে দেয়, তবে সেই ‘সুরক্ষার’ কোনো বাস্তব বা প্রায়োগিক উপযোগিতা থাকে না। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মদিনায় কারফিউ জারি করা, মসজিদে নববী বন্ধ রাখা এবং অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হওয়া [7] এই তথাকথিত অলৌকিক সুরক্ষার দাবিকে চূড়ান্তভাবে নাকচ করে দেয়।

তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে ৭৪৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে হিজাজ অঞ্চলে প্লেগের প্রকোপ মদিনার জনজীবনকেও স্পর্শ করেছিল বলে অনেক ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন। ভৌগোলিকভাবে মদিনা একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং হজ্জের পথ হওয়ায় এটি সবসময়ই সংক্রামক ব্যাধির জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সুতরাং, ফেরেশতা দিয়ে মদিনা পাহারা দেওয়ার গালগল্পটি মূলত একটি কাল্পনিক আশ্বাসের অতিরিক্ত কিছু নয়, যা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সামনে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।


উপসংহার

এই আলোচনার সারকথা খুব সোজা: হাদিসগুলো “মদিনায় প্লেগ/মহামারী প্রবেশ করতে পারবে না”—এমন সরাসরি, সার্বজনীন ভাষায় কথা বলেছে। এমনকি “ফেরেশতা পাহারা”, “দাজ্জালও আসতে পারবে না”, “প্লেগও কাছে আসতে পারবে না”—ধরনের বিবরণ যুক্ত করে দাবিটিকে আরও শক্তভাবে ‘অলৌকিক সুরক্ষা’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। কিন্তু একই বুখারীর অন্য সহিহ বর্ণনায় উমরের খিলাফতের সময় মদিনায় মহামারীর প্রকোপ এবং ব্যাপক মৃত্যু উল্লেখ আছে—অর্থাৎ দাবিটির স্বাভাবিক পাঠ-এর সাথে হাদিসেই হাদিসের সংঘর্ষ তৈরি হয়। এর সাথে সাম্প্রতিক সময়ে মদিনায় কোভিড-১৯ সংক্রমণ, কারফিউ/লকডাউন—এসব বাস্তব ঘটনাও দেখায় যে মদিনা কোনো ‘প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে’ অবস্থিত শহর নয়। রোগের বিস্তার কোনো ধর্মীয় মর্যাদা, শহরের নাম, বা “পবিত্রতা” দেখে থেমে থাকে না; থামে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, চিকিৎসা, এবং বাস্তব প্রতিরোধকৌশলে।

এই অবস্থায় হাদিসকে “সঠিক প্রমাণ” করার তাগিদে সাধারণত যে পাল্টা-ব্যাখ্যাগুলো হাজির করা হয়—যেমন “এটা শুধু নির্দিষ্ট ধরনের প্লেগ”, “শহরের ভেতর বলতে কেবল হারাম/মসজিদ এলাকার কথা”, “পুরো মদিনা নয়, পুরনো সীমানা”, “এটা আসলে রূপক—আত্মিক মহামারী”, “মদিনায় রোগ ছিল কিন্তু ‘প্রবেশ’ করেনি”—এসবই মূলত এড হক উদ্ধার-ব্যাখ্যা। কারণ এই শর্তগুলো শুরুতে বলা হয়নি; বরং অমিল ধরা পড়ার পরে, ব্যর্থতার চাপ তৈরি হলে পরে যোগ করা হয়—শুধু বক্তব্যকে যেকোনোভাবে “মিলিয়ে” নেওয়ার জন্য। ফলে দাবিটি আর পরীক্ষাযোগ্য থাকে না; প্রতিবার বাস্তবতা ধাক্কা দিলে অর্থ বদলে ‘সত্য’ বানিয়ে নেওয়া যায়। যুক্তিবিচারে এটি কোনো অলৌকিক সত্যের প্রমাণ নয়; বরং দেখায় কীভাবে বিশ্বাসকে বাঁচাতে গোলপোস্ট সরানোঅর্থ-স্থানান্তর করা হয়।

তাই ন্যায্য সিদ্ধান্ত হলো: মদিনা-সুরক্ষার এই দাবিটি “ঐশী তথ্য” হিসেবে দাঁড় করাতে গেলে তা নিজস্ব বর্ণনা ও বাস্তবতার পরীক্ষায় টেকে না। আর যদি এটিকে “বিশ্বাস” হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে তাকে বিজ্ঞান-ইতিহাসের সাথে সংঘর্ষে না নামিয়ে রূপক/প্রতীক বলে শুরুতেই স্পষ্ট করা দরকার ছিল। কিন্তু যেহেতু বর্ণনাগুলো এমনভাবে বলা হয়নি, তাই এগুলোকে পরে রূপক বানানো বা সীমিত শর্ত জুড়ে দেওয়া—সবই ad hoc rescue; এবং সেটিই এই পুরো দাবিটির যুক্তিগত দুর্বলতা উন্মোচন করে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৩২০ ↩︎
  2. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৯৬৫ ↩︎
  3. সহীহ মুসলিম শরীফ (প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ বঙ্গানুবাদ), আল হাদিস প্রকাশনী, ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৯ ↩︎
  4. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৪৬৭ ↩︎
  5. করোনরাভাইরাস: কোভিড-১৯ ঠেকাতে মক্কা ও মদিনায় ২৪ ঘণ্টার জন্য কারফিউ জারি করেছে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ ↩︎
  6. পবিত্র মদিনাকে করোনামুক্ত ঘোষণা ↩︎
  7. সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কোভিড-১৯ পরিসংখ্যান, ২০২০ ↩︎