আস্তিকতা ও নাস্তিকতার জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদণ্ড

Table of Contents

ভূমিকা

মানুষ যখন কোনো একটি সুনির্দিষ্ট মতবাদ বা ধর্মকে—ধরা যাক ইসলামকে—‘পরম সত্য’ হিসেবে গ্রহণ করে, তখন অবচেতনেই সে একটি গভীর দার্শনিক সংকটের মুখোমুখি হয়। সংকটটি বিশ্বাসের নয়, সংকটটি হলো সেই বিশ্বাসকে যাচাই করার পদ্ধতির। একজন বিশ্বাসী যখন দাবি করেন যে তার ধর্মটি সত্য, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে: তিনি ঠিক কোন জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদণ্ড বা স্ট্যান্ডার্ড (Standard) ব্যবহার করে এই সত্যতা নিশ্চিত করেছেন? এই প্রবন্ধে আমরা যুক্তিবিদ্যা এবং জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে দেখব যে, কোনো সিস্টেমের (System) সত্যতা সেই সিস্টেমের নিজস্ব উপাদানের ভিত্তিতে যাচাই করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ, বাহ্যিক এবং সার্বজনীন মানদণ্ড। আমরা আরও বিশ্লেষণ করবো, কেন ধর্মের অভ্যন্তরীণ প্রমাণ বা ‘ইন্টারনাল ভ্যালিডেশন’ যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিতে একটি চক্রাকার বিভ্রান্তি বা ‘লজিক্যাল ফ্যালাসি’ তৈরি করে।

এই সংকটটি শুধুমাত্র ইসলামের সাথে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সকল ধর্মীয় ব্যবস্থায় প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, খ্রিস্টধর্মে যখন বলা হয় যে বাইবেল সত্য কারণ বাইবেলে লেখা আছে যে এটি ঈশ্বরের বাণী, তখনও একই সার্কুলার লজিক দেখা যায়। জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে, এই ধরনের দাবি একটি ‘এপিস্টেমিক সার্কুলারিটি’ (Epistemic Circularity) তৈরি করে, যা একটি সোর্সের রিলায়াবিলিটিকে তার নিজের প্রেমিস দিয়ে ডিফেন্ড করে। এই কুযুক্তিটি ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যেমন ইন্টারনেট এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলোসফিতে বর্ণিত। এই প্রবন্ধে আমরা এই ধারণাগুলোকে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করব, বিভিন্ন দার্শনিক যুক্তি, প্রমাণ এবং উদাহরণ সহ।


জ্ঞানতত্ত্বের প্রাথমিক সংকট: মানদণ্ড নির্ধারণের সমস্যা

জ্ঞানতত্ত্ব বা এপিস্টেমোলজি (Epistemology) হলো দর্শনের সেই শাখা, যা জ্ঞানের প্রকৃতি, উৎস এবং সত্যতা যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে [1]। যখন আমরা কোনো কিছুকে ‘সত্য’ বলে দাবি করি, বা নলেজ ক্লেইম করি, তখন আমাদের প্রমাণের দায় (Burden of Proof) মেটাতে হয়। কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা লক্ষ্য করা যায়। একজন মুসলিম যখন বলেন, “ইসলাম সত্য কারণ কোরআনে আল্লাহ বলেছেন এটি সত্য,” তখন তিনি মূলত যুক্তিবিদ্যার একটি সুপরিচিত ফ্যালাসি বা বিভ্রান্তির শিকার হন, যাকে বলা হয় ‘পিটিশো প্রিন্সিপি’ (Petitio Principii) বা ‘বেগিং দ্য কোশ্চেন’ (Begging the Question) [2]

এই বিভ্রান্তিটি ঘটে যখন সিদ্ধান্তের (Conclusion) সত্যতা প্রমাণের জন্য আশ্রয়বাক্যেই (Premise) সেই সিদ্ধান্তকে সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। সহজ কথায়, আপনি যা প্রমাণ করতে চাইছেন, তাকেই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করছেন। ইসলামের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যদি ইসলামেরই কোনো গ্রন্থ, বানী বা নিয়মকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তবে তা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। কারণ, এখানে আপনি ‘যাচাই’ করছেন না, বরং আপনার পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে ‘পুনরাবৃত্তি’ করছেন মাত্র। এই ধরনের সার্কুলার আর্গুমেন্ট রিলিজিয়াস ডিসঅ্যাগ্রিমেন্টে প্রায়শই দেখা যায়, যেমন অ্যান্ড্রু মুনের গবেষণায় বর্ণিত, যা ধর্মীয় বিতর্কে সার্কুলার রেসপন্সেসের সমালোচনা করে।

যেকোনো সিস্টেমের বৈধতা বা সত্যতা যাচাই করতে হলে, সেই সিস্টেমের বাইরে গিয়ে একটি মেটা-সিস্টেম (Meta-system) বা বাহ্যিক মানদণ্ড স্থাপন করা অপরিহার্য। গণিতবিদ কার্ট গোডেল তার বিখ্যাত ‘অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য’ (Incompleteness Theorems) দ্বারা প্রমাণ করেছিলেন যে, কোনো গাণিতিক সিস্টেম নিজের স্ববিরোধহীনতা বা সত্যতা নিজের নিয়মের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে প্রমাণ করতে পারে না [3]। ধর্মের ক্ষেত্রেও এই নীতিটি সমানভাবে প্রযোজ্য। যদিও গোডেলের থিওরেম প্রধানত অ্যারিথমেটিক সম্পর্কে, এর ফিলোসফিকাল ইমপ্লিকেশনস রিলিজিয়নে অ্যানালজি হিসেবে ব্যবহার হয়, যেমন সেল্ফ-রেফারেন্সিয়াল বিলিফ সিস্টেমস যা নিজের সত্যতা প্রমাণ করতে পারে না, হোফস্ট্যাডটারের ‘স্ট্রেঞ্জ লুপ’ ধারণার মতো। এটি দেখায় যে ধর্মীয় সিস্টেমও নিজের অভ্যন্তরীণ লজিক দিয়ে সম্পূর্ণ সত্যতা প্রমাণ করতে অক্ষম।

এছাড়া, দার্শনিক ডেভিড হিউমের স্কেপটিসিজম অনুসারে, জ্ঞানের উৎসগুলো (যেমন অভিজ্ঞতা বা রিজন) কখনো অ্যাবসলিউট সার্টেনটি দিতে পারে না, বিশেষ করে সুপারন্যাচারাল দাবিগুলোতে। এটি ধর্মীয় এপিস্টেমোলজিতে একটি অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ যোগ করে।


সত্য যাচাইয়ের লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক: অভ্যন্তরীণ বনাম বাহ্যিক

বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমরা দুটি বাস্তব ও ব্যবহারিক উদাহরণ বিশ্লেষণ করতে পারি, যা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কেন অভ্যন্তরীণ মানদণ্ড সত্য যাচাইয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। এছাড়া, আমরা আরও উদাহরণ যোগ করব যাতে ধারণাটি আরও স্পষ্ট হয়।

উদাহরণঃ থার্মোমিটারের প্যারাডক্স

কল্পনা করুন, আপনার হাতে একটি থার্মোমিটার আছে। থার্মোমিটারটি রিডিং দেখাচ্ছে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগল, “এই থার্মোমিটারটি কি সঠিক রিডিং দিচ্ছে? নাকি এটি নষ্ট?” – অর্থাৎ আমাদের নিদ্ধারণ করতে হবে, এই থার্মোমিটার যেই রিডিং দিচ্ছে তা সঠিক কিনা, বা এই থার্মোমিটারটি সঠিক রিডিং দিচ্ছে কিনা।

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আপনি যদি থার্মোমিটারটির পারদের উচ্চতা দেখেন, বা থার্মোমিটারটির গায়ে লেখা কোম্পানির ম্যানুয়াল পড়েন যেখানে লেখা আছে—‘এই থার্মোমিটার সর্বদা নির্ভুল’—তবে কি আপনার সন্দেহের নিরসন হবে? অবশ্যই না। এভাবে পরীক্ষা করা কী কোন যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে? না, হবে না। কারণ, থার্মোমিটারটি যদি নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে সে ভুল রিডিংই দেখাবে এবং ম্যানুয়ালের লেখা তখনো মিথ্যা সিদ্ধান্তের দিকেই আমাদের নিয়ে যাবে।

থার্মোমিটারটি সঠিক কি না, তা যাচাই করার জন্য আপনাকে অবশ্যই একটি ‘মাস্টার থার্মোমিটার’ বা ক্যালিব্রেশন স্ট্যান্ডার্ডের সাহায্য নিতে হবে, যা আগে থেকেই বিজ্ঞানাগারে প্রমাণিত। অথবা আপনাকে পানির হিমাঙ্ক (০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা স্ফুটনাঙ্কের (১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মতো এমন একটি বাহ্যিক ভৌত মানদণ্ড ব্যবহার করতে হবে, যা ওই নির্দিষ্ট থার্মোমিটারের মেকানিজমের ওপর নির্ভরশীল নয় [4]। এটিই যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

ধর্মের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। ইসলামের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে যদি আপনি কুরআনের আয়াত বা হাদিস ব্যবহার করেন, যেখানে হয়তো লেখা আছে যে, কোরআনের প্রতিটি শব্দ সত্য, তবে আপনি সেই নষ্ট থার্মোমিটারের মতোই আচরণ করছেন, যা নিজের সাক্ষ্য নিজেই দিচ্ছে। এই অ্যানালজি অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেমন কম্পিউটার সিস্টেম যাচাইয়ে বুটস্ট্র্যাপিং প্রসেস, যা এক্সটার্নাল ভ্যালিডেশন ছাড়া অসম্পূর্ণ।


উদাহরণঃ আদালতের দলিল ও সাক্ষ্য আইনের নিরপেক্ষতা

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি একটি দলিল আদালতে পেশ করে দাবি করলেন যে, “এই পুরো শহরের মালিকানা আমার।” বিচারক যখন প্রমাণের ভিত্তি চাইলেন, লোকটি বলল, “এই যে দেখুন আমার নিজেরই লিখিত এবং তৈরি করা দলিল, যেখানে স্পষ্টভাবে ৩ নম্বর ধারায় লেখা আছে যে, এই দলিলটি সম্পূর্ণ সত্য এবং সমস্ত শহরের মালিকানাই একমাত্র আমার, এবং এই বক্তব্যই চূড়ান্ত সত্য।”

কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের বিচারক কি এই যুক্তি মেনে নেবেন? কখনোই না। একটি দলিলের বৈধতা সেই দলিলের ভেতরের লেখার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে দলিলটি দেশের প্রচলিত আইন, সংবিধান এবং রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের (Registration Act) মতো বাহ্যিক আইনি কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তার ওপর [5]

ইসলাম বা যেকোনো ধর্ম যখন দাবি করে তারা ‘সত্য’, তখন সেই দাবিটি একটি দলিলের মতোই। সেই দাবির সত্যতা যাচাই করতে হলে, ধর্মগ্রন্থের বাইরে এসে যুক্তি, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, এবং বিজ্ঞানের মতো নিরপেক্ষ আদালতের কাঠগড়ায় তাকে দাঁড়াতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, খ্রিস্টধর্মের ক্ষেত্রে বাইবেলের ঐতিহাসিক নির্ভুলতা যাচাইয়ে আর্কিওলজিকাল প্রুফস ব্যবহার করতে হয়, না যে বাইবেলের দাবি নিজেই।


উদাহরণ ৩: সফটওয়্যার ভেরিফিকেশনের অ্যানালজি

আধুনিক প্রযুক্তির একটি উদাহরণ নেওয়া যাক: একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম যা দাবি করে যে এটি ভাইরাস-মুক্ত, কারণ প্রোগ্রামের কোডে লেখা আছে ‘আমি ভাইরাস-মুক্ত’। এটি যাচাই করতে গেলে, আপনি প্রোগ্রামটির নিজের কোড দেখবেন না, বরং একটি এক্সটার্নাল অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার বা সোর্স কোড অডিট ব্যবহার করবেন। এই অ্যানালজি দেখায় যে সেল্ফ-ডিক্লেয়ার্ড ভ্যালিডিটি অপর্যাপ্ত, এবং ধর্মীয় সিস্টেমেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।


ধার্মিকদের এপিস্টেমিক ভিত্তি: বিশ্বাসের বৃত্তাকার ফাঁদ

এখন প্রশ্ন হলো, একজন ধার্মিক ব্যক্তি কেন এই লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যুক্তির ভুলটি দেখতে পান না? এর কারণ তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি বা এপিস্টেমিক ফাউন্ডেশন (Epistemic Foundation) সাধারণ যুক্তিবাদী বা সংশয়বাদীদের চেয়ে ভিন্ন। ধার্মিকদের জ্ঞানের ভিত্তি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যা প্রায়শই যুক্তিবিদ্যার বাধার সৃষ্টি করে। আমরা এগুলোকে আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব, অতিরিক্ত উদাহরণ এবং গবেষণা সহ।

ঐশী বাণীর স্বতঃসিদ্ধতা (Presupposition of Divine Authority)

ধার্মিকরা তাদের ধর্মগ্রন্থকে ‘স্বতঃসিদ্ধ সত্য’ (Axiomatic Truth) হিসেবে ধরে নেন। জ্যামিতিতে যেমন আমরা ইউক্লিডের স্বতঃসিদ্ধগুলোকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়ে পরের উপপাদ্য প্রমাণ করি, ধার্মিকরা ঠিক একইভাবে ধর্মগ্রন্থের নির্ভুলতাকে ‘প্রাইমারি এক্সিয়ম’ বা প্রাথমিক স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করেন [6]। ফলে, তাদের কাছে যাচাইয়ের পদ্ধতিটি হয় নিম্নরূপ:

  • প্রেমিস ১: কোরআন আল্লাহর বাণী।
  • প্রেমিস ২: আল্লাহ কখনো মিথ্যা বলেন না।
  • সিদ্ধান্ত: অতএব, কোরআনের প্রতিটি কথা সত্য।

বা ধরুন,

  • প্রেমিস ১: কোরআন মিথ্যা হতে পারে না।
  • প্রেমিস ২: কোরআনে লেখা আছে “কোরআন সত্য”।।
  • সিদ্ধান্ত: অতএব, কোরআনের প্রতিটি কথা সত্য।

সমস্যা হলো, ‘প্রেমিস ১’ নিজেই একটি বিশাল দাবি, যার প্রমাণের প্রয়োজন। কিন্তু ধার্মিকরা এই প্রমাণটি এড়িয়ে যান, বা এই আর্গুমেন্টের সিদ্ধান্ত অংশটি ব্যবহার করেন প্রেমিস ১ কে বৈধতা দেয়ার জন্য, বা অনেক ক্ষেত্রে ‘ইমান’ (বিশ্বাস)-এর দোহাই দিয়ে যুক্তির পথ বন্ধ করে দেন। এই প্রিসাপোজিশন অ্যালভিন প্ল্যান্টিঙ্গার রিফর্মড এপিস্টেমোলজিতে দেখা যায়, কিন্তু ক্রিটিকস যেমন রিচার্ড ক্যারিয়ার এটিকে সার্কুলার বলে সমালোচনা করেন। উদাহরণ: ভ্যান টিলের প্রিসাপোজিশনালিজম, যা সার্কুলারিটিকে অ্যাক্সেপ্ট করে কিন্তু অপজিশন টু ক্রিশ্চিয়ানিটি হিসেবে দেখা হয়।


ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা (Subjective Religious Experience)

অনেক বিশ্বাসী দাবি করেন, তারা প্রার্থনার সময় এমন এক প্রশান্তি বা অলৌকিক কিছু অনুভব করেছেন, যা তাদের কাছে ধর্মের সত্যতার প্রমাণ। বা ধরুন ব্যক্তিগত জীবনে করিমের মা যখন অসুস্থ ছিলেন, করিম তখন পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে প্রার্থণা করেছেন বলে মা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। উইলিয়াম জেমস তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ভ্যারাইটিজ অফ রিলিজিয়াস এক্সপেরিয়েন্স’-এ দেখিয়েছেন যে, এই অনুভূতিগুলো অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক [7]

জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা ‘সাবজেক্টিভ রিয়েলিটি’ কখনোই ‘অবজেক্টিভ ট্রুথ’ বা বস্তুনিষ্ঠ সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। কারণ, একজন হিন্দুর কালিমন্দিরে যে আধ্যাত্মিক শিহরণ জাগে, একজন খ্রিস্টানের চার্চে বা একজন মুসলিমের কাবা শরীফে ঠিক একই ধরনের মস্তিষ্কের নিউরো-কেমিক্যাল প্রতিক্রিয়া (যেমন ডোপামিন বা সেরোটোনিন নিঃসরণ) ঘটে [8]। যদি ‘অনুভূতি’ সত্যের মাপকাঠি হয়, তবে পরস্পর বিরোধী সব ধর্মই সত্য হতে হয়—যা যুক্তিবিদ্যার ‘ল অব নন-কন্ট্রাডিকশন’ (Law of Non-Contradiction) লঙ্ঘন করে। উদাহরণ: একজন বৌদ্ধের মেডিটেশন অভিজ্ঞতা এবং একজন শামানের আধ্যাত্মিক যাত্রা, উভয়েই একই নিউরাল প্যাটার্ন দেখায় কিন্তু বিভিন্ন বিশ্বাস কনফার্ম করে।


নিশ্চয়তার বায়াস (Confirmation Bias)

মানুষের মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই এমন তথ্য খুঁজতে পছন্দ করে যা তার পূর্ববর্তী বিশ্বাসকে সমর্থন করে। একজন বিশ্বাসী যখন বিজ্ঞানের কোনো জটিল বিষয় দেখেন যা কুরআনের কোনো আয়াতের সাথে অস্পষ্টভাবে মিলে যায়, তিনি তৎক্ষণাৎ একে ‘মিরাকল’ বা অলৌকিকত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু যখন কুরআনের কোনো আয়াত সরাসরি প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের (যেমন বিবর্তনবাদ বা ভ্রূণতত্ত্ব) বিরোধিতা করে, তখন তিনি ‘রূপক অর্থ’ বা ‘ভুল ব্যাখ্যা’র আশ্রয় নেন। এই মানসিক প্রবণতাকে মনোবিজ্ঞানে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বলা হয় [9]। এই বায়াস বা পক্ষপাতিত্বের কারণে তারা বাইরের নিরপেক্ষ স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে ধর্মকে যাচাই করতে ব্যর্থ হন।

উদাহরণ: রিলিজিয়াস প্রেডিকশনস যেমন ‘প্রেয়ারের উত্তর’, যেখানে সাকসেসফুল কেসগুলো হাইলাইট করা হয় কিন্তু ফেলিওরস ইগনোর করা হয়। গবেষণায় দেখা যায় যে এই বায়াস রিলিজিয়াস বিলিফসের সার্ভাইভালে সাহায্য করে, যেমন BioLogos ফোরামে আলোচিত কগনিটিভ বায়াস। আরেক উদাহরণ: একজন খ্রিস্টান যখন বাইবেলের প্রফেসিগুলোকে কারেন্ট ইভেন্টসের সাথে ম্যাচ করে, কিন্তু কনট্রাডিক্টরি ইভেন্টসকে র্যাশনালাইজ করে।

বায়াসের ধরনরিলিজিয়াস উদাহরণপ্রভাব
কনফার্মেশন বায়াসধর্মগ্রন্থের সাথে মিলে যাওয়া সায়েন্টিফিক ফ্যাক্টস হাইলাইটবিশ্বাস শক্তিশালী হয়, কিন্তু কনট্রাডিকশন ইগনোর
অ্যাঙ্করিং বায়াসশৈশবে শেখা ধর্মীয় শিক্ষা সারাজীবন প্রভাবিত করেনতুন প্রমাণ অ্যাক্সেপ্ট করা কঠিন
গ্রুপথিঙ্কধর্মীয় কমিউনিটিতে একই বিশ্বাস শেয়ারআউটসাইড ভিউজ রিজেক্ট

নিরপেক্ষ মানদণ্ড: হিউম্যানিজম ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রস্তাবনা

যেহেতু আমরা দেখেছি যে ধর্মের অভ্যন্তরীণ মানদণ্ড অকার্যকর, তাই আমাদের এমন একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড’ প্রয়োজন যা সবার জন্য সমান এবং যা যাচাইযোগ্য। এই ক্ষেত্রে ‘মেথডোলজিক্যাল ন্যাচারালিজম’ (Methodological Naturalism) এবং ‘হিউম্যানিজম’ বা মানবতাবাদ দুটি শক্তিশালী বিকল্প প্রস্তাব করে। আমরা এগুলোকে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, অতিরিক্ত যুক্তি সহ।


সংশয়বাদ ও ফলসিফায়াবিলিটি (Falsifiability)

দার্শনিক কার্ল পপার বিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, কোনো তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিক বা সত্য হতে হলে সেটিকে অবশ্যই ‘মিথ্যা প্রমাণযোগ্য’ (Falsifiable) হতে হবে [10]। অর্থাৎ, এমন একটি পরীক্ষার সুযোগ থাকতে হবে, যার মাধ্যমে তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হতে পারে।

ইসলাম বা যেকোনো ধর্মের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, তারা তাদের দাবিগুলোকে এমনভাবে সাজায় যে তা ভুল প্রমাণ করার কোনো সুযোগ থাকে না। বৃষ্টি হলে বলা হয় ‘ঈশ্বরের রহমত’, খরা হলে বলা হয় ‘ঈশ্বরের পরীক্ষা’। এই ধরনের যুক্তিকে বলা হয় ‘নন-ফলসিফায়াবল’ বা যাচাই অযোগ্য। সত্য যাচাইয়ের সঠিক মেথড হলো—সন্দেহ করা এবং প্রশ্ন করা। ধর্মকে সত্য প্রমাণ করতে হলে তাকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, কার্বন ডেটিং, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এবং জেনেটিক্সের কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। উদাহরণ: কুরআনের সায়েন্টিফিক মিরাকলস দাবি, যা প্রায়শই ফলসিফায়েড হয় বিজ্ঞানীয় গবেষণায়, যেমন ভ্রূণতত্ত্বের বর্ণনা যা গ্রিক ফিলোসফারদের থেকে অনুপ্রাণিত।


জন লফটাসের ‘আউটসাইডার টেস্ট’ (The Outsider Test for Faith)

ধর্মের দর্শনে জন লফটাস একটি চমৎকার মেথড প্রস্তাব করেছেন, যার নাম ‘আউটসাইডার টেস্ট ফর ফেইথ’ (OTF)। এই মেথডটির মূল কথা হলো:

“আপনার নিজের ধর্মের সত্যতা যাচাই করার জন্য সেই একই সংশয়বাদী মানদণ্ড ও কঠোর যুক্তি ব্যবহার করুন, যা আপনি অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন” [11]

একজন মুসলিম যখন হিন্দু ধর্মের বহুঈশ্বরবাদ বা মূর্তিপূজাকে বাতিল করেন, তখন তিনি যুক্তি, সাধারণ বুদ্ধি এবং বিজ্ঞানের আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, “পাথরের মূর্তির কোনো ক্ষমতা নেই।” কিন্তু নিজের ধর্মের ক্ষেত্রে তিনি ব্ল্যাক স্টোন বা হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়াকে অলৌকিক বা পবিত্র মনে করেন। সেইসাথে তিনি এটিও মনে করেন, এই কালো পাথর কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর পাশে বসে মুমিন মুসলমানদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে [12]। আবার এই একই মুমিন হজ্বে গিয়ে শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর মারেন। সেখানে তিনি কোন পৌত্তলিকতা দেখেন না বা যুক্তির আশ্রয় নেন না। সত্য যাচাইয়ের নিরপেক্ষ স্ট্যান্ডার্ড দাবি করে যে, আপনি হিন্দু ধর্মের মূর্তিকে যে লজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডে বিচার করছেন, কাবার পাথরকেও সেই একই স্ট্যান্ডার্ডে বিচার করতে হবে। এটিই হলো নিরপেক্ষ বা ‘বাইরের’ স্ট্যান্ডার্ড। উদাহরণ: একজন খ্রিস্টান যখন ইসলামের প্রফেটকে স্কেপটিক্যালি দেখেন, কিন্তু জিসাসের মিরাকলসকে অ্যাক্সেপ্ট করেন বিনা প্রশ্নে।


নৈতিকতার হিউম্যানিস্ট মানদণ্ড

অনেকে বলেন, ধর্মই নৈতিকতার উৎস। কিন্তু প্লেটোর বিখ্যাত ‘ইউথাইফ্রো ডাইলেমা’ (Euthyphro Dilemma) এই ধারণাকে অনেক আগেই খণ্ডন করেছে [13] [14]। প্রশ্নটি হলো: “ঈশ্বর যা ভালো বলেন তা-ই কি ভালো? নাকি যা ভালো, ঈশ্বর তাকেই ভালো বলেন?”

যদি ঈশ্বর যা বলেন তা-ই ভালো হয় (ডিভাইন কমান্ড থিওরি), তবে ঈশ্বর যদি কাল হত্যার আদেশ দেন, তবে হত্যাও ‘ভালো’ বা ‘নৈতিক’ হয়ে যাবে—যা আমাদের বিবেক মেনে নেয় না। আর যদি ঈশ্বর ভালো কাজকে ভালো বলেন, তবে প্রমাণ হয় যে ‘ভালো-মন্দ’ বা নৈতিকতার একটি স্বতন্ত্র বাহ্যিক মানদণ্ড আছে, যা ঈশ্বরের আদেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই ডাইলেমার এক্সটেনশনস সেকুলার এথিক্সে দেখা যায়, যেমন রিচার্ড জয়েসের গবেষণায়, যা ডিভাইন কমান্ড থিওরিকে চ্যালেঞ্জ করে।

হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদ সেই বাহ্যিক মানদণ্ডটি সরবরাহ করে। এখানে নৈতিকতা যাচাই করা হয় মানুষের কল্যাণ (Well-being), ক্ষতি হ্রাস (Harm reduction), এবং সম্মতি (Consent)-এর ভিত্তিতে [15]। ইসলামের কোনো বিধান (যেমন: বহুবিবাহ, দাসপ্রথা বা ধর্মত্যাগের শাস্তি) সত্য বা সঠিক কি না, তা যাচাই করতে হলে কোরআনের আয়াতের দিকে না তাকিয়ে, আধুনিক মানবাধিকার এবং মানুষের সার্বজনীন কল্যাণের এই বাহ্যিক স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করতে হবে। উদাহরণ: ইউটিলিটারিয়ানিজম, যা জন স্টুয়ার্ট মিলের মতে, হ্যাপিনেস ম্যাক্সিমাইজ করে, ধর্ম-নিরপেক্ষভাবে।

নৈতিক সিস্টেমভিত্তিধর্ম-নিরপেক্ষতা
ডিভাইন কমান্ডঈশ্বরের আদেশনির্ভরশীল
হিউম্যানিজমমানুষের কল্যাণস্বতন্ত্র
ইউথাইফ্রো অপশন ১ঈশ্বর যা বলেন, তা ভালোঅ্যারবিট্রারি
ইউথাইফ্রো অপশন ২ভালো যা, ঈশ্বর তা বলেনবাহ্যিক স্ট্যান্ডার্ড

উপসংহার: সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা

পরিশেষে, ইসলাম বা যেকোনো ধর্মকে সত্য হিসেবে দাবি করার আগে আমাদের অবশ্যই জ্ঞানতাত্ত্বিক সততা (Epistemic Integrity) বজায় রাখতে হবে। নিজের তৈরি স্কেল দিয়ে নিজের উচ্চতা ১০ ফুট নির্ধারণ যেমন অর্থহীন, তেমনি ধর্মের তৈরি মানদণ্ড দিয়ে ধর্মের সত্যতা যাচাই করাও একটি যৌক্তিক বিভ্রান্তি।

সত্যিকারের অনুসন্ধানকারী তিনি, যিনি নিজের বিশ্বাসের বৃত্ত বা ‘ইকো চেম্বার’ (Echo Chamber) থেকে বেরিয়ে এসে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে জগতকে দেখার সাহস রাখেন। এই প্রক্রিয়ায় যদি দেখা যায় যে, লজিক, বিজ্ঞান এবং মানবিক মূল্যবোধের কষ্টিপাথরে যাচাই করার পর ধর্মের দাবিগুলো টিকছে না, তবে সেই সত্যকে মেনে নেওয়াই হলো প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সততা।

যাচাই করার পদ্ধতিটি হতে হবে ‘বটম-আপ’ (Bottom-up)—অর্থাৎ প্রমাণ থেকে সিদ্ধান্তের দিকে যাওয়া; ‘টপ-ডাউন’ (Top-down) নয়—যেখানে সিদ্ধান্ত আগে থেকেই স্থির করে জোরপূর্বক প্রমাণ মেলানোর চেষ্টা করা হয়। মনে রাখতে হবে, সত্য নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোনো বিশেষ সুরক্ষা বা পবিত্রতার বর্মের প্রয়োজন বোধ করে না; সত্য সবসময়ই প্রমাণের আগুনে পরীক্ষিত হতে প্রস্তুত। এই সততা বজায় রাখলে, ধর্মীয় বিতর্কগুলো আরও সুষম হয়, যেমন গোডেলের থিওরেমের ফিলোসফিকাল অ্যাপ্লিকেশনস দেখায় যে সিস্টেমসের লিমিটস অ্যাক্নোলেজ করা দরকার।


অবশ্য পাঠ্য


তথ্যসূত্রঃ
  1. Audi, R. (2010). Epistemology: A Contemporary Introduction to the Theory of Knowledge. Routledge. ↩︎
  2. Copi, I. M., & Cohen, C. (2009). Introduction to Logic. Pearson Education. ↩︎
  3. Gödel, K. (1931). On Formally Undecidable Propositions of Principia Mathematica and Related Systems. Monatshefte für Mathematik und Physik. ↩︎
  4. Chang, H. (2010). Inventing Temperature: Measurement and Scientific Progress. Oxford University Press. ↩︎
  5. Black’s Law Dictionary (10th ed. 2014). Thomson Reuters. ↩︎
  6. Plantinga, A. (2000). Warranted Christian Belief. Oxford University Press. ↩︎
  7. James, W. (1902). The Varieties of Religious Experience. Longmans, Green & Co. ↩︎
  8. Newberg, A. (2018). Neurotheology: How Science Can Enlighten Us About Spirituality. Columbia University Press. ↩︎
  9. Kahneman, D. (2011). Thinking, Fast and Slow. Farrar, Straus and Giroux. ↩︎
  10. Popper, K. (1959). The Logic of Scientific Discovery. Hutchinson & Co. ↩︎
  11. Loftus, J. W. (2013). The Outsider Test for Faith: How to Know Which Religion Is True. Prometheus Books. ↩︎
  12. হাজরে আসওয়াদ (কালোপাথর) সাক্ষ্য দিবে? ↩︎
  13. Plato. Euthyphro. (Translated by Benjamin Jowett). ↩︎

  14. ধর্ম ছাড়া নৈতিকতা শিখবো কীভাবে? ↩︎
  15. Kurtz, P. (1973). The Humanist Alternative: Some Definitions of Humanism. Prometheus Books. ↩︎