Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ও প্রাথমিক রাজনীতি
- 3 ইহুদি-বিদ্বেষ, দাঙ্গা ও ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন
- 4 নাৎসি জার্মানির সাথে প্রত্যক্ষ সংশ্লেষ: হিটলারের সাথে সাক্ষাৎ ও প্রোপাগান্ডা
- 5 মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে আদর্শিক ও রাজনৈতিক সেতুবন্ধ
- 6 ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন’ দাবির আড়ালে ইসলামপন্থী কর্তৃত্ববাদ
- 7 সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন: ইহুদি-বিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ ও উত্তরাধিকার
ভূমিকা
হাজ্জ আমিন আল-হুসাইনি (প্রায় ১৮৯৫/১৮৯৭–১৯৭৪) ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি (১৯২১–১৯৩৭) এবং পরে সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল-এর সভাপতি (১৯২২ থেকে) হিসেবে ফিলিস্তিনি আরব রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী—এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক চরিত্রগুলোর একজন। তিনি নিজেকে “জাতীয় মুক্তির নেতা” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও, বাস্তবে তার রাজনীতির প্রধান চালিকা ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্বকে রাজনৈতিক ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত করা, এবং ইহুদি অভিবাসন/জায়নবাদ-বিরোধিতাকে ক্রমে এমন এক জাতিগত-ধর্মীয় ঘৃণা (antisemitism) ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব-ভিত্তিক প্রচারে রূপ দেওয়া, যা বারবার সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে। [1] [2]
হুসাইনির ক্ষেত্রে “আলেম/ধর্মীয় নেতা” পরিচয়টি কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়—এটা ছিল এক ধরনের সাংগঠনিক ক্ষমতার লাইসেন্স। ব্রিটিশ প্রশাসন তাকে “শান্তি রাখার” শর্তে বৈধতা দিয়েছিল; কিন্তু তিনি সেই বৈধতাকে ব্যবহার করেছেন মুসলিম প্রতিষ্ঠান, ওয়াক্ফ-ফান্ড, ধর্মীয় শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থা কুক্ষিগত করে বিরোধী আরব নেতৃত্বকে কোণঠাসা করতে এবং “ধর্ম বিপন্ন”—এ ধরনের আবেগতাড়িত বয়ান দিয়ে জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। [3]
তার সবচেয়ে কালো অধ্যায় হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। তিনি কেবল “কূটনৈতিক যোগাযোগ” করেননি; বরং বার্লিন থেকে আরবি রেডিও-প্রচারের মাধ্যমে ইহুদিদের হত্যা/ধ্বংসের আহ্বান, ইহুদি বসতিগুলো ধ্বংস করার উসকানি, এসএস/ওয়াফেন-এসএসের জন্য মুসলিম নিয়োগ-প্রচেষ্টা, এমনকি যুদ্ধের সময় ইহুদি শিশুদের উদ্ধার-চেষ্টাও ঠেকাতে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছেন—যেখানে তিনি শিশুদের ফিলিস্তিনে যেতে না দিয়ে “পোল্যান্ডে” পাঠানোর প্রস্তাব দেন, যা কার্যত “কঠোর নিয়ন্ত্রণ” নামের আড়ালে মৃত্যু-প্রক্রিয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। [4]

এই কারণে হুসাইনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে “ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ” হিসেবে নির্দোষভাবে দেখানো ইতিহাস-নির্লজ্জতা। বরং তিনি দেখিয়েছেন—ধর্মীয় কর্তৃত্ব যখন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, বর্ণবিদ্বেষ, এবং সহিংসতার বৈধতা-উৎপাদনে পরিণত হয়, তখন একটি সমাজের মধ্যপন্থা, বাস্তববাদ এবং মানবিক রাজনীতি কীভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে।
শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ও প্রাথমিক রাজনীতি
আমিন আল-হুসাইনি জেরুজালেমের প্রভাবশালী আল-হুসাইনি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন—যে পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় প্রশাসনে প্রভাবশালী ছিল। তার ধর্মীয় পরিচয়ের সামাজিক পুঁজি (religious prestige) পরে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে মিশে যায়। [5]
তার শিক্ষাজীবনে কোরআনিক শিক্ষা, উসমানীয় স্কুলিং এবং বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির সংস্পর্শ—সবই ছিল; কিন্তু প্রশ্নটা “শিক্ষা” নয়, বরং তিনি সেই শিক্ষা ব্যবহার করেছেন আধুনিক রাজনৈতিক সংঘাতকে ধর্মীয় শত্রু-রূপকে রূপান্তর করতে। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উসমানীয় বাহিনীতে ছিলেন; পরে ব্রিটিশ-শাসিত প্রেক্ষাপটে আরব ঐক্যবাদ ও সিরিয়া-প্যালেস্টাইন একত্রীকরণের (pan-Syrian / pan-Arab) ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। [6]
১৯১৮ সালে তিনি জেরুজালেমে Arab Club (al-Nadi al-‘Arabi)-এর সভাপতি হন এবং বেলফোর ঘোষণার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-প্রচার সংগঠিত করেন। এখান থেকেই তার রাজনৈতিক কৌশল স্পষ্ট: তিনি জনতার আবেগকে “ধর্ম-জাতি-অস্তিত্ব” ফ্রেমে বেঁধে প্রতিপক্ষকে নৈতিকভাবে অমানুষ (demonize) করার পথে হাঁটেন—যা পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কাঁচামাল হয়ে ওঠে। [7]
তার উত্থানের সবচেয়ে বড় “অনৈতিক সুবিধা” ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের ভুল হিসাব। ব্রিটিশরা ধরে নিয়েছিল, তাকে বৈধতা দিলে তিনি শান্তি বজায় রাখবেন এবং আরব নেতৃত্বকে “ম্যানেজ” করা যাবে। বাস্তবে তিনি এই বৈধতাকে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান দখল ও ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণ ঘটান—এবং সংঘাতের তাপমাত্রাও বাড়ান। [8]
উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯২০ সালের দাঙ্গার পরও তিনি রাজনৈতিকভাবে “অপূরণীয়” হয়ে ওঠেন—কারণ ব্রিটিশদের সামনে আরব সমাজকে নিয়ন্ত্রণ/প্রশমনের মতো গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী কম ছিল, আর তিনি ছিল ক্ষমতা-লোভী, কৌশলী এবং জনতাকে উত্তেজিত করার দক্ষ কারিগর। এটাই ছিল তার “ক্যারিশমা”—কিন্তু এটি ছিল সমাজ-ধ্বংসী ক্যারিশমা।
ইহুদি-বিদ্বেষ, দাঙ্গা ও ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন
হুসাইনির রাজনীতিতে শুরুতে “জায়নবাদ-বিরোধিতা” থাকলেও দ্রুত তা ইহুদি জনগোষ্ঠীকে সমষ্টিগত শত্রু বানানো, তাদের বিরুদ্ধে “চিরশত্রু”, “ষড়যন্ত্রকারী”, “ধর্ম-ধ্বংসকারী”—এমন ভাষার দিকে ঢলে পড়ে। এই রূপান্তর গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক প্রকল্প (Zionism) নয়—লক্ষ্য হয়ে ওঠে মানুষ (Jews as Jews)। তার প্রধান অস্ত্র ছিল: মসজিদ-ভিত্তিক নেটওয়ার্ক, গুজব, এবং “পবিত্র স্থান বিপন্ন” ধরনের প্রমাণহীন আতঙ্ক। [9]
১৯২০ সালের নবী মূসা দাঙ্গা: উস্কানি ও সহিংসতার ‘রাজনৈতিক পুঁজি’
১৯২০ সালের ৪ এপ্রিল, নবী মূসা উৎসবের দিন, জেরুজালেমের ইহুদি কোয়ার্টারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। USHMM-এর সারাংশ অনুযায়ী, ওই দিন একাধিক বক্তৃতার মধ্যে হুসাইনির বক্তৃতাও ছিল—যেখানে তিনি ফিলিস্তিনকে সিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান, এবং বক্তৃতার পর চার দিন ধরে দাঙ্গা-লুটতরাজ চলে। এতে ৫ জন ইহুদি ও ৪ জন আরব নিহত হয় এবং ২১১ জন ইহুদি ও ৩৩ জন আরব আহত হয়। এরপর ব্রিটিশ সামরিক ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে উসকানির দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়; তিনি পালিয়ে সিরিয়ায় যান। [10]
এখানে লক্ষণীয় বিষয়টি হলো—এই সহিংসতা তাকে “রাজনৈতিক শহীদ” বানায়। পরে তিনি ক্ষমা পেয়ে (১৯২০ সালের শেষভাগে) ফিরে আসেন এবং ১৯২১ সালের ৮ মে তিনি মুফতি নিযুক্ত হন। অর্থাৎ, সহিংস উসকানির দায়ে দণ্ডিত একজন ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় ক্ষমতার শীর্ষে উঠে যায়—এটা কেবল ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়; এটা ছিল এক ধরনের “ইনসেনটিভ স্ট্রাকচার”, যেখানে দাঙ্গা-উস্কানি রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। [11]
১৯২৯ সালের দাঙ্গা: “আল-আকসা বিপন্ন” বয়ানের রাজনীতি
১৯২৯ সালের সহিংসতা শুরু হয় ওয়েস্টার্ন ওয়াল (Wailing Wall)–এ ইহুদিদের প্রবেশাধিকার নিয়ে উত্তেজনা থেকে, কিন্তু দ্রুতই তা আঞ্চলিক গণহিংসায় রূপ নেয়। USHMM-এর সারাংশ অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় ১৩৩ জন ইহুদি ও ১১৬ জন আরব নিহত হয়; আহত হয় ৩৩৯ জন ইহুদি ও ২৩২ জন আরব। [12]
এই অধ্যায়ে হুসাইনির ভূমিকা “ডকুমেন্টেড ইনসাইট”-সহ বোঝা জরুরি। USHMM বলছে, তিনি পরিকল্পিতভাবে এমন ধারণা (perception) তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন যে, ওয়ালের প্রশ্নটি নাকি আল-আকসা ও ডোম অফ দ্য রক-এর অস্তিত্বের ওপর হুমকি—অর্থাৎ তিনি রাজনৈতিক/সিভিল বিরোধকে ধর্মীয় অস্তিত্ববাদী সংঘাতে রূপ দেন। USHMM আরও বলে, তিনি সরাসরি দাঙ্গা উসকে দিয়েছেন—এটা “ডকুমেন্টেড” নয়; কিন্তু তিনি এটিকে থামানোর জন্য খুব একটা করেননি এবং রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন। এই “উসকানি বনাম দায় এড়ানো”—দুই-ধাপের কৌশলই ছিল তার স্বাক্ষর (signature) রাজনীতি। [13]
অর্থাৎ, তার প্রচারের নৈতিক প্রকৃতি খুব স্পষ্ট: তিনি দাবি করতেন “পবিত্র স্থান রক্ষা”—কিন্তু ফলাফল ছিল নিরস্ত্র মানুষের রক্তপাত, প্রাচীন সহাবস্থানের ভাঙন, এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘৃণার সামাজিক ভিত্তি নির্মাণ।
ব্রিটিশের সমর্থন, তারপর বিদ্রোহ: ১৯৩৬–১৯৩৯ এবং ক্ষমতার রাজনীতি
মুফতি ও সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিলের সভাপতি হওয়ার পর (১৯২২ থেকে) তিনি শারিয়াহ কোর্ট, ধর্মীয় স্কুল/অরফানেজের পাঠ্য, ওয়াক্ফ-ফান্ড—সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এই অর্থনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণই তাকে কেবল “ধর্মীয় নেতা” নয়, বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কেন্দ্র করে তোলে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে সমর্থন দিয়েছিল এই বিশ্বাসে যে তিনি শান্তি বজায় রাখবেন; কিন্তু সেই সমর্থন ছিল একটি ভুল বাজি। [14]
১৯৩৬–১৯৩৯-এর আরব বিদ্রোহে তিনি কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে ওঠেন; কিন্তু এই “নেতৃত্ব” ছিল আপোষহীন ও ধ্বংসাত্মক। তিনি সংঘাতকে এমন পর্যায়ে ঠেলে দেন যে ব্রিটিশরা শেষে তাকে পদচ্যুত করে, আরব হাই কমিটি ভেঙে দেয়, এবং ১৯৩৭ সালে তিনি পালিয়ে যান। USHMM-এর সারাংশ অনুযায়ী, ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশরা তাকে উপদ্রব/সাবভার্সনের সন্দেহে ধরতে চাইলে তিনি ডোম অফ দ্য রক-এর আশ্রয়ে যান; পরে লেবাননে পালান; ১৯৩৭-এর শেষদিকে তাকে পদচ্যুত করা হয় এবং ১৯৩৮ নাগাদ বিদ্রোহ ভেঙে পড়ে। [15]
এই পর্বটা দেখায়—হুসাইনি “স্বাধীনতার আন্দোলন”কে এমন এক কাঠামোয় বেঁধেছিলেন, যেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা (negotiation/compromise) ছিল “বিশ্বাসঘাতকতা”, আর মধ্যপন্থা ছিল “শত্রুর দালালি”—ফলে ফিলিস্তিনি রাজনীতির মধ্যে থেকেই আত্মঘাতী বিভাজন তৈরি হয়।
জায়নবিরোধিতা থেকে নাৎসি-ঘেঁষা ইহুদি-বিদ্বেষ: আদর্শিক অবক্ষয়
হুসাইনির ক্ষেত্রে “ইহুদি-বিদ্বেষ” ছিল কেবল আবেগ নয়—এটা ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক প্রযুক্তি। তিনি ইহুদি উপস্থিতিকে “ধর্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”, “উম্মাহর বিরুদ্ধে অস্তিত্বগত যুদ্ধ” ইত্যাদি ভাষায় ফ্রেম করে সমস্যাকে অমীমাংস্য করে তোলেন। এই রূপান্তরের চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায়—যখন তিনি ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদকে “প্রাকৃতিক মিত্র” ভাবতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত নাৎসি জার্মানির প্রোপাগান্ডা মেশিনে সক্রিয় অংশীদার হন। [16]
এটা এখানে জোর দিয়ে বলা দরকার: অনেকেই “উপনিবেশবিরোধিতা”র অজুহাতে ফ্যাসিবাদী সহযোগিতাকে ধোয়াধোয়া করতে চান। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল দেখায়, হুসাইনির সহযোগিতা “শুধু ব্রিটিশবিরোধী” ছিল না—এটি ছিল ইহুদি নিধন-সমর্থন ও ইহুদি উদ্ধার ঠেকানো পর্যন্ত বিস্তৃত। [17]
নাৎসি জার্মানির সাথে প্রত্যক্ষ সংশ্লেষ: হিটলারের সাথে সাক্ষাৎ ও প্রোপাগান্ডা
হুসাইনির নাৎসি-সহযোগিতা “গুজব” নয়—ডকুমেন্টেড। USHMM-এর মিডিয়া নোটে বলা আছে, তিনি ২৮ নভেম্বর ১৯৪১ বার্লিনে রাইখ চ্যান্সেলারিতে অ্যাডলফ হিটলার-এর সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করেন। সেখানে হিটলার প্রকাশ্য/গোপন আনুষ্ঠানিক চুক্তি দিতে এড়িয়ে গেলেও, তিনি “ইহুদি প্রশ্ন”-কে “সম্পূর্ণ ধ্বংস” পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এবং “আরব জগতে” ইহুদিদের নির্মূলকে ব্রিটিশদের “রক্ষাকবচ” ভাঙার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন। [18]
বার্লিনে তিনি নাৎসি পৃষ্ঠপোষকতায় আরবি রেডিও প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালান। USHMM বলছে, তার সম্প্রচারে তিনি আরব বিদ্রোহ ও ফিলিস্তিনের ইহুদি বসতি ধ্বংস-এর ডাক দেন। তিনি “বিশ্বব্যাপী ইহুদি ষড়যন্ত্র” (worldwide Jewish conspiracy) তত্ত্ব ছড়ান—যে তত্ত্ব অনুযায়ী ইহুদিরা ব্রিটেন-আমেরিকার সরকার, এবং সোভিয়েত কমিউনিজমও নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি ইহুদিদের ইসলাম-শত্রু হিসেবে চিত্রিত করেন, বর্ণবাদী ভাষায় “মাইক্রোব/ব্যাসিলাই” পর্যন্ত বলেন, এবং অন্তত এক বক্তৃতায় “যেখানেই পাওয়া যাবে হত্যা”র মতো বক্তব্যও তার নামে অ্যাট্রিবিউট করা হয়। [19]
.webp)
ডিসেম্বর ১৯৪২-এ বার্লিনে “Islamic Central Institute” উদ্বোধনে তার বক্তৃতায় তিনি কোরআনের নামে ইহুদিদের “মুসলমানদের অমীমাংস্য শত্রু” হিসেবে ফ্রেম করেন এবং দাবি করেন তারা “চক্রান্ত করে, যুদ্ধ বাধায়, জাতিকে জাতির বিরুদ্ধে লাগায়”—এবং এই বক্তব্য জার্মান সংবাদমাধ্যম ও আরবি সম্প্রচারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। [20]
তার দ্বিতীয় বড় ভূমিকা ছিল নাৎসি বাহিনীর জন্য মুসলিম নিয়োগ। USHMM অনুযায়ী, ১৯৪৩–৪৪ সালে তিনি এসএস-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং বোসনিয়া অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে নিয়োগচেষ্টায় যুক্ত হন; একই সঙ্গে অ্যাবভেয়ার/এসএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তর্ঘাতমূলক মিশন-পরিকল্পনাতেও জড়ান। [21]
সবচেয়ে জঘন্য হলো—ইহুদি শিশুদের উদ্ধার-চেষ্টা ঠেকানো। USHMM বলছে, ১৯৪৩ সালের বসন্তে তিনি জানতে পারেন কয়েকটি অক্ষশক্তি-সংশ্লিষ্ট দেশ (Hungary, Romania, Bulgaria) ও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে হাজার হাজার ইহুদি শিশুকে ফিলিস্তিনে নিরাপদে পাঠানোর আলোচনা চলছে। হুসাইনি এটিকে ঠেকাতে চিঠি/প্রতিবাদ করেন এবং শিশুদের ফিলিস্তিনে না পাঠিয়ে “পোল্যান্ডে” পাঠানোর প্রস্তাব দেন—যেখানে “stricter control” থাকবে। USHMM আরও উল্লেখ করে, তার পছন্দ যে শিশুদের পোল্যান্ডে “মেরে ফেলা” (killed) হওয়া—এটা কার্যত স্পষ্ট ছিল; যদিও ঐ চিঠিগুলোর বাস্তব প্রভাব সীমিত ছিল এবং নাৎসিরা নিজস্ব কারণে উদ্ধার-প্রক্রিয়া বানচাল করে। নৈতিক বিচারে কিন্তু এটি তাকে দায়মুক্ত করে না; বরং অভিপ্রায় ও অবস্থান স্পষ্ট করে। [22]
তার “ক্যাম্প ভিজিট” প্রসঙ্গে: USHMM উল্লেখ করে, ১৯৪২ সালের জুলাইয়ে তার ঘনিষ্ঠদের এক দলকে Oranienburg concentration camp-এ “tour” করানো হয়—যা ডকুমেন্টেড। কিন্তু আউশভিৎজ পরিদর্শন-সংক্রান্ত দাবিগুলো নিয়ে শক্ত প্রাইমারি প্রমাণ অনুপস্থিত; তাই এটিকে “বিতর্কিত/অপ্রমাণিত” হিসেবে রাখা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৎ অবস্থান। [23]
সারকথা: হুসাইনি ছিলেন নাৎসি জার্মানির “আরব প্রচার-সম্পদ” (propaganda asset), “অক্ষশক্তির মুসলিম নিয়োগ-সহযোগী”, এবং “ইহুদি উদ্ধার ঠেকানোর সক্রিয় পক্ষ”—এটা কেবল রাজনৈতিক সমালোচনা নয়; দলিলভিত্তিক ঐতিহাসিক মূল্যায়ন। [24]
মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে আদর্শিক ও রাজনৈতিক সেতুবন্ধ
হুসাইনি “প্যান-ইসলামিক” পরিচয়কে কেবল ধর্মীয় ঐক্যের বুলি হিসেবে ব্যবহার করেননি; তিনি এটাকে রাজনৈতিক মবিলাইজেশন (mobilization) ও নেতৃত্ব-দখলের কৌশল বানিয়েছিলেন। USHMM উল্লেখ করে, ১৯৩০-এর দশকে তিনি বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান এবং Muslim Brotherhood-এর মতো প্যান-ইসলামিক ধারার সঙ্গে সম্পর্কও গড়ে ওঠে—১৯৩৫ সালে ব্রাদারহুডের প্রতিনিধিরা ফিলিস্তিনে এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। [25]
এই “সেতুবন্ধ”কে রোমান্টিসাইজ করা খুব সহজ—কারণ “উপনিবেশবিরোধিতা” ও “ধর্মীয় সংহতি” শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু হুসাইনির ক্ষেত্রে এর ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, এটি ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ এবং ইহুদি-বিদ্বেষী ষড়যন্ত্রতত্ত্ব-কে রাজনৈতিক ধর্মভাষ্য হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলার প্রক্রিয়া। তিনি ধর্মীয় ইতিহাস/টেক্সটকে এমনভাবে ব্যবহার করেন যাতে “রাজনৈতিক বিরোধী” সহজে “ধর্মীয় শত্রু” হয়ে যায়—এটাই পরবর্তী অনেক র্যাডিকাল ধারার পরিচিত মেকানিজম। [26]
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: হুসাইনির সঙ্গে ইসলামপন্থী নেটওয়ার্কের সম্পর্ক মানেই “সব ইসলামপন্থী” একই—এমন সরলীকরণ নয়। কিন্তু ইতিহাসগতভাবে দেখা যায়, হুসাইনির ধাঁচের ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদ (যেখানে রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় ঘৃণায় রূপ দেওয়া হয়) মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ঘৃণার ভাষাকে দীর্ঘমেয়াদে পুষ্ট করেছে—এটা অস্বীকার করলে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়।
‘স্বাধীন ফিলিস্তিন’ দাবির আড়ালে ইসলামপন্থী কর্তৃত্ববাদ
হুসাইনি প্রকাশ্যে “স্বাধীনতা”র কথা বললেও তার শাসন-ধারণার বাস্তব অনুশীলন ছিল কর্তৃত্ববাদী ও একচেটিয়া। সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিলের মাধ্যমে তিনি শারিয়াহ কোর্ট, ধর্মীয় শিক্ষা, এবং ওয়াক্ফ-ফান্ডের মতো সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করেন—যা তাকে সমাজের উপর প্রাতিষ্ঠানিক দখল দেয়। USHMM দেখায়, এই ফান্ড-নিয়ন্ত্রণ তার প্রভাবকে কেবল ফিলিস্তিনে নয়, অন্যান্য আরব নেতৃত্বের কাছেও বড় করে তোলে। [27]
এই ক্ষমতার স্বভাবটাই ছিল দমনমূলক: প্রতিদ্বন্দ্বী আরব নেতৃত্বকে “আপোষকারী/বিশ্বাসঘাতক” হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা, এবং “ধর্ম বিপন্ন” জাতীয় আবেগ দিয়ে জনতাকে উসকে রাখা। তার লক্ষ্য ছিল কেবল ইহুদিদের বিরোধিতা নয়—আরব সমাজের মধ্যেই মধ্যপন্থা ও বিকল্প নেতৃত্বকে নিঃশেষ করা। ফলে যে আন্দোলন “জাতীয় মুক্তি”র কথা বলত, সেটাই ভিতর থেকে একনায়কতান্ত্রিক হয়ে পড়ে। [28]
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তার রাজনৈতিক ভূমিকা আবার ফিরে আসে, তবে “নেতৃত্ব” তখনও ছিল সংঘাত-প্রবণ। Palquest-এর সারাংশ অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালে তিনি মিসরে আশ্রয় নেন, পুনর্গঠিত Arab Higher Committee-র সভাপতি হন এবং ১৯৪৭ সালের UN Partition Resolution-এর বিরোধিতা করেন; ১৯৪৮ সালে গাজায় All-Palestine Government ঘোষণায় যুক্ত হন এবং Palestine National Council-এর সভাপতিত্ব করেন—কিন্তু এই কাঠামো বাস্তবে টেকসই ক্ষমতায় রূপ নেয়নি, এবং পরবর্তী সময়ে তার প্রভাব ক্ষয়ে যায়। [29]
অর্থাৎ, “স্বাধীন ফিলিস্তিন” হুসাইনির হাতে একদিকে ছিল রাজনৈতিক স্লোগান, অন্যদিকে ছিল একটি ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা—যেখানে সহাবস্থান, বহুমত, এবং নাগরিক রাজনীতি ছিল দুর্বল বা অনুপস্থিত।
সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন: ইহুদি-বিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ ও উত্তরাধিকার
ঐতিহাসিক দলিলের আলোকে হাজ্জ আমিন আল-হুসাইনিকে কেবল “ফিলিস্তিনি নেতা” হিসেবে দেখানো ভ্রান্ত চিন্তা। তিনি ছিলেন ইসলামী সন্ত্রাসবাদকে লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত করা একজন রাজনৈতিক উদ্যোক্তা, যিনি ধর্মীয় কর্তৃত্বকে ব্যবহার করেছেন ইহুদি-বিদ্বেষী প্রচার ছড়াতে এবং সহিংসতার সামাজিক বৈধতা তৈরি করতে। ১৯২০ সালে তিনি উসকানির দায়ে দণ্ডিত হন; ১৯২৯ সালে তিনি আল-আকসা/ডোম অফ দ্য রক “হুমকির মুখে”—এই ধারণা চাষ করে উত্তেজনা বাড়ান; এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তিনি নাৎসি প্রোপাগান্ডা মেশিনে গিয়ে ইহুদি-বিরোধী যুদ্ধভাষ্যকে ধর্মীয় ভাষায় অনুবাদ করে আরব-দুনিয়ায় সম্প্রচার করেন। [30] [31]
তার নাৎসি-সহযোগিতাকে “পলিটিক্যাল ট্যাকটিক্স” বলে হালকা করার সুযোগ নেই। USHMM স্পষ্ট করে যে, তিনি আরবি রেডিওতে ইহুদি বসতি ধ্বংস-এর আহ্বান জানান, “বিশ্ব ইহুদি ষড়যন্ত্র” তত্ত্ব ছড়ান, এবং ১৯৪৩ সালে ইহুদি শিশুদের উদ্ধার ঠেকাতে সক্রিয় হন—এবং শিশুদের “পোল্যান্ডে” পাঠানোর মতো প্রস্তাব দেন। এই অবস্থান তাকে ইতিহাসে নৈতিকভাবে নগ্ন করে দেয়। [32]
উপসংহারে, হুসাইনি ইতিহাসে একটি সতর্কবার্তা: “ন্যায্য দাবি”ও যখন ধর্মান্ধতা, বর্ণবিদ্বেষ ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জ্বালানি পায়—তখন তা মানবিকতা, বাস্তববাদ এবং সহাবস্থানের সম্ভাবনাকে গ্রাস করে ফেলে। এবং তখন নেতা হয়ে ওঠে সেই ব্যক্তি, যে শান্তি নয়—বরং ঘৃণা উৎপাদনে দক্ষ। এই উত্তরাধিকার আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভাষায় অনুরণিত। [33] [34]
তথ্যসূত্রঃ
- USHMM — “Hajj Amin al-Husayni: Arab Nationalist and Muslim Leader” ↩︎
- USHMM — “Hajj Amin al-Husayni: Wartime Propagandist” ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — “Hajj Amin al-Husayni: The Mufti of Jerusalem” (Media note) ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist (Efforts to Prevent Rescue of Jewish Children) ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist (Oranienburg tour reference) ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- Palquest — Overall Chronology (Haj Amin al-Husseini) ↩︎
- USHMM — Arab Nationalist and Muslim Leader ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- USHMM — Wartime Propagandist ↩︎
- Palquest — Overall Chronology ↩︎
