Table of Contents
ভূমিকা
সুরা কাহফে যুলকারনাইনের সফরের বর্ণনায় একটি বহুল আলোচিত বাক্য আছে—সূর্যকে “পঙ্কিল/কর্দমাক্ত জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখা”। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে সূর্যের বাস্তব “অস্ত যাওয়ার স্থান” কোনো জলাশয় হতে পারে না—কারণ সূর্য পৃথিবীর তুলনায় অসীম দূরবর্তী নক্ষত্র, আর সূর্যাস্ত/সূর্যোদয় হলো পর্যবেক্ষকের অবস্থানভিত্তিক দৃশ্যমান ঘটনা (horizon effect)। ফলে প্রশ্ন ওঠে: কোরআনের এই বর্ণনা কি সরাসরি “বাস্তব ঘটনার তথ্য” হিসেবে বলা হচ্ছে, নাকি এটি যুলকারনাইনের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি/অনুভব? এই বিতর্কে অনেকেই দাবি করেন—এটি নাকি যুলকারনাইনের ভাষ্য, আল্লাহর নয়। তাই আয়াতগুলোর বক্তব্য-ভঙ্গি (narrative voice) সতর্কভাবে পড়া জরুরি: কে বলছে, কার বক্তব্য উদ্ধৃত হচ্ছে, আর কোন অংশে “আমি/আমরা বললাম” ধরনের বাক্য দিয়ে বক্তা নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করছে।
কোরআনের আয়াত
নিচের উদ্ধৃতিগুলোতে (৮৩–৯০) প্রথমে ঘোষণামূলক বাক্য আসে—“আমি তার বিষয় তোমাদের নিকট বর্ণনা করব”—তারপর ধারাবাহিকভাবে “আমি/আমরা” সর্বনাম, “আমি বললাম/আমরা বললাম” ধরনের সরাসরি বক্তব্য এবং সফরের দৃশ্য-বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এগুলো হুবুহু পড়লে বোঝা যায়, বর্ণনাটি কেবল যুলকারনাইনের “রিপোর্ট” হিসেবে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়নি; বরং আখ্যানকার/বক্তার স্বর নিজেই গল্পটি “বলছে” এবং মাঝে মাঝে যুলকারনাইনের প্রতি নির্দেশও দিচ্ছে।
তোমাকে তারা যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘আমি তার বিষয় তোমাদের নিকট কিছু বর্ণনা করব।’
— Taisirul Quran
তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি বলে দাওঃ আমি তোমাদের নিকট তার বিষয় বর্ণনা করব।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তারা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে। বল, ‘আমি এখন তার সম্পর্কে তোমাদের নিকট বর্ণনা দিচ্ছি’।
— Rawai Al-bayan
আর তারা আপনাকে যুল-কারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে [১]। বলুন, ‘অচিরেই আমি তোমাদের কাছে তার বিষয় বর্ণনা করব।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আমি তাকে পৃথিবীতে আধিপত্য দান করেছিলাম আর তাকে সব রকমের উপায় উপাদান দিয়েছিলাম।
— Taisirul Quran
আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায় ও পন্থা নির্দেশ করেছিলাম।
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি তাকে যমীনে কর্তৃত্ব দান করেছিলাম এবং সববিষয়ের উপায়- উপকরণ দান করেছিলাম।
— Rawai Al-bayan
আমরা তো তাকে যমীনে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
একবার সে এক রাস্তা ধরল (অর্থাৎ একদিকে একটা অভিযান চালাল)।
— Taisirul Quran
সে এক পথ অবলম্বন করল।
— Sheikh Mujibur Rahman
অতঃপর সে একটি পথ অবলম্বন করল।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর সে এক পথ অবলম্বন করল।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
চলতে চলতে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে অস্বচ্ছ জলাশয়ে ডুবতে দেখল আর সেখানে একটি জাতির লোকেদের সাক্ষাৎ পেল। আমি বললাম, ‘হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার কিংবা তাদের সঙ্গে (সদয়) ব্যবহারও করতে পার।’
— Taisirul Quran
চলতে চলতে যখন সে সূর্যের অস্তগমন স্থানে পৌঁছল তখন সে সূর্যকে এক পংকিল পানিতে অস্ত যেতে দেখল এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললামঃ হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশেষে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে একটি কর্দমাক্ত পানির ঝর্ণায় ডুবতে দেখতে পেল এবং সে এর কাছে একটি জাতির দেখা পেল। আমি বললাম, ‘হে যুলকারনাইন, তুমি তাদেরকে আযাবও দিতে পার অথবা তাদের ব্যাপারে সদাচরণও করতে পার’।
— Rawai Al-bayan
চলতে চলতে সে যখন সূর্যের অস্ত গমন স্থানে পৌছল [১] তখন সে সূর্যকে এক পংকিল জলাশয়ে অস্তগমন করতে দেখল [২] এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল। আমরা বললাম, ‘হে যুল-কারনাইন! তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা এদের ব্যাপার সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তারপর সে আরেক পথ ধরল।
— Taisirul Quran
আবার সে এক পথ ধরল।
— Sheikh Mujibur Rahman
তারপর সে আরেক পথ অবলম্বন করল।
— Rawai Al-bayan
তারপর সে এক উপায় অবলম্বন করল,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
চলতে চলতে সে সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছল। সে সূর্যকে এমন এক জাতির উপর উদয় হতে দেখতে পেল, আমি যাদের জন্য সূর্য থেকে বাঁচার কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি।
— Taisirul Quran
চলতে চলতে যখন সে সূর্যোদয় স্থলে পৌঁছল তখন সে দেখলো – ওটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য সূর্য তাপ হতে আত্মরক্ষার কোন অন্তরাল আমি সৃষ্টি করিনি।
— Sheikh Mujibur Rahman
অবশেষে সে যখন সূর্যোদয়ের স্থানে এসে পৌঁছল তখন সে দেখতে পেল, তা এমন এক জাতির উপর উদিত হচ্ছে যাদের জন্য আমি সূর্যের বিপরীতে কোন আড়ালের ব্যবস্থা করিনি।
— Rawai Al-bayan
চলতে চলতে যখন সে সূর্যদয়ের স্থলে পৌছল তখন সে দেখল সেটা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে যাদের জন্য সূর্যতাপ হতে কোনো অন্তরাল আমরা সৃষ্টি করিনি;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আয়াতগুলোতে বক্তব্য কার?
উদ্ধৃতিগুলোর ভঙ্গি লক্ষ্য করলে দেখা যায়—আখ্যানকার “আমি/আমরা” ব্যবহার করে বলছে: “আমি তার বিষয় বর্ণনা করব”, “আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম”, “আমি বললাম/আমরা বললাম”। অর্থাৎ এখানে ধারাবাহিক বর্ণনা-স্বর (narrator voice) একটি কেন্দ্রীয় বক্তার অধীনে চলছে, এবং সেই বক্তা যুলকারনাইনকে উদ্দেশ করে কথাও বলছে। যদি “সূর্যকে পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখা” বাক্যটি কেবল যুলকারনাইনের ব্যক্তিগত ভাষ্য হিসেবে আলাদা করে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে সাধারণভাবে টেক্সটে তার জন্য আলাদা উদ্ধৃতি-চিহ্ন/সংলাপ-রূপ, বা “সে বলল/সে মনে করল” ধরনের স্পষ্ট সংকেত থাকার কথা—কিন্তু এখানে মূল বর্ণনার ধারা সেইভাবে ভাগ করা নয়।
এখানে একটি অতিরিক্ত বিষয়ও লক্ষ্যণীয়: “সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল/সূর্যোদয়ের স্থানে পৌঁছল”—এই ধরনের ভাষা নিজেই ভূগোল-ভিত্তিক/দৃশ্যমান অভিজ্ঞতার ভাষা। এই ভাষাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলাতে গেলে সাধারণত “দেখা” শব্দটিকে কেবল দৃশ্যমান প্রতীয়মান (appearance) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সেটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা কি না—তা নির্ভর করে টেক্সটের স্বাভাবিক পাঠ ও প্রসঙ্গ-রচনার ওপর।
রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি
যখন কোনো বক্তব্যকে প্রথম পাঠে যে অর্থ দেয়, সেই অর্থ বাস্তব জ্ঞানের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে—তখন অনেক সময় ব্যাখ্যা “উদ্ধার” করার প্রবণতা তৈরি হয়। এই উদ্ধার-ব্যাখ্যা সমস্যা হয় তখনই, যখন তা শুরুতে পাঠের অংশ হিসেবে উপস্থিত ছিল না, বরং অমিল ধরা পড়ার পরেই নতুন শর্ত/নতুন অর্থ যুক্ত করে “মিলিয়ে নেওয়া” হয়। যুক্তিবিদ্যায় এ ধরনের পরে-যোগ করা, প্রমাণহীন সহায়ক ব্যাখ্যাকে সাধারণত এড হক (ad hoc) বলা হয়—কারণ এটি দাবিকে যাচাইযোগ্য রাখে না; বরং দাবিকে এমনভাবে বদলে দেয় যাতে যেকোনো অবস্থায় “ঠিক” বলা যায়।
এই আয়াতের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়—কেউ যদি বলে, “এটা আসলে আল্লাহ বলছেন না, যুলকারনাইন বলছে”, বা “সূর্য সত্যিই জলাশয়ে ডোবে না, সে কেবল মনে করেছে/তার চোখে এমন লেগেছে”, অথবা “এটা রূপক”—তাহলে প্রশ্ন ওঠে: এই শর্তগুলো কি টেক্সটে শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল, নাকি অস্বস্তিকর বাক্যাংশকে আধুনিক জ্ঞানের সাথে মিলাতে গিয়ে পরে যোগ করা হলো? যদি পরে যোগ করা হয়, এবং টেক্সট নিজে সেই সীমাবদ্ধতা/রূপকতা পরিষ্কার না করে—তাহলে ব্যাখ্যাটি পাঠ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা না হয়ে “বাঁচানোর” কৌশলে পরিণত হয়।
উপসংহার
উদ্ধৃত আয়াতগুলো হুবুহু ধরলে দেখা যায়—বর্ণনাকার নিজেই “আমি/আমরা” বলে ঘটনাগুলো বর্ণনা করছে এবং যুলকারনাইনকে উদ্দেশ করে সিদ্ধান্তের বিকল্পও দিচ্ছে। এই ধারায় “সূর্যকে পঙ্কিল/কর্দমাক্ত জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখা”—বাক্যটি আলাদা করে যুলকারনাইনের ব্যক্তিগত ভাষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি; বরং একই ন্যারেটিভ ধারায় এসেছে। ফলে এটিকে “এটা আল্লাহর বর্ণনা নয়—শুধুই যুলকারনাইনের ভুল ধারণা” বলে নিশ্চিতভাবে দাঁড় করাতে গেলে টেক্সটের স্বাভাবিক পাঠ থেকে সরে এসে বাড়তি শর্ত যুক্ত করতে হয়।
এবং ঠিক এখানেই এড হক সমস্যাটি সামনে আসে: যদি এই আয়াতকে “নির্ভুল” প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে পরে বলা হয়—“আসলে সূর্য সত্যি জলাশয়ে অস্ত যায় না; কেবল তার চোখে এমন লেগেছে”, বা “এটা যুলকারনাইনের ভাষ্য”, বা “এটা রূপক”—তাহলে এসব ব্যাখ্যা শুরুতে বলা হয়নি এবং আয়াতগুলোর বয়ানভঙ্গিতেও তা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং অমিল ঢাকতে গিয়ে ব্যাখ্যাগুলো পরে ‘মিলিয়ে নেওয়ার’ জন্য দেওয়া হচ্ছে—এবং সেটিই এই ধরনের উদ্ধার-ব্যাখ্যাকে যুক্তিগতভাবে দুর্বল করে। অতএব, টেক্সটের স্বাভাবিক পাঠ ও আধুনিক জ্ঞানের সংঘর্ষে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা “পরবর্তী ব্যাখ্যার কসরত” দিয়ে ঢাকার বদলে—পাঠ, ভাষা ও দাবির যাচাইযোগ্যতার দিক থেকেই আলোচনা করা বেশি সঙ্গত।
