ইসলাম বলে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই

ভূমিকা

সহিহ হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই”—অর্থাৎ কোনো রোগ এক দেহ থেকে আরেক দেহে স্বাভাবিক নিয়মে সংক্রমিত হয় না; সবকিছু কেবল অলৌকিক ইচ্ছা ও অদৃশ্য সিদ্ধান্তের ফলে ঘটে। অর্থাৎ আল্লাহ তাকদীরে লিখে রাখলে রোগ হবে, আর তাকদীরে লিখে না রাখলে ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘষাঘষি করলেও কোন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবার এই একই ধর্মগ্রন্থের অনেক জায়গাতে বলা আছে, বিশেষ কিছু রোগী—বিশেষ করে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালিয়ে থাকা, দূরে থাকা, বা তাকে এড়িয়ে চলার নির্দেশনা। এই দুই অবস্থান একে অপরের সরাসরি বিরোধী। যদি সত্যিই “ছোঁয়াচে রোগ নেই” হয়, তবে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর প্রশ্নই ওঠে না; আর যদি কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে দূরে থাকা যৌক্তিক হয়, তবে রোগের সংক্রমণকে অস্বীকার করে কোনো অর্থ দাঁড়ায় না।

আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি এবং এপিডেমিওলজির (মহামারী-বিজ্ঞান) দৃষ্টিতে এই ধর্মীয় বক্তব্যগুলো শুধু ভুলই নয়, বরং বিপজ্জনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), CDC, ECDC, RKI—প্রায় সব আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য-সংস্থা একবাক্যে স্বীকার করে যে, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য প্যাথোজেন মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে; এটিই সংক্রামক রোগের মৌলিক বাস্তবতা। শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে, রক্তের মাধ্যমে, যৌন সংস্পর্শে, বা অন্যান্য পথে—মানুষ থেকে মানুষে রোগ সংক্রমণ আজ একটি কঠোরভাবে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। [1]

এই লেখার উদ্দেশ্য ধর্মীয় বিশ্বাসকে কঠোরভাবে বিচার করা। তাই এখানে আমরা বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা এবং মানবাধিকার-ভিত্তিক নৈতিকতার আলোকে দেখবো—ছোঁয়াচে রোগ অস্বীকারকারী ইসলামি বক্তব্যগুলো বাস্তবে কী ধরনের বিপদ তৈরি করে এবং কুষ্ঠরোগী থেকে পালাতে বললেও সংক্রমণ অস্বীকার করার ভেতরে কী ধরনের যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব লুকিয়ে আছে।


আলেমদের বক্তব্যঃ ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই

আসুন শুরুতেই সেই ওয়াজগুলো শুনে নিই,

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইসলামিক আলেমদের দায়িত্বহীনতা এবং বিজ্ঞানের প্রতি তাদের মধ্যযুগীয় অন্ধত্বের সাক্ষী হিসেবে রয়ে গেছে এই ভিডিওগুলো। দেখুন, কীভাবে টিকা বিরোধী মানসিকতা তৈরিতে এরা ভূমিকা রাখছে,


ছোঁয়াচে রোগ বিষয়ক হাদিসসমূহ

এবারে আসুন সেই হাদিসগুলো পড়ি [2] [3] [4] [5] [6] [7]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/২৫. ‘সফর’ পেটের পীড়া ছাড়া কিছুই না
৫৭১৭. আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের কোন সংক্রমণ নেই, সফরের কোন অশুভ আলামত নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন অশুভ আলামত নেই। তখন এক বেদুঈন বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা কেন হয়? সেগুলো যখন চারণ ভূমিতে থাকে তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগাগ্রস্ত উট এসে সেগুলোর পালে ঢুকে পড়ে এবং এগুলোকেও চর্ম রোগে আক্রান্ত করে ফেলে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে?
যুহরী হাদীসটি আবূ সালামাহ ও সিনান ইবনু আবূ সিনান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। [৫৭০৭; মুসলিম ৩৯/৩৩, হাঃ ২২২০, আহমাদ ৭৬২৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫২৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫১৯৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৭৭-[২] উক্ত রাবী (হুরায়রা (রাঃ) হতে) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের সংক্রমণ বলতে কিছুই নেই, কোন কিছুতে অশুভ নেই। প্যাঁচার মধ্যে কু-লক্ষণ নেই এবং সফর মাসেও কোন অশুভ নেই। তবে কুষ্ঠরোগী হতে পলায়ন করো, যেমন- তুমি বাঘ হতে পালিয়ে থাকো। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৫৭০৭, আল জামি‘উস্ সগীর ১৩৪৮৭, সহীহুল জামি‘ ৭৫৬০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৮২, ৭৮৩; আহমাদ ৯৭২২, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৪৫৪৩, মুসান্নাফ ‘আবদুর রায্যাক ১৯৫০৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৮০-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, রোগে ছোঁয়াচে লাগা, সফর মাস অশুভ হওয়া বা ভূত-প্রেতের ধারণার কোন অস্তিত্ব নেই। (মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : মুসলিম (২২২২)-১০৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১২৮, আহমাদ ১৫১০৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯১২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই, পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত তা সঠিক নয়, কোনো নক্ষত্রের নির্দিষ্ট তারিখে আকাশের কোনো স্থানে অবস্থান করলে বৃষ্টিপাত হয় এরূপ বিশ্বাসও ঠিক নয় এবং সফর মাসকে অশুভ মনে করবে না।[1]
সহীহ।
[1]. মুসলিম, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/৪৩. পশু-পাখি তাড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয়।
৫৭৫৩. ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে ও শুভ-অশুভ বলতে কিছু নেই। অমঙ্গল তিন বস্তুর মধ্যে স্ত্রীলোক, গৃহ ও পশুতে।[1] [২০৯৯; মুসলিম ৩৯/৩৪, হাঃ ২২২৫, আহমাদ ৪৫৪৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২২৯)
[1] কোন কোন স্ত্রীলোক স্বামীর অবাধ্য হয়। আবার কেউ হয় সন্তানহীনা। কোন গৃহে দুষ্ট জ্বিনের উপদ্রব দেখা যা, আবার কোন গৃহ প্রতিবেশীর অত্যাচারের কারণে অশান্তিময় হয়ে উঠে। গৃহে সালাত আদায় ও যিকর-আযকারের মাধ্যমে জ্বিনের অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কোন কোন পশু অবাধ্য বেয়াড়া হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯২১। সা’দ ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ পেঁচা অশুভ নয়, ছোঁয়াচে রোগ নেই এবং কোনো জিনিস অশুভ হওয়া ভিত্তিহীন। যদি কোনো কিছুর মধ্যে অশুভ কিছু থাকতো, তাহলে ঘোড়া, নারী ও বাড়ী এই তিন জিনিসের মধ্যে থাকতো।[1]
সহীহ।
[1]. আহমাদ। আহমাদ শাকির বলেনঃ এর সনদ; সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘দ ইবনু মালিক (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৩/ ভাগ্য গণনা ও ফাল নেয়া
পরিচ্ছেদঃ ৪. পাখীর দ্বারা শুভাশুভের ফাল নির্ধারণ সম্পর্কে।
৩৮৭২. কা’নবী (রহঃ) …. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়, না মৃতের খুলিতে পেঁচা থাকে, আর না দেউ-দানব রাস্তা ভুলিয়ে দেয় এবং না সফর মাস অমঙ্গলের।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাঃ মাইক্রোবায়োলজি ও ভাইরোলজি

মাইক্রোবায়োলজি আমাদের জানায়, অনেক রোগের মূল কারণ হলো অতি ক্ষুদ্র জীব—ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি। এগুলোকে আমরা প্যাথোজেন বলি। এরা দেহে প্রবেশ করে কোষে কোষে বসবাস করে, বংশবৃদ্ধি করে, এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে রোগ সৃষ্টি করে। এই মাইক্রোঅর্গানিজমগুলো যদি এক শরীর থেকে অন্য শরীরে চলে যায়, তখনই তা হয় “ছোঁয়াচে” বা সংক্রামক রোগ।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সংক্রমণ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়—যেমনঃ

রোগজীবাণু পৃথকীকরণ ও শনাক্তকরণ
রোগীর শরীর থেকে রোগজীবাণু আলাদা করা এবং ল্যাবরেটরিতে শনাক্ত করা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কোনো রোগের কারণ নিশ্চিত করতে প্রথমে সেই জীবাণুকে রোগীর দেহ থেকে সফলভাবে পৃথক করতে হয়।
নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংক্রমণ
একে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অন্য জীবের দেহে প্রবেশ করিয়ে একই রোগের লক্ষণ তৈরি করা। জীবাণুর কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য একটি সুস্থ ও সংবেদনশীল প্রাণীদেহে সেটি প্রবেশ করিয়ে একই রোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য।
পুনঃপৃথকীকরণ ও চূড়ান্ত যাচাই
পরবর্তীতে সেই দেহ থেকে আবার একই জীবাণু আলাদা করা ইত্যাদি। গবেষণাগারে সংক্রমিত প্রাণীদেহ থেকে পুনরায় সেই একই অণুজীব উদ্ধার করা গেলে তবেই জীবাণু তত্ত্বের যৌক্তিক চক্রটি পূর্ণ হয়।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলেরা, প্লেগ, গুটি বসন্ত, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, মিজেলস, এইচআইভি, ইবোলা, কোভিড-১৯—এসব রোগই বারবার প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে সংক্রমণ বাস্তব; একটি সংক্রামক প্যাথোজেন এক থেকে অন্য মানুষে ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট প্যাটার্নে মহামারী সৃষ্টি করে। WHO এবং অন্যান্য সংস্থা বারবার ব্যাখ্যা করেছে—শ্বাসযন্ত্রের রোগ যেমন কোভিড-১৯ মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির নিঃশ্বাস, কাশি, হাঁচি ইত্যাদি থেকে বের হওয়া শ্বাসকণার মাধ্যমে ছড়ায়।

এগুলোকে “কাকতালীয়”, “অলৌকিক” বা “স্রষ্টার খেয়াল” বা “তাকদীরের লিখন” বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না; কারণ এদের পিছনে কারণ-ফল সম্পর্ক স্পষ্টভাবে দেখানো গেছে। নির্দিষ্ট ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে টার্গেট করে তৈরি ভ্যাকসিন ব্যবহার করলে রোগের সংক্রমণ কমে; অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অনেক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিরাময় হয়; মাস্ক, দূরত্ব বজায় রাখা, ভিড় এড়ানো—এসব পদক্ষেপ নিলে রোগের গাণিতিক বিস্তার (R₀) কমে যায়। সবকিছু মিলিয়ে “ছোঁয়াচে রোগ বাস্তব”—এটি আজ বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণিত সত্যগুলোর একটি।


সংক্রমণ ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য মানদণ্ড

আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বা Public Health পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে এই স্বীকৃতির ওপর যে, একজনের আচরণ অন্যের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্যই WHO, জাতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কিছু মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করেছে:

আইসোলেশন (Isolation)
সংক্রামক রোগ শনাক্ত হলে আইসোলেশন – রোগীকে পৃথক করে রাখা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের প্রথম ও প্রধান ধাপ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত।
কোয়ারেন্টাইন (Quarantine)
রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকলে কোয়ারেন্টাইন – উপসর্গহীন কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আলাদা রাখা। ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা সুপ্তাবস্থা পার না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য বাহককে পর্যবেক্ষণে রাখা আধুনিক জনস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
টিকাদান (Vaccination)
Vaccination – আগে থেকে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা। গণটিকাদান কর্মসূচি ভাইরাসের বিস্তার রোধে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরিতে সাহায্য করে, যা রোগ ছড়ানোর সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
প্রতিরোধমূলক আচরণ
শ্বাসযন্ত্রের রোগে মাস্ক, বায়ু চলাচল, ভিড় এড়ানো ইত্যাদি। ড্রপলেট বা বায়ুবাহিত সংক্রামক কণা প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ ঠেকাতে ভৌত বাধা বা ব্যারিয়ার অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি।
ক্লিনিক্যাল প্রিকশনস
হাসপাতাল ও ক্লিনিকে standard precautions, contact precautions, droplet precautions, airborne precautions ইত্যাদি। চিকিৎসাক্ষেত্রে জীবাণু সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মাত্রার সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের এবং অন্যান্য রোগীদের ঝুঁকি কমানো হয়।

এর অর্থ হলো, রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব—সংক্রমণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করা, বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার না করা, এবং মানুষকে এমন কোনো ধারণা শেখানো থেকে বিরত থাকা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই” ধরনের বক্তব্য সরাসরি এই নীতিকে আঘাত করে। এটি মানুষকে ভুল নিরাপত্তাবোধ দেয়, যার ফলাফল হতে পারে অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু, অক্ষমতা, এবং বৃহৎ পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বিশেষ করে মহামারীর সময়—যেমন সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারী—যখন সংক্রমণ সম্পর্কে সামান্য অবহেলাও হাজার হাজার নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তখন ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে সংক্রমণ অস্বীকার করা বা তাকে গুরুত্বহীন দেখানো নীতিগতভাবে অপরাধের পর্যায়ে চলে যায়। WHO বারবার সতর্ক করেছে যে, ভুল তথ্য (misinformation) এবং ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক ভুল বিশ্বাস মহামারী নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে। [8]


ইসলামিস্টদের এড হক জোড়াতালি পিঠরক্ষা

যখন ‘রোগের কোন সংক্রমণ নেই’ শীর্ষক হাদিসগুলো আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞানের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং ইসলামেরই অন্যান্য হাদিস-নির্দেশের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে, তখন ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক ও আধুনিক আপোলজিস্টরা নানা ধরনের ‘এড হক’ (ad hoc) ব্যাখ্যা তৈরি করে মূল সমস্যাটিকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। এগুলো কোনো সুসংগত তাত্ত্বিক কাঠামো নয়, বরং শুধুমাত্র হাদিসের স্পষ্ট ভুলের কারণ ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হওয়া এবং সেই চাপ থেকে ইসলামকে বাঁচানোর জন্য কিছু তাৎক্ষণিক জোড়াতালি। নিচে এই চারটি প্রধান জোড়াতালির বিস্তারিত সমালোচনা করা হলো, প্রত্যেকটির সঙ্গে বাস্তব উদাহরণসহ।

প্রথম জোড়াতালি: “সংক্রমণ আছে, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কাজ করে না” এটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত যুক্তি। আপোলজিস্টরা বলেন, “হাদিসে ‘সংক্রমণ নেই’ বলতে বোঝানো হয়েছে যে, জীবাণু স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোগ ছড়াতে পারে না; সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাধীন।” কিন্তু এই যুক্তিটি একটি প্রকট যৌক্তিক ফাঁকিবাজি। ইসলামি আকিদা অনুসারে তো মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা—বজ্রপাত, ভূমিকম্প, এমনকি একটি পাতা পড়া পর্যন্ত—আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ঘটে না। তাহলে শুধু সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই কথা বলে কী লাভ? এটি মূল হাদিসের সরল অর্থকে পাশ কাটিয়ে যায়। উদাহরণ: ধরুন কেউ বলল, “আগুন কোনকিছু পোড়ায় না, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া পোড়াতে পারে না।” তাহলে কি আমরা আগুনে হাত দিতে পারি? না। এই কথারও আসলে তাই কোন বাস্তব অর্থ হয় না। তেমনি করোনাভাইরাস বা ইবোলা যদি আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ছড়াতে না পারে, তবু আমরা কেন মাস্ক পরি, কোয়ারেন্টাইন করি? এই ব্যাখ্যা বাস্তব জীবাণু-প্রতিরোধকে অর্থহীন করে দেয়।

দ্বিতীয় জোড়াতালি: বেদুইনের উটের চর্মরোগের ঘটনায় লজিক্যাল ফ্যালাসি হাদিসে (সহিহ বুখারি) বেদুইন জিজ্ঞাসা করে: “একটি উটের চর্মরোগ হলে অন্য উটগুলোকে কি দূরে রাখবো?” নবী বলেন, “না, সংক্রমণ নেই।” বেদুইন পাল্টা বললো, “সুস্থ উটের পালের মধ্যে কোনো চর্মরোগাক্রান্ত (খুজলি বা পাঁচড়া যুক্ত) উট আসলে যেমন পুরো পালটি সংক্রমিত হয়, তেমনি রোগ ছড়ায়”। তখন নবী বলেন “তাহলে প্রথম উটটিকে কে সংক্রমিত করল?” আপোলজিস্টরা এটিকে “চমৎকার যুক্তি” বলে উপস্থাপন করেন। আসলে এটি একটি ক্লাসিক রেড হেরিং (প্রসঙ্গান্তর) ফ্যালাসি। প্রথম উটটি যেভাবেই আক্রান্ত হোক (জেনেটিক মিউটেশন, পরিবেশগত কারণ বা অন্য কোনো উপায়ে), পরবর্তী উটগুলো যে সরাসরি প্রথম উট থেকে সংক্রমিত হয়েছে—এই বৈজ্ঞানিক সত্যটিকে প্রশ্নটি একেবারে অগ্রাহ্য করে। উদাহরণ: আধুনিক উদাহরণ হিসেবে ধরুন ২০১৪ সালের ইবোলা প্রাদুর্ভাব। প্রথম রোগীটি হয়তো বাদুড় থেকে সংক্রমিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী হাজারো মানুষ তো সেই প্রথম রোগী থেকেই ছড়িয়েছে। “প্রথমটিকে কে দিয়েছে?”—এই প্রশ্ন করে কি আমরা কন্টাক্ট ট্রেসিং বন্ধ করে দিতাম? না। কিন্তু হাদিসের এই প্রশ্নটি ঠিক সেই কাজটিই করে—সংক্রমণ-শৃঙ্খলকে অস্বীকার করে।

তৃতীয় জোড়াতালি: “কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ শুধু দুর্বল ঈমানের লোকদের জন্য” হাদিসে (সহিহ মুসলিম) বলা হয়েছে: “কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকো, যেমন সিংহ থেকে দূরে থাকো।” আধুনিক আপোলজিস্টরা বলেন, “এই নির্দেশ শুধু দুর্বল ঈমানের মুসলিমদের জন্য, যাতে তারা সংক্রমণ দেখে আল্লাহর ক্ষমতাকে অস্বীকার না করে। শক্তিশালী ঈমানদারের জন্য এটি প্রযোজ্য নয়।” এটি একটি পরিষ্কার বৈজ্ঞানিক ত্রুটিকে ধর্মীয় বয়ান দিয়ে আড়াল করার তাত্ত্বিক মেন্টাল জিমন্যাস্টিকস। এতে রোগ-প্রতিরোধের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়। উদাহরণ: মধ্যযুগে ইউরোপে কুষ্ঠরোগীদের আলাদা করা হয়েছিল বলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আজও হ্যানসেন’স ডিজিজ (কুষ্ঠ) চিকিৎসায় আইসোলেশন ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়। যদি কেউ “শক্তিশালী ঈমান” দেখিয়ে কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে মেলামেশা করে, তাহলে সে শুধু নিজেকে নয়, পুরো সমাজকে ঝুঁকিতে ফেলবে—যেমন আধুনিককালে করোনাকালে কিছু ধর্মীয় সমাবেশে দেখা গিয়েছিল। এই ব্যাখ্যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য বিপজ্জনক এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

চতুর্থ জোড়াতালি: “সংক্রমণ আছে, কিন্তু এর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই” কিছু আলেম বলেন, “জীবাণু আছে, সংক্রমণও আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই—সবই আল্লাহর ইচ্ছায়।” এটি একটি দ্বিমুখী অবস্থান: একদিকে বিজ্ঞানকে খুশি করার চেষ্টা, অন্যদিকে হাদিসের মূল দাবি (“সংক্রমণ নেই”) টিকিয়ে রাখা। আসলে এটি কোনো সুসংগত ব্যাখ্যা নয়, বরং একের পর এক নতুন জটিলতা তৈরি করে। কারণ যদি জীবাণুর “নিজস্ব ক্ষমতা” না থাকে, তাহলে কেন আমরা অ্যান্টিবায়োটিক খাই, ভ্যাকসিন নিই? উদাহরণ: ঠিক যেমন কেউ বলতে পারে, “গুলি মারে না, আল্লাহর ইচ্ছায় মারে”—তাহলে কি আমরা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরব না? বা “ভাইরাস ছড়ায় না, আল্লাহ ছড়ান”—তাহলে কেন ২০২০-২১ সালে বিশ্বজুড়ে লকডাউন, মাস্ক ও ভ্যাকসিনেশন করা হয়েছে? এই দ্বিমুখী ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত কোনো একক সত্যের দিকে নির্দেশ করে না, বরং হাদিসের ভুলকে আরও জটিল জোড়াতালির জালে আবদ্ধ করে।

সংক্ষেপে এই সব এড হক ব্যাখ্যাগুলোর মূল উদ্দেশ্য একটাই: হাদিসের আক্ষরিক অর্থকে বাঁচানো, যদিও তা বাস্তবতা ও বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে যুক্তি ও প্রমাণের পরিবর্তে কেবল ধর্মীয় আবেগ ও জটিল শব্দজাল তৈরি হয়। আধুনিক জনস্বাস্থ্যের জন্য এই ধরনের জোড়াতালি ক্ষতিকর, কারণ এটি মানুষকে বাস্তব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সত্যিকারের বিজ্ঞান ও যুক্তি যখন স্পষ্ট, তখন এই ধরনের পিঠরক্ষা শুধুমাত্র ধর্মীয় টেক্সটের দুর্বলতাকেই আরও প্রকট করে তোলে।


কুষ্ঠরোগঃ ইসলামী বক্তব্য বনাম বৈজ্ঞানিক তথ্য

ইসলামী হাদিস গ্রন্থগুলোতে কুষ্ঠরোগ বা “জুজাম” সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে; কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে বলা হয়েছে বাঘ থেকে পালানোর মতো করে। অর্থাৎ, একদিকে বলা হচ্ছে “ছোঁয়াচে রোগ নেই”, অন্যদিকে কুষ্ঠরোগীর থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে—যেন সেখানে সংক্রমণের আশঙ্কা আছে। এই দ্বৈততা বোঝার জন্য আগে কুষ্ঠরোগের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সংক্ষেপে দেখা দরকার।

কুষ্ঠরোগ বা Hansen’s disease–এর কারণ Mycobacterium leprae নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। WHO এবং CDC উভয়েই ব্যাখ্যা করেছে যে, untreated (চিকিৎসা না পাওয়া) কুষ্ঠরোগী যদি দীর্ঘদিন ধরে অন্য মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে—তখন তার নাক-মুখ থেকে নির্গত ড্রপলেটে থাকা ব্যাকটেরিয়া অন্যের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এই রোগ casual contact—যেমন শুধু করমর্দন, একবার একই ঘরে বসা, একই প্লেটে একবার খাওয়া—এসবের মাধ্যমে সাধারণত ছড়ায় না; বরং দীর্ঘমেয়াদি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ প্রয়োজন।

অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কুষ্ঠরোগ কম সংক্রামক, কিন্তু একেবারেই “অসংক্রামক” নয়। সংক্রমণ বাস্তব; তবে এর জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ও নির্দিষ্ট মাত্রার ঘনিষ্ঠতা লাগে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত বহু-ড্রাগ থেরাপি (MDT) শুরু করলে রোগী দ্রুতই সংক্রমণ ঘটানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে; ফলে সমাজে কুষ্ঠরোগের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। WHO কুষ্ঠরোগ নির্মূলের লক্ষ্যে বহু বছর ধরে গ্লোবাল প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে—এর পুরো ভিত্তিই হলো সংক্রমণ স্বীকার করা, রোগী সনাক্ত করা এবং চিকিৎসা দেওয়া।

সুতরাং “কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়”—এমন কথা বলা বিজ্ঞানবিরোধী। আবার “স্ত্রী, ঘরবাড়ি, পশুতে অশুভ থাকে, কিন্তু কুষ্ঠরোগী থেকে বাঘের মত পালাও”—এই ধরনের বক্তব্যও বৈজ্ঞানিকভাবে বিকৃত ও ভীতিপ্রচারমূলক। বাস্তবতা হলো: কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষ একজন রোগী—অপবিত্র জীব বা অশুভ সত্তা নয়; তাকে নিয়ে অশুভ কুসংস্কার ছড়ানো, সামাজিক বয়কট ও ঘৃণা তৈরি করা মানবাধিকারের বিরোধী।


“ছোঁয়াচে রোগ নেই” বনাম “কুষ্ঠরোগী থেকে পালাও”

এখন আসল দ্বন্দ্বটা স্পষ্ট করে দেখা যাকঃ

সংক্রমণ অস্বীকারের দাবি
একদল হাদিসে সরাসরি বলা হয়েছে—“কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়।” এই বর্ণনাটি আধুনিক জার্ম থিওরি বা জীবাণু তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত, যা প্রমাণ করে যে কোনো রোগের কারণ হিসেবে অদৃশ্য আধ্যাত্মিক প্রভাবের চেয়ে ভৌত সংক্রমণের গুরুত্বকে এখানে অস্বীকার করা হয়েছে।
সংক্রমণ এড়ানোর বিপরীত নির্দেশ
অন্যদিকে আরেকদল বর্ণনায় বলা হচ্ছে—কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে হবে, দূরে থাকতে হবে, তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। একই উৎসের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানটি প্রমাণ করে যে, সংক্রমণের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এবং ধর্মীয় দাবির মধ্যে একটি বড় ধরনের যৌক্তিক অসংগতি বিদ্যমান।

যদি সত্যিই “সংক্রমণ বলে কিছু নেই” হয়, তবে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর প্রয়োজন কেন? দুইটি অবস্থানের যে কোনো একটি সত্য হতে পারে, দুইটি একসাথে নয়।

ইসলামি আপোলজেটিকরা সাধারণত এখানে একটি ঘোলাটে ব্যাখ্যা আনে: “আসলেই ছোঁয়াচে নেই, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয়; আল্লাহ চাইলে কুষ্ঠরোগী থেকেও ছড়াবে না, আবার চাইলে সুস্থ লোক থেকেও ছড়াতে পারে; পালাতে বলাটা কেবল ‘কারণ অবলম্বন’।”—এই ব্যাখ্যা আসলে বৈজ্ঞানিক প্রশ্নকে ফাঁকি দেওয়া; কারণ:

বিজ্ঞানের প্রমাণযোগ্য অবস্থান
বিজ্ঞান জানতে চায়—কুষ্ঠরোগীর কাছাকাছি গেলে পরিসংখ্যানগতভাবে রোগ লাগার সম্ভাবনা কি বাড়ে? উত্তর: বাড়ে, এবং তা প্রমাণযোগ্য। পপুলেশন হেলথ এবং এপিডেমিওলজিক্যাল ডাটা অনুযায়ী ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি সরাসরি সংস্পর্শের ওপর নির্ভরশীল যা ল্যাবরেটরিতেও প্রমাণযোগ্য।
আপোলজেটিক ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা
আপোলজেটিক ব্যাখ্যা জানায়—আল্লাহ চাইলেই লাগবে, না চাইলে লাগবে না। অর্থাৎ কোনো testable বা verifiable দাবি নেই; ফলে বাস্তবে এর কোনো explanatory power নেই। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে ‘ফলসিফায়াবিলিটি’ বা ভুল প্রমাণ করার সুযোগ থাকা আবশ্যক, যা কেবল দৈব ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল দাবিতে অনুপস্থিত।

অন্যদিকে, যদি স্বীকার করা হয়—কুষ্ঠরোগীর কাছাকাছি থাকলে রোগ লাগার সম্ভাবনা বাড়ে, তাই পালাতে বলা হয়েছে—তাহলে স্বয়ং ধর্মীয় পাঠের ভেতর থেকেই “সংক্রমণ” ধারণা স্বীকৃত হয়ে যায়। তাহলে “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা সহিহ হাদিসগুলোকে মিথ্যা, ভুল, বা অন্তত বাতিলযোগ্য স্বীকার করতেই হয়। অর্থাৎ:

১) সংক্রমণ নেই → কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, অথবা ২) কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানো যৌক্তিক → সংক্রমণ বাস্তব → “ছোঁয়াচে রোগ নেই” ধরনের হাদিস ভুল।

সংক্রমণ অস্বীকার বনাম কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো: যুক্তিগত দ্বন্দ্ব দুটি পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে।
বিকল্প ১ সংক্রমণ অস্বীকার
১) যদি দাবি করা হয় “সংক্রমণ বলে কিছু নেই” [9]
⇒ তবে কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না
বিকল্প ২ পালানোকে যৌক্তিক ধরলে
২) যদি “কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো” জরুরি হয় [10]
⇒ তবে সংক্রমণ বাস্তব। এক্ষেত্রে প্রথম দাবিটি ভুল প্রমাণিত হয়

এই দুটো একসাথে সত্য হতে পারে না। এখানে “ধর্মের সম্মান রক্ষার” জন্য যতই জটিল ব্যাখ্যা বানানো হোক না কেন, লজিক্যালি এটি একটি ক্লাসিক সেল্‌ফ-কনট্রাডিকশন—একই সাথে P এবং not-P ধরে নেওয়ার চেষ্টা। বৈজ্ঞানিকভাবে এর অবস্থান আরও দুর্বল, কারণ আজ আমরা রোগজীবাণু, ড্রপলেট সংক্রমণ, এ্যারোসোল, ইনকিউবেশন পিরিয়ড, R₀ ইত্যাদি সবকিছুই পরীক্ষাগারে ও মাঠ-গবেষণায় পরিমাপ করতে পারি।


জনস্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও মানবাধিকার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “স্বাস্থ্য”কে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর দায়িত্ব বর্তায়—মানুষকে এমন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা, যেখানে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে তারা অপ্রয়োজনীয় রোগ ও মৃত্যুর শিকার হবে। সংক্রমণ অস্বীকারকারী ধর্মীয় কথা, ওয়াজ, খুতবা—এগুলো যখন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন এগুলো কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় থাকে না; সেগুলো সরাসরি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।

উদাহরণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারীর কথা ধরা যায়। বহু জায়গায় দেখা গেছে, ধর্মীয় নেতারা “ছোঁয়াচে রোগ নেই”, “সব আল্লাহর ইচ্ছা”, “মসজিদে এলে কিছু হবে না”—এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মানুষকে নিরাপত্তা নির্দেশ অমান্য করতে উৎসাহিত করেছেন। এর ফলে বহু লোক গাদাগাদি করে নামাজ, মাহফিল, জমায়েতে অংশ নিয়েছে, মাস্ক ব্যবহার ও দূরত্ব বজায় রাখাকে অবজ্ঞা করেছে—যার মূল্য দিতে হয়েছে বহু সংক্রমণ ও মৃত্যু দিয়ে।

নৈতিক প্রশ্নটি সোজা: কোনো মতবাদ যদি বাস্তবে মানুষের জীবন বাঁচানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই মতবাদকে সমালোচনা করা নৈতিক দায়িত্ব—শুধু অধিকার নয়। তার উৎস ধর্মগ্রন্থ হোক বা ঐতিহ্য—তা অন্ধভাবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য নয়। “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা হাদিসগুলো কেবল ভুলই নয়, এগুলোকে সত্য ধরে নিলে তা মানুষের জীবনের জন্য বিপজ্জনক। তাই নৈতিকভাবে এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা, বা অন্তত নগণ্য, অপ্রামাণ্য ও বাতিল ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।


উপসংহার

মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি এবং আধুনিক এপিডেমিওলজি পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়—সংক্রামক রোগ বাস্তব; মানুষের দেহে থাকা প্যাথোজেন বিভিন্ন পথে আরেক মানুষের দেহে চলে যায়, নির্দিষ্ট প্যাটার্নে রোগ ছড়ায়, মহামারী তৈরি করে। কুষ্ঠরোগ তুলনামূলকভাবে কম সংক্রামক হলেও একেবারে “অসংক্রামক” নয়; বরং দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলে তার ঝুঁকি থাকে, এবং WHO–সহ বিভিন্ন সংস্থা তা বহু গবেষণায় দেখিয়েছে।

এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে “কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়” বলা যে কোনো বক্তব্য সরাসরি বিজ্ঞানবিরোধী, জনস্বাস্থ্য-বিরোধী এবং নৈতিকভাবে দায়িত্বহীন। একইসাথে আবার কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে বলার মধ্যে এমন এক দ্বৈততা তৈরি হয়, যেখানে সংক্রমণকে অস্বীকারও করা হচ্ছে, আবার পরোক্ষে স্বীকৃতিও দেওয়া হচ্ছে। যৌক্তিকভাবে এটি একটি স্ববিরোধী অবস্থান; বৈজ্ঞানিকভাবে এর কোনো স্থান নেই।

অতএব, এই পুরো ইসলামী বক্তব্য—একদিকে “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা, আরেকদিকে “কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকো”—আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, WHO–এর নির্দেশনা, এবং মানবাধিকারের আলোকে অগ্রহণযোগ্য। মানবজীবন, স্বাস্থ্য, এবং বৈজ্ঞানিক সত্যের চেয়েও কোনো ধর্মীয় দাবির মূল্য বেশি হতে পারে না। কারও কথাকে “ধ্রুব সত্য” ধরে নিয়ে কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া একটি নির্মম ও অমানবিক কাজ—যতই তা “ধর্ম” নামে বিক্রি হোক না কেন।

বেশ কয়েকটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, নবী মুহাম্মদ বলেছেন যে, ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই। অথচ আধুনিক যেকোন সভ্য মানুষ মাত্রই জানেন, ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ অবশ্যই আছে, এই কিছুদিন আগেই করোনা নামক ছোঁয়াচে রোগে কোটি মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। লজ্জিত ইসলামিস্টগণ এই হাদিসগুলো এখন উলটে ফেলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু অনেক ইসলামিক আলেমই এখনো মনে করেন, নবীর এই হাদিস ধ্রুবসত্য! আসলেই ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই!

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. WHO, infection prevention and control; CDC, basics of infectious disease transmission ↩︎
  2. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৫৭৭ ↩︎
  3. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৫৮০ ↩︎
  4. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৯১২ ↩︎
  5. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫৭৫৩ ↩︎
  6. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৯২১ ↩︎
  7. সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭২ ↩︎
  8. WHO – infodemic management; COVID-19 misinformation ↩︎
  9. সহীহ বুখারী, ৫৭0৭ ↩︎
  10. সহীহ বুখারী, ৫৭৬৯ ↩︎