ইসলাম বলে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই

ভূমিকা

সহিহ হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই”—অর্থাৎ কোনো রোগ এক দেহ থেকে আরেক দেহে স্বাভাবিক নিয়মে সংক্রমিত হয় না; সবকিছু কেবল অলৌকিক ইচ্ছা ও অদৃশ্য সিদ্ধান্তের ফলে ঘটে। অর্থাৎ আল্লাহ তাকদীরে লিখে রাখলে রোগ হবে, আর তাকদীরে লিখে না রাখলে ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘষাঘষি করলেও কোন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবার এই একই ধর্মগ্রন্থের অনেক জায়গাতে বলা আছে, বিশেষ কিছু রোগী—বিশেষ করে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালিয়ে থাকা, দূরে থাকা, বা তাকে এড়িয়ে চলার নির্দেশনা। এই দুই অবস্থান একে অপরের সরাসরি বিরোধী। যদি সত্যিই “ছোঁয়াচে রোগ নেই” হয়, তবে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর প্রশ্নই ওঠে না; আর যদি কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে দূরে থাকা যৌক্তিক হয়, তবে রোগের সংক্রমণকে অস্বীকার করে কোনো অর্থ দাঁড়ায় না।

আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি এবং এপিডেমিওলজির (মহামারী-বিজ্ঞান) দৃষ্টিতে এই ধর্মীয় বক্তব্যগুলো শুধু ভুলই নয়, বরং বিপজ্জনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), CDC, ECDC, RKI—প্রায় সব আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য-সংস্থা একবাক্যে স্বীকার করে যে, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য প্যাথোজেন মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে; এটিই সংক্রামক রোগের মৌলিক বাস্তবতা। শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে, রক্তের মাধ্যমে, যৌন সংস্পর্শে, বা অন্যান্য পথে—মানুষ থেকে মানুষে রোগ সংক্রমণ আজ একটি কঠোরভাবে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। [1]

এই লেখার উদ্দেশ্য ধর্মীয় বিশ্বাসকে কঠোরভাবে বিচার করা। তাই এখানে আমরা বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা এবং মানবাধিকার-ভিত্তিক নৈতিকতার আলোকে দেখবো—ছোঁয়াচে রোগ অস্বীকারকারী ইসলামি বক্তব্যগুলো বাস্তবে কী ধরনের বিপদ তৈরি করে এবং কুষ্ঠরোগী থেকে পালাতে বললেও সংক্রমণ অস্বীকার করার ভেতরে কী ধরনের যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব লুকিয়ে আছে।


আলেমদের বক্তব্যঃ ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই

আসুন শুরুতেই সেই ওয়াজগুলো শুনে নিই,



তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইসলামিক আলেমদের দায়িত্বহীনতা এবং বিজ্ঞানের প্রতি তাদের মধ্যযুগীয় অন্ধত্বের সাক্ষী হিসেবে রয়ে গেছে এই ভিডিওগুলো। দেখুন, কীভাবে টিকা বিরোধী মানসিকতা তৈরিতে এরা ভূমিকা রাখছে,


ছোঁয়াচে রোগ বিষয়ক হাদিসসমূহ

এবারে আসুন সেই হাদিসগুলো পড়ি [2] [3] [4] [5] [6] [7]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/২৫. ‘সফর’ পেটের পীড়া ছাড়া কিছুই না
৫৭১৭. আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের কোন সংক্রমণ নেই, সফরের কোন অশুভ আলামত নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন অশুভ আলামত নেই। তখন এক বেদুঈন বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা কেন হয়? সেগুলো যখন চারণ ভূমিতে থাকে তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগাগ্রস্ত উট এসে সেগুলোর পালে ঢুকে পড়ে এবং এগুলোকেও চর্ম রোগে আক্রান্ত করে ফেলে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে?
যুহরী হাদীসটি আবূ সালামাহ ও সিনান ইবনু আবূ সিনান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। [৫৭০৭; মুসলিম ৩৯/৩৩, হাঃ ২২২০, আহমাদ ৭৬২৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫২৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫১৯৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৭৭-[২] উক্ত রাবী (হুরায়রা (রাঃ) হতে) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের সংক্রমণ বলতে কিছুই নেই, কোন কিছুতে অশুভ নেই। প্যাঁচার মধ্যে কু-লক্ষণ নেই এবং সফর মাসেও কোন অশুভ নেই। তবে কুষ্ঠরোগী হতে পলায়ন করো, যেমন- তুমি বাঘ হতে পালিয়ে থাকো। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৫৭০৭, আল জামি‘উস্ সগীর ১৩৪৮৭, সহীহুল জামি‘ ৭৫৬০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৮২, ৭৮৩; আহমাদ ৯৭২২, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৪৫৪৩, মুসান্নাফ ‘আবদুর রায্যাক ১৯৫০৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৮০-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, রোগে ছোঁয়াচে লাগা, সফর মাস অশুভ হওয়া বা ভূত-প্রেতের ধারণার কোন অস্তিত্ব নেই। (মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : মুসলিম (২২২২)-১০৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১২৮, আহমাদ ১৫১০৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯১২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই, পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত তা সঠিক নয়, কোনো নক্ষত্রের নির্দিষ্ট তারিখে আকাশের কোনো স্থানে অবস্থান করলে বৃষ্টিপাত হয় এরূপ বিশ্বাসও ঠিক নয় এবং সফর মাসকে অশুভ মনে করবে না।[1]
সহীহ।
[1]. মুসলিম, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/৪৩. পশু-পাখি তাড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয়।
৫৭৫৩. ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে ও শুভ-অশুভ বলতে কিছু নেই। অমঙ্গল তিন বস্তুর মধ্যে স্ত্রীলোক, গৃহ ও পশুতে।[1] [২০৯৯; মুসলিম ৩৯/৩৪, হাঃ ২২২৫, আহমাদ ৪৫৪৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২২৯)
[1] কোন কোন স্ত্রীলোক স্বামীর অবাধ্য হয়। আবার কেউ হয় সন্তানহীনা। কোন গৃহে দুষ্ট জ্বিনের উপদ্রব দেখা যা, আবার কোন গৃহ প্রতিবেশীর অত্যাচারের কারণে অশান্তিময় হয়ে উঠে। গৃহে সালাত আদায় ও যিকর-আযকারের মাধ্যমে জ্বিনের অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কোন কোন পশু অবাধ্য বেয়াড়া হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯২১। সা’দ ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ পেঁচা অশুভ নয়, ছোঁয়াচে রোগ নেই এবং কোনো জিনিস অশুভ হওয়া ভিত্তিহীন। যদি কোনো কিছুর মধ্যে অশুভ কিছু থাকতো, তাহলে ঘোড়া, নারী ও বাড়ী এই তিন জিনিসের মধ্যে থাকতো।[1]
সহীহ।
[1]. আহমাদ। আহমাদ শাকির বলেনঃ এর সনদ; সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘দ ইবনু মালিক (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৩/ ভাগ্য গণনা ও ফাল নেয়া
পরিচ্ছেদঃ ৪. পাখীর দ্বারা শুভাশুভের ফাল নির্ধারণ সম্পর্কে।
৩৮৭২. কা’নবী (রহঃ) …. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়, না মৃতের খুলিতে পেঁচা থাকে, আর না দেউ-দানব রাস্তা ভুলিয়ে দেয় এবং না সফর মাস অমঙ্গলের।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাঃ মাইক্রোবায়োলজি ও ভাইরোলজি

মাইক্রোবায়োলজি আমাদের জানায়, অনেক রোগের মূল কারণ হলো অতি ক্ষুদ্র জীব—ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি। এগুলোকে আমরা প্যাথোজেন বলি। এরা দেহে প্রবেশ করে কোষে কোষে বসবাস করে, বংশবৃদ্ধি করে, এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে রোগ সৃষ্টি করে। এই মাইক্রোঅর্গানিজমগুলো যদি এক শরীর থেকে অন্য শরীরে চলে যায়, তখনই তা হয় “ছোঁয়াচে” বা সংক্রামক রোগ।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সংক্রমণ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়—যেমনঃ

রোগজীবাণু পৃথকীকরণ ও শনাক্তকরণ
রোগীর শরীর থেকে রোগজীবাণু আলাদা করা এবং ল্যাবরেটরিতে শনাক্ত করা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কোনো রোগের কারণ নিশ্চিত করতে প্রথমে সেই জীবাণুকে রোগীর দেহ থেকে সফলভাবে পৃথক করতে হয়।
নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংক্রমণ
একে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অন্য জীবের দেহে প্রবেশ করিয়ে একই রোগের লক্ষণ তৈরি করা। জীবাণুর কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য একটি সুস্থ ও সংবেদনশীল প্রাণীদেহে সেটি প্রবেশ করিয়ে একই রোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য।
পুনঃপৃথকীকরণ ও চূড়ান্ত যাচাই
পরবর্তীতে সেই দেহ থেকে আবার একই জীবাণু আলাদা করা ইত্যাদি। গবেষণাগারে সংক্রমিত প্রাণীদেহ থেকে পুনরায় সেই একই অণুজীব উদ্ধার করা গেলে তবেই জীবাণু তত্ত্বের যৌক্তিক চক্রটি পূর্ণ হয়।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলেরা, প্লেগ, গুটি বসন্ত, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, মিজেলস, এইচআইভি, ইবোলা, কোভিড-১৯—এসব রোগই বারবার প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে সংক্রমণ বাস্তব; একটি সংক্রামক প্যাথোজেন এক থেকে অন্য মানুষে ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট প্যাটার্নে মহামারী সৃষ্টি করে। WHO এবং অন্যান্য সংস্থা বারবার ব্যাখ্যা করেছে—শ্বাসযন্ত্রের রোগ যেমন কোভিড-১৯ মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির নিঃশ্বাস, কাশি, হাঁচি ইত্যাদি থেকে বের হওয়া শ্বাসকণার মাধ্যমে ছড়ায়।

এগুলোকে “কাকতালীয়”, “অলৌকিক” বা “স্রষ্টার খেয়াল” বা “তাকদীরের লিখন” বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না; কারণ এদের পিছনে কারণ-ফল সম্পর্ক স্পষ্টভাবে দেখানো গেছে। নির্দিষ্ট ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে টার্গেট করে তৈরি ভ্যাকসিন ব্যবহার করলে রোগের সংক্রমণ কমে; অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অনেক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিরাময় হয়; মাস্ক, দূরত্ব বজায় রাখা, ভিড় এড়ানো—এসব পদক্ষেপ নিলে রোগের গাণিতিক বিস্তার (R₀) কমে যায়। সবকিছু মিলিয়ে “ছোঁয়াচে রোগ বাস্তব”—এটি আজ বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণিত সত্যগুলোর একটি।


সংক্রমণ ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য মানদণ্ড

আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বা Public Health পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে এই স্বীকৃতির ওপর যে, একজনের আচরণ অন্যের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্যই WHO, জাতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কিছু মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করেছে:

আইসোলেশন (Isolation)
সংক্রামক রোগ শনাক্ত হলে আইসোলেশন – রোগীকে পৃথক করে রাখা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের প্রথম ও প্রধান ধাপ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত।
কোয়ারেন্টাইন (Quarantine)
রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকলে কোয়ারেন্টাইন – উপসর্গহীন কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আলাদা রাখা। ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা সুপ্তাবস্থা পার না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য বাহককে পর্যবেক্ষণে রাখা আধুনিক জনস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
টিকাদান (Vaccination)
Vaccination – আগে থেকে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা। গণটিকাদান কর্মসূচি ভাইরাসের বিস্তার রোধে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরিতে সাহায্য করে, যা রোগ ছড়ানোর সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
প্রতিরোধমূলক আচরণ
শ্বাসযন্ত্রের রোগে মাস্ক, বায়ু চলাচল, ভিড় এড়ানো ইত্যাদি। ড্রপলেট বা বায়ুবাহিত সংক্রামক কণা প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ ঠেকাতে ভৌত বাধা বা ব্যারিয়ার অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি।
ক্লিনিক্যাল প্রিকশনস
হাসপাতাল ও ক্লিনিকে standard precautions, contact precautions, droplet precautions, airborne precautions ইত্যাদি। চিকিৎসাক্ষেত্রে জীবাণু সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন মাত্রার সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের এবং অন্যান্য রোগীদের ঝুঁকি কমানো হয়।

এর অর্থ হলো, রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব—সংক্রমণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করা, বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার না করা, এবং মানুষকে এমন কোনো ধারণা শেখানো থেকে বিরত থাকা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই” ধরনের বক্তব্য সরাসরি এই নীতিকে আঘাত করে। এটি মানুষকে ভুল নিরাপত্তাবোধ দেয়, যার ফলাফল হতে পারে অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু, অক্ষমতা, এবং বৃহৎ পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বিশেষ করে মহামারীর সময়—যেমন সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারী—যখন সংক্রমণ সম্পর্কে সামান্য অবহেলাও হাজার হাজার নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তখন ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে সংক্রমণ অস্বীকার করা বা তাকে গুরুত্বহীন দেখানো নীতিগতভাবে অপরাধের পর্যায়ে চলে যায়। WHO বারবার সতর্ক করেছে যে, ভুল তথ্য (misinformation) এবং ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক ভুল বিশ্বাস মহামারী নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে। [8]


ইসলামিস্টদের এড হক জোড়াতালি পিঠরক্ষা

যখন “রোগের কোনো সংক্রমণ নেই” ধরনের সহিহ হাদিসগুলো আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞান, এপিডেমিওলজি এবং ইসলামেরই অন্য হাদিস-নির্দেশের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে, তখন ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক ও আধুনিক এপোলোজিস্টরা নানা ধরনের এড হক ব্যাখ্যা তৈরি করে মূল সমস্যাটিকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। এই ব্যাখ্যাগুলো কোনো সুসংগত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়; এগুলো মূলত হাদিসের সরল ভাষাকে বাঁচানোর জন্য পরে তৈরি করা ধর্মতাত্ত্বিক পিঠরক্ষা। বাংলাদেশের ইসলামিক এপোলোজিস্টদের লেখায় এই কৌশল খুব স্পষ্ট: তারা একদিকে স্বীকার করে যে রোগের জীবাণু এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়াতে পারে, কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে দূরে থাকা উচিত, মহামারী এলাকা এড়ানো উচিত; অন্যদিকে “লা আদওয়া” বা “সংক্রমণ নেই” হাদিস বাঁচাতে বলে—রোগ নিজে নিজে ছড়ায় না, বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতিক্রমে ছড়ায়। অর্থাৎ বাস্তব সংক্রমণকে অস্বীকার করা যাচ্ছে না, কিন্তু হাদিসের ভুল বাক্যটিকে বাঁচাতে তার ওপর একটি মেটাফিজিক্যাল লেবেল বসানো হচ্ছে।

প্রথম জোড়াতালি হলো: “সংক্রমণ আছে, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কাজ করে না।” আপাতদৃষ্টিতে এটি গভীর ধর্মতাত্ত্বিক কথা মনে হলেও আসলে এটি একটি খালি বাক্য। ইসলামি আকিদা অনুসারে তো মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনাই আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ঘটে না—বজ্রপাত, ভূমিকম্প, আগুনে পোড়া, বিষক্রিয়া, গুলিবিদ্ধ হওয়া, এমনকি একটি পাতা ঝরাও। তাহলে শুধু সংক্রমণের ক্ষেত্রে “আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কাজ করে না” বলা কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়। বিজ্ঞান কখনো দাবি করে না যে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার কোনো স্বাধীন অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আছে। বিজ্ঞান শুধু পরীক্ষা করে—জীবাণু এক দেহ থেকে অন্য দেহে প্রবেশ করে কি না, দেহে বংশবৃদ্ধি করে কি না, রোগ সৃষ্টি করে কি না, এবং সংস্পর্শ কমালে সংক্রমণ কমে কি না। CDC সংক্রমণের মৌলিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে বলেছে, জীবাণু কোনো উৎস থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে, টিস্যু আক্রমণ করে, বংশবৃদ্ধি করে এবং প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এখানে “আল্লাহর ইচ্ছা” কোনো পরীক্ষাযোগ্য ভেরিয়েবল নয়; এটি বিজ্ঞানবিরোধী দাবিকে ধর্মীয় ভাষায় ঢাকার পদ্ধতি মাত্র। [9]

বিন বাযের ফতোয়াতেও এই স্ববিরোধ স্পষ্ট। তিনি বলেন, “লা আদওয়া” দ্বারা জাহেলি যুগের সেই ধারণা নাকচ করা হয়েছে যে রোগ নিজের স্বভাবগত ক্ষমতায়, আল্লাহর তাকদির ছাড়া ছড়ায়। কিন্তু একই ব্যাখ্যায় তিনি স্বীকার করেন, রোগী ও সুস্থ মানুষের মিশ্রণে রোগ স্থানান্তর ঘটতে পারে; তাই কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকা এবং অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের সঙ্গে না মেশানো শরিয়তসম্মত সতর্কতা। অন্যত্র তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, সংক্রমণ “কখনো কখনো” রোগী ও সুস্থের মিশ্রণের কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটতে পারে। এই বক্তব্যের ভেতরেই মূল স্বীকারোক্তি আছে: সংস্পর্শ একটি বাস্তব কারণ। কিন্তু সরাসরি তো আর নবী মুহাম্মদের বক্তব্য অস্বীকার করা যায় না, তাহলে তো ইমান থাকবে না। তাই হাদিস বাঁচাতে বলা হচ্ছে—কারণটি নিজে কাজ করে না, আল্লাহ কাজ করান। [10]

এই যুক্তির অসারতা সহজ উদাহরণেই ধরা পড়ে। কেউ যদি বলে, “আগুন পোড়ায় না, আল্লাহর ইচ্ছায় পোড়ায়”—তাহলে কি আগুনে হাত ঢোকানো নিরাপদ হয়ে যায়? কেউ যদি বলে, “গুলি মারে না, আল্লাহর ইচ্ছায় মারে”—তাহলে কি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়? কেউ যদি বলে, “বিষ মারে না, আল্লাহর ইচ্ছায় মারে”—তাহলে কি বিষ পান করা যুক্তিসঙ্গত হয়ে যায়? না। কারণ বাস্তব জগতে আগুন, গুলি, বিষ, ভাইরাস—সবই কার্যকারণ-নির্ভর ভৌত প্রক্রিয়ায় কাজ করে। “আল্লাহ চাইলে হবে, না চাইলে হবে না” বাক্যটি পরীক্ষাযোগ্য নয়, পূর্বাভাস দেয় না, রোগ প্রতিরোধের কোনো পদ্ধতি দেয় না। তাই এটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়; এটি শুধু হাদিসের ভাষাগত বিপদ থেকে পালানোর পথ। আসুন কিছু উদাহরণ দেখি। এই উদাহরণগুলো দেখায়, “আল্লাহ চাইলে হবে, না চাইলে হবে না”—এই ধরনের বাক্য কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নয়

ক্র.উদ্ভট দাবিযদি সত্যি মানি, তাহলে কী দাঁড়ায়?সমস্যা কোথায়?
আগুন পোড়ায় না, আল্লাহ পোড়ায়আগুনে হাত দিলেও ভয় পাওয়ার দরকার নেই, আল্লাহ না চাইলে পুড়বে নাবাস্তবে আগুন তাপ দিয়ে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করে; এটি ভৌত কারণ
বুলেট মারে না, আল্লাহ মারেবুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, আশ্রয়, নিরাপত্তা—সব অপ্রয়োজনীয়গুলির গতিশক্তি, টিস্যু ভেদ, রক্তক্ষরণ—সবই পরিমাপযোগ্য
বিষ মারে না, আল্লাহ মারেবিষ পান করলেও সমস্যা নেই, আল্লাহ চাইলেই শুধুমাত্র ঐ বিষ কাজ করবেবিষের রাসায়নিক প্রভাব, অঙ্গ বিকল হওয়া—এসব বাস্তব ও পরীক্ষিত
ছাদ থেকে লাফ দিলে কেউ মরে না, আল্লাহ চাইলে মরে১০ তলা থেকে লাফ দেওয়াও নিরাপদ হতে পারেমাধ্যাকর্ষণ, আঘাত, অঙ্গভঙ্গ, ট্রমা—সবই ভৌত বাস্তবতা
ভাইরাস ছড়ায় না, আল্লাহ চাইলে ছড়ায়মাস্ক, কোয়ারেন্টাইন, টিকা—এসব অর্থহীনসংক্রমণ, pathogen load, exposure—এসব বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণিত
সড়ক দুর্ঘটনা গতি বাড়ালে হয় না, আল্লাহ চাইলে হয়বেপরোয়া ড্রাইভিং নিয়েও চিন্তা নেই, ড্রাইভিং লাইসেন্সও অপ্রয়োজনীয়গতি, সংঘর্ষ, reaction time—সবই কারণ-ফল সম্পর্কের অংশ
বিদ্যুৎ শক মারে না, আল্লাহ চাইলে মারেখোলা তার ছোঁয়াও সমস্যা নাবৈদ্যুতিক প্রবাহ, টিস্যু ক্ষতি, cardiac arrest—এসব বাস্তব
পানিতে ডুবে কেউ মরে না, আল্লাহ চাইলে মরেসাঁতার না জানলেও গভীর পানিতে নামা নিরাপদঅক্সিজেনের অভাব, aspiration, drowning—এসব সুস্পষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়া
ধূমপানে ক্যান্সার হয় না, আল্লাহ চাইলে হয়সিগারেট খাওয়া নিয়ে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেইcarcinogen exposure, mutation, cancer risk—সব পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত
১০সিটবেল্ট জীবন বাঁচায় না, আল্লাহ চাইলে বাঁচায়সিটবেল্ট না বেঁধেও সমান নিরাপদcrash physics, impact distribution, injury reduction—সবই empirically proven

দ্বিতীয় জোড়াতালি হলো বেদুইনের উটের চর্মরোগের ঘটনাকে “গভীর নববী যুক্তি” হিসেবে উপস্থাপন করা। অথচ হাদিসটি মনোযোগ দিয়ে পড়লেই দেখা যায়, এখানে বেদুইনের প্রশ্নটাই বাস্তবধর্মী ও যুক্তিসঙ্গত; আর জবাবটাই সমস্যাজনক। বেদুইন সরল অভিজ্ঞতা থেকে বলছে: সুস্থ উটের পাল মাঠে থাকে, তারপর একটি চর্মরোগাক্রান্ত উট এসে পালের মধ্যে ঢোকে, এরপর অন্য উটগুলোও আক্রান্ত হয়। এটি কোনো কুসংস্কার নয়; এটি সংক্রমণ নিয়ে একেবারে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। মানুষ জীবাণু আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই পশুপালন, মহামারী, কুষ্ঠ, প্লেগ, বসন্ত—এসবের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝত যে রোগ কখনো কখনো এক দেহ থেকে আরেক দেহে ছড়ায়।

এই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নের জবাবে বলা হলো: “তাহলে প্রথম উটটিকে কে আক্রান্ত করল?” এপোলোজিস্টরা এই উত্তরকে গভীর দার্শনিক যুক্তি বানাতে চায়। আসলে এটি একটি অত্যন্ত দুর্বল প্রসঙ্গান্তর। বেদুইনের প্রশ্ন ছিল না, “প্রথম রোগী কোথা থেকে এলো?” তার প্রশ্ন ছিল, “একটি রোগাক্রান্ত উট সুস্থ পালের মধ্যে ঢুকলে অন্য উটগুলো আক্রান্ত হয় কেন?” অর্থাৎ প্রশ্নটি ছিল transmission নিয়ে; জবাবটি চলে গেল origin নিয়ে। প্রথম উটটির রোগের উৎস যাই হোক—পরিবেশ, পরজীবী, আঘাত, অন্য পশু, অথবা কোনো অজানা উৎস—তা পরবর্তী উটগুলোর মধ্যে রোগ ছড়ানোর বাস্তবতাকে বাতিল করে না। “প্রথম রোগী কোথা থেকে আক্রান্ত হলো?” এই প্রশ্ন দিয়ে “দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ রোগী প্রথমটির সংস্পর্শে আক্রান্ত হলো কি না”—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।

এটি ঠিক এমন, যেন কেউ বলল: “একটি ঘরে আগুন লাগলে পাশের ঘরেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।” জবাবে কেউ বলল: “তাহলে প্রথম আগুনটি কে লাগিয়েছিল?” এই জবাব আগুনের ছড়িয়ে পড়া অস্বীকার করে না; বরং আলোচনাকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। প্রথম আগুন বজ্রপাত, শর্ট সার্কিট, রান্নাঘরের দুর্ঘটনা—যেকোনো কারণে লাগতে পারে; কিন্তু একবার আগুন লাগার পর তা পাশের ঘরে ছড়াতে পারে—এটি আলাদা সত্য। একইভাবে প্রথম রোগী কোথা থেকে আক্রান্ত হয়েছে, আর তার থেকে অন্যদের রোগ ছড়িয়েছে কি না—এ দুটো ভিন্ন প্রশ্ন।

হাদিসের জবাবটি তাই কোনো বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিগত সমাধান নয়; এটি রোগের উৎপত্তি এবং রোগের সংক্রমণ—দুটি আলাদা স্তরকে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে দেয়। আধুনিক এপিডেমিওলজিতে index case, reservoir, source, exposure, transmission chain, secondary case—এসব আলাদা ধারণা। প্রথম সংক্রমণের উৎস খোঁজা হয়, কিন্তু সেই প্রশ্নের কারণে পরবর্তী সংক্রমণ অস্বীকার করা হয় না। কোভিড-১৯, ইবোলা, প্লেগ, কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা—সব ক্ষেত্রেই প্রথম রোগী কোথা থেকে আক্রান্ত হলো তা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পরবর্তী সংক্রমণ কীভাবে ঘটল। “প্রথমটিকে কে আক্রান্ত করল?”—এই প্রশ্ন করে contact tracing, quarantine, isolation, mask, vaccination—এসব বাতিল করা যায় না।

বরং এই হাদিসে বেদুইনের পর্যবেক্ষণই আধুনিক বিজ্ঞানের কাছাকাছি; নবীর জবাবই বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে সরে গিয়ে তাকদিরমুখী অস্পষ্টতায় আশ্রয় নেয়। বেদুইন বলছে: “রোগাক্রান্ত উট এলে সুস্থ পাল আক্রান্ত হয়।” এটি empirical claim। জবাব আসছে: “প্রথমটিকে কে আক্রান্ত করল?” এটি empirical claim-এর জবাব নয়; এটি causation নিয়ে ধর্মীয় মোড় ঘোরানো। তাই এই হাদিসকে “ইসলামের সংক্রমণ-বিজ্ঞান” প্রমাণ হিসেবে দেখানো হাস্যকর। বরং এটি দেখায়, একটি বাস্তব পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রশ্নের মুখে সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্য রক্ষা করতে একটি অপ্রাসঙ্গিক পাল্টা-প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে।

ধরুন, একটি গ্রামের বাজারে একটি খড়ের গুদামে আগুন লাগল। সেই গ্রামের একজন ধর্মগুরু বললেন, আগুন ছড়িয়ে পড়বে না। একজন সাধারণ গ্রামবাসী তখন প্রশ্ন করল, “যদি আগুন না ছড়ায়, তাহলে একটি গুদামে আগুন লাগার পর পাশের দোকানগুলোতে আগুন গেল কীভাবে?” প্রশ্নটি একেবারে যৌক্তিক। সে আগুনের প্রথম উৎস নিয়ে প্রশ্ন করছে না; সে প্রশ্ন করছে আগুনের বিস্তার নিয়ে। অর্থাৎ আগুন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়ায় কি না—এটাই তার পর্যবেক্ষণ।
এখন গ্রামের সেই ধর্মগুরু যদি উত্তর দেন, “তাহলে প্রথম গুদামে আগুন লাগালো কে?”—তাহলে সেটি কোনো উত্তর হলো না। কারণ প্রথম আগুন বজ্রপাত, শর্ট সার্কিট, রান্নাঘরের চুলা, অথবা কারও অবহেলা—যেকোনো কারণে লাগতে পারে। কিন্তু প্রথম আগুন কীভাবে শুরু হলো, সেটি আলাদা প্রশ্ন; আগুন এক গুদাম থেকে পাশের গুদামে ছড়িয়েছে কি না, ছড়াতে পারে কিনা, সেটি আরেক প্রশ্ন। প্রথম আগুনের উৎস জানাতে না পারলেও আগুনের ছড়িয়ে পড়া অস্বীকার করা যায় না।
ঠিক একইভাবে বেদুইনের প্রশ্ন ছিল সংক্রমণ নিয়ে: একটি অসুস্থ উট সুস্থ পালের মধ্যে ঢুকলে অন্য উটগুলো অসুস্থ হয় কেন? এটি ছিল বাস্তব পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রশ্ন। কিন্তু জবাবে “প্রথম উটটিকে কে অসুস্থ করল?” বলা হলো। এটি সংক্রমণের জবাব নয়; এটি আলোচনাকে রোগের উৎসের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। প্রথম উট কীভাবে অসুস্থ হলো, তা জানা না থাকলেও পরবর্তী উটগুলো তার সংস্পর্শে অসুস্থ হতে পারে। তাই এই উত্তরটি যুক্তি নয়, প্রসঙ্গান্তর; বাস্তব পর্যবেক্ষণকে এড়িয়ে নিজের আগের দাবি বাঁচানোর দুর্বল চেষ্টা।


তৃতীয় জোড়াতালি হলো: “কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ আসলে সংক্রমণভীতির জন্য নয়, বরং দুর্বল ঈমানের লোকেরা যাতে আল্লাহর ওপর ভরসা হারিয়ে না ফেলে সে জন্য।” এই ব্যাখ্যাটি আরও দুর্বল। কারণ হাদিসে কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে বাঘ/সিংহ থেকে পালানোর মতো করে। আবার অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, রোগাক্রান্ত উটকে সুস্থ উটের সঙ্গে না মেশাতে। এগুলো যদি রোগের বাস্তব ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত না হয়, তবে এগুলোর ব্যবহারিক অর্থ কী? আর যদি এগুলো বাস্তব ঝুঁকি এড়ানোর নির্দেশ হয়, তবে সংক্রমণকে অস্বীকার করার সুযোগ কোথায়?

বাইহাকি-ধাঁচের সমন্বয়ও আসলে এই দ্বন্দ্বই প্রকাশ করে। শামেলায় সংরক্ষিত ইরশাদ তুল্লাবিল হাকায়িক গ্রন্থে “মুখতালিফুল হাদিস” আলোচনায় বলা হয়েছে, রোগগুলো নিজস্ব স্বভাবে সংক্রমিত হয় না; কিন্তু আল্লাহ রোগীর সঙ্গে মিশ্রণকে সংক্রমণের কারণ বানিয়েছেন। অর্থাৎ প্রথম হাদিসে জাহেলি বিশ্বাসের “স্বভাবগত সংক্রমণ” নাকচ করা হয়েছে, আর দ্বিতীয় হাদিসে ক্ষতির সাধারণ কারণ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। [11]

এখানেই এপোলোজেটিক ব্যাখ্যার আসল ফাঁক ধরা পড়ে। যদি রোগীর সঙ্গে মিশ্রণ রোগের কারণ হতে পারে, তাহলে সংক্রমণ বাস্তব। আর যদি সংক্রমণ বাস্তব হয়, তাহলে “সংক্রমণ নেই” বাক্যটি আক্ষরিক অর্থে ভুল। বাইহাকি, ইবনুস সালাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবন রজব প্রমুখের অনুসৃত ব্যাখ্যার সারকথাও একই: “লা আদওয়া” বলতে জাহেলি ধারণার স্বয়ংক্রিয়/স্বভাবগত সংক্রমণ নাকচ করা হয়েছে; কিন্তু আল্লাহ চাইলে রোগীর সংস্পর্শ সুস্থ ব্যক্তির রোগের কারণ হতে পারে। শামেলায় সংরক্ষিত “শরহ ফতহুল মাজিদ”-এও এই সমন্বয় এভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে। সেখানে এমনকি স্পষ্ট বলা হয়েছে, অনেক রোগ জীবাণুর কারণে হয় এবং জীবাণু রোগী থেকে সুস্থের দিকে যায়—এটি জানা গেলে হাদিসের উদ্দেশ্য অন্যভাবে বুঝতে হবে। [12]

কিন্তু এই সমন্বয় বৈজ্ঞানিক সমস্যাকে সমাধান করে না; বরং সমস্যাটিকে ধর্মতাত্ত্বিক ভাষায় সরিয়ে দেয়। বিজ্ঞান “রোগ নিজস্ব metaphysical power নিয়ে আল্লাহর বাইরে কাজ করে”—এমন দাবি করে না। বিজ্ঞান শুধু বলে, একটি নির্দিষ্ট প্যাথোজেন নির্দিষ্ট পরিবেশে নির্দিষ্ট host-এর দেহে প্রবেশ করলে রোগের probability বাড়ে। সংক্রমণ deterministic হতে হবে না; probabilistic হলেই যথেষ্ট। একই ঘরে থাকা সবাই অসুস্থ হবে না—এতে সংক্রমণ মিথ্যা হয় না। কারণ সংক্রমণ নির্ভর করে pathogen load, immune response, exposure duration, ventilation, vaccination, prior immunity, genetics, treatment—অসংখ্য ভেরিয়েবলের ওপর। “সবাই আক্রান্ত হয় না” বলে সংক্রমণ অস্বীকার করা যেমন মূর্খতা, তেমনি “আল্লাহ না চাইলে হয় না” বলে সংক্রমণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অস্বীকার করাও একই ধরনের ফাঁকি।

চতুর্থ জোড়াতালি হলো: “সংক্রমণ আছে, কিন্তু তার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই।” এটি আগের যুক্তির আরেক সংস্করণ। কিছু আলেম ও এপোলোজিস্ট বলেন, জীবাণু আছে, সংক্রমণও আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই—সবই আল্লাহর ইচ্ছায়। এই অবস্থান দ্বিমুখী। বিজ্ঞানকে খুশি করার জন্য তারা সংক্রমণ মেনে নেয়, কিন্তু হাদিসের “সংক্রমণ নেই” বাক্যটিকে বাঁচানোর জন্য বলে সংক্রমণের “নিজস্ব ক্ষমতা” নেই। প্রশ্ন হলো: “নিজস্ব ক্ষমতা” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? যদি বোঝানো হয় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া কোনো ঈশ্বরের বাইরে স্বাধীন সত্তা—তাহলে বিজ্ঞান এমন দাবি করে না। আর যদি বোঝানো হয় ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়া কার্যকারণ সম্পর্কের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না—তাহলে সেটি সরাসরি বিজ্ঞানবিরোধী। এই দুই অর্থের মাঝখানে অস্পষ্টভাবে দাঁড়িয়েই এপোলোজিস্টরা হাদিসকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন।

ইসলাম প্রচারকদের লেখায় এই জোড়াতালি আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। তারা বলে, “রোগ আদৌ ছড়ায় না” এটি উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য হলো রোগ “নিজে থেকে” ছড়ায় না, বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতিক্রমে ছড়ায়। আবার তারা সাহাবাদের প্লেগ এলাকা এড়ানো, কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকা, অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের কাছে না নেওয়া—এসব উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করতে চায় যে ইসলাম সংক্রমণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া অস্বীকার করে না। কিন্তু এই যুক্তি নিজেই তাদের বিরুদ্ধে যায়। যদি ইসলাম সত্যিই সংক্রমণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া জানত ও মানত, তাহলে “কোনো সংক্রমণ নেই” এমন ভাষা কেন ব্যবহৃত হলো? আর যদি “লা আদওয়া” বলতে শুধু “আল্লাহ ছাড়া স্বাধীন কারণ নেই” বোঝানো হয়, তবে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো বক্তব্য নয়; এটি কেবল তাকদিরতত্ত্ব। [13]

পঞ্চম জোড়াতালি হলো: “কুষ্ঠরোগী থেকে পালাও”—এটি সংক্রমণের প্রমাণ নয়, শুধু সতর্কতা বা মানসিক নিরাপত্তা। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান দেখায়, কুষ্ঠরোগ বা Hansen’s disease বাস্তবেই একটি chronic infectious disease, যার কারণ Mycobacterium leprae। WHO বলছে, untreated কুষ্ঠরোগীর নাক-মুখের droplets থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে; casual contact যেমন করমর্দন, একসঙ্গে বসা, একবার খাবার ভাগ করা—এসব দিয়ে সাধারণত ছড়ায় না; চিকিৎসা শুরু হলে রোগী দ্রুত সংক্রমণ ঘটানোর ক্ষমতা হারায়। CDC-ও একইভাবে বলছে, কুষ্ঠ সহজে ছড়ায় না, কিন্তু untreated রোগীর সঙ্গে বহু মাস ধরে prolonged close contact থাকলে সংক্রমণ ঘটতে পারে। [14]

অতএব বাস্তব বৈজ্ঞানিক অবস্থান হলো: কুষ্ঠরোগ সংক্রামক, কিন্তু অতিসংক্রামক নয়। ফলে হাদিসের দুই দিকই সমস্যাযুক্ত। একদিকে “সংক্রমণ নেই” বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল; অন্যদিকে “কুষ্ঠরোগী থেকে বাঘের মতো পালাও” ভাষাটি রোগীকে অতিরিক্ত ভয়, ঘৃণা ও সামাজিক বর্জনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কুষ্ঠরোগীকে “অশুভ” বা “পালিয়ে বাঁচার বস্তু” হিসেবে দেখে না; তাকে রোগী হিসেবে দেখে, diagnosis, treatment, multidrug therapy, contact monitoring এবং stigma reduction-এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে। WHO কুষ্ঠকে চিকিৎসাযোগ্য রোগ হিসেবে তুলে ধরে এবং আক্রান্ত মানুষের বিরুদ্ধে stigma ও discrimination-এর বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে। [15]

এই কারণে “দুর্বল ঈমানের লোকদের জন্য দূরে থাকতে বলা হয়েছে” বা “ওয়াসওয়াসা এড়াতে বলা হয়েছে”—এই ব্যাখ্যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামনে টিকে না। যদি রোগীর কাছ থেকে দূরে থাকার নির্দেশের বাস্তব কারণ সংক্রমণ-ঝুঁকি হয়, তবে সংক্রমণ স্বীকার করতে হবে। আর যদি সংক্রমণ-ঝুঁকি না হয়, তবে নির্দেশটি কুসংস্কার, ভয় বা সামাজিক বর্জনের ভাষা হয়ে যায়। দুই অবস্থার যেকোনো একটিই সমস্যাজনক: সংক্রমণ মানলে “লা আদওয়া” দুর্বল হয়; সংক্রমণ না মানলে কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর নির্দেশ অযৌক্তিক ও মানবিকভাবে ক্ষতিকর হয়।

ষষ্ঠ জোড়াতালি হলো: “হাদিসে সফর মাস ও পেঁচার অস্তিত্বও তো অস্বীকার করা হয়নি; তাহলে সংক্রমণ অস্বীকারও অস্তিত্ব অস্বীকার নয়।” ইসলাম প্রচারকগণ এই ধরনের তুলনা ব্যবহার করে। তারা বলে, “লা সফর” মানে সফর মাস নেই নয়, “লা হামাহ” মানে পেঁচা নেই নয়; তাই “লা আদওয়া” মানে সংক্রমণ নেই নয়। এই তুলনা বাহ্যিকভাবে চতুর, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান করে না। কারণ সফর মাস ও পেঁচা নিয়ে হাদিসের বক্তব্য কুসংস্কার, অশুভ লক্ষণ বা অমঙ্গল-ধারণা নিয়ে; কিন্তু “আদওয়া” শব্দটি রোগ-সংক্রমণের বাস্তব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। বেদুইন যে আপত্তি করেছিল, সেটি অমঙ্গল-ধারণা নয়; সে বাস্তব পশুচিকিৎসাগত পর্যবেক্ষণ করেছিল—চর্মরোগাক্রান্ত উট সুস্থ পালের মধ্যে ঢুকলে অন্য উট আক্রান্ত হয়। জবাবে “প্রথমটিকে কে আক্রান্ত করল?” বলা হয়। তাই সফর-পেঁচা analogy দিয়ে রোগ-সংক্রমণের বাস্তব প্রশ্ন ঢেকে দেওয়া যুক্তিগতভাবে দুর্বল।

সপ্তম জোড়াতালি হলো: “সাহাবারা প্লেগ এলাকা এড়িয়েছেন, তাই ইসলাম সংক্রমণ জানত।” এই যুক্তিও উল্টোভাবে প্রমাণ দেয়। যদি প্লেগ এলাকা এড়ানো, রোগীকে সুস্থের সঙ্গে না মেশানো, কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকা—এসব নির্দেশ সত্যিই রোগের বিস্তার ঠেকানোর জন্য হয়, তবে ইসলামি পাঠের মধ্যেই সংক্রমণের বাস্তবতা পরোক্ষভাবে স্বীকৃত। তাহলে “সংক্রমণ নেই” বাক্যটি সরল অর্থে গ্রহণযোগ্য থাকে না। আর যদি বলা হয়, এই সব নির্দেশ শুধু তাকদির, ওয়াসওয়াসা, ঈমান বা মানসিক স্থিতির জন্য—তাহলে আধুনিক জনস্বাস্থ্য-সম্মত ব্যাখ্যা হারিয়ে যায়। অর্থাৎ এপোলোজিস্টদের সামনে দুটি পথ: হয় সংক্রমণ স্বীকার করে “লা আদওয়া”র সরল ভাষাকে দুর্বল করা, নয়তো “লা আদওয়া” বাঁচিয়ে সংক্রমণ-প্রতিরোধমূলক হাদিসগুলোকে অযৌক্তিক করে ফেলা। দুইটি একসঙ্গে পূর্ণ শক্তিতে সত্য রাখা যায় না।

এই সব জোড়াতালির মূল সমস্যা হলো এগুলো testable নয়। “আল্লাহ চাইলে সংক্রমণ হবে, না চাইলে হবে না”—এই বাক্য দিয়ে কোনো outbreak model তৈরি করা যায় না, R₀ নির্ণয় করা যায় না, contact tracing করা যায় না, vaccine efficacy মাপা যায় না, hospital infection control চালানো যায় না। কিন্তু আধুনিক জনস্বাস্থ্য এসবই করে। CDC contact, droplet, airborne transmission-এর ঝুঁকি অনুযায়ী transmission-based precautions-এর কথা বলে; known বা suspected infection-এর ক্ষেত্রে contact precautions ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ আধুনিক চিকিৎসা বাস্তব কার্যকারণ-সম্পর্ক ধরে কাজ করে—রোগী, জীবাণু, পরিবেশ, exposure, susceptibility, প্রতিরোধ—এসব পরিমাপযোগ্য জিনিস। “তাকদির” এখানে কোনো clinical variable নয়। [16]

সংক্ষেপে, এপোলোজিস্টদের সব ব্যাখ্যার আসল কাঠামো একটাই: প্রথমে হাদিস বলে “সংক্রমণ নেই”; বিজ্ঞান ও অন্য হাদিসের চাপ এলে বলা হয়, “সংক্রমণ আছে, কিন্তু নিজে নিজে নয়”; আরও চাপ এলে বলা হয়, “আল্লাহর ইচ্ছায় সংক্রমণ হয়”; তারপর কুষ্ঠ, প্লেগ, অসুস্থ উট—এসব উদাহরণ এনে বলা হয়, ইসলাম সংক্রমণ জানত। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটাই বিষয় পরিষ্কার হয়: “লা আদওয়া”র সরল অর্থ আধুনিক বাস্তবতার সামনে টেকে না। তাই তাকে বাঁচাতে ধারাবাহিকভাবে অর্থ বদলাতে হয়, প্রেক্ষাপট বসাতে হয়, জাহেলি বিশ্বাসের কথা আনতে হয়, তাকদিরতত্ত্ব ঢোকাতে হয়, এবং শেষে সংক্রমণকেই অন্য ভাষায় স্বীকার করতে হয়।

ছোঁয়াচে

এই কারণেই এসব ব্যাখ্যা প্রকৃত সমাধান নয়, বরং পিঠরক্ষা। যদি সংক্রমণ বাস্তব হয়—আর আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞান, WHO, CDC, হাসপাতাল-ভিত্তিক infection control, vaccine science, quarantine ও epidemiology একবাক্যে বলে সংক্রমণ বাস্তব—তাহলে “কোনো রোগই ছোঁয়াচে নয়” ধরনের বক্তব্য ভুল, বিভ্রান্তিকর এবং জনস্বাস্থ্য-বিরোধী। আর যদি বলা হয়, “হাদিসের আসল অর্থ ছিল রোগ আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ছড়ায় না”—তাহলে সেটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বক্তব্য নয়; সেটি একটি ধর্মীয় বিশ্বাস। ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে কেউ তা মানতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। জনস্বাস্থ্যের বাস্তব নীতি দাঁড়িয়ে আছে প্রমাণ, পরিমাপ, ঝুঁকি-নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের ওপর; হাদিস-রক্ষাকারী এড হক ব্যাখ্যার ওপর নয়।


কুষ্ঠরোগঃ ইসলামী বক্তব্য বনাম বৈজ্ঞানিক তথ্য

ইসলামী হাদিস গ্রন্থগুলোতে কুষ্ঠরোগ বা “জুজাম” সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে; কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে বলা হয়েছে বাঘ থেকে পালানোর মতো করে। অর্থাৎ, একদিকে বলা হচ্ছে “ছোঁয়াচে রোগ নেই”, অন্যদিকে কুষ্ঠরোগীর থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে—যেন সেখানে সংক্রমণের আশঙ্কা আছে। এই দ্বৈততা বোঝার জন্য আগে কুষ্ঠরোগের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সংক্ষেপে দেখা দরকার।

কুষ্ঠরোগ বা Hansen’s disease–এর কারণ Mycobacterium leprae নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। WHO এবং CDC উভয়েই ব্যাখ্যা করেছে যে, untreated (চিকিৎসা না পাওয়া) কুষ্ঠরোগী যদি দীর্ঘদিন ধরে অন্য মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে—তখন তার নাক-মুখ থেকে নির্গত ড্রপলেটে থাকা ব্যাকটেরিয়া অন্যের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এই রোগ casual contact—যেমন শুধু করমর্দন, একবার একই ঘরে বসা, একই প্লেটে একবার খাওয়া—এসবের মাধ্যমে সাধারণত ছড়ায় না; বরং দীর্ঘমেয়াদি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ প্রয়োজন।

অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কুষ্ঠরোগ কম সংক্রামক, কিন্তু একেবারেই “অসংক্রামক” নয়। সংক্রমণ বাস্তব; তবে এর জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ও নির্দিষ্ট মাত্রার ঘনিষ্ঠতা লাগে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত বহু-ড্রাগ থেরাপি (MDT) শুরু করলে রোগী দ্রুতই সংক্রমণ ঘটানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে; ফলে সমাজে কুষ্ঠরোগের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। WHO কুষ্ঠরোগ নির্মূলের লক্ষ্যে বহু বছর ধরে গ্লোবাল প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে—এর পুরো ভিত্তিই হলো সংক্রমণ স্বীকার করা, রোগী সনাক্ত করা এবং চিকিৎসা দেওয়া।

সুতরাং “কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়”—এমন কথা বলা বিজ্ঞানবিরোধী। আবার “স্ত্রী, ঘরবাড়ি, পশুতে অশুভ থাকে, কিন্তু কুষ্ঠরোগী থেকে বাঘের মত পালাও”—এই ধরনের বক্তব্যও বৈজ্ঞানিকভাবে বিকৃত ও ভীতিপ্রচারমূলক। বাস্তবতা হলো: কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষ একজন রোগী—অপবিত্র জীব বা অশুভ সত্তা নয়; তাকে নিয়ে অশুভ কুসংস্কার ছড়ানো, সামাজিক বয়কট ও ঘৃণা তৈরি করা মানবাধিকারের বিরোধী।


“ছোঁয়াচে রোগ নেই” বনাম “কুষ্ঠরোগী থেকে পালাও”

এখন আসল দ্বন্দ্বটা স্পষ্ট করে দেখা যাকঃ

সংক্রমণ অস্বীকারের দাবি
একদল হাদিসে সরাসরি বলা হয়েছে—“কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়।” এই বর্ণনাটি আধুনিক জার্ম থিওরি বা জীবাণু তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত, যা প্রমাণ করে যে কোনো রোগের কারণ হিসেবে অদৃশ্য আধ্যাত্মিক প্রভাবের চেয়ে ভৌত সংক্রমণের গুরুত্বকে এখানে অস্বীকার করা হয়েছে।
সংক্রমণ এড়ানোর বিপরীত নির্দেশ
অন্যদিকে আরেকদল বর্ণনায় বলা হচ্ছে—কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে হবে, দূরে থাকতে হবে, তাকে এড়িয়ে চলতে হবে। একই উৎসের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানটি প্রমাণ করে যে, সংক্রমণের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এবং ধর্মীয় দাবির মধ্যে একটি বড় ধরনের যৌক্তিক অসংগতি বিদ্যমান।

যদি সত্যিই “সংক্রমণ বলে কিছু নেই” হয়, তবে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর প্রয়োজন কেন? দুইটি অবস্থানের যে কোনো একটি সত্য হতে পারে, দুইটি একসাথে নয়।

ইসলামি আপোলজেটিকরা সাধারণত এখানে একটি ঘোলাটে ব্যাখ্যা আনে: “আসলেই ছোঁয়াচে নেই, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয়; আল্লাহ চাইলে কুষ্ঠরোগী থেকেও ছড়াবে না, আবার চাইলে সুস্থ লোক থেকেও ছড়াতে পারে; পালাতে বলাটা কেবল ‘কারণ অবলম্বন’।”—এই ব্যাখ্যা আসলে বৈজ্ঞানিক প্রশ্নকে ফাঁকি দেওয়া; কারণ:

বিজ্ঞানের প্রমাণযোগ্য অবস্থান
বিজ্ঞান জানতে চায়—কুষ্ঠরোগীর কাছাকাছি গেলে পরিসংখ্যানগতভাবে রোগ লাগার সম্ভাবনা কি বাড়ে? উত্তর: বাড়ে, এবং তা প্রমাণযোগ্য। পপুলেশন হেলথ এবং এপিডেমিওলজিক্যাল ডাটা অনুযায়ী ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি সরাসরি সংস্পর্শের ওপর নির্ভরশীল যা ল্যাবরেটরিতেও প্রমাণযোগ্য।
আপোলজেটিক ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা
আপোলজেটিক ব্যাখ্যা জানায়—আল্লাহ চাইলেই লাগবে, না চাইলে লাগবে না। অর্থাৎ কোনো testable বা verifiable দাবি নেই; ফলে বাস্তবে এর কোনো explanatory power নেই। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে ‘ফলসিফায়াবিলিটি’ বা ভুল প্রমাণ করার সুযোগ থাকা আবশ্যক, যা কেবল দৈব ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল দাবিতে অনুপস্থিত।

অন্যদিকে, যদি স্বীকার করা হয়—কুষ্ঠরোগীর কাছাকাছি থাকলে রোগ লাগার সম্ভাবনা বাড়ে, তাই পালাতে বলা হয়েছে—তাহলে স্বয়ং ধর্মীয় পাঠের ভেতর থেকেই “সংক্রমণ” ধারণা স্বীকৃত হয়ে যায়। তাহলে “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা সহিহ হাদিসগুলোকে মিথ্যা, ভুল, বা অন্তত বাতিলযোগ্য স্বীকার করতেই হয়। অর্থাৎ:

১) সংক্রমণ নেই → কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, অথবা ২) কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানো যৌক্তিক → সংক্রমণ বাস্তব → “ছোঁয়াচে রোগ নেই” ধরনের হাদিস ভুল।

সংক্রমণ অস্বীকার বনাম কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো: যুক্তিগত দ্বন্দ্ব দুটি পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে।
বিকল্প ১ সংক্রমণ অস্বীকার
১) যদি দাবি করা হয় “সংক্রমণ বলে কিছু নেই” [17]
⇒ তবে কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না
বিকল্প ২ পালানোকে যৌক্তিক ধরলে
২) যদি “কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো” জরুরি হয় [18]
⇒ তবে সংক্রমণ বাস্তব। এক্ষেত্রে প্রথম দাবিটি ভুল প্রমাণিত হয়

এই দুটো একসাথে সত্য হতে পারে না। এখানে “ধর্মের সম্মান রক্ষার” জন্য যতই জটিল ব্যাখ্যা বানানো হোক না কেন, লজিক্যালি এটি একটি ক্লাসিক সেল্‌ফ-কনট্রাডিকশন—একই সাথে P এবং not-P ধরে নেওয়ার চেষ্টা। বৈজ্ঞানিকভাবে এর অবস্থান আরও দুর্বল, কারণ আজ আমরা রোগজীবাণু, ড্রপলেট সংক্রমণ, এ্যারোসোল, ইনকিউবেশন পিরিয়ড, R₀ ইত্যাদি সবকিছুই পরীক্ষাগারে ও মাঠ-গবেষণায় পরিমাপ করতে পারি।


জনস্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও মানবাধিকার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “স্বাস্থ্য”কে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর দায়িত্ব বর্তায়—মানুষকে এমন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা, যেখানে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে তারা অপ্রয়োজনীয় রোগ ও মৃত্যুর শিকার হবে। সংক্রমণ অস্বীকারকারী ধর্মীয় কথা, ওয়াজ, খুতবা—এগুলো যখন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন এগুলো কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় থাকে না; সেগুলো সরাসরি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।

উদাহরণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারীর কথা ধরা যায়। বহু জায়গায় দেখা গেছে, ধর্মীয় নেতারা “ছোঁয়াচে রোগ নেই”, “সব আল্লাহর ইচ্ছা”, “মসজিদে এলে কিছু হবে না”—এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মানুষকে নিরাপত্তা নির্দেশ অমান্য করতে উৎসাহিত করেছেন। এর ফলে বহু লোক গাদাগাদি করে নামাজ, মাহফিল, জমায়েতে অংশ নিয়েছে, মাস্ক ব্যবহার ও দূরত্ব বজায় রাখাকে অবজ্ঞা করেছে—যার মূল্য দিতে হয়েছে বহু সংক্রমণ ও মৃত্যু দিয়ে।

নৈতিক প্রশ্নটি সোজা: কোনো মতবাদ যদি বাস্তবে মানুষের জীবন বাঁচানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই মতবাদকে সমালোচনা করা নৈতিক দায়িত্ব—শুধু অধিকার নয়। তার উৎস ধর্মগ্রন্থ হোক বা ঐতিহ্য—তা অন্ধভাবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য নয়। “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা হাদিসগুলো কেবল ভুলই নয়, এগুলোকে সত্য ধরে নিলে তা মানুষের জীবনের জন্য বিপজ্জনক। তাই নৈতিকভাবে এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা, বা অন্তত নগণ্য, অপ্রামাণ্য ও বাতিল ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।


উপসংহার

মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি এবং আধুনিক এপিডেমিওলজি পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়—সংক্রামক রোগ বাস্তব; মানুষের দেহে থাকা প্যাথোজেন বিভিন্ন পথে আরেক মানুষের দেহে চলে যায়, নির্দিষ্ট প্যাটার্নে রোগ ছড়ায়, মহামারী তৈরি করে। কুষ্ঠরোগ তুলনামূলকভাবে কম সংক্রামক হলেও একেবারে “অসংক্রামক” নয়; বরং দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলে তার ঝুঁকি থাকে, এবং WHO–সহ বিভিন্ন সংস্থা তা বহু গবেষণায় দেখিয়েছে।

এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে “কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়” বলা যে কোনো বক্তব্য সরাসরি বিজ্ঞানবিরোধী, জনস্বাস্থ্য-বিরোধী এবং নৈতিকভাবে দায়িত্বহীন। একইসাথে আবার কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে বলার মধ্যে এমন এক দ্বৈততা তৈরি হয়, যেখানে সংক্রমণকে অস্বীকারও করা হচ্ছে, আবার পরোক্ষে স্বীকৃতিও দেওয়া হচ্ছে। যৌক্তিকভাবে এটি একটি স্ববিরোধী অবস্থান; বৈজ্ঞানিকভাবে এর কোনো স্থান নেই।

অতএব, এই পুরো ইসলামী বক্তব্য—একদিকে “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা, আরেকদিকে “কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকো”—আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, WHO–এর নির্দেশনা, এবং মানবাধিকারের আলোকে অগ্রহণযোগ্য। মানবজীবন, স্বাস্থ্য, এবং বৈজ্ঞানিক সত্যের চেয়েও কোনো ধর্মীয় দাবির মূল্য বেশি হতে পারে না। কারও কথাকে “ধ্রুব সত্য” ধরে নিয়ে কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া একটি নির্মম ও অমানবিক কাজ—যতই তা “ধর্ম” নামে বিক্রি হোক না কেন।

বেশ কয়েকটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, নবী মুহাম্মদ বলেছেন যে, ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই। অথচ আধুনিক যেকোন সভ্য মানুষ মাত্রই জানেন, ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ অবশ্যই আছে, এই কিছুদিন আগেই করোনা নামক ছোঁয়াচে রোগে কোটি মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। লজ্জিত ইসলামিস্টগণ এই হাদিসগুলো এখন উলটে ফেলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু অনেক ইসলামিক আলেমই এখনো মনে করেন, নবীর এই হাদিস ধ্রুবসত্য! আসলেই ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই!

About This Article

Genre: Scientific, Hadith-Based, Public-Health-Based, and Source-Based Critical Analysis of Infectious Disease Denial in Islamic Texts

Epistemic Position: Scientific Skepticism, Microbiology, Virology, Epidemiology, Public Health Ethics, Evidence-Based Medicine, Hadith Criticism, and Source-Internal Critique of Islamic Medical Claims

This article examines hadith reports that deny contagion while also preserving instructions to avoid leprosy patients, diseased animals, and plague-affected areas.

Its scope includes the hadith formula “no contagion,” the instruction to flee from a leper, the Bedouin's diseased-camel objection, Islamic fatalistic explanations, modern apologetic reinterpretations, vaccine-related misinformation, microbiology, pathogens, viral and bacterial transmission, quarantine, isolation, vaccination, infection-control standards, and the public-health consequences of denying contagious disease.

The article follows Shongshoy's tradition of sharp, evidence-based, non-apologetic criticism. It does not treat “Allah wills it” as a scientific explanation. That phrase may function as theology, but it does not identify a pathogen, explain transmission, calculate risk, prevent an outbreak, guide vaccination, or replace epidemiology.

The central argument is that the hadith material contains a direct contradiction. If disease does not spread from one body to another, then avoiding a leper or separating sick animals has no rational basis. If avoiding them is rational, then contagion is real and the statement “there is no contagion” is false in its plain meaning.

The article also attacks the apologetic move of shifting from “there is no contagion” to “contagion exists, but only by Allah's permission.” This is not a solution; it is a retreat. Science never claimed that microbes possess supernatural independence. It only claims that pathogens transmit through observable, testable, and preventable causal pathways.

The discussion treats infectious-disease denial as more than an intellectual error. In public health, false claims about contagion can produce real harm: vaccine refusal, unsafe contact, negligence during outbreaks, stigma toward patients, and avoidable deaths. Religious authority does not make dangerous misinformation harmless.

This article should be evaluated through microbiology, virology, epidemiology, public-health evidence, source accuracy, logical consistency, risk analysis, and human welfare—not through religious sensitivity, inherited reverence, fatalistic slogans, hadith-protection reflex, apologetic wordplay, or the demand that a medically dangerous claim be protected because it appears in sacred literature.


তথ্যসূত্রঃ
  1. WHO, infection prevention and control; CDC, basics of infectious disease transmission ↩︎
  2. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৫৭৭ ↩︎
  3. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৫৮০ ↩︎
  4. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৯১২ ↩︎
  5. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫৭৫৩ ↩︎
  6. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৯২১ ↩︎
  7. সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭২ ↩︎
  8. WHO – infodemic management; COVID-19 misinformation ↩︎
  9. CDC, Infection Control Basics ↩︎
  10. ইবন বায, “معنى حديث لا عدوى ولا طيرة”; “الجمع بين لا عدوى ولا طيرة و فر من المجذوم” ↩︎
  11. إرشاد طلاب الحقائق إلى معرفة سنن خير الخلائق, المكتبة الشاملة ↩︎
  12. شرح فتح المجيد للغنيمان, المكتبة الشاملة ↩︎
  13. ইবন বায; শামেলা-সংরক্ষিত শাস্ত্রীয় সমন্বয় ↩︎
  14. WHO, Leprosy Fact Sheet; CDC, About Leprosy/Hansen’s Disease ↩︎
  15. WHO, Leprosy/Hansen Disease ↩︎
  16. CDC, Infection Control; Transmission-Based Precautions ↩︎
  17. সহীহ বুখারী, ৫৭0৭ ↩︎
  18. সহীহ বুখারী, ৫৭৬৯ ↩︎