ইসলাম বলে ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই

ভূমিকা

সহিহ হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই”—অর্থাৎ কোনো রোগ এক দেহ থেকে আরেক দেহে স্বাভাবিক নিয়মে সংক্রমিত হয় না; সবকিছু কেবল অলৌকিক ইচ্ছা ও অদৃশ্য সিদ্ধান্তের ফলে ঘটে। অর্থাৎ আল্লাহ তাকদীরে লিখে রাখলে রোগ হবে, আর তাকদীরে লিখে না রাখলে ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘষাঘষি করলেও কোন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবার এই একই ধর্মগ্রন্থের অনেক জায়গাতে বলা আছে, বিশেষ কিছু রোগী—বিশেষ করে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালিয়ে থাকা, দূরে থাকা, বা তাকে এড়িয়ে চলার নির্দেশনা। এই দুই অবস্থান একে অপরের সরাসরি বিরোধী। যদি সত্যিই “ছোঁয়াচে রোগ নেই” হয়, তবে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর প্রশ্নই ওঠে না; আর যদি কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে দূরে থাকা যৌক্তিক হয়, তবে রোগের সংক্রমণকে অস্বীকার করে কোনো অর্থ দাঁড়ায় না।

আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি এবং এপিডেমিওলজির (মহামারী-বিজ্ঞান) দৃষ্টিতে এই ধর্মীয় বক্তব্যগুলো শুধু ভুলই নয়, বরং বিপজ্জনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), CDC, ECDC, RKI—প্রায় সব আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য-সংস্থা একবাক্যে স্বীকার করে যে, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য প্যাথোজেন মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে; এটিই সংক্রামক রোগের মৌলিক বাস্তবতা। শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে, রক্তের মাধ্যমে, যৌন সংস্পর্শে, বা অন্যান্য পথে—মানুষ থেকে মানুষে রোগ সংক্রমণ আজ একটি কঠোরভাবে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। [1]

এই লেখার উদ্দেশ্য ধর্মীয় বিশ্বাসকে কঠোরভাবে বিচার করা। তাই এখানে আমরা বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা এবং মানবাধিকার-ভিত্তিক নৈতিকতার আলোকে দেখবো—ছোঁয়াচে রোগ অস্বীকারকারী ইসলামি বক্তব্যগুলো বাস্তবে কী ধরনের বিপদ তৈরি করে এবং কুষ্ঠরোগী থেকে পালাতে বললেও সংক্রমণ অস্বীকার করার ভেতরে কী ধরনের যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব লুকিয়ে আছে।


আলেমদের বক্তব্য

আসুন শুরুতেই সেই ওয়াজগুলো শুনে নিই,


ছোঁয়াচে রোগ বিষয়ক হাদিসসমূহ

এবারে আসুন সেই হাদিসগুলো পড়ি [2] [3] [4] [5] [6] [7]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৭৭-[২] উক্ত রাবী (হুরায়রা (রাঃ) হতে) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের সংক্রমণ বলতে কিছুই নেই, কোন কিছুতে অশুভ নেই। প্যাঁচার মধ্যে কু-লক্ষণ নেই এবং সফর মাসেও কোন অশুভ নেই। তবে কুষ্ঠরোগী হতে পলায়ন করো, যেমন- তুমি বাঘ হতে পালিয়ে থাকো। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৫৭০৭, আল জামি‘উস্ সগীর ১৩৪৮৭, সহীহুল জামি‘ ৭৫৬০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৮২, ৭৮৩; আহমাদ ৯৭২২, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৪৫৪৩, মুসান্নাফ ‘আবদুর রায্যাক ১৯৫০৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৮০-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, রোগে ছোঁয়াচে লাগা, সফর মাস অশুভ হওয়া বা ভূত-প্রেতের ধারণার কোন অস্তিত্ব নেই। (মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : মুসলিম (২২২২)-১০৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১২৮, আহমাদ ১৫১০৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯১২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই, পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত তা সঠিক নয়, কোনো নক্ষত্রের নির্দিষ্ট তারিখে আকাশের কোনো স্থানে অবস্থান করলে বৃষ্টিপাত হয় এরূপ বিশ্বাসও ঠিক নয় এবং সফর মাসকে অশুভ মনে করবে না।[1]
সহীহ।
[1]. মুসলিম, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/৪৩. পশু-পাখি তাড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয়।
৫৭৫৩. ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে ও শুভ-অশুভ বলতে কিছু নেই। অমঙ্গল তিন বস্তুর মধ্যে স্ত্রীলোক, গৃহ ও পশুতে।[1] [২০৯৯; মুসলিম ৩৯/৩৪, হাঃ ২২২৫, আহমাদ ৪৫৪৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২২৯)
[1] কোন কোন স্ত্রীলোক স্বামীর অবাধ্য হয়। আবার কেউ হয় সন্তানহীনা। কোন গৃহে দুষ্ট জ্বিনের উপদ্রব দেখা যা, আবার কোন গৃহ প্রতিবেশীর অত্যাচারের কারণে অশান্তিময় হয়ে উঠে। গৃহে সালাত আদায় ও যিকর-আযকারের মাধ্যমে জ্বিনের অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কোন কোন পশু অবাধ্য বেয়াড়া হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯২১। সা’দ ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ পেঁচা অশুভ নয়, ছোঁয়াচে রোগ নেই এবং কোনো জিনিস অশুভ হওয়া ভিত্তিহীন। যদি কোনো কিছুর মধ্যে অশুভ কিছু থাকতো, তাহলে ঘোড়া, নারী ও বাড়ী এই তিন জিনিসের মধ্যে থাকতো।[1]
সহীহ।
[1]. আহমাদ। আহমাদ শাকির বলেনঃ এর সনদ; সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘দ ইবনু মালিক (রাঃ)

সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৩/ ভাগ্য গণনা ও ফাল নেয়া
পরিচ্ছেদঃ ৪. পাখীর দ্বারা শুভাশুভের ফাল নির্ধারণ সম্পর্কে।
৩৮৭২. কা’নবী (রহঃ) …. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়, না মৃতের খুলিতে পেঁচা থাকে, আর না দেউ-দানব রাস্তা ভুলিয়ে দেয় এবং না সফর মাস অমঙ্গলের।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


সংক্রামক রোগের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা: মাইক্রোবায়োলজি ও ভাইরোলজি

মাইক্রোবায়োলজি আমাদের জানায়, অনেক রোগের মূল কারণ হলো অতি ক্ষুদ্র জীব—ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি। এগুলোকে আমরা প্যাথোজেন বলি। এরা দেহে প্রবেশ করে কোষে কোষে বসবাস করে, বংশবৃদ্ধি করে, এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে রোগ সৃষ্টি করে। এই মাইক্রোঅর্গানিজমগুলো যদি এক শরীর থেকে অন্য শরীরে চলে যায়, তখনই তা হয় “ছোঁয়াচে” বা সংক্রামক রোগ।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সংক্রমণ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়—যেমনঃ

  • রোগীর শরীর থেকে রোগজীবাণু আলাদা করা এবং ল্যাবরেটরিতে শনাক্ত করা,
  • একে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অন্য জীবের দেহে প্রবেশ করিয়ে একই রোগের লক্ষণ তৈরি করা,
  • পরবর্তীতে সেই দেহ থেকে আবার একই জীবাণু আলাদা করা ইত্যাদি।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলেরা, প্লেগ, গুটি বসন্ত, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, মিজেলস, এইচআইভি, ইবোলা, কোভিড-১৯—এসব রোগই বারবার প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে সংক্রমণ বাস্তব; একটি সংক্রামক প্যাথোজেন এক থেকে অন্য মানুষে ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট প্যাটার্নে মহামারী সৃষ্টি করে। WHO এবং অন্যান্য সংস্থা বারবার ব্যাখ্যা করেছে—শ্বাসযন্ত্রের রোগ যেমন কোভিড-১৯ মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির নিঃশ্বাস, কাশি, হাঁচি ইত্যাদি থেকে বের হওয়া শ্বাসকণার মাধ্যমে ছড়ায়।

এগুলোকে “কাকতালীয়”, “অলৌকিক” বা “স্রষ্টার খেয়াল” বা “তাকদীরের লিখন” বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না; কারণ এদের পিছনে কারণ-ফল সম্পর্ক স্পষ্টভাবে দেখানো গেছে। নির্দিষ্ট ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে টার্গেট করে তৈরি ভ্যাকসিন ব্যবহার করলে রোগের সংক্রমণ কমে; অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অনেক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিরাময় হয়; মাস্ক, দূরত্ব বজায় রাখা, ভিড় এড়ানো—এসব পদক্ষেপ নিলে রোগের গাণিতিক বিস্তার (R₀) কমে যায়। সবকিছু মিলিয়ে “ছোঁয়াচে রোগ বাস্তব”—এটি আজ বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণিত সত্যগুলোর একটি।


সংক্রমণ ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য মানদণ্ড

আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বা Public Health পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে এই স্বীকৃতির ওপর যে, একজনের আচরণ অন্যের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্যই WHO, জাতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কিছু মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করেছে:

  • সংক্রামক রোগ শনাক্ত হলে আইসোলেশন – রোগীকে পৃথক করে রাখা,
  • রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকলে কোয়ারেন্টাইন – উপসর্গহীন কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আলাদা রাখা,
  • Vaccination – আগে থেকে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা,
  • শ্বাসযন্ত্রের রোগে মাস্ক, বায়ু চলাচল, ভিড় এড়ানো ইত্যাদি,
  • হাসপাতাল ও ক্লিনিকে standard precautions, contact precautions, droplet precautions, airborne precautions ইত্যাদি।

এর অর্থ হলো, রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব—সংক্রমণ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করা, বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার না করা, এবং মানুষকে এমন কোনো ধারণা শেখানো থেকে বিরত থাকা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। “ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই” ধরনের বক্তব্য সরাসরি এই নীতিকে আঘাত করে। এটি মানুষকে ভুল নিরাপত্তাবোধ দেয়, যার ফলাফল হতে পারে অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু, অক্ষমতা, এবং বৃহৎ পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বিশেষ করে মহামারীর সময়—যেমন সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারী—যখন সংক্রমণ সম্পর্কে সামান্য অবহেলাও হাজার হাজার নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তখন ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে সংক্রমণ অস্বীকার করা বা তাকে গুরুত্বহীন দেখানো নীতিগতভাবে অপরাধের পর্যায়ে চলে যায়। WHO বারবার সতর্ক করেছে যে, ভুল তথ্য (misinformation) এবং ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক ভুল বিশ্বাস মহামারী নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে। [8]


কুষ্ঠরোগ: ইসলামী বক্তব্য বনাম বৈজ্ঞানিক তথ্য

ইসলামী হাদিস সাহিত্যে কুষ্ঠরোগ বা “জুজাম” সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে; কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে বলা হয়েছে বাঘ থেকে পালানোর মতো করে। অর্থাৎ, একদিকে বলা হচ্ছে “ছোঁয়াচে রোগ নেই”, অন্যদিকে কুষ্ঠরোগীর থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে—যেন সেখানে সংক্রমণের আশঙ্কা আছে। এই দ্বৈততা বোঝার জন্য আগে কুষ্ঠরোগের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সংক্ষেপে দেখা দরকার।

কুষ্ঠরোগ বা Hansen’s disease–এর কারণ Mycobacterium leprae নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। WHO এবং CDC উভয়েই ব্যাখ্যা করেছে যে, untreated (চিকিৎসা না পাওয়া) কুষ্ঠরোগী যদি দীর্ঘদিন ধরে অন্য মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে—তখন তার নাক-মুখ থেকে নির্গত ড্রপলেটে থাকা ব্যাকটেরিয়া অন্যের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এই রোগ casual contact—যেমন শুধু করমর্দন, একবার একই ঘরে বসা, একই প্লেটে একবার খাওয়া—এসবের মাধ্যমে সাধারণত ছড়ায় না; বরং দীর্ঘমেয়াদি ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ প্রয়োজন।

অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কুষ্ঠরোগ কম সংক্রামক, কিন্তু একেবারেই “অসংক্রামক” নয়। সংক্রমণ বাস্তব; তবে এর জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ও নির্দিষ্ট মাত্রার ঘনিষ্ঠতা লাগে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত বহু-ড্রাগ থেরাপি (MDT) শুরু করলে রোগী দ্রুতই সংক্রমণ ঘটানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে; ফলে সমাজে কুষ্ঠরোগের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। WHO কুষ্ঠরোগ নির্মূলের লক্ষ্যে বহু বছর ধরে গ্লোবাল প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে—এর পুরো ভিত্তিই হলো সংক্রমণ স্বীকার করা, রোগী সনাক্ত করা এবং চিকিৎসা দেওয়া।

সুতরাং “কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়”—এমন কথা বলা বিজ্ঞানবিরোধী। আবার “স্ত্রী, ঘরবাড়ি, পশুতে অশুভ থাকে, কিন্তু কুষ্ঠরোগী থেকে বাঘের মত পালাও”—এই ধরনের বক্তব্যও বৈজ্ঞানিকভাবে বিকৃত ও ভীতিপ্রচারমূলক। বাস্তবতা হলো: কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষ একজন রোগী—অপবিত্র জীব বা অশুভ সত্তা নয়; তাকে নিয়ে অশুভ কুসংস্কার ছড়ানো, সামাজিক বয়কট ও ঘৃণা তৈরি করা মানবাধিকারের বিরোধী।


“ছোঁয়াচে রোগ নেই” বনাম “কুষ্ঠরোগী থেকে পালাও” – যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব

এখন আসল দ্বন্দ্বটা স্পষ্ট করে দেখা যাক।

  • একদল হাদিসে সরাসরি বলা হয়েছে—“কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়।”
  • অন্যদিকে আরেকদল বর্ণনায় বলা হচ্ছে—কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে হবে, দূরে থাকতে হবে, তাকে এড়িয়ে চলতে হবে।

যদি সত্যিই “সংক্রমণ বলে কিছু নেই” হয়, তবে কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর প্রয়োজন কেন? দুইটি অবস্থানের যে কোনো একটি সত্য হতে পারে, দুইটি একসাথে নয়।

ইসলামি আপোলজেটিকরা সাধারণত এখানে একটি ঘোলাটে ব্যাখ্যা আনে: “আসলেই ছোঁয়াচে নেই, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয়; আল্লাহ চাইলে কুষ্ঠরোগী থেকেও ছড়াবে না, আবার চাইলে সুস্থ লোক থেকেও ছড়াতে পারে; পালাতে বলাটা কেবল ‘কারণ অবলম্বন’।”—এই ব্যাখ্যা আসলে বৈজ্ঞানিক প্রশ্নকে ফাঁকি দেওয়া; কারণ:

  • বিজ্ঞান জানতে চায়—কুষ্ঠরোগীর কাছাকাছি গেলে পরিসংখ্যানগতভাবে রোগ লাগার সম্ভাবনা কি বাড়ে? উত্তর: বাড়ে, এবং তা প্রমাণযোগ্য।
  • আপোলজেটিক ব্যাখ্যা জানায়—আল্লাহ চাইলেই লাগবে, না চাইলে লাগবে না। অর্থাৎ কোনো testable বা verifiable দাবি নেই; ফলে বাস্তবে এর কোনো explanatory power নেই।

অন্যদিকে, যদি স্বীকার করা হয়—কুষ্ঠরোগীর কাছাকাছি থাকলে রোগ লাগার সম্ভাবনা বাড়ে, তাই পালাতে বলা হয়েছে—তাহলে স্বয়ং ধর্মীয় পাঠের ভেতর থেকেই “সংক্রমণ” ধারণা স্বীকৃত হয়ে যায়। তাহলে “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা সহিহ হাদিসগুলোকে মিথ্যা, ভুল, বা অন্তত বাতিলযোগ্য স্বীকার করতেই হয়। অর্থাৎ:

১) সংক্রমণ নেই → কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, অথবা ২) কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানো যৌক্তিক → সংক্রমণ বাস্তব → “ছোঁয়াচে রোগ নেই” ধরনের হাদিস ভুল।

সংক্রমণ অস্বীকার বনাম কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো: যুক্তিগত দ্বন্দ্ব
একই সাথে দুটো অবস্থান সত্য হতে পারে না – যেকোনো একটিকে বাছতেই হবে।
বিকল্প ১ সংক্রমণ নেই ধরে নিলে
১) সংক্রমণ নেই
⇒ কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই
বিকল্প ২ পালানোকে যৌক্তিক ধরলে
২) কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানো যৌক্তিক
⇒ সংক্রমণ বাস্তব“ছোঁয়াচে রোগ নেই” ধরনের হাদিস ভুল
দুইটি একসাথে সত্য হতে পারে না – এটা নিজেই একটি কনট্রাডিকশন।

এই দুটো একসাথে সত্য হতে পারে না। এখানে “ধর্মের সম্মান রক্ষার” জন্য যতই জটিল ব্যাখ্যা বানানো হোক না কেন, লজিক্যালি এটি একটি ক্লাসিক সেল্‌ফ-কনট্রাডিকশন—একই সাথে P এবং not-P ধরে নেওয়ার চেষ্টা। বৈজ্ঞানিকভাবে এর অবস্থান আরও দুর্বল, কারণ আজ আমরা রোগজীবাণু, ড্রপলেট সংক্রমণ, এ্যারোসোল, ইনকিউবেশন পিরিয়ড, R₀ ইত্যাদি সবকিছুই পরীক্ষাগারে ও মাঠ-গবেষণায় পরিমাপ করতে পারি।


জনস্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও মানবাধিকার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “স্বাস্থ্য”কে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর দায়িত্ব বর্তায়—মানুষকে এমন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা, যেখানে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে তারা অপ্রয়োজনীয় রোগ ও মৃত্যুর শিকার হবে। সংক্রমণ অস্বীকারকারী ধর্মীয় কথা, ওয়াজ, খুতবা—এগুলো যখন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন এগুলো কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় থাকে না; সেগুলো সরাসরি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।

উদাহরণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারীর কথা ধরা যায়। বহু জায়গায় দেখা গেছে, ধর্মীয় নেতারা “ছোঁয়াচে রোগ নেই”, “সব আল্লাহর ইচ্ছা”, “মসজিদে এলে কিছু হবে না”—এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মানুষকে নিরাপত্তা নির্দেশ অমান্য করতে উৎসাহিত করেছেন। এর ফলে বহু লোক গাদাগাদি করে নামাজ, মাহফিল, জমায়েতে অংশ নিয়েছে, মাস্ক ব্যবহার ও দূরত্ব বজায় রাখাকে অবজ্ঞা করেছে—যার মূল্য দিতে হয়েছে বহু সংক্রমণ ও মৃত্যু দিয়ে।

নৈতিক প্রশ্নটি সোজা: কোনো মতবাদ যদি বাস্তবে মানুষের জীবন বাঁচানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই মতবাদকে সমালোচনা করা নৈতিক দায়িত্ব—শুধু অধিকার নয়। তার উৎস ধর্মগ্রন্থ হোক বা ঐতিহ্য—তা অন্ধভাবে সম্মান পাওয়ার যোগ্য নয়। “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা হাদিসগুলো কেবল ভুলই নয়, এগুলোকে সত্য ধরে নিলে তা মানুষের জীবনের জন্য বিপজ্জনক। তাই নৈতিকভাবে এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা, বা অন্তত নগণ্য, অপ্রামাণ্য ও বাতিল ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।


উপসংহার

মাইক্রোবায়োলজি, ভাইরোলজি এবং আধুনিক এপিডেমিওলজি পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়—সংক্রামক রোগ বাস্তব; মানুষের দেহে থাকা প্যাথোজেন বিভিন্ন পথে আরেক মানুষের দেহে চলে যায়, নির্দিষ্ট প্যাটার্নে রোগ ছড়ায়, মহামারী তৈরি করে। কুষ্ঠরোগ তুলনামূলকভাবে কম সংক্রামক হলেও একেবারে “অসংক্রামক” নয়; বরং দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলে তার ঝুঁকি থাকে, এবং WHO–সহ বিভিন্ন সংস্থা তা বহু গবেষণায় দেখিয়েছে।

এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে “কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়” বলা যে কোনো বক্তব্য সরাসরি বিজ্ঞানবিরোধী, জনস্বাস্থ্য-বিরোধী এবং নৈতিকভাবে দায়িত্বহীন। একইসাথে আবার কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালাতে বলার মধ্যে এমন এক দ্বৈততা তৈরি হয়, যেখানে সংক্রমণকে অস্বীকারও করা হচ্ছে, আবার পরোক্ষে স্বীকৃতিও দেওয়া হচ্ছে। যৌক্তিকভাবে এটি একটি স্ববিরোধী অবস্থান; বৈজ্ঞানিকভাবে এর কোনো স্থান নেই।

অতএব, এই পুরো ইসলামী বক্তব্য—একদিকে “ছোঁয়াচে রোগ নেই” বলা, আরেকদিকে “কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকো”—আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, WHO–এর নির্দেশনা, এবং মানবাধিকারের আলোকে অগ্রহণযোগ্য। মানবজীবন, স্বাস্থ্য, এবং বৈজ্ঞানিক সত্যের চেয়েও কোনো ধর্মীয় দাবির মূল্য বেশি হতে পারে না। কারও কথাকে “ধ্রুব সত্য” ধরে নিয়ে কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া একটি নির্মম ও অমানবিক কাজ—যতই তা “ধর্ম” নামে বিক্রি হোক না কেন।

বেশ কয়েকটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, নবী মুহাম্মদ বলেছেন যে, ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই। অথচ আধুনিক যেকোন সভ্য মানুষ মাত্রই জানেন, ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ অবশ্যই আছে, এই কিছুদিন আগেই করোনা নামক ছোঁয়াচে রোগে কোটি মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। লজ্জিত ইসলামিস্টগণ এই হাদিসগুলো এখন উলটে ফেলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু অনেক ইসলামিক আলেমই এখনো মনে করেন, নবীর এই হাদিস ধ্রুবসত্য! আসলেই ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই!


তথ্যসূত্রঃ
  1. WHO, infection prevention and control; CDC, basics of infectious disease transmission ↩︎
  2. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৫৭৭ ↩︎
  3. মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৪৫৮০ ↩︎
  4. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৯১২ ↩︎
  5. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৫৭৫৩ ↩︎
  6. সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৩৯২১ ↩︎
  7. সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭২ ↩︎
  8. WHO – infodemic management; COVID-19 misinformation ↩︎