ভূমিকা
ধর্মীয় আবেগ আর ভক্তি যখন একজন মানুষের প্রস্রাবকেও পবিত্র ও রোগনিরাময়কারী বস্তুতে পরিণত করে, তখন সেই ভক্তির সঙ্গে যুক্তিবোধের বিরোধ আর আড়াল থাকে না। মুহাম্মদের প্রস্রাব পান করার কাহিনিতে ঠিক এই রূপান্তর ঘটেছে: রাতে একটি পাত্রে মুহাম্মদ তার প্রস্রাব জমিয়ে রাখতেন, এক সাহাবী নারী তা পান করেন, তারপর নবী সেই কথা জানতে পেরে তার জন্য পেটের পীড়া থেকে মুক্তি কিংবা জাহান্নামের আগুন থেকে সুরক্ষার আশ্বাস দেন, অর্থাৎ বিষয়টিকে উৎসাহ দেন। ঘটনাটি হাদিস ও জীবনীগ্রন্থে জায়গা পেয়েছে; পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যায় তা নবীর শরীরের বিশেষ পবিত্রতার প্রমাণ হয়ে উঠেছে। মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া একটি বর্জ্যকে এখানে বিচার করা হচ্ছে তার বৈশিষ্ট্য দিয়ে নয়, সেটি কার শরীর থেকে বেরিয়েছে, সেই পরিচয় দিয়ে। নবীর মর্যাদা এত দূর প্রসারিত করা হয়েছে যে তাঁর কথা ও কাজের সঙ্গে তাঁর প্রস্রাবও ভক্তির বিষয় হয়ে উঠেছে; এমনকি তা দিয়ে চিকিৎসা করার অনুমতি পর্যন্ত ফিকহের গ্রন্থে লেখা হয়েছে।
এই বিশ্বাসের অস্বস্তিকর দিকটি শুধু প্রস্রাব পান করার দৃশ্য নয়। একজন অনুসারীর কাছে তাঁর নিজের প্রস্রাব নাপাক, অথচ তাঁর ধর্মীয় নেতার প্রস্রাব পবিত্র ও উপকারী—এমন ধারণা ব্যক্তির মর্যাদাকে বস্তু সম্পর্কে বিচার করার ওপর বসিয়ে দেয়। তখন সুস্থতা ও মুক্তির আশা যুক্ত হয় নেতার শরীরের সঙ্গে, আর সেই শরীর থেকে বের হওয়া বর্জ্যের প্রশ্নও আনুগত্যের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। উম্মে আইমান ও বারাকার কাহিনি, কাজী আয়াজের সহিহ ঘোষণা এবং বুহুতির চিকিৎসার অনুমতি এই বিশ্বাসকে গ্রন্থবদ্ধ করেছে। প্রস্রাবকে পবিত্র বলে গ্রহণ করার এই মত ইসলামি ঐতিহ্যের বাইরের কোনো অপবাদ নয়; কাজী আয়াজ ও বুহুতির নিজের গ্রন্থেই তার স্পষ্ট সমর্থন রয়েছে। ধর্মীয় শ্রদ্ধা দিয়ে প্রস্রাবের প্রকৃতি বদলে ফেলার এই চেষ্টা চরম ব্যক্তিপূজার প্রকাশ; মানুষের মর্যাদার সঙ্গে তার বর্জ্যের অলৌকিক গুণের কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই।
খাটের নিচে পাত্রে প্রস্রাব করার বর্ণনা
সুনান আবু দাউদে উমাইমা বিনতে রুকাইকার সূত্রে বর্ণিত আছে, মুহাম্মদের খাটের নিচে একটি কাঠের পাত্র থাকত, যাতে তিনি রাতের বেলা প্রস্রাব করতেন। ফলে শোবার জায়গার নিচেই প্রস্রাবের পাত্র রাখা হতো। সংকলনের অধ্যায়টির শিরোনাম রাতে পাত্রে প্রস্রাব করে কাছে রাখা নিয়ে, এবং উদ্ধৃত বর্ণনায় পাত্রটির অবস্থান ও ব্যবহার দুটিই সরাসরি উল্লেখ আছে। মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আলবানি এই বর্ণনাকে “হাসান সহিহ” বলেছেন। আবু দাউদের এই হাদিসে রাতের প্রস্রাব সংরক্ষণের বিবরণ রয়েছে; উম্মে আইমান ও বারাকার পরবর্তী ঘটনাবর্ণনায় সেই পাত্রের প্রস্রাব পান করার সঙ্গে রোগমুক্তি ও পরকালীন সুরক্ষার দাবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একটি সাধারণ দৈহিক কাজকে অলৌকিকতার উৎস বানানোর ধারাটি এই দুই স্তরে স্পষ্ট। [1]
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عِيسَى، حَدَّثَنَا حَجَّاجٌ، عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، عَنْ حُكَيْمَةَ بِنْتِ أُمَيْمَةَ بِنْتِ رُقَيْقَةَ، عَنْ أُمِّهَا، أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَدَحٌ مِنْ عَيْدَانٍ تَحْتَ سَرِيرِهِ يَبُولُ فِيهِ بِاللَّيْلِ.
বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবন ঈসা আমাদের বর্ণনা করেছেন; হাজ্জাজ তাঁকে বর্ণনা করেছেন, ইবন জুরাইজের সূত্রে, হুকাইমা বিনতে উমাইমা বিনতে রুকাইকার সূত্রে, তাঁর মায়ের সূত্রে। তিনি বলেন: নবীর খাটের নিচে একটি কাঠের পাত্র ছিল, যাতে তিনি রাতে প্রস্রাব করতেন।
সুনান নাসাঈর বর্ণনাতেও কাঠের পাত্রে প্রস্রাব করে সেটি খাটের নিচে রাখার কথা আছে। সেখানে ইবন জুরাইজ হুকাইমা বিনতে উমাইমার সূত্রে তাঁর মা উমাইমা বিনতে রুকাইকার বক্তব্য বর্ণনা করেছেন; আবু দাউদের বর্ণনাতেও এই ধারাটি রয়েছে। দুটি গ্রন্থে সংরক্ষিত হলেও এগুলো একই সূত্রধারার বিবরণ, দুটি স্বতন্ত্র প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নয়। নাসাঈর পাঠে প্রস্রাব পান করার ঘটনা বা তার উপকারের ঘোষণা নেই। সুন্নাহ ডট কমে দারুসসালামের মূল্যায়নে এটি “হাসান” হিসেবে চিহ্নিত। এই পাত্রের বিবরণই পরবর্তী দীর্ঘ কাহিনির পটভূমি: রাতে প্রস্রাব করে রাখা হতো, আর সকালে সেই পাত্র খালি করা হতো। পাত্রের বস্তু পান করে ফেলার পর বর্ণনায় যে হাসি, রোগমুক্তির আশ্বাস ও আগুন থেকে রক্ষার ঘোষণা এসেছে, ধর্মীয় পবিত্রতার যুক্তি গড়ে উঠেছে সেসবকে কেন্দ্র করে। [2]
أَخْبَرَنَا أَيُّوبُ بْنُ مُحَمَّدٍ الْوَزَّانُ، قَالَ حَدَّثَنَا حَجَّاجٌ، قَالَ قَالَ ابْنُ جُرَيْجٍ أَخْبَرَتْنِي حُكَيْمَةُ بِنْتُ أُمَيْمَةَ، عَنْ أُمِّهَا، أُمَيْمَةَ بِنْتِ رُقَيْقَةَ قَالَتْ كَانَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَدَحٌ مِنْ عَيْدَانٍ يَبُولُ فِيهِ وَيَضَعُهُ تَحْتَ السَّرِيرِ.
বাংলা অনুবাদ: আইয়ুব ইবন মুহাম্মদ আল-ওয়াজ্জান আমাদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হাজ্জাজ আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইবন জুরাইজ বলেছেন: হুকাইমা বিনতে উমাইমা আমাকে তাঁর মা উমাইমা বিনতে রুকাইকার সূত্রে জানিয়েছেন। তিনি বলেন: নবীর একটি কাঠের পাত্র ছিল, যাতে তিনি প্রস্রাব করতেন এবং সেটি খাটের নিচে রাখতেন।
উম্মে আইমানের প্রস্রাব পান ও পেটের পীড়া থেকে মুক্তির আশ্বাস
আল-হাকিমের আল-মুস্তাদরাকে উম্মে আইমানের সূত্রে প্রস্রাব পান করার ঘটনাটি সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে মুহাম্মদ রাতে ঘরের এক পাশে থাকা মাটির পাত্রে প্রস্রাব করেন, আর উম্মে আইমান তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠে পাত্রে কী আছে না জেনেই তা পান করে ফেলেন। সকালে পাত্রটি খালি করতে বললে তিনি পান করার কথা জানান। এর পরের প্রতিক্রিয়াই কাহিনিটিকে অলৌকিকতার দাবিতে পরিণত করেছে: মুহাম্মদ দাঁত দেখা যায় এমনভাবে হাসেন এবং তাঁর পেটে আর কখনো কষ্ট হবে না বলে আশ্বাস দেন। উম্মে আইমানের অজান্তে প্রস্রাব পান করার পর মুহাম্মদের হাসি এবং আজীবন পেটের কষ্ট থেকে মুক্তির আশ্বাস ঘটনাটিকে উৎসাহ ও বিশেষ উপকারের বর্ণনায় পরিণত করেছে। পানকারীর ভুলের ওপর দাঁড়িয়েই তাঁর শরীরের বর্জ্যকে অলৌকিক রোগনিরাময়ের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। [3]
عن أم أيمن رضي الله عنها قالت: قام النبي صلى الله عليه وآله وسلم من الليل إلى فخارة من جانب البيت فبال فيها، فقمت من الليل وأنا عطشى فشربت من في الفخارة وأنا لا أشعر، فلما أصبح النبي صلى الله عليه وآله وسلم قال: «يا أم أيمن قومي إلى تلك الفخارة فأهريقي ما فيها» قلت: قد والله شربت ما فيها، قال: فضحك رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم حتى بدت نواجذه ثم قال: «أما إنك لا يفجع بطنك بعده أبدا».
বাংলা অনুবাদ: উম্মে আইমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী রাতে উঠে ঘরের এক পাশে থাকা মাটির পাত্রে প্রস্রাব করেন। আমি রাতে তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠে পাত্রে যা ছিল তা পান করি, কী ছিল তা না জেনেই। সকালে নবী বলেন, “উম্মে আইমান, ওই পাত্রের কাছে গিয়ে এর ভেতরে যা আছে তা ফেলে দাও।” আমি বলি, “আল্লাহর কসম, এর ভেতরে যা ছিল আমি পান করে ফেলেছি।” তখন রাসুল এমনভাবে হাসেন যে তাঁর পেছনের দাঁত দেখা যায়। এরপর বলেন, “এরপর তোমার পেটে আর কখনো কষ্ট হবে না।”
ইবন কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় আবু ইয়ালার সূত্রে একই ধরনের একটি দীর্ঘ বিবরণ আছে। এতে উম্মে আইমানের দায়িত্ব ছিল সকালে পাত্রের প্রস্রাব ঢেলে ফেলা, এবং তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ভুল করে পাত্রের বস্তু পান করেছেন। এই অনিচ্ছাকৃত পান করার পর মুহাম্মদের ঘোষণাই ঘটনাটিকে ধর্মীয় মহিমা দিয়েছে: উম্মে আইমানকে পেটের পীড়া থেকে আজীবন মুক্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। যে বর্জ্য সকালে ফেলে দেওয়ার কথা, সেটিই পানকারীর জন্য অলৌকিক উপকারের কারণ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। এই বক্তব্যের মধ্যে পরিষ্কার একটি পরিবর্তন আছে—বর্জ্য অপসারণের সাধারণ কাজ থেকে বর্জ্য গ্রহণের বিশেষ উপকারে চলে যাওয়া; নবীর শরীরের বিশেষত্বের ধারণা সেই পরিবর্তনকে গ্রহণযোগ্য করেছে। [4]
وقال الحافظ أبو يعلى: ثنا محمد بن أبي بكر المقدمي، ثنا سلم بن قتيبة، عن الحسين بن حريث، عن يعلى بن عطاء، عن الوليد بن عبد الرحمن، عن أم أيمن قالت: كان لرسول الله صلى الله عليه وسلم فخارة يبول فيها، فكان إذا أصبح يقول: «يا أم أيمن، صبي ما في الفخارة» فقمت ليلة وأنا عطشى فغلطت فشربت ما فيها، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «يا أم أيمن، صبي ما في الفخارة» فقالت: يا رسول الله صلى الله عليه وسلم قمت وأنا عطشى، فشربت ما فيها. فقال: «إنك لن تشتكي بطنك بعد يومك هذا أبدا».
বাংলা অনুবাদ: হাফিজ আবু ইয়ালা বলেন: মুহাম্মদ ইবন আবু বকর আল-মুকাদ্দামি আমাদের বর্ণনা করেছেন; সালম ইবন কুতাইবা তাঁকে বর্ণনা করেছেন, হুসাইন ইবন হুরাইসের সূত্রে, ইয়ালা ইবন আতার সূত্রে, ওয়ালিদ ইবন আবদুর রহমানের সূত্রে, উম্মে আইমান থেকে। তিনি বলেন: রাসুলের একটি মাটির পাত্র ছিল, যাতে তিনি প্রস্রাব করতেন। সকালে তিনি বলতেন, “উম্মে আইমান, পাত্রে যা আছে তা ঢেলে দাও।” এক রাতে আমি তৃষ্ণার্ত অবস্থায় উঠে ভুল করে পাত্রে যা ছিল তা পান করে ফেলি। রাসুল বলেন, “উম্মে আইমান, পাত্রে যা আছে তা ঢেলে দাও।” তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসুল, আমি তৃষ্ণার্ত অবস্থায় উঠেছিলাম এবং পাত্রে যা ছিল তা পান করে ফেলেছি।” তখন তিনি বলেন, “আজকের পর তোমার পেটে আর কখনো পীড়া হবে না।”
বারাকার কাহিনিতে জাহান্নাম থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় বারাকা নামে এক নারীর প্রস্রাব পান করার আরেকটি বিবরণ আছে। ইবন কাসির ইবনুল আসিরের আল-গাবার সূত্রে সেটি উদ্ধৃত করেছেন। এতে মুহাম্মদ খাটের নিচে রাখা পাত্রটি খুঁজে সেখানে প্রস্রাব পান না; তাঁকে জানানো হয়, বারাকা তা পান করেছেন। তারপর তাঁর বক্তব্য হিসেবে বলা হয়, বারাকা আগুন থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য একটি বেষ্টনী তৈরি করেছেন। পেটের পীড়া থেকে মুক্তির আশ্বাসের চেয়ে এই দাবি আরও দূরে যায়, কারণ প্রস্রাব পান করার সঙ্গে এখানে পরকালীন শাস্তি থেকে সুরক্ষা যুক্ত হয়েছে। কাহিনিটির ধর্মীয় অর্থ তাই শরীরের একটি বর্জ্যকে সরাসরি মুক্তির উপায় করে তোলা। যে পদার্থ সাধারণ ক্ষেত্রে অপসারণযোগ্য, নবীর ক্ষেত্রে সেটিই গ্রহণ করলে উপকার পাওয়া যায়—ব্যক্তির পরিচয় বদলানোর সঙ্গে পদার্থের ধর্মীয় মূল্যও উল্টে যাচ্ছে। [5]
قال ابن الأثير في «الغابة»: وروى حجاج بن محمد، عن ابن جريج، عن حكيمة بنت أميمة، عن أمها أميمة بنت رقيقة قالت: كان للنبي صلى الله عليه وسلم قدح من عيدان يبول فيه، يضعه تحت السرير، فجاءت امرأة اسمها بركة فشربته، فطلبه فلم يجده، فقيل: شربته بركة. فقال: «لقد احتظرت من النار بحظار» قال الحافظ أبو الحسن بن الأثير: وقيل إن التي شربت بوله عليه الصلاة والسلام، إنما هي بركة الحبشية التي قدمت مع أم حبيبة من الحبشة. وفرق بينهما. فالله أعلم.
বাংলা অনুবাদ: ইবনুল আসির আল-গাবায় বলেন: হাজ্জাজ ইবন মুহাম্মদ ইবন জুরাইজের সূত্রে, হুকাইমা বিনতে উমাইমার সূত্রে, তাঁর মা উমাইমা বিনতে রুকাইকা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: নবীর একটি কাঠের পাত্র ছিল, যাতে তিনি প্রস্রাব করতেন এবং সেটি খাটের নিচে রাখতেন। বারাকা নামের এক নারী এসে তা পান করেন। তিনি সেটি খুঁজে পাননি; তাঁকে বলা হয়, বারাকা পান করেছেন। তখন তিনি বলেন, “তুমি আগুন থেকে নিজেকে একটি বেষ্টনী দিয়ে রক্ষা করেছ।” হাফিজ আবুল হাসান ইবনুল আসির বলেন: বলা হয়েছে, যিনি তাঁর প্রস্রাব পান করেছিলেন, তিনি সেই আবিসিনীয় বারাকা, যিনি উম্মে হাবিবার সঙ্গে আবিসিনিয়া থেকে এসেছিলেন। তিনি তাঁদের দুজনকে পৃথক করেছেন। আল্লাহই অধিক জানেন।
উম্মে আইমানের নামও বারাকা হওয়ায় দুই পরিচয় এক করে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইবন কাসিরের উদ্ধৃত আলোচনাতেই আবিসিনিয়া থেকে উম্মে হাবিবার সঙ্গে আসা বারাকা ও মুহাম্মদের পরিচর্যাকারী উম্মে আইমানকে পৃথক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার কথা আছে। দুই বর্ণনার অলৌকিক দাবিও পৃথক: একটিতে পেটের পীড়া থেকে রক্ষা, অন্যটিতে আগুন থেকে সুরক্ষা। আল-বিদায়ার বাংলা সংস্করণে প্রস্রাবের কাহিনির আগে আকাশ থেকে নামানো পানির বালতি পান করে তৃষ্ণামুক্তির পৃথক কাহিনি রয়েছে; সেটি প্রস্রাব পান করার ফল নয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা সংস্করণের পঞ্চম খণ্ডের ৫৩৪ পৃষ্ঠায় প্রস্রাব পান করার বিবরণটি পাওয়া যায়। প্রস্রাবের কাহিনিতে রোগমুক্তি ও আগুন থেকে সুরক্ষার যে আশ্বাস রয়েছে, সেটিই মানুষের বর্জ্যকে ভক্তি ও মুক্তির উপকরণ বানানোর স্পষ্ট উদাহরণ।
হাফিয আবূ ইয়ালা (র) বলেন, মুহাম্মদ ইবন আবূ বকর আল মুকাদ্দাসী (র)….উম্মু আয়মান (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি পোড়া মাটির পাত্র ছিল যাতে তিনি (রাতের বেলা) পেশাব করতেন। সকাল হলে তিনি বলতেন, হে উম্মু আয়মান! পাত্রে যা আছে তা ঢেলে ফেলে দাও। এক রাতে আমি পিপাসিত হয়ে জেগে উঠলাম। পাত্রে যা ছিল তা আমি পান করে ফেললাম। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হে উম্মু আয়মান! পাত্রে যা আছে তা ফেলে দাও। উম্মু আয়মান (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি পিপাসার্ত হয়ে জেগে উঠেছিলাম, তাই পাত্রে যা ছিল তা আমি পান করে ফেলেছি। তিনি انك لن تشتكى بطنك بعد يومك هذا ابدا কখনো তোমার পেটের পীড়ায় ভুগবে না।” ইবনুল আছীর (র) উসদুল গাবা গ্রন্থে বলেছেন, হাজ্জাজ ইবন মুহাম্মদ (র) রিওয়ায়াত করেছেন…. উমায়মা বিনত রুকায়্যা (রা) হতে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি কাঠের পাত্র ছিল যাতে তিনি পেশাব করতেন। পাত্রটি খাটের নীচে রেখে দিতেন। বারাকাহ নাম্নী এক নারী এসে তা পান করে ফেলল। নবী করীম (সা) তা খোঁজ করে পেলেন না। তাঁকে বলা হল যে, বারাকাহ তা পান করে ফেলেছে।
নবী করীম (সা) বললেন, – لقد احتظرت من النار بحظار “একটি (বিশাল) প্রতিবন্ধক দিয়ে তুমি জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করেছ।” হাফিয আবুল হাসান ইবনুল আছীর (র) বলেছেন, কারো কারো মতে নবী করীম (সা)-এর পেশাব পান করেছিলেন হাবশা বাসিনী বারাকা (রা)। যিনি উম্মু হাবীবা (রা)-এর সংগে হাবশা হতে এসেছিলেন। (অর্থাৎ) তিনি এ দুই জনকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বলেছেন। আল্লাহই সমধিক অবগত।

আশ-শিফায় পবিত্রতা, সহিহ ঘোষণা এবং মুখ না ধোয়ার যুক্তি
কাজী আয়াজ আশ-শিফায় নবীর দেহের পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধ ও বিশেষত্বের আলোচনার মধ্যে প্রস্রাব পান করার কাহিনিটি রেখেছেন। গ্রন্থটির প্রথম খণ্ডের ৬৪ পৃষ্ঠায় তিনি কিছু আলেমের নবীর দেহজাত বর্জ্যকে পবিত্র বলার মত উল্লেখ করেন; পরের পৃষ্ঠায় নারী কর্তৃক প্রস্রাব পান, পেটব্যথা থেকে মুক্তির আশ্বাস এবং মুখ ধোয়ার নির্দেশ বা পুনরাবৃত্তির নিষেধ না থাকার বক্তব্য আসে। একই ধারায় রক্ত পান করার বর্ণনাও রয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায় নবীর দেহের বিশেষ মর্যাদা এবং পানকারীদের প্রতি অনুমোদনের বিবরণ পবিত্রতার দাবিকে সমর্থন করছে। প্রস্রাব পান করার এই কাহিনি থেকে তিনি দেহজাত বর্জ্যের পবিত্রতা ও ধর্মীয় অনুমোদনের যুক্তি তৈরি করেছেন; দুর্ঘটনার বিবরণকে ব্যবহার করেছেন নবীর শরীরের বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজে। কাজী আয়াজ নারীটির প্রস্রাব পান করার হাদিসকে সরাসরি সহিহ বলেছেন। [6] [7]
وقد روي نحو من هذا عنه في امرأة شربت بوله فقال لها لن تشتكي وجع بطنك أبدا، ولم يأمر واحدا منهم بغسل فم ولا نهاه عن عودة. وحديث هذه المرأة التي شربت بوله صحيح ألزم الدارقطني مسلما والبخاري إخراجه في الصحيح، واسم هذه المرأة بركة واختلف في نسبها وقيل هي أم أيمن وكانت تخدم النبي صلى الله عليه وسلم، قالت وكان لرسول الله صلى الله عليه وسلم قدح من عيدان يوضع تحت سريره يبول فيه من الليل فبال فيه ليلة ثم افتقده فلم يجد فيه شيئا فسأل بركة عنه فقالت قمت وأنا عطشانة فشربته وأنا لا أعلم، روى حديثها ابن جريج وغيره.
বাংলা অনুবাদ: তাঁর সম্পর্কে অনুরূপ বর্ণনা আছে—এক নারী তাঁর প্রস্রাব পান করেছিলেন। তিনি সেই নারীকে বলেন, “তোমার পেটে আর কখনো ব্যথা হবে না।” তিনি তাঁদের কাউকে মুখ ধোয়ার নির্দেশ দেননি এবং আবার তা করতে নিষেধও করেননি। এই নারীর প্রস্রাব পান করার হাদিস সহিহ; দারাকুতনি মুসলিম ও বুখারির কাছে এটিকে তাঁদের সহিহে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছেন। নারীর নাম বারাকা; তাঁর পরিচয় নিয়ে মতভেদ আছে, এবং বলা হয়েছে তিনি উম্মে আইমান। তিনি নবীর সেবা করতেন। তিনি বলেন: রাসুলের একটি কাঠের পাত্র ছিল, যা খাটের নিচে রাখা হতো এবং যাতে তিনি রাতে প্রস্রাব করতেন। এক রাতে তিনি সেখানে প্রস্রাব করেন; পরে সেটি খুঁজে ভেতরে কিছু পাননি। তিনি বারাকাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “আমি তৃষ্ণার্ত অবস্থায় উঠে কী ছিল না জেনেই তা পান করেছি।” তাঁর হাদিস ইবন জুরাইজ ও অন্যরা বর্ণনা করেছেন।
কাজী আয়াজের বক্তব্যে দুটি পৃথক দাবি আছে: বর্ণনাটিকে তিনি সহিহ বলেছেন, এবং নিষেধ বা মুখ ধোয়ার নির্দেশ না দেওয়াকে ধর্মীয় আলোচনায় ব্যবহার করেছেন। প্রস্রাব পান করা নারীর প্রথম কাজটি অনিচ্ছাকৃত হলেও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াকে তিনি অনুমোদনের যুক্তিতে যুক্ত করছেন। কাজী আয়াজের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া: তিনি উপকারের আশ্বাস দিয়েছেন, মুখ ধুতে বলেননি এবং পুনরাবৃত্তি নিষিদ্ধ করেননি। নারীর প্রথম ভুলকে সামনে এনে এই পরবর্তী অনুমোদন আড়াল করা যুক্তির ফাঁকি। আবার তাঁর আরবি বাক্যে দারাকুতনির বুখারি ও মুসলিমকে বর্ণনাটি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলার কথা আছে, বুখারি সেটি তাঁর সহিহে সংকলন করেছেন—এমন বক্তব্য নেই। প্রচারিত বাংলা উদ্ধৃতিতে একে বুখারির সহিহে গণ্য করার বক্তব্যে বদলে দেওয়া ভুল অনুবাদ। একইভাবে “পেটে ব্যথা হবে না” কথাকে “কষ্মিনকালেও কোন ব্যাধি হবে না” করলে নির্দিষ্ট আশ্বাসটি সব রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষার দাবিতে পরিণত হয়। অলৌকিক ফল বাড়িয়ে এবং গ্রন্থগত অনুমোদন বদলে এই কাহিনির কর্তৃত্ব আরও বড় করে দেখানো হয়েছে।
ধর্মীয় বাংলা উপস্থাপনায় এই কাহিনির প্রস্রাবকে “পেশাব মোবারক”, হাসির সময় প্রকাশিত দাঁতকে “দাঁত মোবারক”, এমনকি ঘুমকেও “ঘুম মোবারক” বলা হয়েছে। এসব বিশেষণ ঘটনার তথ্যের সঙ্গে ভক্তির মূল্যবোধ জুড়ে দেয়; একটি মানুষের দৈহিক কাজকে আগে থেকেই পবিত্র ঘোষণা করে নেওয়া হয়। প্রস্রাবের সঙ্গে “মোবারক” শব্দ বসানোর ফলে প্রস্রাবের বৈশিষ্ট্যের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না, অথচ শব্দটি পাঠককে সেই বর্জ্য শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করার দিকে ঠেলে দেয়। নবীর প্রতি সম্মান এখানে তাঁর শরীরের প্রতিটি উপাদানের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বর্জ্যের স্বাভাবিক পরিচয়ও ভক্তির ভাষার নিচে চাপা পড়ে। আশ-শিফার বাংলা সংস্করণের প্রথম খণ্ডের ২৩২–২৩৩ পৃষ্ঠার আলোচনাও এই ধর্মীয় গ্রহণের নথি; পবিত্রতার ধারণা শুধু আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাংলা ধর্মীয় পাঠেও পৌঁছেছে।
একবার সিঙ্গা লাগানোর সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়ের (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পবিত্র রক্ত পান করেন। তখন হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,
وَيْلٌ لَكَ مِنَ النَّاسِ، وَوَيْلٌ لِلنَّاسِ مِنْكَ.
-লোকেরা তোমার হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর তুমিও লোকদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
কিন্তু হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে রক্ত পান করতে নিষেধ করেননি। অনুরূপ এক অপর বর্ণনায় এক মহিলা সম্পর্কে বর্ণিত আছে। যে ভুলবশতঃ হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পেশাব পান করেছিল। তখন হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন,
لَنْ تَشْتَكِي وَجَعَ بَطْنِكِ أَبَدًا.
-এখন থেকে তোমার পেটের পীড়া হবে না।
আর তিনি তাকে মুখ ধৌত করার নির্দেশও দেননি বা ভবিষ্যতে এরূপ কাজ করতে নিষেধও করেননি। পেশাব পানকারিণী ঐ মহিলার বর্ণনা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ বর্ণনা ইমাম দারে কুতনী বর্ণনা করেছেন। ইমাম বোখারী ও মুসলিম (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে যেরূপ সর্তকতা অবলম্বন করতেন, ইমাম দারে কুতনীও অনুরূপ বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করতেন। পেশাব পানকারিণী মহিলার নাম “বারকাত”। তবে তাঁর বংশ তালিকায় মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন সেই মহিলা হলেন উম্মে আইমান, যিনি হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বলেন,
قَالَتْ: وَكَانَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدَحٌ مِنْ عِيدَانِ، يُوضَعُ تَحْتَ سَرِيرِهِ، يَبُولُ فِيهِ مِنَ اللَّيْلِ، فَبَالَ فِيهِ لَيْلَةً، ثُمَّ افْتَقَلَهُ، فَلَمْ يَجِدْ فِيهِ شَيْئًا.
فَسَأَلَ بَرَكَةً عَنْهُ، فَقَالَتْ: قُمْتُ، وَأَنَا عَطْشَانَةٌ، فَشَرِبْتُهُ وَأَنَا لَا أَعْلَمُ
-হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটা কাঠের পাত্র ছিলো। সে পেয়ালা তাঁর খাটের নিচে রাখা হতো। যাতে রাতের বেলায় তিনি পেশাব করতেন। এক রাতে তিনি ঐ পাত্রে পেশাব করে পাত্রটি উক্ত স্থানে রেখে দেন। যখন তিনি পাত্রটি দেখেন কিন্তু তাতে পেশাব ছিলোনা। হুযুর (সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন বারকতকে পাত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস বরেন। তখন বারকত বললো, রাতে আমার পানির পিপাসা পেয়েছে, তাই আমি ঘুম থেকে উঠে অন্ধকারে পাত্রে রাখা জিনিস পান করে ফেলি। এ বর্ণনা ইবনে জোরাইজ ও আইনী বর্ণনা করেছেন।’

ফিকহে প্রস্রাব ও রক্ত দিয়ে চিকিৎসা করার অনুমতি
মনসুর আল-বুহুতির কাশশাফ আল-কিনায় নবীর বিশেষত্বের অধীনে আমাদের ক্ষেত্রে নাপাক পদার্থকে তাঁর এবং অন্য নবীদের ক্ষেত্রে পবিত্র বলা হয়েছে; সঙ্গে রয়েছে তাঁর প্রস্রাব ও রক্ত দিয়ে চিকিৎসা করার অনুমতি। শামেলার সংস্করণে পঞ্চম খণ্ডের ৩১ পৃষ্ঠায় এই বক্তব্যের পরই উম্মে আইমানের প্রস্রাব পান এবং আগুন থেকে সুরক্ষার বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, আর বুহুতি সেটিকে দুর্বলও বলেছেন। ফলে একই অনুচ্ছেদে চিকিৎসার অনুমতি, তার সমর্থনে বর্ণনা এবং সেই বর্ণনার দুর্বলতার স্বীকৃতি রয়েছে। দুর্বলতার মন্তব্য বিধানের পাশে থেকেছে, বিধানটি সরিয়ে দেয়নি। পবিত্র ব্যক্তি সম্পর্কে পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাস কতটা শক্তিশালী হলে প্রমাণের দুর্বলতা লিখেও তাঁর প্রস্রাব দিয়ে চিকিৎসার অনুমতি বজায় থাকে, এই পাঠ তার সরাসরি দৃষ্টান্ত। [8] [9]
(والنجس منا طاهر منه) صلى الله عليه وسلم ومن سائر الأنبياء وبجواز أن يستشفى ببوله ودمه لما رواه الدارقطني «أن أم أيمن شربت بوله فقال: إذن لا تلج النار بطنك» لكنه ضعيف.
বাংলা অনুবাদ: আমাদের ক্ষেত্রে যা নাপাক, তাঁর এবং অন্য সব নবীর ক্ষেত্রে তা পবিত্র; তাঁর প্রস্রাব ও রক্ত দিয়ে চিকিৎসা করাও বৈধ। কারণ দারাকুতনি বর্ণনা করেছেন, উম্মে আইমান তাঁর প্রস্রাব পান করলে তিনি বলেন, “তাহলে আগুন তোমার পেটে প্রবেশ করবে না।” কিন্তু বর্ণনাটি দুর্বল।
এই বিধানে পদার্থের ধর্মীয় মর্যাদা বদলানোর কারণ ব্যক্তির নবী পরিচয়। সাধারণ মানুষ ও নবীর জন্য একই ধরনের দেহজাত বর্জ্য সম্পর্কে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে, এবং দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত থেকে চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমতি বেরিয়ে আসছে। এখানে ফিকহি পবিত্রতার দাবির সঙ্গে রোগনিরাময়ের দাবিও যুক্ত হয়েছে, যদিও ধর্মীয়ভাবে পবিত্র ঘোষণা করা কোনো পদার্থের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা প্রমাণ করে না। “আমাদের ক্ষেত্রে নাপাক, তাঁর ক্ষেত্রে পবিত্র”—এই বাক্যই দ্বৈত মানদণ্ডকে প্রকাশ করে; সেই বিশেষ মর্যাদার ভিত্তিতে প্রস্রাব ও রক্ত ব্যবহারের অনুমতি তার বাস্তব পরিণতি। মানুষের দেহের বর্জ্যকে গ্রহণযোগ্য করতে মানুষের পরিচয়কে প্রমাণের বিকল্প করা হয়েছে। নিজের প্রস্রাব থেকে দূরে থাকার বিধান মেনে চলা একজন অনুসারীর কাছে নেতার প্রস্রাবকে উপকারী বলা হলে, তার বিচারবোধকে বস্তুর বৈশিষ্ট্যের বদলে নেতার মর্যাদা অনুসরণ করতে শেখানো হয়।
নাপাক প্রস্রাব, কবরের শাস্তি এবং নেতার জন্য ব্যতিক্রম
আবু দাউদ ইবন আব্বাসের সূত্রে যে হাদিস সংকলন করেছেন, সেখানে প্রস্রাব থেকে নিজেকে রক্ষা না করাকে কবরের শাস্তির কারণ বলা হয়েছে। মুহাম্মদ শামসুল হক আজিমাবাদি আওনুল মাবুদে এর ব্যাখ্যায় প্রস্রাব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থই গ্রহণ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে ফতোয়া কেন্দ্রের আলেমরা নামাজের আগে শরীর, পোশাক ও স্থান থেকে প্রস্রাবের নাপাকি দূর করার বাধ্যবাধকতা জানিয়েছেন—তা অল্প হোক বা বেশি। প্রস্রাবের প্রতি এই কঠোর ধর্মীয় আচরণের বিপরীতে নবীর প্রস্রাবকে পবিত্র ও পানকারীর উপকারের উৎস বলার মত রাখলে পার্থক্যটি আরও তীব্র হয়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে স্পর্শে নাপাকি এবং অবহেলায় শাস্তির ভয়, আর বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে পান করায় রোগমুক্তি ও আগুন থেকে রক্ষার আশ্বাস—পদার্থের পরিচয় থেকে ব্যক্তির পরিচয়ের দিকে সরে যাওয়ার ফল এই দুই বিধান। যে ধর্মীয় ভাষা অনুসারীকে নিজের প্রস্রাবের ব্যাপারে শাস্তির ভয় দেখায়, সেই ভাষার ভেতরেই নেতার প্রস্রাব গ্রহণের বিশেষ উপকারের দাবি জায়গা পেয়েছে। [10] [11]
فيجب إزالته من البدن والثوب والمكان عند إرادة الصلاة سواء كان قليلا أو كثيراً
বাংলা অনুবাদ: নামাজ আদায়ের সময় শরীর, পোশাক ও স্থান থেকে তা দূর করা আবশ্যক, তা অল্প হোক বা বেশি।
প্রস্রাবের পবিত্রতার ধারণাকে প্রশ্নাতীত করার চেষ্টাও নথিভুক্ত হয়েছে। ফতোয়া কেন্দ্রের কাছে এক প্রশ্নকারী জানান, আল-আজহারের একটি পাঠে একজন বক্তা নবীর প্রস্রাবের পবিত্রতা নিয়ে আলেমদের ঐকমত্য দাবি করেছেন, বিপরীত মতাবলম্বীদের বিদআতি বলেছেন এবং তাঁদের খারাপ পরিণতির আশঙ্কা তুলেছেন। ইয়াহইয়া ইবন শরফ আন-নববী আল-মাজমুতে এই বিষয়ে দুটি মতের কথা লিখেছেন এবং অধিকাংশ আলেমের গৃহীত অবস্থান হিসেবে রক্ত ও দেহজাত বর্জ্যের নাপাক হওয়ার মত উল্লেখ করেছেন। ফতোয়া প্রণেতা আলেমরাও তাঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে বক্তার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ঐকমত্যের দাবিটি মিথ্যা; নববীর নিজের পাঠই তা খণ্ডন করে। প্রশ্নকারীর বিবরণে ভিন্নমতকে ধর্মীয় অপরাধ বানানোর চেষ্টাও স্পষ্ট। প্রস্রাব পবিত্র কি না, এমন একটি প্রশ্নে খারাপ পরিণতির ভয় ঢুকিয়ে দিলে বিশ্বাস যাচাইয়ের জায়গায় শাস্তি ও আনুগত্যের চাপ বসে যায়। বর্জ্যকে পবিত্র বানানোর দাবির সঙ্গে সেই দাবি অস্বীকার করাকে অপরাধ বানানোর প্রবণতা যুক্ত হলে, ব্যক্তিপূজা আর শুধু অনুভূতি থাকে না; তা ভিন্নমতকে দমন করার ধর্মীয় ভাষাও পেয়ে যায়। [12] [13]
وطهارة بوله صلى الله عليه وسلم ليس أمرا مجمعا عليه كما زعم
বাংলা অনুবাদ: তিনি যেমন দাবি করেছেন, তাঁর প্রস্রাবের পবিত্রতা নিয়ে ঐকমত্য নেই।
সনদ নিয়ে আপত্তি ও “দুর্ঘটনা” দিয়ে পবিত্রতার যুক্তি খণ্ডনের চেষ্টা
ইবন হাজর আল-আসকালানি উম্মে আইমানের বর্ণনার সনদে আবু মালিক আন-নাখাঈকে দুর্বল বলেছেন এবং নুবাইহ উম্মে আইমানকে পাননি বলে সংযোগের অভাব উল্লেখ করেছেন। দারাকুতনিও আবু মালিকের দুর্বলতা ও তাঁর কারণে বর্ণনার অসংগতির কথা বলেছেন। অন্য ধারার বর্ণনাকারী হুকাইমাকে আল-যাহাবি ও ইবন হাজর অপরিচিত বলেছেন। মুহাম্মদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত ১৮১৭৭৬ নম্বর ফতোয়ায় এই মূল্যায়নগুলো উদ্ধৃত করে দুটি ধারাকেই দুর্বল বলা হয়েছে। সেই ফতোয়ার প্রণেতারা আরও দাবি করেছেন, বর্ণনাগুলো সহিহ হলেও পবিত্রতার প্রমাণ হবে না, কারণ পান করার ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত ছিল। এই যুক্তি অসম্পূর্ণ: নারীর অজ্ঞতা তাঁর পান করার কারণ ব্যাখ্যা করে, মুহাম্মদের পরবর্তী উপকারের আশ্বাসকে বাতিল করে না। কাজী আয়াজ পবিত্রতার যুক্তি তৈরি করেছেন সেই পরবর্তী প্রতিক্রিয়া থেকেই। ভুল করে পান করা এবং তারপর বিশেষ উপকারের ঘোষণা পাওয়া একই ঘটনাক্রমের দুটি পর্যায়; প্রথমটির উল্লেখ করে দ্বিতীয়টির ধর্মীয় অর্থ বাতিল হয় না। [14] [15]
ولو صحَّ شيء منها، لم يكن فيه حجة، لأن شرب البول قد وقع فيها مصادفة، من غير تعمد لشربه.
বাংলা অনুবাদ: এসবের কোনোটি বিশুদ্ধ হলেও তা প্রমাণ হবে না, কারণ প্রস্রাব পান করার ঘটনাটি সেখানে দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে, ইচ্ছাকৃতভাবে পান করা হয়নি।
কাজী আয়াজ বর্ণনাটিকে সহিহ বলেছেন; ইবন হাজর ও দারাকুতনি সংশ্লিষ্ট সনদে দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন। এগুলো ইসলামি বর্ণনাশাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন। দুর্বল সনদ ঘটনাটিকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠার শক্তি কমায়, কিন্তু কোনো ঘটনার না-ঘটার স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রমাণ হয়ে যায় না। একই কাহিনি কয়েকটি গ্রন্থে উদ্ধৃত হওয়াও প্রত্যেকবার নতুন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য তৈরি করে না। প্রস্রাবকে পবিত্র বলা এবং তা দিয়ে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার মত ধ্রুপদী গ্রন্থে সরাসরি লেখা আছে। কাজী আয়াজের সহিহ ঘোষণা, বুহুতির দুর্বলতার মন্তব্যসহ অনুমতি এবং আধুনিক ফতোয়ার প্রত্যাখ্যান পরস্পরবিরোধী ধর্মীয় অবস্থান দেখায়। পরবর্তী প্রত্যাখ্যান আগের বিধানকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেয় না, আর আগের বিধানও ঘটনাটির অলৌকিক ফলকে পরীক্ষিত সত্য করে না। সনদের বিতর্ক দিয়ে এই গ্রন্থবদ্ধ ব্যক্তিপূজা ঢেকে দেওয়া যায় না: মানুষের বর্জ্যকে পবিত্র ও চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য করার অনুমতি আলেমরা নিজেরাই লিখেছেন।
ধর্মীয় বক্তাদের বক্তব্য
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: রক্ত, প্রস্রাব ও পুঁজ খাওয়ার ঝুঁকি
প্রস্রাব: শরীরের বর্জ্যকে ওষুধ বানানোর ভ্রান্তি
প্রস্রাব তৈরি হয় শরীরের বিপাকীয় বর্জ্য এবং অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায়। কিডনির ছাঁকনি ও নালিকা রক্ত থেকে পদার্থ বাছাই করে, প্রয়োজনীয় পানি ও উপাদানের বড় অংশ আবার রক্তে ফিরিয়ে দেয়, আর অবশিষ্ট তরল ও বর্জ্য প্রস্রাব হিসেবে বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডায়াবেটিস, পরিপাক ও কিডনি রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যায় এই বর্জ্য অপসারণ এবং পানি, লবণ ও খনিজের ভারসাম্য রক্ষা কিডনির প্রধান কাজ। শরীর যে পদার্থ বের করে দিচ্ছে, সেই পদার্থকে ধর্মীয় পরিচয়ের জোরে রোগনিরাময়কারী বলে চালানো তার শারীরবৃত্তীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা। প্রস্রাবে পানি আছে বলেই সেটি বিশুদ্ধ পানীয় হয় না; পানির সঙ্গে কী দ্রবীভূত আছে এবং কী জীবাণু রয়েছে, তা-ই তার নিরাপত্তা নির্ধারণ করে। “মোবারক” বিশেষণ কিডনির এই কাজ বা নির্গত তরলের গঠন পাল্টায় না। [16]
Your kidneys remove wastes and extra fluid from your body.
বাংলা অনুবাদ: কিডনি আপনার শরীর থেকে বর্জ্য ও অতিরিক্ত তরল অপসারণ করে।
ক্লিনিক্যাল বিষবিদ ওয়েন্ডি ক্লাইন-শোয়ার্টজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রস্রাবের প্রায় ৯৫ শতাংশ পানি; বাকি অংশে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, বিভিন্ন লবণ ও অন্যান্য যৌগ থাকে। প্রস্রাব পান করলে বমিভাব, বমি ও ডায়রিয়া হতে পারে, আর মূত্রনালির সংক্রমণ থাকলে রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে পরিমাণ, উপাদান ও সংক্রমণের ওপর; অল্প প্রস্রাব ভুল করে খাওয়ার পর কেউ অসুস্থ না হওয়া সেই প্রস্রাবের চিকিৎসাগত উপকার প্রমাণ করে না। তাঁর চিকিৎসাবিষয়ক লেখায় প্রস্রাবকে বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করার বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। অথচ উম্মে আইমানের কাহিনিতে একটি পান করার ঘটনাকে আজীবন পেটের রোগ থেকে মুক্তির আশ্বাসে পরিণত করা হয়েছে। কোনো নির্ণয়, তুলনামূলক পরীক্ষা বা চিকিৎসাগত পর্যবেক্ষণ ছাড়াই এত বড় দাবি করা রোগনিরাময়ের প্রমাণ নয়; এটি অলৌকিকতার প্রমাণহীন ঘোষণা। [17]
There is no scientific evidence for the use of urine as an alternative medicine therapy.
বাংলা অনুবাদ: প্রস্রাবকে বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করার পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
প্রস্রাবকে জীবাণুমুক্ত ধরে নেওয়ার ধারণাও পরীক্ষায় টেকেনি। ইভান ই. হিল্ট ও তাঁর সহকর্মীরা ২০১৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় অতিসক্রিয় মূত্রাশয়ের ৪১ জন রোগী এবং তুলনার জন্য আরও ২৪ জনের মোট ৬৫টি প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করেন। উন্নত কালচার পদ্ধতিতে ৫২টি নমুনায় জীবিত ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়; এর মধ্যে ৪৮টিকে প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নেই বলে জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা না পড়া মানেই জীবাণু নেই—এমন সিদ্ধান্ত ভুল। মূত্রাশয়ে থাকা সব ব্যাকটেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে না; এই গবেষণা জীবিত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রস্রাব পান করার নিরাপত্তা বা উপকার প্রতিষ্ঠা করেনি। অজানা জীবাণু ও অজানা উপাদানের একটি তরলকে পরীক্ষার বদলে ব্যক্তির মহিমা দিয়ে নিরাপদ ঘোষণা করা তাই সম্পূর্ণ প্রমাণহীন। প্রস্রাবের নিরাপত্তা নির্ভর করে তার প্রকৃত গঠনের ওপর, যার শরীর থেকে বেরিয়েছে তাঁর ধর্মীয় খ্যাতির ওপর নয়। [18]
Our current study demonstrates that urine contains communities of living bacteria that comprise a resident female urine microbiota.
বাংলা অনুবাদ: আমাদের বর্তমান গবেষণা দেখায় যে প্রস্রাবে জীবিত ব্যাকটেরিয়ার গোষ্ঠী রয়েছে, যা নারীর মূত্রে বসবাসকারী জীবাণুসমষ্টি গঠন করে।
রক্ত: মুখের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে সংক্রমণের ঝুঁকি
অন্য মানুষের কাঁচা রক্ত মুখে নেওয়ার বড় বিপদ হলো সংক্রমিত রক্তের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ। রক্ত গিলে পাকস্থলীতে পৌঁছানোর আগেই মুখের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে লাগে; মুখে ঘা বা মাড়িতে ক্ষত থাকলে সেই সংস্পর্শ আরও উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের চিকিৎসা নির্দেশিকায় হেপাটাইটিস বি ভাইরাসযুক্ত রক্ত বা দেহরসের সঙ্গে শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির সংস্পর্শকে সংক্রমণের স্বীকৃত পথ বলা হয়েছে। একই নির্দেশিকায় রক্তে এই ভাইরাসের সর্বোচ্চ ঘনত্ব থাকার কথা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ থেকে যকৃতের সিরোসিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখ আছে। ফলে সংক্রমণ পরীক্ষা ছাড়া কারও রক্ত পান করাকে রোগমুক্তির উপায় ঘোষণা করা স্বাস্থ্যঝুঁকিকে উপকার বলে বিক্রি করা। আলেমের অনুমতি রক্ত পরীক্ষা করে না, ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করে না এবং মুখের ক্ষত বন্ধ করে না। ধর্মীয়ভাবে “পবিত্র” বলার সঙ্গে জীবাণুবিজ্ঞানের নিরাপত্তার কোনো সমার্থক সম্পর্ক নেই। [19]
HBV is efficiently transmitted by percutaneous or mucous membrane exposure to HBV-infected blood or body fluids that contain HBV.
বাংলা অনুবাদ: হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত রক্ত বা ওই ভাইরাসযুক্ত দেহরস ত্বক ভেদ করে কিংবা শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির সংস্পর্শে এসে সহজে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
এইচআইভির ক্ষেত্রেও সংক্রমিত রক্ত মুখের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি বা ক্ষতস্থানে লাগা ঝুঁকির বিষয়। মেরি আর. ট্যানার ও তাঁর সহলেখকদের ২০২৫ সালের চিকিৎসা নির্দেশিকায় সংক্রমিত দেহরস ছিটকে ত্বক ও শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির সংস্পর্শের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের বিরল ঘটনা উল্লেখ আছে। রক্তের উৎসের ভাইরাসের অবস্থা, ভাইরাসের পরিমাণ এবং সংস্পর্শের ধরন অনুযায়ী ঝুঁকি নির্ধারিত হয়। তাই অন্যের রক্ত মুখে নেওয়া সংক্রমিত রক্তের সঙ্গে অনাবশ্যক সংস্পর্শ তৈরি করে; পানকারীর ভক্তি তার কোনো প্রতিরোধক নয়। “রক্ত দিয়ে চিকিৎসা করা বৈধ”—বুহুতির এই অনুমতি এমন ঝুঁকির পরীক্ষা বা রোগ সারানোর প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। একটি কাহিনিতে কারও রক্ত পান করার পর আপত্তি না তোলা থেকে চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নামে ধর্মীয় কর্তৃত্ব চাপানো। সম্ভাব্য সংক্রমণের পথ খোলা রেখে রোগনিরাময়ের দাবি করা অনুসারীর স্বাস্থ্যকে প্রমাণহীন বিশ্বাসের হাতে সঁপে দেয়। [20]
Rare cases of HIV acquisition from mucocutaneous exposure to splashed infectious body fluids have been described
বাংলা অনুবাদ: সংক্রমিত দেহরস ছিটকে ত্বক ও শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের বিরল ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
পুঁজ: সংক্রমণ ও ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর উপাদান
পুঁজ তৈরি হয় সংক্রমণ বা প্রদাহের জায়গায় জমা শ্বেতরক্তকণিকা, ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু ও অন্যান্য উপাদান থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় চিকিৎসা গ্রন্থাগারের মেডলাইনপ্লাসে সংক্রমণজনিত ফোঁড়ার পুঁজকে জীবিত ও মৃত শ্বেতরক্তকণিকা, জীবাণু এবং মৃত টিস্যুর মিশ্রণ বলা হয়েছে। শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে এমন পুঁজ তৈরি করে; পুঁজ পান করলে সেই প্রতিরোধক্ষমতা পানকারীর শরীরে স্থানান্তরিত হয় না। সংক্রমিত ক্ষতের উপাদান মুখে নেওয়ার অর্থ জীবাণুসহ সেই উপাদানের সংস্পর্শ তৈরি করা। চিকিৎসায় ফোঁড়ার পুঁজ বের করে দেওয়া ও প্রয়োজনমতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কথা রয়েছে, পুঁজকে রোগ সারানোর পানীয় করার কথা নেই। কারও ক্ষত থেকে বের হয়েছে বলে এই সংক্রমিত উপাদান উপকারী হয়ে যায় না; সেই দাবি শরীরের সংক্রমণকে ভক্তির উপকরণে বদলে দেয়। পুঁজের উৎস হিসেবে কোনো ব্যক্তির পবিত্র পরিচয় দেখানো তার জীবাণু বা মৃত টিস্যুর উপস্থিতি দূর করার পদ্ধতি নয়। [21]
Pus is a mixture of living and dead white blood cells, germs, and dead tissue.
বাংলা অনুবাদ: পুঁজ হলো জীবিত ও মৃত শ্বেতরক্তকণিকা, জীবাণু এবং মৃত টিস্যুর মিশ্রণ।
পুঁজযুক্ত ত্বকের সংক্রমণে স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াসের মতো জীবাণু থাকতে পারে; এর কিছু ধরন একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধী। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী এমন সংক্রমিত ক্ষত ও জীবাণুযুক্ত উপকরণের সংস্পর্শে এমআরএসএ ছড়াতে পারে। একই জীবাণু-প্রজাতির টক্সিন উৎপাদনকারী ধরন দূষিত খাবারে বংশবৃদ্ধি করে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করলে তা খাওয়ার পর বমিভাব, বমি, পেটে মোচড় ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে; রান্নায় ব্যাকটেরিয়া মারা গেলেও খাবারে তৈরি সেই বিষাক্ত পদার্থ নষ্ট না-ও হতে পারে। খাদ্যে বিষক্রিয়ার এই প্রক্রিয়া দেখায়, ঝুঁকি শুধু জীবিত জীবাণুর উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের তৈরি বিষাক্ত পদার্থও গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমিত পুঁজ মুখে নেওয়া জীবাণুর সংস্পর্শ তৈরি করে; আর জীবাণু বা তার বিষাক্ত পদার্থ গ্রহণকে রোগমুক্তির পথ বানানো বিপজ্জনক। চিকিৎসার দাবিতে জীবাণুর ধরন, পরিমাণ ও বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি যাচাইয়ের প্রয়োজনকে “পবিত্র” শব্দ দিয়ে বাতিল করা যায় না। [22] [23]
MRSA spreads in the community through contact with infected people, wounds, or things that have touched infected skin and are carrying the bacteria.
বাংলা অনুবাদ: সমাজে এমআরএসএ ছড়ায় সংক্রমিত ব্যক্তি, ক্ষত অথবা সংক্রমিত ত্বকের সংস্পর্শে এসে ব্যাকটেরিয়া বহন করছে এমন জিনিসের সংস্পর্শের মাধ্যমে।
Staph food poisoning is a gastrointestinal illness. It is caused by toxins made by Staphylococcus aureus (Staph) bacteria.
বাংলা অনুবাদ: স্ট্যাফিলোকক্কাসজনিত খাদ্যে বিষক্রিয়া পরিপাকতন্ত্রের একটি অসুখ। স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস ব্যাকটেরিয়ার তৈরি বিষাক্ত পদার্থ এটি ঘটায়।
প্রস্রাব, রক্ত ও পুঁজের স্বাস্থ্যঝুঁকি এক নয়: প্রস্রাবে বিপাকীয় বর্জ্য ও জীবাণু থাকতে পারে, সংক্রমিত রক্ত মুখের ঝিল্লি ও ক্ষতের মাধ্যমে ভাইরাসের সংস্পর্শ ঘটাতে পারে, আর সংক্রমিত পুঁজে জীবাণু ও ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু থাকে। অসুখ না হওয়াকে রোগ সারানোর প্রমাণ বানানো যুক্তির সরাসরি অপব্যবহার; ঝুঁকিপূর্ণ কিছু খাওয়ার পর তাৎক্ষণিক অসুস্থ না হওয়া তার চিকিৎসাগত উপকারের সাক্ষ্য নয়। নিরাপত্তা, চিকিৎসাগত উপকার এবং আজীবন রোগমুক্তি তিনটি পৃথক দাবি; প্রথমটির জন্য উপাদান ও সংক্রমণের পরীক্ষা, দ্বিতীয়টির জন্য কার্যকারিতার প্রমাণ, আর তৃতীয়টির জন্য তার মাত্রার উপযুক্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রমাণ প্রয়োজন। কাজী আয়াজের পবিত্রতার যুক্তি ও বুহুতির চিকিৎসার অনুমতি এসব প্রমাণ হাজির করে না। মানুষের শরীরের পরিচয়ের জায়গায় নবী পরিচয় বসিয়ে রোগমুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া তাই প্রমাণহীন এবং স্বাস্থ্যগতভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন। “মোবারক” শব্দ দিয়ে বর্জ্যের প্রকৃতি বদলানো যায় না, আর আলেমের অনুমতি দিয়ে সংক্রমণের পথ বন্ধ করা যায় না।
উপসংহার
প্রস্রাব পান করার কাহিনির প্রতিটি স্তরে ব্যক্তির মর্যাদা বর্জ্যের ওপর আরোপিত হয়েছে: নারী পান করেন, তাঁর জন্য উপকারের ঘোষণা আসে, আলেম সেই বিবরণকে পবিত্রতার পক্ষে ব্যবহার করেন, আর ফিকহের গ্রন্থ চিকিৎসার অনুমতি দেয়। এই ধারাবাহিকতায় সাধারণ মানুষের শরীরের বর্জ্য সম্পর্কে যে নাপাকির ধারণা, বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা উল্টে যায়। তার জন্য কোনো পদার্থগত পরীক্ষা হাজির করা হয় না; নবী পরিচয় এবং সেই পরিচয় ঘিরে সংরক্ষিত অলৌকিক বর্ণনাই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়ে ওঠে। রোগমুক্তির আশ্বাস রোগমুক্তির প্রমাণ নয়, আগুন থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি পরকালীন মুক্তির পরীক্ষিত তথ্য নয়, আর ধর্মীয়ভাবে পবিত্র ঘোষণা চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করে না। নেতার মর্যাদা দিয়ে এসব ব্যবধান পূরণ করার চেষ্টা প্রমাণের বদলে ভক্তিকে গ্রহণ করা।
এই ব্যক্তিপূজার ভয়াবহতা অনুসারীর বিচারবোধকে যে অবস্থায় নিয়ে যায়, সেখানেই। নিজের শরীরের বর্জ্য থেকে বাঁচতে তাকে কঠোর বিধান মানতে হয়, অথচ নেতার বর্জ্যকে শ্রদ্ধা ও উপকারের উৎস বলে গ্রহণ করার ধর্মীয় যুক্তি তৈরি করা হয়। আরও এক ধাপ এগিয়ে সেই দাবির বিরোধিতাকে বিদআত বা খারাপ পরিণতির সঙ্গে জুড়ে দিলে প্রশ্ন তোলার অধিকারও আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়। একজন মানুষকে ভালোবাসা তাঁর প্রস্রাবকে পবিত্র করার প্রমাণ নয়, এবং কোনো মানুষের বিশেষ মর্যাদা অন্য মানুষের স্বাধীন বিচারবোধ ত্যাগ করার কারণ হতে পারে না। প্রস্রাবের সঙ্গে “মোবারক” শব্দ বসিয়ে তার প্রকৃতি বদলানো যায় না; ধর্মীয় মহিমা দিয়ে তার অলৌকিক উপকারও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। উম্মে আইমান ও বারাকার কাহিনি ঘিরে গড়ে ওঠা এই বিশ্বাস ব্যক্তিকে এত উঁচুতে তোলে যে মানুষের বর্জ্যের সামনে মানুষের যুক্তিবোধকেই নিচু হতে হয়।
তথ্যসূত্রঃ
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৪ ↩︎
- সুনান নাসাঈ, হাদিস ৩২ ↩︎
- আল-মুস্তাদরাক, “উম্মে আইমানের নবীর প্রস্রাব পান ও তার প্রভাব”; অনলাইন ক্রম ৬৯৯৬ ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, “ইমাউহু” অধ্যায়, আবু ইয়ালার সূত্রে উম্মে আইমানের বিবরণ ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনুল আসিরের সূত্রে বারাকার প্রস্রাব পান করার বিবরণ ↩︎
- আশ-শিফা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫; শামেলা ↩︎
- পূর্ববর্তী পৃষ্ঠা ৬৪: দেহজাত বর্জ্যের পবিত্রতার মত ↩︎
- কাশশাফ আল-কিনা, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১; শামেলা ↩︎
- একই গ্রন্থের পাঠ; Islamweb ↩︎
- ফতোয়া কেন্দ্রের আলেমদের উত্তর, ৭০০১১: প্রস্রাব থেকে পবিত্রতা ও কবরের শাস্তি; ইসলামওয়েব ↩︎
- আজিমাবাদি, আওনুল মাবুদ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭–৩৯ ↩︎
- ফতোয়া কেন্দ্রের আলেমদের উত্তর, ১১৩৮২৮: পবিত্রতা অস্বীকারকারীকে বিদআতি বলার প্রতিবাদ; ইসলামওয়েব ↩︎
- নববী, আল-মাজমু, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৮–২৮৯: নবীর রক্ত ও বর্জ্য নিয়ে মতভেদ ↩︎
- আল-মুনাজ্জিদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত ফতোয়া ১৮১৭৭৬: ইবন হাজর, দারাকুতনি ও যাহাবির মূল্যায়ন; ইসলাম প্রশ্নোত্তর ↩︎
- ফতোয়ার তত্ত্বাবধায়ক মুহাম্মদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদের পরিচয় ↩︎
- জাতীয় ডায়াবেটিস, পরিপাক ও কিডনি রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান: কিডনি কীভাবে কাজ করে ↩︎
- ওয়েন্ডি ক্লাইন-শোয়ার্টজ, ন্যাশনাল ক্যাপিটাল পয়জন সেন্টার: প্রস্রাব পান করা কি নিরাপদ? ↩︎
- হিল্ট ও সহকর্মীরা, ২০১৪: প্রস্রাব জীবাণুমুক্ত নয়; জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি, ৫২(৩): ৮৭১–৮৭৬ ↩︎
- রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র: হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ ও শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির মাধ্যমে সংক্রমণ ↩︎
- ট্যানার ও সহলেখকদের নির্দেশিকা, ২০২৫, পরিশিষ্ট ক: সংক্রমিত রক্ত ও শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির সংস্পর্শ ↩︎
- জাতীয় চিকিৎসা গ্রন্থাগার, মেডলাইনপ্লাস: ফোঁড়া ও পুঁজের গঠন ↩︎
- রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র: এমআরএসএ, পুঁজযুক্ত সংক্রমণ ও সংস্পর্শে সংক্রমণ ↩︎
- রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র: স্ট্যাফিলোকক্কাসের বিষাক্ত পদার্থ থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়া ↩︎

