জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

মুহাম্মদের সমসাময়িক অন্যান্য নবীগণ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর 18, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন10 মিনিট পড়া

ভূমিকা

মুহাম্মদের জীবনের শেষ পর্যায় এবং তাঁর মৃত্যুর পরপরই আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ব্যক্তি নবুয়তের দাবি নিয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে মুসাইলিমা বিন হাবিব, তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ এবং সাজাহ বিনতে আল-হারিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরা নিছক বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি ছিলেন না; প্রত্যেকের পেছনে কোনো না কোনো গোত্র, অনুসারী বা সামরিক শক্তি ছিল। মুসাইলিমা ও তুলায়হার নবুয়তের দাবি মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই শুরু হয়েছিল; সাজাহর উত্থান ঘটে মুহাম্মদের মৃত্যুর পর রিদ্দার সংঘাতের সময়। পরবর্তী ইসলামী ঐতিহ্য বিজয়ী পক্ষের ভাষায় তাদের “কাজ্জাব”, “মুরতাদ” ও “ভণ্ড নবী” হিসেবে চিহ্নিত করেছে; কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তাদের অস্তিত্ব, অনুসারী এবং সামরিক প্রতিরোধ দেখায় যে নবুয়তের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রাথমিক আরবে প্রতিযোগিতা বাস্তব রাজনৈতিক ও সামরিক রূপ নিয়েছিল।

মুসাইলিমার ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই সরাসরি মুখোমুখি অবস্থায় পৌঁছায়। মুসাইলিমা নিজের চিঠিতে নিজেকে “আল্লাহর রাসুল” বলে পরিচয় দিয়ে মুহাম্মদকে জানায় যে সে নবুয়তের “কাজে” তাঁর অংশীদার এবং পৃথিবীর অর্ধেক তাদের, অর্ধেক কুরাইশের হওয়া উচিত। মুহাম্মদ তার দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন, তাকে “মুসাইলিমা আল-কাজ্জাব” বলে সম্বোধন করেন এবং তার দুই দূতও একই দাবি সমর্থন করলে বলেন—দূত হত্যা করার নিয়ম না থাকলে তিনি তাদের গর্দান কাটতেন। [1]

মূল আরবি:
أَمَا وَاللَّهِ لَوْلَا أَنَّ الرُّسُلَ لَا تُقْتَلُ لَضَرَبْتُ أَعْنَاقَكُمَا … مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ، إِلَى مُسَيْلِمَةَ الْكَذَّابِ
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহর শপথ, দূতদের হত্যা করা না হলে আমি তোমাদের দুজনের গর্দান কেটে দিতাম।” … “মুহাম্মদ, আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে মুসাইলিমা আল-কাজ্জাবের প্রতি।”

এই ইতিহাসকে ইসলামের সত্যতার প্রমাণ বানাতে গেলে একটি সরাসরি যৌক্তিক সমস্যা তৈরি হয়। মুসাইলিমা বা অন্য দাবিদার মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়েছেন—এ থেকে তাদের নবুয়তের দাবি মিথ্যা অনুসরণ করে না, যতক্ষণ না আগে স্বাধীনভাবে প্রমাণ করা যায় যে সত্য নবী কখনো সামরিকভাবে পরাজিত বা নিহত হতে পারেন না। ইসলামী ধর্মতত্ত্ব নিজেই সেই নিয়ম মানে না। ইসলামকিউএর বিশ্লেষণেও কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে যে নবী ও রাসুল নিহত হওয়ার সম্ভাবনাকে ইসলামী উৎস নিষিদ্ধ করে না এবং বাস্তবে নবীদের হত্যার কথাও কোরআনে এসেছে। অতএব “প্রতিদ্বন্দ্বী নিহত হয়েছে, তাই তার নবুয়ত মিথ্যা”—কিন্তু “আমাদের নবী নিহত হলেও নবুয়ত মিথ্যা নয়”—এই দুই মানদণ্ড একসঙ্গে ব্যবহার করা দ্বৈত মানদণ্ড। সামরিক বিজয় ক্ষমতার ফলাফল দেখায়; নবুয়তের সত্যতা নয়। [2]

মূল আরবি—IslamQA:
ليس في نصوص الشرع، ولا أصوله ما يمنع قتل الأنبياء، وقد وقع ذلك … ولا فرق في ذلك بين الأنبياء والرسل.
বাংলা অনুবাদ:
শরিয়তের কোনো পাঠ বা মূলনীতিতে নবীদের নিহত হওয়া অসম্ভব বলে কিছু নেই; বরং এমন ঘটনা ঘটেছে … এ ক্ষেত্রে নবী ও রাসুলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

ইসলামী ইতিহাসগ্রন্থে সংরক্ষিত বিবরণ থেকে এই দাবিদারদের বক্তব্য, অনুসারী, সামরিক শক্তি, মুহাম্মদ ও পরবর্তী মুসলিম নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া এবং শেষ পরিণতি সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।


মুসাইলিমা বিন হাবিব

মুসাইলিমা বিন হাবিব আল-হানাফি ছিলেন ইয়ামামার বনু হানিফার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং মুহাম্মদের জীবদ্দশায় নবুয়তের দাবিদারদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। ইবন ইসহাকের বর্ণনা ইবন হিশামের সীরাতে সংরক্ষিত হয়েছে যে নবম হিজরিতে বনু হানিফার প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে এবং মুসাইলিমাও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। একই ঘটনার দুটি ভিন্ন রূপও ইবন ইসহাক সংরক্ষণ করেছেন—এক বর্ণনায় মুসাইলিমা মুহাম্মদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন, অন্য বর্ণনায় তিনি প্রতিনিধিদলের মালপত্র পাহারা দিতে পেছনে ছিলেন। ফলে মদিনায় তাঁর অবস্থানের খুঁটিনাটি নিয়ে উৎসেই ভিন্নতা আছে; কিন্তু ইয়ামামায় ফিরে তাঁর নবুয়তের দাবি এবং পরবর্তী বিরোধ নিয়ে ইসলামী ঐতিহ্য একমত। [3]

মূল আরবি—ইবন হিশাম:
فَلَمَّا انْتَهَوْا إلَى الْيَمَامَةِ … تَنَبَّأَ … وَقَالَ: إنِّي قَدْ أُشْرِكْتُ فِي الْأَمْرِ مَعَهُ.
বাংলা অনুবাদ:
তারা ইয়ামামায় পৌঁছানোর পর … সে নবুয়তের দাবি করল … এবং বলল: “আমাকে এই কর্তৃত্বে তার সঙ্গে অংশীদার করা হয়েছে।”

নবুয়তের এই দাবি কেবল মৌখিক আত্মপরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। দশম হিজরির শেষদিকে মুসাইলিমা মুহাম্মদকে চিঠি পাঠিয়ে নিজেকে “মুসাইলিমা, আল্লাহর রাসুল” বলে পরিচয় দেয় এবং দাবি করে, নবুয়তের কর্তৃত্বে তাকে মুহাম্মদের অংশীদার করা হয়েছে; ভূমির অর্ধেক তার অনুসারীদের এবং অর্ধেক কুরাইশের হওয়া উচিত। মুহাম্মদ পাল্টা চিঠিতে তাকে “মুসাইলিমা আল-কাজ্জাব” বলে সম্বোধন করেন। মুসাইলিমার দুই দূত তার দাবিকে সমর্থন করলে মুহাম্মদ বলেন, দূত হত্যা করা বৈধ হলে তিনি তাদের গর্দান কাটতেন। এটি দেখায় যে নবুয়তের প্রতিযোগিতা মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই সরাসরি রাজনৈতিক বৈরিতায় পরিণত হয়েছিল। [4]

মূল আরবি:
لَوْلَا أَنَّ الرُّسُلَ لَا تُقْتَلُ لَضَرَبْتُ أَعْنَاقَكُمَا … إِلَى مُسَيْلِمَةَ الْكَذَّابِ
বাংলা অনুবাদ:
“দূতদের হত্যা করা না হলে আমি তোমাদের দুজনের গর্দান কেটে দিতাম।” … “মুসাইলিমা আল-কাজ্জাবের প্রতি।”

মুসাইলিমার নিজস্ব ধর্মীয় বক্তব্য সম্পর্কে সংরক্ষিত তথ্যের বড় অংশ তার প্রতিপক্ষ মুসলিম ঐতিহাসিক ধারার মাধ্যমে এসেছে; তাই সেগুলোকে মুসাইলিমার নিজের সংরক্ষিত ধর্মগ্রন্থ হিসেবে নয়, মুসলিম উৎসে সংরক্ষিত তার মতবাদের বিবরণ হিসেবে পড়তে হয়। ইবন ইসহাকের বর্ণনায় মুসাইলিমার নামে কোরআনিক ছন্দের অনুকরণে কয়েকটি বাক্য দেওয়া হয়েছে। এর একটি “গর্ভবতী নারী” সম্পর্কিত বক্তব্য। একই বর্ণনায় আরও দাবি করা হয়েছে যে তিনি অনুসারীদের জন্য নামাজের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছিলেন এবং মদ ও ব্যভিচার অনুমোদন করেছিলেন। [5]

মূল আরবি—ইবন ইসহাকের বর্ণনা:
لَقَدْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَى الْحُبْلَى، أَخْرَجَ مِنْهَا نَسَمَةً تَسْعَى، مِنْ بَيْنِ صِفَاقٍ وَحَشَى.
বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহ গর্ভবতী নারীর প্রতি অনুগ্রহ করেছেন; তিনি তার ভেতর থেকে চলমান একটি প্রাণ বের করেছেন, আবরণ ও অন্ত্রের মধ্য থেকে।”

দাবেস্তান-এ-মাজাহেব সপ্তদশ শতাব্দীর একটি বহু পরের গ্রন্থ; মুহাম্মদ ও মুসাইলিমার যুগ থেকে প্রায় এক হাজার বছর পরের। ফলে সেখানে মুসাইলিমার নামে আরোপিত তিনবার উপাসনা, খাতনা বা খাদ্যবিধির মতো তথ্যকে প্রাথমিক ইতিহাসের সমপর্যায়ের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ, সেই পরবর্তী বর্ণনার কিছু বিষয় ইবন ইসহাকের সংরক্ষিত অনেক পুরোনো বিবরণের সঙ্গেও মেলে না। মুসাইলিমার ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাসগ্রন্থের সাক্ষ্য তাই দাবেস্তান-এর তুলনায় অধিক প্রমাণমূল্য বহন করে।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর মুসাইলিমার শক্তি সামরিক সংঘাতে পরিণত হয়। আবু বকর প্রথমে ইকরিমা ও শুরাহবিলের বাহিনী পাঠান এবং পরে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে বড় বাহিনী ইয়ামামার দিকে পাঠানো হয়। ইবন আল-আসিরের আল-কামিল-এ বনু হানিফার বিপুল সামরিক সমাবেশ এবং মুসলিম বাহিনীর ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষিত আছে। শেষ পর্যন্ত ইয়ামামার যুদ্ধে মুসাইলিমা নিহত হন এবং তার সংগঠিত রাজনৈতিক-সামরিক শক্তি ভেঙে পড়ে। [6]

মূল আরবি—ইবন আল-আসির:
وَوَجَّهَهُ إِلَى مُسَيْلِمَةَ … فَلَمَّا وَصَلُوا إِلَيْهِ سَارَ إِلَى الْيَمَامَةِ.
বাংলা অনুবাদ:
আবু বকর তাকে মুসাইলিমার বিরুদ্ধে পাঠালেন … বাহিনী এসে পৌঁছালে তিনি ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হলেন।

মুসাইলিমার পরাজয় একটি ঐতিহাসিক সামরিক ফলাফল। সেটি থেকে তার নবুয়তের দাবি সত্য বা মিথ্যা হওয়ার সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। তার দাবির সত্যতা নির্ধারণের জন্য তার দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন; ঠিক যেমন মুহাম্মদের সামরিক বিজয়কেও নবুয়তের স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে গণ্য করতে হলে “সামরিক বিজয় = ঐশী সত্যতা” এই অতিরিক্ত পূর্বধারণাটি আগে প্রমাণ করতে হবে।


সাজাহ বিনতে আল-হারিস

সাজাহ বিনতে আল-হারিসের নবুয়তের দাবি মুহাম্মদের মৃত্যুর পর রিদ্দার সংঘাতের সময় প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামরিক রূপ নেয়। তাঁর গোত্রীয় পরিচয় নিয়ে পরবর্তী উৎসের ভাষায় কিছু পার্থক্য আছে। ইবন কাসির তাঁকে জাজিরা থেকে আগত “তাগলিবিয়া” এবং আরব খ্রিস্টানদের একজন বলেছেন; ইবন আল-আসির তাঁকে “তামিমিয়া” বলে পরিচয় দিয়ে তাঁর মাতৃসম্পর্ক তাগলিবের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু উভয় বর্ণনার মূল তথ্য একই: সাজাহ নিজেকে নবী ঘোষণা করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে সশস্ত্র অনুসারী ও গোত্রীয় বাহিনী ছিল। ইবন কাসিরের বর্ণনায় তাঁর বাহিনীর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল আবু বকরের বিরুদ্ধে অভিযান। [7]

মূল আরবি—ইবন কাসির:
وَهِيَ مِنْ نَصَارَى الْعَرَبِ، وَقَدِ ادَّعَتِ النُّبُوَّةَ، وَمَعَهَا جُنُودٌ مِنْ قَوْمِهَا وَمَنِ الْتَفَّ بِهِمْ.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি আরব খ্রিস্টানদের একজন ছিলেন; তিনি নবুয়তের দাবি করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে নিজ গোত্র ও তাদের সঙ্গে যুক্ত লোকদের সেনাবাহিনী ছিল।

ইবন আল-আসিরের আল-কামিল-এ ঘটনাটি আরও রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট। সেখানে বলা হয়েছে, সাজাহ প্রথমে আবু বকরের বিরুদ্ধে অভিযানের ইচ্ছা করেছিলেন। বিভিন্ন তামিমি গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট ও সংঘর্ষের পর তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হন। মুসাইলিমা খবর পেয়ে তাকে নিজের ভূখণ্ডের জন্য হুমকি মনে করেন; কারণ একই সময়ে তিনি মুসলিম বাহিনী ও স্থানীয় প্রতিপক্ষের চাপেও ছিলেন। ফলে সাজাহকে নিছক মুসাইলিমার অনুসারী হিসেবে দেখানো ভুল—ইবন আল-আসিরের বর্ণনায় তিনি প্রথমে নিজের স্বাধীন নবুয়তের দাবি ও সামরিক বাহিনী নিয়ে মুসাইলিমার ভূখণ্ডের দিকেই অগ্রসর হচ্ছিলেন। [8]

মূল আরবি—ইবন আল-আসির:
وَكَانَتْ سَجَاحُ تُرِيدُ غَزْوَ أَبِي بَكْرٍ … ثُمَّ خَرَجَتْ سَجَاحُ فِي الْجُنُودِ وَقَصَدَتِ الْيَمَامَةَ.
বাংলা অনুবাদ:
সাজাহ আবু বকরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন … এরপর সাজাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে বের হয়ে ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হন।

পরবর্তী মুসলিম ইতিহাসগ্রন্থে সাজাহ ও মুসাইলিমার মধ্যে সমঝোতা এবং বিবাহের কাহিনিও সংরক্ষিত হয়েছে। তবে ইবন কাসির এই কাহিনির সংশ্লিষ্ট অংশ শুরু করেছেন “ويقال”—“বলা হয়”—ভাষায়। ফলে সাজাহর নবুয়তের দাবি, বাহিনী এবং ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হওয়ার বর্ণনার তুলনায় বিবাহকাহিনির প্রমাণমূল্য দুর্বল। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নবুয়ত-দাবিদারের মধ্যে সামরিক চাপের প্রেক্ষাপটে সমঝোতার তথ্য তুলনামূলকভাবে শক্তভাবে সংরক্ষিত; বিবাহের বিস্তারিত পরবর্তী বর্ণনার অংশ। [9]

মূল আরবি—ইবন কাসির:
وَيُقَالُ: إِنَّهُ لَمَّا خَلَا بِسَجَاحَ …
বাংলা অনুবাদ:
“আর বলা হয়, যখন সে সাজাহর সঙ্গে একান্তে মিলিত হলো …”

মুসাইলিমার পতনের পর সাজাহর স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তিও টেকেনি। পরবর্তী মুসলিম ঐতিহ্যে তাঁর তওবা ও ইসলাম গ্রহণের কথা সংরক্ষিত হয়েছে। ইসলামকিউএ ইবন হাজারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মুসাইলিমা, তুলায়হা ও সাজাহর পরিণতি আলোচনা করতে গিয়ে সাজাহরও তওবা করার সংবাদ উল্লেখ করেছে। সাজাহর তওবা ও ইসলাম গ্রহণের তথ্যটি পরবর্তী ইসলামী উৎসে সংরক্ষিত বিবরণ। [10]

মূল আরবি—ইবন হাজারের বক্তব্য, IslamQA-তে উদ্ধৃত:
وَنُقِلَ أَنَّ سَجَاحَ أَيْضًا تَابَتْ.
বাংলা অনুবাদ:
“এমন বর্ণনাও রয়েছে যে সাজাহও তওবা করেছিলেন।”


তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ

তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ আল-আসাদি ছিলেন বনু আসাদের একজন নেতা এবং তাঁর নবুয়তের দাবি মুহাম্মদের মৃত্যুর পরে হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। ইবন আল-আসিরের আল-কামিল-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তুলায়হা মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই নবুয়তের দাবি করেছিলেন। মুহাম্মদ তাঁর বিরুদ্ধে দিরার ইবন আল-আজওয়ারকে বনু আসাদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠান এবং যারা ধর্মত্যাগ করেছে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তুলায়হার শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়; তিনি দাবি করতেন জিবরাইল তাঁর কাছে আসে এবং তাঁর নামে নিজস্ব ধর্মীয় নির্দেশও প্রচারিত হয়। [11]

মূল আরবি—ইবন আল-আসির:
قَدْ تَنَبَّأَ فِي حَيَاةِ رَسُولِ اللَّهِ … وَتَبِعَهُ كَثِيرٌ مِنَ الْعَرَبِ عَصَبِيَّةً.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি আল্লাহর রাসুলের জীবদ্দশাতেই নবুয়তের দাবি করেছিলেন … এবং বহু আরব গোত্রীয় পক্ষপাত ও সংহতির কারণে তাঁকে অনুসরণ করেছিল।

উৎসে তুলায়হার অনুসারীরা তাকে নবী হিসেবে “পূজা করত”—এমন কোনো বক্তব্য নেই। বরং ইবন আল-আসির স্পষ্টভাবে বলেছেন, বহু আরব ‘আসাবিয়্যাহ’ বা গোত্রীয় সংহতির কারণে তাঁর অনুসারী হয়েছিল; তাঁর প্রধান সমর্থন এসেছিল আসাদ, গাতাফান ও তাই গোত্র থেকে। অর্থাৎ তুলায়হার আন্দোলনের বিস্তারে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি গোত্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক আনুগত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। [12]

মূল আরবি—ইবন আল-আসির:
وَتَبِعَهُ كَثِيرٌ مِنَ الْعَرَبِ عَصَبِيَّةً … مِنْ أَسَدٍ وَغَطَفَانَ وَطَيِّئٍ.
বাংলা অনুবাদ:
বহু আরব গোত্রীয় পক্ষপাতের কারণে তাঁকে অনুসরণ করেছিল … বিশেষত আসাদ, গাতাফান ও তাই গোত্র থেকে।

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর আবু বকরের শাসনামলে তুলায়হার শক্তির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়। বুজাখার যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদের বাহিনীর কাছে তাঁর জোট পরাজিত হলে তুলায়হা সিরিয়ার দিকে পালিয়ে যান। পরবর্তী ইসলামী উৎস অনুযায়ী তিনি পরে আবার ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম বাহিনীর পক্ষ হয়ে পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নেন। যাহাবির সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা-তেও তাঁর পরাজয়, সিরিয়ায় চলে যাওয়া এবং পরে ইসলাম গ্রহণের বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। [13]

মূল আরবি—আল-যাহাবি:
ثُمَّ انْهَزَمَ وَخُذِلَ، وَلَحِقَ … بِالشَّامِ، ثُمَّ ارْعَوَى وَأَسْلَمَ.
বাংলা অনুবাদ:
এরপর তিনি পরাজিত হলেন ও তাঁর শক্তি ভেঙে পড়ল; তিনি সিরিয়ায় চলে গেলেন; পরে ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করলেন।


উপসংহার

প্রাথমিক ইসলামী ইতিহাসে নবুয়তের দাবি মুহাম্মদের একক দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। মুসাইলিমা ও তুলায়হা মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই নবুয়তের দাবি করেছিলেন; সাজাহ তাঁর মৃত্যুর পর নবুয়তের দাবি নিয়ে সশস্ত্র অনুসারীসহ আবির্ভূত হন। তাদের প্রত্যেকের পেছনে এমন অনুসারী, গোত্রীয় জোট বা সামরিক শক্তি ছিল যা নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য বাস্তব রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী যুদ্ধে মুসাইলিমা নিহত হন, তুলায়হা পরাজিত হয়ে পালিয়ে পরে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সাজাহর স্বাধীন আন্দোলনও বিলুপ্ত হয়। বিজয়ী ইসলামী ঐতিহ্যে তাদের দাবিগুলো তাই পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী নবুয়ত হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে।

কিন্তু ইতিহাসের এই সামরিক ফলাফল থেকে ধর্মতাত্ত্বিক সত্যতা বের করা যুক্তিগতভাবে বৈধ নয়। কোনো দাবিদার যুদ্ধে মারা গেছেন বা তাঁর অনুসারীরা পরাজিত হয়েছেন—এ তথ্য তাঁর নবুয়তের দাবির স্বাধীন খণ্ডন নয়। একই ইসলামী ধর্মতত্ত্বেই নবী ও রাসুল নিহত হতে পারেন বলে স্বীকার করা হয়। ইসলামকিউএর আলোচনাতেও কোরআন ২:৮৭, ৩:১৪৪ ও ৩:১৮৩-এর ভিত্তিতে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে যে নবী বা রাসুল নিহত হওয়া ইসলামী ধর্মতত্ত্বে অসম্ভব নয়। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী নবী নিহত হলে সেটিকে তার মিথ্যাচারের প্রমাণ, কিন্তু স্বীকৃত নবী নিহত হলে সেটিকে নবুয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা একই ঘটনার জন্য দুই ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ। [14]

মূল আরবি—IslamQA:
لَيْسَ هُنَاكَ دَلِيلٌ صَرِيحٌ عَلَى عَدَمِ قَتْلِ الرُّسُلِ؛ بَلْ ظَاهِرُ النُّصُوصِ يَدُلُّ عَلَى حُصُولِ قَتْلِ الرُّسُلِ، وَإِمْكَانِيَّتِهِ.
বাংলা অনুবাদ:
রাসুলদের হত্যা করা অসম্ভব—এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই; বরং পাঠগুলোর প্রকাশ্য অর্থ রাসুলদের নিহত হওয়ার ঘটনা এবং তার সম্ভাব্যতাই নির্দেশ করে।

অতএব ইয়ামামা বা বুজাখার যুদ্ধের ফলাফল ইসলামের সামরিক বিজয়ের ইতিহাস; নবুয়তের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের পরীক্ষা নয়। সত্য নবুয়তের মানদণ্ড যদি প্রমাণ, প্রত্যাদেশের স্বাধীন সত্যতা এবং দাবির যাচাইযোগ্য ভিত্তি হয়, তাহলে মুহাম্মদ, মুসাইলিমা, সাজাহ বা তুলায়হা—সবার দাবিকেই একই মানদণ্ডে পরীক্ষা করতে হবে। কে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ জিতেছে, সেই তথ্য নিজে কোনো মানুষকে আল্লাহর প্রেরিত ব্যক্তি প্রমাণ করে না।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ইসলামওয়েব—মুসাইলিমার চিঠি ও মুহাম্মদের জবাব ↩︎
  2. IslamQA—নবী ও রাসুল নিহত হওয়া কি সম্ভব? ↩︎
  3. ইসলামওয়েব—ইবন হিশাম, বনু হানিফার প্রতিনিধি ও মুসাইলিমা ↩︎
  4. ইসলামওয়েব—মুসাইলিমার চিঠি, দূত এবং মুহাম্মদের প্রতিক্রিয়া ↩︎
  5. ইবন হিশাম—মুসাইলিমার নামে সংরক্ষিত ছন্দ ও বিধান ↩︎
  6. শামেলা—ইবন আল-আসির, মুসাইলিমা ও ইয়ামামার যুদ্ধ ↩︎
  7. ইসলামওয়েব—ইবন কাসির, সাজাহর নবুয়তের দাবি ও বাহিনী ↩︎
  8. শামেলা—ইবন আল-আসির, সাজাহ ও বনু তামিম ↩︎
  9. ইসলামওয়েব—ইবন কাসির, সাজাহ ও মুসাইলিমার সমঝোতা ↩︎
  10. IslamQA—প্রাথমিক যুগের নবুয়ত-দাবিদারদের পরিণতি ↩︎
  11. শামেলা—ইবন আল-আসির, তুলায়হা আল-আসাদি ↩︎
  12. ইসলামওয়েব—ইবন আল-আসির, তুলায়হার অনুসারীদের গোত্রীয় ভিত্তি ↩︎
  13. ইসলামওয়েব—যাহাবি, তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদের জীবনী ↩︎
  14. IslamQA—নবী ও রাসুল নিহত হওয়ার সম্ভাবনা ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.