ভূমিকা
মানুষের মৃগীজনিত আক্রমণ, আকস্মিক চেতনাহানি, অস্বাভাবিক শব্দ শোনা, দৃশ্য দেখা কিংবা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিজ্ঞতাকে বিভিন্ন সমাজে দেবতার ভর, জিনের আছর বা অদৃশ্য শক্তির যোগাযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমাদের গ্রামাঞ্চলেও মানসিক বা স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে ‘জিনে ধরেছে’ অথবা ‘কালী ভর করেছে’ বলার প্রবণতা রয়েছে। এই পরিচয় কাউকে ভয় ও শ্রদ্ধার পাত্র করে, আবার কাউকে মারধর ও ঝাড়ফুঁকের শিকার করে। একই ধরনের অভিজ্ঞতা কোথাও ঐশী মর্যাদা, কোথাও অপমান ও নির্যাতনের কারণ হয়। ধর্মীয় নামকরণ মানুষের অভিজ্ঞতার সামাজিক পরিণতি বদলায়; তার শারীরিক বা মানসিক কারণ নির্ধারণ করে না।
মুহাম্মদের জীবনসংক্রান্ত ইসলামি বর্ণনায় তাঁর শরীর, চেতনা, স্মৃতি ও অনুভূতির পরিবর্তনের বহু তথ্য রয়েছে। প্রচণ্ড ঘাম, মুখের রঙ বদল, ঘড়ঘড় আওয়াজ, উরুর ওপর প্রচণ্ড ভার অনুভূত হওয়া এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ার পাশাপাশি পাওয়া যায় হৃদকম্পন, নিজের জন্য আশঙ্কা, বিপদের ভয়ে অস্থিরতা, তন্দ্রা, কণ্ঠস্বর শোনা এবং বিশেষ আকৃতি দেখার দাবি। নিজের সম্পাদিত কাজ সম্পর্কে ভুল ধারণা, নামাজের রাকাতে ভুল এবং অন্যের তিলাওয়াতে আয়াত মনে পড়ার ঘটনাও সংরক্ষিত। এসব বিবরণ তাঁর শারীরিক ও মানসিক অভিজ্ঞতার একটি ঘটনাভিত্তিক নথি তৈরির উপাদান।
বিবরণগুলোর মধ্যে কোথাও সাহাবিদের দেখা শরীর ও আচরণের পরিবর্তন রয়েছে, কোথাও মুহাম্মদের নিজের অনুভূতির কথা এসেছে, আবার কোথাও তাঁকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য অলৌকিক ঘটনার কাহিনি প্রচারিত হয়েছে। কারও ঘাম দেখা, তাঁর মুখে কোনো দৃশ্য দেখার কথা শোনা এবং কাঠের কান্নার মতো একটি কাহিনি বর্ণনা করা ভিন্ন ধরনের সাক্ষ্য। একই ঘটনার একাধিক পাঠে অতিরিক্ত তথ্য থাকতে পারে; আবার পৃথক ঘটনার পরিস্থিতি ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে তাঁর চেতনা, অনুভূতি, স্মৃতি ও আবেগের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার নির্দিষ্ট ভিত্তি রয়েছে।
মুহাম্মদের তন্দ্রা, স্পর্শের অনুভূতি ও বিশেষ জ্ঞানপ্রাপ্তির দাবি নিয়ে ‘নবীর বুকে আল্লাহর শীতল স্পর্শ’, নিজের কাজ সম্পর্কে বিভ্রান্তির বর্ণনা নিয়ে ‘কুন ফায়াকুন বনাম জাদুর গিঁট’ এবং একজন কিশোরকে দাজ্জাল সন্দেহ করে অনুসন্ধানের ঘটনা নিয়ে ‘ইবনে সাইয়াদ: যেই বালককে মুহাম্মদ ভয় পেতো’ প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
মুহাম্মদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ওহি, নবুয়ত ও অন্য মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক বিধানের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ কোনো অনুভূতি অত্যন্ত স্পষ্ট বা প্রবল হওয়া তার বিষয়বস্তুকে সত্য প্রমাণ করে না। শরীরের প্রতিক্রিয়া ও তাঁর নিজের নিশ্চয়তার বাইরে ঐশী উৎসের দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন। ধর্মের প্রবর্তক হওয়া তাঁর স্মৃতি, উপলব্ধি বা সিদ্ধান্তকে পরীক্ষার ঊর্ধ্বে রাখে না। পরিচিত স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে এসব বিবরণের সাদৃশ্য অনুসন্ধান এবং তাঁর দাবির নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের প্রশ্ন সরাসরি প্রযোজ্য।
এপিলেপ্সি কী এবং কেন হয়?
এপিলেপ্সি বা মৃগীরোগ মস্তিষ্কের একটি রোগ, যার সঙ্গে বারবার সিজার বা স্নায়বিক আক্রমণ হওয়ার স্থায়ী প্রবণতা যুক্ত। আক্রমণের সময় মস্তিষ্কের একদল স্নায়ুকোষে অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বা সমলয় বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ ঘটে। এর ফলে নড়াচড়া, সচেতনতা, অনুভূতি, আবেগ বা উপলব্ধিতে সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া ও ঝাঁকুনি তার পরিচিত প্রকাশ; কিছু আক্রমণ প্রধানত অনুভূতি বা সচেতনতার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মৃগীরোগের সংজ্ঞায় নির্দিষ্ট আক্রমণের সঙ্গে পুনরাবৃত্তির প্রবণতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ সংস্থার ব্যাখ্যায় একটি আক্রমণ একটি ঘটনা, আর মৃগীরোগ পুনরাবৃত্ত আক্রমণের প্রবণতাসংক্রান্ত রোগ। [1]
Seizures and epilepsy are not the same. An epileptic seizure is a transient occurrence of signs and/or symptoms due to abnormal excessive or synchronous neuronal activity in the brain. Epilepsy is a disease characterized by an enduring predisposition to generate epileptic seizures and by the neurobiological, cognitive, psychological, and social consequences of this condition. Translation: a seizure is an event and epilepsy is the disease involving recurrent unprovoked seizures.
বাংলা অনুবাদ: সিজার ও মৃগীরোগ এক বিষয় নয়। মৃগীজনিত সিজার হলো মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষের অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বা সমলয় কার্যকলাপের কারণে সাময়িকভাবে কোনো লক্ষণ বা উপসর্গের প্রকাশ। মৃগীরোগ এমন একটি রোগ, যার বৈশিষ্ট্য মৃগীজনিত সিজার সৃষ্টির স্থায়ী প্রবণতা এবং এই অবস্থার স্নায়ুজৈবিক, জ্ঞানগত, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিণতি। সহজ ভাষায়: সিজার একটি ঘটনা, আর মৃগীরোগ হলো পুনরাবৃত্ত, তাৎক্ষণিক প্ররোচনাহীন সিজারসংক্রান্ত রোগ।
মৃগীরোগের কারণের মধ্যে জন্মগত ও বংশগত সমস্যা, প্রসবকালীন অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি, মাথায় গুরুতর আঘাত, মস্তিষ্কের সংক্রমণ, স্ট্রোক ও টিউমার রয়েছে। বিপাকীয় ও রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাসংক্রান্ত কারণও থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, বিশ্বব্যাপী প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে রোগের কারণ অজানা থেকে যায়। কারণ অজানা থাকার অর্থ অনুসন্ধানের সীমা; সেটিকে জিন, দেবতা বা অদৃশ্য শক্তির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যুক্তিগত ভুল। কোনো ঘটনার প্রাকৃতিক কারণ শনাক্ত না হওয়া থেকে একটি নির্দিষ্ট অতিপ্রাকৃত কারণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। [2]
الصرع مرض مزمن غير سار يصيب الدماغ ويؤثر على الأشخاص من جميع الأعمار.
বাংলা অনুবাদ: মৃগীরোগ একটি দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক রোগ, যা মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে এবং সব বয়সের মানুষের হতে পারে।
রোগের অন্তর্নিহিত কারণ এবং কোনো আক্রমণ উসকে দেওয়ার পরিস্থিতিও পৃথক। মস্তিষ্কে আঘাত বা সংক্রমণ রোগের কারণ হতে পারে; ঘুমের ঘাটতি, ক্লান্তি বা মানসিক চাপ কারও আক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শিশুর জ্বরজনিত খিঁচুনিও স্বতন্ত্র ঘটনা। মূল রোগ, আক্রমণের সম্ভাব্য প্ররোচনা এবং আক্রমণের সময়কার প্রকাশ আলাদা করে চিহ্নিত করলে ঘটনাগুলোর প্রকৃতি স্পষ্ট হয়। আক্রমণের সময়ে ব্যক্তির সচেতনতা ও পরবর্তী স্মৃতিতেও ভিন্নতা থাকে। কেউ নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং পরে তা মনে করতে পারেন; কারও ক্ষেত্রে তা ঘটে না। [3]
You might be aware of having a seizure and remember it afterwards, or you might not.
বাংলা অনুবাদ: আক্রমণ হওয়ার বিষয়ে আপনি সচেতন থাকতে পারেন এবং পরে তা মনে করতে পারেন, আবার তা নাও হতে পারে।
কানের শব্দ, আকস্মিক ভয় ও পরিবর্তিত উপলব্ধি
মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোব থেকে শুরু হওয়া আক্রমণে আচরণ থেমে যাওয়া, সচেতনতা ব্যাহত হওয়া এবং মুখ বা হাতের স্বয়ংক্রিয় নড়াচড়া দেখা যেতে পারে। সচেতনতা ব্যাহত হওয়ার আগে শব্দ শোনা, ভয়, আগে দেখেছি বলে অনুভূতি, বুক ধড়ফড় বা মুখের রঙের পরিবর্তনও হতে পারে। আক্রমণের পরে বিভ্রান্তি দেখা দেওয়ার বিবরণ রয়েছে। টেম্পোরাল লোবের বাইরের অংশ থেকে শুরু হওয়া কিছু আক্রমণে প্রাথমিক শ্রবণগত অভিজ্ঞতা হিসেবে গুঞ্জন বা ঘণ্টাধ্বনিসদৃশ শব্দের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ কণ্ঠ বা শব্দ, আবেগ এবং শারীরিক পরিবর্তন মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রকাশ পেতে পারে। [4]
Temporal lobe seizures are characterized by behavioral arrest and impaired awareness. Automatisms are common during the seizure, and include oral and/or manual automatisms. There may sensory (auditory), emotional (fear), cognitive (deja vu) or autonomic features (epigastric sensation, tachycardia, colour change) prior to onset of impaired awareness. Postictal confusion typically occurs.
বাংলা অনুবাদ: টেম্পোরাল লোব সিজারের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আচরণ থেমে যাওয়া ও সচেতনতা ব্যাহত হওয়া রয়েছে। আক্রমণের সময় স্বয়ংক্রিয় নড়াচড়া সাধারণ; এর মধ্যে মুখ বা হাতের স্বয়ংক্রিয় নড়াচড়া অন্তর্ভুক্ত। সচেতনতা ব্যাহত হওয়ার আগে ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা—শ্রবণ; আবেগগত অভিজ্ঞতা—ভয়; জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা—আগে দেখেছি বলে অনুভূতি; অথবা স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রসংক্রান্ত লক্ষণ—পেটের ওপরের অংশে অনুভূতি, দ্রুত হৃদস্পন্দন ও রঙের পরিবর্তন—থাকতে পারে। আক্রমণের পরে সাধারণত বিভ্রান্তি ঘটে।
আবার কিছু আক্রমণে বাইরের সংশ্লিষ্ট উদ্দীপনা ছাড়াই দৃশ্য বা কণ্ঠের অভিজ্ঞতা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ সংস্থার শ্রেণিবিন্যাসে সচেতনতা বজায় থাকা অবস্থায় এ ধরনের জটিল ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতার কথাও রয়েছে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভয় বা অন্য কোনো ব্যাখ্যা যুক্ত হতে পারে। ফলে একজন ব্যক্তি কোনো কণ্ঠ শুনছেন বা দৃশ্য দেখছেন বলে নিশ্চিত হওয়া মাত্রই বাইরের জগতে সেই কণ্ঠের বক্তা বা দৃশ্যের সত্তাটির অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। মস্তিষ্কের সৃষ্ট অভিজ্ঞতাও ব্যক্তির কাছে প্রত্যক্ষ ও বাস্তব বলে প্রতিভাত হতে পারে। অভিজ্ঞতার এই বৈশিষ্ট্য অতিপ্রাকৃত দাবির স্বাধীন যাচাইকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। [5]
Focal cognitive seizure with hallucination – characterized by the creation of composite perceptions without the presence of external sensory stimuli, these may be visual (e.g. formed images), auditory (e.g. hearing voices) or involve other sensory modalities, without change in awareness. The sensory phenomena may be accompanied by associated emotion or interpretation e.g. a formed visual image may be accompanied by fear, or may be experienced as persecutory or with paranoia (i.e. with unjustified suspicion / mistrust).
বাংলা অনুবাদ: হ্যালুসিনেশনসহ ফোকাল জ্ঞানগত সিজার—এর বৈশিষ্ট্য হলো বাইরের ইন্দ্রিয়-উদ্দীপনার উপস্থিতি ছাড়াই জটিল উপলব্ধি সৃষ্টি হওয়া। সচেতনতার পরিবর্তন ছাড়াই এগুলো দৃশ্যগত হতে পারে—যেমন পূর্ণাঙ্গ ছবি দেখা; শ্রবণগত হতে পারে—যেমন কণ্ঠ শোনা; অথবা অন্য ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এই ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবেগ বা ব্যাখ্যা যুক্ত থাকতে পারে; যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যের সঙ্গে ভয় থাকতে পারে, অথবা সেটিকে নিপীড়নমূলক বলে অনুভব করা হতে পারে কিংবা তার সঙ্গে ভিত্তিহীন সন্দেহ বা অবিশ্বাস যুক্ত হতে পারে।
আধ্যাত্মিক নিশ্চয়তার অনুভূতির স্নায়বিক ভিত্তি
বিশেষ জ্ঞান অর্জন, গভীর প্রশান্তি বা সবকিছুর সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অনুভূতি নিয়েও প্রত্যক্ষ স্নায়ুবৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় অস্ত্রোপচারের পূর্ববর্তী পরীক্ষার সময় মৃগীরোগে আক্রান্ত এক ব্যক্তির মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র ইনসুলার নির্দিষ্ট অংশে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দেওয়া হয়। তাঁর আগে এ ধরনের উচ্ছ্বাসময় অভিজ্ঞতা হতো না। উদ্দীপনায় তিনি গভীর পূর্ণতা, মানসিক স্বচ্ছতা ও সংযুক্তির অনুভূতি জানান। নির্দিষ্ট স্থানে তিনবার উদ্দীপনা দিয়ে অনুরূপ অনুভূতি তৈরি করা হয়। অন্য পাঁচজন রোগীর অনুরূপ পরীক্ষায় একই ফল পাওয়া যায়নি। গবেষণাটি নির্দিষ্ট একজনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে হস্তক্ষেপ ও বিশেষ অভিজ্ঞতার সম্পর্কের প্রমাণ দেয়। [6]
“everything seems simplified”
বাংলা অনুবাদ: “সবকিছু সহজ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।”
এই গবেষণার তাৎপর্য বিশেষ অনুভূতির প্রাকৃতিক উৎপত্তি সম্পর্কে। মানসিক স্বচ্ছতা, নিশ্চিত উপলব্ধি কিংবা গভীর সংযুক্তির অনুভূতি মস্তিষ্কের কার্যকলাপের মাধ্যমে তৈরি হওয়ার প্রত্যক্ষ উদাহরণ রয়েছে। সুতরাং ‘আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুভব করেছি’ থেকে ‘আমি বাইরের জগতের চূড়ান্ত সত্য জেনেছি’ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অনুভূতির তীব্রতা একটি মানসিক ঘটনা; তার বিষয়বস্তুর সত্যতা আলাদা প্রমাণের বিষয়। ঐশী জ্ঞানপ্রাপ্তির দাবির ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য সরাসরি প্রযোজ্য।
চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবন
মৃগীরোগের চিকিৎসার প্রধান উপায় আক্রমণ প্রতিরোধক ওষুধ। কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার, ভেগাস স্নায়ুতে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা বা কিটোজেনিক খাদ্যব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। রোগের ধরন, আক্রমণের প্রকৃতি ও চিকিৎসার ফল অনুযায়ী মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হয়। অনেকের ক্ষেত্রে চিকিৎসায় দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাব কমে আসে, আবার কারও আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়। ওষুধ, প্রয়োজনমাফিক বিশেষ চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন জীবনে সহায়ক ব্যবস্থা এই রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবনযাত্রায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। রোগের প্রকাশ ও চিকিৎসায় তার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গে অভিজ্ঞতার সম্পর্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। [7]
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে যথাযথ ওষুধ ব্যবহারে মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খিঁচুনিমুক্ত থাকতে পারেন। চিকিৎসায় আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘ সময় খিঁচুনিমুক্ত থাকা এবং রোগ সম্পূর্ণ সেরে যাওয়ার ধারণা পৃথক। এই রোগের বাস্তবতা মস্তিষ্কের কার্যক্রম, আক্রমণের ধরন ও চিকিৎসার ফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। জিন, জাদু বা দেবতার নাম দিয়ে তার ব্যাখ্যা দিলে সেই দাবির পক্ষে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। ধর্মীয় পরিচয় রোগের কারণ সম্পর্কে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের বিকল্প হয় না। [8]
এপিলেপ্সি এবং টনিক-ক্লোনিক সিজার
টনিক-ক্লোনিক সিজারে শরীরের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ছন্দময় ঝাঁকুনি—এই দুই ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সাধারণীকৃত টনিক-ক্লোনিক আক্রমণে চেতনা হারানোর সঙ্গে শরীরের দুই পাশ আক্রান্ত হয়। প্রথমে পেশির টান বাড়ে, পরে ঝাঁকুনির পর্যায় আসে। আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ সংস্থার বর্ণনায় এই দুটি পর্যায়ের ক্রম ও তার কিছু ভিন্নতার উল্লেখ রয়েছে। জনস হপকিন্সের চিকিৎসাগত বিবরণে বলা হয়েছে, পেশির তীব্র সংকোচনে ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে চিৎকার বা গোঙানির মতো শব্দ হতে পারে। বুকের পেশি শক্ত হলে শ্বাসপ্রশ্বাসও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে আক্রমণের সঙ্গে গলার শব্দ, শ্বাসের পরিবর্তন এবং চেতনাহানি একই ঘটনায় উপস্থিত থাকতে পারে। [9] [10]
Tonic-clonic seizures involve both tonic (stiffening) and clonic (twitching or jerking) phases of muscle activity.
বাংলা অনুবাদ: টনিক-ক্লোনিক সিজারে পেশির কার্যকলাপের টনিক—শক্ত হয়ে যাওয়া—এবং ক্লোনিক—কেঁপে ওঠা বা ঝাঁকুনি—উভয় পর্যায় থাকে।
পেশি শক্ত হওয়া, ঝাঁকুনি ও চেতনা ফিরে পাওয়ার পর্যায়
টনিক পর্যায়ে মানুষটি পড়ে যেতে পারেন এবং পেশির প্রবল সংকোচনে শব্দ বের হতে পারে। ক্লোনিক পর্যায়ে মুখ, হাত ও পায়ে ঝাঁকুনি দেখা যায়। পরে ঝাঁকুনি ধীরে আসে ও শরীর শিথিল হয়। আক্রমণের পরে কিছু সময় অচেতন থাকা, ঘুমন্ত বা নাক ডাকার মতো অবস্থা এবং পরে বিভ্রান্তি, ক্লান্তি ও শরীরে ব্যথা হতে পারে। জিহ্বা বা গালের ভেতর কামড়ে যাওয়া এবং মূত্র বা মল নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাও আক্রমণের সঙ্গে ঘটতে পারে। এই লক্ষণগুলো সময়ের ক্রমে সাজালে শরীরের পরিবর্তন এবং পরবর্তী অবস্থার সম্পর্ক স্পষ্ট হয়। [11]
| পর্যায় | শরীরে ও সচেতনতায় পরিবর্তন | শব্দ ও অন্যান্য প্রকাশ |
|---|---|---|
| টনিক পর্যায় | পেশি শক্ত হয়; চেতনা হারিয়ে পড়ে যাওয়া ঘটতে পারে। বুকের পেশির শক্ত হয়ে যাওয়া শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা দিতে পারে। | ফুসফুসের বাতাস বেরিয়ে চিৎকার বা গোঙানির মতো শব্দ হতে পারে। মুখ থেকে লালা বা ফেনা আসতে পারে। |
| ক্লোনিক পর্যায় | মুখ, হাত ও পায়ে পুনরাবৃত্ত ছন্দময় ঝাঁকুনি হয়। পরে ঝাঁকুনি কমে এবং শরীর শিথিল হয়। | জিহ্বা বা গালে কামড় লাগতে পারে; মূত্র বা মল নিয়ন্ত্রণ হারানোও ঘটতে পারে। শিথিল হওয়ার পরে শ্বাসের স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে থাকে। |
| আক্রমণ-পরবর্তী পর্যায় | চেতনা ও সাড়া দেওয়ার স্বাভাবিকতা ফিরতে সময় লাগে। বিভ্রান্তি, ক্লান্তি, শরীরে ব্যথা ও ঘটনার স্মৃতির ঘাটতি থাকতে পারে। | ঘুমন্ত বা নাক ডাকার মতো অবস্থা দেখা যেতে পারে। পরে অবসাদ ও বিশ্রামের প্রয়োজন হতে পারে। |
শব্দের সঙ্গে পেশির সংকোচন, চেতনাহানি ও পরবর্তী অবস্থা যুক্ত হওয়ার একটি শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা এখানে রয়েছে। কারও কাছে সেই শব্দ গর্জন বা অন্য প্রাণীর আওয়াজের মতো শোনাতে পারে; সেটি শব্দের একটি তুলনামূলক বর্ণনা। চিকিৎসাগত পরিচয় নির্ধারণে শব্দের সঙ্গে কী ঘটছে এবং পরে মানুষটি কেমন অবস্থায় ফিরছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। পেশির সংকোচন ও শ্বাসের পরিবর্তন থেকেই জোরে শব্দ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা যায়।
সিনকোপ বা সাময়িক চেতনাহানি
সিনকোপে মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ হঠাৎ কমে সাময়িক চেতনাহানি ঘটে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, পানিশূন্যতা, ভঙ্গি পরিবর্তন এবং আবেগের অভিঘাত এর পরিচিত প্ররোচনা। আগে মাথা ঘোরা, দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া, কানে শব্দ, ঘাম বা বমিভাব থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক মৃগীরোগ সংস্থার বিবরণে পড়ে যাওয়ার সময় গোঙানি বা গর্জনসদৃশ শব্দ এবং সংক্ষিপ্তভাবে শরীর শক্ত হওয়া বা ঝাঁকুনির কথাও আছে। [12]
Syncope (fainting) describes the transient loss of consciousness, which occurs when there is an abrupt reduction in blood flow and oxygen supply to the brain. An anoxic seizure is the collapse, stiffening with or without tonic-clonic movements that occurs as a result of the lack of cortical control of the brainstem. The movements are not due to epileptic discharges.
বাংলা অনুবাদ: সিনকোপ বা মূর্ছা বলতে সাময়িক চেতনাহানি বোঝায়, যা মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেন সরবরাহ হঠাৎ কমে গেলে ঘটে। মস্তিষ্কের কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণ ব্রেনস্টেমের ওপর কার্যকর না থাকার ফলে পড়ে যাওয়া ও শরীর শক্ত হওয়ার ঘটনাকে অ্যানক্সিক সিজার বলা হয়; এর সঙ্গে টনিক-ক্লোনিক ধরনের নড়াচড়া থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে। এই নড়াচড়া মৃগীজনিত বৈদ্যুতিক বিস্ফুরণের কারণে ঘটে না।
সিনকোপের ঝাঁকুনি সাধারণত সংক্ষিপ্ত এবং ছন্দহীন; পরে বিভ্রান্তিও সাধারণত অল্প সময় থাকে। জিহ্বায় কামড়, আঘাত বা মূত্র নিয়ন্ত্রণ হারানো সিনকোপেও হতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের কারণেও সিনকোপ ঘটে। ফলে চেতনাহানি, শব্দ, শরীর শক্ত হওয়া ও ঝাঁকুনির বিবরণ একাধিক প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এগুলো মানুষের মস্তিষ্ক, রক্তসঞ্চালন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যক্রম সম্পর্কে অনুসন্ধানের বিষয়।
স্লিপ অ্যাপনিয়া: ঘুমের সময়ে শ্বাসের বাধা ও শব্দ
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের সময়ে শ্বাসপথ সরু হয়ে বা বন্ধ হয়ে শ্বাসে বিরতি ঘটে। এর সঙ্গে জোরে নাক ডাকা, হাঁসফাঁস, নাক দিয়ে জোরে শব্দ বা দম আটকে আসার শব্দ হতে পারে। বারবার ঘুম ভাঙা এবং দিনের বেলায় ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যাও দেখা যায়। অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা কমানো কিছু মানুষের উপকারে আসে। চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিপ্যাপ যন্ত্র শ্বাসপথ অতিরিক্ত সরু হওয়া ঠেকাতে বাতাস সরবরাহ করে। এই অবস্থায় শব্দ, ঘুমের ব্যাঘাত ও পরবর্তী ক্লান্তির মধ্যে একটি শারীরিক সম্পর্ক রয়েছে। [13]
Symptoms of sleep apnoea mainly happen while you sleep.
বাংলা অনুবাদ: স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ প্রধানত ঘুমের সময়ে ঘটে।
ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কটি এখানে নির্দিষ্ট। ঘুমের সময়ে বারবার শ্বাস থামা ও শুরু হওয়া, শব্দ, জেগে ওঠা এবং দিনের ক্লান্তি মিলিয়ে অবস্থাটির পরিচয় গড়ে ওঠে। ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বাসের বাধার শব্দ এবং জাগ্রত অবস্থায় একটি ঘটনার সময় বের হওয়া শব্দের বিবরণ তাই আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়। ঘুমের সময়ে শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণের পরীক্ষায় এই বিরতিগুলোর উপস্থিতি ও মাত্রা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
চেতনাহানি, শব্দ ও পরবর্তী অবস্থার তুলনা
| ঘটনা | শব্দ ও শরীরের প্রকাশ | সময় ও পরবর্তী অবস্থার বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| টনিক-ক্লোনিক সিজার | পেশি শক্ত হওয়া, ছন্দময় ঝাঁকুনি, চেতনাহানি এবং চিৎকার বা গোঙানির মতো শব্দ হতে পারে। | আক্রমণের পরে চেতনা ফিরতে সময়, বিভ্রান্তি, ঘুম ও ক্লান্তি থাকতে পারে। |
| সিনকোপ | রক্তপ্রবাহ কমে চেতনাহানি; গোঙানি, সংক্ষিপ্ত ঝাঁকুনি ও শরীর শক্ত হওয়া ঘটতে পারে। | প্ররোচনা, সংক্ষিপ্ত সময় এবং তুলনামূলক দ্রুত চেতনা ফিরে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। |
| অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া | ঘুমের মধ্যে শ্বাসে বিরতি, নাক ডাকা, হাঁসফাঁস বা দম আটকে আসার শব্দ হয়। | ঘুমে বারবার ব্যাঘাত এবং দিনের ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। |
বর্ণিত শারীরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে এসব পরিচিত অবস্থার সাদৃশ্য অনুসন্ধান যৌক্তিক। একটি শব্দের উপস্থিতি, তার সঙ্গে চেতনাহানি বা নড়াচড়ার সম্পর্ক এবং পরে অবস্থার পরিবর্তন—প্রতিটি তথ্যের নিজস্ব গুরুত্ব আছে। অলৌকিক ব্যাখ্যা ঘটনাটির ওপর অতিরিক্ত একটি দাবি যোগ করে। সেই দাবির পক্ষে ঘাম, শব্দ বা কষ্টের উপস্থিতির বাইরে প্রমাণ প্রয়োজন। শারীরিক পরিবর্তনের বাস্তবতা এবং তার ধর্মীয় পরিচয়ের সত্যতা পৃথক প্রশ্ন।
এপিলেপ্সির কয়েকটি উদাহরণ
আসুন এপিলেপ্সির কিছু উদাহরণ দেখে নিই। একইসঙ্গে এ ধরনের আক্রমণের সময়ে মানুষকে কীভাবে সাহায্য করতে হয়, সে সম্পর্কেও জেনে নেওয়া যাক।
খিঁচুনির সময়ে প্রধান কাজ মানুষটিকে আঘাত থেকে রক্ষা করা। মাথার নিচে নরম কিছু দেওয়া, আশপাশের বিপজ্জনক বস্তু সরানো, আক্রমণের সময় মাপা এবং সুস্থ হওয়া পর্যন্ত পাশে থাকা সহায়ক। শরীর জোর করে চেপে ধরা বা মুখে কিছু ঢোকানো ক্ষতির কারণ হতে পারে। ঝাঁকুনি থামার পরে পাশ ফিরিয়ে রাখা হয়। সম্পূর্ণ সাড়া ও স্বাভাবিকতা ফিরে আসার আগে খাবার বা পানীয় দেওয়া হয় না। [14]
Do not put anything in their mouth, including your fingers. They should not have any food or drink until they have fully recovered.
বাংলা অনুবাদ: নিজের আঙুলসহ কোনো কিছুই তাঁদের মুখে ঢোকাবেন না। সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসার আগে তাঁদের কোনো খাবার বা পানীয় দেওয়া উচিত নয়।
| পরিস্থিতি | সহায়তার পদ্ধতি |
|---|---|
| পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি | মাথার নিচে নরম কিছু দিন এবং আশপাশের আঘাত করতে পারে এমন বস্তু সরান। |
| শরীরে ঝাঁকুনি চলছে | জোর করে শরীর চেপে ধরবেন না; মুখে আঙুল, চামচ বা অন্য কিছু ঢোকাবেন না। |
| ঝাঁকুনি থেমেছে | পাশ ফিরিয়ে রাখুন এবং চেতনা ও স্বাভাবিক সাড়া ফিরে আসা পর্যন্ত পাশে থাকুন। |
| সময় ও অবস্থার বিবরণ | কখন শুরু ও শেষ হলো, শ্বাসে কী পরিবর্তন হলো এবং পরে কেমন অবস্থায় ফিরলেন, তা লক্ষ্য করুন। |
| জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন | প্রথম আক্রমণ, স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ আক্রমণ, সাধারণ সময় জানা না থাকলে পাঁচ মিনিটের বেশি স্থায়িত্ব, চেতনা না ফিরেই পুনরায় আক্রমণ, গুরুতর আঘাত বা পরে শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি সহায়তা নিন। |
অস্বাভাবিক নড়াচড়া, শব্দ ও চেতনাহানির সময়ে সহায়তার ভিত্তি শারীরিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসা। মানুষটিকে ভয় দেখানো, মারধর করা বা তাঁর অভিজ্ঞতার ওপর অদৃশ্য শক্তির পরিচয় চাপিয়ে দিলে প্রয়োজনীয় পরিচর্যার বদলে নির্যাতন ঘটতে পারে। আক্রমণের সময় কী ঘটছে, তার বাস্তব বিবরণ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা পাওয়াই সহায়তার কার্যকর পথ।
ওহি নাজিলের সময়কার লক্ষণসমূহ
মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত ওহির বর্ণনায় শ্রবণগত অভিজ্ঞতা, শরীরের পরিবর্তন এবং আবেগের তীব্র প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে পাওয়া যায়। তাঁর নিজের বক্তব্যে বিশেষ শব্দ ও আগন্তুকের উপস্থিতি এসেছে; অন্যদের বর্ণনায় এসেছে ঘাম, মুখমণ্ডলের পরিবর্তন এবং কষ্টের প্রকাশ। এই অভিজ্ঞতাগুলোর সঙ্গে পরিচিত স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার তুলনার নির্দিষ্ট উপাদান রয়েছে।
ওহি নাজিলের সময় প্রচণ্ড ঘাম ঝরা
হাদিস থেকে জানা যায়, ওহি নাজিলের সময়ে মুহাম্মদ প্রচণ্ড ঘেমে যেতেন। এমনকি তীব্র শীতের মধ্যেও তাঁর কপাল থেকে ঘাম ঝরে পড়ত। আয়িশার বর্ণনায় ওহির অভিজ্ঞতা শেষ হওয়ার সময়ে এই ঘামের উল্লেখ রয়েছে। হারিস ইবন হিশাম ওহি আসার ধরন জানতে চাইলে মুহাম্মদ কখনো ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ এবং কখনো মানুষের আকৃতিতে ফেরেশতার সঙ্গে কথোপকথনের কথা বলেন। সেই ব্যক্তিগত বিবরণের সঙ্গে আয়িশা নিজের দেখা ঘামের ঘটনাটি যুক্ত করেছেন। [15] [16]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
১/ ওয়াহ্য়ীর সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১/২. পরিচ্ছেদ নাই।
২. উম্মুল মু’মিনীন ’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করলেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট ওয়াহী কিরূপে আসে?’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ [কোন কোন সময় তা ঘণ্টা বাজার মত আমার নিকট আসে। আর এটি-ই আমার উপর সবচেয়ে বেদনাদায়ক হয় এবং তা শেষ হতেই মালাক (ফেরেশতা) যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নেই, আবার কখনো মালাক মানুষের রূপ ধারণ করে আমার সাথে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নেই।] ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি তীব্র শীতের সময় ওয়াহী নাযিলরত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি। ওয়াহী শেষ হলেই তাঁর ললাট হতে ঘাম ঝরে পড়ত। (৩২১৫; মুসলিম ৪৩/২৩, হাঃ ২৩৩৩, আহমাদ ২৫৩০৭, ২৬২৫৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
এই বর্ণনায় অভিজ্ঞতার দুটি স্তর স্পষ্ট। ঘণ্টাধ্বনি শোনা ও ফেরেশতার কথা উপলব্ধির বিবরণ মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য। তীব্র শীতে তাঁর কপাল দিয়ে ঘাম ঝরার বিবরণ আয়িশার পর্যবেক্ষণ হিসেবে এসেছে। শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার উপস্থিতি তাঁর অভিজ্ঞতা যে কষ্টকর ছিল, সেই বিবরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই কষ্টকে জিবরাইলের উপস্থিতির প্রমাণে পরিণত করতে হলে বাড়তি একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়: ঘামের কারণ হিসেবে আগেই ফেরেশতার যোগাযোগকে গ্রহণ করতে হয়। শরীরে কী ঘটেছে এবং তার কারণ কে বা কী—এই দুটি প্রশ্নের প্রমাণ এক নয়।
ইফকের দীর্ঘ বর্ণনাতেও শীতের দিনে প্রবল কষ্ট ও ঘামের একটি পূর্ণ ঘটনাংশ রয়েছে। আয়িশা নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করার পরে মুহাম্মদের ওপর সেই অবস্থা আসে। ঘামের ফোঁটাকে মুক্তার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অবস্থা কেটে গেলে তিনি হাসতে হাসতে আয়িশার নির্দোষতার ঘোষণা দেন। এতে শারীরিক প্রতিক্রিয়া, তার অবসান এবং পরবর্তী বক্তব্যের ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। [17]
قَالَتْ فَوَاللَّهِ مَا رَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَلاَ خَرَجَ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْبَيْتِ حَتَّى أُنْزِلَ عَلَيْهِ، فَأَخَذَهُ مَا كَانَ يَأْخُذُهُ مِنَ الْبُرَحَاءِ حَتَّى إِنَّهُ لَيَتَحَدَّرُ مِنْهُ مِثْلُ الْجُمَانِ مِنَ الْعَرَقِ، وَهْوَ فِي يَوْمٍ شَاتٍ مِنْ ثِقَلِ الْقَوْلِ الَّذِي يُنْزَلُ عَلَيْهِ، قَالَتْ فَلَمَّا سُرِّيَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سُرِّيَ عَنْهُ وَهْوَ يَضْحَكُ، فَكَانَتْ أَوَّلُ كَلِمَةٍ تَكَلَّمَ بِهَا ” يَا عَائِشَةُ، أَمَّا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فَقَدْ بَرَّأَكِ ”. فَقَالَتْ أُمِّي قُومِي إِلَيْهِ. قَالَتْ فَقُلْتُ وَاللَّهِ، لاَ أَقُومُ إِلَيْهِ، وَلاَ أَحْمَدُ إِلاَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ.
বাংলা অনুবাদ: আয়িশা বলেন, “আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসুল স্থান ত্যাগ করেননি এবং ঘরের লোকদের কেউ বেরও হননি, এর মধ্যেই তাঁর ওপর ওহি নাজিল হলো। তখন তাঁকে সেই তীব্র কষ্ট পেয়ে বসল, যা তাঁকে পেয়ে বসত। তাঁর ওপর অবতীর্ণ কথার ভারে শীতের দিনেও তাঁর শরীর থেকে মুক্তার মতো ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল। অবস্থা কেটে গেলে তিনি হাসছিলেন। প্রথম যে কথা তিনি বললেন তা হলো, ‘হে আয়িশা, আল্লাহ তোমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন।’ আমার মা বললেন, ‘তাঁর কাছে উঠে যাও।’ আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম, আমি তাঁর কাছে উঠব না এবং আল্লাহ ছাড়া কারও প্রশংসা করব না।’”
শীতের মধ্যে ঘাম হওয়া থেকে শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটার কথা বোঝা যায়। ঘাম নিঃসরণ স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন; স্নায়বিক আক্রমণের সঙ্গেও ঘামের সম্পর্ক নথিবদ্ধ হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি মূল চিকিৎসা-গবেষণায় ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ফোকাল সিজারের সময় মুখের বাম পাশে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রচুর ঘাম জমার বিবরণ রয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রে ভিডিও-ইইজি পর্যবেক্ষণে মস্তিষ্কের বাম টেম্পোরো-প্যারাইটাল অঞ্চলের আক্রমণগত কার্যকলাপ পাওয়া যায়। গবেষকেরা শয্যার পাশে উপস্থিত থেকে ঘাম লক্ষ্য করেন। এখানে স্নায়বিক আক্রমণের সঙ্গে মুখে দৃশ্যমান ঘাম তৈরি হওয়ার প্রত্যক্ষ চিকিৎসাগত উদাহরণ রয়েছে। [18]
In conclusion, ictal unilateral sweating may occur in focal epilepsy and in our patient was ipsilateral to the epileptogenic zone.
বাংলা অনুবাদ: উপসংহারে বলা যায়, ফোকাল মৃগীরোগে আক্রমণের সময়ে শরীরের এক পাশে ঘাম হতে পারে এবং আমাদের রোগীর ক্ষেত্রে সেটি মৃগীজনিত কার্যকলাপের উৎপত্তিস্থলের একই পাশে হয়েছিল।
এই চিকিৎসাগত তথ্য ঘামের সঙ্গে স্নায়বিক ঘটনার তুলনাকে বাস্তব ভিত্তি দেয়। বাইরে ঠান্ডা থাকলেও শরীরের ভেতরের প্রতিক্রিয়ার অনুসন্ধান প্রয়োজন হয়। মুহাম্মদের বর্ণিত ঘামের ক্ষেত্রে ফেরেশতা বা ওহিকে একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে ঘোষণা করলে পরিচিত শারীরিক সম্ভাবনাগুলো বাদ পড়ে যায়। ঘাম ঝরা একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য ঘটনা; ‘আল্লাহর বার্তার ভারে ঘাম’ সেই ঘটনার ধর্মীয় ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যাটিকে সত্য ধরে নিয়ে আবার ঘামকেই তার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করলে একই বিশ্বাস নিজের সমর্থনে ফিরে আসে।
ইফকের ঘটনায় মুহাম্মদের ঘাম ও শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি আয়িশা এবং তাঁর মা-বাবার প্রতিক্রিয়ার বিবরণও রয়েছে। ‘নসরুল বারি’র নিচের ব্যাখ্যায় প্রথমে আয়িশার নিজের উদ্বেগে ইয়াকুবের নাম মনে না-পড়ার কথা এসেছে; এরপর মুহাম্মদের ঘাম, তাঁর মাথার নিচে বালিশ দেওয়া এবং আয়িশার মা-বাবার আশঙ্কার উল্লেখ আছে। [19]
হযরত আয়েশা রা. বলেন, ভীষণ চিন্তা-পেরেশানী এবং অস্থিরতার কারণে তখন বহু চেষ্টা সত্ত্বেও হযরত ইয়াকুব আ. এর নাম স্মরণে আসছিল না। সেহেতু ‘ইউসুফ আ. এর পিতা’ বললাম। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন, একথা বলে আমি বালিশের উপর ঝুঁকে পড়লাম। তিনি বলেন, এ সব কথার পরে পরিবারের কেউ এখনও বাইরে বের হননি। এমতাস্থায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ওহী অবতীর্ণ হওয়ার নিদর্শনাদি শুরু হয়ে যায়। গণ্ড মুবারক থেকে মোতির ন্যায় ঘাম বের হতে শুরু হয়। এ দেখে আমি খুবই প্রশান্ত হয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম এবার আল্লাহ তা’আলা সত্য প্রকাশ করবেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথার নিচে বালিশ রেখে দিলাম। কিন্তু আমার মাতা-পিতার অবস্থা ছিল যেন, তাদের প্রাণ বের হবার উপক্রম। তাদের ধারণা ছিল, আল্লাহ্ জানেন, সত্য কি প্রকাশিত হয়?

প্রথম ওহির সময় চাপের অভিজ্ঞতা, হৃদকম্পন ও নিজের জন্য আশঙ্কা
প্রথম ওহির বর্ণনায় স্বপ্নের অভিজ্ঞতা, নির্জনতা পছন্দ হওয়া, গুহায় কয়েক রাত অবস্থান, বারবার চেপে ধরার অনুভূতি এবং পরে প্রবল ভয় পাওয়ার ধারাবাহিকতা রয়েছে। মুহাম্মদ ফিরে এসে নিজেকে চাদরে ঢেকে দিতে বলেন। ভয় কমার পরে খাদিজাকে নিজের জন্য আশঙ্কার কথা জানান। খাদিজা তাঁর নৈতিক গুণগুলোর কথা বলে আশ্বাস দেন এবং ওয়ারাকার কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা তাঁর বিবরণ শুনে আগন্তুককে মুসার কাছে আসা দূতের পরিচয় দেন। [20]
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১/ ওহীর সূচনা
পরিচ্ছেদঃ ১/ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি কিভাবে ওহী শুরু হয়েছিল
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৩, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৩ – ৪
৩। ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র (রহঃ) আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সর্বপ্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে ভোরের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তারপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়ে এবং তিনি হেরা’র গুহায় নির্জনে থাকতেন। আপন পরিবারের কাছে ফিরে আসা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এইভাবে সেখানে তিনি একাধারে বেশ কয়েক রাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন।
তারপর খাদীজা (রাঃ)-এর কাছে ফিরে এসে আবার অনুরূপ সময়ের জন্য কিছু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতেন। এমনিভাবে হেরা’ গুহায় অবস্থানকালে একদিন তাঁর কাছে ওহী এলো। তাঁর কাছে ফিরিশতা এসে বললেন, পড়ুন’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “আমি বললাম, আমি পড়িনা’। তিনি বলেনঃ তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন’। আমি বললামঃ আমি তো পড়ি না। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ পড়ুন’। আমি জবাব দিলাম, আমিতো পড়িনা’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারপর তৃতীয়বার তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়ুন আর আপনার রব্ মহামহিমান্বিত।” (৯৬: ১-৩)
তারপর এ আয়াত নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন। তাঁর অন্তর তখন কাঁপছিল। তিনি খাদীজা বিন্ত খুওয়ালিদের কাছে এসে বললেন, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও। ’ তাঁরা তাঁকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে তাঁর ভয় দূর হল। তখন তিনি খাদীজা (রাঃ) এর কাছে সকল ঘটনা জানিয়ে তাঁকে বললেন, আমি নিজের উপর আশংকা বোধ করছি। খাদীজা (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম, কক্ষনো না। আল্লাহ্ আপনাকে কক্ষনো অপমানিত করবেন না। আপনিতো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।
এরপর তাঁকে নিয়ে খাদীজা (রাঃ) তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নাওফিল ইবনু আবদুল আসা’দ ইবনু আবদুল উযযার কাছে গেলেন, যিনি জাহিলী যুগে ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইবরানী ভাষা লিখতে জানতেন এবং আল্লাহ্র তওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইনজীল থেকে অনুবাদ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা! তুমি কী দেখ?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দেখেছিলেন, সবই খুলে বললেন।
তখন ওয়ারাকা তাঁকে বললেন, ইনি সে দূত যাঁকে আল্লাহ্ মূসা আলাইহিস সালাম এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কাওম তোমাকে বের করে দেবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাঁরা কি আমাকে বের করে দিবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অতীতে যিনই তোমার মত কিছু নিয়ে এসেছেন তাঁর সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে প্রবলভাবে সাহায্য করব। এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। আর ওহী স্থগিত থাকে।
ইবনু শিহাব (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ) ওহী স্থগিত হওয়া প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ একদা আমি হেঁটে চলেছি, হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম, সেই ফিরিশতা, যিনি হেরায় আমার কাছে এসেছিলেন, আসমান ও যমিনের মাঝখানে একটি কুরসীতে বসে আছেন। এতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তৎক্ষণাৎ আমি ফিরে এসে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারপর আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন, হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠুন, সতর্কবানী প্রচার করুন এবং আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন। অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন (৭৪: ১-৪)। এরপর ব্যাপকভাবে পর পর ওহী নাযিল হতে লাগল।
আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) ও আবূ সালেহ (রহঃ) অনুরুপ বর্ণনা করেছেন। হেলাল ইবনু রাদদাদ (রহঃ) যুহরী (রহঃ) থেকেও অনুরুপ বর্ণনা করেছেন। ইউনুস ও মা’মার فؤاده এর স্থলে بَوَادِرُهُ শব্দ উল্লেখ করেছেন।
তাখরীজ: ( বুখারীঃ তা.পা ৩, ৩৩৯২, ৪৯৫৩, ৪৯৫৫, ৪৯৫৬, ৪৯৫৭, ৬৯৮২; মুসলিম ১/৭৩ হাঃ ১৬০, আহমদ ২৬০১৮ ( আ.প্রঃ ৩, ইঃফাঃ ৩)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

মুহাম্মদের নামে বর্ণিত প্রথম অভিজ্ঞতায় শারীরিক কষ্টের ভাষা স্পষ্ট: আগন্তুকের চাপে তাঁর অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল। ফিরে আসার সময়ে হৃদয় কাঁপছিল এবং বাড়িতে পৌঁছেই শরীর ঢাকার অনুরোধ করেছেন। ভয় কমলে নিজের জন্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ঘুমের স্বপ্ন থেকে শুরু করে জাগ্রত অবস্থার চাপের অনুভূতি, তারপর হৃদকম্পন ও আশ্রয় চাওয়া—ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া এই বর্ণনায় পরপর এসেছে।
খাদিজার আশ্বাসের বিষয়বস্তু ছিল তাঁর আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার, দুর্বলদের দায়িত্ব নেওয়া, অতিথিসেবা ও বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করা। এই সামাজিক ও নৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তিনি মুহাম্মদকে আশ্বস্ত করেন। ওয়ারাকা তাঁর বক্তব্যকে পূর্ববর্তী নবীর কাছে আসা দূতের কাহিনির সঙ্গে মিলিয়ে ধর্মীয় পরিচয় দেন। ফলে মুহাম্মদের ভয় ও আত্মসংশয়ের পরে পরিবার থেকে সান্ত্বনা এবং একজন ধর্মপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে তাঁর অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা এসেছে। নিজের আশঙ্কা জানানো, অন্যের আশ্বাস গ্রহণ এবং অভিজ্ঞতার পরিচয় নির্ধারণে অন্যের ব্যাখ্যা পাওয়া—এই তিনটি দিক তাঁর নবুয়তের সূচনার বর্ণনায় সংরক্ষিত।
ওহি নাজিলের সময় কষ্ট, ক্লান্তির বিবরণ ও পরবর্তী অবস্থা
সহিহ মুসলিমের হাদিস একাডেমি সংস্করণের ৪৩০৮ নম্বর বর্ণনায় ওহির সময় মুহাম্মদকে ক্লান্ত মনে হওয়া এবং মুখমণ্ডলে ক্লান্তির চিহ্ন ফুটে ওঠার অনুবাদ রয়েছে। এরপর তাঁর অবস্থা বদলানোর এবং শাস্তির বিধান ঘোষণার কথা এসেছে। অর্থাৎ কষ্টকর অবস্থার সূত্রপাত, তার অবসান এবং পরবর্তী বক্তব্য—এই ধারাবাহিকতা বর্ণনায় স্পষ্ট। [21]
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩০। অপরাধের (নির্ধারিত) শাস্তি
পরিচ্ছেদঃ ৩. ব্যভিচারের শাস্তি
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৩০৮, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৬৯০
৪৩০৮-(১৩/…) মুহাম্মাদ ইবনু মুসান্না, ইবনু বাশশার ও মুসান্না (রহঃ) ….. উবাদাহ্ ইবনু সামিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর যখন ওয়াহী অবতীর্ণ হতো, তখন তাকে ক্লান্ত মনে হতো এবং তার মুখমণ্ডলে ক্লান্তির চিহ্ন ফুটে উঠত। বর্ণনাকারী বলেন, একদা যখন তার ওপর ওয়াহী অবতীর্ণ হলো তখন তার অবস্থা ঐরূপ হল। এরপর যখন অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল, তখন তিনি বললেনঃ তোমরা আমার কাছ হতে শিক্ষা গ্রহণ কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা মহিলাদের জন্য একটি পন্থা বের করে দিয়েছেন। যদি কোন বিবাহিত পুরুষ কোন বিবাহিতা মহিলার সাথে এবং কোন অবিবাহিত পুরুষ কুমারী মেয়ের সাথে ব্যভিচার করে, তবে বিবাহিত ব্যক্তিকে একশ’ বেত্ৰাঘাত করবে, এরপর পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করবে। আর অবিবাহিত পুরুষ বা মহিলাকে একশ’ বেত্ৰাঘাত করবে, এরপর তাদেরকে এক বছরের জন্য নির্বাসন দেবে (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২৬৯, ইসলামিক সেন্টার ৪২৬৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উবাদা ইব্নুস সামিত (রাঃ)
আরবি পাঠে ‘কুরিবা’ শব্দে কষ্টগ্রস্ত হওয়ার এবং ‘তারাব্বাদা ওয়াজহুহু’ কথায় মুখের রঙ বা অবস্থার পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে। পরে ‘সুররিয়া আনহু’ কথায় কষ্ট দূর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে শারীরিক-মানসিক চাপের প্রকাশ এবং সেই অবস্থার অবসান—দুটিই এখানে আলোচ্য। মূল আরবি বর্ণনাটি হলো: [22]
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، وَابْنُ بَشَّارٍ جَمِيعًا عَنْ عَبْدِ الأَعْلَى، قَالَ ابْنُ الْمُثَنَّى حَدَّثَنَا عَبْدُ الأَعْلَى، حَدَّثَنَا سَعِيدٌ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ حِطَّانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الرَّقَاشِيِّ، عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، قَالَ كَانَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أُنْزِلَ عَلَيْهِ كُرِبَ لِذَلِكَ وَتَرَبَّدَ لَهُ وَجْهُهُ – قَالَ – فَأُنْزِلَ عَلَيْهِ ذَاتَ يَوْمٍ فَلُقِيَ كَذَلِكَ فَلَمَّا سُرِّيَ عَنْهُ قَالَ ” خُذُوا عَنِّي فَقَدْ جَعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاً الثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ وَالْبِكْرُ بِالْبِكْرِ الثَّيِّبُ جَلْدُ مِائَةٍ ثُمَّ رَجْمٌ بِالْحِجَارَةِ وَالْبِكْرُ جَلْدُ مِائَةٍ ثُمَّ نَفْىُ سَنَةٍ ” .
বাংলা অনুবাদ: মুহাম্মদ ইবন মুসান্না ও ইবন বাশশার উভয়ে আবদুল আ‘লার সূত্রে আমাদের বর্ণনা করেছেন। ইবন মুসান্না বলেন, আবদুল আ‘লা আমাদের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সাঈদ কাতাদার সূত্রে, তিনি হাসানের সূত্রে, তিনি হিত্তান ইবন আবদুল্লাহ আর-রাকাশির সূত্রে, তিনি উবাদা ইবন সামিতের সূত্রে আমাদের বর্ণনা করেছেন। উবাদা বলেন, আল্লাহর নবীর ওপর যখন ওহি নাজিল হতো, তখন তিনি তার জন্য কষ্টগ্রস্ত হতেন এবং তাঁর মুখমণ্ডলের রঙ পরিবর্তিত হতো। একদিন তাঁর ওপর ওহি নাজিল হলে তাঁর একই অবস্থা হলো। কষ্ট দূর হলে তিনি বললেন, “আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো। আল্লাহ তাদের জন্য একটি পথ করে দিয়েছেন। পূর্বে বিবাহিতের সঙ্গে পূর্বে বিবাহিত এবং অবিবাহিতের সঙ্গে অবিবাহিত: পূর্বে বিবাহিতের জন্য একশ বেত্রাঘাত, তারপর পাথর মেরে হত্যা; অবিবাহিতের জন্য একশ বেত্রাঘাত, তারপর এক বছরের নির্বাসন।”
নববিও তাঁর ব্যাখ্যায় মুখের পরিবর্তনকে দৃশ্যমান রঙের পরিবর্তন হিসেবে বুঝিয়েছেন। তাঁর ভাষায় মুখে ধূসরতা ছেয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তিনি সেই পরিবর্তনের কারণ হিসেবে ওহির গুরুত্ব ও ভারের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন। [23]
قوله : ( كان نبي الله صلى الله عليه وسلم إذا أنزل عليه الوحي كرب لذلك وتربد وجهه ) هو بضم الكاف وكسر الراء ، وتربد وجهه ، أي : علته غبرة ، والربد تغير البياض إلى السواد ، وإنما حصل له ذلك لعظم موقع الوحي ، قال الله تعالى : إنا سنلقي عليك قولا ثقيلا .
বাংলা অনুবাদ: তাঁর বক্তব্য—“আল্লাহর নবীর ওপর ওহি নাজিল হলে তিনি তার জন্য কষ্টগ্রস্ত হতেন এবং তাঁর মুখমণ্ডলের রঙ পরিবর্তিত হতো”—এখানে ‘কুরিবা’ শব্দে কাফে পেশ ও রায়ে জের। ‘তাঁর মুখমণ্ডল পরিবর্তিত হতো’ অর্থ, তাতে ধূসরতা ছেয়ে যেত। ‘রাবাদ’ হলো শুভ্রতা থেকে কালচে রঙের দিকে পরিবর্তন। ওহির গুরুত্বের কারণেই তাঁর এমন হতো। আল্লাহ বলেছেন, “আমি আপনার ওপর ভারী বাণী অবতীর্ণ করব।”
এখানে মুখের রঙ পরিবর্তনের অর্থ ব্যাখ্যা করা এবং তার কারণ হিসেবে ঐশী বাণীর ভার ঘোষণা করা দুটি আলাদা কাজ। প্রথমটি বর্ণনার শব্দগত অর্থ; দ্বিতীয়টি ধর্মীয় কারণ নির্ধারণ। মুখ বিবর্ণ হওয়া, কষ্টের প্রকাশ বা পরে স্বস্তি পাওয়া মানুষের শরীর ও আবেগের পরিচিত পরিবর্তন। এগুলোকে ওহির ফল বলতে হলে ওহির উপস্থিতির পক্ষে স্বতন্ত্র সমর্থন প্রয়োজন। মুহাম্মদের শরীরের পরিবর্তন দেখার বর্ণনা থেকে তাঁর ঘোষিত বার্তার উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
মৃগীজনিত আক্রমণের পরে চেতনা ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পর্যায়ে ক্লান্তি ও বিভ্রান্তি দেখা যেতে পারে। জনস হপকিন্সের বিবরণে ধীরে সচেতনতা ফিরে পাওয়া, অবসন্নতা, শরীরে ব্যথা ও কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বিভিন্ন অনুভূতির উল্লেখ রয়েছে। আগের কষ্টকর অবস্থার পরে মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তনের এই পরিচিত চিকিৎসাগত ধারাবাহিকতা ওহির বর্ণনার সঙ্গে তুলনার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে। [24]
Gradually the person regains awareness and may feel confused, exhausted, physically sore, sad or embarrassed for a few hours.
বাংলা অনুবাদ: ধীরে ধীরে ব্যক্তির সচেতনতা ফিরে আসে এবং কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত তিনি বিভ্রান্তি, অবসন্নতা, শরীরে ব্যথা, বিষণ্নতা বা বিব্রতবোধ অনুভব করতে পারেন।
উবাদার বর্ণনায় কষ্ট ও মুখের পরিবর্তন ওহির অভিজ্ঞতা চলাকালে এসেছে; অবস্থা কাটার পরে এসেছে স্বস্তি ও বক্তব্য। আর চিকিৎসাগত ‘আক্রমণ-পরবর্তী অবস্থা’ বলতে আক্রমণ শেষ হওয়ার পরের সময় বোঝায়। এই সময়ক্রম অনুযায়ী অভিজ্ঞতাগুলো সাজালে সাদৃশ্যের প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট হয়: কী ধরনের কষ্ট দেখা গেছে, তা কতক্ষণ ছিল, সচেতনতা ও সাড়ায় কী ঘটেছে এবং পরে কী পরিবর্তন এসেছে। বর্ণনায় থাকা তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রশ্নগুলো ওঠে। ‘ওহির ভার’ নাম দিয়ে কষ্টের কারণ নির্ধারণ করে ফেললে এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের আগেই বিশ্বাসকে সিদ্ধান্তের জায়গায় বসানো হয়।
| উৎসে বর্ণিত বিষয় | বিবরণের প্রকৃতি | যে প্রশ্নটি ওঠে |
|---|---|---|
| তীব্র শীতেও কপাল দিয়ে ঘাম ঝরা | আয়িশার দেখা শারীরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণিত। | শরীরের ভেতরের কোন প্রক্রিয়া ঘাম সৃষ্টি করেছে? |
| ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ ও তীব্র কষ্ট | মুহাম্মদের নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ। | অনুভূত শব্দকে ফেরেশতার যোগাযোগ বলে শনাক্ত করার স্বাধীন ভিত্তি কী? |
| ভয় পেয়ে ঢেকে দিতে বলা | প্রথম অভিজ্ঞতার পরে আশ্রয় ও আশ্বাস খোঁজার বর্ণনা। | আতঙ্কের সঙ্গে অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা ও সামাজিক আশ্বাসের সম্পর্ক কী? |
| কষ্টের সঙ্গে মুখমণ্ডলের রঙ পরিবর্তন, পরে স্বস্তি | ওহির নামে চিহ্নিত অবস্থার আগে-পরে পরিবর্তনের বিবরণ। | শারীরিক প্রতিক্রিয়া থেকে ঐশী উৎসের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রমাণ কোথায়? |
উবাদার বর্ণনায় এই ব্যক্তিগত অবস্থার পরেই অন্য মানুষের শরীর ও জীবন সম্পর্কে বিধান ঘোষিত হয়েছে: বেত্রাঘাত, নির্বাসন এবং পাথর মেরে হত্যা। ফলে অভিজ্ঞতার নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্নটি সামাজিকভাবে গুরুতর। একজন মানুষের কষ্ট, ঘাম বা মুখের পরিবর্তন দেখে তাঁর পরবর্তী নির্দেশকে মহাবিশ্বের স্রষ্টার সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। শারীরিক প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা সেই নির্দেশের ঐশী উৎস বা নৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে না। মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার কর্তৃত্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দাবির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সেই দাবির প্রমাণের প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ওহির শব্দে আসমানের অধিবাসীদের অজ্ঞান হওয়ার বর্ণনা
ওহির সঙ্গে অজ্ঞান হওয়ার সম্পর্ক নিয়ে সুনান আবু দাউদে একটি বর্ণনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ ওহির জন্য কথা বললে আসমানের অধিবাসীরা মসৃণ পাথরের ওপর শিকল টানার মতো শব্দ শোনে এবং বেহুঁশ হয়ে পড়ে। জিবরাইল আসার পর তাদের ভয় দূর হয়; তারা জানতে চায়, তাদের রব কী বলেছেন। জিবরাইল বলেন, সত্য বলেছেন; তারাও সেই কথার পুনরাবৃত্তি করে। এখানে অজ্ঞান হওয়ার কথা বলা হয়েছে আসমানের অধিবাসীদের সম্পর্কে। মুহাম্মদ বা তাঁর চারপাশের মানুষদের অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা এই হাদিসের বিষয়বস্তু নয়। বর্ণনাটি ওহি সম্পর্কে মুহাম্মদের প্রচারিত অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার একটি নমুনা। [25]
সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ২১. কুরআন সম্পর্কে।
৪৬৬৩. আহমদ ইবন আবূ সুরায়হ (রহঃ) ….. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন আল্লাহ্ তা’আলা ওয়াহী প্রেরণের জন্য কথা বলেন, তখন এক আসমানের অধিবাসী অন্য আসমান থেকে এরূপ শব্দ শোনে যে, যেমন সাফা পাহাড়ের উপর লোহার শিকল টানলে শব্দ হয়। যা শুনে তারা সবাই বেহুশ হয়ে পড়ে এবং জিবরীল (আঃ) তাদের কাছে না আসা পর্যন্ত তারা এ অবস্থায় থাকে। এরপর জিবরীল (আঃ) যখন তাদের কাছে আসে, তখন তারা জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে বলেঃ হে জিবরীল! আপনার রব কি বলেছেন? তিনি বলেনঃ তিনি সত্য বলেছেনঃ। একথা শুনে সকল ফেরেশতা বলতে থাকেঃ সত্য বলেছেন, সত্য বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রাঃ)
উদ্ধৃত বাংলা অনুবাদে ‘সাফা পাহাড়’ লেখা হয়েছে। আরবির «الصَّفَا» শব্দটি এখানে মসৃণ পাথর বোঝাচ্ছে। আবু দাউদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আওনুল মাবুদ-এ সরাসরি সেই অর্থই দেওয়া হয়েছে। একই ব্যাখ্যায় ‘সালসালা’ শব্দের অর্থ করা হয়েছে লোহার সঙ্গে লোহার সংঘর্ষের আওয়াজ। অর্থাৎ পরিচিত জগতের ধাতব শব্দের উপমা দিয়ে এক অদৃশ্য আসমানি ঘটনার বিবরণ তৈরি করা হয়েছে। [26]
«(أحمد بن أبي سريج) بالسين المهملة والجيم (عن مسلم) هو ابن صبيح كما عند البيهقي في كتاب الصفات (صلصلة) هي صوت وقوع الحديد بعضه على بعض (كجر السلسلة على الصفا) جمع صفاة وهي الصخرة والحجر الأملس.»
বাংলা অনুবাদ: ‘আহমদ ইবন আবি সুরাইজ’ নামটিতে বিন্দুহীন সিন ও জিম রয়েছে। ‘মুসলিম’ হলেন ইবন সুবাইহ, যেমনটি বায়হাকির ‘কিতাবুস সিফাত’-এ আছে। ‘সালসালা’ হলো লোহার এক অংশ অন্য অংশের ওপর পড়ার শব্দ। ‘সাফার ওপর শিকল টানার মতো’—এখানে ‘সাফা’ হলো ‘সাফাত’-এর বহুবচন; এর অর্থ শিলা ও মসৃণ পাথর।
বর্ণনার ভেতরে শব্দ শোনা, ভয় পাওয়া, বেহুঁশ হওয়া এবং পরে প্রশ্ন করার একটি ধারাবাহিকতা আছে। এই ধারাবাহিকতা মানুষের পরিচিত শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ভাষায় সাজানো হলেও ঘটনাস্থল ও চরিত্রগুলো অতিপ্রাকৃত। মুহাম্মদের বক্তব্যের মাধ্যমে আসমানের অধিবাসীদের আচরণ সম্পর্কে জানা যাচ্ছে; পৃথিবীর কোনো পর্যবেক্ষকের দেখা ঘটনা হিসেবে সেটি উপস্থাপিত হয়নি। ফলে এখানে প্রধান প্রশ্নটি দাবির জ্ঞানের উৎস: আসমানে কারা কী শুনল, কে কতক্ষণ বেহুঁশ থাকল এবং জিবরাইলের সঙ্গে কী কথোপকথন হলো—এসব তথ্যের পক্ষে মুহাম্মদের ঘোষণার বাইরে কী সাক্ষ্য রয়েছে? তাঁর নবুয়ত সত্য ধরে নিয়ে এই বিবরণ গ্রহণ করা এবং পরে এই বিবরণ দিয়েই তাঁর নবুয়তের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা একই দাবিকে ঘুরিয়ে নিজের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা।
গল্পটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, আসমানের অধিবাসীরা শব্দ শোনার পরও কী বলা হয়েছে জানতে চায়। জিবরাইলের উত্তর থেকে তারা কথাটির সত্যতা ঘোষণা করে। এখানে শ্রবণ, বক্তব্যের অর্থ জানা এবং সেই বক্তব্যকে সত্য ঘোষণা করা আলাদা ধাপ। অথচ পৃথিবীতে পৌঁছানোর পর পুরো ঘটনাটিই একটি অবিভাজ্য ঐশী সত্যের বিবরণ হিসেবে প্রচারিত হয়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত দাবির সঙ্গে অদৃশ্য জগতের আরেক স্তরের অনুমোদন জুড়ে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু সেই অনুমোদনের খবরও আসছে একই ব্যক্তির কাছ থেকে। দৃশ্যমান অসুস্থতার কারণ নির্ণয়ের প্রশ্নে এই আসমানি কাহিনি কোনো প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ যোগ করে না; এটি দেখায়, ওহির ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতে কী ধরনের অদৃশ্য ঘটনাপ্রবাহের দাবি করা হয়েছে।
ওহি নাজিলের সময় উটের মতো আওয়াজ করা
মুহাম্মদের শরীর থেকে অস্বাভাবিক শব্দ বের হওয়ার একটি প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা সহিহ বুখারিতে রয়েছে। ঘটনাটি জি‘রানার। এক ব্যক্তি সুগন্ধি বা হলদে রঙের চিহ্নযুক্ত জুব্বা পরে এসে উমরাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। এরপর মুহাম্মদকে কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয়। ইয়ালা ইবন উমাইয়া সেই অবস্থায় তাঁকে দেখতে চাইলে উমর কাপড়ের এক পাশ তুলে দেন। ইয়ালা দেখতে পান, মুহাম্মদ ‘গাতীত’ করছেন। বর্ণনাকারীর স্মৃতি অনুযায়ী শব্দটি অল্পবয়সী উটের আওয়াজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। অবস্থা কেটে যাওয়ার পর মুহাম্মদ প্রশ্নকারীকে খুঁজে জুব্বা খুলতে, সুগন্ধির চিহ্ন ধুয়ে ফেলতে এবং উমরাহতে হজের অনুরূপ কাজ করতে নির্দেশ দেন। প্রশ্ন, শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন, আওয়াজ এবং পরবর্তী নির্দেশ—সবগুলো একই ঘটনার ধারাবাহিক অংশ। [27]
Reference : Sahih al-Bukhari 1789
In-book reference : Book 26, Hadith 16
USC-MSA web (English) reference : Vol. 3, Book 27, Hadith 17
(10)Chapter: The same ceremonies in ‘Umra, as in Hajj(10)باب يَفْعَلُ فِي الْعُمْرَةِ مَا يَفْعَلُ فِي الْحَجِّ
Narrated Safwan bin Ya`la bin Umaiya from his father who said:
“A man came to the Prophet (ﷺ) while he was at Ji’rana. The man was wearing a cloak which had traces of Khaluq or Sufra (a kind of perfume). The man asked (the Prophet (ﷺ) ), ‘What do you order me to perform in my `Umra?’ So, Allah inspired the Prophet (ﷺ) divinely and he was screened by a place of cloth. I wished to see the Prophet (ﷺ) being divinely inspired. `Umar said to me, ‘Come! Will you be pleased to look at the Prophet (ﷺ) while Allah is inspiring him?’ I replied in the affirmative. `Umar lifted one corner of the cloth and I looked at the Prophet (ﷺ) who was snoring. (The sub-narrator thought that he said: The snoring was like that of a camel). When that state was over, the Prophet (ﷺ) asked, “Where is the questioner who asked about `Umra? Put off your cloak and wash away the traces of Khaluq from your body and clean the Sufra (yellow color) and perform in your Umra what you perform in your Hajj (i.e. the Tawaf round the Ka`ba and the Sa`i between Safa and Marwa). “
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২২/ হাজ্জ (হজ্জ/হজ)
পরিচ্ছেদঃ ১১২১. হজ্জে যে কাজ করা হয় ‘উমরাতেও তাই করবে
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ১৬৭৪, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৮৯
১৬৭৪। আবূ নু’আইম (রহঃ) … ই’য়ালা ইবনু উমায়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জি’ররানাতে ছিলেন। এ সময় জুব্বা পরিহিত এক ব্যাক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, আপনি ’উমরাতে আমাকে কি কাজ করার নির্দেশ দেন? লোকটির জুব্বাতে খালূক বা হল্দে রঙের দাগ ছিল। এ সময় আল্লাহ তা’আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অহী নাযিল করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করে দেওয়া হল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ’উমর (রাঃ) কে বললাম, আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি অহী নাযিল করছেন, এমতাবস্থায় আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখতে চাই।
’উমরা (রাঃ) বললেন, এসো, আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি অহী নাযিল করছেন, এমতাবস্থায় তুমি কি তাঁকে দেখতে আগ্রহী? আমি বললাম, হাঁ। তারপর ’উমর (রাঃ) কাপড়ের একটি কোণ উঁচু করে ধরলেন। আমি তাঁর দিকে নজর করলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওয়াজ করছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলছিলেন, উটের আওয়াজের মত আওয়াজ। এ অবস্থা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দূরীভুত হলে তিনি বললেনঃ ’উমরা সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়? তিনি বললেনঃ তুমি তোমার থেকে জুব্বাটি খুলে ফেল, খালুকের চিহ্ন ধুয়ে ফেল এবং হলদে রঙ পরিষ্কার করে নাও। আর তোমার হাজ্জে যা করেছ ’’উমরাতে তুমি তা-ই করবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইয়ালা ইবন উমাইয়া (রাঃ)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
২৬/ উমরাহ
পরিচ্ছেদঃ ২৬/১০. হজ্জে যে সকল কাজ করতে হয় ‘উমরাতেও তাই করবে।
১৭৮৯. ই‘য়ালা ইবনু উমায়্যা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জি‘রানাতে ছিলেন। এ সময় জুববা পরিহিত এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললেন, আপনি ‘উমরাহতে আমাকে কী কাজ করার নির্দেশ দেন? লোকটির জুববাতে খালূক বা হল্দে রঙের দাগ ছিল। এ সময় আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর ওয়াহী নাযিল করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করে দেয়া হল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ‘উমার (রাঃ)-কে বললাম, আল্লাহ তাঁর নবীর প্রতি ওয়াহী নাযিল করছেন, এমতাবস্থায় আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে দেখতে চাই। ‘উমার (রাঃ) বললেন, এসো, আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি ওয়াহী নাযিল করছেন, এমতাবস্থায় তুমি কি তাঁকে দেখতে আগ্রহী? আমি বললাম, হাঁ। অতঃপর ‘উমার (রাঃ) কাপড়ের একটি কোণ উঁচু করে ধরলেন। আমি তাঁর দিকে নজর করলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওয়াজ করছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলছিলেন, উটের আওয়াজের মত আওয়াজ। এ অবস্থা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে দূরীভূত হলে তিনি বললেনঃ ‘উমরাহ সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়? তিনি বললেনঃ তুমি তোমার হতে জুববাটি খুলে ফেল, খালূকের চিহ্ন ধুয়ে ফেল এবং হলদে রং পরিষ্কার করে নাও। আর তোমার হাজ্জে যা করেছ ‘উমরাহতে তুমি তা-ই করবে। (১৫৩৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৬২. ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ১৬৭১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ই‘য়ালা ইবনু উমায়্যা (রাঃ)
আরবি বর্ণনার শব্দগুলো এখানে তাৎপর্যপূর্ণ: «فَنَظَرْتُ إِلَيْهِ لَهُ غَطِيطٌ وَأَحْسِبُهُ قَالَ كَغَطِيطِ الْبَكْرِ»—তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখা গেল তিনি ‘গাতীত’ করছেন; বর্ণনাকারীর ধারণা, বলা হয়েছিল অল্পবয়সী উটের মতো ‘গাতীত’। ‘আমার মনে হয়’ কথাটি উপমাটির বর্ণনায় রয়েছে; শব্দ হওয়ার মূল বিবরণটি সরাসরি বলা হয়েছে। ফলে উটের তুলনাটি বর্ণনার স্মৃতিগত অবস্থাসহ সংরক্ষিত, আর মুহাম্মদের শরীর থেকে শ্রবণযোগ্য আওয়াজ বের হওয়ার বিষয়টি ঘটনার কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ। একই ঘটনার ইংরেজি ও দুটি বাংলা অনুবাদে সেই পর্যবেক্ষণই বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। [28]
‘গাতীত’ কোনো অর্থপূর্ণ বাণী পাঠ করার শব্দ নয়; শব্দটির প্রচলিত অর্থ শ্বাসের সঙ্গে শোনা ঘড়ঘড় বা নাক ডাকার মতো আওয়াজ। ইসলামকিউএতে উদ্ধৃত আল-খাত্তাবির ব্যাখ্যায় একে এমনকি গলা চেপে ধরা ব্যক্তির শব্দের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বর্ণনাটিতে শ্বাস ও কণ্ঠের একটি শ্রবণযোগ্য শারীরিক পরিবর্তন ধরা পড়েছে। [29]
«الغطيط: صوت يسمع من تردد النفس، كهيئة صوت المخنوق، ومنه غطيط البَكْر، والخطيط قريب منه، والغين والخاء متقاربا المخرج، وقد مر ذكر معاني هذا الحديث فيما تقدم.»
বাংলা অনুবাদ: ‘গাতীত’ হলো শ্বাসের আসা-যাওয়ার সঙ্গে শোনা শব্দ, যা গলা চেপে ধরা ব্যক্তির শব্দের মতো। অল্পবয়সী উটের ‘গাতীত’ও এর অন্তর্ভুক্ত। ‘খাতীত’ শব্দটির অর্থও এর কাছাকাছি; গাইন ও খা হরফের উচ্চারণস্থান পরস্পরের কাছাকাছি। এই হাদিসের অর্থসংক্রান্ত আলোচনা আগে হয়েছে।
আওয়াজটির সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাস ও পেশির কার্যক্রমের সম্পর্ক অনুসন্ধানযোগ্য। জনস হপকিন্সের বিবরণে টনিক-ক্লোনিক আক্রমণের শুরুতে পেশির সংকোচনে ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে চিৎকার বা গোঙানির মতো শব্দ হওয়ার কথা রয়েছে; আক্রমণের পরের পর্যায়ে নাক ডাকার মতো শব্দও হতে পারে। ইয়ালার বর্ণনায় রয়েছে বিশেষ একটি অবস্থায় মুহাম্মদের শরীর থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ বের হওয়া এবং সেই অবস্থা কাটার পরে কথাবার্তায় ফেরা। শব্দের উৎস অনুসন্ধানে এই সময়ক্রম ও শ্বাসের পরিবর্তন প্রাসঙ্গিক। [30]
একই ঘটনায় মুখ লাল হয়ে যাওয়া: ইয়ালার প্রত্যক্ষ বিবরণ
জি‘রানার এই ঘটনার মুসলিম-বর্ণিত পাঠে আওয়াজের সঙ্গে মুখ লাল হয়ে যাওয়ার বিবরণও সংরক্ষিত আছে। ইয়ালা মুহাম্মদকে দেখার জন্য কাপড়ের নিচে মাথা ঢুকিয়ে দেখেন, তাঁর মুখ লাল এবং তিনি ‘গাতীত’ করছেন। এর আগে প্রশ্নকারীর দিকে তাকানো ও নীরব হওয়ার কথা আছে; অবস্থা কাটার পরে রয়েছে প্রশ্নকারীকে খুঁজে উত্তর দেওয়ার বিবরণ। মুখের রঙ, শ্বাস বা কণ্ঠের আওয়াজ এবং কথোপকথনের বিরতি একই পর্বে ঘটেছে। বুখারি ১৭৮৯ ও মুসলিম ১১৮০গ একই জি‘রানার ঘটনার ভিন্ন পাঠ। [31]
أَنَّ يَعْلَى كَانَ يَقُولُ لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ – رضى الله عنه – لَيْتَنِي أَرَى نَبِيَّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حِينَ يُنْزَلُ عَلَيْهِ. فَلَمَّا كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِالْجِعْرَانَةِ وَعَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ثَوْبٌ قَدْ أُظِلَّ بِهِ عَلَيْهِ مَعَهُ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِهِ فِيهِمْ عُمَرُ إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ عَلَيْهِ جُبَّةُ صُوفٍ مُتَضَمِّخٌ بِطِيبٍ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَى فِي رَجُلٍ أَحْرَمَ بِعُمْرَةٍ فِي جُبَّةٍ بَعْدَ مَا تَضَمَّخَ بِطِيبٍ فَنَظَرَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم سَاعَةً ثُمَّ سَكَتَ فَجَاءَهُ الْوَحْىُ فَأَشَارَ عُمَرُ بِيَدِهِ إِلَى يَعْلَى بْنِ أُمَيَّةَ تَعَالَ. فَجَاءَ يَعْلَى فَأَدْخَلَ رَأْسَهُ فَإِذَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مُحْمَرُّ الْوَجْهِ يَغِطُّ سَاعَةً ثُمَّ سُرِّيَ عَنْهُ فَقَالَ «أَيْنَ الَّذِي سَأَلَنِي عَنِ الْعُمْرَةِ آنِفًا». فَالْتُمِسَ الرَّجُلُ فَجِيءَ بِهِ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «أَمَّا الطِّيبُ الَّذِي بِكَ فَاغْسِلْهُ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ وَأَمَّا الْجُبَّةُ فَانْزِعْهَا ثُمَّ اصْنَعْ فِي عُمْرَتِكَ مَا تَصْنَعُ فِي حَجِّكَ».
বাংলা অনুবাদ: সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১৬। হজ্জ
পরিচ্ছেদঃ ১. হজ্জ ও উমরার ইহরাম অবস্থায় কী ধরনের পোশাক পরিধান করা জায়িয ও কী ধরনের পোশাক নাজায়িয এবং ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধির ব্যবহার নিষিদ্ধ
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ২৬৯০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১১৮০
২৬৯০-(৮/…) যুহায়র ইবনু হারব, আবদ ইবনু হুমায়দ ও আলী ইবনু খাশরম (রহিমাহুমাল্লাহ) ….. ইয়া’লা ইবনু উমাইয়্যাহ (রাযিঃ) উমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিঃ) কে বলতেন, আহা! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যখন ওয়াহী নাযিল হয়, আমি যদি সে অবস্থায় তাকে দেখতে পেতাম! একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিরানায় অবস্থান করছিলেন এবং একটি কাপড়ের সাহায্যে তার উপর ছায়া বিস্তার করা হয়েছিল। তার সঙ্গে তার কিছু সংখ্যক সাহাবাও ছিলেন- যাদের মধ্যে উমর (রাযিঃ)-ও ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি সুগন্ধিযুক্ত জুব্বাহ পরিহিত অবস্থায় তার নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রসূল! এক ব্যক্তি জুব্বায় সুগন্ধি মেখে তা পরিহিত অবস্থায় উমরার ইহরাম বেঁধেছে, তার সম্পর্কে আপনার কী অভিমত? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন, অতঃপর নীরব রইলেন। এ সময় তার উপর ওয়াহী আসল।
উমার (রাযিঃ) হাতের ইশারায় ইয়া’লা ইবনু উমাইয়্যাহ (রাযিঃ) কে বললেন, এদিকে আসো। ইয়া’লা (রাযিঃ) এসে নিজের মাথা (কাপড়ের মধ্যে) ঢুকিয়ে দিলেন (এবং দেখলেন) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা লাল বর্ণ ধারণ করেছে এবং তার মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরুচ্ছে। অতঃপর এ অবস্থা দূরীভূত হল এবং তিনি বললেন, এই মাত্র যে ব্যক্তি আমার নিকট উমরাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিল- সে কোথায়? লোকটিকে খুঁজে এনে তার নিকট উপস্থিত করা হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার সুগন্ধি তিনবার ধুয়ে ফেল এবং জুব্বাহ খুলে ফেল। অতঃপর যে নিয়মে হাজ্জ (হজ্জ/হজ) কর, ঠিক সে নিয়মে ’উমরাহ কর। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৬৬৭, ইসলামীক সেন্টার ২৬৬৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইয়ালা ইবন উমাইয়া (রাঃ)
ইয়ালার দেখা মুখের রক্তিমতা এই ঘটনাটির একটি স্বতন্ত্র শারীরিক লক্ষণ। ত্বকের রক্তপ্রবাহ বেড়ে মুখ লাল হয়ে যাওয়ার পরিচিত শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া রয়েছে। মেডলাইনপ্লাস মুখ, গলা বা বুকের ওপরের অংশের এই আকস্মিক রক্তিমতার সংজ্ঞা দিয়েছে। [32]
Skin blushing or flushing is a sudden reddening of the face, neck, or upper chest due to increased blood flow.
বাংলা অনুবাদ: রক্তপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে মুখ, গলা বা বুকের ওপরের অংশ হঠাৎ লাল হয়ে যাওয়াকে ত্বকের রক্তিমতা বলা হয়।
মৃগীজনিত কিছু আক্রমণেও স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন কার্যক্রম বদলে যায়। আইএলএইর শ্রেণিবিন্যাসে মুখ বা ত্বক ফ্যাকাশে কিংবা লাল হয়ে যাওয়া এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের পরিবর্তন পৃথক লক্ষণ হিসেবে তালিকাভুক্ত। ফলে মুখের রঙ ও শ্বাসের যুগপৎ পরিবর্তন স্নায়বিক অনুসন্ধানেরও বিষয়। আইএলএই এই ধরনের আক্রমণকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে: [33]
Focal autonomic seizures are characterized by alterations in systems controlled by the autonomic nervous system at seizure onset. These may occur with or without objective clinical signs of a seizure evident to the observer. Focal autonomic seizures can be further described using the following descriptors:
বাংলা অনুবাদ: ফোকাল অটোনমিক সিজারের বৈশিষ্ট্য হলো খিঁচুনির শুরুতে স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থাগুলোতে পরিবর্তন ঘটা। পর্যবেক্ষকের কাছে খিঁচুনির দৃশ্যমান শারীরিক লক্ষণ স্পষ্ট থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। পরবর্তী লক্ষণবর্ণনাগুলোর সাহায্যে ফোকাল অটোনমিক সিজারকে আরও নির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা যায়।
মুহাম্মদের ক্ষেত্রে নথিবদ্ধ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি প্রশ্নের পরে নীরবতা, মুখের রঙ বদল, ঘড়ঘড় আওয়াজ এবং পরে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। এগুলো মিলিয়ে একটি শুরু, মধ্যবর্তী শারীরিক পর্ব ও অবসানের ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। শ্বাসের গতি, নাড়ির স্পন্দন, রক্তচাপ ও ঘটনার নির্দিষ্ট স্থায়িত্ব বর্ণনায় মাপা হয়নি। মুখের রঙের পরিবর্তন ও আওয়াজ প্রত্যক্ষদর্শীর পর্যবেক্ষণ; ‘ওহি’ সেই পর্বটির ধর্মীয় পরিচয়। এই পরিচয়ের নিচে চাপা পড়েছে মানুষের দেহে সংঘটিত একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের বিবরণ।
| ঘটনার ধাপ | বর্ণনায় পাওয়া তথ্য | শারীরিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| প্রশ্নের আগমন | সুগন্ধিযুক্ত জুব্বা পরা ব্যক্তি উমরাহর নিয়ম জানতে চান। | মুহাম্মদ প্রথমে তাঁর দিকে তাকান, তারপর নীরব থাকেন। |
| প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে আসা | উমরের ইশারায় ইয়ালা কাপড়ের নিচে মাথা ঢুকিয়ে দেখেন। | শরীরের পরিবর্তন ও শব্দ সম্পর্কে ইয়ালার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। |
| মুখের পরিবর্তন | মুসলিমের পাঠে মুখ লাল হয়ে যাওয়ার কথা স্পষ্ট। | দৃশ্যমান রঙের পরিবর্তন একই পর্বের অংশ। |
| শ্রবণযোগ্য শব্দ | ‘গাতীত’; বুখারির পাঠে উটের আওয়াজের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর স্মৃতিসংক্রান্ত সংশয় রয়েছে। | মুখের রঙের পরিবর্তনের সঙ্গে শ্বাস বা কণ্ঠের শব্দও উপস্থিত। |
| অবস্থার অবসান | অবস্থা কেটে গেলে মুহাম্মদ আগের প্রশ্নকারীকে খুঁজতে বলেন। | নীরব ও শব্দযুক্ত পর্বের পরে নিয়মিত কথোপকথনে ফেরেন। |
| পরবর্তী নির্দেশ | সুগন্ধি তিনবার ধোয়া, জুব্বা খোলা এবং হজের অনুরূপ উমরাহ পালনের নির্দেশ দেন। | বর্ণনার শুরুতে করা ব্যবহারিক প্রশ্নটির উত্তর পর্বটির শেষে দেওয়া হয়। |
অবস্থা কাটার পরে মুহাম্মদ যে উত্তর দেন, তার বিষয় জুব্বা, সুগন্ধি ও উমরাহর আচার। প্রশ্নটি আগেই করা হয়েছিল; উত্তর এসেছে শারীরিক পর্বটির অবসানের পরে। এখানে ব্যক্তিগত শারীরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ধর্মীয় নির্দেশ দেওয়ার সম্পর্ক সরাসরি উপস্থিত। সেই নির্দেশের ঐশী পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য মুখের রক্তিমতা বা ঘড়ঘড় আওয়াজকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যুক্তিগতভাবে অসঙ্গত।
ওহির সময়ে যায়েদের উরুর ওপর প্রচণ্ড ভার অনুভূত হওয়া
ওহির সময়ে মুহাম্মদের শরীরের সঙ্গে সংস্পর্শে থাকা আরেক ব্যক্তির অস্বাভাবিক ভার অনুভবের বিবরণ বুখারিতে রয়েছে। যায়েদ ইবন সাবিতের ভাষ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ তাঁকে সূরা নিসার একটি আয়াত লিখিয়ে দিচ্ছিলেন। ইবন উম্মে মাকতুম এসে নিজের জিহাদে অংশ নিতে না-পারার কথা জানান। এরপর মুহাম্মদের ওপর ওহি আসার কথা বলা হয়েছে। তখন তাঁর উরু যায়েদের উরুর ওপর ছিল; যায়েদ এত ভার অনুভব করেন যে নিজের উরু চূর্ণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন। অবস্থা কেটে যাওয়ার সঙ্গে অক্ষম ব্যক্তিদের ব্যতিক্রম করার পাঠ যুক্ত হয়েছে। [34]
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ، أَنَّهُ قَالَ رَأَيْتُ مَرْوَانَ بْنَ الْحَكَمِ جَالِسًا فِي الْمَسْجِدِ، فَأَقْبَلْتُ حَتَّى جَلَسْتُ إِلَى جَنْبِهِ، فَأَخْبَرَنَا أَنَّ زَيْدَ بْنَ ثَابِتٍ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمْلَى عَلَيْهِ لاَ يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ فَجَاءَهُ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ وَهُوَ يُمِلُّهَا عَلَىَّ، فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَوْ أَسْتَطِيعُ الْجِهَادَ لَجَاهَدْتُ. وَكَانَ رَجُلاً أَعْمَى، فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَلَى رَسُولِهِ صلى الله عليه وسلم وَفَخِذُهُ عَلَى فَخِذِي، فَثَقُلَتْ عَلَىَّ حَتَّى خِفْتُ أَنْ تَرُضَّ فَخِذِي، ثُمَّ سُرِّيَ عَنْهُ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ {غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ}.
বাংলা অনুবাদ: সাহল ইবন সাদ আস-সাঈদি বলেন, আমি মারওয়ান ইবন হাকামকে মসজিদে বসে থাকতে দেখলাম। এগিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে বসলাম। তিনি আমাদের জানালেন, যায়েদ ইবন সাবিত তাঁকে জানিয়েছেন যে আল্লাহর রাসুল তাঁকে লিখিয়ে দিচ্ছিলেন, ‘মুমিনদের মধ্যে যারা বসে থাকে এবং আল্লাহর পথে যারা জিহাদ করে, তারা সমান নয়।’ যায়েদ বলেন, তিনি যখন আমাকে তা লিখিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন ইবন উম্মে মাকতুম এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি জিহাদ করতে সক্ষম হলে অবশ্যই জিহাদ করতাম।’ তিনি ছিলেন অন্ধ ব্যক্তি। তখন আল্লাহ তাঁর রাসুলের ওপর ওহি নাজিল করলেন। তাঁর উরু আমার উরুর ওপর ছিল। তা আমার ওপর এত ভারী হয়ে উঠল যে আমার উরু চূর্ণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করলাম। তারপর তাঁর সেই অবস্থা দূর হলো। আল্লাহ নাজিল করলেন, ‘যারা অক্ষম, তারা ছাড়া।’
এখানে সংস্পর্শের স্থান ও অনুভূতির তীব্রতা নির্দিষ্ট: মুহাম্মদের উরু যায়েদের উরুর ওপর, আর যায়েদের মনে হচ্ছে তাঁর উরু চূর্ণ হয়ে যেতে পারে। ‘ভার’ শব্দটি এই বর্ণনায় শরীরের ওপর অনুভূত চাপের সঙ্গে যুক্ত। যায়েদ কোনো বক্তব্যের অর্থ শুনে কষ্ট পাওয়ার কথা বলছেন না; নিজের দেহের ওপর অন্য দেহাংশের ভার অনুভব করছেন। মুহাম্মদের শারীরিক অবস্থার বর্ণনায় তাই ঘাম, মুখের রঙ ও আওয়াজের পাশাপাশি সংস্পর্শে অনুভূত ভারের এই তথ্যও রয়েছে।
ঘটনার আগে আয়াত লিখিয়ে দেওয়া চলছিল। অন্ধ ব্যক্তি নিজের অক্ষমতার কথা তোলার পর শারীরিক পর্বটি আসে এবং পরে সেই অক্ষমতার জন্য ব্যতিক্রম ঘোষিত হয়। নতুন পরিস্থিতি, দেহগত পরিবর্তন ও সংশোধিত বক্তব্য একই ধারাবাহিকতায় সংরক্ষিত। ব্যক্তিটির উত্থাপিত বাস্তব সমস্যার সঙ্গে পরবর্তী ধর্মীয় বক্তব্যের সম্পর্ক সরাসরি দৃশ্যমান। শারীরিক পর্বটিকে ঐশী যোগাযোগের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি আয়াতের ভাষায় নতুন ব্যতিক্রম সংযোজনের ঘটনাও বর্ণনাটিতে উপস্থিত।
| ঘটনার ধাপ | সংরক্ষিত তথ্য |
|---|---|
| প্রাথমিক কাজ | মুহাম্মদ যায়েদকে আয়াত লিখিয়ে দিচ্ছিলেন। |
| নতুন পরিস্থিতি | ইবন উম্মে মাকতুম নিজের অন্ধত্বজনিত অক্ষমতার প্রসঙ্গ তোলেন। |
| শারীরিক সংস্পর্শ | মুহাম্মদের উরু যায়েদের উরুর ওপর ছিল। |
| যায়েদের অনুভূতি | উরু চূর্ণ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করার মতো ভার অনুভব করেন। |
| পর্বের অবসান | মুহাম্মদের সেই অবস্থা দূর হওয়ার কথা বর্ণিত। |
| পরবর্তী পাঠ | অক্ষম ব্যক্তিদের ব্যতিক্রম করে ‘গাইরু উলিদ্-দারার’ অংশ ঘোষিত হয়। |
| শারীরিক পরিমাপ | দেহের ওজন, চাপের মাত্রা, পেশির টান বা পর্বের সময়কাল মাপার বিবরণ নেই। |
জি‘রানার ঘটনায় ইয়ালা বাইরে থেকে মুখের রঙ ও শ্বাসের আওয়াজ লক্ষ্য করেছিলেন। এখানে যায়েদ নিজের শরীরে ভার অনুভবের কথা বলেছেন। এই দুই ধরনের সাক্ষ্যে পর্যবেক্ষণের মাধ্যম আলাদা—একটিতে দেখা ও শোনা, অন্যটিতে প্রত্যক্ষ শারীরিক সংস্পর্শ। যায়েদের বর্ণনায় সেই অবস্থার অবসানও আছে। ফলে ঘটনাটির নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য হলো, আয়াত লিখিয়ে দেওয়ার মধ্যে একটি শারীরিক পর্ব, অন্য ব্যক্তির ওপর তার অনুভূত প্রভাব এবং পর্বটির পরে নতুন পাঠ ঘোষণা।
চেতনা, স্মৃতি, আবেগ ও ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতার অন্যান্য বিবরণ
ওহির সময়ের বাইরে মুহাম্মদের জীবনকাহিনিতেও সাময়িক চেতনাহানি, নিজের কাজ সম্পর্কে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক এবং অস্বাভাবিক ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। এসব ঘটনা কখনো দৈনন্দিন কাজের মধ্যে, কখনো ঘুমের পরে, কখনো ব্যক্তিগত সংকটের সময়ে ঘটেছে বলে সংরক্ষিত হয়েছে। প্রত্যেকটির পরিস্থিতি, আচরণের পরিবর্তন এবং পরবর্তী অবস্থা তাঁর অভিজ্ঞতার পৃথক দিক প্রকাশ করে।
কাবা নির্মাণের সময় অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া
কাবা পুনর্নির্মাণের সময় পাথর বহন করতে গিয়ে মুহাম্মদের অজ্ঞান হয়ে পড়ার বর্ণনা বুখারিতে রয়েছে। আব্বাস তাঁকে পাথরের ঘর্ষণ থেকে কাঁধ রক্ষা করতে কোমরের কাপড় কাঁধে রাখতে বলেন। এরপর মুহাম্মদ মাটিতে পড়ে যান; তাঁর চোখ আকাশের দিকে ওঠে। চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি কাপড় চান এবং আবার তা পরেন। শ্রমরত অবস্থায় কাপড়ের অবস্থান বদল, আকস্মিক পতন, চেতনাহানি ও ফিরে আসার ঘটনাক্রম এখানে স্পষ্ট। [35]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৩/ আনসারগণ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর মর্যাদা
পরিচ্ছদঃ ৬৩/২৫. কা‘বা নির্মাণ।
৩৮২৯. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন কা’বা গৃহ পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ‘আববাস (রাঃ) পাথর বয়ে আনছিলেন। ‘আববাস (রাঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, তোমার লুঙ্গিটি কাঁধের উপর রাখ, পাথরের ঘর্ষণ হতে তোমাকে রক্ষা করবে। (লুঙ্গি খুলতেই) তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তাঁর চোখ দু’টি আকাশের দিকে নিবিষ্ট ছিল। তাঁর চেতনা ফিরে এল, তখন তিনি বলতে লাগলেন, আমার লুঙ্গি, আমার লুঙ্গি। তৎক্ষণাৎ তাঁর লুঙ্গি পরিয়ে দেয়া হল। (৩৬৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৫৪৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৫৪৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


একই ঘটনার ৩৬৪ নম্বর পাঠে অজ্ঞান হওয়ার কথাটি সরাসরি «فَسَقَطَ مَغْشِيًّا عَلَيْهِ» ভাষায় এসেছে। ওই পাঠে আব্বাসের পরামর্শ এবং মুহাম্মদের নিজের কাপড় খোলার কাজটিও পরিষ্কার। [36]
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، يُحَدِّثُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَنْقُلُ مَعَهُمُ الْحِجَارَةَ لِلْكَعْبَةِ وَعَلَيْهِ إِزَارُهُ. فَقَالَ لَهُ الْعَبَّاسُ عَمُّهُ يَا ابْنَ أَخِي، لَوْ حَلَلْتَ إِزَارَكَ فَجَعَلْتَ عَلَى مَنْكِبَيْكَ دُونَ الْحِجَارَةِ. قَالَ فَحَلَّهُ فَجَعَلَهُ عَلَى مَنْكِبَيْهِ، فَسَقَطَ مَغْشِيًّا عَلَيْهِ، فَمَا رُئِيَ بَعْدَ ذَلِكَ عُرْيَانًا صلى الله عليه وسلم.
বাংলা অনুবাদ: জাবির ইবন আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল কাবার জন্য অন্যদের সঙ্গে পাথর বহন করছিলেন। তাঁর পরনে কোমরের কাপড় ছিল। তাঁর চাচা আব্বাস তাঁকে বললেন, ‘ভাতিজা, তুমি যদি কোমরের কাপড় খুলে পাথরের নিচে দুই কাঁধে রাখতে!’ বর্ণনাকারী বলেন, তিনি কাপড় খুলে দুই কাঁধে রাখলেন। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। সেই ঘটনার পর তাঁকে আর নগ্ন অবস্থায় দেখা যায়নি।
এই বর্ণনায় তিনটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য একত্রে পাওয়া যায়: মাটিতে পড়ে যাওয়া, সাময়িক চেতনাহানি এবং পরে চেতনা ফিরে পাওয়া। ৩৮২৯ নম্বর পাঠে চোখ আকাশের দিকে ওঠার তথ্যটি অতিরিক্ত। চেতনা ফিরে পাওয়ার পরে তাঁর তাৎক্ষণিক কাজ ছিল কাপড় চাওয়া ও শরীর ঢেকে নেওয়া। ঘটনাটির আগে পাথর বহনের শ্রম এবং কাপড় খোলার পরিস্থিতি রয়েছে। জাবির ঘটনাটি বর্ণনা করছেন; উদ্ধৃত হাদিসে তিনি নিজেকে সেই মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী বলেননি।
কাপড় খোলার সঙ্গে পতনের সময়গত সম্পর্ক বর্ণনায় রয়েছে। লজ্জা, আবেগের অভিঘাত বা শারীরিক শ্রমের কোনটি চেতনাহানির কারণ ছিল, তার নির্দিষ্ট পরিচয় দেওয়া হয়নি। সিনকোপের আলোচনায় আবেগ ও রক্তসঞ্চালনের পরিবর্তনের যে সম্পর্ক পাওয়া যায়, তার সঙ্গে এই ঘটনার পরিস্থিতি তুলনাযোগ্য। একই সঙ্গে চোখ ওপরে ওঠা ও সাময়িক চেতনাহানি স্নায়বিক অনুসন্ধানেরও বিষয়। চেতনা হারানোর এই বিবরণ মুহাম্মদের শরীরের আকস্মিক অবস্থাবদলের একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ।
ইবন হাজার এই ঘটনার ব্যাখ্যায় আবু তুফায়লের আরেকটি বর্ণনা এনেছেন। সেখানে কাপড় সরে যাওয়ার পরে মুহাম্মদকে ডেকে শরীর ঢাকতে বলার কথা রয়েছে। জাবিরের বর্ণনার চেতনাহানি ও চোখের অবস্থানের পাশাপাশি এই পাঠে একটি সম্বোধন শোনার উপাদান যুক্ত হয়েছে। [37]
«وفي حديث أبي الطفيل المذكور آنفًا فبينما رسول الله صلى الله عليه وسلم ينقل الحجارة معهم إذ انكشفت عورته، فنودي يا محمد غط عورتك، فذلك في أول ما نودي، فما رئيت له عورة قبل ولا بعد وقوله: طمحت عيناه إلى السماء أي ارتفعت.»
বাংলা অনুবাদ: আগে উল্লেখ করা আবু তুফায়লের হাদিসে আছে: আল্লাহর রাসুল যখন তাদের সঙ্গে পাথর বহন করছিলেন, তখন তাঁর গোপনাঙ্গ অনাবৃত হয়ে যায়। তাঁকে ডেকে বলা হয়, ‘হে মুহাম্মদ, তোমার গোপনাঙ্গ ঢাকো।’ তাঁকে প্রথমবার ডাকার ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি ছিল। এর আগে বা পরে তাঁর গোপনাঙ্গ দেখা যায়নি। আর ‘তাঁর চোখ আকাশের দিকে উঠেছিল’ কথাটির অর্থ হলো, তাঁর চোখ ওপরের দিকে উঠেছিল।
আবু তুফায়লের সূত্রে সংরক্ষিত অংশে নগ্নতা প্রকাশের পরিস্থিতিতে মুহাম্মদকে ডেকে শরীর ঢাকতে বলার কথা রয়েছে। জাবিরের পাঠে পতন ও চেতনা ফিরে পাওয়ার বিবরণ আছে; এই পৃথক পাঠে সম্বোধনের তথ্যটি পাওয়া যায়।
| ঘটনার বিষয় | সংরক্ষিত বিবরণ |
|---|---|
| কাজ ও পরিস্থিতি | কাবা নির্মাণের জন্য পাথর বহন; কাঁধ রক্ষায় কোমরের কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ। |
| কাপড় খোলা | আব্বাসের পরামর্শে মুহাম্মদ নিজের কাপড় খুলে কাঁধে রাখেন। |
| আকস্মিক পরিবর্তন | মাটিতে পড়ে যাওয়া ও সাময়িক চেতনাহানি। |
| চোখের অবস্থান | ৩৮২৯ নম্বর পাঠে চোখ আকাশের দিকে ওঠার উল্লেখ। |
| চেতনা ফিরে পাওয়া | কাপড় চাওয়া এবং আবার কোমরে বাঁধা। |
| সাক্ষ্যের সূত্র | জাবির ইবন আবদুল্লাহর বর্ণনা; হাদিসে ঘটনাস্থলে তাঁর নিজের উপস্থিতির দাবি নেই। |
| ঘটনার পরিমাপ | চেতনাহানির স্থায়িত্ব, নাড়ি, শ্বাস বা অন্য শারীরিক পরিমাপ উল্লেখিত হয়নি। |
অদৃশ্য কারও বেদনাদায়ক ঘুষি ও কাপড় বাঁধার নির্দেশের বর্ণনা
ইবন হিশামের সিরাতে ইবন ইসহাকের ভাষ্যে মুহাম্মদের নামে এমন একটি বর্ণনা সংরক্ষিত আছে, যেখানে আঘাত ও কণ্ঠস্বর একই অভিজ্ঞতার অংশ। কুরাইশের বালকদের সঙ্গে পাথর বহনের সময় কোমরের কাপড় ঘাড়ে রাখার পরে তিনি এমন কারও কাছ থেকে বেদনাদায়ক ঘুষি পাওয়ার কথা বলেন, যাকে তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না। সেই আঘাতকারীই তাঁকে কাপড় বাঁধতে বলে। এরপর তিনি নির্দেশ মেনে আবার কাপড় পরেন। [38]
وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم – فيما ذكر لي – يحدث عما كان الله يحفظه به في صغره وأمر جاهليته ، أنه قال : لقد رأيتني في غلمان قريش ننقل حجارة لبعض ما يلعب به الغلمان ، كلنا قد تعرى ، وأخذ إزاره فجعله على رقبته ، يحمل عليه الحجارة ؛ فإني لأقبل معهم كذلك وأدبر ، إذ لكمني لاكم ما أراه ، لكمة وجيعة ، ثم قال : شد عليك إزارك ؛ قال : فأخذته وشددته علي ، ثم جعلت أحمل الحجارة على رقبتي وإزاري علي من بين أصحابي .
বাংলা অনুবাদ: ইবন ইসহাকের ভাষ্য: আমাকে যেমন জানানো হয়েছে, আল্লাহর রাসুল তাঁর শৈশব ও জাহেলি জীবনে আল্লাহ কীভাবে তাঁকে রক্ষা করতেন সে সম্পর্কে বলতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি কুরাইশের বালকদের সঙ্গে ছিলাম। বালকদের খেলার কোনো কাজের জন্য আমরা পাথর বহন করছিলাম। আমরা সবাই কাপড় খুলে কোমরের কাপড় ঘাড়ে রেখেছিলাম, তার ওপর পাথর বহন করছিলাম। আমি তাদের সঙ্গে এভাবে আসা-যাওয়া করছিলাম। তখন এমন একজন আমাকে একটি বেদনাদায়ক ঘুষি মারল, যাকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। তারপর সে বলল, তোমার কোমরের কাপড় বেঁধে নাও। আমি সেটি নিয়ে নিজের শরীরে বেঁধে নিলাম। এরপর সঙ্গীদের মধ্যে আমি কোমরে কাপড় রেখেই ঘাড়ে পাথর বহন করতে লাগলাম।’
আঘাতকারীকে দেখতে না-পাওয়া, ঘুষির ব্যথা এবং তার কাছ থেকে নির্দেশ শোনা—এই তিনটি তথ্য মুহাম্মদের নিজের অভিজ্ঞতা হিসেবে এসেছে। ঘটনাস্থলে অন্য বালক থাকার কথা বলা হয়েছে; তাদের কেউ একই আঘাতকারীকে দেখেছে বা নির্দেশ শুনেছে বলে এই বর্ণনায় জানায়নি। নির্দেশের পর মুহাম্মদের আচরণ বদলেছে: তিনি শরীর ঢেকেছেন এবং কাজ চালিয়ে গেছেন। অনুভূত আঘাত ও শোনা কথার ভিত্তিতে তাঁর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও কাজ পরিবর্তিত হওয়ার একটি বয়ান এটি।
ইবন ইসহাকের সূচনাবাক্য «فِيمَا ذُكِرَ لِي»—‘আমাকে যেমন জানানো হয়েছে’—বর্ণনাটির প্রাপ্তিসূত্রের পরিচয় দেয়। তিনি ঘটনাটি নিজের দেখা হিসেবে বলেননি। কাহিনিটিকে শুরুতেই আল্লাহর সুরক্ষার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে আঘাত ও নির্দেশের বিবরণের সঙ্গে দৈব সুরক্ষার ধর্মীয় অর্থও যুক্ত। অদেখা আঘাতকারী কীভাবে শনাক্ত হলো এবং তার কাজকে আল্লাহর সুরক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি কী, সেই প্রশ্নের স্বাধীন উত্তর ওই ভাষ্যে নেই।
এই কাহিনি এবং কাবা নির্মাণের সময় কাপড় খুলে অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা একই কি না, তা নিয়ে ধ্রুপদি ব্যাখ্যায় আলোচনা রয়েছে। সুহাইলী শৈশবের বিবরণটি সঠিক হলে দুটি পৃথক ঘটনা হওয়ার কথা বলেছেন। ইবন হাজার একই কাহিনির ভিন্ন উপস্থাপনার সম্ভাবনাও রেখেছেন। ফাতহুল বারিতে তাঁদের সম্পূর্ণ মন্তব্য হলো: [37]
قال السهيلي : إنما وردت هذه القصة في بنيان الكعبة ، فإن صح أن ذلك كان في صغره فهي قصة أخرى : مرة في الصغر ومرة في حال الاكتهال . قلت : وقد يطلق على الكبير غلام إذا فعل فعل الغلمان فلا يستحيل اتحاد القصة اعتمادا على التصريح بالأولية في حديث أبي الطفيل .
বাংলা অনুবাদ: সুহাইলী বলেছেন, এই কাহিনি তো কাবা নির্মাণের প্রসঙ্গেই এসেছে। এটি তাঁর শৈশবে ঘটেছিল বলে বর্ণনাটি সঠিক হলে তা হবে আরেকটি ঘটনা: একবার শৈশবে এবং আরেকবার পরিণত বয়সে। আমি [ইবন হাজার] বলি, বড় মানুষ বালকদের মতো কাজ করলে তাঁকেও ‘গুলাম’ বলা হতে পারে। তাই আবু তুফায়লের হাদিসে প্রথমবারের স্পষ্ট উল্লেখের ভিত্তিতে কাহিনিটি একই হওয়াও সম্ভব।
পাঠগুলোর বৈশিষ্ট্য পৃথক। জাবিরের বর্ণনায় কাবার জন্য পাথর বহন, আব্বাসের পরামর্শ, মাটিতে পড়ে যাওয়া ও চেতনা ফিরে পাওয়া রয়েছে। আবু তুফায়লের উদ্ধৃত পাঠে শরীর ঢাকার সম্বোধন আছে। ইবন ইসহাকের কাহিনিতে বালকদের সঙ্গে খেলার জন্য পাথর বহন, অদেখা কারও বেদনাদায়ক ঘুষি এবং নির্দেশ মেনে কাপড় বাঁধার কথা রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো থেকে সংরক্ষিত অভিজ্ঞতার ধরন স্পষ্ট হয়: একটি পাঠে চেতনাহানি, অন্যটিতে সম্বোধন, আর শেষটিতে অদেখা ব্যক্তির আঘাত ও কণ্ঠস্বর। ঘটনার সংখ্যা ও বয়স নিয়ে উৎসের ভেতরেই অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ওহির বিরতিতে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে পাহাড়ে যাওয়ার বর্ণনা
সহিহ বুখারির ওহির সূচনাসংক্রান্ত দীর্ঘ বর্ণনার একটি অংশে মুহাম্মদের তীব্র মানসিক সংকটের বিবরণ রয়েছে। সেখানে ওরাকার মৃত্যু ও ওহির বিরতির পর তাঁর গভীর দুঃখের কথা বলা হয়েছে। এই অবস্থায় তিনি নিজেকে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে একাধিকবার পাহাড়ে যান। প্রতিবার জিবরাইল আবির্ভূত হয়ে তাঁর নবুয়তের সত্যতা সম্পর্কে আশ্বাস দিলে তিনি শান্ত হয়ে ফিরে আসেন। ওহির বিরতি দীর্ঘ হলে আবার একই উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা আছে। বর্ণনার ভাষায় আত্মবিনাশের ইচ্ছা, সেই উদ্দেশ্যে স্থানান্তর এবং আশ্বাস পেয়ে ফিরে আসার একটি পুনরাবৃত্ত ধারা ফুটে উঠেছে। [39]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৯১/ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা
তাওহীদ পাবলিকেশন
… এরপর কিছু দিনের মধ্যেই ওরাকার মৃত্যু হয়। আর কিছু দিনের জন্য ওয়াহীও বন্ধ থাকে। এমনকি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থার কারণে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি যে, তিনি পর্বতের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাবার জন্য একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছেন। যখনই নিজেকে ফেলে দেয়ার জন্য পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিবরীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন, হে মুহাম্মাদ! নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তাঁর অস্থিরতা দূর হত এবং নিজ মনে শান্তিবোধ করতেন। তাই সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওয়াহী বন্ধ অবস্থা যখন তাঁর উপর দীর্ঘ হত তখনই তিনি ঐরূপ উদ্দেশে দ্রুত চলে যেতেন। যখনই তিনি পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিবরীল (আঃ) তাঁর সামনে আত্মপ্রকাশ করে আগের মত বলতেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই অংশের আরবিতে রয়েছে «فِيمَا بَلَغَنَا»—‘আমাদের কাছে যে খবর পৌঁছেছে’। উদ্ধৃত বাংলা অনুবাদের ‘তার থেকে জানতে পেরেছি’ কথাটির ‘তার থেকে’ অংশটি ওই আরবি শব্দগুলোর মধ্যে নেই। ইবন হাজার এই বাক্যাংশের বক্তা হিসেবে যুহরিকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুসারে, যুহরি মুহাম্মদ সম্পর্কে নিজের কাছে পৌঁছানো খবর হিসেবে অংশটি যুক্ত করেছেন; এখানে সেই খবরের পূর্ণ বর্ণনাসূত্র দেওয়া হয়নি। ফলে বুখারিতে সংরক্ষিত মূল দীর্ঘ বর্ণনা এবং তার মধ্যে যুহরির প্রাপ্ত খবর হিসেবে উল্লিখিত অংশটির পরিচয় পৃথক। [40]
«ثم إن القائل “فيما بلغنا” هو الزهري، ومعنى الكلام: أن في جملة ما وصل إلينا من خبر رسول الله صلى الله عليه وسلم في هذه القصة. وهو من بلاغات الزهري وليس موصولًا، وقال الكرماني: هذا هو الظاهر.»
বাংলা অনুবাদ: ‘আমাদের কাছে যে খবর পৌঁছেছে’ কথাটির বক্তা হলেন যুহরি। বক্তব্যের অর্থ হলো, এই ঘটনায় আল্লাহর রাসুল সম্পর্কে আমাদের কাছে পৌঁছানো খবরগুলোর মধ্যে এটি রয়েছে। এটি যুহরির প্রাপ্ত খবরগুলোর অন্তর্ভুক্ত; এর বর্ণনাসূত্র সংযুক্ত নয়। কিরমানি বলেছেন, এটাই আপাত অর্থ।
যুহরির এই বিবরণে মুহাম্মদের মানসিক স্থিতি ওহির আগমন এবং নিজের নবুয়ত সম্পর্কে আশ্বাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ওহি বন্ধ হলে দুঃখ বাড়ছে; জিবরাইলের উপস্থিতি ও ‘তুমি সত্যিই আল্লাহর রাসুল’ ঘোষণায় অস্থিরতা কমছে। সান্ত্বনার বিষয়বস্তু এখানে সাধারণভাবে বিপদ কেটে যাওয়ার আশ্বাস নয়, তাঁর বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের নিশ্চয়তা। বর্ণনাটিতে আত্মপরিচয়, প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার অনুপস্থিতি এবং আবেগের তীব্র প্রতিক্রিয়া একই কাঠামোর মধ্যে রয়েছে। নিজের নির্বাচিত হওয়ার নিশ্চয়তা তাঁর শান্তি ফেরার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
আত্মবিনাশের ইচ্ছার ক্ষেত্রে কথার সঙ্গে আচরণের সম্পর্কও এখানে স্পষ্ট। আরবির «غَدَا مِنْهُ مِرَارًا كَيْ يَتَرَدَّى» অংশে সেই উদ্দেশ্যে বারবার যাওয়ার কথা রয়েছে; পরের বাক্যে নিজেকে ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্য আবার বলা হয়েছে। বর্ণিত সংকট তাই শুধু মন খারাপের সাধারণ মন্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কষ্ট এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর ছবি দেওয়া হয়েছে, যেখানে নিজের জীবন শেষ করার উদ্দেশ্যে তিনি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছেন। আবার প্রতিবার আশ্বাস পেয়ে ফিরে আসার কথাও আছে। এই ধারাবাহিকতায় আত্মহত্যার উদ্দেশ্য ও সেই উদ্দেশ্যে এগোনোর বিবরণ রয়েছে; বাস্তবে ঝাঁপিয়ে পড়ার বিবরণ নেই।
| বর্ণনার ধাপ | সংরক্ষিত তথ্য | মানসিক তাৎপর্য |
|---|---|---|
| ওহির বিরতি | প্রত্যাশিত যোগাযোগ কিছু সময় বন্ধ থাকে। | বিশেষ অভিজ্ঞতার অনুপস্থিতি মানসিক সংকটের সূচনার সঙ্গে যুক্ত। |
| তীব্র দুঃখ | বর্ণনায় গভীর দুঃখ ও অস্থিরতার কথা আছে। | অপেক্ষার সঙ্গে আবেগগত বিপর্যয়ের সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। |
| আত্মবিনাশের উদ্দেশ্য | নিজেকে ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বারবার পাহাড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। | মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা আচরণগত পদক্ষেপে রূপ নেওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। |
| নবুয়তের আশ্বাস | জিবরাইল তাঁকে সত্যিকার রাসুল বলে সম্বোধন করেন। | নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের নিশ্চয়তা শান্তি ফেরার কারণ হিসেবে উপস্থাপিত। |
| শান্ত হওয়া ও ফিরে আসা | অস্থিরতা কমে; পরে বিরতি দীর্ঘ হলে একই ধারা আবার ঘটে। | আশ্বাসে সাময়িক স্থিতি এবং প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার ওপর আবেগগত নির্ভরতা ফুটে ওঠে। |
ওহির অনুপস্থিতিতে এই সংকট এবং জিবরাইলের আবির্ভাবে তার অবসান একই বর্ণনার দুটি সংযুক্ত দিক। প্রথমটি মানসিক কষ্টের বিবরণ, দ্বিতীয়টি সেই কষ্টের ধর্মীয় সমাধান। এই সমাধানে মুহাম্মদের অনুভূত অভিজ্ঞতাই আবার তাঁর নির্বাচিত হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। আশ্বাসের পর শান্ত হওয়া থেকে বোঝা যায়, কথাটি তাঁর আবেগে প্রভাব ফেলেছে। কথাটির উৎস সত্যিই কোনো ফেরেশতা ছিল কি না, সেটি আলাদা ঐতিহাসিক দাবি। মানসিক সান্ত্বনা পাওয়া এবং সান্ত্বনাদাতার অতিপ্রাকৃত পরিচয় প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
এই বিবরণে নবুয়ত সম্পর্কে আশ্বাসের প্রয়োজন তাঁর জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। যোগাযোগের বিরতিতে দুঃখ, সেই দুঃখ থেকে জীবন শেষ করার উদ্দেশ্যে এগোনো এবং নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের নিশ্চয়তায় শান্তি ফিরে পাওয়া—এটি গুরুতর আবেগগত সংকটের বয়ান। মুহাম্মদের নবুয়তের সূচনা নিয়ে সংরক্ষিত ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরেই এই আত্মবিনাশী সংকটের স্থান রয়েছে। সংকটটির কারণ ও তা থেকে উত্তরণের ঘটনাপ্রবাহ তাঁর মানসিক অবস্থার প্রশ্নকে সরাসরি সামনে আনে।
ঘুম থেকে উঠে ইয়াজুজ-মাজুজের বিপদে আতঙ্কিত হওয়ার বর্ণনা
জয়নব বিনতে জাহশের বর্ণনায় মুহাম্মদের ঘুম থেকে উঠে রক্তিম মুখে আসন্ন বিপদের ঘোষণা দেওয়ার একটি ঘটনা রয়েছে। তিনি বারবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেন এবং আরবদের জন্য ঘনিয়ে আসা দুর্যোগের কথা ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য, সেদিন ইয়াজুজ-মাজুজের বাধায় একটি ফাঁক হয়েছে। হাতের ইশারায় তিনি ফাঁকের আকারও দেখান। ব্যক্তিগতভাবে ঘুম থেকে ওঠার মুহূর্তের সঙ্গে দূরের একটি বাধার পরিবর্তন এবং সমগ্র আরবদের বিপদের ঘোষণা যুক্ত হয়েছে। [41]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
পরিচ্ছেদঃ ২৩. ইয়াজুজ ও মাজুজের আত্মপ্রকাশ
২১৮৭। যাইনাব বিনতু জাহশ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কোন একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম হতে জাগ্রত হলেন, তখন তার মুখমণ্ডল রক্তিমবর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে লাগলেন। তা তিনবার বলার পর তিনি বললেনঃ ঘনিয়ে আসা দুর্যোগে আরবদের দুর্ভাগ্য। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এতটুকু পরিমাণ ফাক হয়ে গেছে। এই বলে তিনি তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে দশ সংখ্যার বৃত্ত করে ইঙ্গিত করেন। যাইনাব (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আমাদের মধ্যে সৎ লোক থাকাবস্থায়ও কি আমরা হবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, যখন পাপাচারের বিস্তার ঘটবে।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (৩৯৫৩), বুখারী, মুসলিম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ)
বুখারির পাঠে একই ঘটনার আবেগগত দিকটি সরাসরি বলা হয়েছে: মুহাম্মদ জয়নবের কাছে «فَزِعًا»—আতঙ্কিত অবস্থায় প্রবেশ করেন। তিরমিজির পাঠে ঘুম থেকে ওঠা ও রক্তিম মুখের কথা আছে; মুসলিমের পাঠেও ঘুম থেকে ওঠার উল্লেখ রয়েছে। এই পাঠগুলোতে জাগরণের অবস্থা, মুখের পরিবর্তন এবং বিপদের ঘোষণার ভিন্ন দিক সংরক্ষিত হয়েছে। ঘুমের মধ্যে ঠিক কী দৃশ্য দেখেছিলেন, তার পৃথক বিবরণ এখানে নেই। প্রত্যক্ষভাবে বর্ণিত ঘটনা হলো, তিনি ঘুম থেকে ওঠার পর বিপদ সম্পর্কে কথা বলছেন এবং অন্য পাঠে তাঁকে আতঙ্কিত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। [42] [43]
عَنْ زَيْنَبَ ابْنَةِ جَحْشٍ ـ رضى الله عنهن أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ عَلَيْهَا فَزِعًا يَقُولُ ” لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ ”. وَحَلَّقَ بِإِصْبَعِهِ الإِبْهَامِ وَالَّتِي تَلِيهَا. قَالَتْ زَيْنَبُ ابْنَةُ جَحْشٍ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَهْلِكُ وَفِينَا الصَّالِحُونَ قَالَ ” نَعَمْ، إِذَا كَثُرَ الْخُبْثُ ”.
বাংলা অনুবাদ: জয়নব বিনতে জাহশ থেকে বর্ণিত, নবী তাঁর কাছে আতঙ্কিত অবস্থায় এসে বলছিলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। ঘনিয়ে আসা অনিষ্টের কারণে আরবদের দুর্ভোগ! আজ ইয়াজুজ-মাজুজের বাধা থেকে এই পরিমাণ খুলে গেছে।’ তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তার পাশের আঙুল দিয়ে বৃত্ত তৈরি করলেন। জয়নব বিনতে জাহশ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের মধ্যে সৎ মানুষ থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হব?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, যখন অনাচার বেড়ে যাবে।’
ঘুম থেকে উঠে ভয় পাওয়া মানুষের পরিচিত মানসিক অভিজ্ঞতা। দুঃস্বপ্নে ভয়ংকর দৃশ্য দেখা এবং জেগে তার স্মৃতি থাকা সম্ভব। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা দুঃস্বপ্নের সংজ্ঞায় জেগে ওঠা ও স্বপ্ন মনে থাকার বিষয় দুটো উল্লেখ করেছে। মুহাম্মদের ঘটনাটিতে জাগরণের সঙ্গে আতঙ্কের সম্পর্ক প্রশ্ন তোলার উপাদান দেয়; স্বপ্নের নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু বর্ণিত না থাকায় সংরক্ষিত তথ্যের কেন্দ্র থাকে তাঁর জাগরণের পরের প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্যে। [44]
Nightmares are bad dreams you wake up from and can remember.
বাংলা অনুবাদ: দুঃস্বপ্ন হলো খারাপ স্বপ্ন, যা দেখে ঘুম ভেঙে যায় এবং যা মনে থাকে।
মুহাম্মদের ঘোষণার বিষয়টি একটি ভৌত বাধা। কোরআনের কাহিনিতে জুলকারনাইন ইয়াজুজ-মাজুজকে ঠেকাতে দুই পাহাড়ের মাঝখানে লোহা ও গলিত ধাতু ব্যবহার করে বাধা নির্মাণ করেন। পরের আয়াতে বলা হয়, তারা সেই বাধা অতিক্রম বা ছিদ্র করতে পারেনি। বাধাটি ভেঙে দেওয়াকে আবার আল্লাহর ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কাহিনির দাবিগুলো বাস্তব ভূগোল, নির্মাণসামগ্রী ও একটি জনগোষ্ঠীর চলাচল সম্পর্কে। এগুলো নিছক মুহাম্মদের ব্যক্তিগত অনুভূতির বিবরণ নয়। [45]
فَمَا اسْطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا قَالَ هَٰذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِّي ۖ فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ ۖ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا
বাংলা অনুবাদ: তারা সেটি অতিক্রম করতে পারল না এবং তাতে ছিদ্রও করতে পারল না। তিনি বললেন, ‘এটি আমার রবের অনুগ্রহ। আমার রবের প্রতিশ্রুত সময় এলে তিনি একে সমতল করে দেবেন। আমার রবের প্রতিশ্রুতি সত্য।’
ঘুম থেকে ওঠার পর ‘আজ’ সেই বাধায় ফাঁক হয়েছে বলা বাইরের জগতের একটি নির্দিষ্ট ঘটনার দাবি। অথচ জয়নবের বর্ণনায় প্রাচীর পরিদর্শন, ফাঁক মাপা কিংবা কোনো পর্যবেক্ষকের প্রতিবেদন আসার কথা নেই। তাঁরা শুনছেন মুহাম্মদের ঘোষণা এবং দেখছেন তাঁর হাতের ইশারা। ইশারাটি বক্তব্যের অংশ; দেয়ালের বাস্তব পরিমাপ নয়। মুখ লাল হয়ে ওঠা ও আতঙ্কিত থাকা থেকে তাঁর আবেগের তীব্রতা জানা যায়, দূরের কোনো দেয়ালের অবস্থা জানা যায় না। দাবির ভৌত বিষয়বস্তু ও দাবিদাতার আবেগকে এক করে দিলে ভয় নিজেই বাইরের বিপদের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
| বর্ণনার উপাদান | তার প্রকৃতি | যে প্রশ্নটি ওঠে |
|---|---|---|
| ঘুম থেকে ওঠা | তিরমিজি ও মুসলিমের পাঠে সংরক্ষিত পরিস্থিতি। | জাগরণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরবর্তী আতঙ্কের সম্পর্ক কী? |
| রক্তিম মুখ ও আতঙ্ক | মুখের দৃশ্যমান পরিবর্তন এবং বর্ণিত আবেগ। | এই প্রতিক্রিয়ার শারীরিক ও মানসিক কারণ কী? |
| বাধায় ফাঁক হওয়ার ঘোষণা | দূরের একটি ভৌত স্থাপনা সম্পর্কে তথ্যের দাবি। | তথ্যটি কীভাবে জানা হলো এবং স্বাধীনভাবে কীভাবে যাচাই করা হয়েছে? |
| আঙুল দিয়ে আকার দেখানো | বক্তার দেওয়া দৃশ্যমান ইঙ্গিত। | ইঙ্গিতের সঙ্গে বাস্তব ফাঁকের পরিমাপের যোগসূত্র কোথায়? |
| সৎ মানুষসহ ধ্বংসের কথা | আসন্ন বিপদকে সমষ্টিগত নৈতিক পরিণতির সঙ্গে যুক্ত করা। | ব্যক্তিগত নৈতিক দায়ের বদলে নির্বিচার বিপর্যয়ের ন্যায়সংগত ভিত্তি কী? |
জয়নবের প্রশ্নে ঘোষণাটির সামাজিক প্রভাবও প্রকাশ পেয়েছে। তিনি জানতে চান, সৎ মানুষ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ধ্বংস হবেন কি না। মুহাম্মদ উত্তর দেন, অনাচার বেড়ে গেলে হবেন। ব্যক্তিগত আতঙ্কের বিবরণ এভাবে পুরো সমাজের ধ্বংস এবং নৈতিক অপরাধের ঘোষণায় রূপ নিয়েছে। দুর্যোগের কারণ হিসেবে অনাচারকে হাজির করা হচ্ছে, আর সৎ মানুষের উপস্থিতিও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এই নৈতিক কাঠামোয় অন্যের আচরণের পরিণতিতে নিরপরাধ মানুষকেও ধ্বংসের অংশীদার করা হয়। ব্যক্তির নিজস্ব কাজের দায়ের জায়গায় সমষ্টিগত শাস্তি প্রতিষ্ঠা পায়।
মেঘ-বাতাসে অস্থিরতা, শাস্তির আশঙ্কা ও বৃষ্টিতে স্বস্তি
আয়িশার বর্ণনায় মুহাম্মদের অস্থিরতা শুধু ঘুম থেকে ওঠার মুহূর্তে সীমাবদ্ধ নয়। মেঘ ও বাতাস দেখলেও তাঁর মুখে পরিবর্তন আসত, তিনি এদিক-ওদিক চলাফেরা করতেন এবং বৃষ্টি শুরু হলে শান্ত হতেন। আয়িশা কারণ জানতে চাইলে তিনি উম্মতের ওপর শাস্তি নেমে আসার আশঙ্কার কথা বলেন। এখানে বাইরের একটি দৃশ্য, তার সঙ্গে যুক্ত ভয়, দেহ ও আচরণের পরিবর্তন এবং পরে স্বস্তি ফিরে পাওয়ার ধারাবাহিকতা রয়েছে। [46]
عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ، أَنَّهُ سَمِعَ عَائِشَةَ، زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم تَقُولُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا كَانَ يَوْمُ الرِّيحِ وَالْغَيْمِ عُرِفَ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ أَقْبَلَ وَأَدْبَرَ فَإِذَا مَطَرَتْ سُرَّ بِهِ وَذَهَبَ عَنْهُ ذَلِكَ. قَالَتْ عَائِشَةُ فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ «إِنِّي خَشِيتُ أَنْ يَكُونَ عَذَابًا سُلِّطَ عَلَى أُمَّتِي». وَيَقُولُ إِذَا رَأَى الْمَطَرَ «رَحْمَةٌ».
বাংলা অনুবাদ: আতা ইবন আবি রাবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি নবীর স্ত্রী আয়িশাকে বলতে শুনেছেন, বাতাস ও মেঘের দিন হলে আল্লাহর রাসুলের মুখে তার প্রভাব বোঝা যেত। তিনি এদিক-ওদিক চলাফেরা করতেন। বৃষ্টি হলে তিনি আনন্দিত হতেন এবং তাঁর সেই অবস্থা দূর হতো। আয়িশা বলেন, আমি তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘আমি আশঙ্কা করেছিলাম, এটি আমার উম্মতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শাস্তি হতে পারে।’ আর বৃষ্টি দেখলে তিনি বলতেন, ‘রহমত।’
মুসলিমের বিস্তারিত পাঠে মুখের রঙ বদল এবং বারবার বাইরে যাওয়া ও ভেতরে আসার কথা রয়েছে। বৃষ্টি হলে মুখে স্বস্তি ফিরে আসত। একই পাঠে মুহাম্মদ নিজের আশঙ্কাকে আদ জাতির শাস্তির কাহিনির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বাতাস সম্পর্কে তাঁর প্রার্থনাসহ পূর্ণ বর্ণনাটি হলো: [47]
عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ عَنْ عَائِشَةَ، زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا عَصَفَتِ الرِّيحُ قَالَ «اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ». قَالَتْ وَإِذَا تَخَيَّلَتِ السَّمَاءُ تَغَيَّرَ لَوْنُهُ وَخَرَجَ وَدَخَلَ وَأَقْبَلَ وَأَدْبَرَ فَإِذَا مَطَرَتْ سُرِّيَ عَنْهُ فَعَرَفْتُ ذَلِكَ فِي وَجْهِهِ. قَالَتْ عَائِشَةُ فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ «لَعَلَّهُ يَا عَائِشَةُ كَمَا قَالَ قَوْمُ عَادٍ {فَلَمَّا رَأَوْهُ عَارِضًا مُسْتَقْبِلَ أَوْدِيَتِهِمْ قَالُوا هَذَا عَارِضٌ مُمْطِرُنَا}».
বাংলা অনুবাদ: আতা ইবন আবি রাবাহ নবীর স্ত্রী আয়িশা থেকে বর্ণনা করেন, প্রবল বাতাস বইলে নবী বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে এর কল্যাণ, এর মধ্যে থাকা কল্যাণ এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার কল্যাণ চাই। আর তোমার কাছে আশ্রয় চাই এর অনিষ্ট, এর মধ্যে থাকা অনিষ্ট এবং যে উদ্দেশ্যে একে পাঠানো হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে।’ আয়িশা বলেন, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে তাঁর রঙ পরিবর্তিত হতো। তিনি বাইরে যেতেন, ভেতরে আসতেন এবং এদিক-ওদিক চলাফেরা করতেন। বৃষ্টি হলে তাঁর অস্বস্তি দূর হতো; তাঁর মুখ দেখে আমি তা বুঝতে পারতাম। আয়িশা বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘আয়িশা, হয়তো তা আদ জাতির কথার মতো: তারা যখন নিজেদের উপত্যকার দিকে আসা মেঘ দেখল, বলল, এই মেঘ আমাদের বৃষ্টি দেবে।’
এই প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ধর্মীয় কাহিনির সংযোগ মুহাম্মদ নিজেই জানিয়েছেন। দৃশ্যমান মেঘ তাঁর কাছে উম্মতের ওপর অদৃশ্য শাস্তির সম্ভাবনা তৈরি করছে। অন্য মানুষের বৃষ্টির প্রত্যাশার সঙ্গে তাঁর প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য আয়িশাও লক্ষ করেছেন। বুখারির পাঠে তাঁর প্রশ্ন ও মুহাম্মদের উত্তর পাশাপাশি সংরক্ষিত। [48]
عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَتْ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ضَاحِكًا حَتَّى أَرَى مِنْهُ لَهَوَاتِهِ، إِنَّمَا كَانَ يَتَبَسَّمُ. قَالَتْ وَكَانَ إِذَا رَأَى غَيْمًا أَوْ رِيحًا عُرِفَ فِي وَجْهِهِ. قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الْغَيْمَ فَرِحُوا، رَجَاءَ أَنْ يَكُونَ فِيهِ الْمَطَرُ، وَأَرَاكَ إِذَا رَأَيْتَهُ عُرِفَ فِي وَجْهِكَ الْكَرَاهِيَةُ. فَقَالَ «يَا عَائِشَةُ مَا يُؤْمِنِّي أَنْ يَكُونَ فِيهِ عَذَابٌ عُذِّبَ قَوْمٌ بِالرِّيحِ، وَقَدْ رَأَى قَوْمٌ الْعَذَابَ فَقَالُوا {هَذَا عَارِضٌ مُمْطِرُنَا}».
বাংলা অনুবাদ: নবীর স্ত্রী আয়িশা বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে এমনভাবে হাসতে দেখিনি যাতে তাঁর আলজিভ দেখা যায়; তিনি মৃদু হাসতেন। তিনি মেঘ বা বাতাস দেখলে তাঁর মুখে তার প্রভাব বোঝা যেত। আয়িশা বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, মানুষ মেঘ দেখলে বৃষ্টির আশায় আনন্দিত হয়। অথচ আপনাকে দেখি, তা দেখলে আপনার মুখে অস্বস্তির চিহ্ন প্রকাশ পায়।’ তিনি বললেন, ‘আয়িশা, এর মধ্যে শাস্তি নেই বলে কে আমাকে নিশ্চয়তা দেবে? একটি জাতিকে বাতাস দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। একটি জাতি শাস্তি দেখে বলেছিল, এই মেঘ আমাদের বৃষ্টি দেবে।’
আয়িশার প্রশ্নে মেঘ দেখার দুটি পৃথক অর্থ সামনে আসে: অন্যদের কাছে প্রত্যাশিত বৃষ্টি, মুহাম্মদের কাছে সম্ভাব্য শাস্তি। তাঁর নিজের উত্তর অনুযায়ী ভয়টির বিষয় ছিল আল্লাহর আযাব। সেই ভয় মুখের অভিব্যক্তি, রঙ ও চলাফেরায় প্রকাশ পাচ্ছিল। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁর আবেগের ব্যাখ্যা এবং আচরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একটি প্রাকৃতিক দৃশ্যকে সমষ্টিগত শাস্তির সংকেত হিসেবে ভাবার ফলে তাঁর নিজের মধ্যেই অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল।
| পর্যবেক্ষণের বিষয় | বর্ণনায় পাওয়া তথ্য |
|---|---|
| বাহ্যিক পরিস্থিতি | মেঘ দেখা ও বাতাস বওয়া। |
| দেহের পরিবর্তন | মুখে অবস্থার প্রকাশ; মুসলিমের বিস্তারিত পাঠে রঙ বদলের উল্লেখ। |
| আচরণ | বাইরে যাওয়া, ভেতরে আসা এবং এদিক-ওদিক চলাফেরা। |
| নিজের ব্যাখ্যা | উম্মতের ওপর শাস্তি নেমে আসার আশঙ্কা; আদ জাতির কাহিনির সঙ্গে তুলনা। |
| পরিস্থিতির পরিবর্তন | বৃষ্টি শুরু হলে অস্বস্তি দূর হওয়া ও আনন্দিত হওয়া। |
| বর্ণনার ধরন | আয়িশার ভাষায় মেঘ-বাতাসের সময়ে তাঁর প্রতিক্রিয়ার সাধারণ বিবরণ; নির্দিষ্ট তারিখ ও ঘটনার সংখ্যা দেওয়া হয়নি। |
বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে তাঁর অস্বস্তি কমার সম্পর্কটিও নির্দিষ্ট। যে মেঘের মধ্যে তিনি শাস্তির সম্ভাবনা দেখছিলেন, তা বৃষ্টি দিলে আনন্দিত হতেন এবং ‘রহমত’ বলতেন। একই আবহাওয়াগত পরিস্থিতির অর্থ তাঁর কাছে আশঙ্কা থেকে আশ্বাসে বদলে যাচ্ছে; তার সঙ্গে বদলাচ্ছে দৃশ্যমান আবেগ। ইয়াজুজ-মাজুজের বাধা নিয়ে ঘুম থেকে উঠে বিপদের ঘোষণা এবং মেঘ-বাতাস দেখে শাস্তির আশঙ্কা—দুই বর্ণনাতেই সমষ্টিগত বিপদের ধর্মীয় ধারণা তাঁর ব্যক্তিগত ভয়ের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
বাস্তবে না-করা কাজ করেছেন বলে মনে হওয়া
আয়িশার নামে সংরক্ষিত একটি বর্ণনায় মুহাম্মদের নিজের কাজ সম্পর্কে বিভ্রান্ত হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তাঁর মনে হতো, তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে যৌনমিলন করেছেন; বাস্তবে তা করেননি। বুখারির অন্য পাঠে আরও সাধারণ ভাষায় এসেছে, তাঁর মনে হতো তিনি কোনো কাজ করছেন, অথচ তা করেননি। এই বিবরণে অনুভূত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব ঘটনার মধ্যে সরাসরি অমিল রয়েছে। নিজের শরীর দিয়ে কী করেছেন, সেই অভিজ্ঞতার সত্যতা সম্পর্কেই বিভ্রান্তি ঘটছে। হাদিসে এই অবস্থার কারণ হিসেবে জাদুকে উপস্থাপন করা হয়েছে। [49] [50] [51]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/৪৯. যাদুর চিকিৎসা করা যাবে কি না?
ক্বাতাদাহ (রহ.) বলেন, আমি সা‘ঈদ ইবনু মুসায়্যিব (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ জনৈক ব্যক্তিকে যাদু করা হয়েছে অথবা যাদু ক’রে) তার ও তার স্ত্রীর মধ্যে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, এমন ব্যক্তিকে যাদু মুক্ত করা যায় কিনা অথবা তার থেকে যাদুর বন্ধন খুলে দেয়া বৈধ কিনা? সা‘ঈদ বললেনঃ এতে কোন ক্ষতি নেই। কেননা, তারা এর দ্বারা তাকে ভাল করতে চাইছে। আর যা কল্যাণকর তা নিষিদ্ধ নয়।
৫৭৬৫. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর একবার যাদু করা হয়। এমন অবস্থা হয় যে, তাঁর মনে হতো তিনি বিবিগণের কাছে এসেছেন, অথচ তিনি আদৌ তাঁদের কাছে আসেননি। সুফ্ইয়ান বলেনঃ এ অবস্থা যাদুর চরম প্রতিক্রিয়া। বর্ণনাকারী বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠেন এবং বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! তুমি জেনে নাও যে, আমি আল্লাহর কাছে যে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি আমাকে তা বলে দিয়েছেন। স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দু’জন লোক এলেন। তাদের একজন আমার মাথার কাছে এবং আরেকজন আমার পায়ের নিকট বসলেন। আমার কাছের লোকটি অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এ লোকটির কী অবস্থা? দ্বিতীয় লোকটি বললেনঃ একে যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন বললেনঃ কে যাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বললেনঃ লাবীদ ইবনু আ‘সাম। এ ইয়াহূদীদের মিত্র যুরায়ক্ব গোত্রের একজন, সে ছিল মুনাফিক।
প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ কিসের মধ্যে যাদু করা হয়েছে? দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তর দিলেনঃ চিরুনী ও চিরুনী করার সময় উঠে যাওয়া চুলের মধ্যে। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ সেগুলো কোথায়? উত্তরে দ্বিতীয়জন বললেনঃ পুং খেজুর গাছের জুবের মধ্যে রেখে ‘যারওয়ান’ কূপের ভিতর পাথরের নীচে রাখা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কূপের নিকট এসে সেগুলো বের করেন এবং বলেনঃ এইটিই সে কূপ, যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। এর পানি মেহদী মিশ্রিত পানির তলানীর মত, আর এ কূপের পার্শ্ববর্তী) খেজুর গাছের মাথাগুলো দেখতে) শয়তানের মাথার ন্যায়। বর্ণনাকারী বলেনঃ সেগুলো তিনি সেখান থেকে বের করেন। ‘আয়িশাহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি কি এ কথা প্রকাশ করে দিবেন না? তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে আরোগ্য দান করেছেন; আর আমি মানুষকে এমন বিষয়ে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে। (৩১৭৫; মুসলিম ৩৯/১৭, হাঃ ২১৮৯, আহমাদ ২৪৩৫৪) (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৪৪, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২৪০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
আল-লুলু ওয়াল মারজান
৩৯/ সালাম
পরিচ্ছেদঃ ৩৯/১৭. যাদু।
১৪১২. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর একবার যাদু করা হয়। এমন অবস্থা হয় যে, তাঁর মনে হতে তিনি বিবিগণের কাছে এসেছেন, অথচ তিনি আদৌ তাদের কাছে আসেননি। সুফইয়ান বলেন, এ অবস্থা খুব যাদুর চরম প্রতিক্রিয়া। বৰ্ণনাকারী বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠেন এবং বলেনঃ হে আয়িশা! তুমি অবগত হও যে, আমি আল্লাহর কাছে যে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি আমাকে তা বাতলিয়ে দিয়েছেন। (স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দু’জন লোক এলেন। তাদের একজন আমার মাথার নিকট এবং অন্যজন আমার পায়ের নিকট বসলেন। আমার কাছের লোকটি অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ এ লোকটির কী অবস্থা? দ্বিতীয় লোকটি বললেনঃ একে যাদু করা হয়েছে। প্রথম জন বললেনঃ কে যাদু করেছে? দ্বিতীয় জন বললেনঃ লবীদ ইবনু আসাম। এ ইয়াহুদীদের মিত্র সুরাইক গোত্রের একজন; সে ছিল মুনাফিক।
প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন। কিসের মধ্যে যাদু করা হয়েছে? দ্বিতীয় ব্যক্তি উত্তর দিলেন চিরুনী ও চিরুনী করার সময় উঠে যাওয়া চুলের মধ্যে। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেনঃ সেগুলো কোথায়? উত্তরে দ্বিতীয়জন বললেনঃ পুং খেজুর গাছের জুবের মধ্যে রেখে যারওয়ান নামক কূপের ভিতর পাথরের নীচে রাখা আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কূপের নিকট এসে সেগুলো বের করেন এবং বলেনঃ এইটিই সে কূপ, যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। এর পানি মেহদী মিশ্রিত পানির তলানীর ন্যায়, আর এ কূপের (পার্শবর্তী) খেজুর গাছের মাথাগুলো (দেখতে) শয়তানের মাথার ন্যায়। বর্ণনাকারী বলেনঃ সেগুলো তিনি সেখান থেকে বের করেন। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এ কথা প্রচার করে দিবেন না? তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে শিক্ষা দান করেছেন; আর আমি মানুষকে এমন ব্যাপারে প্ররোচিত করতে পছন্দ করি না, যাতে অকল্যাণ রয়েছে।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৭৬ : চিকিৎসা, অধ্যায় ৪৯, হাঃ ৫৭৬৫; মুসলিম, পর্ব ৩৯ : সালাম, অধ্যায় ১৭, হাঃ ২১৮৯
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
এখানে স্ত্রীদের ‘কাছে আসা’ কথাটি যৌনমিলন বোঝাচ্ছে। বুখারি ৫৭৬৫-এর আরবিতে রয়েছে «كَانَ يَرَى أَنَّهُ يَأْتِي النِّسَاءَ وَلاَ يَأْتِيهِنَّ»। একই ঘটনার ৫৭৬৩ নম্বর পাঠে রয়েছে «يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ يَفْعَلُ الشَّيْءَ وَمَا فَعَلَهُ»—তাঁর মনে হতো তিনি কাজটি করছেন, অথচ তিনি তা করেননি। নির্দিষ্ট পাঠটি যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলছে; সাধারণ পাঠটি করা ও না-করার বিভ্রম প্রকাশ করছে। তাঁর দৈনন্দিন উপলব্ধির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ভিত্তি এই ভাষার মধ্যেই রয়েছে।
এই অমিলকে শুধু কোনো তথ্য ভুলে যাওয়ার সঙ্গে এক করে দেখলে বর্ণনার প্রকৃত সমস্যাটি আড়ালে পড়ে। এখানে জানা তথ্য মনে করতে না-পারার চেয়ে নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ভুল ধারণা হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। মুহাম্মদের কাছে ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হওয়া এবং বাস্তবে ঘটা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে কোনো অনুভবের তীব্রতা কিংবা অভিজ্ঞতাটিকে সত্য বলে মনে হওয়া থেকে তার বাহ্যিক সত্যতা অনুসরণ করে না। এই বর্ণনায় সেই ব্যবধান তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত জীবনেই উপস্থিত।
জাদুর ব্যাখ্যাটি এসেছে মুহাম্মদ বর্ণিত দুজন পুরুষের কথোপকথনের মাধ্যমে। তাঁরা রোগের নাম, অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয়, ব্যবহৃত উপকরণ এবং সেগুলোর অবস্থান জানান। এরপর কূপে যাওয়ার কথা আছে; বুখারি ৫৭৬৩-এর পাঠে তাঁর সঙ্গে সাহাবিদের যাওয়ার উল্লেখও রয়েছে। কূপ, চিরুনি বা চুলের মতো বস্তু পাওয়া এবং সেই বস্তু দূর থেকে একজন মানুষের উপলব্ধি বদলে দিয়েছে—এই দুটি দাবির প্রমাণ আলাদা। কোনো উপকরণের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়; সেটি কী প্রক্রিয়ায় চিন্তা ও অভিজ্ঞতার বিভ্রম ঘটাল, তা প্রতিষ্ঠা করতে কারণগত সাক্ষ্য প্রয়োজন। ঘটনাগুলো পরপর ঘটেছে বলেই চিরুনি বা চুলের জাদুকরী ক্ষমতা প্রমাণিত হয় না।
ধ্রুপদি ব্যাখ্যাকারীরা এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নবুয়তের নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্নটি সরাসরি যুক্ত করেছেন। কাজি ইয়াজের ব্যাখ্যায় দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবতাহীন কিছু অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা স্বীকার করা হয়েছে, আর ধর্মপ্রচারের ক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসমত ও ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে। ইসলামকিউএতে তাঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত রয়েছে। [52]
«وأما ما ورد أنه كان يخيل إليه أنه فعل الشيء ولا يفعله، فليس في هذا ما يدخل عليه داخلة في شيء من تبليغه أو شريعته، أو يقدح في صدقه لقيام الدليل، والإجماع على عصمته من هذا، وإنما هذا فيما يجوز طروه عليه في أمر دنياه التي لم يبعث بسببها، ولا فضّل من أجلها، وهو فيها عرضة للآفات كسائر البشر، فغير بعيد أن يخيل إليه من أمورها مالا حقيقة له، ثم ينجلي عنه كما كان.»
বাংলা অনুবাদ: তাঁর মনে হতো তিনি কোনো কাজ করেছেন, অথচ করেননি—এই বর্ণনার কারণে তাঁর প্রচারিত বার্তা বা শরিয়তে ত্রুটি আসে না, কিংবা তাঁর সত্যবাদিতা ক্ষুণ্ন হয় না; কারণ এর পক্ষে দলিল প্রতিষ্ঠিত এবং এ থেকে তাঁর সুরক্ষিত থাকার বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। এটি তাঁর পার্থিব বিষয়সংক্রান্ত, যার জন্য তাঁকে পাঠানো হয়নি কিংবা বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এসব বিষয়ে তিনি অন্য মানুষের মতোই বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন। ফলে পার্থিব কোনো বিষয়ে বাস্তবতাহীন কিছু তাঁর মনে প্রতীয়মান হওয়া এবং পরে তা কেটে যাওয়া অসম্ভব নয়।
এই ব্যাখ্যায় ধর্মীয় বার্তার সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত ভিত্তি হলো নবুয়ত সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত বলে গ্রহণ করা দলিল এবং ধর্মীয় ঐকমত্য। উদ্ধৃত বক্তব্যে পার্থিব অভিজ্ঞতার বিভ্রম স্বীকার করেই ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে তার বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু মানসিক অভিজ্ঞতার সত্যতা যাচাইয়ের প্রশ্নে এই সীমারেখার স্বাধীন ভিত্তি প্রয়োজন। কোনো অনুভবকে ‘পার্থিব’ বা ‘ওহি’ নাম দেওয়াই সেই অনুভবের উৎস পরীক্ষা করে না। একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে বাস্তবতাহীন অভিজ্ঞতা সম্ভব বলে স্বীকার করার পর তাঁর অন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে নির্ভুল ঘোষণা করার জন্য কেবল ধর্মীয় মর্যাদার নিশ্চয়তা যথেষ্ট নয়।
নামাজের রাকাতে ভুল এবং নিজের ভুল অস্বীকার
নামাজে ভুল করার একটি বর্ণনায় মুহাম্মদ দুই রাকাত পড়েই সালাম ফেরান। প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ভুলিনি, নামাজও সংক্ষিপ্ত হয়নি।’ যুল-ইয়াদাইন তাঁকে সরাসরি বলেন, তিনি ভুলেছেন। এরপর মুহাম্মদ বাকি দুই রাকাত আদায় করেন। এখানে তাঁর নিজের কাজ সম্পর্কে দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্য ভুল ছিল; সংশোধনের সূত্র এসেছে উপস্থিত অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে। [53]
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ صَلَّى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِحْدَى صَلاَتَىِ الْعَشِيِّ ـ قَالَ مُحَمَّدٌ وَأَكْثَرُ ظَنِّي الْعَصْرَ ـ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ سَلَّمَ ثُمَّ قَامَ إِلَى خَشَبَةٍ فِي مُقَدَّمِ الْمَسْجِدِ فَوَضَعَ يَدَهُ عَلَيْهَا وَفِيهِمْ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ ـ رضى الله عنهما ـ فَهَابَا أَنْ يُكَلِّمَاهُ وَخَرَجَ سَرَعَانُ النَّاسِ فَقَالُوا أَقَصُرَتِ الصَّلاَةُ وَرَجُلٌ يَدْعُوهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ذُو الْيَدَيْنِ فَقَالَ أَنَسِيتَ أَمْ قَصُرَتْ فَقَالَ ” لَمْ أَنْسَ وَلَمْ تُقْصَرْ ”. قَالَ بَلَى قَدْ نَسِيتَ. فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ سَلَّمَ ثُمَّ كَبَّرَ فَسَجَدَ مِثْلَ سُجُودِهِ أَوْ أَطْوَلَ، ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَكَبَّرَ، ثُمَّ وَضَعَ رَأْسَهُ فَكَبَّرَ فَسَجَدَ مِثْلَ سُجُودِهِ أَوْ أَطْوَلَ، ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ وَكَبَّرَ.
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা বলেন, নবী অপরাহ্ণের দুটি নামাজের একটিতে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফেরালেন। মুহাম্মদ নামে বর্ণনাকারী বলেন, আমার প্রবল ধারণা, সেটি ছিল আসরের নামাজ। এরপর তিনি মসজিদের সামনের দিকের একটি কাঠের কাছে দাঁড়িয়ে তাতে হাত রাখলেন। সেখানে আবু বকর ও উমর ছিলেন; তাঁরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে সংকোচ করলেন। তাড়াহুড়ো করা লোকেরা বেরিয়ে গিয়ে বলল, নামাজ কি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে? নবী যাঁকে যুল-ইয়াদাইন বলে ডাকতেন, তিনি বললেন, ‘আপনি কি ভুলে গেছেন, নাকি নামাজ সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘আমি ভুলিনি, নামাজও সংক্ষিপ্ত হয়নি।’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই আপনি ভুলেছেন।’ তখন তিনি আরও দুই রাকাত পড়ে সালাম ফেরালেন। তারপর তাকবির বলে স্বাভাবিক সিজদার মতো বা তার চেয়ে দীর্ঘ সিজদা করলেন। মাথা তুলে তাকবির বললেন, আবার মাথা নামিয়ে তাকবির বলে স্বাভাবিক সিজদার মতো বা তার চেয়ে দীর্ঘ সিজদা করলেন। এরপর মাথা তুলে তাকবির বললেন।
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য হলো, ‘আমি ভুলিনি।’ তাঁর নিজের স্মৃতির ওপর আস্থা ভুলটি শনাক্ত করতে পারেনি। যুল-ইয়াদাইনের আপত্তির পরে অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। আবু বকর ও উমরের কথা বলতে সংকোচ করার উল্লেখও রয়েছে। উপস্থিত লোকদের একাংশ প্রথমে জানতে চেয়েছিল নামাজ সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে কি না। ধর্মীয় নেতার আচরণে ভুল ঘটলে সেটিকে নতুন বিধান হিসেবে গ্রহণ করার সম্ভাবনা এবং সরাসরি প্রশ্ন করতে সংকোচ—দুটিই এখানে প্রকাশ পেয়েছে। নেতার মর্যাদা ভুল সংশোধনের পথে সামাজিক বাধা হয়ে উঠেছে।
পৃথক আরেক ঘটনায় মুহাম্মদ যোহরের নামাজ পাঁচ রাকাত পড়েন। তখনও তাঁকে জানাতে হয় কত রাকাত পড়েছেন। দুটি ঘটনায় ভুলের দিক বিপরীত: একটিতে কম পড়ে শেষ করেছেন, অন্যটিতে বেশি পড়েছেন। দ্বিতীয় ঘটনার পূর্ণ বিবরণ হলো: [54]
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَلَّى الظُّهْرَ خَمْسًا فَقِيلَ لَهُ أَزِيدَ فِي الصَّلاَةِ فَقَالَ «وَمَا ذَاكَ». قَالَ صَلَّيْتَ خَمْسًا. فَسَجَدَ سَجْدَتَيْنِ بَعْدَ مَا سَلَّمَ.
বাংলা অনুবাদ: আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল যোহরের নামাজ পাঁচ রাকাত পড়লেন। তাঁকে বলা হলো, ‘নামাজে কি বাড়ানো হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘কী হয়েছে?’ বলা হলো, ‘আপনি পাঁচ রাকাত পড়েছেন।’ তখন তিনি সালাম ফেরানোর পরে দুটি সিজদা করলেন।
পাঁচ রাকাতের ঘটনায় ‘কী হয়েছে?’ প্রশ্নটি দেখায়, উপস্থিত লোকের বক্তব্যের আগে অতিরিক্ত রাকাতটির কথা তিনি নিজে প্রকাশ করেননি। তারপর ভুলের প্রতিকারের ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করেছেন। দুই বর্ণনাতেই উপস্থিত অন্য মানুষের গণনা তাঁর কাজের হিসাব সংশোধনে কার্যকর হয়েছে। ভুলটি প্রকাশের আগে অনুসারীদের প্রশ্ন আবারও নামাজের নিয়ম বদলেছে কি না, সেই ভাষায় এসেছে।
অন্যের তিলাওয়াতে ভুলে যাওয়া আয়াত মনে পড়া
কোরআনের আয়াত মনে করার ক্ষেত্রেও অন্য ব্যক্তির পাঠের ওপর নির্ভর করার একটি বর্ণনা রয়েছে। আয়িশার ভাষ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ রাতে একজনের তিলাওয়াত শুনে বলেন, সেই ব্যক্তি তাঁকে কয়েকটি আয়াত মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নিজের বক্তব্যেই আগের বিস্মৃতি এবং পরে মনে পড়া স্বীকৃত হয়েছে। [55]
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ سَمِعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَجُلاً يَقْرَأُ فِي سُورَةٍ بِاللَّيْلِ فَقَالَ «يَرْحَمُهُ اللَّهُ لَقَدْ أَذْكَرَنِي كَذَا وَكَذَا آيَةً كُنْتُ أُنْسِيتُهَا مِنْ سُورَةِ كَذَا وَكَذَا».
বাংলা অনুবাদ: আয়িশা বলেন, আল্লাহর রাসুল রাতে এক ব্যক্তিকে একটি সূরা থেকে পাঠ করতে শুনলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন। সে আমাকে অমুক অমুক সূরার অমুক অমুক আয়াত মনে করিয়ে দিয়েছে, যেগুলো আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
আরবির «أَذْكَرَنِي» অর্থ ‘আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে’; «كُنْتُ أُنْسِيتُهَا» অংশে আগে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে বলা হয়েছে। কে বা কী কারণে সেই বিস্মৃতি ঘটেছিল, বাক্যটিতে তার কর্তা উল্লেখিত নেই। বর্ণিত ধারাবাহিকতা হলো, আগে জানা পাঠ তখন স্মরণে ছিল না; অন্যের পাঠ শোনার পরে তা মনে এসেছে। যে কোরআন তিনি প্রচার করছিলেন, তার আয়াত পুনঃস্মরণেও অন্য মানুষের কণ্ঠ সহায়ক হয়েছে।
নামাজের রাকাত, নিজের সম্পাদিত কাজ এবং কোরআনের আয়াত—এই তিন ক্ষেত্রে স্মৃতি ও উপলব্ধির ভিন্ন প্রকাশ পাওয়া যায়। কোথাও কাজের সংখ্যা ভুল হয়েছে, কোথাও না-ঘটা কাজ ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে, কোথাও পরিচিত পাঠ সাময়িকভাবে স্মরণে ছিল না। দুই রাকাতের ঘটনায় ভুল অস্বীকারের পরে সংশোধন এবং আয়াতের ঘটনায় অন্যের সহায়তা সরাসরি স্বীকার—এই পার্থক্যও সংরক্ষিত। তাঁর নিজের বক্তব্য ও বাইরের পর্যবেক্ষণ সব ক্ষেত্রে এক ছিল না।
| ঘটনা | ভুল বা স্মৃতির সমস্যার রূপ | সংশোধন বা পুনঃস্মরণের মাধ্যম |
|---|---|---|
| স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন বলে মনে হওয়া | কাজটি ঘটেছে বলে অনুভব; আয়িশার বর্ণনায় বাস্তবে তা ঘটেনি। | অমিলটি আয়িশার সূত্রে বর্ণিত; ঘটনাটিকে জাদুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। |
| দুই রাকাত পড়ে সালাম | নামাজ অসম্পূর্ণ থাকা এবং প্রথমে ভুল হওয়ার কথা অস্বীকার। | যুল-ইয়াদাইনের আপত্তির পরে আরও দুই রাকাত আদায়। |
| যোহরে পাঁচ রাকাত | নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে এক রাকাত বেশি আদায়। | উপস্থিত ব্যক্তির জানানো এবং পরে দুটি সিজদা। |
| আয়াত পুনরায় মনে পড়া | আগে জানা আয়াতের সাময়িক বিস্মৃতি। | অন্য ব্যক্তির তিলাওয়াত শুনে পুনঃস্মরণ। |
পাথরের সালাম, শ্রুতির অভিজ্ঞতা ও অলৌকিক স্বীকৃতির দাবি
সহিহ মুসলিমে মুহাম্মদের নিজের বক্তব্য হিসেবে মক্কার একটি পাথরের তাঁকে সালাম দেওয়ার দাবি সংরক্ষিত আছে। তিনি বলেন, নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার আগেই পাথরটি তাঁকে সালাম দিত এবং তখনও তিনি পাথরটিকে চিনতে পারেন। এখানে নিজের শোনা অভিজ্ঞতাকে একটি নির্দিষ্ট পাথরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। জাবির ইবন সামুরা তাঁর এই বক্তব্যটি বর্ণনা করছেন; এই হাদিসে জাবির নিজে সেই পাথরের সালাম শোনার দাবি করছেন না। [56]
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
৪৪। ফাযীলাত
পরিচ্ছেদঃ ১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশের ফাযীলাত এবং নুবুওয়াত প্রাপ্তির আগে (তাকে) পাথরের সালাম করা প্রসঙ্গ
৫৮৩৩-(২/২২৭৭) আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ্ (রহঃ) ….. জাবির ইবনু সামুরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি মাক্কায় একটি পাথরকে জানি, যে আমার (নবীরূপে) প্রেরিত হওয়ার আগেও আমাকে সালাম করত; আমি এখনও তাকে সন্দেহাতীতভাবে চিনতে পারি। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৭৪০, ইসলামিক সেন্টার ৫৭৭১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু সামুরাহ (রাঃ)
শব্দ শোনার অনুভূতি এবং শব্দটির বাইরের উৎস শনাক্ত করা পৃথক বিষয়। কেউ যদি কোনো কণ্ঠকে পাথরের সালাম হিসেবে অনুভব করেন, তখন অনুসন্ধানের প্রশ্ন হয়—কী শব্দ শোনা হয়েছিল, কোথা থেকে এসেছিল, আর কে সেটি শুনেছিল। শ্রুতিবিভ্রমও এখানে একটি প্রাসঙ্গিক প্রাকৃতিক সম্ভাবনা। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বাস্তব বলে প্রতীয়মান হলেও বাইরের জগতে সংশ্লিষ্ট উদ্দীপক না-থাকার অভিজ্ঞতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হ্যালুসিনেশন বলা হয়। এনএইচএসের সংজ্ঞায় শ্রবণসহ বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের এমন অভিজ্ঞতার কথা রয়েছে। [57]
Hallucinations are where you hear, see, smell, taste or feel things that appear to be real but only exist in your mind.
বাংলা অনুবাদ: হ্যালুসিনেশন হলো এমন কিছু শোনা, দেখা, গন্ধ পাওয়া, স্বাদ পাওয়া বা অনুভব করা, যা বাস্তব বলে মনে হয়, কিন্তু কেবল মনের মধ্যেই বিদ্যমান।
পাথরকে শব্দের উৎস বলা হলে দাবি আরও নির্দিষ্ট হয়। পাথরে মানুষের মতো স্নায়ুতন্ত্র, ভাষা শেখার ব্যবস্থা বা বাক্যন্ত্র নেই। পাথরের সংঘর্ষে শব্দ হওয়া এবং কাউকে শনাক্ত করে অর্থপূর্ণ ভাষায় অভিবাদন জানানো ভিন্ন ঘটনা। ‘সালাম’ একটি সামাজিক ও ভাষাগত কাজ; তার মধ্যে সম্বোধিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা এবং অর্থবহ বার্তা দেওয়ার দাবি থাকে। ফলে পাথর সালাম দিয়েছে বলা নিছক কোনো আওয়াজ শোনার বিবরণ নয়; নির্জীব বস্তুর মধ্যে চেনা, বোঝা ও ভাষায় প্রকাশের ক্ষমতা আরোপ করা হচ্ছে।
নববি ঘটনাটিকে অলৌকিক নিদর্শন এবং কিছু জড়বস্তুর উপলব্ধিক্ষমতার প্রমাণ বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় পাথরের সালাম আক্ষরিক ঘটনা। [58]
«فيه معجزة له صلى الله عليه وسلم، وفي هذا إثبات التمييز في بعض الجمادات، وهو موافق لقوله تعالى في الحجارة: وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، وقوله تعالى: وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ، وفي هذه الآية خلاف مشهور، والصحيح أنه يسبح حقيقة، ويجعل الله تعالى فيه تمييزًا بحسبه، كما ذكرنا، ومنه الحجر الذي فر بثوب موسى صلى الله عليه وسلم، وكلام الذراع المسمومة، ومشي إحدى الشجرتين إلى الأخرى حين دعاهما النبي صلى الله عليه وسلم، وأشباه ذلك.»
বাংলা অনুবাদ: এতে তাঁর একটি অলৌকিক নিদর্শন রয়েছে এবং কিছু জড়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা প্রমাণিত হয়। এটি পাথর সম্পর্কে আল্লাহর ‘তাদের কিছু আল্লাহর ভয়ে নেমে পড়ে’ এবং ‘এমন কিছু নেই, যা তাঁর প্রশংসা করে না’ বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই আয়াত নিয়ে পরিচিত মতভেদ আছে; সঠিক মত হলো, বস্তু সত্যিই প্রশংসা করে এবং আল্লাহ তার উপযোগী উপলব্ধিক্ষমতা দেন, যেমন আমরা আগে উল্লেখ করেছি। মুসার কাপড় নিয়ে পালানো পাথর, বিষযুক্ত বাহুর কথা বলা, নবীর ডাকে একটি গাছের অন্য গাছের দিকে হেঁটে যাওয়া এবং এ ধরনের অন্যান্য ঘটনাও এর অন্তর্ভুক্ত।
এই ব্যাখ্যায় একটি অলৌকিক দাবির সমর্থনে আরও কয়েকটি অলৌকিক বর্ণনা ব্যবহৃত হয়েছে। ধর্মীয় সাহিত্যের ভেতরে তাদের পারস্পরিক সামঞ্জস্য দেখানো হয়েছে; পাথরের কথা বলার স্বাধীন পর্যবেক্ষণ উপস্থাপিত হয়নি। আল্লাহ পাথরকে বিশেষ উপলব্ধি দিয়েছেন—এটি পাথরের সালামের জন্য দেওয়া ধর্মতাত্ত্বিক কারণ। সেই বিশেষ ক্ষমতা সত্যিই সৃষ্টি হয়েছিল কি না, তা আবার মূল ঘটনার সত্যতার ওপর নির্ভর করছে। পাথর কথা বলেছে—এই দাবির যাচাই ছাড়া পাথরকে বিশেষ উপলব্ধিক্ষমতা দেওয়ার ব্যাখ্যাটি একই অপ্রমাণিত ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিশেষ ক্ষমতা আরোপ মূল বিবরণের সত্যতা যাচাইয়ের কাজটি এগিয়ে নেয় না।
তিরমিজিতে আলির নামে আরেকটি বর্ণনায় সঙ্গীর উপস্থিতিসহ পাহাড় ও গাছের সালামের কথা আছে। আলি বলেন, তিনি মুহাম্মদের সঙ্গে মক্কার এক দিকে গিয়েছিলেন; সামনে আসা পাহাড় ও গাছ তাঁকে ‘আল্লাহর রাসুল’ বলে সালাম জানিয়েছে। এখানে দাবির রূপ আলাদা: মুহাম্মদের নিজের স্মৃতিবয়ানের বদলে আলির উপস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তিরমিজি একে ‘গরিব’ বলেছেন; দারুসসালামের মূল্যায়নে এটি ‘দইফ’। [59]
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم بِمَكَّةَ فَخَرَجْنَا فِي بَعْضِ نَوَاحِيهَا فَمَا اسْتَقْبَلَهُ جَبَلٌ وَلاَ شَجَرٌ إِلاَّ وَهُوَ يَقُولُ السَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ.
বাংলা অনুবাদ: আলি ইবন আবি তালিব বলেন, আমি নবীর সঙ্গে মক্কায় ছিলাম। আমরা মক্কার এক দিকে বের হলাম। তাঁর সামনে এমন কোনো পাহাড় বা গাছ পড়েনি, যা ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনাকে সালাম’ বলেনি।
মুসলিমের বর্ণনায় মুহাম্মদ নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন; তিরমিজির বর্ণনায় আলি নিজেকে ঘটনাস্থলের সঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করেন। প্রথমটির ভিত্তি মুহাম্মদের নিজের স্মৃতিবয়ান; দ্বিতীয়টিতে রয়েছে সঙ্গীর উপস্থিতিতে পাহাড় ও গাছের সালামের দাবি। এই দুই পাঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ ও প্রকাশ্য অলৌকিক ঘটনার কাহিনি পৃথকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।
আমাদের এলাকায়ও এক ব্যক্তি বলতেন, রাস্তার গাছগুলো তাঁকে সালাম দেয়। এমন দাবির সত্যতা নির্ধারণে দাবিদাতার সামাজিক মর্যাদা কোনো যাচাইপদ্ধতি নয়। একই ধরনের অভিজ্ঞতা একজন সাধারণ মানুষের মুখে শুনলে তার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে; মুহাম্মদের মুখে শোনার পরও সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। ‘আমি এখনও পাথরটিকে চিনতে পারি’ বলা তাঁর নিজের নিশ্চয়তা প্রকাশ করে। সেই নিশ্চয়তা থেকে পাথরের ভাষাগত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
এই কাহিনিগুলোর ধর্মীয় কাজও লক্ষণীয়। এখানে শুধু মানুষ মুহাম্মদের মর্যাদা স্বীকার করছে না; পাথর, পাহাড় ও গাছও তাঁকে রাসুল হিসেবে অভিবাদন জানাচ্ছে। তাঁর বিশেষ পরিচয়ের স্বীকৃতি মানুষের সমাজ ছাড়িয়ে সমগ্র প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামওয়েব এই বর্ণনাগুলোকে তাঁর নবুয়তের নিদর্শন হিসেবেই উপস্থাপন করে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে কোনো শব্দ শুনে তার উৎস নির্ধারণের ঘটনাটি নবুয়তের পক্ষে প্রকৃতিজুড়ে স্বীকৃতির কাহিনিতে পরিণত হচ্ছে। এই সাহিত্যিক ও ধর্মীয় কার্যকারিতা স্পষ্ট; বাস্তব পাথরের মুখে সালাম শোনার দাবিটির যাচাই তার বাইরের প্রশ্ন। [60]
কাঠের খণ্ডের কান্না, শোক ও উপলব্ধিক্ষমতার দাবি
মুহাম্মদের জন্য কাঠের খণ্ডের কান্নার কাহিনিতে একটি নির্জীব বস্তুকে শোকাহত প্রাণীর ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি আগে কাঠের খণ্ডে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন; মিম্বার তৈরি হওয়ার পর সেখানে গেলে কাঠটি আর্তনাদ করে। দারেমির বর্ণনায় সেই শব্দ ষাঁড়ের ডাকের মতো, আর মুহাম্মদ আলিঙ্গন করার পর তা থেমে যায়। এরপর তিনি ঘোষণা করেন, আলিঙ্গন না করলে কাঠটি কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর জন্য কাঁদত। এই গল্পে কাঠ শুধু শব্দ করছে না; তাঁর অনুপস্থিতি উপলব্ধি করছে, বিচ্ছেদের কষ্ট পাচ্ছে এবং তাঁর স্পর্শে সান্ত্বনা লাভ করছে। নির্জীব বস্তুর ওপর মানুষের আবেগ ও বোঝার ক্ষমতা আরোপের একটি স্পষ্ট উদাহরণ এটি। [61]
সুনান আদ-দারেমী (হাদিসবিডি)
ভূমিকা
পরিচ্ছেদঃ ৬. মিম্বারের কান্নার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মানিত করার বিবরণ
৪২. আনাস ইবনে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমু’আর দিনে মসজিদের একটি কাষ্ঠখণ্ডের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে লোকদের মাঝে খুতবা দিতেন। তারপর এক রোম থেকে একজন লোক এসে বলল, আমি আপনার জন্য একটি কিছু বানিয়ে দিব যার উপরে বসলে মনে হবে যেন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন? তারপর সে তাঁর জন্যে একটি মিম্বার তৈরী করল, যার (নিচের দিকে) দু’টি ধাপ ছিল, আর (উপরের দিকে) তৃতীয় ধাপে তিনি বসতেন। অতঃপর যখন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মিম্বারে বসলেন, তখন কাষ্ঠখণ্ডটি ষাঁড়ের মত আর্তনাদ করতে লাগলো, এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শোকে পুরো মসজিদ প্রকম্পিত হয়ে উঠল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বার হতে নেমে সেটির দিকে আসলেন এবং আর্তনাদরত কাষ্ঠখণ্ডটিকে আলিঙ্গন করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটিকে আলিঙ্গন করা মাত্র তা শান্ত হয়ে গেল। তারপর তিনি বলেন: ’সেই মহান সত্ত্বার কসম, যার হাতে রয়েছে মুহাম্মাদের প্রাণ, আমি যদি একে আলিঙ্গন না করতাম, তবে অবশ্যই তা কিয়ামত পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শোকে এভাবে কাঁদতে থাকত।’ এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিকে দাফন করার নিদের্শ দিলেন, ফলে এটিকে দাফন করে দেয়া হল।[1]
[1] তাহক্বীক্ব: এর সনদ সহীহ।
তাখরীজ: আহমদ, ৩/২২৬; তিরমিযী ৩৬৩১; ইবনু মাজাহ ১৪১৫।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বুখারির জাবির-বর্ণিত পাঠে কাঠের আওয়াজকে শিশুর কান্নার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, কাঠটির কাছে যে জিকির হতো, তা শুনতে না-পাওয়ার জন্য সেটি কাঁদছিল। অর্থাৎ শব্দের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মানসিক কারণও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কাঠের স্মৃতি আছে, তা আগের অভিজ্ঞতার অভাব বুঝতে পারে এবং ধর্মীয় বক্তব্য শুনতে না-পেয়ে দুঃখ পায়—এই কল্পিত ক্ষমতাগুলো কাহিনির অপরিহার্য অংশ। [62]
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقُومُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَى شَجَرَةٍ أَوْ نَخْلَةٍ، فَقَالَتِ امْرَأَةٌ مِنَ الأَنْصَارِ ـ أَوْ رَجُلٌ ـ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلاَ نَجْعَلُ لَكَ مِنْبَرًا قَالَ ” إِنْ شِئْتُمْ ”. فَجَعَلُوا لَهُ مِنْبَرًا، فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ الْجُمُعَةِ دُفِعَ إِلَى الْمِنْبَرِ، فَصَاحَتِ النَّخْلَةُ صِيَاحَ الصَّبِيِّ، ثُمَّ نَزَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَضَمَّهُ إِلَيْهِ تَئِنُّ أَنِينَ الصَّبِيِّ، الَّذِي يُسَكَّنُ، قَالَ ” كَانَتْ تَبْكِي عَلَى مَا كَانَتْ تَسْمَعُ مِنَ الذِّكْرِ عِنْدَهَا ”.
বাংলা অনুবাদ: জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নবী জুমার দিনে একটি গাছ বা খেজুরগাছের কাছে দাঁড়াতেন। আনসারদের একজন নারী বা পুরুষ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি আপনার জন্য একটি মিম্বার তৈরি করব?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা চাইলে।’ তাঁরা মিম্বার তৈরি করলেন। জুমার দিন তিনি মিম্বারের দিকে গেলে খেজুরগাছটি শিশুর মতো চিৎকার করে উঠল। নবী নেমে এসে সেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। শান্ত করা হচ্ছে এমন শিশুর মতো সেটি গোঙাচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘এর কাছে আগে যে জিকির হতো, তার জন্য এটি কাঁদছিল।’
তিরমিজির আন্তর্জাতিক নম্বর ৩৬২৭-এর সমান্তরাল বর্ণনায় উটের আওয়াজের উপমা আছে। ইবন মাজাহ ১৪১৫-তে আলিঙ্গন না করলে কেয়ামত পর্যন্ত কান্না চলার ঘোষণাটি রয়েছে। বর্ণনার উপমা ও বিস্তারিত অংশে পার্থক্য থাকলেও কেন্দ্রীয় দাবি একই: কাঠটি মুহাম্মদের সরে যাওয়ায় শোকাহত হয়েছে এবং তাঁর সংস্পর্শে শান্ত হয়েছে। [63] [64]
একটি কাঠে চাপ পড়লে, ঘর্ষণ হলে বা কাঠ ফাটলে শব্দ হতে পারে। সেই ভৌত শব্দ থেকে বিচ্ছেদের বেদনা, ধর্মীয় বক্তব্যের স্মৃতি কিংবা বিশেষ ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা অনুসরণ করে না। কাঠের খণ্ডে প্রাণীর মতো সংবেদন ও আবেগ পরিচালনার স্নায়ুতন্ত্র নেই। এখানে সমস্যাটি তাই কাঠ কোনো শব্দ করতে পারে কি না, সেই সাধারণ প্রশ্নের চেয়ে অনেক বড়: শব্দটিকে শোক হিসেবে শনাক্ত করা এবং তার কারণ মুহাম্মদের বিচ্ছেদ বলে ঘোষণা করার ভিত্তি কী? কোনো শব্দকে শিশুর কান্নার সঙ্গে তুলনা করলেই সেই শব্দের উৎস শিশুর মতো কষ্ট অনুভব করছে, এমন সিদ্ধান্ত বৈধ হয় না।
ইবন হাজারও কাহিনিটিকে জড়বস্তুর বিশেষ উপলব্ধিক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় আল্লাহ জড়বস্তুর মধ্যে প্রাণীর মতো উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারেন। অর্থাৎ শোক ও কান্নাকে আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করে তার জন্য অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করা হয়েছে। [65]
«وفي الحديث دلالة على أن الجمادات قد يخلق الله لها إدراكًا كالحيوان بل كأشرف الحيوان، وفيه تأييد لقول من يحمل وإن من شيء إلا يسبح بحمده على ظاهره.»
বাংলা অনুবাদ: হাদিসটিতে প্রমাণ রয়েছে যে, আল্লাহ জড়বস্তুর মধ্যে প্রাণীর মতো, বরং সর্বোৎকৃষ্ট প্রাণীর মতো উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারেন। ‘এমন কিছু নেই, যা তাঁর প্রশংসা করে না’ বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণকারীদের মতেরও এতে সমর্থন রয়েছে।
কাহিনিটির মধ্যে তিন ধরনের দাবি একত্র হয়েছে। প্রথমটি শ্রবণযোগ্য শব্দের ঘটনা। দ্বিতীয়টি সেই শব্দের আবেগগত ব্যাখ্যা: কাঠ শোক করছে। তৃতীয়টি একটি অনঘটিত পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ ফল: আলিঙ্গন না করলে কেয়ামত পর্যন্ত কান্না চলত। তৃতীয় দাবিটি যাচাই করার পরিস্থিতিই বর্ণনায় ঘটেনি, কারণ আলিঙ্গন করার কথাই সেখানে বলা হয়েছে। মুহাম্মদের ঘোষণার মাধ্যমেই অসীম দীর্ঘ শোকের সম্ভাবনাটি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এই ঘোষণা তাঁর নিজের বিশেষ মর্যাদা ও সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষমতাকে গল্পটির কেন্দ্রে বসায়।
| দাবির স্তর | কাহিনিতে তার রূপ | প্রমাণের প্রশ্ন |
|---|---|---|
| শব্দের ঘটনা | কাঠ থেকে প্রাণী বা শিশুর কান্নার মতো শব্দ হয়েছে। | কী শব্দ হয়েছিল এবং তার উৎস কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল? |
| আবেগ আরোপ | বিচ্ছেদ ও জিকির শুনতে না-পাওয়ার কারণে কাঠ কাঁদছিল। | কাঠের শোক, স্মৃতি ও উপলব্ধির অস্তিত্বের সাক্ষ্য কী? |
| স্পর্শের প্রভাব | মুহাম্মদ স্পর্শ বা আলিঙ্গন করলে শব্দ থামে। | শব্দ থামার সঙ্গে কাঠের সান্ত্বনা পাওয়ার ব্যাখ্যার সম্পর্ক কী? |
| কেয়ামত পর্যন্ত কান্না | আলিঙ্গন না করলে কান্না অব্যাহত থাকত বলে ঘোষণা। | যে পরিস্থিতি ঘটেনি, তার এই ভবিষ্যৎ ফল কীভাবে জানা গেল? |
বর্ণনাটি মসজিদের প্রকাশ্য অলৌকিক ঘটনার দাবি হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। এর সত্যতা বিচার করতে হয় ঘটনার সাক্ষ্য, বর্ণনার রূপ ও সংরক্ষণের ইতিহাসের ভিত্তিতে। পাশাপাশি এর ধর্মীয় কাজটি স্পষ্ট: মুহাম্মদের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য এমনকি কাঠের মধ্যেও আছে বলে প্রচারিত হচ্ছে। কাঠকে শিশুর মতো সান্ত্বনা দেওয়া এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে অনন্ত শোকের ঘোষণা তাঁকে জীবজগৎ ও জড়জগতের আবেগের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। নির্জীব বস্তুতে অনুভূতি আরোপ এবং ধর্মীয় ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধির এই কাহিনি রূপকথার পরিচিত কৌশল ব্যবহার করে। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার বাংলা সংস্করণেও কাঠের কান্নাসংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সংকলিত আছে। [66]
রাসলুল্লাহর প্রতি অনুরাগ এবং তাঁর বিচ্ছেদ
বেদনায় খেজুর কাণ্ডের ব্যকুলতা
এ বিষয়ে একদল সাহাবী থেকে একাধিক সূত্রে হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা হাদীস শাস্ত্রের ইমামগণের নিকট অকাট্য প্রমাণরূপে বিবেচিত।
উবাই ইব্ন্ন কা’ব থেকে প্রথম হাদীস
ইমাম শাফিয়ী, ইবরাহীম ইবন মুহাম্মদ …… উবাই ইব্ন কা’ব সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, মসজিদে নববী যখন ছাপরা অবস্থায় ছিল তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি খেজুর গাছের (কর্তিত) কাণ্ড সামনে রেখে নামায পড়তেন এবং খুৎবা প্রদান কালে তার সাথে ঠেস দিতেন। এরপর (একদিন) তার এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি আপনাকে একটি মিম্বর বানিয়ে দেব যে, জুমু’আর দিন আপনি তার উপরে দাঁড়িয়ে খুৎবা দেবেন আর সকলে ভালভাবে আপনার খুৎবা শুনতে পাবে? তিনি বললেন, হাঁ! তখন তাঁর জন্য তিনধাপ বিশিষ্ট একটি মিম্বর বানানো হল, যেগুলি সাধারণত মিম্বরে দেখা যায়। তারপর যখন মিম্বর বানানো হল এবং আল্লাহ্র রাসূল তাকে যথাস্থানে স্থাপন করলেন তখন তার উপর দাঁড়িয়ে খুৎবা দিতে উদ্যত হলেন। এ উদ্দেশ্যে সেদিকে অগ্রসর হওয়ার পথে সেই খেজুর গাছের কাণ্ডকে অতিক্রম করলেন তখন তা আর্তনাদ করে ফেটে চৌচির হয়ে গেল। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তার আর্তনাদ শুনলেন তখন তিনি তার গায়ে হাত বুলালেন এরপর মিম্বরে ফিরে আসলেন। পরবর্তীতে যখন নতুনভাবে নির্মাণের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববী ভেঙে ফেলা হল তখন হযরত উবাই ইব্ন কা’ব সেই কাণ্ডটি নিয়ে গেলেন। আর পরবর্তীকালেও এটা তার কাছে ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তা জীর্ণ হয়ে যায় এবং তাকে ঘুণে খেয়ে শেষ করে ফেলে। ইমাম আহমদ ইব্ন হাম্বল এভাবেই যাকারিয়্যা ইন্ন আদী উবাই ইব্ন কা’ব সূত্রে হাদীসখানি রিওয়ায়াত করেছেন। তাঁর বর্ণনায় রয়েছে: তখন তিনি তার গায়ে হাত বুলালেন এবং তা শান্ত হল। তারপর তিনি মিম্বরে ফিরে গেলেন। আর তিনি যখন নামায পড়তেন তখন সেটি তার সামনে থাকত, এছাড়া হাদীসের অবশিষ্টাংশ পূর্বের মতই। এছাড়া ইবন মাজা হাদীসখানি রিওয়ায়াত করেছেন ইসমাঈল ইব্ন আবদুল্লাহ্, উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আমর সূত্রে।
হযরত আনাস থেকে দ্বিতীয় হাদীস
হাফিয আবূ ইয়া’লা, আবূ খায়ছামা …… আনাস ইব্ন মালিক সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমু’আর দিন খুৎবা দেওয়ার সময় মসজিদে রক্ষিত একটি খেজুর কাণ্ডের সাথে হেলান দিতেন। এরপর একদিন জনৈক রোমক এসে তাঁকে বলল, আমি কি আপনার জন্য এমন একটি উঁচু আসন বানিয়ে দেবো যাতে বসলেও মনে হবে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর সে তাঁর জন্য দুইধাপ বিশিষ্ট একটি মিম্বর বানাল যার তৃতীয় ধাপে তিনি বসতেন। এরপর আল্লাহর নবী যখন মিম্বরে বসলেন, তখন সেই খেজুর গাছের কাণ্ড আল্লাহর রাসূলের বিচ্ছেদ বেদনায় গরুর হাম্বা হাম্বা রবের ন্যায় আর্তনাদ করে কেঁপে উঠল। তখন আল্লাহর রাসূল মিম্বর ‘থেকে নেমে তার আর্তনাদরত অবস্থায় তাকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন সে থামলো। তখন তিনি বললেন, কসম ঐ সত্তার, যাঁর কুদরতি হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আমি যদি তাকে জড়িয়ে না ধরতাম তাহলে সে আল্লাহর রাসূলের বিচ্ছেদ বেদনায় কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আর্তনাদ করতেই থাকত। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে তাকে মাটিতে দাফন করা হল। আর হাদীসটি ইমাম তিরমিযী মাহমূদ ইব্ন গায়লান আমর ইবন ইউনুস সূত্রে রিওয়ায়াত করেছেন। এরপর তিনি বলেন, এই সূত্রে এটি ‘সহীহ গরীব’।
হযরত আনাস থেকে ভিন্ন একটি সূত্র
হাফিয আবূ বক্স আল বায্যার তাঁর মুসসাদে হুদবা আনাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি খেজুর গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে খুৎবা দিতেন। এরপর যখন মিম্বর বানানো হল তখন তিনি তাতে স্থানান্তরিত হলেন। তখন এই কাণ্ড থেকে করুন বিলাপধ্বনি শোনা যেতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে তাকে কোলে জড়িয়ে ধরলেন, তখন সে থামল। তিনি বললেন, আমি যদি তাকে কোলে জড়িয়ে না ধরতাম তাহলে সে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত বিলাপ ও আর্তনাদ করতে থাকত। এ ভাবেই ইবন মাজা হাদীসখানি রিওয়ায়াত করেছেন আবু বক্র ইন্ন খাল্লাদ সূত্রে আনাস থেকে এবং হাম্মাদ ইব্ন আম্মার সূত্রে…… ইব্ন আব্বাস থেকে।
হযরত আনাস থেকে ভিন্ন আরেকটি সূত্র
ইমাম আহমদ, হাশিম আনাস ইব্ন মালিক সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জুমু’আর দিন খুৎবা দিতেন তখন তিনি একটি কাষ্ঠ খণ্ডে পিঠ ঠেকাতেন। এরপর যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল তখন তিনি বললেন আমার জন্য একটি মিম্বর তৈরী কর-তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সকলকে কথা শোনান। তখন তাঁর জন্য দুইধাপ বিশিষ্ট একটি মিম্বর বানানো হল। এরপর তিনি সেই কাষ্ঠ খণ্ডের পরিবর্তে মিম্বরে স্থানান্তরিত হলেন। হাসান বলেন, আনাস জানিয়েছেন যে, তিনি কাষ্ঠ খণ্ডটিকে সন্তানহারা নারীর ন্যায় আর্তনাদ করতে শুনেছেন। আনাস বলেন, তা এভাবে আর্তনাদ করতে থাকল-অবশেষে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মিম্বর থেকে নামালেন এবং তার কাছে হেঁটে গিয়ে তাকে কোলে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর সে শান্ত হল। এই সনদে এটা ইমাম আহমদের একক বর্ণনা। এছাড়া আবুল কাসিম বাগাভী তা রিওয়ায়াত করেছেন শায়বান ইন্ন ফারূখ ….. আনাস সূত্রে। তিনি অতিরিক্ত এই অংশ উল্লেখ করেছেন: হযরত হাসান বসরী যখন এই হাদীসখানি রিওয়ায়াত করতেন তখন কেঁদে ফেলতেন। তারপর বলতেন, হে আল্লাহর বান্দারা। নির্জীব কাষ্ট খণ্ডও আল্লাহর রাসূলের প্রতি অনুরাগে ও ব্যাকুলতায় আর্তনাদ করে আল্লাহ্র কাছে তাঁর মর্যাদার কারণে। তাহলে তোমরাই তাঁর সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হওয়ার অধিক উপযুক্ত। হাফিয আবু নু’আয়ম তা রিওয়ায়াত করেছেন ওলীদ ইব্ন মুসলিম আনাস ইব্ন মালিক সূত্রে।
হযরত আনাস থেকে ভিন্ন একটি সূত্র
আবূ নু’আয়ম আবূ বকর ইব্ন খাল্লাদ….. আনাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি খেজুর গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে খুৎবা দিতেন। (একদিন) কাণ্ডটি করুন স্বরে আর্তনাদ করতে লাগল। তখন তিনি তাকে কোলে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমি যদি তাকে কোলে জড়িয়ে না ধরতাম তাহলে সে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত বিলাপ করতে থাকত।
তৃতীয় হাদীস জাবির ইবন আবদুল্লাহর সূত্রে
ইমাম আহমদ ওয়াকী’ জাবির সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি খেজুর কাণ্ডে হেলান দিয়ে খুৎবা দিতেন। জাবির (রা) বলেন, একদিন এক আনসারী স্ত্রীলোক বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার একটি ছুতোর গোলাম আছে, আমি কি তাকে আপনার জন্য একটি মিম্বর বানিয়ে দিতে বলব, যাতে করে আপনি তাতে আরোহণ করে খুৎবা দিতে পারেন? তিনি বললেন, অবশ্যই। তখন তাঁর জন্য মিম্বর বানানো হল। জাবির (রা) বলেন, এরপর জুমু’আর দিন তিনি মিম্বরে আরোহণ করে খুৎবা দিলেন। জাবির বলেন, তখন যে কাণ্ডটির উপর দাঁড়িয়ে ইতিপূর্বে তিনি খুৎবা দিতেন, সেটি ছোট শিশুর ন্যায় কাতরাতে লাগল। তখন নবী করীম (সা) বললেন, এই কাণ্ডটি তার নিকট শ্রুত যিক্রের’ সংস্পর্শ হারিয়ে কাঁদছে। ইমাম আহমদ এভাবেই তা রিওয়ায়াত করেছেন। আর ইমাম বুখারী আবদুল ওয়াহিদ ইব্ন আয়মান সূত্রে জাবির ইব্ আবদুল্লাহ্ থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমু’আর দিন একটি গাছের অথবা খেজুর গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন, (একদিন) এক আনসারী স্ত্রীলোক বলল (কিংবা পুরুষ লোক) ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমরা কি আপনাকে একটি মিম্বর বানিয়ে দেব? তিনি বললেন, তোমাদের ইচ্ছা হলে দিতে পার। তখন তাঁরা তাঁকে একটি মিম্বর বানিয়ে দিল। এরপর জুমু’আর দিন তিনি যখন মিম্বরের দিকে ধাবিত হলেন তখন সেই খেজুর গাছের কাণ্ডটি ছোট শিশুর ন্যায় আর্তনাদ করে উঠল। তারপর তার শিশুর ন্যায় ক্রন্দনরত অবস্থায় নবীজী মিম্বর থেকে নেমে তাকে থামানোর জন্য জড়িয়ে ধরলেন। এ সময় তিনি বললেন, তার কান্নার কারণ হলো খুৎবার সময় সে আল্লাহ্র যে যিক্র শুনতে পেত তা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এছাড়া ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থের একাধিক স্থানে আবদুল ওয়াহিদ ইব্ আয়মানের হাদীস সংগ্রহ থেকে হযরত জাবিরের বরাতে হাদীসখানি রিওয়ায়াত করেছেন।
হযরত জাবির থেকে ভিন্ন একটি সূত্র
ইমাম বুখারী, ইসমাঈল আনাস ইবন মালিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি জাবির ইব্ন আবদুল্লাহকে বলতে শুনেছেন, মসজিদে নববীর ছাদ প্রথমে কর্তিত খেজুর গাছের কাণ্ড সমূহের খুঁটিতে নির্মিত ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খুৎবা দিতেন তখন তিনি সেগুলির একটিতে হেলান দিতেন। এরপর যখন তাঁর জন্য মিম্বর বানানো হল এবং তিনি তাতে আরোহণ করলেন তখন আমরা পূর্ণগর্ভবতী উটনীর আওয়াজের ন্যায় আওয়াজ শুনলাম। তখন নবী করীম (সা) কাছে এসে তার উপর নিজের হাত রাখলেন, তাতে সে স্থির হল। এটা বুখারীর একক বর্ণনা।
তার থেকে আরেকটি বর্ণনা সূত্র
আবু বক্স আলবায্যার বলেন, মুহাম্মদ ইবনুল মুছান্না …… জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ সূত্রে তিনি বলেন, মসজিদে নববীতে একখণ্ড কাঠ ছিল, যাতে হেলান দিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা দিতেন। একদিন সকলে বলল, আপনার দাঁড়ানোর জন্য আমরা যদি কুরসির ন্যায় কিছু বানিয়ে নিতাম তাহলে মনে হয় বেশ হত। এরপর তা করা হল, তখন সেই কাষ্ঠ খণ্ডটি দুগ্ধবতী উটনীর ন্যায় আর্তনাদ করতে লাগল। এ সময় নবী করীম (সা) তার কাছে এসে তাকে কোলে জড়িয়ে তার উপর হাত রাখলেন, ফলে তা স্থির হল। আবু বক্ আল-বায্যার এরপর এই হাদীসের সনদ ও তাতে বিদ্যমান রাবী আবূ কুরায়ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
হযরত জাবির থেকে অন্য একটি সূত্র
ইমাম আহমদ, ইয়াহইয়া ইব্ন আদম ….. জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি কাষ্ঠ খণ্ডে হেলান দিয়ে খুৎবা দিতেন। এরপর যখন তাঁর জন্য মিম্বর বানালো হল তখন কাষ্ঠ খণ্ডটি (দুগ্ধবতী) উটনীর ন্যায় আর্তনাদ করতে লাগল। তখন তিনি এসে তার উপর হাত বুলালেন, ফলে তা থামল। এটা আহমদের একক বর্ণনা।
হযরত জাবির থেকে অন্য একটি সূত্র
হাফিয আবূ বক্স, আল বায্যার মুহাম্মদ ইব্ন মুআম্মার জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, মিম্বর তৈরী হওয়ার পূর্বে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি খেজুর গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে খুৎবা দিতেন। এরপর যখন মিম্বর তৈরী হল, তখন কাণ্ডটি বেদনায় আর্তনাদ করল। এমন কি আমরা তার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। তখন আল্লাহ্র রাসূল তার গায়ে হাত বুলালে সে শান্ত হল। বায্যার বলেন, সুলায়মান ইব্ন কাছীর ব্যতীত অন্য রাবীদের আমরা জানি না, যারা যুহরীর বরাতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আমি বলি, এই সনদটি বেশ উৎকৃষ্ট মানের। এর রাবীরা সকলেই বুখারীর শর্তোত্তীর্ণ। আর সিহাহ সিত্তার সংকলকগণের কেউই তা রিওয়ায়াত করেননি। তবে হাফিয আবূ নু’আয়ম…




ঘুমের মধ্যে আল্লাহর স্পর্শ ও হঠাৎ জ্ঞানপ্রাপ্তির দাবি
মুয়াজ ইবন জাবালের নামে সংরক্ষিত একটি দীর্ঘ বর্ণনায় মুহাম্মদ সকালে নামাজে দেরি করে আসার কারণ হিসেবে নিজের ঘুমের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সাহাবিরা অপেক্ষা করতে করতে প্রায় সূর্যোদয়ের সময়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি দ্রুত এসে সংক্ষিপ্তভাবে নামাজ পড়ান এবং সবাইকে কাতারে থাকতে বলেন। এরপর জানান, রাতে নামাজ পড়ার সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গভীর ঘুমে চলে গিয়েছিলেন। সেই অবস্থায় তিনি তাঁর রবকে ‘সর্বোত্তম আকৃতিতে’ দেখেন, কথোপকথন করেন এবং শরীরে আঙুলের শীতলতা অনুভব করেন। স্পর্শের পর আগে না-জানা প্রশ্নের উত্তর জেনে যাওয়ার কথাও রয়েছে। [67]
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رضى الله عنه قَالَ احْتُبِسَ عَنَّا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ غَدَاةٍ عَنْ صَلاَةِ الصُّبْحِ حَتَّى كِدْنَا نَتَرَاءَى عَيْنَ الشَّمْسِ فَخَرَجَ سَرِيعًا فَثُوِّبَ بِالصَّلاَةِ فَصَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَتَجَوَّزَ فِي صَلاَتِهِ فَلَمَّا سَلَّمَ دَعَا بِصَوْتِهِ قَالَ لَنَا ” عَلَى مَصَافِّكُمْ كَمَا أَنْتُمْ ” . ثُمَّ انْفَتَلَ إِلَيْنَا ثُمَّ قَالَ ” أَمَا إِنِّي سَأُحَدِّثُكُمْ مَا حَبَسَنِي عَنْكُمُ الْغَدَاةَ إِنِّي قُمْتُ مِنَ اللَّيْلِ فَتَوَضَّأْتُ وَصَلَّيْتُ مَا قُدِّرَ لِي فَنَعَسْتُ فِي صَلاَتِي حَتَّى اسْتَثْقَلْتُ فَإِذَا أَنَا بِرَبِّي تَبَارَكَ وَتَعَالَى فِي أَحْسَنِ صُورَةٍ فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَبِّ . قَالَ فِيمَ يَخْتَصِمُ الْمَلأُ الأَعْلَى قُلْتُ لاَ أَدْرِي . قَالَهَا ثَلاَثًا قَالَ فَرَأَيْتُهُ وَضَعَ كَفَّهُ بَيْنَ كَتِفَىَّ حَتَّى وَجَدْتُ بَرْدَ أَنَامِلِهِ بَيْنَ ثَدْيَىَّ فَتَجَلَّى لِي كُلُّ شَيْءٍ وَعَرَفْتُ فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَبِّ قَالَ فِيمَ يَخْتَصِمُ الْمَلأُ الأَعْلَى قُلْتُ فِي الْكَفَّارَاتِ قَالَ مَا هُنَّ قُلْتُ مَشْىُ الأَقْدَامِ إِلَى الْجَمَاعَاتِ وَالْجُلُوسُ فِي الْمَسَاجِدِ بَعْدَ الصَّلَوَاتِ وَإِسْبَاغُ الْوُضُوءِ فِي الْمَكْرُوهَاتِ . قَالَ فِيمَ قُلْتُ إِطْعَامُ الطَّعَامِ وَلِينُ الْكَلاَمِ وَالصَّلاَةُ بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ . قَالَ سَلْ . قُلْتُ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَتَرْكَ الْمُنْكَرَاتِ وَحُبَّ الْمَسَاكِينِ وَأَنْ تَغْفِرَ لِي وَتَرْحَمَنِي وَإِذَا أَرَدْتَ فِتْنَةَ قَوْمٍ فَتَوَفَّنِي غَيْرَ مَفْتُونٍ أَسْأَلُكَ حُبَّكَ وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ وَحُبَّ عَمَلٍ يُقَرِّبُ إِلَى حُبِّكَ ” . قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” إِنَّهَا حَقٌّ فَادْرُسُوهَا ثُمَّ تَعَلَّمُوهَا ” .
বাংলা অনুবাদ: মুয়াজ ইবন জাবাল বলেন, এক সকালে আল্লাহর রাসুল আমাদের কাছে ফজরের নামাজে আসতে বিলম্ব করলেন; আমরা প্রায় সূর্যের উদয় দেখতে পাওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। এরপর তিনি দ্রুত বেরিয়ে এলেন, নামাজের ইকামত দেওয়া হলো এবং তিনি সংক্ষিপ্তভাবে নামাজ আদায় করলেন। সালাম ফেরানোর পর তিনি আমাদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা যেভাবে আছ, সেভাবে নিজেদের কাতারে থাকো।’ তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘আজ সকালে তোমাদের কাছে আসতে আমার কী কারণে বিলম্ব হয়েছে, তা বলব। আমি রাতে উঠে ওজু করলাম এবং আমার জন্য যতটুকু নির্ধারিত ছিল নামাজ পড়লাম। নামাজের মধ্যে আমার তন্দ্রা এলো; অবশেষে ঘুমে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লাম। তখন আমি আমার বরকতময় ও মহান রবকে সর্বোত্তম আকৃতিতে দেখলাম। তিনি বললেন, “হে মুহাম্মদ!” আমি বললাম, “হে আমার রব, আমি উপস্থিত।” তিনি বললেন, “ঊর্ধ্বজগতের সমাবেশ কী নিয়ে বিতর্ক করছে?” আমি বললাম, “জানি না।” তিনি তিনবার কথাটি বললেন। এরপর দেখলাম, তিনি তাঁর হাতের তালু আমার দুই কাঁধের মাঝখানে রাখলেন; আমি আমার দুই স্তনের মাঝখানে তাঁর আঙুলের শীতলতা অনুভব করলাম। তখন আমার কাছে সবকিছু স্পষ্ট হলো এবং আমি জানতে পারলাম। তিনি বললেন, “হে মুহাম্মদ!” আমি বললাম, “হে আমার রব, আমি উপস্থিত।” তিনি বললেন, “ঊর্ধ্বজগতের সমাবেশ কী নিয়ে বিতর্ক করছে?” আমি বললাম, “পাপমোচনকারী কাজগুলো নিয়ে।” তিনি বললেন, “সেগুলো কী?” আমি বললাম, “জামাতে নামাজে হেঁটে যাওয়া, নামাজের পর মসজিদে বসে থাকা এবং কষ্টকর অবস্থায় পূর্ণভাবে ওজু করা।” তিনি বললেন, “আর কী বিষয়ে?” আমি বললাম, “মানুষকে খাবার খাওয়ানো, কোমলভাবে কথা বলা এবং মানুষ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় রাতে নামাজ পড়া।” তিনি বললেন, “চাও।” আমি বললাম, “হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে ভালো কাজ করা, মন্দ কাজ ছেড়ে দেওয়া, দরিদ্রদের ভালোবাসা, আমাকে ক্ষমা করা ও দয়া করার প্রার্থনা করছি। তুমি কোনো জাতির মধ্যে বিপর্যয় আনতে চাইলে আমাকে বিপর্যস্ত হওয়ার আগেই মৃত্যু দিয়ো। আমি তোমার ভালোবাসা, যারা তোমাকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা এবং তোমার ভালোবাসার কাছে নিয়ে যায় এমন কাজের ভালোবাসা চাই।”’ আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘এটি সত্য; তোমরা এটি অধ্যয়ন করো এবং শিখে নাও।’
বর্ণনার সময়ক্রমে প্রথমে নামাজ, তারপর তন্দ্রা, তারপর ঘুমে ভারাক্রান্ত হওয়া এবং তার মধ্যে দৃশ্য ও কথোপকথন রয়েছে। ইবন তাইমিয়াও এই পাঠকে ঘুমের মধ্যে দেখা অভিজ্ঞতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইসলামকিউএতে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত রয়েছে। [68]
«قد بينا أن ألفاظ الحديث صريحة في أن هذه الرؤية كانت في المنام، فيكون هذا الوجه هو المقطوع به، وما سواه باطل.»
বাংলা অনুবাদ: আমরা দেখিয়েছি, হাদিসের শব্দগুলো স্পষ্টভাবে জানায় যে, এই দেখা ঘুমের মধ্যে ঘটেছিল। ফলে এই অর্থই নিশ্চিতভাবে গ্রহণযোগ্য; এর বাইরের অর্থ বাতিল।
এই ঘুমের অভিজ্ঞতায় দেখা, কথা শোনা ও স্পর্শ অনুভব করা একত্র হয়েছে। সত্তাটি তাঁর সঙ্গে কথা বলছে, দুই কাঁধের মাঝখানে হাত রাখছে এবং তিনি বুকের দুই স্তনের মাঝখানে আঙুলের শীতলতা অনুভব করছেন। স্পর্শের স্থান ও শীতলতা অনুভবের স্থান আলাদা করে বলা হয়েছে। সত্তাটির পরিচয় ‘আমার রব’ এবং স্পর্শের পর জ্ঞানপ্রাপ্তির ঘোষণা—দুটিই মুহাম্মদের নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ।
ঘুমে প্রবেশের সময় দৃশ্য, কণ্ঠস্বর, শরীরে বিশেষ অনুভূতি বা কারও উপস্থিতির অনুভব ঘটতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক এই ঘুম-প্রবেশকালীন অভিজ্ঞতাকে ‘হিপনাগগিক হ্যালুসিনেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই ক্ষণিক অনুভূতি ও ঘটনাক্রমযুক্ত পূর্ণ স্বপ্নের পার্থক্যও সেখানে উল্লেখিত। তিরমিজির বর্ণনায় তন্দ্রার পরে ঘুমে ভারাক্রান্ত হওয়া এবং দীর্ঘ প্রশ্নোত্তরের ধারাবাহিকতা রয়েছে। ফলে ঘুম-সম্পর্কিত অনুভূতির সঙ্গে তুলনার দুটি নির্দিষ্ট দিক পাওয়া যায়: অবস্থাটি শুরু হচ্ছে তন্দ্রা থেকে, আর অভিজ্ঞতার মধ্যে দৃশ্য, শ্রুতি ও শরীরের শীতলতা যুক্ত হচ্ছে। [69]
Hypnagogic hallucinations are hallucinations that happen as you’re falling asleep.
বাংলা অনুবাদ: হিপনাগগিক হ্যালুসিনেশন হলো ঘুমে প্রবেশের সময় ঘটে এমন ইন্দ্রিয়বিভ্রম।
জ্ঞানপ্রাপ্তির বর্ণনাতেও একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তন রয়েছে। সর্বোচ্চ পরিষদ কী নিয়ে আলোচনা করছে, প্রথমে মুহাম্মদ সেই প্রশ্নের উত্তর জানেন না। প্রশ্নটি তিনবার আসার পরে স্পর্শ ও শীতলতার অভিজ্ঞতা ঘটে। তারপর তিনি বলেন, তাঁর কাছে সবকিছু প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি জেনেছেন। পরবর্তী উত্তরগুলো জামাতে নামাজ, মসজিদে বসে থাকা, কষ্টের মধ্যেও ভালোভাবে ওজু, খাবার খাওয়ানো, কোমল কথা ও রাতের নামাজসংক্রান্ত। অর্থাৎ স্বপ্নের মধ্যে অনুভূত শারীরিক সংস্পর্শকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের কারণ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ‘সবকিছু’ জানার ঘোষণার পরে বর্ণিত নির্দিষ্ট বিষয়গুলো এই আচার ও নৈতিক কাজের মধ্যেই রয়েছে।
| ঘটনার স্তর | সংরক্ষিত বিবরণ |
|---|---|
| সকালের পরিস্থিতি | নামাজে দেরি করে আসা, দ্রুত নামাজ পড়ানো ও সবাইকে কাতারে থাকতে বলা। |
| পূর্ববর্তী অবস্থা | রাতে ওজু ও নামাজের পরে তন্দ্রা এবং ঘুমে ভারাক্রান্ত হওয়ার বিবরণ। |
| দৃশ্য ও শ্রুতি | নিজের রবকে সর্বোত্তম আকৃতিতে দেখা এবং প্রশ্নোত্তর শোনার দাবি। |
| স্পর্শ ও শীতলতা | দুই কাঁধের মাঝে হাত রাখা এবং বুকের দুই স্তনের মাঝে আঙুলের শীতলতা অনুভব। |
| জ্ঞানের অবস্থাবদল | প্রথমে উত্তর না-জানা; স্পর্শের পরে সবকিছু প্রকাশিত ও জানা হওয়ার ঘোষণা। |
| উত্তরের বিষয়বস্তু | জামাতে নামাজ, মসজিদে বসা, ওজু, খাবার খাওয়ানো, কোমল কথা ও রাতের নামাজ। |
| পরবর্তী নির্দেশ | অভিজ্ঞতাটিকে সত্য ঘোষণা করে অধ্যয়ন ও শেখার নির্দেশ। |
ইবন সাইয়াদকে দাজ্জাল সন্দেহ: পরীক্ষা, গুপ্তশ্রবণ ও হত্যার প্রস্তাব
ইবন সাইয়াদের ঘটনাতে ধর্মীয় আতঙ্কের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি বয়সের একটি বালক। সে অন্য বালকদের সঙ্গে খেলছিল। মুহাম্মদ একদল লোক নিয়ে তার কাছে যান, নিজের নবুয়তের স্বীকৃতি চান এবং তার অস্বাভাবিক দাবিগুলো পরীক্ষা করেন। কথোপকথনের মধ্যেই উমর বালকটির মাথা কেটে ফেলার অনুমতি চান। মুহাম্মদ অনুমতি দেননি; তাঁর উত্তরে ছিল দুটি শর্ত—সে দাজ্জাল হলে উমর তাকে বধ করতে পারবেন না, আর দাজ্জাল না হলে তাকে হত্যা করে কোনো কল্যাণ হবে না। একটি বালকের পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা, তার দাবির পরীক্ষা এবং তাকে হত্যার প্রস্তাব একই ঘটনাপ্রবাহের অংশ। বুখারিতে ইবন উমরের বর্ণনায় প্রাথমিক সাক্ষাৎ ও পরবর্তী গুপ্তশ্রবণের ঘটনাদুটি এভাবে এসেছে। [70]
أَنَّ عُمَرَ انْطَلَقَ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي رَهْطٍ قِبَلَ ابْنِ صَيَّادٍ، حَتَّى وَجَدُوهُ يَلْعَبُ مَعَ الصِّبْيَانِ عِنْدَ أُطُمِ بَنِي مَغَالَةَ، وَقَدْ قَارَبَ ابْنُ صَيَّادٍ الْحُلُمَ فَلَمْ يَشْعُرْ حَتَّى ضَرَبَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِيَدِهِ ثُمَّ قَالَ لاِبْنِ صَيَّادٍ «تَشْهَدُ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ». فَنَظَرَ إِلَيْهِ ابْنُ صَيَّادٍ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُولُ الأُمِّيِّينَ. فَقَالَ ابْنُ صَيَّادٍ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَتَشْهَدُ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ فَرَفَضَهُ وَقَالَ آمَنْتُ بِاللَّهِ وَبِرُسُلِهِ. فَقَالَ لَهُ «مَاذَا تَرَى». قَالَ ابْنُ صَيَّادٍ يَأْتِينِي صَادِقٌ وَكَاذِبٌ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «خُلِّطَ عَلَيْكَ الأَمْرُ» ثُمَّ قَالَ لَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «إِنِّي قَدْ خَبَأْتُ لَكَ خَبِيئًا». فَقَالَ ابْنُ صَيَّادٍ هُوَ الدُّخُّ. فَقَالَ «اخْسَأْ، فَلَنْ تَعْدُوَ قَدْرَكَ». فَقَالَ عُمَرُ ـ رضى الله عنه ـ دَعْنِي يَا رَسُولَ اللَّهِ أَضْرِبْ عُنُقَهُ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «إِنْ يَكُنْهُ فَلَنْ تُسَلَّطَ عَلَيْهِ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْهُ فَلاَ خَيْرَ لَكَ فِي قَتْلِهِ». وَقَالَ سَالِمٌ سَمِعْتُ ابْنَ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ يَقُولُ انْطَلَقَ بَعْدَ ذَلِكَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأُبَىُّ بْنُ كَعْبٍ إِلَى النَّخْلِ الَّتِي فِيهَا ابْنُ صَيَّادٍ وَهُوَ يَخْتِلُ أَنْ يَسْمَعَ مِنِ ابْنِ صَيَّادٍ شَيْئًا قَبْلَ أَنْ يَرَاهُ ابْنُ صَيَّادٍ فَرَآهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ مُضْطَجِعٌ، يَعْنِي فِي قَطِيفَةٍ لَهُ فِيهَا رَمْزَةٌ أَوْ زَمْرَةٌ، فَرَأَتْ أُمُّ ابْنِ صَيَّادٍ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يَتَّقِي بِجُذُوعِ النَّخْلِ فَقَالَتْ لاِبْنِ صَيَّادٍ يَا صَافِ ـ وَهْوَ اسْمُ ابْنِ صَيَّادٍ ـ هَذَا مُحَمَّدٌ صلى الله عليه وسلم. فَثَارَ ابْنُ صَيَّادٍ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم «لَوْ تَرَكَتْهُ بَيَّنَ».
বাংলা অনুবাদ: উমর একদল লোকের সঙ্গে নবীকে নিয়ে ইবন সাইয়াদের কাছে গেলেন। তাঁরা তাকে বনু মাগালার দুর্গের কাছে বালকদের সঙ্গে খেলতে দেখলেন। ইবন সাইয়াদ তখন বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। নবী হাত দিয়ে তাকে আঘাত করার আগ পর্যন্ত সে টের পায়নি। তারপর তিনি ইবন সাইয়াদকে বললেন, ‘তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আমি আল্লাহর রাসুল?’ ইবন সাইয়াদ তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি উম্মিদের রাসুল।’ এরপর ইবন সাইয়াদ নবীকে বলল, ‘আপনি কি সাক্ষ্য দেন যে আমি আল্লাহর রাসুল?’ তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস করি।’ তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী দেখো?’ ইবন সাইয়াদ বলল, ‘আমার কাছে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী আসে।’ নবী বললেন, ‘তোমার কাছে বিষয়টি মিশ্রিত হয়ে গেছে।’ তারপর নবী তাকে বললেন, ‘আমি তোমার জন্য একটি বিষয় গোপন করে রেখেছি।’ ইবন সাইয়াদ বলল, ‘সেটি দুখ।’ তিনি বললেন, ‘দূর হও! তুমি তোমার সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।’ উমর বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে তার মাথা কেটে ফেলতে দিন।’ নবী বললেন, ‘সে যদি সেই ব্যক্তি হয়, তবে তোমাকে তার ওপর ক্ষমতা দেওয়া হবে না। আর সে যদি সেই ব্যক্তি না হয়, তবে তাকে হত্যা করায় তোমার কোনো কল্যাণ নেই।’ সালিম বলেন, আমি ইবন উমরকে বলতে শুনেছি, পরে আল্লাহর রাসুল ও উবাই ইবন কাব সেই খেজুরবাগানে গেলেন, যেখানে ইবন সাইয়াদ ছিল। ইবন সাইয়াদ তাঁকে দেখার আগে তার কোনো কথা শোনার জন্য তিনি গোপনে এগোচ্ছিলেন। নবী তাকে একটি চাদরের মধ্যে শুয়ে থাকতে দেখলেন; তার মধ্য থেকে অস্পষ্ট শব্দ আসছিল। ইবন সাইয়াদের মা আল্লাহর রাসুলকে খেজুরগাছের গুঁড়ির আড়াল নিতে দেখে ইবন সাইয়াদকে বললেন, ‘ও সাফ’—এটি ছিল ইবন সাইয়াদের নাম—‘এই যে মুহাম্মদ।’ ইবন সাইয়াদ তখন উঠে পড়ল। নবী বললেন, ‘সে তাকে ছেড়ে দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যেত।’
মুহাম্মদের নিজের দাবির প্রতিধ্বনি ঘটিয়েছিল বালকটির পাল্টা প্রশ্নটি: ‘আপনি কি সাক্ষ্য দেন যে আমি আল্লাহর রাসুল?’ দুজনের দাবির সত্যতা নির্ধারণের জন্যই তাঁদের বক্তব্যের বাইরে প্রমাণ প্রয়োজন। মুহাম্মদ ইবন সাইয়াদের অভিজ্ঞতাকে মিশ্রিত বলে রায় দিলেন এবং নিজেকে তার পরীক্ষকের স্থানে বসালেন। কিন্তু কারও অভিজ্ঞতার বিচার করার ক্ষমতা দাবি করলেই নিজের অভিজ্ঞতার ঐশী উৎস প্রতিষ্ঠিত হয় না। ‘আমার কাছে আসে’ জাতীয় ব্যক্তিগত বিবরণ দিয়ে অতিপ্রাকৃত যোগাযোগ প্রমাণ করার দুর্বলতা দুই দাবির ক্ষেত্রেই কার্যকর। একজনের দাবিকে যাচাইয়ের অধীন রেখে নিজের দাবিকে সেই যাচাই থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ভিত্তি ধর্মীয় কর্তৃত্বের মধ্যেই আটকে থাকে।
গোপন বিষয় অনুমান করার পরীক্ষাটির সঙ্গেও দাজ্জালের পরিচয় নির্ধারণের যুক্তিগত ফাঁক রয়েছে। কোনো শব্দ সম্পূর্ণ বা আংশিক বলতে পারা দিয়ে ব্যক্তিটি পৃথিবীর শেষ যুগের নির্দিষ্ট প্রতারক—এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে না। অনুমান সঠিক হলে তার উৎস অনুসন্ধান প্রয়োজন; ভুল হলে তা ভুল উত্তর। ‘দুখ’ উচ্চারণ থেকে বালকটির অতিপ্রাকৃত পরিচয় নির্ধারণ করতে হলে আরও কয়েকটি অপ্রমাণিত ধারণা যোগ করতে হয়। ইবন হাজারও এই ঘটনায় মুহাম্মদের অবস্থানকে সম্ভাবনা যাচাইয়ের চেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাষায় বিষয়টি অনিশ্চিত ছিল বলেই পরীক্ষা করা হয়। [71]
قلت : ولا يتعين ذلك ، بل الذي يظهر أن أمره كان محتملا فأراد اختباره بذلك فإن أجاب غلب ترجيح أنه ليس هو ، وإن لم يجب تمادى الاحتمال ، أو أراد باستنطاقه إظهار كذبه المنافي لدعوى النبوة ، ولما كان ذلك هو المراد أجابه بجواب منصف فقال : آمنت بالله ورسله .
বাংলা অনুবাদ: আমি বলি, সেটিই নির্দিষ্টভাবে গ্রহণ করা আবশ্যক নয়। বরং স্পষ্টত মনে হয়, তার ব্যাপারটি সম্ভাবনার মধ্যে ছিল; তাই তিনি এর মাধ্যমে তাকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। সে সাড়া দিলে তার সেই ব্যক্তি না হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হতো, আর সাড়া না দিলে সম্ভাবনাটি বহাল থাকত। অথবা তাকে কথা বলিয়ে তার মিথ্যা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, যা নবুয়তের দাবির বিরোধী। এই উদ্দেশ্যেই তিনি ন্যায়সংগত উত্তর দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস করি।’
বাগানে লুকিয়ে অস্পষ্ট শব্দ শোনার চেষ্টাটিও সেই অনিশ্চয়তার বাস্তব প্রকাশ। বালকটির মা তাকে সতর্ক করে দেওয়ার পর মুহাম্মদ বলেন, তাকে ছেড়ে দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হতো। অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ থেকে পরিচয় উদ্ধার করার প্রত্যাশা ছিল। কোন উচ্চারণ পাওয়া গেলে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো, তার প্রকাশ্য মানদণ্ড বর্ণনায় নেই। ফিসফিসানি, স্বগতোক্তি বা অস্পষ্ট আওয়াজকে আগাম অতিপ্রাকৃত সন্দেহের মধ্যে স্থাপন করলে সাধারণ আচরণও রহস্যময় সংকেতে পরিণত হতে পারে। এখানে সন্দেহের লক্ষ্যবস্তু বালকটি, আর তার আচরণের অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্ক ধর্মীয় নেতার হাতে।
উমরের হত্যার প্রস্তাব এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়ংকর নৈতিক দিক। একটি বালকের অস্বাভাবিক উত্তর ও কথিত অদৃশ্য যোগাযোগ তাকে হত্যাযোগ্য সন্দেহভাজন করে তুলেছিল একজন প্রভাবশালী অনুসারীর চোখে। মুহাম্মদের শর্তযুক্ত প্রত্যাখ্যান হত্যাটি ঠেকায়; একই উত্তরে দাজ্জাল হওয়ার সম্ভাবনাও বহাল থাকে। সন্দেহ, ভয় ও ধর্মীয় শত্রুর পরিচয় একত্র হলে মানুষের নিরাপত্তা কত দ্রুত বিপন্ন হতে পারে, ঘটনাটি তার নির্দিষ্ট উদাহরণ। বালকটির বিরুদ্ধে কোনো সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বা সহিংস আক্রমণের অভিযোগ এই কথোপকথনে নেই। তবু তার মাথা কেটে ফেলার অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
পরবর্তী বয়সে ইবন সাইয়াদের সঙ্গে আবু সাঈদ খুদরির সফরের বর্ণনায় এই সন্দেহের সামাজিক পরিণতি আরও স্পষ্ট। আবু সাঈদ তার দেওয়া দুধ পর্যন্ত নিতে চাননি। ইবন সাইয়াদ অভিযোগ করেন, মানুষের কথায় অতিষ্ঠ হয়ে তিনি গলায় দড়ি দেওয়ার কথা ভেবেছেন। নিজের মুসলমান পরিচয়, সন্তান এবং মদিনা থেকে মক্কায় যাত্রার কথা তুলে তিনি দাজ্জালের বর্ণনার সঙ্গে নিজের অমিল দেখান। কথোপকথনের শেষে দাজ্জালের অবস্থান জানার দাবিও করেন; পুরো বিবরণে অভিযোগ, আত্মপক্ষসমর্থন ও নতুন রহস্যময় দাবি পাশাপাশি রয়েছে। [72]
خَرَجْنَا حُجَّاجًا أَوْ عُمَّارًا وَمَعَنَا ابْنُ صَائِدٍ قَالَ فَنَزَلْنَا مَنْزِلاً فَتَفَرَّقَ النَّاسُ وَبَقِيتُ أَنَا وَهُوَ فَاسْتَوْحَشْتُ مِنْهُ وَحْشَةً شَدِيدَةً مِمَّا يُقَالُ عَلَيْهِ قَالَ وَجَاءَ بِمَتَاعِهِ فَوَضَعَهُ مَعَ مَتَاعِي. فَقُلْتُ إِنَّ الْحَرَّ شَدِيدٌ فَلَوْ وَضَعْتَهُ تَحْتَ تِلْكَ الشَّجَرَةِ قَالَ فَفَعَلَ قَالَ فَرُفِعَتْ لَنَا غَنَمٌ فَانْطَلَقَ فَجَاءَ بِعُسٍّ فَقَالَ اشْرَبْ أَبَا سَعِيدٍ. فَقُلْتُ إِنَّ الْحَرَّ شَدِيدٌ وَاللَّبَنُ حَارٌّ. مَا بِي إِلاَّ أَنِّي أَكْرَهُ أَنْ أَشْرَبَ عَنْ يَدِهِ أَوْ قَالَ آخُذَ عَنْ يَدِهِ فَقَالَ أَبَا سَعِيدٍ لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آخُذَ حَبْلاً فَأُعَلِّقَهُ بِشَجَرَةٍ ثُمَّ أَخْتَنِقَ مِمَّا يَقُولُ لِيَ النَّاسُ يَا أَبَا سَعِيدٍ مَنْ خَفِيَ عَلَيْهِ حَدِيثُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا خَفِيَ عَلَيْكُمْ مَعْشَرَ الأَنْصَارِ أَلَسْتَ مِنْ أَعْلَمِ النَّاسِ بِحَدِيثِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَلَيْسَ قَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «هُوَ كَافِرٌ». وَأَنَا مُسْلِمٌ أَوَلَيْسَ قَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «هُوَ عَقِيمٌ لاَ يُولَدُ لَهُ». وَقَدْ تَرَكْتُ وَلَدِي بِالْمَدِينَةِ أَوَ لَيْسَ قَدْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «لاَ يَدْخُلُ الْمَدِينَةَ وَلاَ مَكَّةَ». وَقَدْ أَقْبَلْتُ مِنَ الْمَدِينَةِ وَأَنَا أُرِيدُ مَكَّةَ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ حَتَّى كِدْتُ أَنْ أَعْذِرَهُ. ثُمَّ قَالَ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَعْرِفُهُ وَأَعْرِفُ مَوْلِدَهُ وَأَيْنَ هُوَ الآنَ. قَالَ قُلْتُ لَهُ تَبًّا لَكَ سَائِرَ الْيَوْمِ.
বাংলা অনুবাদ: আবু সাঈদ খুদরি বলেন, আমরা হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম; আমাদের সঙ্গে ইবন সায়িদও ছিল। আমরা এক জায়গায় নামলাম। লোকজন ছড়িয়ে পড়ল, আমি ও সে রয়ে গেলাম। তাকে নিয়ে যেসব কথা বলা হতো, তার কারণে আমি তাকে খুব ভয় পাচ্ছিলাম। সে নিজের মালপত্র এনে আমার মালপত্রের সঙ্গে রাখল। আমি বললাম, ‘প্রচণ্ড গরম; তুমি যদি ওগুলো ওই গাছের নিচে রাখতে।’ সে তা-ই করল। আমাদের সামনে কিছু ভেড়া দেখা গেল। সে গিয়ে একটি পাত্র নিয়ে এল এবং বলল, ‘আবু সাঈদ, পান করুন।’ আমি বললাম, ‘প্রচণ্ড গরম, দুধও গরম।’ আসলে তার হাত থেকে পান করতে—অথবা তার হাত থেকে নিতে—আমার অনীহা হচ্ছিল। সে বলল, ‘আবু সাঈদ, মানুষ আমাকে যেসব কথা বলে, তার কারণে আমি একটি দড়ি নিয়ে গাছে ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়ার কথা ভেবেছি। আবু সাঈদ, আল্লাহর রাসুলের হাদিস অন্য কারও অজানা হলেও তোমাদের আনসারদের তো অজানা নয়। আপনি কি আল্লাহর রাসুলের হাদিস সম্পর্কে সবচেয়ে অবগত লোকদের একজন নন? আল্লাহর রাসুল কি বলেননি, সে কাফির? অথচ আমি মুসলমান। আল্লাহর রাসুল কি বলেননি, সে বন্ধ্যা, তার সন্তান হবে না? অথচ আমি আমার সন্তানকে মদিনায় রেখে এসেছি। আল্লাহর রাসুল কি বলেননি, সে মদিনা ও মক্কায় প্রবেশ করবে না? অথচ আমি মদিনা থেকে এসেছি এবং মক্কায় যেতে চাই।’ আবু সাঈদ খুদরি বলেন, আমি প্রায় তার ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলাম। তারপর সে বলল, ‘আল্লাহর শপথ, আমি অবশ্যই তাকে চিনি, তার জন্মস্থান চিনি এবং এখন সে কোথায় আছে তা-ও জানি।’ আমি তাকে বললাম, ‘তোমার সারাটা দিন ধ্বংস হোক!’
এই পরবর্তী কথোপকথনে ইবন সাইয়াদ প্রাপ্তবয়স্ক; প্রথম সাক্ষাতের বালকটির সঙ্গে বয়সের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তত দিনে তাকে ঘিরে দাজ্জাল-সন্দেহ মানুষের আচরণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবু সাঈদ নিজেই স্বীকার করেছেন, গরমের অজুহাতের পেছনে ছিল তার হাত থেকে দুধ গ্রহণের অনীহা। সন্দেহের সামাজিক মূল্য দিতে হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে—নিজের ধর্ম, সন্তান ও যাতায়াত তুলে ধরে পরিচয় ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে; মানুষের কথায় মৃত্যুচিন্তার অভিযোগ জানাতে হচ্ছে। শেষে তার রহস্যময় দাবি নতুন সন্দেহ তৈরি করে। এই পরিণতি ধর্মীয় আতঙ্কের একটি নিষ্ঠুর চক্র দেখায়: অস্পষ্ট দাবিকে অশুভ পরিচয়ের প্রমাণ ধরা হয়, সেই পরিচয় সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে, এবং পরবর্তী কথাবার্তাও একই সন্দেহের আলোয় বিচার করা হয়।
| বর্ণনায় সংরক্ষিত বিষয় | সরাসরি যে সমস্যা উঠে আসে |
|---|---|
| বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি বালককে দাজ্জাল সন্দেহে পরীক্ষা | ধর্মীয় মহাবিপদের কল্পনা একটি নির্দিষ্ট বালকের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। |
| গোপন বিষয়ের জবাবে ‘দুখ’ উচ্চারণ | একটি উত্তর থেকে অতিপ্রাকৃত পরিচয়ে পৌঁছানোর যাচাইকৃত যোগসূত্র অনুপস্থিত। |
| খেজুরগাছের আড়াল থেকে অস্পষ্ট শব্দ শোনার চেষ্টা | সন্দেহ মেটাতে গোপন পর্যবেক্ষণের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে; পরিচয় সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বহাল ছিল। |
| উমরের মাথা কেটে ফেলার অনুমতি চাওয়া | অপ্রমাণিত ধর্মীয় সন্দেহের মধ্যে প্রাণঘাতী সহিংসতার প্রস্তাব উঠেছে। |
| পরবর্তী সফরে আবু সাঈদের ভয় ও ইবন সাইয়াদের অভিযোগ | দাজ্জাল-সন্দেহ ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক দুর্ভোগে বাস্তব প্রভাব ফেলেছে। |
মুহাম্মদের আচরণে এখানে দেখা যায় অশুভ পরিচয়ের সন্দেহ, পরীক্ষা, গোপন অনুসন্ধান এবং শর্তযুক্ত সিদ্ধান্ত। এই নির্দিষ্ট আচরণগুলো বিচার করতে কোনো রোগের নাম বসানোর প্রয়োজন পড়ে না। অন্য একজনের অদৃশ্য যোগাযোগের দাবি নিয়ে তিনি যে যাচাই ও সন্দেহ প্রয়োগ করেছিলেন, তাঁর নিজের দাবিও একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। আর সন্দেহভাজনের মাথা কাটার প্রস্তাব দেখায়, ধর্মীয় কল্পনা ক্ষমতাবান মানুষের হাতে পড়লে তার পরিণতি কতটা সহিংস হতে পারে।
ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ ও জাগ্রত অবস্থায় দৃশ্য দেখার বর্ণনা
ওহির সঙ্গে যুক্ত ঘণ্টাধ্বনির বর্ণনা শ্রবণ-অভিজ্ঞতার একটি নির্দিষ্ট ধরন সামনে আনে। হারিস ইবন হিশামের প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদ জানান, কখনো তা ঘণ্টাধ্বনির মতো আসে, সেই ধরনটি তাঁর জন্য সবচেয়ে কষ্টকর এবং অবস্থা শেষ হওয়ার সময় তিনি বক্তব্য উপলব্ধি করে ফেলেন। কখনো ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এখানে ধ্বনির অনুভব, তার সঙ্গে কষ্ট এবং বক্তব্য বুঝে যাওয়ার দাবি একত্রে রয়েছে। আয়িশার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ হিসেবে রয়েছে শীতের দিনেও কপালে ঘাম ঝরা। ঘণ্টার মতো শব্দের উৎস ও বক্তব্যের ঐশী পরিচয় এসেছে মুহাম্মদের ব্যাখ্যায়। [73]
ঘণ্টাধ্বনির মতো একটি শ্রুতির সঙ্গে অর্থবহ বক্তব্য বোঝার সম্পর্কটিও আলাদা প্রশ্ন তৈরি করে। ধাতব ধ্বনির বর্ণনা এবং ভাষার অর্থ উপলব্ধি দুটি পৃথক বৈশিষ্ট্য। মুহাম্মদ দুটিকেই একই অভিজ্ঞতার মধ্যে স্থাপন করেছেন; কীভাবে ধ্বনি থেকে নির্দিষ্ট বাক্য বা অর্থ উপলব্ধ হলো, তার পরীক্ষাযোগ্য প্রক্রিয়া হাদিসটি দেয় না। অভিজ্ঞতার শেষে তাঁর বক্তব্য মনে থাকার দাবি রয়েছে। সেই বক্তব্যের উৎস নির্ধারণে তাঁর নিজের নিশ্চিত অনুভূতিই প্রমাণের প্রধান অবলম্বন। ব্যক্তিগত নিশ্চয়তাকে ঐশী উৎসের নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রহণ করলেই নবুয়তের দাবিটি বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়ে: তিনি জানেন এটি ওহি, কারণ তাঁর কাছে এটি ওহি বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
বাহ্যিক উৎস ছাড়াও শব্দ শোনার অনুভূতি মানুষের শ্রবণব্যবস্থায় ঘটতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ডেফনেস অ্যান্ড আদার কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস টিনিটাসের বিবরণে ঘণ্টা বাজা, গর্জন বা গুঞ্জনের মতো শব্দের উল্লেখ করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অনুভূতির স্বাভাবিক অনুসন্ধান চলে শ্রবণব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট শারীরিক কারণ নিয়ে। ঘণ্টার মতো ধ্বনি অনুভব করার সঙ্গে বাস্তবে ঘণ্টা বা অন্য কোনো বহিরাগত শব্দসৃষ্টিকারী সত্তার উপস্থিতির পার্থক্য সেখানেই। [74]
Tinnitus is commonly described as a ringing sound, but some people hear other types of sounds, such as roaring or buzzing.
বাংলা অনুবাদ: টিনিটাসকে সাধারণত ঘণ্টা বাজার মতো শব্দ হিসেবে বর্ণনা করা হয়; তবে কেউ কেউ গর্জন বা গুঞ্জনের মতো অন্য ধরনের শব্দও শোনেন।
মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলে উৎপন্ন খিঁচুনির সঙ্গেও অস্বাভাবিক শ্রবণ ও দৃশ্য-অভিজ্ঞতার সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক মৃগীরোগবিষয়ক সংস্থা আইএলএই সাধারণ গুঞ্জন বা ঘণ্টাধ্বনির মতো অনুভূতি এবং কণ্ঠস্বর শোনার মতো জটিল অনুভূতিকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করেছে। একইভাবে আলো ঝলকানো ও গঠিত দৃশ্য দেখার মধ্যেও পার্থক্য করেছে। এই পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘অদ্ভুত কিছু শোনা বা দেখা’ একটি বিস্তৃত বর্ণনা; তার বিভিন্ন রূপের সম্ভাব্য প্রক্রিয়াও ভিন্ন। আইএলএইর শ্রেণিবিন্যাসে শ্রুতিসংক্রান্ত অনুচ্ছেদটি বলছে: [75]
Focal sensory auditory seizure – characterized by elementary auditory phenomena including buzzing, ringing, drumming or single tones. More complex auditory hallucinations such as voices are considered a focal cognitive seizure. Focal sensory auditory seizures involve auditory cortex in the lateral superior temporal lobe.
বাংলা অনুবাদ: কেন্দ্রিক শ্রুতিসংবেদনমূলক খিঁচুনি—এর বৈশিষ্ট্য হলো গুঞ্জন, ঘণ্টাধ্বনি, ঢোলের মতো শব্দ বা একক সুরসহ সাধারণ শ্রুতিসংক্রান্ত অনুভূতি। কণ্ঠস্বর শোনার মতো অধিক জটিল শ্রুতিভ্রমকে কেন্দ্রিক জ্ঞানীয় খিঁচুনি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেন্দ্রিক শ্রুতিসংবেদনমূলক খিঁচুনির সঙ্গে ঊর্ধ্ব টেম্পোরাল লোবের পার্শ্বীয় অংশে অবস্থিত শ্রবণ কর্টেক্স যুক্ত থাকে।
মুহাম্মদের বর্ণনার সঙ্গে এই চিকিৎসাগত বিবরণগুলোর মিল সম্ভাব্য প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন তোলে। ঘণ্টার মতো ধ্বনির উল্লেখ একাধিক অবস্থার সঙ্গে মেলে; নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করতে ধ্বনির স্থায়িত্ব, পুনরাবৃত্তির ধরন, শ্রবণক্ষমতা, চেতনার অবস্থা ও পরীক্ষার ফল প্রয়োজন। হাদিসে সংরক্ষিত অভিজ্ঞতার বিবরণে সেই তথ্যগুলো অসম্পূর্ণ। ফলে অনুসন্ধানের যথার্থ কেন্দ্র হলো তাঁর অনুভূতি থেকে ফেরেশতার উপস্থিতিতে পৌঁছানোর প্রমাণগত ব্যবধান। কষ্টের তীব্রতা এবং স্মৃতিতে বক্তব্য থেকে যাওয়া দিয়ে ধ্বনির অলৌকিক উৎস নির্ধারণ করা যায় না।
দৃশ্য-অভিজ্ঞতার বর্ণনাও একই সমস্যাকে আরও বড় পরিসরে হাজির করে। জাবিরের সূত্রে মুহাম্মদের বক্তব্য অনুযায়ী, হাঁটার সময় তিনি আকাশ থেকে শব্দ শুনে তাকিয়ে আসমান ও জমিনের মাঝখানে কুরসিতে বসা সেই ফেরেশতাকে দেখেন, যিনি হেরায় এসেছিলেন; এরপর ভয়ে ফিরে গিয়ে নিজেকে ঢেকে দিতে বলেন। বুখারির আরেক বর্ণনায় ইবন মাসউদের সূত্রে ছয়শ ডানাবিশিষ্ট জিবরাইলকে দেখার কথা রয়েছে। ব্যক্তিগত দর্শনের সঙ্গে এখানে একটি বিশাল, নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সত্তার পরিচয় যুক্ত হয়েছে। [76] [77]
قَالَ سَأَلْتُ زِرَّ بْنَ حُبَيْشٍ عَنْ قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى {فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى * فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى}. قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ مَسْعُودٍ أَنَّهُ رَأَى جِبْرِيلَ لَهُ سِتُّمِائَةِ جَنَاحٍ.
বাংলা অনুবাদ: আবু ইসহাক শাইবানি বলেন, আমি জির ইবন হুবাইশকে আল্লাহর এই বক্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম: ‘অতঃপর দূরত্ব হলো দুই ধনুক পরিমাণ কিংবা আরও কম। তারপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহি করার তা করলেন।’ তিনি বললেন, ইবন মাসউদ আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি [মুহাম্মদ] জিবরাইলকে দেখেছিলেন; তাঁর ছয়শ ডানা ছিল।
আয়িশার বক্তব্যে এই দৃশ্য আরও বিস্তৃত—জিবরাইলের আকৃতি দিগন্ত ঢেকে রেখেছিল। একই বক্তব্যে তিনি মুহাম্মদের আল্লাহকে দেখার দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থাৎ দেখা সত্তার পরিচয় নিয়ে ধর্মীয় বর্ণনার ভেতরেই নির্দিষ্ট অবস্থান রয়েছে। আয়িশা ঘটনাটির দৃশ্য নিজে দেখেছেন বলে এই হাদিসে জানাননি; তিনি মুহাম্মদের দর্শনের পরিচয় ব্যাখ্যা করছেন। [78]
عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ قَالَتْ مَنْ زَعَمَ أَنَّ مُحَمَّدًا رَأَى رَبَّهُ فَقَدْ أَعْظَمَ، وَلَكِنْ قَدْ رَأَى جِبْرِيلَ فِي صُورَتِهِ، وَخَلْقُهُ سَادٌّ مَا بَيْنَ الأُفُقِ.
বাংলা অনুবাদ: আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘যে দাবি করে মুহাম্মদ তাঁর রবকে দেখেছেন, সে গুরুতর কথা বলেছে। বরং তিনি জিবরাইলকে তাঁর নিজস্ব আকৃতিতে দেখেছেন; তাঁর আকৃতি দিগন্ত ঢেকে রেখেছিল।’
দিগন্ত ঢেকে রাখা সত্তার বর্ণনায় আয়তন যত বিশাল, স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রশ্নটিও তত সরাসরি। এই নির্দিষ্ট হাদিসগুলোতে আশপাশের মানুষ একই ছয়শ ডানাবিশিষ্ট সত্তাকে একই সময়ে দেখে তার বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছে—এমন সাক্ষ্য দেওয়া হয়নি। ইবন মাসউদ ও আয়িশা এখানে দর্শনের বর্ণনাকারী; উদ্ধৃত বক্তব্যে তাঁরা নিজেদের সেই দৃশ্যের সহদর্শক হিসেবে পরিচয় দেননি। ফলে বর্ণনাটি প্রচারিত হওয়ার সাক্ষ্য এবং দৃশ্যটি বাহ্যিক জগতে উপস্থিত থাকার সাক্ষ্যকে এক করে ফেললে দাবির পক্ষে প্রমাণ কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়। ব্যক্তিগত দর্শনের তীব্রতা, বিশালতা ও ভয়ের প্রতিক্রিয়া অভিজ্ঞতার মানসিক প্রভাব বোঝায়; বাস্তব বহির্জগতের সত্তা শনাক্ত করতে স্বাধীন সাক্ষ্য প্রয়োজন।
শ্রুতি ও দৃশ্যের সঙ্গে ধর্মীয় অর্থ যুক্ত হওয়ার ধাপটিই এখানে কেন্দ্রীয়। প্রথমে একটি অনুভব: ধ্বনি শোনা, আকৃতি দেখা, ভয় পাওয়া। এরপর সেই অনুভবের পরিচয়: এটি জিবরাইল, বক্তব্যটি আল্লাহর। দ্বিতীয় ধাপের সত্যতা প্রথম ধাপের তীব্রতা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মানুষের মস্তিষ্ক শব্দ, উপস্থিতি ও দৃশ্যের প্রবল অনুভূতি তৈরি করতে সক্ষম—চিকিৎসাবিজ্ঞানের নথিবদ্ধ অভিজ্ঞতাগুলো সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব ভিত্তি দেয়। মুহাম্মদের দাবির অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যাকে সত্য ধরে নিয়ে এই প্রাকৃতিক অনুসন্ধান বন্ধ করা ধর্মীয় পক্ষপাত। তাঁর নিজের নিশ্চিত বিশ্বাস অনুসন্ধানের বিষয়; সেই বিশ্বাসকে অনুসন্ধানের চূড়ান্ত রায় বানালে প্রমাণের জায়গা দখল করে নেয় কর্তৃত্ব।
তন্দ্রার মধ্যে সূরা কাউসারপ্রাপ্তি
আনাস ইবন মালিকের বর্ণনায় মুহাম্মদের একটি সংক্ষিপ্ত তন্দ্রার পরপরই নতুন সূরা অবতীর্ণ হওয়ার ঘোষণা পাওয়া যায়। তিনি উপস্থিত লোকদের মধ্যে ছিলেন, কিছুক্ষণের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হন, তারপর হাসিমুখে মাথা তোলেন। লোকেরা হাসির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর ওপর এইমাত্র একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর সূরা কাউসার পাঠ করেন এবং কাউসারকে তাঁর জন্য প্রতিশ্রুত নদী ও হাউজের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা দেন। এই ঘটনার বিশেষত্ব হলো, তন্দ্রা, মাথা তোলা, হাসি, প্রশ্নের উত্তর এবং সূরা পাঠ—একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় সংরক্ষিত হয়েছে। সহিহ মুসলিমে আনাসের বর্ণনার মূল বক্তব্য এবং শেষে বর্ণনাভেদের নোটটি রয়েছে এভাবে: [79]
بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ يَوْمٍ بَيْنَ أَظْهُرِنَا إِذْ أَغْفَى إِغْفَاءَةً ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ مُتَبَسِّمًا فَقُلْنَا مَا أَضْحَكَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ «أُنْزِلَتْ عَلَىَّ آنِفًا سُورَةٌ». فَقَرَأَ «بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ {إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ * فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ * إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُ}». ثُمَّ قَالَ «أَتَدْرُونَ مَا الْكَوْثَرُ». فَقُلْنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ «فَإِنَّهُ نَهْرٌ وَعَدَنِيهِ رَبِّي عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ هُوَ حَوْضٌ تَرِدُ عَلَيْهِ أُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ آنِيَتُهُ عَدَدُ النُّجُومِ فَيُخْتَلَجُ الْعَبْدُ مِنْهُمْ فَأَقُولُ رَبِّ إِنَّهُ مِنْ أُمَّتِي. فَيَقُولُ مَا تَدْرِي مَا أَحْدَثَتْ بَعْدَكَ». زَادَ ابْنُ حُجْرٍ فِي حَدِيثِهِ بَيْنَ أَظْهُرِنَا فِي الْمَسْجِدِ. وَقَالَ «مَا أَحْدَثَ بَعْدَكَ».
বাংলা অনুবাদ: আনাস বলেন, একদিন আল্লাহর রাসুল আমাদের মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি কিছুক্ষণের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন। এরপর হাসিমুখে মাথা তুললেন। আমরা বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, কী আপনাকে হাসাল?’ তিনি বললেন, ‘আমার ওপর এইমাত্র একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে।’ তারপর তিনি পাঠ করলেন, ‘পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে। নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাউসার দিয়েছি। অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো। নিশ্চয়ই তোমার প্রতি বিদ্বেষপোষণকারীই নির্বংশ।’ এরপর তিনি বললেন, ‘তোমরা কি জানো কাউসার কী?’ আমরা বললাম, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সবচেয়ে ভালো জানেন।’ তিনি বললেন, ‘এটি একটি নদী, যার প্রতিশ্রুতি আমার মহামহিম রব আমাকে দিয়েছেন; এতে প্রচুর কল্যাণ রয়েছে। এটি এমন একটি হাউজ, যেখানে কেয়ামতের দিন আমার উম্মত উপস্থিত হবে। এর পাত্রের সংখ্যা নক্ষত্রের সংখ্যার সমান। তাদের মধ্য থেকে এক বান্দাকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তখন আমি বলব, হে রব, সে তো আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলবেন, তোমার পরে তারা কী নতুন বিষয় ঘটিয়েছে, তুমি তা জানো না।’ ইবন হুজর তাঁর বর্ণনায় ‘আমাদের মধ্যে মসজিদে’ কথাটি বাড়িয়েছেন এবং বলেছেন, ‘তোমার পরে সে কী নতুন বিষয় ঘটিয়েছে।’
আরবির «أَغْفَى إِغْفَاءَةً» অল্প সময়ের ঘুম বা তন্দ্রা বোঝায়। এর পরেই মাথা তোলা, হাসি এবং প্রশ্নের উত্তর এসেছে। মুহাম্মদ «آنِفًا»—‘এইমাত্র’—শব্দে সূরা অবতীর্ণ হওয়ার সময় চিহ্নিত করেছেন। তন্দ্রা ও ঘোষণার মাঝে অন্যত্র যাওয়া বা নতুন সাক্ষাতের কোনো বিবরণ নেই। কাউসার নদীর কথা এসেছে পরবর্তী ব্যাখ্যায়; তন্দ্রার মধ্যে ঠিক কী দেখেছিলেন বা শুনেছিলেন, আনাস তা বর্ণনা করেননি। সংরক্ষিত ঘটনাক্রমে তাই অল্প তন্দ্রার পরেই নতুন ধর্মীয় পাঠপ্রাপ্তির ঘোষণা রয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে ধ্রুপদি ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যেও তন্দ্রা ও ওহির সম্পর্কের প্রশ্ন উঠেছে। সুয়ুতি ‘আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন’-এর ‘শয্যায় ও ঘুমে অবতীর্ণ’ বিষয়ক আলোচনায় সূরা কাউসারের এই বর্ণনা এনেছেন। তিনি রাফিয়ীর আলোচনা উদ্ধৃত করেছেন—কেউ ঘটনাটিকে ঘুমের মধ্যে সূরা অবতরণের বিবরণ হিসেবে বুঝেছেন; রাফিয়ী আগে অবতীর্ণ সূরা ঘুমের মধ্যে মনে আসা অথবা কাউসার দেখানোর সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। সুয়ুতি আগেই অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ‘এইমাত্র অবতীর্ণ হয়েছে’ কথাটি তুলে ধরেন। এরপর তন্দ্রাকে সাধারণ ঘুমের পরিবর্তে ওহির সময়কার বিশেষ অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর সম্পূর্ণ মন্তব্যটি হলো: [80]
قلت : الذي قاله الرافعي في غاية الاتجاه ، وهو الذي كنت أميل إليه قبل الوقوف عليه ، والتأويل الأخير أصح من الأول ; لأن قوله : ” أنزل علي آنفا ” يدفع كونها نزلت قبل ذلك ، بل نقول : نزلت تلك الحالة ، ليس الإغفاء إغفاء نوم ، بل الحالة التي كانت تعتريه عند الوحي ، فقد ذكر العلماء أنه كان يؤخذ عن الدنيا .
বাংলা অনুবাদ: আমি বলি, রাফিয়ী যা বলেছেন তা অত্যন্ত সংগত; তাঁর বক্তব্য দেখার আগেও আমি এই অভিমতের দিকে ঝুঁকেছিলাম। শেষ ব্যাখ্যাটি প্রথমটির চেয়ে বেশি সঠিক। কারণ, তাঁর ‘আমার ওপর এইমাত্র অবতীর্ণ হয়েছে’ কথাটি এর আগে তা অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাখ্যাকে খণ্ডন করে। বরং আমরা বলি, ওই অবস্থাতেই তা অবতীর্ণ হয়েছে; তন্দ্রাটি ঘুমের তন্দ্রা ছিল না, বরং ওহির সময় তাঁর যে অবস্থা হতো সেটিই ছিল। আলেমরা উল্লেখ করেছেন যে তখন তিনি পার্থিব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেন।
সুয়ুতি ‘এইমাত্র’ শব্দটির ভিত্তিতে আগে অবতীর্ণ সূরা মনে পড়ার ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারপর আনাসের ব্যবহৃত তন্দ্রার শব্দটিকে সাধারণ ঘুমের বদলে ওহির বিশেষ অবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই ব্যাখ্যায় তন্দ্রার পরিচয় বদলেছে, কিন্তু নতুন কোনো প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ যুক্ত হয়নি। তিনি নিজেও অবস্থাটিকে পার্থিব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভাষায় বর্ণনা করেছেন। আনাসের দেখা অবস্থা ও সুয়ুতির ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পৃথক তথ্য; পরেরটি আগেরটির শারীরিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে না।
সূরা পাঠের পরে মুহাম্মদ ভবিষ্যতের নদী, হাউজ এবং উম্মতের একজনকে সরিয়ে নেওয়ার কথোপকথন বর্ণনা করেন। সেই কথোপকথনে ব্যক্তিটিকে নিজের উম্মতের সদস্য হিসেবে চিনলেও তার পরবর্তী কাজ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কথা তাঁর নিজের বক্তব্যেই রয়েছে। উপস্থিত লোকদের সামনে ঘটে তন্দ্রা থেকে মাথা তোলা ও বক্তব্য দেওয়া; নদী ও ভবিষ্যৎ কথোপকথন সেই বক্তব্যের বিষয়বস্তু।
| ঘটনাসংক্রান্ত বিষয় | বর্ণনায় পাওয়া তথ্য |
|---|---|
| বর্ণনাকারী ও উপস্থিতি | আনাস ইবন মালিক; ‘আমাদের মধ্যে’ কথাটি প্রত্যক্ষ উপস্থিতির বিবরণ দেয়। |
| স্থান | ইবন হুজরের বর্ণনাভেদে মসজিদ উল্লেখিত। |
| প্রাথমিক অবস্থা | অল্প সময়ের ঘুম বা তন্দ্রা; নির্দিষ্ট সময়কাল দেওয়া হয়নি। |
| অবস্থার পরবর্তী পরিবর্তন | হাসিমুখে মাথা তোলা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং সূরা পাঠ করা। |
| মুহাম্মদের নিজের ঘোষণা | এইমাত্র তাঁর ওপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। |
| ঘোষণার পরবর্তী বিষয়বস্তু | কাউসারের ব্যাখ্যা, ভবিষ্যৎ হাউজ এবং উম্মতের একজনকে সরিয়ে নেওয়ার বিবরণ। |
| তন্দ্রার অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা | স্বপ্নের দৃশ্য, কণ্ঠস্বর বা অনুভূতির পৃথক বিবরণ নেই। |
| অন্যান্য শারীরিক লক্ষণের বিবরণ | খিঁচুনি, শরীর শক্ত হওয়া, মাটিতে পড়ে যাওয়া কিংবা দীর্ঘ বিভ্রান্তির উল্লেখ নেই। |
| পুনরাবৃত্তি ও পরবর্তী শারীরিক অবস্থা | এই বর্ণনায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির হার, দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বা চিকিৎসাগত পরীক্ষার তথ্য নেই। |
উপসংহার
মুহাম্মদের জীবনসংক্রান্ত ইসলামি বর্ণনায় প্রবল ঘাম, মুখের রং পরিবর্তন, অস্বাভাবিক শব্দ, অজ্ঞান হয়ে পড়া, তীব্র আতঙ্ক, তন্দ্রা এবং না-করা কাজ করেছেন বলে মনে হওয়ার মতো বিবরণ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কণ্ঠস্বর শোনা, বিশাল আকৃতি দেখা, ঘুমের মধ্যে স্পর্শ অনুভব এবং নির্জীব বস্তুর সঙ্গে যোগাযোগের দাবি। কিছু বর্ণনায় অনুসারীরা তাঁর শরীরের পরিবর্তন দেখেছেন; কিছুতে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথা পৌঁছে দিয়েছেন; কিছু ঘটনা অলৌকিক কাহিনি হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। এই পৃথক ধরনের বিবরণ একত্রে তাঁর শারীরিক অবস্থা, উপলব্ধি, স্মৃতি, আবেগ ও বিশ্বাস সম্পর্কে অনুসন্ধানের বিস্তৃত উপাদান সরবরাহ করে। ধর্মীয় মর্যাদার কারণে এসব তথ্যকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার কোনো যুক্তি নেই।
সাড়ে চৌদ্দশ বছর পর নির্দিষ্ট রোগের চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত তথ্য এই বর্ণনাগুলো দেয় না। মৃগীরোগ স্নায়বিক রোগ; তন্দ্রা, ভয়, স্মৃতির ভুল এবং অস্বাভাবিক উপলব্ধির প্রতিটি ঘটনাকে একই রোগের লক্ষণ ধরে নিলেও ভুল হবে। কিন্তু সংরক্ষিত আচরণ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার মিল অনুসন্ধানের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। অসাধারণ অনুভূতি ঘটেছে বলে তার অসাধারণ ধর্মীয় ব্যাখ্যাও সত্য—এই সিদ্ধান্ত প্রমাণহীন। অনুভূতির কারণ, অভিজ্ঞ ব্যক্তির ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী অনুসারীদের বিশ্বাস তিনটি পৃথক বিষয়।
সাধারণ একজন মানুষ অদৃশ্য কণ্ঠস্বর, নিজের জন্য বিশেষ বার্তা, ঘুমের মধ্যে অতিপ্রাকৃত স্পর্শ কিংবা বাস্তবে না-ঘটা কাজের নিশ্চিত অনুভূতির কথা জানালে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বাভাবিক অনুসন্ধান চলে। মুহাম্মদের ক্ষেত্রেও সেই অনুসন্ধান প্রযোজ্য। তাঁর অনুসারীর সংখ্যা, প্রতিষ্ঠিত ধর্মের বিস্তার কিংবা শতাব্দীর ভক্তি তাঁর বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণ করে না। তাঁর শরীর ও মস্তিষ্ককে প্রাকৃতিক কার্যকারণের বাইরে রাখার দাবির পক্ষে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। নবী পরিচয়কে আগেই সত্য ধরে নিয়ে প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে অলৌকিক ঘোষণা করা সেই প্রমাণের বদলে বিশ্বাসকে বসিয়ে দেয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য বাধ্যতামূলক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবির ওপরই সবচেয়ে কঠোর প্রমাণের দায় বর্তায়।
তথ্যসূত্রঃ
- ইন্টারন্যাশনাল লিগ এগেইনস্ট এপিলেপ্সি, রোগী ও পরিচর্যাকারীদের জন্য ২০১৪ সালের সংজ্ঞার ব্যাখ্যা ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ‘الصرع’, কারণ ও রোগপরিচয় ↩︎
- এনএইচএস, মৃগীরোগ: লক্ষণ ও আক্রমণের সম্ভাব্য প্ররোচনা ↩︎
- ইন্টারন্যাশনাল লিগ এগেইনস্ট এপিলেপ্সি, টেম্পোরাল লোব সিজারের চিকিৎসাগত বিবরণ ↩︎
- ইন্টারন্যাশনাল লিগ এগেইনস্ট এপিলেপ্সি, জ্ঞানগত সিজার: হ্যালুসিনেশনসংক্রান্ত বিবরণ ↩︎
- নেনচা ও সহলেখক, ‘Insular Stimulation Produces Mental Clarity and Bliss’, Annals of Neurology, ২০২২, খণ্ড ৯১, পৃষ্ঠা ২৮৯–২৯২ ↩︎
- এনএইচএস, মৃগীরোগের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ‘الصرع’, চিকিৎসা ↩︎
- ইন্টারন্যাশনাল লিগ এগেইনস্ট এপিলেপ্সি, টনিক-ক্লোনিক সিজার ও তার ভিন্নতা ↩︎
- জনস হপকিন্স মেডিসিন, টনিক-ক্লোনিক সিজার ↩︎
- জনস হপকিন্স মেডিসিন, টনিক, ক্লোনিক ও আক্রমণ-পরবর্তী পর্যায় ↩︎
- ইন্টারন্যাশনাল লিগ এগেইনস্ট এপিলেপ্সি, ‘Syncope and anoxic seizures’ ও ‘Vasovagal syncope’ ↩︎
- এনএইচএস, স্লিপ অ্যাপনিয়া: লক্ষণ ও চিকিৎসা ↩︎
- এনএইচএস, কারও খিঁচুনি হলে করণীয় ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ২ ↩︎
- সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিস ৪৭৫০ ↩︎
- সহিহ বুখারি ৪৭৫০, ইফকের বর্ণনায় ওহির সময় কষ্ট ও ঘামের ঘটনাংশ ↩︎
- আনা ক্যাটারিনা ফ্রাঙ্কো, সোহেইল নোয়াখটার ও ইয়ান রেমি, ‘Ictal ipsilateral sweating in focal epilepsy’, Seizure, ২০১৭, খণ্ড ৫০, পৃষ্ঠা ৪–৫ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ৮ম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২২৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, হাদিস একাডেমি, হাদিস ৪৩০৮; আন্তর্জাতিক নম্বর ১৬৯০ ↩︎
- সহিহ মুসলিম ১৬৯০গ, উবাদা ইবন সামিতের বর্ণনা ↩︎
- নববি, শরহু সহিহ মুসলিম, কিতাবুল হুদুদ, ব্যভিচারের শাস্তি অধ্যায় ↩︎
- জনস হপকিন্স মেডিসিন, টনিক-ক্লোনিক সিজারের পরবর্তী অবস্থা ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ৪৭৩৮; ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে ৪৬৬৩ ↩︎
- আওনুল মাবুদ, কিতাবুস সুন্নাহ, ‘কোরআন সম্পর্কে’ অধ্যায় ↩︎
- সহিহ বুখারি, ১৭৮৯ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ১৭৮৯: আরবি পাঠ ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৩৩৬৭৮০; আল-খাত্তাবি, শারহুল বুখারি, ১/৪৭৯ থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
- জনস হপকিন্স মেডিসিন: টনিক-ক্লোনিক খিঁচুনির লক্ষণ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ১১৮০গ; হাদিস একাডেমি, ২৬৯০ ↩︎
- মেডলাইনপ্লাস: ত্বক লাল হয়ে যাওয়া ↩︎
- আইএলএই: স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রসংক্রান্ত কেন্দ্রিক খিঁচুনি ↩︎
- সহিহ বুখারি, ২৮৩২ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৩৮২৯ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৩৬৪ ↩︎
- ইবন হাজার, ফাতহুল বারি, কাবা নির্মাণ অধ্যায় 1 2
- ইবন হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৪; শৈশবে সুরক্ষার বর্ণনা ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৬৯৮২; স্বপ্নের ব্যাখ্যা, ওহির সূচনা ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ১৫২৬১১; ফাতহুল বারি, ১২/৩৫৯ থেকে ইবন হাজারের ব্যাখ্যা ↩︎
- জামে তিরমিজি, ২১৮৭ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৩৩৪৬ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ২৮৮০ক ↩︎
- এনএইচএস: ঘুমের আতঙ্ক ও দুঃস্বপ্ন ↩︎
- কোরআন, সূরা কাহফ ১৮:৯৬–৯৮ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ৮৯৯ক ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ৮৯৯খ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৪৮২৮–৪৮২৯ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৫৭৬৫ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৫৭৬৩ ↩︎
- আল-লুলু ওয়াল মারজান, ১৪১২ ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ২৫৮২১০; কাজি ইয়াজ, আশ-শিফা, ২/১৬০ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ১২২৯; নামাজে ভুল ↩︎
- সহিহ বুখারি, ১২২৬ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৫০৩৮ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ২২৭৭; হাদিস একাডেমি, ৫৮৩৩ ↩︎
- এনএইচএস: হ্যালুসিনেশন ও কণ্ঠস্বর শোনা ↩︎
- নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, ১৫/৩৬; আদ-দুরারুস সানিয়্যার উদ্ধৃতি ↩︎
- জামে তিরমিজি, ৩৬২৬ ↩︎
- ইসলামওয়েব: পাথরের সালাম ↩︎
- সুনান আদ-দারেমি, ৪২ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৩৫৮৪ ↩︎
- জামে তিরমিজি, ৩৬২৭ ↩︎
- সুনান ইবন মাজাহ, ১৪১৫ ↩︎
- ফাতহুল বারি, কিতাবুল মানাকিব, ‘ইসলামে নবুয়তের নিদর্শন’ অধ্যায় ↩︎
- আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ১৯২–১৯৫ ↩︎
- জামে তিরমিজি, ৩২৩৫ ↩︎
- ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৫০৬৭৭১; বায়ান তালবিসিল জাহমিয়্যা, ৭/৩৬৬ ↩︎
- ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক: ঘুমে প্রবেশের সময়ের ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতা ↩︎
- সহিহ বুখারি, ১৩৫৪–১৩৫৫ ↩︎
- ইবন হাজার, ফাতহুল বারি, ‘বালকের কাছে কীভাবে ইসলাম পেশ করা হবে’, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ২৯২৭গ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ২ ↩︎
- এনআইডিসিডি, টিনিটাস ↩︎
- আইএলএই, সংবেদনমূলক খিঁচুনি; উন্মুক্ত অনুমতিতে প্রকাশিত চিকিৎসাবিবরণ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৪ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৩২৩২ ↩︎
- সহিহ বুখারি, ৩২৩৪ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ৪০০ক ↩︎
- সুয়ুতি, আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৪; পঞ্চম প্রকার: আল-ফিরাশি ওয়ান-নাওমি ↩︎

