ভূমিকা
তালাক-পরবর্তী খোরপোষ ও আবাসন–এর প্রশ্নটি ইসলামি আইনশাস্ত্রে শুধুমাত্র একটি পারিবারিক বিধান নয়; এটি ক্ষমতার অসম সম্পর্ক, নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং গৃহস্থালি শ্রমের সামাজিক অবমূল্যায়নের সাথে গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে “বায়িন” বা রুজুর সুযোগহীন তালাকের ক্ষেত্রে অগর্ভবতী তালাকপ্রাপ্ত নারীর ইদ্দতকালীন খোরপোষ তিনটি সুন্নি মাযহাবে অস্বীকৃত; হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতে আবাসনও অস্বীকৃত। হানাফি মাযহাবে ইদ্দতকালে উভয়টি প্রাপ্য হলেও বিচ্ছেদের পর নারীর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নটি তার বাইরেও থেকে যায়। ফাতিমা বিনতে কায়সের সূত্রে বর্ণিত হাদিসে মুহাম্মদের নামে সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায় যে, তিন তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য বাসস্থান বা খোরপোষ কোনোটিই প্রাপ্য নয়। এই বর্ণনার গ্রহণ ও প্রয়োগ নিয়ে সাহাবি এবং পরবর্তী ফকিহদের মধ্যেই মতভেদ সংরক্ষিত আছে। একতরফা তালাকের মূল ক্ষমতা স্বামীর হাতে ন্যস্ত থাকার সঙ্গে আর্থিক দায় প্রত্যাহারের বিধান যুক্ত হলে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত ও তার অর্থনৈতিক পরিণতির মধ্যে গুরুতর ক্ষমতাবৈষম্য তৈরি হয়।
বিবাহের সময় একজন নারী সংসার পরিচালনা, সন্তান লালন-পালন এবং স্বামীর কর্মজীবন টিকিয়ে রাখতে নিজের শ্রম, সময় ও উপার্জনের সম্ভাবনা ব্যয় করতে পারেন। বিচ্ছেদের কাগজে সম্পর্কের অবসান ঘটলেও সেই ব্যয়ের ফল শেষ হয়ে যায় না। হারানো চাকরি, অসম্পূর্ণ শিক্ষা, সঞ্চয়হীনতা কিংবা সন্তানের পরিচর্যার দায়িত্ব তালাকের সঙ্গে অদৃশ্য হয় না। নারীর এই বাস্তব অবস্থার বদলে তালাকের ধরন, ইদ্দত ও গর্ভাবস্থাকেই সহায়তার প্রধান নির্ণায়ক করা হলে বিধানের সীমাবদ্ধতা সরাসরি মানুষের জীবনধারণের সংকটে পরিণত হয়।
পরিভাষা ও বিশ্লেষণ-পদ্ধতি
রাজঈ ও বায়িন তালাক: ইসলামি ফিকহে রাজঈ তালাক বলতে এমন তালাক বোঝায় যাতে ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামীর রুজু (পুনর্বিবাহ ছাড়াই ফিরে আসা) করার সুযোগ থাকে। বায়িন তালাকে স্বামীর একতরফা রুজুর সুযোগ থাকে না। সব বায়িন তালাক তিন তালাক নয়; খুলার মতো বিচ্ছেদও সংশ্লিষ্ট ফিকহি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত। রাজঈ তালাকের ইদ্দতে বৈবাহিক সম্পর্কের কিছু প্রভাব বহাল থাকে। অগর্ভবতী বায়িন তালাকপ্রাপ্তার খোরপোষ ও আবাসন নিয়ে তিনটি প্রধান অবস্থান রয়েছে: উভয়টি দেওয়া, শুধু আবাসন দেওয়া এবং কোনোটিই না দেওয়া।
খোরপোষ, আবাসন, দেনমোহর এবং বিচ্ছেদকালীন মুতআ পৃথক আর্থিক বিষয়। খোরপোষ হচ্ছে নিয়মিত জীবনধারণের ব্যয়; আবাসন হচ্ছে থাকার ব্যবস্থা; অপরিশোধিত দেনমোহর বিবাহচুক্তি থেকে সৃষ্ট পাওনা; মুতআ হচ্ছে বিচ্ছেদ উপলক্ষে আর্থিক বা ব্যবহার্য সামগ্রী প্রদান, যার বাধ্যতামূলকতা ও প্রযোজ্য ক্ষেত্র নিয়ে মাযহাবভেদে মতভেদ আছে। সন্তানের খোরপোষ, দুধপানের পারিশ্রমিক ও হেফাজতের পারিশ্রমিকও তালাকপ্রাপ্ত নারীর ব্যক্তিগত খোরপোষের সমার্থক নয়। একটি পাওনা দিয়ে অন্য সব প্রয়োজন পূরণ হয়েছে ধরে নিলে নারীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার হিসাব বিকৃত হয়।
তালাক দেওয়ার মূল ক্ষমতা, নারীর বিচ্ছেদ চাওয়ার পথ এবং আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ—এসবের গঠনও এক নয়। স্বামীর একতরফা তালাকের ক্ষমতার আলোচনা রয়েছে সংশয়ের পৃথক প্রবন্ধে। [1]
কোনো বিধানে কী প্রাপ্য এবং সেই প্রাপ্য ন্যায়সংগত বা পর্যাপ্ত কি না—দুটি স্বতন্ত্র প্রশ্ন। একটি ব্যবস্থায় আবাসন বাধ্যতামূলক হলেও খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যয় অনির্ধারিত থাকতে পারে; এককালীন অর্থপ্রদান থাকলেও বহু বছরের উপার্জনহানির ক্ষতিপূরণ নাও হতে পারে। বিধানের নিজের ভাষা এবং তার সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিণতির মধ্যে এই ব্যবধানই নৈতিক সমালোচনার বিষয়।
কোরআন: “বাড়ি থেকে বের করে দিও না” এবং “ব্যবস্থা/মাতাআ”
কোরআনের সূরা আত-তালাক (৬৫)-এর শুরুতেই (৬৫:১) একটি স্পষ্ট নির্দেশ আছে: তালাকের পর ইদ্দতকালীন সময়ে নারীদের “তাদের ঘর থেকে বের করে দিয়ো না” এবং তারাও যেন স্বেচ্ছায় না বের হয়। এই নির্দেশ অন্তত ইদ্দতকালীন আবাসনের অধিকারকে নীতিগতভাবে স্বীকৃতি দেয়। [2]
সূরা আত-তালাক ৬৫:১
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا
বাংলা অনুবাদ:
হে নবী, তোমরা যখন নারীদের তালাক দাও, তখন তাদের ইদ্দতের উপযোগী সময়ে তালাক দাও এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো। তাদের ঘর থেকে তাদের বের করে দিয়ো না এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে, সে নিজের ওপরই জুলুম করে। তুমি জানো না, হয়তো আল্লাহ এর পরে নতুন কোনো অবস্থা সৃষ্টি করবেন।
একই সূরার ৬ নম্বর আয়াতে (৬৫:৬) সামর্থ্য অনুযায়ী বাসস্থান দেওয়া, গর্ভাবস্থায় সন্তান প্রসব পর্যন্ত ব্যয়ভার বহন করা এবং সন্তানদের দুধ পান করালে পারিশ্রমিক দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এই কাঠামো—আবাসন, ব্যয়ভার ও মাতৃত্ব-সংক্রান্ত পারিশ্রমিক—তালাক-পরবর্তী অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি প্রাথমিক রূপরেখা উপস্থাপন করে। [3]
সূরা আত-তালাক ৬৫:৬
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُم مِّن وُجْدِكُمْ وَلَا تُضَارُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ وَإِن كُنَّ أُولَاتِ حَمْلٍ فَأَنفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ وَأْتَمِرُوا بَيْنَكُم بِمَعْرُوفٍ وَإِن تَعَاسَرْتُمْ فَسَتُرْضِعُ لَهُ أُخْرَىٰ
বাংলা অনুবাদ:
তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বাস করো, তাদেরও সেখানে বাস করতে দাও। তাদের সংকটে ফেলার জন্য তাদের ক্ষতি করো না। তারা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করো। তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করালে তাদের পারিশ্রমিক দাও এবং নিজেদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে পরামর্শ করো। তোমাদের মধ্যে অসুবিধা সৃষ্টি হলে অন্য কোনো নারী তার জন্য দুধ পান করাবে।
সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় ও আবাসনের ব্যবস্থা করা এখানে একটি কর্তব্য। সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সেই কর্তব্যের পরিসর: দীর্ঘদিনের বিবাহে নারীর হারানো উপার্জন, শিক্ষার সুযোগ, সঞ্চয় ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন এই নির্দেশগুলোতে সরাসরি হিসাবের মানদণ্ড হয়নি। একজন অগর্ভবতী, অসুস্থ কিংবা বহু বছর কর্মজীবনের বাইরে থাকা নারীর আর্থিক প্রয়োজন গর্ভাবস্থার অনুপস্থিতিতে কমে যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত (২:২৪১) তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য “মাতাআ” বা “যুক্তিসংগত ব্যবস্থা”-এর ধারণা প্রবর্তন করে। পরবর্তী ফিকহে বিচ্ছেদকালীন মুতআর বাধ্যতামূলকতা, ক্ষেত্র ও পরিমাণ নিয়ে যে মতভেদ তৈরি হয়েছে, তার একটি প্রধান ভিত্তি এই আয়াত। [4]
সূরা আল-বাকারা ২:২৪১
وَلِلْمُطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ
বাংলা অনুবাদ:
তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য ন্যায়সংগতভাবে আর্থিক ব্যবস্থা রয়েছে; এটি আল্লাহভীরুদের ওপর একটি কর্তব্য।
ইদ্দতকালীন খোরপোষ ও বিচ্ছেদকালীন মুতআকে এক করে ফেললে এই বিতর্কের প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে না। প্রথমটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জীবনধারণের ব্যয়; দ্বিতীয়টি বিচ্ছেদ উপলক্ষে পৃথক প্রদান। কোন কোন ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি আদায়যোগ্য অধিকার, কোথায় শুধু উৎসাহ এবং কোন পরিস্থিতিতে তা প্রাপ্য নয়—এসব নির্ধারণে ফকিহদের সিদ্ধান্ত নারীর প্রাপ্ত অর্থের বাস্তব পরিমাণ বদলে দেয়। ন্যায়সংগত ব্যবস্থার সাধারণ ঘোষণা থেকে কার্যকর আর্থিক নিরাপত্তায় পৌঁছাতে যে ফাঁক থাকে, সেটিই এখানে মূল সমস্যা।
হাদিস: ফাতিমাহ বিনতে কায়সের বর্ণনা এবং ‘আয়িশাহর আপত্তি
ফাতিমাহ বিনতে কায়সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপরিবর্তনীয় তালাক–প্রাপ্তা নারীর “বাসস্থান ও খোরপোষ নেই”—এমন বক্তব্য সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণনাই বহু ফিকহি আলোচনায় একটি প্রধান ভিত্তি। একই সঙ্গে আয়িশার আপত্তিও সংরক্ষিত আছে: তিনি ফাতিমাহকে ভর্ৎসনা করেন এই বক্তব্যের জন্য যে “তালাকপ্রাপ্তা নারী বাসস্থান ও খোরপোষ পাবে না।” [5] [6]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৮/ ত্বলাক
পরিচ্ছদঃ ৬৮/৪১. ফাতিমাহ বিন্ত কায়সের ঘটনা
৫৩২৩-৫৩২৪. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ফাতিমার কী হল? সে কেন আল্লাহকে ভয় করছে না অর্থাৎ তার এ কথায় যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী (তার স্বামীর থেকে) খাদ্য ও বাসস্থান কিছুই পাবে না। (৫৩২১, ৫৩২২) আধুনিক প্রকাশনী- ৪৯৩২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮২৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ১৯। ত্বলাক্ব (তালাক)
পরিচ্ছদঃ ৬. বায়িন ত্বলাকপ্রাপ্তা* স্ত্রীর জন্য খোরপোষ নেই
৩৬০০-(৪৪/…) মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না ও ইবনু বাশশার (রহিমাহুমাল্লাহ) ….. ফাত্বিমাহ বিনতু কায়স (রাযিঃ) এর সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তিন ত্বলাক (তালাক) প্রাপ্ত মহিলা সম্পর্কে বর্ণিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোষ কোনটাই নেই। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৫৭০, ইসলামীক সেন্টার ৩৫৭০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
দুটি উদ্ধৃতি একই বিধানের প্রতি অভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। ফাতিমার সূত্রে বাসস্থান ও খোরপোষ প্রত্যাখ্যানের বর্ণনা রয়েছে; আয়িশা সেই বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি করেছেন। পরবর্তী ফিকহেও বিরোধটি বহাল থেকেছে। একই নারীর আর্থিক নিরাপত্তা কোথাও স্বীকৃত, কোথাও আংশিক স্বীকৃত এবং কোথাও সম্পূর্ণ অস্বীকৃত হওয়ার পেছনে এই দলিলগুলোর ভিন্ন ব্যবহার কার্যকর হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বিপন্ন একজন নারীর কাছে বিতর্কটি নিছক ব্যাখ্যার পার্থক্য নয়; খাদ্য ও আশ্রয়ের দায় কে নেবে, তার সিদ্ধান্ত।
নবী মুহাম্মদের পারিবারিক জীবনেও খোরপোষের দাবি ঘিরে সহিংসতার বিবরণ রয়েছে। উমর নিজের স্ত্রীর ঘাড়ে আঘাত করার কথা বললে মুহাম্মদ হেসে ওঠেন; এরপর আবু বকর আয়িশাকে এবং উমর হাফসাকে আঘাত করেন। স্ত্রীদের আর্থিক দাবির সঙ্গে তাঁদের ওপর পুরুষ অভিভাবকদের শারীরিক আক্রমণ একই ঘটনায় যুক্ত হয়েছে। [7]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ তালাক
পরিচ্ছেদঃ ৪. ইখতিয়ার প্রদান করলে তালাকের নিয়্যাত ছাড়া তালাক হবে না
৩৫৫৭। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উপস্থিতির অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তিনি তার দরজায় অনেক লোককে উপবিষ্ট দেখতে পেলেন। তবে তাদের কাউকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় নি। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, এরপর তিনি আবূ বকর (রাঃ) কে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে তিনি প্রবেশ করলেন। এরপর উমর (রাঃ) এলেন এবং তিনি অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তখন তাকেও প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হল। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে চিন্তিত ও নীরব বসে থাকতে দেখলেন আর তখন তার চতুষ্পার্শ্বে তাঁর সহধর্মিনীগণ উপবিষ্টা ছিলেন।
তিনি (বর্ণানাকারী জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ)) বলেন, উমর (রাঃ) বললেনঃ নিশ্চয়ই আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে এমন কথা বলব যা তাঁকে হাসাবে। এপর তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যদি দেখতেন খারিজার কন্যা (উমর (রাঃ) এর স্ত্রী) আমার কাছে খোরপোষ তলব করছিল। আমি তার দিকে উঠে গেলাম এবং তার ঘাড়ে ঘুষি মারলাম।তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে উঠলেন এবং বললেন, আমার চতুষ্পার্শ্বে তোমরা যাদের দেখতে পাচ্ছ তারা আমার কাছে খোরপোষ দাবী করছে।
অমনি আবূ বকর (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) এর দিকে ছুটলেন এবং তাঁর গর্দানে ঘুষি মারলেন। উমর (রাঃ)ও দাঁড়িয়ে গেলেন এবং হাফসা (রাঃ) এর দিকে অগ্রসর হয়ে তাঁর ঘাড়ে ঘুষি মারলেন। তাঁরা উভয়ে বললেন, তোমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এমন জিনিস দাবী করছে যা তাঁর কাছে নেই। তখন তাঁরা (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনীগণ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা আর কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এমন জিনিস চাইব না যা তাঁর কাছে নেই।
এরপর তিনি তাঁদের (তাঁর সহধর্মিনীগণের) থেকে একমাস কিংবা ঊনত্রিশ দিন পৃথক রইলেন। এপর তাঁর প্রতি এই আয়াত নাযিল হলঃ (অর্থ) “হে নবী! আপনি আপনার সহধর্মিনীদের বলে দিন, তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও এর বিলাসিতা কামনা কর, তাহলে এসো আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসে ব্যবস্থা করে দেই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদের বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও পরকালকে কামনা কর তাহলে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ন আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন।” (আহযাবঃ ২৮ ২৯)
তিনি [জাবির (রা)] বলেন, তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আয়িশা (রাঃ) কে দিয়ে (আয়াতের নির্দেশ তামীল করতে) শুরু করলেন। তখন তিনি বললেন, হে আয়িশা! আমি তোমার কাছে একটি (গুরত্বপূর্ণ) বিষয়ে আলাপ করতে চাই। তবে সে বিষয়ে তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে পরামর্শ না করে তোমার ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করাই আমি পছন্দ করি।
তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে বিষয়টা কি (আমি জানতে পারি)? তখন তিনি তার কাছে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার ব্যাপারে আমি কি আমার পিতা-মাতার কাছে পরামর্শ নিতে যাব? (এর কোন প্রয়োজন নেই)। না, বরং আমি আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখিরাতকেই বেছে নিয়েছি। তবে আপনার সকাশে আমার একান্ত নিবেদন, আমি যা বলেছি সে সম্পর্কে আপনি আপনার অন্যান্য সহধর্মিনীগণের কারো কাছে ব্যক্ত করবেন না। তিনি বললেন, তাদের যে কেউ সে বিষয় আমাকে জিজ্ঞাসা করলে আমি অবশ্যই তাঁকে তা বলে দিব। কারণ আল্লাহ আমাকে কঠোরতা আরোপকারী ও হঠকারীরূপে নয় বরং সহজ পন্থায় (শিক্ষাদানকারী) হিসাবে প্রেরণ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
উমর মুহাম্মদকে হাসানোর জন্য যে ঘটনাটি বেছে নিয়েছিলেন, সেটি খোরপোষ চাওয়ায় নিজের স্ত্রীর ঘাড়ে আঘাত করার ঘটনা। একজন নারীর প্রয়োজনের কথা জানানো, সেই দাবির উত্তরে স্বামীর প্রহার এবং প্রহারের স্মৃতিকে আরেক পুরুষের বিনোদনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার—এই তিনটি কাজ একই ধারায় ঘটেছে। মুহাম্মদ সেই কথা শুনে হেসেছেন। এখানে স্ত্রীর যন্ত্রণা পুরুষদের কথোপকথনে হাসির বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যাঁর কাছে নৈতিক নেতৃত্বের দাবি করা হচ্ছে, তাঁর প্রতিক্রিয়া স্ত্রীকে প্রহার করার ঘটনাটিকে আনন্দের উপলক্ষ দিয়েছে। স্ত্রীকে মারার কথা বলে উমর মুহাম্মদের মন ভালো করতে চেয়েছিলেন এবং বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। নারীর ওপর সহিংসতাকে পুরুষের রসিকতার উপাদান হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে নারীকে সমমর্যাদার মানুষ হিসেবে না দেখার নির্মমতা স্পষ্ট।
এরপর মুহাম্মদ নিজের স্ত্রীদের খোরপোষ চাওয়ার কথা বলতেই আবু বকর আয়িশাকে এবং উমর হাফসাকে আঘাত করেন। দুই পিতা নিজেদের মেয়েদের আর্থিক প্রয়োজন নিয়ে কথা শোনার বদলে জামাতার অসন্তোষের প্রতিক্রিয়ায় মেয়েদের শরীরের ওপর আক্রমণ চালান। পিতৃপরিবার এখানে মেয়েদের নিরাপত্তার আশ্রয় হয়ে ওঠেনি; স্বামীর পক্ষে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করার আরেকটি শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বিবাহিত মেয়ের সংসারে প্রবেশ করেও পিতা তাঁকে প্রহার করতে পারছেন, আর সেই প্রহারের কারণ হচ্ছে স্বামীর কাছে অর্থ চাওয়া। ফলে নারীর জন্য দুটি সম্পর্কেই একই কর্তৃত্ব কাজ করছে: স্বামীর কাছে দাবি তুললে পিতাও এসে তাঁকে শাস্তি দিতে পারেন। স্বামী ও পিতার এই সম্মিলিত ক্ষমতার সামনে নারী নিজের প্রয়োজন নিয়ে কার কাছে দাঁড়াবেন?
আবু বকর ও উমর আঘাত করার সময় বলেন, স্ত্রীরা মুহাম্মদের কাছে এমন জিনিস চাইছেন যা তাঁর কাছে নেই। স্বামীর সামর্থ্যের প্রশ্ন এবং স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার প্রশ্নের মধ্যে কোনো নৈতিক সংযোগ নেই। আয় সীমিত হলে সংসারের ব্যয় নিয়ে আলোচনা, হিসাব এবং সমঝোতার প্রয়োজন হয়। ঘাড়ে আঘাত করলে আয় বাড়ে না, ব্যয়ের হিসাবও পরিষ্কার হয় না; যিনি দাবি তুলেছেন, তাঁকে ভয় দেখানো হয়। এই বর্ণনায় স্ত্রীদের চাহিদার পরিমাণ, তার প্রয়োজনীয়তা কিংবা পরিবারের সম্পদের বণ্টন নিয়ে কোনো বিচার দেখানো হয়নি। পুরুষদের অসন্তোষই প্রহারের যথেষ্ট কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজন জানানো নারীর শরীরকে শাস্তির লক্ষ্য বানিয়ে অর্থসংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসা করা সরাসরি নিপীড়ন।
প্রহারের পর স্ত্রীরা শপথ করে বলেন, মুহাম্মদের কাছে যা নেই তা তাঁরা আর চাইবেন না। এই অঙ্গীকার এসেছে শারীরিক আক্রমণের অব্যবহিত পরে। ফলে পুরুষদের আপত্তি শুধু কথায় প্রকাশিত হয়নি; আঘাতের মাধ্যমে তার ফলও আদায় হয়েছে। ভয় দেখিয়ে কোনো দাবির পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা এবং সেই দাবির ন্যায়সংগত সমাধান করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ। স্ত্রীদের সম্মতি এখানে সহিংসতার পরিবেশে উচ্চারিত; তাকে পারস্পরিক আলোচনায় গৃহীত আর্থিক সমঝোতা হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই। নারীর প্রয়োজন কতটুকু পূরণ হলো, তার বিবরণের জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে ভবিষ্যতে দাবি না করার প্রতিশ্রুতি। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সঙ্গে শারীরিক শাস্তি যুক্ত হলে নিজের প্রয়োজন উচ্চারণ করাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পরবর্তী ঊনত্রিশ দিন বা এক মাসের বিচ্ছিন্নতার পরে বিষয়টি পার্থিব জীবন ও আল্লাহ–রাসুল–পরকাল বেছে নেওয়ার ভাষায় উপস্থাপিত হয়। আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে সৌজন্যের সঙ্গে বিদায়ের বিকল্পের বিপরীতে মুহাম্মদের সংসারে থাকা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও পরকালকে বেছে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। এতে সংসারের ব্যয় নিয়ে বিরোধ ধর্মীয় আনুগত্যের প্রশ্নে উন্নীত হয়। স্ত্রী নিজের আর্থিক চাহিদার কথা বলছেন, কিন্তু সিদ্ধান্তের নৈতিক ভাষা নির্ধারিত হচ্ছে পার্থিব আকাঙ্ক্ষা ও পরকালের পুরস্কারের তুলনায়। এমন বিন্যাসে নিজের জন্য উন্নত জীবনযাপনের দাবি বহাল রাখার সঙ্গে একটি আধ্যাত্মিক মূল্যও জুড়ে যায়: তাঁকে সেই পথের বিপরীতে দাঁড়াতে হয়, যেটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে বেছে নেওয়া হিসেবে মহিমান্বিত করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক দরকষাকষিতে ধর্মীয় কর্তৃত্ব এভাবেই স্বামীর অবস্থানকে অতিরিক্ত শক্তি দেয়।
আয়িশাকে পিতা-মাতার সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ দেওয়ার কথাটিও আগের ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত। এই একই বর্ণনায় তাঁর পিতা এর আগে আর্থিক দাবির কারণে তাঁকে আঘাত করেছেন। ফলে পিতার কাছে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ তাঁকে নিরাপদ ও নিরপেক্ষ পরামর্শ পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। যে পিতা জামাতার পক্ষে মেয়েকে প্রহার করেন, তাঁর উপস্থিতি মেয়ের স্বাধীন সিদ্ধান্তের সহায়ক শক্তি হওয়ার বদলে চাপের উৎস হয়ে উঠতে পারে। ব্যক্তিগত আঘাতের অভিজ্ঞতা, পিতৃকর্তৃত্ব, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কা এবং ধর্মীয় পুরস্কারের আহ্বান—সবকিছু একই সিদ্ধান্তের পরিবেশে সক্রিয় রয়েছে।
ঘটনার সময় তাঁদের বিবাহ বহাল ছিল। খাদ্য, খরচ ও জীবনযাপনের প্রশ্নে কথা বলার প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা পিতাদের হাতে আঘাত পেয়েছেন। তাঁদের প্রহার করার কোনো ভর্ৎসনা এই বিবরণে পাওয়া যায় না; উমরের নিজের স্ত্রীকে প্রহারের গল্পে মুহাম্মদের হাসি সরাসরি লিপিবদ্ধ আছে। পরিবারের আর্থিক বিরোধে নারীর বক্তব্য শুনে সমাধানের পরিবর্তে এখানে পুরুষের শারীরিক ও ধর্মীয় ক্ষমতা প্রাধান্য পেয়েছে। আবু বকর ও উমরের মর্যাদা তাঁদের আঘাতকে ন্যায়সংগত করে না, আর মুহাম্মদের নবুয়তের দাবি স্ত্রীকে প্রহারের ঘটনায় তাঁর হাসিকে নৈতিক আদর্শে পরিণত করে না। এই মারপিটের ঘটনাকে কীভাবে ধর্মীয়ভাবে মহিমান্বিত করা হয়, তার একটি নমুনা শোনা যেতে পারে, বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম মিজানুর রহমান আজহারীর মুখ থেকে,
ফিকহ: বায়িন তালাকপ্রাপ্তার খোরপোষ ও আবাসন নিয়ে মাযহাবগুলোর বিধান
অগর্ভবতী বায়িন তালাকপ্রাপ্তার ইদ্দতকালীন অধিকার নিয়ে তিনটি প্রধান অবস্থান রয়েছে। হানাফিরা খোরপোষ ও আবাসন উভয়টি দেন; মালিকি ও শাফিঈ মতে আবাসন থাকে, খোরপোষ থাকে না; হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতে উভয়টি অস্বীকৃত। ইবন আবদুল বার এই বিভাজন সরাসরি লিপিবদ্ধ করেছেন। [8]
আল-ইস্তিযকার, অনুচ্ছেদ ২৬৭৯৬
قال أبو عمر: اختلف العلماء في سكنى المبتوتة ونفقتها على ثلاثة أقوال: أحدها: أن لها السكنى والنفقة، وهو قول الكوفيين. والآخر: أن لها السكنى ولا نفقة لها، وهو قول مالك والشافعي وأكثر أهل الحجاز. والثالث: أنها لا سكنى لها ولا نفقة، هو قول أحمد وطائفة.
বাংলা অনুবাদ:
আবু উমর বলেন: বায়িন তালাকপ্রাপ্তার আবাসন ও খোরপোষ সম্পর্কে আলেমরা তিনটি মতে বিভক্ত হয়েছেন। প্রথম মত হচ্ছে, তাঁর আবাসন ও খোরপোষ উভয়টি প্রাপ্য; এটি কুফার ফকিহদের মত। দ্বিতীয় মত হচ্ছে, তাঁর আবাসন প্রাপ্য, খোরপোষ প্রাপ্য নয়; এটি মালিক, শাফিঈ এবং হিজাজের অধিকাংশ আলেমের মত। তৃতীয় মত হচ্ছে, তাঁর আবাসন ও খোরপোষ কোনোটিই প্রাপ্য নয়; এটি আহমদ এবং একদল আলেমের মত।
| অগর্ভবতী বায়িন তালাকপ্রাপ্তার ইদ্দতকালীন অধিকার | খোরপোষ | আবাসন |
|---|---|---|
| হানাফি মাযহাব | প্রাপ্য | প্রাপ্য |
| মালিকি মাযহাব | প্রাপ্য নয় | প্রাপ্য |
| শাফিঈ মাযহাব | প্রাপ্য নয় | প্রাপ্য |
| হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ অবস্থান | প্রাপ্য নয় | প্রাপ্য নয় |
খোরপোষ বন্ধ করা এবং আবাসনও বন্ধ করার মধ্যে বাস্তব পার্থক্য আছে। প্রথম ক্ষেত্রে নারী থাকার জায়গা পেলেও খাদ্য, পোশাক ও অন্যান্য ব্যয়ের দায় নিজের কাঁধে নিতে পারেন; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে থাকার জায়গাটিও নিশ্চিত থাকে না। বিধানের এই ভিন্ন ফল নারীর ওপর চাপানো ঝুঁকির মাত্রা বদলায়। একইভাবে হানাফি অবস্থানে ইদ্দতকালীন সহায়তা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ বিবাহে সৃষ্ট উপার্জনহানি ও ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবভুক্ত হয়ে যায় না।
আল-মুগনি: রুজুর অধিকার শেষ হলে খোরপোষ ও আবাসন প্রত্যাখ্যান
ইবন কুদামার আল-মুগনিতে রুজুর সুযোগহীন তালাকের ক্ষেত্রে আবাসন ও খোরপোষ প্রত্যাখ্যানের বিধান সরাসরি পাওয়া যায়; গর্ভাবস্থা তার ব্যতিক্রম। এই বিধানের ভাষায় নারীর দীর্ঘদিনের শ্রম বা স্বনির্ভর হওয়ার সামর্থ্য শর্ত হয়নি। [9]
আল-মুগনি, মাসআলা ৬৫২৬-এ উদ্ধৃত মূল বিধান
وإذا طلق الرجل زوجته طلاقا لا يملك فيه الرجعة، فلا سكنى لها، ولا نفقة، إلا أن تكون حاملا.
বাংলা অনুবাদ:
কোনো পুরুষ তাঁর স্ত্রীকে এমন তালাক দিলে যাতে তাঁর রুজু করার অধিকার নেই, সেই নারীর আবাসন ও খোরপোষ কোনোটিই প্রাপ্য নয়; তবে তিনি গর্ভবতী হলে ব্যতিক্রম।
এই বিধানে নারীর আবাসন ও খোরপোষের প্রশ্ন শুরু হচ্ছে স্বামীর রুজুর অধিকার আছে কি না, তা দিয়ে। কোনো নারী বিশ বছর সংসার সামলেছেন, স্বামীর কর্মজীবনের সুবিধার জন্য নিজের কাজ ছেড়েছেন, কিংবা বিচ্ছেদের দিনে তাঁর হাতে ঘরভাড়ার অর্থ নেই—এসব এই নিয়মে খোরপোষের স্বতন্ত্র ভিত্তি হিসেবে স্থান পায়নি। বৈবাহিক শ্রেণি বদলানোর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবিকার দাবি প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। একই মানুষের ক্ষুধা, বয়স এবং উপার্জনক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকলেও তালাকের ধরন বদলে তাঁর প্রাপ্য পাল্টে যাচ্ছে। মানুষের প্রয়োজনের বদলে পুরুষের সঙ্গে তাঁর আইনি সম্পর্ককে এমন নির্ধারক করা সেই প্রয়োজনের ওপর বৈবাহিক কর্তৃত্বকে স্থান দেয়।
স্বামীর একতরফা তালাকে এই বৈষম্য বিশেষভাবে তীব্র। সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত যিনি নিতে পারেন, সেই সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তিনি নিয়মিত খোরপোষ ও আবাসনের দায় থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান। অথচ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের ওপর অন্য পক্ষের নিয়ন্ত্রণ সমান নয়, নিজের জীবিকা হারানোর পরিণতিও তিনি সঙ্গে সঙ্গে সামলাতে পারেন না। পুরুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নারীর ক্ষতি বহনের বাধ্যবাধকতা একই নিয়মে একত্র হয়েছে। বিবাহের সুবিধা যত দিন গ্রহণ করা হচ্ছে তত দিন খরচ দেওয়া, পরে সম্পর্কের পরিচয় বদলে সেই খরচ বন্ধ করা—এই হিসাবে বিবাহের সময়ে তৈরি আর্থিক অসমতার কোনো নিষ্পত্তি হয় না।
সংসারে একজনের কর্মজীবন এগোনোর পেছনে অন্যজনের পরিচর্যা ও অবৈতনিক শ্রম কার্যকর হলে বিচ্ছেদের দিনে দুই পক্ষ সমান জায়গায় দাঁড়ান না। একজনের হাতে চাকরি, অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয়ের ধারাবাহিকতা থাকে; অন্যজনের হাতে থাকতে পারে কর্মজীবনের বিরতি এবং আয়হীনতা। অতীতের এই ব্যবস্থার ফল বহাল রেখেই ভবিষ্যৎ আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করা সুবিধাভোগীর পক্ষে লাভজনক। নারীকে আবার কাজ খুঁজতে বলা তাঁর হারানো বছরগুলো ফিরিয়ে দেয় না। পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সময় ও বাসস্থানের ব্যয় তাঁর কাঁধে চাপালে সংসারের জন্য দেওয়া ত্যাগই তাঁর ব্যক্তিগত শাস্তিতে পরিণত হয়।
গর্ভাবস্থার ব্যতিক্রম থাকলেও অগর্ভবতী নারীর জীবিকার সংকটের উত্তর এই বিধানে পাওয়া যায় না। বিবাহের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির দায় নির্ধারণে সম্পর্কের মেয়াদ, শ্রমের বণ্টন এবং উপার্জনহানি বিবেচনা করতে হয়। রুজুর অধিকার শেষ হওয়া সেই দায় নিষ্পত্তির হিসাব নয়। এই নিয়মে নিয়মিত সহায়তা প্রত্যাখ্যানের আগে নারীর বাস্তব আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের আবশ্যকতা রাখা হয়নি; ফলে অধিকার হারানোর সিদ্ধান্তটি তাঁর প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
মালিকি বিধান: থাকার জায়গা আছে, জীবনধারণের খরচ নেই
আল-মুদাওয়ানায় মালিকের বক্তব্যে আবাসনের দায় বহাল আছে, কিন্তু অগর্ভবতী তিন তালাকপ্রাপ্তার খোরপোষ নেই। একই বক্তব্যে রাজঈ তালাকের ইদ্দতে খোরপোষ বহাল থাকার কারণ হিসেবে নারীকে তখনো স্ত্রী গণ্য করার কথা এসেছে। [10]
আল-মুদাওয়ানা, তালাকপ্রাপ্ত নারীর খোরপোষ ও আবাসন
قال: قال مالك: السكنى تلزمه لهن كلهن، فأما النفقة فلا تلزم الزوج في المبتوتة ثلاثا، كان طلاقه إياها أو صلحا، إلا أن تكون حاملا فتلزمه النفقة، والنفقة لازمة للزوج في كل طلاق يملك فيه الزوج الرجعة، حاملا كانت امرأته أو غير حامل؛ لأنها تعد امرأته على حالها حتى تنقضي عدتها، وكذلك قال مالك.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি বলেন, মালিক বলেছেন: তাঁদের সবার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। কিন্তু তিন তালাকপ্রাপ্তার জন্য স্বামীর খোরপোষের দায় নেই—তা তালাকের মাধ্যমে হোক বা সমঝোতার মাধ্যমে—যদি না তিনি গর্ভবতী হন; গর্ভবতী হলে খোরপোষ দিতে হবে। যে তালাকে স্বামীর রুজুর অধিকার থাকে, সেখানে স্ত্রী গর্ভবতী হোন বা না হোন, স্বামীর ওপর খোরপোষের দায় থাকে; কারণ ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি স্ত্রী হিসেবেই গণ্য হন। মালিক এভাবেই বলেছেন।
থাকার জায়গা পেলেও খাবার, পোশাক ও অন্য প্রয়োজনের অর্থ ছাড়া মানুষের পূর্ণ জীবিকা নিশ্চিত হয় না। বায়িন তালাকের পরে এই ব্যয় বন্ধ হওয়ার আইনি কারণ হচ্ছে তাঁর স্ত্রীপরিচয়ের অবসান; তাঁর ক্ষুধা, অসুস্থতা বা উপার্জনক্ষমতা নিয়ে বিধানটি আলাদা পরীক্ষা স্থাপন করেনি। ফলে দাম্পত্যে গড়ে ওঠা নির্ভরশীলতার চেয়ে বৈবাহিক শ্রেণিবিভাগ অধিক নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়।
হানাফি বিধান: আবদ্ধ রাখলে খোরপোষের দায়ও বহন করতে হবে
হানাফি মাযহাব কোরআনের ৬৫:৬ আয়াতকে ভিত্তি করে যুক্তি দেয় যে, ইদ্দতকালীন বাসস্থানের স্পষ্ট নির্দেশ থাকায় এবং জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা বাসস্থানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকায়—ইদ্দতকালে খোরপোষও প্রাপ্য, এমনকি বায়িন তালাকের ক্ষেত্রেও। কাসানির ব্যাখ্যায় বাইরে গিয়ে উপার্জন থেকে নিবৃত্ত রেখে খাদ্যের দায় প্রত্যাখ্যান করলে নারী অনাহার বা সংকটে পড়বেন। [11]
বাদায়িউস সানায়ি, ইদ্দতকালীন খোরপোষের যুক্তি
ولأن الأمر بالإسكان أمر بالإنفاق؛ لأنها إذا كانت محبوسة ممنوعة عن الخروج لا تقدر على اكتساب النفقة، فلو لم تكن نفقتها على الزوج ولا مال لها لهلكت، أو ضاق الأمر عليها وعسر، وهذا لا يجوز.
বাংলা অনুবাদ:
আবাসনের নির্দেশ খোরপোষেরও নির্দেশ; কারণ তাঁকে আবদ্ধ রেখে বাইরে যেতে বাধা দেওয়া হলে তিনি জীবিকার অর্থ উপার্জন করতে পারেন না। তখন তাঁর খোরপোষ স্বামীর দায়িত্ব না হলে এবং তাঁর নিজের সম্পদ না থাকলে তিনি ধ্বংসের মুখে পড়বেন অথবা কঠিন সংকটে পড়বেন। এটি বৈধ নয়।
কাসানির যুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি রয়েছে: বাইরে গিয়ে উপার্জনের সুযোগ বন্ধ রাখলে নিজের অর্থ না থাকা নারী অনাহার বা কঠিন সংকটে পড়বেন। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এখানে নারীর স্বাভাবিক অক্ষমতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যাত হয়নি; তাঁর চলাচলে আরোপিত বাধা এবং উপার্জনের সুযোগহীনতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। যে ব্যবস্থায় তাঁকে আবদ্ধ রাখা হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাকেই তাঁর খরচের দায় নিতে হচ্ছে। ফলে খোরপোষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যুক্তির ভেতরেই নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত করার স্বীকারোক্তি আছে। জীবনধারণের খরচ দিয়ে কারও চলাচল ও উপার্জনের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা ক্ষমতার একটি অসম বিন্যাস।
এই কাঠামোয় নারী নিজের জীবিকা গড়ে তোলার স্বাধীনতা এবং স্বামীর খোরপোষের ওপর নির্ভরতার মধ্যে আটকে পড়েন। উপার্জনের সুযোগ সীমিত হলে সংসার থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তব ক্ষমতাও দুর্বল হয়। কাজ শেখা, পেশাগত সম্পর্ক তৈরি করা এবং নিজের নামে সঞ্চয় করার জন্য নিয়মিত সুযোগ প্রয়োজন। এসবের ঘাটতি দীর্ঘ হলে আর্থিক নির্ভরতা জমতে থাকে। ইদ্দতের খরচ দিয়ে সেই নির্দিষ্ট সময়ের অনাহার ঠেকানো যায়, কিন্তু আগে থেকে তৈরি নির্ভরশীলতার পুরো ব্যয় মেটানো হয় না।
ইদ্দত শেষ হওয়া একটি সময়সীমার অবসান; উপার্জনক্ষমতা ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। বাইরে যাওয়ার বাধা সরে গেলে চাকরি, প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ বাসস্থানও সঙ্গে সঙ্গে জোগাড় হয়ে যায় না। যে নারী দীর্ঘদিন উপার্জনের বাইরে ছিলেন, তাঁর নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হতে সময় ও অর্থ লাগবে। আবদ্ধ থাকার সময় খরচ দেওয়া এবং বাধা সরে যাওয়ার পর অর্জনক্ষমতা পুনর্গঠনের ব্যয় বহন করা দুটি পৃথক দায়িত্ব। প্রথমটি পালন করেই দ্বিতীয়টির প্রয়োজন উপেক্ষা করলে নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নারীকে একা দিতে হয়।
এই হানাফি যুক্তি ইদ্দতকালে বায়িন তালাকপ্রাপ্তার খোরপোষের পক্ষে দাঁড়ায়। তার নৈতিক সীমা হচ্ছে সহায়তার সঙ্গে স্বাধীনতার অসম সম্পর্ক: নারীকে আটকে রাখার দায় স্বীকৃত, কিন্তু সেই অবস্থায় হারানো উপার্জনের ধারাবাহিকতা পুনর্গঠনের জন্য পৃথক হিসাব এই যুক্তিতে নেই। নারীর স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ সংকুচিত করে পরে তাঁকেই স্বনির্ভরতার সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে দেওয়া সুবিধাভোগী পক্ষের দায় এড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। খোরপোষের অধিকার কত দিন থাকছে, তার সঙ্গে নারী কেন খোরপোষনির্ভর হয়ে পড়েছেন এবং সেই অবস্থা কাটাতে কী লাগবে—এই প্রশ্নও আর্থিক দায়ের অংশ।
গর্ভাবস্থার খোরপোষ: নারীর অধিকার, না গর্ভস্থ সন্তানের কারণে ব্যয়?
গর্ভবতী বায়িন তালাকপ্রাপ্তার খোরপোষের প্রশ্নে আল-মুগনিতে আরও একটি তাত্ত্বিক বিভাজন আছে: খরচটি নারীর জন্য গর্ভাবস্থার কারণে, নাকি গর্ভস্থ সন্তানের জন্য? ইবন কুদামা দুটি মতই লিপিবদ্ধ করেছেন। [12]
আল-মুগনি, মাসআলা ৬৫২৯
وهل تجب نفقة الحمل للحامل من أجل الحمل أو للحمل، فيه روايتان؛ إحداهما: تجب للحمل اختارها أبو بكر؛ لأنها تجب بوجوده، وتسقط عند انفصاله، فدل على أنها له. والثانية، تجب لها من أجله؛ لأنها تجب مع اليسار والإعسار، فكانت له كنفقة الزوجات، ولأنها لا تسقط بمضي الزمان، فأشبهت نفقتها في حياته. وللشافعي قولان، كالروايتين.
বাংলা অনুবাদ:
গর্ভাবস্থার খোরপোষ কি গর্ভধারণের কারণে নারীর জন্য বাধ্যতামূলক, নাকি গর্ভস্থ সন্তানের জন্য? এ বিষয়ে দুটি মত রয়েছে। প্রথম মতে, এটি গর্ভস্থ সন্তানের জন্য; আবু বকর এই মত গ্রহণ করেছেন। কারণ গর্ভের অস্তিত্বে এটি বাধ্যতামূলক হয় এবং সন্তান পৃথক হয়ে গেলে তা শেষ হয়, যা নির্দেশ করে এটি সন্তানের জন্য। দ্বিতীয় মতে, সন্তানের কারণে এটি নারীর জন্য বাধ্যতামূলক; কারণ সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় তা প্রাপ্য এবং স্ত্রীর খোরপোষের মতো সময় অতিবাহিত হলেও তা বিলুপ্ত হয় না। শাফিঈরও এই দুই মতের অনুরূপ দুটি মত রয়েছে।
উভয় মতেই গর্ভধারণ আর্থিক দায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্রেণিবিভাগে অগর্ভবতী নারীর প্রয়োজন নিজস্ব গুরুত্বে সমান দাবি তৈরি করে না। অথচ স্বনির্ভর হওয়ার অক্ষমতা, বয়স, অসুস্থতা এবং বিবাহের কারণে হারানো উপার্জনের সুযোগ গর্ভধারণের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রজননসংক্রান্ত অবস্থার সঙ্গে খরচের দায় এত ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধা থাকলে বিবাহে নারীর অন্যান্য অবদানের মূল্যায়ন পিছিয়ে পড়ে।
মুতআ: বাধ্যতামূলক পাওনা ও স্বেচ্ছামূলক প্রদানের বিভাজন
তালাকের পরে মুতআ দেওয়া সব মাযহাবে একই অর্থে স্বেচ্ছামূলক নয়। শাফিঈ ফিকহের তুহফাতুল মুহতাজে সহবাস হয়েছে এমন বায়িন তালাকপ্রাপ্তা এবং রুজু ছাড়া ইদ্দত শেষ হওয়া রাজঈ তালাকপ্রাপ্তার জন্যও মুতআ বাধ্যতামূলক হওয়ার আলোচনা আছে। সেখানে মুতআ ও দেনমোহরের উদ্দেশ্যও পৃথক করা হয়েছে। [13]
তুহফাতুল মুহতাজ, মুতআসংক্রান্ত বিধান ও তার তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা
(وكذا) تجب (لموطوءة) طلقت طلاقا بائنا مطلقا أو رجعيا وانقضت عدتها على الأوجه؛ لأن الرجعية زوجة في أكثر الأحكام، والمتعة للإيحاش، ولا يتحقق إلا بانقضاء عدتها من غير رجعة، أي وهو حي، فلو مات فيها فلا؛ لما نقل من الإجماع على منع الجمع بين المتعة والإرث.
বাংলা অনুবাদ:
তেমনিভাবে সহবাস হয়েছে এমন নারীর জন্যও মুতআ বাধ্যতামূলক—বায়িন তালাক হলে সরাসরি, অথবা রাজঈ তালাকের পরে ইদ্দত শেষ হলে, অধিক গ্রহণযোগ্য মতে। কারণ অধিকাংশ বিধানে রাজঈ তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী হিসেবেই থাকেন; আর মুতআ বিচ্ছেদের বেদনার জন্য, যা রুজু ছাড়া ইদ্দত শেষ হলে বাস্তবায়িত হয়—স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায়। ইদ্দতের মধ্যে স্বামী মারা গেলে মুতআ নেই; কারণ মুতআ ও উত্তরাধিকার একত্র হওয়ার নিষেধে ঐকমত্য উদ্ধৃত হয়েছে।
মালিকি বিধানে একই প্রশ্নে আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করার সুযোগ অস্বীকৃত হয়েছে। আল-মুদাওয়ানায় সহবাস হয়েছে এবং দেনমোহর নির্ধারিত ছিল এমন তালাকপ্রাপ্তার মুতআ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে এই পার্থক্য সরাসরি পাওয়া যায়। [14]
আল-মুদাওয়ানা, মুতআ সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
قلت: أرأيت المطلقة إذا كان زوجها قد دخل بها وكان قد سمى لها مهرا في أصل النكاح، أيكون لها عليه المتعة في قول مالك؟ قال: نعم، عليه المتعة. قلت: فهل يجبر على المتعة أم لا؟ قال: لا يجبر على المتعة في قول مالك.
বাংলা অনুবাদ:
আমি বললাম: যে তালাকপ্রাপ্তার সঙ্গে স্বামীর সহবাস হয়েছে এবং মূল বিবাহচুক্তিতে তাঁর দেনমোহর নির্ধারিত ছিল, মালিকের মতে তিনি কি স্বামীর কাছ থেকে মুতআ পাবেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তাঁর মুতআ দেওয়া কর্তব্য। আমি বললাম: মুতআ দিতে তাঁকে বাধ্য করা হবে কি না? তিনি বললেন: মালিকের মতে তাঁকে মুতআ দিতে বাধ্য করা হবে না।
আল-মুদাওয়ানার এই প্রশ্নোত্তরে একই সঙ্গে দুটি কথা আছে: মুতআ দেওয়া কর্তব্য এবং দিতে অস্বীকার করলে পুরুষকে বাধ্য করা হবে না। বাস্তব ক্ষমতার প্রশ্নে দ্বিতীয় কথাটিই নির্ধারক। অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত যাঁর হাতে থাকছে, তিনি অনিচ্ছুক হলে নারী কেবল নিজের প্রয়োজন জানিয়ে সেই অর্থ নিশ্চিত করতে পারবেন না। তাঁর প্রয়োজন থাকা এবং অর্থপ্রদান ভালো কাজ হওয়া—কোনোটিই অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার দিচ্ছে না। ফলে আর্থিক সহায়তার নৈতিক প্রশংসা বহাল থেকেও সহায়তাপ্রার্থী নারী টাকা ছাড়াই ফিরে যেতে পারেন।
বিচ্ছেদের পরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তীব্র হলে সদিচ্ছার ওপর নির্ভরতা বিশেষ বিপজ্জনক। যাঁর কাছ থেকে আলাদা হতে হচ্ছে, নিজের পুনর্বাসনের অর্থের জন্য তাঁর অনুগ্রহের অপেক্ষা করাই তখন অতিরিক্ত অধীনতা। নারী যত বেশি অর্থের প্রয়োজন অনুভব করবেন, অস্বীকার করার ক্ষমতা থাকা পুরুষের সামনে তাঁর দরকষাকষির অবস্থান তত দুর্বল হবে। প্রয়োজনের কথা বারবার বলা, সন্তুষ্ট করার চেষ্টা এবং অসহযোগিতার আশঙ্কা—এসবের মধ্যে অধিকার দাবির মর্যাদা ক্ষয়ে যায়। আদায়যোগ্য পাওনা থাকলে অস্বীকৃতির পর আইনি পথ থাকে; বাধ্য করার সুযোগ না থাকলে অর্থদাতার মর্জিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়।
কোরআনে তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য ন্যায়সংগত ব্যবস্থার ঘোষণা এবং ফিকহে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই প্রদান আদায়ে বাধ্য না করার সিদ্ধান্তের মধ্যে বাস্তব ব্যবধান এখানেই। কোনো দায়িত্বের পক্ষে ধর্মীয় ভাষা যত জোরালোই হোক, তার অমান্যতার বিরুদ্ধে নারী কী করতে পারবেন, সেই প্রশ্ন তাঁর খাদ্য ও আশ্রয় নির্ধারণ করে। যিনি অর্থ পেলেন না, তাঁর কাছে অন্য পক্ষকে দেওয়া নৈতিক উপদেশের বিনিময়মূল্য নেই। মালিকি বিধানের উদ্ধৃত ক্ষেত্রে পুরুষের অস্বীকৃতির ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে নারীর নিরাপত্তাকে তাঁর সদিচ্ছায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
শাফিঈ মতে উল্লিখিত ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মুতআ থাকায় সেখানে পরীক্ষাটি পরের ধাপে যায়: প্রাপ্ত অর্থ কত, কীভাবে আদায় হবে এবং বাস্তব ক্ষতির কতটা মেটাবে। আদালতের মাধ্যমে কিছু পাওয়া সম্ভব হওয়া এবং প্রয়োজনমাফিক পুনর্বাসন নিশ্চিত হওয়া একই ফল নয়। সংসারের জন্য হারানো উপার্জন, বিচ্ছেদের সময়ে নিজের সম্পদ এবং পুনরায় কাজে ফিরতে প্রয়োজনীয় সময়ের সঙ্গে প্রদানের পরিমাণের সম্পর্ক না থাকলে এককালীন পাওনা অপর্যাপ্ত থাকতে পারে। একটি ব্যবস্থায় অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিকার নেই; আরেকটিতে প্রতিকার থাকলেও পর্যাপ্ততার প্রশ্ন থাকে। এই নির্দিষ্ট পার্থক্যগুলোই নারীর আর্থিক নিরাপত্তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে।
দেনমোহর ও সন্তানের ব্যয়: নারীর পুনর্বাসনের পৃথক হিসাব
ইসলামকিউএর সমসাময়িক একটি ফতোয়ায় অগর্ভবতী বায়িন তালাকপ্রাপ্তার ব্যক্তিগত খোরপোষ ও আবাসন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই অবস্থানের সমসাময়িক প্রয়োগেও নারীর আর্থিক প্রাপ্তি একইভাবে সীমিত হয়। [15] [16]
ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২৬৪১৪৬
المطلقة طلاقا بائنا لا نفقة لها، ولا سكنى؛ إلا أن تكون حاملا.
বাংলা অনুবাদ:
বায়িন তালাকপ্রাপ্তার খোরপোষ ও আবাসন নেই; তবে তিনি গর্ভবতী হলে ব্যতিক্রম।
দেনমোহরের বকেয়া পরিশোধ পুরোনো চুক্তিগত পাওনা মেটায়; তা দিয়ে ভবিষ্যৎ জীবিকার সব প্রয়োজন পূরণ হয়েছে বলা যায় না। সন্তানের খাদ্য ও শিক্ষার খরচ সন্তানের প্রয়োজন পূরণ করে; মায়ের নিজের আয়হানি বা চিকিৎসার হিসাব তার সঙ্গে এক নয়। গৃহস্থালি শ্রমের কারণে কর্মজীবন থেকে পিছিয়ে পড়া নারীর ক্ষতির আলাদা মূল্য নির্ধারণ না করলে বিভিন্ন খাতে দেওয়া অর্থের নামের আড়ালে তাঁর ব্যক্তিগত দুর্বলতা চাপা পড়ে। দুধপানের মজুরি বা সন্তানকেন্দ্রিক সুবিধার বাইরেও একজন নারীর জীবন আছে; সন্তান না থাকা তালাকপ্রাপ্তারও একইভাবে খাদ্য, আশ্রয় ও পুনর্বাসন প্রয়োজন।
গৃহস্থালি শ্রমের অবমূল্যায়ন: অর্থনৈতিক বাস্তবতা বনাম বিধান-রীতি
আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজ—রান্না, ঘর পরিচর্যা, সন্তান লালন-পালন এবং মানসিক শ্রম—কে স্পষ্টভাবে উৎপাদনশীল শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যদিও এটি বাজারে মজুরি হিসেবে গণনা হয় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০১৮ সালের হিসাবে ন্যূনতম ঘণ্টামজুরির ভিত্তিতে এই শ্রমের মূল্য বিশ্ব মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ বা প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান; ডলারের হিসাবটি ২০১১ সালের ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে। একই প্রতিবেদনে অবৈতনিক পরিচর্যার মোট সময়ের ৭৬.২ শতাংশ নারীরা দেন বলে উল্লেখ রয়েছে। [17]
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, ২০১৮
In no country in the world do men and women provide an equal share of unpaid care work.
বাংলা অনুবাদ:
পৃথিবীর কোনো দেশেই পুরুষ ও নারী অবৈতনিক পরিচর্যার কাজে সমান অংশ দেন না।
বায়িন তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল পর্যন্ত—বা কিছু ব্যাখ্যায় সেই সময়েও খোরপোষ ছাড়া—সীমিত খোরপোষ-আবাসন দিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলে দীর্ঘ বছরের এই শ্রম-অবদান ক্ষতিপূরণের স্বতন্ত্র ভিত্তি পায় না। বিবাহ একটি চুক্তি হলেও তার অর্থনৈতিক প্রভাব চুক্তির সমাপ্তির দিনেই শেষ হয় না। নৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অসমতুল: সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত নির্ভরশীলতা ও অবদানের বোঝা কেন শুধু দুর্বল পক্ষের, সাধারণত নারীর, কাঁধে চাপবে? স্বামী নিজের কর্মজীবন, আয় ও সঞ্চয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, আর সেই ধারাবাহিকতা তৈরিতে সহায়তা করা নারী শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য হতে পারেন।
আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো, গৃহস্থালি শ্রমের কারণে অনেক নারী শিক্ষা বা কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা হারান, ফলে তালাক-পরবর্তী তাৎক্ষণিক স্বনির্ভরতার প্রত্যাশা প্রায়শই অবাস্তব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পরিচর্যার দায়িত্বের কারণে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা ৭৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মধ্যে ৭০ কোটি ৮০ লাখ ছিলেন নারী এবং ৪ কোটি ছিলেন পুরুষ। উপার্জনে প্রবেশের সুযোগে এই অসমতা বিচ্ছেদের পরে একজন নারীর জীবিকা পুনর্গঠনের সমস্যাকে আরও তীব্র করে। [18]
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, ২০২৪
Of these, 708 million were women and 40 million were men.
বাংলা অনুবাদ:
এঁদের মধ্যে ৭০ কোটি ৮০ লাখ ছিলেন নারী এবং ৪ কোটি ছিলেন পুরুষ।
দশ বা বিশ বছর সংসারের দায়িত্ব পালন করা নারীর জন্য নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়া শুধু ইচ্ছার বিষয় নয়। তাঁর বয়স, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, কাজের অভিজ্ঞতায় বিরতি এবং সন্তানের চলমান দায়িত্ব উপার্জনের সুযোগকে সীমিত করতে পারে। একজন বিবাহিত নারীকে সংসারের প্রয়োজনে উপার্জনের সুযোগ ছেড়ে দিতে উৎসাহ দেওয়া এবং তালাকের পরে তাঁকেই তাৎক্ষণিক স্বনির্ভরতার পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া দ্বিচারিতা। পরিবারের সুবিধার জন্য যে ত্যাগ গ্রহণ করা হয়েছে, তার ব্যয়ও পরিবারের সুবিধাভোগী পক্ষকে বহন করতে হবে।
গৃহস্থালি সেবা বাধ্যতামূলক নয় বললেও সম্পাদিত শ্রমের হিসাব থাকে
ইবন কুদামা স্ত্রীর ওপর ময়দা মাখা, রুটি বানানো ও রান্নার মতো সেবা বাধ্যতামূলক নয় বলে আলোচনা করেছেন। তাঁর যুক্তিতে বিবাহচুক্তিতে নারীর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত বিষয় হিসেবে যৌন উপভোগকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। [19]
আল-মুগনি, মাসআলা ৫৬৯৬
وقد روي أن فاطمة أتت رسول الله صلى الله عليه وسلم تشكو إليه ما تلقى من الرحى، وسألته خادما يكفيها ذلك. ولنا أن المعقود عليه من جهتها الاستمتاع، فلا يلزمها غيره، كسقي دوابه، وحصاد زرعه.
বাংলা অনুবাদ:
বর্ণিত হয়েছে যে, ফাতিমা যাঁতা চালানোর কষ্টের অভিযোগ নিয়ে রাসুলের কাছে এসেছিলেন এবং এই কাজ করে দিতে একজন সেবক চেয়েছিলেন। আমাদের যুক্তি হচ্ছে, তাঁর পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয় যৌন উপভোগ; সুতরাং এর বাইরে অন্য কাজ তাঁর ওপর বাধ্যতামূলক হয় না—যেমন স্বামীর পশুকে পানি পান করানো কিংবা তাঁর ফসল কাটা।
ইবন কুদামার আলোচনায় ঘরের কাজ বাধ্যতামূলক নয় বলার পরেও প্রথা ও সদাচারের ভিত্তিতে নারীকে সেই কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের জীবনযাপন সুষ্ঠু রাখতে এসব কাজের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ রান্না ও পরিচর্যার প্রয়োজন বাস্তব, সেই প্রয়োজন পূরণে নারীর শ্রম প্রত্যাশিত, কিন্তু বাধ্যতামূলক চুক্তিগত কাজের তালিকা থেকে তা আলাদা রাখা হয়েছে। [20]
আল-মুগনি, মাসআলা ৫৬৯৬
ولم يكن ذلك واجبا عليها، ولهذا لا يجب على الزوج القيام بمصالح خارج البيت، ولا الزيادة على ما يجب لها من النفقة والكسوة، ولكن الأولى لها فعل ما جرت العادة بقيامها به؛ لأنه العادة، ولا تصلح الحال إلا به، ولا تنتظم المعيشة بدونه.
বাংলা অনুবাদ:
এ কাজ তাঁর ওপর বাধ্যতামূলক ছিল না। একই কারণে স্বামীর ওপরও ঘরের বাইরের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন কিংবা স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত খোরপোষ ও পোশাকের অতিরিক্ত প্রদান বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু প্রথা অনুযায়ী নারী যে কাজ করে থাকেন, তা করাই তাঁর জন্য উত্তম; কারণ এটিই প্রচলিত রীতি, এটি ছাড়া অবস্থা সুষ্ঠু হয় না এবং জীবনযাপন সুবিন্যস্ত হয় না।
এই বক্তব্যে প্রথার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কাজ আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা যায় না বলেই সংসারে সেই কাজ প্রত্যাখ্যান করা সমানভাবে সহজ হয় না। সদাচার, উত্তম আচরণ এবং সংসার সুষ্ঠু রাখার দায়িত্বের সঙ্গে নারীকে যুক্ত করলে কাজটি না করার সামাজিক মূল্য তাঁর ওপর পড়ে। পরিবারের অন্য সদস্যরা রান্না, পরিচ্ছন্নতা ও পরিচর্যার সুবিধা নিয়মিত গ্রহণ করবেন, অথচ বিচ্ছেদের সময়ে সেই সুবিধার অর্থনৈতিক হিসাব অনুপস্থিত থাকতে পারে। কাজটি বাধ্যতামূলক ছিল কি না, সেই প্রশ্ন বাস্তবে কে কত শ্রম দিয়েছেন এবং কে তার সুবিধা পেয়েছেন—তার উত্তর দেয় না।
একজন নারী খাবার তৈরি, শিশুর যত্ন ও ঘর সামলানোর কাজ করলে অন্য সদস্যের পেশাগত কাজে সময় দেওয়ার সুযোগ বাড়ে। একই সেবা বাইরে থেকে নিতে হলে অর্থ দিতে হতো; নিজেরা ভাগ করে করলে উপার্জনের সময় কিংবা অবসর ব্যয় করতে হতো। ফলে এই শ্রম পরিবারের খরচ সাশ্রয় করে এবং অন্যের আয় বজায় রাখতে সহায়তা করে। সেবাদানকারী নিজের নামে বেতন না পেলেও সুবিধাভোগীর হাতে সময় ও অর্থ থেকে যায়। বিচ্ছেদের সময়ে শুধু সরাসরি উপার্জিত অর্থকে সম্পদের উৎস হিসেবে গণনা করলে পরিবারের আয় সম্ভব করার এই শ্রম বাদ পড়ে। এতে বাজারে বেতন পাওয়া ব্যক্তির অবদান দৃশ্যমান হয়, তাঁর কাজ করার সুযোগ তৈরি করা ব্যক্তির অবদান হিসাবের বাইরে যায়।
বিবাহচুক্তির আলোচনায় নারীর পক্ষ থেকে যৌন উপভোগকে সুনির্দিষ্ট করা এবং বাস্তবে সম্পাদিত পরিচর্যাকে প্রথা ও সদাচারের স্তরে রাখা নারীর অবদানের একটি অসম মূল্যায়ন তৈরি করে। যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষের চুক্তিগত প্রাপ্য স্পষ্ট, কিন্তু দীর্ঘদিনের শ্রমের ফলে নারীর হারানো উপার্জনের প্রতিদান সেইভাবে নির্ধারিত হয়নি। নারীর জন্য উত্তম আচরণ হিসেবে যে কাজ প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তার সুবিধা নিয়মিত নেওয়ার পরে বিচ্ছেদে তার অর্থনৈতিক পরিণতির দায়ও সুবিধাভোগীকে নিতে হবে। নিজের কর্মজীবন, বিশ্রাম ও সঞ্চয় গড়ে তুলতে অন্যের পরিচর্যা গ্রহণ করে পরে তাঁকে শুধু অতীতের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গণনা করা শোষণমূলক।
আর্থিক নিষ্পত্তিতে সেই কারণে শুধু হাতে দেওয়া টাকার হিসাব যথেষ্ট নয়। কে আয় করেছেন, তার সঙ্গে কার শ্রমে সেই আয় করার সময় ও সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেটিও বিবেচ্য। সংসারে কাজের ভাগ দুজনের সমঝোতায় নির্ধারিত হলেও সেই সমঝোতার লাভ একজন রেখে দেবেন এবং ক্ষতি অন্যজন একা বহন করবেন—এটি ন্যায়সংগত বণ্টন নয়। অবৈতনিক কাজের সুবিধা গ্রহণের সময়ে তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে বিচ্ছেদের সময়ে সেই কাজের অবদান অগ্রাহ্য করা পুরুষের সম্পদ ও নারীর নির্ভরশীলতার মধ্যে ব্যবধান বাড়ায়।
প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও “সেফটি নেট” প্রশ্ন
সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নে দুটি পৃথক দায়িত্ব রয়েছে: রাষ্ট্রীয় সহায়তা—ভাতা, আশ্রয় ও আইনি সুরক্ষা—এবং বিবাহ থেকে সৃষ্ট ব্যক্তিগত আর্থিক দায়। যেসব বিধানে ইদ্দতের পরে নিয়মিত ব্যক্তিগত খোরপোষের দায় থাকে না, সেখানে নারীকে নতুন জীবন শুরুর সম্পূর্ণ ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ব্যয় একতরফাভাবে বহন করতে হয়—যা তালাকের ক্ষমতা-অসমতা (প্রায়শই পুরুষ-কেন্দ্রিক) কে সরাসরি অর্থনৈতিক বৈষম্যে রূপান্তরিত করে ।
নীতিগত প্রশ্নটি স্পষ্ট: বিবাহকালে সৃষ্ট নির্ভরশীলতা (আর্থিক নিরাপত্তা, কর্মজীবন ত্যাগ) তালাকের পরও কি ন্যূনতমভাবে ভাগ করে নেওয়া উচিত নয়? যদি না হয়, তাহলে এই বিধান কার্যত দুর্বল পক্ষকে শাস্তি-সদৃশ অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়—যদিও তালাক শরীয়তে অনুমোদিত একটি প্রক্রিয়া। এই ব্যবস্থা নারীর অর্থনৈতিক স্থানচ্যুতির বোঝা পুরোপুরি তাদের উপর চাপিয়ে দেয়, যা আধুনিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য।
প্রাক্তন স্ত্রীকে তাঁর পিতা, ভাই, সন্তান বা দাতব্য সহায়তার দিকে ঠেলে দিলে বিবাহে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির দায় স্থানান্তরিত হয়। যিনি দীর্ঘদিন সংসারের শ্রমের সুবিধা পেয়েছেন, তাঁর দায় সীমিত করে অন্য আত্মীয় বা সমাজকে ব্যয় বহন করতে বলা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় সহায়তা দরকার হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের সহায়তা থাকা মাত্রই বিবাহে সুবিধাভোগী ব্যক্তির দায়িত্ব মুছে যায় না। সামাজিক সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ পরস্পরের বিকল্প নয়।
ধরা যাক, একজন নারী বহু বছর সন্তান ও অসুস্থ স্বজনের পরিচর্যার জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন; বিচ্ছেদের সময় তাঁর নিজের বাড়ি, সঞ্চয় বা তাৎক্ষণিক আয় নেই। তাঁকে নির্দিষ্ট ইদ্দত পর্যন্ত সহায়তা দিয়ে পরে নিজের ব্যবস্থা করতে বলা হলে চাকরি হারানোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় তাঁর ওপরই থাকে। ন্যায়সংগত সহায়তার মানদণ্ডে তাঁর বাস্তব প্রয়োজন, উপার্জনে ফিরতে লাগা সময় এবং বিবাহে দুই পক্ষের অবদান বিবেচ্য হওয়া দরকার।
আদায়যোগ্য অধিকার না থাকলে সহায়তা পাওয়ার জন্য বারবার আবেদন, আত্মীয়ের অনুমোদন এবং দাতার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে মর্যাদার প্রশ্নও জড়িত। একজন মানুষ নিজের পাওনা দাবি করছেন, নাকি জীবিকার জন্য করুণা প্রার্থনা করছেন—এই পার্থক্য বাস্তব ক্ষমতার পার্থক্য। পরিবারে দীর্ঘদিন অবদান রাখা একজন নারীকে বিচ্ছেদের পরে অনিশ্চিত অনুগ্রহের ওপর ছেড়ে দেওয়া তাঁর শ্রম ও ব্যক্তিসত্তার অবমূল্যায়ন।
আধুনিক তুলনামূলক আইন: ইদ্দত-সীমাবদ্ধতা বনাম পুনর্বাসন-ভিত্তিক সহায়তা
আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনে তালাক-পরবর্তী সহায়তা ইদ্দতের মতো স্বল্প ও নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করেও নির্ধারিত হতে পারে। নারীর অর্থনৈতিক অক্ষমতা, পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় সময়কাল, বিবাহের দৈর্ঘ্য এবং অন্য পক্ষের সামর্থ্য এই সহায়তার প্রয়োজন মূল্যায়নের বাস্তব মানদণ্ড। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ১০ জুলাই ২০২৪ সালের Mohd. Abdul Samad v. State of Telangana & Another মামলায় (2024 INSC 506) তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীও ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় খোরপোষ দাবি করতে পারেন বলে রায় দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৬ সালের Muslim Women (Protection of Rights on Divorce) Act-এর প্রতিকার এই পৃথক অধিকারকে বাতিল করে না। [21]
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের যৌথ আদেশ, ১০ জুলাই ২০২৪
If Muslim women are married and divorced under Muslim law then Section 125 of the CrPC as well as the provisions of the 1986 Act are applicable. Option lies with the Muslim divorced women to seek remedy under either of the two laws or both laws.
বাংলা অনুবাদ:
মুসলিম নারীরা মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহিত ও তালাকপ্রাপ্ত হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারা এবং ১৯৮৬ সালের আইনের বিধান উভয়ই প্রযোজ্য। তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারী এই দুই আইনের যেকোনো একটি অথবা উভয়ের অধীনে প্রতিকার চাইবেন কি না, সেই পছন্দ তাঁর।
এই রায়ের প্রাসঙ্গিকতা হচ্ছে, তালাকের ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগের বাইরে নারীর জীবনধারণের বাস্তব প্রশ্নকে আইনি প্রতিকারের বিষয় করা। কোনো নারীকে দেওয়া অর্থ তাঁর ভবিষ্যৎ জীবিকার যুক্তিসংগত বিকল্প কি না, সেই পরীক্ষা ছাড়া সামান্য কোনো প্রদান দেখিয়ে সমস্ত দায় শেষ হয়েছে দাবি করলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। অধিকারকে এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন যাতে বিচ্ছেদের আইনি ঘোষণা একজন ব্যক্তিকে অনাহার বা আশ্রয়হীনতার মুখে ফেলার সহজ উপায়ে পরিণত না হয়।
এই ধরনের তুলনামূলক আইনি যুক্তি একটি মৌলিক নীতিগত সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করে: তালাক-পরবর্তী সহায়তার উদ্দেশ্য কেবল ইদ্দত পূরণ বা গর্ভাবস্থা যাচাই নয়, বরং অর্থনৈতিক পতন রোধ করে নারীর বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। বিবাহের দৈর্ঘ্য, পরিচর্যার দায়িত্ব, হারানো উপার্জনের সুযোগ এবং আর্থিক সামর্থ্য সেই কারণে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। একটি এককালীন প্রদান পর্যাপ্ত কি না, নিয়মিত সহায়তা কত দিন প্রয়োজন কিংবা কাজের প্রশিক্ষণ ও বাসস্থানের খরচ কে বহন করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। নির্দিষ্ট ধর্মীয় সময়সীমা মানুষের প্রত্যেক ধরনের আর্থিক ক্ষতির বিকল্প হিসাব হতে পারে না।
কোরআন-হাদিস: ব্যাখ্যাগত সমন্বয় এবং তার সীমা
ফাতিমা বিনতে কায়সের বর্ণনার প্রয়োগ নিয়ে বিরোধটি ধ্রুপদি উৎসেই সংরক্ষিত। আয়িশার আপত্তি, হানাফি ফকিহদের আবাসন ও খোরপোষ উভয়টি দেওয়ার যুক্তি, মালিকি-শাফিঈ অবস্থানের পৃথকীকরণ এবং হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ প্রত্যাখ্যান—এসব ভিন্ন সিদ্ধান্ত একই তালাকপ্রাপ্তার ওপর ভিন্ন অর্থনৈতিক ফল চাপায়। আবাসনের সাধারণ নির্দেশকে কারা কোন তালাকে প্রযোজ্য করেন এবং গর্ভাবস্থার শর্ত থেকে অগর্ভবতীর খোরপোষ বাদ দেন কি না, তার ওপর নারীর প্রাপ্তি নির্ভর করে।
আল-মুগনিতে অগর্ভবতী বায়িন তালাকপ্রাপ্তার পক্ষে খোরপোষ প্রত্যাখ্যানের একটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, রুজুর মাধ্যমে অপসারণযোগ্য নয় এমন নিষেধের ফলে তাঁর অবস্থান বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরের নারীর মতো। রাজঈ তালাকপ্রাপ্তার ক্ষেত্রে স্ত্রীপরিচয় বহাল থাকার যুক্তি দেওয়া হয়েছে। [22]
আল-মুগনি, মাসআলা ৬৫২৬
ولأن هذه محرمة عليه تحريما لا تزيله الرجعة، فلم يكن لها سكنى ولا نفقة، كالملاعنة أو كالأجنبية، وفارقت الرجعية في ذلك.
বাংলা অনুবাদ:
এই নারী তাঁর জন্য এমনভাবে নিষিদ্ধ হয়েছেন যা রুজুর মাধ্যমে দূর হয় না; তাই লিআনের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন নারী কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরের নারীর মতো তাঁর আবাসন ও খোরপোষ নেই। এই ক্ষেত্রে তিনি রাজঈ তালাকপ্রাপ্তা থেকে পৃথক।
এই যুক্তির কেন্দ্র নারীর জীবিকা নয়, স্বামীর সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক অবস্থান। বিবাহের সময়ে যৌথ জীবনের সুবিধা গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু রুজুর অধিকার শেষ হলে অর্থনৈতিক সম্পর্কও বহিরাগত ব্যক্তির সম্পর্কের মতো গণ্য হচ্ছে। দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতা, সংসারের জন্য সম্পাদিত শ্রম ও হারানো কর্মজীবন সেখানে স্বাধীন দাবির মর্যাদা পায় না। আইনি সম্পর্কের অবসান এবং সেই সম্পর্কের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির অবসানকে এক করে দেখা যুক্তিগত ভুল।
কোরআনের ক্ষতি না করা ও আর্থিক ব্যবস্থার নির্দেশকে কতখানি সম্প্রসারিত বা সংকুচিত করা হচ্ছে, তার সামাজিক ফল নির্দিষ্ট। আবাসন স্বীকৃত রেখে খাদ্যের দায় বাদ দিলে একটি প্রয়োজন পূরণ হয় এবং অন্যটি অনিশ্চিত থাকে। মুতআকে অনুপ্রেরণামূলক বলে আদায়ের বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে প্রাপ্তি সদিচ্ছানির্ভর হয়। ইদ্দতের ব্যয় দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি আয়হানির প্রতিকার অনির্ধারিত থাকতে পারে। কোনো ব্যবস্থার ন্যায়সংগততা মূল্যায়নে নামমাত্র অধিকার ঘোষণার চেয়ে সেই অধিকার বাস্তবে কতটা জীবনধারণ নিশ্চিত করে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
ফাতিমা বিনতে কায়সের বর্ণনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফিকহি ধারাগুলোর মধ্যে অগর্ভবতী বায়িন তালাকপ্রাপ্ত নারীর খোরপোষ এবং কোনো কোনো মতে আবাসনও সম্পূর্ণ অস্বীকৃত। এতে তিনটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়: কোরআনের বাসস্থান-সংক্রান্ত নির্দেশ ও “মাতাআ” ধারণার সঙ্গে ব্যাখ্যাগত সংঘাত, গৃহস্থালি শ্রমের বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্যকে ক্ষতিপূরণের পর্যাপ্ত ভিত্তি না দেওয়া এবং তালাক-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকির বড় অংশ নারীর ওপর চাপিয়ে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ানো। যে মতগুলোতে ইদ্দতকালীন সহায়তা বা বাধ্যতামূলক মুতআ রয়েছে, সেখানেও দীর্ঘমেয়াদি আয়হানি ও পুনর্বাসনের খরচের প্রশ্ন পৃথকভাবে থেকে যায়।
তালাক-পরবর্তী আর্থিক সহায়তা দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় হয়ে থাকলে দুর্বল পক্ষের নিরাপত্তা শক্তিশালী পক্ষের মর্জির ওপর নির্ভর করে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক দেনমোহর বা মুতআ থাকলেও সেগুলোর পরিমাণ, আদায় এবং প্রকৃত ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্ক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বহু বছরের শ্রমের সুবিধা নেওয়ার পরে স্বল্প সময়ের খরচ মিটিয়ে সমস্ত দায়িত্ব শেষ বলে ঘোষণা করা মানবিক বা অর্থনৈতিক ন্যায়ের যথেষ্ট ভিত্তি নয়।
যুক্তি ও ন্যায়ের দৃষ্টিতে তালাক-পরবর্তী আর্থিক সহায়তাকে কেবল দয়া বা স্বেচ্ছামূলক অনুগ্রহ হিসেবে নয়, বরং বিবাহকালে সৃষ্ট নির্ভরশীলতা, নারীর অবদান এবং মৌলিক মানবিক নিরাপত্তার যৌক্তিক ফল হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। গর্ভধারণ করেছেন কি না কিংবা রুজুর সুযোগ আছে কি না—এই প্রশ্নগুলোর চেয়ে একজন মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন বিস্তৃত। ধর্মীয় পরিচয় বা তালাকের শ্রেণিবিভাগের কারণে কোনো নারীকে কম সুরক্ষা দেওয়ার নৈতিক যুক্তি নেই। বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতার সঙ্গে তার অর্থনৈতিক পরিণতির ন্যায়সংগত দায়ও যুক্ত থাকতে হবে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আলোচিত সিদ্ধান্ত দেখায়, রাষ্ট্রীয় আইনে ইদ্দতের সীমা অতিক্রম করে মুসলিম নারীর প্রতিকার চাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হতে পারে। কার্যকর অধিকার মানে এমন পাওনা, যা অস্বীকার করলে আদায়ের পথ থাকবে এবং যার পরিমাণ বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। একটি সম্পর্কের সমাপ্তি অন্য ব্যক্তিকে অর্থনৈতিক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার অনুমতিপত্র হতে পারে না।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামি শরিয়তে তালাক দেয়ার অধিকার একমাত্র স্বামীর ↩︎
- কোরআন, সূরা আত-তালাক ৬৫:১ ↩︎
- কোরআন, সূরা আত-তালাক ৬৫:৬ ↩︎
- কোরআন, সূরা আল-বাকারা ২:২৪১ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিস: ৫৩২৩-৫৩২৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিস: ৩৬০০ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ৩৫৫৭; আন্তর্জাতিক নম্বর ১৪৭৮ ↩︎
- ইবন আবদুল বার, আল-ইস্তিযকার, অনুচ্ছেদ ২৬৭৯৬ ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, মাসআলা ৬৫২৬ ↩︎
- সাহনুন, আল-মুদাওয়ানা, কিতাবু তালাকিস সুন্নাহ, “নাফাকাতুল মুতাল্লাকাতি ওয়া সুকনাহা” ↩︎
- কাসানি, বাদায়িউস সানায়ি, ইদ্দতকালীন খোরপোষ ও আবাসন ↩︎
- আল-মুগনি, মাসআলা ৬৫২৯, “নাফাকাতুল হামিল” ↩︎
- ইবন হাজার হাইতামি, তুহফাতুল মুহতাজ, সপ্তম খণ্ড, “ফাসলুন ফিল মুতআ” ↩︎
- আল-মুদাওয়ানা, “আল-মুতআ” ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২৬৪১৪৬ ↩︎
- একই ফতোয়ার আরবি পাঠ ↩︎
- আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, Care Work and Care Jobs for the Future of Decent Work, ২০১৮, নির্বাহী সারসংক্ষেপ, পৃষ্ঠা ৩ ↩︎
- আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, পরিচর্যার দায়িত্ব ও নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ, ২৯ অক্টোবর ২০২৪ ↩︎
- আল-মুগনি, মাসআলা ৫৬৯৬, “লাইসা আলাল মারআতি খিদমাতু যাওজিহা” ↩︎
- ইবন কুদামা, আল-মুগনি, মাসআলা ৫৬৯৬, গৃহস্থালি সেবা সম্পর্কে একই আলোচনার পরবর্তী বক্তব্য ↩︎
- ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, Mohd. Abdul Samad, 2024 INSC 506, যৌথ আদেশের দফা গ(ii) ↩︎
- আল-মুগনি, মাসআলা ৬৫২৬, বায়িন ও রাজঈ তালাকের পার্থক্যের যুক্তি ↩︎


আসিফ ভাই আসল সত্য কথাগুলি মুমিনদের চোখের সামনে আয়নার মতো তুলে ধরানোর জন্য আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।ধন্যবাদ