সারসংক্ষেপ
‘রদা আল-কাবীর’ বা প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান সংক্রান্ত বিধানটি ইসলামী উৎসে এমন এক জটিল সমস্যার সৃষ্টি করেছে, যেখানে সহিহ হাদিস, কোরআনিক পাঠ, সাহাবি-আমল এবং পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যা পরস্পরের সঙ্গে একাধিক স্তরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সাহলা বিনতে সুহাইলকে পূর্ণবয়স্ক ও দাড়িওয়ালা সালিমকে দুধ পান করানোর নির্দেশ সহিহ মুসলিমসহ বহু হাদিসগ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে। একই বিষয়ে আয়িশা এই বিধানকে অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও কার্যকর মনে করে বাস্তবে প্রয়োগ করতেন, অথচ নবীর অন্যান্য স্ত্রী এটিকে সালিমের জন্য বিশেষ অনুমতি বলে প্রত্যাখ্যান করেন। আরও অস্বাভাবিকভাবে, ইবন আবী মুলাইকা এই হাদিসটি প্রায় এক বছর ভয়ে বর্ণনা করেননি। ফলে বিধানটির ব্যাখ্যা নিয়ে অস্বস্তি ও মতভেদ কোনো আধুনিক প্রতিক্রিয়া নয়; প্রাথমিক ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যেই তার স্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে।
দুধপানের পদ্ধতি নিয়েও একই ধরনের সংঘাত দেখা যায়। সহিহ বর্ণনায় কোথাও পাত্রে দুধ দোহন করে খাওয়ানোর কথা নেই; এই নির্দিষ্ট বিবরণটি আসে ওয়াকিদীর সূত্রে, যাকে প্রধান মুহাদ্দিসদের অনেকে হাদিসে পরিত্যক্ত বা মিথ্যাবাদী বলেছেন। অন্যদিকে ইবন হাজমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফকিহ সরাসরি স্তন থেকে চোষাকেই শরিয়তগত ‘রদা’ হিসেবে গণ্য করেছেন এবং পাত্রে দুধ পান করলে মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না বলে মত দিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দশবার ও পাঁচবার দুধপানসংক্রান্ত কোরআনিক পাঠের সমস্যা: সহিহ মুসলিমে নবীর মৃত্যুর সময়ও পাঁচবারের পাঠ কোরআন হিসেবে তিলাওয়াত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, অথচ বর্তমান কোরআনে তা নেই। পরবর্তী ব্যাখ্যায় নববী বলেছেন, এর তিলাওয়াত এত দেরিতে রহিত হয়েছিল যে নবীর মৃত্যুর সময়ও কিছু মানুষ রহিত হওয়ার সংবাদ না পেয়ে সেটিকে কোরআন হিসেবে পড়ছিলেন। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানের বিধানটির আইনি অবস্থান নিয়েও ঐকমত্য নেই—কেউ একে রহিত বলেছেন, কেউ কেবল সালিমের জন্য বিশেষ বলেছেন, আবার ইবন তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিমের ধারায় সালিমের মতো প্রয়োজন সৃষ্টি হলে অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে ঘটনাটি শুধু একটি অস্বাভাবিক ফিকহি বিধান নয়; এটি হাদিসের ভাষা, ফিকহি প্রয়োগ, ওহীর রহিতকরণ এবং কোরআনের পাঠ-সংরক্ষণ—এই চারটি ক্ষেত্রেই গভীর অসামঞ্জস্য উন্মোচন করে।
ভূমিকা
একটি আদর্শ ও রুচিশীল সমাজে মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত শালীনতা এবং পারিবারিক সম্পর্কের পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শিষ্টাচার প্রচলিত থাকে। আধুনিক সভ্যতা যেখানে নারী-পুরুষের পারস্পরিক মেলামেশার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং জেন্ডার শিষ্টাচারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে, সেখানে ইসলামের ধ্রুপদী ইতিহাসে ‘রদা-আল-কাবীর’ বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দুগ্ধপানের বিষয়টি এক গভীর ও অস্বস্তিকর দ্বান্দ্বিকতার জন্ম দেয়। মুসলিম বিশ্বের প্রামাণ্য ধর্মগ্রন্থগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লিপিবদ্ধ এই বিধানটি এমন এক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়েছে, যা সমসাময়িক সুস্থ বিবেক, মানবিক প্রজ্ঞা এবং রুচিবোধের কাছে কেবল অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং চরমভাবে অযৌক্তিক ও বিকৃত বলে মনে হয়।
পারিবারিক পরিবেশে অবাধ প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার মতো একটি প্রাত্যহিক ও লৌকিক সমস্যার সমাধানের জন্য একজন পূর্ণবয়স্ক, দাড়িওয়ালা পুরুষকে একজন পরনারীর বুকের দুধ পান করানোর বিষয়টি নৈতিকভাবে যতটা অস্বস্তিকর, ধর্মীয় ‘ঐশী প্রজ্ঞা’ বা ডিভাইন উইজডমের দাবির ক্ষেত্রে তা তার চেয়েও বড় একটি দার্শনিক প্রশ্নচিহ্ন। যখন একটি ধর্ম নিজেকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে দাবি করে, তখন তার মধ্যে এমন একটি কুরুচিপূর্ণ ও অযৌক্তিক পন্থার উপস্থিতি আধুনিক মনস্তত্ত্বের সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়ায়। এই প্রবন্ধটি সেই বিতর্কিত বিধানের ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করবে এবং দেখাবে কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সমাধান সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের সাথে সরাসরি সংঘাত সৃষ্টি করে এবং কেন এটি আজ এক বড় বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের নামান্তর।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: সাহলা ও সালিমের কাহিনী
এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু সাহলা বিনতে সুহাইল এবং সালিম মাওলা আবু হুজাইফা। সালিমকে আবু হুজাইফা পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং পরিবারের সন্তানের মতোই তিনি ঘরে যাতায়াত করতেন। পরে কোরআনের দত্তক-পুত্রকে প্রকৃত পিতার পরিচয়ে ডাকার বিধান নাযিল হলে সেই পুরনো সামাজিক সম্পর্কের আইনি অবস্থান বদলে যায় এবং পূর্ণবয়স্ক সালিমের সাহলার কাছে অবাধ যাতায়াত সমস্যায় পরিণত হয়। ইসলামী উৎসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই সমস্যার সমাধান হিসেবে মুহাম্মদ সাহলাকে নির্দেশ দেন সালিমকে দুধ পান করাতে, যাতে দুগ্ধ-সম্পর্ক সৃষ্টি হয় এবং সালিম তার জন্য মাহরাম হয়ে যায়। লক্ষণীয়, সালিম তখন কোনো শিশু ছিলেন না; হাদিসের ভাষাতেই তিনি “পুরুষেরা যে পর্যায়ে পৌঁছে, সে পর্যায়ে পৌঁছেছেন”, “পুরুষেরা যা বোঝে তা বোঝেন” এবং অন্য বর্ণনায় তিনি দাড়িওয়ালা পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। দত্তক-সম্পর্ক বিলোপ এবং সালিমের ঘটনার পটভূমিও ধ্রুপদী ও আধুনিক ইসলামি উৎসে একইভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই বিষয়ে ফতোয়াগুলো পরের পরিচ্ছেদে দেয়া হচ্ছে।
ঘটনাটি কোনো একটি বিচ্ছিন্ন বা অজ্ঞাত বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; সহীহ মুসলিমে একাধিক সনদে, ইবনু মাজাহ, আবু দাউদ, নাসাঈ, মুওয়াত্তা মালিকসহ বহু গ্রন্থে এর বিভিন্ন অংশ বর্ণিত হয়েছে। হাদিসগুলো আগে দেখা যাক [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] –
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৬৯। আমরুন নাকিদ ও ইবনু আবূ উমর (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুহায়লের কন্যা সাহলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাযির হায়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার সাথে সালিমের দেখা সাক্ষাৎ করার কারণে আমি আবূ হুযায়ফার মুখমণ্ডলে অসন্তুষ্টির আলামত দেখতে পাচ্ছি অথচ সালিম হল তার হালীফ (পোষ্য পূত্র)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তাকে দুধপান করিয়ে দাও। তিনি বললেন, আমি কেমন করে তাকে দুধপান করাব, অথচ সে একজন বয়স্ক পূরুষ। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসি দিলেন এবং বললেন, আমি জানি যে, সে একজন বয়স্ক পুরুষ। আম্র (রাবী) তাঁর হাদীসে অতিরিক্ত বলেছেন, সালিম বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর ইবনু আবূ উমরের বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৭০। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম হানযালী ও মুহাম্মাদ ইবনু আবূ উমর (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আবূ হুযায়ফার দাস সালিম (রহঃ) আবূ হুযায়ফা ও তাঁর পরিবারের সাথে একই ঘরে বসবাস করত। একদা সুহায়লের কন্যা (হুযায়ফার স্ত্রী) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট নিকট এসে বলল, সালিম বয়স্ক পুরুষের স্তরে পৌছে গেছে, সে বুঝে লোকে যা বুঝতে পারে অথচ সে আমাদের নিকট প্রবেশ করে থাকে। আমি ধারণা করি এই কারণে আবূ হুযায়ফার মনে অভিযোগের ভাব সৃষ্টি হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি তাকে দুধপান করিয়ে দাও, তুমি তার জন্য হারাম হয়ে যাবে এবং আবূ হুযায়ফার মনের অভিযোগ দুরীভূত হবে। তারপর তিনি তার (আবূ হুযায়ফার) নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি তাকে (সালিমকে) দুধপান করিয়েছি। তাতে আবূ হুযায়ফার মনের অসন্তোষ দুর হয়ে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৭২। মুহাম্মাদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) … উম্মু সালমা (রাঃ) আয়িশা (রাঃ)-কে বললেন, তোমার নিকট বালিগ হওয়ার নিকটর্তী ছেলে প্রবেশ করে থাকে, কিন্তু আমার নিকট ঐ ধরনের ছেলের প্রবেশ করাকে পছন্দ করি না। রাবী বলেন, আয়িশা (রাঃ) বললেন, তোমার জন্য কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে সুন্দর আদর্শ বিদ্যমান নেই? তিনি আরো বললেন, একদা আবূ হুযায়ফার স্ত্রী আরয করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সালিম আমার নিকট প্রবেশ করে থাকে, অথচ সে একজন বয়স্ক পুরুষ এবং এ জন্য আবূ হুযায়ফার অন্তরে কিছুটা অসন্তোষভাব বিদ্যমান। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি তাকে তোমার দুধ পান করিয়ে দাও যাতে সে তোমার নিকট প্রবেশ করতে পারে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৭৩। আবূ তাহির ও হারুন ইবনু সাঈদ আয়লী (রহঃ) … রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনী উম্মু সালামা (রাঃ) একদিন আয়িশা (রাঃ)-কে বললেন, আল্লাহর কসম আমি পছন্দ করি না যে, যে ছেলে দুধপানের বয়স পার হয়ে গেছে, সে আমাকে দেখুক। তিনি বললেন, কেন? একদা সুহায়লের কন্যা সাহলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর কসম! আমার নিকট সালিমের প্রবেশ করার কারণে আমি আবূ হুযায়ফার মুখমণ্ডলে অসন্তোষের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে তোমার দুধপান করিয়ে দাও। সাহলা বললেন, সে (সালিম) তো দাড়িবিশিষ্ট। তিনি বললেন, তুমি তাকে দুধ পান করিয়ে দাও, তাতে আবূ হুযায়ফার মুখমন্ডলের মলিনতা দূর হয়ে যাবে। সাহলার বর্ণনা, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, তারপরে আমি আবূ হুযায়ফার চেহারায় মলিনতা আর দেখতে পাই নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু সালামাহ (রাঃ)
সুনান ইবনু মাজাহ
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/৩৬. বয়স্ক লোকে দুধ পান করলে।
১/১৯৪৩। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহ্লা বিনতে সুহাইল (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বললো, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমার নিকট সালেমের যাতায়াতের কারণে আমি (আমার স্বামী) আবূ হুযাইফাহর চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি তাকে দুধ পান করিয়ে দাও। সে বললো, আমি তাকে কিভাবে দুধপান করাবো, সে যে বয়স্ক পুরুষ? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বলেনঃ আমিও অবশ্য জানি যে, সে বয়স্ক পুরুষ। সে তাই করলো, দুধ পান করানোর পর আবূ হুযাইফাহর চেহারায় আমি কোন অপছন্দের ভাব লক্ষ্য করিনি। (রাবী বলেন), তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
সহীহুল বুখারী ৪০০০, ৫০৮৮, মুসলিম ১৪৫৩, নাসায়ী ৩২২৩, ৩২৩৪, ৩৩১৯, ৩৩২০, ৩৩২১, ৩৩২২, ৩৩২৩, আবূ দাউদ ২০৬১, আহমাদ ২৫১২১, মুয়াত্তা মালেক ১২৮৮, দারেমী ২২৫৭, ইরওয়াহ ৬/২৬৪, রওদুন নাদীর ৩৫৪
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
সুনান ইবনু মাজাহ
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/৩৫. এক ঢোক অথবা দু’ ঢোকে দুধপানে হুরমত সাব্যস্ত হয় না।
৩/১৯৪২। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রথমদিকে কোরআনে এই বিধান ছিলো, যা পরে রহিত হয়ে যায়ঃ দশ ঢোক বা পাঁচ ঢোক দুধ পানের কমে নিষিদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
সহীহুল বুখারী ১৪৫২, ইবনু মাজাহ ১৯৪৪, নাসায়ী ৩৩০৭, ২০৬২, মুয়াত্তা মালেক ১২৯৩, দারেমী ২২৫৩, ইরওয়াহ ২১৪৭, তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ১৮। দুধপান
পরিচ্ছদঃ ৬. (কোন মহিলার দুধ) পাঁচ চুমুক খাওয়াতে হারাম সাব্যস্ত হওয়া প্রসঙ্গে
৩৪৯০-(২৫/…) আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামাহ্ আল কা’নাবী (রহঃ) ….. আমরাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশাহ (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছেন, যখন তিনি দুধপানের ঐ পরিমাণ সম্পর্কে আলোচনা করলেন যার দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়। আমরাহ বললেন যে, আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেছিলেন, আল-কোরআনে নাযিল হয় عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ “নির্ধারিত দশবার দুধপানে”। অতঃপর নাযিল হয় خَمْسٌ مَعْلُومَاتٌ “নির্ধারিত পাঁচবার দুধপানে।” (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪৬৩, ইসলামীক সেন্টার. ৩৪৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১৮/ দুধপান
পরিচ্ছদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৬৬। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোরআনে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিলঃ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ ‘দশবার দুধপানে হারাম সাবিত হয়।’ তারপর তা রহিত হয়ে যায় خَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ এর দ্বারা। (পাঁচবার পান দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয়) তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন অথচ ঐ আয়াতটি কোরআনের আয়াত হিসাবে তিলাওয়াত করা হত।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সাহলার স্তনে দুধ এলো কোথা থেকে?
সালিমের ঘটনাকে ঘিরে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, সাহলা বিনতে সুহাইলের স্তনে তখন দুধ এলো কোথা থেকে? সালিম তখন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ; আর সাহলা সেই সময় সদ্য সন্তান প্রসব করেছিলেন, এমন কোনো তথ্য সহিহ হাদিসের বর্ণনায় নেই। এই প্রশ্নটি আধুনিক সমালোচকদের তৈরি নয়; ইসলামকিউএ-তেও সরাসরি একই প্রশ্ন করা হয়েছে। তাদের উত্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সাহলার দুধের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে তারাও কোনো ঐতিহাসিক তথ্য দিতে পারেনি। বরং একের পর এক সম্ভাবনা হাজির করেছে—হয়তো অন্য কোনো সন্তান হয়েছিল যার কথা সংরক্ষিত হয়নি, হয়তো গর্ভপাত হয়েছিল, হয়তো আগের সন্তান মুহাম্মদের জন্মের পরও বহুদিন দুধ থেকে গিয়েছিল। আবার শেষ পর্যন্ত বলা হয়েছে, গর্ভধারণ বা এমনকি বিবাহ ছাড়াও কোনো নারীর স্তনে দুধ আসতে পারে। [10]। ইসলামকিউএর বক্তব্যটি লক্ষ্য করুন—
أما عن استشكال السائل في بقاء لبنها، فيقال فيه:
يحتمل أن يكون هذا اللبن قد در لها من ولد آخر، سوى محمد المذكور، ولم ينقل لنا شأنه.
ويحتمل أن يكون بسبب سقط، لم يبق إلى حين الولادة، ونقل شأنه.
ويحتمل أن يكون قد اتصل لبنها، بعد ولادة ابنها محمد، المذكور، وإن كان ذلك يبعد، لطول الزمان بين قصة سالم، وتحريم التبني، وولادة محمد المذكور، قبل الرجوع من الحبشة، على ما ذكره أهل السير.
وأما ما ذكر في السؤال، من أن المعروف أن اللبن يكون في صدر المرأة، إذا كانت حديثة عهد بالولادة؛ فيقال: نعم، هذا هو المعروف، الغالب؛ لكن ذلك لا يمنع أن يحصل اللبن في صدر المرأة، ولو بغير حمل، بل، ولو من غير زواج، أحيانا، كما هو مشاهد معلوم.
বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্নকারী সাহলার স্তনে দুধ কীভাবে বিদ্যমান ছিল—এই যে প্রশ্ন তুলেছেন, তার উত্তরে বলা যায়:
সম্ভব যে, উল্লেখিত পুত্র মুহাম্মদ ছাড়া অন্য কোনো সন্তানের কারণে তার স্তনে এই দুধ এসেছিল, কিন্তু সেই সন্তানের কোনো বিবরণ আমাদের কাছে সংরক্ষিত হয়নি।
এটিও সম্ভব যে, কোনো গর্ভপাতের কারণে তার দুধ এসেছিল, কিন্তু সেই গর্ভ পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত পৌঁছেনি এবং তার ঘটনাও সংরক্ষিত হয়নি।
এটিও সম্ভব যে, তার উল্লেখিত পুত্র মুহাম্মদের জন্মের পর থেকে তার স্তনে দুধ অব্যাহত ছিল। যদিও এই সম্ভাবনাটি দূরবর্তী; কারণ সালিমের ঘটনা ও দত্তকপ্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার সময়ের সঙ্গে মুহাম্মদের জন্মের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান ছিল। সিরাতবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ হাবশা থেকে ফিরে আসার আগেই জন্মেছিলেন।
আর প্রশ্নে বলা হয়েছে, সাধারণত কোনো নারী সদ্য সন্তান প্রসব করলে তার স্তনে দুধ থাকে। হ্যাঁ, সাধারণ ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, গর্ভধারণ ছাড়া নারীর স্তনে দুধ আসতে পারে না। বরং কখনো কখনো গর্ভধারণ ছাড়াও, এমনকি বিবাহ ছাড়াও নারীর স্তনে দুধ আসতে পারে—এটি পর্যবেক্ষিত ও পরিচিত ঘটনা।
এখানে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। সাহলার ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণে দুধ এসেছিল—ইসলামকিউএ তার কোনো ঐতিহাসিক তথ্য দিতে পারেনি। “অন্য সন্তান হয়ে থাকতে পারে”, “গর্ভপাত হয়ে থাকতে পারে”, “আগের সন্তানের দুধ থেকে গিয়ে থাকতে পারে”—এগুলো সবই সম্ভাবনা, ঘটনার বর্ণনা নয়। অর্থাৎ সালিমকে দুধ পান করানোর ঘটনা সহিহ হাদিসে থাকলেও, সেই ঘটনার একটি মৌলিক জৈবিক উপাদানঃ সাহলার দুধের উৎস, এই সম্পর্কে মূল বর্ণনা সম্পূর্ণ নীরব। ইসলামকিউএ সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে অনুমানের মাধ্যমে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের তৃতীয় সম্ভাবনাটিকেও তারা নিজেরাই দূরবর্তী বলে স্বীকার করেছে, কারণ সময়ের ব্যবধান অনেক দীর্ঘ।
এই প্রশ্নের উত্তরে ইসলামকিউএ ইবন বাযের আরেকটি ফতোয়াও উদ্ধৃত করেছে। ইবন বায সেখানে আরও স্পষ্টভাবে বলেন যে, শরিয়তগত দুগ্ধসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য নারীর আগে গর্ভধারণ বা সন্তান প্রসব করা কোনো শর্তই নয়। এমনকি কোনো অবিবাহিত কুমারী নারীর স্তনে যদি দুধ আসে এবং সে কোনো শিশুকে তা পান করায়, তাহলেও তার সঙ্গে দুধ-মাতার সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। [11]
السؤال فيه إشكال، لكن هذا الرضاع الذي حصل من هذه المرأة من خالة الطفل رضاع شرعي، ما دام درت عليه تكون أمه، وليس من شرط ذلك أن تكون قد حملت.
الصواب: أن درها يؤثر، ولو لم يسبق حمل، هذا هو الصواب؛ لأن الله أطلق قال: وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ [النساء:23].
[…]
سواء كان عن حمل، أو عن وطء، أو درت من دون حمل، ولا وطء، تكون أمه، لو كانت امرأة بكر ما تزوجت أصلًا، ثم درت على إنسان تكون أمًا له […] ما هو بشرط أن يكون هناك زوج وحمل، ما هو بشرط، الصحيح أنه ليس بشرط.
বাংলা অনুবাদ:
প্রশ্নটির মধ্যে কিছু জটিলতা আছে। তবে ওই নারী যে শিশুটিকে দুধ পান করিয়েছেন, সেটি শরিয়তসম্মত দুধপান। যতক্ষণ তার স্তনে দুধ এসেছে এবং তিনি শিশুটিকে তা পান করিয়েছেন, তিনি তার দুধ-মা হয়ে যাবেন। এর জন্য তার আগে গর্ভধারণ করা শর্ত নয়।
সঠিক মত হলো, নারীর স্তনে দুধ এলে সেই দুধ কার্যকর হবে, যদিও তার আগে কোনো গর্ভধারণ না হয়ে থাকে। কারণ আল্লাহ সাধারণভাবে বলেছেন: “এবং তোমাদের সেই মায়েরা যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে।” [সূরা নিসা: ২৩]
[…]
দুধ গর্ভধারণের কারণে আসুক, সহবাসের কারণে আসুক, অথবা গর্ভধারণ ও সহবাস ছাড়াই আসুক—তিনি দুধ-মা হয়ে যাবেন। এমনকি কোনো কুমারী নারী, যিনি কখনো বিবাহই করেননি, তার স্তনে যদি দুধ আসে এবং তিনি কাউকে তা পান করান, তিনিও তার দুধ-মা হয়ে যাবেন। […] স্বামী থাকা বা গর্ভধারণ করা কোনো শর্ত নয়; সঠিক মত অনুযায়ী এগুলোর কোনোটিই শর্ত নয়।
অর্থাৎ সাহলা কখন সন্তান প্রসব করেছিলেন বা আদৌ ওই সময় তার কোনো নবজাতক সন্তান ছিল কি না—এই প্রশ্নের কোনো উত্তর মূল হাদিসে নেই। ইসলামি ফিকহ এই সমস্যার সমাধান করেছে অন্যভাবে: নারীর স্তনে দুধ থাকাটাই যথেষ্ট, সেটি কোথা থেকে এলো তার জন্য গর্ভধারণ বা সন্তান প্রসবকে আবশ্যক ধরা হয়নি। কিন্তু এতে সালিমের ঐতিহাসিক ঘটনার তথ্যগত শূন্যতা দূর হয় না। সাহলার ক্ষেত্রে আসলে কোন ঘটনাটি ঘটেছিল, সে সম্পর্কে উৎসগুলো কোনো তথ্যই দেয় না।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ইবন বায নিজেও সালিমের প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় দুধপানের ঘটনাটি অস্বীকার করেননি। বরং তিনি সরাসরি লিখেছেন যে এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ হয়েছে; এরপর নিজের নির্বাচিত মত হিসেবে ঘটনাটিকে কেবল সালিম ও সাহলার জন্য বিশেষ বলে ঘোষণা করেছেন। একই খণ্ডের পরবর্তী ফতোয়ায় প্রশ্নকারী নিজেই উল্লেখ করেন যে, যাদুল মা‘আদ-এ তিনি তিনটি ভিন্ন মত পেয়েছেন—একদল শুধু সালিমের জন্য বিশেষ বলেছেন, একদল সবার জন্য সাধারণ বলেছেন, আর ইবন তাইমিয়ার মত অনুযায়ী একই পরিস্থিতি তৈরি হলে অন্যদের ক্ষেত্রেও বিধানটি প্রযোজ্য। [12]
153 – لا يعتد بالرضاع إلا ما كان في الحولين
فقد اختلف أهل العلم في رضاع الكبير هل يؤثر أم لا؟ والسبب في ذلك أنه ورد في الحديث الصحيح عن عائشة – رضي الله عنها – أن النبي – صلى الله عليه وسلم – أمر سهلة بنت سهيل أن ترضع سالما مولى أبي حذيفة وكان كبيرا […]
فأمرها أن ترضعه خمس رضعات، فاختلف العلماء في ذلك، والصحيح من قولي العلماء أن هذا خاص بسالم وبسهلة بنت سهيل وليس عاما للأمة، قاله غالب أزواج النبي – صلى الله عليه وسلم -، وقاله جمع غفير من أهل العلم، وهذا هو الصواب.
[…]
154 – حكم إرضاع الكبير
وقد راجعت كلام أهل العلم في المسألة في كتاب: زاد المعاد، فوجدت أنهم فريقان ووسط: فريق يرى أن الحديث خاص في حق سالم فقط، وفريق يرى عموم الحديث في سالم وغيره، وفريق يتوسط ويرى أن الحديث عام في سالم وغيره بشرط أن تكون حاله مثل حال سالم وأم حذيفة، وهو رأي شيخ الإسلام ابن تيمية – رحمه الله -.
[…]
نرى أن حديث سالم مولى أبي حذيفة خاص بسالم كما هو قول الجمهور، لصحة الأحاديث الدالة على أنه لا رضاع إلا في الحولين، وهذا هو الذي نفتي به.
১৫৩ — দুগ্ধপান কেবল দুই বছরের মধ্যে সংঘটিত হলেই তা ধর্তব্য হবে
প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান কার্যকর হয় কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদের কারণ হলো, আয়িশা থেকে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে নবী সাহলা বিনতে সুহাইলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি আবু হুযাইফার মুক্তদাস সালিমকে দুধ পান করান, অথচ সালিম তখন প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। […]
নবী তাকে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি সালিমকে পাঁচবার দুধ পান করান। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। আলেমদের দুই মতের মধ্যে সঠিক মত হলো, এটি কেবল সালিম এবং সাহলা বিনতে সুহাইলের জন্য বিশেষ ছিল; পুরো উম্মাহর জন্য সাধারণ বিধান ছিল না। নবীর অধিকাংশ স্ত্রী এবং বিপুলসংখ্যক আলেম এই মত দিয়েছেন। আর এটিই সঠিক মত।
[…]
১৫৪ — প্রাপ্তবয়স্ককে দুধ পান করানোর বিধান
আমি ‘যাদুল মা‘আদ’ গ্রন্থে এই মাসআলা সম্পর্কে আলেমদের আলোচনা পর্যালোচনা করে দেখেছি, তারা তিনটি দলে বিভক্ত:
একদল মনে করেন, হাদিসটি কেবল সালিমের জন্য বিশেষ।
অন্য দল মনে করেন, হাদিসটি সালিমসহ অন্য সবার ক্ষেত্রেও সাধারণভাবে প্রযোজ্য।
আর মধ্যবর্তী একটি দল মনে করেন, সালিম ও অন্যদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, তবে শর্ত হলো তাদের পরিস্থিতি সালিম ও উম্মু হুযাইফার পরিস্থিতির মতো হতে হবে। এটিই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়ার মত।
[…]
আমাদের মতে আবু হুযাইফার মুক্তদাস সালিমের হাদিসটি কেবল সালিমের জন্যই বিশেষ, যেমনটি জমহুর আলেমদের মত। কারণ দুই বছরের পরে দুধপান কার্যকর নয়—এ মর্মে সহিহ হাদিস রয়েছে। আমরা এই মত অনুযায়ীই ফতোয়া দিয়ে থাকি।
বয়স্কলোককে দুধপান করানো মানসুখ হয়েছে?
উপরের সহীহ মুসলিমের বর্ণনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়িশা বলছেন, প্রথমে কোরআনে দশবার দুধপান সম্পর্কিত বিধান নাযিল হয়েছিল, পরে সেটি পাঁচবার দ্বারা রহিত হয়; এরপর মুহাম্মদ মারা যান, “অথচ ঐ আয়াতটি কোরআনের আয়াত হিসেবে তিলাওয়াত করা হত।” [9] [13] এখানেই সমস্যাটি প্রকট: আয়িশার বক্তব্য অনুযায়ী নবীর মৃত্যুর সময়ও পাঁচবার দুধপানের পাঠ কোরআন হিসেবে প্রচলিত ছিল, অথচ বর্তমান কোরআনে সেটি নেই। পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা এর সমাধান হিসেবে বলেছেন, পাঁচবারের আয়াতটির তিলাওয়াত একেবারে শেষ পর্যায়ে রহিত হয়েছিল এবং নবীর মৃত্যুর সময়ও কিছু মানুষের কাছে সেই রহিতকরণের সংবাদ পৌঁছেনি। ইমাম নববী সরাসরি এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন—কিছু মানুষ মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও “পাঁচবার দুধপান”কে কোরআন হিসেবে পড়ছিলেন, পরে তাদের কাছে রহিতকরণের সংবাদ পৌঁছালে তারা তা ত্যাগ করেন। [14] [15] অর্থাৎ মূল সহীহ বর্ণনা এবং বর্তমান মুসহাফের মধ্যকার ফাঁক পূরণ করতে পরবর্তী ব্যাখ্যায় এমন একটি অত্যন্ত দেরিতে সংঘটিত রহিতকরণের ধারণা দাঁড় করাতে হয়েছে, যার সংবাদ নবীর মৃত্যুর সময়ও সকল পাঠকের কাছে পৌঁছায়নি। এই ব্যাখ্যাই কোরআনের পাঠ কীভাবে সংরক্ষিত ও সবার কাছে একযোগে নির্ধারিত হলো—সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে। এবারে আসুন এই হাদিসটির বাংলা ব্যাখ্যাও পড়ে নিই [16] –

আসুন আরেকটি হাদিস পড়ি, [17]
সুনান ইবনু মাজাহ
৯/ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ৯/৩৬. বয়স্ক লোকে দুধ পান করলে।
২/১৯৪৪। ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রজম সম্পর্কিত আয়াত এবং বয়স্ক লোকেরও দশ ঢোক দুধপান সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়েছিল, যা একটি সহীফায় (লিখিত) আমার খাটের নিচে সংরক্ষিত ছিল। যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন এবং আমরা তাঁর ইন্তিকালে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন একটি ছাগল এসে তা খেয়ে ফেলে।
মাজাহ ১৯৪৪ সহীহুল বুখারী ১৪৫২, নাসায়ী ৩৩০৭, ২০৬২, মুয়াত্তা মালেক ১২৯৩, দারেমী ২২৫৩, তা’লীক ইবনু মাজাহ।
তাহকীক আলবানীঃ হাসান। উক্ত হাদিসের রাবী মুহাম্মাদ বিন ইসহাক সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন মাঈন ও আজালী বলেন, তিনি সিকাহ। আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, তিনি হাসানুল হাদিস। আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, তিনি সালিহ। (তাহযীবুল কামালঃ রাবী নং ৫০৫৭, ২৪/৪০৫ নং পৃষ্ঠা)
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
এখানে মূল সংকটটি শুধু একটি কাগজ ছাগলে খাওয়ার গল্প নয়। একই বিষয়ের দুটি বর্ণনা পাশাপাশি রাখলেই সমস্যাটি পরিষ্কার হয়। সহীহ মুসলিমে আয়িশা বলেন, মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও পাঁচবার দুধপানের পাঠ কোরআন হিসেবে তিলাওয়াত করা হচ্ছিল; আর ইবনু মাজাহর বর্ণনায় তিনি বলেন, রজম ও “প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপান” সম্পর্কিত লেখা তাঁর খাটের নিচে একটি সহীফায় ছিল, মুহাম্মদের মৃত্যুর ব্যস্ততার সময় একটি গৃহপালিত পশু সেটি খেয়ে ফেলে। [18] [19] ইবনু মাজাহর এই বর্ণনার মান নিয়ে মুহাদ্দিসদের মতভেদ রয়েছে; আলবানীর তাহকীকে এটি হাসান হিসেবে প্রচলিত, এবং বর্ণনার আরবি পাঠে সরাসরি “وَرَضَاعَةُ الْكَبِيرِ عَشْرًا”—“প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপান”—শব্দগুলো রয়েছে। ইসলামী ব্যাখ্যাকাররা সমাধান হিসেবে বলেন, এসব পাঠের তিলাওয়াত রহিত হয়েছিল; কিন্তু সমস্যাটি থেকেই যায়—সহীহ মুসলিমের পাঠ নিজেই বলছে নবীর মৃত্যুর সময়ও এটি কোরআন হিসেবে পড়া হচ্ছিল। নববীকে তাই বলতে হয়েছে, রহিতকরণ এত দেরিতে ঘটেছিল যে মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও কিছু মানুষের কাছে তার সংবাদ পৌঁছেনি। [20] আরও তাৎপর্যপূর্ণ, মিরকাতুল মাফাতীহ-এ ইবনুল হুমামের আপত্তিও উদ্ধৃত হয়েছে: যদি আয়িশার বক্তব্যকে এমনভাবে বোঝা হয় যে নবীর মৃত্যুর পরও অরহিত কোরআনের কিছু অংশ হারিয়ে গেছে, তাহলে তা সরাসরি কোরআনের অংশ হারিয়ে যাওয়ার সমস্যায় নিয়ে যায়; আবার “তিলাওয়াত রহিত কিন্তু হুকুম বহাল” বললেও সেই বহাল হুকুমের জন্য আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। [21] তাই এখানে বিতর্কটি কোনো ছাগলকে ঘিরে হাস্যরস নয়; এটি ওহীর পাঠ, রহিতকরণের সংবাদ, এবং বর্তমান মুসহাফে কোন পাঠ থাকবে—এই তিনটির মধ্যকার বাস্তব বর্ণনাগত সংঘাত। আসুন এই সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত পড়ে নেয়া যাক [22] [23]
আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে, তাত্থেকে উত্তম কিংবা তারই মত আয়াত নিয়ে আসি, তুমি কি জান না যে, আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।
— Taisirul Quran
আমি কোন আয়াতের হুকুম রহিত করলে কিংবা আয়াতটিকে বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তদনুরূপ আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপরই ক্ষমতাবান?
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Rawai Al-bayan
আমরা কোনো আয়াত রহিত করলে বা ভুলিয়ে দিলে তা থেকে উত্তম অথবা তার সমান কোনো আয়াত এনে দেই [১] আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আমি যখন এক আয়াতের বদলে অন্য আয়াত নাযিল করি- আর আল্লাহ ভালভাবেই জানেন, যা তিনি নাযিল করেন– তখন এই লোকেরা বলে, ‘তুমি তো মিথ্যা রচনাকারী।’ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এ সম্পর্কে তাদের অধিকাংশেরই কোন জ্ঞান নেই।
— Taisirul Quran
আমি যখন এক আয়াতের পরিবর্তে অন্য এক আয়াত উপস্থিত করি, আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তা তিনিই ভাল জানেন, তখন তারা বলেঃ তুমিতো শুধু মিথ্যা উদ্ভাবনকারী, কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানেনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যখন আমি একটি আয়াতের স্থানে পরিবর্তন করে আরেকটি আয়াত দেই- আল্লাহ ভাল জানেন সে সম্পর্কে, যা তিনি নাযিল করেন– তখন তারা বলে, তুমি তো কেবল মিথ্যা রটনাকারী; রবং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Rawai Al-bayan
আর যখন আমরা এক আয়াতের স্থান পরিবর্তন করে অন্য আয়াত দেই— আর আল্লাহ্ই ভাল জানেন যা তিনি নাযিল করবেন সে সম্পর্কে— , তখন তারা বলে, ‘আপনি তো শুধু মিথ্যা রটনাকারী’, বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
পাঁচবার দুধপানের আয়াত: ব্যাখ্যাকারদের মধ্যেই গুরুতর সংকট
সহীহ মুসলিমের আয়িশা-বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, প্রথমে কোরআনে “দশবার নির্দিষ্ট দুধপান” সম্পর্কিত বিধান নাযিল হয়েছিল, পরে তা “পাঁচবার নির্দিষ্ট দুধপান” দ্বারা রহিত হয়; এরপর মুহাম্মদ মারা যান, অথচ সেই পাঁচবারের পাঠ তখনও কোরআন হিসেবে তিলাওয়াত করা হচ্ছিল। এই বর্ণনাটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরবর্তী মুহাদ্দিস ও ফকিহরা একাধিক ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। কিন্তু সেই ব্যাখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে সমস্যা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। মোল্লা আলী আল-ক্বারীর মিরকাতুল মাফাতীহ শরহ মিশকাতুল মাসাবীহ-এ তুরবিশতি, আশরাফ, নববী, তীবি এবং ইবনুল হুমামের বক্তব্য একসঙ্গে সংরক্ষিত হয়েছে। [24]
3167 – وعن عائشة قالت : كان فيما أنزل من القرآن : عشر رضعات معلومات يحرمن ، ثم نسخن بخمس معلومات فتوفي رسول الله – صلى الله عليه وسلم – وهي فيما يقرأ من القرآن . رواه مسلم .
( وعن عائشة قالت : كان فيما أنزل من القرآن عشر رضعات ) بسكون الشين وفتح الضاد ( معلومات يحرمن ثم نسخن بخمس معلومات ) أي : مشبعات في خمسة أوقات متفاصلة عرفا ( فتوفي رسول الله – صلى الله عليه وسلم – وهي ) أي : آية خمس رضعات ( فيما يقرأ ) بصيغة المجهول ( من القرآن ) تعني أن من لم يبلغه النسخ كان يقرؤه على الرسم الأول لأن النسخ لا يكون إلا في زمان الوحي فكيف بعد وفاة النبي – صلى الله عليه وسلم – أرادت بذلك قرب زمان الوحي.
قال التوربشتي : ولا يجوز أن يقال أن تلاوتها قد كانت باقية فتركوها فإن الله تعالى رفع قدر هذا الكتاب المبارك عن الاختلال والنقصان وتولى حفظه وضمن صيانته فقال عز من قال: إنا نحن نزلنا الذكر وإنا له لحافظون، فلا يجوز على كتاب الله أن يضيع منه آية ولا أن ينخرم حرف كان يتلى في زمان الرسالة إلا ما نسخ منه.
قال الأشرف : المفهوم من كلام الشيخ في شرح السنة أن الضمير في قول عائشة وهو ( فيما يقرأ من القرآن ) عائد إلى عشر رضعات […] ولو جعل الضمير المذكور عائدا إلى خمس معلومات […] يكون المعنى حينئذ أن العشر نسخن بخمس معلومات واستقر النسخ وتقرر في زمان النبي – صلى الله عليه وسلم – وهذا هو المراد من قولها فتوفي رسول الله – صلى الله عليه وسلم – وهي فيما يقرأ من القرآن أي توفي النبي – صلى الله عليه وسلم – بعد نسخ العشرة بالخمس في حالة استقرار الخمس وكونه مقروءا في القرآن.
قال الطيبي – رحمه الله – : ويؤيده قول النووي في شرح مسلم أي : أن النسخ بخمس رضعات تأخر إنزاله جدا حتى أنه – صلى الله عليه وسلم – توفي وبعض الناس يقرأ خمس رضعات ويجعلها قرآنا متلوا لكونه لم يبلغه النسخ لقرب عهده فلما بلغهم النسخ بعد ذلك رجعوا عن ذلك وأجمعوا على أن هذا لا يتلى.
قال الطيبي : والنسخ ثلاثة أنواع منها ما نسخ حكمه وتلاوته كعشر رضعات ، وما نسخت تلاوته دون حكمه كخمس رضعات ، والشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما ، وما نسخ حكمه وبقيت تلاوته وهذا هو الأكثر.
قال المحقق ابن الهمام : هذا لا يستقيم إلا على إرادة الكل وإلا لزم ضياع بعض القرآن الذي لم ينسخ فيثبت قول الروافض ذهب كثير من القرآن بعد رسول الله – صلى الله عليه وسلم – لم يثبته الصحابة فلا تمسك بالحديث ، وإن كان إسناده صحيحا لانقطاعه باطنا وما قيل ليكن نسخ الكل ويكون نسخ التلاوة مع بقاء الحكم وأن هذا مما لا جواب له فليس بشيء ; لأن ادعاء بقاء حكم الدال بعد نسخه يحتاج إلى دليل وإلا فالأصل أن نسخ الدال يرفع حكمه وما نظر به الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما فلولا ما علم بالسنة والإجماع لم يثبت به.
বাংলা অনুবাদ:
৩১৬৭ — আয়িশা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: কোরআনে যা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে ছিল—“দশবার নির্দিষ্ট দুধপান বিবাহ হারাম করে দেয়।” পরে সেই দশবারের বিধান “পাঁচবার নির্দিষ্ট দুধপান” দ্বারা রহিত হয়। এরপর রাসুলুল্লাহ মারা যান, অথচ সেটি তখনও কোরআনের মধ্যে তিলাওয়াত করা হচ্ছিল। হাদিসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: আয়িশার বক্তব্য “দশবার নির্দিষ্ট দুধপান” অর্থ এমন দশবারের দুধপান যা বিবাহ হারাম করে। পরে তা পাঁচবারের দ্বারা রহিত হয়—অর্থাৎ প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পৃথক পাঁচটি সময়ে পূর্ণভাবে দুধ পান করা। আয়িশার বক্তব্য “রাসুলুল্লাহ মারা গেলেন অথচ সেটি কোরআনের মধ্যে পড়া হচ্ছিল”—এখানে “সেটি” বলতে পাঁচবার দুধপানের আয়াত বোঝানো হয়েছে। এর অর্থ হলো, যাদের কাছে রহিত হওয়ার সংবাদ পৌঁছেনি তারা আগের লিখিত পাঠ অনুযায়ী সেটি পড়তে থাকতেন। কারণ রহিতকরণ কেবল ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময়েই সম্ভব; নবীর মৃত্যুর পরে রহিতকরণ কীভাবে হবে? আয়িশা এখানে ওহীর সময়ের একেবারে নিকটবর্তী অবস্থার কথা বোঝাতে চেয়েছেন।
তুরবিশতি বলেন: এমন বলা বৈধ নয় যে আয়াতটির তিলাওয়াত তখনও বহাল ছিল, কিন্তু পরে মানুষ তা ছেড়ে দিয়েছে। কারণ আল্লাহ এই বরকতময় কিতাবকে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা থেকে ঊর্ধ্বে রেখেছেন, নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন: “নিশ্চয় আমিই যিকর নাযিল করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।” অতএব আল্লাহর কিতাব থেকে এমন কোনো আয়াত হারিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, কিংবা নবুওয়াতের যুগে তিলাওয়াত করা কোনো অক্ষরও বিলুপ্ত হতে পারে না—শুধু যা রহিত হয়েছে তা ছাড়া।
আশরাফ বলেন: শরহুস সুন্নাহয় শায়খের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আয়িশার “কোরআনের মধ্যে যা পড়া হচ্ছিল” কথার সর্বনামটি দশবার দুধপানের দিকে ফিরে গেছে। […] কিন্তু যদি সর্বনামটি পাঁচবার নির্দিষ্ট দুধপানের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে অর্থ হবে—দশবারের বিধান পাঁচবার দ্বারা রহিত হয়েছিল এবং এই রহিতকরণ নবীর জীবদ্দশাতেই স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আয়িশার “রাসুলুল্লাহ মারা গেলেন অথচ সেটি কোরআনের মধ্যে পড়া হচ্ছিল” কথার অর্থ তখন হবে—দশবারের বিধান পাঁচবার দ্বারা রহিত হওয়ার পর নবী মারা যান এবং তখন পাঁচবারের পাঠটি কোরআনে পড়া হচ্ছিল।
তীবি বলেন: এর সমর্থনে নববী শরহ মুসলিমে বলেছেন—পাঁচবার দুধপানের পাঠ রহিত হওয়ার ঘটনা এত দেরিতে ঘটেছিল যে, নবী মারা যাওয়ার সময়ও কিছু মানুষ পাঁচবার দুধপানের পাঠকে তিলাওয়াতযোগ্য কোরআন হিসেবে পড়ছিলেন; কারণ সময় এত অল্প ছিল যে রহিত হওয়ার সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছেনি। পরে যখন তাদের কাছে রহিত হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়, তখন তারা সেই পাঠ ছেড়ে দেন এবং সবাই একমত হন যে এটি আর তিলাওয়াত করা হবে না।
তীবি আরও বলেন: রহিতকরণ তিন প্রকার। এক ধরনের রহিতকরণে হুকুম ও তিলাওয়াত দুটোই রহিত হয়—যেমন দশবার দুধপান। আরেক ধরনের রহিতকরণে তিলাওয়াত রহিত হয় কিন্তু হুকুম বহাল থাকে—যেমন পাঁচবার দুধপান এবং “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধ নারী ব্যভিচার করলে তাদের পাথর মেরে হত্যা করো”। আর তৃতীয় প্রকারে হুকুম রহিত হলেও তিলাওয়াত বহাল থাকে; এটিই সবচেয়ে বেশি।
মুহাক্কিক ইবনুল হুমাম বলেন: এই ব্যাখ্যা তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে যদি পুরো পাঠটিই রহিত হয়েছে বলে বোঝানো হয়। তা না হলে এর অর্থ দাঁড়াবে যে কোরআনের এমন কিছু অংশ হারিয়ে গেছে যা রহিতই হয়নি। আর তাহলে রাফেজিদের সেই দাবি প্রতিষ্ঠিত হবে যে, রাসুলুল্লাহর মৃত্যুর পর কোরআনের বহু অংশ হারিয়ে গেছে এবং সাহাবিরা তা সংরক্ষণ করেননি। সুতরাং এই হাদিসকে দলিল হিসেবে আঁকড়ে ধরা যাবে না, যদিও এর সনদ সহিহ; কারণ ভেতরগতভাবে এতে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
আর যদি বলা হয়, পুরো পাঠটিই রহিত হয়েছে এবং তিলাওয়াত রহিত হলেও হুকুম বহাল রয়েছে—এ কথাও সমস্যার সমাধান নয়। কারণ কোনো পাঠ রহিত হয়ে যাওয়ার পর তার হুকুম বহাল আছে—এ দাবি করতে হলে আলাদা দলিল প্রয়োজন। তা না হলে মূলনীতি হলো, কোনো নির্দেশক পাঠ রহিত হলে তার হুকুমও উঠে যায়। “বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধ নারী ব্যভিচার করলে তাদের পাথর মেরে হত্যা করো”—এই উদাহরণও স্বতন্ত্রভাবে যথেষ্ট নয়; সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা তার হুকুম প্রতিষ্ঠিত না হলে শুধু সেই রহিত পাঠ দিয়ে হুকুম প্রমাণ করা যেত না।
এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে সমস্যাটি কোনো বাইরের সমালোচক তৈরি করছেন না; একই ইসলামি শরহের ভেতরেই ব্যাখ্যাকাররা সমস্যার গভীরতা স্বীকার করছেন। তুরবিশতি প্রথমেই একটি সীমারেখা টেনেছেন—নবীর যুগে তিলাওয়াত করা অথচ রহিত না হওয়া কোনো আয়াত পরে হারিয়ে যেতে পারে না, কারণ তা হলে কোরআনের সংরক্ষণের দাবি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আয়িশার বক্তব্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করতেই হবে যাতে পাঁচবারের পাঠটি নবীর জীবদ্দশাতেই রহিত হয়ে যায়।
কিন্তু সেই ব্যাখ্যাও নতুন প্রশ্ন সৃষ্টি করে। নববীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রহিতকরণ এত দেরিতে হয়েছিল যে মুহাম্মদের মৃত্যুর সময়ও কিছু মানুষ পাঁচবার দুধপানের পাঠকে কোরআনের আয়াত হিসেবে পড়ছিলেন; তারা জানতেনই না যে পাঠটি রহিত হয়ে গেছে। পরে তাদের কাছে সংবাদ পৌঁছালে তারা সেটি বাদ দেন। অর্থাৎ নবীর মৃত্যুর সময় একই সমাজে এমন মানুষ ছিলেন যারা একটি পাঠকে তখনও কোরআন মনে করছিলেন, অথচ পরবর্তী ব্যাখ্যা অনুযায়ী সেটি ইতিমধ্যে রহিত হয়ে গিয়েছিল। এখানে প্রশ্নটি সরাসরি ওহীর যোগাযোগ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে স্পর্শ করে—একটি কোরআনিক পাঠ রহিত হয়ে গেল, অথচ নবীর মৃত্যুর সময়ও সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট সকল মানুষের কাছে পৌঁছাল না।
সবচেয়ে তীব্র আপত্তিটি এসেছে ইবনুল হুমামের কাছ থেকে। তিনি সরাসরি বলেছেন, যদি আয়িশার বক্তব্যের অর্থ হয় যে এমন কোনো কোরআনিক পাঠ হারিয়ে গেছে যা রহিত হয়নি, তাহলে তার ফল দাঁড়ায় “কোরআনের কিছু অংশ হারিয়ে গেছে”—এবং তিনি নিজেই বলেন, এতে রাফেজিদের কোরআন থেকে বহু অংশ বিলুপ্ত হওয়ার দাবি শক্তি পায়। আর যদি বলা হয় তিলাওয়াত রহিত হয়েছিল কিন্তু হুকুম বহাল ছিল, তাহলেও আলাদা প্রমাণ চাই; শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া বা রহিত পাঠের ওপর দাঁড়িয়ে হুকুম বহাল রাখা যায় না। [25]
ফলে পাঁচবার দুধপানের আয়াতের সমস্যাটি শুধু “এটি মানসুখ হয়েছিল” বললেই শেষ হয় না। মূল সহিহ বর্ণনা বলছে নবীর মৃত্যুর সময়ও তা কোরআন হিসেবে পড়া হচ্ছিল; নববীর ব্যাখ্যা বলছে রহিতকরণের সংবাদ তখনও সবার কাছে পৌঁছেনি; তুরবিশতি বলছেন রহিত না হওয়া কোনো আয়াত হারিয়ে যাওয়ার কথা বলা যাবে না; আর ইবনুল হুমাম বলছেন, তা না হলে কোরআনের অংশ হারিয়ে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি মাত্র সহিহ বর্ণনাকে বর্তমান কোরআনিক পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে গিয়ে ধ্রুপদী ইসলামি ব্যাখ্যার ভেতরেই একের পর এক ব্যাখ্যা, আপত্তি এবং পাল্টা-আপত্তি তৈরি হয়েছে।
শুধুমাত্র সালিমের জন্য কোরআনের বিধান?
প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানের বিধানকে কেবল সালিমের ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম বলে শেষ করে দেওয়া যায় না, কারণ মূল ইসলামি উৎসের ভেতরেই এই প্রশ্নে স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে। আয়িশা সালিমের ঘটনাকে ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রহণ করেননি; আবু দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি তাঁর বোন ও ভাইদের কন্যাদের নির্দেশ দিতেন, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে তিনি নিজের কাছে প্রবেশের অনুমতি দিতে চাইতেন তাদের পাঁচবার দুধ পান করাতে। ইবন হাজার এই বর্ণনার সনদকে সহিহ বলে উল্লেখ করে লিখেছেন যে এটি একেবারে স্পষ্ট প্রমাণ—আয়িশা বাস্তবেই এই বিধান প্রয়োগ করতেন। [26] অন্যদিকে উম্মে সালামাহসহ নবীর অন্যান্য স্ত্রীরা এটিকে সালিমের জন্য বিশেষ অনুমতি মনে করেছিলেন। অর্থাৎ “শুধু সালিমের জন্য” কোনো নববী ঘোষণার ভাষা নয়; এটি নবীর স্ত্রীদের একাংশের ব্যাখ্যা, যার বিপরীতে আয়িশার আমল দাঁড়িয়ে আছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরবর্তী আলেমদের মধ্যেও এই “বিশেষ অনুমতি” ব্যাখ্যা স্থির হয়নি। সংশয়ের ইসলাম আর্কাইভে সংরক্ষিত ইবন বাযের ফতোয়ায় একে সালিম ও সাহলার জন্য বিশেষ বলা হয়েছে। [27] অথচ ইবন তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিমের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন: তাদের মতে ঘটনাটি মানসুখও নয়, সালিমের ব্যক্তিগত বিশেষাধিকারও নয়; বরং সালিমের মতো প্রয়োজন সৃষ্টি হলে প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানের বিধান কার্যকর হতে পারে। ইসলামকিউএ ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে: “حديث سهلة ليس بمنسوخ، ولا مخصوص”—সাহলার হাদিস মানসুখ নয়, সালিমের জন্য ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্টও নয়। [28] আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ইসলামকিউএ স্বীকার করছে দুই বছরের দুধপানের কোরআনিক আয়াত সালিমের ঘটনার আগেই নাযিল হয়েছিল। কাজেই সালিমের ঘটনা কোনো আগের সাধারণ বিধান, যা পরে দুই বছরের আয়াত দিয়ে রহিত হয়ে গেছে—এই কালানুক্রমিক ব্যাখ্যাও চলে না। ইবন হাজারও ফাতহুল বারী-তে এই মানসুখের যুক্তির ভিত্তিকে “দুর্বল” বলেছেন এবং বিশেষত্বের যুক্তির ক্ষেত্রেও লিখেছেন, একই ধরনের প্রয়োজন অন্যের ক্ষেত্রে ঘটলে সেই যুক্তি অন্যকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। [29] অর্থাৎ মূল প্রশ্নে ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরেই তিনটি পৃথক অবস্থান রয়ে গেছে—রহিত, কেবল সালিমের জন্য বিশেষ, অথবা প্রয়োজন হলে অন্য প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রেও কার্যকর।
আরও একটি হাদিস আসুন পড়ে নিই, [30] –
বয়স্ক (দুধপানকারী) ব্যক্তির জন্য যা অবৈধ
২০৬১। হযরত আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালামা (রা.) হতে বর্ণিত। নিশ্চয় আবূ হুযায়ফা ইবন উবা ইবন রাবীআ ইব্ন আব্দ শামস সালেমকে পালক পুত্র হিসাবে লালন পালন করেন এবং তার সাথে তার ভ্রাতুষ্পুত্রী হিন্দু বিনতুল ওয়ালীদ ইবন রাবী’আর বিয়ে দেন। আর সে ছিল একজন আনাসর মহিলার আযাদকৃত গোলাম। যেমন আল্লাহর রাসূল যায়িদকে পালক পুত্র হিসাবে লালন পালন করেন। জাহিলিয়াতের যুগের প্রথা ছিল কাউকেও পালক পুত্র হিসাবে লালন পালন করা হলে লোকেরা তাকে তার সাথে সম্পর্কিত করে ডাকতো এবং সে তার উত্তরাধিকারী হত। অতঃপর কোরআনের এই আয়াত অবতীর্ণ হলঃ “তোমরা তাদের ডাকবে তাদের প্রকৃত পিতার সাথে সম্পর্কিত করে তারা তোমাদের দীনী ভাই এবং তোমাদের আযাদকৃত দাস”। কাজেই, তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার সহিত সম্পর্কিত করবে। আর যদি কারো পিতৃ পরিচয় জানা না যায়, তবে সে দীনী ভাই ও আযাদকৃত দাস হবে। অতঃপর সাহলা বিন্ত সুহায়েল ইব্ উমার আল্-কোরায়েশী, পরে আল্-আমিরী যিনি আবূ হুযায়ফার স্ত্রী ছিলেন, আসেন এবং বরেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা সালেমকে আমাদের পুত্র হিসাবে গণ্য করি। আর সে আমার সাথে এবং আবু হুযয়ফার সাথে আমার ঘরে (আমাদের সন্তান হিসাবে) লালিত পালিত হয়েছে। আর সে আমাকে একই বস্ত্রের মধ্যে দেখেছে। আর আল্লাহ্ তা’য়ালা এদের সম্পর্কে যা অবতীর্ণ করেছেন, তা আপনি বিশেষভাবে জানেন। এখন তার সম্পর্কে আপনি কি নির্দেশ দেন? নবী করীম তাকে বলেন, তাকে পাঁচবার তোমার দুধপান করাও তাতে তুমি তার দুধ-মাতা হিসাবে গণ্য হবে। অতঃপর তিনি তাকে পাচবার দুধ পান করান এবং তিনি তার দুধমা হিসাবে গণ্য হন। এই কারণেই আয়েশা (রা.) তাঁর বোনের ও ভাইয়ের মেয়েদের ও ছেলেদেরকে পাঁচবার দুধ পান করাতে নির্দেশ দিতেন যারা তাকে ভালবাসতেন, যাতে তিনি তাদের সাথে দেখা করতে পারেন। কিন্তু উম্মে সালামা (রা.) ও নবী করীম-এর অন্যান্য স্ত্রীগণ এ বয়সে দুগ্ধ পানকারীগণকে নিজেদের নিকট আসতে বাঁধা দিতেন, বরং তারা ছোট বেলার দুধপান করাকেই প্রাধান্য দিতেন (বয়স্ক ব্যক্তির নয়)। আর আমরা আয়েশা (রা.) সম্পর্কে বলতাম আল্লাহর শপথ! আমাদের জানা নাই, সম্ভবতঃ এটা (সালেমের ব্যাপারটি) নবী করীম-এর পক্ষ হতে বিশেষভাবে অনুমোদিত ছিল, যা অন্যদের জন্য নয়।

হাদিসটি বর্ণনা করতেই রাবীর ভয়
প্রাপ্তবয়স্ক সালিমকে দুধ পান করানোর হাদিসটির বর্ণনাপরম্পরার মধ্যেই একটি অস্বাভাবিক ঘটনা সংরক্ষিত আছে। রাবী আবদুল্লাহ ইবন আবী মুলাইকা কাসিম ইবন মুহাম্মদের কাছ থেকে আয়িশার সূত্রে এই হাদিস শোনার পর প্রায় এক বছর সেটি কাউকে বলেননি। কারণ হিসেবে বর্ণনায় সরাসরি এসেছে رَهْبَةً—ভয়, আতঙ্ক বা গভীর আশঙ্কা। পরে তিনি আবার কাসিমের কাছে ফিরে গিয়ে বিষয়টি জানান এবং কাসিম তাঁকে হাদিসটি নিজের সূত্রে বর্ণনা করতে বলেন। একই বর্ণনা মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাকেও রয়েছে। [31] [32] [33]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৮/ দুধপান
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৩৪৭১। ইসহাক ইবনু ইবরাহীম ও মুহাম্মদ ইবনু রাফি (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, সুহায়ল ইবনু আমরের কন্যা সাহলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সালিম (আবূ হুযাফার মুক্তদাস) আমাদের সাথে একই ঘরে থাকে; অথচ সে বয়স্ক ও জ্ঞান সম্পন্ন পূরুষের স্তরে পৌঁছে গেছে। তিনি বললেন, তুমি তাকে দুধপান করিয়ে দাও, তাতে তুমি তার প্রতি হারাম হয়ে যাবে। রাবী (ইবনু আবূ মুলায়কা) বলেন, অতঃপর আমি এক বছর বা প্রায় এক বছর কাল ভয়ে উক্ত হাদীস বর্ণনা করি নি। তারপর কাসিমের সাথে সাক্ষাত করে বললাম, আপনি আমার নিকট এতদিন এমনি এক হাদীস বর্ণনা করেছেন যা আমি অদ্যাবধি কারোর নিকট বর্ণনা করি নি। তিনি বললেন, তা কোন হাদীস? তখন আমি তাকে ঐ হাদীস খানার বিষয় অবহিত করলাম। তখন তিনি বললেন, তুমি তা আমা হতে এ সূত্রে বর্ণনা কর যে, আয়িশা (রাঃ) আমাকে সে সম্পর্কে অবহিত করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

এই ভয় কোনো আধুনিক সমালোচকের কল্পনা নয়; শব্দটি হাদিসের নিজের ভাষা। আরও শক্ত প্রমাণ হলো, এই বর্ণনার আরেক রূপে কাসিম তাঁকে বলেন, “حدث به ولا تهابه” — এটি বর্ণনা করো, এটিকে ভয় করো না। অর্থাৎ যে বিষয়টি তিনি প্রায় এক বছর চেপে রেখেছিলেন সেটিই ছিল এই হাদিস। ইবন আবদুল বার আল-ইস্তিযকার-এ এই ঘটনাটি উদ্ধৃত করে সরাসরি মন্তব্য করেন: “هذا يدل على أنه حديث ترك قديما، ولم يعمل به، ولا تلقاه الجمهور بالقبول على عمومه”—এটি দেখায় যে হাদিসটি প্রাচীনকালেই পরিত্যক্ত ছিল, এর ওপর সাধারণভাবে আমল করা হয়নি এবং জমহুর আলেমগণ এটিকে সাধারণ বিধান হিসেবে গ্রহণ করেননি। [34]
ফলে এই হাদিসকে ঘিরে অস্বস্তি আধুনিক যুগে তৈরি হয়েছে—এ কথা বলার সুযোগ নেই। হাদিসের নিজের বর্ণনাতেই ইবন আবী মুলাইকা প্রায় এক বছর সেটি প্রকাশ করেননি “ভয়ে”; নাসাঈর বর্ণনায় কাসিমকে তাঁকে আলাদাভাবে বলতে হয়েছে, “এটি বর্ণনা করো, ভয় করো না।” [35] এরপর ইবন আবদুল বার সরাসরি লিখেছেন, হাদিসটি প্রাচীনকালেই সাধারণভাবে আমল করা হয়নি এবং জমহুর এটিকে সাধারণ বিধান হিসেবে গ্রহণ করেননি। [36] অথচ আয়িশা এটিকে সালিমের ব্যক্তিগত ঘটনা মনে করেননি; তিনি অন্য প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ করাতেন। অর্থাৎ একই সহিহ নির্দেশকে নিয়ে একজন রাবী বর্ণনা করতেই ভয় পাচ্ছেন, নবীর স্ত্রীদের অধিকাংশ সেটিকে সাধারণ বিধান হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছেন, আর আয়িশা সেটিই অন্যদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছেন। এই বিভক্তি ইসলামি উৎসের নিজের ভেতরেই সংরক্ষিত।
পাত্রে দুধের দাবি: সহিহ হাদিসে যার কোনো উল্লেখ নেই
সালিম ঠিক কীভাবে সাহলার দুধ পান করেছিলেন—সরাসরি স্তন থেকে, নাকি দুধ দোহন করে পাত্রে—এই প্রশ্নটিই পরবর্তী ব্যাখ্যার সবচেয়ে বিব্রতকর অংশ। সহীহ মুসলিমের একাধিক বর্ণনা, আবু দাউদ, নাসাঈ এবং অন্যান্য মূল বর্ণনায় সাহলাকে বলা হয়েছে “أَرْضِعِيهِ”—তাকে দুধ পান করাও; সাহলা পাল্টা প্রশ্ন করছেন, সে তো পূর্ণবয়স্ক বা দাড়িওয়ালা পুরুষ; মুহাম্মদ মুচকি হাসছেন এবং বলছেন, তিনি জানেন সালিম পূর্ণবয়স্ক। কিন্তু এই সহিহ বর্ণনাগুলোর কোনোটিতেই পাত্র, বাটি, দুধ দোহন বা স্তন স্পর্শ না করার কোনো নির্দেশ নেই। ইসলামওয়েবকে ঠিক এই প্রশ্ন করা হলে তাদের উত্তরও দ্ব্যর্থহীন: “ولم يرد في الروايات ما يشير إلى أن الرضاعة كانت من إناء ولم تكن من الثدي”—বর্ণনাগুলোতে এমন কিছু নেই যা নির্দেশ করে দুধপান পাত্র থেকে হয়েছিল, স্তন থেকে নয়। [37]
পাত্রের ধারণাটি সহিহ হাদিস থেকে নয়; পরবর্তী ব্যাখ্যা এবং একটি পৃথক দুর্বল বর্ণনা থেকে এসেছে। কাজী ইয়াদ বলেছেন, “হয়তো সাহলা দুধ দোহন করেছিলেন”; নববী এই অনুমানকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন, কিন্তু একইসঙ্গে স্বীকার করেছেন আরেকটি সম্ভাবনা—প্রয়োজনের কারণে সরাসরি স্পর্শের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জারকানীর শরহ আল-মুওয়াত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়: সেখানে বলা হয়েছে, হাদিসের ظاهر বা সরল বাহ্যিক অর্থ সরাসরি স্তন থেকে পান করার দিকেই যায়; কারণ সাহলা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আপত্তি তুলেছিলেন, মুহাম্মদ মুচকি হেসেছিলেন, কিন্তু তাঁকে দুধ দোহন করে পাত্রে দেওয়ার নির্দেশ দেননি। [38]
পাত্রে দুধ দেওয়ার নির্দিষ্ট বিবরণটি পাওয়া যায় আত-তাবাকাতুল কুবরা-তে। [39]
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُمَرَ. حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ابْنِ أَخِي الزُّهْرِيِّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ:
كَانَ يَحْلُبُ فِي مِسْعَطٍ أَوْ إِنَاءٍ قَدْرَ رَضْعَةٍ فَيَشْرَبُهُ سَالِمٌ كُلَّ يَوْمٍ. خَمْسَةَ أَيَّامٍ. وَكَانَ بَعْدُ يَدْخُلُ عَلَيْهَا وَهِيَ حَاسِرٌ. رُخْصَةً مِنْ رَسُولِ اللَّهِ لِسَهْلَةَ بنت سهيل
সাহলা এক পাত্রে দুগ্ধ দোহন করে রাখলেন। সেখান থেকে সালেম পাঁচদিন এসে দুধ পান করে যায়। এরপর সালেম সাহলা এর সামনে পর্দা ছাড়াই সরাসরি প্রবেশ করতো। সাহলার বিন সুহাইয়েলের সহজতার জন্য রাসূল সাঃ এ সুযোগ প্রদান করেন।
কিন্তু এই বর্ণনার প্রথম শব্দগুলিই সমস্যাটি প্রকাশ করে: “أخبرنا محمد بن عمر”—“আমাদেরকে মুহাম্মদ ইবন উমর অবহিত করেছেন।” এই মুহাম্মদ ইবন উমর হলেন মুহাম্মদ ইবন উমর আল-ওয়াকিদী। অর্থাৎ সহিহ হাদিসে অনুপস্থিত “পাত্রে দুধ” দৃশ্যটির নির্দিষ্ট বর্ণনা এসেছে এমন একজন রাবীর মাধ্যমে যাকে প্রধান হাদিস সমালোচকদের বড় অংশ হাদিসের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসলামওয়েবে সংরক্ষিত তাহযীব আল-কামাল-এ বুখারীর বক্তব্য: “متروك الحديث”—ওয়াকিদী হাদিসে পরিত্যক্ত; আহমদ ইবন হাম্বল বলেছেন “هو كذاب”—সে মিথ্যাবাদী; মুসলিম বলেছেন “متروك الحديث”; নাসাঈ বলেছেন “ليس بثقة”—বিশ্বাসযোগ্য নয়; ইয়াহইয়া ইবন মাঈন বলেছেন দুর্বল, “কিছুই নয়”, “বিশ্বাসযোগ্য নয়”; আলী ইবন মাদিনী বলেছেন তিনি তাকে হাদিস, বংশতালিকা বা অন্য কোনো বিষয়েই গ্রহণ করেন না। [40] শামেলা-সংরক্ষিত আলোচনাতেও নাসাঈর “মাতরুক”, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহর “হাদিস বানাতেন” অভিযোগ এবং বুখারীর প্রত্যাখ্যান উদ্ধৃত আছে। [41]
তাই উৎসের স্তর দুটি এক নয়। প্রাপ্তবয়স্ক সালিমকে দুধ পান করানোর নির্দেশ সহিহ; পাত্রে দোহন করে পান করানোর নির্দিষ্ট দৃশ্যটি সহিহ সূত্রে নেই। বরং সেটির নির্দিষ্ট রেওয়ায়েত ওয়াকিদীর মাধ্যমে এসেছে। ফলে পরবর্তী যুগে “আসলে পাত্রেই খেয়েছিলেন” কথাটিকে সহিহ হাদিসের তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসকে উল্টে দেওয়া; সহিহ উৎস পদ্ধতি নির্দিষ্ট করেনি, আর পাত্র নির্দিষ্ট করা বর্ণনার সনদ দুর্বল।
ইবন হাজম: পাত্রে পান করলে সেটি ‘রদা’ই নয়
পাত্রের ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে আরও বড় সমস্যা তৈরি করেন জাহিরি ফকিহ ইবন হাজম। আল-মুহাল্লা-তে তিনি কোনো অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করেননি। তাঁর সংজ্ঞা: “وأما صفة الرضاع المحرم فإنما هو ما امتصه الراضع من ثدي المرضعة بفيه فقط”—হারাম সম্পর্ক সৃষ্টিকারী দুধপান কেবল সেটিই, যেখানে দুধপানকারী নিজের মুখ দিয়ে স্তন্যদানকারিণীর স্তন থেকে দুধ চুষে নেয়। এরপর তিনি একে একে বলেন, কোনো নারীর দুধ পাত্রে নিয়ে পান করা, মুখে ঢেলে দেওয়া, খাবারে মেশানো, নাকে দেওয়া—এসবের কোনোটিই তাঁর মতে রদা নয় এবং এগুলো দিয়ে মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না। [42] শামেলা-সংরক্ষিত পাঠেও একই বক্তব্য রয়েছে। [43]
এখানে প্যারাডক্সটি সরাসরি। কাজী ইয়াদের ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে বলা হয়—পরনারীর স্তন স্পর্শ করা যাবে না, তাই নিশ্চয়ই পাত্রে দুধ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইবন হাজমের ফিকহ গ্রহণ করলে পাত্রে পান করালে মাহরামই হবে না; সরাসরি স্তন মুখে নিয়ে চোষা আবশ্যক। ইবন হাজার ফাতহুল বারী-তে এই সংঘাতটি স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করেছেন: তিনি বলেন, কাজী ইয়াদের পাত্রের সম্ভাবনা ইবন হাজমের জন্য কোনো সমাধান নয়, কারণ ইবন হাজম রদা হিসেবে কেবল স্তন মুখে নেওয়াকেই গ্রহণ করেন; এবং ইবন হাজম সালিমের ঘটনাকে পরনারীর স্তন স্পর্শ ও মুখে নেওয়ার অনুমতির দলিল হিসেবেই ব্যবহার করেছেন। [44]
মুচকি হাসি এবং সহিহ বর্ণনার সরল অর্থ
সাহলা যখন বলেন, “আমি তাকে কীভাবে দুধ পান করাব? সে তো একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ”, তখন মুহাম্মদ মুচকি হাসেন এবং বলেন, তিনি জানেন সালিম একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। অন্য বর্ণনায় সাহলা সরাসরি বলেন, “সে তো দাড়িওয়ালা”; উত্তরে আবারও নির্দেশ আসে, তাকে দুধ পান করাও। এই কথোপকথনের কোথাও “দুধ বের করে পাত্রে দাও” বলা হয়নি। বরং জারকানীর শরহে এই কারণেই বলা হয়েছে, হাদিসের ظاهر সরাসরি স্তন্যপানের দিকে যায়—মুহাম্মদ সাহলার আপত্তি শুনেছেন, হাসছেন, কিন্তু পাত্রে দোহনের নির্দেশ দিয়ে তার আপত্তির সমাধান করেননি। [45] ফলে মুচকি হাসিকে পাত্রের প্রমাণ বানানো যায় না; পাত্রের পক্ষে প্রয়োজনীয় বাক্যটি সহিহ বর্ণনায় নেই।
মানসুখ, ব্যক্তিগত ছাড়, নাকি আজও প্রযোজ্য?
বিধানটির আইনি অবস্থান নিয়েও ইসলামি ঐতিহ্যে কোনো একক ব্যাখ্যা নেই। একদল এটিকে মানসুখ বলেছেন, একদল সালিমের জন্য বিশেষ বলেছেন, আবার অন্য একটি শক্তিশালী ধারা একই ধরনের প্রয়োজন দেখা দিলে অন্য প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রেও বিধানটি কার্যকর বলে মনে করেছে। ইবন হাজার ফাতহুল বারী-তে “সালিমের ঘটনা আগে, দুই বছরের দুধপানের হাদিস পরে”—এই মানসুখের যুক্তিকে “مستند ضعيف” বা দুর্বল ভিত্তি বলেছেন। তিনি আরও বলেন, সালিমের বিশেষ পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে ধরে শুধু তার জন্য বিধান সীমাবদ্ধ করলে একই ধরনের প্রয়োজন থাকা অন্য ব্যক্তিকেও যুক্তির একই কারণে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। [46]
এই মতভেদ আজও ইসলামি ফতোয়ার উৎসে দৃশ্যমান। ইবন বাযের ফতোয়া বলছে, সঠিক মত হলো এটি কেবল সালিম ও সাহলার জন্য বিশেষ। [47] কিন্তু ইসলামকিউএ একই বিষয়ে ইবনুল কাইয়্যিমের মত উদ্ধৃত করে বলছে, এটি মানসুখ নয়, সালিমের ব্যক্তিগত বিশেষ অনুমতিও নয়; প্রয়োজনের কারণে সালিমের মতো অবস্থায় অন্যের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। [48] অর্থাৎ একই হাদিস থেকে একটি পক্ষ বলছে বিধান শেষ, আরেকটি বলছে কেবল একজনের জন্য, তৃতীয় পক্ষ বলছে শর্তসাপেক্ষে আজও নীতিগতভাবে কার্যকর। এই মতভেদ কোনো বাইরের সমালোচকের তৈরি নয়; ইসলামী ফিকহের নিজস্ব উৎসেই তা লিখিত আছে।
মূল সংঘাতগুলো এক নজরে
উপরের দলিলগুলো একত্র করলে বিতর্কটির তিনটি কেন্দ্রীয় সমস্যা স্পষ্ট হয়—সহিহ বর্ণনায় পাত্রের অনুপস্থিতি, পাত্রের নির্দিষ্ট বর্ণনায় ওয়াকিদীর উপস্থিতি এবং ইবন হাজমের সরাসরি স্তন্যপানভিত্তিক ফিকহি অবস্থান। নিচে বিষয়গুলো সংক্ষেপে দেখানো হলো।
সহীহ মুসলিমসহ ঘটনার প্রধান সহিহ বর্ণনাগুলোতে মুহাম্মদ বলেছেন “أرضعيه”, সাহলা পূর্ণবয়স্ক ও দাড়িওয়ালা পুরুষের কথা বলে আপত্তি করেছেন, কিন্তু কোথাও পাত্রে দুধ দোহনের নির্দেশ নেই। ইসলামওয়েবও সরাসরি স্বীকার করেছে যে মূল বর্ণনাগুলোতে পাত্রের কোনো উল্লেখ নেই।
সাহলা দুধ দোহন করে পাত্রে দিয়েছিলেন—এই নির্দিষ্ট বিবরণটি আত-তাবাকাতুল কুবরা-তে ওয়াকিদীর সূত্রে এসেছে। অথচ বুখারী তাকে “মাতরুকুল হাদিস”, আহমদ “কাযযাব”, মুসলিম “মাতরুক” এবং নাসাঈ “বিশ্বাসযোগ্য নয়” বলেছেন। ফলে দুর্বল রাবীর বর্ণনা দিয়ে সহিহ হাদিসে অনুপস্থিত পদ্ধতি নিশ্চিত করা যায় না।
ইবন হাজমের স্পষ্ট সংজ্ঞা অনুযায়ী রদা হলো নারীর স্তন মুখে নিয়ে সরাসরি দুধ চোষা; পাত্রে দোহন করে পান করলে কোনো দুধ-সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না। ফলে “পাত্রের ব্যাখ্যা” গ্রহণ করলেই ইসলামী ঐতিহ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি হয়।
এই বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য, আসুন সুন্নাহ ডট কম থেকে এর ইংরেজি অনুবাদটি পড়ি,
17. The Book of Suckling
(7) Chapter: Breastfeeding an adult
‘ A’isha (Allah be pleased with her) reported that Sahla bint Suhail came to Allah’s Apostle (may peace be eupon him) and said:
Messengerof Allah, I see on the face of Abu Hudhaifa (signs of disgust) on entering of Salim (who is an ally) into (our house), whereupon Allah’s Apostle (ﷺ) said: Suckle him. She said: How can I suckle him as he is a grown-up man? Allah’s Messenger (ﷺ) smiled and said: I already know that he is a young man ‘Amr has made this addition in his narration that he participated in the Battle of Badr and in the narration of Ibn ‘Umar (the words are): Allah’s Messenger (ﷺ) laughed.
Reference : Sahih Muslim 1453a
In-book reference : Book 17, Hadith 33
USC-MSA web (English) reference : Book 8, Hadith 3424
এবারে মুওয়াত্তা মালিকের বর্ণনাগুলো লক্ষ্য করা যাক। এখানে বাংলা অনুবাদে “দুধ চোষাইয়া” ও “দুধ চোষার” ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথম বর্ণনার সালিম হলেন সালিম ইবন আবদিল্লাহ, সালিম মাওলা আবু হুজাইফা নন; বর্ণনাতেই বলা হয়েছে তিনি তখন দুগ্ধপোষ্য ছিলেন। ফলে এই বর্ণনাটি প্রাপ্তবয়স্ক সালিম কীভাবে দুধ পান করেছিলেন তার প্রত্যক্ষ বিবরণ নয়। এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়—দুধপান বা রদা সম্পর্কিত ভাষাকে বাংলা অনুবাদক কীভাবে সরাসরি “চোষানো” হিসেবে অনুবাদ করেছেন, এবং পরের বর্ণনায় দশবার ও পাঁচবার দুধ চোষার কোরআনিক বিধান কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে তা এখানে স্পষ্ট দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক সালিমের পদ্ধতির প্রশ্নে মূল প্রমাণ বরং সহিহ হাদিসের ভাষা, জারকানীর ব্যাখ্যা এবং ইবন হাজমের ফিকহি সংজ্ঞা। [49] –
মুয়াত্তা মালিক
৩০. সন্তানের দুধ পান করানোর বিধান সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ১. শিশুদের দুধ পান করানো
রেওয়ায়ত ৭. নাফি’ (রহঃ) হইতে বর্ণিত, সালিম ইবন আবদিল্লাহ (রহঃ) তাহার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন যে, তিনি যখন দুগ্ধপোষ্য ছিলেন, তখন আয়েশা উম্মুল মু’মিনীন (রাঃ) তাহাকে পাঠাইলেন তাহার ভগ্নী উম্মে কুলসুম বিনত আবী বকর (রাঃ) এর নিকট এবং বলিয়া দিলেন- ইহাকে (সালিমকে) দশবার দুধ চোষাইয়া দিন, যেন সে আমার নিকট প্রবেশ করিতে পারে। সালিম বলেনঃ উম্মে কুলসুম আমাকে তিনবার দুধ চোষাইয়াছেন। তারপর আমি পীড়িত হই, তাই আমাকে তিনবার ছাড়া আর দুধ পান করান নাই, যেহেতু উম্মে কুলসুম আমাকে দশবার দুধ পান করান নাই তাই আমি আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করিতাম না।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ নাফি‘ (রহঃ)
মুয়াত্তা মালিক
৩০. সন্তানের দুধ পান করানোর বিধান সম্পর্কিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ৩. দুধ পান করানোর বিবিধ বিষয়
রেওয়ায়ত ১৭. আমরা বিনত আবদির রহমান (রহঃ) হইতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্নী আয়েশা (রাঃ) বলিয়াছেনঃ কোরআনে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছিল তাহাতে দশবার দুধ চোষার কথা নির্ধারিত ছিল, যাহা হারাম করিবে, তারপর উহা রহিত হইয়া যায় নির্ধারিত পাঁচবার দুগ্ধ চোষার (অবতীর্ণ হুকুমের) দ্বারা। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ওফাত হয় তখনও সেই পাঁচবার দুধ চোষার (হুকুমের অংশ) সম্মিলিত আয়াত তিলাওয়াত করা হইত।
মালিক (রহঃ) বলেনঃ ইহার উপর আমল নাই। অর্থাৎ পাঁচবারের উপর আমল নাই। দুগ্ধ পান অল্প হউক বা বেশি হউক বিবাহ সম্পর্ক হারাম করিবে।
হাদিসের মানঃ তাহকীক অপেক্ষমাণ
বর্ণনাকারীঃ আমরাহ বিনতু আবদুর রহমান (রহঃ)

এবারে আসুন এই রেফারেন্সটি দেখি। এখানে বলা হচ্ছে, নবীর শেষ যুগে নাকি পাঁচবার দুধ খাওয়ানোর আয়াত মানসুখ হয়ে গেছে। কিন্তু সেটির রেফারেন্স কোথায়? কোন হাদিসে এটি বর্ণিত আছে? ইসলামিক দলিল প্রমাণ ঘেঁটে সেই সম্পর্কে কোন তথ্য কেন পাওয়া যাচ্ছে না?

ইসলামিক অ্যাপোলজিস্টদের দাবি অনুযায়ী, এই বিধানটি শুধুমাত্র সালিমের জন্য ছিল। কিন্তু ইবনু মাজাহর বর্ণনায় সরাসরি “প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপান” সম্পর্কিত আয়াতের কথা এসেছে; আর সহীহ মুসলিমে দশবার থেকে পাঁচবার দুধপানের পাঠ নাযিল হওয়া এবং নবীর মৃত্যুর সময়ও পাঁচবারের পাঠ কোরআন হিসেবে তিলাওয়াত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
- বিধানটি কেবল সালিমের জন্য হলে, আল্লাহ কেন এটি কোরআনের আয়াতের মতো সার্বজনীন রূপে নাযিল করবেন?
- কোরআন যদি কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির সংবিধান হয়, তবে সেখানে একজনের ঘরোয়া সমস্যা সমাধানে স্বতন্ত্র আয়াত নাযিল হওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?
বলা হয় এই বিধানটি মানসুখ (রহিত) হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রহিতকারী সেই অকাট্য দলিল বা হাদিসটি আসলে কোথায়?
- নবীর জীবনের শেষ মুহূর্তের সাক্ষী আয়েশা নিজেই এই বিধানের সপক্ষে আমল করতেন।
- যদি এটি রহিত হতো, তবে আয়েশা কেন তাঁর বোন বা ভাগ্নিদের দিয়ে এটি নিয়মিত অনুশীলন করাতেন?
- নবীর সর্বশেষ বিধান আয়েশারই সবচাইতে ভালো জানার কথা, অথচ তাঁর আমল রহিতকরণের দাবির সম্পূর্ণ বিরোধী।
‘রদা’ ও সরাসরি স্তন্যপানের ফিকহি অর্থ
সাহলার হাদিসে ব্যবহৃত মূল নির্দেশ হলো “أَرْضِعِيهِ”—“তাকে দুধ পান করাও/স্তন্যদান করো।” এই শব্দটির প্রয়োগ কীভাবে হবে তা নিয়েই পরবর্তী ফকিহদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে; আর সেই মতভেদই এই ঘটনার সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে। কাজী ইয়াদ পাত্রে দুধ দেওয়ার সম্ভাবনা কল্পনা করেছেন, কিন্তু জারকানীর শরহে সরাসরি বলা হয়েছে যে হাদিসের ظاهر বা বাহ্যিক অর্থ স্তন থেকে পান করার দিকে যায়, কারণ সাহলার প্রাপ্তবয়স্কতার আপত্তির পরও মুহাম্মদ তাকে দুধ দোহনের নির্দেশ দেননি। [38]
ইবন হাজম এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট। তাঁর আল-মুহাল্লা-তে রদার সংজ্ঞা: “ما امتصه الراضع من ثدي المرضعة بفيه فقط”—দুধপানকারী নিজের মুখ দিয়ে স্তন্যদানকারিণীর স্তন থেকে যা চুষে নেয়, কেবল সেটিই শরিয়তগত রদা। তিনি এরপর পরিষ্কারভাবে বলেন, নারীর দুধ পাত্রে নিয়ে পান করা, মুখে ঢেলে দেওয়া, খাবারে মেশানো বা অন্য কোনো উপায়ে শরীরে প্রবেশ করানো তাঁর মতে রদা নয় এবং এতে দুধ-সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না। [50] ইবন হাজারও ফাতহুল বারী-তে লিখেছেন, পাত্রের ব্যাখ্যা ইবন হাজমের অবস্থানের কোনো সমাধান নয়; কারণ ইবন হাজম সরাসরি স্তন মুখে নেওয়াকেই আবশ্যক মনে করেন এবং সালিমের হাদিস থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পরপুরুষের স্তন স্পর্শ ও মুখে নেওয়ার অনুমোদনই বের করেছেন। [51] অর্থাৎ “পাত্রে খাইয়েছিলেন” এবং “রদা কেবল সরাসরি স্তন চোষা”—দুটিই ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরের বক্তব্য; একটিকে বেছে নিলে অন্যটির সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য। আসুন এবার আল-মুহাল্লার বিস্তারিত বক্তব্য পড়ি [52] –
আল-মুহাল্লা বিল আসার: প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান সংক্রান্ত মাসআলা
ইমাম ইবনে হাজম আল-আন্দালুসি
মূল বক্তব্য
মাসআলা: প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানও (বিবাহ) হারাম করে দেয়—এমনকি সে যদি বৃদ্ধও হয়—ঠিক যেভাবে শিশুর দুধপান হারাম করে। এ দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
এই বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
১. প্রথম পক্ষ: একদল বলেন, কেবল শৈশবে দুধপান করলেই হারাম হয়, বড় অবস্থায় নয়। তবে তারা এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেননি। যেমন মালেক, ইবনে শিহাব ও উরওয়াহ ইবনুল জুবাইরের সূত্রে বর্ণিত—আয়িশা (রা.) ব্যতীত নবী (সা.)-এর অন্যান্য স্ত্রীগণ মনে করতেন যে, সালেম মাওলা আবু হুজাইফার ঘটনাটি কেবল তার জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, তারা কেবল শিশুর দুধপানকেই হারাম হওয়ার কারণ মনে করতেন। এছাড়া উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং ইবনে উমর (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, “দুধপান কেবল শৈশবেই ধর্তব্য” [53]।
২. দ্বিতীয় পক্ষ: একদল বলেন, কেবল দোলনায় থাকা অবস্থায় (অর্থাৎ অতি শৈশবে) দুধপান করলেই হারাম হবে। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবের মতে, “দোলনা ছাড়া কোনো দুধপান (হারাম) নেই” [54]।
৩. তৃতীয় পক্ষ: অন্য একদল বলেন, বুকের দুধ ছাড়ানোর (ফিতাম) আগের দুধপানই কেবল হারাম করে, পরেরটি নয়। উম্মে সালামাহ (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দুধ ছাড়ানোর পর দুধপান কি হারাম করে? তিনি বলেছিলেন, “না” [55]। আবু মুসা আল-আশআরি (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললেন যে তিনি তার স্ত্রীর স্তন চুষেছেন এবং দুধ তার পেটে গেছে। আবু মুসা প্রথমে বলেছিলেন, “তোমার স্ত্রী তোমার জন্য হারাম হয়ে গেছে।” কিন্তু ইবনে মাসউদ (রা.) এর বিরোধিতা করে বলেন, “দুধপান কেবল তা-ই যা হাড় ও মাংস গঠন করে।” তখন আবু মুসা নিজের মত প্রত্যাহার করেন [56]।
আবু হানিফা, মালেক ও জফরের মতের সমালোচনা
ইমাম ইবনে হাজম বলেন:
জফর ইবনুল হুযাইল বলেন, তিন বছর বয়স পর্যন্ত দুধপান হারাম করে।
আবু হানিফা বলেন, দুই বছর ছয় মাস পর্যন্ত হারাম করে।
ইমাম মালেক বলেন, দুই বছর দুই মাস পর্যন্ত হারাম করে।
ইবনে হাজম কঠোর ভাষায় বলেন, “আবু হানিফা, জফর এবং মালেকের এই তিন মতের কোনোটির পক্ষেই তাদের পূর্বসূরি কোনো আলেম থেকে কোনো প্রমাণ আমরা জানি না। তারা কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করেছেন। আমরা এই ফিতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই” [57]।
আয়িশা (রা.) ও ইবনে হাজমের দলিল (প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান)
ইমাম ইবনে হাজম প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান হারাম হওয়ার পক্ষে শক্তিশালী দলিল পেশ করেন:
১. সালেম ও সাহলার ঘটনা: আবু হুজাইফার স্ত্রী সাহলা বিনতে সুহাইল নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, “সালেম (পালক পুত্র) বড় হয়ে গেছে, সে আমাদের ঘরে প্রবেশ করে, যা আবু হুজাইফার পছন্দ নয়।” নবী (সা.) মুচকি হেসে বললেন, “তাকে দুধ পান করাও, তবেই তুমি তার জন্য হারাম (মাহরাম) হয়ে যাবে এবং আবু হুজাইফার মনের অস্বস্তি দূর হবে।” সাহলা বললেন, “সে তো দাড়িওয়ালা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ!” নবী (সা.) বললেন, “আমি জানি সে বড় মানুষ” [58]।
২. আয়িশা (রা.)-এর আমল: আয়িশা (রা.) এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ফতোয়া দিতেন। তিনি যখন চাইতেন কোনো পুরুষ তার ঘরে প্রবেশ করুক, তখন তিনি তার বোন উম্মে কুলসুম বা ভাইদের মেয়েদের নির্দেশ দিতেন তাকে দুধ পান করাতে। এরপর সেই পুরুষ আয়িশা (রা.)-এর মাহরাম হয়ে যেতেন [59]।
৩. লিথ বিন সা’দ ও আতা বিন আবি রাবাহ: প্রখ্যাত ফকিহ লিথ বিন সা’দ এবং আতা বিন আবি রাবাহও প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানের মাধ্যমে মাহরাম হওয়া জায়েজ মনে করতেন [60]।
ইবনে হাজমের চূড়ান্ত যুক্তি
ইবনে হাজম বলেন, যারা বলেন এই আয়াতগুলো বা বিধানগুলো মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে, তাদের দাবি বাতিল। কারণ কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া সহীহ হাদিসকে মানসূখ বলা যায় না।
নবী (সা.) সাহলা বিনতে সুহাইলকে যখন এই নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন সালেম একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ।
যদি এটি কেবল সালেমের জন্য বিশেষ অনুমতি হতো, তবে নবী (সা.) তা স্পষ্ট করে দিতেন, যেমনটি তিনি আবু বুরদাহর কোরবানির ক্ষেত্রে করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, “কিছু মানুষ (প্রতিপক্ষ) আপত্তি করে যে, একজন বড় পুরুষ কীভাবে পরনারীর স্তন চুষবে? অথচ তারাই আবার ফতোয়া দেয় যে দাসী বিবস্ত্র হয়ে নামাজ পড়তে পারবে বা লজ্জাবস্থানের কিছু অংশ দেখা গেলে নামাজ হবে। তাদের লজ্জা ও দ্বীনদারির অভাব দেখে আমরা আল্লাহর আশ্রয় চাই” [61]।
উপসংহার: ইমাম ইবনে হাজমের মতে, কোরআনের সাধারণ আয়াত “তোমাদের সেই মায়েরা যারা তোমাদের দুধপান করিয়েছে” [62] কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কথা উল্লেখ করেনি। তাই সহীহ হাদিসের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় কমপক্ষে ৫ বার দুধপান করলে মাহরাম সম্পর্ক তৈরি হবে। আয়িশা (রা.) এই ফতোয়া দিতেন এবং তাঁর বোন ও ভাইদের কন্যাদের মাধ্যমে তা বাস্তবে প্রয়োগ করাতেন।
বিধানটির প্রয়োগ ও উৎস নিয়ে তৈরি হওয়া সংঘাত
‘রদা আল-কাবীর’ বা প্রাপ্তবয়স্কের দুধপানের বিধানটি ইসলামী উৎসের ভেতরেই একাধিক স্তরের সংঘাত তৈরি করেছে। প্রথমত, নবীর স্ত্রীদের মধ্যেই এর প্রয়োগ নিয়ে সরাসরি বিভাজন ছিল। আয়িশা সালিমের ঘটনাকে অনুসরণ করে তাঁর বোন ও ভাইদের কন্যাদের দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের দুধ পান করাতেন, যাতে তারা তাঁর কাছে প্রবেশ করতে পারে; অন্যদিকে উম্মে সালামাহসহ নবীর অন্যান্য স্ত্রীরা এই পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, তাদের মতে এটি কেবল সালিমের জন্য বিশেষ অনুমতি। ইবন হাজার আবু দাউদের আয়িশার আমলসংক্রান্ত সনদকে সহিহ বলেছেন এবং এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশকারীদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। [51] [63] ফলে নবীর পরিবারের মধ্যেই একই নববী নির্দেশের আইনি অর্থ নিয়ে ঐকমত্য ছিল না।
দ্বিতীয়ত, পদ্ধতিগত সংঘাত আরও প্রকট। সহিহ হাদিসে পাত্রের কোনো উল্লেখ নেই; ইসলামওয়েব নিজেই তা স্বীকার করে। পাত্রের নির্দিষ্ট বিবরণ আসে ওয়াকিদীর মাধ্যমে, যিনি হাদিস সমালোচকদের কাছে পরিত্যক্ত। আবার ইবন হাজমের মতে পাত্রে দুধ খেলেই কোনো রদা সংঘটিত হয় না—সরাসরি স্তন মুখে নিয়ে চোষা আবশ্যক। অন্যদিকে ইসলামে একজন পরনারীর শরীর দেখা, স্পর্শ করা এবং তার সঙ্গে নির্জনে থাকা নিষিদ্ধ করার বিস্তৃত বিধান রয়েছে। ফলে মাহরাম হওয়ার পূর্বশর্ত পূরণের জন্যই এমন একটি শারীরিক কাজ প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যা মাহরাম হওয়ার আগের অবস্থায় অন্যথায় নিষিদ্ধ। নববী এই সমস্যার সমাধানে “প্রয়োজনের কারণে স্পর্শ ক্ষমা করা হয়েছিল” সম্ভাবনাও উল্লেখ করেছেন। [64] অর্থাৎ এই প্যারাডক্স বাইরের আরোপ নয়; ইসলামি ব্যাখ্যাকারদের নিজেদের আলোচনাতেই সেটি উপস্থিত।
তৃতীয়ত, দুধপানের আয়াতগুলোর বর্ণনা কোরআনের সংরক্ষণ ও রহিতকরণের প্রশ্নকে সরাসরি সামনে আনে। সহীহ মুসলিমে আয়িশা বলেন, দশবার দুধপানের আয়াত পাঁচবার দ্বারা রহিত হয়েছিল এবং মুহাম্মদ মারা যাওয়ার সময়ও পাঁচবারের পাঠ কোরআন হিসেবে পড়া হচ্ছিল। [18] ইবনু মাজাহর হাসান হিসেবে প্রচলিত বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, রজম এবং প্রাপ্তবয়স্কের দশবার দুধপান সম্পর্কিত লেখা আয়িশার খাটের নিচের সহীফায় ছিল এবং মুহাম্মদের মৃত্যুর ব্যস্ততায় একটি গৃহপালিত পশু সেটি খেয়ে ফেলে। [19] পরবর্তী ব্যাখ্যায় নববীকে বলতে হয়েছে, পাঁচবারের তিলাওয়াত এত দেরিতে রহিত হয়েছিল যে নবীর মৃত্যুর সময়ও কিছু মানুষ রহিত হওয়ার সংবাদ না পেয়ে সেটিকে কোরআন হিসেবে পড়ছিল। [65] এই ব্যাখ্যা ঘটনাটিকে মুছে দেয় না; বরং দেখায় যে নবীর মৃত্যুর মুহূর্তেও কোন পাঠ কোরআনের অংশ আর কোনটি রহিত—এই তথ্য সব পাঠকের কাছে এক অবস্থায় পৌঁছেনি। ফলে বিষয়টি কেবল একটি অস্বাভাবিক ফিকহি বিধান নয়; এটি ওহীর পাঠ, সংরক্ষণ এবং রহিতকরণের ইতিহাসের মধ্যেও একটি গুরুতর অসামঞ্জস্য তুলে ধরে।
উপসংহার: মানবিকতা বনাম ধর্মীয় গোঁড়ামি
পরিশেষে বলা যায় যে, ‘রদা-আল-কাবীর’ বা প্রাপ্তবয়স্কের দুগ্ধপানের বিষয়টি ইসলামের ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় যা সমকালীন অনেক মুসলিম আলেম বা চিন্তাবিদও প্রকাশ্যে আলোচনা করতে অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করেন। এর প্রধান কারণ হলো, এই বিধানটি মানুষের সহজাত বিচারবুদ্ধি, আধুনিক নৈতিকতা এবং উন্নত রুচিবোধের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ধর্মের দোহাই দিয়ে এমন সব কুরুচিপূর্ণ ও অযৌক্তিক প্রথাকে যখন পবিত্র বা ঐশ্বরিক আইনের মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন তা কেবল মানুষের যুক্তিকেই অপমান করে না, বরং সার্বজনীন নৈতিক মানদণ্ডকেও প্রবলভাবে নিচে নামিয়ে দেয়।
এই বিতর্কিত বিষয়টি নিয়ে নবীর স্ত্রীদের মধ্যকার সুস্পষ্ট বিভেদ, ওহীর সংরক্ষণের দাবি বনাম হারিয়ে যাওয়া আয়াতের ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং সরাসরি স্তন্যপানের মতো বিকৃত পদ্ধতি—সব মিলিয়ে এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং যৌক্তিক আইন। সম্পর্কের সংজ্ঞাকে অদ্ভুতভাবে পাল্টে দেওয়ার নামে মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি, জৈবিক শালীনতা এবং ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো বিধান আধুনিক যুগে আর গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মূলত, মানবিক প্রগতি এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির এই দ্বন্দ্বে যখনই যুক্তিকে বিসর্জন দেওয়া হয়, তখনই সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সভ্যতার অগ্রযাত্রায় এমন সব আদিম ও অমানবিক প্রথাকে ছুড়ে ফেলে সুস্থ ও আধুনিক বিচারবুদ্ধিকে গ্রহণ করাই সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৬৯ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭৩ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৪৩ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৪২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৯০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৬৬ 1 2
- IslamQA, প্রশ্ন ২৯৫৫৮৭: حول رضاع سالم مولى أبي حذيفة، وهل ولدت زوجة أبي حذيفة كي ترضع سالما؟ ↩︎
- ইবন বাযের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: حكم الرضاع ممن درت لبنًا مع أنها لم تلد ↩︎
- মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২৬২–২৬৫; ফতোয়া নং ১৫৩–১৫৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৪৮৯ [১৪৫২] ↩︎
- শরহ সহীহ মুসলিম, ইমাম নববী: خمس رضعات এবং “وهن فيما يقرأ من القرآن” এর ব্যাখ্যা ↩︎
- IslamWeb: بيان نسخ تحريم الرضاع من عشر رضعات إلى خمس ↩︎
- আল-আওনুল মাহমুদ ফি-হল্লি সুনানে আবী দাউদ (কিতাবুয্ যাকাত – কিতাবুল জিহাদ), সংকলন ও সম্পাদনাঃ মাওলানা আব্দুল হাফীজ বিন আব্দুর রউফ, আল-মাহমূদ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৩৭২ ↩︎
- সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিসঃ ১৯৪৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম ৩৪৮৯ [১৪৫২] 1 2
- সুনান ইবনু মাজাহ ১৯৪৪ 1 2
- শরহ মুসলিম, নববী ↩︎
- মিরকাতুল মাফাতীহ, باب المحرمات: পাঁচবার দুধপানের আয়াত ও ইবনুল হুমামের আপত্তি ↩︎
- সূরা বাকারাঃ ১০৬ ↩︎
- সূরা নাহলঃ ১০১ ↩︎
- মিরকাতুল মাফাতীহ শরহ মিশকাতুল মাসাবীহ, মোল্লা আলী আল-ক্বারী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২০৭৯, হাদিস ৩১৬৭ ↩︎
- মিরকাতুল মাফাতীহ, মোল্লা আলী আল-ক্বারী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২০৭৯ ↩︎
- ফাতহুল বারী, ইবন হাজার, باب من قال لا رضاع بعد حولين ↩︎
- সংশয় ইসলাম আর্কাইভ: ইবনু বায, খণ্ড ২৫, পৃষ্ঠা ২৫১–২৫৫ ↩︎
- IslamQA 509196: أيهما كان أولا آية الرضاع في العامين أو قصة سالم؟ ↩︎
- ফাতহুল বারী: মানসুখ ও বিশেষত্বের যুক্তির সমালোচনা ↩︎
- আল-আওনুল মাহমুদ ফি-হল্লি সুনানে আবী দাউদ (কিতাবুয্ যাকাত – কিতাবুল জিহাদ), সংকলন ও সম্পাদনাঃ মাওলানা আব্দুল হাফীজ বিন আব্দুর রউফ, আল-মাহমূদ প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৩৭১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৪৭১ ↩︎
- সহিহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০১ ↩︎
- মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক, باب رضاع الكبير, হাদিস ১৩৮৮৪ ↩︎
- আল-ইস্তিযকার, ইবন আবদুল বার, باب ما جاء في الرضاعة بعد الكبر ↩︎
- সুনান আন-নাসাঈ, باب رضاع الكبير, হাদিস ৩৩২২ ↩︎
- আল-ইস্তিযকার, ইবন আবদুল বার ↩︎
- IslamWeb: خبر رضاع سالم من سهلة بنت سهيل ↩︎
- শরহুয যারকানী ‘আলা মুওয়াত্তা মালিক, باب ما جاء في الرضاعة بعد الكبر 1 2
- আততাবক্কাতুল কুবরা-৮/২১২, দারুল কুতুব বৈরুত, রাবী নং-৪২১৯ ↩︎
- তাহযীব আল-কামাল: محمد بن عمر بن واقد الواقدي ↩︎
- আল-মাকতাবা আল-শামিলা: ওয়াকিদীর রেওয়ায়েতের মূল্যায়ন ↩︎
- আল-মুহাল্লা বিল আসার, ইবন হাজম: صفة الرضاع المحرم ↩︎
- আল-মাকতাবা আল-শামিলা: ইবন হাজমের রদা সংক্রান্ত বক্তব্য ↩︎
- ফাতহুল বারী, ইবন হাজার: رضاع الكبير ↩︎
- শরহুয যারকানী ‘আলা মুওয়াত্তা মালিক ↩︎
- ফাতহুল বারী: من قال لا رضاع بعد حولين ↩︎
- সংশয় ইসলাম আর্কাইভ: ইবন বায, حكم إرضاع الكبير ↩︎
- IslamQA 509196 ↩︎
- মুয়াত্তা ইমাম মালেক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩২, ২৩৩, ২৩৮ ↩︎
- আল-মুহাল্লা বিল আসার: صفة الرضاع المحرم ↩︎
- ফাতহুল বারী, ইবন হাজার 1 2
- আল-মুহাল্লা: প্রাপ্তবয়স্কের দুধপান ↩︎
- মুয়াত্তাহ মালেক, ৩/৬০৪; সুনান বাইহাকি, ১৫৫৯৩ ↩︎
- মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, ৭/৪৬৩ ↩︎
- মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ, ৪/১৭১ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ২০৬০ ↩︎
- আল-মুহাল্লা, ১০/২০৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ১৪৫৩ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, ২০৬১; মুয়াত্তাহ মালেক, ১২৯২ ↩︎
- আল-মুহাল্লা, ১০/২০৫ ↩︎
- আল-মুহাল্লা, ১০/২১১ ↩︎
- সূরা নিসা, ২৩ ↩︎
- IslamQA: আয়িশার আমল ও নবীর অন্যান্য স্ত্রীদের বিরোধিতা ↩︎
- শরহুয যারকানী: কাজী ইয়াদ ও নববীর দুই সম্ভাবনা ↩︎
- শরহ সহীহ মুসলিম, নববী ↩︎

