ভূমিকা
মানবিকতার চিরন্তন সংজ্ঞায় বিপন্ন মানুষের প্রাণ রক্ষা করা প্রতিটি মানুষের সর্বোচ্চ নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেই আধুনিক সমাজব্যবস্থায় ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ বলে অভিহিত করা হয়। বিশেষ করে দাঙ্গা বা যুদ্ধের মতো অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে যখন নারী বা শিশুদের মতো অরক্ষিত গোষ্ঠী প্রাণভয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তখন তাদের ঘরের দরজা খুলে দেওয়াকে একটি পরম মানবিক কর্তব্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যখন এই মানবিক কর্মকাণ্ডকে কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামোর মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই এক গভীর নৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়।
ইসলামি আইনশাস্ত্রের কিছু ধ্রুপদী ব্যাখ্যা এবং তাফসির গ্রন্থ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে সাহায্য ও বন্ধুত্বের পরিধিকে কেবল নিজ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার একটি শক্তিশালী প্রবণতা বিদ্যমান। বিশেষ করে অমুসলিমদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে একজন মুসলমানের অবস্থান কী হবে এবং প্রাণভয়ে ভীত অমুসলিমদের আশ্রয় প্রদান করা বৈধ কি না—এই প্রশ্নটি যখন উত্থাপিত হয়, তখন ইসলামের অনেক আইনি দলিল ‘সর্বজনীন মানবিকতার’ বদলে ‘ধর্মীয় আনুগত্য’ বা ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ (বন্ধুত্ব ও বিচ্ছেদ) তত্ত্বকে প্রাধান্য দেয়। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং বাস্তব সংকটকালীন মুহূর্তে একজন মুমিনের আচরণগত সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তাফসীরে মাযহারী ও মাবসুত-এর নিষেধাজ্ঞা: আইনি ও আদর্শিক ব্যবচ্ছেদ
ইসলামি আইনশাস্ত্রের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সাহায্য এবং সহযোগিতার বিষয়টি কেবল মানবিক আবেগের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘তাফসীরে মাযহারী’-র মতো প্রামাণ্য তাফসীর গ্রন্থে সুরা আনফালের আয়াতের ব্যাখ্যায় যে মাসআলা বা আইনি সমাধান দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে বা কাফের, তারা কেবল একে অপরের বন্ধু হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, মুসলমানদের সঙ্গে অমুসলিমদের এমন কোনো গভীর বন্ধুত্ব বা সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা বৈধ নয়, যা ধর্মীয় সীমান্তের ঊর্ধ্বে গিয়ে কেবল মানবিকতাকে প্রাধান্য দেয় [1]।
যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, যদি তোমরা উহা না কর তবে দেশে ফিত্না ও মহা বিপর্যয় দেখা দিবে।
যাহারা বিশ্বাস করিয়াছে, দ্বীনের জন্য গৃহত্যাগ করিয়াছে ও আল্লাহের পথে সংগ্রাম করিয়াছে এবং যাহারা আশ্রয় দান করিয়াছে তাহারাই প্রকৃত বিশ্বাসী; তাহাদিগের জন্য ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা রহিয়াছে।
প্রথমোক্ত আয়াতটির মর্মার্থ হচ্ছে- অবিশ্বাসীরা অবিশ্বাসীদেরই বন্ধু।
বিশ্বাসীদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব হতে পারে না। তাই তাদেরকে সাহায্য করা বিশ্বাসীদের জন্য বৈধ নয়। বিশ্বাসীরা সাহায্য করবে কেবল বিশ্বাসীদেরকে। এ রকম না করলে দেখা দিবে বিপর্যয়।
হজরত উসামা ইবনে জায়েদ থেকে বোখারী, মুসলিম ও সুনান রচয়িতাগণ তাঁদের আপনাপন পুস্তকে লিখেছেন, রসুল স. বলেছেন মুসলমানেরা কাফেরদের উত্তরাধিকারী নয়। কাফেরেরাও নয় মুসলমানদের উত্তরাধিকারী। সুরা নিসার উত্তরাধিকার বিষয়ক আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রসঙ্গটির বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। যথাস্থানে তা দেখে নেয়া যেতে পারে।
মাসআলাঃ মাবসুত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কাফের সাম্রাজ্যে কিছু সংখ্যক কাফের অপর কোনো কাফের জনপদের উপর আক্রমন করে বসে, তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে, ওই জনপদে বাস করে কিছু সংখ্যক আশ্রিত মুসলমান, তবে হামলাকারীদের প্রতিহত করা মুলমানদের জন্য জায়েয নয়। কিন্তু যদি মুসলমানদের জান-মালের ক্ষতির আশংকা দেখা যায় তবে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। কারণ শত্রুর মোকাবিলা করার অর্থ- জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করা। আর আল্লাহতায়ালার বাণীকে সমুন্নত করা, ধর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা ও আত্মরক্ষা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জীবনের ঝুঁকি নেয়া বৈধ নয়। তাই কাফেরদের জান মাল রক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেয়া মুসলমানদের জন্য অবৈধ।

এই ধর্মীয় বিভাজনের একটি প্রত্যক্ষ আইনি উদাহরণ পাওয়া যায় হানাফি মাযহাবের প্রভাবশালী আইনজ্ঞ শামসুল আইম্মা আস-সারাখসির আল-মাবসুত গ্রন্থে। দশম খণ্ডের ৯৭–৯৮ পৃষ্ঠায় সারাখসি এমন একটি পরিস্থিতির বিধান আলোচনা করেছেন, যেখানে কিছু মুসলমান অমুসলিম শাসিত অঞ্চলে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত অবস্থায় বসবাস করছে। সেই অঞ্চলের ওপর অন্য একদল অমুসলিম আক্রমণ করলে স্থানীয় অমুসলিমদের পক্ষে যুদ্ধ করা মুসলমানদের জন্য বৈধ নয়। কারণ যুদ্ধের মাধ্যমে নিজের জীবন বিপন্ন করা হয়, অথচ সেই বিপদ গ্রহণের বৈধ উদ্দেশ্য হিসেবে সারাখসি আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করা এবং ইসলামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। অমুসলিমদের শাসন রক্ষার যুদ্ধকে তিনি শিরকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করেছেন। তবে আক্রমণকারীদের কারণে মুসলমানদের নিজেদের জীবন বিপন্ন হলে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একই আক্রমণে আক্রান্ত অমুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ, কিন্তু মুসলমানদের নিজেদের নিরাপত্তা বিপন্ন হলে যুদ্ধ অনুমোদিত। এই পার্থক্যের ভিত্তি আক্রান্ত মানুষের ন্যায়সংগত প্রতিরক্ষার প্রয়োজন নয়, বরং যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না, সেই ধর্মীয় উদ্দেশ্য। [2] [3]
وإذا كان قوم من المسلمين مستأمنين في دار الحرب فأغار على تلك الدار قوم من أهل الحرب لم يحل لهؤلاء المسلمين أن يقاتلوهم لأن في القتال تعريض النفس فلا يحل ذلك إلا على وجه إعلاء كلمة الله عزوجل وإعزاز الدين وذلك لا يوجد ههنا لأن أحكام أهل الشرك غالبة فيهم فلا يستطيع المسلمون أن يحكموا بأحكام أهل الإسلام فكان قتالهم في الصورة لإعلاء كلمة الشرك وذلك لا يحل إلا أن يخافوا على أنفسهم من أولئك فحينئذ لا بأس بأن يقاتلوهم للدفع عن أنفسهم لا لإعلاء كلمة الشرك.
বাংলা অনুবাদ: যদি কিছু মুসলমান যুদ্ধরত অমুসলিমদের দেশে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত অবস্থায় বসবাস করে এবং অন্য একদল যুদ্ধরত অমুসলিম সেই অঞ্চলে আক্রমণ করে, তাহলে ওই মুসলমানদের জন্য আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বৈধ নয়। কারণ যুদ্ধের মধ্যে নিজের জীবন বিপন্ন করা রয়েছে। আর আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করা এবং ধর্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছাড়া তা বৈধ নয়। এখানে সেই উদ্দেশ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সেখানে মুশরিকদের বিধানই প্রাধান্য বিস্তার করে আছে এবং মুসলমানরা ইসলামের বিধান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম নয়। ফলে তাদের যুদ্ধ বাহ্যিকভাবে শিরকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ হবে, যা বৈধ নয়। তবে আক্রমণকারীদের কারণে মুসলমানরা নিজেদের জীবনের আশঙ্কা করলে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করতে পারবে; শিরকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।
এই বিধানের নৈতিক অসংগতি অত্যন্ত স্পষ্ট। একটি অমুসলিম জনপদ আক্রান্ত হলে তার প্রতিরক্ষাকে ধর্মীয় কারণে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, অথচ সেই একই আক্রমণে মুসলমানদের নিজেদের জীবন বিপন্ন হলে যুদ্ধ বৈধ হয়ে যাচ্ছে। এখানে আক্রমণকারীদের অন্যায়, আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষতি কিংবা অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রয়োজন যুদ্ধের বৈধতা নির্ধারণে মুখ্য নয়। মুখ্য হলো ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। এর ফলে একটি জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ প্রতিরোধ করার নৈতিক দায়িত্বও ধর্মীয় পরিচয়ের অধীন হয়ে পড়ে। অমুসলিমদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষাকে শিরকের কর্তৃত্ব রক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাদের ন্যায়সংগত প্রতিরক্ষার প্রশ্নকে ধর্মীয় বিরোধে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই ধরনের বিধান একই সমাজে বসবাসকারী মানুষের পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার পরিবর্তে ধর্মীয় বিভাজনকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। মানুষের ওপর সংঘটিত অন্যায়কে ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করার পরিবর্তে কোন ধর্মীয় গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব রক্ষিত হবে, সেই প্রশ্নকে প্রাধান্য দেওয়া সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস ও বৈরিতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে।
ইমাম মুহাম্মদ আশ-শায়বানির বিধান: অমুসলিমদের উভয় পক্ষই শয়তানের দল
অমুসলিমদের প্রতি ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের এই দর্শন হানাফি ফিকহের আরও প্রাচীন ও প্রভাবশালী গ্রন্থেও পাওয়া যায়। আবু হানিফার ছাত্র এবং হানাফি আইনশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইবনে হাসান আশ-শায়বানি তাঁর আস-সিয়ার আল-কাবির গ্রন্থে মুসলমানদের অমুসলিমদের পারস্পরিক যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিধান আলোচনা করেছেন। তাঁর এই গ্রন্থের ব্যাখ্যা শরহুস সিয়ার আল-কাবির-এ ইমাম সারাখসি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, একদল অমুসলিমের সঙ্গে মিলে অন্য অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মুসলমানদের উচিত নয়। এর পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অমুসলিমদের পরস্পরবিরোধী দুই পক্ষকেই সেখানে ‘শয়তানের দল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মুসলমানদের ওই দুই পক্ষের কোনো একটির সঙ্গে যোগ দিয়ে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং তাদের প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সেখানে শিরকের শাসনই প্রতিষ্ঠিত থাকবে; অথচ মুসলমানের যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য হলো সত্যপন্থীদের বিজয়ী করা, শিরকের শাসন প্রতিষ্ঠা করা নয়। এখানে অমুসলিমদের রাজনৈতিক বিরোধের ন্যায়-অন্যায়, আক্রমণকারী ও আক্রান্তের অবস্থান কিংবা তাদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের পরিবর্তে উভয় পক্ষের ধর্মীয় পরিচয়কেই নেতিবাচক মূল্যায়নের ভিত্তি করা হয়েছে। [4]
بَابُ قِتَالِ أَهْلِ الْإِسْلَامِ أَهْلَ الشِّرْكِ مَعَ أَهْلِ الشِّرْكِ
٢٩٦٩ – قَالَ: لَا يَنْبَغِي لِلْمُسْلِمِينَ أَنْ يُقَاتِلُوا أَهْلَ الشِّرْكِ مَعَ أَهْلِ الشِّرْكِ.
لِأَنَّ الْفِئَتَيْنِ حِزْبُ الشَّيْطَانِ، وَحِزْبُ الشَّيْطَانِ هُمْ الْخَاسِرُونَ، فَلَا يَنْبَغِي لِلْمُسْلِمِ أَنْ يَنْضَمَّ إِلَى إِحْدَى الْفِئَتَيْنِ فَيَكْثُرُ سَوَادُهُمْ وَيُقَاتِلُ دَفْعًا عَنْهُمْ، وَهَذَا؛ لِأَنَّ حُكْمَ الشِّرْكِ هُوَ الظَّاهِرُ، وَالْمُسْلِمُ إِنَّمَا يُقَاتِلُ لِنُصْرَةِ أَهْلِ الْحَقِّ، لَا لِإِظْهَارِ حُكْمِ الشِّرْكِ.
বাংলা অনুবাদ: পরিচ্ছেদ: অমুসলিমদের সঙ্গে মিলে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধ।
২৯৬৯। তিনি বলেছেন: মুসলমানদের উচিত নয় একদল মুশরিকের সঙ্গে মিলে অন্য মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। কারণ উভয় দলই শয়তানের দল, আর শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত। সুতরাং কোনো মুসলমানের উচিত নয় এই দুই দলের কোনো একটির সঙ্গে যোগ দেওয়া, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং তাদের প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধ করা। কারণ এখানে শিরকের বিধানই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। আর মুসলমান যুদ্ধ করে সত্যপন্থীদের সাহায্য করার জন্য, শিরকের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়।
এই বক্তব্যে ধর্মীয় বিদ্বেষের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো পাওয়া যায়। দুই পক্ষের কেউ মুসলমান নয়—এই পরিচয়ই তাদের উভয়কে ‘শয়তানের দল’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার ভিত্তি হয়েছে। অথচ দুটি অমুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটলেই উভয় পক্ষ সমানভাবে অন্যায়কারী হয়ে যায় না। একটি পক্ষ আক্রমণকারী এবং অন্যটি আক্রান্ত হতে পারে; একটি পক্ষ নিপীড়নকারী এবং অন্যটি নিপীড়নের শিকার হতে পারে। কিন্তু এখানে তাদের রাজনৈতিক বা নৈতিক অবস্থানের বিচারের আগেই উভয় পক্ষের ওপর একই ধর্মীয় অবমাননাকর পরিচয় আরোপ করা হয়েছে। এই ধরনের শিক্ষা অমুসলিম মানুষকে স্বাধীন নৈতিক সত্তা হিসেবে মূল্যায়নের পরিবর্তে ধর্মীয়ভাবে প্রত্যাখ্যাত একটি সামষ্টিক পরিচয়ের মধ্যে বন্দি করে। একজন মানুষের ন্যায়পরায়ণতা, সততা, সাহস কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তাঁর ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন না করলে এই শ্রেণিবিভাগে তাঁকে শয়তানের দলের বাইরে নিয়ে আসে না। ধর্মের ভিত্তিতে সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে এভাবে নেতিবাচক পরিচয়ে চিহ্নিত করা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, অবিশ্বাস ও বৈরিতার আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে।
শায়বানির বিধানের ব্যাখ্যায় আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মুসলমানদের অমুসলিম পক্ষের প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, সেই প্রতিরক্ষার মাধ্যমে শিরকের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ অমুসলিম জনপদের নিরাপত্তা রক্ষায় অংশগ্রহণকে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষার সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে। এর ফলে একজন মুসলমান যে সমাজে বসবাস করেন, সেই সমাজের অমুসলিম নাগরিকদের সঙ্গে তাঁর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ধর্মীয় আনুগত্যের অধীন হয়ে পড়ে। অমুসলিমদের ওপর আক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যকে নিজস্ব নৈতিক মূল্য না দিয়ে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মানদণ্ডে বিচার করা হয়। এই বিধান ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক সংহতি গড়ে তোলার প্রতিবন্ধক। কারণ একটি সমাজের বাসিন্দারা পরস্পরের নিরাপত্তার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করবেন কি না, তার সিদ্ধান্তে অন্যের ধর্মীয় পরিচয়কে বিভাজনের ভিত্তি করা হয়েছে।
মুসলিম বিদ্রোহীদের সঙ্গে ঐক্য সম্ভব, অমুসলিমদের পক্ষে যুদ্ধ নয়
একই গ্রন্থের পরবর্তী মাসআলায় আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি পার্থক্য পাওয়া যায়। সেখানে খারিজিদের সঙ্গে মুসলিম শাসকদের অনুসারীদের সংঘর্ষের বিষয়টি আলোচনা করে বলা হয়েছে, ন্যায়পন্থী মুসলমানরা খারিজিদের সঙ্গে একত্র হয়ে অমুসলিম যুদ্ধরত পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। কারণ এই যুদ্ধকে কুফরের বিপদ প্রতিহত করা এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর ফলে ইসলামের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধ সত্ত্বেও অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধের বৈধতা স্বীকৃত হচ্ছে। একই আলোচনায় অমুসলিমদের পক্ষে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিষিদ্ধ, কিন্তু পরস্পরবিরোধী মুসলিম গোষ্ঠীর পক্ষে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনুমোদিত। এই পার্থক্যের ভিত্তি হলো সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের মাধ্যমে কোন ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। [5]
٢٩٧٠ – وَلَا بَأْسَ بِأَنْ يُقَاتِلَ الْمُسْلِمُونَ، مِنْ أَهْلِ الْعَدْلِ مَعَ الْخَوَارِجِ، الْمُشْرِكِينَ مِنْ أَهْلِ الْحَرْبِ.
لِأَنَّهُمْ يُقَاتِلُونَ الْآنَ لِدَفْعِ فِتْنَةِ الْكُفْرِ، وَإِظْهَارِ الْإِسْلَامِ، فَهَذَا قِتَالٌ عَلَى الْوَجْهِ الْمَأْمُورِ بِهِ، وَهُوَ إِعْلَاءُ كَلِمَةِ اللَّهِ تَعَالَى، بِخِلَافِ مَا سَبَقَ، فَالْقِتَالُ هُنَاكَ لِإِظْهَارِ مَا هُوَ مَائِلٌ عَنْ طَرِيقِ الْحَقِّ، وَهَا هُنَا لِإِثْبَاتِ أَصْلِ الطَّرِيقِ.
বাংলা অনুবাদ: ২৯৭০। ন্যায়পন্থী মুসলমানদের জন্য খারিজিদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধরত মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ তারা এখন কুফরের ফিতনা প্রতিহত করতে এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করছে। সুতরাং এই যুদ্ধ নির্দেশিত পদ্ধতিতেই হচ্ছে, অর্থাৎ আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য। এটি আগের পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন। কারণ সেখানে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত একটি ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা, আর এখানে যুদ্ধের উদ্দেশ্য হলো সত্যপথের মূল ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা।
এই দুটি মাসআলা একত্রে ধর্মীয় গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আনুগত্যের প্রকৃতি প্রকাশ করে। মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গুরুতর মতভেদ ও সংঘর্ষ থাকলেও অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাদের যৌথ অবস্থান গ্রহণযোগ্য হতে পারে। অথচ অমুসলিমদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে এক পক্ষকে রক্ষার যুদ্ধ ধর্মীয় কর্তৃত্বের কারণে নিষিদ্ধ। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের সর্বজনীন মানদণ্ড নয়, বরং ইসলাম প্রতিষ্ঠা এবং শিরকের কর্তৃত্ব প্রতিহত করার উদ্দেশ্য যুদ্ধের নৈতিক ও আইনি বৈধতা নির্ধারণ করছে। একই সঙ্গে অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে শয়তানের দল এবং তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে শিরকের শাসন হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাদের প্রতি বৈরিতাকে ধর্মীয় ভাষায় স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে। এই শিক্ষা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে স্থায়ীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীতে বিভক্ত করার একটি আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে।
ইমাম মালিকের বিধান: অমুসলিমদের যুদ্ধ ইসলামের বিস্তার না ঘটালে মুসলমানের রক্তপাত নিষিদ্ধ
অমুসলিমদের পারস্পরিক যুদ্ধে মুসলমানদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার এই চিন্তাধারা কেবল হানাফি মাযহাবে সীমাবদ্ধ নয়। মালিকি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক ইবনে আনাসের বক্তব্যেও একই ধর্মকেন্দ্রিক যুক্তি পাওয়া যায়। মালিকি ফিকহের প্রাচীন ও প্রভাবশালী গ্রন্থ আল-মুদাওয়ানা-তে এমন একটি পরিস্থিতি আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে কিছু মুসলমান অমুসলিম অঞ্চলে বন্দি অথবা ব্যবসায়ী হিসেবে অবস্থান করছে। ওই অঞ্চলের শাসক অন্য একদল অমুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের সাহায্য চাইছেন। এমনকি বন্দি মুসলমানদের যুদ্ধের পরে মুসলিম অঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিস্থিতিতে ইমাম মালিক মুসলমানদের সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ অনুমোদন করেননি। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধ করার বৈধ উদ্দেশ্য হিসেবে অমুসলিমদের শিরক থেকে ইসলামে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। একদল অমুসলিমকে অন্য অমুসলিম শাসনের অধীনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুসলমানদের রক্তপাত করাকে তিনি অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেছেন। এখানে মুসলমানদের নিজেদের মুক্তি ও স্বার্থের সম্ভাবনা উপস্থিত থাকলেও যুদ্ধের ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। [6]
قُلْتُ: أَرَأَيْتَ لَوْ أَنَّ قَوْمًا مِنْ الْمُسْلِمِينَ أُسَارَى فِي بِلَادِ الشِّرْكِ أَوْ تُجَّارًا اسْتَعَانَ بِهِمْ صَاحِبُ تِلْكَ الْبِلَادِ عَلَى قَوْمٍ مِنْ الْمُشْرِكِينَ نَاوَءُوهُ مِنْ أَهْلِ مَمْلَكَتِهِ أَوْ مِنْ غَيْرِ أَهْلِ مَمْلَكَتِهِ، أَتَرَى أَنْ يُقَاتِلُوا مَعَهُ أَمْ لَا؟
قَالَ: سَمِعْتُ مَالِكًا يَقُولُ فِي الْأُسَارَى يَكُونُونَ فِي بِلَادِ الْمُشْرِكِينَ فَيَسْتَعِينُ بِهِمْ الْمَلِكُ عَلَى أَنْ يُقَاتِلُوا مَعَهُ عَدُوَّهُ وَيُجَاءُ بِهِمْ إِلَى بِلَادِ الْمُسْلِمِينَ؟
قَالَ: قَالَ مَالِكٌ: لَا أَرَى أَنْ يُقَاتِلُوا عَلَى هَذَا وَلَا يَحِلُّ لَهُمْ أَنْ يَسْفِكُوا دِمَاءَهُمْ عَلَى مِثْلِ ذَلِكَ، قَالَ مَالِكٌ: وَإِنَّمَا يُقَاتَلُ النَّاسُ لِيُدْخَلُوا فِي الْإِسْلَامِ مِنْ الشِّرْكِ، فَأَمَّا أَنْ يُقَاتِلُوا الْكُفَّارَ لِيُدْخِلُوهُمْ مِنْ الْكُفْرِ إِلَى الْكُفْرِ وَيَسْفِكُوا دِمَاءَهُمْ فِي ذَلِكَ، فَهَذَا مِمَّا لَا يَنْبَغِي وَلَا يَنْبَغِي لِمُسْلِمٍ أَنْ يَسْفِكَ دَمَهُ عَلَى هَذَا.
বাংলা অনুবাদ: আমি জিজ্ঞেস করলাম: আপনার অভিমত কী, যদি কিছু মুসলমান মুশরিকদের দেশে বন্দি অথবা ব্যবসায়ী হিসেবে অবস্থান করে এবং সেই দেশের শাসক তার রাজ্যের ভেতরের অথবা বাইরের কোনো মুশরিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য চায়, যারা তার বিরোধিতা করছে, তাহলে তারা কি তার পক্ষে যুদ্ধ করবে?
তিনি বললেন: আমি মালিককে মুশরিকদের দেশে অবস্থানরত বন্দিদের সম্পর্কে বলতে শুনেছি। সেখানকার শাসক তাদের কাছে তার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহায্য চায় এবং তাদের মুসলমানদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা থাকে।
মালিক বলেছেন: আমি মনে করি না, তাদের এ উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা উচিত। এ ধরনের উদ্দেশ্যে তাদের নিজেদের রক্তপাত করা বৈধ নয়। মালিক আরও বলেছেন: মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করা হয় তাদের শিরক থেকে ইসলামে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের এক কুফরি অবস্থা থেকে অন্য কুফরি অবস্থায় নিয়ে যাওয়া এবং সেই উদ্দেশ্যে নিজেদের রক্তপাত করা উচিত নয়। কোনো মুসলমানের এ উদ্দেশ্যে নিজের রক্তপাত করা উচিত নয়।
ইমাম মালিকের বক্তব্যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে ধারণা প্রকাশ পেয়েছে, সেটি আধুনিক ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক সমমর্যাদার নীতির সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। তাঁর ভাষায় মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য হলো তাদের শিরক থেকে ইসলামে নিয়ে আসা। এখানে মানুষের স্বাধীন বিশ্বাস, নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণকে যুদ্ধের বৈধ উদ্দেশ্য নির্ধারণের কেন্দ্র করা হয়নি; বরং ইসলাম গ্রহণের লক্ষ্যকে যুদ্ধের গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অমুসলিমদের মধ্যে এক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থেকে অন্য কর্তৃত্বে পরিবর্তন ঘটানোর জন্য যুদ্ধ অগ্রহণযোগ্য, কিন্তু শিরক থেকে ইসলামে প্রবেশ করানোর উদ্দেশ্যকে যুদ্ধের বৈধ ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। ফলে ধর্মীয় পরিচয় যুদ্ধের ন্যায়সংগততার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। মানুষের বিশ্বাস পরিবর্তন করাকে সামরিক শক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করা ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নীতিকে সমর্থন করে।
এখানে অমুসলিমদের প্রতি ধর্মীয় বিদ্বেষ কেবল ব্যক্তিগত অপছন্দের বিষয় নয়; সেটি যুদ্ধ, আনুগত্য ও সহযোগিতার বিধান নির্ধারণকারী একটি আইনগত ধারণা। একজন অমুসলিম শাসকের অধীনে মুসলমানরা বসবাস করলেও তাঁর রাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তা রক্ষাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। কারণ সেই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামের পরিবর্তে অমুসলিম কর্তৃত্ব টিকে থাকবে। একই সঙ্গে মুসলিম বন্দিদের সম্ভাব্য মুক্তির প্রশ্নেও যুদ্ধের উদ্দেশ্যকে ধর্মীয়ভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে বাস্তব মানুষের নিরাপত্তা, পারস্পরিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক সহযোগিতার ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য প্রাধান্য পাচ্ছে। এই ধরনের বিধান সমাজে এমন এক মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যেখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে সহযোগিতা করার আগে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় এবং সেই সহযোগিতার ফলে কোন ধর্মের কর্তৃত্ব লাভবান হবে, তা বিচার করা হয়। এটি নাগরিক সমতা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে শক্তিশালী করে।
ধ্রুপদি ফিকহের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সমকালীন প্রয়োগ
এই বিধানগুলো কেবল প্রাচীন গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। ইসলামওয়েবের ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ২৪১০৪২ নম্বর ফতোয়ায় একজন মুসলমানের অমুসলিম রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং সেই রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার শপথ গ্রহণের বিধান জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ইসলামওয়েব এ ধরনের সেনাবাহিনীতে যোগদানকে অবৈধ ঘোষণা করে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, অমুসলিম রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কুফরের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত হয়, অথচ মুসলমান যুদ্ধ করে আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য। এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে সারাখসির আল-মাবসুত, আশ-শায়বানির আস-সিয়ার আল-কাবির এবং ইমাম মালিকের আল-মুদাওয়ানা থেকে উপরোক্ত বিধানগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে। অর্থাৎ একবিংশ শতাব্দীর একটি ইসলামি ফতোয়াতেও অমুসলিম রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে কুফরের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে সেই রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় মুসলমানের অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। [7]
এই ফতোয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুতর। একজন মুসলমান কোনো অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করতে পারেন, সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারেন, তার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন এবং একই রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করতে পারেন। অথচ আলোচ্য ফতোয়া অনুযায়ী সেই রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তার প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার করা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়িত্বকে এখানে ধর্মীয় আনুগত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের সম্মিলিত নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে আলাদা ধর্মীয় দায়িত্ব তৈরি হওয়ার ফলে সমনাগরিকত্বের ধারণা দুর্বল হয়। একই ভূখণ্ডের বাসিন্দারা যে রাজনৈতিক সমাজের সদস্য, সেই সমাজের যৌথ নিরাপত্তার প্রতি তাঁদের দায়িত্ব ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পৃথক হয়ে যায়। এ ধরনের ফতোয়া ধর্মীয় বিভাজনকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিসর থেকে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করে।
সারাখসি, আশ-শায়বানি, মালিক এবং সমকালীন ইসলামওয়েবের এসব বক্তব্যে একটি ধারাবাহিক আদর্শিক অবস্থান প্রকাশিত হয়েছে: মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামরিক দায়িত্ব নির্ধারণে তাদের ধর্মীয় পরিচয় এবং ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যকে প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করা। অমুসলিমদের উভয় পক্ষকে ‘শয়তানের দল’ বলা, তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষাকে শিরকের শাসন প্রতিষ্ঠা হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তাদের রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা—এসব বিধান মানুষে মানুষে ধর্মীয় বিভাজনকে বৈধতা দেয়। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের প্রতি নেতিবাচক সামষ্টিক পরিচয় আরোপ করলে ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র, কাজ ও নৈতিক অবস্থান গৌণ হয়ে পড়ে। এর ফলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বৈরিতা তৈরি ও স্থায়ী হওয়ার আদর্শিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই ধরনের ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের সর্বজনীন সমমর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক সংহতি এবং বিপন্ন মানুষের প্রতি বিশ্বাসনিরপেক্ষ দায়িত্বের নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সম্প্রীতির বুলি বনাম বাস্তবতা: সমকালীন ওয়াজ ও আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থায় যখন বহুত্ববাদ (Pluralism) এবং অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থানকে শ্রেষ্ঠ সামাজিক আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন অনেক আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদ ও প্রচারক ইউরোপ কিংবা আমেরিকা সফরের সময় দাবি করেন যে, ইসলাম নাকি সব ধর্মের মানুষের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ব এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর জোর দেয়। তারা কোরআনের কিছু খণ্ডিত আয়াত উদ্ধৃত করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ইসলাম একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু যখন আমরা রক্ষণশীল আলেমদের বক্তব্য এবং ধ্রুপদী শাস্ত্রীয় বিধানগুলো বিশ্লেষণ করি, তখন এই ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ দাবিটি কেবল একটি পলিশ করা বয়ান বা ‘অ্যাপোলজেটিক্স’ (Apologetics) হিসেবেই ধরা পড়ে। ইসলামি শরিয়াহর মূলে অমুসলিমদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা মূলত সহাবস্থানের চেয়ে ‘আদর্শিক দূরত্ব’ বজায় রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত এবং প্রভাবশালী আলেমদের ওয়াজ ও ফতোয়াগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা অমুসলিমদের সাথে ‘আন্তরিক বন্ধুত্ব’ (Internal Friendship) স্থাপনের ঘোর বিরোধী। তাদের মতে, একজন মুসলমান এবং একজন অমুসলিমের মধ্যে সামাজিক লেনদেন বা মানবিক আচরণ হয়তো জায়েজ হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের গহীন থেকে কোনো অমুসলিমকে বন্ধু বা আপন হিসেবে গ্রহণ করা ইসলামি আকিদার পরিপন্থী। ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ (Al-Wala’ wal-Bara’) নামক আকিদাগত তত্ত্বে এটি স্পষ্টভাবে শেখানো হয় যে, একজন মুমিনের ভালোবাসা ও আনুগত্য কেবল আল্লাহর অনুসারীদের জন্যই নিবেদিত থাকবে এবং যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে (কাফের), তাদের প্রতি থাকবে ঘৃণা বা দূরত্ব। এমনকি অনেক জননন্দিত বক্তা তাদের ওয়াজে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চরিত্রবান অমুসলিম বা কাফেরের চেয়ে একজন পাপী বা ‘চরিত্রহীন’ মুসলিমও অনেক বেশি মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠ।
এই মানসিকতার শেকড় মূলত ‘তাফসীরে মাযহারী’-র মতো গ্রন্থগুলোর সেই মাসআলায় প্রোথিত, যেখানে অমুসলিমদের একে অপরের বন্ধু হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং মুসলমানদের তাদের থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে [8]। এই শিক্ষাগুলোর প্রভাবে জনমানসে একটি সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি হয়, যেখানে ‘আমরা’ এবং ‘তারা’—এই দুই মেরুতে সমাজকে ভাগ করে দেওয়া হয়। আধুনিক মুমিনরা যখন অসাম্প্রদায়িকতার দাবি করেন, তখন তারা আসলে শাস্ত্রীয় বিধানের এই রূঢ় অংশগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখনই কোনো সংকটের সময় অমুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর বা তাদের জীবন রক্ষার প্রশ্ন আসে, তখন এই ‘ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ এবং ‘বন্ধুত্বের নিষেধাজ্ঞা’ মানবিক দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে, একজন অমুসলিমকে কেবল তার মানবিক পরিচয়ে দেখা বা তাকে বিপদে আশ্রয় দেওয়ার মতো সাধারণ নৈতিকতাও তখন ধর্মীয় আইনি বিতর্কের গোলকধাঁধায় আটকে যায়। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, ইসলামের তাত্ত্বিক কাঠামোতে অমুসলিমদের সাথে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও মানবিক সংহতির কোনো বাস্তবিক স্থান নেই বললেই চলে। আসুন বাংলাদেশের সবচাইতে প্রখ্যাত কয়েকজন আলেমের বক্তব্য শুনি,
এবারে আসুন আরও দুইটি ওয়াজ শুনে নিই,
অমুসলিমের জীবন রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ: ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানবজীবনের মূল্য নির্ধারণ
ইসলামি আইনশাস্ত্রে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্যের অন্যতম নির্মম প্রকাশ পাওয়া যায় বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য আত্মত্যাগের বিধানে। একজন মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি, তখন তাঁকে বাঁচানোর জন্য অন্য কেউ নিজের জীবন বিপন্ন করতে পারবেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে ধ্রুপদি ইসলামি ফিকহে উদ্ধারপ্রার্থীর ধর্মীয় পরিচয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য খাদ্য অন্যকে দিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করার ক্ষেত্রেও মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে সরাসরি পার্থক্য করা হয়েছে। এখানে একজন মানুষের জীবন কতটা মূল্যবান, তা কেবল তাঁর বিপন্নতা কিংবা বেঁচে থাকার প্রয়োজন দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না; তিনি মুসলমান কি না, সেটিও আত্মত্যাগের অনুমতি নির্ধারণের শর্ত হয়ে উঠছে। এই বৈষম্যমূলক বিধানের একটি স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় শাফেয়ি মাযহাবের প্রভাবশালী আইনজ্ঞ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে শারাফ আন-নববির রচনায়।
ইমাম নববির বিধান: মুসলমানের জন্য আত্মত্যাগ বৈধ, অমুসলিমের জন্য নয়
ইমাম নববি তাঁর আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব গ্রন্থের নবম খণ্ডে অনাহারে মৃত্যুর উপক্রম হওয়া মানুষের জন্য খাদ্য প্রদানের বিধান আলোচনা করেছেন। সেখানে এমন একটি পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে, যেখানে একজন ব্যক্তির কাছে জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সামান্য খাদ্য রয়েছে এবং অন্য একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি সেই খাদ্যের প্রয়োজন অনুভব করছেন। খাদ্যের মালিক নিজেও মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকলে অন্য ব্যক্তি জোর করে তাঁর খাদ্য নিয়ে যেতে পারবেন না। কিন্তু খাদ্যের মালিক যদি নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যকে খাদ্য দিতে চান, তাহলে সেই আত্মত্যাগের অনুমতি সম্পর্কে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক পার্থক্য করা হয়েছে। নববি শাফেয়ি আইনজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন, নিজের জীবন বিপন্ন করে একজন মুসলমানকে অগ্রাধিকার দেওয়া বৈধ; কিন্তু অমুসলিমকে একই অগ্রাধিকার দেওয়া বৈধ নয়। অমুসলিম ব্যক্তি যুদ্ধরত গোষ্ঠীর সদস্য হোন কিংবা মুসলিম শাসনের অধীন নিরাপত্তাপ্রাপ্ত জিম্মি হোন, উভয় ক্ষেত্রেই এই নিষেধ প্রযোজ্য। [9]
قالوا : وإنما يجوز أن يؤثر على نفسه مسلما ، فأما الكافر فلا يؤثره حربيا كان أو ذميا وكذا لا يؤثر على نفسه بهيمة ، والله أعلم .
বাংলা অনুবাদ: তাঁরা বলেছেন: নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুমতি কেবল মুসলমানের ক্ষেত্রেই রয়েছে। কিন্তু কাফেরকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না, সে যুদ্ধরত অমুসলিম হোক কিংবা জিম্মি। একইভাবে নিজের ওপর কোনো পশুকেও অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না। আল্লাহই ভালো জানেন।
এই বিধান মানুষের সমমর্যাদার নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। দুটি মানুষ একইভাবে অনাহারে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারেন। তাঁদের ক্ষুধা, যন্ত্রণা, মৃত্যুভয় এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো মৌলিক পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। অথচ আলোচ্য বিধানে একজন মুসলমানের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে খাদ্য ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি রয়েছে, কিন্তু একজন অমুসলিমের জন্য তা নিষিদ্ধ। এখানে আত্মত্যাগের নৈতিক মূল্য নির্ধারণে বিপন্ন মানুষের মানবিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একজন মুসলমানের জীবন রক্ষার জন্য যে আত্মত্যাগকে প্রশংসনীয় বলা হচ্ছে, একই আত্মত্যাগ একজন অমুসলিমের জন্য করা হলে তা অনুমোদন পাচ্ছে না। এই পার্থক্যের কোনো মানবিক ভিত্তি নেই। এটি সরাসরি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিপন্ন মানুষের মধ্যে বৈষম্য।
নববির বিধানটির আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অমুসলিমদের মধ্যেও তিনি যুদ্ধরত ব্যক্তি এবং নিরাপত্তাপ্রাপ্ত জিম্মির মধ্যে এই আত্মত্যাগের প্রশ্নে কোনো পার্থক্য করেননি। জিম্মি ব্যক্তি মুসলিম শাসনের অধীনে বসবাসকারী একজন সুরক্ষাপ্রাপ্ত অমুসলিম। তিনি যুদ্ধরত শত্রু না হলেও তাঁকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে প্রয়োজনীয় খাদ্য ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে এই নির্দিষ্ট বিধানে অমুসলিমের প্রতি আত্মত্যাগের নিষেধাজ্ঞা শুধু যুদ্ধরত শত্রুর পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে না; তাঁর অমুসলিম পরিচয়ই নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি। একজন অমুসলিম প্রতিবেশী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা দীর্ঘদিনের সহবাসী মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি হলেও তাঁর জন্য আত্মত্যাগের প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয়ের এই বাধা বহাল থাকে। এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সংহতির পরিবর্তে ধর্মীয় শ্রেণিবিভাগকে আইনি মর্যাদা দেয়।
রাওদাতুত তালিবিন: জীবনরক্ষার সম্পদ বণ্টনেও ধর্মীয় বৈষম্য
ইমাম নববি তাঁর আরেকটি প্রভাবশালী গ্রন্থ রাওদাতুত তালিবিন ওয়া উমদাতুল মুফতিন-এর তৃতীয় খণ্ডেও একই বিধান সংরক্ষণ করেছেন। গ্রন্থটির খাদ্যসংক্রান্ত আলোচনায় বিপন্ন ব্যক্তিকে খাদ্য দেওয়ার বিভিন্ন পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজের কাছে রেখে অন্যের জীবন রক্ষার বিষয়, আত্মত্যাগের অনুমতি এবং খাদ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা পৃথকভাবে নির্ধারিত হয়েছে। একটি বিশেষ বিধানে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত মানুষকে বাঁচানোর জন্য সম্পদ ব্যয় করা যেমন আবশ্যক, তেমনি সম্মানিত প্রাণীর জীবন রক্ষার জন্যও সম্পদ ব্যয়ের বিধান রয়েছে। এরপর যুদ্ধরত অমুসলিম, ধর্মত্যাগী ব্যক্তি এবং হিংস্র কুকুরের ক্ষেত্রে সেই বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করা হয়েছে। মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বকে এভাবে ধর্মীয় ও আইনগত শ্রেণিতে বিভক্ত করার ফলে কোনো ব্যক্তি বিপন্ন হলেও তাঁর পরিচয়ের কারণে সাহায্যের বাধ্যবাধকতা থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। [10]
كما يجب بذل المال لإبقاء الآدمي المعصوم ، يجب بذله لإبقاء البهيمة المحترمة ، وإن كان ملكا للغير . ولا يجب البذل للحربي ، والمرتد ، والكلب العقور .
বাংলা অনুবাদ: যেমন নিরাপত্তাপ্রাপ্ত মানুষের জীবন রক্ষার জন্য সম্পদ ব্যয় করা আবশ্যক, তেমনি সম্মানিত প্রাণীর জীবন রক্ষার জন্যও সম্পদ ব্যয় করা আবশ্যক, যদিও সেটি অন্যের মালিকানাধীন হয়। কিন্তু যুদ্ধরত অমুসলিম, ধর্মত্যাগী ব্যক্তি এবং হিংস্র কুকুরের জন্য সম্পদ ব্যয় করা আবশ্যক নয়।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণের সময় তাঁর ধর্মীয় ও আইনগত পরিচয়কে কেন্দ্রীয় মানদণ্ড করা হয়েছে। একজন মানুষকে কেবল ধর্মত্যাগী কিংবা যুদ্ধরত অমুসলিম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার ফলে তাঁর জীবন রক্ষার জন্য সম্পদ ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করা হচ্ছে। একই আলোচনায় প্রাণীর জীবন রক্ষার বাধ্যবাধকতা স্বীকার করার পরে নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীকে সেই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে। এই বিধান একটি সর্বজনীন মানবিক দায়িত্বকে ধর্মীয় ও আইনগত অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। মানুষের দুর্দশা, জীবনহানির আশঙ্কা এবং জীবন রক্ষার বাস্তব প্রয়োজনের পরিবর্তে তাঁর বিশ্বাসগত অবস্থান ও আইনগত শ্রেণিবিভাগের ভিত্তিতে দায়িত্ব নির্ধারণ করা মানবিক সমমর্যাদার নীতির পরিপন্থী।
সমকালীন ইসলামকিউএর ফতোয়া: অমুসলিমের জন্য আত্মত্যাগের অনুমতি নেই
ধ্রুপদি ফিকহের এই বৈষম্যমূলক বিধান সমকালীন ইসলামি ফতোয়াতেও সরাসরি পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর ইসলামকিউএ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২৮৯৯২৪ নম্বর ফতোয়ায় একজন প্রশ্নকারী জানতে চান, কোনো অমুসলিমকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় যদি একজন মুসলমানের নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া হয়, তাহলে সেই মুসলমানের জন্য অমুসলিম ব্যক্তিকে বাঁচানো বৈধ হবে কি না। প্রশ্নটি সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষায় আত্মত্যাগের বৈধতা সম্পর্কে। উত্তরে প্রথমে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারের সাধারণ বাধ্যবাধকতা আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এমন পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে, যেখানে অন্যকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে উদ্ধারকারীর নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা প্রবল। ফতোয়ায় নিজের মৃত্যু ঘটিয়ে অন্যকে উদ্ধার করা সাধারণভাবে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। কিন্তু একই আলোচনায় ইবনুল কাইয়িমের নির্বাচিত ব্যতিক্রমী মত উল্লেখ করে সেই অনুমতিকে উদ্ধারপ্রার্থীর মুসলিম পরিচয়ের শর্তে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিজের জীবন উৎসর্গের অনুমতির যে ব্যতিক্রম স্বীকৃত হয়েছে, সেটিও অমুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য করা হয়নি। [11]
أنه لا يجوز للمسلم أن ينقذ أحدًا ويهلك نفسه ، وعلى القول بجواز ذلك – وهو اختيار ابن القيم- فإنه يقيد بما إذا كان المنقَذ مسلمًا .
বাংলা অনুবাদ: কোনো ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন ধ্বংস করা মুসলমানের জন্য বৈধ নয়। আর যে মত অনুসারে এমন আত্মত্যাগ বৈধ—যেটি ইবনুল কাইয়িমের নির্বাচিত মত—সেই অনুমতিও উদ্ধারপ্রার্থী মুসলমান হওয়ার শর্তে সীমাবদ্ধ।
এই ফতোয়ায় ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। প্রশ্নটি ছিল একজন অমুসলিমের জীবন বাঁচানোর জন্য আত্মত্যাগ করা যায় কি না। জবাবে যে ব্যতিক্রমী অনুমতির কথা বলা হয়েছে, তা কেবল মুসলিম উদ্ধারপ্রার্থীর জন্য সীমাবদ্ধ। ফলে একজন মুসলমান নিজের জীবন বিসর্জনের মাধ্যমে অন্য একজন মুসলমানকে বাঁচানোর অনুমতি পেতে পারেন, কিন্তু সেই একই আত্মত্যাগের অনুমতি একজন অমুসলিমের জন্য দেওয়া হয়নি। এখানে দুটি মানুষের বিপন্নতার মাত্রা কিংবা উদ্ধারের প্রয়োজন একই হলেও তাদের ধর্মীয় পরিচয় অনুসারে আত্মত্যাগের বৈধতা বদলে যাচ্ছে। মানুষের জীবনের মূল্য সমান হলে উদ্ধারপ্রার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস আত্মত্যাগের নৈতিক বৈধতার নির্ধারক হতে পারে না। অথচ এই ফতোয়া সেই বৈষম্যকেই ধর্মীয় আইনের ভাষায় বহাল রেখেছে।
ফতোয়াটির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, কাকে জীবনরক্ষার বাধ্যতামূলক সুরক্ষা দেওয়া হবে, সেই শ্রেণিবিভাগ। সেখানে মুসলিম, জিম্মি, মুআহাদ ও মুস্তামানকে সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধরত অমুসলিম, ধর্মত্যাগী এবং নির্দিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য ব্যক্তিদের সেই শ্রেণির বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে একজন মানুষকে উদ্ধার করার ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা তাঁর বিপন্নতার বাস্তব অবস্থার পাশাপাশি তাঁর আইনগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ওপরও নির্ভর করছে। আধুনিক মানবাধিকার ধারণায় জীবন রক্ষার মৌলিক অধিকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের সঙ্গে বিলুপ্ত হয় না। কিন্তু আলোচ্য ফিকহি কাঠামোয় ধর্মত্যাগের মতো বিশ্বাসগত পরিবর্তনও ব্যক্তির নিরাপত্তার মর্যাদা হারানোর কারণ হতে পারে। ধর্মীয় আনুগত্যকে মানবজীবনের সুরক্ষার শর্তে পরিণত করার এই ব্যবস্থা বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও মানুষের সমমর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত সৃষ্টি করে।
ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক আত্মত্যাগের বিধান কীভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে প্রতিষ্ঠা করে
ইমাম নববি এবং সমকালীন ইসলামকিউএর উল্লিখিত বিধানগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন নীতি পাওয়া যায়: মানুষের জন্য আত্মত্যাগের অনুমতি ও জীবন রক্ষার বিশেষ দায়িত্ব নির্ধারণে ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই নীতির সবচেয়ে বড় নৈতিক সমস্যা হলো, এটি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং আত্মত্যাগের মতো মৌলিক মানবিক গুণকে ধর্মীয় গোষ্ঠীগত আনুগত্যের অধীন করে। বিপন্ন মানুষ একজন মুসলমান হলে তাঁর জন্য নিজের জীবন বিসর্জনের অনুমতি একটি ফিকহি মত অনুযায়ী স্বীকৃত; কিন্তু তিনি অমুসলিম হলে সেই অনুমতি প্রত্যাখ্যাত। একইভাবে জীবন রক্ষার জন্য সম্পদ ব্যয়ের বাধ্যবাধকতাও ব্যক্তির ধর্মীয় ও আইনগত শ্রেণিবিভাগের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয়। এই ধরনের বিধান মানুষকে মানুষের পরিচয়ে নয়, বরং আগে মুসলমান, কাফের, জিম্মি, হারবি কিংবা মুরতাদ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে শেখায়।
সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কেবল সরাসরি কাউকে ঘৃণা করতে বলার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় না। কোনো জনগোষ্ঠীকে অন্যদের তুলনায় কম নৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়া, তাদের জন্য আত্মত্যাগের অনুমতি সীমিত করা এবং তাদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল করে তোলাও বৈষম্য ও বিদ্বেষের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণ করে। একজন অমুসলিম যখন জানবেন যে তাঁর মুসলিম প্রতিবেশীর ধর্মীয় আইন অনুসারে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে একজন মুসলমানকে বাঁচানোর অনুমতি থাকতে পারে, কিন্তু তাঁকে বাঁচানোর জন্য সেই একই আত্মত্যাগ বৈধ নয়, তখন এই ধর্মীয় বিধান পারস্পরিক আস্থা ও সমমর্যাদার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করার বাস্তব কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখানে অমুসলিম ব্যক্তির চরিত্র, নৈতিকতা, মানবিক গুণ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মানুষের জীবন রক্ষার নৈতিক মূল্য কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। অনাহারে মৃত্যুপথযাত্রী একটি শিশু, পানিতে ডুবে যাওয়া একজন মানুষ কিংবা সহিংসতার মুখে বিপন্ন কোনো পরিবার—তাঁদের বাঁচার প্রয়োজন ধর্মীয় পরিচয় অনুসারে কমবেশি হয় না। অথচ আলোচ্য বিধানগুলোতে আত্মত্যাগ ও সুরক্ষার প্রশ্নে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈষম্যকে পবিত্র আইন হিসেবে উপস্থাপন করলে মানুষে মানুষে সমমর্যাদার পরিবর্তে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ এবং পরধর্মাবলম্বীদের প্রতি দূরত্ব ও অবিশ্বাসকে আদর্শিক বৈধতা দেওয়া হয়। ফলে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সর্বজনীন মানবিক সংহতি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে মানুষকে পৃথক নৈতিক শ্রেণিতে বিভক্ত করার প্রবণতা শক্তিশালী হয়। মানবিকতার মৌলিক নীতি হলো বিপন্ন মানুষকে তাঁর মানুষ হওয়ার কারণেই মূল্য দেওয়া। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে সেই মূল্য এবং তাঁর জন্য আত্মত্যাগের অনুমতি পৃথক করে দেওয়া সরাসরি বৈষম্যমূলক।
বিশ্বাসের মানদণ্ডে মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের বিচার
ইসলামি আইনশাস্ত্র ও সমকালীন রক্ষণশীল ওয়াজগুলোর একটি প্রধান স্তম্ভ হলো ‘বিশ্বাসগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষের পরম মর্যাদা তার কর্ম, চরিত্র বা মানবিক গুণের ওপর নির্ভর করে না, বরং তার ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে। এই শ্রেষ্ঠত্ববাদের সবচাইতে বিতর্কিত এবং প্রকট প্রকাশ ঘটে যখন দাবি করা হয় যে, “পৃথিবীর সবচাইতে নিকৃষ্ট চরিত্রবান মুসলমানও সবচাইতে ভালো চরিত্রবান কাফের বা অমুসলিমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” এই ধারণাটি কেবল একটি বিমূর্ত ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে অমুসলিমদের প্রতি মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। যখন একজন অমুসলিমকে জন্মগতভাবে বা বিশ্বাসগতভাবে ‘নিকৃষ্ট’ বা ‘অভিশপ্ত’ হিসেবে দেখা হয়, তখন তার জীবন রক্ষার গুরুত্বও ধর্মীয় বিধানের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে।
এই ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদের সবচেয়ে নির্মম প্রকাশ ঘটে যখন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য আত্মত্যাগ কিংবা সামরিক প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণের বৈধতা তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাফসীরে মাযহারী ও আল-মাবসুতের বিধানে অমুসলিমদের পারস্পরিক যুদ্ধে তাদের প্রতিরক্ষায় নিজের জীবন বিপন্ন করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ সেই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামের পরিবর্তে অমুসলিমদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে ইমাম নববির আলোচিত বিধানে নিজের জীবন বিপন্ন করে প্রয়োজনীয় খাদ্য অন্যকে দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে সরাসরি বৈষম্য করা হয়েছে। এমনকি নিরাপত্তাপ্রাপ্ত জিম্মি অমুসলিমও এই আত্মত্যাগের অনুমতি থেকে বাদ পড়েছেন। অর্থাৎ অমুসলিম ব্যক্তি নিরপরাধ, শান্তিপ্রিয় কিংবা বিশ্বস্ত হলেও তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিজের জীবন বিপন্ন করে তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নিষেধের ভিত্তি হতে পারে। এই বৈষম্যের নৈতিক সমস্যা হলো, বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষার মূল্যকে তাঁর মানুষ হওয়ার পরিচয়ের পরিবর্তে ধর্মীয় আনুগত্যের মানদণ্ডে নির্ধারণ করা।
মানবিক মর্যাদা ও জীবন রক্ষার অধিকার ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। একজন মুসলমান এবং একজন অমুসলিমের জীবন সমানভাবে মূল্যবান; তাঁদের ক্ষুধা, যন্ত্রণা, মৃত্যুভয় এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পরিবর্তিত হয় না। অথচ আলোচ্য ফিকহি বিধানগুলোতে মানুষের নিরাপত্তা, আত্মত্যাগ এবং সহযোগিতার প্রশ্নে মুসলিম, জিম্মি, মুআহাদ, মুস্তামান ও হারবির মতো পৃথক আইনগত শ্রেণি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অমুসলিমদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব রক্ষার যুদ্ধকে শিরকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং অমুসলিম ব্যক্তির জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে খাদ্য ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি অস্বীকার করা ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক অসম নৈতিক অগ্রাধিকারের প্রত্যক্ষ উদাহরণ। এ ধরনের শিক্ষা মানুষকে ব্যক্তিগত চরিত্র ও বাস্তব আচরণের ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবর্তে ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে বিচার করতে উৎসাহিত করে। এর ফলে সাম্প্রদায়িক দূরত্ব, অবিশ্বাস ও বৈষম্য ধর্মীয় আইনের সমর্থন লাভ করে।
সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের ব্যাখ্যায় অমুসলিমদের প্রতি শত্রুতা ও ধর্মীয় বিভাজন
অমুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর ধর্মীয় বিধিনিষেধ কেবল মধ্যযুগের ফিকহবিদদের উদ্ভাবিত ধারণা নয়। কোরআনের একাধিক আয়াত এবং সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যায় এই বিভাজনের ভিত্তি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অমুসলিমদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপনের নিষেধাজ্ঞা, অমুসলিমদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষের নির্দেশ এবং মুসলমানদের পারস্পরিক আনুগত্যকে সামাজিক স্থিতিশীলতার শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষণীয়। এই শিক্ষাগুলোতে একজন মানুষের নৈতিকতা, সততা, ব্যক্তিগত চরিত্র কিংবা অন্যের প্রতি তাঁর আচরণের পরিবর্তে ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্পর্ক নির্ধারণের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করা হয়েছে। এর ফলে মুসলিম ও অমুসলিমের সম্পর্ককে মানবিক সমমর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে তোলার পরিবর্তে ধর্মীয় আনুগত্য ও বিচ্ছেদের কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছে।
কোরআনে অবিশ্বাসীদের প্রতি স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষের আদর্শ
সূরা মুমতাহিনার চতুর্থ আয়াতে ইবরাহিম এবং তাঁর অনুসারীদের আচরণকে মুসলমানদের জন্য উত্তম আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ইবরাহিম ও তাঁর অনুসারীরা নিজেদের জনগোষ্ঠীর প্রতি ঘোষণা করেন যে, তারা সেই জনগোষ্ঠী এবং আল্লাহ ছাড়া তাদের উপাস্যদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন। এরপর তাদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয় এবং সেই শত্রুতা অব্যাহত থাকার শর্ত হিসেবে একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকে নির্ধারণ করা হয়। এখানে বিরোধের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মানুষদের কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ, সহিংসতা কিংবা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের উল্লেখ নেই। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনাপদ্ধতির বিরোধই শত্রুতা ও বিদ্বেষের ঘোষিত কারণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই আচরণকে কোরআন মুসলমানদের জন্য অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। [12]
وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ
বাংলা অনুবাদ: আর আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরস্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশিত হয়েছে, যতক্ষণ না তোমরা একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো।
এই বক্তব্যের নৈতিক সমস্যা অত্যন্ত স্পষ্ট। একজন মানুষ কেবল ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করেন অথবা একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করেন না—এই কারণে তাঁর প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘোষণা করা হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসকে শত্রুতা অবসানের শর্তে পরিণত করার অর্থ হলো, ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের স্বাভাবিক ভিত্তি হিসেবে পারস্পরিক সম্মানের পরিবর্তে ধর্মীয় বিরোধ প্রতিষ্ঠা করা। এখানে বিদ্বেষ কোনো নির্দিষ্ট অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া নয়; বিশ্বাসগত পার্থক্য থেকেই তার উৎপত্তি। যে ব্যক্তি নিজের ধর্ম পরিবর্তন করবেন না, তাঁর প্রতি বিদ্বেষ অব্যাহত রাখার আদর্শ এই বক্তব্যে উপস্থিত। মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতার সঙ্গে এমন শর্তযুক্ত ভালোবাসা ও শত্রুতা সরাসরি সাংঘর্ষিক। একজন মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে তাঁর প্রতি শত্রুতা পোষণের যথেষ্ট কারণ হিসেবে গ্রহণ করা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের একটি সুস্পষ্ট আদর্শিক ভিত্তি।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুফাসসির জামাখশারি তাঁর আল-কাশশাফ গ্রন্থে শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণ আরও স্পষ্ট করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইবরাহিম ও তাঁর অনুসারীরা নিজেদের জনগোষ্ঠীর সামনে প্রকাশ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা প্রদর্শন করেছিলেন। এই শত্রুতার একমাত্র কারণ ছিল আল্লাহর প্রতি তাদের অবিশ্বাস। যতক্ষণ সেই অবিশ্বাস বহাল থাকবে, ততক্ষণ শত্রুতাও বহাল থাকবে; তারা একমাত্র আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করলে শত্রুতা বন্ধুত্বে এবং বিদ্বেষ ভালোবাসায় পরিণত হবে। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনকেই আন্তরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। [13]
وصرحوا بأن سبب عداوتهم وبغضائهم ليس إلا كفرهم بالله، ومادام هذا السبب قائما كانت العداوة قائمة
বাংলা অনুবাদ: তাঁরা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণ একমাত্র আল্লাহর প্রতি ওই লোকদের অবিশ্বাস। আর যতক্ষণ এই কারণ বিদ্যমান থাকবে, ততক্ষণ শত্রুতাও বিদ্যমান থাকবে।
জামাখশারির এই ব্যাখ্যা শত্রুতা ও বিদ্বেষকে নিছক উপাসনাপদ্ধতির বিরোধ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখে না। তিনি স্পষ্টভাবে মানুষের প্রতি শত্রুতার কারণ হিসেবে তাদের অবিশ্বাসকে চিহ্নিত করেছেন। একজন মানুষ সৎ, ন্যায়পরায়ণ, পরোপকারী কিংবা শান্তিপ্রিয় হতে পারেন; কিন্তু তাঁর অবিশ্বাস বহাল থাকলে আলোচ্য ধর্মীয় আদর্শ অনুযায়ী শত্রুতার কারণও বহাল থাকে। বিপরীতে সেই ব্যক্তি ইসলামি একেশ্বরবাদ গ্রহণ করলে তাঁর প্রতি শত্রুতা ভালোবাসায় পরিণত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই ধারণায় মানুষের নৈতিক চরিত্রের পরিবর্তে বিশ্বাসগত আনুগত্যই ভালোবাসা ও বিদ্বেষের প্রধান নিয়ামক। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঘৃণাকে আদর্শিক মর্যাদা দেওয়ার ফলে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি বৈরিতা কেবল ব্যক্তিগত কুসংস্কার থাকে না; তা ধর্মীয়ভাবে সমর্থিত আচরণে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়।
ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত ব্যাখ্যা: অমুসলিমদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কের নিষেধ
কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতে মুসলমানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন মুমিনদের পরিবর্তে কাফেরদের অভিভাবক বা অন্তরঙ্গ সহযোগী হিসেবে গ্রহণ না করে। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবি ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়। তাবারি তাঁর জামিউল বায়ান গ্রন্থে এবং ইবনে আবি হাতিম তাঁর তাফসীরে এই বক্তব্য সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে অমুসলিমদের সঙ্গে আন্তরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এবং মুসলমানদের পরিবর্তে তাদের অন্তরঙ্গ সহযোগী হিসেবে গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। অমুসলিমদের ক্ষমতাগত প্রাধান্যের পরিস্থিতিতে বাইরে থেকে সৌজন্য প্রদর্শনের অনুমতির কথাও রয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃত আনুগত্য এবং বাহ্যিক আচরণের মধ্যে পৃথক অবস্থান গ্রহণের একটি ধর্মীয় কাঠামো এই ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়। [14]
نهى الله سبحانه المؤمنين أن يلاطفوا الكفار، ويتخذونهم وليجة من دون المؤمنين إلا أن يكون الكفار عليهم ظاهرين
বাংলা অনুবাদ: আল্লাহ মুমিনদের কাফেরদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ অন্তরঙ্গতা স্থাপন এবং মুমিনদের পরিবর্তে তাদের অন্তরঙ্গ সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন; তবে কাফেররা তাদের ওপর ক্ষমতাশালী হলে ব্যতিক্রম রয়েছে।
এই বর্ণনায় অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তার ভিত্তি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাস্তব চরিত্র নয়, তাঁর ধর্মীয় পরিচয়। একজন অমুসলিম বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হলেও তাঁকে মুসলমানদের পরিবর্তে অন্তরঙ্গ সহযোগী হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক আস্থা ও আন্তরিকতার একটি স্বাভাবিক সম্পর্কও ধর্মীয় আনুগত্যের পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। মানুষের ব্যক্তিগত সততা ও বিশ্বস্ততার পরিবর্তে তাঁর বিশ্বাসগত পরিচয়কে সম্পর্ক নির্ধারণের ভিত্তি করা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, মুসলমানরা অমুসলিমদের ক্ষমতার অধীনে থাকলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে মুখে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু অন্তরে তাদের প্রতি শত্রুতা বজায় রাখতে পারেন। তাঁর আলোচনায় বাহ্যিক আনুগত্য প্রদর্শন এবং অন্তর্গত বৈরিতাকে পৃথক করা হয়েছে। এর ফলে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এমন এক সম্পর্কব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রকাশ্য সৌজন্য ও আন্তরিক অনুভূতি পরস্পরের বিপরীত হতে পারে। ধর্মীয় বৈরিতা অন্তরে বহাল রেখে সামাজিক সৌহার্দ্য প্রদর্শনের এই নীতি পারস্পরিক আস্থা ও আন্তরিক সম্পর্কের ভিত্তিকে দুর্বল করে। কোনো সমাজে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে বসবাস করলেও যদি ধর্মীয় শিক্ষা তাদের অন্তরে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে উৎসাহিত করে, তাহলে দৃশ্যমান সহাবস্থান প্রকৃত সামাজিক সংহতির নিশ্চয়তা দেয় না। [15]
فَتُظْهِرُوا لَهُمُ الْوِلَايَةَ بِأَلْسِنَتِكُمْ، وَتُضْمِرُوا لَهُمُ الْعَدَاوَةَ
বাংলা অনুবাদ: তখন তোমরা মুখে তাদের প্রতি বন্ধুত্ব ও আনুগত্য প্রকাশ করবে, কিন্তু অন্তরে তাদের প্রতি শত্রুতা গোপন রাখবে।
সাহাবিদের নামে সংরক্ষিত ঘটনা: ইহুদিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা পরিত্যাগের নির্দেশ
একই আয়াতের অবতরণের কারণ সম্পর্কে ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত আরেকটি বিবরণে মদিনার মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। তাবারি ও ইবনে আবি হাতিমের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে, কাব ইবনে আশরাফ, ইবনে আবি হুকাইক এবং কায়েস ইবনে জায়েদের সঙ্গে কয়েকজন আনসারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বর্ণনাটিতে দাবি করা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট ইহুদি ব্যক্তিরা মুসলমানদের নিজেদের ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতে চেয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে রিফাআ ইবনে মুনযির, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর এবং সাদ ইবনে খাইসামা তাঁদের সেই ইহুদি ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা পরিত্যাগ করতে বলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মুসলমানরা সেই সম্পর্ক বজায় রাখেন। এরপর অমুসলিমদের অন্তরঙ্গ সহযোগী হিসেবে গ্রহণ নিষিদ্ধকারী আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। [16]
اجْتَنِبُوا هَؤُلَاءِ الْيَهُودَ، وَاحْذَرُوا لُزُومَهُمْ وَمُبَاطَنَتَهُمْ لَا يَفْتِنُوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ
বাংলা অনুবাদ: এই ইহুদিদের এড়িয়ে চলো এবং তাদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থেকে সতর্ক থাকো, যাতে তারা তোমাদের ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।
এই বর্ণনাটি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সামাজিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। এখানে কয়েকজন মুসলমানের সঙ্গে ইহুদিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ধর্মীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধর্মান্তরিত করার কথিত প্রচেষ্টা এই ঘটনার বিশেষ প্রেক্ষাপট হলেও ঘটনাটিকে পরবর্তী তাফসীরকাররা মুসলমানদের অমুসলিমদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞার ব্যাখ্যায় ব্যবহার করেছেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্পর্কের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বৃহত্তর ধর্মীয় আনুগত্যের বিধানের অংশ হয়ে উঠেছে। এই ধরনের শিক্ষায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে সহজেই বিশ্বাস ও আনুগত্য হারানোর আশঙ্কা হিসেবে দেখা হয়। এর সামাজিক পরিণতি হলো, পারস্পরিক পরিচয় ও আস্থা বৃদ্ধির পরিবর্তে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সন্দেহ ও দূরত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
তাবেয়ি কাতাদার ব্যাখ্যা: মুসলিম ও মুশরিকের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
তাবেয়ি কাতাদা ইবনে দিআমা সূরা আনফালের ৭৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় ধর্মীয় আনুগত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। তাবারির তাফসীরে সংরক্ষিত বর্ণনা অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি মুসলমান ও মুশরিক—উভয় পক্ষের মধ্যে অবস্থান করে যে পক্ষ বিজয়ী হবে, তার সঙ্গে থাকার মনোভাব পোষণ করতেন। কাতাদার ব্যাখ্যায় এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে মুসলমান ও মুশরিকের অবস্থান পৃথক করার ধারণা প্রকাশিত হয়েছে; এমনকি উভয়ের আগুন পরস্পরের দৃষ্টিসীমায় না থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জিজিয়া প্রদানকারী ব্যক্তির জন্য পৃথক অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে। এখানে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমারেখা যুক্ত করা হয়েছে। [17]
فَلَا تَرَاءَى نَارُ مُسْلِمٍ وَنَارُ مُشْرِكٍ، إِلَّا صَاحِبَ جِزْيَةٍ مُقِرٍّ بِالْخَرَاجِ
বাংলা অনুবাদ: মুসলমানের আগুন ও মুশরিকের আগুন যেন পরস্পরের দৃষ্টিসীমায় না থাকে; তবে জিজিয়া ও করের অধীন ব্যক্তির অবস্থান ব্যতিক্রম।
কাতাদার ব্যাখ্যায় ধর্মীয় বিভাজন শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বসবাস, আনুগত্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। মুসলমান ও মুশরিকের আগুন পরস্পরের দৃষ্টিসীমায় না থাকার ভাষাটি দুই সম্প্রদায়ের পৃথক অবস্থানের প্রতীকী প্রকাশ। জিজিয়া প্রদানকারী অমুসলিমের জন্য ব্যতিক্রম উল্লেখ করাও তাৎপর্যপূর্ণ; সেখানে অমুসলিমের অবস্থান একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও করসংক্রান্ত সম্পর্কের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। এই ধারণায় ধর্মীয় পরিচয় মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের মৌলিক সীমারেখা হয়ে উঠেছে। একই সমাজে মানুষে মানুষে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ধর্মীয় গোষ্ঠীর পৃথক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এমন শিক্ষা সমনাগরিকত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তাবে-তাবেয়ি ইবনে জুরাইজ: ধর্মীয় গোষ্ঠীগত সহযোগিতাই সামাজিক স্থিতির শর্ত
তাবে-তাবেয়ি আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আজিজ ইবনে জুরাইজও সূরা আনফালের ৭৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় মুসলমানদের পারস্পরিক ধর্মীয় সহযোগিতা ও সমর্থনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আয়াতটিতে সতর্ক করা হয়েছে, নির্ধারিত আনুগত্যের ব্যবস্থা অনুসরণ না করলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় বিপর্যয় দেখা দেবে। ইবনে জুরাইজ এই সতর্কতার ব্যাখ্যায় মুসলমানদের ধর্মের ভিত্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাহায্য করার কথা বলেছেন। অর্থাৎ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যদের পরস্পরকে সাহায্য করা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। একই আলোচনায় ইবনে ইসহাকের ব্যাখ্যায় মুসলমানদের পরিবর্তে অমুসলিমদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকে ফিতনা ও বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। [18]
إِلَّا تَعَاوَنُوا وَتَنَاصَرُوا فِي الدِّينِ
বাংলা অনুবাদ: যদি তোমরা ধর্মের ভিত্তিতে পরস্পর সহযোগিতা ও সাহায্য না করো।
ইবনে জুরাইজের বক্তব্যের সঙ্গে ইবনে ইসহাকের ব্যাখ্যা একত্র করলে ধর্মীয় আনুগত্যের সামাজিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। মুসলমানদের পারস্পরিক সহযোগিতা শুধু একটি গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সংহতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি; অমুসলিমদের পরিবর্তে মুসলমানদের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার নির্দেশের সঙ্গে সামাজিক বিপর্যয়ের সতর্কতাও যুক্ত হয়েছে। এই ধারণা ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতাকে গৌণ অবস্থানে ঠেলে দেয়। একটি সমাজে ন্যায়পরায়ণতা, সততা, বিপন্ন মানুষের সাহায্য এবং পারস্পরিক দায়িত্বের ভিত্তিতে সংহতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয়কে আনুগত্যের প্রধান মানদণ্ড করা হচ্ছে। এর ফলে একই ধর্মের মানুষের প্রতি পক্ষপাত এবং অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি দূরত্ব ধর্মীয় কর্তব্যের মর্যাদা লাভ করার সুযোগ পায়।
ধর্মীয় আনুগত্য থেকে সামাজিক বিদ্বেষ: বিভাজনের ধারাবাহিকতা
কোরআনের শত্রুতা ও বিদ্বেষের ঘোষণা, ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত অমুসলিমদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞা, সাহাবিদের নামে সংরক্ষিত ইহুদিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা পরিত্যাগের নির্দেশ, কাতাদার পৃথক আনুগত্যের ব্যাখ্যা এবং ইবনে জুরাইজের ধর্মভিত্তিক সহযোগিতার ধারণা একই বৃহত্তর আদর্শিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। সেখানে ধর্মীয় পরিচয় কেবল ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়; তা বন্ধুত্ব, আনুগত্য, পারস্পরিক সাহায্য এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব নির্ধারণের মানদণ্ড। অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্ককে সন্দেহের চোখে দেখা এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ আনুগত্যকে কর্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এই ধরনের শিক্ষার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো, ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি বিদ্বেষকে ব্যক্তিগত অন্যায়ের প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন কি না, অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করেছেন কি না কিংবা মানবিক দায়িত্ব পালন করছেন কি না—এসব বিচার ছাড়াই তাঁর বিশ্বাসগত পরিচয়কে শত্রুতা ও দূরত্বের কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। একই ধর্মের মানুষের প্রতি অগ্রাধিকার এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি সন্দেহের এই নীতি একটি সমাজকে ধর্মীয় গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে। দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাসকারী মানুষের মধ্যেও আন্তরিক সম্পর্কের পরিবর্তে ধর্মীয় আনুগত্যের প্রশ্নকে প্রধান করে তুলতে পারে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সামষ্টিক শত্রুতা প্রতিষ্ঠা করা হলে ব্যক্তির প্রকৃত নৈতিক চরিত্র ক্রমশ গুরুত্ব হারায় এবং সম্প্রদায়গত অবিশ্বাস স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতার নৈতিক ভিত্তি হওয়া উচিত তাঁর মানবিক পরিচয় ও বাস্তব আচরণ। একজন মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা কিংবা অন্যের জীবন রক্ষার যোগ্যতার স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ নয়। একইভাবে অবিশ্বাস বা ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসও তাঁর প্রতি ঘৃণা পোষণের কোনো ন্যায়সংগত কারণ হতে পারে না। ধর্মীয় পরিচয়কে শত্রুতা ও ভালোবাসার নির্ধারক করা হলে মানুষকে তাঁর ব্যক্তিগত গুণের ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবর্তে একটি সামষ্টিক পরিচয়ের কারণে বিচার করা হয়। কোরআন এবং ধ্রুপদি ইসলামি ব্যাখ্যায় সংরক্ষিত উল্লিখিত নির্দেশনাগুলোর নৈতিক সমস্যা এখানেই। ধর্মীয় আনুগত্যকে মানুষের সমমর্যাদা ও আন্তরিক সামাজিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করার এই আদর্শিক প্রবণতা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতাকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।
সাহাবিদের জীবনে অমুসলিমদের আশ্রয়, হত্যার উদ্যোগ এবং নিরাপত্তার ধর্মীয় সীমারেখা
অমুসলিমদের জীবন রক্ষা, আশ্রয় প্রদান এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিরাপত্তার অধিকার নির্ধারণের প্রশ্নে মুহাম্মদের সাহাবিদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংরক্ষিত হয়েছে। মক্কা বিজয়ের সময় মুহাম্মদের চাচাতো বোন এবং আলীর বোন উম্মে হানি কয়েকজন অমুসলিম ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই আশ্রয়ের বিরোধিতা করে আলী তাঁদের হত্যা করতে উদ্যত হন। উম্মে হানি বাধা দেন এবং পরে মুহাম্মদের কাছে গিয়ে আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আদায় করেন। ঘটনাটির মূল বিবরণ সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ ও সুনান তিরমিজিতে সংরক্ষিত হয়েছে। পরবর্তী ফিকহগ্রন্থগুলোতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম নারীর অমুসলিমকে নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা, মুসলিম শাসকের অনুমোদনের প্রয়োজন এবং নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হত্যা করার বৈধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই ঘটনাটির তাৎপর্য শুধু কয়েকজন মানুষের প্রাণরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে একজন মুসলিম নারীর দেওয়া আশ্রয়ের মুখোমুখি আরেকজন সাহাবির হত্যার উদ্যোগ এবং সেই বিরোধ নিষ্পত্তিতে ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রত্যক্ষ ভূমিকা পাওয়া যায়।
উম্মে হানির আশ্রয়প্রাপ্ত অমুসলিমকে হত্যার ঘোষণা দেন আলী
সহিহ বুখারির ৩১৭১ নম্বর হাদিসে উম্মে হানি নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি মুহাম্মদের কাছে গিয়ে দেখতে পান, মুহাম্মদ গোসল করছেন এবং ফাতিমা তাঁকে আড়াল করে রেখেছেন। গোসলের পরে মুহাম্মদ আট রাকাত নামাজ পড়েন। এরপর উম্মে হানি তাঁর ভাই আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। আলী এমন একজন ব্যক্তিকে হত্যা করার ঘোষণা দিয়েছেন, যাকে উম্মে হানি ইতিমধ্যে আশ্রয় দিয়েছেন। বর্ণনায় সেই ব্যক্তিকে ইবনে হুবাইরা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মুহাম্মদ তখন উম্মে হানির দেওয়া আশ্রয় অনুমোদন করেন। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, উম্মে হানি আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ একজন সাহাবির হত্যার ঘোষণা আরেকজন সাহাবিকে প্রতিরোধ করতে হচ্ছে। [19]
زَعَمَ ابْنُ أُمِّي عَلِيٌّ أَنَّهُ قَاتِلٌ رَجُلًا قَدْ أَجَرْتُهُ فُلَانُ بْنُ هُبَيْرَةَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ قَدْ أَجَرْنَا مَنْ أَجَرْتِ يَا أُمَّ هَانِئٍ
বাংলা অনুবাদ: আমার ভাই আলী এমন একজন ব্যক্তিকে হত্যা করার কথা বলেছেন, যাকে আমি আশ্রয় দিয়েছি—ইবনে হুবাইরা। তখন রাসুল বললেন, হে উম্মে হানি, তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, একজন অমুসলিম ব্যক্তি ইতিমধ্যে একজন মুসলিম নারীর আশ্রয়ে থাকার পরও তাঁর জীবন বিপন্ন হয়েছিল। আলী তাঁকে হত্যা করার ঘোষণা দিয়েছেন বলে উম্মে হানি অভিযোগ করেছেন। বর্ণনায় আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের বিচার, সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতের রায়ের উল্লেখ নেই। তাঁর অমুসলিম পরিচয় এবং মক্কা বিজয়ের সামরিক পরিস্থিতির মধ্যেই হত্যার উদ্যোগের বিবরণ এসেছে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করার জন্য উম্মে হানিকে মুহাম্মদের কাছে যেতে হয়েছে। একজন মানুষের প্রাণরক্ষার প্রশ্নে তাঁর নিজের নিরাপত্তার দাবির পরিবর্তে একজন মুসলিম নারীর আশ্রয় এবং মুহাম্মদের স্বীকৃতি এখানে কার্যকর হয়েছে।
এই ঘটনায় উম্মে হানির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আলীর হত্যার ঘোষণার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর আচরণে বিপন্ন মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রকাশ রয়েছে। বিপরীতে আলীর অবস্থানে সেই আশ্রয় অগ্রাহ্য করে হত্যার ঘোষণা পাওয়া যায়। একই ধর্মের অনুসারী এবং একই পরিবারের সদস্য হয়েও একজন মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নে তাঁদের আচরণ পরস্পরবিরোধী। এই বিরোধ প্রকাশ করে যে, অমুসলিমের জীবন রক্ষার প্রশ্নে প্রাথমিক মুসলিম সমাজেও কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তার সীমা নিয়ে সংঘাত ঘটেছে। আশ্রয়প্রার্থীর নিরাপত্তা তাঁর মানুষ হওয়ার পরিচয় থেকে স্বতঃসিদ্ধ অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; সেই নিরাপত্তা কার্যকর করার জন্য মুসলিম পক্ষের দেওয়া আশ্রয় ও তার স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়েছে।
আল-মাবসুতের বিস্তৃত বিবরণ: আলীকে ঘর থেকে বের করে আশ্রিতদের রক্ষা করেন উম্মে হানি
হানাফি আইনজ্ঞ শামসুল আইম্মা আস-সারাখসি তাঁর আল-মাবসুত গ্রন্থের দশম খণ্ডের ৬৯–৭০ পৃষ্ঠায় উম্মে হানির ঘটনাটির আরও বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, মক্কা বিজয়ের সময় উম্মে হানি তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্কযুক্ত দুজন মুশরিক পুরুষকে আশ্রয় দেন। আলী তাঁদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে ঘরে প্রবেশ করেন এবং উম্মে হানির কাছে জানতে চান, তিনি মুশরিকদের আশ্রয় দিচ্ছেন কি না। উম্মে হানি তখন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, আশ্রয়প্রাপ্ত দুজনকে হত্যা করতে হলে প্রথমে তাঁকেই হত্যা করতে হবে। এরপর তিনি আলীকে ঘর থেকে বের করে দেন এবং আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য দরজা বন্ধ করেন। পরে মুহাম্মদের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে, তাঁর ভাই তাঁর আশ্রিতদের হত্যা করতে চেয়েছেন। সারাখসির সংরক্ষিত বিবরণ অনুযায়ী মুহাম্মদ আলীর সেই উদ্যোগ অনুমোদন করেননি এবং উম্মে হানির দেওয়া নিরাপত্তা স্বীকার করেছেন। [20]
সারাখসির সংরক্ষিত এই বিস্তৃত বিবরণে উম্মে হানির প্রতিরোধের প্রকৃতি আরও স্পষ্ট। তিনি কেবল মৌখিকভাবে হত্যার বিরোধিতা করেননি; আশ্রিতদের বাঁচানোর জন্য আলীকে ঘর থেকে বের করে তাঁদের নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আশ্রিতদের হত্যা করার আগে তাঁকেই হত্যা করতে হবে। অর্থাৎ একজন অমুসলিমের জীবন রক্ষার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি গ্রহণের একটি প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত এখানে পাওয়া যায়। আলীর হত্যার উদ্যোগের মুখে উম্মে হানির এই প্রতিরোধ মানবিক দায়িত্বের এমন একটি অবস্থান প্রকাশ করে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিপন্ন ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করা হয়নি। ঘটনাটির পরবর্তী নিষ্পত্তিও তাৎপর্যপূর্ণ: মুহাম্মদ তাঁর আশ্রয় স্বীকার করেছেন, কিন্তু এই ঘটনা থেকে মানুষের ধর্মনির্বিশেষে সমান নিরাপত্তার কোনো সর্বজনীন আইন ঘোষিত হয়েছে—এমন বক্তব্য বর্ণনায় নেই। ঘটনাটি মূলত কে আশ্রয় দিতে পারেন এবং সেই আশ্রয় কার্যকর হবে কি না, তার ফিকহি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
জিম্মি অমুসলিমের নিরাপত্তা দেওয়ার অধিকার অস্বীকার: ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই অবিশ্বাসের উৎপত্তি
সারাখসির আল-মাবসুতের একই আলোচনায় ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্যের আরও সরাসরি একটি বিধান পাওয়া যায়। একজন মুসলিম নারী অমুসলিমদের নিরাপত্তা দিলে সেই নিরাপত্তা কার্যকর হতে পারে। কিন্তু একজন জিম্মি অমুসলিম যুদ্ধরত অমুসলিমদের নিরাপত্তা দিতে চাইলে তাঁর সেই ক্ষমতা স্বীকৃত নয়। সারাখসি এর কারণ হিসেবে সরাসরি ধর্মীয় বিশ্বাসের মিলকে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জিম্মি ব্যক্তি অন্য অমুসলিমদের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসে একমত হওয়ায় তাঁদের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করবেন বলে ধরে নেওয়া হয়। এই অনুমানের ভিত্তিতে তাঁকে নিরাপত্তা প্রদানের কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তির বাস্তব বিশ্বাসঘাতকতা, অসততা কিংবা ক্ষতিকর আচরণের প্রমাণ উপস্থিত করা হয়নি। অমুসলিম পরিচয় এবং অন্য অমুসলিমদের সঙ্গে বিশ্বাসগত মিল থেকেই তাঁর প্রতি অবিশ্বাসের কারণ তৈরি করা হয়েছে। [21]
فأما الذمي لم يوجد في حقه سبب ولاية الامان وهو موافق لهم في الاعتقاد فالظاهر أنه يميل إليهم وأنهم لا يخافونه
বাংলা অনুবাদ: কিন্তু জিম্মির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দেওয়ার কর্তৃত্বের ভিত্তি পাওয়া যায় না। কারণ সে তাদের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসে একমত। তাই বাহ্যত মনে করা হয়, সে তাদের প্রতি পক্ষপাতী হবে এবং তারা তাকে ভয় করবে না।
এই বক্তব্য ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক অবিশ্বাসের একটি প্রত্যক্ষ দলিল। একজন মুসলমানের ক্ষেত্রে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় তাঁকে অন্যের নিরাপত্তা প্রদানের আইনগত যোগ্যতা দিচ্ছে। কিন্তু একজন অমুসলিমের ক্ষেত্রে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ই সেই যোগ্যতা অস্বীকারের কারণ হচ্ছে। এখানে অমুসলিম ব্যক্তির সততা, বিশ্বস্ততা কিংবা ন্যায়পরায়ণতা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। ধরে নেওয়া হচ্ছে, অন্য অমুসলিমদের সঙ্গে বিশ্বাসগত মিল থাকায় তিনি তাঁদের প্রতি পক্ষপাতী হবেন। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয় থেকেই ব্যক্তির সম্ভাব্য আচরণ সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই ধরনের অনুমান ধর্মীয় বৈষম্যের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য: ব্যক্তির নিজের আচরণের পরিবর্তে তাঁর সম্প্রদায়ের পরিচয়কে বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড করা।
এই বিধানের সামাজিক পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর। একজন জিম্মি অমুসলিম দীর্ঘদিন মুসলিম শাসনের অধীনে বসবাস করতে পারেন, শাসকের সঙ্গে চুক্তি পালন করতে পারেন এবং বাস্তবে বিশ্বস্ত আচরণ করতে পারেন। কিন্তু সারাখসির যুক্তিতে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ই অন্য অমুসলিমদের প্রতি পক্ষপাতের অনুমান তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। এই নীতি একটি সমাজে অমুসলিমদের স্থায়ীভাবে সন্দেহের চোখে দেখার আদর্শিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে। মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয়কে আস্থার কারণ এবং অমুসলিমের ধর্মীয় পরিচয়কে সম্ভাব্য পক্ষপাতের কারণ হিসেবে গ্রহণ করা একই সমাজের মানুষের মধ্যে অসম মর্যাদা সৃষ্টি করে। এমন আইনগত শ্রেণিবিভাগ পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক সংহতির পরিবর্তে ধর্মীয় বিভাজনকে শক্তিশালী করে এবং অমুসলিমদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসকে স্বাভাবিক করে তোলে।
আয়েশা, ইমাম মালিক, সুফিয়ান সাওরি ও আওজায়ির বক্তব্য: নিরাপত্তা প্রদানের কর্তৃত্ব কার হাতে?
অমুসলিমদের নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষমতা নিয়ে পরবর্তী ইসলামি আইনজ্ঞদের বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায় ইবনে মুনযিরের আল-আওসাত ফিস সুনান ওয়াল ইজমা ওয়াল ইখতিলাফ গ্রন্থে। সেখানে আয়েশার নামে সংরক্ষিত বক্তব্যে মুসলিম নারীর দেওয়া নিরাপত্তাকে বৈধ বলা হয়েছে। ইবনে মুনযির ইমাম মালিক, সুফিয়ান সাওরি, আওজায়ি, শাফেয়ি, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক এবং হানাফি আইনজ্ঞদের অবস্থানও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের অধিকাংশের মতে মুসলিম নারীর দেওয়া নিরাপত্তা কার্যকর। এর ভিত্তিতে উম্মে হানি ও মুহাম্মদের কন্যা জয়নবের দেওয়া নিরাপত্তার ঘটনা উদ্ধৃত হয়েছে। তবে আবদুল মালিক ইবনে মাজিশুনের নামে পৃথক একটি মত সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা প্রদানের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব শাসক বা সামরিক নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। [22]
وممن قال بأن أمان المرأة جائز: مالك بن أنس، وسفيان الثوري، والأوزاعي، والشافعي، وأحمد، وإسحاق، وأصحاب الرأي.
বাংলা অনুবাদ: যাঁরা নারীর দেওয়া নিরাপত্তাকে বৈধ বলেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মালিক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সাওরি, আওজায়ি, শাফেয়ি, আহমদ, ইসহাক এবং আহলুর রায় বা হানাফি আইনজ্ঞরা।
এই বিধানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আশ্রয়প্রাপ্ত অমুসলিম ব্যক্তির নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্বের সমস্যায় পরিণত করা হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মুসলিম নারী নিরাপত্তা দিতে পারবেন কি না এবং তাঁর দেওয়া নিরাপত্তা শাসকের অনুমোদন ছাড়াই কার্যকর হবে কি না। অন্যদিকে আশ্রয়প্রার্থী মানুষটির নিজের জীবন রক্ষার অধিকার এই বিতর্কের নির্ধারক ভিত্তি হিসেবে উপস্থিত নয়। ফলে অমুসলিমের নিরাপত্তা এমন একটি ক্ষমতার ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়েছে, যেখানে কে নিরাপত্তা দেবেন এবং সেই ব্যক্তির ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদা কী, তা প্রধান প্রশ্ন।
ইবনে রুশদের ফিকহি আলোচনা: নারীর আশ্রয়ও শাসকের অনুমোদনের অধীন হতে পারে
মালিকি আইনজ্ঞ ইবনে রুশদ তাঁর বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ গ্রন্থে নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষমতা নিয়ে মাযহাবগুলোর মতভেদ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, শাসকের দেওয়া নিরাপত্তার বৈধতা স্বীকৃত। স্বাধীন মুসলিম পুরুষের দেওয়া নিরাপত্তাও অধিকাংশ আইনজ্ঞ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নারী ও দাসের দেওয়া নিরাপত্তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আইনজ্ঞ নারীর নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষমতা স্বীকার করলেও ইবনে মাজিশুন ও সাহনুনের মতে তা শাসকের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। একই আলোচনায় আবু হানিফার মতে যুদ্ধের অনুমতি নেই এমন দাসের দেওয়া নিরাপত্তা বৈধ নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অমুসলিমকে জীবনরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষমতা নির্ধারণে আশ্রয়দাতার ধর্ম, স্বাধীনতা, লিঙ্গ এবং সামরিক অবস্থানকে আইনগত মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [23]
واختلفوا في أمان العبد وأمان المرأة : فالجمهور على جوازه ، وكان ابن الماجشون وسحنون يقولان : أمان المرأة موقوف على إذن الإمام .
বাংলা অনুবাদ: দাস ও নারীর দেওয়া নিরাপত্তা সম্পর্কে তাঁদের মতভেদ হয়েছে। অধিকাংশ আইনজ্ঞ তা বৈধ বলেছেন। কিন্তু ইবনে মাজিশুন ও সাহনুন বলেছেন, নারীর দেওয়া নিরাপত্তা শাসকের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।
এই মতভেদের মধ্যেও একটি মৌলিক বিষয় অভিন্ন: অমুসলিমকে নিরাপত্তা দেওয়ার কার্যকারিতা নির্ধারিত হচ্ছে মুসলিম আইনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্বের ভিত্তিতে। আশ্রয়দাতা নারী হলে তাঁর ক্ষমতা কতটুকু, দাস হলে তাঁর সামরিক অবস্থান কী এবং শাসকের অনুমোদন প্রয়োজন কি না—এসব প্রশ্নে বিপন্ন মানুষের নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষ করে শাসকের অনুমোদন ছাড়া নারীর দেওয়া নিরাপত্তা অকার্যকর গণ্য করার মতটি একজন আশ্রয়প্রার্থীর জীবনকে শাসকের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল করে। মানুষের জীবন রক্ষার মতো মৌলিক বিষয়কে এভাবে মর্যাদা ও কর্তৃত্বের স্তরভিত্তিক ব্যবস্থার অধীন করা সর্বজনীন মানবাধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আশ্রয় ও নিরাপত্তার বিধানে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস
উম্মে হানির ঘটনা এবং পরবর্তী ফিকহি বিধানগুলো একত্রে মানুষের নিরাপত্তা নির্ধারণে ধর্মীয় পরিচয়ের গভীর প্রভাব প্রকাশ করে। উম্মে হানির আশ্রয়প্রাপ্ত অমুসলিমদের হত্যার উদ্যোগের বর্ণনা, সেই উদ্যোগ প্রতিরোধে তাঁর হস্তক্ষেপ, মুসলিম নারীর দেওয়া নিরাপত্তার ক্ষমতা নিয়ে পরবর্তী মতভেদ এবং জিম্মি অমুসলিমের নিরাপত্তা দেওয়ার কর্তৃত্ব অস্বীকারের বিধান—সবকিছুতেই ধর্মীয় ও আইনগত পরিচয় প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে সারাখসির বক্তব্যে অমুসলিমের ধর্মবিশ্বাসকে তাঁর সম্ভাব্য পক্ষপাতের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি কেবল আইনি ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ নয়; একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে সামষ্টিক নেতিবাচক অনুমান।
কোনো মানুষ বিশ্বস্ত কি না, তা তাঁর আচরণ, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব পালনের ইতিহাস দিয়ে নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার কারণেই তাঁকে অন্য সম্প্রদায়ের তুলনায় কম বিশ্বাসযোগ্য মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়। একইভাবে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করার প্রয়োজন তাঁর ধর্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা এবং পারস্পরিক আস্থার সীমা নির্ধারণ করা হলে সমাজে সমান মর্যাদার নাগরিক সম্পর্কের পরিবর্তে উচ্চতর ও নিম্নতর ধর্মীয় অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়। এক সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর আস্থা এবং অন্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রতি সহজাত সন্দেহের শিক্ষা পারস্পরিক বিদ্বেষের ভিত্তি নির্মাণ করে। ধর্মীয় আইন সেই সন্দেহকে স্বীকৃতি দিলে ব্যক্তিগত কুসংস্কার প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের রূপ নেয়।
একটি সমাজে অমুসলিমদের নিরাপত্তা যদি মুসলমানদের দেওয়া আশ্রয় এবং সেই আশ্রয়ের আইনগত স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়, অথচ অমুসলিমরা নিজেরা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সমতুল্য কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাহলে সেখানে পারস্পরিক সম্পর্ক সমমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় না। নিরাপত্তা প্রদানের অধিকার এক ধর্মীয় গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে। এই অসম ক্ষমতার সম্পর্ক ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধকে শক্তিশালী করে এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর অবিশ্বাসকে স্বাভাবিক করে তোলে। উম্মে হানির আশ্রয় দেওয়ার ঘটনা একজন বিপন্ন অমুসলিমের জীবন রক্ষার বাস্তব উদাহরণ; আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত ফিকহি শ্রেণিবিভাগ প্রকাশ করে, কীভাবে আশ্রয় ও নিরাপত্তার প্রশ্নও ধর্মীয় কর্তৃত্ব, মর্যাদা এবং অসম অধিকারের অধীন হয়ে উঠেছে। মানুষের জীবন রক্ষায় ধর্মীয় পরিচয়ের এই বৈষম্যমূলক ব্যবহার সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বিদ্বেষকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়।
উপসংহার: ধর্মীয় কাঠামোর ঊর্ধ্বে সর্বজনীন মানবিকতার আবশ্যকতা
ইসলামের ধ্রুপদি আইনশাস্ত্র, তাফসীর এবং সমকালীন ফতোয়ায় সংরক্ষিত বিধানগুলো মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্যের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রকাশ করে। আল-মাবসুত ও আস-সিয়ার আল-কাবিরে অমুসলিমদের পারস্পরিক যুদ্ধে তাদের প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণকে শিরকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইমাম মালিক অমুসলিমদের এক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থেকে অন্য কর্তৃত্বে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুসলমানদের রক্তপাত প্রত্যাখ্যান করেছেন, অথচ শিরক থেকে ইসলামে নিয়ে আসাকে যুদ্ধের গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইমাম নববির বিধানে নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যকে খাদ্য দেওয়ার অনুমতি মুসলমানের জন্য স্বীকৃত হলেও অমুসলিমের জন্য অস্বীকৃত। সারাখসি জিম্মি অমুসলিমের নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষমতা অস্বীকার করতে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় থেকে পক্ষপাতের অনুমান করেছেন। এসব বিধানে মানুষের ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিপন্ন অবস্থার পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয় ও ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই বৈষম্য আধুনিক মানবিক সমমর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক সংহতির নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ধর্মীয় বিদ্বেষ কেবল সরাসরি কাউকে হত্যা বা আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ‘শয়তানের দল’ হিসেবে চিহ্নিত করা, তাদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষকে বিশ্বাস পরিবর্তন না করা পর্যন্ত বহাল রাখার আদর্শ প্রচার করা, তাদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষাকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ করা এবং তাদের জন্য আত্মত্যাগের ক্ষেত্রে পৃথক বিধান প্রতিষ্ঠা করাও সাম্প্রদায়িক বৈরিতার শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি। এই শিক্ষাগুলো মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্রের পরিবর্তে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সম্পর্ক, সহযোগিতা ও আনুগত্যের নির্ধারক করে তোলে। ফলে একই সমাজে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে সমান মর্যাদার পরিবর্তে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ, পারস্পরিক সন্দেহ এবং অসম দায়িত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার মূল্য নির্ধারণে ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার এই নীতি সর্বজনীন মানবিকতার বিরোধী। কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস, অবিশ্বাস কিংবা ধর্মান্তরিত না হওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর প্রতি ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও জীবনরক্ষার দায়িত্ব অস্বীকার করার নৈতিক ভিত্তি হতে পারে না।
একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তুলতে হলে মানুষকে কেবল তার ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, বরং তার মানবিক পরিচয়ে মূল্যায়ন করা শিখতে হবে। জীবন রক্ষার মতো মৌলিক নৈতিক দায়িত্বকে যখন কোনো ধর্মীয় শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তখন তা আর ‘ধর্ম’ থাকে না, বরং তা এক প্রকার ‘বৌদ্ধিক ও নৈতিক জড়তা’য় পরিণত হয়। প্রকৃত সভ্যতার মানদণ্ড হওয়া উচিত বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সেখানে তার কপালে তিলক আছে নাকি মাথায় টুপি—তা হওয়া উচিত একেবারেই গৌণ। ধর্মের নামে অমানবিকতাকে বৈধতা দেওয়ার এই প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে এসে একটি যুক্তিবাদী ও সহমর্মী সমাজ গঠন করাই হোক বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্রঃ
- তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫ ↩︎
- আস-সারাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৯৭–৯৮, কিতাবুস সিয়ার ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২৪১০৪২: আল-মাবসুতের মূল বিধানের উদ্ধৃতি ↩︎
- আস-সারাখসি, শরহুস সিয়ার আল-কাবির, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৫১৫, পরিচ্ছেদ: অমুসলিমদের সঙ্গে মিলে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধ, মাসআলা ২৯৬৯; শামেলা ↩︎
- আস-সারাখসি, শরহুস সিয়ার আল-কাবির, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৫১৫, মাসআলা ২৯৭০; শামেলা ↩︎
- ইমাম মালিক, আল-মুদাওয়ানা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮, কিতাবুল জিহাদ, পরিচ্ছেদ: ফি নাদবিল ইমাম ইলাল কিতাল বিজুআল; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ২৪১০৪২, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪: অমুসলিম রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং প্রতিরক্ষার শপথ গ্রহণের বিধান ↩︎
- তাফসীরে মাযহারী, ৫ ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৫ ↩︎
- ইমাম নববি, আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৪৮, কিতাবুল আতইমা, বিপন্ন ব্যক্তির খাদ্যসংক্রান্ত বিধান; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইমাম নববি, রাওদাতুত তালিবিন ওয়া উমদাতুল মুফতিন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৮৮, কিতাবুল আতইমা, বাব: বিপন্ন অবস্থা; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইসলামকিউএ, ফতোয়া ২৮৯৯২৪, ১ ডিসেম্বর ২০১৮: অন্যকে ডুবে যাওয়া বা অনাহার থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার বিধান ↩︎
- আল-কোরআন, সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত ৪: ইবরাহিম ও তাঁর অনুসারীদের শত্রুতা ও বিদ্বেষের ঘোষণা ↩︎
- জামাখশারি, আল-কাশশাফ, খণ্ড ৬, সূরা মুমতাহিনা ৬০:৪-এর তাফসীর; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে আবি হাতিম, তাফসীরুল কোরআনিল আযীম, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬২৯, বর্ণনা ৩৩৭৫, সূরা আলে ইমরান ৩:২৮-এর ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইমাম তাবারি, জামিউল বায়ান, খণ্ড ৬, সূরা আলে ইমরান ৩:২৮-এর তাফসীর; ইসলামওয়েব ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, খণ্ড ৬, সূরা আলে ইমরান ৩:২৮, বর্ণনা ৬৮২৬; ইবনে আব্বাসের নামে সংরক্ষিত ঘটনা; ইসলামওয়েব ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, খণ্ড ১৪, সূরা আনফাল ৮:৭৩, বর্ণনা ১৬৩৪৬, কাতাদার ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
- তাবারি, জামিউল বায়ান, খণ্ড ১৪, সূরা আনফাল ৮:৭৩, বর্ণনা ১৬৩৫০–১৬৩৫১, ইবনে ইসহাক ও ইবনে জুরাইজের ব্যাখ্যা; ইসলামওয়েব ↩︎
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৩১৭১, কিতাবুল জিজিয়া ওয়াল মুওয়াদাআ, পরিচ্ছেদ: নারীদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় প্রদান ↩︎
- আস-সারাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৬৯–৭০, কিতাবুস সিয়ার, অমুসলিমদের নিরাপত্তা প্রদানের বিধান; ইসলামওয়েব ↩︎
- আস-সারাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৭০, জিম্মির নিরাপত্তা প্রদানের কর্তৃত্বসংক্রান্ত আলোচনা; মূল আরবি পাঠ ↩︎
- ইবনে মুনযির, আল-আওসাত ফিস সুনান ওয়াল ইজমা ওয়াল ইখতিলাফ, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৭৬–২৭৮, নিরাপত্তা প্রদানের বিধানসংক্রান্ত পরিচ্ছেদ; ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুকতাসিদ, খণ্ড ১, কিতাবুল জিহাদ, শত্রুর প্রতি কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ বৈধ, নিরাপত্তা প্রদানের কর্তৃত্বসংক্রান্ত আলোচনা; ইসলামওয়েব ↩︎

