জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলাম অনুসারে শিশুদের ভিন্নধর্ম শিক্ষা দেয়া হারাম

প্রকাশিত: এপ্রিল 27, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন49 মিনিট পড়া

ভূমিকা: মানব মনস্তত্ত্ব এবং বিশ্বাসের উত্তরাধিকার

একটি শিশু জন্মলগ্নে কোনো পূর্বনির্ধারিত আদর্শ, ধর্মবিশ্বাস বা দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। সমাজবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বের ভাষায়, নবজাতকের মস্তিষ্ক থাকে একটি ‘তাবুলা রাসা’ (Tabula Rasa) বা অলিখিত শ্লেটের মতো, যেখানে তার চারপাশের পরিবেশ প্রথম আঁচড় কাটতে শুরু করে। শিশুরা প্রাকৃতিকভাবেই তাদের অভিভাবক ও চারপাশের বয়োজ্যেষ্ঠদের অনুকরণ করে বড় হয়। এই সহজাত অনুকরণপ্রবৃত্তি এবং নির্ভরশীলতাকে ব্যবহার করে পরিবারগুলো তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামো শিশুর ওপর আরোপ করে। এখানে নৈতিক সংকটটি হলো—একটি শিশু যখন একটি নির্দিষ্ট ধর্মের পরিবারে বড় হয়, তখন সে সেই ধর্মের আচার-আচরণকে জীবনের ধ্রুব সত্য হিসেবে গ্রহণ করে, কিন্তু এটি তার নিজস্ব কোনো যৌক্তিক বিচার বা দীর্ঘ গবেষণার ফসল নয়। বরং এটি নিছক একটি ভৌগোলিক ও পারিবারিক ঘটনা- যার ওপর সেই ব্যক্তির সম্মতি, ইচ্ছা বা নিয়ন্ত্রণ নেই।

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন হলেও, তাদের চিন্তার জগতকে শৈশবেই একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। অভিভাবকগণ তাদের নিজেদের বিশ্বাসকে পরম সত্য মনে করে শিশুর মনস্তত্ত্বে এমনভাবে গেঁথে দেন যে, শিশুটির পক্ষে তার বাইরে গিয়ে চিন্তা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, একজন শিশু যখন তার পিতামাতার শেখানো ধর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করে বড় হয়, সে আসলে তার নিজের অজান্তেই একটি ‘বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার’ বহন করছে, যেখানে তার নিজস্ব বিচারবুদ্ধি বা প্রজ্ঞার প্রয়োগ করার কোনো সুযোগ শুরুতে থাকে না। এই প্রক্রিয়ায় শিশুর মানসিক বিকাশের চেয়ে ‘আদর্শিক ছাঁচে’ তাকে ঢালাই করাই মুখ্য হয়ে ওঠে।


ধর্মীয় বিশ্বাসের সামাজিক নির্মাণ: গবেষণা ও পারিবারিক উত্তরাধিকার

শিশুর সামনে কোন ধরনের গল্প সত্য হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব ও কল্পনা সম্পর্কে শিশুর বিচারও সম্পর্কিত। ক্যাথলিন করিভো, ইভা চেন ও পল হ্যারিসের গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজ ও আশপাশের এলাকার পাঁচ–ছয় বছর বয়সী শিশুদের ধর্মীয় পরিবেশ এবং গল্পের চরিত্র সম্পর্কে তাদের সিদ্ধান্ত তুলনা করা হয়। প্রথম গবেষণায় অংশ নেয় ৬৬ জন শিশু। গির্জায় যাওয়া অথবা ধর্মীয় বিদ্যালয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থাকা শিশুরা অলৌকিক ধর্মীয় গল্পের চরিত্রকে বাস্তব ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা দেখায়। পরিবারে গির্জায় যাওয়া ও বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা—দুটির অভিজ্ঞতাই অনুপস্থিত থাকা শিশুরা ওই চরিত্রগুলোকে কাল্পনিক বলে বিচার করার প্রবণতা দেখায়। খ্রিষ্টীয় ধর্মশিক্ষা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশভেদে পাওয়া এই পার্থক্য দেখায়, শিশুর কাছে কোন বিবরণ বাস্তব বলে গ্রহণযোগ্য হবে, তার সঙ্গে পরিচিত ধর্মীয় শিক্ষার সম্পর্ক আছে। গবেষণাটি ২০১৫ সালে Cognitive Science-এর ৩৯তম খণ্ডের দ্বিতীয় সংখ্যায়, ৩৫৩–৩৮২ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। [1]

এই ফলাফলের নৈতিক তাৎপর্য শিশুর ওপর শিক্ষকের দায়িত্বের জায়গায়। কোনো অলৌকিক বিবরণকে ছোটবেলা থেকেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে শেখানো হলে, সেই বিবরণ গ্রহণ করার অভ্যাস এবং বিবরণটি যাচাই করার ক্ষমতা দুটি পৃথক শিক্ষাগত ফল হয়ে দাঁড়ায়। শিশুর কাছে বড়দের নিশ্চয়তাই তখন প্রমাণের জায়গা দখল করতে পারে। যে শিশু একই বিষয়কে পারিবারিক আনুগত্য, বিদ্যালয়ের কর্তৃত্ব এবং ধর্মীয় পুরস্কার-শাস্তির ভাষায় বারবার শুনছে, তার পরবর্তী সম্মতিকে স্বাধীন যাচাইয়ের সমতুল্য ধরে নেওয়া যুক্তিগতভাবে অসঙ্গত। সম্মতি কীভাবে তৈরি হলো, কোন বিকল্প ব্যাখ্যা তার সামনে ছিল এবং আপত্তি করার কী সুযোগ সে পেয়েছিল—সেই প্রশ্নগুলো তার বিশ্বাসের স্বাধীনতা নির্ধারণে কেন্দ্রীয়।

ধর্মীয় বিশ্বাসের আন্তঃপ্রজন্ম মিল সম্পর্কে বাস্তব উপাত্তও আছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জরিপে ১৩–১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ৪৮ শতাংশ জানায়, জরিপে অংশ নেওয়া অভিভাবকের সঙ্গে তাদের সমস্ত ধর্মীয় বিশ্বাস এক। আরও ৪৩ শতাংশ জানায়, কিছু বিশ্বাস এক; ৮ শতাংশ বলে, তাদের বিশ্বাস বেশ ভিন্ন। এই সংখ্যাগুলো কিশোর-কিশোরীদের নিজের দেওয়া উত্তরের ভিত্তিতে তৈরি। পারিবারিক বিশ্বাসের উত্তরাধিকারের আলোচনায় এর গুরুত্ব হলো, ধর্মীয় বিশ্বাসের মিল বাস্তব সামাজিক উপাত্তে দৃশ্যমান। [2]

পরিবারে প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে সন্তানের বিশ্বাসের এই ঘনিষ্ঠতা সত্য নির্ধারণের মানদণ্ডকে আরও জরুরি করে তোলে। কোনো পরিবারের কাছে একটি ধর্ম সত্য, আর পাশের পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্ম সত্য। দুই পরিবারের শিশুই বড়দের কাছ থেকে একই নিশ্চয়তার ভাষা শিখতে পারে। সেই নিশ্চয়তার তীব্রতা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না; একই পদ্ধতিতে পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসও শক্ত হতে পারে। তাই ধর্মীয় পরিচয় কীভাবে সঞ্চারিত হলো এবং সেই পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত দাবিগুলোর পক্ষে কী প্রমাণ আছে, এই দুই প্রশ্ন আলাদাভাবে বিচার করা প্রয়োজন।


পারিবারিক কাঠামো ও সত্যের একপাক্ষিক নির্মাণ: শিশুর বৌদ্ধিক স্বাধীনতার সংকট

একটি শিশুর শৈশবে তার জগত মূলত তার পিতামাতা এবং নিকটাত্মীয়দের ঘিরেই আবর্তিত হয়। এই প্রাথমিক স্তরে শিশুর কাছে ‘সত্য’ এবং ‘মিথ্যা’ কোনো বিমূর্ত বা জটিল দার্শনিক ধারণা নয়, বরং তার অভিভাবকরা তাকে যা বলেন এবং যেভাবে জগতকে চিনতে শেখান, সেটিই তার কাছে ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ‘প্রাথমিক সামাজিকীকরণ’ (Primary Socialization) প্রক্রিয়ায় শিশু যা শেখে, তা তার অবচেতন মনে এমনভাবে গেঁথে যায় যে পরবর্তীতে তা থেকে মুক্ত হওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে।

একটি শিশু যখন কোনো মুসলিম পরিবারে বড় হয়, সে প্রাকৃতিকভাবেই তার পিতামাতার কাছ থেকে ইসলামের আকিদা ও নিয়মকানুন গ্রহণ করে। একইভাবে, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুটিও তার নিজ নিজ পারিবারিক পরিমণ্ডলের ধর্মবিশ্বাসকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে নেয়। এখানে সমস্যাটি হলো—শৈশবে একটি শিশুর পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মতত্ত্বের তুলনা করা, তথ্য যাচাই করা কিংবা নিজের যুক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব। তার অভিভাবকরা যদি তাকে শেখান যে তাদের ধর্মই একমাত্র সত্য এবং অন্য সব পথ ভ্রান্ত বা শয়তানের প্ররোচনা, তবে শিশুটি সেই একপাক্ষিক শিক্ষাকেই পরম জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করে।

এই প্রক্রিয়ায় শিশুর বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের কোনো ক্ষেত্র থাকে না। এটি মূলত একটি বৌদ্ধিক আধিপত্যবাদ, যেখানে শিশুর ওপর তার পূর্বপুরুষের বিশ্বাসকে জোরপূর্বক বা প্রথাগতভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। নৈতিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত সব ধরণের জীবনদর্শন ও বিশ্ববীক্ষা সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠভাবে জানা এবং বোঝার। একজন শিশু যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে এবং তার যৌক্তিক সক্ষমতা পূর্ণতা পাবে, তখন সে নিজের বিচারবুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রাখা উচিত। কিন্তু শৈশবেই যদি তাকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ছাঁচে আবদ্ধ করা হয় এবং স্বাধীনভাবে অন্য কোনো পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে। ফলে সে সত্যকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করার বদলে কেবল ঐতিহ্যের দাস হয়ে বড় হতে থাকে।


ফিতরাত ও পারিবারিক ধর্ম: হাদিস এবং গাজ্জালির পর্যবেক্ষণ

শিশুর ধর্মীয় পরিচয় গঠনে বাবা-মায়ের ভূমিকা সহিহ বুখারির একটি বর্ণনাতেও সরাসরি উপস্থিত। সেখানে শিশুর প্রাথমিক অবস্থাকে ফিতরাত বলা হয়েছে এবং তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলার কাজ বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ বর্ণনায় পশুশাবকের অক্ষত জন্মের উপমা এবং আবু হুরায়রার কোরআনের আয়াত পাঠও আছে। [3]

حَدَّثَنَا عَبْدَانُ ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ ، أَخْبَرَنَا يُونُسُ ، عَنِ الزُّهْرِيِّ ، أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلاَّ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ، كَمَا تُنْتَجُ الْبَهِيمَةُ بَهِيمَةً جَمْعَاءَ، هَلْ تُحِسُّونَ فِيهَا مِنْ جَدْعَاءَ ” . ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه {فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لاَ تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ}

বাংলা অনুবাদ: আবদান আমাদের বর্ণনা করেছেন; আবদুল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন; ইউনুস আমাদের জানিয়েছেন, যুহরি থেকে; তিনি বলেন, আবু সালামা ইবন আবদুর রহমান আমাকে জানিয়েছেন যে আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেছেন: আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবজাতকই ফিতরাতের ওপর জন্মায়। তারপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়। যেমন পশু সম্পূর্ণ অঙ্গবিশিষ্ট বাচ্চা প্রসব করে; তোমরা কি তাতে কোনো অঙ্গচ্ছেদ দেখতে পাও?’ এরপর আবু হুরায়রা (রাঃ) বলতেন: ‘আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম।’

এই বর্ণনায় মানুষের ধর্মীয় পরিচয় অর্জনের পারিবারিক প্রক্রিয়াটি প্রকাশিত। জন্মের পর নির্দিষ্ট ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে ওঠা ব্যক্তির পরিচয় তার সামনে থাকা পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাকেও গাজ্জালি একই পর্যবেক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর আল-মুনকিয মিন আদ-দালাল-এ খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিম শিশুর নিজ নিজ পারিবারিক ধর্মে বেড়ে ওঠা তাঁর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন জাগানোর কারণ হিসেবে এসেছে। তারপর তিনি বাবা-মা ও শিক্ষকের অনুকরণে অর্জিত আকিদার প্রকৃতি এবং নিশ্চিত জ্ঞানের মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন। [4]

وقد كان التعطش إلى درك حقائق الأمور دأبي وديني، من أول أمري، وريعان عمري، غريزة وفطرة من الله وضعها في جبلتي لا باختياري وحيلتي، وحتى انحلت عني رابطة التقليد، وانكسرت علي العقائد الموروثة على قرب عهد سن الصبا، إذ رأيت: صبيان النصارى لا يكون لهم نشوء إلا على التنصُر، وصبيان اليهود لا نشوء لهم إلا على التهود، وصبيان المسلمين لا نشوء لهم إلا على الإسلام. وسمعت الحديث المروي عن رسول الله صلى الله عليه وسلم حيث قال: ” كل مولودٍ يولدُ على الفطرةِ فأبواهُ يُهودانهِ، وينُصرانهِ، ويُمجِّسَانِهِ ” فتحرك باطني إلى طلب حقيقة الفطرة الأصلية، وحقيقة العقائد العارضة بتقليد الوالدين والأستاذين، والتمييز بين هذه التقليدات، وأوائلها تلقينات، وفي تمييز الحق منها عن الباطل اختلافات فقلت في نفسي: أولاً إنما مطلوبي العلم بحقائق الأمور، فلا بد من طلب حقيقة العلم ما هي؟ فظهر لي: أن العلم اليقيني هو الذي ينكشف فيه المعلوم انكشافاً لا يبقى معه ريب، ولا يفارقه إمكان الغلط والوهم، ولا يتسع القلب لتقدير ذلك، بل الأمان من الخطأ ينبغي أنا يكون مقارناً لليقين، مقارنة لو تحدى بإظهار بطلانه – مثلاً – من يقلب الحجر ذهباً والعصا ثعباناً، لم يروث ذلك شكاً وإنكاراً، فإني إذا علمت: أن العشرة أكثر من الثلاثة، فلو قال لي قائل: لا بل الثلاثة أكثر، بدليل أني أقلب هذه العصا ثعباناً، وقلبها، وشاهدت ذلك منه، لم أشك بسببه في معرفتي، ولم يحصل لي منه إلا التعجب من كيفية قدرته عليه! فأما الشك بسببه فيما علمته فلا ثم علمت أن كل ما لا أعلمه على هذا الوجه ولا أتيقنه هذا النوع من اليقين، فهو علم لا ثقة به ولا أمان معه، وكل علم لا أمان معه فليس بعلم يقيني.

বাংলা অনুবাদ: বস্তুর প্রকৃত সত্য জানার তৃষ্ণা আমার জীবনের শুরু ও যৌবনের প্রথম কাল থেকেই আমার অভ্যাস ও সাধনা ছিল। আল্লাহ আমার প্রকৃতিতে এই সহজাত বৈশিষ্ট্য স্থাপন করেছেন; নিজের পছন্দ বা কৌশলে তা তৈরি করিনি। শৈশব থেকে বেরিয়ে আসার কাছাকাছি সময়েই অনুকরণের বন্ধন আমার থেকে খুলে যায় এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিশ্বাসগুলো আমার কাছে ভেঙে পড়ে। কারণ আমি দেখেছি, খ্রিষ্টান শিশুরা খ্রিষ্টধর্মেই বেড়ে ওঠে, ইহুদি শিশুরা ইহুদিধর্মেই বেড়ে ওঠে এবং মুসলিম শিশুরা ইসলামেই বেড়ে ওঠে। আমি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) থেকে বর্ণিত এই হাদিস শুনেছি: ‘প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের ওপর জন্মায়; তারপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।’ তখন মূল ফিতরাতের প্রকৃতি এবং বাবা-মা ও শিক্ষকদের অনুকরণে পরে অর্জিত বিশ্বাসগুলোর প্রকৃতি অনুসন্ধানের তাগিদ আমার মধ্যে তৈরি হয়। এসব অনুকরণের মধ্যে পার্থক্য করার তাগিদও তৈরি হয়; যার শুরুতে থাকে তালকিন বা শেখানো বক্তব্য গ্রহণ, আর তার কোনটি সত্য ও কোনটি মিথ্যা, তা নির্ধারণে মতভেদ আছে। আমি নিজেকে বললাম: আমার উদ্দেশ্য যেহেতু বস্তুর প্রকৃত সত্য জানা, তাই প্রথমে জানতে হবে জ্ঞানের প্রকৃতি কী। আমার কাছে স্পষ্ট হলো, নিশ্চিত জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান, যাতে জ্ঞাত বিষয়টি এমনভাবে উন্মোচিত হয় যে কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট থাকে না, ভুল বা বিভ্রমের সম্ভাবনাও তার সঙ্গী হয় না এবং হৃদয়ে তার সম্ভাবনা কল্পনা করারও জায়গা থাকে না। বরং ভুল থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার এমন অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হওয়া উচিত যে, পাথরকে সোনা ও লাঠিকে সাপ বানাতে পারে এমন কেউ যদি তার ভুল প্রমাণের চ্যালেঞ্জও দেয়, তবু তাতে সন্দেহ বা অস্বীকৃতি তৈরি হবে না। যেমন আমি যদি জানি যে দশ তিনের চেয়ে বড়, আর কেউ আমাকে বলে, ‘না, তিনই বড়; তার প্রমাণ হলো আমি এই লাঠিকে সাপ বানাব,’ এবং সে তা করে ও আমি তা প্রত্যক্ষ করি, তবু তার কারণে নিজের জ্ঞানে সন্দেহ করব না। এতে কেবল তার এই ক্ষমতার ধরন দেখে বিস্ময় তৈরি হবে; আমি যা জানি, তাতে সন্দেহ তৈরি হবে না। এরপর বুঝলাম, যা এইভাবে জানি না এবং এই ধরনের নিশ্চয়তায় নিশ্চিত নই, তা বিশ্বাসযোগ্য ও নিরাপদ জ্ঞান নয়। যে জ্ঞানে নিরাপত্তা নেই, তা নিশ্চিত জ্ঞান নয়।

গাজ্জালি মুসলিম শিশুকেও একই সামাজিক নিয়মের মধ্যে রেখেছেন: পরিবারে যে ধর্ম আছে, সাধারণত সেই ধর্মেই তার বেড়ে ওঠা। মুসলিম পরিচয়ের উৎপত্তি সম্পর্কেও তাঁর আত্মবিবরণে পারিবারিক শিক্ষার প্রশ্ন আছে। বাবা-মা ও শিক্ষক বিশ্বাসের প্রথম উৎস হলে, জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্মকে নিজের স্বাধীন অনুসন্ধানের ফল হিসেবে দাবি করার আগে সেই উৎসের কর্তৃত্ব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই পারিবারিক পদ্ধতি খ্রিষ্টান শিশুকে খ্রিষ্টান এবং মুসলিম শিশুকে মুসলিম করে তুললে, পদ্ধতিটির উপস্থিতি একা কোনো একটি ধর্মকে সত্য প্রমাণের বিশেষ সুবিধা দেয় না।

গাজ্জালি নিশ্চিত জ্ঞানের উদাহরণে দশ ও তিনের তুলনা এনেছেন। লাঠি সাপে পরিণত করার প্রদর্শন দেখলেও সংখ্যাগত সত্য বদলে যাবে না—তাঁর বক্তব্যে প্রমাণের নিশ্চয়তা ও বিস্ময়কর ঘটনার প্রভাব আলাদা হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই পরীক্ষা প্রযোজ্য: অভিভাবকের মর্যাদা, শিক্ষকের আত্মবিশ্বাস অথবা শৈশবের গভীর আবেগ কোনো দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণের কাজ কতটা করছে? যে বিশ্বাস টিকে থাকার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য থেকে শিক্ষার্থীকে দূরে রাখে, সেই বিশ্বাসের স্থায়িত্ব প্রথমত তার শিক্ষাগত পরিবেশের ফল হিসেবে পরীক্ষা করতে হবে। সত্যের দাবি যাচাইয়ের প্রশ্নটি তার পরেও থেকে যায়।


গাজ্জালির শিক্ষাপদ্ধতি: মুখস্থ বিশ্বাস, অভ্যাস এবং সংশয়ের চিকিৎসা

গাজ্জালির ইহইয়া উলুমিদ্দিন-এর কিতাব কাওয়াইদ আল-আকাইদ-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে শিশুর বিশ্বাস গঠনের একটি সুস্পষ্ট পদ্ধতি দেওয়া হয়েছে। শুরুতে আকিদা মুখস্থ করানো, পরে তার অর্থ বোঝানো এবং কোরআন, হাদিস, ইবাদত ও সৎ ব্যক্তিদের সাহচর্যের মাধ্যমে সেই বিশ্বাস দৃঢ় করা—এই ক্রম তিনি নির্ধারণ করেছেন। বিপরীত বক্তব্যের প্রভাবে অনুকরণে পাওয়া বিশ্বাস বদলে যেতে পারে বলে তাকে স্থায়ী করার নির্দেশও আছে। নিচের ধারাবাহিক পরিচ্ছেদগুলোতে তালকিন, বিশ্বাসের স্থায়িত্ব, বিতর্ক থেকে শিশুর কান রক্ষা এবং পরবর্তী ধর্মীয় সাধনার সম্পর্ক একসঙ্গে এসেছে। [5]

اعلم أن ما ذكرناه في ترجمة العقيدة ينبغي أن يقدم إلى الصبي في أول نشوه ليحفظه حفظًا ثم لا يزال ينكشف له معناه في كبره شيئًا فشيئًا فابتداؤه الحفظ ثم الفهم ثم الاعتقاد والإيقان والتصديق به وذلك مما يحصل في الصبي بغير برهان فمن فضل الله سبحانه على قلب الإنسان أن شرحه في أول نشوه للإيمان من غير حاجة إلى حجة وبرهان وكيف ينكر ذلك وجميع عقائد العوام مباديها التلقين المجرد والتقليد المحض نعم يكون الاعتقاد الحاصل بمجرد التقليد غير خال عن نوع من الضعف في الابتداء على معنى أنه يقبل الإزالة بنقيضه لو ألقى إليه فلا بد من تقويته وإثباته في نفس الصبي والعامي حتى يترسخ ولا يتزلزل وليس الطريق في تقويته وإثباته إن يعلم صنعة الجدل والكلام بل يشتغل بتلاوة القرآن وتفسيره وقراءة الحديث ومعانيه ويشتغل بوظائف العبادات فلا يزال اعتقاده يزداد رسوخًا بما يقرع سمعه من أدلة القرآن وحججه وبما يرد عليه من شواهد الأحاديث وفوائدها وبما يسطع عليه من أنوار العبادات ووظائفها وبما يسري إليه من مشاهدة الصالحين ومجالستهم وسيماهم وسماعهم وهيآتهم في الخضوع لله عز وجل والخوف منه والاستكانة له فيكون أول التلقين كإلقاء بذر في الصدر وتكون هذه الأسباب كالسقي والتربية له حتى ينمو ذلك البذر يقوى ويرتفع شجرة طيبة راسخة أصلها ثابت وفرعها في السماء وينبغي أن يحرس سمعه من الجدل والكلام غاية الحراسة فإن ما يشوشه الجدل أكثر مما يمهده وما يفسده أكثر مما يصلحه بل تقويته بالجدل تضاهي ضرب الشجرة بالمدقة من الحديد رجاء تقويتها بأن تكثر أجزاؤها وربما يفتتها ذلك ويفسدها وهو الأغلب والمشاهدة تكفيك في هذا بيانًا فناهيك بالعيان برهانًا فقس عقيدة أهل الصلاح والتقى من عوام الناس بعقيدة المتكلمين والمجادلين فترى اعتقاد العامي في الثبات كالطود الشامخ لا تحركه الدواهي والصواعق وعقيدة المتكلم الحارس اعتقاده بتقسيمات الجدل كخيط مرسل في الهواء تفيئه الرياح مرة هكذا ومرة هكذا إلا من سمع منهم دليل الاعتقاد فتلقفه تقليدًا كما تلقف نفس الاعتقاد تقليدًا إذ لا فرق في التقليد بين تعليم الدليل أو تعلم المدلول فتلقين الدليل شيء والاستدلال بالنظر شيء آخر بعيد عنه ثم الصبي إذا وقع نشوه على هذه العقيدة إن اشتغل بكسب الدنيا لم ينفتح له غيرها ولكنه يسلم في الآخرة باعتقاد أهل الحق إذ لم يكلف الشرع أجلاف العرب أكثر من التصديق الجازم بظاهر هذه العقائد فأما البحث والتفتيش وتكلف نظم الأدلة فلم يكلفوه أصلًا وإن أراد أن يكون من سالكي طريق الآخرة وساعده التوفيق حتى اشتغل بالعمل ولازم التقوى ونهى النفس عن الهوى واشتغل بالرياضة والمجاهدة انفتحت له أبواب من الهداية تكشف عن حقائق هذه العقيدة بنور إلهي يقذف في قلبه بسبب المجاهدة تحقيقًا لوعده عز وجل إذ قال والذين جاهدوا فينا لنهدينهم سبلنا وإن الله لمع المحسنين وهو الجوهر النفيس الذي هو غاية إيمان الصديقين والمقربين وإليه الإشارة بالسر الذي وقر في صدر أبي بكر الصديق رضي الله عنه حيث فضل به الخلق وانكشاف ذلك السر بل تلك الأسرار له درجات بحسب درجات المجاهدة ودرجات الباطن في النظافة والطهارة عما سوى الله تعالى وفي الاستضاءة بنور اليقين وذلك كتفاوت الخلق في اسرار الطب والفقه وسائر العلوم إذ يختلف ذلك باختلاف الاجتهاد واختلاف الفطرة في الذكاء والفطنة وكما لا تنحصر تلك الدرجات فكذلك هذه

বাংলা অনুবাদ: জেনে রাখো, আকিদার যে বিবরণ আমরা দিয়েছি, শিশুর বেড়ে ওঠার শুরুতেই তা তার সামনে পেশ করা উচিত, যাতে সে তা ভালোভাবে মুখস্থ করে। তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে তার অর্থ তার কাছে উন্মোচিত হতে থাকবে। তার শুরু হবে মুখস্থ করার মাধ্যমে, এরপর বোঝা, তারপর বিশ্বাস, নিশ্চয়তা ও সত্য বলে গ্রহণ। শিশুর মধ্যে এসব প্রমাণ ছাড়াই অর্জিত হয়। মানুষের হৃদয়ের প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ হলো, তিনি তার বেড়ে ওঠার শুরুতেই যুক্তি ও প্রমাণের প্রয়োজন ছাড়াই ঈমানের জন্য তার হৃদয় উন্মুক্ত করে দেন। এটি কীভাবে অস্বীকার করা যায়, যখন সাধারণ মানুষের সমস্ত আকিদার সূচনা হয় নিছক তালকিন বা শেখানো বক্তব্য গ্রহণ এবং বিশুদ্ধ অনুকরণের মাধ্যমে? অবশ্য নিছক অনুকরণে অর্জিত বিশ্বাস শুরুতে একধরনের দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকে না। অর্থাৎ তার বিপরীত বক্তব্য সামনে পেশ করা হলে সেই বিশ্বাস অপসারিত হতে পারে। কাজেই শিশু ও সাধারণ মানুষের মনে সেটিকে শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত করা অপরিহার্য, যাতে তা গভীরভাবে প্রোথিত হয় এবং টলে না যায়। সেই বিশ্বাস শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত করার পথ তাকে বিতর্ক ও কালামশাস্ত্রের কৌশল শেখানো নয়; বরং তাকে কোরআন পাঠ ও তার ব্যাখ্যা এবং হাদিস ও তার অর্থ পাঠে নিয়োজিত করা। সে ইবাদতের কর্তব্যগুলোতেও নিয়োজিত থাকবে। এভাবে কোরআনের যেসব যুক্তি ও প্রমাণ তার কানে পৌঁছাবে, হাদিসের যেসব সাক্ষ্য ও উপকারিতা তার কাছে আসবে, ইবাদত ও তার কর্তব্যগুলো থেকে যেসব আলো তার ওপর উদ্ভাসিত হবে এবং সৎ মানুষদের দেখা, তাঁদের সাহচর্য, চেহারা, কথা ও আল্লাহর প্রতি বিনয়, ভয় ও আত্মসমর্পণের অবস্থাগুলো থেকে তার মধ্যে যা সঞ্চারিত হবে, সেসবের মাধ্যমে তার বিশ্বাস ক্রমেই দৃঢ় হতে থাকবে। প্রথম তালকিন হবে বুকে বীজ বপনের মতো; আর এসব উপায় হবে সেই বীজে পানি দেওয়া ও পরিচর্যার মতো। ফলে বীজটি বেড়ে উঠবে, শক্তিশালী হবে এবং একটি উত্তম, সুদৃঢ় বৃক্ষে পরিণত হবে, যার শিকড় স্থির এবং শাখা আকাশে। তার কানকে বিতর্ক ও কালাম থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করা উচিত। কারণ বিতর্ক যতটা স্থির করে, তার চেয়ে বেশি অস্থির করে; যতটা সংশোধন করে, তার চেয়ে বেশি নষ্ট করে। বিতর্ক দিয়ে বিশ্বাস শক্তিশালী করার চেষ্টা অনেকটা লোহার মুগুর দিয়ে গাছে আঘাত করার মতো—এই আশায় যে তার অংশ বেড়ে গিয়ে গাছটি শক্তিশালী হবে। অথচ তা গাছটিকে চূর্ণবিচূর্ণ ও নষ্ট করে দিতে পারে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটিই ঘটে। এই বিষয়ে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণই তোমার ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট; চোখে দেখা সাক্ষ্যই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। সাধারণ মানুষের মধ্যকার সৎ ও পরহেজগার ব্যক্তিদের বিশ্বাসের সঙ্গে কালামবিদ ও বিতার্কিকদের বিশ্বাস তুলনা করো। দেখবে, সাধারণ মানুষের বিশ্বাস স্থিরতার দিক দিয়ে উঁচু পর্বতের মতো, যাকে বিপর্যয় ও বজ্রপাতও নড়াতে পারে না। আর যে কালামবিদ বিতর্কের বিভিন্ন বিভাজন দিয়ে নিজের বিশ্বাস পাহারা দেয়, তার বিশ্বাস বাতাসে ঝুলন্ত সুতোর মতো—বাতাস তাকে একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে ঘোরায়। ব্যতিক্রম হলো তাঁদের মধ্যে সেই ব্যক্তি, যে বিশ্বাসের প্রমাণ শুনে তা অনুকরণের মাধ্যমেই গ্রহণ করেছে, যেমন বিশ্বাসটিকেও অনুকরণের মাধ্যমে গ্রহণ করেছিল। কারণ প্রমাণ শেখা আর প্রমাণিত বিষয় শেখার মধ্যে অনুকরণের দিক দিয়ে কোনো পার্থক্য নেই। কাউকে প্রমাণ মুখস্থ শেখানো এক বিষয়; নিজে বিচার করে যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তার থেকে বহু দূরের আরেক বিষয়। এরপর শিশু যদি এই আকিদার ওপর বেড়ে ওঠে এবং পার্থিব উপার্জনে ব্যস্ত হয়, তবে এর বাইরে তার জন্য আর কিছু উন্মোচিত হবে না। কিন্তু সত্যপন্থীদের আকিদা ধারণ করার কারণে সে আখিরাতে মুক্তি পাবে। কারণ শরিয়ত অমার্জিত আরবদের এই আকিদাগুলোর বাহ্যিক অর্থে দৃঢ় বিশ্বাসের চেয়ে বেশি কিছু করার দায়িত্ব দেয়নি। অনুসন্ধান, খুঁটিয়ে পরীক্ষা এবং যুক্তি সাজানোর কষ্ট তাদের ওপর আদৌ চাপানো হয়নি। আর সে যদি আখিরাতের পথের অভিযাত্রী হতে চায় এবং আল্লাহর সহায়তায় কাজে নিয়োজিত হয়, তাকওয়া অবলম্বন করে, প্রবৃত্তিকে তার খেয়াল থেকে নিবৃত্ত রাখে এবং আত্মশিক্ষা ও সাধনায় ব্যস্ত হয়, তবে তার জন্য হেদায়েতের এমন সব দরজা খুলে যাবে, যা এই আকিদার সত্যগুলো উন্মোচিত করবে। সাধনার কারণে তার হৃদয়ে নিক্ষিপ্ত ঐশী আলোর মাধ্যমে তা ঘটবে। এর দ্বারা মহান আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি সত্য হবে: ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথগুলো দেখাব; নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।’ এটি সেই মূল্যবান রত্ন, যা সিদ্দিক ও আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের ঈমানের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আবু বকর সিদ্দিকের বুকে যে গোপন বিষয় স্থির হয়েছিল এবং যার কারণে তিনি অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছিলেন, তার দ্বারাই এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়। সেই গোপন বিষয়—বরং গোপন বিষয়গুলোর—উন্মোচনের বিভিন্ন স্তর আছে। সাধনার মাত্রা, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে তার পবিত্রতা এবং নিশ্চয়তার আলোতে উদ্ভাসিত হওয়ার মাত্রা অনুসারে সেগুলো ভিন্ন হয়। এটি চিকিৎসা, ফিকহ ও অন্যান্য বিদ্যার গোপন বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের পার্থক্যের মতো; অধ্যবসায় এবং জন্মগত বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার ভিন্নতায় সেই পার্থক্য ঘটে। যেমন সেসব স্তর সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি এখানেও।

এই পদ্ধতিতে শিক্ষার প্রাথমিক লক্ষ্য আগে থেকেই নির্ধারিত আকিদাকে শিশুর মনে প্রতিষ্ঠা করা। শিশুর সামনে একাধিক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রেখে কোনটি প্রমাণে টেকে, সেই বিচার দিয়ে শিক্ষা শুরু হচ্ছে না। প্রথমে একটি সিদ্ধান্ত মুখস্থ করানো হচ্ছে, তারপর তার অর্থ ও সমর্থনকারী উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। গাজ্জালি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রমাণও মুখস্থভাবে গ্রহণ করা যায়; কাউকে প্রমাণ শিখিয়ে দেওয়া এবং তার নিজের বিচারবুদ্ধিতে অনুসন্ধান করা ভিন্ন কাজ। তাঁর নিজের এই পার্থক্য ব্যবহার করলেই বোঝা যায়, ধর্মীয় যুক্তির তালিকা মুখস্থ করতে পারা এবং স্বাধীন বিচারক্ষমতা অর্জন এক জিনিস নয়। শিশুটি নিজের বিশ্বাসের পক্ষে বহু বক্তব্য আবৃত্তি করলেও, সে বক্তব্যগুলো যাচাই করার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থাকতে পারে।

বিশ্বাসকে বীজ এবং একপাক্ষিক ধর্মীয় অনুশীলনকে পানি ও পরিচর্যার সঙ্গে তুলনা করার মধ্যে অভ্যাসের মাধ্যমে বিশ্বাস পুনরুৎপাদনের পদ্ধতি প্রকাশিত। একই সঙ্গে বিতর্ক থেকে কান পাহারা দেওয়ার নির্দেশ সেই পরিবেশের সীমানা নির্ধারণ করে। শিশুর সামনে কোন বক্তব্য বারবার আসবে এবং কোন বক্তব্য প্রবেশ করতে পারবে না, তা অভিভাবক ও শিক্ষক ঠিক করছেন। এর ফলে যে দৃঢ়তা তৈরি হয়, তার উৎসের মধ্যে নির্বাচিত তথ্যপ্রবাহ ও পুনরাবৃত্ত অনুশীলন রয়েছে। একটি বিশ্বাস গভীরভাবে স্থায়ী হয়েছে—এই তথ্য থেকে বিশ্বাসটির প্রতিটি দাবি সত্য, এমন সিদ্ধান্ত টানা প্রমাণের চেয়ে বেশি দাবি করা হবে। বিপরীত ধর্মীয় পরিবেশেও একই অভ্যাস ও পুনরাবৃত্তি প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বাসকে স্থায়ী করতে পারে।

একই অধ্যায়ের পরবর্তী পরিচ্ছেদে প্রশ্ন ও সংশয়ের মোকাবিলায় আরও নির্দিষ্ট নির্দেশ আছে। যেখানে মাযহাবগত মতভেদ কম, সেখানে সংক্ষিপ্ত আকিদা শেখানোতেই সীমাবদ্ধ থাকা, সংশয় দেখা দিলে প্রয়োজনমতো যুক্তি দেওয়া এবং প্রশ্ন আরও বাড়লে নির্ধারিত আকিদাগ্রন্থের পরবর্তী স্তরে যাওয়া—এই পদ্ধতি তিনি বলেছেন। শিশুর বুদ্ধিমত্তায় কোনো প্রশ্ন ধরা পড়া অথবা মনে সংশয় তৈরি হওয়ার অবস্থাকে বর্ণনা করতে তিনি ব্যাধি, রোগ ও চিকিৎসকের ভাষা ব্যবহার করেছেন। [6]

وأما في بلاد تقل فيها البدعة ولا تختلف فيها المذاهب فيقتصر فيها على ترجمة الاعتقاد الذي ذكرناه ولا يتعرض للأدلة ويتربص وقوع شبهة فإن وقعت ذكر بقدر الحاجة فإن كانت البدعة شائعة وكان يخاف على الصبيان أن يخدعوا فلا بأس أن يعلموا القدر الذي أودعناه كتاب الرسالة القدسية ليكون ذلك سببًا لدفع تأثير مجادلات المبتدعة إن وقعت إليهم وهذا مقدار مختصر وقد أودعناه هذا الكتاب لاختصاره فإن كان فيه ذكاء وتنبه بذكائه لموضع سؤال أو ثارت في نفسه شبهة فقد بدت العلة المحذورة وظهر الداء فلا بأس أن يرقى منه إلى القدر الذي ذكرناه في كتاب الاقتصاد في الاعتقاد وهو قدر خمسين ورقة وليس فيه خروج عن النظر في قواعد العقائد إلى غير ذلك من مباحث المتكلمين فإن اقنعه ذلك كف عنه وإن لم يقنعه ذلك فقد صارت العلة مزمنة والداء غالبًا والمرض ساريًا فليتلطف به الطبيب بقدر إمكانه وينتظر قضاء الله تعالى فيه إلى أن ينكشف له الحق بتنبيه من الله سبحانه أو يستمر على الشك والشبهة إلى ما قدر له فالقدر الذي يحويه ذلك الكتاب وجنسه من المصنفات هو الذي يرجى نفعه

বাংলা অনুবাদ: যেসব দেশে বিদআত কম এবং মাযহাবগুলোতে মতভেদ নেই, সেখানে আমাদের দেওয়া আকিদার বিবরণেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, প্রমাণের আলোচনায় প্রবেশ করতে হবে না; বরং সংশয় দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করতে হবে। সংশয় দেখা দিলে প্রয়োজনমতো প্রমাণ উল্লেখ করবে। বিদআত ব্যাপক হলে এবং শিশুরা প্রতারিত হতে পারে বলে আশঙ্কা থাকলে, আমাদের ‘আর-রিসালা আল-কুদসিয়্যা’য় রাখা পরিমাণটুকু তাদের শেখাতে অসুবিধা নেই, যাতে বিদআতিদের বিতর্ক তাদের কাছে পৌঁছালে তার প্রভাব ঠেকানো যায়। এটি সংক্ষিপ্ত পরিমাণ, এবং সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে আমরা তা এই গ্রন্থে রেখেছি। শিশুটি বুদ্ধিমান হলে এবং নিজের বুদ্ধির কারণে কোনো প্রশ্নের জায়গা ধরতে পারলে, অথবা তার মনে সংশয় জাগলে, আশঙ্কিত ব্যাধির প্রকাশ ঘটেছে এবং রোগ দেখা দিয়েছে। তখন তাকে আমাদের ‘আল-ইকতিসাদ ফিল-ইতিকাদ’ গ্রন্থে থাকা পরিমাণ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে অসুবিধা নেই। তা প্রায় পঞ্চাশ পত্রের পরিমাণ; সেখানে আকিদার মূলনীতির আলোচনা থেকে বেরিয়ে কালামবিদদের অন্য অনুসন্ধানে প্রবেশ করা হয়নি। এতে সন্তুষ্ট হলে সেখানেই থামবে। তাতেও সন্তুষ্ট না হলে ব্যাধি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, রোগ প্রবল হয়েছে এবং অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়েছে। তখন চিকিৎসক সামর্থ্য অনুযায়ী কোমলভাবে তার সঙ্গে আচরণ করবে এবং তার বিষয়ে আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষা করবে—যতক্ষণ না আল্লাহর কোনো সতর্কসংকেতে তার কাছে সত্য উন্মোচিত হয়, অথবা তার জন্য নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সে সন্দেহ ও সংশয়ের ওপর থেকে যায়। ওই গ্রন্থ এবং তার মতো রচনাগুলোয় থাকা পরিমাণ থেকেই উপকারের আশা করা যায়।

গাজ্জালি সংশয়কে ব্যাধি হিসেবে এবং আকিদার ব্যাখ্যায় অসন্তুষ্ট থেকে যাওয়াকে দীর্ঘস্থায়ী রোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক কি না, তার বিচারও একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গন্তব্যের অধীন। শিক্ষার্থী নির্ধারিত আকিদায় নিশ্চিত হলে চিকিৎসা সফল; নিশ্চিত না হলে রোগ দীর্ঘস্থায়ী। এই ব্যবস্থায় আকিদার দাবিটি ভুল হতে পারে—এমন সম্ভাবনা শিক্ষার স্বাভাবিক অনুসন্ধান হিসেবে জায়গা পায় না। শিক্ষার্থীর অসম্মতি ও সংশয়ই অসুস্থতার লক্ষণ হয়ে ওঠে। ফলে জিজ্ঞাসার অধিকার এবং গ্রহণযোগ্য উত্তরের সীমা, দুটোই ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে।

বৌদ্ধিক স্বাধীনতার প্রশ্ন এখানেই তীব্র হয়। কোনো শিশু প্রশ্ন করলে তার যুক্তি পরীক্ষা করার বদলে তাকে রোগগ্রস্ত অবস্থার মানুষ হিসেবে দেখলে শিক্ষকের সঙ্গে তার সম্পর্ক বদলে যায়। শিক্ষক তখন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যার মধ্য থেকে যথার্থ সিদ্ধান্ত খোঁজার সহযাত্রী হওয়ার বদলে পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসে তাকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালন করেন। কোন মাত্রায় যুক্তি শেখানো হবে, কখন থামানো হবে এবং সংশয় কতদূর গেলে রোগ দীর্ঘস্থায়ী বলা হবে—সবই সেই দায়িত্বের অংশ। ধর্মের পক্ষে যুক্তি জানার সুযোগ পেলেও ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করার যুক্তিসংগত সম্ভাবনাটি শিক্ষার অনুমোদিত ফল হিসেবে অনুপস্থিত থাকে।


শৈশবের ধর্মশিক্ষা: ইবন খালদুন ও ইবন কাইয়্যিম

ইবন খালদুন মুকাদ্দিমা-র ‘শিশুদের শিক্ষা এবং বিভিন্ন ইসলামি অঞ্চলে তার পদ্ধতির পার্থক্য’ পরিচ্ছেদে কোরআন শিক্ষাকে ঈমান ও আকিদা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। শৈশবের শিক্ষা বেশি স্থায়ী হয় এবং হৃদয়ে প্রথম প্রবেশ করা বিষয় পরবর্তী মানসিক অভ্যাসের ভিত্তি তৈরি করে—এটি তাঁর বর্ণনার কেন্দ্রীয় বক্তব্য। [7]

اعلم أن تعليم الولدان للقرآن شعار من شعائر الدين، أخذ به أهل الملة ودرجوا عليه في جميع أمصارهم، لما يسبق فيه إلى القلوب من رسوخ الإيمان وعقائده من آيات القرآن وبعض متون الأحاديث. وصار القرآن أصل التعليم الذي ينبني عليه ما يحصل بعده من الملكات. وسبب ذلك أن تعليم الصغر أشد رسوخاً وهو أصل لما بعده، لأن السابق الأول للقلوب كالأساس للملكات. وعلى حسب الأساس وأساليبه يكون حال ما ينبني عليه. واختلفت طرقهم في تعليم القرآن للولدان، باختلافهم باعتبار ما ينشأ عن ذلك التعليم من الملكات.

বাংলা অনুবাদ: জেনে রাখো, শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেওয়া ধর্মের নিদর্শনগুলোর একটি। এই ধর্মের অনুসারীরা তা গ্রহণ করেছে এবং নিজেদের সমস্ত নগরে তার চর্চা করেছে। কারণ কোরআনের আয়াত ও কিছু হাদিসের মূল পাঠের মাধ্যমে হৃদয়ে আগে থেকেই ঈমান ও আকিদা দৃঢ় হয়। কোরআন শিক্ষার সেই ভিত্তি হয়ে উঠেছে, যার ওপর পরবর্তী দক্ষতা ও মানসিক অভ্যাসগুলো গড়ে ওঠে। এর কারণ, শৈশবের শিক্ষা অধিক দৃঢ়ভাবে স্থায়ী হয় এবং পরবর্তী শিক্ষার মূল হয়। হৃদয়ে প্রথম প্রবেশ করা বিষয়টি দক্ষতা ও মানসিক অভ্যাসের ভিত্তির মতো; ভিত্তি ও তার পদ্ধতি অনুসারেই তার ওপর নির্মিত বিষয়ের অবস্থা হয়। এই শিক্ষা থেকে কী ধরনের দক্ষতা ও অভ্যাস তৈরি হয়, সেই বিবেচনায় শিশুদের কোরআন শিক্ষার পদ্ধতি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন হয়েছে।

এই ব্যাখ্যা ধর্মীয় পরিচয়কে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করার শিক্ষাগত কাঠামো দেখায়। শিশু প্রথমে যা শেখে, তা পরবর্তী বোঝাপড়ার ভিত্তি হলে, কোরআনকে শিক্ষার প্রথম ভিত্তি করার মাধ্যমে পরবর্তী জ্ঞানও একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। শিক্ষার্থীর নিজস্ব তুলনামূলক বিচার শুরু হওয়ার আগেই কোন গ্রন্থ সত্যের মানদণ্ড হবে, তা ঠিক করা থাকে। এই ভিত্তির অধীনে বিকশিত মানুষ পরে নিজের পরিচিত ধর্মীয় ভাষায় প্রশ্ন করতে পারলেও সেই ভাষার বাইরের প্রশ্নকে অপরিচিত, বিপজ্জনক অথবা অগ্রহণযোগ্য বলে দেখতে পারে। এখানেই প্রাথমিক সামাজিকীকরণ ও তথ্যনিয়ন্ত্রণ পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

একই পরিচ্ছেদের শেষদিকে ইবন খালদুন ভাষা, কবিতা ও হিসাববিদ্যা আগে শেখানোর একটি প্রস্তাবকে উত্তম বলেছেন এবং প্রচলিত কোরআন শিক্ষার অগ্রাধিকারের সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বর্ণনায় শিশুর অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণাধীন থাকা সময়টিকে কাজে লাগানোর কথা এসেছে; বয়ঃপ্রাপ্তির পরে সেই নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কাও উল্লেখ আছে। নিচের পরিচ্ছেদে প্রস্তাবিত পাঠক্রম ও প্রচলিত নিয়ন্ত্রণের যুক্তি একসঙ্গে রয়েছে। [8]

ولقد ذهب القاضي أبو بكر بن العربي في كتاب رحلته إلى طريقة غريبة في وجه التعليم، وأعاد في ذلك وأبدأ، وقدم تعليم العربية والشعر على سائر العلوم كما هو مذهب أهل الأندلس. قال: ” لأن الشعر ديوان العرب ويدعو إلى تقديمه وتقديم العربية في التعليم ضرورة، فساداً للغة، ثم ينتقل منه إلى الحساب فيتمرن فيه حتى يرى القوانين، ثم ينتقل إلى درس القرآن، فإنه يتيسر عليه بهذه المقدمة ” ثم قال: ” ويا غفلة أهل بلادنا في أن يؤخذ الصبي بكتاب الله في أول عمره، يقرأ ما لا يفهم وينصب في أمر، غيره أهم عليه منه ” . قال: ” ثم ينظر في أصول الدين ثم أصول الفقه ثم الجدل ثم الحديث وعلومه ” . ونهى مع ذلك أن يخلط في التعليم علمان، إلا أن يكون المتعلم قابلاً لذلك بجودة الفهم والنشاط. هذا ما أشار إليه القاضي، أبو بكر رحمه الله، وهو لعمري مذهب حسن، إلا أن العوائد لا تساعد عليه وهي أملك بالأحوال ووجه ما اختصت به العوائد، من تقديم دراسة القرآن، إيثاراً للتبرك أو الثواب، وخشية ما يعرض للولد في جنون الصبا من الآفات والقواطع عن العلم ، فيفوته القرآن، لأنه ما دام في الحجر منقاد للحكم. فإذا تجاوز البلوغ وانحل من ربقة القهر، فربما عصفت به رياح الشبيبة، فألقته بساحل البطالة، فيغتنمون في زمان الحجر وربقة الحكم تحصيل القرآن له لئلا يذهب خلواً منه. ولو حصل اليقين باستمراره في طلب العلم، وقبوله التعليم، لكان هذا المذهب الذي ذكره القاضي أولى ما أخذ به أهل المغزب والمشرق. ولكن الله يحكم ما يشاء، لا معقب لحكمه سبحانه.

বাংলা অনুবাদ: কাজি আবু বকর ইবন আল-আরাবি তাঁর ভ্রমণবিষয়ক গ্রন্থে শিক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে একটি ব্যতিক্রমী পথ নিয়েছেন এবং তা বারবার আলোচনা করেছেন। আন্দালুসের পদ্ধতি অনুসারে তিনি অন্য সব বিদ্যার আগে আরবি ভাষা ও কবিতা শিক্ষাকে স্থান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কবিতা আরবদের সংরক্ষিত জ্ঞানের ভাণ্ডার, তাই তা আগে শেখানো উচিত। ভাষার অবনতির কারণে শিক্ষায় আরবিকে আগে রাখা জরুরি। এরপর হিসাববিদ্যায় যেতে হবে, যাতে অনুশীলনের মাধ্যমে তার নিয়মগুলো বুঝতে পারে। তারপর কোরআন অধ্যয়নে যাবে; এই প্রস্তুতির কারণে তা তার জন্য সহজ হবে।’ এরপর বলেছেন, ‘আমাদের দেশের লোকেরা কতই না উদাসীন, যে তারা শিশুকে জীবনের শুরুতেই আল্লাহর কিতাব ধরিয়ে দেয়; সে যা বোঝে না, তা পড়ে এবং এমন কাজে কষ্ট করে, যার চেয়ে অন্য কিছু তখন তার জন্য বেশি জরুরি।’ তিনি বলেছেন, ‘এরপর ধর্মের মূলনীতি, তারপর ফিকহের মূলনীতি, তারপর বিতর্কবিদ্যা, তারপর হাদিস ও তার শাস্ত্রগুলো অধ্যয়ন করবে।’ সেই সঙ্গে একই শিক্ষায় দুটি বিদ্যা মেশাতে নিষেধ করেছেন, যদি না শিক্ষার্থী ভালো বোঝার ক্ষমতা ও উদ্যমের কারণে তা গ্রহণে সক্ষম হয়। কাজি আবু বকর (রহঃ) এই পরামর্শ দিয়েছেন। আমার জীবনের শপথ, এটি একটি উত্তম পদ্ধতি। কিন্তু প্রচলিত অভ্যাস এর সহায়ক নয়; মানুষের অবস্থার ওপর অভ্যাসের কর্তৃত্ব বেশি। কোরআন অধ্যয়নকে আগে রাখার এই প্রচলনের কারণ হলো বরকত বা সওয়াবকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং শৈশবের উচ্ছৃঙ্খলতায় এমন বিপদ ও শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা ঘটার আশঙ্কা, যাতে শিশুর কোরআন শেখা বাদ পড়ে যায়। কারণ সে যতদিন অভিভাবকীয় তত্ত্বাবধানে থাকে, ততদিন নির্দেশের অনুগত থাকে। বয়ঃপ্রাপ্তি অতিক্রম করে বাধ্যবাধকতার বন্ধন থেকে মুক্ত হলে যৌবনের ঝড় তাকে নিষ্ক্রিয়তার তীরে ছুড়ে ফেলতে পারে। তাই অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশের বন্ধনের সময়টুকু কাজে লাগিয়ে তাকে কোরআন শেখানো হয়, যাতে সে তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত না হয়। সে জ্ঞানার্জন চালিয়ে যাবে ও শিক্ষা গ্রহণ করবে—এই নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে কাজির উল্লেখ করা পদ্ধতিই মাগরিব ও মাশরিকের মানুষের গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি হতো। কিন্তু আল্লাহ যা চান, ফয়সালা করেন; তাঁর ফয়সালা পরিবর্তন করার কেউ নেই।

ইবন খালদুনের বর্ণনা থেকে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একটি ক্ষমতাসম্পর্ক স্পষ্ট হয়: অভিভাবকের নির্দেশ কার্যকর থাকা বয়সে শিশুর ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়, কারণ পরে সে সেই নির্দেশের বাইরে চলে যেতে পারে। শিশুর সম্ভাব্য স্বাধীনতা এখানে শিক্ষাপদ্ধতির সময় নির্বাচনের একটি কারণ। ফলে শৈশবে ধর্মীয় শিক্ষার তাড়াহুড়োকে কেবল শিশুর শেখার সুবিধা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এই নিয়ন্ত্রণের উপাদান আড়াল হয়। সমাজের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা পরবর্তী প্রজন্মের ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণ করতে নিজের কর্তৃত্বের সময়সীমাকে ব্যবহার করছেন—তাঁর আলোচনায় সেই প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ বর্ণনা আছে।

ইবন কাইয়্যিমের তুহফাত আল-মাওদুদ বি-আহকাম আল-মাওলুদ-এ নির্দেশটি আরও নির্দিষ্ট বয়সগত পর্যায়ে নেমে এসেছে। শিশুর কথা শেখার পরিচর্যার সঙ্গে একই পরিচ্ছেদে কালিমা ও আল্লাহর পরিচয় শেখানোর নির্দেশ রয়েছে। সে যখন বোধসম্পন্ন হবে, তখন যেন নিজেকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে জানে—এটিকে শিক্ষার লক্ষ্য করা হয়েছে। [9]

فصل فإذا قربوا من وقت التكلم وأريد تسهيل الكلام عليهم فليدلك ألسنتهم بالعسل والملح الاندراني لما فيهما من الجلاء للرطوبات الثقيلة المانعة من الكلام فإذا كان وقت نطقهم فليلقنوا لا إله إلا الله محمد رسول الله وليكن أول ما يقرع مسامعهم معرفة الله سبحانه وتوحيده وأنه سبحانه فوق عرشه ينظر إليهم ويسمع كلامهم وهو معهم أينما كانوا وكان بنو إسرائيل كثيرا ما يسمون أولادهم ب عمانويل ومعنى هذه الكلمة إلهنا معنا ولهذا كان أحب الأسماء إلى الله عبد الله وعبد الرحمن بحيث إذا وعى الطفل وعقل علم أنه عبد الله وأن الله هو سيده ومولاه

বাংলা অনুবাদ: শিশুরা কথা বলার সময়ের কাছাকাছি এলে এবং তাদের কথা বলা সহজ করতে চাইলে, তাদের জিহ্বায় মধু ও আন্দরানি লবণ ঘষতে হবে; কারণ এতে কথা বলায় বাধাদানকারী ঘন আর্দ্রতা দূর করার ক্ষমতা আছে। তাদের কথা বলার সময় হলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ শেখাতে হবে। তাদের কানে প্রথম প্রবেশ করা বিষয় হবে মহান আল্লাহর পরিচয় ও তাঁর একত্ব, তিনি তাঁর আরশের ওপরে থেকে তাদের দেখছেন ও তাদের কথা শুনছেন এবং তারা যেখানেই থাকুক তিনি তাদের সঙ্গে আছেন। বনি ইসরাইল অনেক সময় নিজেদের সন্তানদের ইম্মানুয়েল নাম দিত; এই শব্দের অর্থ ‘আমাদের ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন।’ এই কারণেই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান, যাতে শিশু যখন বোঝে ও চিন্তা করে, তখন সে জানে যে সে আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহ তার প্রভু ও অভিভাবক।

এই নির্দেশে বিশ্বাসের শিক্ষাদান ভাষা শেখার সূচনাতেই স্থাপন করা হয়েছে। শিশু যখন নিজের চারপাশের বস্তু, মানুষ ও পরিচয় সম্পর্কে শব্দ শিখছে, তখনই তার নিজের অস্তিত্বের ধর্মীয় সংজ্ঞাও নির্ধারিত হচ্ছে: সে কার বান্দা, কে তাকে দেখছেন এবং কে তার প্রভু। পরবর্তী সময়ে এই বক্তব্যগুলো তার কাছে বাইরের একটি মতবাদ হিসেবে আসবে না; নিজের পরিচয়ের পরিচিত অংশ হিসেবে উপস্থিত থাকবে। ফলে ধর্ম প্রত্যাখ্যানের প্রশ্নও নিছক একটি তত্ত্ব বদলানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবার, নাম, আত্মপরিচয় ও কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। শৈশবের শিক্ষার এই গভীরতা থেকেই বিকল্প জানার অধিকার ও প্রশ্ন করার সুযোগের নৈতিক গুরুত্ব তৈরি হয়।


ইবাদতে অভ্যস্তকরণ এবং শাস্তির নির্দেশ

পরিবারকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় জীবনে পরিচালিত করার দায়িত্ব কোরআনে জাহান্নাম থেকে রক্ষার ভাষায় প্রকাশিত। সুরা আত-তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে বিশ্বাসীদের নিজেদের ও পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [10]

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ قُوٓا۟ أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًۭا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَـٰٓئِكَةٌ غِلَاظٌۭ شِدَادٌۭ لَّا يَعْصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ٦

বাংলা অনুবাদ: হে ঈমানদাররা, তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে এমন আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর। তার ওপর নিয়োজিত আছে কঠোর ও শক্তিশালী ফেরেশতারা; আল্লাহ তাদের যা আদেশ করেন, তারা তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদিষ্ট হয়, তা-ই করে।

ইবন কাসির এই আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরিবারকে শিক্ষা ও শাসন করা, আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ দেওয়া এবং অবাধ্যতা থেকে ফিরিয়ে আনার কথা এনেছেন। একই ধারাবাহিক ব্যাখ্যায় শিশুদের নামাজ শেখানো, দশ বছর বয়সে নামাজের জন্য প্রহার এবং বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই ধর্মীয় অনুশীলনে অভ্যস্ত করার উদ্দেশ্য এসেছে। নিচের প্রাসঙ্গিক পরিচ্ছেদগুলো আয়াতের পারিবারিক নির্দেশকে শিশুশিক্ষা ও শাস্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে। [11]

قال سفيان الثوري عن منصور عن رجل عن علي رضي الله عنه في قوله تعالى “قوا أنفسكم وأهليكم نارا” يقول أدبوهم وعلموهم وقال علي بن أبي طلحة عن ابن عباس “قوا أنفسكم وأهليكم نارا” يقول اعملوا بطاعة الله واتقوا معاصي الله وأمروا أهليكم بالذكر ينجيكم الله من النار. وقال مجاهد “قوا أنفسكم وأهليكم نارا” قال اتقوا الله وأوصوا أهليكم بتقوى الله وقال قتادة تأمرهم بطاعة الله وتنهاهم عن معصية الله وأن تقوم عليهم بأمر الله وتأمرهم به وتساعدهم عليه فإذا رأيت لله معصية قذعتهم عنها وزجرتهم عنها وهكذا قال الضحاك ومقاتل حق المسلم أن يعلم أهله من قرابته وإمائه وعبيده ما فرض الله عليهم وما نهاهم الله عنه. وفي معنى هذه الآية الحديث الذي رواه أحمد وأبو داود والترمذي من حديث عبدالملك بن الربيع بن سبرة عن أبيه عن جده قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم “مروا الصبي بالصلاة إذا بلغ سبع سنين فإذا بلغ عشر سنين فاضربوه عليها” هذا لفظ أبي داود وقال الترمذي هذا حديث حسن وروى أبو داود من حديث عمرو بن شعيب عن أبيه عن جده عن رسول الله صلى الله عليه وسلم مثل ذلك قال الفقهاء وهكذا في الصوم ليكون ذلك تمرينا له على العبادة لكي يبلغ وهو مستمر علي العبادة والطاعة ومجانبة المعاصي وترك المنكر والله الموفق.

বাংলা অনুবাদ: সুফিয়ান আস-সাওরি মানসুরের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে, তিনি আলি (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ‘তোমরা নিজেদের ও নিজেদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো’—আল্লাহর এই কথার অর্থ হলো, তাদের শাসন করো ও শিক্ষা দাও। আলি ইবন আবু তালহা ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, এর অর্থ: আল্লাহর আনুগত্য করো, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বাঁচো এবং নিজেদের পরিবারকে আল্লাহর স্মরণের নির্দেশ দাও; আল্লাহ তোমাদের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। মুজাহিদ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পরিবারকে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দাও। কাতাদা বলেছেন, তুমি তাদের আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ দেবে, তাঁর অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করবে, আল্লাহর নির্দেশ নিয়ে তাদের তত্ত্বাবধান করবে, তাদের তা পালনের আদেশ দেবে এবং সাহায্য করবে। আল্লাহর কোনো অবাধ্যতা দেখলে তুমি তাদের তা থেকে ফিরিয়ে দেবে ও ধমক দিয়ে নিবৃত্ত করবে। দাহহাক ও মুকাতিলও একই কথা বলেছেন। মুসলিমের কর্তব্য হলো, আত্মীয়স্বজন, দাসী ও দাসদের মধ্যকার নিজের পরিবারকে আল্লাহ তাদের ওপর যা ফরজ করেছেন এবং যা নিষেধ করেছেন, তা শেখানো। এই আয়াতের অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি হাদিস আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেছেন; আবদুল মালিক ইবন আর-রাবি ইবন সাবরা তাঁর বাবা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন: আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘শিশু সাত বছরে পৌঁছালে তাকে নামাজের আদেশ দাও; দশ বছরে পৌঁছালে নামাজের জন্য তাকে প্রহার করো।’ এটি আবু দাউদের ভাষা। তিরমিযি বলেছেন, এই হাদিস হাসান। আবু দাউদ আমর ইবন শুয়াইব, তাঁর বাবা ও তাঁর দাদার সূত্রে রাসুল থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ফকিহরা বলেছেন, রোজার ক্ষেত্রেও একইভাবে করতে হবে, যাতে তা তার জন্য ইবাদতের অনুশীলন হয় এবং সে ইবাদত, আনুগত্য, পাপ থেকে দূরে থাকা ও অন্যায় বর্জনের ওপর অবিচল অবস্থায় বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহই সহায়তাকারী।

সাত ও দশ বছরের বয়সসীমাসহ এই প্রহারের নির্দেশ আবু দাউদের বর্ণনাতেও আছে। এখানে আদেশটি শিশুর ধর্মীয় অনুশীলন প্রতিষ্ঠার জন্য; নামাজ শেখানো এবং সেই নামাজ পালনে শারীরিক শাস্তিকে একই নির্দেশের মধ্যে রাখা হয়েছে। [12]

حَدَّثَنَا مُؤَمَّلُ بْنُ هِشَامٍ، – يَعْنِي الْيَشْكُرِيَّ – حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ ، عَنْ سَوَّارٍ أَبِي حَمْزَةَ ، – قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَهُوَ سَوَّارُ بْنُ دَاوُدَ أَبُو حَمْزَةَ الْمُزَنِيُّ الصَّيْرَفِيُّ – عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنْ جَدِّهِ ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” مُرُوا أَوْلاَدَكُمْ بِالصَّلاَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ ” .

বাংলা অনুবাদ: মুআম্মাল ইবন হিশাম—অর্থাৎ আল-ইয়াশকুরি—আমাদের বর্ণনা করেছেন; ইসমাইল আমাদের বর্ণনা করেছেন, সাওয়ার আবু হামজা থেকে। আবু দাউদ বলেছেন, তিনি হলেন সাওয়ার ইবন দাউদ আবু হামজা আল-মুযানি আস-সায়রাফি। তিনি আমর ইবন শুয়াইব থেকে, তিনি তাঁর বাবা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের আদেশ দাও; দশ বছর বয়সে নামাজের জন্য তাদের প্রহার করো এবং তাদের শয্যা পৃথক করে দাও।’

এই ব্যবস্থায় ধর্মীয় পরিচয় গঠনের সঙ্গে আচরণগত বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়। একটি শিশু কেন নামাজ পড়বে, সেই প্রশ্নের স্বাধীন বিচার শেষ হওয়ার আগেই তার জন্য নামাজের নির্দেশ কার্যকর হয়; নির্দিষ্ট বয়সে তা না মানলে প্রহারের অনুমোদনও থাকে। ইবন কাসিরের ব্যাখ্যায় লক্ষ্যটি হলো, শিশুকে এমন অভ্যাসে গড়ে তোলা যাতে বয়ঃপ্রাপ্তির সময় সে সেই ধর্মাচরণে অবিচল থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করলেও, তার আগের দীর্ঘ সময় ধরে শাস্তি ও অভ্যাসের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের অনুকূল মানুষ তৈরি করার নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়।

অভিভাবক নিজে এই কাজকে সন্তানের কল্যাণ বা জাহান্নাম থেকে রক্ষা হিসেবে দেখতে পারেন; শিশুর ওপর প্রয়োগ করা শারীরিক বাধ্যবাধকতার বাস্তবতা তাতে বদলায় না। এখানে সন্তানের কল্যাণের সংজ্ঞাটি অভিভাবকের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে এসেছে এবং সেই সংজ্ঞা মানতে শিশুকে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো শিশু একই বয়সে অন্য ধর্মীয় পরিবারে থাকলে ভিন্ন আচরণ ও ভিন্ন ঈশ্বরসংক্রান্ত শিক্ষা পেত। জন্মসূত্রে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের এই ক্ষমতা ধর্মীয় সম্মতির স্বাধীনতা বিচার করার সময় বাদ দেওয়া যায় না। শাস্তির আশঙ্কায় গড়ে ওঠা নিয়মিত আচরণকে ধর্মের যৌক্তিক সত্যতা স্বীকারের প্রমাণ হিসেবে দেখানোও বিভ্রান্তিকর।


তথ্যের একপাক্ষিকতা এবং অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার সীমাবদ্ধতা

বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ অপরিহার্য, কিন্তু অনেক ধর্মীয় কাঠামোতে শিশুদের জন্য এই পথটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রুদ্ধ করে রাখা হয়। বিশেষ করে ইসলামি আইনশাস্ত্র ও ফতোয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুসলিম শিশুদের বা সাধারণ অনুসারীদের অন্য ধর্ম সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে একটি ‘বৌদ্ধিক সুরক্ষা প্রাচীর’ তৈরি করা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূলে রয়েছে এই বিশ্বাস যে, অন্য ধর্ম বা মতবাদ পাঠ করলে অনুসারীদের মনে নিজ ধর্ম সম্পর্কে সংশয় বা বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

ইসলামি শরিয়াহর মৌলিক নীতি অনুযায়ী, তথাকথিত ‘বিকৃত ধর্মগ্রন্থ’ (যেমন বর্তমানের বাইবেল বা তোরাহ) অথবা অন্য কোনো ‘মিথ্যা’ ধর্মতত্ত্ব পাঠ করা বা শিক্ষা দেওয়া মুসলিমদের জন্য সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞার কঠোরতা এতটাই যে, এটি কেবল বিশেষজ্ঞ বা সুগভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমদের জন্য শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত, যাতে তারা সেসব ধর্মের অসারতা প্রমাণ করতে পারেন [13]। হাশিয়াত ইবনে আবিদিন-এ আলোচিত ধর্মগ্রন্থগুলোর কোনো কিছু পাঠ করতে নিষেধ করা হয়েছে—সেগুলো অবিশ্বাসীরা পৌঁছে দিক অথবা তাদের মধ্য থেকে ইসলাম গ্রহণকারীরা পৌঁছে দিক [14]।

এই তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটি কেবল আধুনিক ফতোয়া নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবেও সমর্থিত। কিতাবুল ইবনা-তে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ স্বয়ং হযরত ওমর-এর হাতে তাওরাতের একটি পৃষ্ঠা দেখে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এবং প্রশ্ন করেছিলেন যে তিনি কি সত্য নিয়ে সন্দেহের মধ্যে আছেন কি না? [15]। আল-হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানির মতে, যাদের ঈমান বা ধর্মবিশ্বাস এখনো দৃঢ় নয়, তাদের জন্য ভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা একেবারেই অনুচিত, কারণ এটি বিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল করে দিতে পারে [16]। আধুনিক সালাফি পণ্ডিত শায়খ ইবনে বাজও একই মত পোষণ করে বলেছেন যে, তাওরাত বা ইঞ্জিল পড়ার ফলে মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে, যা বর্জনীয় [17]।

আল-বুহুতির কাশশাফ আল-কিনা আন মাতন আল-ইকনা-য় অন্য ধর্মগ্রন্থ পাঠের নিষেধ সরাসরি পাওয়া যায়। উমরের তাওরাত পাঠসংক্রান্ত বিবরণটি এই গ্রন্থে পাঠনিষেধের যুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। নিচের উদ্ধৃতির গ্রন্থপরিচয় কাশশাফ আল-কিনা; এর মধ্যে নিষেধ, উমরের ঘটনার উল্লেখ, বিদআতিদের বই এবং আকিদা নষ্ট হওয়ার কারণ—সবকটি একসঙ্গে আছে। [18]

( ولا يجوز النظر في كتب أهل الكتاب نصا ) ; لأنه صلى الله عليه وسلم { غضب حين رأى مع عمر صحيفة من التوراة ، وقال أفي شك أنت يا ابن الخطاب } الحديث ( ولا ) النظر في ( كتب أهل البدع ، و ) لا النظر في ( الكتب المشتملة على الحق والباطل ، ولا روايتها ) لما في ذلك من ضرر إفساد العقائد ( وتقدم في نواقض الوضوء جملة من أحكام المصحف ) فينبغي مراجعتها .

বাংলা অনুবাদ: স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী আহলে কিতাবের বই দেখা অনুমোদিত নয়। কারণ নবী (সাঃ) উমরের সঙ্গে তাওরাতের একটি পত্র দেখে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘হে ইবন আল-খাত্তাব, তুমি কি সংশয়ে আছ?’—হাদিস। বিদআতিদের বই দেখা এবং যেসব বইয়ে সত্য ও মিথ্যা মেশানো আছে, সেগুলো দেখা বা বর্ণনা করাও অনুমোদিত নয়; কারণ এতে আকিদা নষ্ট হওয়ার ক্ষতি আছে। মুসহাফের কিছু বিধান অজু ভঙ্গের কারণগুলোর আলোচনায় আগে এসেছে; তাই তা দেখে নেওয়া উচিত।

বিধানটির মানদণ্ড হলো পাঠের ফলে অনুসারীর আকিদায় কী প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি সত্য ও মিথ্যা মেশানো বইও নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। ফলে নতুন তথ্য থেকে সত্য আলাদা করতে শেখানোর পরিবর্তে পুরো তথ্যক্ষেত্র থেকেই সাধারণ অনুসারীকে দূরে রাখা হয়। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ আগে স্থির করছে কোন বিশ্বাস অক্ষত থাকা দরকার, তারপর সেই স্থির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পাঠের অনুমতি নির্ধারণ করছে। এই নির্বাচন অনুসন্ধানের ফলকে আগেই সীমাবদ্ধ করে: পাঠক কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে, তার স্বাধীনতার আগে কোন সিদ্ধান্ত থেকে তাকে সরতে দেওয়া হবে না, তা স্থির হয়ে যায়।

এই পুরো বিষয়টি একটি গভীর ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা ‘বৌদ্ধিক একাধিপত্য’ নির্দেশ করে। একদিকে মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো বা ইসলাম শিক্ষা দেওয়াকে নৈতিক কর্তব্য মনে করেন, কিন্তু অন্যদিকে নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনদর্শন সম্পর্কে জানতে দিতে তারা ঘোরতর বিরোধী। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিশুদের যৌক্তিক বিচারের অধিকারকে অস্বীকার করে। যদি কোনো ধর্ম সত্যিই ‘পরম সত্য’ হয়ে থাকে, তবে অন্য কোনো ভ্রান্ত মতবাদ পাঠ করলে সেই সত্যের ভিত্তি নড়ে ওঠার কথা নয়। বরং বিপরীতমুখী তথ্যের অনুপস্থিতিতে কোনো বিশ্বাসকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা অনেকটা ‘অন্ধ আনুগত্যের’ নামান্তর। শিশুদের জন্য শিক্ষার পরিবেশটি এমন হওয়া উচিত যেখানে তারা বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে জানবে এবং পরবর্তীতে পূর্ণ বয়সে পৌঁছে নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তথ্যের এই পদ্ধতিগত সেন্সরশিপ শিশুদের একটি বদ্ধ মানসিকতায় বড় করে তোলে, যা তাদের বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।


পূর্বপুরুষের ধর্ম অনুসরণের যুক্তি এবং একই মানদণ্ডের দাবি

পূর্বপুরুষের ধর্মে জন্ম নেওয়াকে সেই ধর্ম অনুসরণের যথেষ্ট কারণ হিসেবে পেশ করার সমালোচনা কোরআনেও আছে। সুরা আল-বাকারার ১৭০ নম্বর আয়াতে ইসলামি আহ্বানের উত্তরে পিতৃপুরুষের পথ অনুসরণ করার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। [19]

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ ٱتَّبِعُوا۟ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ قَالُوا۟ بَلْ نَتَّبِعُ مَآ أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ ءَابَآءَنَآ ۗ أَوَلَوْ كَانَ ءَابَآؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْـًۭٔا وَلَا يَهْتَدُونَ ١٧٠

বাংলা অনুবাদ: তাদের যখন বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তা অনুসরণ করো,’ তখন তারা বলে, ‘বরং আমরা তা-ই অনুসরণ করব, যার ওপর আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি।’ তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝত না এবং সঠিক পথেও ছিল না—তবুও কি?

ইবন কাসির আয়াতটির ব্যাখ্যায় পূর্বপুরুষের উপাসনা অনুসরণ, তাদের পদাঙ্কে চলা এবং ইসলামের দাওয়াতের উত্তরে পিতৃধর্মকে সামনে আনার প্রসঙ্গই আলোচনা করেছেন। [20]

يقول تعالى : ( وإذا قيل ) لهؤلاء الكفرة من المشركين : ( اتبعوا ما أنزل الله ) على رسوله ، واتركوا ما أنتم فيه من الضلال والجهل ، قالوا في جواب ذلك : ( بل نتبع ما ألفينا ) أي : وجدنا ( عليه آباءنا ) أي : من عبادة الأصنام والأنداد . قال الله تعالى منكرا عليهم : ( أولو كان آباؤهم ) أي : الذين يقتدون بهم ويقتفون أثرهم ( لا يعقلون شيئا ولا يهتدون ) أي : ليس لهم فهم ولا هداية ! ! . وروى ابن إسحاق عن محمد بن أبي محمد ، عن عكرمة أو سعيد بن جبير ، عن ابن عباس : أنها نزلت في طائفة من اليهود ، دعاهم رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى الإسلام ، فقالوا : بل نتبع ما ألفينا عليه آباءنا . فأنزل الله هذه الآية .

বাংলা অনুবাদ: মহান আল্লাহ বলেন: এসব অবিশ্বাসী মুশরিককে যখন বলা হয়, আল্লাহ তাঁর রাসুলের ওপর যা নাজিল করেছেন তা অনুসরণ করো এবং যে ভ্রান্তি ও অজ্ঞতার মধ্যে আছ তা ছেড়ে দাও, তখন তারা জবাবে বলে, ‘বরং আমরা যা পেয়েছি’—অর্থাৎ দেখেছি—‘আমাদের পূর্বপুরুষদের তার ওপর’—অর্থাৎ মূর্তি ও আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী উপাসনার ওপর—‘তা-ই অনুসরণ করব।’ তাদের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের পূর্বপুরুষরা’—অর্থাৎ যাদের তারা অনুসরণ করে এবং যাদের পদাঙ্ক ধরে চলে—‘কিছুই বুঝত না এবং সঠিক পথেও ছিল না’—অর্থাৎ তাদের বোঝার ক্ষমতা ও হেদায়েত ছিল না—তবুও কি? ইবন ইসহাক মুহাম্মাদ ইবন আবু মুহাম্মাদ থেকে, তিনি ইকরিমা অথবা সাঈদ ইবন জুবাইর থেকে, তিনি ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: আয়াতটি একদল ইহুদি সম্পর্কে নাজিল হয়। রাসুল তাদের ইসলামের দিকে ডাকলে তারা বলে, ‘বরং আমরা তা-ই অনুসরণ করব, যার ওপর আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি।’ তখন আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন।

পূর্বপুরুষ কোনো বিশ্বাস অনুসরণ করতেন—এটি ঐতিহাসিক ও পারিবারিক তথ্য। সেই বিশ্বাসের দাবি সত্য—এটি আলাদা প্রমাণের বিষয়। এই পার্থক্য ইহুদি বা মূর্তিপূজক পরিবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে মুসলিম পরিবারের ক্ষেত্রেও একই যুক্তিগত মানদণ্ড প্রযোজ্য। মুসলিম শিশু বাবা-মায়ের শিক্ষা থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে—এই তথ্য দিয়ে ইসলামের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না, যেমন খ্রিষ্টান শিশু বাবা-মায়ের শিক্ষা থেকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে বলে খ্রিষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয় না। জন্মসূত্রের পরিচয় এবং যাচাইকৃত সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য সব পরিবারের জন্য একই।

এখানে তথ্যপ্রাপ্তির অসম অনুমতি দ্বিমুখী মানদণ্ড তৈরি করে। অন্য ধর্মের অনুসারীকে তার পারিবারিক শিক্ষা পুনর্বিবেচনা করে ইসলামের বক্তব্য শুনতে বলা হচ্ছে, আর নিজের সাধারণ অনুসারী ও শিশুকে প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মের বক্তব্য শোনার আগে সেই ধর্মের ভ্রান্তি প্রমাণের উদ্দেশ্য ও নিজের ঈমান অক্ষত থাকার শর্ত পূরণ করতে বলা হচ্ছে। প্রথম ক্ষেত্রে পারিবারিক কর্তৃত্ব ভাঙা কাম্য; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেই কর্তৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের সুরক্ষা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সমান অনুসন্ধানের নীতি হলে প্রত্যেক মানুষ নিজের ধর্মসহ সব দাবির পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ দেখার সুযোগ পাবে। যে ব্যবস্থায় নিজের বিশ্বাস পরিত্যাগের সম্ভাবনাটিকেই পাঠের বিপদ ধরা হয়, সেখানে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ফলের মধ্যে আটকে থাকে।


ইসলাম কিউঅ্যান্ডএ-র ফতোয়া এবং বঙ্গানুবাদ

এই বিষয়ে ইসলাম কিউঅ্যান্ডএ-র ২১৭০৮৪ নম্বর ফতোয়াটি দেখে নেওয়া যাক [21]। ২১৭০৮৪ নম্বর ফতোয়ার উৎসপাতায় প্রকাশক হিসেবে ইসলাম কিউঅ্যান্ডএ-র পরিচয় দেওয়া আছে; প্রকাশের তারিখ ৭ জুন ২০১৪। ফতোয়াটির প্রকাশিত উত্তর এবং তাতে উদ্ধৃত ফিকহি গ্রন্থ ও আলেমদের বক্তব্যই এখানে আলোচিত নিষেধাজ্ঞার প্রত্যক্ষ দলিল। [22]

Ruling on teaching false religions to children
217084
Publication : 07-06-2014
Question
Im a student, becoming a teacher in religion to teach children. I live in Europe, in a Christian country, but my studies teaches the five main world religions (Islam, Christianity, Judaism, Hinduism and Buddhism). I’ve never thought that it could be haram to teach other religions to children, because I don’t see non-Islamic religions as the truth and I will never tell it is. I believe children need to know what other people believe in this world.
However, many people have been telling me my studies are haram and it’s definitely haram to teach to other children, especially muslim children. I’ve been searching, but I couldn’t find any source clarifying anything. I hope you can clarify it. Thank you very much in advance!
Answer
Praise be to Allah.
The basic principle is that it is not permissible to study or teach the distorted Scriptures, false religions or schools of thought that are contrary to the truth, unless that is done with the aim of teaching people that they are corrupt and false, and that they are contrary to reason and common sense, and contrary to the religion of truth which Allah, may He be glorified, has chosen for His slaves, namely Islam. In addition to that, the one who is studying that should also have sound knowledge of the truth and the ability to distinguish truth from falsehood, error from right guidance, and there should be no fear that he will be tempted or confused by that. This kind of study should be limited to specialists who it is hoped will play a role in combatting these distorted and devilish religions; the door should not be left open to everyone, especially the common folk and children, lest that create in them doubts and uncertainty about their religion. It says in Haashiyat Ibn ‘Aabideen (1/175): We were instructed not to look into any of that, whether it was transmitted to us by the disbelievers or by those among them who became Muslim. End quote.
In Kashshaaf al-Qinaa‘ ‘an Matn al-Iqnaa‘ (1/434) it says: It is not permissible to read the books of the People of the Book – this was stated by Imam Ahmad – because the Prophet (blessings and peace of Allah be upon him) got angry when he saw ‘Umar carrying a page of the Torah, and he said to him: “Are you doubting, O son of al-Khattab?” … It is not permissible to read the books of those who follow innovation or the books that contain both truth and falsehood, or to narrate them, because that comes under the heading of corrupting beliefs. End quote.
Al-Haafiz Ibn Hajar (may Allah have mercy on him) said, when discussing this issue – namely reading the books of the People of the Book: With regard to this issue, it is more appropriate to differentiate between the one whose faith is not deeply-rooted, in which case it is not permissible for him to read any of those books, in contrast to the one whose faith is deeply rooted, for whom it is permissible to do so, especially when there is a need to refute the arguments of those whose view is opposed to the truth. That is indicated by the fact that the imams (leading scholars) of the past and present quoted from the Torah and challenged the Jews to believe in Muhammad (blessings and peace of Allah be upon him) on the basis of what they quoted from their books. If they did not believe that it is permissible to read it, they would not have done that and they would all have reiterated this view.
End quote from Fath al-Baari by Ibn Hajar, 13/525
Shaykh Ibn Baaz (may Allah have mercy on him) was asked: Is it permissible for us to read the books of religions other than Islam, out of a desire to study and learn about other religions? He replied: That is not appropriate. It is not appropriate to read the Torah or the Gospel or any other books, because that may lead to doubt, and it was narrated from the Messenger (blessings and peace of Allah be upon him) that when he saw ‘Umar reading a page of the Torah, he said: “Are you doubting, O son of al-Khattab? I have brought it to you white and pure; if Moosa were alive he could not but follow me.” What is meant is that the Muslim should not read other books, such as the Torah, the Gospel or any others, except in the case of those who need to read them, such as scholars who want to refute the Jews and Christians from their own books. If there is a need to do so, the scholar who is refuting them and highlighting their falsehood may read their books so that he may refute them on that basis. In that case there is nothing wrong with doing that when there is a need for it, in the case of those who have knowledge and insight.
End quote from the Shaykh’s website
http://www.binbaz.org.sa/mat/10748
If this is the ruling for adults, then it is more applicable in the case of children, because their reasoning is still immature, so teaching them these religions is a wrong action in which there is nothing good. You will never be allowed, whilst teaching, to criticize these false religions and highlight their falseness; even if this is allowed, children will never be able to understand that, because specious arguments and refutation thereof will be above their level of understanding.
And Allah knows best.

এই উত্তরটির কিয়দাংশের অনুবাদ নিচে দেয়া হলো। অনুবাদকঃ ফারহান চৌধুরি।

শিশুদের মিথ্যা ধর্ম শিক্ষা দেয়ার বিষয়ে নীতিমালা
প্রশ্ন
আমি একজন ছাত্র, শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য ধর্মের একজন শিক্ষক হচ্ছি। আমি ইউরোপে থাকি, একটি খ্রিষ্টান দেশ, কিন্তু আমার পাঠ্যক্রমে আছে বিশ্বের প্রধান পাচঁটি ধর্ম (ইসলাম, খ্রিষ্টান, ইহুদী, হিন্দু এবং বৌদ্ধ)। আমি কখনো ভাবিনি যে, শিশুদের অন্য ধর্ম শিক্ষাদান ক্ষতির কারণ হতে পারে, কারণ আমি ইসলাম বাদে অন্য ধর্ম গুলোকে সত্য বলে মনে করিনা এবং আমি কখনো বলবও না এটা। আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর অন্য মানুষেরা কি বিশ্বাস করছে সেটাও শিশুদের জানা উচিত।
যাইহোক, অনেক মানুষই আমাকে বলছে যে আমার পড়ালেখার বিষয়টি হারাম এবং অন্য শিশুদের শিক্ষা দেয়াটাও অবশ্যই হারাম, বিশেষত মুসলিম শিশুদের। আমি অনুসন্ধান করছি, কিন্তু ব্যাখ্যা দেয়ার মত স্পষ্ট কোনো উৎস পাইনি। আশা করছি আপনি বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। অগ্রিম ধন্যবাদ।
উত্তর
সকল প্রশংসা আল্লাহর।
মৌলিক নীতি হচ্ছে যে, বিকৃত ধর্মগ্রন্থ, মিথ্যা ধর্ম অথবা যে সকল চিন্তা সত্যের পরিপন্থী তা পড়া বা শিক্ষাদানের অনুমতি নেই, যদিনা তা নীতি বহির্ভূত বা মিথ্যা হিসেবে মানুষকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে শিক্ষা দেয়া হয় এবং যা তর্ক ও সাধারণ চিন্তার পরিপন্থী, এবং সত্য ধর্ম যার নাম ইসলাম, এর পরিপন্থী যা কিনা স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের জন্য মনস্থ করেছেন। আরও বলা যায়, যে ব্যক্তি এ বিষয়ে পড়ছেন তার অবশ্যই সত্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে এবং মিথ্যা থেকে সত্যকে আলাদা করার এবং সত্যপথ থেকে ভুলকে পার্থক্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে, এবং সেসব জ্ঞান দ্বারা প্রলোভিত বা দ্বিধান্বিত হওয়ার কোনো ভয় থাকা যাবেনা। এ ধরনের শিক্ষা অবশ্যই শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞদের জন্য নির্ধারিত হতে হবে যারা এসব বিকৃত এবং শয়তান ধর্মের সাথে যুদ্ধ করবে বলে আশা করা যায়; এ শিক্ষার দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত নয়, বিশেষত সাধারণ জনগণ ও শিশুদের জন্য যেন ধর্ম সম্বন্ধে তাদের মনে কোনো সন্দেহ বা অনিশ্চয়তার জন্ম না নেয়।
হাশিয়াত ইবনে ‘আবিদান হতে বর্ণিত (১/১৭৫)ঃ ” এসব বিষয়ে লক্ষ্য না দেয়ার জন্য আমাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যদিও তা অবিশ্বাসী বা তাদের মধ্যে যারা মুসলিম হয়েছে তাদের কাছ থেকে এসে থাকে।”
কাশশাফ আল-কিনা’ ‘আন মাতন আল-কিনা(১/৪৩৪) হতে বর্ণিতঃ বিধর্মীদের বই পড়ার কোনো অনুমতি নেই – এ উক্তিটি করেছেন ইমাম আহমেদ – কারণ নবী (সাঃ) একদা রেগে গিয়েছিলেন যখন তিনি উমর’ কে তাওরাতের একটি পৃষ্ঠা বহন করতে দেখেন, এবং তিনি তাকে বলেনঃ ” তুমি কি সন্ধেহের বশবর্তী হয়েছ, ইবন খাত্তাব?”….. যারা নতুন কিছুকে অনুসরণ করে তাদের বই পড়া বা তিলওয়াতের অনুমতি নাই এবং সে সব বই যাতে সত্য ও মিথ্যা উভয়ই আছে, কারণ সেসব আসে কলুষিত বিশ্বাস থেকে।’
আল হাফিজ ইবনে হাজর (র) হতে বর্ণিত, এই বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় – অর্থাৎ বিধর্মীদের বই পড়া বিষয়ে বলেনঃ এই সমস্যা বিবেচনায়, যাদের বিশ্বাস গভীর নয় তাদের এসব হতে আলাদা করাই উচিত, এক্ষেত্রে তার জন্য এসব বই পড়ারই কোনো অনুমতি নেই, অপরপক্ষে যাদের গভীর বিশ্বাস আছে, তার জন্য এর অনুমতি আছে, বিশেষত যখন যাদের অভিমত সত্যের বিরোধী তাদের যুক্তি খন্ডনের প্রয়োজন হয়। এটি সত্য দ্বারা নির্দেশিত যে, অতীত এবং বর্তমানের ইমামগণ (বিশিষ্ট আলেমগণ) ইহুদীদের মুহাম্মদ (সাঃ) সম্বন্ধে বিশ্বাস করানোর জন্য তাওরাত হতে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যখন তারা তাদের বই থেকে উদ্বৃত্ত করেছে। যদি তারা এটা পাঠের অনুমতি আছে বলে বিশ্বাস করত না, তবে তারা এমনটি করত না এবং তারা এই মতের পুনরাবৃত্তি করত।
শেষ উক্তিটি ফাত আল-বারী হতে বর্ণিত, ১৩/৫২৫।


যুক্তি, প্রজ্ঞা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্তের নৈতিক প্রয়োজনীয়তা

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার বিচারবুদ্ধি এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের ক্ষমতায়। কোনো আদর্শ বা বিশ্বাস তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা কোনো ব্যক্তির সচেতন সিদ্ধান্তের ফসল হয়। কিন্তু শৈশবে কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এই ‘সচেতন সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার সুযোগটিকেই অঙ্কুরে বিনষ্ট করা হয়। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant)-এর ‘সেপারে অউড’ (Sapere Aude) বা “জানার সাহস রাখো” তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষের প্রকৃত জ্ঞানোদয় তখনই ঘটে, যখন সে অন্যের অভিভাবকত্ব বা নির্দেশনার বাইরে নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করতে শেখে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই অভিভাবকত্ব কেবল শারীরিক সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে যখন ‘বৌদ্ধিক সেন্সরশিপে’ রূপ নেয়, তখন তা তাদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে উল্লেখিত বিভিন্ন ইসলামি ফতোয়া ও ধর্মীয় বিধানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে ‘সন্দেহ’ বা ‘বিভ্রান্তি’ (Doubt) তৈরি হওয়াকে চরমভাবে ভয় পাওয়া হয়েছে [13]। কিন্তু যুক্তিশাস্ত্রের দৃষ্টিতে, কোনো সত্য যদি পরম এবং অনড় হয়ে থাকে, তবে তা ভিন্ন কোনো মতাদর্শ বা তথ্যের সংস্পর্শে এলেই ধসে পড়ার কথা নয়। বরং সত্যের শক্তি হওয়া উচিত এমন যে, তা সমস্ত বিপরীতমুখী যুক্তির মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে। যখন শিশুদের অন্য ধর্ম বা জীবনদর্শন সম্পর্কে জানতে বাধা দেওয়া হয়, তখন পরোক্ষভাবে এটিই স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, শিশুদের জন্য নির্ধারিত বিশ্বাসটি সম্ভবত অন্যান্য তথ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো যৌক্তিক সক্ষমতা রাখে না। শায়খ ইবনে বাজ বা ইবনে হাজার আসকালানির দেওয়া নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত বিশ্বাসকে একটি কাঁচের পাত্রের মতো রক্ষা করতে চায়, যা সামান্য আঘাতেই ভেঙে যেতে পারে [17] [23]।

নৈতিকভাবে বিচার করলে, কোনো বিশ্বাস বা আদর্শকে ‘উত্তরাধিকার’ হিসেবে গ্রহণ করার চেয়ে ‘যাচাইকৃত সত্য’ হিসেবে গ্রহণ করা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। একটি শিশুর অধিকার থাকা উচিত পৃথিবী নামক এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের সবটুকুর আস্বাদন নেওয়ার। সে যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে, তখন তার সামনে থাকা সব পথ—ইসলাম, হিন্দুধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, বৌদ্ধধর্ম কিংবা নাস্তিক্যবাদ—সম্পর্কে নিরপেক্ষ জ্ঞান থাকলে তবেই তার গৃহীত সিদ্ধান্তটি প্রকৃত অর্থে ‘তার নিজের’ হবে। অন্যথায়, সে কেবল তার পিতামাতার বিশ্বাসের একটি প্রতিধ্বনি (Echo) হয়ে থাকবে, যাকে অন্ধবিশ্বাস হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করতে হয়। শিশুকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাকে বিপথে ঠেলে দেওয়া, বরং এর অর্থ হলো তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে সে নিজেই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখে। একটি সমাজ তখনই প্রগতিশীল হতে পারে, যখন তার সদস্যরা কেবল অন্ধ অনুসারী না হয়ে বরং প্রজ্ঞাবান ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিতে পরিণত হয়।


শিশুর নিজস্ব অধিকার: চিন্তা, বিবেক এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্য

শিশুর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সিদ্ধান্তের প্রশ্নে শিশুকেই অধিকারধারী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ১৪ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার শিশুর নিজের অধিকার হিসেবে আছে। অভিভাবকের নির্দেশনার অধিকার ও দায়িত্বকে একই অনুচ্ছেদে শিশুর ক্রমবিকাশমান সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। ফলে নির্দেশনার পরিসর নির্ধারণের কেন্দ্রেও শিশুর বিকাশ ও তার নিজের অধিকার রয়েছে। [24]

المادة 14 1. تحترم الدول الأطراف حق الطفل في حرية الفكر والوجدان والدين. 2. تحترم الدول الأطراف حقوق وواجبات الوالدين وآذلك، تبعا للحالة، الأوصياء القانونيين عليه، في توجيه الطفل في ممارسة حقه بطريقة تنسجم مع قدرات الطفل المتطورة. 3. لا يجوز أن يخضع الإجهار بالدين أو المعتقدات إلا للقيود التي ينص عليها القانون واللازمة لحماية السلامة العامة أو النظام أو الصحة أو الآداب العامة أو الحقوق والحريات الأساسية للآخرين.

বাংলা অনুবাদ: অনুচ্ছেদ ১৪। ১. অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো শিশুর চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকারকে সম্মান করবে। ২. শিশুর ক্রমবিকাশমান সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপায়ে নিজের অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাকে নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়ে বাবা-মা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনগত অভিভাবকদের অধিকার ও দায়িত্বকে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো সম্মান করবে। ৩. ধর্ম বা বিশ্বাস প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কেবল এমন সীমা আরোপ করা যাবে, যা আইনে নির্ধারিত এবং জননিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য বা নৈতিকতা অথবা অন্যদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।

এই অধিকারকে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে কার্যকর হবে এমন প্রতিশ্রুতিতে নামিয়ে আনলে শৈশবের শিক্ষাগত ক্ষমতাসম্পর্ক অক্ষত থেকে যায়। শিশুর প্রশ্ন করার ক্ষমতা যত বাড়ে, ততই তাকে উত্তর শোনার, পার্থক্য বোঝার এবং নিজের অবস্থান গঠনের সুযোগ দিতে হয়। অভিভাবকের ভূমিকা তখন বয়স ও সক্ষমতার উপযোগী ব্যাখ্যা, নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার মধ্যে নিহিত। সন্তানের ভবিষ্যৎ মতামত নিজের বিশ্বাসের অনুরূপ হবেই—এই ফল নিশ্চিত করার জন্য তথ্য আটকে রাখা তার স্বতন্ত্র অধিকারকে অভিভাবকের পছন্দের অধীন করে।

তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও সনদের ১৭ অনুচ্ছেদ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎসের তথ্য ও উপকরণ শিশুর নাগালে রাখার কথা বলে। সামাজিক, আত্মিক ও নৈতিক কল্যাণ এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার উপযোগী তথ্যপ্রবাহের পাশাপাশি ক্ষতিকর উপকরণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও একই অনুচ্ছেদে আছে। [25]

المادة 17 تعترف الدول الأطراف بالوظيفة الهامة التي تؤديها وسائط الإعلام وتضمن إمكانية حصول الطفل على المعلومات والمواد من شتى المصادر الوطنية والدولية، وبخاصة تلك التي تستهدف تعزيز رفاهيته الاجتماعية والروحية والمعنوية وصحته الجسدية والعقلية، وتحقيقا لهذه الغاية، تقوم الدول الأطراف بما يلي: (أ) تشجيع وسائط الإعلام على نشر المعلومات والمواد ذات المنفعة الاجتماعية والثقافية ، للطفل ووفقا لروح المادة 29 (ب) تشجيع التعاون الدولي في إنتاج وتبادل ونشر هذه المعلومات والمواد من شتى المصادر الثقافية والوطنية والدولية، (ج) تشجيع إنتاج آتب الأطفال ونشرها، (د) تشجيع وسائط الإعلام على إيلاء عناية خاصة للاحتياجات اللغوية للطفل الذي ينتمي إلى مجموعة من مجموعات الأقليات أو إلى السكان الأصليين، (ه) تشجيع وضع مبادئ توجيهية ملائمة لوقاية الطفل من المعلومات والمواد التي تضر بصالحه، مع وضع أحكام المادتين 13 و 18 في الاعتبار.

বাংলা অনুবাদ: অনুচ্ছেদ ১৭। অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করে এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে শিশুর তথ্য ও উপকরণ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করবে; বিশেষ করে যেসব তথ্য ও উপকরণ তার সামাজিক, আত্মিক ও নৈতিক কল্যাণ এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার উন্নতি ঘটায়। এই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রগুলো: (ক) শিশুর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপকারে আসে এবং ২৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন তথ্য ও উপকরণ প্রচারে গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করবে; (খ) বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এ ধরনের তথ্য ও উপকরণ তৈরি, বিনিময় ও প্রচারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উৎসাহিত করবে; (গ) শিশুদের বই তৈরি ও বিতরণ উৎসাহিত করবে; (ঘ) সংখ্যালঘু গোষ্ঠী অথবা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত শিশুর ভাষাগত চাহিদার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করবে; (ঙ) ১৩ ও ১৮ অনুচ্ছেদের বিধান বিবেচনায় রেখে শিশুর কল্যাণের পক্ষে ক্ষতিকর তথ্য ও উপকরণ থেকে তাকে রক্ষার জন্য উপযুক্ত নির্দেশিকা তৈরি উৎসাহিত করবে।

বিকল্প ধর্ম সম্পর্কে জানা এবং সেই ধর্ম গ্রহণ করা আলাদা কাজ। কোনো শিশু পৃথিবীতে অন্য মানুষ কী বিশ্বাস করে তা জানলে সে তুলনা করার প্রাথমিক উপকরণ পায়। সেই জানাটুকুকেও নিজের ধর্মের পক্ষে আগাম আনুগত্যের শর্তে বেঁধে দিলে শিক্ষা ধর্মীয় সীমানা রক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়। কোনো বক্তব্য গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের যৌক্তিক ক্ষমতা গড়ে তুলতে হলে তার দাবি, প্রমাণ এবং আপত্তি সম্পর্কে পরিচিত হওয়া দরকার। কেবল নিজের ধর্মের নির্বাচিত বর্ণনা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী মত শেখালে প্রতিদ্বন্দ্বীর নিজের বক্তব্য শোনার অভিজ্ঞতা তৈরি হয় না।

তথ্য থেকে শিশুকে রক্ষা করার যুক্তিরও যাচাইযোগ্য বিষয়বস্তু থাকা প্রয়োজন। কোন তথ্য শিশুর কী ক্ষতি করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে শুধু ‘সে নিজের ধর্ম সম্পর্কে সংশয় করতে পারে’ বলা হলে ক্ষতির সংজ্ঞাই নির্ধারিত বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্য হয়ে দাঁড়ায়। একটি যুক্তিসংগত প্রশ্ন, একটি ধর্মীয় দাবির দুর্বলতা অথবা ভিন্ন জীবনদর্শনের সঙ্গে পরিচয় শিশুর চিন্তার বিকাশের অংশ হতে পারে। সেগুলোকে আগেই বিপদ চিহ্নিত করে সরিয়ে দেওয়া শিশুর পক্ষে বিচার করার কাজটি প্রাপ্তবয়স্ক কর্তৃপক্ষের হাতে স্থায়ী করে। নিজের বিশ্বাসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে বাস্তব করতে সেই বিচারক্ষমতা অর্জনের উপকরণও শৈশব থেকে উন্মুক্ত রাখতে হয়।


উপসংহারঃ বৌদ্ধিক মুক্তি এবং একটি মুক্ত সমাজের রূপরেখা

পরিশেষে বলা যায়, শিশুদের কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা আদর্শিক ছাঁচে ঢালাই করা তাদের মৌলিক মানবিক সত্তার এক প্রকার অবমাননা। আমরা যখন কোনো শিশুকে কেবল আমাদের নিজস্ব বিশ্বাসের উত্তরাধিকারী হিসেবে গড়ে তুলি, তখন আমরা আসলে তার অসীম সম্ভাবনাময় চিন্তার জগতকে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বন্দি করে ফেলি। এই প্রবন্ধের আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, বিশেষ করে ইসলামি ফতোয়া ও ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিধানগুলোতে অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানতে যে পদ্ধতিগত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা মূলত একটি গভীর বৌদ্ধিক ভীতি থেকে উদ্ভূত—ভীতিটি হলো বিকল্প দর্শনের মুখোমুখি হওয়া বা তথ্যের অবাধ প্রবাহে নিজস্ব বিশ্বাসের ভিত্তি নড়ে ওঠা [13] [23] [17]।

প্রকৃত শিক্ষা এবং নৈতিকতার দাবি হলো—একটি শিশুকে অন্ধ অনুসারী হিসেবে নয়, বরং একজন সত্যান্বেষী হিসেবে গড়ে তোলা। সত্য যদি সত্যিই শাশ্বত এবং অকাট্য হয়, তবে তাকে কোনো ‘বৌদ্ধিক সুরক্ষা প্রাচীর’ বা সেন্সরশিপ দিয়ে আগলে রাখার প্রয়োজন পড়ে না। বরং বিপরীতমুখী যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই হওয়ার পরেই কোনো সত্যের প্রকৃত মহিমা প্রকাশিত হয়। শিশুদের ওপর শৈশবেই ধর্মবিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে যেমন ক্ষুণ্ণ করে, তেমনি এটি তাদের একপাক্ষিক ও সংকীর্ণ বিশ্ববীক্ষা নিয়ে বড় হতে বাধ্য করে।

একটি প্রগতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য অপরিহার্য হলো শিশুদের চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তাদের জন্য তথ্যের দুয়ার উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে তারা বিশ্বের বিচিত্র ধর্ম, দর্শন ও মতাদর্শ সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান লাভ করতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যখন তারা নিজের প্রজ্ঞা, যুক্তি এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে কোনো পথ বেছে নেবে, কেবল তখনই সেই বিশ্বাস বা জীবনদর্শন প্রকৃত অর্থে সার্থকতা পাবে। শিশুদের ওপর বৌদ্ধিক আধিপত্য বিস্তার না করে তাদের স্বাধীন মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়াই হোক আধুনিক সভ্যতার অঙ্গীকার।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Corriveau, Chen & Harris, Judgments About Fact and Fiction by Children From Religious and Nonreligious Backgrounds ↩︎
  2. Pew Research Center, Shared beliefs between parents and teens, 10 September 2020 ↩︎
  3. সহিহ বুখারি, ১৩৫৯ ↩︎
  4. গাজ্জালি, আল-মুনকিয মিন আদ-দালাল, প্রারম্ভিক আলোচনা ↩︎
  5. গাজ্জালি, ইহইয়া উলুমিদ্দিন, ১/৯৪, কিতাব কাওয়াইদ আল-আকাইদ, যাবিদির ইত্তিহাফে সংরক্ষিত মূল পাঠ ও ব্যাখ্যা ↩︎
  6. গাজ্জালি, ইহইয়া উলুমিদ্দিন, ১/৯৮, ইত্তিহাফে সংশ্লিষ্ট মূল পাঠ ও ব্যাখ্যা ↩︎
  7. ইবন খালদুন, মুকাদ্দিমা, ঊনচল্লিশতম পরিচ্ছেদ: ফি তালিম আল-উলদান ↩︎
  8. মুকাদ্দিমা, একই পরিচ্ছেদের শেষাংশ ↩︎
  9. ইবন কাইয়্যিম, তুহফাত আল-মাওদুদ, ষোড়শ অধ্যায়ের কথা শেখা ও ধর্মশিক্ষা বিষয়ক পরিচ্ছেদ ↩︎
  10. কোরআন, ৬৬:৬ ↩︎
  11. তাফসির ইবন কাসির, সুরা আত-তাহরিম ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা ↩︎
  12. সুনান আবু দাউদ, ৪৯৫ ↩︎
  13. Ruling on teaching false religions to children, IslamQA, 217084 1 2 3
  14. Haashiyat Ibn ‘Aabideen, 1/175 ↩︎
  15. Kashshaaf al-Qinaa‘ ‘an Matn al-Iqnaa‘, 1/434 ↩︎
  16. Fath al-Baari by Ibn Hajar, 13/525 ↩︎
  17. Fatwa of Shaykh Ibn Baaz 1 2 3
  18. আল-বুহুতি, কাশশাফ আল-কিনা, ১/৪৩৪ ↩︎
  19. কোরআন, ২:১৭০ ↩︎
  20. তাফসির ইবন কাসির, সুরা আল-বাকারা ১৭০ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা ↩︎
  21. Ruling on teaching false religions to children ↩︎
  22. ইসলাম কিউঅ্যান্ডএ, ফতোয়া ২১৭০৮৪, প্রকাশনা ও উৎসপরিচয় ↩︎
  23. Fath al-Baari, 13/525 1 2
  24. জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, অনুচ্ছেদ ১৪, সরকারি আরবি পাঠ, ইউনিসেফে ইংরেজি পাঠ ↩︎
  25. জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, অনুচ্ছেদ ১৭, ইউনিসেফে ইংরেজি পাঠ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.