জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

আল্লাহর ‘হও’ নির্দেশ: সৃষ্টি, সর্বশক্তিমানতা ও সর্বজ্ঞতার যৌক্তিক সংকট

প্রকাশিত: জুন 12, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন37 মিনিট পড়া

ভূমিকা

কোরআনে সৃষ্টির ক্ষমতাকে একটি অত্যন্ত সরল বক্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে: আল্লাহ কোনো কিছু ইচ্ছা করলে শুধু বলেন ‘হও’, আর তা হয়ে যায়। এই বক্তব্যকে আল্লাহর সর্বশক্তিমানতার প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এখানে এমন এক ক্ষমতার দাবি করা হচ্ছে, যার সামনে উপকরণ সংগ্রহ, শ্রম, অপেক্ষা কিংবা কোনো বাধা অতিক্রমের প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটি ক্ষমতার ঘোষণা এবং সেই ক্ষমতা দিয়ে কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করা এক বিষয় নয়। ‘আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন’ বললে একজন সৃষ্টিকর্তার নাম পাওয়া যায়; সৃষ্টি কীভাবে সম্ভব হলো, ইচ্ছা থেকে অস্তিত্বে পৌঁছানোর সম্পর্ক কী এবং একটি নির্দিষ্ট ফলের বদলে অন্য ফল কেন ঘটল—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। ‘হও’ শব্দটি এই অনুপস্থিত ব্যাখ্যার জায়গায় বসিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বরং যে প্রক্রিয়া বোঝার কথা ছিল, সেটিকে একটি আদেশের আড়ালে সরিয়ে রাখা হয়।

কোনো শাসক আদেশ দিলে তাঁর অধীনস্থ কর্মীরা সেই আদেশ বাস্তবায়ন করেন। সেখানে আদেশদাতা, আদেশ গ্রহণকারী, বাস্তবায়নের উপায় এবং কাজের ফল—প্রতিটি বিষয়ের পৃথক অস্তিত্ব ও ভূমিকা থাকে। কিন্তু যে বস্তু এখনো অস্তিত্বই পায়নি, তাকে ‘হও’ বলার অর্থ কী? নির্দেশটি কার কাছে পৌঁছায় এবং কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর হয়? আবার আল্লাহর ইচ্ছাই যদি ফল ঘটানোর জন্য যথেষ্ট হয়, তাহলে সেই ইচ্ছার পরে পৃথক নির্দেশের ভূমিকা কী? এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়ে যখন একই ধর্মীয় বর্ণনায় সৃষ্টি সময় নিয়ে সম্পন্ন হয়, মানুষ তৈরিতে উপাদান ও পর্যায়ের উল্লেখ আসে এবং বিভিন্ন কাজের জন্য পৃথক ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। একদিকে সরাসরি কার্যকর সর্বশক্তিমান ইচ্ছার ঘোষণা, অন্যদিকে দূত, লেখক, পর্যবেক্ষক, বাহক ও দণ্ড কার্যকরকারীর বিস্তৃত ব্যবস্থা—এই দুই চিত্রের মধ্যে সম্পর্কটি পরীক্ষা করা জরুরি।

একই সমস্যা সর্বজ্ঞতার দাবির ক্ষেত্রেও দেখা যায়। আল্লাহ যদি মানুষের প্রতিটি কাজ ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ জানেন, তাহলে আমললেখক, পালাক্রমে পর্যবেক্ষক এবং নির্দিষ্ট সময়ে আমল পেশ করার ব্যবস্থা তাঁর জন্য কী কাজ করে? যিনি সব জানেন, তাঁর কাছে প্রতিবেদন কেন পৌঁছাতে হয়? যিনি নিজের ইচ্ছায় সব ঘটাতে পারেন, তাঁর আদেশ বাস্তবায়নের জন্য এত কর্মী কেন নিয়োজিত থাকে? এসব প্রশ্নকে ভক্তির সাহায্যে পাশ কাটিয়ে গেলে দাবিগুলোর যৌক্তিক মূল্য যাচাই করা হয় না। মহাবিশ্ব, মানুষ ও কার্যকারণ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য সত্য দাবি করলে তাকে ব্যাখ্যা ও প্রমাণের পরীক্ষায় আসতেই হবে। এই প্রবন্ধে তাই ‘হও’ বললেই হয়ে যাওয়ার ধারণাটিকে কোরআন, তাফসির এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হবে। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই বক্তব্য বাস্তবতার কোনো বোধগম্য ব্যাখ্যা দেয়, নাকি ব্যাখ্যার পরিবর্তে অসীম ক্ষমতার একটি ঘোষণা প্রতিষ্ঠা করে।


কোরআনের দাবীঃ আল্লাহ হও বললেই তাৎক্ষণিকভাবে সব হয়ে যায়

ইসলাম ধর্মের আকীদা হচ্ছে, আল্লাহ হও বললে সাথে সাথেই তা হয়ে যায় [1]

মারইয়াম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কীভাবে আমার পুত্র হবে, অথচ আমাকে কোন মানব স্পর্শ করেনি’। তিনি বললেন, ‘এভাবেই’ আল্লাহ সৃজন করেন যা তিনি ইচ্ছে করেন, তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, ‘‘হয়ে যাও’’ সুতরাং তা হয়ে যায়।
— Taisirul Quran
সে বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! কিরূপে আমার পুত্র হবে? কোন পুরুষ মানুষতো আমাকে স্পর্শ করেনি; তিনি বললেনঃ এরূপে আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, সৃষ্টি করে থাকেন, যখন তিনি কোন কাজের মনস্থ করেন তখন তিনি ওকে ‘হও’ বলেন, ফলতঃ তাতেই হয়ে যায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
মারইয়াম বলল, ‘হে আমার রব, কিভাবে আমার সন্তান হবে? অথচ কোন মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি’! আল্লাহ বললেন, ‘এভাবেই’ আল্লাহ যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাকে শুধু বলেন, ‘হও’। ফলে তা হয়ে যায়।
— Rawai Al-bayan
সে বলল, ‘হে আমার রব! আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি, এমতাবস্থায় আমার সন্তান হবে কিভাবে?’ তিনি (আল্লাহ্‌) বললেন, ‘এভাবেই’, আল্লাহ্‌ যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, ‘হও’, ফলে তা হয়ে যায় [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

আসুন কোরআনের আরেকটি আয়াতটি পড়ে নিই, [2]

Originator of the heavens and the earth. When He decrees a matter, He only says to it, “Be,” and it is.
— Saheeh International
The Originator of the heavens and the earth! When He decreeth a thing, He saith unto it only: Be! and it is.
— M. Pickthall
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃজনকারী, যখন কোন কাজ করতে মনস্থ করেন, তখন তার জন্য শুধু বলেন, হয়ে যাও, তক্ষুনি তা হয়ে যায়।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা এবং যখন তিনি কোন কাজ সম্পাদন করতে ইচ্ছা করেন তখন তার জন্য শুধুমাত্র ‘হও’ বলেন, আর তাতেই তা হয়ে যায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের উদ্ভাবক। আর যখন তিনি কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জন্য শুধু বলেন, ‘হও’, ফলে তা হয়ে যায়।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


তাফসীর থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যা

এই আয়াতের তাফসীরে তাফসীরে মাযহারী গ্রন্থে যা বলা আছে তা হচ্ছে [3]

সকল প্রকারই আল্লাহতায়ালার ক্ষমতাভূত। তিনি যদি বলেন, ‘হও’ তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। তাঁর ইচ্ছা, কেবল মাতার মাধ্যমে ঈসাকে সৃষ্টি করবেন।

হও

এই আয়াতটির তাফসীরও একইসাথে পড়ে নেয়া জরুরি, [4]

قَوْلَهُ أَي كُفَّارَ مَكَةً : এ সূরাটি মাদানী সূরা হওয়ার পরও الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ -এর তাফসীরে كَثَرُ مَكَ বলার কারণ
কয়েকটি হতে পারে-
১. পূর্ণ সূরা মদনী কিন্তুএ আয়াতটি মক্কী। কিন্তু এ জবাবটি দূরবর্ত
২. এও হতে পারে যে, মক্কার কাফেররা রাসূল-এর কাছে মদীনার ইহুদিদের সম্পর্কে পরিচয় লাভ করেছে।
قَوْلَهُ بَدِيعُ : তিনিই যিনি কোনো অস্ত্র-যন্ত্রের মুখাপেক্ষী নন, যাঁর কোনো মাল-মসলা বা উপকরণ-সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না, যিনি স্থান-অবস্থান ও পরিস্থিতির নিগড়ে আবদ্ধ নন, যিনি সময় বন্ধনের উর্ধ্বে; যিনি কোনো নমুনা স্যাম্পল দেখে বানাবার প্রয়োজন অনুভব করেন না, যার কোনো উস্তাদ প্রশিক্ষকের দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। তিনি সৃজনশীল প্রকৌশলী, তিনি উপকরণ সংযোজক কারিগর নন। প্রকৃত ও বাস্তব অর্থে, আক্ষরিক অর্থে যিনি স্রষ্টা, আবিষ্কারক, অস্তিত্ব বিধায়ক। কারো সহায়তা-সহযোগিতা ছাড়াই আরো কোনোরূপ অংশগ্রহণ ব্যতীতই যিনি নাস্তিজগত থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসেন।
بدیع শব্দের উল্লেখ সেসব মুশরিক পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের মতবাদ খণ্ডনের জন্য হয়েছে, যারা আল্লাহকে শুধু কারিগর [ও মিস্ত্রি[
-এর মর্যাদা দিত এবং আত্মা ও মূল উপকরণকে কোনো না স্তরে তাঁর সহযোগী সহাধ্যায়ী ভাবত। অর্থাৎ যেন মূল ধাতু ও উপকরণ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং তা ছিল অনাদিও নিত্য। কিংবা আত্মা ও তার সঙ্গে সঙ্গে ছিল অনাদি ও নিত্য। আল্লাহ তা’আলার কাজ ছিল শুধু এতটুকু যে তিনি একজন সুদক্ষ কেমিষ্ট রসায়নবিদের ন্যায় বিদ্যমান উপকরণ কেবল আত্মার সংযোজন ও বিন্যাসের কাজটি সুচারুরূপে সমাধা করে নতুন নতুন রূপ ও আকৃতিতে বাজার জাত করেন। কেবল إبداع শব্দটিই মুশরিকদের কল্পিত কল্পনা খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তা’আলার জন্য অন্যান্য পূর্ণাঙ্গ সাবাহকার’ গুণের অনুরূপ সত্তাগত অনাদিত্বের সাথে সাথে সময় কালগত অনাদিত্ব (১) সাব্যস্ত রয়েছে। কাল বলতে যা বোস, তিনি তার চেয়েও আদি অগ্রবর্তী। এমন একটি সময় [ও কাল] ছিল যখন [কাল বলতে কিছুই ছিল এ এবং মহাকাল নামেন সে অকালে) শুধু তিনিই ছিলেন, আর কিছুই ছিল না, প্রান্ত দিগন্ত, সত্তা অস্তিত্ব [জড় অজড়, দেহ, অদেহ] কিছুই ছিল না।

-তাফসীরে মাজেদী খ. ১. পৃ. ২১৪)

তাফসীরে জালালাইন আরবি-বাংলা, প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা ২৯৯
জন্য দুটি کون অথবা বলা যায় موجود واحد -এর জন্য দুটি وُجُود হওয়া লাজেম আসে। কেননা মুখাতাব হওয়ার জন্য কোনো বস্তুর বিদ্যমান থাকা জরুরি। অন্যথায় অনুপস্থিত ও অবিদ্যমান বস্তুকে সম্বোধন করা লাজেম আসবে, যা সঠিক নয়।
উত্তর: উত্তরের সারকথা হলো
শব্দটি ার্স-এর অর্থে।
কুন বলা দ্বারা শুধু এতটুকু বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ওদিকে আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা হলো আর তৎক্ষণাৎ এদিকে কোনো মাধ্যম ও বিরতি ছাড়াই তা বাস্তবে প্রকাশমান হলো। তাফসীরে মাদারিকে আছে-
وَهَذَا مَجَازَ عَنْ سُرْعَةِ التَّكْوِينِ وَالتَّمْشِيلِ إِذْ لَا قَوْلًا ثُمَّ
অর্থ: এটি আজ্ঞা পালন ও সৃষ্টি হওয়া এর দ্রুততা বুঝাবার রূপক। কেননা সেখানে তো আর কোনো কথা [বা বলা)-র অস্তিত্ব নেই। -তাফসীরে মাদারিক।
قوله کن : অর্থাৎ নিরেট অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ববান হয়ে যাও, ‘না’ থেকে ‘হ্যাঁ’ হয়ে যাও। এর অর্থ এমন নয় যে, আল্লাহ তা’আলা আপনার আমার মতো এ দুই বর্ণের ‘কুন’ (১) হও শব্দটি উচ্চারণ করেন। কেননা বর্ণ এবং শব্দও তো সৃষ্ট )حادث( অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বপ্রাপ্ত অনিত্য। এবং আল্লাহ পাক জিহ্বা, ওষ্ঠ ও ধমনী কোষাশ্রয়ী উচ্চারণের মুখাপেক্ষীও নন। তবে তার সৃজন প্রক্রিয়াকে বান্দাদের বুঝ উপযোগী ও তাদের বোধ-এর যথাসম্ভব নিকটবর্তী বর্ণনা পদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গি আর
কি গ্রহণ করা যেত?
[তাকে সর্বনামটি সে বিষয়ের জন্য যা এখনও বাহ্য অস্তিত্ব লাভ করেনি, তবে আল্লাহ তা’আলার ইলমে তো তা যথারীতি বিদ্যমানই রয়েছে। আর আল্লাহ তা’আলার আদেশের অভিমুখে আদিষ্টও বিদ্যমান-এর মাঝে সময়ের বিচারে কোনো ব্যবধান নেই। যে কোনো আদিষ্ট অর্থই বিদ্যমান হওয়া এবং বিদ্যমান মানেই আদিষ্ট হওয়া।
أَمَرَهُ لِلشَّيْ بِكُنْ لَا يَتَقَدَّمُ الْوُجُودُ وَلَا يَتَآخَرُ عَنْهُ فَلَا يَكُونُ مَامُوراً بِالْوُجُودِ إِلَّا وَهُوَ مَوْجُودُ بِالْأَمْرِ وَلَا مَوْجُودًا بالأمْرِ إِلَّا وَهُوَ مَا مُورَ بِالْوُجُودِ .
অর্থাৎ কুন দ্বারা কোনো কিছুকে তাঁর আদেশ ঐ বিষয়ের অস্তিত্বের আগেও নয় অস্তিত্বের পরেও নয়। যা কিছু অস্তিত্ব লাভে আদিষ্ট তা আদেশ সংযোগে [আদেশ জগতে। বিদ্যমানই; এবং যা-ই আদেশে বিদ্যমান, তাই অস্তিত্ব লাভে আদিষ্ট। অর্থাৎ এখানে আদিষ্টও অস্তিত্ব সম্পন্ন বলে কোনো ভেদরেখা কার্যত টানা যায় না। ইবনু জারীর সূত্রে মাজেদী খ. ১, পৃ. ২১৫)
قَولَهُ كُنْ فَيَكُونَ : এখানে ১ টি সম্পূর্ণ ক্রিয়া (মتَامَّ( : অসম্পূর্ণ )نَاقِصَة( নয়। অর্থাৎ হয়ে যা, অস্তিত্বে এসো- এর সমার্থক, অমুক বিষয়রূপে হয়ে যা-এর সমার্থক নয়। এটি ২৩ জাতীয় র্থ অর্থাৎ اَحْدَثَ অস্তিত্বে আয়, হও ফলে তখনই
তা অস্তিত্ববান হয়।
قَوْلُهُ فَيَكُونُ : অর্থাৎ ব্যাস, তখনই ঐ বিষয়টি অস্তিত্বে এসে যায়। হয়ে যেতে কোনোও বিলম্ব হয় না এবং তার জন্য কারো সহায়তা, মাধ্যম হওয়া, অংশগ্রহণ করা ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না। এ শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য বিষয়বস্তুর অস্তিত্ব বিধানে আল্লাহ তা’আলার কুদরতের অতি দ্রুত বাস্তবায়ন বুঝানো-
الْمُرَادُ مِنْ هَذِهِ الكَلِمَةِ سُرْعَة نِفَاذِ قدرة الله تعالى في تكوين الاشياء . (كبير)
এ যেন মুশরিকদের প্রতিই সম্বোধন যে, আল্লাহ তা’আলার সৃজন প্রক্রিয়া তোমাদের বোধগম্য হলো কি? তাতে তো আল্লাহ তা’আলার ইরাদা ব্যতীত অন্য কোনো কিছুরই অংশ গ্রহণের অবকাশ নেই। সুতরাং এতে তোমাদের অংশীবাদের ভিত্তিই ধ্বংস যায়।
প্রশ্ন: فانّما يقول له كن فيكون দ্বারা জানা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা কোনো অবিদ্যমান বস্তুকে অস্তিত্বে আনার ইচ্ছা করলে তাকে বলেন। ফলে সে অস্তিত্বহীন বস্তু অস্তিত্বশীল হয়ে যায়। এতে তো معدوم বস্তুকে সম্বোধন করা লাজেম আসে।
উত্তর: আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাতেই সে অস্তিত্বহীন বস্তু অস্তিত্বশীল বস্তুর হুকুমে হয়ে যায়। সুতরাং সম্বোধন করা সঠিক আছে।

1 كُن فيكون দ্বারা তাড়াতাড়ি উদ্দেশ্য, উদ্ভাবন উদ্দেশ্য নয়।

হও 1
হও 3

দাবীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা

আল্লাহ বলতে পারতেন, মহাবিশ্বের উদ্ভব প্রক্রিয়াটি জটিল, যা মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে তোমরা বুঝবে না। সেটি না করে তিনি কিছু দাবি করেছেন, যেই দাবিগুলো বিশ্লেষণ করলে তা অসংখ্য জটিল প্রশ্নের জন্ম দেয়, যা কোরআনের দাবিকে ভালভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি এগুলো মানুষের জ্ঞানের বাইরেই হয়, তাহলে আল্লাহ কোরআনে যেই কথাটি বলেছেন, সেটিই বা বললেন কেন? আল্লাহ কি চান, আমরা মানুষেরা না বুঝে, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে এই অজুহাতে তার দাবিটি অন্ধভাবে মেনে নিই? তাহলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব বা ওডিন, জিউস বা অন্য ধর্মের ঈশ্বরেরা কী দোষ করলো? মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার দাবি করে তারাও বা সেই ধর্মের মানুষও তো বলতে পারে, মানুষ সেসব রহস্য বুঝবে না। তাহলে তাদের কথা কেন মানবো না? যুক্তি তো সকল ঈশ্বরের ক্ষেত্রেই একইভাবে ব্যবহার করতে হবে।

আর আল্লাহ যেহেতু দাবিটি করেই ফেলেছেন, তাই সেই দাবিটিকে বিশ্লেষণ করা তো অবশ্যই জরুরি। আমরা যদি কিছুই না বুঝি, তাহলে আল্লাহর বলা এই আয়াতটি একটি অর্থহীন আয়াত হিসেবে পাঠ করার তো কোনো উপযোগ থাকতে পারে না। আল্লাহরও এরকম অবোধ্য আয়াত নাজিলের কোন যৌক্তিকতা থাকে না।


‘হও’ নির্দেশের লজিক্যাল অসংগতি

প্রথমত, ‘হও’ একটি শব্দ, একটি মৌখিক বা মানবীয় নির্দেশ। এর ভাষাগত দিক যদি আমরা বাদ দিই, শুধুমাত্র একে একটি নির্দেশনামূলক বক্তব্য ধরি, তাহলে এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, যেকোনো নির্দেশের কার্যকারিতা নির্ভর করে একটি প্রাপক সত্তার ওপর, যিনি সেই নির্দেশ গ্রহণ করবেন, বুঝবেন এবং কার্যকর করবেন।

আমরা যদি কোরআনের এই দাবিটিকে মহাবিশ্বের উদ্ভবের বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করি, তাহলে দুইটি ব্যাপার ঘটা সম্ভব:

  • আল্লাহ নিজেই ‘হও’ বলছেন এবং নিজেই তা কার্যকর করছেন। এখানে আল্লাহই নির্দেশদাতা এবং নির্দেশ বাস্তবায়নকারী।
  • আল্লাহ শুধু ‘হও’ বলছেন এবং একটি তৃতীয় পক্ষ নির্দেশটি শুনেছে, বুঝেছে এবং বাস্তবায়ন করেছে। এখানে আল্লাহ নির্দেশদাতা এবং অন্যকেউ নির্দেশ বাস্তবায়নকারী।

এই দুই সম্ভাবনাকে চিত্রিত করতে নিম্নোক্ত ডায়াগ্রামটি বিবেচনা করা যায় (যা অরিজিনাল প্রবন্ধে প্রদত্ত): বাম পাশে আল্লাহ ‘হও’ বলছেন, কিন্তু মাঝে একটি প্রশ্নচিহ্ন (কোনো গ্রাহক সত্তা নেই), এবং নিচে মহাবিশ্বের চিত্র। ডান পাশে আল্লাহ নিজেকে মেগাফোন দিয়ে ‘হও’ বলছেন এবং নিজেই গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করছেন, নিচে মহাবিশ্ব। এটি দেখায় যে নির্দেশ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র সত্তা প্রয়োজন।

হও 5

সমস্যাটি হচ্ছে, একটি নির্দেশ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য স্বাভাবিকভাবেই দুটি ভিন্ন সচেতন সত্তা থাকা বাঞ্ছনীয়। যদি বলা হয় যে নির্দেশ পাওয়ার জন্য কোনো বাহ্যিক সত্তার প্রয়োজন নেই, তাহলে ‘হও’ বলার কোনো কার্যকারিতা থাকে না, বরং হও বলাটাই স্ববিরোধী। এটি ঈশ্বরকে এমন এক সত্তায় পরিণত করে, যিনি নিজেই নিজের কথা শোনেন এবং নিজেই নিজের নির্দেশে সাড়া দিয়ে তা বাস্তবায়ন করেন – যা সচেতনতা বা আত্ম-সচেতনতার ধারণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কার্যকারণ যুক্তির পরিপন্থী। এই ব্যাখ্যা ঈশ্বরকে উদ্ভট একটি যুক্তিহীন চরিত্রে পরিণত করে, যে নিজেই নিজেকে নির্দেশ দেয় এবং নিজেই তা বাস্তবায়ন করে।

‘হও’ নির্দেশের লজিক্যাল ডায়াগ্রাম
সম্ভাবনা ১
আল্লাহ
(নির্দেশদাতা)
⬇️
“হও”
[ ? ]
(কোনো গ্রাহক সত্তা নেই)
⬇️
মহাবিশ্ব
সম্ভাবনা ২
আল্লাহ
(নির্দেশদাতা)
⬇️
“হও” 📢
আল্লাহ
(নিজেই গ্রাহক সত্তা)
⬇️
বাস্তবায়ন
মহাবিশ্ব
সারসংক্ষেপ: একটি নির্দেশ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য স্বাভাবিকভাবেই দুটি ভিন্ন সচেতন সত্তা থাকা বাঞ্ছনীয়। বাহ্যিক সত্তা না থাকলে নির্দেশটি যৌক্তিকভাবে স্ববিরোধী হয়ে দাঁড়ায়।

পদার্থ সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক অসম্ভবতা

দ্বিতীয়ত, কোনো কিছুর অস্তিত্ব লাভের জন্য উপাদান, শক্তি এবং সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র অনুসারে, শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হওয়া যুক্তি বা বিজ্ঞানের জগতের সংরক্ষণশীলতার নীতিগুলির পরিপন্থী। আধুনিক বিগ ব্যাং তত্ত্বও ‘শূন্য’ বলতে আক্ষরিক অর্থে ‘কিছু না’ বোঝায় না; বরং একটি অতি-ঘন, অতি-উষ্ণ অবস্থা (সিঙ্গুলারিটি) থেকে স্থান, সময় এবং পদার্থ-শক্তির উদ্ভব ঘটেছে বলে ব্যাখ্যা করে। এই বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে, কেবল ‘হও’ বললেই শূন্য থেকে জগৎ তৈরি হয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মতভাবে তাৎপর্যহীন। এই ধারণাটি প্রাকৃতিক নিয়ম এবং কার্যকারণ সম্পর্ককে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে।


সময়, ইচ্ছা এবং পরিবর্তনের দার্শনিক সমস্যা

এছাড়াও, দর্শনের এক কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো: “কিভাবে কোনো কিছু নেই থেকে কিছু হতে পারে?” যদি বলা হয় ঈশ্বর চিরকাল বিদ্যমান, তাহলে ঈশ্বরের ইচ্ছারও একটি সময়িক (সময়-নির্ভরশীল) রূপ আছে বলে ধরে নিতে হয় — অর্থাৎ, কোনো এক নির্দিষ্ট মুহূর্তে তিনি ‘ইচ্ছা’ করলেন যে জগৎ হোক। যেই মুহূর্তে তিনি ইচ্ছাটি করলেন, তার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ইচ্ছাটি তাহলে ছিল না।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এর আগে কেন তিনি এই ইচ্ছা করলেন না? ইচ্ছা করার জন্য মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন, আর মানসিক পরিবর্তন মানেই সময়ের অস্তিত্ব, কারণ সময় হলো পরিবর্তনের পরিমাপ। কিন্তু ঈশ্বর যদি সময়-নিরপেক্ষ হন, তাহলে তার ইচ্ছারও পরিবর্তন হতে পারে না। ইচ্ছাটিও আদি ও অনন্ত হতে হবে। আর মহাবিশ্ব সৃষ্টির ইচ্ছাটি যদি আদি ও অনন্ত হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহর তো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি তো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা ভিন্ন অন্য কোনো ইচ্ছা করতেই পারতেন না, যেহেতু তার ঐ ইচ্ছাটি আদি ও অনন্ত।

আবার, আল্লাহর ইচ্ছা যদি একটি সময়িক (সময়-নির্ভরশীল) ঘটনা হয়, তবে আল্লাহ সময়ের অন্তর্গত হয়ে পড়েন; আর যদি তা চিরন্তন হয়, তাহলে জগতের শুরু কেন একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে হলো? তার পূর্বে আল্লাহ কিসের অপেক্ষায় ছিলেন? এই ধারণায় একটি গভীর দার্শনিক সংকট নিহিত। যদি ঈশ্বর শূন্য থেকে সৃষ্টি করে থাকেন, তবে সৃষ্টি এবং শূন্যতার মাঝখানে এমন এক সত্তা বা প্রক্রিয়া থাকতে হয়, যা মধ্যবর্তী বা আন্তঃসম্পর্কের ধরন বোঝাতে পারে — যা আবার ঈশ্বর ছাড়াও যুক্তিবাদী কাঠামোয় অনুসন্ধানযোগ্য হওয়া দরকার। কারণ যুক্তির নিয়ম অনুসারে, প্রত্যেক কার্যের একটি কারণ থাকা চাই। ‘হও’ যদি একটি কার্য-কারণ সম্পর্কের বাহক হয়, তাহলে এটি একটি কার্যকর ‘কারণ’ হতে পারে কেবল তখনই যখন তার পরিণতি ঘটানোর প্রক্রিয়া বা মাধ্যম বিদ্যমান থাকে। অন্যথায় এটি একটি অযৌক্তিক দাবি যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কোরআনের অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতাও এখানে স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। কোরআনের একাধিক আয়াতে দাবি করা হয়েছে যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন [5]। এখন যৌক্তিক প্রশ্ন হলো, ঈশ্বরের কেবল ‘হও’ বলাই যদি সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট হয় এবং তা নির্দেশমাত্রই তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করে, তবে এই ছয় দিন বা দীর্ঘ সময় ধরে পর্যায়ক্রমিক সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিল? ‘হও’ বলার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সৃষ্টি এবং ছয় দিনে ধাপে ধাপে সৃষ্টির এই সাংঘর্ষিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, এটি কোনো সুসংহত মহাজাগতিক নিয়ম নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রচিত এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত পৌরাণিক ধারণার একটি অগোছালো সংমিশ্রণ মাত্র।


মহাবিশ্বের জটিলতা উপেক্ষা

আরও একটি গুরুতর সমস্যা হলো, ‘হও’ বললেই কিছু হয়ে যায় – এমন চিন্তা মহাবিশ্বের জটিলতা এবং পরিপার্শ্বিক কার্যকারণ নীতিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে। আজকের মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা, শক্তি, আইন এবং গঠনের পিছনে যে সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও সম্পর্ক বিদ্যমান, তা কোনো বোধগম্য ভাষাগত নির্দেশে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। যেমন, হিগস বোসনের আবিষ্কার (যা ২০১২ সালে CERN-এ নিশ্চিত হয়েছে এবং যা কণার ভর প্রদান করে) কিংবা ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির গঠন (যা মহাবিশ্বের ৯৫% ভর-শক্তি গঠন করে কিন্তু অদৃশ্য) ব্যাখ্যার জন্য শত শত বছর গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়। অথচ যদি একটি ‘হও’ বলায় সব তৈরি হয়ে যায় – তাহলে “আল্লাহর জ্ঞান অসীম” এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তার সৃষ্টি পদ্ধতিকে একটি শিশুসুলভ জাদুকরী কাজে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। এটি এক ধরনের জ্ঞানগত অলসতা, যা মহাবিশ্বের বিস্ময়কর জটিলতাকে অস্বীকার করে এবং মানবীয় জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টাকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য করে।


ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব এবং প্রাচীন ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুখের কথার বা নির্দেশের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির এই ধারণাটি (Creation by fiat) ইসলামের নিজস্ব কোনো মৌলিক বা অভিনব দর্শন নয়। প্রাচীন মিশরের ‘মেমফাইট থিওলজি’-তে বিশ্বাস করা হতো যে, দেবতা ‘তাহ’ (Ptah) তার মনের ইচ্ছা এবং মুখের উচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে সবকিছুর সৃষ্টি করেছেন [6]। একইভাবে, হিব্রু বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায়েও “ঈশ্বর বললেন… আর তা হয়ে গেল” কাঠামোর বহুল ব্যবহার রয়েছে [7]। অর্থাৎ, এটি প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই প্রচলিত একটি অতিপরিচিত পৌরাণিক মোটিফ (Mythological motif), যা কোরআন পূর্ববর্তী ধর্ম ও লোককথা থেকে ধার করে নিজের মতো করে আত্মস্থ করেছে।

দর্শনের আলোকে এই কথাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ‘হও’ মূলত মরু আরবের অশিক্ষিত মানুষকে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা বোঝাবার জন্য একটি ভাষাগত দাবি মাত্র। কিন্তু যখন একে বাস্তব জগতের অস্তিত্ব বা উদ্ভবের ব্যাখ্যা হিসেবে নেওয়া হয়, তখন তা যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়ে। এই ‘হও’ শব্দটির কোনো দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব নেই, কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা এটি দেয় না, শুধুমাত্র এই দাবিকে অন্ধবিশ্বাস করতে বলে, যা জ্ঞানের পরিপন্থী। এটি কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা আমাদের দিচ্ছে না, বরং মানব জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং মহাবিশ্বের অসীমতার ধারণা দিয়ে আমাদের অন্ধভাবে অযৌক্তিক দাবিকে মেনে নিতে উৎসাহিত করে। এটি ঈশ্বরের ক্ষমতাকে এমন এক সরলীকৃত রূপে উপস্থাপন করে, যা মানুষকে আসলে কোনো জ্ঞান না দিয়েও জ্ঞান দেয়ার ভান করে, কিন্তু এর গভীরতর অর্থ অন্বেষণ করতে গেলে আমাদের যুক্তির সীমানা প্রসারিত করা তো দূরের কথা, বরং তাকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হয়।


তাৎক্ষণিকভাবে না হওয়ার উদাহরণ সমূহ

কোরআনে একটি মৌলিক ধারণা হলো আল্লাহর ইচ্ছা বা নির্দেশের তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা। সূরা ইয়াসিন (36:82)-এ বলা হয়েছে: “তার নির্দেশ শুধু এই যে, যখন তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাকে বলেন ‘হও’—এবং তা হয়ে যায়।” এই আয়াতটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং সর্বশক্তিমানতাকে তুলে ধরে, যা ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় বিশ্বাস। অথচ কোরআন এবং হাদিসসমূহে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে আল্লাহর ইচ্ছা বা নির্দেশ প্রকাশিত হওয়ার পরও তা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন ওঠে যে, যদি ‘হও’ নির্দেশটি সত্যিই তাৎক্ষণিক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তাহলে কেন অনেক ক্ষেত্রে সময়, প্রক্রিয়া বা উপাদানের প্রয়োজন পড়ে? এই অসঙ্গতিগুলো সর্বশক্তিমানতার সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ সর্বশক্তিমান সত্তার কোনো সীমাবদ্ধতা থাকার কথা নয়—যেমন সময়ের অপেক্ষা বা বাহ্যিক উপাদানের নির্ভরতা। নীচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে, এবং যেখানে সম্ভব সোর্স উল্লেখ করা হয়েছে। যদি কোনো দাবির জন্য সরাসরি প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে।


মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে সময় বনাম তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা

কোরআনে (2:117)-এ বলা হয়েছে যে, আল্লাহ কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চাইলে শুধু ‘হও’ বলেন, এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে যায়—সময় কোনো বাধা নয়। এটি সর্বশক্তিমানতার একটি প্রতিফলন, যেখানে সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে অস্তিত্ব লাভ করে। কিন্তু কোরআনের অন্যান্য আয়াতে মহাবিশ্ব সৃষ্টির বর্ণনা এই ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, সূরা আল-আরাফ (7:54) এবং সূরা ইউনুস (10:3)-এ বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আকাশমণ্ডল এবং পৃথিবী সৃষ্টি করতে ছয় দিন সময় নিয়েছেন [8] । এছাড়া সূরা ফুসসিলাত (41:9-12)-এ বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে: পৃথিবী সৃষ্টি করতে দুই দিন, পর্বতসমূহ এবং জীবিকার ব্যবস্থা করতে আরও চার দিন (যা মোট ছয় দিনের অন্তর্ভুক্ত), এবং আকাশমণ্ডল সাতটি স্তরে সৃষ্টি করতে আরও দুই দিন। কিছু ব্যাখ্যাকার দাবি করেন যে এখানে ওভারল্যাপ রয়েছে এবং মোট ছয় দিনই, কিন্তু যৌক্তিকভাবে যদি গণনা করা হয় (2+4+2=8), তাহলে অসঙ্গতি দেখা যায়। যদি ‘হও’ নির্দেশটি সত্যিই তাৎক্ষণিক হয়, তাহলে কেন এই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় কয়েক দিনের সময় লাগবে? এটি প্রমাণ করে যে, ঐশ্বরিক ইচ্ছা সময়ের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত নয়, যা সর্বশক্তিমানতার সাথে সরাসরি বিপরীত। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, যা ‘ছয় দিন’ ধারণার সাথে মিলে না, কিন্তু এখানে ফোকাস কোরআনের অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতির উপর।


মানুষ সৃষ্টিতে উপাদানের প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা

মানুষ বা আদম সৃষ্টির বর্ণনায় কুরআনে বলা হয়েছে যে, আদমের ক্ষেত্রেও আল্লাহর নির্দেশ ছিল কেবল ‘হও’, এবং তিনি হয়ে গেলেন [9]। অথচ একইসাথে কোরআনের একাধিক স্থানে দাবি করা হয়েছে যে, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে কাদা মাটি, শুকনা মাটি বা পোড়ামাটির মতো উপাদান থেকে [10]। একইসাথে ইসলামের আদমকে তৈরির যেই গল্প রয়েছে, সেখানে আরও বিস্তারিতভাবে বিভিন্ন ধাপ জানা যায় [11]। যদি ‘হও’ নির্দেশটিই কোনো কিছু সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তবে সেখানে কাঁচামাল বা মাটির মতো প্রাকৃত উপাদানের ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা থাকার কথা নয়। উপাদানের ব্যবহার এবং একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার (মাটি থেকে মানুষে রূপান্তর) মধ্য দিয়ে যাওয়া নির্দেশ করে যে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং একটি জাগতিক নির্মাণ প্রক্রিয়ার সমতুল্য। যেখানে কোনো উপাদানের প্রয়োজন পড়ে, সেখানে স্রষ্টা সেই উপাদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা তার হও বললেই ‘তাৎক্ষণিক সৃষ্টি’ করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তোলে।


আবু লাহাবের ধ্বংসের নির্দেশ ও বিলম্বিত বাস্তবায়ন

আল্লাহর নির্দেশের তাৎক্ষণিক কার্যকারিতার বিপরীতে আবু লাহাবের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুসারে, মুহাম্মদ যখন সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের সতর্ক করেন, তখন আবু লাহাব তাকে অপমানজনক কথা বলে। এর প্রেক্ষিতে সূরা আল-মাসাদ নাজিল হয়, যেখানে বলা হয়— “আবু লাহাবের হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক” [12]। লক্ষ্যণীয় যে, কুরআনের এই ভাষাটি কেবল একটি ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং এটি একটি ঐশ্বরিক ডিক্রি বা ধ্বংসের নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপিত। যদি আল্লাহর নির্দেশ ‘হও’ বলার মতোই কার্যকর হতো, তবে এই ঘোষণার সাথে সাথেই আবু লাহাবের ধ্বংস হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য ও হাদিস অনুসারে, এই অভিশাপ বা নির্দেশের পরেও আবু লাহাব প্রায় দশ বছর জীবিত ছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে ইসলামের বিরোধিতা করে গেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একটি সরাসরি ধ্বংসের নির্দেশ বাস্তবায়িত হতে এক দশকের দীর্ঘ সময় লাগা এটিই নির্দেশ করে যে, ঐশ্বরিক ইচ্ছা বা নির্দেশ সর্বদা তৎক্ষণাৎ কার্যকর হয় না, যা ‘কুন ফায়াকুন’ ধারণার যৌক্তিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় [13] [14]

আবূ লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক
এবং ধ্বংস হোক সে নিজে,
কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ
ও যা সে উপার্জন করেছে।
সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে
এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে,
তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে।

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬৫/ কুরআন মাজীদের তাফসীর
পরিচ্ছেদঃ ৬৫/২৬/২. আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীঃ তোমার নিকট আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও এবং (মু’মিনদের প্রতি) বিনয়ী হও। (সূরাহ শু‘আরা ২৬/২১৪-২১৫)
اخْفِضْ جَنَاحَكَ ’’তোমার পার্শ্ব নম্র রাখ।
৪৭৭০. ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِيْنَ এ আয়াত অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা (পর্বতে) আরোহণ করলেন এবং আহবান জানালেন, হে বানী ফিহর! হে বানী আদী! কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে। অবশেষে তারা জমায়েত হল। যে নিজে আসতে পারল না, সে তার প্রতিনিধি পাঠাল, যাতে দেখতে পায়, ব্যাপার কী? সেখানে আবূ লাহাব ও কুরাইশগণও আসল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বল তো, আমি যদি তোমাদের বলি যে, শত্রুসৈন্য উপত্যকায় চলে এসেছে, তারা তোমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল, হাঁ আমরা আপনাকে সর্বদা সত্য পেয়েছি। তখন তিনি বললেন, ’’আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করছি।’’ আবূ লাহাব [রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে] বলল, সারাদিন তোমার উপর ধ্বংস নামুক! এজন্যই কি তুমি আমাদের জমায়েত করেছ? তখন অবতীর্ণ হল, ’’ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের হস্ত দু’টি এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার অর্জন তার কোন উপকারে লাগেনি।’’ [১৩৯৪] (আধুনিক প্রকাশনীঃ , ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৪০৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)


‘হও’ বললেই সব হয়, তাহলে এত ফেরেশতা ও দপ্তর কেন?

কোরআনে আল্লাহর ক্ষমতার শুধু ‘হও’ বলার সাথে সাথেই তা হয়ে যাওয়ার বিবরণ আরো জটীল আকার ধারণ করে বিভিন্ন ইসলামিক দাবির সাথে যখন একসাথে পড়া হয়। এই বিবরণে তাঁর ইচ্ছা ও ফলাফলের মাঝখানে কোনো কর্মচারী, বাহক, লেখক, প্রহরী কিংবা বাস্তবায়নকারী বাহিনীর কথা নেই। অথচ কোরআন ও হাদিসের অন্য বিবরণগুলোতে একটি বিস্তৃত ফেরেশতা-ব্যবস্থা উপস্থিত: একজন ওহি নিয়ে আসেন, একজন বৃষ্টি ও উদ্ভিদের দায়িত্বে থাকেন, একজন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন, কেউ প্রাণ নেন, কেউ মানুষের কাজ লেখেন, কেউ কবরের জিজ্ঞাসাবাদ করেন, কেউ জান্নাত-জাহান্নামের প্রবেশদ্বার ও শাস্তির কাজে নিযুক্ত থাকেন, আবার একদল আল্লাহর আরশ বহন করেন। ফলে সৃষ্টি ও বিশ্বপরিচালনার বিবরণে একই সঙ্গে দুটি ব্যবস্থা সামনে আসে—একদিকে সরাসরি কার্যকর ঐশ্বরিক ইচ্ছা, অন্যদিকে আলাদা কাজের জন্য আলাদা সৃষ্ট কর্মী ও মাধ্যম [15] [16]।

এই দায়িত্ববিভাগের সঙ্গে মানুষের রাষ্ট্র ও রাজদরবারের পরিচিত সাদৃশ্য রয়েছে। রাজা নিজে সব জায়গায় যেতে পারেন না, সব তথ্য জানতে পারেন না, সব কাজ একা করতে পারেন না; তাই তাঁর দূত, সৈন্য, লেখক, প্রহরী, দণ্ড কার্যকরকারী এবং প্রশাসনিক কর্মচারী লাগে। একটি রাষ্ট্রে আলাদা মন্ত্রণালয় থাকার কারণও কাজের পরিমাণ, বিশেষায়িত দক্ষতা এবং মানুষের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু আল্লাহকে সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ বললে এই সীমাবদ্ধতাগুলো তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। তখন প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট হয়: যে কাজ সরাসরি ঐশ্বরিক ইচ্ছায় সম্পন্ন হতে পারে, সেই কাজে ফেরেশতা কোন অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে? যে তথ্য আগে থেকেই সম্পূর্ণ জানা, তা লেখার ও প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা কী ব্যাখ্যা করছে? যে আরশ একটি ইচ্ছাতেই স্থিত থাকতে পারে, সেটি বহনের জন্য বিশালাকৃতির সৃষ্ট বাহক নিয়োগের কার্যগত কারণ কী?


ফেরেশতাদের কাজের বিভাগ: দূত, লেখক, প্রহরী ও দণ্ড কার্যকরকারী

কোরআন, হাদিস এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ফেরেশতাদের কাজ নির্দিষ্টভাবে ভাগ করা হয়েছে। এই ভাগগুলো পাশাপাশি রাখলে ওহি পৌঁছানো থেকে মৃত্যু, বিচার, শাস্তি ও মহাপ্রলয় পর্যন্ত একটি দায়িত্ববণ্টিত ব্যবস্থার ছবি পাওয়া যায়। নিচের সারণিতে ফেরেশতা বা ফেরেশতাদের দল, তাদের ওপর অর্পিত কাজ এবং সেই বিবরণের সূত্র দেওয়া হলো। এখানে মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে তুলনাটি কাজের বিভাজন বোঝায়: বার্তাপ্রেরণ, আবহাওয়া, প্রাণহরণ, নথি সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, জিজ্ঞাসাবাদ ও দণ্ড কার্যকরের জন্য পৃথক ভূমিকা বর্ণিত হয়েছে।

ফেরেশতা বা ফেরেশতাদের দলদায়িত্ব ও দপ্তরসম কাজরেফারেন্স
জিব্রাইলওহি ও বার্তাপ্রেরণ: আল্লাহর অনুমতিক্রমে মুহাম্মদের হৃদয়ে কোরআন পৌঁছানো।কোরআন, ২:৯৭
মিকাইলবৃষ্টি ও উদ্ভিদ: ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বৃষ্টি ও উদ্ভিদের দায়িত্বে নিযুক্ত; ইবন কাসীরের বর্ণনায় তাঁর সহায়কেরা বায়ু ও মেঘ পরিচালনার কাজ করেন।ইবন কাসীরের উদ্ধৃত বক্তব্য; দায়িত্ববিষয়ক আলোচনা
ইসরাফিলশিঙ্গা ও মহাপ্রলয়: ধর্মীয় ব্যাখ্যায় শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার দায়িত্বে নিযুক্ত। হাদিসে শিঙ্গাধারীর মুখে শিঙ্গা নিয়ে আদেশের অপেক্ষায় থাকার বিবরণ রয়েছে।ইসরাফিলের দায়িত্ব; তিরমিযী, ২৪৩১; কোরআন, ৩৯:৬৮
মালাকুল মাউত ও প্রাণগ্রহণকারী ফেরেশতারাপ্রাণহরণ: মানুষের প্রাণ গ্রহণের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেশতা এবং প্রাণগ্রহণকারী দূতদের উল্লেখ রয়েছে।কোরআন, ৩২:১১; ৬:৬১
আরশবাহক ফেরেশতারাআরশ বহন: কিয়ামতের দিনে আটজনের আরশ বহনের উল্লেখ; আরশবাহক ও তার চারপাশের ফেরেশতারা প্রশংসা এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনাও করেন।কোরআন, ৬৯:১৭; ৪০:৭; আবু দাউদ, ৪৭২৭
কিরামান কাতিবীন ও আমললেখক ফেরেশতারানথি সংরক্ষণ: মানুষের কাজ ও উচ্চারিত বক্তব্য পর্যবেক্ষণ এবং লিখে রাখা; ডানে ও বামে অবস্থানকারী দুই গ্রহীতার বিবরণ রয়েছে।কোরআন, ৮২:১০–১২; ৫০:১৭; ৫০:১৮
মুআক্কিবাত বা পালাক্রমে নিযুক্ত রক্ষীরারক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা: মানুষের সামনে ও পেছনে থেকে আল্লাহর আদেশে তাকে রক্ষা করা।কোরআন, ১৩:১১
দিন–রাত পালাক্রমে আগমনকারী ফেরেশতারাপর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন: ফজর ও আসরের সময় মিলিত হওয়া; পরে আল্লাহর কাছে মানুষের অবস্থা সম্পর্কে উত্তর দেওয়া।সহিহ বুখারী, ৫৫৫
মাতৃগর্ভে নিযুক্ত ফেরেশতাগর্ভসংক্রান্ত দায়িত্ব ও নথিভুক্তি: ভ্রূণের পর্যায় সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া এবং লিঙ্গ, সৌভাগ্য–দুর্ভাগ্য, জীবিকা ও আয়ু সম্পর্কে জিজ্ঞাসার পর লিখে রাখা।সহিহ বুখারী, ৬৫৯৫
মুনকার ও নাকিরকবরের জিজ্ঞাসাবাদ: মৃত ব্যক্তিকে মুহাম্মদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা; উত্তরের সঙ্গে কবরের পরবর্তী অবস্থার সম্পর্ক বর্ণিত হয়েছে।তিরমিযী, ১০৭১
মালিকজাহান্নামের তত্ত্বাবধান: জাহান্নামবাসীরা তাঁর কাছে মৃত্যু চেয়ে আবেদন করে; তিনি তাদের সেখানে অবস্থান করতে হবে বলে জানান।কোরআন, ৪৩:৭৭
জাহান্নামের কঠোর প্রহরীরাশাস্তি ও পাহারা: আগুনের ওপর নিযুক্ত কঠোর ফেরেশতারা আদেশ পালন করেন; সাকার সম্পর্কে উনিশের উল্লেখ এবং অগ্নিরক্ষীদের ফেরেশতা হিসেবে পরিচয় রয়েছে।কোরআন, ৬৬:৬; ৭৪:৩০–৩১
জান্নাতের রক্ষীরাপ্রবেশ ও অভ্যর্থনা: জান্নাতের প্রবেশদ্বারে আগত ব্যক্তিদের অভিবাদন জানানো এবং প্রবেশের কথা বলা।কোরআন, ৩৯:৭৩
পর্বতের ফেরেশতাপর্বতসংক্রান্ত শক্তি প্রয়োগ: মুহাম্মদকে দুই পর্বত দিয়ে তাঁর বিরোধীদের পিষে ফেলার প্রস্তাব দেওয়া।সহিহ বুখারী, ৩২৩১
যুদ্ধে সহায়তাকারী ফেরেশতারাসামরিক সহায়তা: সাহায্যের আবেদনের উত্তরে এক হাজার ফেরেশতা দিয়ে সহায়তার ঘোষণা।কোরআন, ৮:৯
সালাম পৌঁছানো ভ্রাম্যমাণ ফেরেশতারাবার্তা পরিবহন: পৃথিবীতে ঘুরে মুহাম্মদের অনুসারীদের সালাম তাঁর কাছে পৌঁছানো।সুনান আন-নাসাঈ, ১২৮২
যিকরের সভা অনুসন্ধানকারী ফেরেশতারাসভা পর্যবেক্ষণ: যিকরের সমাবেশ খোঁজা, সেখানে উপস্থিত হওয়া এবং পরে আল্লাহর কাছে সেই সমাবেশ সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া।সহিহ মুসলিম, ২৬৮৯

আরশ বহনের জন্য বিশাল বাহক: সর্বশক্তিমান সত্তার রাজসিংহাসন

আরশবাহক ফেরেশতাদের বিবরণটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কোরআনে কিয়ামতের দিনে আটজনের আরশ বহনের কথা রয়েছে; অন্য আয়াতে আরশবাহক এবং আরশের চারপাশে থাকা ফেরেশতাদের প্রশংসা ও ক্ষমাপ্রার্থনার কথা বলা হয়েছে। আবু দাউদের হাদিসে এক আরশবাহকের কানের লতি থেকে কাঁধের দূরত্ব সাতশ বছরের পথ বলে বর্ণিত। অর্থাৎ এখানে বহনকারীকে বাস্তব দৈহিক বিশালতার বৈশিষ্ট্যে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আরশ, তার বহনকারী, তার চারপাশের অনুগত সত্তা এবং তাদের প্রার্থনা—সব মিলিয়ে একটি রাজদরবারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ দৃশ্য তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদিসের পূর্ণ বক্তব্য পড়া যাক।

সূরা আল-হাক্কাহ, ৬৯:১৭
وَالْمَلَكُ عَلَىٰ أَرْجَائِهَا ۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ
বাংলা অর্থ: ফেরেশতারা থাকবে তার প্রান্তগুলোতে; আর সেদিন আটজন তাদের ওপরে তোমার রবের আরশ বহন করবে।
মূল পাঠ ও অনলাইন রেফারেন্স

সূরা গাফির, ৪০:৭
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ
বাংলা অর্থ: যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ মহিমা ঘোষণা করে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং বিশ্বাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে: আমাদের রব, তোমার দয়া ও জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করেছে। অতএব যারা ফিরে এসেছে ও তোমার পথ অনুসরণ করেছে, তাদের ক্ষমা করো এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।
মূল পাঠ ও অনলাইন রেফারেন্স

সুনান আবু দাউদ, ৪৭২৭
জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন:
أُذِنَ لِي أَنْ أُحَدِّثَ عَنْ مَلَكٍ مِنْ مَلاَئِكَةِ اللَّهِ مِنْ حَمَلَةِ الْعَرْشِ إِنَّ مَا بَيْنَ شَحْمَةِ أُذُنِهِ إِلَى عَاتِقِهِ مَسِيرَةُ سَبْعِمِائَةِ عَامٍ
বাংলা অর্থ: আল্লাহর ফেরেশতাদের মধ্যে আরশ বহনকারী একজন সম্পর্কে বলার অনুমতি আমাকে দেওয়া হয়েছে। তার কানের লতি থেকে কাঁধ পর্যন্ত দূরত্ব সাতশ বছরের পথ।
সুনান আবু দাউদ, ৪৭২৭; আরবি পাঠ ও রেফারেন্স

একজন পার্থিব রাজার সিংহাসন বহন করতে মানুষের শক্তি লাগে, কারণ রাজা কিংবা বাহকের ক্ষমতা সীমিত এবং বস্তুটি সরানোর জন্য শ্রম দরকার হয়। কিন্তু ‘হও’ বললেই সব করতে সক্ষম সত্তার ক্ষেত্রে আরশকে স্থিত রাখা কিংবা কোনো অবস্থানে রাখা তাঁর ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার কথা নয়। তখন বিশাল দেহ, বহু বাহক এবং বহন করার শ্রমের বিবরণ সৃষ্টি-পরিচালনার কোনো অপরিহার্য প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছে কি? আরশ বহনের কাহিনিতে শক্তি ও আকারের যে প্রদর্শন রয়েছে, তা মানুষের রাজকীয় মহিমার দৃশ্যকে বড় করে তোলে; কিন্তু অসীম ক্ষমতার অধিকারী সত্তার জন্য এই বাহকদের কার্যগত প্রয়োজন প্রতিষ্ঠা করে না। এখানে প্রশ্নটি আরশের ওজন কত, তা নয়; প্রশ্নটি হলো, অনায়াস ঐশ্বরিক কার্যকারিতার দাবির মধ্যে বহনকারী সৃষ্ট দেহের এই কাজ কী যোগ করছে?


সর্বজ্ঞের জন্য লেখক, পর্যবেক্ষক ও পালাক্রমে প্রতিবেদন

মানুষের প্রশাসনে নথি রাখা হয় ভুলে যাওয়া ঠেকাতে, অনুপস্থিত অবস্থার তথ্য পেতে, অন্য কর্মচারীর কাজ যাচাই করতে এবং ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের জন্য প্রমাণ সংরক্ষণ করতে। সর্বজ্ঞ সত্তার ক্ষেত্রে এই তথ্যগত অভাবগুলোর কোনটি পূরণ করতে হবে? কোরআনে আমললেখক ও পর্যবেক্ষকের উল্লেখ আছে; বুখারীর বর্ণনায় দিন–রাতের ফেরেশতারা পালাক্রমে আসে এবং আল্লাহর কাছে উত্তর দেয়। সেখানে আল্লাহ মানুষের অবস্থা সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্মভাবে আরও ভালো জানেন—এই কথাটিও স্পষ্ট। জানা এবং প্রতিবেদন গ্রহণের এই যুগপৎ বিবরণেই সমস্যাটি কেন্দ্রীভূত হয়: অনুপস্থিত তথ্য পূরণের প্রয়োজন ছাড়াই একটি তথ্য-প্রশাসনের দৃশ্য সাজানো হয়েছে।

সূরা আল-ইনফিতার, ৮২:১০–১২
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ ۝ كِرَامًا كَاتِبِينَ ۝ يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ
বাংলা অর্থ: তোমাদের ওপর অবশ্যই পর্যবেক্ষক রয়েছে—সম্মানিত লেখকেরা; তোমরা যা করো, তারা তা জানে।
মূল পাঠ ও অনলাইন রেফারেন্স

সূরা ক্বাফ, ৫০:১৭–১৮
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ ۝ مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
বাংলা অর্থ: যখন দুই গ্রহীতা গ্রহণ করে, একজন ডানে এবং একজন বামে বসে থাকে। সে কোনো কথাই উচ্চারণ করে না, যার জন্য তার কাছে প্রস্তুত পর্যবেক্ষক থাকে না।
৫০:১৭; ৫০:১৮

সহিহ বুখারী, ৫৫৫
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন:
يَتَعَاقَبُونَ فِيكُمْ مَلاَئِكَةٌ بِاللَّيْلِ وَمَلاَئِكَةٌ بِالنَّهَارِ، وَيَجْتَمِعُونَ فِي صَلاَةِ الْفَجْرِ وَصَلاَةِ الْعَصْرِ، ثُمَّ يَعْرُجُ الَّذِينَ بَاتُوا فِيكُمْ، فَيَسْأَلُهُمْ وَهْوَ أَعْلَمُ بِهِمْ كَيْفَ تَرَكْتُمْ عِبَادِي فَيَقُولُونَ تَرَكْنَاهُمْ وَهُمْ يُصَلُّونَ، وَأَتَيْنَاهُمْ وَهُمْ يُصَلُّونَ
বাংলা অর্থ: রাতে একদল এবং দিনে একদল ফেরেশতা তোমাদের মধ্যে পালাক্রমে আসে। তারা ফজর ও আসরের নামাজে মিলিত হয়। এরপর যারা তোমাদের মধ্যে রাত কাটিয়েছে তারা ওপরে ওঠে। আল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করেন—যদিও তিনি তাদের সম্পর্কে আরও ভালো জানেন—‘তোমরা আমার বান্দাদের কী অবস্থায় রেখে এসেছ?’ তারা বলে, ‘আমরা তাদের নামাজরত অবস্থায় রেখে এসেছি এবং নামাজরত অবস্থায়ই তাদের কাছে গিয়েছিলাম।’
সহিহ বুখারী, ৫৫৫; আরবি পাঠ ও রেফারেন্স

এই লেখক, পর্যবেক্ষক ও প্রতিবেদকের ভূমিকাগুলো মানুষের পরিচিত প্রশাসনিক কাজ। একটি বিচারব্যবস্থায় নথি ব্যবহারের অর্থ বোঝা যায়, কারণ বিচারক ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং প্রত্যক্ষভাবে সব জানেন না। কিন্তু যে বিচারকের জ্ঞান পূর্ণ এবং স্মৃতিতে কোনো ত্রুটি নেই, তাঁর জানার জন্য লেখকের খাতা অতিরিক্ত তথ্য দিতে পারে না। তখন নথির কোনো স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য দাবি করতে হলে সেই উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু ‘আল্লাহ এমন ব্যবস্থা রেখেছেন’ বললে ব্যবস্থা থাকার কথাটি পুনরাবৃত্তি হয়; কেন এই ব্যবস্থা বেছে নেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ফেরেশতার খাতা সর্বজ্ঞতার ব্যাখ্যা নয়, আর সর্বজ্ঞতার ঘোষণা খাতা-নির্ভর প্রশাসনিক চিত্রের উদ্দেশ্যও ব্যাখ্যা করে না।


সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ: সর্বজ্ঞের কাছে সাপ্তাহিক প্রতিবেদন কেন?

মানুষের আমল নথিবদ্ধ করা এবং দিন–রাতের ফেরেশতাদের প্রতিবেদন দেওয়ার পাশাপাশি হাদিসে আমল পেশ করার নির্দিষ্ট সাপ্তাহিক সময়সূচিও পাওয়া যায়। সোমবার ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়; মুহাম্মদ এই দিনগুলোতে রোজা থাকার কারণ হিসেবে বলেছেন, তাঁর আমল পেশ হওয়ার সময় তিনি রোজা অবস্থায় থাকতে পছন্দ করেন। অর্থাৎ এখানে একটি কাজ সংঘটিত হওয়া এবং সেই কাজ পরে আল্লাহর কাছে উপস্থাপিত হওয়ার মধ্যে পৃথক ধাপ দেখানো হয়েছে। অথচ আল্লাহ যদি মানুষের প্রতিটি কাজ, সেই কাজের উদ্দেশ্য এবং সংঘটনের মুহূর্ত সম্পর্কে আগে থেকেই সম্পূর্ণ অবগত থাকেন, তাহলে পরবর্তী উপস্থাপন তাঁর জ্ঞানে কী যোগ করে? সোমবারে পেশ করার আগে কোনো কাজ সম্পর্কে তাঁর জানার কী বাকি থাকে, যা সোমবারের উপস্থাপনের মাধ্যমে পূরণ হয়? বৃহস্পতিবারে আবার পেশ করার প্রয়োজনই বা কেন? এই বর্ণনার সমস্যাটি বোঝার জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলোর সম্পূর্ণ বক্তব্য দেখা যাক।

সুনান আন-নাসাঈ, ২৩৫৮
পরিচ্ছেদ: নবীর রোজা
বর্ণনাকারী: উসামা ইবনে যায়দ
আরবি মূল বক্তব্য:
قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تَصُومُ حَتَّى لاَ تَكَادَ تُفْطِرُ وَتُفْطِرُ حَتَّى لاَ تَكَادَ أَنْ تَصُومَ إِلاَّ يَوْمَيْنِ إِنْ دَخَلاَ فِي صِيَامِكَ وَإِلاَّ صُمْتَهُمَا ‏.‏ قَالَ ‏”‏ أَىُّ يَوْمَيْنِ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ ذَانِكَ يَوْمَانِ تُعْرَضُ فِيهِمَا الأَعْمَالُ عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ فَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ ‏”‏ ‏.‏
বাংলা অনুবাদ: উসামা ইবনে যায়দ বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কখনো এমনভাবে রোজা রাখতে থাকেন যে, প্রায় রোজা ছাড়েনই না; আবার কখনো এমনভাবে রোজা রাখা থেকে বিরত থাকেন যে, প্রায় রোজা রাখেনই না। তবে দুইটি দিন ব্যতিক্রম: দিন দুইটি আপনার রোজা রাখার সময়ের মধ্যে পড়লে তো রাখেনই, তা না হলেও ওই দুই দিন রোজা রাখেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন দুই দিন?’ আমি বললাম, সোমবার ও বৃহস্পতিবার। তিনি বললেন, ‘এই দুই দিনে সমস্ত জগতের প্রতিপালকের কাছে আমল পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি, আমার আমল পেশ করা হোক এমন অবস্থায়, যখন আমি রোজাদার।’
হাদিসের মান: হাসান; দারুসসালাম সংস্করণের মূল্যায়ন।
রেফারেন্স: সুনান আন-নাসাঈ, ২৩৫৮; কিতাব ২২, হাদিস ২৬৯; পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ইংরেজি অনুবাদের নম্বর ২৩৬০।

জামি আত-তিরমিযী, ৭৪৭
পরিচ্ছেদ: সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা
বর্ণনাকারী: আবু হুরাইরা
আরবি মূল বক্তব্য:
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ تُعْرَضُ الأَعْمَالُ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ فَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ أَبِي هُرَيْرَةَ فِي هَذَا الْبَابِ حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ ‏.‏
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি, আমার আমল পেশ করা হোক এমন অবস্থায়, যখন আমি রোজাদার।’ আবু ঈসা তিরমিযী বলেন, এই পরিচ্ছেদে আবু হুরাইরার হাদিসটি হাসান গরিব।
হাদিসের মান: হাসান; দারুসসালাম সংস্করণের মূল্যায়ন।
রেফারেন্স: জামি আত-তিরমিযী, ৭৪৭; কিতাব ৮, হাদিস ৬৬।

পার্থিব প্রশাসনে সাপ্তাহিক প্রতিবেদন দেওয়ার কারণ বোঝা যায়। কর্তৃপক্ষ প্রতিটি কর্মচারীর প্রতিটি কাজ সরাসরি দেখেন না; তাঁকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, বিভিন্ন সময়ের কাজ একত্র করতে হয় এবং প্রতিবেদন পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেখানে তথ্য সংগ্রহ ও উপস্থাপনের সময়সূচি মানুষের সীমিত জ্ঞান, মনোযোগ এবং কাজের সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু সর্বজ্ঞ আল্লাহর ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতাগুলোর কোনটি আছে? কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেই যদি তিনি সেটি সম্পূর্ণ জানেন, তাহলে সেই কাজ সোমবার বা বৃহস্পতিবার পেশ করার মাধ্যমে তাঁর জানার কোনো ঘাটতি পূরণ হয় না। আমলের সঙ্গে মানুষের উদ্দেশ্যও যদি তাঁর জানা থাকে, তাহলে কোনো লেখক বা প্রতিবেদক তাঁর কাছে এমন কোনো ব্যাখ্যা যোগ করতে পারেন না, যা তিনি আগে জানতেন না। সর্বজ্ঞের কাছে নির্দিষ্ট দিনে আমল পেশের এই ব্যবস্থা তথ্য পৌঁছানোর কাজ করলে সর্বজ্ঞতার দাবি সমস্যায় পড়ে; আর কোনো নতুন তথ্য না পৌঁছালে তথ্য পরিবেশনের এই গোটা আয়োজনের স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য কী, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মুহাম্মদ আমল পেশের সময় নিজের রোজা অবস্থায় থাকার সঙ্গে বিশেষ পছন্দ যুক্ত করেছেন। এখানেই উপস্থাপনের মুহূর্তটি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ যদি সর্বক্ষণ মানুষের কাজ এবং অন্তরের অবস্থা জানেন, তাহলে সোমবারে রোজা থাকা এবং অন্য দিনে রোজা থাকার মধ্যে আমল পেশের কারণে অতিরিক্ত তাৎপর্য সৃষ্টি হবে কেন? একটি রোজার মূল্য কি তার আন্তরিকতা, উদ্দেশ্য ও পালনপদ্ধতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি সেটি প্রতিবেদন পেশের দিনের সঙ্গে মিলে যাওয়াও বিশেষভাবে কাম্য হবে? সর্বজ্ঞ বিচারকের সামনে মানুষের কোনো মুহূর্ত আড়াল থাকে না; তাঁকে নিজের ভালো অবস্থা দেখানোর জন্য বিশেষ উপস্থাপনকাল বেছে নেওয়ারও তথ্যগত প্রয়োজন নেই। তাহলে ‘আমার আমল যখন পেশ হবে, তখন আমি রোজাদার থাকব’—এই প্রত্যাশার সঙ্গে সর্বজ্ঞতার সম্পর্ক কী? মানুষের দপ্তরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে কাজ পেশের সময় নিজের ভালো অবস্থা তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা বোধগম্য। যে সত্তা আগে থেকেই সম্পূর্ণ কর্মজীবন এবং প্রতিটি উদ্দেশ্য জানেন, তাঁর ক্ষেত্রে একই ধরনের উপস্থাপন-সচেতনতা কেন গুরুত্ব পায়?

এইভাবে আমললেখক, পালাক্রমে পর্যবেক্ষক, ঊর্ধ্বে আরোহণ, প্রশ্নোত্তর এবং সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে আমল পেশ—সবগুলো বর্ণনা একত্র করলে একটি দপ্তরভিত্তিক প্রশাসনের ছবি তৈরি হয়। কিন্তু সেই প্রশাসনের কেন্দ্রে যাঁকে রাখা হয়েছে, তাঁর সর্বজ্ঞতার দাবিই তথ্য সংগ্রহ ও পৌঁছানোর প্রয়োজন সরিয়ে দেয়। ফলে প্রশ্নটি শুধু ফেরেশতারা কী কাজ করেন, সেটি নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁরা যে প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ, সেটি সর্বজ্ঞ সত্তার জন্য কী উদ্দেশ্য পূরণ করে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই নির্দিষ্ট সমস্যা এবং আমল পেশের সময় ইবাদতের বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে সংশয়ের আল্লাহর আমলাতন্ত্র – ইসলামের পৌত্তলিক উত্তরাধিকার প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।


শাবান মাসেও আমল ওঠানো: একই কাজের এত পর্যায়ে উপস্থাপন কেন?

আমল পেশ করার বর্ণনা সাপ্তাহিক সময়সূচিতে শেষ হয় না। শাবান মাসে বেশি রোজা রাখার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়েও মুহাম্মদ বলেছেন, এই মাসে সমস্ত জগতের প্রতিপালকের কাছে আমল ওঠানো হয় এবং তিনি চান, তাঁর আমল ওঠানোর সময় তিনি রোজাদার থাকুন। ফলে মানুষের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোতে একাধিক সময়চক্র দেখা যাচ্ছে: দিন–রাতের ফেরেশতাদের পালাবদল ও প্রতিবেদন, সোমবার–বৃহস্পতিবার আমল পেশ এবং শাবান মাসে আমল ওঠানো। সর্বজ্ঞতার দাবি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি পর্যায়ের জন্য একই প্রশ্ন করতে হয়: এই উপস্থাপন এমন কী যোগ করছে, যা আল্লাহর জ্ঞানে আগে ছিল না? মানুষের দপ্তরে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও বার্ষিক বিবরণ আলাদা কাজে লাগে, কারণ কর্মচারী ও কর্তৃপক্ষের জ্ঞান সীমিত এবং তাঁদের তথ্য একত্র করতে হয়। কিন্তু যিনি প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি সময়কাল এবং ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ জানেন, তাঁর জন্য এই সময়ভিত্তিক উপস্থাপন কী কাজ করে?

সুনান আন-নাসাঈ, ২৩৫৭
পরিচ্ছেদ: নবীর রোজা
বর্ণনাকারী: উসামা ইবনে যায়দ
আরবি মূল বক্তব্য:
قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَمْ أَرَكَ تَصُومُ شَهْرًا مِنَ الشُّهُورِ مَا تَصُومُ مِنْ شَعْبَانَ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ ذَلِكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ ‏”‏ ‏.‏
বাংলা অনুবাদ: উসামা ইবনে যায়দ বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! শাবান মাসে আপনাকে যত রোজা রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে তত রোজা রাখতে দেখি না। তিনি বললেন, ‘এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস, যার ব্যাপারে মানুষ গাফেল থাকে। এটি এমন একটি মাস, যাতে সমস্ত জগতের প্রতিপালকের কাছে আমল ওঠানো হয়। তাই আমি পছন্দ করি, আমার আমল ওঠানো হোক এমন অবস্থায়, যখন আমি রোজাদার।’
হাদিসের মান: হাসান; দারুসসালাম সংস্করণের মূল্যায়ন।
রেফারেন্স: সুনান আন-নাসাঈ, ২৩৫৭; কিতাব ২২, হাদিস ২৬৮; পৃষ্ঠায় উল্লিখিত ইংরেজি অনুবাদের নম্বর ২৩৫৯।

এই বর্ণনায় শাবানের রোজা এবং আমল ওঠানোর সময়ের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমল ওঠানোর মাস কেন মানুষের বর্তমান ইবাদতের অবস্থার জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হবে? আল্লাহর জ্ঞান যদি সর্বক্ষণ সমানভাবে পূর্ণ থাকে, তাহলে শাবান মাসে তাঁর কাছে মানুষের কোনো নতুন অবস্থা প্রকাশিত হচ্ছে না। তিনি আগের মাসের রোজাও জানেন, পরের মাসের রোজাও জানেন; কে আন্তরিকভাবে রোজা রাখছে এবং কে লোক দেখানোর জন্য রাখছে, সেই পার্থক্যও জানেন। তাহলে নিজের আমল ওঠানোর সময় রোজাদার থাকার পছন্দের সঙ্গে এই মাসকে যুক্ত করার ভিত্তি কী? রোজার ধর্মীয় মূল্য দাবি করার পাশাপাশি এখানে উপস্থাপনের সময়েরও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত গুরুত্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে হলে দেখাতে হবে, সর্বজ্ঞ সত্তার সামনে পেশের মুহূর্ত কেন এমন কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করে, যা তাঁর সর্বক্ষণিক জ্ঞানের মধ্যে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল না।

দিন–রাতের প্রতিবেদন, সপ্তাহের দুই দিনে আমল পেশ এবং শাবান মাসে আমল ওঠানোর এই বিবরণগুলোকে পাশাপাশি রাখলে মানুষের প্রশাসনের সঙ্গে সাদৃশ্যটি আরও স্পষ্ট হয়। পার্থিব কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দিষ্ট সময়ে কাজের বিবরণ পৌঁছায়; কর্মকর্তা তা গ্রহণ করেন; কর্মচারী সেই উপস্থাপনের সময় নিজের ভালো কাজ সামনে রাখতে চান। ধর্মীয় বর্ণনায় একই ধরনের সময়সূচি, ঊর্ধ্বমুখী উপস্থাপন এবং উপস্থাপনের সময় ভালো অবস্থায় থাকার আকাঙ্ক্ষা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু পার্থিব কর্তৃপক্ষের জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতা এখানে থাকার কথা নয়। সর্বজ্ঞতার দাবি বজায় রাখলে এই প্রতিবেদনগুলো আল্লাহকে কিছু জানাতে পারে না; তখন উপস্থাপন, সময়সূচি এবং উপস্থাপনের মুহূর্তে নিজের বিশেষ ইবাদতের অবস্থার ওপর এত গুরুত্ব দেওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি কী? আমল পেশ হয়—এটি বর্ণনার বক্তব্য। সেই পেশকরণ সর্বজ্ঞের জন্য কী উদ্দেশ্য পূরণ করে—এটি ব্যাখ্যার প্রশ্ন। প্রথম বক্তব্য বারবার বললে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।


ওহির দূত ও বৃষ্টির দপ্তর: মধ্যবর্তী কর্মীরা কী ব্যাখ্যা করেন?

বার্তা পাঠাতে পার্থিব শাসকের দূত লাগে, কারণ তিনি নিজে সর্বত্র উপস্থিত থাকতে পারেন না এবং প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে সরাসরি বক্তব্য পৌঁছাতে পারেন না। কোরআনে জিব্রাইলকে ওহি পৌঁছানোর ভূমিকায় রাখা হয়েছে। তখন আল্লাহর ইচ্ছা থেকে মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছানোর মধ্যে একটি সৃষ্ট দূত যুক্ত হয়। কিন্তু বার্তা পৌঁছানোর দাবি এবং বার্তা পৌঁছানোর প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা এক জিনিস নয়। জিব্রাইল কীভাবে বার্তাটি গ্রহণ করেন, কীভাবে দূরত্ব অতিক্রম করেন এবং মানুষের বোধে সেটি কীভাবে পৌঁছান—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল দূতের নাম উল্লেখ করে পাওয়া যায় না। সর্বশক্তিমান সত্তার সরাসরি বার্তা দেওয়ার ক্ষমতার পাশে দূত-ব্যবস্থাটি কেন নির্বাচিত হলো, সেই প্রশ্নও থেকে যায় [17]।

বৃষ্টি ও উদ্ভিদের ক্ষেত্রে মিকাইলের দায়িত্ববিষয়ক বিবরণ এই কাজের বিভাগকে আরও স্পষ্ট করে। ইবন কাসীরের উদ্ধৃত বক্তব্যে মিকাইলের সহায়কদেরও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বৃষ্টি ও উদ্ভিদের বিষয়ে একটি দায়িত্বপ্রাপ্ত সত্তা, তার সহায়ক এবং নির্দেশ অনুযায়ী বায়ু-মেঘ পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে। এই বিবরণ পড়লে শুধু একটি ঐশ্বরিক ইচ্ছা নয়, সেই ইচ্ছার অধীনে একাধিক কর্মীর কাজের ছবিও পাওয়া যায়।

মিকাইলের দায়িত্ব সম্পর্কে ইবন কাসীরের বক্তব্য
ميكائيل موكل بالقطر والنبات اللذين يخلق منهما الأرزاق في هذه الدار، وله أعوان يفعلون ما يأمرهم به بأمر ربه، يصرفون الرياح والسحاب، كما يشاء الرب جل جلاله.
বাংলা অর্থ: মিকাইল বৃষ্টি ও উদ্ভিদের দায়িত্বে নিযুক্ত, যার মাধ্যমে এই জগতে জীবিকা সৃষ্টি হয়। তাঁর সহায়কেরা রয়েছে; তাঁর রবের আদেশ অনুযায়ী তিনি তাদের যা নির্দেশ দেন, তারা তা করে। রব যেভাবে ইচ্ছা করেন, সেভাবে তারা বায়ু ও মেঘ পরিচালনা করে।
সূত্র: ইবন কাসীরের নামে উদ্ধৃত সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ; ‘সুআল আল-মালাকাইন ফিল-কবর’, দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের আলোচনা।

এখানে কাজের ওপর আরও একটি কাজ বসানো হয়েছে: বৃষ্টি ও উদ্ভিদের দায়িত্বে মিকাইল, আবার তাঁর অধীনে সহায়কদের বায়ু ও মেঘ পরিচালনা। কিন্তু বৃষ্টি কীভাবে হয়, সেই প্রশ্নের উত্তরে সৃষ্ট কর্মীর পরিচয় দেওয়া কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। আর ‘হও’ বললেই ফল উৎপন্ন হয় বলে দাবি করলে প্রশ্ন ওঠে, নির্দেশবাহক ও সহায়কদের এই অতিরিক্ত স্তর ফল উৎপাদনে কী স্বতন্ত্র কাজ করছে? ‘মিকাইল করেন, কারণ আল্লাহ তাঁকে বলেছেন’ উত্তরটি নির্দেশের উৎস জানায়; বৃষ্টির প্রক্রিয়া কিংবা সহায়ক বাহিনীর প্রয়োজন ব্যাখ্যা করে না। একটি অদৃশ্য কর্মীর কাজকে আরেক অদৃশ্য নির্দেশ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে প্রশ্নটি শেষ হয় না; ব্যাখ্যার মধ্যবর্তী সত্তার সংখ্যা বাড়ে।


মহাপ্রলয়ের জন্য শিঙ্গা, ফুঁ এবং আদেশের অপেক্ষা

কোরআনে মৃত্যু ও পুনরুত্থানের সঙ্গে শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়ার বিবরণ যুক্ত রয়েছে। তিরমিযীর হাদিসে শিঙ্গাধারী মুখে শিঙ্গা নিয়ে আদেশ শোনার অপেক্ষায় রয়েছেন। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এই দায়িত্ব ইসরাফিলের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে মহাপ্রলয়ের চিত্রে আদেশদাতা, অপেক্ষমাণ কর্মী, যন্ত্র এবং যন্ত্রে ফুঁ দেওয়ার কার্য—এই পৃথক উপাদানগুলো উপস্থিত। ‘হও’ বলার সরাসরি কার্যকারিতার দাবির সঙ্গে এই যন্ত্রনির্ভর দৃশ্য পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়: মৃত্যু ও পুনরুত্থান ঘটাতে শিঙ্গা এবং ফুঁ দেওয়ার ভূমিকা কী? নিচের আয়াত ও হাদিসের পূর্ণ বক্তব্যে এই উপাদানগুলো দেখা যায় [18]।

সূরা আয-যুমার, ৩৯:৬৮
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ ۖ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ
বাংলা অর্থ: শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে; তখন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা রয়েছে তারা লুটিয়ে পড়বে, আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। এরপর আবার তাতে ফুঁ দেওয়া হবে; তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।
মূল পাঠ ও অনলাইন রেফারেন্স

জামি আত-তিরমিযী, ২৪৩১
আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন:
كَيْفَ أَنْعَمُ وَصَاحِبُ الْقَرْنِ قَدِ الْتَقَمَ الْقَرْنَ وَاسْتَمَعَ الإِذْنَ مَتَى يُؤْمَرُ بِالنَّفْخِ فَيَنْفُخُ
বাংলা অর্থ: আমি কীভাবে নিশ্চিন্ত থাকব, যখন শিঙ্গাধারী শিঙ্গাটি মুখে নিয়েছেন এবং কখন ফুঁ দেওয়ার আদেশ হবে তা শোনার অপেক্ষায় আছেন, যাতে তিনি ফুঁ দিতে পারেন?
বিষয়টি মুহাম্মদের সঙ্গীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠলে তিনি তাদের বলেন:
قُولُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا
বাংলা অর্থ: বলো, আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক; আমরা আল্লাহর ওপর নির্ভর করেছি।
আবু ঈসা তিরমিযী এই হাদিসকে হাসান বলেছেন এবং আতিয়্যাহ থেকে আবু সাঈদের মাধ্যমে অন্য পথেও অনুরূপ বর্ণনা আসার কথা উল্লেখ করেছেন।
জামি আত-তিরমিযী, ২৪৩১; পূর্ণ আরবি পাঠ ও রেফারেন্স

মানুষের সমাজে শিঙ্গা বা অন্য সংকেতযন্ত্রের ব্যবহার বোঝা যায়: দূরের লোককে খবর দেওয়া, সেনাদের একযোগে চলার সংকেত দেওয়া কিংবা কোনো সমাবেশের সূচনা ঘোষণা করা। কিন্তু মৃতকে জীবিত করা কোনো মানবিক সমাবেশ ডাকার মতো কাজ নয়। শিঙ্গার ফুঁ যদি পুনরুত্থানের কার্যকর মাধ্যম হয়, তবে তার সঙ্গে দেহের পুনর্গঠন ও প্রাণ ফিরে আসার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে হবে। আর যদি ফুঁটি কেবল ঘটনার সংকেত হয়, তবে সরাসরি ঐশ্বরিক ইচ্ছার বিবরণে সেই সংকেতের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করতে হবে। শিঙ্গা, ফুঁ এবং অপেক্ষমাণ কর্মী উল্লেখ করলেই পুনরুত্থানের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বরং সর্বশক্তিমানতার ঘোষণার ওপর একটি নাটকীয় অনুষ্ঠানিক দৃশ্য যোগ হয়, যার পরিচিত উপাদান মানুষের সংকেতব্যবস্থা থেকে নেওয়া।


জন্ম থেকে মৃত্যু: প্রশ্ন, নথি ও কার্যকর করার পৃথক কর্মী

মাতৃগর্ভে নিযুক্ত ফেরেশতার হাদিসে প্রশ্নোত্তর ও লিখে রাখার বিবরণ রয়েছে। ভ্রূণের পর্যায়, লিঙ্গ, জীবিকা ও আয়ু সম্পর্কে বক্তব্য ও জিজ্ঞাসা আসে; শেষে লিখে রাখার কথা বলা হয়। এখানে মানুষের জন্মের সঙ্গে একটি অদৃশ্য নথিভুক্তির ব্যবস্থা যুক্ত হচ্ছে। হাদিসটির বক্তব্য সম্পূর্ণ পড়া যাক।

সহিহ বুখারী, ৬৫৯৫
আনাস ইবন মালিক থেকে বর্ণিত, মুহাম্মদ বলেছেন:
وَكَّلَ اللَّهُ بِالرَّحِمِ مَلَكًا فَيَقُولُ أَىْ رَبِّ نُطْفَةٌ، أَىْ رَبِّ عَلَقَةٌ، أَىْ رَبِّ مُضْغَةٌ. فَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ أَنْ يَقْضِيَ خَلْقَهَا قَالَ أَىْ رَبِّ ذَكَرٌ أَمْ أُنْثَى أَشَقِيٌّ أَمْ سَعِيدٌ فَمَا الرِّزْقُ فَمَا الأَجَلُ فَيُكْتَبُ كَذَلِكَ فِي بَطْنِ أُمِّهِ
বাংলা অর্থ: আল্লাহ মাতৃগর্ভে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘হে রব, বীর্যবিন্দু; হে রব, আলাকা; হে রব, মাংসপিণ্ড।’ এরপর আল্লাহ যখন তার সৃষ্টি সম্পন্ন করতে চান, তিনি বলেন, ‘হে রব, পুরুষ না নারী? দুর্ভাগা না সৌভাগ্যবান? জীবিকা কী? আয়ু কী?’ এভাবে তার মায়ের গর্ভেই তা লিখে রাখা হয়।
সহিহ বুখারী, ৬৫৯৫; আরবি পাঠ ও রেফারেন্স

মৃত্যুর ক্ষেত্রেও আলাদা কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন: কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেশতা তাদের প্রাণ গ্রহণ করবেন। অন্য আয়াতে এই কাজে দূতদের উল্লেখ এসেছে। মৃত্যুর পর কবরের জিজ্ঞাসাবাদ, পরবর্তী বিচার এবং জান্নাত-জাহান্নামের প্রবেশ ও শাস্তির জন্যও পৃথক ভূমিকা রয়েছে। এই ধারায় মানুষের জীবন একটি দায়িত্ববণ্টিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে—জন্মের নথি, জীবনের আমল, মৃত্যুর প্রাণগ্রহণ, কবরের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরকালের পাহারা ও দণ্ড। কিন্তু প্রতিটি নতুন কর্মীর উল্লেখের সঙ্গে একটি প্রশ্নও যুক্ত হয়: যে ফল আল্লাহ সরাসরি ঘটাতে পারেন, তার জন্য এই কর্মী ঠিক কী অপরিহার্য কাজটি করছে? কর্মীর নাম এবং দায়িত্বের পরিচয় দেওয়া সেই প্রয়োজনের ব্যাখ্যা নয় [19]।


সর্বশক্তিমানতার ব্যাখ্যা, নাকি মানুষের রাজদরবারের মহাজাগতিক প্রতিচ্ছবি?

এই বিবরণগুলোর সম্মিলিত চিত্রে আল্লাহর জন্য দূত, লেখক, পর্যবেক্ষক, প্রহরী, বাহক, জিজ্ঞাসাবাদকারী ও দণ্ড কার্যকরকারী উপস্থিত। পৃথিবীর রাজা তাঁর ক্ষমতা কার্যকর করতে এসব ভূমিকার ওপর নির্ভর করেন; তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর সীমাবদ্ধতার সম্পর্ক বোঝা যায়। ফেরেশতা-ব্যবস্থায় একই ধরনের কাজের বিভাগকে মহাজাগতিক আকার দেওয়া হয়েছে। এই সাদৃশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠগত প্রশ্ন তোলে: ধর্মীয় বর্ণনা কি অসীম ক্ষমতার কোনো স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা দিচ্ছে, নাকি মানুষের কাছে পরিচিত শাসক ও কর্মচারীর সম্পর্ককে আকাশে বিস্তৃত করছে? সিংহাসন যত বড়ই হোক, বাহকের দেহ যত বিশালই হোক কিংবা কর্মীর সংখ্যা যত বেশি হোক, আকার বাড়ানো কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন ব্যাখ্যা করার সমান নয়।

‘আল্লাহর ইচ্ছা’ বলেও এই প্রশ্নের উত্তর শেষ করা যায় না। ইচ্ছা কোনো ব্যবস্থা নির্বাচনের উৎস হতে পারে; কিন্তু সেই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, কার্যপ্রক্রিয়া ও ব্যাখ্যামূলক মূল্য পৃথক প্রশ্ন। কেন সর্বজ্ঞের জন্য তথ্যলেখক, কেন সরাসরি কার্যকর ক্ষমতার জন্য বার্তাবাহক, কেন আরশের জন্য বাহক এবং কেন পুনরুত্থানের জন্য শিঙ্গাধারী—এসব জানতে চাওয়া ঘোষিত ক্ষমতার সঙ্গে বর্ণিত ব্যবস্থার সম্পর্ক পরীক্ষা করা। যদি ফেরেশতার কাজ ছাড়া ফলটি ঘটানো না যায়, তবে মাধ্যমের ওপর নির্ভরতার প্রশ্ন উঠবে। যদি ফলটি ফেরেশতা ছাড়াই ঘটানো যায়, তবে সেই মাধ্যম নির্বাচনের উদ্দেশ্য ও তার স্বতন্ত্র ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ফেরেশতার সংখ্যা, নাম ও কাজের তালিকা কোনো উত্তর নয়; এগুলো সেই ব্যবস্থারই বিবরণ, যার যৌক্তিক প্রয়োজন ও কার্যকারণ সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা বাকি।


উপসংহার

‘আল্লাহ হও বললেন, আর তা হয়ে গেল’—এই বক্তব্য সৃষ্টির কোনো কার্যপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে না। এটি একটি ইচ্ছা, একটি নির্দেশ এবং একটি ফলের কথা বলে; কিন্তু তাদের মধ্যকার সম্পর্কটি অপ্রমাণিত রেখেই ফলটিকে নিশ্চিত ঘোষণা করে। অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব কীভাবে আসে, নির্দেশের প্রাপক কে, সেই নির্দেশ কীভাবে কার্যকর হয় এবং একটি জটিল মহাবিশ্বের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো কীভাবে নির্ধারিত হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর ‘সর্বশক্তিমান’ শব্দটির মধ্যে পাওয়া যায় না। যে ক্ষমতার সাহায্যে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করার দাবি করা হচ্ছে, সেই ক্ষমতা এবং তার কার্যকারিতা দুটোই আগে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো ঘটনার অজানা কারণের জায়গায় আল্লাহর ইচ্ছা বসিয়ে দেওয়া অজানাকে জানা বানায় না; কেবল অজানা বিষয়টিকে একটি ধর্মীয় নাম দেয়।

ধর্মীয় বর্ণনাগুলোর সম্মিলিত চিত্র এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে। সরাসরি কার্যকর ইচ্ছার ঘোষণার পাশে রয়েছে সময় নিয়ে সৃষ্টি, উপাদান ব্যবহার, পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন কাজের জন্য ফেরেশতা নিয়োগ। আল্লাহর জন্য দূত বার্তা বহন করেন, বাহকেরা আরশ বহন করেন, লেখকেরা মানুষের কাজ নথিবদ্ধ করেন এবং পর্যবেক্ষকেরা এসে মানুষের অবস্থা জানান। আবার নির্দিষ্ট দিনে ও মাসে আমল পেশ করা হয়, আর সেই উপস্থাপনের সময় রোজা অবস্থায় থাকার বিশেষ পছন্দ প্রকাশ করা হয়। মানুষের প্রশাসনে এসব ব্যবস্থার কারণ বোঝা যায়: শাসক সব জানেন না, সর্বত্র উপস্থিত থাকতে পারেন না এবং প্রতিটি কাজ নিজে করতে পারেন না। কিন্তু সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান সত্তার ক্ষেত্রে এই একই দপ্তরি ব্যবস্থার স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য কী? প্রতিবেদন তাঁর জ্ঞানে কিছু যোগ না করলে এত পর্যায়ে উপস্থাপন কেন? ইচ্ছাই যথেষ্ট হলে বাস্তবায়নের জন্য এত মধ্যবর্তী কর্মীর ভূমিকা কী? ব্যবস্থাটির বিবরণ দেওয়া এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার সমান নয়।

এই বর্ণনায় মানুষের পরিচিত রাজদরবারের একটি মহাজাগতিক প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে: সিংহাসনে অধিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষ, তাঁর আদেশ বহনকারী দূত, অধীনস্থ কর্মীবাহিনী, নথি, প্রতিবেদন এবং দণ্ড কার্যকর করার পৃথক বিভাগ। সিংহাসনের আকার বাড়িয়ে, বাহকের দেহ বিশাল করে কিংবা কর্মীর সংখ্যা অসংখ্য করে এই কাঠামোর ব্যাখ্যাগত ঘাটতি দূর হয় না। সর্বশক্তিমানতার ঘোষণা কোনো কার্যকারণ ব্যাখ্যার বিকল্প নয়; সর্বজ্ঞতার ঘোষণাও প্রতিবেদনভিত্তিক প্রশাসনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে না। মহাবিশ্ব ও মানুষের অস্তিত্ব বুঝতে হলে এমন বক্তব্যের প্রয়োজন, যা প্রশ্নের মুখে টিকে থাকে, যার পক্ষে প্রমাণ হাজির করা যায় এবং যার সাহায্যে বাস্তব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। ‘হও’ বলে সব হয়ে যাওয়ার দাবিতে সেই ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। ভক্তি দিয়ে এই শূন্যস্থান পূরণ করা যায়, জ্ঞান দিয়ে নয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সূরা আল ইমরান, আয়াত ৪৭ ↩︎
  2. সূরা বাকারা, আয়াত ১১৭ ↩︎
  3. তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০ ↩︎
  4. তাফসীরে জালালাইন, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮ ↩︎
  5. সূরা আল-আরাফ ৭:৫৪ ↩︎
  6. The Intellectual Adventure of Ancient Man, H. Frankfort, 1946, pp. 64-66 ↩︎
  7. Genesis 1:3 ↩︎
  8. সর্বশক্তিমান আল্লাহর ছয়দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি ↩︎
  9. কোরআন ৩:৫৯ ↩︎
  10. কোরআন ১৫:২৬, ৩২:৭ ↩︎
  11. ইসলামে আদমকে বানাবার গপ্পো ↩︎
  12. সহীহ বুখারী ৪৭৭০ ↩︎
  13. সূরা মাসাদ ↩︎
  14. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৪৭৭০ ↩︎
  15. কোরআন, ৩৬:৮২ ↩︎
  16. ফেরেশতাদের বিভিন্ন দায়িত্ব সম্পর্কে আকীদাভিত্তিক আলোচনা ↩︎
  17. কোরআন, ২:৯৭ ↩︎
  18. ইসরাফিলের দায়িত্ববিষয়ক আলোচনা ↩︎
  19. কোরআন, ৩২:১১; ৬:৬১; তিরমিযী, ১০৭১ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Philosophical criticism, textual analysis, and critique of Islamic theology.

Epistemic Position: Secular rationalism, skepticism, and evidence-based inquiry.

This article examines the Quranic expression kun fa-yakun—“Be, and it comes into being”—and its implications for creation, causation, time, and divine agency. Drawing on Quranic passages and the tafsir quotations reproduced in the article, it investigates the relationship between declaring unlimited power and providing an intelligible explanation of how something acquires existence.

The discussion brings this declaration into comparison with religious accounts of creation over time, the use of materials in forming human beings, and the assignment of distinct responsibilities to angels. Particular attention is given to Throne-bearers, messengers of revelation, recording angels, the trumpet-bearer, and the presentation of human deeds on Mondays, Thursdays, and during Shaban.

The central argument concerns the explanatory role of these arrangements: what do intermediaries contribute when divine will is sufficient, and what information can reports supply to a being whose knowledge is already complete? The article evaluates these claims through their textual content, logical implications, and explanatory adequacy.

Leave a comment

Your email will not be published.