জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

সর্বজ্ঞানী কলমঃ ইসলামে গায়েব জানা আল্লাহ কয়জন?

প্রকাশিত: জুন 19, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন23 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামী আকীদার একটি মৌলিক দাবি হলো গায়েবের জ্ঞান আল্লাহর একচ্ছত্র বৈশিষ্ট্য। কোরআন শুধু এটুকু বলে না যে আল্লাহ গায়েব জানেন; সূরা আল-আনআম ৬:৫৯-এ আরও কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই এবং তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না। অর্থাৎ গায়েবজ্ঞান এখানে আল্লাহকে অন্য সমস্ত সত্তা থেকে পৃথককারী একটি একচ্ছত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপিত। [1]

وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ.
বাংলা অনুবাদ:
গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই; তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না।

সূরা আল-জিন ৭২:২৬–২৭-এ এই একচ্ছত্রতার একটি নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমও দেওয়া হয়েছে: আল্লাহ তাঁর গায়েব কাউকে প্রকাশ করেন না, তবে যাকে তিনি রাসুল হিসেবে নির্বাচন করেন। অর্থাৎ কোরআনের নিজের ভাষাতেই ব্যতিক্রমের শ্রেণি নির্দিষ্ট—নির্বাচিত রাসুল। কোনো কলমকে সেখানে ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। [2]

عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِ أَحَدًا ۝ إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِنْ رَسُولٍ.
বাংলা অনুবাদ:
তিনি গায়েবের জ্ঞানী; তিনি তাঁর গায়েব কাউকে প্রকাশ করেন না—তবে সেই রাসুল ছাড়া, যাকে তিনি মনোনীত করেছেন।

কিন্তু হাদিসে এমন একটি সৃষ্ট কলমের বর্ণনা রয়েছে, যাকে কিয়ামত পর্যন্ত “প্রত্যেক কিছুর তাকদীর” লিখতে বলা হয়। এটি কোনো রাসুলের কাছে একটি যুদ্ধের ফল, একটি ভবিষ্যদ্বাণী বা কয়েকটি সীমিত গায়েবি তথ্য প্রকাশের ঘটনা নয়। এখানে মহাবিশ্বের সমগ্র ভবিষ্যৎ ইতিহাস—প্রত্যেক ঘটনা, প্রত্যেক মানুষের কাজ, জীবন, মৃত্যু ও পরিণতি—একটি সৃষ্ট কলমের মাধ্যমে আগেই লেখা হচ্ছে। সুনান আবু দাউদ ৪৭০০-এ কলম নিজেই প্রশ্ন করে কী লিখবে এবং তাকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত কিছুর তাকদীর লিখতে বলা হয়। আলবানী বর্ণনাটিকে সহিহ বলেছেন। [3]

إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ قَالَ رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ قَالَ اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَىْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ.
বাংলা অনুবাদ:
আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করলেন এবং তাকে বললেন, ‘লেখো।’ কলম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমি কী লিখব?’ তিনি বললেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক কিছুর তাকদীর লিখে দাও।’

এখানে ইসলামী টেক্সটের ভেতরেই মৌলিক সংঘাত তৈরি হয়। কোরআনের একদিকে দাবি—গায়েবের চাবিকাঠি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না; তাঁর গায়েব প্রকাশের ঘোষিত ব্যতিক্রম নির্বাচিত রাসুল। অন্যদিকে কলম কোনো রাসুল নয়, অথচ তাকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ভবিষ্যৎ তথ্য নয়, কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত কিছুর পূর্ণ ভবিষ্যৎ-রেকর্ড লিখতে দেওয়া হয়েছে। কলমকে যদি তথ্যবিহীন একটি যন্ত্র বলা হয়, তার প্রশ্ন করা ও উত্তর বোঝার বর্ণনা অর্থহীন হয়ে পড়ে; আর যদি সে নির্দেশ বুঝে পূর্ণ ভবিষ্যৎ লিখে থাকে, তবে সেই গায়েবি তথ্য তার কাছে উপস্থিত ছিল। তথ্য আল্লাহ দিয়েছেন বললেও কলমের কাছে সেই তথ্যের উপস্থিতি অদৃশ্য হয়ে যায় না।

কোরআনের একচ্ছত্র দাবিকে কঠোরভাবে সত্য ধরে নিলে যুক্তির ফল সরল: যদি গায়েবের পূর্ণ জ্ঞান শুধু আল্লাহর হয় এবং কলমও পূর্ণ ভবিষ্যৎ গায়েব জানে, তাহলে সেই একচ্ছত্র বৈশিষ্ট্য আর শুধু আল্লাহর থাকে না। বিপরীত ফল ধরে অসঙ্গতি দেখালে দাঁড়ায়—একচ্ছত্র গায়েবজ্ঞান যদি আল্লাহত্বের পরিচায়ক হয়, তবে কলমকেও আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত সেই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বলতে হয়; অথচ ইসলামি আকীদা কলমকে আল্লাহ নয়, সৃষ্টি বলে। ফলে দুটি দাবি একই অর্থে একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।

এই সমস্যার সঙ্গে আরও দুটি সংকট যুক্ত: কলমকে বাস্তব দেহবিশিষ্ট সৃষ্টি হিসেবে বর্ণনা করা হলেও তাকে আসমান-জমিন সৃষ্টির পূর্ববর্তী ঘটনাক্রমে স্থাপন করা হয়েছে; এবং একই কলম দিয়ে মানুষের সমস্ত ভবিষ্যৎ কর্ম আগেই লিখে, পরে আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টির অধীনে সেই কর্ম সংঘটিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু একটি অদ্ভুত পৌরাণিক কলমের গল্প নয়; এটি গায়েবজ্ঞান, সৃষ্টি, স্থান-কাল, পূর্বনির্ধারণ এবং নৈতিক দায়—ইসলামী ধর্মতত্ত্বের একাধিক মৌলিক দাবিকে একই সঙ্গে সমস্যায় ফেলে।


সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি এবং আল্লাহর নির্দেশ

কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা আছে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অদৃশ্য বিষয় বা গায়েবের বিষয় জানে না [4]

বল,আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ ছাড়া,আর তারা জানে না কখন তাদেরকে জীবিত ক’রে উঠানো হবে।
— Taisirul Quran
বলঃ আল্লাহ ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে কেহই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখেনা এবং তারা জানেনা তারা কখন পুনরুত্থিত হবে।
— Sheikh Mujibur Rahman
বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না।আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’।
— Rawai Al-bayan
বলুন, ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত আসমান ও যমীনে কেউই গায়েব জানে না [১] এবং তারা উপলব্ধিও করেনা কখন উত্থিত হবে [২]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন দেখে নিই, আল্লাহ সকল বিষয় কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন [5]

পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের উপর এমন কোন মুসীবত আসে না যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। এটা (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।
— Taisirul Quran
পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে, আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ।
— Sheikh Mujibur Rahman
যমীনে এবং তোমাদের নিজদের মধ্যে এমন কোন মুসীবত আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ।
— Rawai Al-bayan
যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয়ই আসে তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আমরা তা কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি [১]। নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষে এটা খুব সহজ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এবারে আসুন দেখি, ঐ কিতাবে কীভাবে আসলে সেগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা দেখে নিই। হাদিসে বলা হয়েছে [6] –

সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই।
২১৫৮. ইয়াহইয়া ইবন মূসা (রহঃ) ….. আবদুল ওয়াহিদ ইবন সালিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার মক্কায় এলাম। সেখানে আতা ইবন আবু রাবাহ (রহঃ) এর সঙ্গে দেখা করলাম।তাঁকে বললামঃ হে আবূ মুহাম্মদ, বাসরাবাসরীরা তো তাকদীরের অস্বীকৃতিমূলক কথা বলে। তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস, তুমি কি কুরআন তিলাওয়াত কর? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ সূরা আয-যুখরুখ তিলাওয়াত কর তো। আমি তিলাওয়াত করলামঃ
হা-মীম, কসম সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি তা অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন রূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার। তা রয়েছে আমার কাছে উম্মূল কিতাবে, এ তো মহান, জ্ঞান গর্ভ (৪৩ঃ ১, ২, ৩, ৪)।
তিনি বললেনঃ উম্মূল কিতাব কি তা জান? আমি বললামঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ এ হল একটি মহাগ্রন্থ, আকাশ সৃষ্টিরও পূর্বে এবং যমীন সৃষ্টিরও পূর্বে আল্লাহ তাআলা তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আছে ফির‘আওন জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত, এতে আছে তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবীও ওয়া তাব্বা ‏(‏تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ‏) আবূ লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হয়েছে আর ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও।
আতা (রহঃ) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্যতম সাহাবী উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র ওয়ালীদ (রহঃ)-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাত করেছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলামঃ মৃত্যুর সময় তোমার পিতা কি ওয়াসীয়ত করেছিলেন?
তিনি বললেনঃ তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। বললেনঃ হে প্রিয় বৎস, আল্লাহকে ভয় করবে। যেনে রাখবে যতক্ষণ না আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং তাকদীরের সব কিছুর ভাল-মন্দের উপর ঈমান আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কখনো আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তবে জাহান্নামে দাখেল হতে হবে। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। এরপর একে নির্দেশ দিলেন, লিখ, সে বললঃ কি লিখব? তিনি বললেনঃ যা হয়েছে এবং অনন্ত কাল পর্যন্ত যা হবে সব তাকদীর লিখ। সহীহ, সহিহহ ১৩৩, তাখরিজুত তহাবিয়া ২৩২, মিশকাত ৯৪, আযযিলাল ১০২, ১০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ২১৫৫ (আল মাদানী প্রকাশনী)
(আবু ঈসা বলেন) এ হাদীসটি এ সূত্রে গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তিরমিযী শরীফ বইটি থেকেও সরাসরি দেখে নিই [7] –

তাকদীর বিষয়ক হাদিস তিরমীজী শরিফ
গায়েব

কলম কোনো রূপক নয়: বাস্তব ও দেহবিশিষ্ট সৃষ্টি

তাকদীরের কলমকে নিছক প্রতীক বা ‘আল্লাহর জ্ঞান’-এর সাহিত্যিক প্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি। কলমের প্রকৃতি নিয়ে ১৭৯৬৮৫ নম্বর উত্তরে একে “বাস্তব কলম” বলা হয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এর জিরম—অর্থাৎ দেহ বা ভৌত সত্তা—আছে। একই আলোচনায় সালিহ আল-ফাওযানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কলম ও লাওহ—উভয়কেই আল্লাহর সৃষ্ট বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে এখানে ‘কলম’ কোনো বিমূর্ত জ্ঞানের নাম নয়; এটি বাস্তব সৃষ্ট সত্তা বা বস্তু। [8]

فَالْقَلَمُ الَّذِي كَتَبَ الْمَقَادِيرَ شَأْنُهُ عَظِيمٌ بِلَا شَكٍّ، وَهُوَ قَلَمٌ حَقِيقِيٌّ، كَالَّذِي يَفْهَمُ النَّاسُ مِنْ مَعَانِي الْقَلَمِ، وَلَهُ جِرْمٌ أَيْضًا، لَكِنْ لَا يُقَدَّرُ قَدْرُهُ.

বাংলা অনুবাদ:
যে কলম তাকদীরসমূহ লিখেছে, নিঃসন্দেহে তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বাস্তব কলম—মানুষ ‘কলম’ বলতে যে অর্থ বোঝে সেই অর্থেই; এর একটি দেহ বা ভৌত সত্তাও রয়েছে। তবে তার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

অর্থাৎ এটি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি একটি সৃষ্ট, দেহবিশিষ্ট বাস্তব সত্তা বা বস্তু। ফলে পরবর্তী প্রশ্নটি সরাসরি অস্তিত্বগত: এই দেহবিশিষ্ট সৃষ্টি কোথায় এবং কখন ছিল? হাদিসি ঘটনাক্রম অনুযায়ী, তাকদীরের লিখন আসমান ও জমিন সৃষ্টির বহু আগেই সংঘটিত হয়েছে। সহীহ মুসলিম ২৬৫৩-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে নববী ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে অনাদি তাকদীরের সূচনা নয়, বরং লাওহে মাহফুজে লিখনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে; একই সঙ্গে ‘আরশ পানির ওপর ছিল’ কথাটি আসমান ও জমিন সৃষ্টির পূর্ববর্তী অবস্থাকেই নির্দেশ করে। [9]

كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ. قَالَ الْعُلَمَاءُ: الْمُرَادُ تَحْدِيدُ وَقْتِ الْكِتَابَةِ فِي اللَّوْحِ الْمَحْفُوظِ.

বাংলা অনুবাদ:
“আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টির তাকদীর লিখেছিলেন এবং তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।” আলেমরা বলেছেন, এর উদ্দেশ্য হলো লাওহে মাহফুজে লিখনের সময় নির্ধারণ করা—তাকদীরের মূল সূচনা নির্ধারণ করা নয়।

আসমান-জমিনের আগেই দেহবিশিষ্ট কলম: স্থান কোথায়?

এখানে স্থানসংক্রান্ত সমস্যা সরাসরি দেখা দেয়। কলমের দেহ বা জিরম থাকার বক্তব্যের পাশাপাশি ইবনে তাইমিয়া আল-রিসালাতুল আরশিয়্যা-য় বলেছেন, আরশ আসমান ও জমিন সৃষ্টির আগেই পানির ওপর ছিল এবং তাকদীর নির্ধারণও আরশের অস্তিত্বের পরে, আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের আসমান-জমিনভিত্তিক মহাজাগতিক জগত সৃষ্টির আগেই একাধিক সৃষ্ট বস্তু এবং তাদের পারস্পরিক অবস্থান বিদ্যমান। [10]

أَخْبَرَ اللَّهُ تَعَالَى أَنَّ عَرْشَهُ كَانَ عَلَى الْمَاءِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ.

বাংলা অনুবাদ:
ইবনে তাইমিয়া বলেন, আল্লাহ জানিয়েছেন যে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার আগে তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।

দেহবিশিষ্ট কোনো সৃষ্টি স্থানগত বিস্তার ছাড়া অর্থপূর্ণ নয়। আরও স্পষ্টভাবে, আরশ যদি ‘পানির ওপর’ থাকে, তবে দুইটি সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে ইতিমধ্যে একটি স্থানগত সম্পর্ক রয়েছে—একটি অন্যটির ওপরে। কলম যদি একটি বাস্তব, দেহবিশিষ্ট সৃষ্টি হয় এবং লাওহে লিখে, তবে লেখনী ও যে ফলকে লেখা হচ্ছে তাদের মধ্যেও বাস্তব সম্পর্ক থাকতে হয়। ফলে আসমান-জমিন সৃষ্টির পূর্বে ‘কোনো স্থানগত ব্যবস্থা ছিল না’ বলা এই বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্ণনাটি বরং এমন একটি মহাবিশ্ব-পূর্ব সৃষ্ট জগত দাবি করে, যেখানে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের আগেই বস্তু, অবস্থান এবং পারস্পরিক স্থানগত সম্পর্ক বিদ্যমান।

ইবনে আবিল ইয্‌যের শরহ আকীদাতুত তাহাবিয়্যা-তে এই সৃষ্টিক্রম নিয়ে আলেমদের মতভেদ সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে বিতর্কটি ছিল কলম নাকি আরশ—কোনটি প্রথম সৃষ্টি। আবুল আলা আল-হামাদানীর উল্লেখ করে তিনি আরশকে কলমের পূর্ববর্তী বলাকেই অধিক সঠিক মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। [11]

وَاخْتَلَفَ الْعُلَمَاءُ: هَلِ الْقَلَمُ أَوَّلُ الْمَخْلُوقَاتِ، أَوِ الْعَرْشُ؟ عَلَى قَوْلَيْنِ، ذَكَرَهُمَا الْحَافِظُ أَبُو الْعَلَاءِ الْهَمَذَانِيُّ، أَصَحُّهُمَا: أَنَّ الْعَرْشَ قَبْلَ الْقَلَمِ.

বাংলা অনুবাদ:
আলেমরা মতভেদ করেছেন: কলম কি প্রথম সৃষ্টি, নাকি আরশ? এ বিষয়ে দুটি মত রয়েছে, যা হাফিজ আবুল আলা আল-হামাদানী উল্লেখ করেছেন। দুই মতের মধ্যে অধিক সঠিক হলো, আরশ কলমের আগে।


আসমান-জমিনের ৫০,০০০ বছর আগে: সময় সৃষ্টি হওয়ার আগেই ‘বছর’

স্থানসংক্রান্ত সমস্যার পাশাপাশি আরও কঠিন সমস্যা হলো সময়। সহীহ মুসলিমের ভাষায় তাকদীর লেখা হয়েছে আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে। আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি আল-মুফহিম-এ এই ভাষার সমস্যাটি এড়িয়ে যাননি। তিনি ‘পঞ্চাশ হাজার বছর’কে বাস্তব আসমানি বছর হিসেবে না রেখে একটি অনুমানিক সময়মাত্রা বলেছেন; কারণ তাঁর নিজের ব্যাখ্যায় আসমান সৃষ্টির আগেই আমাদের বছর, দিন ও রাতের অর্থে সময়ের বাস্তব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। [12]

وَهَذِهِ الْخَمْسُونَ أَلْفَ سَنَةٍ سِنُونَ تَقْدِيرِيَّةٌ؛ إِذْ قَبْلَ خَلْقِ السَّمَاوَاتِ لَا يَتَحَقَّقُ وُجُودُ الزَّمَانِ، فَإِنَّ الزَّمَانَ الَّذِي يُعَبَّرُ عَنْهُ بِالسِّنِينَ وَالْأَيَّامِ وَاللَّيَالِي.

বাংলা অনুবাদ:
এই পঞ্চাশ হাজার বছর হলো অনুমানিক বছর; কারণ আসমানসমূহ সৃষ্টির আগে সময়ের বাস্তব অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। কেননা যে সময়কে বছর, দিন ও রাত দিয়ে প্রকাশ করা হয়, তা আকাশীয় ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ হয় না। একই মহাবিশ্ব-পূর্ব কাহিনীতে একটি ধারাবাহিক ঘটনাক্রম রয়েছে: একটি সৃষ্টি আগে বিদ্যমান, আরেকটি পরে; কলম সৃষ্টি হয়; তাকে আদেশ দেওয়া হয়; সে প্রশ্ন করে; আল্লাহ উত্তর দেন; তারপর সে লিখে। ‘আগে’, ‘পরে’, প্রশ্নের পূর্বাবস্থা, উত্তরের পরবর্তী অবস্থা এবং লিখনের সূচনা—সবই সময়গত ক্রম। সময় যদি একেবারেই না থাকে, এই ধারাবাহিকতা অর্থহীন; আর যদি এই ধারাবাহিকতার জন্য কোনো পূর্ববর্তী সময় থাকে, তাহলে আসমান-জমিনের আগেই অন্য একটি সময়গত কাঠামো স্বীকার করতে হয়।

ইবনে তাইমিয়া এই সমস্যার একটি সরাসরি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আসমান ও জমিন যে ছয় দিনে সৃষ্টি হয়েছে, সেই দিনগুলো বর্তমান সূর্য-চন্দ্রের গতিনির্ভর দিন নয়; বরং আসমান-জমিনের আগেই বিদ্যমান অন্য সৃষ্ট বস্তুর গতির মাধ্যমে সেই সময় নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ তাঁর সমাধান সময়কে বিলোপ করে না; বরং আসমান-জমিনের পূর্বেই একটি ভিন্ন সময়গত ব্যবস্থা স্বীকার করে। [13]

وَتِلْكَ الْأَيَّامُ مُقَدَّرَةٌ بِحَرَكَةِ أَجْسَامٍ مَوْجُودَةٍ قَبْلَ خَلْقِ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ.

বাংলা অনুবাদ:
ইবনে তাইমিয়া বলেন, সেই দিনগুলো আসমান ও জমিন সৃষ্টির আগে বিদ্যমান সৃষ্ট বস্তুর গতির মাধ্যমে পরিমিত ছিল।

ফলে বর্ণনার সামনে একটি সরল দ্বিধা দাঁড়ায়। আসমান-জমিন সৃষ্টির আগে যদি সময় না থাকে, তবে ‘পঞ্চাশ হাজার বছর আগে’ এবং সৃষ্টি → আদেশ → প্রশ্ন → উত্তর → লিখন—এই ক্রম আক্ষরিকভাবে ঘটতে পারে না। আর যদি এগুলো বাস্তব ধারাবাহিক ঘটনা হয়, তবে মহাবিশ্বের পূর্বেই একটি সময়গত ব্যবস্থা ছিল। একইভাবে দেহবিশিষ্ট কলম, পানি এবং পানির ‘ওপর’ আরশ যদি বাস্তব হয়, তবে মহাবিশ্বের পূর্বেই স্থানগত সম্পর্কও ছিল। অর্থাৎ আসমান-জমিনকে স্থান-কালের সূচনা হিসেবে ধরলে হাদিসি মহাবিশ্বতত্ত্ব নিজের ঘটনাক্রমেই সেই সূচনার আগের স্থান ও সময় তৈরি করে ফেলে।


লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তা: স্মৃতি, ভুল ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা

লিখিত রেকর্ড মূলত সীমাবদ্ধ জ্ঞানসম্পন্ন সত্তার প্রযুক্তি। মানুষ ভুলে যায়, সাক্ষ্য হারায়, তথ্য বিকৃত হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নির্দেশ পৌঁছাতে হয় এবং বিরোধের ক্ষেত্রে দলিল দেখাতে হয়। কিন্তু ইসলামী আকীদায় আল্লাহর জ্ঞান এসব সীমাবদ্ধতার সম্পূর্ণ বিপরীত—অনাদি, সর্বব্যাপী এবং ভুল ও বিস্মৃতিমুক্ত। মুহাম্মদ খলিল হাররাস শরহুল আকীদাতিল ওয়াসিতিয়্যা-য় প্রথমে আল্লাহর অনাদি ও সর্বব্যাপী জ্ঞান, তারপর সেই জানা বিষয়গুলোর লাওহে মাহফুজে লিখন—এই ক্রম ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ লিখন আল্লাহকে নতুন কোনো তথ্য দেয় না; তাঁর জ্ঞান লিখনের আগেই পূর্ণ। [14]

فَكُلُّ مَا يُوجَدُ مِنْ أَعْيَانٍ وَأَوْصَافٍ وَيَقَعُ مِنْ أَفْعَالٍ وَأَحْدَاثٍ فَهُوَ مُطَابِقٌ لِمَا عَلِمَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَزَلًا.

বাংলা অনুবাদ:
মুহাম্মদ খলিল হাররাস বলেন, যে সমস্ত বস্তু ও গুণ অস্তিত্ব লাভ করে এবং যে সমস্ত কাজ ও ঘটনা সংঘটিত হয়, তা আল্লাহ অনাদিকাল থেকে যা জানতেন তারই অনুরূপ।

ফলে ‘আল্লাহ ভবিষ্যৎ মনে রাখার জন্য লিখেছেন’—এই ব্যাখ্যা ইসলামি উৎসের নিজের বক্তব্য নয়। কিন্তু এর ফলে অন্য প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়: একজন সর্বজ্ঞ সত্তা, যাঁর জ্ঞানের জন্য কোনো বাহ্যিক রেকর্ডের প্রয়োজন নেই, কেন একটি বাস্তব কলম, একটি বাস্তব সংরক্ষিত ফলক এবং সমস্ত মহাজাগতিক ইতিহাসের একটি পূর্বলিখিত সংরক্ষণব্যবস্থা সৃষ্টি করবেন? মানুষের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রাজা, ফরমান, লিপিকার, দলিল ও রেজিস্টারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট; সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ক্ষেত্রে সেই একই কাঠামোর মহাজাগতিক সংস্করণের প্রয়োজনীয়তা স্বতঃসিদ্ধ নয়।

এই লিখন আবার কয়েকটি নির্বাচিত ঘটনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। আগের হাদিসেই কলমকে কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক কিছুর তাকদীর লিখতে বলা হয়েছে। ফলে লাওহে মাহফুজকে নিছক স্মৃতিসহায়ক দলিল বলা যায় না; এটি কদরের কাঠামোর অংশ। সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই—এই স্বীকারোক্তি কলম ও ফলকের মানবসদৃশ প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্যকে মুছে দেয় না; বরং আরও পরিষ্কার করে যে এই মহাজাগতিক রেকর্ড-ব্যবস্থার অস্তিত্ব আল্লাহর জ্ঞানগত প্রয়োজন থেকে আসে না।


কলম কি নিছক যন্ত্র, নাকি গায়েবজ্ঞানসম্পন্ন প্রতিক্রিয়াশীল সৃষ্টি?

হাদিসের বর্ণনায় কলমকে নিছক অচেতন লেখনী হিসেবে দেখানো হয়নি। তাকে সম্বোধন করা হয়, সে প্রশ্ন করে, উত্তর গ্রহণ করে এবং এরপর সমস্ত কিছুর তাকদীর লিখে ফেলে। উবাদা ইবনে সামিতের বর্ণনায় বলা হয়েছে, কলমকে ‘লেখো’ বলা হলে সে কী লিখবে জানতে চায়; এরপর কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে তা লিখে ফেলে। এই বর্ণনাই পরবর্তী কদর-বিষয়ক ব্যাখ্যাগুলোর ভিত্তি। [15]

فَإِنَّ الْقَلَمَ كَتَبَ مَقَادِيرَ الْأَشْيَاءِ، كَمَا يَدُلُّ لَهُ الْحَدِيثُ: إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ لَهُ اكْتُبْ، فَجَرَى بِمَا هُوَ كَائِنٌ إِلَى الْأَبَدِ.

বাংলা অনুবাদ:
কলম সমস্ত বিষয়ের তাকদীর লিখেছে। এর প্রমাণ সেই হাদিস: আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করে তাকে বললেন, ‘লেখো’; এরপর কলম অনন্তকাল পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লিখে ফেলল।

এখানে একটি সরল জ্ঞানসংক্রান্ত প্রশ্ন রয়েছে: কোনো তথ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ একটি সত্তা সেই তথ্য নির্ভুলভাবে লিখতে পারে না, যদি না সেটি নিছক বাহ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র হয়। কিন্তু হাদিস কলমকে প্রশ্নকারী ও নির্দেশ গ্রহণকারী সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। আল্লাহ প্রতিটি শব্দ আলাদাভাবে উচ্চারণ করে কলমকে যান্ত্রিকভাবে লিখিয়েছেন—এমন বর্ণনা হাদিসে নেই; বরং কলমকে সমস্ত কিছুর তাকদীর লিখতে আদেশ করা হয়েছে এবং সে তা লিখেছে। ফলে লিখনের সময়ে মহাবিশ্বের সেই পূর্ণ ভবিষ্যৎ-তথ্য তার কাছে উপলব্ধ ছিল।

এই জায়গাতেই কোরআনের একচ্ছত্র গায়েবজ্ঞান দাবি সমস্যায় পড়ে। ‘গায়েব শুধু আল্লাহ জানেন’—এর সঙ্গে ‘একটি সৃষ্টি সমগ্র ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ লিখিত রেকর্ড তৈরি করেছে’ একই অর্থে একসঙ্গে রাখা যায় না। জ্ঞানটি কোথা থেকে এসেছে—এটি জ্ঞানের উৎসের প্রশ্ন; কলমের কাছে সেই গায়েবি তথ্য ছিল কি না—এটি জ্ঞান ধারণের প্রশ্ন। আল্লাহ তথ্য দিয়েছেন ধরে নিলেও লিখনের সময়ে কলমের কাছে সেই তথ্যের উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না।

আরও কঠোরভাবে বললে, কোরআনের `لا يعلمها إلا هو`—“তিনি ছাড়া কেউ জানে না”—বাক্যটি যদি সর্বজনীন একচ্ছত্র ঘোষণা হয়, তবে একটি সৃষ্ট কলমের পূর্ণ ভবিষ্যৎ-জ্ঞান সেই ঘোষণার সরাসরি ব্যতিক্রম। তখন হয় কোরআনের একচ্ছত্রতার দাবিতে নতুন শর্ত যোগ করতে হবে, নয়তো হাদিসি কলমের পূর্ণ ভবিষ্যৎ-তথ্য অস্বীকার করতে হবে। দুটিকে একই অর্থে অপরিবর্তিত রেখে অসঙ্গতি এড়ানো যায় না।

গায়েব 2

যে গায়েব জানে সে-ই আল্লাহ: কোরআনের একচ্ছত্র দাবির বিরুদ্ধে কলম

কোরআনের বক্তব্যকে সরল যুক্তিবাক্যে ধরলে সমস্যাটি আরও পরিষ্কার হয়। আল-আনআম ৬:৫৯ বলছে: গায়েবের চাবিকাঠি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আল-জিন ৭২:২৬–২৭ বলছে: আল্লাহ তাঁর গায়েব প্রকাশ করেন না, শুধু নির্বাচিত রাসুলকে ব্যতিক্রম করেছেন। কলম আল্লাহ নয়; কলম কোনো রাসুলও নয়; ইসলামি আকীদায় এটি একটি সৃষ্ট মাখলুক। অথচ একই কলমকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত কিছুর পূর্ণ তাকদীর লিখতে বলা হয়েছে।

আবদুর রহমান আস-সা‘দীর তাফসিরে এই লিখনের ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট। তাঁর ব্যাখ্যায় লাওহে মাহফুজে শুধু কয়েকটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; ছোট-বড় সমস্ত বস্তু ও ঘটনা তাদের প্রকৃত অবস্থাসহ লিপিবদ্ধ, এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো কলমের সেই লিখন অনুযায়ী সংঘটিত হয়। [16]

بَلْ جَمِيعُ الْأَشْيَاءِ، صَغِيرُهَا وَكَبِيرُهَا، مُثْبَتَةٌ فِي اللَّوْحِ الْمَحْفُوظِ، عَلَى مَا هِيَ عَلَيْهِ، فَتَقَعُ جَمِيعُ الْحَوَادِثِ طِبْقَ مَا جَرَى بِهِ الْقَلَمُ.

বাংলা অনুবাদ:
বরং সমস্ত বিষয়—ছোট ও বড়—লাওহে মাহফুজে তাদের প্রকৃত অবস্থাসহ লিপিবদ্ধ রয়েছে; ফলে সমস্ত ঘটনাই কলমে যা লেখা হয়েছে ঠিক সেই অনুযায়ী সংঘটিত হয়।

এটি কয়েকটি বিচ্ছিন্ন গায়েবি তথ্য নয়। একটি মানুষ কখন জন্মাবে, কী করবে, কতদিন বাঁচবে, কী পাপ-পুণ্য করবে, কী পরিণতি হবে—মহাবিশ্বে কিয়ামত পর্যন্ত যা যা সত্যিকার অর্থে ঘটবে, পুরো সেটিই পূর্বলিখিত। ফলে কলমের কাছে উপস্থিত তথ্যের পরিধি কার্যত সমগ্র ভবিষ্যৎ ইতিহাস।

এখন কোরআনের দাবিকে একই কঠোর অর্থে ধরে রাখলে যুক্তিটি দাঁড়ায়:

প্রথম প্রেমিস: গায়েবের জ্ঞান আল্লাহর একচ্ছত্র বৈশিষ্ট্য—“তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।”

দ্বিতীয় প্রেমিস: সৃষ্ট কলম কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত ঘটনার তাকদীর লিখেছে; অর্থাৎ সেই সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ-তথ্য তার কাছে উপস্থিত ছিল।

ফল: হয় গায়েবজ্ঞান বাস্তবে আল্লাহর একচ্ছত্র বৈশিষ্ট্য নয়, নয়তো কলমকেও আল্লাহর জন্য একচ্ছত্রভাবে সংরক্ষিত সেই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী স্বীকার করতে হয়। দ্বিতীয়টি স্বীকার করলে মাখলুক কলম আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত বৈশিষ্ট্যের অংশীদার হয়ে যায়।

অসঙ্গতি: “শুধু আল্লাহ জানেন” এবং “আল্লাহ নয় এমন সৃষ্ট কলমও সমগ্র ভবিষ্যৎ জানে”—দুটি বক্তব্য একই অর্থে একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।

তথ্যের উৎস আল্লাহ হওয়া এবং সেই তথ্য একটি সৃষ্ট সত্তার কাছে উপস্থিত থাকা দুইটি পৃথক বিষয়। কোরআন যে জ্ঞানকে “তিনি ছাড়া কেউ জানে না” বলে একচ্ছত্র করেছে, কলমের বর্ণনায় সেই গায়েবি তথ্য একটি মাখলুকের কাছে উপস্থিত এবং তার মাধ্যমে লিখিত। তখন একচ্ছত্রতা আর জ্ঞান ধারণে থাকে না; কেবল জ্ঞানের উৎসে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কোরআনের বাক্যটি “তিনি ছাড়া কেউ নিজের থেকে জানে না” বলেনি; বলেছে “তিনি ছাড়া কেউ জানে না”। ‘নিজস্ব জ্ঞান’ ও ‘প্রদত্ত জ্ঞান’-এর পার্থক্য তাই আয়াতের সরাসরি ভাষায় নেই; এটি দুই উৎসকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য পরবর্তী ব্যাখ্যাগত সংযোজন।


ইসলামী আকীদা: স্রষ্টা এবং সৃষ্টি আলাদা

ইসলামী তাওহীদের মূল দাবি হলো, স্রষ্টা (আল্লাহ) এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পূর্ণ পৃথক ও অভিন্ন নয়। কোরআনের সূরা আল-ইখলাস (১১২:১-৪)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: “বলো, তিনি আল্লাহ, এক, অদ্বিতীয়। তিনি না জন্ম দিয়েছেন, না জন্মগ্রহণ করেছেন। এবং কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।” এই তাওহীদের তৃতীয় শাখা—তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত—আরও জোর দিয়ে বলে যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি (সিফাত) তাঁর সত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু কোনো সৃষ্ট বস্তু বা সত্তা সেই সিফাত ধারণ করতে পারে না। সৃষ্টি আল্লাহর সত্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, কোনো অংশ বা প্রকাশ নয়। এই দাবি ইসলামী আকীদার কেন্দ্রবিন্দু, যা কোনো ধরনের অভিন্নতা বা অংশীদারিত্বকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে।

হিন্দু ধর্ম বা সর্বপ্রাণবাদী দর্শনে (প্যানথেইজম) সৃষ্টি ও স্রষ্টা একাকার—ব্রহ্মই সবকিছু, সবকিছুই ব্রহ্মের অংশ বা প্রকাশ। অদ্বৈত বেদান্তে আত্মা ও ব্রহ্ম অভিন্ন। ইসলাম এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে দাবি করে যে সৃষ্টি কখনো স্রষ্টার অংশ বা সত্তার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। একইভাবে খ্রিস্টধর্মে যীশুকে ঈশ্বরের অবতার বা ত্রিত্বের অংশ (ইনকারনেশন) হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ঈশ্বর মানবরূপ ধারণ করেন। ইসলামী তাওহীদ এই ধারণাকে শিরক বলে প্রত্যাখ্যান করে—আল্লাহর সত্তা কোনো সৃষ্টিতে প্রবেশ বা অবতীর্ণ হতে পারে না। এই পার্থক্যকে ইসলামী আলেমরা ‘তানজিহ’ (ঈশ্বরকে সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ উর্ধ্বে রাখা) বলে ব্যাখ্যা করেন।

কিন্তু যখন এই নীতি কলমের (আল-কালাম) ধারণায় প্রয়োগ করা হয়, তখন স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা দেয়। হাদিস অনুসারে, আল্লাহ প্রথমে কলম সৃষ্টি করেন এবং কলম সব ভবিষ্যৎ লিখে ফেলে। এই বর্ণনায় কলমকে একটি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে এমন সৃষ্ট সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাকে ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ জ্ঞান (গায়েব) প্রদান করা হয়েছে। অথচ কোরআন (সূরা নামল ২৭:৬৫) বলে, “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।”

ইসলামী আকীদা অনুসারে কলম একটি ‘মাখলুক’—সৃষ্টি; আল্লাহর কোনো ‘সিফাত’ বা গুণ নয়। সুন্নি অর্থোডক্সিতে কোরআনকে আল্লাহর অনন্ত বাণী হিসেবে অসৃষ্ট বলে গণ্য করা হয়। কোরআন সৃষ্ট কি না—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে খলিফা আল-মামুনের শাসনামলে ৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘মিহনা’ নামের ধর্মীয় নিপীড়ন শুরু হয়; আলেমদের কারাবন্দি ও প্রহার করা হয় এবং এই নীতি আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে ৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্যাহৃত হয়। এই ঐতিহাসিক বিরোধ দেখায় যে স্রষ্টার গুণ ও সৃষ্ট সত্তার বৈশিষ্ট্যের সীমারেখা ইসলামি আকীদায় তুচ্ছ প্রশ্ন ছিল না।

যুক্তির সমস্যাটি এখানেই: কলম যদি সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহর সত্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়, অথচ কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনা জানার মতো তথ্য তার কাছে উপস্থিত থাকে, তাহলে কোরআনের একচ্ছত্র গায়েবজ্ঞান দাবিটি আর সরল অর্থে অক্ষুণ্ণ থাকে না। হাদিস কলমকে এমন জ্ঞান ধারণের অবস্থায় স্থাপন করে, যা কোরআনের ভাষায় আল্লাহর জন্য একচ্ছত্রভাবে সংরক্ষিত। ‘প্রদত্ত জ্ঞান’ ও ‘নিজস্ব জ্ঞান’-এর পার্থক্য যোগ করলে তথ্যের উৎস ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু “তিনি ছাড়া কেউ জানে না” বাক্যটির সরল একচ্ছত্রতা আর বজায় থাকে না। একটি সৃষ্ট সত্তা তখন আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত বলে ঘোষিত বৈশিষ্ট্যের অংশীদার হয়।


প্রতীকী বা রূপক অর্থের সমস্যা

রূপক ব্যাখ্যার জন্য একটি সুসংগত মানদণ্ড প্রয়োজন। কোনো বর্ণনার আক্ষরিক অর্থ সমস্যায় পড়লেই সেটিকে রূপক ধরে নেওয়া হলে একই পদ্ধতি মিরাজ, বুরাক, জান্নাতের হুর, ফেরেশতা, শয়তান এবং অন্যান্য অলৌকিক বর্ণনার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়। কলমের বর্ণনাকে রূপক বলার পক্ষে স্বতন্ত্র টেক্সটভিত্তিক প্রমাণ না থাকলে শুধু এই একটি সমস্যাজনক জায়গায় আক্ষরিক অর্থ ত্যাগ করা নির্বাচিত ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত যখন একই সুন্নি উৎসে কলমকে বাস্তব সৃষ্টি, এমনকি দেহবিশিষ্ট বলেও বর্ণনা করা হয়েছে, তখন রূপক পাঠের ভিত্তি আরও দুর্বল হয়।


তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামী কাহিনীর প্রাচীন উৎসসমূহ

প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনীগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানুষের ভাগ্য বা নিয়তির ধারণা প্রায়শই একটি ‘লিখিত দলিল’ বা ‘বোনা সুতো’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা দেবতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ইসলামের তাকদির, লাওহে মাহফুজ এবং কলমের ধারণার সঙ্গে এই প্রাচীন পুরাণগুলোর শক্তিশালী সাদৃশ্য রয়েছে। এই সাদৃশ্য নিজে থেকে সরাসরি ধার নেওয়া প্রমাণ করে না; তবে ধারণাগুলোকে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন বা ইতিহাসবিচ্ছিন্ন ঐশী ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করাও সঠিক নয়। প্রাচীন পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় ধর্মে লিখিত ভাগ্য, ঐশী লিপিকার এবং পূর্বনির্ধারিত নিয়তির বহু পুরোনো নজির রয়েছে।

মেসোপটেমিয়ান মিথলজি (ভাগ্যের ফলক): প্রাচীন মেসোপটেমীয় (সুমেরিয়ান এবং আক্কাদিয়ান) পুরাণে “ট্যাবলেট অব ডেসটিনিজ” (সুমেরিয়ান: dub namtarra; আক্কাদিয়ান: ṭup šīmātu) নামক একটি সিলিন্ডার সিল চিহ্নিত মাটির ফলকের কথা উল্লেখ আছে। ‘এনুমা এলিশ’ (Enuma Elish) মহাকাব্যে বর্ণিত আছে, দেবতা এনলিলের হাতে থাকা এই ফলকটি মহাবিশ্বের নিয়তি নির্ধারণ করে এবং যে এটি ধারণ করে, সে-ই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়। পরবর্তীতে এটি কিংগুর হাতে দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে দেবতা মারডুক তা ছিনিয়ে নেন। এই ‘ভাগ্যের ফলক’-এর ধারণাই যে ইসলামী ‘লাওহে মাহফুজ’ বা সংরক্ষিত ট্যাবলেটের মূল আদি উৎস, তা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহজেই অনুমেয়। এটি কোনো আসমানি ধারণা নয়, বরং প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার লিখিত আইন ব্যবস্থার ধর্মীয় রূপান্তর মাত্র।
মিশরীয় মিথলজি (দেবতা থোথ এবং ঐশী লিপিকার): প্রাচীন মিশরে থোথ ছিলেন লেখা, জ্ঞান এবং চাঁদের দেবতা। তিনি হায়ারোগ্লিফিক্সের সঙ্গে যুক্ত এবং দেবতাদের লিপিকার হিসেবে বর্ণিত। মৃত্যুর পর হৃদয় ওজনের বিচারে তিনি ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন। ইসলামে কলমের ভবিষ্যৎ-লিখন এবং ফেরেশতাদের কর্মলিপির সঙ্গে এর একটি লক্ষণীয় তুলনামূলক সাদৃশ্য রয়েছে; এই সাদৃশ্য সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন তোলে, যদিও শুধু সাদৃশ্য থেকেই সরাসরি ধার নেওয়া প্রমাণিত হয় না।
গ্রিক মিথলজি (ময়রাই বা ভাগ্যের দেবী): গ্রিক ধর্মে নিয়তি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিল ‘ময়রাই’ নামক তিন দেবী—ক্লোথো (যিনি জীবনের সুতো কাটেন), ল্যাচেসিস (যিনি ভাগ্যের সুতো মাপেন) এবং অ্যাট্রোপোস (যিনি সুতো কেটে মৃত্যু নির্ধারণ করেন)। হেসিওডের ‘থিওগনি’ অনুসারে, এই নিয়তি এতটাই শক্তিশালী ও অপরিবর্তনীয় যে স্বয়ং দেবতারাও এর অধীন। মানুষের জীবনের এই পূর্বনির্ধারিত ছকের ধারণা ইসলামী কাদর বা অপরিবর্তনীয় নিয়তির সাথে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
নর্স মিথলজি (নর্নস এবং বিশ্ববৃক্ষ): নর্স ধর্মে ‘নর্নস’ নামক তিন দেবী—উর্দ (অতীত), ভার্দান্দি (বর্তমান) এবং স্কুলদ (ভবিষ্যৎ)—বিশ্ববৃক্ষ ‘ইগড্রাসিল’-এর নিচে বসে মানুষের ভাগ্যের সুতো বুনতেন। ‘ভোলুস্পা’ (Völuspá) কবিতায় দেখা যায়, তারা দেবতাদের ভাগ্যও নিয়ন্ত্রণ করেন। সুতো বুনে নিয়তি নির্ধারণ করার এই প্রাচীন ধারণা ইসলামী কলম দিয়ে নিয়তি লেখার ধারণারই সমান্তরাল একটি মিথ।
হিন্দু ধর্ম (ব্রহ্মার লিখন এবং কর্মফল): হিন্দু পুরাণসমূহে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা মানুষের ভবিষ্যৎ লিখে রাখেন বলে উল্লেখ আছে। তবে এখানে একটি বড় দার্শনিক পার্থক্য রয়েছে—এই লিখিত ভাগ্য মানুষের ‘কর্মফল’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’ ও ‘সাধনা’র মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য। অর্থাৎ, ‘কর্ম’, ‘ফল’ ও ‘পুনর্জন্ম’-এর মাধ্যমে সেখানে একটি ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া, ব্রহ্মা হিন্দুধর্মে চূড়ান্ত বা সর্বশক্তিমান ঈশ্বর নন, তার ঊর্ধ্বে নিরাকার পরম ব্রহ্মের অবস্থান।

প্রাচীন মিথলজিতে ভাগ্য পরিবর্তনযোগ্য বা অন্তত দেবতাদের মধ্যে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকলেও, ইসলামে “তাকদির” বা কাদর একটি একবারে লেখা, চূড়ান্ত এবং চরম অপরিবর্তনীয় ভাগ্যব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপিত [17]। মূলধারার ইসলামী আকিদা অনুসারে, এটি আল্লাহর নির্দেশে লাওহে মাহফুজে একবারই লিখিত হয়েছে এবং তা কোনোভাবেই বদলানো সম্ভব নয়।

এই অনড়, একরৈখিক নিয়তি শুধু ধর্মতাত্ত্বিক অসামঞ্জস্যই তৈরি করে না, বরং এক ভয়াবহ দার্শনিক শূন্যতা সৃষ্টি করে। যদি সবকিছু পূর্বলিখিত এবং অপরিবর্তনীয় পূর্বলিখিত ছক অনুযায়ীই ঘটে, তবে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মর্যাদা বলে কিছু থাকে না। মানুষের পছন্দের কোনো কার্যকর মূল্য না থাকলে, শেষ বিচারের দিনে তাকে শাস্তির সম্মুখীন করা যৌক্তিকভাবে চরম অবিচার। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ভাগ্য বা নিয়তির ইসলামী ধারণাটি কোনো নিখুঁত অলৌকিক সত্য নয়, বরং প্রাচীন মেসোপটেমীয় ও অন্যান্য মিথগুলোর একটি অপরিমার্জিত ও অনমনীয় অভিযোজন মাত্র, যা যুক্তি দিয়ে সহজেই খণ্ডনযোগ্য।


মানবীয় ঈশ্বর, স্বাধীন ইচ্ছা এবং ন্যায়বিচারের সংকট

কলম দিয়ে ভাগ্য লেখার ধারণা ঈশ্বরের মানবীয়করণের একটি স্পষ্ট রূপ। প্রাচীন রাজা-বাদশাহরা কেরানি বা লিপিকার দিয়ে ফরমান, আইন ও ইতিহাস লিখিয়ে সংরক্ষণ করতেন; ইসলামি বর্ণনায়ও সর্বজ্ঞ শাসক, কলম, সংরক্ষিত ফলক এবং পূর্বলিখিত মহাজাগতিক নথির কাঠামো দেখা যায়। কোরআনে আল্লাহর হাত, মুখ, পা ইত্যাদি বর্ণনা নিয়েও ইসলামি ধর্মতত্ত্বে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে [17]। কিন্তু কলম ও লাওহের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও নির্দিষ্ট: সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান সত্তার নিজের জ্ঞান সংরক্ষণ, ভুল ঠেকানো বা ভবিষ্যৎ স্মরণ করার প্রয়োজন নেই; অথচ ধর্মতত্ত্বে একটি বাস্তব লেখনী ও সংরক্ষিত ফলককে মহাজাগতিক ব্যবস্থার মৌলিক অংশ করা হয়েছে। এটি মানুষের প্রশাসনিক নথি-ব্যবস্থার সঙ্গে গভীর সাদৃশ্য তৈরি করে।

স্বাধীন ইচ্ছার সংকট শুধু ভবিষ্যৎ আগেই ‘জানা’ বা ‘লেখা’ ছিল—এতটুকু নয়। নিছক পূর্বজ্ঞান নিজে কোনো কাজের কারণ না-ও হতে পারে। কিন্তু আহলুস সুন্নাহর কদর-তত্ত্ব পূর্বজ্ঞান ও লিখনে থামে না। ইবনে তাইমিয়া আল-আকীদাতুল ওয়াসিতিয়্যা-য় কদরের প্রথম স্তরে আল্লাহর অনাদি জ্ঞান ও লাওহে লিখন, এবং দ্বিতীয় স্তরে আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছা ও সর্বব্যাপী সৃষ্টিশক্তি স্থাপন করেছেন। মুহাম্মদ খলিল হাররাসের শরহেও এই কাঠামো একইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে মানুষের কাজ শুধু আগে জানা ও লেখা নয়; তা এমন এক ব্যবস্থার অংশ যেখানে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো ঘটনা ঘটে না এবং সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টাও আল্লাহ। [18]

فَالْدَرَجَةُ الْأُولَى: الْإِيمَانُ بِأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى عَلِيمٌ بِالْخَلْقِ، وَهُمْ عَامِلُونَ بِعِلْمِهِ الْقَدِيمِ الَّذِي هُوَ مَوْصُوفٌ بِهِ أَزَلًا وَأَبَدًا.

বাংলা অনুবাদ:
ইবনে তাইমিয়া বলেন, কদরের প্রথম স্তর হলো: আল্লাহ সৃষ্টির বিষয়ে জ্ঞাত, এবং সৃষ্টির কর্ম তাঁর সেই অনাদি জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত, যে জ্ঞান দ্বারা তিনি অনন্তকাল ধরে গুণান্বিত।

মুহাম্মদ খলিল হাররাস শরহুল আকীদাতিল ওয়াসিতিয়্যা-য় আল্লাহর ইচ্ছার পরিসর আরও স্পষ্ট করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় আসমান ও জমিনের কোনো গতি বা স্থিরতা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয়; তাঁর রাজত্বে তিনি যা চান না তা ঘটে না। বান্দাদের আনুগত্য ও অবাধ্যতার কাজও এই সর্বব্যাপী ইচ্ছার বাইরে রাখা হয়নি। [19]

وَأَنَّهُ لَا يَقَعُ فِي مُلْكِهِ مَا لَا يُرِيدُ، وَأَنَّ أَفْعَالَ الْعِبَادِ مِنَ الطَّاعَاتِ وَالْمَعَاصِي وَاقِعَةٌ بِتِلْكَ الْمَشِيئَةِ الْعَامَّةِ الَّتِي لَا يَخْرُجُ عَنْهَا كَائِنٌ.

বাংলা অনুবাদ:
তাঁর রাজত্বে এমন কিছু ঘটে না যা তিনি চান না। বান্দাদের কাজ—আনুগত্য হোক বা পাপ—সেই সর্বব্যাপী ইচ্ছার অধীনেই সংঘটিত হয়, যার বাইরে কোনো সৃষ্ট ঘটনাই যেতে পারে না।

মানুষের কাজ আল্লাহর সৃষ্টি—এই অবস্থান ইবনে উসাইমিনও সরাসরি ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায় বান্দাদের আনুগত্য ও পাপসহ সমস্ত কাজ আল্লাহর সৃষ্টি; এরপর তিনি মানুষের দায় ব্যাখ্যা করতে মানুষের ইচ্ছা ও সক্ষমতার কথা বলেছেন। অর্থাৎ সুন্নি কাঠামোতে মানুষের কাজকে একই সঙ্গে মানুষের অর্জিত কাজ এবং আল্লাহর সৃষ্টি বলা হয়। [20]

أَفْعَالُ الْعِبَادِ كُلُّهَا مِنْ طَاعَاتٍ وَمَعَاصٍ كُلُّهَا مَخْلُوقَةٌ لِلَّهِ.

বাংলা অনুবাদ:
ইবনে উসাইমিন বলেন, বান্দাদের সমস্ত কাজ—আনুগত্য ও পাপ—সবই আল্লাহর সৃষ্টি।

এখানেই নৈতিক সমস্যাটি সবচেয়ে কঠোর রূপ নেয়। যে কাজের জন্য একজন মানুষকে বিচার করা হবে, সেই কাজ সম্পর্কে বিচারক অনাদিকাল থেকে জানেন; মানুষ জন্মানোর আগেই তা লিখে রেখেছেন; তাঁর কার্যকর ইচ্ছার বাইরে বিপরীত ফল ঘটতে পারে না; এবং কাজটির অস্তিত্বও তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। এরপর একই মানুষকে বলা হয়, কাজটির জন্য পূর্ণ দায় তার এবং অবিশ্বাস বা নির্দিষ্ট পাপের জন্য তার অনন্ত শাস্তি হতে পারে। যে ব্যবস্থায় বিচারকই ফলাফলের পূর্বজ্ঞান, পূর্বলিখন, কার্যকর ইচ্ছা ও অস্তিত্ব-সৃষ্টির অধিকারী, সেখানে সমস্ত নৈতিক দায় কেবল বিচারাধীন সৃষ্টির ওপর চাপানো ন্যায়বিচারের দাবি নয়; সেই ন্যায়বিচার আলাদাভাবে প্রমাণ করার বিষয়।

মানুষের ইচ্ছাকেও কোরআন আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করেছে: “তোমরা চাইবে না, যদি না আল্লাহ চান”। মানুষ যদি আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছার বাইরে অন্য ফল বাস্তবায়ন করতে অক্ষম হয়, তার কর্মও যদি আল্লাহর সৃষ্টি হয় এবং তার চূড়ান্ত পরিণতিও আগে থেকে লিখিত থাকে, তবে প্রকৃত বিকল্প বেছে নেওয়ার অর্থে স্বাধীন ইচ্ছার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব সম্ভাবনা আর অবশিষ্ট থাকে না।


উপসংহার: ইসলামি ঈশ্বরতত্ত্বের অন্তঃসারশূন্যতা

কলম ও লাওহে মাহফুজের বর্ণনা বিচ্ছিন্ন কোনো অদ্ভুত হাদিস নয়; এটি ইসলামী কদর-তত্ত্বের কেন্দ্রীয় কাঠামোর অংশ। কোরআন গায়েবজ্ঞানকে আল্লাহর একচ্ছত্র বৈশিষ্ট্য বলে এবং গায়েব প্রকাশের নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম হিসেবে নির্বাচিত রাসুলকে উল্লেখ করে। অথচ হাদিসে আল্লাহ নয়, রাসুলও নয়—এমন একটি সৃষ্ট, বাস্তব ও দেহবিশিষ্ট কলমকে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত কিছুর তাকদীর লিখতে দেওয়া হয়েছে। ইসলামি ব্যাখ্যার নিজের ভাষায় ছোট-বড় সব ঘটনা সেই রেকর্ডে আছে এবং ঘটনাগুলো কলমের লিখন অনুযায়ী সংঘটিত হয়। এটি খণ্ডিত ভবিষ্যৎ সংবাদ নয়; সৃষ্টির পূর্ণ ভবিষ্যৎ ইতিহাস।

একই কাহিনী স্থান ও সময়ের সমস্যাও তৈরি করে। আসমান-জমিন সৃষ্টির আগেই পানি, তার ওপর আরশ, বাস্তব দেহবিশিষ্ট কলম এবং লাওহের লিখন বিদ্যমান। আবার সেই লিখনকে ‘আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে’ বলা হয়েছে। ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকারীরাই স্বীকার করেছেন যে আসমান সৃষ্টির আগে আমাদের পরিচিত সময় ছিল না। ফলে হয় ‘পঞ্চাশ হাজার বছর’ এবং সৃষ্টি-আদেশ-প্রশ্ন-উত্তর-লিখনের ঘটনাক্রমকে আক্ষরিক সময় থেকে সরিয়ে নিতে হয়, নয়তো আমাদের মহাবিশ্বের আগেই একটি ভিন্ন সময়গত ব্যবস্থা স্বীকার করতে হয়। একইভাবে ‘আরশ পানির ওপর’ এবং দেহবিশিষ্ট কলমের লিখন মহাবিশ্ব-পূর্ব স্থানগত সম্পর্ক দাবি করে।

পূর্বনির্ধারণের সংকট আরও গভীর। মূলধারার সুন্নি আকীদায় মানুষের ভবিষ্যৎ শুধু আল্লাহ জানেন না; তা আগে লেখা, তাঁর কার্যকর ইচ্ছার অধীন এবং মানুষের কাজসহ সমস্ত কিছু তাঁর সৃষ্টি। অর্থাৎ বিচারাধীন ব্যক্তির কাজের পূর্বজ্ঞান, পূর্বলিখন, সংঘটনের কার্যকর ইচ্ছা ও অস্তিত্ব—সবই বিচারকের নিয়ন্ত্রণে। তারপরও সমস্ত নৈতিক দায় সৃষ্টির ওপর চাপিয়ে তাকে অনন্ত শাস্তির মুখোমুখি করা হয়। এমন ব্যবস্থাকে ন্যায়বিচার বলা ঘোষণা হতে পারে; কিন্তু ঘোষণাটি ন্যায়বিচারের যৌক্তিক ভিত্তি নয়।

ফলে কলমের গল্প ইসলামী ঈশ্বরতত্ত্বের একাধিক মৌলিক দাবিকে একই বিন্দুতে সংঘর্ষে আনে: আল্লাহর একচ্ছত্র গায়েবজ্ঞান বনাম সৃষ্ট কলমের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ-লিখন; আসমান-জমিনের পূর্বে দেহবিশিষ্ট সৃষ্টি ও স্থান-কালসদৃশ সম্পর্ক; সর্বজ্ঞ সত্তার পাশে মহাজাগতিক লিখন ও সংরক্ষণ-ব্যবস্থা; এবং আল্লাহর জ্ঞান, লিখন, ইচ্ছা ও সৃষ্টির অধীন মানবকর্মের জন্য মানুষের পূর্ণ নৈতিক দায়। ‘গায়েব’, ‘রহস্য’ বা ‘আল্লাহই ভালো জানেন’—এই শব্দগুলো পরস্পরবিরোধী দাবির যৌক্তিক সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করে না। যে ধর্মতত্ত্ব একই সঙ্গে এসব পরস্পরবিরোধী অস্তিত্বগত দাবি সত্য বলে গ্রহণ করে, সেই ধর্মতত্ত্বের ওপরই তাদের সামঞ্জস্য প্রমাণ করার দায় থাকে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন, আল-আনআম ৬:৫৯ ↩︎
  2. কোরআন, আল-জিন ৭২:২৬–২৭ ↩︎
  3. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৭০০ ↩︎
  4. কোরআন ২৭ঃ৬৫ ↩︎
  5. কোরআন ৫৭ঃ২২ ↩︎
  6. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২১৫৮ ↩︎
  7. সহীহ আত-তিরমিযী, ৪র্থ খণ্ড, তাহক্বীকঃ মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী, হোসেইন আল মাদানী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫২ ↩︎
  8. তাকদীরের কলমের প্রকৃতি; সালিহ আল-ফাওযানের উদ্ধৃতিসহ, উত্তর ১৭৯৬৮৫ ↩︎
  9. নববী, আল-মিনহাজ শরহ সহীহ মুসলিম, কিতাবুল কদর ↩︎
  10. ইবনে তাইমিয়া, আল-রিসালাতুল আরশিয়্যা; উদ্ধৃত ফতোয়া ৪৭০৪৫৮ ↩︎
  11. ইবনে আবিল ইয্‌য, শরহ আকীদাতুত তাহাবিয়্যা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৫ ↩︎
  12. আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি, আল-মুফহিম, কিতাবুল কদর ↩︎
  13. ইবনে তাইমিয়া, মাজমু আল-ফাতাওয়া, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ২৩৫; উদ্ধৃত উত্তর ২৪০৫৯৯ ↩︎
  14. মুহাম্মদ খলিল হাররাস, শরহুল আকীদাতিল ওয়াসিতিয়্যা, কদরের প্রথম স্তর ↩︎
  15. উবাদা ইবনে সামিতের বর্ণিত হাদিস; আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযী ↩︎
  16. আবদুর রহমান আস-সা‘দী, তাফসির: লাওহে মাহফুজে সমস্ত কিছুর লিখন; উদ্ধৃত উত্তর ৩৪৬৩৭১ ↩︎
  17. ইসলামের অন্যতম ভিত্তি তাকদীর প্রসঙ্গে 1 2
  18. ইবনে তাইমিয়া, আল-আকীদাতুল ওয়াসিতিয়্যা; মুহাম্মদ খলিল হাররাসের শরহ, কদরের স্তরসমূহ ↩︎
  19. মুহাম্মদ খলিল হাররাস, শরহুল আকীদাতিল ওয়াসিতিয়্যা, কদরের দ্বিতীয় স্তর ↩︎
  20. ইবনে উসাইমিন, মাজমু ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৪৬; উদ্ধৃত উত্তর ৩৭৬৩০২ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Source-critical analysis of Islamic theology, predestination, divine omniscience and cosmology.

Epistemic Position: Evidence-based, non-confessional and logically critical. Qur'anic verses, hadith reports and classical Sunni theological commentaries are treated as textual evidence for Islamic doctrines; their religious authority is not assumed to establish the truth or logical consistency of those doctrines.

This article examines the Islamic doctrine of the Pen, the Preserved Tablet and predestination in relation to several foundational theological claims: Allah's exclusive knowledge of the unseen, the distinction between Creator and creation, the creation of the heavens and the earth, the nature of time and spatial relations before the observable cosmos, divine omniscience, and human moral responsibility.

Particular attention is given to the tension between Qur'anic passages stating that knowledge of the unseen belongs exclusively to Allah and hadith reports describing a created Pen that records the decrees of everything until the Day of Resurrection. The article also examines classical explanations describing the Pen as a real created entity, the Throne and water as existing before the creation of the heavens, and the decree as having been written fifty thousand years before the creation of the heavens and the earth.

The analysis further addresses the temporal and spatial implications of this cosmology. If the Pen, the Throne and water existed before the heavens and the earth, while creation, command, response and writing occurred sequentially, the narrative already presupposes relations analogous to temporal succession and spatial arrangement before the creation of the present cosmic order.

The final section examines the four classical Sunni levels of qadar—knowledge, writing, divine will and creation—and their implications for human responsibility. If human actions are eternally known, previously written, dependent upon Allah's effective will and themselves created by Allah, the compatibility of this system with meaningful moral responsibility requires a separate justification rather than merely an assertion of both doctrines.

Leave a comment

Your email will not be published.