জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

কোরআনে ভুলের বর্ণনা: উসমানের ‘লাহন’ ও আয়েশার ‘কাতিবরা লেখায় ভুল করেছে’

প্রকাশিত: এপ্রিল 26, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন17 মিনিট পড়া

সারসংক্ষেপ

কোরআনের বর্তমান উসমানি মুসহাফ শুরু থেকেই প্রতিটি লিখিত রূপে সম্পূর্ণ নিখুঁত ছিল এবং তার লিখনপ্রক্রিয়ায় মানবীয় ভুলের কোনো প্রশ্ন কখনো ওঠেনি—এই জনপ্রিয় দাবি প্রাথমিক ইসলামি উৎসের সঙ্গে মেলে না। কিতাব আল-মাসাহিফ, তাবারি, কুরতুবি, আল-সুয়ূতির আল-ইতকান এবং অন্যান্য ধ্রুপদী গ্রন্থে উসমান, আয়েশা, ইবন আব্বাস, সাঈদ ইবন জুবাইর ও অন্যদের নামে এমন বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে যেখানে মুসহাফের কিছু রূপকে লাহন, কাতিবের কাজ, লেখকের ভুল, এমনকি ঘুমন্ত অবস্থায় লেখার ফল বলেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই বর্ণনাগুলোর সব সনদ সমান নয়; উসমানের নামে প্রচলিত লাহন-বর্ণনাগুলোকে আল-সুয়ূতি দুর্বল, বিচ্ছিন্ন ও সমস্যাযুক্ত বলেছেন। কিন্তু আয়েশার “هذا عمل الكتاب، أخطؤوا في الكتاب” বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে তিনিই স্পষ্ট লিখেছেন: “هذا إسناد صحيح على شرط الشيخين”—এর সনদ বুখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ।

আয়েশার বক্তব্যে বর্তমান কোরআনের তিনটি নির্দিষ্ট রূপ চিহ্নিত হয়েছে: সূরা নিসা ৪:১৬২-এর وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ, সূরা মায়িদা ৫:৬৯-এর وَالصَّابِئُونَ এবং সূরা ত্বহা ২০:৬৩-এর إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ। পরবর্তী আরবি ব্যাকরণবিদরা তিনটিরই ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ দিয়েছেন; ফলে কেবল আধুনিক মানক আরবির সরল নিয়ম দেখিয়ে এগুলোকে নিশ্চিত ব্যাকরণগত ভুল ঘোষণা করা যথেষ্ট নয়। কিন্তু সেটি আয়েশার আছারকে বাতিল করে না। ঐতিহাসিক সত্য হলো, প্রাথমিক মুসলিম জ্ঞান-ঐতিহ্যের মধ্যেই বর্তমান মুসহাফের এই রূপগুলোকে মানব কাতিবের ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং পরবর্তী উলুমুল-কোরআন সাহিত্যে সেই বক্তব্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। অতএব “কোরআনের লিখিত ইতিহাসে কখনো কাতিবের ভুল বা লিখনগত সমস্যার ধারণাই ছিল না”—এই দাবি সরাসরি মিথ্যা।

উসমানি মান্যকরণের ইতিহাস, উসমান ও আয়েশার নামে সংরক্ষিত বর্ণনা, ইবন আব্বাসের বিকল্প পাঠ এবং পরবর্তী ব্যাকরণগত ব্যাখ্যাগুলো একত্রে দেখায় যে বর্তমান মুসহাফের লিখিত ইতিহাসে পাঠভেদ, কাতিব-সংক্রান্ত অভিযোগ এবং পরবর্তী ব্যাখ্যার একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক স্তর রয়েছে। এসব উৎসের সনদের মান এক নয়, কিন্তু কোরআনের লিখিত রূপকে মানবীয় ভুলের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা প্রাথমিক মুসলিম সাহিত্যেই নথিভুক্ত।


ভূমিকা

কোরআন সম্পর্কে ইসলামের সবচেয়ে শক্ত ধর্মতাত্ত্বিক দাবিগুলোর একটি হলো তার নির্ভুল সংরক্ষণ। এই দাবির শক্ত সংস্করণ শুধু এতটুকু বলে না যে বর্তমান কোরআনের মূল পাঠ প্রাচীন; বরং সাধারণ ধর্মীয় প্রচারণায় আরও বলা হয়—মুহাম্মদের উচ্চারিত কোরআন কোনো মানবীয় অনুলিপি-ভুল, লিখনগত সমস্যা, পাঠ-সংঘাত বা সংশোধনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যায়নি। বর্তমান মুসহাফের প্রতিটি শব্দ যেন কোনো মানবীয় জটিলতা ছাড়াই সরাসরি সপ্তম শতাব্দী থেকে এসে পৌঁছেছে। প্রাথমিক ইসলামি সাহিত্য এই সরল ছবিটি সমর্থন করে না।

সহিহ বুখারির বর্ণনাতেই উসমানি মান্যকরণের কারণ হিসেবে আঞ্চলিক পাঠভেদকে দেখানো হয়েছে। হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান সিরিয়া ও ইরাকের মুসলিমদের কোরআন-পাঠে পার্থক্য দেখে উসমানকে সতর্ক করেন। উসমান হাফসার কাছে থাকা সহিফা আনিয়ে যায়েদ ইবন সাবিত, আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর, সাঈদ ইবন আল-আস এবং আবদুর রহমান ইবন হারিসকে অনুলিপি প্রস্তুতের দায়িত্ব দেন। তিনি কুরাইশি সদস্যদের নির্দেশ দেন, যায়েদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে কুরাইশের ভাষায় লিখতে। অনুলিপি প্রস্তুত হলে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয় এবং অন্য কোরআনিক লিখিত উপকরণ ও মুসহাফ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এটি নিজেই দেখায় যে লিখিত মান্যকরণ ছিল একটি মানব-পরিচালিত সম্পাদকীয় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান পাঠ-বিরোধকে এক মান্য রসমের অধীনে আনা। [1]

إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ … وَأَمَرَ بِمَا سِوَاهُ مِنَ الْقُرْآنِ فِي كُلِّ صَحِيفَةٍ أَوْ مُصْحَفٍ أَنْ يُحْرَقَ
“তোমরা এবং যায়েদ ইবন সাবিত কোরআনের কোনো বিষয়ে মতভেদ করলে তা কুরাইশের ভাষায় লিখবে …” এরপর উসমান অন্য সব সহিফা বা মুসহাফে থাকা কোরআনিক উপকরণ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
[2]

উসমানি মান্যকরণের এই ইতিহাসের পাশাপাশি একই মুসলিম সাহিত্য মুসহাফের কিছু লিখিত রূপকে লাহন, কাতিবের কাজ বা সরাসরি কাতিবের ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা বর্ণনাও সংরক্ষণ করেছে। ফলে পাঠভেদ ও মান্যকরণের ইতিহাসের সঙ্গে কাতিবের ভুল-সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো একই ঐতিহাসিক ধারার অংশ।


প্রমাণের মানচিত্র: কোন বর্ণনা কতটা শক্ত

বর্ণনাপ্রধান উৎসসনদ/অবস্থাঐতিহাসিক মূল্য
উসমান: أرى شيئا من لحن ستقيمه العرب بألسنتهاইবন আবি দাউদ, আল-দুরর আল-মানসুর, আল-ইতকানএকাধিক বিচ্ছিন্ন/দুর্বল পথ; আল-সুয়ূতি নিজেই দুর্বলতা স্বীকার করেছেনউসমানের নিশ্চিত উক্তি হিসেবে একে একা ব্যবহার করা যাবে না; কিন্তু প্রাচীন মুসলিম সাহিত্যে ধারণাটির প্রচলন প্রমাণ করে
উসমান: لو كان المملي من هذيل والكاتب من ثقيف…ইবন আবি দাউদ; ইকরিমা-ধারাসংযোগগত সমস্যা; সরাসরি উসমান পর্যন্ত শক্ত সনদ নয়লেখক বা ইমলাকারীর দক্ষতার সঙ্গে সমস্যাকে যুক্ত করা একটি প্রাচীন ব্যাখ্যা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ
আয়েশা: هذا عمل الكتاب، أخطؤوا في الكتابআবু উবাইদ → আবু মু‘আবিয়া → হিশাম → উরওয়া → আয়েশা; তাবারি, ইবন আবি দাউদ, আল-সুয়ূতিআল-সুয়ূতি: “সহিহ, বুখারি-মুসলিমের শর্তে”; পরে কিছু আলেম আবু মু‘আবিয়ার হিশাম-রেওয়ায়াত নিয়ে আপত্তি তুলেছেনকাতিবের ভুল সংক্রান্ত প্রবন্ধের সবচেয়ে শক্ত বর্ণনা
ইবন আব্বাস: حتى تستأنسوا সম্পর্কে “কাতিবের ভুল”তাবারি, ইবন আবি হাতিম, সাঈদ ইবন মানসুর; সাঈদ ইবন জুবাইর-ধারাএকাধিক প্রাচীন সনদে সংরক্ষিত; ইবন কাসির ‘অত্যন্ত গরিব’ বলেছেনপ্রাথমিক পাঠভেদ ও কাতিবের ভুলের অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় ধারাটি নির্দেশ করে
ইবন আব্বাস: أفلم ييأس বনাম أفلم يتبينইবনুল আনবারি, তাবারি, আল-সুয়ূতিবিরোধী বর্ণনাও আছে; অন্য বর্ণনায় ييأس-কে ‘يعلم’ অর্থে ভাষাগত ব্যবহার বলা হয়েছেসাহাবি-পাঠভেদের উদাহরণ; নিশ্চিত কাতিব-ভুল প্রমাণ নয়
ইবন আব্বাস: وقضى ربك বনাম ووصى ربكসাঈদ ইবন মানসুর, ইবন আশতা, আল-সুয়ূতিশায বা বিকল্প পাঠ হিসেবে সংরক্ষিত; বর্তমান মান্য পাঠের বিপরীতলেখার আকৃতি বদলে যাওয়ার ব্যাখ্যা প্রাচীন ঐতিহ্যে ছিল
ইবন আব্বাস: مثل نوره বনাম مثل نور المؤمنইবন আবি হাতিম; আল-সুয়ূতিপ্রাচীন আছার; বর্তমান মান্য পাঠের বিকল্পকাতিবের ভুল হিসেবে চিহ্নিত বর্ণনা সংরক্ষিত

উসমানের নামে ‘লাহন’: মুসহাফে সমস্যা দেখে “আরবরা জিহ্বা দিয়ে ঠিক করবে”

কিতাব আল-মাসাহিফ-এ আবদুল আ‘লা ইবন আবদুল্লাহ ইবন আমিরের সূত্রে একটি বহুল আলোচিত বর্ণনা আছে। মুসহাফ প্রস্তুত হয়ে উসমানের কাছে আনা হলে তিনি কাজের প্রশংসা করেন, তারপর বলেন যে তাতে কিছু লাহন দেখছেন এবং আরবরা জিহ্বা দিয়ে তা ঠিক করে নেবে। আল-সুয়ূতি আল-দুরর আল-মানসুর ও আল-ইতকান-এ এই বর্ণনা এবং কাছাকাছি আরও কয়েকটি পথ একত্র করেছেন।

قَدْ أَحْسَنْتُمْ وَأَجْمَلْتُمْ، أَرَى شَيْئًا مِنْ لَحْنٍ سَتُقِيمُهُ الْعَرَبُ بِأَلْسِنَتِهَا
“তোমরা ভালো ও সুন্দরভাবে কাজ করেছ। আমি এতে কিছু লাহন দেখতে পাচ্ছি; আরবরা তাদের জিহ্বা দিয়ে তা ঠিক করে নেবে।”
[3]

একই বর্ণনা-সমষ্টিতে ইকরিমার সূত্রে আরও কঠিন ভাষা আছে: উসমান নাকি বলেন, ইমলা-দাতা হুযাইল গোত্রের এবং লেখক সাকিফ গোত্রের হলে এই সমস্যা থাকত না। এই বক্তব্যের সরল অর্থ মানব লেখকের ভাষাগত দক্ষতাকে সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে।

لَوْ كَانَ الْمُمْلِي مِنْ هُذَيْلٍ، وَالْكَاتِبُ مِنْ ثَقِيفٍ، لَمْ يُوجَدْ فِيهِ هَذَا
“ইমলা-দাতা হুযাইলের এবং লেখক সাকিফের হলে এতে এটি পাওয়া যেত না।”
[4]

আল-সুয়ূতি উসমান-সংক্রান্ত এসব পথকে দুর্বল, বিচ্ছিন্ন ও সমস্যাযুক্ত বলেছেন; ফলে এগুলো উসমানের নিশ্চিত বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করে না। তবে এগুলো প্রমাণ করে যে প্রাচীন মুসলিম কোরআন-সাহিত্যে উসমানি মুসহাফের কিছু লিখিত রূপকে লাহন এবং কাতিব বা ইমলা-দাতার দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করার একটি প্রচলিত ঐতিহ্য ছিল। আল-সুয়ূতি নিজেই এসব বর্ণনা সম্পর্কে লিখেছেন “وهذه الآثار مشكلة جدا”—“এই আছারগুলো অত্যন্ত সমস্যাজনক”—এবং এরপর সনদ, রসম ও ভাষাগত অর্থের ভিত্তিতে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। [5]


তাফসীরে মাযহারী: বাংলা ইসলামি সাহিত্যে একই বর্ণনার স্বীকৃতি

কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথীর তাফসীরে মাযহারী-র বাংলা অনুবাদেও আয়েশা, আবান ইবন উসমান এবং উসমানের নামে এই বর্ণনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তিনটি আলোচিত রূপ—المقيمين, الصابئون এবং هذان—লেখার প্রসঙ্গ আনা হয়েছে; তারপর ঐকমত্যের ভিত্তিতে কোরআনের বর্তমান রূপকে শুদ্ধ বলার ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। এই উদ্ধৃতির মূল্য হলো, সমস্যাজনক বর্ণনাগুলো কোনো আধুনিক বিতর্কমূলক উদ্ভাবন নয়; মুসলিম তাফসিরের নিজস্ব বর্ণনা-ঐতিহ্যেই এগুলো বহাল ছিল।

“হজরত আয়েশা এবং হজরত আবান বিন ওসমান বলেছেন, কথাটি লিখতে হতো … সূরা মায়িদার মধ্যেও এ রকম ভুল রয়েছে … আরেকস্থানে লেখা হয়েছে ‘হাজানি’—যার শুদ্ধ লিখিতরূপ ‘হাজাইনি’। হজরত ওসমান বলেছেন, কোরআনে এ রকম কিছু কিছু ভুল উচ্চারণের শব্দ লিপিবদ্ধ রয়েছে যেগুলোকে আরববাসীরা পাঠ করার সময় সঠিকভাবে উচ্চারণ করে …”
[6]

তাফসীরে মাযহারীতে কোরআনের লাহন ও কাতিবের ভুল সংক্রান্ত আলোচনা
উসমান ও আয়েশার নামে কোরআনের লিখিত রূপ নিয়ে বর্ণনা

আয়েশার আছার: “এটি কাতিবদের কাজ; তারা কিতাব লেখায় ভুল করেছে”

উসমানের নামে বর্ণিত আছারগুলোর সনদ দুর্বলতার কারণে মূল ঐতিহাসিক চাপটি আয়েশার বর্ণনায় এসে পড়ে। আবু উবাইদ ফাদাইলুল কোরআন-এ আবু মু‘আবিয়া, হিশাম ইবন উরওয়া, উরওয়া, আয়েশা—এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে উরওয়া তাঁকে কোরআনের তিনটি রূপ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। আয়েশার নামে সংরক্ষিত উত্তর সরাসরি:

يَا ابْنَ أَخِي، هَذَا عَمَلُ الْكُتَّابِ، أَخْطَؤُوا فِي الْكِتَابِ
“হে আমার ভাতিজা, এটি কাতিবদের কাজ; তারা কিতাব লেখার ক্ষেত্রে ভুল করেছে।”
[7]

আল-সুয়ূতি এই সনদ উদ্ধৃত করেই বলেন: “هذا إسناد صحيح على شرط الشيخين”—সনদটি বুখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, উসমানের বর্ণনার ক্ষেত্রে যে প্রথম উত্তর—‘সনদ দুর্বল’—তিনি গ্রহণ করেছিলেন, আয়েশার ক্ষেত্রে সেটি নিজেই বাতিল করেছেন: “أما الجواب بالتضعيف فلأن إسناده صحيح كما ترى”—দুর্বল বলার উত্তর এখানে চলে না, কারণ সনদ সহিহ। [8]

পরবর্তী কিছু মুহাদ্দিস আবু মু‘আবিয়ার হিশাম ইবন উরওয়া থেকে বর্ণনার মান নিয়ে রাবি-নির্দিষ্ট আপত্তি তুলেছেন; ইসলামওয়েব সেই সমালোচনা উদ্ধৃত করেছে। এর বিপরীতে আল-সুয়ূতি একই সনদকে “صحيح على شرط الشيخين” বলেছেন। আয়েশার নামে “هذا عمل الكتاب، أخطؤوا في الكتاب” বক্তব্যটি প্রাচীন সনদসহ সংরক্ষিত হয়েছে, তাবারি ও ইবন আবি দাউদের গ্রন্থেও এসেছে এবং পরবর্তী উলুমুল-কোরআন ও তাফসির সাহিত্যে বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। [9]


আল-সুয়ূতির নিজের স্বীকারোক্তি: প্রচলিত উত্তরগুলো আয়েশার বর্ণনায় যথেষ্ট নয়

এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি আল-সুয়ূতির নিজের বিশ্লেষণ। তিনি উসমান-সংক্রান্ত আছারগুলোর জন্য তিন ধরনের উত্তর দেন: সনদ দুর্বল; লাহন বলতে রসম বা ভাষার বিশেষ রীতি; অথবা লিখিত রূপের সঙ্গে উচ্চারণের পার্থক্য। তারপর আয়েশার হাদিসে এসে তিনি বলেন, এসব উত্তর সরাসরি কার্যকর নয়। সনদ দুর্বল বলা যাচ্ছে না; আবার প্রশ্নটি তিনটি নির্দিষ্ট অক্ষর বা রূপ নিয়েই ছিল। এরপর ইবন আশতার ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করা হয়—আয়েশা নাকি ‘ভুল’ বলতে সাত আহরুফের মধ্যে সর্বোত্তম রূপ নির্বাচন না করাকে বুঝিয়েছেন, কোরআনের বাইরে কোনো অবৈধ পাঠ লেখাকে নয়।

এই ব্যাখ্যাটি আয়েশার বাক্যের সরল ভাষা থেকে আসে না। বাক্যে أخطؤوا في اختيار الأولى من الأحرف السبعة—‘সাত আহরুফ থেকে উত্তমটি বেছে নিতে ভুল করেছে’—এমন কিছু নেই। আছে أخطؤوا في الكتاب—‘লেখায় ভুল করেছে’। ইবন আশতার ব্যাখ্যাটি পরবর্তী সামঞ্জস্যমূলক পুনর্ব্যাখ্যা; এটিকে আয়েশার নিজস্ব বক্তব্যের সমার্থক বানানো যায় না। আল-সুয়ূতি নিজেও এই সমস্যাটি মুছে দেননি; বরং আয়েশার বর্ণনার পরে তিনটি রূপের বিভিন্ন ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা একে একে তালিকাভুক্ত করেছেন।


আয়েশা একা নন: প্রাথমিক ঐতিহ্যে কাতিবের ভুলের আরও বর্ণনা

কাতিবের ভুলের ধারণা শুধু আয়েশার তিনটি শব্দে সীমাবদ্ধ ছিল না। আল-সুয়ূতি একই আলোচনায় ইবন আব্বাস ও অন্যদের নামে আরও কয়েকটি আছার সংরক্ষণ করেছেন। এগুলোর সবগুলোর সনদের মান সমান নয়; কিন্তু সামগ্রিকভাবে এগুলো দেখায় যে লিখনগত ভুল দিয়ে পাঠভেদ ব্যাখ্যা করা প্রাথমিক মুসলিম ঐতিহ্যে একটি পরিচিত ব্যাখ্যার ধরন ছিল।


১. সূরা নূর ২৪:২৭ — تَسْتَأْنِسُوا বনাম تَسْتَأْذِنُوا

বর্তমান মুসহাফে আছে حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا—‘যতক্ষণ না পরিচিতি/অনুমতি নিশ্চিত করো’ ধরনের রূপ। তাবারি একাধিক সনদে ইবন আব্বাসের নামে সংরক্ষণ করেছেন যে তিনি পড়তেন حَتَّىٰ تَسْتَأْذِنُوا—‘যতক্ষণ না অনুমতি চাও’, এবং একটি বর্ণনায় সরাসরি বলেন:

إِنَّمَا هِيَ خَطَأٌ مِنَ الْكَاتِبِ: حَتَّى تَسْتَأْذِنُوا وَتُسَلِّمُوا
“এটি কাতিবের ভুল; [পাঠটি] ‘যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি চাও এবং সালাম দাও’।”
[10]

ইবন আবি হাতিমের একটি পাঠে ভাষা আরও সংযত: “هو فيما أحسب مما أخطأت به الكتاب”—‘আমার ধারণায় এটি কাতিবদের ভুলের একটি’। অন্যদিকে একই আয়াতের জন্য تستأنسوا-এর স্বাভাবিক অর্থও প্রাচীন তাফসিরে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখানে দুটি পৃথক প্রাচীন ধারা পাশাপাশি আছে: একটি বর্তমান মান্য রূপের ব্যাখ্যা দিচ্ছে, অন্যটি বিকল্প পাঠকে মূল ধরে কাতিবের ভুলের কথা বলছে। [11]


২. সূরা রা‘দ ১৩:৩১ — أَفَلَمْ يَيْأَسْ বনাম أَفَلَمْ يَتَبَيَّنْ

বর্তমান মুসহাফে রয়েছে أَفَلَمْ يَيْأَسِ الَّذِينَ آمَنُوا। আল-সুয়ূতি ও তাবারি ইবন আব্বাস ও আলীর নামে أَفَلَمْ يَتَبَيَّنِ الَّذِينَ آمَنُوا পাঠ সংরক্ষণ করেছেন। ইবনুল আনবারির সূত্রে ইবন আব্বাসকে বর্তমান মুসহাফের পাঠ দেখানো হলে তাঁর নামে উত্তর এসেছে:

أَظُنُّ الْكَاتِبَ كَتَبَهَا وَهُوَ نَاعِسٌ
“আমার ধারণা, কাতিব এটি লিখেছিল যখন সে তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল।”
[12]

একই সূত্রসমষ্টিতেই বিপরীত ব্যাখ্যাও সংরক্ষিত: ইবন আব্বাসের নামে ييأس-কে কিছু আরব গোত্রের ভাষায় ‘জানা’ অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অতএব এই আছার কাতিবের ভুলের অভিযোগের অস্তিত্ব দেখায়, কিন্তু বর্তমান মান্য শব্দটি ভাষাগতভাবে অর্থহীন—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করে না।


৩. সূরা ইসরা ১৭:২৩ — وَقَضَىٰ رَبُّكَ বনাম وَوَصَّىٰ رَبُّكَ

বর্তমান পাঠ وَقَضَىٰ رَبُّكَ। সাঈদ ইবন মানসুরের সূত্রে ইবন আব্বাসের নামে وَوَصَّىٰ رَبُّكَ পাঠ এবং একটি লিখনগত ব্যাখ্যা এসেছে—দুটি ওয়াওয়ের একটি সাদের সঙ্গে লেগে গিয়ে রূপ বদলেছে। উবাই ইবন কা‘ব, সাঈদ ইবন জুবাইর প্রমুখের কাছেও ووصى পাঠের ধারা সংরক্ষিত হয়েছে।

إِنَّمَا هِيَ «وَوَصَّى رَبُّكَ» الْتَزَقَتِ الْوَاوُ بِالصَّادِ
“আসলে এটি ‘ওয়া-ওয়াস্সা রব্বুকা’; ওয়াওটি সাদের সঙ্গে লেগে গেছে।”
[7]

এই পাঠটি মান্য পাঠে পরিণত হয়নি; পরবর্তী ব্যাকরণ ও তাফসিরে قضى-কে ‘আদেশ/ফয়সালা করা’ অর্থে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবু ঐতিহাসিক বিষয়টি অটুট: বর্তমান মান্য রূপের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে অক্ষরের আকৃতি মিশে যাওয়ার কারণে কাতিবের ভুলের ধারণা প্রাচীন মুসলিম ঐতিহ্যের ভেতরেই প্রচলিত ছিল।


৪. সূরা নূর ২৪:৩৫ — مَثَلُ نُورِهِ বনাম مَثَلُ نُورِ الْمُؤْمِنِ

ইবন আবি হাতিম ইবন আব্বাসের নামে বর্তমান مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ সম্পর্কে একটি আছার সংরক্ষণ করেছেন যেখানে এটিকে কাতিবের ভুল বলা হয়েছে এবং مَثَلُ نُورِ الْمُؤْمِنِ كَمِشْكَاةٍ—‘মুমিনের নূরের দৃষ্টান্ত’—পাঠ দেওয়া হয়েছে।

هِيَ خَطَأٌ مِنَ الْكَاتِبِ … إِنَّمَا هِيَ: مَثَلُ نُورِ الْمُؤْمِنِ كَمِشْكَاةٍ
“এটি কাতিবের ভুল … আসলে [পাঠ] ‘মুমিনের নূরের দৃষ্টান্ত একটি মিশকাতের মতো’।”
[13]

এই আছার বর্তমান মান্য পাঠের বিপরীতে একটি বিকল্প পাঠ ও ব্যাখ্যার ধারা; একে বর্তমান পাঠ বাতিলের চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না। কিন্তু ‘প্রাথমিক মুসলিমরা কখনো কাতিবের ভুলের ভাষা ব্যবহার করেননি’—এই দাবি এর সামনে টেকে না।


আয়েশার তিনটি নির্দিষ্ট রূপ

আয়েশার আছারের কেন্দ্র বর্তমান মুসহাফের তিনটি নির্দিষ্ট রূপ। তিনটির লিখিত রূপই সাধারণ ব্যাকরণিক প্রত্যাশা থেকে ব্যতিক্রমী; পরবর্তী আরবি ব্যাকরণে তিনটিরই বাক্যগঠনগত বা উপভাষাগত বৈধ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে; আবার আয়েশার নামে সংরক্ষিত আছারে এই একই তিনটি রূপকে কাতিবদের ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ পরবর্তী ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা এবং প্রাথমিক কাতিব-ভুলের অভিযোগ একই লিখিত ইতিহাসের পৃথক স্তর।


১. সূরা নিসা ৪:১৬২ — وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ

لَٰكِنِ الرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ مِنْهُمْ وَالْمُؤْمِنُونَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَالْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ
“কিন্তু তাদের মধ্যে জ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিতরা এবং মুমিনরা … এবং সালাত প্রতিষ্ঠাকারীদের … এবং যাকাত প্রদানকারীরা …”
[14]

বাক্যে الرَّاسِخُونَ, الْمُؤْمِنُونَ এবং পরে الْمُؤْتُونَ রফার রূপে রয়েছে; মাঝখানে الْمُقِيمِينَ নসবের রূপে এসেছে। স্বাভাবিক সমান্তরাল বাক্যগঠন প্রত্যাশা করলে المقيمون হওয়ার কথা মনে হয়। প্রাচীন তাফসিরে ইবন মাসউদের পাঠ হিসেবে والمقيمون الصلاة-ও উল্লেখিত। আয়েশার আছারে বর্তমান المقيمين কাতিবের ভুলের উদাহরণ।

তবে ধ্রুপদী আরবিতে এর একটি স্বীকৃত ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ আছে: النصب على المدح—প্রশংসার উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক বাক্যগঠন থেকে সরে নসব ব্যবহার করা। বসরি ব্যাকরণবিদদের এই ব্যাখ্যা ফখরুদ্দিন রাজি গ্রহণ করেছেন; তাবারি একাধিক ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ তালিকাভুক্ত করেছেন এবং নিজে অন্য একটি সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থাৎ রূপটি ব্যাকরণগতভাবে ব্যাখ্যাতীত নয়। ঐতিহাসিক সমস্যাটি হলো, আয়েশার নামে সংরক্ষিত প্রাথমিক বর্ণনা এই রূপের উৎপত্তিকে কাতিবের ভুল হিসেবে চিহ্নিত করে। [15] [16]


২. সূরা মায়িদা ৫:৬৯ — وَالصَّابِئُونَ

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالصَّابِئُونَ وَالنَّصَارَىٰ …
“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি, সাবিয়ানরা এবং খ্রিষ্টানরা …”
[17]

إِنَّ-এর অধীন ধারাবাহিক পদ হিসেবে পড়লে الصابئين প্রত্যাশিত; সূরা বাকারা ২:৬২-এ ঠিক সেই নসবের রূপই আছে। কিন্তু ৫:৬৯-এ الصابئون রফার রূপে এসেছে। আয়েশার আছারে এটিও কাতিবের ভুলের উদাহরণ।

ধ্রুপদী আরবি ব্যাকরণবিদরা রূপটিকে বৈধ ব্যাখ্যা করার একাধিক উপায় দিয়েছেন: الصابئون-কে আলাদা মুবতাদা ধরে তার অনুল্লিখিত খবর অনুমান করা; পুরো إنّ + اسمها-এর বাক্যগত অবস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত করা; অথবা অন্য ব্যাকরণগত গঠন গ্রহণ করা। একাধিক বৈধ বিশ্লেষণ থাকায় কেবল বাহ্যিক ব্যাকরণগত প্রত্যাশা থেকে রূপটিকে নিশ্চিত ‘ভুল আরবি’ বলা যায় না। কিন্তু এসব ব্যাখ্যা আয়েশার বর্ণনার বক্তব্য পরিবর্তন করে না; সেখানে একে কাতিবের ভুল বলা হয়েছে।


৩. সূরা ত্বহা ২০:৬৩ — إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ

إِنْ هَذَانِ لَسَاحِرَانِ
“নিশ্চয়/এরা দুজন অবশ্যই দুই জাদুকর।”
[18]

যদি إنَّ-কে স্বাভাবিক আমিল হিসেবে ধরা হয়, প্রচলিত কারক-নিয়মে দ্বিবচন নির্দেশকের নসবের রূপ هذين প্রত্যাশিত। আবু আমর আল-বসরির কিরাআতে إن هذين لساحران পাওয়া যায়। অন্য স্বীকৃত কিরাআতে هذان রসমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্নভাবে পাঠ করা হয়েছে। ফাররা উল্লেখ করেছেন—কিছু পাঠক এটিকে লাহন বলেছেন, যদিও তিনি মুসহাফের বিরোধিতা করতে চাননি। [19]

এর ব্যাকরণগত ব্যাখ্যাও রয়েছে: কিছু আরব গোত্র দ্বিবচন বিশেষ্যকে রফা, নসব ও জর—তিন অবস্থাতেই আলিফসহ ব্যবহার করত; অন্য বিশ্লেষণে إن-কে হালকা রূপের অব্যয় ধরা হয়; আরও কিছু বিশ্লেষণে অনুল্লিখিত সর্বনাম বা ভিন্ন বাক্যগঠন গ্রহণ করা হয়। আলুসি, সামিন আল-হালাবি এবং ইবন তাইমিয়ার আলোচনায় এসব মত পাওয়া যায়। সুতরাং রূপটি ‘কোনো আরবিতেই সম্ভব নয়’ বলা ভুল। তবে প্রচলিত ব্যাকরণিক কাঠামোয় রূপটি সরল নয় বলেই প্রাথমিক ও মধ্যযুগীয় মুসলিম ভাষাবিদদের একটি অংশ এর বিশেষ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। [20] [21]


আবান ইবন উসমানের বর্ণনা: ‘ওয়াল-মুকিমিন’ কীভাবে লেখা হলো

কুরতুবি নিসা ৪:১৬২-এর আলোচনায় আয়েশার আছারের পাশাপাশি আবান ইবন উসমানের নামে আরেকটি ব্যাখ্যা সংরক্ষণ করেছেন। সেখানে কাতিবকে বাক্য লিখতে বলা হচ্ছিল; প্রথম অংশ লেখার পর তিনি জিজ্ঞেস করেন কী লিখবেন, এবং তাকে والمقيمين الصلاة লিখতে বলা হয়—সেখান থেকেই এই রূপ ঘটেছে বলে বর্ণনা। কুরতুবি নিজে কাতিবের ভুলের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি; তিনি অন্যান্য ব্যাকরণগত বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু পাঠের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্তমান রূপের উৎপত্তি নিয়ে কাতিবের ভুলের ব্যাখ্যা তাফসির-ঐতিহ্যে একাধিক ব্যক্তির নামে প্রচলিত ছিল। [22]


‘লাহন মানে ভুল নয়’—প্রসঙ্গ কী বলে

لحن আরবিতে একার্থক শব্দ নয়। এটি ভুল, ভাষার ধরন, উপভাষা, ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা বা পাঠভঙ্গি—বিভিন্ন অর্থে আসতে পারে। তাই উসমানের দুর্বল বর্ণনায় শব্দটি একা দেখে ‘ব্যাকরণগত ভুল’ অর্থ নিশ্চিত করা যাবে না। কিন্তু শব্দটির সম্ভাব্য বিভিন্ন অর্থ দেখিয়ে প্রসঙ্গকে উপেক্ষা করা যায় না। ستقيمه العرب بألسنتها—আরবরা জিহ্বা দিয়ে ‘ঠিক করবে’—এবং لو كان المملي من هذيل والكاتب من ثقيف لم يوجد فيه هذا—ভিন্ন ইমলা-দাতা ও লেখক হলে ‘এটি থাকত না’—এই দুই বাক্যাংশই সমস্যা ও সংশোধনের একটি স্পষ্ট কাঠামো তৈরি করে।

তাই উসমানের বর্ণনার ক্ষেত্রে সঠিক আপত্তি হলো সনদ দুর্বল; ‘লাহন কখনো ভুল অর্থে আসে না’ বলা ভাষাগতভাবে মিথ্যা। আবার আয়েশার বর্ণনায় لحن-এর বহুঅর্থকতার প্রশ্নই নেই: সেখানে সরাসরি أخطؤوا في الكتاب বলা হয়েছে। একটি বহুঅর্থক শব্দের অভিধান দেখিয়ে অন্য বর্ণনার পরিষ্কার ‘ভুল করেছে’ বাক্যকে নিষ্ক্রিয় করা যায় না।


‘সাত আহরুফের মধ্যে কম উত্তমটি বেছে নিয়েছিল’—এটি মূল বক্তব্য নয়

ইবন আশতা ও পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা আয়েশার أخطؤوا-কে নতুন অর্থ দিয়েছেন: কাতিবরা নাকি অবৈধ কিছু লেখেনি; সাত আহরুফের মধ্যে মানুষের জন্য যে রূপটি সবচেয়ে উপযোগী ছিল সেটি নির্বাচন করতে ভুল করেছে। এই ব্যাখ্যা ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধ কমায়, কিন্তু উৎসের ভাষা থেকে নিজে থেকে বের হয় না। আয়েশার সংরক্ষিত বাক্যে ‘সাত আহরুফ’, ‘কম উত্তম নির্বাচন’ বা ‘উভয় পাঠই ওহি’—কোনোটিই নেই।

আরও বড় সমস্যা হলো, এই ব্যাখ্যা একটি সিদ্ধান্ত আগে থেকে ধরে নিয়ে বর্ণনাটিকে পুনর্লিখন করে। আগে ধরে নেওয়া হয় বর্তমান মান্য রসমে প্রকৃত কাতিবের ভুল থাকতে পারে না; তারপর أخطؤوا في الكتاب-এর এমন অর্থ বানানো হয় যাতে কোনো কাতিবের ভুল না থাকে। এটি বর্ণনাটির স্বাধীন ব্যাখ্যা নয়; এটি কোরআনের নির্ভুল সংরক্ষণের ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের সঙ্গে বর্ণনাটিকে সামঞ্জস্য করানোর পুনর্ব্যাখ্যা। ইতিহাসে উৎসের ভাষা আগে, মতবাদ পরে।


‘মুতাওয়াতির কোরআন একটি আছারের কারণে বদলাবে না’—এই যুক্তি কী প্রমাণ করে

বর্তমান মান্য পাঠের ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং একটি ঐতিহাসিক বর্ণনার অর্থ এক প্রশ্ন নয়। পরবর্তী মুসলিম ঐকমত্য বর্তমান রসমকে কর্তৃত্বপূর্ণ করেছে—এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। তাই একক আছার দিয়ে বর্তমান মুসহাফ বদলে দেওয়ার প্রশ্ন নেই। কিন্তু এখান থেকে এ সিদ্ধান্ত আসে না যে আছারটির বক্তা কাতিবের ভুল বোঝাননি। পরবর্তী কোনো মান্য পাঠ আগের ভিন্ন ব্যাখ্যার বক্তব্য বা অর্থ পরিবর্তন করে না।

সুতরাং ‘মুসহাফ বদলানো যাবে না’ একটি ধর্মীয় বিধান; ‘আয়েশা কী বলেছেন’ একটি ঐতিহাসিক উৎসের প্রশ্ন। দুটিকে মিশিয়ে দিলে চক্রাকার যুক্তি তৈরি হয়: বর্তমান মান্য পাঠ অবশ্যই নির্ভুল → তাই আয়েশার ‘কাতিবরা ভুল করেছে’ কথার অর্থ প্রকৃত ভুল হতে পারে না → অতএব বর্তমান মান্য পাঠ নির্ভুল। এভাবে পূর্বধারণাই নিজের প্রমাণে পরিণত হয়।


এগুলো কি বর্তমান কোরআনে নিশ্চিত ব্যাকরণগত ভুল প্রমাণ করে?

والمقيمين الصلاة-এর জন্য النصب على المدح ধ্রুপদী আরবিতে স্বীকৃত গঠন; والصابئون-এর জন্য পৃথক মুবতাদা, অনুল্লিখিত পদ এবং অন্যান্য বাক্যগঠনগত বিশ্লেষণ রয়েছে; আর إن هذان لساحران-এর জন্য দ্বিবচনের তিন কারকেই আলিফ ব্যবহারের উপভাষাগত রীতি, হালকা إن এবং অন্যান্য ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ প্রাচীন আরবি ব্যাকরণে নথিভুক্ত। ফলে এই তিনটি রূপের অস্তিত্ব নিজে থেকে ব্যাকরণগত অসম্ভবতা প্রতিষ্ঠা করে না।

কিন্তু প্রাথমিক মুসলিম উৎসে কাতিবের ভুলের অভিযোগ স্পষ্ট। আয়েশার নামে সংরক্ষিত এবং আল-সুয়ূতির সহিহ-গ্রেড করা আছারে তিনটি রূপকেই কাতিবদের ভুল বলা হয়েছে। ইবন আব্বাসের নামে অন্য আয়াত সম্পর্কেও একই ধরনের বক্তব্য সংরক্ষিত, আর উসমানের নামে দুর্বল লাহন-বর্ণনাগুলো একই ধারণার প্রচলন দেখায়। অতএব প্রাথমিক ইসলামী ঐতিহ্যে বর্তমান মুসহাফের লিখিত রূপকে কখনো মানবীয় কাতিবের ভুল হিসেবে দেখা হয়নি—এই দাবি তথ্যগতভাবে মিথ্যা।


সমস্যাটি তিনটি শব্দের চেয়ে বড়: মান্যকরণ ছিল একটি মানবীয় নির্বাচন-প্রক্রিয়া

সহিহ বুখারির উসমানি সংকলন-বর্ণনা, সাহাবিদের বিকল্প পাঠ, উসমানের নামে লাহন-বর্ণনা, আয়েশার কাতিবের ভুল সংক্রান্ত আছার এবং ইবন আব্বাসের বিকল্প পাঠ—সব একত্রে একটি মানবীয় লিখিত ইতিহাস দেখায়। মানুষ অনুলিপি করেছে, পাঠের পার্থক্য নিয়ে বিবাদ করেছে, একটি ভাষাগত রূপ নির্বাচন করেছে, মান্য প্রতিলিপি তৈরি করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী লিখিত উপকরণ ধ্বংস করেছে এবং পরবর্তী প্রজন্ম উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রসমের জটিল রূপগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছে। এই ইতিহাস কোনো মানবীয় জটিলতাহীন অলৌকিক পাঠ-সঞ্চালনের বিবরণ নয়; এটি প্রাচীন একটি গ্রন্থের মান্যকরণের ইতিহাস।

উসমানি মান্যকরণ বর্তমান কোরআনিক পাঠকে দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত স্থিতিশীল করেছে। কিন্তু পাঠের পরবর্তী স্থিতিশীলতা এবং তার আগের মানবীয় লিখিত ইতিহাসের অনুপস্থিতি এক কথা নয়। কোনো পাঠ প্রাথমিক পর্যায়েই মান্য হয়ে পরে শতাব্দীর পর শতাব্দী স্থিতিশীল থাকতে পারে; সেই স্থিতিশীলতা মান্যকরণের আগের বিকল্প পাঠ, সম্পাদনাগত নির্বাচন বা কাতিবের ভুলের অভিযোগকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয় না।


প্রমাণগুলো একত্রে কী প্রতিষ্ঠা করে

বিষয়প্রমাণমূল্যায়ন
উসমানি মান্যকরণসহিহ বুখারি: আঞ্চলিক পাঠভেদ, কুরাইশি ভাষা বেছে লেখা, বিকল্প লিখিত উপকরণ পুড়িয়ে দেওয়াঅত্যন্ত শক্ত
উসমানের ‘লাহন’ স্বীকারোক্তিইবন আবি দাউদ ও পরবর্তী সংকলনে একাধিক পথপ্রচলিত কিন্তু সনদ দুর্বল/বিচ্ছিন্ন
আয়েশার বর্ণনায় তিনটি কাতিবের ভুলহিশাম → উরওয়া → আয়েশা; আল-সুয়ূতি ‘শর্ত আল-শাইখাইন’ বলেছেনপ্রবন্ধের সবচেয়ে শক্ত অভ্যন্তরীণ বর্ণনা
নিসা ৪:১৬২কাতিবের ভুলের বর্ণনা + একাধিক ধ্রুপদী ব্যাকরণগত বিশ্লেষণবর্ণনা শক্ত; রূপটি ব্যাকরণগতভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য
মায়িদা ৫:৬৯কাতিবের ভুলের বর্ণনা + একাধিক বাক্যগঠনগত বিশ্লেষণবর্ণনা শক্ত; রূপটি ব্যাকরণগতভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য
ত্বহা ২০:৬৩কাতিবের ভুলের বর্ণনা + একাধিক স্বীকৃত কিরাআত ও উপভাষাগত ব্যাখ্যাবর্ণনা শক্ত; রূপটি ব্যাকরণগতভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য
নূর ২৪:২৭ইবন আব্বাসের নামে تستأذنوا এবং ‘কাতিবের ভুল’একাধিক প্রাচীন বর্ণনা; বর্তমান মান্য পাঠও ভাষাগতভাবে ব্যাখ্যাত
রা‘দ ১৩:৩১يتبين বিকল্প পাঠ + তন্দ্রাচ্ছন্ন কাতিবের বর্ণনা; একই সঙ্গে ييأس-এর উপভাষাগত ব্যাখ্যাপরস্পরবিরোধী বর্ণনা-ধারা
ইসরা ১৭:২৩وصى বিকল্প পাঠ + অক্ষরের আকৃতি মিশে যাওয়ার ব্যাখ্যাপ্রাচীন অমান্য বিকল্প পাঠের ধারা
নূর ২৪:৩৫نور المؤمن বিকল্প পাঠ + ‘কাতিবের ভুল’ অভিযোগপ্রাচীন আছার; বর্তমান মান্য পাঠের বিকল্প

উপসংহার

প্রাথমিক মুসলিম ঐতিহ্যে বর্তমান মুসহাফের লিখিত রূপকে কাতিবের ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করার বর্ণনা স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আয়েশার “هذا عمل الكتاب، أخطؤوا في الكتاب” বক্তব্যকে আল-সুয়ূতি বুখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ বলেছেন; ইবন আব্বাসের নামে একাধিক আয়াতে কাতিবের ভুলের অভিযোগ পাওয়া যায়; আর উসমানের নামে দুর্বল হলেও লাহন-সংক্রান্ত একটি বিস্তৃত বর্ণনা-ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে কোরআনের লিখিত ইতিহাসে মানবীয় অনুলিপি-ভুল বা কাতিবের ভুলের ধারণা কখনো ছিল না—এই প্রচলিত দাবি সরাসরি মিথ্যা।

আয়েশার তিনটি উদাহরণের ক্ষেত্রে পরবর্তী ধ্রুপদী আরবি ব্যাকরণবিদরা বৈধ ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তাই বর্তমান তিনটি রূপকে ব্যাকরণগতভাবে অসম্ভব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ঐতিহাসিক সমস্যাটি অন্য জায়গায়: একই রূপগুলোকে প্রাথমিক ইসলামী বর্ণনায় কাতিবদের ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, অথচ পরবর্তী ব্যাকরণ ও তাফসির-ঐতিহ্য সেগুলোর বৈধ ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা দিয়েছে। ফলে বর্তমান মান্য পাঠের পরবর্তী ব্যাখ্যা এবং প্রাথমিক কাতিব-ভুলের বর্ণনার মধ্যে একটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক ব্যবধান দেখা যায়।

উসমানি মুসহাফের ইতিহাসও একই কথা বলে। পাঠভেদ ছিল; একটি কমিটি কাজ করেছে; মতভেদ হলে কুরাইশের ভাষা বেছে নেওয়ার নির্দেশ ছিল; মান্য প্রতিলিপি বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে; বিকল্প লিখিত উপকরণ ধ্বংস করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া ছিল সফল পাঠ-মান্যকরণ; কিন্তু এটি ‘কোনো মানবীয় নির্বাচন, অনুলিপি, পাঠভেদ বা বিতর্ক ছাড়াই শব্দে-শব্দে নেমে আসা একটি বই’-এর ইতিহাস নয়। যে ধর্মতাত্ত্বিক প্রচারণা এই মানবীয় ইতিহাস মুছে দিয়ে নিখুঁত ও সমস্যাহীন পাঠ-সঞ্চালনের ছবি আঁকে, সেটি উৎসের তথ্যকে বিকৃত করে।

সবচেয়ে কঠিন প্রমাণটি কোনো আধুনিক ভাষাবিদের অভিযোগ নয়; ইসলামের নিজস্ব উলুমুল-কোরআন সাহিত্য। আল-সুয়ূতি এমন একটি আছার সংরক্ষণ করেছেন যার ভাষা—“কাতিবরা লেখায় ভুল করেছে”—এবং যার সনদকে তিনি বুখারি-মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ বলেছেন। পরে সেই বক্তব্যকে কোরআনের নির্ভুল সংরক্ষণের ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য করাতে যত পুনর্ব্যাখ্যাই নির্মিত হোক, মূল বর্ণনার অস্তিত্ব বদলায় না। কোরআনের লিখিত ইতিহাসে পাঠভেদ এবং কাতিবের ভুলের অভিযোগ ইসলামের বাইরের কোনো উদ্ভাবন নয়; এগুলো ইসলামী ঐতিহ্যের নিজের সংরক্ষিত ইতিহাস।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহিহ বুখারি ৪৯৮৭, কোরআন সংকলন ও উসমানি মান্যকরণ ↩︎
  2. সহিহ বুখারি ৪৯৮৭ ↩︎
  3. ইবন আবি দাউদ, কিতাব আল-মাসাহিফ ↩︎
  4. কিতাব আল-মাসাহিফ, اختلاف ألحان العرب ↩︎
  5. আল-সুয়ূতি, আল-ইতকান, ই‘রাব ও মুসহাফের লাহন প্রসঙ্গ ↩︎
  6. তাফসীরে মাযহারী, কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানিপথী, বাংলা সংস্করণ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ৩৪৮–৩৪৯ ↩︎
  7. আল-সুয়ূতি, আল-ইতকান 1 2
  8. আল-ইতকান: আয়েশার আছারের সনদ মূল্যায়ন ↩︎
  9. ইসলামওয়েব: আয়েশার আছারের রাবি-সংক্রান্ত সমালোচনা ↩︎
  10. তাফসির আত-তাবারি, নূর ২৪:২৭ ↩︎
  11. ইবন আবি হাতিম, নূর ২৪:২৭ ↩︎
  12. আল-দুরর আল-মানসুর, রা‘দ ১৩:৩১ ↩︎
  13. তাফসির ইবন আবি হাতিম, নূর ২৪:৩৫ ↩︎
  14. কোরআন ৪:১৬২ ↩︎
  15. তাফসির আর-রাজি, নিসা ৪:১৬২ ↩︎
  16. তাফসির আত-তাবারি, নিসা ৪:১৬২ ↩︎
  17. কোরআন ৫:৬৯ ↩︎
  18. কোরআন ২০:৬৩ ↩︎
  19. আল-ফাররা, মা‘আনিল কোরআন, ত্বহা ২০:৬৩ ↩︎
  20. আদ-দুরর আল-মাসুন, ত্বহা ২০:৬৩ ↩︎
  21. ইবন তাইমিয়া, ত্বহা ২০:৬৩ ↩︎
  22. তাফসির আল-কুরতুবি, নিসা ৪:১৬২ ↩︎

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism and Secular Humanist Ethics

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

Its purpose is evidence-based critical examination of religious, philosophical, moral, and historical claims.

Leave a comment

Your email will not be published.