ভূমিকা: শিষ্টাচারের সীমানা ও আবু বকরের অশ্লীল গালি
ইসলামি ধর্মীয় প্রচারে মুহাম্মদকে ‘উত্তম চরিত্রের পূর্ণতাদানকারী’ এবং তাঁর অনুসারীদের আদর্শ নৈতিকতার অনুসারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। শিষ্টাচার, সংযত ভাষা, অন্যকে অপমান না করা এবং অশ্লীলতা পরিহারের বিষয়ে ইসলামের হাদিসগ্রন্থেও সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। অথচ সেই একই হাদিসসাহিত্যে মুহাম্মদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর আবু বকরের এমন একটি কদর্য যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালির বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে, যা তিনি মুহাম্মদের উপস্থিতিতে একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী রাজনৈতিক প্রতিনিধিকে দিয়েছিলেন। গালিটি কোনো সাধারণ ক্রোধের প্রকাশ কিংবা কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ ছিল না। তিনি প্রতিপক্ষের উপাস্য দেবী লাতের যৌনাঙ্গ চেটে খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাকে অপমান করেছিলেন। সহিহ বুখারির হুদায়বিয়ার সন্ধিসংক্রান্ত বর্ণনায় ঘটনাটি সংরক্ষিত রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পরবর্তী ইসলামি আইনজ্ঞরা এই বক্তব্যকে কেবল একটি অশোভন ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে থেমে যাননি; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের ধর্মীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠার দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধির আলোচনা চলাকালে কুরাইশদের প্রতিনিধি উরওয়া ইবনে মাসউদ মুহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আলোচনার একপর্যায়ে উরওয়া মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামরিক আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি আশঙ্কা জানান, কুরাইশদের সঙ্গে সংঘাত হলে মুহাম্মদের অনুসারীরা তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন। এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে আবু বকর উরওয়ার ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আঘাত করেন এবং তাঁর উপাস্য দেবীকে কেন্দ্র করে যৌনাঙ্গসংক্রান্ত গালি দেন। উরওয়া এই অপমানের জবাব দিতে চাইলেও আবু বকরের পূর্ববর্তী উপকারের কারণে প্রতিশোধমূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। বর্ণনায় মুহাম্মদের উপস্থিতি, উরওয়ার বক্তব্য, আবু বকরের গালি এবং উরওয়ার প্রতিক্রিয়া একই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সংরক্ষিত হয়েছে। এখানে একজন শান্তি-আলোচনাকারী প্রতিনিধির প্রতি যৌন অপমানকে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
আবু বকরের গালির প্রকৃত অর্থ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। আরবি বাক্যটি হচ্ছে امصص بظر اللات। এখানে امصص অর্থ চুষে খাওয়া, بظر নারীর ভগাঙ্কুর বা যৌনাঙ্গের একটি নির্দিষ্ট অংশ এবং اللات হচ্ছে লাত দেবীর নাম। ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারী গ্রন্থে এই শব্দগুলোর ভাষাগত অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আরবদের মধ্যে মায়ের যৌনাঙ্গকে কেন্দ্র করে এ ধরনের গালি প্রচলিত ছিল। আবু বকর উরওয়ার মায়ের পরিবর্তে তাঁর উপাস্য দেবীকে সেই অপমানের লক্ষ্য বানিয়েছিলেন। অর্থাৎ গালিটির উদ্দেশ্য কেবল উরওয়াকে অপমান করা নয়, তাঁর ধর্মীয় উপাস্যকেও যৌন অপমানের বিষয়বস্তুতে পরিণত করা। এই অপমানের তীব্রতা এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্য ইবনে হাজারের ব্যাখ্যাতেই সুস্পষ্ট।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর দিক মুহাম্মদের উপস্থিতি এবং পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যা। সহিহ বুখারির বিবরণে আবু বকরকে গালির জন্য মুহাম্মদের তিরস্কার করার কোনো ঘটনা নেই। ইসলামি আইনশাস্ত্রে মুহাম্মদের উপস্থিতিতে সংঘটিত কোনো কাজ সম্পর্কে তাঁর অবগত থাকা সত্ত্বেও আপত্তি না করাকে নির্দিষ্ট শর্তে মৌন অনুমোদন বা তকরির হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ইসলামওয়েবের ৫৯৮১৬ নম্বর ফতোয়ায় এই নির্দিষ্ট ঘটনাকে সরাসরি মুহাম্মদের অনুমোদিত আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফতোয়াটিতে বলা হয়েছে, আবু বকরের বক্তব্য অন্যায় হলে মুহাম্মদ তাঁকে নিষেধ করতেন; কিন্তু তিনি নিষেধ না করে অনুমোদন করেছেন। একই সঙ্গে ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিশেষ পরিস্থিতিতে যৌনাঙ্গের নাম স্পষ্টভাবে ব্যবহার করার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলে এই ঘটনার ধর্মীয় তাৎপর্য কেবল একজন সাহাবির ব্যক্তিগত অশ্লীলতায় সীমিত নয়। তাঁর আচরণকে পরবর্তী ইসলামি কর্তৃপক্ষ শরিয়তসম্মত ভাষা ব্যবহারের নজিরে পরিণত করেছে।
যে ধর্মীয় ব্যবস্থায় সাধারণ অবস্থায় অশ্লীলতা নিষিদ্ধ, সেই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় প্রতিপক্ষকে অপমান করার প্রয়োজন দেখা দিলে অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থান ইসলামের ঘোষিত শিষ্টাচারের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রতিপক্ষের বক্তব্যের জবাব তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব; তাঁর উপাস্য দেবীর যৌনাঙ্গ নিয়ে গালি দেওয়া সেই বক্তব্যের যৌক্তিক খণ্ডন নয়। বরং তা প্রতিপক্ষকে হেয় করা, তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে অবমাননা করা এবং আলোচনার পরিবেশে অপমানকে বৈধ কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ইবনে হাজার, ইবনুল কাইয়্যিম এবং ইসলামওয়েবের আলোচনায় এই গালির উদ্দেশ্য ও বৈধতা যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাতে ধর্মীয় শিষ্টাচারের ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য অনুমোদিত আচরণের মধ্যে স্পষ্ট নৈতিক সংঘাত প্রকাশ পেয়েছে।
অন্যের উপাস্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে গালাগালি করার বিরুদ্ধে কোরআনের সূরা আনআমের ১০৮ নম্বর আয়াতে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটির পৃথক আলোচনা রয়েছে অন্য উপাস্যদের গালি দেওয়ার বিধান বিষয়ে। আবু বকরের ঘটনা সেই ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ এবং পরবর্তী আইনজ্ঞদের ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নজির।
হাদিসের বর্ণনা: লাত দেবীর যৌনাঙ্গ ও আবু বকরের আক্রমণ
হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় কুরাইশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুহাম্মদের আলোচনা চলছিল। উরওয়া ইবনে মাসউদ কুরাইশদের পক্ষ থেকে মুহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর অনুসারীদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। উরওয়া জানান, যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি মুহাম্মদের আশপাশে এমন বিভিন্ন গোত্রের লোকদের দেখছেন, যারা তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন। এই বক্তব্য শুনে আবু বকর তাঁর যুক্তির জবাব দেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালি দেন। বুখারির বর্ণনায় উরওয়ার পূর্ববর্তী পরামর্শ, তাঁর মন্তব্য, আবু বকরের প্রতিক্রিয়া এবং উরওয়ার জবাব একই ধারাবাহিক ঘটনার অংশ। ফলে গালিটি কোন পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল এবং তার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায়। [1] [2]
সহিহ বুখারি, হুদায়বিয়ার সন্ধি।
فقال له أبو بكر: امصص ببظر اللات، أنحن نفر عنه وندعه؟ فقال: من ذا؟ قالوا: أبو بكر.
ঘটনার বাংলা বিবরণ ও উদ্ধৃত আরবি বাক্যের অনুবাদ: উরওয়া ইবনে মাসউদ কুরাইশদের উদ্দেশে বলেন, মুহাম্মদ তাঁদের একটি যুক্তিসঙ্গত সন্ধিপ্রস্তাব দিয়েছেন এবং সেটি গ্রহণ করা উচিত। তিনি নিজে মুহাম্মদের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার অনুমতি চান। কুরাইশরা তাঁকে অনুমতি দিলে তিনি মুহাম্মদের কাছে যান এবং আলোচনা শুরু করেন। মুহাম্মদ তাঁকে আগের প্রতিনিধি বুদাইলকে দেওয়া সন্ধিপ্রস্তাবের অনুরূপ বক্তব্য জানান। উরওয়া তখন মুহাম্মদকে বলেন, তিনি যদি নিজের জাতিকে সমূলে ধ্বংস করেন, তাহলে আরবদের মধ্যে এমন কাজের কোনো নজির আছে কি? অন্যদিকে যুদ্ধের ফল বিপরীত হলে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে বিভিন্ন গোত্রের এমন লোক রয়েছে, যারা তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে।
এই বক্তব্য শুনে আবু বকর বলেন, “তুই লাত দেবীর ভগাঙ্কুর চুষে খা! আমরা কি তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাব?” উরওয়া তখন জানতে চান, এই ব্যক্তি কে। তাঁকে জানানো হয়, তিনি আবু বকর। উরওয়া বলেন, আবু বকর তাঁর একটি উপকার করেছিলেন, যার প্রতিদান তিনি এখনো দেননি; সেই উপকারের কথা না থাকলে তিনি এই গালির জবাব দিতেন। এরপর উরওয়া মুহাম্মদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান। কথা বলার সময় তিনি মুহাম্মদের দাড়িতে হাত দিচ্ছিলেন। মুহাম্মদের মাথার কাছে তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুগীরা ইবনে শুবা বারবার তলোয়ারের হাতল দিয়ে উরওয়ার হাত সরিয়ে দিচ্ছিলেন এবং মুহাম্মদের দাড়ি থেকে হাত সরিয়ে নিতে বলছিলেন। উরওয়া তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে তাঁকে মুগীরার নাম জানানো হয়। তখন উরওয়া মুগীরার পূর্ববর্তী বিশ্বাসঘাতকতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪৬/ শর্তাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১৭০১. যুদ্ধরত কাফিরদের সাথে জিহাদ ও সন্ধির ব্যাপারে শর্তারোপ এবং লোকদের সাথে কৃত মৌখিক শর্ত লিপিবদ্ধ করা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ২৫৪৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৭৩১ – ২৭৩৩
২৫৪৭। …
তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি লাত দেবীর লজ্জাস্থান চেটে খাও। আমরা কি তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাব?
…
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মারওয়ান ইবনু হাকাম (রহঃ)

এই বর্ণনায় উরওয়ার বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে। তিনি মুহাম্মদের বাহিনীর আনুগত্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ভুল হতে পারে, তাঁর মূল্যায়ন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে কিংবা তিনি মুহাম্মদকে চাপ দিতে চাইতে পারেন। কিন্তু আবু বকরের জবাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। তিনি উরওয়ার বক্তব্যের যৌক্তিকতা পরীক্ষা করেননি; প্রতিপক্ষের ধর্মীয় উপাস্যকে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালির লক্ষ্য বানিয়েছেন। একটি কূটনৈতিক আলোচনায় এই ভাষা যুক্তির শক্তি প্রকাশ করে না, বরং ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় অপমানকে বিতর্কের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
উরওয়ার প্রতিক্রিয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আবু বকরের গালিকে সাধারণ কথোপকথনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং পূর্ববর্তী উপকারের কারণে পাল্টা জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন। অর্থাৎ অপমানের উপস্থিতি বর্ণনার দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট। আবু বকর উদ্দেশ্যমূলকভাবে গালি দিয়েছেন এবং উরওয়া সেটিকে জবাবের যোগ্য অপমান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইবনে হাজারের ব্যাখ্যায়ও আবু বকরের উদ্দেশ্যকে উরওয়াকে অধিক মাত্রায় অপমান করা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মুহাম্মদ এই কথোপকথনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন। উরওয়ার সঙ্গে তাঁর আলোচনা চলছিল এবং আবু বকর সেই আলোচনার মধ্যেই গালি দিয়েছিলেন। পরবর্তী বর্ণনায় মুহাম্মদ উরওয়ার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছেন; আবু বকরের গালির জন্য কোনো সংশোধন বা তিরস্কারের কথা সেখানে নেই। ইসলামওয়েবের ফতোয়ায় এই নীরবতাকে সরাসরি অনুমোদন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে সহিহ বুখারির ঘটনাটি এবং তার পরবর্তী শরিয়তগত ব্যাখ্যা একত্রে একটি গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: প্রতিপক্ষের ধর্মীয় উপাস্যকে যৌন অপমান করা হলে সেই আচরণকে নিষিদ্ধ অশ্লীলতা বলা হবে, নাকি ধর্মীয় স্বার্থের কারণে বৈধ আচরণ হিসেবে গণ্য করা হবে?
হাদিসের ব্যাখ্যাঃ সেটি ছিল এক মারাত্মক গালি
এবারে আসুন এই বিষয়টি বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে জেনে নেয়া যাক [3] –
উরওয়ার এ কথা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর কাছে অপছন্দ হল। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, امصص بَظَرَ اللَاتِ أَنْفر অর্থাৎ, যা বেটা! স্বীয় লাতের লজ্জাস্থান চাট। তুই কি জানিস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমাদের ভালবাসা কিরূপ? আমরা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রেখে পালিয়ে যাব? অসম্ভব!
লাত ছিল সাকীফ গোত্রের প্রতিমার নাম। আরবদের মধ্যে এটি (লাতের লজ্জাস্থান চাট) ছিল মারাত্মক গালি। উরওয়ার বিস্ময়কর কষ্ট হল। সে জিজ্ঞেস করল, এ কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু বকর। উরওয়া বলল, আমাদের উপর আপনার এহসান রয়েছে, যার প্রতিদান আমরা দেইনি। অন্যথায় আমি আপনার এ কটূক্তির উত্তর দিতাম।
… হযরত মুগীরা রা. তলোয়ারের (লাগাল) দ্বারা উরওয়ার হাতে আঘাত করে বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাড়ি থেকে হাত পৃথক রাখ। উরওয়া মস্তক উত্তোলন করে জিজ্ঞেস করল, এ কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ হল তোমার ভাতিজা মুগীরা ইবনে শুবা।

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আবু বকর কেবল রাগ প্রকাশ করেননি, বরং প্রতিপক্ষের ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলে আঘাত করতে গিয়ে অত্যন্ত নিচু স্তরের যৌন-আশ্রয়ী গালি বেছে নিয়েছেন। এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় স্ববিরোধিতার দিকটি হলো আবু বকরের ‘ইহরাম’ অবস্থা। হুদায়বিয়ার এই সফরে সাহাবীরা উমরার উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধেছিলেন। কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ হলো—
হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয় এবং তোমরা যে কোন সৎ কাজই কর, আল্লাহ তা জানেন এবং তোমরা পাথেয়ের ব্যবস্থা করবে আর তাক্বওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে জ্ঞানী সমাজ! আমাকেই ভয় করতে থাক।
— Taisirul Quran
হাজ্জের মাসগুলি সুবিদিত। কেহ যদি ঐ মাসগুলির মধ্যে হাজ্জের সংকল্প করে তাহলে সে হাজ্জের সময়ে সহবাস, দুস্কার্য ও কলহ করতে পারবেনা এবং তোমরা যে কোন সৎ কাজ করনা কেন আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন। আর তোমরা তোমাদের সাথে পাথেয় নিয়ে নাও। বস্ত্ততঃ উৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া বা আত্মসংযম। সুতরাং হে জ্ঞানবানগণ! আমাকে ভয় কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
হজের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ আরোপ করে নিল, তার জন্য হজে অশ্লীল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। আর তোমরা ভাল কাজের যা কর, আল্লাহ তা জানেন এবং পাথেয় গ্রহণ কর। নিশ্চয় উত্তম পাথেয় তাকওয়া। আর হে বিবেক সম্পন্নগণ, তোমরা আমাকে ভয় কর।
— Rawai Al-bayan
হজ হয় সুবিদিত মাসগুলোতে [১]। তারপর যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ করা স্থির করে সে হজের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ [২], অন্যায় আচরণ [৩], ও কলহ-বিবাদ [৪] করবে না। আর তোমরা উত্তম কাজ থেকে যা-ই কর আল্লাহ্ তা জানেন [৫] আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর [৬]। নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ! তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর [৭] ।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় মুসলিমরা উমরা পালনের উদ্দেশ্যে ইহরাম গ্রহণ করেছিলেন। এই অবস্থায় আবু বকরের যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালির ঘটনা ইসলামের নিজস্ব শিষ্টাচার ও ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে একটি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। কোরআনের সূরা বাকারার ১৯৭ নম্বর আয়াতে হজের সময় রাফাছ, ফুসুক এবং জিদাল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাফাছের ব্যাখ্যায় যৌনসংসর্গ, যৌন ইঙ্গিত এবং যৌনসম্পর্কসংক্রান্ত অশ্লীল কথার উল্লেখ রয়েছে। ফুসুকের ব্যাখ্যায় পাপাচার ও গালিগালাজ এবং জিদালের ব্যাখ্যায় বিবাদ ও কলহের কথা পাওয়া যায়। আবু বকর যে শব্দগুলো উচ্চারণ করেছেন, সেগুলো কোনো নিরপেক্ষ শারীরবৃত্তীয় আলোচনা ছিল না। তিনি প্রতিপক্ষের উপাস্য দেবীর যৌনাঙ্গকে কেন্দ্র করে সরাসরি অপমানজনক গালি দিয়েছেন। এই কাজের সঙ্গে ইসলামের ঘোষিত সংযম ও গালিগালাজ পরিহারের বিধানের নৈতিক সংঘাত সুস্পষ্ট।
ধ্রুপদী হাম্বলি আইনজ্ঞ ইবনে কুদামা তাঁর আল-মুগনি গ্রন্থে ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজের আলোচনা করতে গিয়ে সূরা বাকারার ১৯৭ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে রাফাছের প্রধান অর্থ হিসেবে যৌনসংসর্গের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি যৌন ইঙ্গিত ও অশ্লীল কথাবার্তার বিভিন্ন ব্যাখ্যাও সংরক্ষণ করেছেন। একই আলোচনায় ফুসুকের অর্থ হিসেবে গালিগালাজের কথাও উল্লেখ করেছেন। এর ফলে ইহরামের শিষ্টাচার কেবল যৌনসংসর্গ থেকে বিরত থাকার বিধান নয়; ভাষা ও আচরণসংক্রান্ত সংযমও এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। ইবনে কুদামা লিখেছেন [4]—
وَالْفُسُوقُ هُوَ السِّبَابُ لِقَوْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ
বাংলা অনুবাদ: ফুসুক হচ্ছে গালিগালাজ। এর দলিল মুহাম্মদের বক্তব্য: একজন মুসলিমকে গালি দেওয়া পাপাচার।
ইবনে কুদামার আলোচনায় গালিগালাজকে পাপাচারের অন্তর্ভুক্ত করার নীতিটি স্পষ্ট। আবু বকরের ঘটনাতেও গালিগালাজের উপস্থিতি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইবনে হাজার নিজেই বলেছেন, আবু বকর উরওয়াকে অধিক মাত্রায় অপমান করার উদ্দেশ্যে তাঁর উপাস্য দেবীকে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালির লক্ষ্য বানিয়েছিলেন। ফলে কাজটির প্রকৃতি নির্ধারণে পরবর্তী কোনো অনুমানের প্রয়োজন নেই: এটি ইচ্ছাকৃত গালিগালাজ এবং ধর্মীয় অপমান। প্রশ্ন হচ্ছে, যে আচরণকে সাধারণ নৈতিক ও ধর্মীয় বিধানে নিন্দনীয় গণ্য করা হয়, একই আচরণ কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংঘটিত হলে কেন তাকে অনুমোদিত বলা হবে।
এখানে ধর্মীয় বিধানের প্রয়োগে আরেকটি অসংগতি রয়েছে। কোরআনে হজের সময় যৌনসম্পর্ক, পাপাচার এবং বিবাদ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। এই বিধানের উদ্দেশ্য আত্মসংযম ও আচরণগত শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আবু বকরের গালির ব্যাখ্যায় ধর্মীয় প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রয়োজনকে অশ্লীল ভাষার অনুমতির ভিত্তি বানানো হয়েছে। অর্থাৎ শিষ্টাচারের ঘোষিত আদর্শ এবং প্রতিপক্ষকে অপমান করার অনুমোদিত পদ্ধতির মধ্যে একটি ব্যতিক্রম সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ব্যতিক্রমের নৈতিক বৈধতা নির্ধারণে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষের রাজনৈতিক বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে তাঁর ধর্মীয় উপাস্যকে যৌন অপমান করা কতটা প্রয়োজনীয় বা ন্যায়সংগত ছিল। হুদায়বিয়ার আলোচনায় উরওয়া যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার যুক্তিসঙ্গত জবাব দেওয়ার জন্য এ ধরনের গালির প্রয়োজন ছিল না।
ইবনুল কাইয়্যিমের যাদুল মাআদ এবং ইসলামওয়েবের ৫৯৮১৬ নম্বর ফতোয়ায় এই ঘটনার বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য পরিস্থিতির প্রয়োজন, স্বার্থরক্ষা এবং প্রতিপক্ষকে কঠোরভাবে দমন করার যুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে মূল নৈতিক বিরোধটি শুধু ইহরামের নির্দিষ্ট একটি বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসলামের শিষ্টাচারবিধানে সাধারণভাবে অশ্লীলতা নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও, সেই অশ্লীলতাকে ধর্মীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য পৃথক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যে ভাষা সাধারণ পরিস্থিতিতে নিন্দনীয়, সেই ভাষা ধর্মীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োগের সময় গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই অবস্থান সমান নৈতিক মানদণ্ডের পরিবর্তে পরিস্থিতি ও পক্ষপরিচয়ের ভিত্তিতে শিষ্টাচারের সীমা পরিবর্তন করে।
‘তকরির’ বা মৌন সম্মতি: মুহাম্মদের নৈতিক অবস্থান
ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, নবীর কাজ, কথা এবং ‘নীরবতা’—এই তিনটিই আইনের উৎস। যদি আবু বকরের এই আচরণ ইসলামে নিষিদ্ধ বা অশালীন হতো, তবে মুহাম্মদের দায়িত্ব ছিল তৎক্ষণাৎ তাকে তিরস্কার করা। কিন্তু তিনি তা করেননি। ফাতহুল বারী গ্রন্থের লেখক ইবনু হাজার আসকালানি এই হাদিসের ব্যাখ্যাতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, নবী সেই সময়ে আবু বকরের এই কাজে নীরব সম্মতি জানিয়েছিলেন। আসুন ইবনু হাজার আসকালানির ফাতহুল বারী থেকে বিষয়টি দেখে নিই, [5]
لَأُقَاتِلَنَّهُمْ.
قَوْلُهُ: (اجْتَاحَ) بِجِيمٍ ثُمَّ مُهْمَلَةٍ أَيْ أَهْلَكَ أَصْلُهُ بِالْكُلِّيَّةِ، وَحَذَفَ الْجَزَاءَ مِنْ قَوْلِهِ: وَإِنْ تَكُنِ الْأُخْرَى تَأَدُّبًا مَعَ النَّبِيِّ ﷺ وَالْمَعْنَى وَإِنْ تَكُنِ الْغَلَبَةُ لِقُرَيْشٍ لَا آمَنُهُمْ عَلَيْكَ مَثَلًا. وَقَوْلُهُ: (فَإِنِّي وَاللَّهِ لَا أَرَى وُجُوهًا إِلَخْ) كَالتَّعْلِيلِ لِهَذَا الْقَدْرِ الْمَحْذُوفِ، وَالْحَاصِلُ أَنَّ عُرْوَةَ رَدَّدَ الْأَمْرَ بَيْنَ شَيْئَيْنِ غَيْرِ مُسْتَحْسَنَيْنِ عَادَةً وَهُوَ هَلَاكُ قَوْمِهِ إِنْ غَلَبَ، وَذَهَابُ أَصْحَابِهِ إِنْ غُلِبَ، لَكِنْ كُلٌّ مِنَ الْأَمْرَيْنِ مُسْتَحْسَنٌ شَرْعًا كَمَا قَالَ تَعَالَى: ﴿قُلْ هَلْ تَرَبَّصُونَ بِنَا إِلا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ﴾
قَوْلُهُ: (أَشْوَابًا) بِتَقْدِيمِ الْمُعْجَمَةِ عَلَى الْوَاوِ كَذَا لِلْأَكْثَرِ وَعَلَيْهَا اقْتَصَرَ صَاحِبُ الْمَشَارِقِ، وَوَقَعَ لِأَبِي ذَرٍّ، عَنِ الْكُشْمِيهَنِيِّ أَوْشَابًا بِتَقْدِيمِ الْوَاوِ، وَالْأَشْوَابُ الْأَخْلَاطُ مِنْ أَنْوَاعٍ شَتَّى، وَالْأَوْبَاشُ (١) الْأَخْلَاطُ مِنَ السَّفَلَةِ، فَالْأَوْبَاشُ أَخَصُّ مِنَ الْأَشْوَابِ.
قَوْلُهُ: (خَلِيقًا) بِالْخَاءِ الْمُعْجَمَةِ وَالْقَافِ أَيْ حَقِيقًا وَزْنًا وَمَعْنًى، وَيُقَالُ خَلِيقٌ لِلْوَاحِدِ وَالْجَمْعِ وَلِذَلِكَ وَقَعَ صِفَةً لِأَشْوَابٍ.
قَوْلُهُ: (وَيَدَعُوكَ) بِفَتْحِ الدَّالِ أَيْ يَتْرُكُوكَ، فِي رِوَايَةِ أَبِي الْمَلِيحِ، عَنِ الزُّهْرِيِّ عِنْدَ مَنْ سَمَّيْتُهُ وَكَأَنّي بِهِمْ لَوْ قَدْ لَقِيتَ قُرَيْشًا قَدْ أَسْلَمُوكَ فَتُؤْخَذُ أَسِيرًا فَأَيُّ شَيْءٍ أَشَدُّ عَلَيْكَ مِنْ هَذَا وَفِيهِ أَنَّ الْعَادَةَ جَرَتْ أَنَّ الْجُيُوشَ الْمُجَمَّعَةَ لَا يُؤْمَنُ عَلَيْهَا الْفِرَارُ بِخِلَافِ مَنْ كَانَ مِنْ قَبِيلَةٍ وَاحِدَةٍ فَإِنَّهُمْ يَأْنَفُونَ الْفِرَارَ فِي الْعَادَةِ. وَمَا دَرَى عُرْوَةُ أَنَّ مَوَدَّةَ الْإِسْلَامِ أَعْظَمُ مِنْ مَوَدَّةِ الْقَرَابَةِ، وَقَدْ ظَهَرَ لَهُ ذَلِكَ مِنْ مُبَالَغَةِ الْمُسْلِمِينَ فِي تَعْظِيمِ النَّبِيِّ ﷺ كَمَا سَيَأْتِي.
قَوْلُهُ: (فَقَالَ لَهُ أَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ) زَادَ ابْنُ إِسْحَاقَ وَأَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ خَلْفَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ قَاعِدٌ فَقَالَ.
قَوْلُهُ: (امْصَصْ بَظْرَ اللَّاتِ) زَادَ ابْنُ عَائِذٍ مِنْ وَجْهٍ آخَرَ عَنِ الزُّهْرِيِّ وَهِيَ – أَيِ اللَّاتُ – طَاغِيَتُهُ الَّتِي يَعْبُدُ أَيْ طَاغِيَةُ عُرْوَةَ. وَقَوْلُهُ امْصَصْ بِأَلِفِ وَصْلٍ وَمُهْمَلَتَيْنِ الْأُولَى مَفْتُوحَةٌ بِصِيغَةِ الْأَمْرِ، وَحَكَى ابْنُ التِّينِ عَنْ رِوَايَةِ الْقَابِسِيِّ ضَمَّ الصَّادِ الْأُولَى وَخَطَّأَهَا، وَالْبَظْرُ بِفَتْحِ الْمُوَحَّدَةِ وَسُكُونِ الْمُعْجَمَةِ قِطْعَةٌ تَبْقَى بَعْدَ الْخِتَانِ فِي فَرْجِ الْمَرْأَةِ، وَاللَّاتُ اسْمُ أَحَدِ الْأَصْنَامِ الَّتِي كَانَتْ قُرَيْشٌ وَثَقِيفٌ يَعْبُدُونَهَا، وَكَانَتْ عَادَةُ الْعَرَبِ الشَّتْمُ بِذَلِكَ لَكِنْ بِلَفْظِ الْأُمِّ فَأَرَادَ أَبُو بَكْرٍ الْمُبَالَغَةَ فِي سَبِّ عُرْوَةَ بِإِقَامَةِ مَنْ كَانَ يَعْبُدُ مَقَامَ أُمِّهِ، وَحَمَلَهُ عَلَى ذَلِكَ مَا أَغْضَبَهُ بِهِ مِنْ نِسْبَةِ الْمُسْلِمِينَ إِلَى الْفِرَارِ، وَفِيهِ جَوَازُ النُّطْقُ بِمَا يُسْتَبْشَعُ مِنَ الْأَلْفَاظِ لِإِرَادَةِ زَجْرِ مَنْ بَدَا مِنْهُ مَا يَسْتَحِقُّ بِهِ ذَلِكَ. وَقَالَ ابْنُ الْمُنِيرِ: فِي قَوْلِ أَبِي بَكْرٍ تَخْسِيسٌ لِلْعَدُوِّ وَتَكْذِيبُهُمْ وَتَعْرِيضٌ بِإِلْزَامِهِمْ مِنْ قَوْلِهِمْ إِنَّ اللَّاتَ بِنْتُ اللَّهِ، تَعَالَى اللَّهُ عَنْ ذَلِكَ عُلُوًّا كَبِيرًا، بِأَنَّهَا لَوْ كَانَتْ بِنْتًا لَكَانَ لَهَا مَا يَكُونُ لِلْإِنَاثِ.
قَوْلُهُ: (أَنَحْنُ نَفِرُّ) اسْتِفْهَامُ إِنْكَارٍ.
قَوْلُهُ: (مَنْ ذَا؟ قَالُوا: أَبُو بَكْرٍ) فِي رِوَايَةِ ابْنِ إِسْحَاقَ فَقَالَ: مَنْ هَذَا يَا مُحَمَّدُ؟ قَالَ: هَذَا ابْنُ أَبِي قُحَافَةَ.
قَوْلُهُ: (أَمَا) هُوَ حَرْفُ اسْتِفْتَاحٍ، وَقَوْلُهُ: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْقَسَمَ بِذَلِكَ كَانَ عَادَةً لِلْعَرَبِ.
قَوْلُهُ: (لَوْلَا يَدٌ) أَيْ نِعْمَةٌ، وَقَوْلُهُ: (لَمْ أَجْزِكَ بِهَا) أَيْ لَمْ أُكَافِئْكَ بِهَا، زَادَ ابْنُ إِسْحَاقَ وَلَكِنَّ هَذِهِ بِهَا أَيْ جَازَاهُ بِعَدَمِ إِجَابَتِهِ عَنْ شَتْمِهِ بِيَدِهِ الَّتِي كَانَ أَحْسَنَ إِلَيْهِ بِهَا، وَبَيَّنَ عَبْدُ الْعَزِيزِ الْإِمَامِيُّ، عَنِ الزُّهْرِيِّ فِي هَذَا الْحَدِيثِ أَنَّ الْيَدَ الْمَذْكُورَةَ أَنَّ عُرْوَةَ كَانَ تَحَمَّلَ بِدِيَةٍ فَأَعَانَهُ أَبُو بَكْرٍ فِيهَا بِعَوْنٍ حَسَنٍ، وَفِي رِوَايَةِ الْوَاقِدِيِّ عَشْرِ قَلَائِصَ.
قَوْلُهُ: (قَائِمٌ عَلَى رَأْسِ النَّبِيِّ ﷺ بِالسَّيْفِ) فِيهِ جَوَازُ الْقِيَامُ عَلَى رَأْسِ الْأَمِيرِ بِالسَّيْفِ بِقَصْدِ الْحِرَاسَةِ وَنَحْوِهَا مِنْ تَرْهِيبِ الْعَدُوِّ، وَلَا يُعَارِضُهُ النَّهْيُ عَنِ الْقِيَامِ عَلَى رَأْسِ الْجَالِسِ لِأَنَّ مَحَلَّهُ مَا إِذَا كَانَ عَلَى وَجْهِ الْعَظَمَةِ وَالْكِبْرِ.
قَوْلُهُ: (فَكُلَّمَا تَكَلَّمَ) فِي رِوَايَةِ السَّرَخْسِيِّ، وَالْكُشْمِيهَنِيِّ فَكُلَّمَا كَلَّمَهُ أَخَذَ بِلِحْيَتِهِ وَفِي رِوَايَةِ ابْنِ إِسْحَاقَ فَجَعَلَ يَتَنَاوَلُ لِحْيَةَ النَّبِيِّ ﷺ وَهُوَ يُكَلِّمُهُ.
আল-মাকতাবা আল-শামেলা থেকে সংগৃহীত ‘ফাতহুল বারী’ (ইবনু হাজার আসকালানি) এর এই অংশটি মূলত হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপটে কুরাইশ প্রতিনিধি উরওয়া ইবনু মাসউদ এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মধ্যকার কথোপকথন ও তার আইনি ও ভাষাগত ব্যাখ্যা।
নিচে পাতাটির অনুবাদ দেওয়া হলো:
ফাতহুল বারী: জিহাদ ও সন্ধি অধ্যায় (ব্যাখ্যা অংশ)
১. কুরাইশদের আক্রমণ ও উরওয়ার বক্তব্য:
ইবনু হাজার বলেন, “اجتاح” (ইজতাহা) শব্দের অর্থ হলো— কোনো কিছুকে পুরোপুরি ধ্বংস বা সমূলে বিনাশ করা। উরওয়া ইবনু মাসউদ যখন নবী (সা.)-কে বলছিলেন, “যদি কুরাইশরা জয়ী হয় তবে তারা আপনাদের সমূলে বিনাশ করবে,” তখন তিনি আদববশত বাক্যের শেষ অংশ উহ্য রেখেছিলেন। অর্থাৎ, কুরাইশরা জয়ী হলে আপনার ওপর কী বিপদ আসতে পারে, তা তিনি সরাসরি উচ্চারণ করেননি।
এরপর উরওয়া যখন বললেন, “আমি আপনার সাথে এমন কিছু মুখ (মানুষ) দেখছি যারা পালিয়ে যাবে,” এটি ছিল তাঁর পূর্বের উহ্য রাখা কথার কারণ দর্শানো। মূলত উরওয়া পরিস্থিতিকে এমন দুটি বিকল্পের মধ্যে ফেলেছিলেন যা জাগতিকভাবে খুব একটা ভালো নয়— হয় কুরাইশদের বিনাশ, নতুবা মুসলিমদের পলায়ন। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে এই দুটিই মঙ্গলের (যেকোনো একটি ঘটবে), যেমন আল্লাহ বলেছেন: “বলুন, তোমরা কি আমাদের জন্য দুটি মঙ্গলের একটির অপেক্ষা করছ না?”
২. ‘অশওয়াব’ ও ‘আওবাশ’ (মিশ্র ভিড়) শব্দের ব্যাখ্যা:
উরওয়া সাহাবীদের ‘অশওয়াব’ (أشوابا) বলেছিলেন। অধিকাংশ বর্ণনায় এই শব্দই এসেছে। এর অর্থ হলো— বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সংমিশ্রিত জনতা। অন্য বর্ণনায় এসেছে ‘আওবাশ’ (أوباش), যার অর্থ হলো— নিচু স্তরের বা সাধারণ মানুষের মিশ্রণ। ফলে ‘আওবাশ’ শব্দটি ‘অশওয়াব’ এর চেয়েও বেশি অপমানজনক বা সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
উরওয়া নবী (সা.)-কে বলছিলেন যে, এরা আপনাকে বিপদে ফেলে (যুদ্ধক্ষেত্রে) ছেড়ে পালাবে। আবু মালিহ এর বর্ণনায় এসেছে— উরওয়া বলতে চেয়েছিলেন, “আমি দেখছি যদি আপনি কুরাইশদের মুখোমুখি হন, তবে এরা আপনাকে ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাবে এবং আপনি বন্দী হবেন।” প্রাচীনকালে প্রচলিত ধারণা ছিল যে, বিভিন্ন গোত্রের সংমিশ্রণে তৈরি সেনাবাহিনী পালানোর ভয় থাকে, কিন্তু যারা কেবল এক গোত্রের লোক, তারা বংশীয় মর্যাদার খাতিরে পালায় না। কিন্তু উরওয়া জানতেন না যে, ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বা ভালোবাসা বংশীয় সম্পর্কের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।
৩. আবু বকরের অশ্লীল গালি ও তার ব্যাখ্যা:
উরওয়ার এই অপমানজনক বক্তব্যের প্রতিবাদে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)—যিনি নবীর ঠিক পাশেই বসা ছিলেন—বলে উঠলেন: “امصص بظر اللات” (যা, লাত দেবীর লজ্জাস্থান চেটে খা!)।
ইবনু আইয-এর বর্ণনায় জুহরি থেকে এসেছে, ‘লাত’ ছিল উরওয়ার সেই দেবী বা উপাস্য যাকে সে পূজা করত। ‘আমসিস’ (امصص) শব্দটি এখানে আদেশসূচক। ‘বজর’ (بظر) বলতে নারীদেহের খতনার পর অবশিষ্ট অংশকে (ক্লিটোরিস) বোঝানো হয়। আর ‘লাত’ হলো সেই প্রতিমা যার পূজা কুরাইশ ও সাকীফ গোত্র করত।
আরবদের মধ্যে সাধারণত মাকে জড়িয়ে এই গালি দেওয়ার প্রথা ছিল। কিন্তু আবু বকর এখানে উরওয়াকে চূড়ান্ত অপমান করার জন্য তার উপাস্য দেবীকে (লাত) তার মায়ের জায়গায় স্থাপন করে এই গালি দিয়েছিলেন। উরওয়া যখন মুসলিমদের পলায়নপর বা কাপুরুষ হিসেবে ইঙ্গিত করলেন, তখন আবু বকর চরম ক্রোধান্বিত হয়ে এই উক্তিটি করেন।
৪. অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের বৈধতা:
ইবনু হাজার আসকালানি এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কাউকে কঠোরভাবে ধমক দেওয়া বা যথাযথ শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজনে এমন শব্দ (অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ) উচ্চারণ করা জায়েজ যা সাধারণত ঘৃণিত বা অপছন্দনীয়।”
ইবনু মুনির বলেন, আবু বকরের এই উক্তিতে শত্রুকে তুচ্ছ করা হয়েছে এবং তাদের দাবিকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা হয়েছে। মুশরিকরা দাবি করত যে ‘লাত’ হলো আল্লাহর কন্যা (নাউযুবিল্লাহ)। আবু বকর এখানে বিদ্রূপ করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে যদি কন্যাই হয় তবে সাধারণ নারীদের মতো তারও তো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকবে!
৫. উরওয়ার প্রতিক্রিয়া ও আবু বকরের পূর্বের এহসান:
উরওয়া যখন জিজ্ঞেস করলেন, “হে মুহাম্মদ, এ কে?” নবী (সা.) উত্তর দিলেন, “ইনি ইবনু আবি কুহাফা (আবু বকর)।” তখন উরওয়া আবু বকরকে বললেন, “আল্লাহর কসম! যদি আমার ওপর আপনার একটি ঋণ (এহসান) না থাকত যার বদলা আমি এখনও দিইনি, তবে আমি অবশ্যই আপনার এই গালির উত্তর দিতাম।”
আবদুল আজিজ আল-ইমামি জুহরি থেকে বর্ণনা করেছেন যে, সেই ‘এহসান’ বা ঋণটি ছিল— উরওয়া একবার কোনো এক রক্তপণের (দিয়্যত) বোঝা বহন করছিলেন, তখন আবু বকর তাকে উত্তমভাবে সাহায্য করেছিলেন। ওয়াকিদির বর্ণনায় এসেছে, আবু বকর তাকে ১০টি উট দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।
৬. মুগীরা ইবনু শু’বা এবং পাহারাদারি:
মুগীরা ইবনু শু’বা (রা.) তলোয়ার হাতে নবীর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে পাহারাদারি করছিলেন। ইবনু হাজার বলেন, শত্রুকে ভয় দেখাতে বা নিরাপত্তার প্রয়োজনে নেতার মাথার কাছে তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েজ। এটি অহংকারবশত কারও সামনে দাঁড়িয়ে থাকার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। উরওয়া কথা বলার সময় বারবার নবীর দাড়িতে হাত দিচ্ছিলেন, আর মুগীরা প্রতিবারই তলোয়ারের হাতল দিয়ে উরওয়ার হাতে আঘাত করে সরিয়ে দিচ্ছিলেন।
ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ফাতহুল বারী গ্রন্থে আবু বকরের গালির ভাষাগত ও সামাজিক অর্থ স্পষ্ট করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আরব সমাজে সাধারণত মায়ের যৌনাঙ্গের উল্লেখ করে এ ধরনের গালি দেওয়া হতো। আবু বকর উরওয়ার ক্ষেত্রে সেই গালিকে আরও অপমানজনক করার জন্য তাঁর মায়ের পরিবর্তে তাঁর উপাস্য লাত দেবীকে লক্ষ্য করেছিলেন। ইবনে হাজার স্পষ্টভাবে লিখেছেন, আবু বকর উরওয়াকে অধিক মাত্রায় অপমান করতে চেয়েছিলেন এবং মুসলিমরা তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে—উরওয়ার এমন মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে গালিটি দিয়েছিলেন। এরপর ইবনে হাজার এই ঘটনা থেকে একটি আইনগত সিদ্ধান্ত টেনেছেন: যে ব্যক্তির আচরণ কঠোরভাবে ধমক দেওয়ার উপযুক্ত, তাকে দমন করার উদ্দেশ্যে সাধারণভাবে ঘৃণিত বা কদর্য শব্দ ব্যবহার করা বৈধ। অর্থাৎ তিনি গালিটিকে শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেননি, তার ব্যবহারকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনুমোদিত আচরণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এই সিদ্ধান্তের নৈতিক সমস্যা অত্যন্ত স্পষ্ট। উরওয়া মুসলিমদের আনুগত্য নিয়ে একটি রাজনৈতিক মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্যকে ভুল প্রমাণ করার জন্য তথ্য ও যুক্তি দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু আবু বকর তাঁর ধর্মীয় উপাস্যের যৌনাঙ্গকে অপমানের উপকরণ করেছেন। ইবনে হাজার এই গালির উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতিপক্ষকে অপমান ও দমনের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সেই উদ্দেশ্যকে কদর্য শব্দ ব্যবহারের অনুমতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে ধর্মীয় প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমানকে আইনগত বৈধতা দেওয়া হয়েছে। যে আচরণ সাধারণ নৈতিক বিচারে অশ্লীল ও অপমানজনক, সেটিকে ধর্মীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে অনুমোদিত ঘোষণা করা হয়েছে।
ইবনুল কাইয়্যিম: স্বার্থসিদ্ধির জন্য যৌনাঙ্গের নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণের অনুমতি
ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে হুদায়বিয়ার ঘটনার বিভিন্ন আইনগত শিক্ষা আলোচনা করেছেন। এই আলোচনায় আবু বকরের গালিকে একটি স্বতন্ত্র বিধানের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, আবু বকরের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো স্বার্থ অর্জনের জন্য যৌনাঙ্গের নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা বৈধ। একই প্রসঙ্গে তিনি মুহাম্মদের সেই নির্দেশের উল্লেখ করেছেন, যেখানে জাহেলি বংশগৌরব প্রকাশকারী ব্যক্তিকে তার পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়াতে বলার নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ ইবনুল কাইয়্যিম আবু বকরের গালির বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য মুহাম্মদের আরেকটি যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমানজনক নির্দেশকেও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে [6]—
وَفِي قَوْلِ الصِّدِّيقِ لِعُرْوَةَ: امْصُصْ بَظْرَ اللَّاتِ، دَلِيلٌ عَلَى جَوَازِ التَّصْرِيحِ بِاسْمِ الْعَوْرَةِ إِذَا كَانَ فِيهِ مَصْلَحَةٌ تَقْتَضِيهَا تِلْكَ الْحَالُ.
বাংলা অনুবাদ: আবু বকর উরওয়াকে যে বলেছিলেন, ‘লাত দেবীর ভগাঙ্কুর চুষে খাও’, তার মধ্যে প্রমাণ রয়েছে যে পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো স্বার্থ থাকলে যৌনাঙ্গের নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা বৈধ।
ইবনুল কাইয়্যিমের বক্তব্যে ব্যবহৃত মাসলাহা শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ কল্যাণ, স্বার্থ কিংবা পরিস্থিতিগত প্রয়োজন। তিনি আবু বকরের গালির বৈধতা নির্ধারণে এই প্রয়োজনকে কেন্দ্রীয় যুক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বার্থ থাকা এবং সেই স্বার্থ অর্জনের জন্য প্রতিপক্ষকে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালি দেওয়ার নৈতিক অধিকার থাকা দুটি পৃথক বিষয়। একটি কাজ কোনো পক্ষের জন্য সুবিধাজনক হলেই তা ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। প্রতিপক্ষকে অপমান করে নিজের অনুসারীদের আনুগত্য প্রকাশ করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সেই উদ্দেশ্য অপমানজনক আচরণকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে না। ইবনুল কাইয়্যিমের যুক্তিতে প্রয়োজনীয়তা ও স্বার্থের ধারণাকে অশ্লীল ভাষার অনুমতির ভিত্তিতে পরিণত করা হয়েছে।
এই অবস্থান ইসলামের ঘোষিত শিষ্টাচারের সঙ্গে আরও গভীর বিরোধ সৃষ্টি করে। ধর্মীয় আদর্শ যদি সত্যিই সর্বজনীন নৈতিক মানদণ্ড হয়, তাহলে সেই মানদণ্ড নিজের অনুসারী এবং প্রতিপক্ষ উভয়ের ক্ষেত্রেই একইভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কিন্তু আবু বকরের গালির বৈধতা প্রতিষ্ঠার সময় প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে অপমানের উপযুক্ত কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। উরওয়ার ধর্মীয় উপাস্যকে যৌন অপমানের লক্ষ্য বানানো হয়েছে এবং পরবর্তী ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সেটিকে বৈধ বলা হয়েছে। এর ফলে নৈতিকতা ব্যক্তির মর্যাদা ও আচরণের ওপর নয়, বরং পরিস্থিতির সুবিধা এবং প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ইসলামওয়েবের ৫৯৮১৬ নম্বর ফতোয়া: মুহাম্মদের নীরবতাকে সরাসরি অনুমোদন ঘোষণা
২০০৫ সালের ১০ মার্চ প্রকাশিত ইসলামওয়েবের ৫৯৮১৬ নম্বর ফতোয়ায় আবু বকরের এই নির্দিষ্ট গালির সত্যতা এবং শরিয়তগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছিলেন, ‘লাত দেবীর ভগাঙ্কুর চুষে খাও’ কথাটি নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় রয়েছে কি না, ইসলামি আইনজ্ঞরা এর কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং এই আচরণ মুহাম্মদের অশ্লীলতা ও গালিগালাজ নিষিদ্ধ করার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না। উত্তরে ফতোয়াটিতে বুখারি ও আহমদের বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ইবনে হাজারের ব্যাখ্যা, ইবনুল কাইয়্যিমের মাসলাহাসংক্রান্ত বক্তব্য এবং ইবনে তাইমিয়ার একটি মত উদ্ধৃত করে আবু বকরের আচরণের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এই ফতোয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য মুহাম্মদের নীরবতা সম্পর্কে। সেখানে বলা হয়েছে, আবু বকরের গালিতে কোনো অন্যায় থাকলে মুহাম্মদ তাঁকে নিষেধ করতেন। কিন্তু মুহাম্মদ তাঁকে নিষেধ করেননি; বরং অনুমোদন করেছেন। এভাবে ঘটনাটিকে শুধু আবু বকরের ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তাঁর গালির বৈধতার পক্ষে মুহাম্মদের নীরবতাকে ধর্মীয় অনুমোদনের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফতোয়ার বক্তব্য হচ্ছে [7]—
وأيضاً لو كان فيه مخالفة لنهاه النبي عن ذلك بل أقره وهو صلى الله عليه وسلم لا يقر على باطل.
বাংলা অনুবাদ: এ ছাড়া এতে কোনো বিধান লঙ্ঘন থাকলে নবী তাঁকে নিষেধ করতেন। বরং তিনি তা অনুমোদন করেছেন। আর নবী কোনো অন্যায়কে অনুমোদন করেন না।
এই বক্তব্য আবু বকরের আচরণের ধর্মীয় বৈধতা সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট। মুহাম্মদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, গালি দেওয়ার পর উরওয়ার সঙ্গে আলোচনা চলেছে এবং বর্ণনায় আবু বকরের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো তিরস্কারের উল্লেখ নেই। ইসলামওয়েব এই নীরবতাকে অনুমোদন হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে অশ্লীলতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু ইবনে হাজার বা ইবনুল কাইয়্যিমের পরবর্তী মত ব্যবহার করা হয়নি; মুহাম্মদের উপস্থিতি ও নীরবতাকেও সেই বৈধতার ভিত্তিতে পরিণত করা হয়েছে।
ইসলামওয়েবের এই ব্যাখ্যার নৈতিক পরিণতি গুরুতর। একজন ধর্মীয় নেতা নিজের উপস্থিতিতে তাঁর অনুসারীর যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালির প্রতিবাদ করেননি। পরবর্তী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ সেই নীরবতাকে অনুমোদন বলে ঘোষণা করেছে। এর ফলে প্রতিপক্ষের ধর্মীয় উপাস্যকে অশ্লীলভাবে অপমান করার একটি ঘটনা ধর্মীয়ভাবে বৈধ আচরণের নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যে আদর্শ নিজেকে উচ্চতর শিষ্টাচার ও চরিত্রের বিধান হিসেবে প্রচার করে, সেই আদর্শের অনুমোদিত আচরণের তালিকায় এমন যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমান অন্তর্ভুক্ত হওয়া তার নৈতিক দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, পরিস্থিতির স্বার্থে এবং ক্ষতি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এমন শব্দ ব্যবহার করতে হলে তাতে অসুবিধা নেই। এই বক্তব্যে গালির নৈতিক বৈধতা নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিপক্ষের মর্যাদার পরিবর্তে বক্তার প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। উরওয়ার বক্তব্যে আবু বকর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষুব্ধ হওয়া অন্যের ধর্মীয় উপাস্যকে যৌন অপমান করার নৈতিক অধিকার সৃষ্টি করে না। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ সেই অপমানকে বৈধ ঘোষণা করায় প্রতিপক্ষের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণের দাবিটি একটি পরিস্থিতিনির্ভর ব্যতিক্রমের অধীন হয়ে পড়েছে।
ইসলামওয়েবের পরবর্তী ফতোয়া: অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের অনুমতি স্থায়ী আইনগত অবস্থান
ইসলামওয়েবের ৫৯৮১৬ নম্বর ফতোয়ার অবস্থান পরবর্তী সময়েও পুনরাবৃত্ত হয়েছে। ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রকাশিত ৩৪২১৯৬ নম্বর ফতোয়ার শিরোনামই হচ্ছে جواز التكلم بالألفاظ الفاحشة للمصلحة الراجحة, অর্থাৎ অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের জন্য অশ্লীল শব্দ উচ্চারণের বৈধতা। এই ফতোয়ায় প্রশ্নকারী আবু বকরের গালি এবং জাহেলি বংশগৌরব প্রকাশকারী ব্যক্তিকে পুরুষাঙ্গ কামড়াতে বলার নির্দেশের সঙ্গে অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করার অন্যান্য হাদিসের বিরোধ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরে বলা হয়েছে, ইসলামে সাধারণভাবে শালীন ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ থাকলেও কোনো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেই সাধারণ বিধান থেকে ব্যতিক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। [8]
এই সিদ্ধান্ত দেখায়, আবু বকরের গালিকে বৈধ বলার অবস্থান কোনো বিচ্ছিন্ন বা অপ্রচলিত মন্তব্য নয়। পরবর্তী ইসলামি ফতোয়াতেও সেই ঘটনার বৈধতা এবং যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমানজনক শব্দ ব্যবহারের অনুমোদন ধর্মীয় যুক্তির মাধ্যমে বজায় রাখা হয়েছে। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই অশ্লীলতাকে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন তখন অশ্লীলতার সংজ্ঞা নিয়ে নয়; বরং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ কোন পরিস্থিতিকে অশ্লীল ভাষা ব্যবহারের উপযুক্ত মনে করছেন এবং কেন প্রতিপক্ষের মর্যাদার ওপর সেই প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তা নিয়ে।
মুহাম্মদের নিজের নির্দেশে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালি: উবাই ইবনে কাবের ঘটনা
আবু বকরের অশ্লীল গালির ঘটনার পাশাপাশি ইসলামি হাদিসসাহিত্যে মুহাম্মদের নিজের নির্দেশে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের বর্ণনাও রয়েছে। ইমাম বুখারির আল-আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থের ৯৬৩ নম্বর হাদিসে উবাই ইবনে কাবের একটি ঘটনা সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, একজন ব্যক্তি জাহেলি যুগের বংশগৌরবের ভিত্তিতে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেছিলেন। উবাই ইবনে কাব তাঁকে নিজের পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়াতে বলেন এবং কথাটিকে আড়াল করার জন্য কোনো পরোক্ষ শব্দ ব্যবহার করেননি। উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁর এমন ভাষা শুনে বিস্মিত হন। তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে উবাই জানান, এই বিষয়ে তিনি কাউকে ভয় করেন না। এরপর তিনি মুহাম্মদের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন, যেখানে জাহেলি বংশগৌরব প্রকাশকারীদের এভাবেই অপমান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই হাদিসের বিশেষ গুরুত্ব হচ্ছে, এখানে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালির অনুমোদন মুহাম্মদের নীরবতা থেকে অনুমান করার প্রয়োজন নেই। বর্ণনায় মুহাম্মদের নিজের নির্দেশ উদ্ধৃত হয়েছে। একই সঙ্গে একজন সাহাবি সেই নির্দেশের বাস্তব প্রয়োগ করেছেন এবং উপস্থিত লোকদের আপত্তির মুখে মুহাম্মদের বক্তব্যকে নিজের আচরণের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। হাদিসটির সংশ্লিষ্ট বক্তব্য হচ্ছে [9]—
إِنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ وَلَا تَكْنُوهُ.
বাংলা অনুবাদ: আমি মুহাম্মদকে বলতে শুনেছি: যে ব্যক্তি জাহেলি যুগের বংশগৌরবের ভিত্তিতে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে, তাকে তার পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়াতে বলো এবং কথাটি পরোক্ষ ভাষায় প্রকাশ করো না।
বর্ণনার ঘটনাপ্রবাহে উবাই ইবনে কাবের বক্তব্য এবং উপস্থিত লোকদের প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেবল কাউকে কঠোরভাবে তিরস্কার করেননি। তিনি এমন একটি যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমান ব্যবহার করেছেন, যা শুনে তাঁর সঙ্গীরা বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁদের সেই বিস্ময়ের জবাবে তিনি মুহাম্মদের নির্দেশ উদ্ধৃত করেছেন। ফলে কদর্য ভাষাটিকে নিজের ব্যক্তিগত ক্রোধের অনিয়ন্ত্রিত প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় নির্দেশের বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই ঘটনা ইসলামের শিষ্টাচারসংক্রান্ত দাবির সঙ্গে একটি গুরুতর বিরোধ সৃষ্টি করে: যে ধরনের শব্দ সাধারণ কথোপকথনে অশ্লীল ও অবমাননাকর, নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় সেই ধরনের ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত হয়েছে।
আবু বকরের গালি এবং উবাই ইবনে কাবের ঘটনা পরস্পর থেকে পৃথক। প্রথম ঘটনায় ধর্মীয় প্রতিপক্ষের উপাস্য দেবীকে অপমান করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনায় জাহেলি বংশগৌরব প্রকাশকারী ব্যক্তির পিতার পুরুষাঙ্গকে অপমানের বিষয়বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু দুটি ঘটনার ভাষাগত ও নৈতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমানকে কাউকে দমন বা হেয় করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম ঘটনায় মুহাম্মদের উপস্থিতিতে আবু বকর গালি দিয়েছেন এবং পরবর্তী আইনজ্ঞরা নীরবতাকে অনুমোদনের ভিত্তি করেছেন। দ্বিতীয় ঘটনায় মুহাম্মদের নিজের নির্দেশের ভিত্তিতে একই প্রকৃতির অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের বর্ণনা পাওয়া যায়।
ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে আবু বকরের গালির বৈধতা ব্যাখ্যা করার সময় জাহেলি বংশগৌরব প্রকাশকারীদের সম্পর্কে মুহাম্মদের এই নির্দেশও উদ্ধৃত করেছেন। তাঁর যুক্তিতে দুটি ঘটনাই বিশেষ পরিস্থিতিতে যৌনাঙ্গের নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণের অনুমতির দলিল। এর ফলে বিষয়টি কেবল বিচ্ছিন্ন দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরবর্তী ইসলামি আইনশাস্ত্রে এগুলো একই বিধানের সমর্থনকারী নজির হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিপক্ষের প্রতি অবমাননাকর ভাষা প্রয়োগ এবং জাহেলি পরিচয় প্রকাশকারীর প্রতি যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমান—উভয়কেই বিশেষ পরিস্থিতিতে বৈধ বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করার হাদিস এবং যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালির অনুমোদন
ইসলামে শালীন ভাষা ব্যবহারের নির্দেশও সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। সুনান আত-তিরমিজির ১৯৭৭ নম্বর হাদিসে মুহাম্মদ মুমিনের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে অন্যের সম্মানহানি, অভিশাপ, অশ্লীলতা এবং কদর্য ভাষা ব্যবহারকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই বক্তব্য একটি সাধারণ নৈতিক বিধান প্রতিষ্ঠা করে: বিশ্বাসী মানুষের ভাষা অপমানজনক, অশ্লীল বা কদর্য হবে না। কিন্তু আবু বকরের গালির বৈধতা এবং জাহেলি বংশগৌরব প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের নির্দেশের সঙ্গে এই সাধারণ বিধান তুলনা করলে একই ধর্মীয় নৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে পরস্পরবিরোধী আচরণগত নির্দেশ পাওয়া যায়। একদিকে অশ্লীলতাকে মুমিনের চরিত্রের বিপরীত বলা হয়েছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিরমিজির হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে মুহাম্মদের বক্তব্য এভাবে এসেছে [10]—
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ.
বাংলা অনুবাদ: মুমিন অন্যের সম্মানহানি করে না, অভিশাপ দেয় না, অশ্লীল আচরণ করে না এবং কদর্য ভাষা ব্যবহার করে না।
এই হাদিসের সঙ্গে আবু বকরের বক্তব্যের সংঘাত সরাসরি। আবু বকর প্রতিপক্ষের উপাস্য দেবীর যৌনাঙ্গ চেটে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি অশ্লীল ও কদর্য ভাষার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। ইবনে হাজারও গালিটিকে সাধারণভাবে ঘৃণিত শব্দের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইবনুল কাইয়্যিম পরিস্থিতির প্রয়োজনকে এমন ভাষা ব্যবহারের বৈধতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইসলামওয়েবের ফতোয়ায় মুহাম্মদের নীরবতাকে অনুমোদন ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ একই ধর্মীয় ঐতিহ্যে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই অশ্লীলতার অনুমতি পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই দুই অবস্থানের নৈতিক সংঘাতকে কেবল পরিস্থিতির পার্থক্য দিয়ে দূর করা যায় না। পরিস্থিতি ভিন্ন হলে কোনো আচরণের মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই পার্থক্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তিসঙ্গত নৈতিক কারণ প্রয়োজন। একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধি মুসলিমদের আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন—এই ঘটনা তাঁর উপাস্য দেবীকে যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক গালি দেওয়ার ন্যায়সংগত কারণ নয়। একইভাবে জাহেলি বংশগৌরব প্রকাশ করা ভুল কিংবা নিন্দনীয় হলেও তার প্রতিক্রিয়ায় পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়াতে বলার ভাষা অপরিহার্য হয়ে যায় না। উভয় ক্ষেত্রেই অশ্লীল অপমানের পরিবর্তে সরাসরি আপত্তি, যুক্তিগত প্রতিবাদ কিংবা কঠোর কিন্তু শালীন তিরস্কার করা সম্ভব ছিল। কিন্তু ইসলামি বর্ণনা ও পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যায় যৌনাঙ্গকেন্দ্রিক অপমানকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এই অবস্থান বিশেষভাবে গুরুতর হয়ে ওঠে যখন ধর্মীয় নেতা ও তাঁর অনুসারীদের আচরণকে আদর্শ নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সাধারণ মানুষের অশোভন আচরণকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে সমালোচনা করা যায়। কিন্তু ধর্মীয় কর্তৃত্বের মাধ্যমে একই আচরণকে বৈধ ঘোষণা করলে তা আর কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা থাকে না; অন্যদের জন্য গ্রহণযোগ্য আচরণের নজিরে পরিণত হয়। ইবনুল কাইয়্যিম
তথ্যসূত্রঃ
- সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৩১–২৭৩২, হুদায়বিয়ার সন্ধি ↩︎
- সহিহ বুখারি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস ২৫৪৭ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫২ ↩︎
- ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, তৃতীয় খণ্ড, ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজের আলোচনা ↩︎
- فهرس الكتاب ٥٤ – كتاب الشروط ١٥ – باب الشروط في الجهاد، والمصالحة مع أهل الحرب، وكتابة الشروط ↩︎
- ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মাআদ, তৃতীয় খণ্ড, হুদায়বিয়ার ঘটনার আইনগত শিক্ষা ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৫৯৮১৬, دفاع عن الصديق رضي الله عنه, ১০ মার্চ ২০০৫ ↩︎
- ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩৪২১৯৬, جواز التكلم بالألفاظ الفاحشة للمصلحة الراجحة, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ ↩︎
- ইমাম বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ৯৬৩, كتاب الحركات ↩︎
- সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ১৯৭৭, كتاب البر والصلة ↩︎

