জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

উসমানের খিলাফত ও অমুসলিমদের অধিকার :’সোনালী যুগে’র মিথ খণ্ডন এবং কাঠামোগত অন্যায়, অবিচার

প্রকাশিত: জানুয়ারি 12, 2025লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন20 মিনিট পড়া

ভূমিকা: ঐতিহাসিক রোমান্টিকতা বনাম শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতা

ইসলামী ইতিহাসে প্রথম চার খলিফার শাসনকাল বা ‘খিলাফতে রাশেদা’কে একটি নিখুঁত, ন্যায়পরায়ণ এবং সাম্যবাদী ‘সোনালী যুগ’ হিসেবে চিত্রিত করা একটি জনপ্রিয় ধর্মীয় বয়ান। দাবি করা হয়, এই সময়কালে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার ছিল সর্বজনীন এবং অমুসলিমদের অধিকার ছিল সুরক্ষিত। তবে সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎস এবং ধ্রুপদী ইসলামী আইনগ্রন্থগুলোর নির্মোহ বিশ্লেষণ এই রোমান্টিক ধারণার বিপরীতে এক কঠোর ও বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থার চিত্র উন্মোচিত করে। বিশেষ করে তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফানের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে ন্যায়বিচার কোনো নিরপেক্ষ আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না, বরং তা ছিল গোত্রীয় প্রভাব, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদের অধীন। অমুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবনের মূল্য এই ব্যবস্থায় ছিল মুসলিমদের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য, যা একটি আধুনিক এবং মানবিক রাষ্ট্রের ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

উসমানের শাসনামলের সূচনাতেই যে বিচারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আইনের শাসনের কবর দেওয়া হয়েছিল, তা হলো খলিফা উমরের হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী বিচারহীনতা। এই ঘটনাটি কেবল একটি একক আইনি ত্রুটি নয়, বরং এটি ইসলামী শাসনতন্ত্রের সেই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে, যেখানে শাসকের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা নিরপরাধ মানুষের রক্তের বিনিময়ে হলেও জায়েজ বলে গণ্য করা হতো। উসমানের বিচারিক কার্যাবলীতে দেখা যায়, তিনি অমুসলিম বা পারস্য বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রজা’ হিসেবে গণ্য করে তাদের খুনিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রদান করেছিলেন। এই প্রবন্ধের পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতে আমরা দেখব কীভাবে তথাকথিত ‘সোনালী যুগে’র আড়ালে অমুসলিমদের নাগরিক অধিকারকে পদদলিত করা হয়েছিল এবং কীভাবে ন্যায়বিচারকে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকারে পরিণত করা হয়েছিল।


উবাইদুল্লাহ ইবনে উমরের বিচারিক প্রহসন: আইনের শাসনের অপমৃত্যু

খলিফা উসমানের শাসনামলের শুরুর দিককার সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত ঘটনাটি ছিল উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর কর্তৃক পরিচালিত হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া। খলিফা উমরের মৃত্যুর পর তার পুত্র উবাইদুল্লাহ কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা প্রমাণের তোয়াক্কা না করেই পারস্যের প্রাক্তন সেনাপতি হুরমুজান, জনৈক খ্রিস্টান জুফাইনাহ এবং উমরের ঘাতক আবু লুলুর এক নাবালিকা কন্যাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেন। আধুনিক বিচারব্যবস্থা তো বটেই, এমনকি তৎকালীন সাধারণ মানবিক বোধ থেকেও এটি ছিল এক চরম বর্বরোচিত অপরাধ। উবাইদুল্লাহর এই উন্মত্ততা কেবল ঘাতকের আত্মীয়দের ওপর সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি মদিনার সকল অনারব গোলাম ও বন্দীদের হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই ধরনের প্রকাশ্য এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডের পর উসমানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রধান দায়িত্ব ছিল আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ বয়ান বলছে, সেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে কাজ করেছিল রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব। এটি তথাকথিত ‘সোনালী যুগে’র সেই মিথকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে দাবি করা হয় যে খলিফারা আইনের ঊর্ধ্বে কাউকে স্থান দিতেন না।

উসমান এই মামলাটি যখন মজলিসে শূরার অধিবেশনে উত্থাপন করেন, তখন সেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে এক ধরণের ‘পলিটিক্যাল সেটলমেন্ট’ বা রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা দেখা যায়। আলী ইবনে আবি তালিবের মতো সাহাবী যখন স্পষ্ট ভাষায় উবাইদুল্লাহর মৃত্যুদণ্ড বা ‘কিসাস’ দাবি করেন, তখন উসমান এবং তার সমর্থকদের পক্ষ থেকে এক অদ্ভুত যুক্তি দাঁড় করানো হয়। তাদের যুক্তি ছিল—“গতকাল তার পিতাকে (উমর) হত্যা করা হয়েছে, আর আজ তাকে (উবাইদুল্লাহ) হত্যা করা হবে—এটি সাধারণ মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।” অর্থাৎ, অপরাধীর অপরাধ বা নিহতদের জীবনের মূল্যের চেয়েও শাসকের পরিবারের ভাবমূর্তি রক্ষা করাকে এখানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। উসমান এই পরিস্থিতিতে নিজেকে নিহতদের ‘অভিভাবক’ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং এই বিশেষ ক্ষমতাবলে খুনি উবাইদুল্লাহকে ক্ষমা করে দেন। একজন খলিফা যখন নিজেই বিচারক এবং নিজেই নিহতদের স্বজন সেজে অপরাধীকে দায়মুক্তি দেন, তখন তাকে ‘ইনসাফ’ বলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটি ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় মদদে একটি গুরুতর অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়া এবং মদিনার বিচার ব্যবস্থায় ‘রুল অফ ল’ এর বদলে ‘রুল অফ পাওয়ার’ প্রতিষ্ঠা করা।

এই বিচারিক প্রহসনটি একটি ভয়ঙ্কর নজির স্থাপন করেছিল যে, শাসকগোষ্ঠীর বা পূর্বতন কোনো খলিফার সন্তান যদি সাধারণ প্রজা বা অমুসলিমদের হত্যা করে, তবে রাষ্ট্র তাকে সুরক্ষা দেবে। উসমান উবাইদুল্লাহর পক্ষ থেকে দিয়াত বা রক্তপণ রাষ্ট্রীয় কোষাগার কিংবা নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পরিশোধ করেছিলেন। এই সমাধানটি আইনি দৃষ্টিতে ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, রক্তপণ তখনই দেওয়া যায় যখন হত্যাকাণ্ডটি ভুলবশত হয়, কিন্তু উবাইদুল্লাহর এই হত্যাকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত এবং পূর্বপরিকল্পিত। উসমানের এই সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত একটি অমুসলিম বা অনারব জীবনের চেয়ে একজন আরবীয় শাসক পরিবারের সন্তানের জীবনের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করা। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, খিলাফতের সেই তথাকথিত সোনালী যুগেও নাগরিক অধিকারের সমতা ছিল না এবং প্রভাবশালী কুরাইশ বংশের সদস্যদের জন্য আইনের ভিন্ন ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ বিদ্যমান ছিল।


প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক দলিলপত্র এবং বিবরণ

আসুন ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু গ্রন্থ থেকে উসমানের শাসনামলের এই ঘটনা জেনে নিই [1] –

[ঘ] উত্তেজিত অবস্থায় কোনো অপরাধ করে বসলে এ ব্যাপারে হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত হচ্ছে-উত্তেজিত অবস্থায় কেউ কোনো অপরাধ করে বসলে তার হুকুম জিনাইয়াতুল খাতা বা ভুলে কৃত অপরাধের মত। এ ক্ষেত্রে কিসাসের পরিবর্তে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা অপরিহার্য হবে। যেমন-আবদুর রহমান ইবনু আবু বকর (রা) বর্ণনা করেছেন-যখন
www.amarboi.org
ফিক্সে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু
১৫৩
হযরত ওমর (রা)-কে শহীদ করা হলো, তখন আমি হরমুজান, জুফাইনাহ এবং আবু লুলুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। তারা মদীনার একটি মহল্লায় বসবাস করতো। আমাকে দেখেই তারা পালাতে শুরু করলো। আমিও তাদের পিছু নিলাম। দৌড়ানোর এক পর্যায়ে তাদের হাত থেকে একটি খঞ্জর (বড়ো আকারের ছুরি) পড়ে গেলো, যা দুদিকেই ধারালো ছিলো। আমি দেখেই (আমার সাথীদেরকে) বললাম- দেখো, এটি সেই খঞ্জর যা দিয়ে ওমর (রা)-কে শহীদ করা হয়েছে। লোকজন গিয়ে খঞ্জর দেখে তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। যখন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) সেই খঞ্জর দেখলেন, তখন তরবারী নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এবং হরমুজান, জুফাইনাহকে হত্যা করলেন, আর আবু লুলুর কিশোরী কন্যাকে পেয়ে তাকেও হত্যা করে ফেললেন। তারপর তলোয়ার উচিয়ে বলতে লাগলেন-আল্লাহর কসম! আজ মদীনার কোনো গোলাম বা বাঁদী আমার তরবারী থেকে রেহাই পাবে না। এদেরকে ছাড়া আরো কিছু লোককেও হত্যা করতে হবে। আরো কিছু লোক বলতে তিনি কতিপয় মুহাজির সাহাবার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। লোকজন তাকে তলোয়ার ফেলে দেয়ার জন্য চাপ দিলেন। তারা কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এমন সময় সেখানে হযরত আমর ইবনুল আস (রা) এলেন। তিনি খুব নরম ও স্নেহের স্বরে বললেন- ‘ভাতিজা। তরবারীটি আমার কাছে দিয়ে দাও।’ তিনি তরবারী দিয়ে দিলেন।
হযরত ওসমান (রা) মজলিসে শূরার অধিবেশন আহ্বান করে তাদেরকে বললেন-আপনারা উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-এর ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দিন। মতামত দিতে গিয়ে শূরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলো। কতিপয় মুহাজির সাহাবা পরামর্শ দিলেন-তাকে কিসাস স্বরূপ হত্যা করা হোক। অন্যেরা বললেন-কী আশ্চর্য! কাল তার পিতাকে শহীদ করা হয়েছে আর আজ তাকে হত্যা করা হবে? আল্লাহ হরমুজান ও জুফাইনাহকে ধ্বংস করুন। হযরত ওসমান (রা) চিন্তার গভীরে হারিয়ে গেলেন। পরে সিদ্ধান্তে পৌছুলেন উবাইদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা) এমন অবস্থায় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যখন সে স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলো না। সে এমন কথা বলছে এবং এমন কাজ করছে তা স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ করতে পারে না। তার মানসিক অবস্থা এমন ছিলো, যা কিসাস মুলতবী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সন্দেহের কারণে হদ এর মত কিসাসও মুলতবী হয়ে যায়।
হরমুজান এবং আবু লুলুর কন্যার কোনো উত্তরাধিকারী ছিলো না। এমতাবস্থায় রাষ্ট্র তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছিলো। অন্য কথায় হযরত ওসমান (রা) তাদের অভিভাবক ছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন কিভাবে এ সমস্যার ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান করা যায়। তাই যারা উৰাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন-আপনারা বলনুতো হরমুজানের অভিভাবক কে? ‘আমীরুল মুমিনীন! তার অভিভাবক তো এখন আপনি।’- তারা উত্তর দিলেন। এ জবাব শুনে তিনি বললেন-‘যদি তাই হয় তাহলে আমি উবাউদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা)-কে মাফ করে দিলাম। ‘৬ যখন নিহত ব্যক্তির অভিভাবক হত্যাকারীকে মাফ করে দেন তখন কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত (রক্তপণ) ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই হযরত ওসমান (রা) বাইতুলমাল থেকে দিয়াত আদায় করে দেবার নির্দেশ দেন। রইলো জুফাইনার ব্যাপারটি। সে খৃষ্টান ছিলো। কোনো অমুসলিম কোনো মুসলমানের হাতে নিহত হলে সেজন্য মুসলমানকে হত্যা করা যায় না। তাই তিনি উবাইদুল্লাহর পক্ষ থেকে তার দিয়াতও আদায় করে দেন।

আর যদি ভুলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে দিয়াত প্রদান ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক)।
[খ.১] মুসলিম কর্তৃক কোনো অমুসলিমের ক্ষতি সাধন: কোনো মুসলমানের হাতে যদি
কোনো অমুসলিম (সে যিম্মি হোক কিংবা না হোক) নিহত হয়, সে জন্য মুসলিম থেকে কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে দিয়াত গ্রহণ করতে হবে। এজন্য হযরত ওসমান (রা) কোনো মুশরিককে হত্যা করার কারণে কোনো মুসলমান থেকে কিসাস গ্রহণ করতেন না। তার সময়ে একজন মুসলমান এক যিম্মীকে ইচ্ছে করে হত্যা করেন। সে জন্য তিনি কিসাস গ্রহণ করেননি বরং দিয়াতু মুগাল্লাযা (অর্থাৎ পুরো দিয়াত) প্রদানের নির্দেশ দেন। যদি কোনো মুসলমান অমুসলিমকে হত্যা না করে হত্যার চেয়ে কম ক্ষতি সাধন করেন, সে ক্ষেত্রে কিভাবে কিসাস গ্রহণ করা যাবে? এ সম্পর্কে আমরা হযরত ওসমান (রা)-এর অভিমত সংক্রান্ত কোনো বর্ণনা পাইনি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে হযরত ওমর (রা) কিসাস গ্রহণ করতেন না, তবে দিয়াতের পরিমাণ

বিচার
বিচার 1
বিচার 3

একই তথ্য পাওয়া যায় আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতেও [2]

হযরত উসমান (রা)-এর খিলাফতের প্রথম মামলাটি হলো উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-এর মামলা। যে মামলার রায় দিলেন খোদ আমীরুল মু’মিনীন হযরত উসমান (রা)। হযরত উমর (রা)-এর আহত হবার পরদিন সকালে উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা), উমর (রা)-এর হত্যাকারী আবু লুলুর কন্যার কাছে গমন করেন এবং তাকে হত্যা করেন। জুফাইনাহ নামক একজন খ্রিস্টানকে তিনি তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেন ও এভাবে তাকে হত্যা করেন। তাসতুরের শাসক আল-হুরমুযানকে তিনি আঘাত করেন ও তাকে হত্যা করেন। অভিযোগ করা হয়েছে যে, তারা এ দুইজন উমর (রা)-কে হত্যার ব্যাপারে আবু লুলুকে সাহায্য করেছিল।
ইতোমধ্যে উমর (রা) তাকে বন্দী করার হুকুম দিয়েছিলেন। যাতে তার পরে যে খলীফা হবেন তিনি তাঁর বিচার করতে পারেন। যখন হযরত উসমান (রা) খলীফা হলেন এবং জনগণের সমস্যা সমাধানে বসলেন, তখন প্রথম মামলাটি ছিল উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা) সম্পর্কে, যেটাতে উসমান (রা)-কে রায় দিতে হবে। আলী (রা) বলেন, “ন্যায় বিচারকে ছেড়ে দেওয়া বিচারের অন্তর্ভুক্ত নয়। তিনি হত্যার নির্দেশ প্রদান করলেন, কিছু সংখ্যক মুহাজির। বলেন, ‘গতকাল তাঁর পিতা শহীদ হন, আর আজকে তাকে হত্যা করা হবে, এটা কেমন দেখায়? আমর ইবন ‘আস (রা) বলেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনাকে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এটা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। এ মামলাটি আপনার যুগে সংঘটিত হয় নাই। কাজেই, আপনি আপনার পক্ষ থেকে এটা ছেড়ে দিতে পারেন। তখন হযরত উসমান (রা) এ তিনটি হত্যাকাণ্ডের খেসারত নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে আদায় করে দেন। কেননা, তাদের বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত খলীফার উপরই বর্তায়। বায়তুলমাল ব্যতীত তাদের কোন উত্তরাধিকারীই ছিল না। আর খলীফা এ ব্যাপারে যা ভাল মনে করেন তা-ই করতে পারেন। হযরত উসমান (রা) এভাবে উবাইদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-কে দায়মুক্ত করে দিলেন।

বিচার 5

উসমানের রায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়: হাদিস ও জমহুর ফিকহে ধর্মভিত্তিক অসম কিসাস

উবাইদুল্লাহ ইবন উমরের হত্যাকাণ্ডে উসমানের সিদ্ধান্তকে কেবল একজন খলিফার ব্যক্তিগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ কিংবা নিহত উমরের পুত্রের প্রতি বিশেষ সহানুভূতির ফল হিসেবে দেখলে ইসলামী আইনের বৃহত্তর সমস্যাটি আড়াল হয়ে যায়। কারণ মুসলিম হত্যাকারী এবং অমুসলিম নিহত ব্যক্তির মধ্যে কিসাসের অসমতা উসমান নিজে উদ্ভাবন করেননি; মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত হাদিসেই এই ধর্মভিত্তিক বৈষম্যের আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়। সহিহ বুখারির ‘রক্তপণ’ অধ্যায়ে আলীর কাছে সংরক্ষিত লিখিত বিধানের মধ্যে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কোনো মুসলিমকে কোনো কাফিরের হত্যার কারণে কিসাসে হত্যা করা হবে না। একই বিধান ইবন মাজাহ ও আবু দাউদেও সংরক্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে কি না—শুধু সেই অপরাধের প্রকৃতি নয়, হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়ও সর্বোচ্চ প্রতিশোধমূলক শাস্তি নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে [3]।

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، حَدَّثَنَا زُهَيْرٌ، حَدَّثَنَا مُطَرِّفٌ، أَنَّ عَامِرًا، حَدَّثَهُمْ عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ، قَالَ قُلْتُ لِعَلِيٍّ. وَحَدَّثَنَا صَدَقَةُ بْنُ الْفَضْلِ، أَخْبَرَنَا ابْنُ عُيَيْنَةَ، حَدَّثَنَا مُطَرِّفٌ، سَمِعْتُ الشَّعْبِيَّ، يُحَدِّثُ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا جُحَيْفَةَ، قَالَ سَأَلْتُ عَلِيًّا هَلْ عِنْدَكُمْ شَىْءٌ مِمَّا لَيْسَ فِي الْقُرْآنِ ـ وَقَالَ ابْنُ عُيَيْنَةَ مَرَّةً مَا لَيْسَ عِنْدَ النَّاسِ ـ فَقَالَ وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ وَبَرَأَ النَّسَمَةَ مَا عِنْدَنَا إِلاَّ مَا فِي الْقُرْآنِ إِلاَّ فَهْمًا يُعْطَى رَجُلٌ فِي كِتَابِهِ وَمَا فِي الصَّحِيفَةِ. قُلْتُ وَمَا فِي الصَّحِيفَةِ قَالَ الْعَقْلُ، وَفِكَاكُ الأَسِيرِ، وَأَنْ لاَ يُقْتَلَ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ.
বাংলা অনুবাদ: আবু জুহাইফা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদের কাছে কি এমন কিছু আছে যা কোরআনে নেই?” ইবন উয়াইনা একবার বর্ণনায় বলেছেন, “যা অন্য মানুষের কাছে নেই?” আলী বললেন, “যিনি শস্যদানা বিদীর্ণ করেন এবং প্রাণ সৃষ্টি করেন তাঁর শপথ, আমাদের কাছে কোরআনে যা আছে তা ছাড়া আর কিছু নেই; তবে আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তাঁর কিতাব বোঝার যে ক্ষমতা দেন এবং এই লিখিত পত্রে যা আছে তা ব্যতীত।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এই পত্রে কী আছে?” তিনি বললেন, “রক্তপণের বিধান, বন্দী মুক্ত করার বিধান এবং কোনো কাফিরকে হত্যার কারণে কোনো মুসলিমকে কিসাসে হত্যা করা হবে না—এই বিধান।”

একই বিধান সুনান ইবন মাজাহ-তেও প্রায় একই ভাষায় সংরক্ষিত হয়েছে। এখানে বিষয়টি কোনো পরবর্তী ফকিহের অনুমান নয়; বর্ণনাটি সরাসরি মুহাম্মদের কাছ থেকে পাওয়া রক্তপণ ও হত্যার বিধানের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত। অধ্যায়ের শিরোনামও দ্ব্যর্থহীন—“কাফের ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবে না।” একই বর্ণনাধারা বিভিন্ন হাদিসসংকলনে পুনরাবৃত্ত হওয়াকে স্বাধীন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না, কিন্তু ইসলামী হাদিস-আইনের ভেতরে এই নীতির সুস্পষ্ট ও পুনরাবৃত্ত উপস্থিতি অস্বীকার করারও কোনো সুযোগ নেই [4]।

حَدَّثَنَا عَلْقَمَةُ بْنُ عَمْرٍو الدَّارِمِيُّ، حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ عَيَّاشٍ، عَنْ مُطَرِّفٍ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ، قَالَ قُلْتُ لِعَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ هَلْ عِنْدَكُمْ شَىْءٌ مِنَ الْعِلْمِ لَيْسَ عِنْدَ النَّاسِ قَالَ لاَ وَاللَّهِ مَا عِنْدَنَا إِلاَّ مَا عِنْدَ النَّاسِ إِلاَّ أَنْ يَرْزُقَ اللَّهُ رَجُلاً فَهْمًا فِي الْقُرْآنِ أَوْ مَا فِي هَذِهِ الصَّحِيفَةِ فِيهَا الدِّيَاتُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَنْ لاَ يُقْتَلَ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ.
বাংলা অনুবাদ: আবু জুহাইফা বলেন, আমি আলী ইবন আবি তালিবকে বললাম, “আপনাদের কাছে কি এমন কোনো জ্ঞান আছে যা অন্য মানুষের কাছে নেই?” তিনি বললেন, “না, আল্লাহর শপথ। মানুষের কাছে যা আছে আমাদের কাছেও তা-ই আছে; তবে আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে কোরআন বোঝার বিশেষ ক্ষমতা দিতে পারেন, অথবা এই পত্রে যা রয়েছে।” এই পত্রে মুহাম্মদের কাছ থেকে বর্ণিত রক্তপণের বিধান ছিল এবং তাতে ছিল—“কোনো কাফিরকে হত্যার কারণে কোনো মুসলিমকে কিসাসে হত্যা করা হবে না।”

সুনান আবু দাউদ-এর বর্ণনাটি এই বৈষম্যের প্রকৃতি আরও পরিষ্কার করে, কারণ একই দলিলের ভেতর প্রথমে ঘোষণা করা হয়েছে—“মুমিনদের রক্ত পরস্পর সমান”; তারপর সঙ্গে সঙ্গেই বলা হয়েছে—“কোনো মুমিনকে কোনো কাফিরের হত্যার কারণে হত্যা করা হবে না।” অর্থাৎ এখানে যে রক্তের সমতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেটি সর্বজনীন মানবসমতা নয়; সেটি মুসলিম সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ সমতা। ধর্মীয় সীমানার বাইরে থাকা মানুষের জীবন সেই সমতার একই আইনি মর্যাদা পাচ্ছে না। একজন মুসলিম নিহত হলে কিসাসে হত্যাকারীর প্রাণ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু নিহত ব্যক্তি কাফির হলে মুসলিম হত্যাকারীর প্রাণ একইভাবে নেওয়া যাবে না—এই বিধান মানুষের জীবনকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে ভিন্ন আইনি স্তরে ভাগ করে [5]।

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ، وَمُسَدَّدٌ، قَالاَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، أَخْبَرَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِي عَرُوبَةَ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ قَيْسِ بْنِ عَبَّادٍ، قَالَ انْطَلَقْتُ أَنَا وَالأَشْتَرُ، إِلَى عَلِيٍّ فَقُلْنَا هَلْ عَهِدَ إِلَيْكَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم شَيْئًا لَمْ يَعْهَدْهُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً قَالَ لاَ إِلاَّ مَا فِي كِتَابِي هَذَا. قَالَ مُسَدَّدٌ قَالَ فَأَخْرَجَ كِتَابًا، وَقَالَ أَحْمَدُ كِتَابًا مِنْ قِرَابِ سَيْفِهِ، فَإِذَا فِيهِ: الْمُؤْمِنُونَ تَكَافَأُ دِمَاؤُهُمْ وَهُمْ يَدٌ عَلَى مَنْ سِوَاهُمْ وَيَسْعَى بِذِمَّتِهِمْ أَدْنَاهُمْ أَلاَ لاَ يُقْتَلُ مُؤْمِنٌ بِكَافِرٍ وَلاَ ذُو عَهْدٍ فِي عَهْدِهِ مَنْ أَحْدَثَ حَدَثًا فَعَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَحْدَثَ حَدَثًا أَوْ آوَى مُحْدِثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ. قَالَ مُسَدَّدٌ عَنِ ابْنِ أَبِي عَرُوبَةَ فَأَخْرَجَ كِتَابًا.
বাংলা অনুবাদ: কায়স ইবন আব্বাদ বলেন, আমি ও আশতার আলীর কাছে গেলাম এবং বললাম, “মুহাম্মদ কি আপনাকে এমন কোনো বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষকে দেননি?” তিনি বললেন, “না, আমার এই লিখিত পত্রে যা আছে তা ছাড়া।” মুসাদ্দাদের বর্ণনায় তিনি একটি পত্র বের করেন; আহমদের বর্ণনায় তিনি তরবারির খাপ থেকে একটি পত্র বের করেন। তাতে লেখা ছিল: “মুমিনদের রক্ত পরস্পর সমান। অন্যদের বিরুদ্ধে তারা একক শক্তি। তাদের সবচেয়ে নিম্ন মর্যাদার ব্যক্তির দেওয়া নিরাপত্তাও সবার জন্য কার্যকর। সাবধান, কোনো মুমিনকে কোনো কাফিরের হত্যার কারণে হত্যা করা হবে না এবং কোনো চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিকেও তার চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় হত্যা করা হবে না।” যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ বা নতুন অনাচার ঘটায় তার দায় তার নিজের ওপর; আর যে এমন অপরাধ ঘটায় অথবা অপরাধীকে আশ্রয় দেয়, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা এবং সকল মানুষের অভিশাপ।

এই বিধানকে শুধু যুদ্ধরত শত্রু বা ‘হারবি কাফির’-এর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে বৈষম্যটিকে আড়াল করার সুযোগও জমহুর ফিকহ দেয়নি। আধুনিক ইসলামি ফতোয়া প্রতিষ্ঠান ইসলামওয়েব সরাসরি স্বীকার করেছে যে, যুদ্ধরত অমুসলিমের হত্যার কারণে মুসলিমকে হত্যা না করার বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে; আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুসলিম শাসনের অধীন বসবাসকারী স্বাধীন অমুসলিম বা যিম্মিকে হত্যার ক্ষেত্রেও মুসলিমকে কিসাসে হত্যা না করাই অধিকাংশ আলেমের মত। ফতোয়াটি আবু হানিফা ও হানাফি ফকিহদের বিপরীত মতও উল্লেখ করেছে—তাদের মতে যিম্মিকে হত্যার কারণে মুসলিমকে কিসাসে হত্যা করা হবে। কিন্তু সেই ব্যতিক্রম স্বীকার করার পর ইসলামওয়েব নিজেই জমহুরের অসম অবস্থানকে “সঠিক মত” বলে ঘোষণা করেছে [6]।

All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad is His slave and Messenger. We ask Allaah to exalt his mention as well as that of his family and all his companions.
First of all, you should know that a Muslim should not be killed for killing a belligerent non-Muslim according to the consensus of the scholars may Allaah have mercy upon them. According to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them a Muslim should not be killed against a free non-Muslim under the Muslim rule. The evidence about this is the saying of the Prophet sallallaahu `alayhi wa sallam: “A Muslim should not be killed for killing a non-Muslim.” [At-Tirmithi]
Moreover, according to the view of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them the title (and rulings) “disbeliever” is applicable to a free non-Muslim under the Muslim rule. However, Abu Haneefah, and the scholars of his School of jurisprudence may Allaah have mercy upon them are of the view that a Muslim should be killed for killing a free non-Muslim under Muslim rule; their evidence is the two verses which the questioner mentioned. Nonetheless, the correct opinion is that of the majority of the scholars may Allaah have mercy upon them that is based on the above Prophetic narration, which is a direct proof related to the case of dispute.
Allaah Knows best.
বাংলা অনুবাদ: সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন মুহাম্মদ, তার পরিবার এবং তার সকল সঙ্গীর মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
প্রথমত, আপনার জানা উচিত যে, আলেমদের ঐকমত্য অনুযায়ী একজন যুদ্ধরত অমুসলিমকে হত্যার কারণে কোনো মুসলিমকে হত্যা করা হবে না। অধিকাংশ আলেমের মত অনুযায়ী, মুসলিম শাসনের অধীন বসবাসকারী একজন স্বাধীন অমুসলিমকে হত্যার কারণেও কোনো মুসলিমকে কিসাসে হত্যা করা হবে না। এর প্রমাণ মুহাম্মদের বক্তব্য: “কোনো অমুসলিমকে হত্যার কারণে কোনো মুসলিমকে হত্যা করা হবে না।”
এছাড়া অধিকাংশ আলেমের মতে, মুসলিম শাসনের অধীন থাকা স্বাধীন অমুসলিমের ক্ষেত্রেও ‘কাফির’ শব্দ এবং তার সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোজ্য। তবে আবু হানিফা এবং তার মাজহাবের আলেমদের মতে, মুসলিম শাসনের অধীন কোনো স্বাধীন অমুসলিমকে হত্যার কারণে মুসলিমকেও হত্যা করা হবে। তাদের প্রমাণ প্রশ্নকারীর উল্লেখ করা দুটি আয়াত। তা সত্ত্বেও, সঠিক মত হলো অধিকাংশ আলেমের মত, কারণ সেটি উপরে বর্ণিত নবীর হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা এই বিতর্কিত বিষয়ে সরাসরি প্রমাণ।
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

এই স্বীকারোক্তির পর ধর্মভিত্তিক বৈষম্যকে কোনো ভাষাগত কৌশলে অস্বীকার করা যায় না। হানাফি মাজহাব যিম্মির জীবনের ক্ষেত্রে সমান কিসাসের সম্ভাবনা স্বীকার করেছে—অর্থাৎ একই ইসলামি আইনশাস্ত্রের ভেতরেই এমন একটি অবস্থান বিদ্যমান ছিল যেখানে মুসলিম হত্যাকারীকে অমুসলিম নাগরিক হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সম্ভব। তারপরও জমহুর ফকিহরা বিপরীত নীতি গ্রহণ করেছেন এবং আধুনিক ইসলামওয়েব সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকেই সঠিক বলে সমর্থন করছে। ফলে অসমতা কোনো অনিবার্য আইনি প্রয়োজন ছিল না; এটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয়-আইনি নির্বাচন। সেই নির্বাচনে মুসলিম হত্যাকারীর জীবন অমুসলিম নিহত ব্যক্তির সমপরিমাণ প্রতিশোধমূলক শাস্তি থেকে বিশেষ সুরক্ষা পেয়েছে।

উসমানের বিচারিক কর্মকাণ্ড এই নীতিকে বাস্তবে আরও নগ্ন করে তোলে। বর্তমান প্রবন্ধে উদ্ধৃত ফিকহে উসমান নিজেই জানিয়েছে, খ্রিস্টান জুফাইনাকে হত্যার জন্য উবাইদুল্লাহকে হত্যা করা হয়নি, কারণ “কোনো অমুসলিম কোনো মুসলমানের হাতে নিহত হলে সেজন্য মুসলমানকে হত্যা করা যায় না”; একই গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে, উসমানের আমলে একজন মুসলিম একজন যিম্মিকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলেও তিনি কিসাস গ্রহণ করেননি, বরং বর্ধিত দিয়াত ধার্য করেছিলেন। অর্থাৎ একদিকে মুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত হাদিসি বিধান, অন্যদিকে জমহুর ফিকহের ব্যাখ্যা এবং তৃতীয়দিকে উসমানের বাস্তব বিচার—তিন স্তরেই একই ধর্মভিত্তিক অসমতা দৃশ্যমান। এখানে অমুসলিমের জীবন সম্পূর্ণ মূল্যহীন ছিল—এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই; আরও নির্দিষ্ট এবং আরও ভয়াবহ সত্য হলো, কিসাসের আইনে তার জীবন মুসলিমের জীবনের সমমূল্যের আইনি সুরক্ষা পায়নি।

এটি কোনো বিমূর্ত ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য নয়; এর ফল সরাসরি জীবন-মৃত্যুর বিচার। একই ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তির ধর্ম বদলালে হত্যাকারীর ওপর সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান বদলে যাচ্ছে। যে রাষ্ট্রে একজন মানুষের বিশ্বাস নির্ধারণ করে তার হত্যার প্রতিশোধে ঘাতকের জীবন নেওয়া যাবে কি না, সেখানে আইনের সামনে সমান মানবমর্যাদা নেই। উসমানের বিচারিক রায় তাই কেবল একজন খলিফার নৈতিক ব্যর্থতা নয়; সেটি এমন একটি ধর্মীয় আইনি কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ, যেখানে মুসলিম পরিচয় হত্যাকারীকে এমন একটি বিশেষ সুরক্ষা দিতে পারে, যা নিহত অমুসলিমের সমমর্যাদার বিচারকে অস্বীকার করে।


অমুসলিম জীবনের মূল্য ও কাঠামোগত বৈষম্য: শরিয়া আইনের একদেশদর্শী প্রয়োগ

খলিফা উসমানের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তৎকালীন আইনি কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তথাকথিত ‘সোনালী যুগে’ নাগরিক অধিকারের সাম্য কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। অমুসলিম বা ‘জিম্মি’দের জীবনের মূল্য এই ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। ধ্রুপদী ইসলামী আইন বা ফিকহশাস্ত্রের সেই প্রাথমিক পর্যায়ে এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হিসেবে আবির্ভূত হয় যে, “কোনো অমুসলিম নিহত হওয়ার কারণে কোনো মুসলমানকে মৃত্যুদণ্ড (কিসাস) দেওয়া যাবে না।” উসমানের শাসনামলে এই নীতিটির কঠোর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যখন উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর খ্রিস্টান নাগরিক জুফাইনাহকে হত্যা করেন, তখন খলিফা উসমান তাকে মৃত্যুদণ্ড দেননি, বরং কেবল ‘দিয়াত’ বা রক্তপণ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই আইনি অবস্থানটি আধুনিক মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের (Rule of Law) সম্পূর্ণ পরিপন্থী, কারণ এটি মানুষের জীবনের মূল্যকে তার বিশ্বাসের নিক্তিতে পরিমাপ করে। একজন নাগরিক কেবল তার ধর্মের কারণে হত্যাকারীর শাস্তি থেকে বঞ্চিত হবেন—এটি কোনোভাবেই একটি ‘ন্যায়বিচারক’ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

এই কাঠামোগত বৈষম্য কেবল উবাইদুল্লাহর মামলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল উসমানের সামগ্রিক শাসনদর্শনের অংশ। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, উসমানের শাসনামলে যখনই কোনো মুসলমান কোনো জিম্মি বা অমুসলিমকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে, উসমান সেখানে কিসাসের পরিবর্তে কেবল ‘দিয়াতু মুগাল্লাযা’ বা বর্ধিত রক্তপণ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এই ব্যবস্থার ফলে অমুসলিমরা একটি চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নিপতিত হয়; কারণ তারা জানত যে একজন মুসলিম কর্তৃক আক্রান্ত বা নিহত হলে তারা আইনি সমতা পাবে না [7]। এর ফলে সমাজে একটি ‘শ্রেণিগত বিন্যাস’ তৈরি হয়, যেখানে মুসলিম শাসকগোষ্ঠী আইনি দায়মুক্তি (Legal Immunity) ভোগ করত এবং অমুসলিম প্রজারা বিচারহীনতার শিকার হতো। উসমানের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বিচার ব্যবস্থা ছিল মূলত একটি ‘মুসলিম-বান্ধব’ আইনি ফ্রেমওয়ার্ক, যেখানে অমুসলিমদের অবস্থান ছিল কেবল করদ প্রজা হিসেবে, সমমর্যাদার নাগরিক হিসেবে নয়।

যৌক্তিক দৃষ্টিতে এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘সোনালী যুগে’র যে মিথটি প্রচার করা হয়, তা মূলত একটি রাজনৈতিক নির্মান। ন্যায়বিচার যদি কেবল নিজ ধর্মাবলম্বীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রাণের মূল্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয়, তবে তাকে ‘ইনসাফ’ বলা একটি ঐতিহাসিক প্রতারণা। উসমানের আমলে এই আইনি বৈষম্য কেবল ব্যক্তিগত কোনো ভুল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমের বহিঃপ্রকাশ। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া এবং ফিকহে ওসমান-এর মতো আকর গ্রন্থগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, উসমান জেনেশুনেই অমুসলিমদের জীবনের বিনিময়ে মুসলিম খুনিদের সুরক্ষা দিয়েছিলেন। এই ধরণের শাসনতান্ত্রিক পক্ষপাতিত্বই প্রমাণ করে যে, খিলাফতে রাশেদার আমলটি ছিল মূলত একটি ধর্মীয় আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র, যেখানে ‘ন্যায়বিচার’ ছিল কেবল শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থরক্ষার একটি আবরণ।


রাজনৈতিক অস্থিরতা ও খিলাফতের নৈতিক অবক্ষয়: ‘সোনালী যুগে’র শেষের শুরু

খলিফা উসমানের শাসনামলের সূচনালগ্নে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমরকে প্রদত্ত দায়মুক্তি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আইনি ত্রুটি ছিল না, বরং এটি ছিল খিলাফতের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার প্রথম স্পষ্ট সংকেত। যখন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘আইনের শাসন’ (Rule of Law) ব্যক্তিগত প্রভাব এবং গোত্রীয় রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন সেই ব্যবস্থার পতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। উসমানের এই পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত মদিনার সচেতন নাগরিকদের মধ্যে, বিশেষ করে আলী ইবনে আবি তালিবের মতো সাহাবীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল, যারা মনে করতেন যে ন্যায়বিচার বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই খিলাফতের আদর্শ হতে পারে না। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তথাকথিত ‘সোনালী যুগ’ আসলে এক ধরণের ‘অলিগার্কি’ বা গোষ্ঠীশাসিত ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল, যেখানে কুরাইশ বংশীয় আভিজাত্য এবং খলিফার ব্যক্তিগত মর্জির কাছে সাধারণ মানুষের—বিশেষ করে অনারব ও অমুসলিমদের—প্রাণের মূল্য ছিল তুচ্ছ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উসমানের এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি পরবর্তীতে তার প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। তার শাসনামলে উমাইয়া বংশীয় আত্মীয়দের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করা এবং তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া ছিল উবাইদুল্লাহর মামলারই একটি সম্প্রসারিত রূপ। যখন একজন খুনিকে কেবল তার বংশমর্যাদার কারণে মাফ করে দেওয়া হয়, তখন তা রাষ্ট্রের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, আনুগত্য ও রক্তসম্পর্কই হচ্ছে আইনের চেয়ে বড় রক্ষা কবচ। এর ফলে বিজিত অঞ্চলের অনারব মুসলিম এবং অমুসলিমদের মধ্যে এক ধরণের বিজাতীয়করণ (Alienation) তৈরি হয়। তারা অনুভব করতে শুরু করে যে, এই খিলাফত আর ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের প্রতীক নয়, বরং এটি একটি আরবীয় সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো, যা কেবল নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করছে। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই পরবর্তীতে উসমানের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ এবং শেষ পর্যন্ত তার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

যৌক্তিক দৃষ্টিতে দেখলে, উসমানের শাসনামল ‘সোনালী যুগে’র কোনো আদর্শ উদাহরণ নয়, বরং তা ছিল একটি ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। যে শাসনব্যবস্থা একজন নিরপরাধ কিশোরীর রক্তকে ‘দিয়াত’ বা সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেয়, তাকে মহিমান্বিত করা ঐতিহাসিক জালিয়াতির শামিল। উসমানের এই নীতিগুলো প্রমাণ করে যে, খিলাফত তখন তার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে কেবল একটি জাগতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। উমরের প্রবর্তিত কঠোরতা এবং উসমানের শিথিলতা—উভয়ই শেষ পর্যন্ত একই মুদ্রার দুই পিঠ হিসেবে কাজ করেছে, যা সাধারণ প্রজা ও অমুসলিমদের প্রান্তিকীকরণ নিশ্চিত করেছিল। এই নৈতিক অবক্ষয়ই ছিল প্রথম ‘ফিতনা’ বা গৃহযুদ্ধের মূল কারণ, যা ইসলামী সাম্রাজ্যের ঐক্যের মিথকে চিরতরে চূর্ণ করে দেয়।


উপসংহার: মিথের ব্যবচ্ছেদ ও ইতিহাসের নির্মোহ সত্য

উসমানের খিলাফত এবং অমুসলিমদের প্রতি তার শাসনতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ‘সোনালী যুগ’ বা ‘স্বর্ণযুগ’ ধারণাটি মূলত পরবর্তীকালের ধর্মতাত্ত্বিকদের দ্বারা নির্মিত একটি রোমান্টিক মিথ। প্রকৃত ইতিহাসে উসমানের আমল ছিল স্বজনপ্রীতি, আইনি বৈষম্য এবং কাঠামোগত অবিচারের এক সংমিশ্রণ। উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর কর্তৃক একজন খ্রিস্টান নাগরিক এবং একজন নাবালিকা পারসিক কন্যাকে হত্যার পর খলিফার পক্ষ থেকে যে বিচারিক প্রহসন মঞ্চস্থ হয়েছিল, তা আধুনিক সভ্যতার যেকোনো মানবিক মানদণ্ডে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। ন্যায়বিচার যেখানে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় কিংবা তার বংশ পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয়, সেখানে মানবিক মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হতে বাধ্য।

ঐতিহাসিক সত্য কোনো ভাবাবেগের ধার ধারে না। উসমানের শাসনামলে অমুসলিম জিম্মিদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা এবং খুনিদের রাষ্ট্রীয় মদদে সুরক্ষা প্রদান প্রমাণ করে যে, তৎকালীন খিলাফত ছিল মূলত একটি ধর্মীয় আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র (Religious Hegemonic State), যেখানে ‘সমানাধিকার’ শব্দটি ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। উসমানের এই বিচারহীনতার উত্তরাধিকার পরবর্তীতে ইসলামী রাজতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যমূলক আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। সুতরাং, তথাকথিত সোনালী যুগের এই মিথ খণ্ডন করে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, উসমানের খিলাফত ছিল একটি সংকীর্ণ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষাকারী শাসনকাল, যা শোষিত ও নিপীড়িত অমুসলিমদের রক্তে রঞ্জিত ছিল এবং যার বিচারিক পদ্ধতি ছিল মূলত শোষকের হাতিয়ার।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ফিকহে ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, ড মুহাম্মদ রাওয়াস কালা’জী, ভাষান্তর ও সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ খলিলুল রহমান মুমিন, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১৫২, ১৫৩, ১৫৪ ↩︎
  2. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা ২৬৯ ↩︎
  3. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৯১৫ — কাফেরের বদলে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না ↩︎
  4. সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ২৬৫৮ — কাফেরের হত্যার দায়ে মুসলিমকে হত্যা না করার বিধান ↩︎
  5. সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৫৩০ — মুসলিম ও কাফিরের মধ্যে কিসাস ↩︎
  6. Islamweb Fatwa 92261 — Killing a Muslim in punishment for killing a non-Muslim ↩︎
  7. ইসলামী শরীয়তে কাফের হত্যা করলে মুসলিমের কোন মৃত্যুদণ্ড নেই ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Semi-Academic Historical and Legal Critique

Epistemic Position: Historical-Critical Analysis, Legal Criticism, and Secular Humanist Ethics

This article critically examines the caliphate of Uthman ibn Affan through the judicial treatment of Ubaydullah ibn Umar after the killings of al-Hurmuzan, Jufayna, and the young daughter of Abu Lu'lu'a. It evaluates the historical reports surrounding the case, the political considerations involved in Uthman's decision, and the broader claim that the Rashidun period represented a universally just and egalitarian “Golden Age.”

The analysis does not treat Uthman's decision as an isolated historical anomaly. It places the case within the wider Islamic legal doctrine of qisas, particularly the rule preserved in canonical hadith that a Muslim is not to be executed in retaliation for killing a non-Muslim. The article compares this doctrine with Uthman's reported judicial practice, including the separate case in which a Muslim intentionally killed a dhimmi and was not subjected to qisas.

Primary and classical Islamic materials are prioritized, including Sahih al-Bukhari, Sunan Ibn Majah, Sunan Abi Dawud, Musannaf Abd al-Razzaq, classical fiqh discussions, historical chronicles, and contemporary Islamic fatwa literature. Where the jurists disagreed, the disagreement is stated explicitly; in particular, the Hanafi position allowing qisas for the intentional killing of a dhimmi is distinguished from the majority position that rejected such equality in retaliation.

The article distinguishes between the wording of the sources, historical inference drawn from those sources, and the ethical judgment applied to the legal system they describe. Repetition of the same report across later compilations is not treated as independent corroboration, and technical hadith classifications are not treated as automatic proof or disproof of historical events.

The central ethical question is whether a legal order can plausibly be described as universally just when the religion or political status of the victim affects whether the killer may face equivalent punishment. The article therefore evaluates the Rashidun judicial system through evidentiary consistency, equality before the law, bodily security, and equal human worth rather than through later theological reverence for the caliphs.

This article should be evaluated through source quality, evidentiary strength, historical consistency, legal reasoning, and logical validity—not through theological sensitivity, devotional expectations, or demands for rhetorical protection of religious figures and institutions.

Leave a comment

Your email will not be published.