ভূমিকা
নবী মুহাম্মদের নামে বর্ণিত একটি বহুল পরিচিত বক্তব্য হলো, ‘যুদ্ধ হচ্ছে ধোঁকা’—আরবিতে الْحَرْبُ خَدْعَةٌ। সহীহ মুসলিম ও সহীহ বুখারীতে সংরক্ষিত এই বক্তব্যকে ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকারীরা যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার অনুমোদন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই অনুমোদনের পরিসর শুধু সেনাবাহিনীর অবস্থান বা অভিযানের গন্তব্য গোপন রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নববী সরাসরি মিথ্যা বলার বৈধতা স্বীকার করেছেন; ইবনে হাজর কা’ব ইবনে আশরাফ হত্যার ঘটনায় মুহাম্মদের দেওয়া অনুমতির মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের মিথ্যার অনুমতি অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফলে এখানে সামরিক দক্ষতার পাশাপাশি সত্যবাদিতা, ব্যক্তিগত আস্থা এবং হত্যার পদ্ধতি নিয়ে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন উপস্থিত হয়।
সৈন্যের অবস্থান গোপন করা, শত্রুর নজর এড়ানো কিংবা আত্মরক্ষার পরিকল্পনা প্রকাশ না করা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের আস্থা ব্যবহার করে কাউকে হত্যার জন্য কাছে টেনে আনা একই কাজ নয়। প্রথমটির ক্ষেত্রে তথ্য না দেওয়ার প্রশ্ন থাকে; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে ভুল বিশ্বাস সৃষ্টি করে সেই বিশ্বাসকে হত্যার উপকরণে পরিণত করা হয়। ধর্মীয় বিধান কোনো কাজকে অনুমোদন করলেই সেই কাজ নৈতিকভাবে ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। অনুমোদনের পেছনে যুক্তি কী, কাকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে এবং একই মানদণ্ড প্রতিপক্ষের জন্যও গ্রহণযোগ্য কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
সহীহ মুসলিম: যুদ্ধের মধ্যে শত্রুকে ধোঁকা দেওয়ার বৈধতা
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ ও আবু হুরাইরার সূত্রে সহীহ মুসলিমে একই বক্তব্য সংরক্ষিত আছে। বাংলা অনুবাদে একটিতে ‘কৌশল ও ছলনা’, অন্যটিতে ‘কুটকৌশল’ বলা হয়েছে। উভয় বর্ণনার আরবি বক্তব্য একই: الْحَرْبُ خَدْعَةٌ। [1]
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «الْحَرْبُ خَدْعَةٌ».
বাংলা অনুবাদ:
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছেদঃ ৫. যুদ্ধের মধ্যে শক্রকে ধোঁকা দেয়ার বৈধতা
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৪৩১, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৩৯
৪৪৩১-(১৭/১৭৩৯) আলী ইবনু হুজুর সাদী, আমর আন্ নাকিদ ও যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) ….. জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যুদ্ধ কৌশল ও ছলনারই নাম। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৩৮৯, ইসলামিক সেন্টার ৪৩৮৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
আবু হুরাইরার সূত্রে পরবর্তী বর্ণনাতেও একই আরবি বাক্য সংরক্ষিত হয়েছে: الْحَرْبُ خَدْعَةٌ। বাংলা অনুবাদে এখানে ‘কুটকৌশল’ বলা হলেও মূল আরবিতে আগের বর্ণনার মতোই খুদআ শব্দ রয়েছে। ফলে বাংলা অনুবাদের ‘কৌশল’ শব্দকে কেবল নিরপেক্ষ সামরিক পরিকল্পনা বা গোপনীয়তা অর্থে সীমিত করলে মূল শব্দের অর্থ এবং মুসলিমের অধ্যায়বিন্যাস—দুটিই সংকুচিত হয়ে যায়। নববী ও ইবনে হাজরের ব্যাখ্যায় এই খুদআ-র মধ্যে প্রতিপক্ষকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করা, পরোক্ষ কথা এবং নির্দিষ্ট অবস্থায় মিথ্যাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [2]
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «الْحَرْبُ خَدْعَةٌ».
বাংলা অনুবাদ:
সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৩৩। জিহাদ ও সফর
পরিচ্ছেদঃ ৫. যুদ্ধের মধ্যে শক্রকে ধোঁকা দেয়ার বৈধতা
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৪৪৩২, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১৭৪০
৪৪৩২-(১৮/১৭৪০) মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান ইবনু সাহম (রহঃ) ….. আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যুদ্ধ কুটকৌশলেরই নাম। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৩৯০, ইসলামিক সেন্টার ৪৩৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
মাওলানা উসমান গনীর বাংলা সহজ নসরুল বারী শরহে একই বর্ণনার একাধিক সনদ পাশাপাশি দেওয়ার পর ব্যাখ্যার ‘উদ্দেশ্য’ অংশে সিদ্ধান্তটি আরও সরাসরি ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে: “কাফেরদের সাথে লড়াই ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে ধোঁকা ও প্রতারণা জায়েয।” এখানে একই শরহ অনুবাদের জায়গায় ‘কৌশল’ শব্দ ব্যবহার করলেও ব্যাখ্যার জায়গায় তার অর্থকে ‘ধোঁকা ও প্রতারণা’ হিসেবে স্পষ্ট করেছে। ফলে الْحَرْبُ خَدْعَةٌ-কে শুধু সেনা মোতায়েন, অবস্থান গোপন বা সাধারণ কৌশলগত পরিকল্পনা বা স্ট্রাটিজিক কূটকৌশল হিসেবে সীমিত করা এই বাংলা শরহের নিজের ব্যাখ্যার সঙ্গেও মেলে না। [3]
২৮২৬. আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ. আবূ হুরায়রা রাযি. সূত্রে রাসূলুল্লাহর থেকে বর্ণিত, তিনি – বলেন, (পারস্য সম্রাট) কিসরা ধ্বংস হবে, তারপর আর কিসরা হবে না। আর (রোমক সম্রাট) কায়সার অবশ্যই ধ্বংস হবে, তারপর আর কায়সার হবে না। এবং এটাই নিশ্চিত যে, তাদের ধনভান্ডার আল্লাহর রাহে বন্টিত হবে। আর তিনি যুদ্ধকে কৌশল নামে আখ্যায়িত করেন।
সহজ তাহকীক ও তাশরীহ
শিরোনামের সাথে হাদীসের মিল: শিরোনামের সাথে হাদীসের মিল সুস্পষ্ট।
হাদীসের পুনরাবৃত্তি : হাদীসটি এখানে বুখারী শরীফঃ ৪২৫ পৃঃ সামনে ৪৪৪০, ৫১১, ৯৮১ পৃঃ।
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَصْرَمَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ . قَالَ سَمَّى النَّبِيُّ الْحَرْبَ خُدْعَةٌ ، قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ أَبُو بَكْرٍ هُوَ بُوْرِ بْنُ أَصْرَمَ .
সহজ তরজমা
২৮২৭. বকর ইবনে আসরাম রহ. ……. আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী যুদ্ধকে কৌশল নামোআখ্যায়িত করেছেন। আবু আব্দুল্লাহ রহ বলেন, আবু বকর হলেন বুর ইবনে আসরাম।
সহজ তাহকীক ও তাশরীহ
শিরোনামের সাথে হাদীসের মিল: শিরোনামের সাথে হাদীসের মিল এভাবে যে, এই হাদীসটি পূর্বোক্ত হাদীসের ভিন্ন একটি সনদ।
হাদীসের পুনরাবৃত্তি : হাদীসটি এখানে বুখারী শরীফ ৪ ৪২৫ পৃঃ।
حَدَّثَنَا صَدَقَةُ بْنُ الْفَضْلِ أَخْبَرَنَا ابْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ عَمْرٍو سَمِعَ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ الْحَرْبُ خُدْعَةٌ “.
সহজ তরজমা
২৮২৮. সাদাকা ইবনে ফাযল রহ. বলেছেন, ‘যুদ্ধ হল কৌশল।’ জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী
সহজ তাহকীক ও তাশরীহ
শিরোনামের সাথে হাদীসের মিল: শিরোনামের সাথে হাদীসের মিল সুস্পষ্ট।
হাদীসের পুনরাবৃত্তিঃ হাদীসটি এখানে বুখারী শরীফঃ ৪২৫ পৃঃ।
উদ্দেশ্যঃ কাফেরদের সাথে লড়াই ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে ধোকা ও প্রতারণা জায়েয।

নববীর ব্যাখ্যা: সরাসরি মিথ্যা বলাও বৈধ
নববী তাঁর আল-মিনহাজ শরহ সহীহ মুসলিম গ্রন্থে যুদ্ধে কাফেরদের ধোঁকা দেওয়ার বৈধতার বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য উল্লেখ করেছেন। চুক্তি বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভঙ্গ করাকে তিনি এই অনুমোদনের বাইরে রেখেছেন। সরাসরি মিথ্যার প্রশ্নে তিনি তাবারীর সীমিত ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে নিজের সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন: প্রকৃত মিথ্যা বলার অনুমতিই বক্তব্যের প্রকাশ্য অর্থ; পরোক্ষ কথায় সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম। অর্থাৎ পরোক্ষ কথা উত্তম হওয়া এবং সরাসরি মিথ্যা নিষিদ্ধ হওয়া তাঁর কাছে এক কথা নয়। [4]
وَاتَّفَقَ الْعُلَمَاءُ عَلَى جَوَازِ خِدَاعِ الْكُفَّارِ فِي الْحَرْبِ وَكَيْفَ أَمْكَنَ الْخِدَاعُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ فِيهِ نَقْضُ عَهْدٍ أَوْ أَمَانٍ فَلَا يَحِلُّ وَقَدْ صَحَّ فِي الْحَدِيثِ جَوَازُ الْكَذِبِ فِي ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ أَحَدُهَا فِي الْحَرْبِ قَالَ الطَّبَرِيُّ إِنَّمَا يَجُوزُ مِنَ الْكَذِبِ فِي الْحَرْبِ الْمَعَارِيضُ دُونَ حَقِيقَةِ الْكَذِبِ فَإِنَّهُ لَا يَحِلُّ هَذَا كَلَامُهُ وَالظَّاهِرُ إِبَاحَةُ حَقِيقَةِ نَفْسِ الْكَذِبِ لَكِنَّ الِاقْتِصَارَ عَلَى التعريض أفضل والله أعلم.
বাংলা অনুবাদ:
আলেমরা যুদ্ধে কাফেরদের ধোঁকা দেওয়ার বৈধতার বিষয়ে একমত হয়েছেন; যেভাবেই ধোঁকা দেওয়া সম্ভব হোক। তবে তাতে কোনো চুক্তি বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভঙ্গ করা হলে তা বৈধ নয়। হাদিসে তিনটি বিষয়ে মিথ্যা বলার অনুমতি প্রমাণিত হয়েছে; তার একটি হলো যুদ্ধ। তাবারী বলেছেন, যুদ্ধে মিথ্যা হিসেবে যা অনুমোদিত, তা কেবল পরোক্ষ বা দ্ব্যর্থবোধক কথা; প্রকৃত মিথ্যা নয়, কারণ তা বৈধ নয়। এটি তাঁর বক্তব্য। প্রকাশ্য অর্থ হলো, প্রকৃত মিথ্যা বলাও অনুমোদিত; তবে পরোক্ষ কথায় সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম। আল্লাহই ভালো জানেন।
নববীর ব্যাখ্যায় তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে পৃথক। প্রথমত, যুদ্ধে কাফেরদের ধোঁকা দেওয়ার বৈধতার বিষয়ে তিনি আলেমদের ঐকমত্য উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত, চুক্তি বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভঙ্গকে তিনি সেই অনুমতির সীমার বাইরে রেখেছেন। তৃতীয়ত, সরাসরি মিথ্যার প্রশ্নে তিনি তাবারীর সীমিত অবস্থান গ্রহণ করেননি; তাবারী যেখানে কেবল মাআরিদ বা দ্ব্যর্থবোধক কথাকে বৈধ বলেছেন, নববী সেখানে প্রকৃত মিথ্যা বলার অনুমোদনকেই হাদিসের প্রকাশ্য অর্থ বলেছেন। তাঁর ব্যবহৃত ‘পরোক্ষ কথায় সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম’ বক্তব্যটি সরাসরি মিথ্যাকে নিষিদ্ধ করে না; বরং বৈধ দুই পদ্ধতির মধ্যে একটিকে অধিকতর উত্তম হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে যুদ্ধে সরাসরি মিথ্যার বৈধতা নববীর ব্যাখ্যা থেকে অনুমান করে তৈরি করা কোনো আধুনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি তাঁর নিজের ঘোষিত ফিকহি ব্যাখ্যা।
ইবনে হাজর: ধোঁকা মানে বাইরে এক, ভেতরে অন্য
ইবনে হাজর আসকালানী ফাতহুল বারী গ্রন্থে ধোঁকার অর্থ বলেছেন, বাইরে একটি বিষয় প্রকাশ করা এবং ভেতরে তার বিপরীত গোপন রাখা। একই আলোচনায় তিনি হাদিসটি থেকে কাফেরদের ধোঁকা দিতে উৎসাহ দেওয়ার অর্থ গ্রহণ করেছেন। তাই ‘খুদআ’ শব্দকে শুধু নিরীহ ‘দক্ষতা’ বা ‘পরিকল্পনা’ হিসেবে উপস্থাপন করলে ব্যাখ্যাকারীর স্বীকৃত প্রতারণামূলক অর্থ বাদ পড়ে যায়। [5]
وأصل الخدع إظهار أمر وإضمار خلافه. وفيه التحريض على أخذ الحذر في الحرب، والندب إلى خداع الكفار، وأن من لم يتيقظ لذلك لم يأمن أن ينعكس الأمر عليه، قال النووي: واتفقوا على جواز خداع الكفار في الحرب كيفما أمكن، إلا أن يكون فيه نقض عهد أو أمان فلا يجوز، قال ابن العربي: الخداع في الحرب يقع بالتعريض وبالكمين ونحو ذلك.
বাংলা অনুবাদ:
ধোঁকার মূল অর্থ হলো একটি বিষয় প্রকাশ করা এবং তার বিপরীত গোপন রাখা। এতে যুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ এবং কাফেরদের ধোঁকা দেওয়ার উৎসাহ রয়েছে। যে ব্যক্তি এ বিষয়ে সতর্ক হবে না, তার বিরুদ্ধে পরিস্থিতি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। নববী বলেছেন, যুদ্ধে যেভাবেই সম্ভব কাফেরদের ধোঁকা দেওয়ার বৈধতা সম্পর্কে তাঁরা একমত হয়েছেন; তবে তাতে চুক্তি বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভঙ্গ হলে তা বৈধ নয়। ইবনুল আরাবী বলেছেন, যুদ্ধে ধোঁকা দেওয়া হয় পরোক্ষ কথা, অতর্কিত আক্রমণের জন্য ওত পেতে থাকা এবং এ ধরনের অন্যান্য পদ্ধতিতে।
তিরমিযী: যুদ্ধে মিথ্যা বলার স্পষ্ট অনুমতি
‘যুদ্ধ হচ্ছে ধোঁকা’ বক্তব্যের খুদআ শব্দের অর্থ নিয়ে অনুবাদগত অস্পষ্টতার সুযোগ থাকলেও আসমা বিনতে ইয়াযিদের সূত্রে তিরমিযীর এই বর্ণনায় সেই অস্পষ্টতা নেই। এখানে সরাসরি ব্যবহৃত শব্দ الْكَذِبُ—মিথ্যা। বর্ণনায় প্রথমে সাধারণ নীতি হিসেবে বলা হয়েছে, তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া মিথ্যা বৈধ নয়; তারপর সেই ব্যতিক্রমগুলোর একটি হিসেবে স্পষ্টভাবে “যুদ্ধে মিথ্যা” উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধের ক্ষেত্রে শুধু তথ্য গোপন, ছদ্মচাল বা দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্য নয়, ‘মিথ্যা’ শব্দটিই হাদিসের ভাষায় অনুমোদিত ব্যতিক্রমের তালিকায় এসেছে। তিরমিযী বর্ণনাটিকে ‘হাসান’ বলেছেন। [6]
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ، قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: «لاَ يَحِلُّ الْكَذِبُ إِلاَّ فِي ثَلاَثٍ يُحَدِّثُ الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ لِيُرْضِيَهَا وَالْكَذِبُ فِي الْحَرْبِ وَالْكَذِبُ لِيُصْلِحَ بَيْنَ النَّاسِ».
বাংলা অনুবাদ:
আসমা বিনতে ইয়াযিদ বলেন, আল্লাহর রসুল বলেছেন: তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া মিথ্যা বলা বৈধ নয়: কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য যে কথা বলে, যুদ্ধে মিথ্যা বলা এবং মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য মিথ্যা বলা।
সহীহ মুসলিম ২৬০৫ক-তেও একই তিন ক্ষেত্রের আলোচনা এসেছে, তবে বর্ণনার স্তর সেখানে ভিন্ন। মানুষের মধ্যে মীমাংসাকারীকে ‘মিথ্যাবাদী নয়’ বলার অংশটি মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে এসেছে; স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করা, যুদ্ধ এবং মানুষের মধ্যে মীমাংসা—এই তিন ক্ষেত্রের তালিকাটি ওই বর্ণনায় ইবনে শিহাব যুহরীর বক্তব্য। তিরমিযীর বর্ণনায় একই তালিকা সরাসরি মুহাম্মদের বক্তব্য হিসেবে সংরক্ষিত। এই পাঠগত পার্থক্য বজায় রেখেও হাদিস-ঐতিহ্যের ফলাফল একই দিকে যায়: যুদ্ধকে সাধারণ মিথ্যা-নিষেধের একটি অনুমোদিত ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তী নববী, ইবনে হাজর ও ইবনুল আরাবীর ব্যাখ্যাতেও এই ধারণাই ফিকহি নীতিতে রূপ নিয়েছে। [7]
কা’ব ইবনে আশরাফ হত্যা: ব্যক্তিগত আস্থা হত্যার উপকরণ
কা’ব ইবনে আশরাফ হত্যার বর্ণনায় ধোঁকার ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় রূপ নিয়েছে। মুহাম্মদ তাঁর হত্যার অনুমোদন দেন। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা কিছু বলার অনুমতি চান এবং তা পান। এরপর তিনি কা’বের কাছে মুহাম্মদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের ভান করেন, খাদ্য ধার চাওয়ার কথা বলেন এবং অস্ত্র বন্ধক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। রাতে কা’বের দুধভাই আবু নায়িলাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে ডাকা হয়। পরিচিত সম্পর্কের কারণে কা’ব তাঁদের বিশ্বাস করেন। মাথার সুগন্ধ শোঁকার অনুমতি নিয়ে তাঁকে শক্ত করে ধরে সহযোগীদের আঘাত করতে বলা হয়। এটি সৈন্যের অবস্থান লুকিয়ে রাখা নয়; ব্যক্তিগত আস্থা অর্জন করে একজন মানুষকে পরিকল্পিত হত্যার নাগালে আনার ঘটনা। [8]
جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ ـ رضى الله عنهما ـ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم «مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الأَشْرَفِ فَإِنَّهُ قَدْ آذَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ». فَقَامَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتُحِبُّ أَنْ أَقْتُلَهُ قَالَ «نَعَمْ». قَالَ فَأْذَنْ لِي أَنْ أَقُولَ شَيْئًا. قَالَ «قُلْ». فَأَتَاهُ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ فَقَالَ إِنَّ هَذَا الرَّجُلَ قَدْ سَأَلَنَا صَدَقَةً، وَإِنَّهُ قَدْ عَنَّانَا، وَإِنِّي قَدْ أَتَيْتُكَ أَسْتَسْلِفُكَ. قَالَ وَأَيْضًا وَاللَّهِ لَتَمَلُّنَّهُ قَالَ إِنَّا قَدِ اتَّبَعْنَاهُ فَلاَ نُحِبُّ أَنْ نَدَعَهُ حَتَّى نَنْظُرَ إِلَى أَىِّ شَىْءٍ يَصِيرُ شَأْنُهُ، وَقَدْ أَرَدْنَا أَنْ تُسْلِفَنَا وَسْقًا، أَوْ وَسْقَيْنِ ـ وَحَدَّثَنَا عَمْرٌو غَيْرَ مَرَّةٍ، فَلَمْ يَذْكُرْ وَسْقًا أَوْ وَسْقَيْنِ أَوْ فَقُلْتُ لَهُ فِيهِ وَسْقًا أَوْ وَسْقَيْنِ فَقَالَ أُرَى فِيهِ وَسْقًا أَوْ وَسْقَيْنِ ـ فَقَالَ نَعَمِ ارْهَنُونِي. قَالُوا أَىَّ شَىْءٍ تُرِيدُ قَالَ فَارْهَنُونِي نِسَاءَكُمْ. قَالُوا كَيْفَ نَرْهَنُكَ نِسَاءَنَا وَأَنْتَ أَجْمَلُ الْعَرَبِ قَالَ فَارْهَنُونِي أَبْنَاءَكُمْ. قَالُوا كَيْفَ نَرْهَنُكَ أَبْنَاءَنَا فَيُسَبُّ أَحَدُهُمْ، فَيُقَالُ رُهِنَ بِوَسْقٍ أَوْ وَسْقَيْنِ. هَذَا عَارٌ عَلَيْنَا، وَلَكِنَّا نَرْهَنُكَ اللأْمَةَ ـ قَالَ سُفْيَانُ يَعْنِي السِّلاَحَ ـ فَوَاعَدَهُ أَنْ يَأْتِيَهُ، فَجَاءَهُ لَيْلاً وَمَعَهُ أَبُو نَائِلَةَ وَهْوَ أَخُو كَعْبٍ مِنَ الرَّضَاعَةِ، فَدَعَاهُمْ إِلَى الْحِصْنِ، فَنَزَلَ إِلَيْهِمْ فَقَالَتْ لَهُ امْرَأَتُهُ أَيْنَ تَخْرُجُ هَذِهِ السَّاعَةَ فَقَالَ إِنَّمَا هُوَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ، وَأَخِي أَبُو نَائِلَةَ ـ وَقَالَ غَيْرُ عَمْرٍو قَالَتْ أَسْمَعُ صَوْتًا كَأَنَّهُ يَقْطُرُ مِنْهُ الدَّمُ. قَالَ إِنَّمَا هُوَ أَخِي مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ وَرَضِيعِي أَبُو نَائِلَةَ ـ إِنَّ الْكَرِيمَ لَوْ دُعِيَ إِلَى طَعْنَةٍ بِلَيْلٍ لأَجَابَ قَالَ وَيُدْخِلُ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ مَعَهُ رَجُلَيْنِ ـ قِيلَ لِسُفْيَانَ سَمَّاهُمْ عَمْرٌو قَالَ سَمَّى بَعْضَهُمْ قَالَ عَمْرٌو جَاءَ مَعَهُ بِرَجُلَيْنِ وَقَالَ غَيْرُ عَمْرٍو أَبُو عَبْسِ بْنُ جَبْرٍ، وَالْحَارِثُ بْنُ أَوْسٍ وَعَبَّادُ بْنُ بِشْرٍ قَالَ عَمْرٌو وَجَاءَ مَعَهُ بِرَجُلَيْنِ ـ فَقَالَ إِذَا مَا جَاءَ فَإِنِّي قَائِلٌ بِشَعَرِهِ فَأَشَمُّهُ، فَإِذَا رَأَيْتُمُونِي اسْتَمْكَنْتُ مِنْ رَأْسِهِ فَدُونَكُمْ فَاضْرِبُوهُ. وَقَالَ مَرَّةً ثُمَّ أُشِمُّكُمْ. فَنَزَلَ إِلَيْهِمْ مُتَوَشِّحًا وَهْوَ يَنْفَحُ مِنْهُ رِيحُ الطِّيبِ، فَقَالَ مَا رَأَيْتُ كَالْيَوْمِ رِيحًا ـ أَىْ أَطْيَبَ ـ وَقَالَ غَيْرُ عَمْرٍو قَالَ عِنْدِي أَعْطَرُ نِسَاءِ الْعَرَبِ وَأَكْمَلُ الْعَرَبِ قَالَ عَمْرٌو فَقَالَ أَتَأْذَنُ لِي أَنْ أَشَمَّ رَأْسَكَ قَالَ نَعَمْ، فَشَمَّهُ، ثُمَّ أَشَمَّ أَصْحَابَهُ ثُمَّ قَالَ أَتَأْذَنُ لِي قَالَ نَعَمْ. فَلَمَّا اسْتَمْكَنَ مِنْهُ قَالَ دُونَكُمْ. فَقَتَلُوهُ ثُمَّ أَتَوُا النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَأَخْبَرُوهُ.
বাংলা অনুবাদ:
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আল্লাহর রসুল বললেন, ‘কা’ব ইবনে আশরাফের ব্যবস্থা কে করবে? সে আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে কষ্ট দিয়েছে।’ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা উঠে বললেন, ‘আল্লাহর রসুল, আপনি কি চান আমি তাকে হত্যা করি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে কিছু বলার অনুমতি দিন।’ তিনি বললেন, ‘বলো।’
মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা কা’বের কাছে গিয়ে বললেন, ‘এই লোক আমাদের কাছে সদকা চেয়েছে এবং আমাদের কষ্টে ফেলেছে। আমি তোমার কাছে ধার চাইতে এসেছি।’ কা’ব বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, তোমরা তার ওপর বিরক্ত হয়ে পড়বে।’ তিনি বললেন, ‘আমরা যখন তার অনুসরণ করেছি, তখন তার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা না দেখা পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দিতে চাই না। আমরা চাই তুমি আমাদের এক বা দুই ওয়াসক ধার দাও।’ আমর আমাদের কাছে একাধিকবার বর্ণনা করেছেন; তখন এক বা দুই ওয়াসকের কথা উল্লেখ করেননি। অথবা আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এতে এক বা দুই ওয়াসকের কথা আছে কি না। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় এতে এক বা দুই ওয়াসকের কথা আছে।’
কা’ব বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার কাছে কিছু বন্ধক রাখো।’ তাঁরা বললেন, ‘তুমি কী চাও?’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের নারীদের আমার কাছে বন্ধক রাখো।’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা আমাদের নারীদের তোমার কাছে কীভাবে বন্ধক রাখি, যখন তুমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন?’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তোমাদের ছেলেদের বন্ধক রাখো।’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা আমাদের ছেলেদের কীভাবে বন্ধক রাখি? তাদের কাউকে গালি দিয়ে বলা হবে, তাকে এক বা দুই ওয়াসকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছিল। এটি আমাদের জন্য অপমান। আমরা বরং তোমার কাছে বর্ম-অস্ত্র বন্ধক রাখব।’ সুফিয়ান বলেন, এখানে অস্ত্র বোঝানো হয়েছে।
তিনি কা’বের কাছে আসার সময় ঠিক করলেন। রাতে তাঁর কাছে এলেন; সঙ্গে ছিলেন আবু নায়িলা, যিনি কা’বের দুধভাই। কা’ব তাঁদের দুর্গে ডাকলেন এবং তাঁদের কাছে নেমে এলেন। তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘এই সময়ে তুমি কোথায় বের হচ্ছ?’ তিনি বললেন, ‘এ তো মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা ও আমার ভাই আবু নায়িলা।’ আমর ছাড়া অন্য বর্ণনাকারীর বর্ণনায় স্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি এমন আওয়াজ শুনছি যেন তা থেকে রক্ত ঝরছে।’ তিনি বললেন, ‘এ তো আমার ভাই মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা ও আমার দুধভাই আবু নায়িলা। একজন উদার মানুষকে রাতে বর্শাঘাতের জন্যও ডাকা হলে সে সাড়া দেবে।’
মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা তাঁর সঙ্গে আরও দুইজনকে নিয়ে গেলেন। সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমর কি তাঁদের নাম বলেছেন? তিনি বললেন, ‘কয়েকজনের নাম বলেছেন।’ আমর বলেছেন, তিনি সঙ্গে দুইজনকে নিয়ে এসেছিলেন। আমর ছাড়া অন্য বর্ণনাকারী আবু আবস ইবনে জাবর, হারিস ইবনে আওস ও আব্বাদ ইবনে বিশরের নাম বলেছেন। আমর বলেছেন, তিনি তাঁর সঙ্গে দুইজনকে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বললেন, ‘সে এলে আমি তার চুল ধরে সুগন্ধ শুঁকব। তোমরা যখন দেখবে আমি তার মাথা শক্ত করে ধরেছি, তখন তোমরা তাকে আঘাত করবে।’ আরেকবার তিনি বলেছিলেন, ‘তারপর তোমাদেরও শুঁকতে দেব।’
কা’ব পোশাক জড়িয়ে তাঁদের কাছে নামলেন; তাঁর কাছ থেকে সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা বললেন, ‘আজকের মতো এত সুন্দর সুগন্ধ আমি দেখিনি।’ আমর ছাড়া অন্য বর্ণনাকারীর বর্ণনায় কা’ব বলেছিলেন, ‘আমার কাছে আরবের সবচেয়ে সুগন্ধি ব্যবহারকারী এবং সবচেয়ে পরিপূর্ণ নারীরা আছে।’ আমর বলেন, মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা বললেন, ‘তোমার মাথার সুগন্ধ শোঁকার অনুমতি দেবে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তিনি শুঁকলেন এবং তাঁর সঙ্গীদেরও শুঁকতে দিলেন। তারপর আবার বললেন, ‘আমাকে অনুমতি দেবে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ যখন তিনি তাঁকে শক্ত করে ধরে ফেললেন, তখন বললেন, ‘এবার তোমরা এগিয়ে যাও।’ তাঁরা তাঁকে হত্যা করলেন। তারপর নবীর কাছে এসে তাঁকে জানালেন।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৪/ মাগাযী (যুদ্ধ)
পরিচ্ছদঃ ৬৪/১৫. কা‘ব ইব্নু আশরাফ-এর হত্যা
(কা‘ব ইবনু আশরাফ বনী কুরায়যা গোত্রের একজন কবি ও নেতা ছিল যে বিভিন্ন সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নামে বিদ্রুপাত্মক কথা প্রচার করতো। এমনকি সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের স্ত্রী কন্যাদের সম্পর্কেও কুৎসিত অশালীন উদ্ভট কথা রচনা করতো। এসকল কর্মকাণ্ডে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে অবশেষে তৃতীয় হিজরী সনের রবীউল আওয়াল মাসে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুহামমাদ ইবনু মাসলামাহকে নির্দেশ দেন তাকে যেন হত্যা করা হয়। এবং সে আদেশ মতে তাকে হত্যা করা হয়।)
৪০৩৭. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কা‘ব ইবনু আশরাফের হত্যা করার জন্য কে প্রস্তুত আছ? কেননা সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) দাঁড়ালেন, এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হাঁ। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, তাহলে আমাকে কিছু প্রতারণাময় কথা বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ বল। এরপর মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) কা‘ব ইবনু আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ লোকটি (রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সদাকাহ চায় এবং সে আমাদেরকে বহু কষ্টে ফেলেছে। তাই আমি আপনার নিকট কিছু ঋণের জন্য এসেছি। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, আল্লাহর কসম পরে সে তোমাদেরকে আরো বিরক্ত করবে এবং আরো অতিষ্ঠ করে তুলবে। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমরা তাঁর অনুসরণ করছি। পরিণাম কী দাঁড়ায় তা না দেখে এখনই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করা ভাল মনে করছি না। এখন আমি আপনার কাছে এক ওসাক বা দুই ওসাক খাদ্য ধার চাই।
বর্ণনাকারী সুফ্ইয়ান বলেন, ‘আমর (রহ.) আমার নিকট হাদীসটি কয়েকবার বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথা উল্লেখ করেননি। আমি তাকে বললাম, এ হাদীসে তো এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথাটি বর্ণিত আছে, তিনি বললেন, মনে হয় হাদীসে এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথাটি বর্ণিত আছে। কা‘ব ইবনু আশরাফ বলল, ধার তো পাবে তবে কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, কী জিনিস আপনি বন্ধক চান। সে বলল, তোমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আপনি আরবের একজন সুশ্রী ব্যক্তি, আপনার নিকট কীভাবে, আমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখব? তখন সে বলল, তাহলে তোমাদের ছেলে সন্তানদেরকে বন্ধক রাখ। তিনি বললেন, আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে আপনার নিকট কী করে বন্ধক রাখি? তাদেরকে এ বলে সমালোচনা করা হবে যে, মাত্র এক ওসাক বা দুই ওসাকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছে। এটা তো আমাদের জন্য খুব লজ্জাজনক বিষয়। তবে আমরা আপনার নিকট অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি। রাবী সুফ্ইয়ান বলেন, লামা শব্দের মানে হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র। শেষে তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) তার কাছে আবার যাওয়ার ওয়াদা করে চলে আসলেন। এরপর তিনি কা’ব ইবনু আশরাফের দুধ ভাই আবূ নাইলাকে সঙ্গে করে রাতের বেলা তার নিকট গেলেন। কা’ব তাদেরকে দূর্গের মধ্যে ডেকে নিল এবং সে নিজে উপর তলা থেকে নিচে নেমে আসার জন্য প্রস্তুত হল। তখন তার স্ত্রী বলল, এ সময় তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, এই তো মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং আমার ভাই আবূ নাইলা এসেছে। ‘আমর ব্যতীত বর্ণনাকারীগণ বলেন যে, কা’বের স্ত্রী বলল, আমি তো এমনই একটি ডাক শুনতে পাচ্ছি যার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে বলে আমার মনে হচ্ছে। কা’ব ইবনু আশরাফ বলল, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ এবং দুধ ভাই আবূ নাইলা, (অপরিচিত কোন লোক তো নয়) ভদ্র মানুষকে রাতের বেলা বর্শা বিদ্ধ করার জন্য ডাকলে তার যাওয়া উচিত। (বর্ণনাকারী বলেন) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) সঙ্গে আরো দুই ব্যক্তিকে নিয়ে সেখানে গেলেন। সুফ্ইয়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ‘আমর কি তাদের দু’জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন? উত্তরে সুফ্ইয়ান বললেন, একজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। ‘আমর বর্ণনা করেন যে, তিনি আরো দু’জন মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, যখন সে (কা’ব ইবনু আশরাফ) আসবে। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামার সাথীদের সম্পর্কে) বলেছেন যে (তারা হলেন) আবূ আবস্ ইবনু জাব্র হারিস ইবনু আওস এবং আববাদ ইবনু বিশ্র। ‘আমর বলেছেন, তিনি অপর দুই লোককে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেন, যখন সে আসবে তখন আমি তার মাথার চুল ধরে শুঁকতে থাকব। যখন তোমরা আমাকে দেখবে যে, খুব শক্তভাবে আমি তার মাথা আঁকড়িয়ে ধরেছি, তখন তোমরা তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করবে। তিনি (মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ) একবার বলেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকেও শুঁকাব। সে (কা‘ব) চাদর নিয়ে নিচে নেমে আসলে তার শরীর থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আজকের মত এতো উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি। ‘আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ বর্ণনা করেছেন যে, কা‘ব বলল, আমার নিকট আরবের সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন সুগন্ধী ব্যবহারকারী মহিলা আছে। ‘আমর বলেন, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ (রাঃ) বললেন, আমাকে আপনার মাথা শুঁকতে অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হাঁ। এরপর তিনি তার মাথা শুঁকলেন এবং এরপর তার সাথীদেরকে শুঁকালেন। তারপর তিনি আবার বললেন, আমাকে আবার শুকবার অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হাঁ। এরপর তিনি তাকে কাবু করে ধরে সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা কর। তাঁরা তাকে হত্যা করলেন। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এ খবর দিলেন। (২৫১০; মুসলিম ৩২/৪৩, হাঃ ১৮০১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৭৩৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৭৩৯)
হাদিসটির আর্কাইভ লিংক
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বুখারী একই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ‘যুদ্ধে মিথ্যা বলা’—باب الكذب في الحرب—শিরোনামের অধ্যায়ে রেখেছেন। সেখানে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা কা’বের কাছে মুহাম্মদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে থাকেন এবং বর্ণনার ভাষায়, এভাবে কথা বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত কা’বের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করে তাঁকে হত্যা করেন। হত্যার অনুমোদন, প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন এবং প্রতারণার মাধ্যমে হত্যার সুযোগ সৃষ্টি—সবগুলো একই ঘটনার অংশ। [9]
এর অব্যবহিত পরের অধ্যায়েই বুখারী আবার একই কা’ব হত্যার ঘটনা এনেছেন। এবারের অধ্যায়ের শিরোনাম “শত্রুপক্ষের লোককে গোপনে হত্যা করা”—باب الْفَتْكِ بِأَهْلِ الْحَرْبِ। সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা মুহাম্মদের কাছে কা’বকে হত্যা করার অনুমতি নেওয়ার পর বলেন, “তাহলে আমাকে যা বলার বলতে অনুমতি দিন”; মুহাম্মদ সেই অনুমতি দেন। ফলে বুখারীর ধারাবাহিক অধ্যায়বিন্যাসে কা’ব হত্যার ঘটনাটি একদিকে যুদ্ধে মিথ্যার, অন্যদিকে শত্রুকে গোপনে হত্যার নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে এসেছে। [10]
عَنْ جَابِرٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ «مَنْ لِكَعْبِ بْنِ الأَشْرَفِ». فَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ أَتُحِبُّ أَنْ أَقْتُلَهُ قَالَ «نَعَمْ». قَالَ فَأْذَنْ لِي فَأَقُولَ. قَالَ «قَدْ فَعَلْتُ».
বাংলা অনুবাদ:
জাবির থেকে বর্ণিত, নবী বললেন, ‘কা’ব ইবনে আশরাফের ব্যবস্থা কে করবে?’ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা বললেন, ‘আপনি কি চান আমি তাকে হত্যা করি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে যা বলার বলতে অনুমতি দিন।’ তিনি বললেন, ‘আমি অনুমতি দিলাম।’
এই গুপ্ত হত্যা সম্পর্কে সহজ নসরুল বারীতে কী লেখা রয়েছে তা দেখে নিই, [11]

আবু দাউদ ও আওনুল মা’বুদ: শত্রুকে অসতর্ক রেখে বাহ্যিকভাবে তার অনুরূপ হওয়া
আবু দাউদ কা’ব ইবনে আশরাফ হত্যার ঘটনাটি “শত্রুকে অসতর্ক অবস্থায় আক্রমণ এবং তাদের অনুরূপ হওয়া”—باب في العدو يؤتى على غرة ويتشبه بهم—শিরোনামের অধ্যায়ে সংরক্ষণ করেছেন। অধ্যায়ের দুটি অংশই কা’ব হত্যার পদ্ধতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত: লক্ষ্যবস্তুকে প্রকৃত হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অসতর্ক রাখা এবং হত্যাকারীদের বাহ্যিক আচরণ এমনভাবে সাজানো যাতে তারা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না হয়। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা হত্যার অনুমতি নেওয়ার পর ‘কিছু বলার’ অনুমতি চান; এরপর মুহাম্মদের প্রতি অসন্তোষের ভান, ধার চাওয়া, বন্ধকের আলোচনা এবং পরিচিত সম্পর্ক ব্যবহার করে কা’বের আস্থা অর্জন করেন। [12]
শামসুল হক আযীমাবাদী আওনুল মা’বুদ-এ “অসতর্ক অবস্থায়” কথাটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, শত্রু হত্যার সিদ্ধান্ত ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকবে। আর “তাদের অনুরূপ হওয়া” বলতে তিনি শুধু পোশাক বা বাহ্যিক চেহারা বোঝাননি; তাঁর ব্যাখ্যায় শত্রুর বাহ্যিক রূপ, আচরণ ও রীতির অনুকরণ এবং তাওরিয়াযুক্ত বক্তব্যও এর অন্তর্ভুক্ত। তিনি মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার “এই ব্যক্তি আমাদের কাছে সদকা চেয়েছে এবং আমাদের কষ্টে ফেলেছে” কথাটিকেই এর উদাহরণ হিসেবে এনেছেন এবং বলেছেন, এ ধরনের কথা ওই বিশেষ পরিস্থিতির বাইরে শরিয়তে বৈধ নয়। [13]
وَيَتَشَبَّهُ أَيِ الْمُسْلِمُ الدَّاخِلُ عَلَى الْعَدُوِّ بِهِمْ أَيْ بِالْأَعْدَاءِ فِي ظَاهِرِ الْحَالِ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ فَيَتَشَبَّهُ بِهَيْئَتِهِمْ وَآدَابِهِمْ وَأَخْلَاقِهِمْ وَالتَّلَفُّظِ بِالْكَلِمَاتِ الَّتِي فِيهَا تَوْرِيَةٌ.
বাংলা অনুবাদ:
‘তাদের অনুরূপ হবে’—অর্থাৎ শত্রুর কাছে প্রবেশকারী মুসলিম বাহ্যিক অবস্থায় শত্রুদের অনুরূপ হবে, অথচ তার অন্তর ঈমানে স্থির থাকবে; তাদের বাহ্যিক রূপ, আচরণ ও রীতির অনুরূপ হবে এবং এমন কথাও উচ্চারণ করবে যার মধ্যে তাওরিয়া বা দ্ব্যর্থবোধক অর্থ রয়েছে।
‘তাওরিয়া’ বললে প্রতারণার উদ্দেশ্য বদলে যায় না
ইবনে হাজর কা’বকে বলা কথাগুলোকে সরাসরি মিথ্যার পরিবর্তে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘আমাদের কষ্টে ফেলেছে’ কথাটির ভেতরে ধর্মীয় আদেশ-নিষেধের দায়িত্ব বোঝানো এবং বাইরে অসন্তোষের ধারণা তৈরি করা—এই ধরনের ব্যাখ্যায় বক্তার গোপন অর্থকে সত্য হিসেবে ধরা হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, মুহাম্মদের দেওয়া অনুমতির মধ্যে সরাসরি ও পরোক্ষ উভয় মিথ্যাই অন্তর্ভুক্ত। তাঁর বক্তব্যের দুটি অংশই গুরুত্বপূর্ণ: তিনি নির্দিষ্ট কথাগুলোকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলেছেন, কিন্তু অনুমতিকে শুধু ইঙ্গিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেননি। [14]
والذي يظهر أنه لم يقع منهم فيما قالوه بشيء من الكذب أصلا، وجميع ما صدر منهم تلويح كما سبق، لكن ترجم بذلك لقول محمد بن مسلمة للنبي صلى الله عليه وسلم أولا «ائذن لي أن أقول، قال قل» فإنه يدخل فيه الإذن في الكذب تصريحا وتلويحا.
বাংলা অনুবাদ:
প্রকাশ্যত বোঝা যায়, তাঁরা যা বলেছেন তাতে আদৌ কোনো মিথ্যা ঘটেনি; তাঁদের সব বক্তব্যই পূর্বে উল্লিখিত ইঙ্গিতপূর্ণ কথা। কিন্তু তিনি এই শিরোনাম দিয়েছেন, কারণ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা প্রথমে নবীকে বলেছিলেন, ‘আমাকে কিছু বলার অনুমতি দিন’, আর তিনি বলেছিলেন, ‘বলো’। এর মধ্যে সরাসরি এবং ইঙ্গিতের মাধ্যমে মিথ্যা বলার অনুমতি অন্তর্ভুক্ত হয়।
তাওরিয়া বা দ্ব্যর্থবোধক কথার ক্ষেত্রে বক্তা মনে মনে একটি অর্থ রাখেন এবং শ্রোতাকে অন্য অর্থ বুঝতে দেন। কা’বকে হত্যার ঘটনায় সেই ভুল বোঝাবুঝি আকস্মিক ছিল না; তাঁকে হত্যার কাছে আনার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বক্তার গোপন অর্থকে সত্য ধরে নিলেও শ্রোতার মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বিশ্বাস সৃষ্টি করার কাজটি প্রতারণাই থাকে। ‘আমি শব্দের একটি সম্ভাব্য সত্য অর্থ বোঝাতে চেয়েছিলাম’ বললে অন্য মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য কিংবা সেই বিভ্রান্তি ব্যবহার করে হত্যার নৈতিক দায় মুছে যায় না। কা’বের দুধভাইকে সঙ্গে নেওয়া, খাদ্য ধার ও অস্ত্র বন্ধকের কথায় যোগাযোগ তৈরি করা এবং মাথার সুগন্ধ শোঁকার অনুমতি নিয়ে তাঁকে আটকে ফেলা—এসব মিলিয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে হত্যার সুযোগে রূপান্তর করা হয়েছে।
হাজ্জাজ ইবনে ইলাত: সম্পদ উদ্ধার করতে মিথ্যা সংবাদ
ইবনে হাজর সরাসরি মিথ্যার অনুমোদনের পক্ষে হাজ্জাজ ইবনে ইলাতের ঘটনাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর আলোচনায় হাজ্জাজ নিজের সম্পদ উদ্ধার করার জন্য মুহাম্মদের বিষয়ে ইচ্ছামতো কথা বলার অনুমতি নেন এবং মক্কাবাসীকে জানান যে খাইবারের লোকেরা মুসলিমদের পরাজিত করেছে। ইবনে হাজর নিজেই পরবর্তী আলোচনায় বলেছেন, ঘটনাটি যুদ্ধ চলার অবস্থায় ঘটেনি। ফলে তাঁর ব্যবহৃত উদাহরণে মিথ্যার অনুমোদনের প্রয়োগ সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও পৌঁছেছে। [15]
ويقويه ما أخرجه أحمد وابن حبان من حديث أنس في قصة الحجاج ابن علاط الذي أخرجه النسائي وصححه الحاكم في استئذانه النبي صلى الله عليه وسلم أن يقول عنه ما شاء لمصلحته في استخلاص ماله من أهل مكة وأذن له النبي صلى الله عليه وسلم، وإخباره لأهل مكة أن أهل خيبر هزموا المسلمين وغير ذلك مما هو مشهور فيه.
বাংলা অনুবাদ:
এটিকে শক্তিশালী করে আনাসের হাদিসে হাজ্জাজ ইবনে ইলাতের যে ঘটনা আহমদ ও ইবনে হিব্বান বর্ণনা করেছেন; নাসাঈও তা বর্ণনা করেছেন এবং হাকিম সহীহ বলেছেন। এতে মক্কাবাসীর কাছ থেকে নিজের সম্পদ উদ্ধার করার স্বার্থে নবীর সম্পর্কে যা ইচ্ছা বলার অনুমতি চাওয়ার কথা রয়েছে। নবী তাঁকে অনুমতি দেন। তিনি মক্কাবাসীকে জানান যে খাইবারের লোকেরা মুসলিমদের পরাজিত করেছে; এ ছাড়া ঘটনাটিতে আরও কিছু পরিচিত বিবরণ রয়েছে।
হাজ্জাজের ঘটনায় মিথ্যার প্রকৃতি শুধু তথ্য গোপন নয়; খাইবারের প্রকৃত সামরিক ফলাফলের ঠিক বিপরীত সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় থাকা নিজের সম্পদ নিরাপদে উদ্ধার করা। ইবনুল কাইয়িম যাদুল মাআদ-এ ঘটনাটি থেকে একটি সাধারণ ফিকহি নীতি নিষ্কাশন করেছেন: অন্যের ক্ষতি না হলে নিজের অধিকার উদ্ধার করার জন্য নিজের বা অন্যের বিষয়ে মিথ্যা বলা বৈধ। তিনি এই নীতির উদাহরণ হিসেবেই হাজ্জাজ ইবনে ইলাতের মিথ্যাকে উল্লেখ করেন। এরপর মক্কার মুসলিমরা ওই মিথ্যা সংবাদ শুনে যে দুঃখ ও কষ্ট পেয়েছিলেন, সেটিকেও পরবর্তীতে অর্জিত বৃহত্তর স্বার্থ, আনন্দ এবং ঈমান বৃদ্ধির তুলনায় ক্ষুদ্র মাফসাদা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। [16]
وَمِنْهَا جَوَازُ كَذِبِ الْإِنْسَانِ عَلَى نَفْسِهِ وَعَلَى غَيْرِهِ إِذَا لَمْ يَتَضَمَّنْ ضَرَرَ ذَلِكَ الْغَيْرِ إِذَا كَانَ يَتَوَصَّلُ بِالْكَذِبِ إِلَى حَقِّهِ كَمَا كَذَبَ الْحَجَّاجُ بْنُ عِلَاطٍ.
বাংলা অনুবাদ:
এর থেকে আরেকটি বিধান হলো: অন্য ব্যক্তির ক্ষতি না হলে এবং মিথ্যার মাধ্যমে নিজের অধিকার উদ্ধার করা সম্ভব হলে নিজের ও অন্যের বিষয়ে মিথ্যা বলা বৈধ—যেমন হাজ্জাজ ইবনে ইলাত মিথ্যা বলেছিলেন।
এখানে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে পরবর্তী ফিকহি সাধারণীকরণ ঘটেছে। হাজ্জাজের মিথ্যা কার্যকর ছিল—এটি কার্যকারিতার প্রশ্ন; ইবনুল কাইয়িম সেই মিথ্যাকে নির্দিষ্ট শর্তে বৈধতার নজির করেছেন—এটি শরিয়তি মূল্যায়ন। কিন্তু কার্যকারিতা ও শরিয়তি বৈধতা থেকে নৈতিক ন্যায়সংগততা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মিথ্যার ফলে নিরপরাধ মুসলিমদেরও সাময়িক মানসিক কষ্ট হয়েছিল; ইবনুল কাইয়িম সেই ক্ষতিকে বাতিল করেননি, বরং বৃহত্তর স্বার্থের তুলনায় ক্ষুদ্র বলে মূল্যায়ন করেছেন। ফলে এখানে নৈতিক কাঠামোটি সত্য বলার অপরিবর্তনীয় বাধ্যবাধকতার ওপর নয়, বরং উদ্দেশ্য, স্বার্থ ও ক্ষতির তুলনামূলক হিসাবের ওপর দাঁড়িয়েছে।
তাকিয়া: কোরআনে বিশ্বাস গোপন ও বিপরীত আচরণ প্রকাশের ভিত্তি
তাকিয়া ইসলামের একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা; সুন্নি তাফসির ও ফিকহেও এর স্বীকৃতি রয়েছে। এর কেন্দ্রে আছে অন্তরের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখে বিপদ এড়াতে সেই বিশ্বাস গোপন করা অথবা বাইরে তার বিপরীত প্রকাশ করা। কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতে মুমিনদের বদলে কাফেরদের অভিভাবক বা মিত্র হিসেবে গ্রহণের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে ‘তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য’ একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। ধ্রুপদী তাফসিরে এই ব্যতিক্রমকে তাকিয়ার ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [17]
لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ.
বাংলা অনুবাদ:
মুমিনরা যেন মুমিনদের পরিবর্তে কাফেরদের অভিভাবক বা মিত্র হিসেবে গ্রহণ না করে। যে তা করবে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না; তবে তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করলে তা ব্যতিক্রম। আল্লাহ তোমাদের নিজের সম্পর্কে সতর্ক করছেন। আর আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তন।
সূরা নাহলের ১০৬ নম্বর আয়াতে জবরদস্তির শিকার ব্যক্তির জন্য অন্তরের বিশ্বাস ও বাহ্যিক প্রকাশের পার্থক্য আরও স্পষ্ট। বাইরে কুফর প্রকাশ করা হলেও অন্তর ঈমানে স্থির থাকলে তাকে স্বেচ্ছায় কুফর গ্রহণকারীর একই অবস্থায় রাখা হয়নি। [18]
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ.
বাংলা অনুবাদ:
ঈমান আনার পর যে আল্লাহকে অস্বীকার করে—তবে যে বাধ্য হয়েছে অথচ তার অন্তর ঈমানে স্থির রয়েছে, সে ব্যতিক্রম—কিন্তু যারা কুফরের জন্য নিজেদের অন্তর উন্মুক্ত করেছে, তাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।
তাবারী: জিহ্বায় বাহ্যিক মিত্রতা, অন্তরে বিপরীত অবস্থান
তাবারীর ব্যাখ্যায় আলে ইমরান ৩:২৮-এর ব্যতিক্রমটি কোনো সাধারণ সামাজিক সৌজন্যের কথা নয়। প্রথমে তিনি কাফেরদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা ব্যাখ্যা করেন; তারপর “তবে তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য” অংশের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি উল্লেখ করেন—যখন মুমিনরা তাদের কর্তৃত্বের অধীনে থাকে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় করে। সেই পরিস্থিতিতে জিহ্বায় বাহ্যিক মিত্রতা প্রকাশ করা যায়, অথচ অন্তরে বিপরীত অবস্থান রাখা যায়। একই ব্যাখ্যার ধারায় ইবনে আব্বাসের সূত্রেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে বাহ্যিক সৌহার্দ্য প্রদর্শন এবং ধর্মীয় অবস্থানে তাদের বিরোধিতা বজায় রাখার কথা এসেছে। [19]
إِلَّا أَنْ تَكُونُوا فِي سُلْطَانِهِمْ فَتَخَافُوهُمْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ، فَتُظْهِرُوا لَهُمُ الْوِلَايَةَ بِأَلْسِنَتِكُمْ، وَتُضْمِرُوا لَهُمُ الْعَدَاوَةَ.
বাংলা অনুবাদ:
তবে যখন তোমরা তাদের কর্তৃত্বের অধীনে থাকবে এবং নিজেদের ব্যাপারে তাদের ভয় করবে, তখন জিহ্বায় তাদের প্রতি মিত্রতা প্রকাশ করবে এবং অন্তরে তাদের প্রতি শত্রুতা গোপন রাখবে।
ইবনে কাসীর ও ইবনুল কাইয়িম: সুন্নি উৎসে তাকিয়ার স্বীকৃতি
ইবনে কাসীর আলে ইমরান ৩:২৮-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, শত্রুর ক্ষতির ভয় থাকলে মানুষ বাইরে এমন আচরণ করতে পারে যা তার অন্তরের বিশ্বাস ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে এক নয়। তিনি আবু দারদার মুখে হাসি ও অন্তরে অভিশাপের বক্তব্য, ইবনে আব্বাসের জিহ্বার মাধ্যমে তাকিয়ার ব্যাখ্যা এবং হাসান বসরীর ‘কিয়ামত পর্যন্ত তাকিয়া’ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। এখানে ‘তাকিয়া’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে; ধারণাটি পরবর্তী কোনো বহিরাগত অভিযোগের ওপর নির্ভর করছে না। [20]
وقوله: (إلا أن تتقوا منهم تقاة) أي: إلا من خاف في بعض البلدان أو الأوقات من شرهم، فله أن يتقيهم بظاهره لا بباطنه ونيته، كما حكاه البخاري عن أبي الدرداء أنه قال: «إنا لنكشر في وجوه أقوام وقلوبنا تلعنهم». وقال الثوري: قال ابن عباس، رضي الله عنهما: ليس التقية بالعمل إنما التقية باللسان، وكذا رواه العوفي عن ابن عباس: إنما التقية باللسان، وكذا قال أبو العالية، وأبو الشعثاء والضحاك، والربيع بن أنس. ويؤيد ما قالوه قول الله تعالى: (من كفر بالله من بعد إيمانه إلا من أكره وقلبه مطمئن بالإيمان ولكن من شرح بالكفر صدرا فعليهم غضب من الله ولهم عذاب عظيم) [النحل: 106]. وقال البخاري: قال الحسن: التقية إلى يوم القيامة.
বাংলা অনুবাদ:
তাঁর বক্তব্য ‘তবে তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করলে’—এর অর্থ হলো, কোনো দেশ বা সময়ে তাদের ক্ষতির ভয় থাকলে ব্যক্তি বাইরে তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য আচরণ করতে পারে; অন্তরের বিশ্বাস ও উদ্দেশ্যে নয়। বুখারী আবু দারদা থেকে উদ্ধৃত করেছেন, তিনি বলেছেন: ‘আমরা কিছু লোকের মুখের সামনে হাসি, অথচ আমাদের অন্তর তাদের অভিশাপ দেয়।’ সাওরী বলেছেন, ইবনে আব্বাস বলেছেন: তাকিয়া কাজের মাধ্যমে নয়; তাকিয়া কেবল জিহ্বার মাধ্যমে। আওফীও ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: তাকিয়া কেবল জিহ্বার মাধ্যমে। আবুল আলিয়া, আবুশ শাসা, দাহহাক ও রাবি ইবনে আনাসও একই কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্যের সমর্থন করে আল্লাহর বাণী: ‘ঈমান আনার পর যে আল্লাহকে অস্বীকার করে—তবে যে বাধ্য হয়েছে অথচ তার অন্তর ঈমানে স্থির রয়েছে, সে ব্যতিক্রম—কিন্তু যারা কুফরের জন্য নিজেদের অন্তর উন্মুক্ত করেছে, তাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’ [নাহল: ১০৬] বুখারী বলেছেন, হাসান বলেছেন: ‘তাকিয়া কিয়ামতের দিন পর্যন্ত।’
ইবনুল কাইয়িম আহকামু আহলিয যিম্মা-তে তাকিয়ার সংজ্ঞাটি একটি নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বিতর্কের মধ্যে দিয়েছেন। মানুষের আদিম অঙ্গীকারকে কেউ ‘তাকিয়ার কারণে দেওয়া স্বীকারোক্তি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে—এই ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। প্রত্যাখ্যানের যুক্তি দিতে গিয়েই তাকিয়ার অর্থ নির্দিষ্ট করেন: ব্যক্তি বাস্তবে যা বিশ্বাস করে তার বিপরীত কথা বলে এমন ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করবে, যা সত্য অবস্থান প্রকাশ করলে তার ওপর আসত। অর্থাৎ ইবনুল কাইয়িমের সংজ্ঞায় তাকিয়ার প্রধান উপাদান দুটি—অন্তরের বিশ্বাস ও বাহ্যিক বক্তব্যের সচেতন অমিল এবং সেই অমিলের পেছনে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানোর উদ্দেশ্য। [21]
وَكَذَلِكَ قَوْلُهُمْ إِنَّهُمْ أَقَرُّوا عَلَى وَجْهِ التَّقِيَّةِ كَلَامٌ بَاطِلٌ قَطْعًا، فَإِنَّ التَّقِيَّةَ أَنْ يَقُولَ الْعَبْدُ خِلَافَ مَا يَعْتَقِدُهُ لِاتِّقَاءِ مَكْرُوهٍ يَقَعُ بِهِ.
বাংলা অনুবাদ:
তাদের এই দাবি যে তারা তাকিয়ার কারণে স্বীকার করেছিল—এটি নিশ্চিতভাবে বাতিল। কারণ তাকিয়া হলো ব্যক্তি নিজের বিশ্বাসের বিপরীত কথা বলবে এমন ক্ষতি এড়াতে, যা তার ওপর এসে পড়ত।
হানাফি ফকিহ শামসুল আইম্মা সারাখসি আল-মাবসুত-এর কিতাবুল ইকরাহ-এ তাকিয়াকে জবরদস্তির বিধানের অংশ হিসেবে আলোচনা করেছেন। তিনি প্রথমে এমন মতের কথা উল্লেখ করেন যেখানে বাহ্যিকভাবে অন্তরের বিপরীত প্রকাশকে ‘নিফাক’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল; এরপর সেই অবস্থান সরাসরি নাকচ করে তাকিয়াকে বৈধ বলেছেন এবং আলে ইমরান ৩:২৮-কে তার দলিল হিসেবে এনেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় জবরদস্তির অবস্থায় অন্তরে ঈমান অক্ষুণ্ণ রেখে মুখে শিরকের কথাও উচ্চারণ করা তাকিয়ার অন্তর্ভুক্ত। একই আলোচনায় তিনি একটি সীমাও উল্লেখ করেন: নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার ক্ষেত্রে নিজের জীবন রক্ষার জন্য তাকিয়া ব্যবহার করা বৈধ নয়। [22]
وَالصَّحِيحُ أَنَّ ذَلِكَ جَائِزٌ لِقَوْلِهِ تَعَالَى إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً، وَالتَّقِيَّةُ أَنْ يَقِيَ نَفْسَهُ مِنَ الْعُقُوبَةِ بِمَا يُظْهِرُهُ، وَإِنْ كَانَ يُضْمِرُ خِلَافَهُ.
বাংলা অনুবাদ:
সঠিক মত হলো, এটি বৈধ—আল্লাহর বাণী ‘তবে তাদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করলে’ এর দলিল। তাকিয়া হলো ব্যক্তি বাইরে যা প্রকাশ করে তার মাধ্যমে নিজেকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে, যদিও অন্তরে তার বিপরীত অবস্থান রাখে।
সুন্নি তাফসির ও ফিকহে তাকিয়া শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত: ভয়, জবরদস্তি বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কায় ব্যক্তি অন্তরের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখে বাইরে বিপরীত বক্তব্য বা আচরণ প্রকাশ করতে পারে। তাবারীর ব্যাখ্যায় শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে জিহ্বায় বাহ্যিক মিত্রতা এবং অন্তরে বিরোধিতা, ইবনে কাসীরের আলোচনায় বাইরে একরকম আচরণ ও অন্তরে ভিন্ন অবস্থান, ইবনুল কাইয়িমের সংজ্ঞায় নিজের বিশ্বাসের বিপরীত কথা এবং সারাখসির ফিকহে জবরদস্তির মুখে কুফরের বাক্য উচ্চারণ—সবগুলো একই মৌলিক কাঠামোর বিভিন্ন প্রয়োগ। আত্মরক্ষার জন্য বিশ্বাস গোপন করা এবং প্রতিপক্ষকে হত্যার নাগালে আনার জন্য প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করা নৈতিকভাবে পৃথক পরিস্থিতি; কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই বাহ্যিক প্রকাশকে প্রকৃত বিশ্বাস বা উদ্দেশ্য থেকে সচেতনভাবে পৃথক করার অনুমোদন রয়েছে।
শিয়া ইমামিয়া ইসলামে তাকিয়া: ধর্মীয় পরিচয় গোপন, প্রয়োজন ও সীমা
দ্বাদশী শিয়া হাদিস-ঐতিহ্যে তাকিয়া আরও সুসংগঠিত ও পুনরাবৃত্ত একটি বিষয়। কুলাইনীর আল-কাফি-র কিতাবুল ঈমান ওয়াল কুফর-এ “বাবুত তাকিয়া” নামে স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে। সেই অধ্যায়ের একটি বর্ণনার তাৎক্ষণিক প্রসঙ্গ ছিল শাসকদের সম্মানে দাঁড়ানো। মুয়াম্মার ইবনে খাল্লাদ আবুল হাসানকে শাসকদের জন্য দাঁড়ানোর বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি আবু জাফরের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন: “তাকিয়া আমার ধর্ম এবং আমার পূর্বপুরুষদের ধর্ম; যার তাকিয়া নেই তার ঈমান নেই।” অর্থাৎ বক্তব্যটি কোনো বিচ্ছিন্ন slogan হিসেবে নয়, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সামনে বাহ্যিক আচরণ কী হবে—সেই বাস্তব প্রশ্নের উত্তরে এসেছে। [23]
سَأَلْتُ أَبَا الْحَسَنِ عَنِ الْقِيَامِ لِلْوُلاةِ فَقَالَ قَالَ أَبُو جَعْفَرٍ التَّقِيَّةُ مِنْ دِينِي وَدِينِ آبَائِي وَلا إِيمَانَ لِمَنْ لا تَقِيَّةَ لَهُ.
বাংলা অনুবাদ:
আমি আবুল হাসানকে শাসকদের জন্য দাঁড়ানোর বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আবু জাফর বলেছেন: “তাকিয়া আমার ধর্ম এবং আমার পূর্বপুরুষদের ধর্ম; যার তাকিয়া নেই তার ঈমান নেই।”
আল-কাফি-র একই অধ্যায়ে তাকিয়ার প্রয়োগকে প্রয়োজন ও জবরদস্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আবু জাফরের নামে একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, “প্রত্যেক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তাকিয়া রয়েছে এবং যার ওপর পরিস্থিতিটি আসে সে নিজেই তা সবচেয়ে ভালো জানে।” আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, মানুষ যে বিষয়ে বাধ্য হয় সেই বিষয়ে তাকিয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তার জন্য ছাড় দিয়েছেন। ফলে শিয়া হাদিস-ঐতিহ্যে তাকিয়ার শক্ত ভাষা থাকলেও এর প্রয়োগকে নিছক ইচ্ছামতো সত্য গোপনের সাধারণ লাইসেন্স হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি; প্রয়োজন, ভয় ও বাধ্যতার ধারণা এর ফিকহি কাঠামোর অংশ। [24]
التَّقِيَّةُ فِي كُلِّ ضَرُورَةٍ وَصَاحِبُهَا أَعْلَمُ بِهَا حِينَ تَنْزِلُ بِهِ.
বাংলা অনুবাদ:
প্রত্যেক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তাকিয়া রয়েছে; আর যার ওপর সেই পরিস্থিতি আসে, সে নিজেই তা সবচেয়ে ভালো জানে।
শিয়া ফিকহে এই অনুমোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাও স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। হুর আল-আমিলীর ওয়াসাইলুশ শিয়া-তে স্বতন্ত্র অধ্যায়ের নামই “রক্তের ক্ষেত্রে তাকিয়া বৈধ নয়”। সেখানে আল-কাফি থেকে আবু জাফরের বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে: তাকিয়ার উদ্দেশ্য রক্ত রক্ষা করা; যখন বিষয়টি অন্যের রক্তপাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন তাকিয়া থাকে না। অর্থাৎ নিজের জীবন বা নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে নিরপরাধ অন্য ব্যক্তিকে হত্যা করার অনুমতি এই নীতির মধ্যে রাখা হয়নি। [25]
إِنَّمَا جُعِلَتِ التَّقِيَّةُ لِيُحْقَنَ بِهَا الدَّمُ، فَإِذَا بَلَغَ الدَّمَ فَلَيْسَ تَقِيَّةٌ.
বাংলা অনুবাদ:
তাকিয়া বিধান করা হয়েছে রক্ত রক্ষা করার জন্য; যখন বিষয়টি রক্তপাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন তাকিয়া নেই।
পরবর্তী ইমামি ধর্মতত্ত্বেও তাকিয়াকে শিয়া পরিচয়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মুহাম্মদ রিদা আল-মুযাফফর তাঁর আকায়িদুল ইমামিয়্যাহ-তে তাকিয়াকে ইমামিয়া শিয়ার একটি স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য বলেছেন এবং এর ঐতিহাসিক কার্যকারিতা হিসেবে ইমাম ও অনুসারীদের ক্ষতি থেকে রক্ষা, রক্তপাত প্রতিরোধ এবং নিপীড়নের মধ্যে সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর আলোচনায় তাকিয়া সব সময় বাধ্যতামূলক নয়; সত্য প্রকাশ ধর্মীয় স্বার্থে প্রয়োজন হলে জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি নিয়েও তা ত্যাগ করা যেতে পারে। ফলে শিয়া ইমামি কাঠামোয় তাকিয়া একটি শক্তিশালী ধর্মীয় নীতি হলেও তা সীমাহীন বা সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নয়। [26]
Taqiyyah is still the distinctive feature of the Imamiyyah Shi`ah amongst the other sects and nations.
বাংলা অনুবাদ:
তাকিয়া এখনো অন্যান্য সম্প্রদায় ও জাতির তুলনায় ইমামিয়া শিয়ার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারাতেই তাকিয়ার মৌলিক কাঠামো হলো বাহ্যিক প্রকাশ এবং অন্তরের প্রকৃত বিশ্বাসের মধ্যে অনুমোদিত পরিস্থিতিতে পার্থক্য সৃষ্টি করা। পার্থক্য প্রধানত এর ধর্মতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক বিস্তারে: সুন্নি ফিকহে এটি প্রধানত জবরদস্তি, ভয় ও বিশেষ যুদ্ধকৌশলের ব্যতিক্রমী বিধান হিসেবে আলোচিত; দ্বাদশী শিয়া হাদিস ও ধর্মতত্ত্বে এটি স্বতন্ত্র অধ্যায়, পুনরাবৃত্ত ইমামি বর্ণনা এবং সম্প্রদায়গত আত্মরক্ষার নীতি হিসেবে অনেক বেশি বিস্তৃত স্থান পেয়েছে। তবে শিয়া উৎস নিজেই প্রয়োজনের শর্ত এবং রক্তপাতের সীমা নির্ধারণ করেছে।
আবদুল্লাহ আল-কারনী: যুদ্ধের স্বার্থে বিশ্বাস গোপন ও বিপরীত পরিচয় প্রকাশ
আবদুল্লাহ আল-কারনী তাঁর দাওয়াবিতুত তাকফির ইনদা আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ গবেষণায় তাকিয়াকে শুধু অন্তরে ঈমান রেখে নীরব থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেননি। তাঁর সংজ্ঞায় অনুমোদিত কারণে ইসলাম গোপন করা, ধর্ম প্রকাশ না করা এবং বাইরে এমন কুফর বা পাপের প্রকাশ ঘটানোও অন্তর্ভুক্ত, যা ব্যক্তির প্রকৃত বিশ্বাসের বিপরীত। তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় অন্তর ও বাহ্যিক আচরণের মিলকে মূলনীতি বলেছেন; কিন্তু জবরদস্তি ও বিশেষ যুদ্ধকৌশলকে ব্যতিক্রম করেছেন। যুদ্ধের উদাহরণে নুআইম ইবনে মাসউদের ইসলাম গোপন করে শত্রুপক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার কা’ব ইবনে আশরাফকে হত্যার জন্য মুহাম্মদের প্রতি অসন্তোষের ভান—দুটিই তাঁর আলোচনায় এসেছে। [27]
التَّقِيَّةُ مِنَ الاتِّقَاءِ، سَوَاءٌ كَانَ ذَلِكَ بِكِتْمَانِ الدِّينِ وَعَدَمِ إِظْهَارِهِ، أَوْ بِإِظْهَارِ مَا يُخَالِفُ الإِيمَانَ مِنْ كُفْرٍ أَوْ مَعْصِيَةٍ فِي الظَّاهِرِ فَقَطْ.
বাংলা অনুবাদ:
তাকিয়া আত্মরক্ষার ধারণা থেকে এসেছে; এর মধ্যে ধর্ম গোপন ও প্রকাশ না করা, অথবা বাইরে এমন কুফর বা পাপ প্রকাশ করা অন্তর্ভুক্ত যা প্রকৃত ঈমানের বিপরীত।
এই সংজ্ঞা এবং তাঁর নির্বাচিত উদাহরণগুলো তাকিয়ার প্রয়োগের দুটি আলাদা ক্ষেত্র দেখায়। একদিকে নির্যাতন বা ক্ষতির আশঙ্কায় ধর্মীয় পরিচয় গোপন করা; অন্যদিকে যুদ্ধের স্বার্থে প্রতিপক্ষের সামনে প্রকৃত ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীত ধারণা সৃষ্টি করা। কা’ব হত্যার ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা যে মুহাম্মদের অনুসরণে অসন্তুষ্ট—এই ধারণাটিই কা’বের আস্থা অর্জনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ফলে তাকিয়া, তাওরিয়া এবং যুদ্ধের ধোঁকা পরিভাষাগতভাবে পৃথক হলেও এখানে তাদের কার্যকর পদ্ধতি একই বিন্দুতে মিলেছে: লক্ষ্যবস্তুকে বক্তার প্রকৃত বিশ্বাস বা উদ্দেশ্য না জানিয়ে বিপরীত একটি ধারণায় বিশ্বাস করানো।
ইবনুল আরাবী: ধর্মীয় নির্দেশের সামনে যুক্তির স্থান নেই
মালিকি ফকিহ আবু বকর ইবনুল আরাবীর বক্তব্যে মিথ্যার অনুমোদনের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি আরও স্পষ্ট। আবদুর রহমান মুবারকপুরী তাঁর তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে ইবনুল আরাবীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: যুদ্ধে মিথ্যা মুসলিমদের প্রয়োজনের কারণে ধর্মীয় নির্দেশে অনুমোদিত ব্যতিক্রম; এতে যুক্তির কোনো অবকাশ নেই। এখানে একই নামের সুফি দার্শনিক ইবনে আরাবী নয়, মালিকি ফকিহ আবু বকর ইবনুল আরাবীর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। [28]
وقال ابن العربي: الكذب في الحرب من المستثنى الجائز بالنص رفقا بالمسلمين لحاجتهم إليه وليس للعقل فيه مجال، ولو كان تحريم الكذب بالعقل ما انقلب حلالا انتهى.
বাংলা অনুবাদ:
ইবনুল আরাবী বলেছেন: যুদ্ধে মিথ্যা বলা ধর্মীয় নির্দেশে অনুমোদিত ব্যতিক্রমগুলোর একটি; মুসলিমদের প্রয়োজনের কারণে তাদের প্রতি অনুকম্পাস্বরূপ এটি অনুমোদিত। এতে যুক্তির কোনো অবকাশ নেই। মিথ্যার নিষেধাজ্ঞা যদি যুক্তির ভিত্তিতে হতো, তাহলে তা হালালে পরিণত হতো না। উদ্ধৃতি শেষ।
ইবনুল আরাবীর বক্তব্যে ধর্মীয় নির্দেশই মিথ্যার বৈধতার ভিত্তি এবং যুক্তিকে সেই বৈধতা নির্ধারণের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় অনুমোদন নিজেই সেই অনুমোদনের নৈতিক ন্যায়সংগততার প্রমাণ হতে পারে না; সেটি চক্রাকার যুক্তি। শরিয়তের ভেতরে কোনো কাজ বৈধ হওয়া এবং প্রতারণার দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির বিচারে কাজটি নৈতিকভাবে ন্যায়সংগত হওয়া দুটি পৃথক দাবি।
চুক্তিভঙ্গের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অপব্যবহার
নববী ও ইবনে হাজরের ব্যাখ্যায় যুদ্ধের ধোঁকার অনুমতি চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ভঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত নয়; এই সীমা তাঁদের ফিকহি অবস্থানের অংশ। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ‘আমান’ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া আস্থা একই জিনিস নয়। কা’ব হত্যার বর্ণনায় তাঁকে নিরাপত্তার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা নেই; বরং হত্যার পরিকল্পনাটি তাঁর পরিচিত ব্যক্তিদের ওপর বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েছে। দুধভাই আবু নায়িলার উপস্থিতি তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল; স্ত্রী রাতের ডাক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার পরও কা’ব বলেন, আগতরা মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা ও তাঁর দুধভাই। ধার চাওয়া ও অস্ত্র বন্ধকের আলোচনা প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করে যোগাযোগকে স্বাভাবিক করেছে। এরপর মাথার সুগন্ধ শোঁকার প্রশংসাসূচক অনুরোধের মাধ্যমে শারীরিক নৈকট্যের অনুমতি নেওয়া হয় এবং সেই অনুমতির মুহূর্তেই তাঁকে শক্ত করে ধরে সহযোগীদের আঘাত করতে বলা হয়। বর্ণিত পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের আস্থাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার সুযোগে রূপান্তর করা হয়েছে। ফিকহি অর্থে আনুষ্ঠানিক ‘আমান’ না থাকা এই সম্পর্কনির্ভর প্রতারণার নৈতিক প্রকৃতি পরিবর্তন করে না।
সামরিক সাফল্য নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়
কোনো পদ্ধতি দিয়ে শত্রুকে পরাজিত করা সম্ভব—এটি কার্যকারিতার বক্তব্য। সেই পদ্ধতি ন্যায়সংগত—এটি নৈতিক বক্তব্য। প্রথমটি থেকে দ্বিতীয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে না। একজন হত্যাকারী সফলভাবে অন্যের আস্থা অর্জন করতে পারেন; সেই সাফল্য তাঁর নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে না। একইভাবে ধর্মীয় নেতার অনুমোদনে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পরিকল্পনাটি ধর্মীয় বৈধতা পেতে পারে, কিন্তু মানবিক বিচারে সেটির যৌক্তিকতা আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
ন্যায়সংগত আত্মরক্ষায় প্রতিপক্ষের কাছে সব তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু প্রতারণার মূল্যায়নে যুদ্ধের ন্যায্যতা, লক্ষ্যবস্তুর ভূমিকা, ব্যবহৃত সম্পর্ক, ক্ষতির মাত্রা এবং বিকল্প পদ্ধতি প্রাসঙ্গিক। ‘যুদ্ধ’ শব্দটি এসব প্রশ্নের একক উত্তর নয়। কা’বকে ব্যক্তিগত আস্থার মাধ্যমে হত্যার নাগালে আনার পরিকল্পনাকে শুধু ‘যুদ্ধকৌশল’ বলে নাম বদলে দিলে তার প্রকৃতি বদলায় না। মুহাম্মদকে নৈতিক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবির সঙ্গে এই অনুমোদিত আচরণের সম্পর্ক বিচার করতে গেলে সেই আচরণকেই সামনে রাখতে হয়।
উপসংহার
কোরআন, সুন্নি ও শিয়া তাফসির-ফিকহ, হাদিস এবং ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় বাহ্যিক প্রকাশ ও প্রকৃত বিশ্বাস বা উদ্দেশ্যের মধ্যে অনুমোদিত পার্থক্যের একাধিক রূপ পাওয়া যায়। সুন্নি উৎসে ভয় ও জবরদস্তির পরিস্থিতিতে তাকিয়া স্বীকৃত; দ্বাদশী শিয়া হাদিস-ঐতিহ্যে তাকিয়ার জন্য স্বতন্ত্র অধ্যায়, পুনরাবৃত্ত ইমামি নির্দেশ এবং প্রয়োজনভিত্তিক বিধান রয়েছে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দেওয়া অনুমোদিত; নববীর ব্যাখ্যায় সরাসরি মিথ্যাও বৈধ; ইবনে হাজরের আলোচনায় মুহাম্মদের অনুমতির মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের মিথ্যা অন্তর্ভুক্ত; আর কা’ব হত্যার বর্ণনায় প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন ও ব্যক্তিগত আস্থাকে হত্যার পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসগুলো সীমাও নির্ধারণ করেছে: নববী ও ইবনে হাজর চুক্তি ও ‘আমান’ ভঙ্গকে নিষিদ্ধ রেখেছেন, আর শিয়া হাদিস-ফিকহে অন্যের রক্তপাত পর্যন্ত তাকিয়ার অনুমতি বিস্তৃত করা হয়নি। এই সীমাগুলো অনুমোদিত প্রতারণার পরিসর নির্ধারণ করে; অনুমোদিত ক্ষেত্রগুলোর অস্তিত্ব মুছে দেয় না।
মিথ্যার অনুমোদনকে সত্যবাদিতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এবং সম্পর্কের আস্থা ব্যবহার করে হত্যাকে মানবিক মহত্ত্বের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা অসঙ্গত। সামরিক কার্যকারিতা, শরিয়তি বৈধতা এবং নৈতিক ন্যায়সংগততা এক বিষয় নয়। কোনো ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন মানুষের আস্থা অপব্যবহার করে হত্যার নৈতিক দায় মুছে দেয় না; অনুমোদনদাতাকেও সেই দায়ের বিচারের মধ্যে নিয়ে আসে।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী ৪৪৩১; আন্তর্জাতিক ১৭৩৯; আরবি মূল ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী ৪৪৩২; আন্তর্জাতিক ১৭৪০; আরবি মূল ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, সপ্তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৭, ২২৮ ↩︎
- নববী, আল-মিনহাজ শরহ সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৪৫—শামেলা; একই ব্যাখ্যা—ইসলামওয়েব; নববীর বক্তব্যের পুনরুদ্ধৃতি—ইসলামকিউএ, উত্তর ৮৩০৯৩ ↩︎
- ইবনে হাজর আসকালানী, ফাতহুল বারী, খণ্ড ৬, ‘যুদ্ধ হচ্ছে ধোঁকা’ অধ্যায়—ইসলামওয়েব ↩︎
- জামে তিরমিযী, হাদিস ১৯৩৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৬০৫ক ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৪০৩৭, ‘কা’ব ইবনে আশরাফ হত্যা’ ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৩১, باب الكذب في الحرب ↩︎
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৩২, باب الْفَتْكِ بِأَهْلِ الْحَرْبِ ↩︎
- সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, সপ্তম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২২৯ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৭৬৮ ↩︎
- শামসুল হক আযীমাবাদী, আওনুল মা’বুদ, কিতাবুল জিহাদ—ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে হাজর আসকালানী, ফাতহুল বারী, ‘যুদ্ধে মিথ্যা বলা’ অধ্যায়ের ব্যাখ্যা—ইসলামওয়েব; ইবনে হাজরের বক্তব্যের পুনরুদ্ধৃতি, ফতোয়া ৩৫৮৭০৫ ↩︎
- ইবনে হাজর আসকালানী, ফাতহুল বারী, ‘যুদ্ধে মিথ্যা বলা’ অধ্যায়, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৮৪–১৮৫—ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মাআদ, খণ্ড ৩—ইসলামওয়েব ↩︎
- কোরআন, আলে ইমরান ৩:২৮ ↩︎
- কোরআন, নাহল ১৬:১০৬ ↩︎
- তাবারী, জামিউল বায়ান, আলে ইমরান ৩:২৮-এর তাফসির—ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনে কাসীর, তাফসিরুল কোরআনিল আযীম, আলে ইমরান ৩:২৮, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০–৩১—ইসলামওয়েব ↩︎
- ইবনুল কাইয়িম, আহকামু আহলিয যিম্মা, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৩৮—ইসলামওয়েব; একই সংজ্ঞার উদ্ধৃতি—ইসলামকিউএ, উত্তর ১৭৮৯৭৫ ↩︎
- সারাখসি, আল-মাবসুত, কিতাবুল ইকরাহ, খণ্ড ২৪—ইসলামওয়েব ↩︎
- আল-কাফি, খণ্ড ২, কিতাবুল ঈমান ওয়াল কুফর, বাবুত তাকিয়া, হাদিস ১২ ↩︎
- আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৯, বাবুত তাকিয়া; আল-কাফি, একই অধ্যায়, হাদিস ১৮; মিরআতুল উকূলসহ ↩︎
- ওয়াসাইলুশ শিয়া, বাব ৩১: রক্তের ক্ষেত্রে তাকিয়া বৈধ নয়; আল-কাফি ২:২২০-এর বর্ণনা ↩︎
- মুহাম্মদ রিদা আল-মুযাফফর, The Faith of the Imamiyyah Shi’ah ↩︎
- আবদুল্লাহ আল-কারনী, দাওয়াবিতুত তাকফির ইনদা আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামাআহ; ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩৫৮৭০৫-এ উদ্ধৃত ↩︎
- আবদুর রহমান মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৬২, ইবনুল আরাবীর উদ্ধৃতি—ইসলামওয়েব ↩︎

