ভূমিকা
মানুষকে তার কাজের জন্য নৈতিকভাবে দায়ী করতে হলে অন্তত এটুকু প্রয়োজন যে সংশ্লিষ্ট কাজটি করা বা না করার মধ্যে তার বাস্তব নির্বাচনক্ষমতা থাকতে হবে। কেউ যদি এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে যেখানে তার চূড়ান্ত গন্তব্য আগে থেকেই নির্ধারিত, সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর উপযোগী কাজ তার দ্বারা করানো হয় এবং সেই কাজ করেই তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়, তাহলে পরবর্তী পুরস্কার বা শাস্তিকে তার স্বাধীন কর্মের ফল বলা কঠিন হয়ে পড়ে। ইসলামী তাকদীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস ঠিক এই সমস্যাটিই সৃষ্টি করে। সেখানে আল্লাহ কেবল জানেন না কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে; বরং কিছু মানুষকে জান্নাতের জন্য এবং কিছু মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে, আল্লাহ জান্নাতের জন্য সৃষ্ট ব্যক্তিকে জান্নাতীদের কাজ করান এবং জাহান্নামের জন্য সৃষ্ট ব্যক্তিকে জাহান্নামীদের কাজ করান, যতক্ষণ না সে সেই কাজের ওপরই মারা যায় এবং নির্ধারিত গন্তব্যে প্রবেশ করে।
এখানে পূর্বজ্ঞান, পূর্বলিখন এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করা জরুরি। কোনো সর্বজ্ঞ সত্তা যদি কেবল আগে থেকে জানে একজন স্বাধীন ব্যক্তি কী সিদ্ধান্ত নেবে, তাহলে অন্তত ধারণাগতভাবে বলা সম্ভব যে সিদ্ধান্তটির উৎস ব্যক্তি নিজেই, আর সর্বজ্ঞ সত্তা শুধু সেই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অভ্রান্ত জ্ঞান রাখে। কিন্তু যদি একই সত্তা ব্যক্তির গন্তব্য নির্ধারণ করে, তার কর্মও সৃষ্টি করে, নিজের ইচ্ছার অধীন তার ইচ্ছাকে রাখে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নির্দিষ্ট শ্রেণির কাজ করিয়ে নেয়, তাহলে সেই সত্তাকে আর নিছক পর্যবেক্ষক বলা যায় না। সে কার্যকারণ-শৃঙ্খলের সক্রিয় নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।
সমস্যাটি আরও গভীর হয় কারণ ইসলামী ন্যায়বিচারের ধারণা একই সঙ্গে দাবি করে যে মানুষ নিজের কাজের জন্য দায়ী এবং সেই কাজের ভিত্তিতেই তার বিচার হবে। কিন্তু যদি একজন মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হয়, তাকে দিয়ে জাহান্নামীদের কাজ করানো হয়, সেই কাজের ওপর তার মৃত্যু ঘটানো হয় এবং তারপর সেই কাজের কারণেই তাকে জাহান্নামে পাঠানো হয়, তাহলে শাস্তির ভিত্তি একটি বৃত্তাকার কাঠামো তৈরি করে। প্রথমে স্রষ্টা গন্তব্য নির্ধারণ করছেন, তারপর সেই গন্তব্যের উপযোগী কাজ ঘটাচ্ছেন, তারপর সেই কাজকে আবার গন্তব্যে পাঠানোর কারণ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই ব্যবস্থায় মানুষের তাৎক্ষণিক কর্ম এবং ঐশ্বরিক চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ—দুটিকে একই স্তরের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
“মানুষ নিজের ইচ্ছায় কাজ করে”—এই বক্তব্য একা সমস্যাটির সমাধান করে না। প্রশ্ন হলো সেই ইচ্ছার উৎপত্তি, সীমা এবং কার্যকারিতা কোথা থেকে আসে। মানুষের ইচ্ছাই যদি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কার্যকর হতে না পারে, মানুষের কর্ম যদি ঐশ্বরিক সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিণতির উপযোগী কাজের দিকে পরিচালিত করা হয়, তাহলে শুধু কাজটির তাৎক্ষণিক কর্তা মানুষ—এই তথ্য থেকে পূর্ণ নৈতিক দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। দায়বদ্ধতার জন্য দেখতে হয়, ব্যক্তি সত্যিই অন্যভাবে করতে পারত কি না এবং তার ইচ্ছার চূড়ান্ত কারণ তার নিজের মধ্যে ছিল কি না।
তাকদীরের এই সমস্যা শুধু বিমূর্ত ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক নয়। এটি সরাসরি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। একজন বিচারক যদি কোনো ব্যক্তিকে নিজে এমন কাজ করতে বাধ্য করেন যার জন্য পরে তাকেই শাস্তি দেন, সেই বিচারকে ন্যায়সঙ্গত বলা যাবে না। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও তীব্র, কারণ তার ক্ষমতার বাইরে কোনো স্বতন্ত্র শক্তি নেই যাকে দায়ী করা যায়। তিনি চাইলে সৃষ্টি, পরিস্থিতি, মানসিক প্রবণতা, হেদায়াত, সিদ্ধান্ত এবং ফল—সবকিছু ভিন্নভাবে ঘটাতে সক্ষম। ফলে ইসলামি উৎস যখন একই সঙ্গে ঐশ্বরিক সর্বশক্তিমানতা, পূর্ণ তাকদীর এবং মানুষের শাস্তিযোগ্যতা ঘোষণা করে, তখন এই দাবিগুলোর পারস্পরিক সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
তাকদীর শুধু আল্লাহর পূর্বজ্ঞান নয়, নির্ধারণ
তাকদীরের সমস্যাকে অনেক সময় কেবল এভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানেন, কিন্তু মানুষের কাজ নির্ধারণ করেন না। প্রচলিত সুন্নি আকিদার নিজের বিবরণ এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে না। ইসলামওয়েবের তাকদীরবিষয়ক একটি ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তাকদীরের চারটি স্তর হলো জ্ঞান, লিখন, ইচ্ছা এবং সৃষ্টি। সেখানে আল্লাহ মানুষের কাজ আগে থেকেই জানেন ও লিখেছেন—এই দুই স্তরের পাশাপাশি বলা হয়েছে, তিনি তা পূর্বেই ইচ্ছা করেছেন, তাঁর ইচ্ছা কার্যকর, এবং মানুষের কর্মও তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। শুধু জ্ঞান ও লিখনের মধ্যে তাকদীরকে সীমাবদ্ধ করাকে সেখানে কদরিয়াদের বিদআত বলা হয়েছে। [1]
لَهُ أَرْبَعُ مَرَاتِبَ: الْعِلْمُ، وَالْكِتَابَةُ، وَالْمَشِيئَةُ، وَالْخَلْقُ … فَمَا شَاءَ كَانَ، وَمَا لَمْ يَشَأْ لَمْ يَكُنْ … وَهُوَ تَعَالَى خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ، وَمِنْ ذَلِكَ أَفْعَالُ عِبَادِهِ.
বাংলা অনুবাদ:“তাকদীরের চারটি স্তর হলো জ্ঞান, লিখন, ইচ্ছা এবং সৃষ্টি … আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ঘটে, আর যা তিনি ইচ্ছা করেন না তা ঘটে না … তিনি সবকিছুর স্রষ্টা এবং বান্দাদের কাজও সেই সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত।”
এই বক্তব্যের তাৎপর্য মৌলিক। এখানে তাকদীরকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি যেখানে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং আল্লাহ শুধু সেই সিদ্ধান্তটি আগে থেকেই জানেন। আল্লাহর জ্ঞান ও লিখনের পরে মাশিয়াত বা কার্যকর ইচ্ছা এবং খালক বা সৃষ্টি যুক্ত করা হয়েছে। মানুষের কর্মও যদি সৃষ্ট বস্তুর অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে কাজটির অস্তিত্বের চূড়ান্ত কারণ মানুষ নয়। মানুষ কাজটি সম্পাদন করছে, কিন্তু যে সত্তা মানুষ, তার ক্ষমতা, ইচ্ছার সামর্থ্য এবং কাজটির অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছেন—ধর্মতত্ত্বের নিজের ভাষায় সেই চূড়ান্ত স্রষ্টা আল্লাহ।
একই ইসলামওয়েব ফতোয়ায় মানুষের নির্বাচনক্ষমতা স্বীকার করা হলেও সেই নির্বাচনকে আল্লাহর তাকদীরের বাইরে রাখা হয়নি। মানুষকে সম্পূর্ণ বাধ্য বা সম্পূর্ণ স্বাধীন—কোনোটিই না বলে “যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে” বলা হয়। স্বাধীন নির্বাচন এবং সর্বব্যাপী তাকদীরকে কীভাবে একসঙ্গে সত্য ধরা হবে, সেই সমন্বয়কে আবার এমন এক “রহস্য” বলা হয়েছে যা মানুষের বুদ্ধি পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। [1]
IslamQA-র তাকদীরবিষয়ক বিস্তারিত ব্যাখ্যাতেও একই কাঠামো রয়েছে। সেখানে মানুষের নির্বাচনকে বাস্তব বলা হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে কেউ মহাজাগতিক তাকদীরের বিধানের বাইরে যেতে পারে না এবং আল্লাহ তার জন্য যা লিখেছেন তার বিরোধিতা করতে পারে না। [2]
الْحِكْمَةُ الْكَوْنِيَّةُ الْقَدَرِيَّةُ لَا يَخْرُجُ عَنْهَا أَحَدٌ، وَلَا يُخَالِفُ مَا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ.
বাংলা অনুবাদ:“মহাজাগতিক তাকদীরের বিধান থেকে কেউ বের হয় না এবং আল্লাহ তার জন্য যা লিখেছেন, তার বিরোধিতা করতে পারে না।”
একই ব্যাখ্যায় আল্লাহর ইচ্ছাকে শরিয়তগত এবং তাকদীরগত—দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কোনো পাপ আল্লাহ নৈতিকভাবে অপছন্দ করতে পারেন, কিন্তু সেই পাপও তাঁর তাকদীরগত ইচ্ছার বাইরে ঘটে না। ফলে “আল্লাহ পাপের আদেশ দেননি” বলা কার্যকারণের সমস্যার সমাধান নয়। মানুষ যদি পূর্বলিখিত তাকদীর অতিক্রম করতে না পারে এবং তার কাজও আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টির বাইরে না হয়, তাহলে শুধু “সে নিজের ইচ্ছায় করেছে” বললে কাজটির মধ্যবর্তী মানবীয় ধাপটি বর্ণনা করা হয়; স্বাধীনতার চূড়ান্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না।
মন্দ কাজকে সুন্দর দেখানো এবং পথভ্রষ্টতার নিয়ন্ত্রণ
কোরআনের সূরা ফাতির ৩৫:৮ এই সমস্যার সঙ্গে মানুষের নৈতিক উপলব্ধিকেও যুক্ত করে। আয়াতটিতে এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যার মন্দ কাজকে তার কাছে সুশোভিত করে দেখানো হয়েছে, ফলে সে সেই মন্দ কাজটিকেই ভালো মনে করছে। একই আয়াতেই এরপর বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। এখানে মানুষ এমন অবস্থায় নেই যে সে মন্দকে মন্দ হিসেবে পরিষ্কারভাবে জেনে কেবল স্বাধীন সিদ্ধান্তে মন্দটি বেছে নিচ্ছে; বরং তার মূল্যায়নের স্তরেই মন্দটি ভালো হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। [3]
যাকে তার মন্দ কর্ম শোভনীয় ক’রে দেখানো হয়, অতঃপর সে সেটাকে উত্তম মনে করে (সে কি তার সমান, যে সৎ পথে পরিচালিত?) আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিপথগামী করেন, আর যাকে ইচ্ছে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। কাজেই তাদের জন্য আক্ষেপ ক’রে, তুমি তোমার জীবনকে ধ্বংস হতে দিও না। তারা যা করে আল্লাহ তা খুব ভালভাবেই জানেন।
— Taisirul Quran
কেহকেও যদি তার মন্দ কাজ শোভন করে দেখানো হয় এবং সে ওটাকে উত্তম মনে করে সেই ব্যক্তি কি তার সমান যে সৎ কাজ করে? আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎ পথে পরিচালিত করেন। অতএব তুমি তাদের জন্য আক্ষেপ করে তোমার প্রাণকে ধ্বংস করনা। তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
কাউকে যদি তার অসৎ কাজ সুশোভিত করে দেখানো হয় অতঃপর সে ওটাকে ভাল মনে করে, (সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যে ভালকে ভাল এবং মন্দকে মন্দ দেখে?) কেননা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন আর যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন; অতএব তাদের জন্য আফসোস করে নিজে ধ্বংস হয়ো না। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন।
— Rawai Al-bayan
কাউকে যদি তার মন্দকাজ শোভন করে দেখানো হয় ফলে সে এটাকে উত্তম মনে করে, (সে ব্যক্তি কি তার সমান যে সৎকাজ করে?) তবে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছে হিদায়াত করেন। অতএব তাদের জন্য আক্ষেপ করে আপনার প্রাণ যেন ধ্বংস না হয়। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
এই আয়াতে নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নটি শুধু কাজের স্তরে নয়, উপলব্ধির স্তরেও তৈরি হয়। মানুষ সাধারণত সেই কাজই নির্বাচন করে যেটিকে তার উপলব্ধি, মূল্যবোধ, আকাঙ্ক্ষা ও বিচারবুদ্ধি তুলনামূলকভাবে ভালো বা প্রয়োজনীয় বলে উপস্থাপন করে। যদি মন্দ কাজটিই তার কাছে উত্তম বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে তার নির্বাচন সেই বিকৃত মূল্যায়নের অনুসরণ করবে। ব্যক্তি তখন নিজের দৃষ্টিতে “মন্দ” নির্বাচন করছে না; তার কাছে যে বিকল্পটি ভালো বলে মনে হচ্ছে সেটিই নির্বাচন করছে। ফলে মন্দকে সুন্দর বলে প্রতীয়মান হওয়ার কার্যকারণটি নৈতিক দায়ের আলোচনায় উপেক্ষা করা যায় না।
এর সঙ্গে একই আয়াতের “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন” বক্তব্য যুক্ত হলে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি একজন ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট করার কার্যকর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেই ব্যক্তির সীমিত ক্ষমতা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে পরাজিত করে স্বাধীনভাবে হেদায়াত অর্জন করবে—এমন ধারণা ঐশ্বরিক সর্বশক্তিমানতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আল্লাহ যদি তাকে পথভ্রষ্ট না করতেন, অথবা হেদায়াত দিতেন, তাহলে ফল ভিন্ন হতে পারত; কারণ আয়াত নিজেই হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করছে।
মন্দ কাজটি ব্যক্তির হাতেই সম্পন্ন হতে পারে, কিন্তু তার উপলব্ধিতে মন্দকে ভালো মনে হওয়া, হেদায়াত বা পথভ্রষ্টতার অবস্থা, তার ইচ্ছার কার্যকারিতা এবং সমগ্র ঘটনাটি যে তাকদীরগত ব্যবস্থার মধ্যে ঘটছে—এসব যদি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়, তাহলে শুধু শেষ ধাপের মানবীয় কাজটিকে আলাদা করে পূর্ণ দায়ের ভিত্তি বানানো যায় না। হাদিসে এর চেয়েও সরাসরি কিছু মানুষকে শুরু থেকেই জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করার এবং তাদের দ্বারা সংশ্লিষ্ট শ্রেণির কাজ করিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি: “তাহলে আমলের প্রয়োজন কী?”
তাকদীরের এই সমস্যাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে এমন একটি হাদিসে, যেখানে মুহাম্মদের সামনেই একজন ব্যক্তি ঠিক সেই প্রশ্নটি করেছিলেন যা এই মতবাদের যৌক্তিক ফল থেকে তৈরি হয়—যদি আল্লাহ আগেই কিছু মানুষকে জান্নাতের জন্য এবং কিছু মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে মানুষের আমলের প্রয়োজন কী? প্রশ্নটি পরবর্তী যুগের কোনো নাস্তিক, সংশয়বাদী বা দার্শনিকের তৈরি আপত্তি নয়; বর্ণনার ভেতরেই একজন শ্রোতা এই সমস্যা উপলব্ধি করে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, “তাহলে আমলের কী মূল্য রইল?” উত্তরে পূর্বনির্ধারণ অস্বীকার করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জান্নাতবাসীদের কাজ করিয়ে নেন যতক্ষণ না সে সেই কাজের ওপর মারা যায়; আর যাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন যতক্ষণ না সে সেই কাজের ওপর মারা যায়। এরপর সেই কাজের কারণেই প্রথমজন জান্নাতে এবং দ্বিতীয়জন জাহান্নামে প্রবেশ করে।
সুনান আবু দাউদের বাংলা তাহকীককৃত সংস্করণে বর্ণনাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে শুধু আল্লাহ আগে থেকেই কার পরিণতি কী হবে তা জানেন—এমন ভাষা নেই। প্রথমে বলা হচ্ছে, একদলকে জান্নাতের জন্য এবং আরেক দলকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; পরে তাদের দ্বারা সেই শ্রেণির কাজ করিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে; শেষে সেই কাজের ওপর তাদের মৃত্যু এবং সেই কাজের ফল হিসেবে জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশের কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ সৃষ্টি, গন্তব্য, কর্ম এবং চূড়ান্ত পরিণতি—চারটিই একই ধারাবাহিকতার মধ্যে যুক্ত। [4] [5] –
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
পাবলিশারঃ আল্লামা আলবানী একাডেমী
অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ
৪৭০৩। মুসলিম ইবনু ইয়াসার আল-জুহানী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলোঃ ‘‘যখন তোমার রব আদম সন্তানের পিঠ থেকে তাদের সমস্ত সন্তানদেরকে বের করলেন…’’ (সূরা আল-আ‘রাফঃ ১৭২)। বর্ণনাকারী বলেন, আল-কা‘নবী এ আয়াত পড়েছিলেন। উমার (রাঃ) বলেন, আমি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রশ্ন করতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর স্বীয় ডান হাতে তাঁর পিঠ বুলিয়ে তা থেকে তাঁর একদল সন্তান বের করে বললেন, আমি এদেরকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং এরা জান্নাতবাসীর উপযোগী কাজই করবে।
অতঃপর আবার তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে একদল সন্তান বেরিয়ে এনে বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং জাহান্নামীদের উপযোগী কাজই করবে। একথা শুনে এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমলের কি মূল্য রইলো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তার দ্বারা জান্নাতবাসীদের কাজই করিয়ে নেন। শেষে সে জান্নাতীদের কাজ করেই মারা যায়। আর আল্লাহ এর বিনিময়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যখন তিনি কোনো বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন। অবশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করে মারা যায়। অতঃপর এজন্য তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান।(1)
সহীহ, পিঠ বুলানো কথাটি বাদে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


এখানে ব্যবহৃত আরবি ক্রিয়া استعمله বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মূল বর্ণনায় বলা হয়েছে, “إذا خلق العبد للنار استعمله بعمل أهل النار”—আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তাকে জাহান্নামীদের কাজের মধ্যে ব্যবহার করেন বা তার দ্বারা সেই কাজ করান। বাংলা অনুবাদে তাই যথার্থভাবেই “তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন” বলা হয়েছে। বর্ণনার পরবর্তী অংশে আবার এই কাজের ওপর মৃত্যু এবং সেই কাজের কারণে জাহান্নামে প্রবেশকে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এটি শুধু পূর্বজ্ঞান নয়; মানুষ কোন শ্রেণির কাজ করবে সেই কার্যপ্রক্রিয়ায় ঐশ্বরিক ভূমিকার ভাষা। ইসলামওয়েবের আবু দাউদের আরবি পাঠেও একই শব্দাবলি অক্ষত আছে। [6]
إِذَا خَلَقَ الْعَبْدَ لِلنَّارِ اسْتَعْمَلَهُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ.
বাংলা অনুবাদ:“যখন তিনি কোনো বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করান।”
হাদিসের ভেতরে উত্থাপিত “ফাফীমাল ‘আমাল?”—“তাহলে আমলের প্রয়োজন কী?”—প্রশ্নটি এই কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নকারী বুঝেছিলেন, যদি গন্তব্য আগে থেকেই নির্ধারিত এবং সেই গন্তব্যের কাজও কার্যত নিশ্চিত হয়, তাহলে আমলের স্বাধীন নৈতিক তাৎপর্য কোথায় থাকে? উত্তরে মুহাম্মদ বলেননি যে পূর্বনির্ধারণ আসলে শুধু আল্লাহর পূর্বজ্ঞান, অথবা মানুষ চাইলে নির্ধারিত গন্তব্যের বিপরীত ফল তৈরি করতে পারে। উত্তরে আবার সেই একই ব্যবস্থাই বর্ণিত হয়েছে—যার জন্য সৃষ্টি, তাকে সেই শ্রেণির কাজ করানো, সেই কাজের ওপর মৃত্যু এবং সেই অনুযায়ী পরিণতি। ফলে প্রশ্নটির মূল premise প্রত্যাখ্যাত হয়নি; বরং আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। আবু দাউদের আরেকটি হাদিস এখানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে [7]
সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছেদঃ ৭. সুন্নাত অনুসরণে আহবান
৪৬১২। আবুস সালাত (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি উমার ইবনু আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর নিকট তাকদীর সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি লিখলো। উত্তরে তিনি লিখেন, অতঃপর আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, আল্লাহকে ভয় করো, ভারসাম্যপূর্ণভাবে তাঁর হুকুম মেনে চলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ করো, তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভের ও সংরক্ষিত হওয়ার পর বিদ’আতীদের বিদ’আত বর্জন করো। সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা তোমার কর্তব্য। কারণ এ সুন্নাত তোমাদের জন্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে রক্ষাকবজ। জেনে রাখো! মানুষ এমন কোনো বিদ’আত করেনি যার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বা তার বিরুদ্ধে এমন কোনো শিক্ষা নেই যা তার ভ্রান্তি প্রমাণ করে। কেননা সুন্নাতকে এমন এক ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন, যিনি সুন্নাতের বিপরীত সম্বন্ধে অবগত।
আর ইবনু ফাসির তার বর্ণনায় ’’তিনি জানতেরন ভুলত্রটি, অজ্ঞতা ও গোঁড়ামি সম্পর্কে’’ এ কথাগুলো উল্লেখ করেননি। কাজেই তুমি নিজের জন্য ঐ পথ বেছে নিবে যা তোমার পূর্ববর্তী মহাপুরুষগণ তাদের নিজেদের জন্য অবলম্বন করেছেন। কারণ তারা যা জানতে পেরেছেন তার পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতার সঙ্গে বিরত থেকেছেন এবং তারা দীন সম্পর্কে পারদর্শী ছিলেন, আর যা করতে তারা নিষেধ করেছেন, তা জেনে-শুনেই নিষেধ করেছেন। তারা দীনের অর্থ উপলদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে অনেক জ্ঞানী ছিলেন। আর তোমাদের মতাদর্শ যদি সঠিক পথ হয় তাহলে তোমরা তাদেরকে ডিঙ্গিয়ে গেলে। আর যদি তোমরা বলো যে, তারা দীনের মধ্যে নতুন কথা উদ্ভাবন করেছেন তবে বলো, পূর্ববর্তী লোকেরাই উত্তম ছিলেন এবং তারা এদের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন। যতটুকু বর্ণনা করার তা তারা বর্ণনা করেছেন, আর যতটুকু বলার প্রয়োজন তা তারা বলেছেন। এর অতিরিক্ত বা এর কমও বলার নেই। আর এক গোত্র তাদেরকে উপেক্ষা করে কিছু কমিয়েছে, তারা সঠিক পথ থেকে সরে গেছে, আর যারা বাড়িয়েছে তারা সীমালঙ্ঘন করেছে। আর পূর্ববর্তী মহাপুরুষগণ ছিলেন এর মাঝামাঝি সঠিক পথের অনুসারী।
পত্রে তুমি তাকদীরে বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে চেয়ে লিখেছো। আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি এমন ব্যক্তির নিকট এ বিষয়ে জানতে চেয়েছো যিনি এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ। আমার জানা মতে, তাকদীরে বিশ্বাসের উপর বিদ’আতীদের নবতর মতবাদ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। এটা কোনো নতুন বিষয় নয়; জাহিলিয়াতের সময়ও এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।অজ্ঞ লোকেরা তখনও তাদের আলোচনা ও কবিতায় এ বিষয়টি উল্লেখ করতো এবং তাদের ব্যর্থতার জন্য তাকদীরকে দায়ী করতো। ইসলাম এসে এ ধারণাকে আরো বদ্ধমূল করেছে এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। আর মুসলিমগণ তাঁর নিকট সরাসরি শুনেছে এবং তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে পরস্পর আলোচনা করেছে।
তারা অন্তরে বিশ্বাস রেখে, তাদের রবের অনুগত হয়ে, নিজেদেরকে অক্ষম মনে করে এ বিশ্বাস স্থাপন করেছে যে, এমন কোনো বস্তু নেই যা আল্লাহর জ্ঞান, কিতাব ও তাকদীর বহির্ভূত। এছাড়া তা আল্লাহর আমোঘ কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। আর যদি তোমরা বলো, কেন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেছেন এবং কেন এ কথা বলেছেন, তবে জেনে রাখো! তারাও কিতাবের ঐসব বিষয় পড়েছেন যা তোমরা পড়েছো; উপরন্ত তারা সেসব ব্যাখ্যা ছিলেন যা তোমরা জানো না। এতদসত্ত্বেও তারা বলেছেন,সবকিছু আল্লাহর কিতাব ও তকদীর অনুযায়ী সংঘটিত হয়ে থাকে। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তা অবশ্যই ঘটবে, আল্লাহ যা চান তাই হয় এবং যা চান না তা হয় না। লাভ বা ক্ষতি কোনো কিছুই আমরা নিজেদের জন্য করতে সক্ষম নই। অতঃপর তারা ভালো কাজের প্রতি উৎসাহী ও খারাপ কাজের ব্যাপারে সাবধান হয়েছেন।[1]
সহীহ মাকতু।
[1]. আজরী ‘আশ-শারী‘আহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মুআত্তা মালিকেও একই বর্ণনা
একই বর্ণনা মালিক ইবন আনাসের মুআত্তা-র তাকদীর অধ্যায়েও সংরক্ষিত। এখানে ভাষাগত কাঠামো একই: আল্লাহ একদলকে জান্নাতের জন্য এবং অন্যদলকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন; প্রথম দল জান্নাতীদের কাজ করবে, দ্বিতীয় দল জাহান্নামীদের কাজ করবে; এবং যখন কোনো বান্দাকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়, তখন তাকে সেই গন্তব্যের মানুষের কাজ করানো হয়। ফলে আবু দাউদের বর্ণনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো একক পাঠ নয়। প্রাচীন মালিকি হাদিস-সংকলনেও একই বক্তব্য রয়েছে। [8] [9] [10]
গ্রন্থের নামঃ মুয়াত্তা মালিক
অধ্যায়ঃ ৪৬. তকদীর অধ্যায়
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১. তকদীরের ব্যাপারে বিতর্ক করা নিষেধ
রেওয়ায়ত ২. মুসলিম ইবন ইয়াসার জুহানী (রহঃ) হইতে বর্ণিত, উমর (রাঃ)-এর নিকট (وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ) (সূরা আ’রাফঃ ১৭২) আয়াত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হইল। তিনি বলিলেন, আমি শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হইয়াছিল। তিনি বলিয়াছিলেন, আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করিলেন এবং তাহার পৃষ্ঠে স্বীয় দক্ষিণ হস্ত দ্বারা মুসেহ করিলেন, অতঃপর আদমের পৃষ্ঠদেশ হইতে তাহার সন্তানদেরকে বাহির করিলেন এবং বলিলেন, আমি ইহাদেরকে বেহেশতের জন্য সৃষ্টি করিয়াছি। ইহারা বেহেশতের কাজ করবে। অতঃপর পুনরায় তাহার পৃষ্ঠদেশে স্বীয় দক্ষিণ হস্ত বুলাইলেন এবং তাহার আর কিছু সংখ্যক সন্তান বাহির করিলেন এবং বলিলেন, আমি ইহাদেরকে দোযখের জন্য সৃষ্টি করিয়াছি। ইহারা দোযখের কাজ করবে। এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা হইলে আমল করায় লাভ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহু পাক যখন কোন বান্দাকে বেহেশতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তাহার দ্বারা বেহেশতীদের কাজ করান আর মৃত্যুর সময়েও সে নেক কাজ করিয়া মৃত্যুবরণ করে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাহাকে বেহেশতে প্রবেশ করাইয়া থাকেন। আর যখন কোন বান্দাকে দোযখের জন্য সৃষ্টি করেন তখন তাহার দ্বারা দোযখীদের কাজ করাইয়া থাকেন। অতঃপর মৃত্যুর সময়েও তাহাকে খারাপ কাজ করাইয়াই মৃত্যুবরণ করান। আর আল্লাহ তখন তাহাকে দোযখে প্রবেশ করাইয়া থাকেন।

মুআত্তার আরবি পাঠে দুটি বাক্য পাশাপাশি রয়েছে—“خلقت هؤلاء للجنة وبعمل أهل الجنة يعملون” এবং “خلقت هؤلاء للنار وبعمل أهل النار يعملون”। অর্থাৎ “এদের জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তারা জান্নাতীদের কাজ করবে”; “এদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তারা জাহান্নামীদের কাজ করবে।” এরপর প্রশ্নের উত্তরে استعمله ক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে “সৃষ্টি করেছি” এবং “কাজ করান”—দুটি পর্যায় একই বর্ণনায় সরাসরি উপস্থিত।
মিশকাতুল মাসাবীহ: “যার জন্য সৃষ্টি, সেই কাজই করিয়ে নেন”
মিশকাতুল মাসাবীহ-তেও একই বর্ণনা সংরক্ষিত হয়েছে এবং সেখানে আবু দাউদ, তিরমিজি ও মালিককে উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা তাহকীক সংস্করণে সনদের বিচ্ছিন্নতার কথাও গোপন করা হয়নি; একই সঙ্গে একাধিক সমর্থক বর্ণনার কারণে হাদিসটিকে সহিহ হিসেবে গ্রহণ এবং আলবানির মূল্যায়নের কথাও দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্ণনার সনদসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করেও এর মূল বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট হাদিস-সাহিত্যে গ্রহণ করা হয়েছে। [11]
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাক্বদীরের প্রতি ঈমান
৯৫-(১৭) মুসলিম ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে কুরআনের এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ ‘‘(হে মুহাম্মাদ!) আপনার রব যখন আদম সন্তানদের পিঠ থেকে তাদের সব সন্তানদেরকে বের করলেন’’ (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭: ১৭২) (…আয়াতের শেষ পর্যন্ত)। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি শুনেছি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তিনি জবাবে বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করলেন। অতঃপর আপন ডান হাত তাঁর পিঠ বুলালেন। আর সেখান থেকে তাঁর (ভবিষ্যতের) একদল সন্তান বের করলেন। অতঃপর বললেন, এসবকে আমি জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি, তারা জান্নাতীদের কাজই করবে। আবার আদামের পিঠে হাত বুলালেন এবং সেখান থেকে (অপর) একদল সন্তান বের করলেন এবং বললেন, এদেরকে আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তারা জাহান্নামীদেরই ‘আমাল করবে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে ‘আমালের আর আবশ্যকতা কি? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজই করিয়ে নেন। শেষ পর্যন্ত সে জান্নাতীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে এবং আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। এভাবে আল্লাহ তাঁর কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজই করিয়ে নেন। পরিশেষে সে জাহান্নামীদের কাজ করেই মৃত্যুবরণ করে, আর এ কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করেন। (মালিক, তিরমিযী ও আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : وَمَسَحَ ظَهْرَهٗ অংশটুকু ব্যতীত। মুয়াত্ত্বা মালিক ১৩৯৫, আবূ দাঊদ ৪০৮১, তিরমিযী ৩০০১; সহীহ সুনান আবূ দাঊদ। হাদীসের সানাদের রাবীগণ নির্ভরযোগ্য ও তারা বুখারী মুসলিমের রাবী। তবে এ সানাদে মুসলিম ইবনু ইয়াসার ও ‘উমারের মাঝে বিচ্ছিনণতা রয়েছে তথাপি হাদীসের অনেক শাহিদ বর্ণনা থাকায় হাদীসটি সহীহ। আর সহীহ সুনানে আবী দাঊদে আলবানী (রহঃ) হাদীসটিকে وَمَسَحَ ظَهْرَهٗ অংশটুকু ছাড়া সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
মূল বইয়ের বাংলা সংস্করণেও একই বর্ণনা রয়েছে [12]।
![ইসলামের ধ্রুপদী ব্যাখ্যায় আল্লাহ মানুষকে জান্নাতী বা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেন 5 গ্রন্থের নামঃ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) হাদিস নম্বরঃ [95] অধ্যায়ঃ পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস) (كتاب الإيمان) পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি](https://assets.shongshoy.com/2019/09/A9Uc2ei.jpg.webp)
এবারে আসুন আরো একটি হাদিস পড়ি, যেখানে খুব পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে, সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত [13] –
সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৩০/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৩. সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য
২১৩৫৷ আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উমর (রাঃ) প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমলের ক্ষেত্রে আপনার অভিমত কি? আমরা যেসব কাজ করি তা কি নতুনভাবে ঘটল না আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে? তিনি বললেনঃ হে খাত্তাবের পুত্র! তা আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে। আর সকলের করণীয় বিষয় সহজ করে রাখা হয়েছে। যারা সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত তারা অবশ্যই সাওয়াবের কাজ সম্পাদন করে আর যারা দুর্ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত তারা দুর্ভাগ্যজনক কাজই সম্পাদন করে থাকে।
সহীহ, যিলালুল জান্নাহ (১৬১, ১৬৭)।
আবূ ঈসা বলেন, আলী, হুযাইফা ইবনু উসাইদ, আনাস ও ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
আসুন এবারে আরেকটি হাদিস পড়ি, [14]

এবারে আরও একটি হাদিস পড়ি, যেখানে আল্লাহ বলছেন যে, তাকদীরের বিষয়াদি আল্লাহ নির্ধারণ করে রাখেন কারো পরোয়া না করেই। আল্লাহ সদম্ভে ঘোষণা করেন, তিনি কারোরই পরোয়া করেন না, যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই করেন [15]

আবু দাউদের আরেক বাংলা সংস্করণেও একই বক্তব্য
ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত আবু দাউদের বাংলা সংস্করণেও একই বর্ণনা রয়েছে। এখানে অনুবাদে আরও সরাসরি বলা হয়েছে—আল্লাহ যাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, “তিনি তাকে দিয়ে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করান”; সে সেই কাজ করতে করতে মারা যায় এবং “যদ্দরুন” আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান। অর্থাৎ কাজটি করানো এবং সেই কাজের কারণে শাস্তি—দুই ধাপ একই পাঠে পাশাপাশি রয়েছে। [16]
সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ
পরিচ্ছদঃ ১৭. তাকদীর সম্পর্কে।
৪৬৩০. আবদুল্লাহ্ কা’নাবী (রহঃ) ……. মুসলিম ইবন জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি উমার ইবন খাওাব (রাঃ)-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেনঃ
إِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ
অর্থাৎ স্মরণ কর! তোমার রব আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তার বংশধরকে বের করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারুক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেঃ নিশ্চয়ই, আমরা সাক্ষী থাকলাম। (৭ঃ১৭২)
রাবী বলেনঃ কা’নাবী এ আয়াত তিলাওয়াত করলে উমার (রাঃ) বলেনঃ একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুনি। জবাবে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মহান আল্লাহ্ আদম (আ)-কে সৃষ্টি করার পর, তার পিঠকে স্বীয় ডান হাত দিয়ে মাসেহ করেন। ফলে অনেক আদম সন্তান সৃষ্টি হয়। এরপর তিনি বলেনঃ আমি এদের জান্নাতে জন্য সৃষ্টি করেছি। এরা জান্নাতীদের ন্যায় আমল করবে। এরপর আল্লাহ্ তার হাত দিয়ে আদমের পিঠকে মাসেহ করেন। ফলে তার আরো সন্তান সৃষ্টি হয়। তিনি বলেনঃ আমি এদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তারা জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করবে। তখন এক ব্যক্তি বলেঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাহলে আমলের প্রয়োজনীয়তা কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা যখন কোন বান্দাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জান্নাতীদের আমল করিয়ে নেন। ফলে, সে ব্যক্তি জান্নাতীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর যখন তিনি কোন বান্দাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে দিয়ে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করান। ফলে সে জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করতে করতে মারা যায়। যদ্দরুন আল্লাহ্ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহিহ বুখারি: জান্নাত ও জাহান্নামের আসন আগে থেকেই লিখিত
এই ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো শুধু উপরের বর্ণনাগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। সহিহ বুখারিতে আলীর সূত্রে মুহাম্মদের নামে বর্ণিত হয়েছে যে প্রত্যেক মানুষের জান্নাত ও জাহান্নামের আসন আগেই লিখে রাখা হয়েছে। সাহাবীরা তখন যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন করেন—যদি আসন লিখিতই থাকে, তাহলে সেই লিখিত ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে আমল ছেড়ে দেওয়া হবে না কেন? উত্তরে বলা হয়, কাজ করতে হবে, কারণ প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। সুখীদের সুখীদের কাজ এবং দুর্ভাগাদের দুর্ভাগাদের কাজের দিকে সহজ করা হবে। [17]
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ كُتِبَ مَقْعَدُهُ مِنَ النَّارِ وَمَقْعَدُهُ مِنَ الْجَنَّةِ … أَفَلَا نَتَّكِلُ؟ … اعْمَلُوا فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ.
বাংলা অনুবাদ:“তোমাদের এমন কেউ নেই যার জাহান্নাম ও জান্নাতের আসন লিখে রাখা হয়নি।” তখন প্রশ্ন করা হলো, “তাহলে কি আমরা সেই লিখিত ভাগ্যের ওপর নির্ভর করব?” তিনি বললেন, “কাজ করো; প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই কাজের দিকে সহজ করে দেওয়া হবে।”
এই হাদিসটির মূল বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি মানুষ ঐ কাজই করবে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা যা তার জন্য সহজ করা হয়েছে [18],
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৮২/ তাকদীর
পরিচ্ছেদঃ ৮২/২. আল্লাহর ইলম-মুতাবিক (লেখার পর) কলম শুকিয়ে গেছে।
আল্লাহর বাণীঃ ‘‘আল্লাহ জেনে শুনেই তাকে গুমরাহ করেছেন’’- (সূরাহ জাসিয়াহ ৪৫/২৩) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ যার সম্মুখীন তুমি হবে (তোমার যা ঘটবে) তা লেখার পর কলম শুকিয়ে গেছে। ইবনু ‘আব্বাস(রাঃ) বলেছেন,(لَهَا سَابِقُوْنَ) তাদের উপর নেকবখতি প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
৬৫৯৬. ‘ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! জাহান্নামীদের থেকে জান্নাতীদেরকে চেনা যাবে কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। সে বলল, তাহলে ‘আমলকারীরা ‘আমল করবে কেন? তিনি বললেনঃ প্রতিটি লোক ঐ ‘আমলই করে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অথবাযা তার জন্য সহজ করা হয়েছে। [৭৫৫১; মুসলিম ৩৮/১, হাঃ ২৬৪৯] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬১৩৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৬১৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ)
এখানেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শুধু জ্ঞান নয়, লিখিত গন্তব্য এবং সেই গন্তব্যের উপযোগী কাজের দিকে সহজ করে দেওয়া একই সঙ্গে উপস্থিত। একজন ব্যক্তি জান্নাতের জন্য লিখিত হলে তাকে সেই শ্রেণির কাজের দিকে সহজ করা হয়, আর জাহান্নামের জন্য লিখিত হলে তাকে বিপরীত শ্রেণির কাজের দিকে সহজ করা হয়। “সহজ করা” এবং “করিয়ে নেওয়া” শব্দ দুটি এক নয়, কিন্তু দুটির ধর্মতাত্ত্বিক দিক একই দিকে নির্দেশ করে: চূড়ান্ত গন্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তির কার্যপ্রবাহের একটি পূর্বনির্ধারিত সামঞ্জস্য স্থাপন করা হয়েছে।
সহিহ মুসলিম: পিতার ঔরসে থাকতেই জান্নাত ও জাহান্নামের লোক সৃষ্টি
সহিহ মুসলিমে আয়েশার সূত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। একজন আনসারি শিশুর জানাজায় আয়েশা বলেন, শিশুটির জন্য সুসংবাদ—সে জান্নাতের পাখিদের একটি, কারণ সে মন্দ কাজ করেনি এবং মন্দ করার বয়সও পায়নি। মুহাম্মদ এই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে বলেন, আল্লাহ জান্নাতের জন্য কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তারা তখনো তাদের পিতাদের ঔরসে ছিল; এবং জাহান্নামের জন্যও কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তারাও তখনো তাদের পিতাদের ঔরসে ছিল। অর্থাৎ এখানে ব্যক্তির নিজের কোনো সম্পন্ন কাজের আগেই জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য সৃষ্ট মানুষের শ্রেণি সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। [19]
قَالَتْ عَائِشَةُ: طُوبَى لِهَذَا، عُصْفُورٌ مِنْ عَصَافِيرِ الْجَنَّةِ، لَمْ يَعْمَلِ السُّوءَ … قَالَ: أَوَ غَيْرَ ذَلِكَ يَا عَائِشَةُ؟ إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ لِلْجَنَّةِ أَهْلًا … وَخَلَقَ لِلنَّارِ أَهْلًا.
বাংলা অনুবাদ:আয়েশা বলেন, “এই শিশুর জন্য সুসংবাদ; সে জান্নাতের পাখিদের একটি। সে কোনো মন্দ কাজ করেনি।” মুহাম্মদ বলেন, “হে আয়েশা, বিষয়টি অন্যরকমও হতে পারে। আল্লাহ জান্নাতের জন্য কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছেন … এবং জাহান্নামের জন্যও কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছেন।”
এই বর্ণনার ক্ষেত্রে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা শিশুটির ব্যক্তিগত পরিণতি সম্পর্কে আয়েশাকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত না দিতে সতর্ক করা হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা হাদিসের কেন্দ্রীয় ধর্মতাত্ত্বিক বাক্যটি সরিয়ে দেয় না: জান্নাতের লোক এবং জাহান্নামের লোক তাদের পিতাদের ঔরসে থাকা অবস্থাতেই সংশ্লিষ্ট গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি। নববীর শরহেও মূল হাদিসটি একই ভাষায় সংরক্ষিত হয়েছে, যদিও তিনি মুসলিম শিশুদের জান্নাতি হওয়ার পরবর্তী সুন্নি অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। [20]
ইবনে মাজাহ: পিতার মেরুদণ্ডেই ভবিষ্যত নির্ধারণ
ইবনে মাজাহর হাদিসে বলা হয়েছে, পিতার মেরুদণ্ডে অবচেতন থাকতেই কে জাহান্নামে আর কে জান্নাতে যাবে তা নির্ধারিত বিষয়। অর্থাৎ সে ভালো কাজ করবে না খারাপ কাজ, সেসব কাজ করার আগেই তার ভাগ্য নির্ধারিত [21] –
সুনানে ইবনে মাজাহ
অধ্যায়ঃ ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ১০. তাকদীর (রাঃ) ভাগ্যলিপির বর্ণনা
৭/৮২। উম্মুল মুমিনীন আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আনসার সম্প্রদায়ের এক বালকের জানাযা পড়ার জন্য ডাকা হল। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! তার জন্য সুসংবাদ, সে জান্নাতের চড়ুই পাখিদের মধ্যে এক চড়ুই যে পাপ কাজ করেনি এবং তা তাকে স্পর্শও করেনি। তিনি বলেনঃ হে আয়িশাহ! এর ব্যতিক্রমও কি হতে পারে? নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা একদল লোককে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে অবচেতন থাকতেই তিনি তাদেরকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি জাহান্নামের জন্যও একদল সৃষ্টি করেছেন। তারা তাদের পিতাদের মেরুদন্ডে অবচেতন থাকতেই তিনি তাদের জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: মুসলিম ২৬৬২/১-২, নাসায়ী ১৯৪৭, আবূ দাঊদ ৪৭১৩, আহমাদ ২৩৬১২, ২৫২১৪।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)
ধ্রুপদি আকিদায় এটি প্রান্তিক বক্তব্য নয়
“জান্নাতের জন্য সৃষ্টি” এবং “জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি” ভাষাকে কোনো একক দুর্বল বা প্রান্তিক বর্ণনার ওপর দাঁড় করানো যায় না। ইবন বাট্টার আল-ইবানাহ আল-কুবরা-তে তাকদীরের একটি পুরো অধ্যায়ের শিরোনামই রাখা হয়েছে—আল্লাহ যাকে ইচ্ছা জান্নাতের জন্য এবং যাকে ইচ্ছা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাঁর জ্ঞান পূর্বেই তা নির্ধারণ করেছে, তাঁর বিধান কার্যকর হয়েছে এবং কলম তা লিখেছে; যে এটি অস্বীকার করে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত। একই অধ্যায়ে উমরের সূত্রে উপরের হাদিসটি আবার উদ্ধৃত হয়েছে। [22]
فَمَنْ شَاءَ خَلَقَهُ لِلْجَنَّةِ وَمَنْ شَاءَ خَلَقَهُ لِلنَّارِ.
বাংলা অনুবাদ:“যাকে তিনি ইচ্ছা করেছেন তাকে জান্নাতের জন্য এবং যাকে ইচ্ছা করেছেন তাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”
বাগাভির শরহুস সুন্নাহ-র “তাকদীরের প্রতি ঈমান” অধ্যায়েও একই বর্ণনা স্থান পেয়েছে। সেখানে “জান্নাতের জন্য সৃষ্টি”, “জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি” এবং সংশ্লিষ্ট শ্রেণির কাজ করিয়ে নেওয়ার পুরো কাঠামো সংরক্ষিত। ফলে এটি শুধু একটি হাদিসগ্রন্থের বিচ্ছিন্ন পাঠ নয়; পরবর্তী সুন্নি আকিদা ও হাদিস-ব্যাখ্যার সাহিত্যেও এটি তাকদীরের আলোচনার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। [23]। আকীদা গ্রন্থের বিস্তারিত আলোচনা জ্ঞানকোষ পাতার অন্য প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে।
ইবন তাইমিয়া: কাজের আগেই জান্নাতি ও জাহান্নামি জানা ও নির্ধারিত
ইবন তাইমিয়া মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া-র তাকদীর আলোচনায় একই হাদিস উদ্ধৃত করার পর এর প্রথম স্তর হিসেবে আল-কদর আল-সাবিক বা পূর্ববর্তী তাকদীরের কথা বলেন। তাঁর ভাষায়, আল্লাহ মানুষ কাজ করার আগেই জানতেন কে জান্নাতবাসী এবং কে জাহান্নামবাসী; এই পূর্বজ্ঞান ও পূর্বলিখন বিশ্বাস করা আবশ্যক। তিনি বুখারি-মুসলিমের সেই বর্ণনাও একই আলোচনায় আনেন যেখানে প্রত্যেকের জান্নাত ও জাহান্নামের আসন আগে থেকেই লিখিত এবং প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করে দেওয়ার কথা আছে। [24]
اللَّهُ سُبْحَانَهُ عَلِمَ أَهْلَ الْجَنَّةِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَعْمَلُوا الْأَعْمَالَ.
বাংলা অনুবাদ:“মানুষ কাজ করার আগেই আল্লাহ জানতেন কে জান্নাতের লোক এবং কে জাহান্নামের লোক।”
ইবন তাইমিয়ার আলোচনার গুরুত্ব হলো, তিনি মূল হাদিসটিকে অস্বীকার বা রূপক করে দেননি। বরং এটিকে পূর্ববর্তী তাকদীরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং সঙ্গে পূর্বলিখিত আসন ও “যার জন্য সৃষ্টি, তার জন্য সহজ করে দেওয়া” বর্ণনাকে যুক্ত করেছেন। পরবর্তী ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা মানুষের ইচ্ছা ও কর্মকে বাস্তব বলে বর্ণনা করলেও পূর্বতাকদীর, ঐশ্বরিক সৃষ্টি, লিখিত গন্তব্য এবং সেই গন্তব্যের উপযোগী কাজের কার্যকারিতা—এই স্তরগুলো অক্ষত থাকে।
“কাজ করো”—কিন্তু ফল কি অন্য হতে পারে?
এই সব বর্ণনায় “আমল করো” নির্দেশটি প্রায়ই স্বাধীন ইচ্ছার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু “আমল করো” একটি আদেশ; এটি নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে ব্যক্তি পূর্বনির্ধারিত ফলের বিপরীত ফল বাস্তবে ঘটাতে সক্ষম। বরং সহিহ বুখারির বক্তব্যে আদেশটির পরেই বলা হচ্ছে—প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। আবু দাউদ ও মুআত্তায় বলা হচ্ছে—যাকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজ করানো হয়; যাকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করানো হয়। ফলে আমল করার নির্দেশ এবং পূর্বনির্ধারিত পরিণতি পরস্পরের বিকল্প নয়; ধর্মীয় উৎসে আমলটিকেই সেই পূর্বনির্ধারিত পরিণতিতে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে রাখা হয়েছে।
এই পার্থক্যটি মৌলিক। কোনো ব্যক্তি যদি জান্নাতের জন্য নির্ধারিত হয় এবং তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজ করানো হয়, তাহলে তার নেক আমল পূর্বনির্ধারণ বাতিল করছে না; বরং পূর্বনির্ধারণ বাস্তবায়ন করছে। একইভাবে জাহান্নামের জন্য নির্ধারিত ব্যক্তির পাপকর্মও তাকদীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে একটি স্বাধীন নতুন ফল তৈরি করছে না; বরং সেই কাজের মাধ্যমেই পূর্বনির্ধারিত জাহান্নামের পরিণতি সম্পন্ন হচ্ছে। তাই “মানুষ কাজ করে বলেই সে দায়ী”—এই উত্তর কার্যকারণ-সমস্যাটিকে এক ধাপ পিছিয়ে দেয়: প্রশ্ন থেকে যায়, কোন শ্রেণির কাজ সে করবে এবং সেই কাজের ওপরই তার মৃত্যু হবে—এই ধারাটি কে নির্ধারণ ও কার্যকর করেছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উৎসের নিজের ভাষায় মানুষ নির্ধারিত গন্তব্যের বিপরীত পরিণতি তৈরি করতে পারে—এমন কোনো বক্তব্য এখানে নেই। বরং বিভিন্ন বর্ণনা একে অপরকে শক্তিশালী করে: গন্তব্য লিখিত; মানুষ সংশ্লিষ্ট গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি; তাকে সেই গন্তব্যের কাজের দিকে সহজ করা হয়; কিছু বর্ণনায় তার দ্বারা সেই কাজ করানো হয়; সে সেই কাজের ওপর মারা যায়; এবং সেই কাজের মাধ্যমেই পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে প্রবেশ করে। এই ধারাবাহিকতা শুধু ভবিষ্যৎ জানা নয়, বরং ভবিষ্যৎ ফল এবং তার দিকে নিয়ে যাওয়া কর্মপ্রবাহকে একই তাকদীরগত কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে।
মানুষের ইচ্ছা আছে—কিন্তু সেই ইচ্ছার স্রষ্টাও আল্লাহ
প্রচলিত সুন্নি ধর্মতত্ত্ব মানুষের ইচ্ছা ও কাজকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না। মানুষ ইচ্ছা করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাস্তব অর্থেই কাজ করে। কিন্তু একই সঙ্গে বলা হয়, মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন, তার ক্ষমতা আল্লাহর সৃষ্টি এবং তার কাজও আল্লাহর সৃষ্টি। IslamQA-তে উদ্ধৃত সুন্নি আকিদার ভাষায়, মানুষ বাস্তব অর্থে কাজ করলেও তার কাজ, ক্ষমতা ও ইচ্ছার স্রষ্টা আল্লাহ। [25]
الْعِبَادُ فَاعِلُونَ حَقِيقَةً، وَاللَّهُ خَالِقُ أَفْعَالِهِمْ … وَلِلْعِبَادِ قُدْرَةٌ عَلَى أَعْمَالِهِمْ، وَلَهُمْ إِرَادَةٌ، وَاللَّهُ خَالِقُ قُدْرَتِهِمْ وَإِرَادَتِهِمْ.
বাংলা অনুবাদ:“বান্দারা বাস্তব অর্থেই কাজ করে, কিন্তু আল্লাহ তাদের কাজের স্রষ্টা। বান্দাদের নিজেদের কাজ করার ক্ষমতা ও ইচ্ছা আছে; আবার সেই ক্ষমতা ও ইচ্ছার স্রষ্টাও আল্লাহ।”
ইবন তাইমিয়াও মানুষের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল বলেছেন। অর্থাৎ মানুষ চায়, কিন্তু সেই চাওয়ার অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। [26]
مَشِيئَةُ الْعَبْدِ مُعَلَّقَةٌ بِمَشِيئَةِ اللَّهِ.
বাংলা অনুবাদ:“বান্দার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।”
সুন্নি সমন্বয়বাদ: সৃষ্ট ইচ্ছাকেই স্বাধীনতার ভিত্তি করা
Islamweb সুন্নি অবস্থানকে জাবরিয়া ও কাদরিয়ার মাঝামাঝি হিসেবে উপস্থাপন করে: মানুষকে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করা হয়; মহাবিশ্বের কিছুই আল্লাহর তাকদীরের বাইরে যায় না; আল্লাহ মানুষ ও তার ইচ্ছার স্রষ্টা; আবার মানুষকেই নিজের কাজের কর্তা বলা হয়। [27]
وَالْوَسَطُ ـ وَهُمْ أَهْلُ السُّنَّةِ ـ فَالْعَبْدُ عِنْدَهُمْ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ … يُؤْمِنُ بِقَضَاءِ اللَّهِ وَقَدَرِهِ الَّذِي لَا يَخْرُجُ عَنْهُ شَيْءٌ فِي الْكَوْنِ … فَاللَّهُ خَالِقٌ لِلْعَبْدِ وَإِرَادَتِهِ، وَالْعَبْدُ فَاعِلٌ لِفِعْلِهِ حَقِيقَةً.
বাংলা অনুবাদ:“আহলুস সুন্নাহর মতে বান্দাকে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করা হয় … আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরের বাইরে মহাবিশ্বের কিছুই যায় না … আল্লাহ বান্দা ও তার ইচ্ছার স্রষ্টা, আবার বান্দাও বাস্তব অর্থে নিজের কাজের কর্তা।”
এই সমন্বয় মূল বিরোধের সমাধান করে না। মানুষের ইচ্ছা আছে এবং মানুষের ইচ্ছা স্বাধীন এক কথা নয়। যদি মানুষের ইচ্ছা আল্লাহ সৃষ্টি করেন, সেই ইচ্ছার কার্যকারিতা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, মানুষের কাজও আল্লাহ সৃষ্টি করেন এবং পূর্বলিখিত ফলের বাইরে যাওয়া অসম্ভব হয়, তাহলে মানুষ কাজটির তাৎক্ষণিক কর্তা হলেও তাকে কাজটির চূড়ান্ত স্বাধীন উৎস বলা যায় না। বাহ্যিকভাবে কেউ তাকে জোর না করলেও তার ভেতরের ইচ্ছাটিই পূর্বনির্ধারিত ফল বাস্তবায়নের মাধ্যম হতে পারে।
IslamQA-র একটি উদাহরণে বলা হয়েছে, মানুষ নিজের ইচ্ছায় গাড়ি কেনে বা প্রশ্ন করে; কেউ তাকে বাইরে থেকে বাধ্য করে না। অথচ একই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আসমান ও জমিনে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। [28]
وَلَكِنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا وَفَعَلَهُ عَلِمْنَا أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَدْ أَرَادَهُ … فَلِكَمَالِ رُبُوبِيَّتِهِ لَا يَقَعُ شَيْءٌ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا بِمَشِيئَتِهِ تَعَالَى.
বাংলা অনুবাদ:“বান্দা যখন কোনো কিছু ইচ্ছা করে এবং তা করে, তখন আমরা জানি যে আল্লাহও সেটি ইচ্ছা করেছেন … তাঁর পরিপূর্ণ প্রভুত্বের কারণে আসমান ও জমিনে তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না।”
বাহ্যিক জবরদস্তি না থাকা স্বাধীন ইচ্ছার প্রমাণ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ব্যক্তি একই সম্পূর্ণ পরিস্থিতিতে বাস্তবভাবে বিপরীত সিদ্ধান্ত নিতে পারত কি না। IslamQA-র অন্য একটি ব্যাখ্যায় আবার সরাসরি বলা হয়েছে, সৃষ্টির আগেই যা লিখিত হয়েছে তা কেউ পরিবর্তন করতে পারে না, কেউ সেই তাকদীরের বাইরে যেতে পারে না এবং আল্লাহ তার জন্য যা লিখেছেন তার বিরোধিতা করতে পারে না। [2]
أَحَدًا لَا يُغَيِّرُ مَا قَدْ كُتِبَ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُخْلَقَ، وَلَا بِإِمْكَانِهِ أَنْ يَخْرُجَ عَنْهُ … وَالْحِكْمَةُ الْكَوْنِيَّةُ الْقَدَرِيَّةُ لَا يَخْرُجُ عَنْهَا أَحَدٌ، وَلَا يُخَالِفُ مَا كَتَبَ اللَّهُ لَهُ.
বাংলা অনুবাদ:“সৃষ্টির আগেই যা লিখে রাখা হয়েছে কেউ তা পরিবর্তন করতে পারে না এবং তার পক্ষে তা থেকে বের হওয়াও সম্ভব নয় … মহাজাগতিক তাকদীরের বিধান থেকে কেউ বের হয় না এবং আল্লাহ তার জন্য যা লিখেছেন, তার বিরোধিতা করতে পারে না।”
এখানেই সমন্বয়বাদী ব্যাখ্যার যুক্তিগত বিরোধ স্পষ্ট। যদি জাহান্নাম কারও জন্য পূর্বলিখিত হয় এবং সে বাস্তবে জান্নাতে যেতে পারে, তাহলে পূর্বলিখিত তাকদীর অমোঘ নয়। আর যদি সে জান্নাতে যেতে না পারে, তাহলে জাহান্নাম সম্ভাব্য বহু ফলের একটি নয়; সেটিই একমাত্র বাস্তব ফল। সেই ফলের দিকে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলো তার নিজের মনের ভেতর দিয়ে ঘটছে—এতে ফলটির পূর্বনির্ধারিত চরিত্র বদলায় না।
সুতরাং একই সঙ্গে তিনটি দাবি অক্ষত রাখা যায় না: তাকদীর অমোঘ; মানুষের ইচ্ছা ও কাজ আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর ইচ্ছার অধীন; অথচ মানুষ এমন স্বাধীন নৈতিক কর্তা যে পূর্বনির্ধারিত কাজের সম্পূর্ণ দায় শুধু তার। প্রথম দুটি সত্য হলে তৃতীয় দাবির প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা থাকে না। আর তৃতীয়টির জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা সত্য হলে প্রথম দুটি দাবির সর্বব্যাপী নির্ধারণ দুর্বল করতে হয়। “মানুষও কাজের কর্তা” বলা এই বিরোধ দূর করে না; কারণ প্রশ্ন মানুষের হাত দিয়ে কাজটি ঘটেছে কি না নয়, বরং সে আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ফলের বিপরীত কিছু বাস্তবে করতে পারত কি না।
পূর্বজ্ঞান নয়, কার্যকর তাকদীর
তাকদীরের সমস্যাকে কেবল সর্বজ্ঞতার সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করলে মূল উৎসের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কেবল পূর্বজ্ঞান থাকলে বলা যেত—আল্লাহ জানেন ব্যক্তি কী করবে, কিন্তু তার সিদ্ধান্তে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেন না। অথচ প্রচলিত সুন্নি আকিদা চারটি স্তর স্বীকার করে: আল্লাহ জানেন, লিখে রাখেন, ইচ্ছা করেন এবং সৃষ্টি করেন। মানুষের কাজও সেই সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। এর সঙ্গে যখন “জান্নাতের জন্য সৃষ্টি”, “জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি”, “যার জন্য সৃষ্টি তার জন্য সহজ করা”, এবং “তার দ্বারা জান্নাতী বা জাহান্নামীদের কাজ করানো”—এই বর্ণনাগুলো যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি নিছক ভবিষ্যৎ দেখা নয়।
পূর্বজ্ঞান কোনো ঘটনার কারণ নাও হতে পারে। কেউ সূর্যগ্রহণ আগে থেকে নিখুঁতভাবে জানলে তার জ্ঞান সূর্যগ্রহণ ঘটায় না। কিন্তু তাকদীরের আলোচিত কাঠামোতে আল্লাহ বাইরের দর্শক নন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তার ক্ষমতা ও ইচ্ছা সৃষ্টি করেছেন, তার কাজ সৃষ্টি করেছেন, গন্তব্য লিখেছেন, গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং সেই গন্তব্যের কাজের দিকে তাকে সহজ বা ব্যবহৃত করেন। ফলে “আল্লাহ আগে থেকেই জানতেন” উপমা এই সম্পূর্ণ causal structure ধারণ করে না।
এই পার্থক্যটি নৈতিক প্রশ্নে নির্ধারক। একজন পর্যবেক্ষক ভবিষ্যৎ জানলেও ব্যক্তির সিদ্ধান্তের লেখক নন। কিন্তু কোনো সত্তা যদি ব্যক্তি, তার সিদ্ধান্তক্ষমতা, তার আকাঙ্ক্ষা, তার পরিবেশ এবং তার কাজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত স্রষ্টা হন, তাহলে তার ভূমিকা পর্যবেক্ষকের চেয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন। মানুষের কাজের নিকটবর্তী কারণ মানুষ হতে পারে, কিন্তু ইসলামি তাকদীরের কাঠামোয় চূড়ান্ত ontological কারণ আল্লাহ।
একই সত্তা গন্তব্য নির্ধারণ, কাজ সৃষ্টি এবং বিচার করলে
জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য সৃষ্টির হাদিসে কার্যকারণ-শৃঙ্খলটি বিশেষভাবে কঠোর। প্রথমে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়। এরপর তাকে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির কাজ করানো হয়। তারপর সে সেই কাজের ওপর মারা যায়। শেষে সেই কাজের কারণেই নির্ধারিত গন্তব্যে প্রবেশ করে। অর্থাৎ যে গন্তব্য শুরুতেই সৃষ্টির উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারিত, সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর কাজ মাঝখানে কার্যকর করা হয় এবং শেষে সেই কাজই আবার বিচারিক কারণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জাহান্নামের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ নৈতিক সমস্যা তৈরি করে। কোনো মানুষ নিজেকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। সে আদমের বংশে জন্ম নেওয়া, নিজের মানসিক প্রকৃতি, সময়, সমাজ, পরিবার, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, বুদ্ধিমত্তা, আবেগ, বিশ্বাসগ্রহণের প্রবণতা কিংবা আল্লাহর হেদায়াত পাবে কি না—কোনোটিই জন্মের আগে নির্বাচন করেনি। ইসলামী উৎস যদি আরও বলে যে তাকে শুরু থেকেই জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করানো হয়েছে, তাহলে তার শেষ কাজকে পুরো কার্যকারণ-শৃঙ্খল থেকে বিচ্ছিন্ন করে “এই কাজের জন্য সে নিজেই দায়ী” বলা অসম্পূর্ণ।
এখানে একটি মৌলিক অসমতা রয়েছে। জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ তাকে এমন কাজ করান যা তাকে পুরস্কারের দিকে নিয়ে যায়; জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাকে এমন কাজ করান যা শাস্তির দিকে নিয়ে যায়। দুই ব্যক্তিই নিজেদের জীবনযাত্রায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে বলে অনুভব করতে পারে, কিন্তু ঐশ্বরিক স্তরে তাদের গন্তব্য ও কাজের শ্রেণি শুরু থেকেই ভিন্নভাবে বিন্যস্ত। তখন পুরস্কার ও শাস্তির নৈতিক ভিত্তি ব্যক্তির সমান স্বাধীন সুযোগের ওপর দাঁড়ায় না।
শাস্তির ন্যায়সঙ্গত ভিত্তির সমস্যা
শাস্তিকে ন্যায়সঙ্গত বলতে হলে সাধারণভাবে অপরাধীকে এমন একটি কাজের জন্য দায়ী করা হয় যা সে বুঝে, নিজের নিয়ন্ত্রণে এবং বাস্তব বিকল্প থাকা অবস্থায় করেছে। ব্যক্তি যত বেশি নিয়ন্ত্রণ হারায়, নৈতিক ও আইনি দায় সাধারণত তত কমে। জবরদস্তি, গুরুতর মানসিক অক্ষমতা, প্রতারণা বা সিদ্ধান্তক্ষমতার অভাব দায়ের মাত্রা বদলে দেয়। কারণ ন্যায়বিচার শুধু “কার হাত দিয়ে কাজটি ঘটেছে” দেখে না; কাজটির পেছনে ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প সামর্থ্যও দেখে।
তাকদীরের এই বর্ণনায় নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ স্তর মানুষের কাছে নয়। মানুষ নিজের তাৎক্ষণিক ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করলেও তার ইচ্ছা আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহর ইচ্ছার অধীন এবং পূর্বলিখিত তাকদীরের বিপরীত ফল তৈরি করতে অক্ষম। জাহান্নামের জন্য সৃষ্ট ব্যক্তিকে যদি জাহান্নামীদের কাজ করানো হয়, তাহলে তার শাস্তির ক্ষেত্রে স্রষ্টার কার্যকর ভূমিকা কোনো দুর্ঘটনামূলক বা পার্শ্ববর্তী বিষয় নয়; সেটিই সম্পূর্ণ ব্যবস্থার কেন্দ্র।
একজন মানুষের পাপকে আল্লাহ নৈতিকভাবে পছন্দ করেন না—এটি এই causal problem দূর করে না। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব নিজেই আল্লাহর শরিয়তগত ইচ্ছা এবং তাকদীরগত ইচ্ছাকে আলাদা করে। কোনো পাপ শরিয়তগতভাবে নিষিদ্ধ হলেও তাকদীরগতভাবে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে ঘটতে পারে না। তাই “আল্লাহ পাপের আদেশ দেননি” সত্য হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—কেন এমন মানুষ সৃষ্টি করা হলো যার গন্তব্য জাহান্নাম, কেন তার ইচ্ছা ও কাজের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব ঐশ্বরিক সৃষ্টির মধ্যে রাখা হলো, এবং কেন তার দ্বারা সেই গন্তব্যের কাজ কার্যকর করা হলো?
তাকদীরের দ্বন্দ্ব, জাবরিয়া–কাদরিয়া এবং সুন্নি সমন্বয়বাদের ঐতিহাসিক পটভূমি
তাকদীর ও মানবীয় দায়বদ্ধতার এই বিরোধ আধুনিক সমালোচকদের আবিষ্কার নয়; ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগেই মুসলিম চিন্তকদের সামনে সমস্যাটি উপস্থিত হয়েছিল। কোরআন ও হাদিসের একগুচ্ছ বক্তব্যে মানুষের কাজ, ইচ্ছা, হেদায়াত, পথভ্রষ্টতা এবং চূড়ান্ত পরিণতিকে আল্লাহর ইচ্ছা ও পূর্বনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; আবার অন্যদিকে মানুষকে তার কাজের জন্য দায়ী, শাস্তিযোগ্য এবং পুরস্কারযোগ্যও বলা হয়েছে। এই দুই ধারার বক্তব্যকে সরল অর্থে পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়: মানুষের কাজ যদি আল্লাহর পূর্বনির্ধারণ ও কার্যকর ইচ্ছার বাইরে যেতে না পারে, তাহলে সেই কাজের জন্য পূর্ণ নৈতিক দায় মানুষের ওপর কীভাবে বর্তাবে? উমাইয়া যুগেই এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক শুরু হয়, তা নিছক ধর্মতাত্ত্বিক তর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; খুব দ্রুত তা শাসকের বৈধতা, রাজনৈতিক অন্যায়, বিদ্রোহ এবং নাগরিকের নৈতিক দায়ের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। Encyclopaedia Iranica-ও উল্লেখ করেছে যে স্বাধীন ইচ্ছা বনাম পূর্বনির্ধারণের বিতর্ক উমাইয়া যুগ থেকেই রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছিল। [29]
Free will versus predestination was an important theological debate, with political implications, in Muslim society dating back to Omayyad times. At one extreme … Jabrīya [held] that man’s deeds as well as good and evil resulted from God’s decrees and pre-ordination. At the other extreme … Qadarīya … recognized the freedom of human will and the individual’s moral responsibility for his deeds.
বাংলা অনুবাদ:“স্বাধীন ইচ্ছা বনাম পূর্বনির্ধারণের প্রশ্ন মুসলিম সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল এবং উমাইয়া যুগ থেকেই এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। এক প্রান্তে জাবরিয়া-প্রবণতায় মানুষের কাজ এবং ভালো-মন্দকে আল্লাহর ফয়সালা ও পূর্বনির্ধারণের ফল হিসেবে দেখা হতো; অন্য প্রান্তে কাদরিয়ারা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও নিজের কাজের জন্য ব্যক্তিগত নৈতিক দায় স্বীকার করত।”
পরবর্তী গ্রন্থে যাদের জাবরিয়া নামে চিহ্নিত করা হয়েছে, তারা কঠোর পূর্বনির্ধারণের দিকে ঝুঁকেছিল। এই ধারার চরম রূপে মানুষের কাজের স্বাধীন উৎপাদক হিসেবে মানুষকে স্বীকার করা হয়নি; মানুষের কাজও আল্লাহর নির্ধারণ ও সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে। বিপরীতে কাদরিয়া নামে পরিচিত প্রবণতা মানুষের নিজের কাজের জন্য মানুষেরই প্রকৃত দায়ের ওপর জোর দেয়। কাদরিয়ারা একক, সুসংগঠিত দল ছিল—এভাবে ইতিহাসকে সরল করা ঠিক হবে না; প্রাথমিক সূত্রে নামটি বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর ব্যবহৃত হয়েছে এবং মতগুলোর মধ্যেও পার্থক্য ছিল। কিন্তু তাদের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি স্পষ্ট ছিল: যদি মানুষ নিজের অন্যায়ের প্রকৃত কর্তা না হয়, তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়া এবং বিশেষত কোনো শাসককে তার অত্যাচারের জন্য দায়ী করা কীভাবে সম্ভব? অক্সফোর্ডের Handbook of Islamic Theology-এ প্রাথমিক কাদরিয়াদের আলোচনায় মানবীয় স্বাধীন ইচ্ছা, আন্দোলনটির রাজনৈতিকীকরণ এবং উমাইয়া রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। [30]
এই তর্ক রাজনৈতিকভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ পরিষ্কার। যদি খলিফার ক্ষমতালাভ, তার শাসন এবং তার কার্যকলাপকে আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ইচ্ছার বাস্তবায়ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে শাসকের কাজের বিরুদ্ধে নৈতিক আপত্তির জায়গা সংকুচিত হয়। কোনো শাসক ক্ষমতায় আছে—কারণ আল্লাহ তা ঘটতে দিয়েছেন; তার শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও তখন আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব। উমাইয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শাসনকে আল্লাহপ্রদত্ত বৈধতার ভাষায় উপস্থাপনের প্রমাণ আছে। দরবারি কবিতায় খলিফাদের খলিফাত আল্লাহ—“আল্লাহর প্রতিনিধি”—বলা হয়েছে, এবং পরবর্তী উমাইয়া শাসকেরা ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপও করেছেন। Cambridge-এর ইতিহাসবিদ Ira Lapidus উল্লেখ করেছেন যে পরবর্তী উমাইয়ারা ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতেন এবং কাদরি চিন্তকদের দমন ও মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল; একই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খলিফাকে “God’s deputy” হিসেবে মহিমান্বিত করা হতো। [31]
The later Umayyads assumed the right to intervene in theological matters … Their court poets bestowed on them the grandiose title of God’s deputy (khalifat Allah).
বাংলা অনুবাদ:“পরবর্তী উমাইয়া শাসকেরা ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার নিজেদের হাতে নিয়েছিলেন … তাদের দরবারি কবিরা তাদের ‘আল্লাহর প্রতিনিধি’—খলিফাত আল্লাহ—এই মহিমান্বিত উপাধি দিয়েছিল।”
পূর্বনির্ধারণের এই রাজনৈতিক ব্যবহার শাসকের দায়কে কার্যত দুর্বল করতে পারত। যদি শাসকের উত্থান, বিজয়, ক্ষমতা এবং কাজ সবই আল্লাহর নির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অভিযোগের সামনে শাসককে জবাবদিহিমূলক নৈতিক কর্তা হিসেবে না দেখে ঐশ্বরিক পরিকল্পনার যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। Cambridge-এর সাম্প্রতিক গবেষণাতেও জাবরি অবস্থানের এই রাজনৈতিক পরিণতি স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে: মানুষের কাজ পূর্বনির্ধারিত হলে অন্যায়কারী শাসকের কাজও সেই পূর্বনির্ধারণের অংশ; সে ক্ষেত্রে শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। [32]
If humans are predestined to behave in a certain way and have no power over their actions, then believers should not revolt against the injustices of a ruler.
বাংলা অনুবাদ:“মানুষ যদি নির্দিষ্টভাবে আচরণ করতে পূর্বনির্ধারিত হয় এবং নিজের কাজের ওপর তার কোনো ক্ষমতা না থাকে, তাহলে কোনো শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও বিশ্বাসীদের বিদ্রোহ করা উচিত নয়—এই রাজনৈতিক ফল সেই মত থেকে অনুসরণ করতে পারে।”
এই কারণেই মানবীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন একই সঙ্গে শাসকের দায়ের প্রশ্নে পরিণত হয়। কাদরি অবস্থান থেকে বলা সম্ভব হলো—খলিফার অন্যায় খলিফার নিজের অন্যায়; সেটিকে “আল্লাহর তাকদীর” বলে দায়মুক্ত করা যায় না। Encyclopedia.com-এর ইসলামী স্বাধীন ইচ্ছার ঐতিহাসিক আলোচনায় বিষয়টি সরাসরি এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে: কোনো উমাইয়া খলিফার মন্দ কাজ যদি তার নিজের কাজ হয়, আল্লাহর নয়, তাহলে মুসলিমরা সেই কাজের বিরোধিতা করতে পারে এবং এজন্য তাদের আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধী বলে অভিযুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই মাবাদ আল-জুহানি এবং গাইলান আল-দিমাশকির মতো প্রাথমিক কাদরি ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। মাবাদ একটি উমাইয়াবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন এবং পরে নিহত হন; গাইলানের মতও রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এবং উমাইয়া খলিফা হিশামের আমলে তাকেও হত্যা করা হয়। [33]
From this it would follow that the bad acts of an Umayyad caliph were from himself and not from God, and thus good Muslims could oppose such acts without making themselves unbelievers.
বাংলা অনুবাদ:“এ থেকে অনুসরণ করে যে কোনো উমাইয়া খলিফার মন্দ কাজ তার নিজের, আল্লাহর নয়; ফলে মুসলিমরা সেই কাজের বিরোধিতা করতে পারে, অথচ এজন্য তাদের অবিশ্বাসী হতে হয় না।”
অর্থাৎ তাকদীরের বিতর্কের পেছনে শুধু বিমূর্ত প্রশ্ন—“মানুষের ইচ্ছা আছে কি নেই”—ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আরও বিপজ্জনক একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন: খলিফা অত্যাচার করলে দায়ী কে? যদি উত্তর হয় “আল্লাহ তার কাজ সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছু ঘটে না, তার ক্ষমতাও আল্লাহ দিয়েছেন”, তাহলে শাসকের কাজকে ঐশ্বরিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আর যদি উত্তর হয় “খলিফা নিজেই নিজের অন্যায়ের কর্তা”, তাহলে তাকে বিচার, নিন্দা বা অপসারণের নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়। ফলে স্বাধীন ইচ্ছার ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন সরাসরি রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল। কাদরি অবস্থানের রাজনৈতিক আকর্ষণ এখানেই: শাসকের অপরাধকে তাকদীরের আড়ালে লুকিয়ে ফেলা যাবে না।
তবে কাদরিয়াদের সমস্যা ছিল বিপরীত দিকে। মানুষের কাজ যদি মানুষ নিজেই প্রকৃত অর্থে সৃষ্টি করে, তাহলে আল্লাহ “সবকিছুর স্রষ্টা” এবং তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছু ঘটে না—এই শক্তিশালী কোরআনিক ও হাদিসি বক্তব্যগুলোর সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়। আবার কঠোর জাবরি অবস্থান গ্রহণ করলে মানুষের নৈতিক দায়, বিচার, পুরস্কার ও শাস্তি অর্থহীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই দ্বন্দ্ব পরবর্তী মু‘তাযিলি চিন্তায় আরও সুসংগঠিত হয়। মু‘তাযিলারা আল্লাহর ন্যায়বিচার রক্ষা করতে মানুষের কাজের ওপর মানুষের প্রকৃত ক্ষমতার কথা জোর দিয়ে বলেন: আল্লাহ যদি নিজেই মানুষের অবিশ্বাস সৃষ্টি করেন এবং তারপর সেই অবিশ্বাসের জন্য মানুষকে শাস্তি দেন, তাহলে সেই শাস্তিকে ন্যায়সঙ্গত বলা যায় না। Cambridge-এর গবেষণায় মু‘তাযিলি অবস্থানের এই যুক্তিটিই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে—নৈতিক দায়িত্বের অর্থ থাকতে হলে মানুষকে অন্তত এমন ক্ষমতা থাকতে হবে যাতে সে অন্যভাবে কাজ করতে পারত। [34]
The Mu’tazilites asserted that if God were to create a man’s unbelief while commanding him to believe, He would be unjust in punishing him for unbelief, since the man could not, in this situation, help but disbelieve.
বাংলা অনুবাদ:“মু‘তাযিলারা যুক্তি দিয়েছিলেন, আল্লাহ যদি কোনো মানুষের অবিশ্বাস নিজেই সৃষ্টি করেন অথচ তাকে বিশ্বাসের আদেশ দেন, তাহলে সেই অবিশ্বাসের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া অন্যায় হবে; কারণ সে অবস্থায় মানুষের পক্ষে অবিশ্বাস না করা সম্ভব ছিল না।”
কিন্তু মূলধারার সুন্নি ধর্মতত্ত্ব শেষ পর্যন্ত কাদরি বা মু‘তাযিলি সমাধান গ্রহণ করেনি। কারণ মানুষের কর্মকে মানুষের স্বাধীন সৃষ্টি হিসেবে মেনে নিলে আল্লাহর সর্বব্যাপী সৃষ্টিশক্তি ও তাকদীরের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে; আবার মানুষকে সম্পূর্ণ বাধ্য বললে নৈতিক দায় ও পরকালের বিচার ভেঙে পড়ে। এই দুই বিপরীত দাবির কোনোটিকেই উৎস থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না। কোরআন-হাদিসে একদিকে আল্লাহর সর্বব্যাপী ইচ্ছা, পূর্বলিখন, হেদায়াত-পথভ্রষ্টতা ও কর্মসৃষ্টির পক্ষে শক্ত বক্তব্য ছিল; অন্যদিকে আদেশ, নিষেধ, পাপ, সওয়াব, শাস্তি এবং ব্যক্তিগত জবাবদিহির ভাষাও ছিল। ফলে পরবর্তী সুন্নি কালামে সমস্যাটিকে নির্মূল না করে দুই ধরনের বক্তব্যকেই ধরে রেখে তাদের মধ্যে একটি সমন্বয় তৈরির চেষ্টা শুরু হয়।
সমন্বয়ের চেষ্টা: আল্লাহ সৃষ্টি করেন, মানুষ “অর্জন” করে
জাবরিয়া, কাদরিয়া ও পরে মু‘তাযিলাদের দীর্ঘ বিতর্কের মধ্যে সুন্নি কালামে কাসব বা “অর্জন”-এর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আশ‘আরি ধারায় বলা হলো—মানুষের কাজের স্রষ্টা আল্লাহ, কিন্তু মানুষ সেই কাজ “অর্জন” করে এবং সেই কারণে তার জন্য দায়ী হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সর্বব্যাপী সৃষ্টিশক্তি এবং মানুষের নৈতিক দায়—দুটি দাবিই অক্ষত রাখা। [34]
The Ash’arites taught that since God is the sole creator, He creates human actions. In order to safeguard both God’s omnipotence and man’s responsibility, al-Ash’arī … developed a theory of kasb (lit. acquisition) according to which God creates man’s actions while man appropriates them and thus becomes responsible for them.
বাংলা অনুবাদ:“আশ‘আরিদের মতে আল্লাহ একমাত্র স্রষ্টা হওয়ায় মানুষের কাজও তিনিই সৃষ্টি করেন। আল্লাহর সর্বশক্তিমানতা এবং মানুষের দায়—উভয়কে রক্ষা করার জন্য আশ‘আরি ‘কাসব’ বা অর্জনের তত্ত্ব গড়ে তোলেন: আল্লাহ মানুষের কাজ সৃষ্টি করেন, আর মানুষ সেটি অর্জন করে এবং সেই কারণে দায়ী হয়।”
এই সূত্রে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বটির দুই পাশই রাখা হলো: কাজের সৃষ্টি আল্লাহর, কিন্তু দায় মানুষের। পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যায় এই সমন্বয়ের সীমাও স্বীকার করা হয়েছে। Islamweb তাকদীরের চার স্তর এবং মানুষের নির্বাচন—দুটিই মানার পর বলেছে, এদের মধ্যে সমন্বয় “আল্লাহর রহস্যসমূহের একটি”, যা মানুষের বুদ্ধি পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না; শেষ পর্যন্ত বুদ্ধির জন্য আত্মসমর্পণ ও অদৃশ্যে বিশ্বাসই অবশিষ্ট থাকে। [1]
وَالْجَمْعُ بَيْنَ إِثْبَاتِ الْقَدَرِ، وَبَيْنَ إِثْبَاتِ مَشِيئَةِ الْعَبْدِ وَاخْتِيَارِهِ وَكَسْبِهِ لِفِعْلِهِ، إِنَّمَا هُوَ سِرٌّ مِنْ أَسْرَارِ اللَّهِ تَعَالَى، لَا تَحْتَمِلُهُ الْعُقُولُ أَوْ أَكْثَرُهَا؛ فَيَبْقَى لِلْعَقْلِ حُكْمُ التَّسْلِيمِ وَالْإِيمَانِ بِالْغَيْبِ.
বাংলা অনুবাদ:“তাকদীরকে স্বীকার করা এবং একই সঙ্গে বান্দার ইচ্ছা, নির্বাচন ও নিজের কাজ অর্জনকে স্বীকার করার মধ্যে সমন্বয় আল্লাহর রহস্যসমূহের একটি; মানুষের বুদ্ধি, অথবা অধিকাংশ মানুষের বুদ্ধি, তা ধারণ করতে পারে না। ফলে বুদ্ধির জন্য অবশিষ্ট থাকে আত্মসমর্পণ করা এবং অদৃশ্যে বিশ্বাস করা।”
এই পর্যায়ে সমন্বয় আর যুক্তিগত ব্যাখ্যা দেয় না; বিরোধটিকে “রহস্য” ঘোষণা করে ব্যাখ্যার দাবি থেকে সরে যায়। জাবরবাদ মানুষের দায়কে দুর্বল করছিল, আর কাদরি ও মু‘তাযিলি স্বাধীনতা আল্লাহর সর্বব্যাপী তাকদীর ও সৃষ্টিশক্তির সঙ্গে সংঘর্ষে যাচ্ছিল। সুন্নি কালাম দুই ধরনের বক্তব্যই রেখে দেয়। “কাসব” সেই ঐতিহাসিক সমন্বয়ের নাম; কিন্তু নামটি নিজে এই প্রশ্নের উত্তর নয়—আল্লাহ যদি ইচ্ছা ও কাজ সৃষ্টি করেন এবং তাঁর নির্ধারণের বাইরে যাওয়া অসম্ভব হয়, তাহলে সেই কাজের পূর্ণ নৈতিক দায় শুধু মানুষের কেন?
“যার জন্য সৃষ্টি, তার জন্য সহজ”—পুরস্কার ও শাস্তির অসম উৎস
“প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়” বর্ণনাটি নৈতিক অসমতার আরেকটি দিক প্রকাশ করে। জান্নাতের লোককে জান্নাতীদের কাজের দিকে সহজ করা হলে তার নেক কাজের পেছনে ঐশ্বরিক সহায়তা রয়েছে। জাহান্নামের লোককে জাহান্নামীদের কাজের দিকে সহজ করা হলে তার পাপের ক্ষেত্রেও ঐশ্বরিক তাকদীর কার্যকর। ফলে প্রথম ব্যক্তির পুরস্কার শুধু তার স্বনির্মিত নৈতিক উৎকর্ষের ফল নয় এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির শাস্তিও শুধু তার স্বনির্মিত নৈতিক ব্যর্থতার ফল নয়। উভয়ের পেছনেই পূর্ববর্তী ঐশ্বরিক বিভাজন রয়েছে।
এখানে বিশেষ করে “জান্নাতের জন্য সৃষ্টি” ও “জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি” ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। যদি মানুষ প্রথমে নিরপেক্ষভাবে সৃষ্টি হতো, তারপর সম্পূর্ণ স্বাধীন সিদ্ধান্তের ফলে একদল জান্নাত এবং একদল জাহান্নাম অর্জন করত, তাহলে নৈতিক কাঠামো ভিন্ন হতো। কিন্তু বর্ণনাগুলো উল্টো ক্রম দেয়: প্রথমে গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি, তারপর সেই গন্তব্যের কাজ। এই ক্রমটি নৈতিক ফলকে ব্যক্তির কাজের আগেই ঐশ্বরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করে।
ফলে জান্নাতির নেক কাজ এবং জাহান্নামির পাপকর্ম একই অর্থে “স্বনির্মিত” নয়। একজনের নেক কাজকে আল্লাহর তৌফিক ও সহজকরণ ছাড়া কল্পনা করা হয় না; অন্যজনের পাপও আল্লাহর তাকদীরগত ইচ্ছা ও সৃষ্টির বাইরে নয়। কিন্তু পুরস্কার ও শাস্তির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ফল মানুষের ওপর আরোপ করা হয়। এই অসমতার ন্যায়সঙ্গত ব্যাখ্যা শুধু “আল্লাহ ন্যায়বিচারক” ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠিত হয় না; ন্যায়বিচারের দাবি এবং causal structure-এর মধ্যে যুক্তিগত সামঞ্জস্য দেখাতে হয়।
জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি এবং অসীম শাস্তির মাত্রা
সমস্যাটি আরও কঠোর হয়ে ওঠে যখন জাহান্নামের শাস্তিকে দীর্ঘস্থায়ী বা চিরস্থায়ী হিসেবে ধরা হয়। সীমিত জীবনে এমন এক ব্যক্তির বিশ্বাস ও কাজ, যার অস্তিত্ব, মানসিক কাঠামো, ইচ্ছাশক্তি, পরিস্থিতি এবং তাকদীর সবই স্রষ্টার অধীন, সেই ব্যক্তিকে অনন্তকাল শাস্তি দেওয়ার নৈতিক অনুপাত আলাদাভাবে ব্যাখ্যা দাবি করে। এখানে শুধু অপরাধের প্রকৃতি নয়, অপরাধীর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণের মাত্রাও বিবেচ্য।
যদি কোনো ব্যক্তি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি হওয়ার আগেই সেই গন্তব্যের অন্তর্ভুক্ত হয়, তারপর তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করানো হয়, তাহলে শাস্তির পূর্ণ নৈতিক কারণ হিসেবে তার কাজকে ব্যবহার করা একটি বৃত্তাকার কাঠামো তৈরি করে: তাকে নির্দিষ্ট ফলের জন্য সৃষ্টি করা হলো, সেই ফলের কারণস্বরূপ কাজও তার দ্বারা করানো হলো, এবং তারপর সেই কাজের জন্যই তাকে সেই পূর্বনির্ধারিত ফলে পাঠানো হলো। কাজটি তখন পূর্বনির্ধারণের বিকল্প নয়; পূর্বনির্ধারণ বাস্তবায়নের মাধ্যম।
সমস্যাটি ভাষাগত নয়, কার্যকারণ ও ন্যায়বিচারের
তাকদীরের বিতর্ক অনেক সময় “সৃষ্টি”, “অর্জন”, “তৌফিক”, “খিযলান”, “ইচ্ছা”, “অনুমতি”, “শরিয়তগত ইচ্ছা” এবং “তাকদীরগত ইচ্ছা”—এই বিভিন্ন পরিভাষার মধ্যে ছড়িয়ে যায়। এসব পার্থক্যের ধর্মতাত্ত্বিক গুরুত্ব আছে, কিন্তু মূল নৈতিক প্রশ্ন পরিভাষা বদলালে অদৃশ্য হয় না। প্রশ্নটি সহজ: একজন ব্যক্তি কি আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যের বিপরীত চূড়ান্ত ফল বাস্তবে তৈরি করতে পারে?
যদি পারে, তাহলে পূর্বলিখিত তাকদীর অমোঘ নয়। যদি না পারে, তাহলে তার চূড়ান্ত গন্তব্যের বাস্তব বিকল্প ছিল না। একইভাবে প্রশ্ন হলো, তার ইচ্ছা কি এমন এক স্বাধীন উৎস যার অস্তিত্ব ও দিকনির্দেশ আল্লাহ সৃষ্টি করেননি? যদি হয়, তাহলে “আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা” এবং “মানুষের ইচ্ছার স্রষ্টাও আল্লাহ” মতবাদের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক। যদি না হয়, তাহলে মানুষের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত নৈতিক উৎস হিসেবে ব্যবহার করা সমস্যাজনক।
এই দ্বন্দ্বকে “রহস্য” বলা যেতে পারে, কিন্তু রহস্য বলা যৌক্তিক সামঞ্জস্য প্রদর্শনের সমান নয়। দুটি বক্তব্য একসঙ্গে সত্য বলে ঘোষণা করা এবং কীভাবে দুটো পরস্পরবিরোধী নয় তা দেখানো আলাদা বিষয়। একদিকে বলা হচ্ছে আল্লাহর তাকদীর থেকে কেউ বের হতে পারে না, মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন, মানুষের ইচ্ছা ও কাজ আল্লাহর সৃষ্টি এবং কিছু মানুষ জান্নাত বা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি; অন্যদিকে বলা হচ্ছে মানুষ এমনভাবে স্বাধীন যে তার চূড়ান্ত পুরস্কার বা শাস্তির পূর্ণ নৈতিক দায় কেবল তার নিজের। দ্বিতীয় দাবিটির সঙ্গে প্রথম দাবিগুলোর কার্যকারণগত সম্পর্ক ব্যাখ্যা করাই মূল সমস্যা।
উপসংহার
জান্নাতী ও জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেওয়ার বর্ণনা ইসলামী তাকদীরের সমস্যাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে আনে। এখানে আল্লাহ কেবল মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন—এমন একটি নিষ্ক্রিয় সর্বজ্ঞতার ধারণা পাওয়া যায় না। কিছু মানুষকে জান্নাতের জন্য এবং কিছু মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে; প্রত্যেককে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সহজ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে; এবং আরও সরাসরি বর্ণনায় জান্নাতের জন্য সৃষ্ট ব্যক্তির দ্বারা জান্নাতীদের কাজ ও জাহান্নামের জন্য সৃষ্ট ব্যক্তির দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই কাজের ওপর তাদের মৃত্যু ঘটে এবং সেই কাজের মাধ্যমেই তারা পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে।
প্রচলিত সুন্নি ধর্মতত্ত্ব মানুষের ইচ্ছা ও কাজকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না। মানুষ ইচ্ছা করে, নির্বাচন করে এবং বাস্তব অর্থেই কাজ করে—এই অবস্থান স্বীকার করা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের ইচ্ছা ও ক্ষমতার স্রষ্টা আল্লাহ, মানুষের কাজের স্রষ্টা আল্লাহ, মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল এবং কেউ আল্লাহর তাকদীরের বাইরে যেতে পারে না—এসব দাবিও একই ব্যবস্থার অংশ। ফলে মানুষের ইচ্ছা বাস্তব হলেও স্বনির্ভর নয়; মানুষের কাজ বাস্তব হলেও তার চূড়ান্ত অস্তিত্ব ও কার্যকারণ মানুষের নিজের সৃষ্টি নয়।
এই কাঠামোয় “মানুষ নিজের ইচ্ছায় করেছে” বাক্যটি সমস্যার আংশিক বর্ণনা মাত্র। মানুষ নিজের ইচ্ছায় কাজ করতে পারে, কিন্তু সেই ইচ্ছার অস্তিত্ব, প্রকৃতি, ক্ষমতা ও কার্যকারিতা যদি অন্য একটি সর্বশক্তিমান সত্তার সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণাধীন হয়, তাহলে ব্যক্তিকে সেই ইচ্ছার চূড়ান্ত উৎস বলা যায় না। বাহ্যিক জবরদস্তি না থাকা এবং চূড়ান্ত স্বনির্ধারণ থাকা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ বন্দুকের মুখে বাধ্য না হয়েও এমন এক পূর্বনির্ধারিত কার্যকারণ-শৃঙ্খলের মধ্যে কাজ করতে পারে যার বিপরীত ফল বাস্তবে ঘটার সুযোগ নেই।
জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য সৃষ্টির বর্ণনা সমস্যাটিকে আরও গভীর করে, কারণ এখানে গন্তব্য কাজের পরে নির্ধারিত হচ্ছে না; বরং গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি আগে, সেই গন্তব্যের উপযোগী কাজ পরে। এর ফলে নেক কাজ বা পাপকর্ম পূর্বনির্ধারিত ফলের বিকল্প তৈরি করে না; সেই ফল বাস্তবায়নের মাধ্যম হয়ে ওঠে। জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা ব্যক্তিকে জাহান্নামীদের কাজ করিয়ে তারপর সেই কাজের কারণেই জাহান্নামে পাঠানো হলে শাস্তির কার্যকারণ কাঠামোর কেন্দ্রেই ঐশ্বরিক সিদ্ধান্ত অবস্থান করে।
ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয় যে মানুষ কাজটি করেছে কি না। প্রশ্ন হলো, সে বাস্তবে অন্যভাবে করতে পারত কি না, তার ইচ্ছার চূড়ান্ত উৎস কোথায়, তার গন্তব্যের বিপরীত ফল ঘটানো তার ক্ষমতার মধ্যে ছিল কি না এবং যে সত্তা তার অস্তিত্ব, ইচ্ছা, ক্ষমতা, পরিস্থিতি, কর্ম ও তাকদীরের সর্বশেষ নিয়ন্ত্রক—সেই সত্তার ভূমিকা নৈতিক দায়ের হিসাব থেকে কেন বাদ যাবে। তাৎক্ষণিক কর্তা এবং চূড়ান্ত কারণকে এক করে দেখলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
যদি আল্লাহ জান্নাতের জন্য কাউকে সৃষ্টি করে তার দ্বারা জান্নাতীদের কাজ করান, তাহলে সেই ব্যক্তির জান্নাত লাভকে সম্পূর্ণ স্বনির্মিত নৈতিক সাফল্য বলা যায় না। একইভাবে আল্লাহ যদি কাউকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করে তার দ্বারা জাহান্নামীদের কাজ করান, তাহলে তার জাহান্নাম লাভকে সম্পূর্ণ স্বনির্মিত নৈতিক ব্যর্থতা বলাও অসঙ্গত। দুই ক্ষেত্রেই মানুষের কাজের পেছনে এমন একটি পূর্ববর্তী ঐশ্বরিক ব্যবস্থা কার্যকর, যা মানুষ নিজে নির্বাচন করেনি এবং যার বাইরে সে যেতে পারে না।
ফলে ইসলামী তাকদীরের এই বর্ণনাগুলো নৈতিক দায় ও ঐশ্বরিক ন্যায়বিচারের একটি গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি করে: আল্লাহ গন্তব্য নির্ধারণ করেন, মানুষকে সেই গন্তব্যের জন্য সৃষ্টি করেন, তার ইচ্ছা ও কাজের ক্ষমতা সৃষ্টি করেন, তাকে সেই গন্তব্যের উপযোগী কাজের দিকে পরিচালিত বা ব্যবহৃত করেন, এবং শেষে সেই কাজের কারণেই তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেন। মানুষের কাজ বাস্তব হলেও এই ব্যবস্থায় তার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে নয়। তাই “মানুষ নিজেই কাজ করেছে” বাক্যটি তাকদীর ও ন্যায়বিচারের সমস্যার সমাধান নয়; সমস্যাটির কেন্দ্রই হলো—মানুষ যে কাজটি করেছে, সেই কাজ এবং সেই কাজ করার ইচ্ছার চূড়ান্ত উৎস কার হাতে ছিল।
তথ্যসূত্রঃ
- إسلام ويب – كل ميسر لما خلق له 1 2 3
- الإسلام سؤال وجواب – هل هناك تعارض بين كتابة مصير الإنسان ومطالبته بالعمل؟ 1 2
- সূরা ফাতির ৩৫:৮ ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), আল্লামা আলবানী একাডেমী, হাদিসঃ ৪৭০৩ ↩︎
- সুনান আবু দাউদ, পঞ্চম খণ্ড, আল্লামা আলবানী একাডেমী, পৃষ্ঠা ৪৪৫-৪৪৬ ↩︎
- سنن أبي داود – كتاب السنة – باب في القدر ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিসঃ ৪৬১২ ↩︎
- মুয়াত্তা মালিক, হাদিসঃ ১৬৬০ ↩︎
- মুয়াত্তা ইমাম মালিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬১৬, ৬১৭ ↩︎
- موطأ مالك – كتاب الجامع – باب القدر – النهي عن القول بالقدر ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত), হাদিসঃ ৯৫ ↩︎
- তাহক্বীক্ব মিশকা-তুল মাসা-বীহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০ ↩︎
- সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), ২১৩৫ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ ( মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০-১১১ ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ ( মিশকাত শরীফ), আধুনিক প্রকাশনী, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৬ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬৩০ ↩︎
- صحيح البخاري – كتاب تفسير القرآن – باب فسنيسره للعسرى ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ৬৫৯৬ ↩︎
- صحيح مسلم – كتاب القدر – باب معنى كل مولود يولد على الفطرة وحكم موت أطفال الكفار وأطفال المسلمين ↩︎
- شرح النووي على مسلم – حديث خلق أهل الجنة والنار وهم في أصلاب آبائهم ↩︎
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিসঃ ৮২ ↩︎
- الإبانة الكبرى لابن بطة – باب أن الله خلق من شاء للجنة ومن شاء للنار ↩︎
- شرح السنة للبغوي – كتاب الإيمان – باب الإيمان بالقدر ↩︎
- مجموع فتاوى ابن تيمية – كتاب القدر – معنى حديث خلق أهل الجنة والنار ↩︎
- الإسلام سؤال وجواب – هل الإنسان مسير أو مخير ↩︎
- مجموع فتاوى ابن تيمية – العباد لهم مشيئة وقدرة وفعل ↩︎
- إسلام ويب – للعبد مشيئة وإرادة بها يستحق الحمد أو الذم ↩︎
- الإسلام سؤال وجواب – الإنسان مسير أو مخير ↩︎
- Encyclopaedia Iranica — Free Will ↩︎
- Oxford Handbook of Islamic Theology — The Early Qadariyya ↩︎
- Ira M. Lapidus — Islamic Societies to the Nineteenth Century ↩︎
- God, Evil, and Suffering in Islam — Moral Evil, Freedom, and Predestination ↩︎
- Encyclopedia of Religion — Free Will and Predestination: Islamic Concepts ↩︎
- A Re-examination of al-Ashʿarī’s Theory of Kasb 1 2

