সারসংক্ষেপ
“রোগের কোনো সংক্রমণ নেই”—মুহাম্মদের এই বক্তব্যকে বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে মুসলিম ব্যাখ্যাকারীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার অর্থ ও প্রয়োগ বদলেছেন। একই হাদিসসাহিত্যে সংক্রমণ অস্বীকারের পাশাপাশি অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর সঙ্গে না মেশানো, কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো এবং প্লেগ আক্রান্ত এলাকায় যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ রয়েছে। বেদুইনের উটের পালে রোগ ছড়ানোর পর্যবেক্ষণও অস্বীকৃতির সামনে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে। এই বিরোধ আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞানের আবিষ্কারের পরে তৈরি হয়নি; প্রাচীন মুসলিম গ্রন্থেই আপত্তি এবং তার জবাবে নানা সমন্বয়ের চেষ্টা সংরক্ষিত আছে।
ইবন কুতাইবা রোগীর দীর্ঘ সান্নিধ্যে অন্যের অসুস্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু কুষ্ঠের ক্ষেত্রে তার কারণ বলেছেন দুর্গন্ধ। রোগ ছড়ানোর পর্যবেক্ষণকে গ্রহণ করেও সেটিকে হাদিসে অস্বীকৃত সংক্রমণ থেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছেন তিনি। নববীর নির্বাচিত সমন্বয়ে অস্বীকৃতির অর্থ সংকুচিত হয়েছে: রোগ ছড়ায় না নয়, রোগ আল্লাহর কাজ ও তাকদিরের বাইরে নিজের স্বভাবে ছড়ায় না। এতে রোগীর সংস্পর্শে ক্ষতি হওয়ার বাস্তবতা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার ওপর দৈব নিয়ন্ত্রণ বসানো হয়েছে। সংক্রমণের সাধারণ অস্বীকৃতি এভাবে সংক্রমণ ঘটার ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে। একই ঐতিহ্যে কেউ অসুস্থ পশুকে আলাদা রাখার নির্দেশ রহিত হওয়ার মত দিয়েছেন; কেউ দূরে থাকার কারণ বলেছেন দুর্গন্ধ ও রোগীর চেহারাজনিত অস্বস্তি।
ইবন হাজার ও আইনীর সংরক্ষিত আলোচনায় আরও স্পষ্ট পিঠরক্ষার যুক্তি পাওয়া যায়। আবু উবাইদ ও ইবন খুজাইমার ব্যাখ্যায় রোগী এড়িয়ে চলার উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, তাঁর সংস্পর্শে গিয়ে কেউ অসুস্থ হলে যেন সংক্রমণ ঘটেছে বলে বিশ্বাস না করেন। এখানে রোগ ছড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বাস সংশোধনের পথটিই বন্ধ করা হচ্ছে। আগে স্থির করা হয়েছে, সংক্রমণ নেই; পরে সেই সিদ্ধান্তের বিপরীতে মানুষের অভিজ্ঞতা দাঁড়ানোর সুযোগ ঠেকাতে দূরে থাকার নির্দেশ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে একই আচরণকে কখনো রোগ প্রতিরোধ, কখনো সংক্রমণ অস্বীকারের বিশ্বাস রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আধুনিক ফতোয়াতেও এই অর্থ পরিবর্তন চলেছে। বিন বায রোগী থেকে সুস্থের মধ্যে রোগ স্থানান্তর স্বীকার করে ঘটনাটিকে আল্লাহর অনুমতি ও তাকদিরের অধীন বলেছেন। আল-গুনাইমান জীবাণুর মাধ্যমে সংক্রমণের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান গ্রহণ করে ‘লা আদওয়া’কে নিষেধার্থেও ব্যাখ্যা করেছেন—অর্থাৎ কেউ যেন অন্যকে রোগাক্রান্ত করার কারণ না হন। তাঁর যুক্তির শুরুতেই স্থির রয়েছে, মুহাম্মদের বক্তব্য বাস্তবতার বিরোধী হতে পারে না; এরপর সেই সিদ্ধান্ত রক্ষার উপযোগী অর্থ নির্বাচন করা হয়েছে। এই দীর্ঘ ইতিহাসে অপরিবর্তিত থেকেছে হাদিসকে অভ্রান্ত রাখার দাবি; বদলেছে সংক্রমণ অস্বীকারের অর্থ, রোগীকে এড়ানোর উদ্দেশ্য এবং রোগের কার্যকারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা। বাস্তব প্রমাণের মুখে বক্তব্যের অর্থ পাল্টে তাকে রক্ষা করা হয়েছে; মূল অস্বীকৃতির বৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ভূমিকা
রোগ কীভাবে ছড়ায়, সেই প্রশ্নের উত্তর মানুষের জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। রোগের কারণ সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা চিকিৎসা গ্রহণে বাধা তৈরি করতে পারে, প্রয়োজনীয় সতর্কতাকে অর্থহীন মনে করাতে পারে এবং একজনের অসুস্থতাকে আরও বহু মানুষের বিপদের কারণ করে তুলতে পারে। এই ভুল ধারণা যখন ধর্মীয় কর্তৃত্বের সমর্থন পায়, তখন তার প্রভাব আরও গভীর হয়। ধর্মের নামে প্রচারিত বক্তব্যকে অভ্রান্ত মনে করা মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পরীক্ষিত জ্ঞানকেও সন্দেহ করতে শুরু করতে পারে। সংক্রমণ সম্পর্কে মুহাম্মদের ভুল বক্তব্য এবং সেই ভুল রক্ষার ইসলামি ব্যাখ্যাও মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনরক্ষার এই প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সহিহ হাদিসের একাধিক বর্ণনায় মুহাম্মদের নামে বলা হয়েছে, “রোগের কোনো সংক্রমণ নেই”, অথবা “ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই”। এই বক্তব্যের সঙ্গে এমন একটি ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে, যেখানে এক বেদুইন নিজের উটের পালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর সুস্থ উটগুলোর মধ্যে চর্মরোগে আক্রান্ত একটি উট প্রবেশ করার পর অন্য উটগুলোও একই ধরনের রোগে আক্রান্ত হতো। বেদুইনের প্রশ্নটি ছিল প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে উঠে আসা একটি কার্যকারণসংক্রান্ত প্রশ্ন। মুহাম্মদ এর উত্তরে জানতে চেয়েছিলেন, প্রথম উটটিকে কে আক্রান্ত করেছিল। কিন্তু প্রথম কোনো প্রাণীর রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ এবং আক্রান্ত প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়া দুটি পৃথক অনুসন্ধানের বিষয়। প্রথমটির ব্যাখ্যা চাওয়া দ্বিতীয়টির অস্তিত্ব অস্বীকারের যুক্তি হতে পারে না।
একই হাদিসসাহিত্যে অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর সঙ্গে না মেশানোর নির্দেশ পাওয়া যায়। কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে সিংহের কাছ থেকে পালানোর মতো করে পালাতে বলা হয়েছে। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত এক ব্যক্তিকে সরাসরি সাক্ষাৎ ছাড়াই ফেরত পাঠানোর বিবরণও রয়েছে। আবার প্লেগ দেখা দিয়েছে এমন এলাকায় প্রবেশ এবং সেখানে অবস্থানরত মানুষের বেরিয়ে যাওয়া সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়। একদিকে সংক্রমণ অস্বীকার, অন্যদিকে রোগী ও রোগাক্রান্ত এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশ। এই দুই ধরনের বক্তব্যের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার দায় হাদিসগুলোর অভ্রান্ততা দাবি করা ব্যক্তিদের ওপরই পড়ে। রোগীর সান্নিধ্য যদি অন্যের অসুস্থতার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা না রাখে, তাহলে তাকে এড়িয়ে চলার নির্দেশের ভিত্তি কী? আর রোগীর সান্নিধ্যে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকলে সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্যের অর্থ কী থাকে?
এই সমস্যা আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞান আবিষ্কারের পরে প্রথম দেখা দেয়নি। প্রাচীন মুসলিম ব্যাখ্যাকারীদের আলোচনাতেও হাদিসগুলোর বিরোধ মেলানোর চেষ্টা পাওয়া যায়। সেখানে একটিমাত্র সর্বসম্মত ব্যাখ্যা ছিল না। কেউ বলেছেন, রোগের নিজস্ব ক্ষমতায় সংক্রমণ ঘটে না, আল্লাহ চাইলে ঘটে। কেউ একটি বক্তব্যের মাধ্যমে অন্য বক্তব্য রহিত হওয়ার সম্ভাবনা তুলেছেন। কেউ রোগী এড়িয়ে চলার কারণ হিসেবে দুর্গন্ধ, শারীরিক অস্বস্তি কিংবা সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানোর আশঙ্কার কথা বলেছেন। এসব ব্যাখ্যার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আজ যে ব্যাখ্যাকে মুহাম্মদের বক্তব্যের একমাত্র সুস্পষ্ট অর্থ হিসেবে প্রচার করা হয়, ঐতিহাসিক আলোচনায় তার পাশাপাশি ভিন্ন এবং পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যাও উপস্থিত ছিল।
পরবর্তী ব্যাখ্যায় “সংক্রমণ নেই” কথাটিকে প্রায়ই “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সংক্রমণ নেই” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে বক্তব্যের অর্থ বদলে যায়। প্রথম বাক্য সংক্রমণের অস্তিত্ব অস্বীকার করে; দ্বিতীয় বাক্য সংক্রমণ ঘটার বিষয়টি মেনে নিয়ে তার সঙ্গে একটি দৈব শর্ত যুক্ত করে। রোগ কীভাবে ছড়ায়, সেই প্রশ্ন তখন সরে যায় রোগ ছড়ানোর পেছনে কার ইচ্ছা কাজ করে, সেই প্রশ্নে। অথচ কোনো অতিপ্রাকৃত ইচ্ছার দাবি থেকে জানা যায় না কোন রোগ কীভাবে ছড়াবে, কোন পরিস্থিতিতে ঝুঁকি বাড়বে কিংবা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সংক্রমণ কমবে। মানুষের জীবন রক্ষার জন্য এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য উত্তর প্রয়োজন।
আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞান ও মহামারিবিজ্ঞান রোগের সংক্রমণ সম্পর্কে সেই যাচাইযোগ্য জ্ঞান তৈরি করেছে। রোগজীবাণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা, সংক্রমণের পথ অনুসন্ধান করা, আক্রান্ত ও অনাক্রান্ত মানুষের মধ্যে রোগের বিস্তারের পার্থক্য পরীক্ষা করা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ফল পরিমাপ করার মাধ্যমে এই জ্ঞান গড়ে উঠেছে। সংক্রমণের ঝুঁকি নির্ভর করে রোগজীবাণুর ধরন, সংস্পর্শের প্রকৃতি ও স্থায়িত্ব, পরিবেশ এবং মানুষের রোগপ্রতিরোধক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। এসব শর্তের পার্থক্য থেকেই বোঝা যায় কেন একই পরিবেশে সবাই সমানভাবে অসুস্থ হন না। রোগের বিস্তার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে এই পরীক্ষিত জ্ঞানকে অস্বীকার করলে তার মূল্য দিতে হয় মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন দিয়ে।
সংক্রমণ সম্পর্কে ভুল ধর্মীয় ধারণার সামাজিক ফলও গুরুতর। সংক্রমণ অস্বীকারকারী প্রচার প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও প্রতিরোধের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে। আবার কোনো রোগীকে ভয়ংকর প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করে তার কাছ থেকে পালানোর নির্দেশ রোগ সম্পর্কে অযৌক্তিক আতঙ্ক এবং রোগীর প্রতি ঘৃণা তৈরি করতে পারে। ফলে একদিকে রোগ ছড়ানোর বাস্তব ঝুঁকি অবহেলিত হয়, অন্যদিকে রোগে আক্রান্ত মানুষ সামাজিক বর্জন ও অপমানের শিকার হন। দায়িত্বশীল জনস্বাস্থ্যচর্চায় রোগের প্রকৃত ঝুঁকি নির্ণয়, কার্যকর চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং রোগীর মর্যাদা রক্ষা একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় মর্যাদা কোনো বক্তব্যকে পরীক্ষার ঊর্ধ্বে রাখে না। রোগ, চিকিৎসা ও জীবনরক্ষার সঙ্গে যুক্ত দাবির সত্যতা নির্ধারিত হয় প্রমাণে; নবুয়তের দাবি কোনো ভুলকে সত্য করে না।
আলেমদের বক্তব্য: ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নেই
সংক্রমণ অস্বীকারকারী হাদিসের প্রভাব পুরোনো ধর্মীয় গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান সময়েও ওয়াজ, ধর্মীয় আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্য প্রচার করা হয়। ধর্মীয় বক্তার মুখ থেকে যখন ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়, তখন শ্রোতার কাছে সেটি রোগ সম্পর্কে একটি সাধারণ মতামতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। বক্তব্যটির সঙ্গে মুহাম্মদের কর্তৃত্ব, সহিহ হাদিসের মর্যাদা এবং ঈমানের প্রশ্ন জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের বিপরীতে দাঁড়িয়েও একজন শ্রোতা মনে করতে পারেন, তিনি ধর্মের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছেন।
এই ধরনের প্রচারের কেন্দ্রীয় সমস্যা হলো, রোগের সংক্রমণ সম্পর্কে একটি বাস্তব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হচ্ছে ধর্মীয় কর্তৃত্বের সাহায্যে। একজন অসুস্থ মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে রোগজীবাণু পৌঁছাতে পারে কি না, কোন পথে পৌঁছায় এবং কীভাবে সেই বিস্তার কমানো যায়, এগুলো পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার বিষয়। কোনো বক্তব্য হাদিসে আছে বলে তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বাস্তব প্রমাণ বাতিল হয়ে যায় না। অথচ হাদিসের অভ্রান্ততাকে আগে থেকেই চূড়ান্ত ধরে নিলে বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মেলানোর চাপ তৈরি হয়। ধর্মীয় বক্তার দায়িত্ব এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর বক্তব্য শ্রোতার দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। সংক্রমণ নেই বলে বিশ্বাস করলে রোগীর সংস্পর্শে প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণের কারণ দুর্বল হয়ে পড়ে। অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা, চিকিৎসকের নির্দেশ মানা কিংবা রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে উদাসীনতা তৈরি হতে পারে। ধর্মীয় বক্তা তাঁর কথার এই ব্যবহারিক পরিণতির দায় এড়াতে পারেন না।
তাকদিরের প্রসঙ্গ এনে এই সমস্যার সমাধান হয় না। রোগ হওয়ার বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত বলে দাবি করলে রোগের বিস্তারের পথ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। একই দাবি ব্যবহার করে সতর্কতা গ্রহণের পক্ষে এবং সতর্কতা অবহেলা করার পক্ষেও কথা বলা সম্ভব। কার্যকর নির্দেশনার জন্য জানতে হয় কোন আচরণে ঝুঁকি বাড়ে, কোন ব্যবস্থায় কমে এবং তার পক্ষে কী প্রমাণ আছে। এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে কেবল দৈব সিদ্ধান্তের কথা বললে রোগ প্রতিরোধে ব্যবহারযোগ্য জ্ঞানের জায়গাটি শূন্য থেকে যায়। টিকা সম্পর্কে ধর্মীয় প্রচারেও রোগ প্রতিরোধ ও বিশ্বাসের মধ্যে একই কৃত্রিম বিরোধ তৈরি করা হয়।
টিকা সম্পর্কে মানুষের সিদ্ধান্তে রোগের ঝুঁকি, প্রতিরোধের প্রয়োজন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর আস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধকে অপ্রয়োজনীয় কিংবা বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সেই আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেন অভিভাবকেরা। ফলে ভুল ধারণার পরিণতি বহন করতে হয় এমন মানুষকেও, যিনি নিজে সেই ধারণা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেননি। আলেমদের সংক্রমণ অস্বীকারের ভিত্তি মুহাম্মদের নামে সংকলিত হাদিস। সেখানে সংক্রমণ নেই বলার পাশাপাশি রোগী এড়িয়ে চলার নির্দেশও আছে। এই বিরোধ ঢাকতে মূল অস্বীকৃতির অর্থ বদলে দেওয়া হয়: রোগ ছড়ায় না থেকে বক্তব্যটি হয়ে যায়, রোগ ছড়ায়, কিন্তু আল্লাহর অনুমতিতে।
ছোঁয়াচে রোগ বিষয়ক হাদিসসমূহ
সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্য হাদিসের বিভিন্ন সংকলনে পাওয়া যায়। কোথাও সরাসরি বলা হয়েছে, রোগের কোনো সংক্রমণ নেই। কোথাও এই বক্তব্যের সঙ্গে পেঁচা, সফর মাস কিংবা শুভাশুভের ধারণা অস্বীকার করা হয়েছে। আবার একটি বর্ণনায় সংক্রমণ অস্বীকারের পরপরই কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বর্ণনাগুলোতে সংক্রমণ অস্বীকারের পুনরাবৃত্তি, বেদুইনের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তার সংঘাত এবং একই বর্ণনার মধ্যে রোগী এড়িয়ে চলার বিপরীত নির্দেশ রয়েছে।
বেদুইনের অভিজ্ঞতা এবং মুহাম্মদের পাল্টা প্রশ্ন
বুখারির বর্ণনায় সংক্রমণ অস্বীকারের বক্তব্য শুনে একজন বেদুইন নিজের উটের পালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সুস্থ উটগুলোর মধ্যে একটি রোগাক্রান্ত উট প্রবেশ করার পরে অন্য উটগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে—এই পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন তিনি। [1]
حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، وَغَيْرُهُ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ عَدْوَى وَلاَ صَفَرَ وَلاَ هَامَةَ ”. فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا بَالُ إِبِلِي تَكُونُ فِي الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ فَيَأْتِي الْبَعِيرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ بَيْنَهَا فَيُجْرِبُهَا. فَقَالَ ” فَمَنْ أَعْدَى الأَوَّلَ ”. رَوَاهُ الزُّهْرِيُّ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ وَسِنَانِ بْنِ أَبِي سِنَانٍ .
বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/২৫. ‘সফর’ পেটের পীড়া ছাড়া কিছুই না
৫৭১৭. আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের কোন সংক্রমণ নেই, সফরের কোন অশুভ আলামত নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন অশুভ আলামত নেই। তখন এক বেদুঈন বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা কেন হয়? সেগুলো যখন চারণ ভূমিতে থাকে তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগাগ্রস্ত উট এসে সেগুলোর পালে ঢুকে পড়ে এবং এগুলোকেও চর্ম রোগে আক্রান্ত করে ফেলে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে?
যুহরী হাদীসটি আবূ সালামাহ ও সিনান ইবনু আবূ সিনান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। [৫৭০৭; মুসলিম ৩৯/৩৩, হাঃ ২২২০, আহমাদ ৭৬২৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫২৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫১৯৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
বেদুইনের প্রশ্নের বিষয় ছিল রোগ ছড়ানোর একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি। রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের পালে প্রবেশ করছে এবং তার পরে অন্য উটগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি রোগের আদি উৎপত্তির রহস্য জানতে চাননি; নিজের চোখে দেখা ঘটনাটির ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। সুস্থ পালের মধ্যে রোগাক্রান্ত উট ঢোকার পরে রোগ দেখা দিচ্ছে কেন? আক্রান্ত উটটির সঙ্গে মেলামেশা এবং অন্য উটগুলোর অসুস্থ হওয়ার মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক আছে কি না? সেই সম্পর্ক না থাকলে বেদুইনের পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা কী? মুহাম্মদের উত্তর এসব প্রশ্নের কোনো সমাধান দেয়নি। তিনি জানতে চেয়েছেন, প্রথম উটটিকে কে আক্রান্ত করেছিল। কিন্তু রোগের সূচনার প্রশ্ন তুলে রোগের পরবর্তী বিস্তারের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় না।
প্রথম প্রাণীটি কীভাবে আক্রান্ত হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর অজানা থাকলেও আক্রান্ত প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাতিল হয় না। প্রথম ঘটনাটির কারণ এবং সেই ঘটনার পরবর্তী বিস্তারের কারণ পৃথক হতে পারে। কোনো পালে প্রথম যে উটটিকে অসুস্থ দেখা গেছে, সেটিই রোগটির ইতিহাসে সর্বপ্রথম আক্রান্ত প্রাণী—এমন তথ্যও বর্ণনায় নেই। পর্যবেক্ষকের কাছে প্রথম শনাক্ত হওয়া প্রাণীকে রোগের চূড়ান্ত সূচনা ধরে নেওয়ার ভিত্তি কোথায়? আর প্রথম প্রাণীটির রোগের উৎস জানা গেলেও সেটি অন্য প্রাণীর মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আলাদাভাবেই প্রয়োজন। রোগ কোথা থেকে এসেছে এবং রোগ এক দেহ থেকে অন্য দেহে যাচ্ছে কি না—দুটি প্রশ্নকে এক করে ফেলাই এখানে মৌলিক যুক্তিগত ভুল।
মুহাম্মদের পাল্টা প্রশ্ন বেদুইনের জ্ঞানের সীমা প্রকাশ করতে পারে; সংক্রমণ নেই বলে প্রমাণ করতে পারে না। বেদুইন প্রথম উটটির রোগের কারণ জানতেন না ধরে নিলেও তা থেকে কীভাবে সিদ্ধান্ত আসে যে অসুস্থ উটের সংস্পর্শে অন্য উট আক্রান্ত হয় না? একজন পশুপালককে রোগের সমগ্র ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে না পারা পর্যন্ত নিজের পালের মধ্যে রোগ ছড়ানোর প্রশ্ন তোলার অধিকার হারাতে হবে কেন? প্রশ্নকারীর অজানা তথ্য কোনো অস্বীকৃতির পক্ষে প্রমাণ নয়। “প্রথমটির কারণ তুমি জানো না” থেকে “পরেরগুলোর মধ্যে সংক্রমণ ঘটেনি” সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো বৈধ যৌক্তিক পথ নেই। প্রথম বাক্যটি মানুষের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে; দ্বিতীয়টি বাস্তবে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে একটি দাবি।
বেদুইনের পর্যবেক্ষণ থেকে অনুসন্ধানের প্রশ্নগুলোও সুনির্দিষ্ট। রোগাক্রান্ত উটকে আলাদা রাখলে পালের মধ্যে নতুন করে রোগ দেখা দেওয়ার হার বদলায় কি না? আক্রান্ত উটের সংস্পর্শে আসা এবং না আসা উটগুলোর অসুস্থতার মধ্যে পার্থক্য আছে কি না? একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে কি না? রোগ ছড়ানোর পেছনে সংস্পর্শ ছাড়াও কোনো সাধারণ উৎস কাজ করছে কি না? এগুলোর উত্তর থেকেই কার্যকারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে। প্রথম উটটিকে কে আক্রান্ত করেছে, সেই প্রশ্ন এসব অনুসন্ধানের বিকল্প নয়। সেটির উত্তর পাওয়া গেলেও পরবর্তী বিস্তারের অনুসন্ধান বাকি থাকে; উত্তর না পাওয়া গেলেও সেই অনুসন্ধান অর্থহীন হয়ে যায় না।
সংক্রমণ নেই—এই ব্যাপক অস্বীকৃতির পক্ষে তাই মুহাম্মদের পাল্টা প্রশ্ন কোনো প্রমাণ হাজির করে না। বেদুইনের পর্যবেক্ষণ ভুল দেখানো হয়নি, আক্রান্ত উটের সঙ্গে মেলামেশার ভূমিকা খণ্ডন করা হয়নি, রোগ ছড়ানোর কোনো বিকল্প ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। প্রশ্নটিকে শুধু রোগের পরবর্তী বিস্তার থেকে প্রথম রোগীর উৎসের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি সংক্রমণ অস্বীকারের যুক্তি নয়; একটি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে অন্য প্রশ্ন হাজির করা। প্রথম উটের রোগের উৎস অজানা থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত হয়, সেই উৎস অজানা। সেখান থেকে “রোগের কোনো সংক্রমণ নেই” ঘোষণা করা প্রমাণের চেয়ে অনেক বড় দাবি এবং সরাসরি যুক্তিগত অসংগতি।
একই বর্ণনায় সংক্রমণ অস্বীকার এবং কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর নির্দেশ
একই হাদিসে মুহাম্মদের নামে সংক্রমণ অস্বীকার এবং কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর নির্দেশ সংকলিত হয়েছে। মিশকাতের উদ্ধৃত বাংলা অনুবাদে প্রাণীটির নাম “বাঘ” লেখা হলেও বুখারির আরবিতে আছে “সিংহ”। রোগের সংক্রমণ নেই ঘোষণা করেই রোগীকে এমন প্রাণীর মতো এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে, যার কাছে যাওয়া তাৎক্ষণিক বিপদের কারণ। [2]
وَقَالَ عَفَّانُ حَدَّثَنَا سَلِيمُ بْنُ حَيَّانَ، حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مِينَاءَ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ، وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الأَسَدِ ”.
বাংলা অনুবাদ: মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৭৭-[২] উক্ত রাবী (হুরায়রা (রাঃ) হতে) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের সংক্রমণ বলতে কিছুই নেই, কোন কিছুতে অশুভ নেই। প্যাঁচার মধ্যে কু-লক্ষণ নেই এবং সফর মাসেও কোন অশুভ নেই। তবে কুষ্ঠরোগী হতে পলায়ন করো, যেমন- তুমি বাঘ হতে পালিয়ে থাকো। (বুখারী)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ৫৭০৭, আল জামি‘উস্ সগীর ১৩৪৮৭, সহীহুল জামি‘ ৭৫৬০, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৮২, ৭৮৩; আহমাদ ৯৭২২, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৪৫৪৩, মুসান্নাফ ‘আবদুর রায্যাক ১৯৫০৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সংক্রমণ নেই বলার পর রোগীর কাছ থেকে পালাতে বলা হলে সেই পালানোর কারণ কী? একই বর্ণনায় প্রথমে রোগের সংক্রমণ অস্বীকার করা হচ্ছে, তারপর কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে সিংহের কাছ থেকে পালানোর মতো করে পালাতে বলা হচ্ছে। রোগীর উপস্থিতিতে এমন কী বিপদ তৈরি হচ্ছে, যার জন্য এই কঠোর নির্দেশ? বিপদটি কি তাঁর রোগ অন্যের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, নাকি অন্য কিছু? সংক্রমণ প্রতিরোধকে পালানোর কারণ হিসেবে গ্রহণ করলে সংক্রমণের বাস্তবতা স্বীকার করা হয়। আর সংক্রমণ সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে পালানোর নির্দেশকে সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। হাদিসের পক্ষে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোর সমস্যা এই জায়গাতেই।
রোগীর সংস্পর্শে গেলে তাঁর রোগ অন্যের শরীরে ছড়াতে পারে বলে দূরে থাকা প্রয়োজন—এই ব্যাখ্যা সংক্রমণের কার্যকারণই স্বীকার করে। তখন প্রশ্ন আসে, প্রথমে সংক্রমণ নেই বলা হলো কেন? রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাই যদি পালানোর ভিত্তি হয়, তাহলে সেই আশঙ্কার বাস্তব কারণকে অস্তিত্বহীন ঘোষণা করার অর্থ কী? যে ব্যক্তি “সংক্রমণ নেই” কথাটি সরাসরি গ্রহণ করবেন, তাঁর কাছে রোগীর সংস্পর্শ এড়ানোর স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন কোথা থেকে আসবে? আবার যিনি রোগ ছড়ানোর আশঙ্কায় রোগীকে এড়িয়ে চলবেন, তিনি কার্যত সেই সংক্রমণকেই স্বীকার করছেন, যা আগের বাক্যে অস্বীকার করা হয়েছে। একই অর্থে সংক্রমণকে অস্তিত্বহীন বলা এবং সেই সংক্রমণ ঠেকানোর প্রয়োজন দাবি করা স্ববিরোধী।
রোগীর কাছ থেকে পালানোর অন্য কারণ ধরলেও সংক্রমণসংক্রান্ত প্রশ্নটি মুছে যায় না। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা দুর্গন্ধ, চেহারাজনিত অস্বস্তি এবং সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানোর আশঙ্কার কথাও বলেছেন। এসব ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে পালানোর নির্দেশের উদ্দেশ্য বদলে যায়। তখন রোগের বিস্তার ঠেকানোর বদলে সুস্থ মানুষের অস্বস্তি এড়ানো কিংবা তাঁর বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করা প্রধান হয়ে ওঠে। রোগীর গন্ধ বা চেহারা অপছন্দ হওয়ায় তাঁকে এড়িয়ে চলা কীভাবে জীবাণুর মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর জ্ঞানের প্রমাণ হয়? আর রোগীর সংস্পর্শের পরে অসুস্থ হয়ে কেউ সংক্রমণ ঘটেছে বলে বিশ্বাস করতে পারেন—এই আশঙ্কায় দূরে থাকতে বলা হলে সেটি রোগ প্রতিরোধের জ্ঞান, নাকি সংক্রমণ অস্বীকারের বিশ্বাস রক্ষার ব্যবস্থা?
এখানে রোগীকে এড়িয়ে চলার আচরণ এবং সেই আচরণের পেছনের ব্যাখ্যাকে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। একই দূরত্ব সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর জন্যও বজায় রাখা হতে পারে, আবার রোগীর প্রতি বিরূপতা বা ধর্মীয় বিশ্বাস রক্ষার কারণেও বজায় রাখা হতে পারে। শুধু দূরে থাকার নির্দেশ দেখিয়ে তার পেছনে আধুনিক সংক্রমণজ্ঞান উপস্থিত ছিল বলে সিদ্ধান্ত আসে না। সেই দাবির সঙ্গে “সংক্রমণ নেই” বক্তব্যের সম্পর্কও ব্যাখ্যা করতে হয়। রোগী থেকে পালানোর নির্দেশকে বিজ্ঞানের কৃতিত্ব হিসেবে হাজির করা, আর সংক্রমণ অস্বীকারের ভুল সামনে এলে নির্দেশটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যের বলে ব্যাখ্যা করা সুবিধামতো অর্থ বদলানো।
পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের বিভিন্ন সমাধান এই বিরোধকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কেউ সংক্রমণের অস্বীকৃতিকে রোগের স্বাধীন ক্ষমতার অস্বীকৃতিতে সীমিত করেছেন; কেউ রোগীকে এড়িয়ে চলার জন্য সংক্রমণের বাইরের কারণ বেছে নিয়েছেন। প্রথম পদ্ধতিতে সংক্রমণ ঘটে বলে গ্রহণ করে সাধারণ অস্বীকৃতির অর্থ সংকুচিত করা হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে দূরে থাকার নির্দেশ থেকে সংক্রমণ প্রতিরোধের বৈজ্ঞানিক দাবি সরে যায়। কোনো ব্যাখ্যায় সতর্কতা বজায় থাকে, কোনো ব্যাখ্যায় সংক্রমণ অস্বীকার বজায় থাকে; কিন্তু এই ভিন্ন অবস্থানগুলোকে এক করে মূল বক্তব্যের অপরিবর্তিত বৈজ্ঞানিক সত্যতা দাবি করা যায় না। হাদিসের দুটি বাক্যকে কোনোভাবে মেলানো এবং রোগ সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্যকে সত্য প্রমাণ করা এক কাজ নয়।
জাবিরের বর্ণনায় সংক্রমণের অস্তিত্ব অস্বীকার
জাবিরের সূত্রেও মুহাম্মদের নামে সংক্রমণ অস্বীকারের বক্তব্য সংকলিত হয়েছে। এখানে রোগ ছড়ানোর বাস্তব প্রশ্নটিকে সফর ও ভূতপ্রেতসংক্রান্ত বিশ্বাসের সঙ্গে একই তালিকায় রেখে অস্তিত্বহীন বলা হয়েছে। [3]
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا عَدْوَى وَلَا صَفَرَ وَلَا غُولَ» . رَوَاهُ مُسلم
বাংলা অনুবাদ: মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ১. প্রথম অনুচ্ছেদ – শুভ ও অশুভ লক্ষণ
৪৫৮০-[৫] জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, রোগে ছোঁয়াচে লাগা, সফর মাস অশুভ হওয়া বা ভূত-প্রেতের ধারণার কোন অস্তিত্ব নেই। (মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : মুসলিম (২২২২)-১০৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১২৮, আহমাদ ১৫১০৩।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
এই বর্ণনা আলোচনাটিকে আবু হুরায়রার একক বর্ণনার বাইরে নিয়ে যায়। সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্য একাধিক সাহাবির সূত্রে সংকলিত হয়েছে। রোগ ছড়ানোর প্রশ্নকে এখানে এমন কিছু বিশ্বাসের সঙ্গে একই তালিকায় রাখা হয়েছে, যেগুলোকে অমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। বেদুইনের উটের ঘটনা সেই তালিকার একটি বিষয়ের বাস্তব পরীক্ষা হাজির করে: রোগাক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শের পরে অন্য প্রাণীর আক্রান্ত হওয়ার পর্যবেক্ষণকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
আবু দাউদের বর্ণনায় সরাসরি সংক্রমণ অস্বীকার
আবু দাউদের বর্ণনায় মুহাম্মদের নামে সরাসরি বলা হয়েছে, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই। পেঁচা, নক্ষত্র ও সফরসংক্রান্ত বিশ্বাস প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে একই বাক্যে সংক্রমণও অস্বীকার করা হয়েছে। [4]
حَدَّثَنَا الْقَعْنَبِيُّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ، – يَعْنِي ابْنَ مُحَمَّدٍ – عَنِ الْعَلاَءِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” لاَ عَدْوَى وَلاَ هَامَةَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ صَفَرَ ” .
বাংলা অনুবাদ: সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯১২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই, পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত তা সঠিক নয়, কোনো নক্ষত্রের নির্দিষ্ট তারিখে আকাশের কোনো স্থানে অবস্থান করলে বৃষ্টিপাত হয় এরূপ বিশ্বাসও ঠিক নয় এবং সফর মাসকে অশুভ মনে করবে না।[1]
সহীহ।
[1]. মুসলিম, আহমাদ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই বর্ণনার মূল আরবিতেও সংক্রমণ অস্বীকারকারী বাক্যাংশটি রয়েছে। সংক্রমণ ঘটে, তবে তার জন্য আল্লাহর অনুমতি প্রয়োজন, এই ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে হলে মূল বাক্যের সঙ্গে সেই ব্যাখ্যার সম্পর্ক দেখাতে হয়। সংক্রমণের অস্তিত্ব অস্বীকার এবং সংক্রমণের ওপর দৈব নিয়ন্ত্রণ আরোপ দুটি ভিন্ন দাবি। অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় এই পার্থক্য মুছে ফেললে পাঠকের সামনে মূল বক্তব্যের পরিবর্তিত রূপ হাজির হয়।
ইবন উমরের বর্ণনায় সংক্রমণ ও শুভাশুভের প্রসঙ্গ
ইবন উমরের সূত্রে সংক্রমণ ও শুভাশুভ অস্বীকারের পাশাপাশি নারী, গৃহ ও পশুতে অমঙ্গল থাকার বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। বাংলা সংস্করণে এই বক্তব্যের পরে প্রকাশকের ব্যাখ্যামূলক পাদটীকাও যুক্ত আছে। [5]
حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ عُمَرَ، حَدَّثَنَا يُونُسُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَالِمٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ، وَالشُّؤْمُ فِي ثَلاَثٍ فِي الْمَرْأَةِ، وَالدَّارِ، وَالدَّابَّةِ ”.
বাংলা অনুবাদ: সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৭৬/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ৭৬/৪৩. পশু-পাখি তাড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয়।
৫৭৫৩. ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ছোঁয়াচে ও শুভ-অশুভ বলতে কিছু নেই। অমঙ্গল তিন বস্তুর মধ্যে স্ত্রীলোক, গৃহ ও পশুতে।[1] [২০৯৯; মুসলিম ৩৯/৩৪, হাঃ ২২২৫, আহমাদ ৪৫৪৪] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৩৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫২২৯)
[1] কোন কোন স্ত্রীলোক স্বামীর অবাধ্য হয়। আবার কেউ হয় সন্তানহীনা। কোন গৃহে দুষ্ট জ্বিনের উপদ্রব দেখা যা, আবার কোন গৃহ প্রতিবেশীর অত্যাচারের কারণে অশান্তিময় হয়ে উঠে। গৃহে সালাত আদায় ও যিকর-আযকারের মাধ্যমে জ্বিনের অমঙ্গল থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কোন কোন পশু অবাধ্য বেয়াড়া হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)
উদ্ধৃতির পাদটীকায় অবাধ্য স্ত্রী, সন্তানহীনতা, জিনের উপদ্রব এবং পশুর আচরণ সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাংলা সংস্করণের ব্যাখ্যামূলক সংযোজন। এসব পরবর্তী ব্যাখ্যা মুহাম্মদের মূল বক্তব্যের অংশ নয়। সংক্রমণের প্রশ্নেও এই পার্থক্য প্রযোজ্য। মূল বক্তব্যের অর্থ নির্ধারণে পরে যুক্ত করা ব্যাখ্যাকে সরাসরি মুহাম্মদের উচ্চারিত বাক্যের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
সা‘দ ইবনু মালিকের বর্ণনা
সা‘দ ইবনু মালিকের সূত্রেও পেঁচার অমঙ্গল, সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণ অস্বীকারের বক্তব্য রয়েছে। এই বর্ণনায়ও ঘোড়া, নারী ও বাড়ির প্রসঙ্গ একই সঙ্গে এসেছে। [6]
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا أَبَانُ، حَدَّثَنِي يَحْيَى، أَنَّ الْحَضْرَمِيَّ بْنَ لاَحِقٍ، حَدَّثَهُ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ، عَنْ سَعْدِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقُولُ ” لاَ هَامَةَ وَلاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَإِنْ تَكُنِ الطِّيَرَةُ فِي شَىْءٍ فَفِي الْفَرَسِ وَالْمَرْأَةِ وَالدَّارِ ” .
বাংলা অনুবাদ: সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
২৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৪. অশুভ লক্ষণ
৩৯২১। সা’দ ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ পেঁচা অশুভ নয়, ছোঁয়াচে রোগ নেই এবং কোনো জিনিস অশুভ হওয়া ভিত্তিহীন। যদি কোনো কিছুর মধ্যে অশুভ কিছু থাকতো, তাহলে ঘোড়া, নারী ও বাড়ী এই তিন জিনিসের মধ্যে থাকতো।[1]
সহীহ।
[1]. আহমাদ। আহমাদ শাকির বলেনঃ এর সনদ; সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ সা‘দ ইবনু মালিক (রাঃ)
বিভিন্ন বর্ণনার শব্দবিন্যাসে পার্থক্য থাকলেও সংক্রমণ অস্বীকারকারী বাক্যাংশটি বারবার ফিরে আসছে। এই পুনরাবৃত্তির কারণে সমস্যাটিকে একটি বাংলা অনুবাদের বিচ্ছিন্ন শব্দচয়ন বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। অস্বীকৃতিটি মূল আরবিতেই আছে; পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীরা তার অর্থ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সমাধান দিয়েছেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদে সংক্রমণ অস্বীকার
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাংলা অনুবাদে বক্তব্যটি আরও সরাসরি: “কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়।” একই আরবি বর্ণনার অনুবাদে নক্ষত্রসংক্রান্ত অংশের জায়গায় দেউ-দানবের কথাও বসানো হয়েছে। [7]
حَدَّثَنَا الْقَعْنَبِيُّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ، – يَعْنِي ابْنَ مُحَمَّدٍ – عَنِ الْعَلاَءِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” لاَ عَدْوَى وَلاَ هَامَةَ وَلاَ نَوْءَ وَلاَ صَفَرَ ” .
বাংলা অনুবাদ: সুনান আবূ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৩/ ভাগ্য গণনা ও ফাল নেয়া
পরিচ্ছেদঃ ৪. পাখীর দ্বারা শুভাশুভের ফাল নির্ধারণ সম্পর্কে।
৩৮৭২. কা’নবী (রহঃ) …. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়, না মৃতের খুলিতে পেঁচা থাকে, আর না দেউ-দানব রাস্তা ভুলিয়ে দেয় এবং না সফর মাস অমঙ্গলের।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
এই বাংলা সংস্করণের “দেউ-দানব রাস্তা ভুলিয়ে দেয়” অংশটির জায়গায় সংযুক্ত আরবিতে নক্ষত্রসংক্রান্ত ‘নও’ শব্দ রয়েছে। “নও” শব্দকে দেউ-দানব দিয়ে অনুবাদ করা ভুল; এতে নক্ষত্রসংক্রান্ত বক্তব্যের অর্থ বদলে গেছে। সংক্রমণ অস্বীকারকারী বাক্যাংশটি অবশ্য বাংলা ও আরবি উভয় পাঠেই রয়েছে। “কোন রোগই ছোঁয়াচে নয়” একটি ব্যাপক অস্বীকৃতি। পরে ব্যাখ্যায় সংক্রমণের ঘটনা মেনে নিয়ে তার ওপর আল্লাহর অনুমতির শর্ত আরোপ করলে সেই অর্থ পরিবর্তিত হয়।
বর্ণনাগুলোর মধ্যে যে প্রশ্নগুলো উপস্থিত
উপরের উদ্ধৃতিগুলোতে একই বক্তব্য বিভিন্ন সংকলন, বর্ণনাসূত্র ও বাংলা সংস্করণে পাওয়া যাচ্ছে। মিশকাতের বর্ণনাগুলো বুখারি ও মুসলিম থেকে সংকলিত হওয়ায় এগুলোর মধ্যে মূল বর্ণনার পুনরাবৃত্তিও রয়েছে। এসব বর্ণনায় কেন্দ্রীয় তিনটি বিষয় হলো: সংক্রমণের সরাসরি অস্বীকৃতি, বেদুইনের রোগ ছড়ানোর পর্যবেক্ষণ এবং কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর নির্দেশ। বেদুইন রোগাক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শের পরে অন্য প্রাণীর অসুস্থ হওয়ার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর নির্দেশেও রোগীর সান্নিধ্যকে এড়ানোর বিষয়টি আছে। সংক্রমণের আশঙ্কাকে এই দূরত্বের কারণ হিসেবে গ্রহণ করলে সংক্রমণ স্বীকার করা হয়; তখন সাধারণ অস্বীকৃতিকে বিশেষ অর্থে সীমিত করতে হয়। মূল বক্তব্যের সঙ্গে পরে যুক্ত শর্তের এই পার্থক্য ঢেকে দিলেই সংক্রমণ অস্বীকারের ভুল মুছে যায় না।
‘লা আদওয়া’: মূল আরবি বক্তব্য এবং অনুবাদে যুক্ত দৈব অনুমতির শর্ত
সংক্রমণসংক্রান্ত হাদিসের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যাংশ হলো “লা আদওয়া”, যার সরাসরি অর্থ “সংক্রমণ নেই”। এই বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রায়ই বলা হয়, মুহাম্মদ আসলে বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো রোগ অন্যের শরীরে সংক্রমিত হয় না। কিন্তু মূল বাক্য এবং ব্যাখ্যায় যুক্ত এই শর্তের মধ্যে অর্থগত পার্থক্য রয়েছে। একটি বক্তব্য সংক্রমণ অস্বীকার করে, অন্যটি সংক্রমণ ঘটার বিষয়টি মেনে নিয়ে তার ওপর দৈব অনুমতির শর্ত আরোপ করে। এই পার্থক্যটি সহিহ বুখারির একটি বর্ণনার মূল আরবি এবং প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদ পাশাপাশি পড়লে সরাসরি দেখা যায়।
মূল আরবিতে কী বলা হয়েছে
সহিহ বুখারি ৫৭১৭-এর আরবিতে সরাসরি “লা আদওয়া” বলা হয়েছে। বেদুইনের উটের পালে রোগ ছড়ানোর প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদ প্রথম উটের রোগের উৎস জানতে চেয়েছেন; “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া” কিংবা “স্বাধীন ক্ষমতায়” সংক্রমণ ঘটার কোনো শর্ত উচ্চারণ করেননি। [8]
حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، وَغَيْرُهُ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ عَدْوَى وَلاَ صَفَرَ وَلاَ هَامَةَ ”. فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا بَالُ إِبِلِي تَكُونُ فِي الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ فَيَأْتِي الْبَعِيرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ بَيْنَهَا فَيُجْرِبُهَا. فَقَالَ ” فَمَنْ أَعْدَى الأَوَّلَ ”. رَوَاهُ الزُّهْرِيُّ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ وَسِنَانِ بْنِ أَبِي سِنَانٍ .
বাংলা অনুবাদ: আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, “সংক্রমণ নেই, সফর নেই, হামাহ নেই।” এক বেদুইন বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আমার উটগুলোর কী অবস্থা? সেগুলো বালুর মধ্যে হরিণের মতো থাকে। এরপর একটি চর্মরোগাক্রান্ত উট তাদের মধ্যে ঢুকে তাদেরও চর্মরোগে আক্রান্ত করে।” তিনি বললেন, “তাহলে প্রথমটিকে কে সংক্রমিত করেছিল?” যুহরি এটি আবু সালামা ও সিনান ইবন আবি সিনানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
বর্ণনাটিতে মুহাম্মদের নামে প্রথমে সংক্রমণ, সফর এবং হামাহ অস্বীকার করা হয়েছে। এরপর বেদুইন তাঁর উটের পালে রোগ ছড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। উত্তরে মুহাম্মদ প্রথম উটটিকে কে আক্রান্ত করেছিল, সেই প্রশ্ন করেছেন। এই আরবি বর্ণনায় “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া” কথাটি নেই। রোগের “স্বাধীন ক্ষমতা”, “নিজস্ব শক্তি” কিংবা “আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে” সংক্রমণ ঘটার ধারণাকেই শুধু অস্বীকার করা হচ্ছে, এমন কোনো শর্তও উচ্চারিত হয়নি। এসব ধারণা মূল বক্তব্যের ব্যাখ্যায় যুক্ত করা হয়।
ইংরেজি অনুবাদের বন্ধনীতে কী যুক্ত হয়েছে
সহিহ বুখারি ৫৭১৭-এর ইংরেজি অনুবাদে Sunnah.com ‘আদওয়া’র ব্যাখ্যা হিসেবে বন্ধনীর মধ্যে আল্লাহর অনুমতির শর্ত বসিয়েছে। আরবির সাধারণ অস্বীকৃতির জায়গায় এই সংযোজন সংক্রমণ ঘটার বিষয়টি মেনে নিয়ে তার ওপর দৈব নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। মূল আরবি বাক্যাংশ এবং প্রকাশিত অনুবাদের বন্ধনীতে যুক্ত অংশটি হলো: [9]
لاَ عَدْوَى
English translation: “no disease is conveyed from the sick to the healthy without Allah’s permission”
বন্ধনীর বাক্যাংশটির বাংলা অর্থ: আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো রোগ অসুস্থ ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তির শরীরে সংক্রমিত হয় না। এখানে অনুবাদের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যুক্ত হয়েছে। অনুবাদের ওপর নির্ভরশীল পাঠকের কাছে এই অতিরিক্ত শর্ত মুহাম্মদের বক্তব্যের অর্থ হিসেবে পৌঁছায়। অথচ বন্ধনীর এই শর্ত মূল আরবির অতিরিক্ত সংযোজন। বন্ধনীতে বসানো এই সংযোজন অর্থ পরিবর্তন করে। “সংক্রমণ নেই” পড়লে পাঠকের সামনে সংক্রমণ অস্বীকারের দাবি আসে। “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সংক্রমণ নেই” পড়লে সংক্রমণের ঘটনা স্বীকার করা হয় এবং তার পেছনে আল্লাহর অনুমতিকে আবশ্যিক শর্ত হিসেবে বসানো হয়। একই বক্তব্যের দুটি রূপ পাঠককে দুটি ভিন্ন সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়।
অস্বীকৃতি থেকে শর্তযুক্ত স্বীকৃতি
| বক্তব্য | সংক্রমণ সম্পর্কে অবস্থান | ব্যাখ্যার কেন্দ্র |
|---|---|---|
| সংক্রমণ নেই | সংক্রমণ অস্বীকার করা হচ্ছে | রোগ অন্যের শরীরে ছড়ায় কি না |
| আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সংক্রমণ নেই | দৈব অনুমতি সাপেক্ষে সংক্রমণ স্বীকার করা হচ্ছে | সংক্রমণ ঘটার অনুমতি কে দেন |
| রোগ নিজের স্বাধীন ক্ষমতায় সংক্রমিত হয় না | সংক্রমণ ঘটলেও তার স্বাধীন কার্যক্ষমতা অস্বীকার করা হচ্ছে | রোগের কার্যক্ষমতার ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা |
প্রথম দাবির সামনে রোগ ছড়ানোর পর্যবেক্ষণ হাজির করলে তার ব্যাখ্যা দিতে হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দাবিতে সেই পর্যবেক্ষণ মেনে নিয়েও বলা সম্ভব, ঘটনাটি আল্লাহর অনুমতিতে ঘটেছে। অর্থাৎ ব্যাখ্যার সাহায্যে মূল অস্বীকৃতির জায়গায় এমন একটি অবস্থান তৈরি করা হচ্ছে, যার মধ্যে সংক্রমণের ঘটনা গ্রহণ করা যায়। এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বিশেষভাবে বোঝা যায় বেদুইনের প্রশ্নে। তাঁর প্রশ্নে রোগের স্বাধীন ঐশ্বরিক ক্ষমতার দাবি ছিল না। তাঁর প্রশ্ন ছিল, রোগাক্রান্ত উট পালে ঢোকার পরে সুস্থ উটগুলো কেন আক্রান্ত হয়। প্রশ্নটি রোগীর সংস্পর্শ এবং পরবর্তী অসুস্থতার সম্পর্ক নিয়ে। তার উত্তরে প্রথম উটের রোগের উৎস জানতে চাওয়া সেই সম্পর্কের ব্যাখ্যা দেয় না।
ব্যাখ্যার সাহায্যে সংক্রমণকে আবার স্বীকার করা
বিন বাযের ব্যাখ্যায় এই পরিবর্তিত অবস্থানটি স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তিনি অসুস্থ ও সুস্থের মেলামেশার কারণে আল্লাহর অনুমতিতে রোগ ছড়াতে পারে বলে স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, হাদিসে অস্বীকার করা হয়েছে আল্লাহর ইচ্ছা ও তাকদিরের বাইরে রোগ নিজের স্বভাবগত ক্ষমতায় ছড়িয়ে পড়ার বিশ্বাস। অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর সঙ্গে না মেশানো এবং কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশকে তিনি ক্ষতির কারণ এড়িয়ে চলার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। [10]
قد ينتقل المرض من المريض إلى الصحيح
বাংলা অনুবাদ: অসুস্থের রোগ সুস্থের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে পারে।
এই ব্যাখ্যায় সংক্রমণের বাস্তব ঘটনাটি গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে সমাধানের জন্য মূল অস্বীকৃতির ক্ষেত্র সংকুচিত করতে হয়েছে: সংক্রমণ ঘটে, কিন্তু তা স্বাধীনভাবে ঘটে না। এখানে রোগ ছড়ানোর প্রশ্ন থেকে আলোচনা সরে গেছে রোগ ছড়ানোর পেছনে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেই প্রশ্নে। এর ফলে মূল সমস্যার প্রকৃতিও বদলে যায়। সংক্রমণ ঘটে কি না, তা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে অনুসন্ধান করা যায়। কিন্তু সংক্রমণ ঘটলে আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন এবং না ঘটলে অনুমতি দেননি বললে উভয় ফলই একই ব্যাখ্যার মধ্যে স্থান পায়। এই শর্ত নিজে থেকে কোন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ঘটবে কিংবা কোন ব্যবস্থায় তা কমবে, সে সম্পর্কে কোনো পূর্বাভাস দেয় না।
মূল বক্তব্যের দায় ব্যাখ্যার আড়ালে সরিয়ে দেওয়া
হাদিসের সঙ্গে সংক্রমণের পর্যবেক্ষণ মেলাতে গিয়ে যে ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হচ্ছে, তার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের দায় ব্যাখ্যাকারীর। আরবিতে অনুল্লিখিত শর্ত অনুবাদে বসিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সেই দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মূল বাক্য এবং ব্যাখ্যামূলক সংযোজন এক করে দেখানো হলে সাধারণ পাঠকের কাছে বিকৃত অর্থ পৌঁছায়। সংক্রমণ অস্বীকারের পক্ষে মূল বাক্য ব্যবহার করা এবং সংক্রমণের প্রমাণের মুখে একই বাক্যকে দৈব অনুমতিসাপেক্ষ সংক্রমণের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা পরস্পরবিরোধী অবস্থান। প্রথম অবস্থানে রোগ ছড়ানোর বাস্তবতা প্রত্যাখ্যাত হয়। দ্বিতীয় অবস্থান সেই বাস্তবতা গ্রহণ করে হাদিসের অর্থ নতুনভাবে নির্ধারণ করে। এই অর্থ পরিবর্তনকে আড়াল করে বক্তব্যটির অপরিবর্তিত সত্যতা দাবি করলে মূল বক্তব্যের বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক সমস্যাটি চাপা পড়ে যায়।
আবু হুরায়রার ‘সংক্রমণ নেই’ বর্ণনা অস্বীকার এবং অসুস্থ উটকে আলাদা রাখার নির্দেশ
সংক্রমণসংক্রান্ত হাদিসগুলোর সমস্যা বর্ণনার বিষয়বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এসব বক্তব্য বর্ণনা করতে গিয়ে আবু হুরায়রার অবস্থান পরিবর্তনের একটি ঘটনাও সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি প্রথমে মুহাম্মদের নামে দুটি বক্তব্যই বর্ণনা করতেন: সংক্রমণ নেই এবং অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে নেওয়া যাবে না। পরে তিনি দ্বিতীয় বক্তব্যটি বর্ণনা করতে থাকলেও প্রথমটি বর্ণনা করার কথা অস্বীকার করেন। তাঁর শ্রোতারা বিষয়টি লক্ষ করেন এবং আগের বর্ণনার কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন। একই বর্ণনাকারী দুটি বক্তব্য প্রচার করেছেন, পরে একটির বর্ণনা অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর শ্রোতারা সেই অস্বীকারের প্রতিবাদ করেছেন। বর্ণনা সংরক্ষণের মধ্যেই এই সংঘাত নথিবদ্ধ আছে।
সহিহ বুখারিতে সংরক্ষিত বিবরণ
সহিহ বুখারি ৫৭৭১-এ আবু হুরায়রা অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না নেওয়ার নির্দেশ বর্ণনা করেন। একই বর্ণনায় তাঁর আগের “সংক্রমণ নেই” হাদিস অস্বীকার, শ্রোতাদের প্রতিবাদ এবং হাবশি ভাষায় কথা বলার ঘটনাও সংরক্ষিত হয়েছে। [11]
وَعَنْ أَبِي سَلَمَةَ، سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ، بَعْدُ يَقُولُ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ” لاَ يُورِدَنَّ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ ”. وَأَنْكَرَ أَبُو هُرَيْرَةَ حَدِيثَ الأَوَّلِ قُلْنَا أَلَمْ تُحَدِّثْ أَنَّهُ لاَ عَدْوَى فَرَطَنَ بِالْحَبَشِيَّةِ. قَالَ أَبُو سَلَمَةَ فَمَا رَأَيْتُهُ نَسِيَ حَدِيثًا غَيْرَهُ.
বাংলা অনুবাদ: আবু সালামা থেকে বর্ণিত। তিনি পরে আবু হুরায়রাকে বলতে শুনেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অসুস্থ পশুর মালিক যেন তার পশুকে সুস্থ পশুর মালিকের পশুর কাছে না আনে।”
আবু হুরায়রা প্রথম হাদিসটি অস্বীকার করলেন। আমরা বললাম, “আপনি কি বর্ণনা করেননি যে সংক্রমণ নেই?” তখন তিনি হাবশি ভাষায় কথা বললেন।
আবু সালামা বলেন, “এটি ছাড়া তাঁকে আর কোনো হাদিস ভুলে যেতে দেখিনি।”
এই বর্ণনায় আবু হুরায়রার অস্বীকারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রোতারা তাঁকে তাঁর আগের বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আবু সালামা ঘটনাটিকে ভুলে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করে বর্ণনা করেছেন। Sunnah.com-এর এই পাতার আরবি অংশে অস্বীকার, শ্রোতাদের প্রশ্ন এবং হাবশি ভাষায় কথা বলার বিবরণ রয়েছে। কিন্তু প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদে শুধু অসুস্থ ও সুস্থ পশুকে একসঙ্গে না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে ওই পাতার ইংরেজি অনুবাদ থেকে ঘটনাটির সম্পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় না।
সহিহ মুসলিমে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
সহিহ মুসলিমে ঘটনাটি আরও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে আবু হুরায়রার চাচাতো ভাই হারিস ইবন আবি যুবাবের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন এবং আবু সালামার অনিশ্চয়তা দুটোই পাওয়া যায়। [12]
وَحَدَّثَنِي أَبُو الطَّاهِرِ، وَحَرْمَلَةُ، – وَتَقَارَبَا فِي اللَّفْظِ – قَالاَ أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ، أَخْبَرَنِي يُونُسُ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّ أَبَا سَلَمَةَ بْنَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ عَدْوَى ” . وَيُحَدِّثُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ ” . قَالَ أَبُو سَلَمَةَ كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يُحَدِّثُهُمَا كِلْتَيْهِمَا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ صَمَتَ أَبُو هُرَيْرَةَ بَعْدَ ذَلِكَ عَنْ قَوْلِهِ ” لاَ عَدْوَى ” . وَأَقَامَ عَلَى ” أَنْ لاَ يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ ” . قَالَ فَقَالَ الْحَارِثُ بْنُ أَبِي ذُبَابٍ – وَهُوَ ابْنُ عَمِّ أَبِي هُرَيْرَةَ – قَدْ كُنْتُ أَسْمَعُكَ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ تُحَدِّثَنَا مَعَ هَذَا الْحَدِيثِ حَدِيثًا آخَرَ قَدْ سَكَتَّ عَنْهُ كُنْتَ تَقُولُ قَالَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” لاَ عَدْوَى ” . فَأَبَى أَبُو هُرَيْرَةَ أَنْ يَعْرِفَ ذَلِكَ وَقَالَ ” لاَ يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ ” . فَمَا رَآهُ الْحَارِثُ فِي ذَلِكَ حَتَّى غَضِبَ أَبُو هُرَيْرَةَ فَرَطَنَ بِالْحَبَشِيَّةِ فَقَالَ لِلْحَارِثِ أَتَدْرِي مَاذَا قُلْتُ قَالَ لاَ . قَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ . قُلْتُ أَبَيْتُ . قَالَ أَبُو سَلَمَةَ وَلَعَمْرِي لَقَدْ كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يُحَدِّثُنَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” لاَ عَدْوَى ” . فَلاَ أَدْرِي أَنَسِيَ أَبُو هُرَيْرَةَ أَوْ نَسَخَ أَحَدُ الْقَوْلَيْنِ الآخَرَ
বাংলা অনুবাদ: আবু সালামা ইবন আবদুর রহমান ইবন আওফ বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সংক্রমণ নেই।” তিনি আরও বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অসুস্থ পশুর মালিক যেন তার পশুকে সুস্থ পশুর মালিকের পশুর কাছে না আনে।”
আবু সালামা বলেন, আবু হুরায়রা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এই দুটি বক্তব্যই বর্ণনা করতেন। পরে আবু হুরায়রা “সংক্রমণ নেই” বক্তব্যটি সম্পর্কে নীরব হয়ে গেলেন এবং অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না আনার বক্তব্যটি বর্ণনা করতে থাকলেন।
তখন হারিস ইবন আবি যুবাব, যিনি আবু হুরায়রার চাচাতো ভাই, তাঁকে বললেন, “হে আবু হুরায়রা, আমি আপনাকে এই হাদিসের সঙ্গে আরেকটি হাদিসও বর্ণনা করতে শুনতাম। এখন আপনি সেটি সম্পর্কে নীরব হয়ে গেছেন। আপনি বলতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সংক্রমণ নেই।’”
আবু হুরায়রা সেটি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, “অসুস্থ পশুর মালিক যেন তার পশুকে সুস্থ পশুর মালিকের পশুর কাছে না আনে।”
হারিস তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে তর্ক করতে থাকলেন। অবশেষে আবু হুরায়রা রেগে গেলেন এবং হাবশি ভাষায় কথা বললেন। এরপর তিনি হারিসকে বললেন, “আমি কী বলেছি, তুমি কি জানো?” তিনি বললেন, “না।” আবু হুরায়রা বললেন, “আমি বলেছি, আমি অস্বীকার করছি।”
আবু সালামা বলেন, “আমার জীবনের শপথ, আবু হুরায়রা আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সংক্রমণ নেই।’ আমি জানি না, আবু হুরায়রা ভুলে গিয়েছিলেন, নাকি দুটি বক্তব্যের একটি অন্যটিকে রহিত করেছিল।”
মুসলিমের বর্ণনায় ঘটনাটির কয়েকটি পর্যায় পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা প্রথমে দুটি বক্তব্যই বর্ণনা করতেন। পরে সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্যটি বলা বন্ধ করেন। তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে সেটি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে, অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না নেওয়ার নির্দেশটি বর্ণনা করতে থাকেন। এখানে আবু হুরায়রার আগের বর্ণনা এবং পরবর্তী অস্বীকারের মধ্যে সরাসরি সংঘাত রয়েছে। হারিস তাঁর স্মৃতির ওপর নির্ভর করে আগের বক্তব্যের কথা স্মরণ করাচ্ছেন। আবু সালামাও নিশ্চিত করছেন, আবু হুরায়রা তাঁদের কাছে সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্যটি বর্ণনা করেছিলেন।
ভুলে যাওয়া এবং রহিত হওয়ার প্রশ্ন
অস্বীকারের কারণ সম্পর্কে আবু সালামা নিজেই অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন। তিনি ভুলে যাওয়া এবং একটি বক্তব্যের মাধ্যমে অন্য বক্তব্য রহিত হওয়ার সম্ভাবনা তুলেছেন। অস্বীকারের কারণ সম্পর্কে বর্ণনায় কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই। ভুলে যাওয়ার ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে একজন গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাকারীর স্মৃতি এবং তাঁর নিজের আগের বর্ণনা অস্বীকার করার বিষয়টি সামনে আসে। শ্রোতারা যে বক্তব্য মনে রেখেছেন, বর্ণনাকারী পরে সেটিই অস্বীকার করছেন। ফলে শুধু বর্ণনাকারীর পরবর্তী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে তাঁর আগের বর্ণনার ইতিহাস নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রহিত হওয়ার সম্ভাবনা গ্রহণ করলে প্রশ্ন আসে, কোন বক্তব্য আগে বলা হয়েছিল এবং কোনটি পরে? কোন তথ্য থেকে নির্ধারণ করা হবে যে একটি বক্তব্য অন্যটির বিধান বাতিল করেছে? আবু সালামার বক্তব্যে এই কালানুক্রম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায় সম্ভাবনাটি উত্থাপিত হয়েছে, নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। স্মৃতি, আগের বর্ণনা অস্বীকার এবং রহিত হওয়ার প্রশ্ন পরবর্তী ব্যাখ্যাকারীদের উদ্ভাবিত সমস্যা নয়; হাদিস সংরক্ষণের বিবরণেই এগুলো উপস্থিত।
অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে নেওয়া নিষেধ কেন?
আবু হুরায়রা যে নির্দেশটি বর্ণনা করতে থাকলেন, সেটি হলো: অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে নেওয়া যাবে না। এই নিষেধ অসুস্থ ও সুস্থ পশুর মেলামেশা নিয়ন্ত্রণ করে। সংস্পর্শে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিকে এই নিষেধের কারণ হিসেবে গ্রহণ করলে সংক্রমণের বাস্তবতা স্বীকার করতে হয়। বেদুইনের পর্যবেক্ষণেও একই সম্পর্কের কথা উঠেছিল: রোগাক্রান্ত উট পালে প্রবেশ করার পরে অন্য উটগুলো আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্য এই সম্পর্কটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। রোগীর সংস্পর্শে অন্যের অসুস্থ হওয়ার কোনো সম্পর্ক না থাকলে অসুস্থ ও সুস্থ পশুকে আলাদা রাখার নির্দেশের কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়। আর সংস্পর্শের কারণে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা স্বীকার করলে সংক্রমণ অস্বীকারকারী বাক্যটির অর্থ পরিবর্তন করতে হয়।
| বিষয় | বর্ণনায় যা পাওয়া যায় |
|---|---|
| বেদুইনের অভিজ্ঞতা | রোগাক্রান্ত উট পালে প্রবেশ করার পরে অন্য উটগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে |
| সংক্রমণ সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য | সংক্রমণ নেই; প্রথম উটটিকে কে আক্রান্ত করেছিল |
| পশুর মেলামেশা সম্পর্কে মুহাম্মদের নির্দেশ | অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে নেওয়া যাবে না |
| আবু হুরায়রার পরবর্তী অবস্থান | আলাদা রাখার নির্দেশ বর্ণনা করতে থাকা এবং আগের সংক্রমণ অস্বীকারকারী বর্ণনা স্বীকার না করা |
সুনান আবু দাউদেও বেদুইনের প্রশ্ন, অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না নেওয়ার নির্দেশ এবং আবু হুরায়রার অস্বীকারের বিবরণ একত্রে পাওয়া যায়। সেখানে তাঁকে আগের বর্ণনার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, তিনি সেটি তাঁদের কাছে বর্ণনা করেননি। আবু সালামা আবারও নিশ্চিত করেন, তিনি তা বর্ণনা করেছিলেন। [13]
قَالَ لَمْ أُحَدِّثْكُمُوهُ . قَالَ الزُّهْرِيُّ قَالَ أَبُو سَلَمَةَ قَدْ حَدَّثَ بِهِ وَمَا سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ نَسِيَ حَدِيثًا قَطُّ غَيْرَهُ .
বাংলা অনুবাদ: তিনি বললেন, “আমি তোমাদের কাছে এটি বর্ণনা করিনি।” যুহরি বলেন, আবু সালামা বলেছেন, “তিনি অবশ্যই এটি বর্ণনা করেছেন। এটি ছাড়া আবু হুরায়রা আর কোনো হাদিস ভুলে গেছেন বলে আমি কখনো শুনিনি।”
সংক্রমণ অস্বীকার এবং রোগাক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখার নির্দেশের টানাপোড়েন হাদিসের নিজস্ব বর্ণনাতেই সংরক্ষিত হয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে একজন বর্ণনাকারীর আগের বক্তব্য অস্বীকার এবং তাঁর শ্রোতাদের প্রতিবাদ। এই ইতিহাসকে বাদ দিয়ে পরবর্তী একটি সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যাকে শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠিত ও দ্ব্যর্থহীন অর্থ হিসেবে উপস্থাপন করলে বর্ণনাগুলোর ভেতরের সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যায়।
কুষ্ঠরোগী প্রতিনিধিকে ফেরত পাঠানো: মুহাম্মদের নিজের আচরণ
কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে পালানোর নির্দেশের পাশাপাশি মুহাম্মদের নিজের আচরণ সম্পর্কেও একটি বর্ণনা রয়েছে। সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর কাছে বার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়, তাঁর বায়াত গ্রহণ করা হয়েছে, তিনি ফিরে যেতে পারেন। [14]
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، أَخْبَرَنَا هُشَيْمٌ، ح وَحَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا شَرِيكُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، وَهُشَيْمُ بْنُ بَشِيرٍ، عَنْ يَعْلَى بْنِ عَطَاءٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ الشَّرِيدِ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ” إِنَّا قَدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ ” .
বাংলা অনুবাদ: আমর ইবনুশ শারিদ তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, সাকিফের প্রতিনিধি দলে একজন কুষ্ঠরোগী ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছে বার্তা পাঠালেন, “আমরা তোমার বায়াত গ্রহণ করেছি। তুমি ফিরে যাও।”
এই ঘটনায় সরাসরি উপস্থিত হয়ে বায়াত সম্পন্ন করার পরিবর্তে বার্তা পাঠিয়েই ব্যক্তিটিকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বর্ণনায় তাঁর কুষ্ঠরোগের পরিচয়টি বিশেষভাবে উল্লেখিত। কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে দূরে থাকার নির্দেশের পাশে এই আচরণ রাখলে একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়: সাধারণ নির্দেশে রোগীকে এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট ঘটনাতেও দূর থেকে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। রোগীর সান্নিধ্য এড়ানোকে সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর ভিত্তিতে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি স্বীকার করা হয়। তখন “সংক্রমণ নেই” বক্তব্যের সরাসরি অর্থ ধরে রাখা যায় না। কুষ্ঠরোগী এড়িয়ে চলার সাধারণ নির্দেশের সঙ্গে মিলিয়ে এই ঘটনায় রোগের কারণে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ধারাবাহিকতাই পাওয়া যায়।
এখানে ধর্মীয় স্বীকৃতি ও শারীরিক দূরত্ব একসঙ্গে উপস্থিত। ব্যক্তিটির বায়াত গৃহীত হয়েছে, কিন্তু তাঁকে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে আচরণ সম্পর্কে এই বিবরণকে আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞানের সমতুল্য বলে প্রচার করতে হলে রোগের প্রকৃত সংক্রমণপথ, সংস্পর্শের মাত্রা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতার সঙ্গেও মিল দেখাতে হয়। শুধু একজন রোগীকে দূরে রাখার ঘটনা থেকে সেই জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংক্রমণ অস্বীকার এবং রোগীকে দূরে রাখার আচরণ একই ধর্মীয় ঐতিহ্যে সংরক্ষিত। সংক্রমণরোধকে দ্বিতীয়টির কারণ বলা হলে প্রথমটির সাধারণ অস্বীকৃতি ভুল হয়ে যায়।
প্লেগ আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়ার নিষেধাজ্ঞা
সংক্রমণসংক্রান্ত আলোচনায় প্লেগের হাদিস প্রায়ই তুলে ধরা হয়। রোগ দেখা দিয়েছে এমন এলাকায় প্রবেশ না করা এবং সেখানে অবস্থানরত মানুষের বেরিয়ে না আসার নির্দেশকে আধুনিক রোগনিয়ন্ত্রণের পূর্বাভাস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আক্রান্ত এলাকায় যাতায়াতের নিষেধাজ্ঞা সংক্রমণ অস্বীকারের বক্তব্যকে সত্য করে না। [15]
حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ عُمَرَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ أَخْبَرَنِي حَبِيبُ بْنُ أَبِي ثَابِتٍ، قَالَ سَمِعْتُ إِبْرَاهِيمَ بْنَ سَعْدٍ، قَالَ سَمِعْتُ أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ، يُحَدِّثُ سَعْدًا عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” إِذَا سَمِعْتُمْ بِالطَّاعُونِ بِأَرْضٍ فَلاَ تَدْخُلُوهَا، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلاَ تَخْرُجُوا مِنْهَا ” . فَقُلْتُ أَنْتَ سَمِعْتَهُ يُحَدِّثُ سَعْدًا وَلاَ يُنْكِرُهُ قَالَ نَعَمْ.
বাংলা অনুবাদ: হাবিব ইবন আবি সাবিত বলেন, আমি ইবরাহিম ইবন সা‘দকে বলতে শুনেছি, তিনি উসামা ইবন যায়দকে সা‘দের কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা যখন কোনো ভূখণ্ডে প্লেগের কথা শুনবে, সেখানে প্রবেশ করবে না। আর তোমরা কোনো ভূখণ্ডে অবস্থান করার সময় সেখানে প্লেগ দেখা দিলে সেখান থেকে বের হবে না।”
আমি বললাম, “আপনি কি তাঁকে সা‘দের কাছে এটি বর্ণনা করতে শুনেছেন এবং সা‘দ তা অস্বীকার করেননি?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”
নির্দেশটির ব্যবহারিক তাৎপর্য রয়েছে। আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ কমানো মানুষের বিপদের সংস্পর্শ কমাতে পারে। আক্রান্ত এলাকা থেকে মানুষের চলাচল সীমিত করাও কিছু পরিস্থিতিতে রোগের বিস্তার কমানোর ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। কিন্তু কোনো নির্দেশের ব্যবহারিক উপযোগিতা এবং সেই নির্দেশের পেছনে আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞানের জ্ঞান উপস্থিত থাকা পৃথক দাবি। জীবাণু, সংক্রমণপথ, রোগের সুপ্তিকাল কিংবা উপসর্গহীন অবস্থায় রোগ ছড়ানোর বিবরণ এই হাদিসে নেই।
তাকদিরের মধ্যেই সতর্কতা বেছে নেওয়ার বিবরণ
বুখারির পরের বর্ণনায় উমরের সিরিয়াযাত্রার সময় মহামারীর খবর পেয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্তের কথা আছে। সেখানে সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ হয়। আবু উবাইদা প্রশ্ন তোলেন, আল্লাহর তাকদির থেকে পালানো হচ্ছে কি না। উমর জবাব দেন, আল্লাহর তাকদির থেকে আল্লাহর তাকদিরের দিকেই যাওয়া হচ্ছে। পরে আবদুর রহমান ইবন আওফ মহামারী এলাকায় প্রবেশ ও সেখান থেকে পালিয়ে না বের হওয়ার নির্দেশ বর্ণনা করেন। [16]
نَعَمْ نَفِرُّ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ إِلَى قَدَرِ اللَّهِ
বাংলা অনুবাদ: হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর তাকদির থেকে আল্লাহর তাকদিরের দিকেই পালাচ্ছি।
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬৩/ চিকিৎসা
পরিচ্ছেদঃ ২৩০১. প্লেগ রোগের বর্ণনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৫৩১৮ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৫৭২৯
৫৩১৮। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) সিরিয়ার দিকে যাত্রা করেছিলেন। অবশেষে তিনি যখন সারগ এলাকায় গেলেন, তখন তার সঙ্গে সৈন্য বাহিনীর প্রধানগণ তথা আবূ উবায়দা ইবনু জাররাহ ও তার সংগীগণ সাক্ষাৎ করেন। তারা তাকে অবহিত করেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন উমর (রাঃ) বলেনঃ আমার নিকট প্রবীণ মুহাজীরদের ডেকে আনো। তখন তিনি তাদের ডেকে আনলেন। উমর (রাঃ) তাঁদের সিরিয়ায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটার কথা অবহিত করে তাদের কাছে পরামর্শ চহিলেন। তখন তাদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হল। কেউ বললেনঃ আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন; কাজেই তা থেকে ফিরে যাওয়াকে আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেনঃ আপনার সঙ্গে রয়েছেন শেষ অবশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণ, কাজেই আমাদের কাছে ভাল মনে হয় না যে, আপনি তাদের এই প্লেগের মধ্যে ঠেলে দিবেন।
উমর (রাঃ) বললেনঃ তোমরা আমার নিকট থেকে চলে যাও। এরপর তিনি বললেনঃ আমার নিকট আনসারদের ডেকে আনো। আমি তাদের ডেকে আনলাম। তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলে তারাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের ন্যায় মতভেদ করলেন। উমর (রাঃ) বললেনঃ তোমরা উঠে যাও। এরপর আমাকে বললেনঃ এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরায়শী আছেন, যারা মক্কা বিজয়ের বছর হিজরত করেছিলেন, তাদের ডেকে আনো। আমি তাদের ডেকে আনলাম, তখন তারা পরস্পরে কোন মতপার্থক্য করেননি। তাঁরা বললেনঃ আপনার লোকজনকে নিয়ে ফিরে যাওয়া এবং তাদের প্লেগের কবলে আপনার ঠেলো না দেওয়াই আমাদের কাছে ভাল মনে হয়। তখন উমর (রাঃ) লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সাওয়াবীর পিঠে আরোহন করবো (ফিরে যাওযার জন্য)। এরপর ভোরে সকলে এভাবে প্রস্তুতি নিল।
আবূ উবায়দা (রাঃ) বললেনঃ আপনি কি আল্লাহর নির্ধারণকৃত তাকদীর থেকে পলায়ন করার জন্য ফিরে যাচ্ছেন? উমর (রাঃ) বললেন হে আবূ উবায়দা! যদি তুমি ছাড়া অন্য কেউ কথাটি বলতো! হাঁ আমরা আল্লাহর এক তাকদীর থেকে আল্লাহর অন্য একটি তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত তোমার কিছু উটকে যদি তুমি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও আর সেখানে আছে দুটি মাঠ। তন্মধ্যে একটি হল সবুজ শ্যমল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তাহলে তাও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ।
বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) আসলেন। তিনি এতক্ষণ যাবত তাঁর কোন প্রয়োজনের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেনঃ এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তখ্য আছে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা যখন কোন এলাকায় (প্লেগের) প্রাদুর্ভাবের কথা শোন, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকে তাহলে পলায়ন করে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। বর্ণনাকারী বলেনঃ এরপর উমর (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)
এই বিবরণে তাকদিরের বিশ্বাসের সঙ্গে সতর্কতা গ্রহণের সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু তা থেকে “সংক্রমণ নেই” কথাটি বৈজ্ঞানিক সত্য হয়ে যায় না। সতর্কতার মাধ্যমে বাস্তব ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে গ্রহণ করলে কোন পরিস্থিতি বিপজ্জনক এবং কেন, সেই কার্যকারণ মেনে নিতে হয়।
একই নির্দেশের ভিন্ন ব্যাখ্যা
ইবন কুতাইবা প্লেগের এলাকা থেকে বের না হওয়ার নির্দেশকে আল্লাহর তাকদির থেকে পালানোর ধারণা প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ না করার কারণ হিসেবে বলেছেন, রোগমুক্ত স্থানে থাকা মানুষের মন ও জীবনযাপনের পক্ষে স্বস্তিকর। তাঁর এই ব্যাখ্যা আধুনিক সংক্রমণনিয়ন্ত্রণের ভাষা থেকে ভিন্ন। [17]
يريد بقوله : لا تخرجوا من البلد إذا كان فيه ، كأنكم تظنون أن الفرار من قدر الله تعالى ينجيكم من الله ، ويريد بقوله : وإذا كان ببلد فلا تدخلوه أن مقامكم بالموضع الذي لا طاعون فيه أسكن لأنفسكم وأطيب لعيشكم .
বাংলা অনুবাদ: কোনো এলাকায় তা থাকলে সেখান থেকে বের না হওয়ার অর্থ হলো, তোমরা যেন মনে না করো যে আল্লাহর তাকদির থেকে পালানো তোমাদের আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করবে। আর কোনো এলাকায় তা থাকলে প্রবেশ না করার অর্থ হলো, প্লেগমুক্ত স্থানে অবস্থান তোমাদের মনের জন্য বেশি শান্তিদায়ক ও জীবনযাপনের জন্য বেশি সুখকর।
অতএব প্লেগের নির্দেশ তুলে সংক্রমণ অস্বীকারকারী হাদিসের সমস্যা মুছে ফেলা যায় না। রোগের বিস্তার ঠেকানোকে নির্দেশটির কারণ হিসেবে গ্রহণ করলে সংক্রমণ স্বীকার করতে হয়। তাকদির বা মানসিক স্বস্তিকে কারণ হিসেবে গ্রহণ করলে আধুনিক মহামারিবিজ্ঞানের জ্ঞান উপস্থিত ছিল বলে দাবি করার ভিত্তি থাকে না। এই পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যাগুলো একসঙ্গে বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রমাণ হতে পারে না।
ইবন কুতাইবার আলোচনা: প্রাচীন আপত্তি এবং বিরোধ মেলানোর চেষ্টা
সংক্রমণসংক্রান্ত হাদিসের বিরোধ আধুনিক সমালোচকদের আবিষ্কার বলে দেখানো যায় না। ইবন কুতাইবার তাওয়িল মুখতালিফুল হাদিস গ্রন্থে এই আপত্তি স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে। তিনি আপত্তিকারীদের বক্তব্য হিসেবে “পরস্পরবিরোধী দুটি হাদিস” প্রসঙ্গ তুলে সংক্রমণ অস্বীকার, অসুস্থ পশুকে আলাদা রাখা, কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো এবং বায়াত করতে আসা কুষ্ঠরোগীকে ফেরত পাঠানোর বিবরণ একত্রে এনেছেন। এরপর নিজে সেগুলোর মধ্যে বিরোধ নেই বলে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন। ইবন কুতাইবা আপত্তিকারীদের বক্তব্য হিসেবেই “পরস্পরবিরোধী দুটি হাদিস” কথাটি উল্লেখ করেছেন; এটি তাঁর নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণসংক্রান্ত পরিচ্ছেদের শুরুতে লেখা আছে: [18]
قالوا حديثان متناقضان .
10 – العدوى والطيرة .
বাংলা অনুবাদ: তাঁরা বলেছেন: পরস্পরবিরোধী দুটি হাদিস।
১০. সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণ।
আপত্তিকারীদের বক্তব্য তুলে ধরার পরে তাঁর নিজের উত্তর শুরু হয়েছে এভাবে: [19]
قال أبو محمد : ونحن نقول : إنه ليس في هذا اختلاف ، ولكل معنى منها وقت وموضع ، فإذا وضع بموضعه زال الاختلاف .
বাংলা অনুবাদ: আবু মুহাম্মদ বলেন: আমাদের বক্তব্য হলো, এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। এগুলোর প্রতিটি অর্থের একটি সময় ও স্থান রয়েছে। যথাস্থানে স্থাপন করলে বিরোধ দূর হয়ে যায়।
বিরোধের আপত্তির জবাবে ইবন কুতাইবা অর্থ, সময় ও প্রয়োগক্ষেত্র আলাদা করে সমন্বয় করেছেন। তাঁর পরের ব্যাখ্যায় রোগ ছড়ানোর অভিজ্ঞতা গ্রহণ করা হলেও তার কারণ হিসেবে দুর্গন্ধ ও ক্ষত থেকে নিঃসৃত পদার্থকে সামনে আনা হয়েছে।
দুর্গন্ধকে অসুস্থতার কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা
ইবন কুতাইবা সংক্রমণকে দুই ধরনের বলে আলোচনা শুরু করেন। কুষ্ঠরোগ ও অন্য কিছু রোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সান্নিধ্যে অসুস্থ হওয়ার ঘটনাকে তিনি দুর্গন্ধের প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। কুষ্ঠরোগীর স্ত্রী, সন্তান, দীর্ঘ সান্নিধ্য এবং চর্মরোগাক্রান্ত উটের প্রসঙ্গও তাঁর ব্যাখ্যায় রয়েছে। [20]
والعدوى جنسان : أحدهما عدوى الجذام ، فإن المجذوم تشتد رائحته حتى يسقم من أطال مجالسته ومؤاكلته ، وكذلك المرأة تكون تحت المجذوم فتضاجعه في شعار واحد ، فيوصل إليها الأذى ، وربما جذمت ، وكذلك ولده ينزعون في الكثير إليه .
وكذلك من كان به سل ودق ونقب ، والأطباء تأمر بأن لا يجالس المسلول ولا المجذوم لا يريدون بذلك معنى العدوى ، إنما يريدون به تغير الرائحة وأنها قد تسقم من أطال اشتمامها ، والأطباء أبعد الناس من الإيمان بيمن أو شؤم ، وكذلك النقبة تكون بالبعير ، وهي جرب رطب ، فإذا خالطها الإبل وحاكها وأوى في مباركها ، أوصل إليها بالماء الذي يسيل منه والنطف ، نحوا مما به .
বাংলা অনুবাদ: সংক্রমণ দুই ধরনের। একটি হলো কুষ্ঠের সংক্রমণ। কুষ্ঠরোগীর গন্ধ এত তীব্র হয় যে দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে বসা ও খাওয়া মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। একইভাবে কোনো নারী কুষ্ঠরোগীর স্ত্রী হয়ে তাঁর সঙ্গে একই আচ্ছাদনে শয়ন করলে তার কাছে ক্ষতি পৌঁছায় এবং কখনো সেও কুষ্ঠে আক্রান্ত হয়। তার সন্তানদের মধ্যেও অনেক ক্ষেত্রে একই প্রবণতা দেখা যায়।
একই কথা প্রযোজ্য যক্ষ্মা, ক্ষয় ও ক্ষতগ্রস্ততার ক্ষেত্রেও। চিকিৎসকেরা যক্ষ্মারোগী ও কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে বসতে নিষেধ করেন। তাঁরা এর দ্বারা সংক্রমণের অর্থ বোঝান না; তাঁরা গন্ধের পরিবর্তন এবং দীর্ঘ সময় সেই গন্ধ গ্রহণকারী অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, তা বোঝান। শুভ বা অশুভে বিশ্বাস থেকে চিকিৎসকেরা সবচেয়ে দূরে থাকেন। একইভাবে উটের যে ক্ষত হয়, তা ভেজা খোসপাঁচড়া। অন্য উট তার সঙ্গে মিশলে, গা ঘষলে কিংবা তার বসার স্থানে আশ্রয় নিলে তার শরীর থেকে বের হওয়া তরল ও ফোঁটার মাধ্যমে অন্য উটেরও অনুরূপ অবস্থা হয়।
এই ব্যাখ্যায় রোগীর দীর্ঘ সান্নিধ্য, একসঙ্গে থাকা এবং অসুস্থ পশুর সঙ্গে গা ঘষা বা একই স্থানে থাকার পরে অন্যের আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা স্বীকার করা হয়েছে। তাঁর সমাধান হলো এই ঘটনাগুলোকে একদিকে গ্রহণ করা, অন্যদিকে হাদিসে অস্বীকৃত ‘সংক্রমণ’ থেকে আলাদা অর্থে ব্যাখ্যা করা। কুষ্ঠের ক্ষেত্রে দুর্গন্ধকে অসুস্থতার কারণ বলা হয়েছে; উটের ক্ষেত্রে ক্ষতের তরল ও ব্যবহৃত স্থানের সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্গন্ধের উপস্থিতি এবং জীবাণুর স্থানান্তর পৃথক বিষয়। কোনো গন্ধ অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু গন্ধ অনুভব করা থেকে সংক্রামক রোগের জীবাণু, প্রবেশপথ ও রোগসৃষ্টির প্রক্রিয়া শনাক্ত করা হয় না। একইভাবে পরিবারের মধ্যে একাধিক মানুষের রোগ দেখা দেওয়াকে বংশগত সাদৃশ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করলে যৌথ পরিবেশ ও দীর্ঘ সংস্পর্শের ভূমিকা আলাদা করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ইবন কুতাইবার আলোচনায় তাই বাস্তব পর্যবেক্ষণ এবং ভুল কার্যকারণ ব্যাখ্যা পাশাপাশি রয়েছে। পশুর ক্ষত, সংস্পর্শ ও ব্যবহৃত স্থানের সম্পর্ক লক্ষ করা হয়েছে; কুষ্ঠের কারণ হিসেবে দেওয়া দুর্গন্ধের ব্যাখ্যা ভুল। এই লেখাকে জীবাণুতত্ত্বের আগাম আবিষ্কার বলা যায় না। এটি রোগ ছড়ানোর অভিজ্ঞতা এবং সংক্রমণ অস্বীকারকারী ধর্মীয় বক্তব্য মেলানোর একটি প্রাচীন প্রয়াস। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তিনি এমন ব্যাখ্যার কথাও উল্লেখ করেছেন যেখানে অসুস্থ পশু দূরে রাখার উদ্দেশ্য বলা হয়েছিল, মালিক যেন পরে তার পশু অসুস্থ হলে সংক্রমণ ঘটেছে বলে বিশ্বাস না করেন। ইবন কুতাইবা সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং নিজের বর্ণিত ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায় বলে জোর দিয়েছেন। প্রাচীন ইসলামি আলোচনার মধ্যেই বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বাস রক্ষার যুক্তির সংঘাত ছিল।
ইমাম নববীর বিবরণ: একই সমস্যার তিন ধরনের সমাধান
ইমাম নববীর শরহ সহিহ মুসলিমে সংক্রমণসংক্রান্ত হাদিস মেলানোর একাধিক পদ্ধতি সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি নিজে একটি সমন্বয়কে সঠিক বলেছেন, অন্য দুটি ব্যাখ্যাও নথিবদ্ধ করেছেন। এই মতভেদই প্রমাণ করে, পরবর্তী একটি ব্যাখ্যা শুরু থেকেই মুহাম্মদের বক্তব্যের একমাত্র অবিসংবাদিত অর্থ ছিল—এমন দাবি মিথ্যা।
প্রথম ব্যাখ্যা: রোগের স্বভাবগত ক্ষমতা অস্বীকার
নববীর বর্ণিত সংখ্যাগরিষ্ঠের সমাধান হলো, সংক্রমণ অস্বীকারের হাদিসে রোগের নিজের স্বভাবগত ক্ষমতায় সংক্রমিত হওয়ার বিশ্বাস নাকচ করা হয়েছে। অন্যদিকে রোগীকে এড়িয়ে চলার নির্দেশে আল্লাহর কাজ ও তাকদিরের মাধ্যমে সাধারণত যেখানে ক্ষতি ঘটে, তা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। এই সমন্বয়ে সংক্রমণ অস্বীকারকে বিশেষ ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে সীমিত করা হয়েছে। [21]
قال جمهور العلماء : يجب الجمع بين هذين الحديثين ، وهما صحيحان . قالوا : وطريق الجمع أن حديث ( لا عدوى ) المراد به نفي ما كانت الجاهلية تزعمه وتعتقده أن المرض والعاهة تعدي بطبعها لا بفعل الله تعالى .
وأما حديث ( لا يورد ممرض على مصح ) فأرشد فيه إلى مجانبة ما يحصل الضرر عنده في العادة بفعل الله تعالى وقدره .
فنفى في الحديث الأول العدوى بطبعها ، ولم ينف حصول الضرر عند ذلك بقدر الله تعالى وفعله ، وأرشد في الثاني إلى الاحتراز مما يحصل عنده الضرر بفعل الله وإرادته وقدره .
বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ আলেম বলেছেন, এই দুটি হাদিসের মধ্যে সমন্বয় করা আবশ্যক এবং দুটিই সহিহ। তাঁদের মতে, সমন্বয়ের পদ্ধতি হলো, ‘সংক্রমণ নেই’ হাদিসে জাহেলি যুগের মানুষের সেই ধারণা ও বিশ্বাস নাকচ করা হয়েছে যে রোগ ও অসুস্থতা নিজেদের স্বভাবে সংক্রমিত হয়, আল্লাহর কাজের মাধ্যমে নয়।
আর ‘অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে আনবে না’ হাদিসে এমন বিষয় থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার সান্নিধ্যে আল্লাহর কাজ ও তাকদিরের মাধ্যমে সাধারণত ক্ষতি ঘটে।
প্রথম হাদিসে স্বভাবগত সংক্রমণ নাকচ করা হয়েছে। সেখানে আল্লাহর তাকদির ও কাজের মাধ্যমে ক্ষতি ঘটাকে অস্বীকার করা হয়নি। দ্বিতীয় হাদিসে আল্লাহর কাজ, ইচ্ছা ও তাকদিরের মাধ্যমে যেখানে ক্ষতি ঘটে, তা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
নববী এই সমন্বয় গ্রহণ করেছেন। এর ফলে রোগীর সান্নিধ্যে ক্ষতি ঘটার বাস্তবতা বজায় থাকে, কিন্তু তার চূড়ান্ত কারণ হিসেবে আল্লাহকে স্থাপন করা হয়। এখানে ব্যাখ্যার কেন্দ্র হলো কার্যকারণের ধর্মতাত্ত্বিক মালিকানা। মূল বাক্যে উচ্চারিত সাধারণ অস্বীকৃতিকে এই বিশেষ অর্থে সীমিত করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: একটি হাদিস অন্যটিকে রহিত করেছে
নববী জানিয়েছেন, কিছু আলেম অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না নেওয়ার নির্দেশকে ‘সংক্রমণ নেই’ হাদিসের মাধ্যমে রহিত বলে বিবেচনা করেছেন। তিনি এই মতকে ভুল বলেছেন। তাঁর আপত্তি দুটি: হাদিসগুলোর মধ্যে সমন্বয় সম্ভব থাকলে রহিত হওয়ার সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না; আর রহিত হওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য আগে-পরে বলা হওয়ার ইতিহাস জানা প্রয়োজন। এখানে সেই ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত নেই। এই ব্যাখ্যার ফল গুরুতর। সংক্রমণ অস্বীকারের বক্তব্যকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া হলে অসুস্থ পশু আলাদা রাখার নির্দেশের কার্যকারিতা ধর্মীয় ব্যাখ্যাতেই বাতিল হয়ে যেতে পারে। আজ যে নির্দেশকে সংক্রমণ প্রতিরোধে ইসলামের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রমাণ বলা হয়, অতীতে কেউ সেটিকেই রহিত বলে বিবেচনা করেছেন।
তৃতীয় ব্যাখ্যা: সংক্রমণ নেই, দূরে থাকার কারণ দুর্গন্ধ ও অস্বস্তি
নববী অন্য একটি মত এভাবে উল্লেখ করেছেন: [22]
وقال آخرون : حديث ( لا عدوى ) على ظاهره ، وأما النهي عن إيراد الممرض على المصح فليس للعدوى ، بل للتأذي بالرائحة الكريهة ، وقبح صورته ، وصورة المجذوم . والصواب ما سبق . والله أعلم .
বাংলা অনুবাদ: অন্যরা বলেছেন, ‘সংক্রমণ নেই’ হাদিস তার প্রকাশ্য অর্থেই প্রযোজ্য। অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে আনতে নিষেধ করার কারণ সংক্রমণ নয়; বরং দুর্গন্ধে কষ্ট পাওয়া এবং তার ও কুষ্ঠরোগীর চেহারার কদর্যতা। সঠিক বক্তব্য হলো আগে যা বলা হয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
এই তৃতীয় ব্যাখ্যায় রোগীকে এড়িয়ে চলার কারণ হিসেবে রোগীর দেহের গন্ধ ও চেহারাকে সামনে আনা হয়েছে। এতে রোগ প্রতিরোধের প্রশ্নটি সরে গিয়ে রোগীকে দেখলে বা তাঁর কাছে গেলে সুস্থ মানুষের অস্বস্তির প্রশ্ন প্রধান হয়ে ওঠে। এখানে অসুস্থ মানুষের শরীর ও চেহারাকেই সামাজিক দূরত্বের কারণ করা হচ্ছে।
| ব্যাখ্যা | সংক্রমণ সম্পর্কে অবস্থান | রোগী বা অসুস্থ পশুকে এড়ানোর ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| নববীর নির্বাচিত সমন্বয় | স্বভাবগত স্বাধীন ক্ষমতা অস্বীকার; আল্লাহর মাধ্যমে ক্ষতি স্বীকার | সাধারণত ক্ষতি ঘটে এমন পরিস্থিতি এড়ানো |
| রহিত হওয়ার মত | সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্যকে পরবর্তী ও কার্যকর ধরা | আলাদা রাখার নির্দেশ রহিত বলে বিবেচনা |
| আক্ষরিক অস্বীকৃতির মত | সংক্রমণ সম্পূর্ণ অস্বীকার | দুর্গন্ধ ও চেহারাজনিত অস্বস্তি এড়ানো |
একই হাদিসের ব্যাখ্যা থেকে এখানে বাস্তব আচরণ সম্পর্কে ভিন্ন সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে। রোগের সংক্রমণ মেনে সতর্কতা গ্রহণ, সতর্কতার নির্দেশ রহিত বলে ধরা এবং সংক্রমণ অস্বীকার করে রোগীর চেহারাকে সমস্যার কারণ করা এক অবস্থান নয়। ঐতিহাসিক মতভেদটি মুছে দিয়ে একটিমাত্র ব্যাখ্যাকে মূল বক্তব্যের স্বতঃসিদ্ধ অর্থ বলা যায় না।
ইবন হাজার ও আইনীর আলোচনা: তাকদির, কারণ এবং ভিন্ন ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতা
ইবন হাজারের ফাতহুল বারি এবং বদরুদ্দিন আইনীর উমদাতুল কারিতে সংক্রমণসংক্রান্ত পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা সংরক্ষিত আছে। রোগীর সংস্পর্শে ক্ষতি হতে পারে বলে গ্রহণ করা এবং সেই ক্ষতির কার্যকারণকে ধর্মতাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। পাশাপাশি সংক্রমণ সম্পূর্ণ অস্বীকারের ধারাও সংরক্ষিত হয়েছে।
ইবন হাজারের আলোচনায় কারণের স্বীকৃতি ও স্বাধীন ক্ষমতার অস্বীকৃতি
ইবন হাজার সমন্বয়ের একাধিক পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। একটি পদ্ধতিতে অসুস্থের কাছ থেকে দূরে থাকার নির্দেশকে সাধারণ কার্যকারণ স্বীকার হিসেবে এবং অন্য আচরণকে কারণের স্বাধীনতা অস্বীকার হিসেবে পড়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বাইহাকির বক্তব্য তুলে ধরেছেন: [23]
قال البيهقي : وأما ما ثبت عن النبي – صلى الله عليه وسلم – أنه قال : لا عدوى فهو على الوجه الذي كانوا يعتقدونه في الجاهلية من إضافة الفعل إلى غير الله – تعالى – .
وقد يجعل الله بمشيئته مخالطة الصحيح من به شيء من هذه العيوب سببا لحدوث ذلك ، ولهذا قال – صلى الله عليه وسلم – : فر من المجذوم فرارك من الأسد وقال : لا يورد ممرض على مصح ” وقال في الطاعون ” من سمع به بأرض فلا يقدم عليه وكل ذلك بتقدير الله – تعالى – . وتبعه على ذلك ابن الصلاح في الجمع بين الحديثين ومن بعده وطائفة ممن قبله .
বাংলা অনুবাদ: বাইহাকি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রতিষ্ঠিত ‘সংক্রমণ নেই’ বক্তব্যটি জাহেলি যুগে আল্লাহ ছাড়া অন্যের প্রতি কাজটি আরোপ করার যে বিশ্বাস ছিল, সেই অর্থে প্রযোজ্য।
আল্লাহ তাঁর ইচ্ছায় সুস্থ মানুষের সঙ্গে এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের মেলামেশাকে সেই রোগ হওয়ার কারণ করতে পারেন। এ কারণেই তিনি বলেছেন, ‘কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে সিংহের কাছ থেকে পালানোর মতো পালাও’; বলেছেন, ‘অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে আনবে না’; এবং প্লেগ সম্পর্কে বলেছেন, ‘কোনো ভূখণ্ডে এর কথা শুনলে সেখানে যাবে না।’ এসবই আল্লাহর তাকদিরে ঘটে। দুটি হাদিসের সমন্বয়ে ইবনুস সালাহ এবং তাঁর পরের ও আগের কিছু আলেমও এই পথ অনুসরণ করেছেন।
এই সমন্বয়ে সংস্পর্শকে রোগ হওয়ার কারণ হিসেবে স্বীকার করা হচ্ছে। পার্থক্য তৈরি করা হচ্ছে কারণের বাস্তব উপস্থিতি এবং তার স্বাধীন ক্ষমতার মধ্যে। ধর্মতাত্ত্বিকভাবে এটি আল্লাহকে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক হিসেবে ধরে রাখার পদ্ধতি। রোগের জীবাণু কী, কীভাবে দেহে প্রবেশ করে এবং কোন পরিস্থিতিতে ছড়ায়, তার উত্তর এই ব্যাখ্যায় দেওয়া হচ্ছে না।
নববীর শরহ সহিহ মুসলিমেও রোগীর সান্নিধ্যে ক্ষতি স্বীকার করে সেই ক্ষতিকে আল্লাহর কাজ ও তাকদিরের অধীন বলা হয়েছে। বাইহাকি, ইবনুস সালাহ ও নববীর সমন্বয়ধারায় কার্যকারণকে অস্বীকার না করে তার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে রাখা হয়।
আইনীর আলোচনায় পাশাপাশি সংরক্ষিত বিপরীত অর্থ
আইনী অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না আনার হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবন বত্তালের একটি সমাধান এবং নববীর সমাধান পাশাপাশি এনেছেন। তাঁর সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদ: [24]
وَالتَّوْفِيقُ بَيْنَ الْحَدِيثَيْنِ بِمَا قَالَهُ ابْنُ بَطَّالٍ، وَهُوَ أَنْ “لَا عَدْوَى” إِعْلَامٌ بِأَنَّهَا لَا حَقِيقَةَ لَهَا، وَأَمَّا النَّهْيُ فَلِئَلَّا يَتَوَهَّمَ الْمُصِحُّ أَنَّ مَرَضَهَا مِنْ أَجْلِ وُرُودِ الْمَرْضَى عَلَيْهَا فَيَكُونُ دَاخِلًا بِتَوَهُّمِهِ ذَلِكَ فِي تَصْحِيحِ مَا أَبْطَلَهُ النَّبِيُّ – صَلَّى اللَّهُ تَعَالَى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – مِنَ الْعَدْوَى، وَقَالَ النَّوَوِيُّ: الْمُرَادُ بِقَوْلِهِ: “لَا عَدْوَى” يَعْنِي مَا كَانُوا يَعْتَقِدُونَهُ أَنَّ الْمَرَضَ يُعْدِي بِطَبْعِهِ، وَلَمْ يَنْفِ حُصُولَ الضَّرَرِ عِنْدَ ذَلِكَ بِقُدْرَةِ اللَّهِ تَعَالَى وَجَعْلِهِ، وَبِقَوْلِهِ: “لَا يُورِدَنَّ” الْإِرْشَادُ إِلَى مُجَانَبَةِ مَا يَحْصُلُ الضَّرَرُ عِنْدَهُ فِي الْعَادَةِ بِفِعْلِ اللَّهِ وَقَدَرِهِ، وَقِيلَ: النَّهْيُ لَيْسَ لِلْعَدْوَى، بَلْ لِلتَّأَذِّي بِالرَّائِحَةِ الْكَرِيهَةِ وَنَحْوِهَا.
বাংলা অনুবাদ: দুটি হাদিসের মধ্যে সমন্বয় ইবন বত্তালের বক্তব্য অনুযায়ী করা যায়। তাঁর মতে, ‘সংক্রমণ নেই’ কথাটি সংক্রমণের কোনো বাস্তবতা নেই বলে জানানো। আর নিষেধের উদ্দেশ্য হলো, সুস্থ পশুর মালিক যেন ধারণা না করেন যে অসুস্থ পশু কাছে আনার কারণেই তাঁর পশু অসুস্থ হয়েছে। কারণ, এমন ধারণা করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সংক্রমণকে বাতিল করেছেন, তিনি সেটিকেই সত্য বলে ধরে নেবেন। নববী বলেছেন, ‘সংক্রমণ নেই’ দ্বারা মানুষের রোগ নিজের স্বভাবে সংক্রমিত হওয়ার বিশ্বাস বোঝানো হয়েছে। আল্লাহর ক্ষমতা ও সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষতি হওয়াকে অস্বীকার করা হয়নি। আর ‘আনবে না’ কথার মাধ্যমে এমন বিষয় থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে, যার সান্নিধ্যে আল্লাহর কাজ ও তাকদিরে সাধারণত ক্ষতি হয়। আরও বলা হয়েছে, নিষেধের কারণ সংক্রমণ নয়; বরং দুর্গন্ধ ও অনুরূপ বিষয়ে কষ্ট পাওয়া।
এখানে প্রথম ব্যাখ্যা সংক্রমণের বাস্তবতা অস্বীকার করে। দ্বিতীয়টি রোগীর সান্নিধ্যে ক্ষতি স্বীকার করে তার কারণ আল্লাহর কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তৃতীয়টি রোগীর দুর্গন্ধকে দূরে থাকার কারণ বলে। একই অনুচ্ছেদে এই ব্যাখ্যাগুলো থাকার অর্থ হলো, সংক্রমণ নিয়ে ঐতিহ্যের অবস্থানকে এক বাক্যে অভিন্ন করে দেখানো ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। ইবন হাজারের আলোচনাতেও সমন্বয়, রহিত হওয়া এবং একটি বর্ণনাকে অন্যটির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার ভিন্ন পথ পাওয়া যায়। কেউ সংক্রমণ অস্বীকারকারী বর্ণনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন; কেউ রোগী এড়ানোর নির্দেশকে। ইবন হাজার সমন্বয়ের সুযোগ থাকলে সেটি গ্রহণের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এই পদ্ধতিগত নির্বাচন হাদিসের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা রক্ষার চেষ্টা। আধুনিক পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ যাচাই করা এর উদ্দেশ্য নয়।
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা দেখায়, সংক্রমণ অস্বীকারকে তাকদিরতত্ত্বে রূপ দেওয়ার ব্যাখ্যা পুরোনো। একই সঙ্গে সংক্রমণ পুরোপুরি অস্বীকারের ব্যাখ্যাও পুরোনো। বর্তমানের কোনো বক্তার আক্ষরিক অস্বীকৃতিকে ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে সরিয়ে দিলে এই ইতিহাস বাদ পড়ে যায়।
রোগীকে এড়ানোর উদ্দেশ্য সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানো ঠেকানো: আবু উবাইদ ও ইবন খুজাইমার ব্যাখ্যা
রোগীর কাছ থেকে দূরে থাকার নির্দেশকে কখনো এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে সংক্রমণ প্রতিরোধের বদলে সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানো ঠেকানোই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। ইবন হাজার তাঁর আলোচনার ষষ্ঠ পদ্ধতি হিসেবে এই মত সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় আবু উবাইদের বক্তব্য হলো: [25]
المسلك السادس : العمل بنفي العدوى أصلا ورأسا ، وحمل الأمر بالمجانبة على حسم المادة وسد الذريعة لئلا يحدث للمخالط شيء من ذلك فيظن أنه بسبب المخالطة فيثبت العدوى التي نفاها الشارع ، وإلى هذا القول ذهب أبو عبيد وتبعه جماعة فقال أبو عبيد : ليس في قوله : لا يورد ممرض على مصح إثبات العدوى ، بل لأن الصحاح لو مرضت بتقدير الله – تعالى – ربما وقع في نفس صاحبها أن ذلك من العدوى فيفتتن ويتشكك في ذلك ، فأمر باجتنابه .
বাংলা অনুবাদ: ষষ্ঠ পদ্ধতি হলো সংক্রমণকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা। দূরে থাকার নির্দেশকে এমন আশঙ্কা ও তার পথ বন্ধ করার অর্থে নেওয়া হয়, যাতে সান্নিধ্যে থাকা ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে মেলামেশাকেই তার কারণ মনে না করেন এবং শরিয়তপ্রণেতা যে সংক্রমণ অস্বীকার করেছেন, তা প্রতিষ্ঠিত বলে গ্রহণ না করেন। আবু উবাইদ এবং তাঁর অনুসারী একদল এই মত গ্রহণ করেছেন। আবু উবাইদ বলেন, ‘অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে আনবে না’ কথায় সংক্রমণ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সুস্থ পশুগুলো আল্লাহর তাকদিরে অসুস্থ হলে মালিকের মনে হতে পারে, সংক্রমণের কারণে এমন হয়েছে। তাতে তিনি বিভ্রান্তি ও সংশয়ে পড়তে পারেন। তাই দূরে থাকতে বলা হয়েছে।
এই ব্যাখ্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাকে সংস্পর্শের ফল হিসেবে গ্রহণ করাই সমস্যার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রোগীর কাছে যাওয়ার পরে কেউ অসুস্থ হলে তিনি সংক্রমণ ঘটেছে বলে ভাবতে পারেন। সেই বিশ্বাস জন্মানোর সুযোগ বন্ধ করতেই দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে বলা হচ্ছে।
ইবন হাজার ইবন খুজাইমার কিতাবুত তাওয়াক্কুলের আলোচনাও তুলে ধরেছেন। সেখানে রোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: [26]
إنما أمرهم – صلى الله عليه وسلم – بالفرار من المجذوم كما نهاهم إن يورد الممرض على المصح شفقة عليهم ، وخشية أن يصيب بعض من يخالطه المجذوم الجذام ، والصحيح من الماشية الجرب فيسبق إلى بعض المسلمين أن ذلك من العدوى فيثبت العدوى التي نفاها – صلى الله عليه وسلم – فأمرهم بتجنب ذلك شفقة منه ورحمة ليسلموا من التصديق بإثبات العدوى ، وبين لهم أنه لا يعدي شيء شيئا .
বাংলা অনুবাদ: কুষ্ঠরোগী থেকে পালাতে বলা এবং অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে আনতে নিষেধ করা হয়েছে তাদের প্রতি মমতা থেকে। আশঙ্কা ছিল, কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে মেলামেশাকারীদের কেউ কুষ্ঠে আক্রান্ত হলে কিংবা সুস্থ পশুর খোসপাঁচড়া হলে কোনো কোনো মুসলিমের মনে হবে, এটি সংক্রমণের কারণে হয়েছে। তাতে তিনি সেই সংক্রমণ স্বীকার করবেন, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকার করেছেন। তাই মমতা ও দয়া থেকে তা এড়াতে বলা হয়েছে, যাতে তাঁরা সংক্রমণ প্রতিষ্ঠিত বলে বিশ্বাস করা থেকে রক্ষা পান। তাঁদের বোঝানো হয়েছে, কোনো কিছু অন্য কিছুকে সংক্রমিত করে না।
এই ব্যাখ্যার জ্ঞানগত সমস্যা গভীর। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সংক্রমণ নেই। তারপর রোগীর সান্নিধ্যের পরে অসুস্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ যেন বিপরীত সিদ্ধান্তে না পৌঁছান, সেই উদ্দেশ্যে আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বাস্তব পর্যবেক্ষণ থেকে বিশ্বাস সংশোধনের পথটি এখানে বন্ধ রাখা হয়। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে রোগীর সংস্পর্শে থাকা এবং না থাকা মানুষের মধ্যে অসুস্থতার পার্থক্য পরীক্ষা করা হয়। অন্য কারণগুলো বিবেচনা করে সেই সম্পর্ক যাচাই করা হয়। এই ব্যাখ্যায় পর্যবেক্ষণ থেকে সংক্রমণের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোকেই এড়াতে বলা হচ্ছে। ফলে একই নিষেধাজ্ঞাকে আধুনিক রোগ প্রতিরোধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা এবং তার এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করা ভিন্ন অবস্থান। আক্ষরিক সংক্রমণ অস্বীকার এবং রোগী এড়িয়ে চলাকে ঈমান রক্ষার উপায় হিসেবে দেখানোর নজির প্রাচীন ব্যাখ্যার মধ্যেই রয়েছে। আধুনিক আলেমদের আক্ষরিক সংক্রমণ অস্বীকার এই প্রাচীন পিঠরক্ষারই ধারাবাহিকতা।
খেজুরের পরাগায়ন: ভুল পরামর্শের ক্ষতি ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব
মুহাম্মদের পার্থিব জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং তাঁর কথার ব্যবহারিক পরিণতি সহিহ মুসলিমের খেজুরের পরাগায়নসংক্রান্ত বর্ণনায় সরাসরি উপস্থিত [27]। মদিনার কৃষকেরা খেজুরের পরাগায়ন করতেন। মুহাম্মদ কাজটি না করলেই ভালো হবে বলে মত দেওয়ার পরে তাঁরা তা ছেড়ে দেন। রাফি ইবন খাদিজের বর্ণনায় এরপর ফল ঝরে যাওয়া অথবা ফলন কমে যাওয়ার কথা আছে। আয়িশা ও আনাসের সূত্রে সংকলিত বর্ণনায় চিটা খেজুর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কৃষকেরা তাঁর আগের কথার বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি বলেন, পার্থিব বিষয়ে তাঁরাই বেশি জানেন। এখানে ভুল পরামর্শের বাস্তব পরিণতি ভোগ করেছেন সেই কৃষকেরা, যাঁরা তাঁর কথায় নিজেদের কাজের পদ্ধতি বদলেছিলেন। [28]
أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم مَرَّ بِقَوْمٍ يُلَقِّحُونَ فَقَالَ ” لَوْ لَمْ تَفْعَلُوا لَصَلُحَ ” . قَالَ فَخَرَجَ شِيصًا فَمَرَّ بِهِمْ فَقَالَ ” مَا لِنَخْلِكُمْ ” . قَالُوا قُلْتَ كَذَا وَكَذَا قَالَ ” أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأَمْرِ دُنْيَاكُمْ ” .
বাংলা অনুবাদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরাগায়নরত কিছু লোকের পাশ দিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, “তোমরা এটি না করলে ভালো হতো।” বর্ণনাকারী বলেন, এরপর চিটা খেজুর হলো। তিনি তাদের পাশ দিয়ে গিয়ে বললেন, “তোমাদের খেজুরগাছের কী হয়েছে?” তারা বলল, “আপনি এমন এমন বলেছিলেন।” তিনি বললেন, “তোমাদের পার্থিব বিষয়ে তোমরাই অধিক অবগত।”
কৃষকেরা যে কাজটি করে আসছিলেন, মুহাম্মদের অনুমানের কারণে সেটিই বন্ধ হলো। তাঁর ব্যক্তিগত মত অনুসারীদের উৎপাদনপদ্ধতি বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলেছে। ফল খারাপ হওয়ার পরে কৃষকেরা তাঁকে তাঁর নিজের কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। নবীর কথার মর্যাদা এখানে কৃষকের ব্যবহারিক জ্ঞানের জায়গা দখল করেছে, আর ক্ষতি বহন করেছেন কৃষকেরা। পরে তাঁদের অধিক জ্ঞান স্বীকার করা আগের পরামর্শকে সঠিক করে না। এই বিবরণে ধর্মীয় কর্তৃত্ব অনুসরণের একটি বাস্তব সমস্যা ধরা পড়ে: বক্তার মর্যাদা তাঁর অনুমানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়, অথচ সেই অনুমানের ভুলের মূল্য দিতে হয় অনুসারীদের।
তালহার সূত্রে সংকলিত বর্ণনায় মুহাম্মদ প্রথমে পরাগায়নকে উপকারী মনে করেননি বলে জানান। লোকেরা সেই কথা শুনে কাজটি ছেড়ে দেয়। পরে বিষয়টি তাঁকে জানানো হলে তিনি নিজের আগের কথাকে অনুমান হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা কথার সঙ্গে তার পার্থক্য করেন। এখানে তাঁর নিজের বক্তব্যেই ব্যক্তিগত অনুমানের সীমা এবং আল্লাহর নামে বলা বক্তব্যের জন্য আলাদা কর্তৃত্বের দাবি উপস্থিত। [29]
إِنْ كَانَ يَنْفَعُهُمْ ذَلِكَ فَلْيَصْنَعُوهُ فَإِنِّي إِنَّمَا ظَنَنْتُ ظَنًّا فَلاَ تُؤَاخِذُونِي بِالظَّنِّ وَلَكِنْ إِذَا حَدَّثْتُكُمْ عَنِ اللَّهِ شَيْئًا فَخُذُوا بِهِ فَإِنِّي لَنْ أَكْذِبَ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
বাংলা অনুবাদ: যদি কাজটি তাদের উপকার করে, তবে তারা তা করুক। আমি তো কেবল একটি অনুমান করেছিলাম; আমার অনুমানের জন্য আমাকে দায়ী করো না। কিন্তু আমি যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো কথা বলি, তা গ্রহণ করো; কারণ আমি মহাপরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত আল্লাহর নামে মিথ্যা বলব না।
এই পার্থক্য থেকে একটি সরাসরি প্রশ্ন আসে: কোন কাজের ফলে ফলন বাড়ে, সে বিষয়ে মুহাম্মদের অনুমান ভুল হতে পারলে রোগ কীভাবে ছড়ায়, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে অভ্রান্ত ধরে নেওয়ার ভিত্তি কী? কৃষিকাজ ও রোগের সংক্রমণ উভয়ই বাস্তব কার্যকারণের বিষয়। পরাগায়নের উপকারিতা ফলনে প্রকাশ পায়; সংক্রমণের বাস্তবতা প্রকাশ পায় জীবাণুর স্থানান্তর, আক্রান্তের বিস্তার এবং প্রতিরোধের ফলে। কোনো দাবিকে ধর্মীয় বক্তব্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করলেই তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রমাণ মিথ্যা হয়ে যায় না। “পার্থিব বিষয়ে তোমরাই অধিক অবগত” স্বীকার করে নেওয়ার পরে পার্থিব রোগসংক্রমণের প্রশ্নে বিশেষজ্ঞের পরীক্ষিত জ্ঞানকে হাদিসের অধীন করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকে না।
সংক্রমণ অস্বীকারকারী বক্তব্যের পিঠরক্ষায় তাই মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়: রোগ সম্পর্কে মুহাম্মদের বক্তব্য ভুল হতে পারে কি না। খেজুরের ঘটনায় তাঁর কথায় চাষপদ্ধতি বদলানোর পরে ক্ষতির বিবরণ সংরক্ষিত আছে। সংক্রমণের ক্ষেত্রে একই ধরনের কর্তৃত্ব চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেললে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। ভুল বক্তব্যের অর্থ পাল্টে তাকে অভ্রান্ত রাখার চেষ্টা সেই ঝুঁকি দূর করে না। নবুয়তের মর্যাদা কৃষিবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষতার প্রমাণ নয়; রোগ ও জীবিকার প্রশ্নে ভুলের পরিণতি ধর্মীয় পরিচয় মেনে থেমে থাকে না।
বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা: জীবাণু, সংক্রমণ এবং রোগের কার্যকারণ
আধুনিক জীবাণুবিজ্ঞান রোগের কারণ হিসেবে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও বিভিন্ন পরজীবীর ভূমিকা শনাক্ত করেছে। রোগসৃষ্টিকারী এসব জীবাণু নির্দিষ্ট পথে দেহে প্রবেশ করতে পারে, বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং দেহের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিলিতভাবে অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে। সংক্রমণের জন্য একটি উৎস, জীবাণু পৌঁছানোর পথ এবং সংবেদনশীল দেহের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা সিডিসির সংক্রমণবিষয়ক মৌলিক ব্যাখ্যাতেও এই প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। [30]
An infection occurs when germs enter the body, increase in number and the body reacts.
বাংলা অনুবাদ: জীবাণু দেহে প্রবেশ করে সংখ্যায় বাড়লে এবং দেহ প্রতিক্রিয়া জানালে সংক্রমণ ঘটে।
একেক রোগের সংক্রমণপথ একেক রকম। শ্বাসের সঙ্গে নির্গত কণা, সরাসরি সংস্পর্শ, দূষিত বস্তু, খাদ্য বা পানি, রক্ত এবং বাহক প্রাণীর ভূমিকা রোগভেদে আলাদা। সেই কারণে সব রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও এক হতে পারে না। শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ানো রোগের ক্ষেত্রে ঘরের বাতাস ও শ্বাসরক্ষার গুরুত্ব থাকতে পারে; দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়ানো রোগের ক্ষেত্রে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের গুরুত্ব থাকে। কারণ জানা থাকলেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নির্দিষ্ট করা যায়। [31]
Use Contact Precautions for patients with known or suspected infections
বাংলা অনুবাদ: পরিচিত বা সন্দেহভাজন সংক্রমণের রোগীদের ক্ষেত্রে সংস্পর্শজনিত সতর্কতা ব্যবহার করুন।
সংক্রমণের প্রমাণ কীভাবে তৈরি হয়
পরপর দুজনের অসুস্থ হওয়াই একা কার্যকারণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পরীক্ষাগারের ফল, রোগের সময়ক্রম, তুলনামূলক ঝুঁকি এবং বিকল্প কারণের মূল্যায়ন মিলিয়ে রোগের বিস্তার নির্ণয় করা হয়। জীবাণু শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধের ফল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ সেই অনুসন্ধানে পরস্পরকে সমর্থন করে।
| অনুসন্ধানের ক্ষেত্র | কী পরীক্ষা করা হয় |
|---|---|
| রোগজীবাণু শনাক্তকরণ | আক্রান্ত ব্যক্তির প্রাসঙ্গিক নমুনায় জীবাণু বা তার নির্দিষ্ট উপাদান পাওয়া যায় কি না |
| সময়ক্রম ও সংস্পর্শ | সম্ভাব্য উৎসের সংস্পর্শের পরে যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সংক্রমণ বা রোগ দেখা দেয় কি না |
| তুলনামূলক ঝুঁকি | সংস্পর্শে থাকা ও না থাকা মানুষের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার হারে পার্থক্য রয়েছে কি না |
| পরীক্ষামূলক অনুসন্ধান | উপযুক্ত ও নৈতিক গবেষণায় জীবাণুর রোগসৃষ্টির ক্ষমতা এবং প্রক্রিয়া যাচাই করা যায় কি না |
| জিনগত সম্পর্ক | বিভিন্ন নমুনার জীবাণুর মিল রোগের বিস্তারের ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না |
| প্রতিরোধের ফল | সংক্রমণপথে বাধা দেওয়া বা কার্যকর প্রতিরোধ গ্রহণের পরে নতুন আক্রান্তের হার কমে কি না |
জীবাণুকে পৃথক করা, উপযুক্ত পরীক্ষামূলক পরিবেশে রোগ সৃষ্টি এবং আবার সেই জীবাণু শনাক্ত করার ঐতিহাসিক পদ্ধতি রোগের কারণ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে কখের শর্তগুলো সব রোগের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নয়। ভাইরাসের গবেষণা, উপসর্গহীন বাহক এবং আধুনিক আণবিক পরীক্ষার কারণে কার্যকারণ যাচাইয়ের পদ্ধতি বিস্তৃত হয়েছে। সব জীবাণুকে জীবন্ত কোষ ছাড়া একইভাবে বাড়ানো যায়, এমন ধারণাও সঠিক নয়। [32]
Some agents cannot be propagated in culture.
বাংলা অনুবাদ: কিছু রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুকে পরীক্ষাগারে কালচার করে বাড়ানো যায় না।
সংক্রমণ একটি সম্ভাবনাভিত্তিক প্রক্রিয়া
একই রোগীর কাছে যাওয়া সবাই অসুস্থ হন না। জীবাণুর পরিমাণ, প্রবেশপথ, সংস্পর্শের সময়, পরিবেশ এবং দেহের প্রতিরোধক্ষমতা ফলকে প্রভাবিত করে। উপসর্গ না থাকলেও কোনো কোনো ব্যক্তি জীবাণু বহন ও ছড়াতে পারেন। অন্যদিকে জীবাণুর সংস্পর্শে এসেও কারও দেহ তা প্রতিহত করতে পারে। এসব পার্থক্য গবেষণার বিষয়। কোনো ঝুঁকি প্রতিবার একই ফল ঘটায় না বলে সেই ঝুঁকি অস্বীকার করা যায় না। ধূমপানকারী প্রত্যেক ব্যক্তি একই রোগে আক্রান্ত হন না; প্রত্যেক সড়ক দুর্ঘটনাতেও একই আঘাত হয় না। তবু ঝুঁকির পার্থক্য পরীক্ষা ও পরিমাপ করা যায়। রোগের সংক্রমণ সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় প্রশ্ন হলো, প্রাসঙ্গিক শর্তগুলো বিবেচনায় নিলে আক্রান্ত উৎসের সংস্পর্শে ঝুঁকি বাড়ে কি না। বিজ্ঞানের বক্তব্য হলো, নির্দিষ্ট জীবাণু ও নির্দিষ্ট সংস্পর্শ রোগের ঝুঁকিতে বাস্তব পার্থক্য তৈরি করে। এই দাবির পক্ষে বা বিপক্ষে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। দৈব ইচ্ছার সাধারণ ঘোষণায় এমন কোনো পার্থক্য নির্দিষ্ট হয় না।
উটের চর্মরোগ: বেদুইনের পর্যবেক্ষণ এবং প্রথম রোগীর প্রশ্ন
বেদুইনের পর্যবেক্ষণে প্রথমে একটি সুস্থ পাল রয়েছে। পরে চর্মরোগাক্রান্ত একটি উট সেই পালে প্রবেশ করে। এরপর অন্য উটগুলোও আক্রান্ত হয়। এই সময়ক্রম থেকে সংস্পর্শের ভূমিকা সম্পর্কে একটি অনুসন্ধানযোগ্য প্রশ্ন তৈরি হয়। এর উত্তর দিতে হলে জানতে হয়, রোগের কারণ কী, আক্রান্ত উট অন্যদের মধ্যে কী বহন করছে এবং মেলামেশা বন্ধ করলে রোগের বিস্তারে কী পরিবর্তন হয়। “প্রথমটিকে কে আক্রান্ত করেছিল?” প্রশ্নটি এই অনুসন্ধানের কোনো ধাপের বিকল্প নয়। প্রথম উটের রোগের উৎস অজানা থাকলেও সেটি পরবর্তী উটগুলোর জন্য রোগের উৎস হতে পারে।
পশুচিকিৎসাবিজ্ঞানে সংক্রামক চর্মরোগ
পশুর কিছু খোসপাঁচড়াজাতীয় চর্মরোগ অতি ক্ষুদ্র পরজীবী মাইটের কারণে হয়। সরাসরি গা ঘষা এবং দূষিত বিছানা বা ব্যবহৃত জিনিসের মাধ্যমে কিছু মাইট অন্য পশুর দেহে পৌঁছাতে পারে। রোগের ধরন অনুযায়ী আক্রান্ত পশু, তার সংস্পর্শে আসা পশু এবং পরিবেশের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। [33]
Transmission is via direct contact and fomites.
বাংলা অনুবাদ: সরাসরি সংস্পর্শ এবং জীবাণু বা পরজীবী বহনকারী দূষিত বস্তুর মাধ্যমে বিস্তার ঘটে।
উটের ক্ষেত্রেও পরজীবী শনাক্ত করার গবেষণা রয়েছে। সৌদি আরবের এক গবেষণায় উটের চামড়ার নমুনা পরীক্ষা করে সারকপটিস স্ক্যাবিয়াই নামের মাইট পাওয়া গেছে। ফলে উটের মধ্যে সংক্রামক চর্মরোগের বিস্তার একটি পরীক্ষাযোগ্য পশুচিকিৎসাগত বাস্তবতা। [34]
skin scraping revealed that Sarcoptes scabiei var. cameli mite was found in 28% of the examined animals
বাংলা অনুবাদ: চামড়ার নমুনা পরীক্ষায় পরীক্ষিত প্রাণীগুলোর ২৮ শতাংশে সারকপটিস স্ক্যাবিয়াই ভ্যারাইটি ক্যামেলি মাইট পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের দুবাইয়ের ঘটনাভিত্তিক গবেষণায় একটি আক্রান্ত উট থেকে অন্য উট ও মানুষের মধ্যে সারকপটিক খোসপাঁচড়া ছড়ানোর বিবরণ রয়েছে। [35]
from one dromedary camel to a group of other dromedary camels and a group of human beings
বাংলা অনুবাদ: একটি এককুঁজবিশিষ্ট উট থেকে অন্য একদল এককুঁজবিশিষ্ট উট এবং একদল মানুষের মধ্যে।
হাদিসের উটগুলোর কোনো পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগনির্ণয় নেই। বেদুইনের পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব হলো, আক্রান্ত প্রাণীর সঙ্গে মেলামেশার পরে অন্য প্রাণীর অসুস্থ হওয়ার সম্পর্কটি তিনি সামনে এনেছিলেন। আধুনিক পশুচিকিৎসা এমন সম্পর্ক অনুসন্ধানের উপায় দেয়। প্রথম রোগীর উৎস সম্পর্কে পাল্টা প্রশ্ন সেই সম্পর্ক বাতিল করে না।
রোগের সূচনা এবং রোগের বিস্তার
প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণী রোগজীবাণু পেতে পারে অন্য কোনো প্রাণী, অচিহ্নিত বাহক, পরিবেশ কিংবা মানুষের নজরের বাইরে থাকা উৎস থেকে। কোনো পালে প্রথম শনাক্ত হওয়া উটটিই রোগের ইতিহাসের সর্বপ্রথম আক্রান্ত প্রাণী, এমনও নয়। পর্যবেক্ষকের কাছে প্রথম দেখা দেওয়া ঘটনা এবং প্রকৃত সূচনা এক জিনিস নয়। প্রথম রোগী শনাক্ত করতে না পারলেও পরবর্তী রোগীদের মধ্যে বিস্তারের পথ অনুসন্ধান করা সম্ভব। কোনো বাড়িতে আগুনের সূচনা কীভাবে হয়েছিল তা অজানা থাকলেও সেই আগুন পাশের বাড়িতে ছড়াচ্ছে কি না, তা দেখা যায়। আগুনের উৎস এবং আগুনের বিস্তারকে এক করে ফেললে একই যুক্তিগত ভুল ঘটে।
ধরুন, একটি গ্রামের বাজারে একটি খড়ের গুদামে আগুন লাগল। সেই গ্রামের একজন ধর্মগুরু বললেন, আগুন ছড়িয়ে পড়বে না। একজন সাধারণ গ্রামবাসী তখন প্রশ্ন করল, “যদি আগুন না ছড়ায়, তাহলে একটি গুদামে আগুন লাগার পর পাশের দোকানগুলোতে আগুন গেল কীভাবে?” প্রশ্নটি একেবারে যৌক্তিক। সে আগুনের প্রথম উৎস নিয়ে প্রশ্ন করছে না; সে প্রশ্ন করছে আগুনের বিস্তার নিয়ে। অর্থাৎ আগুন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়ায় কি না, এটাই তার পর্যবেক্ষণ। এখন গ্রামের সেই ধর্মগুরু যদি উত্তর দেন, “তাহলে প্রথম গুদামে আগুন লাগালো কে?”, তাহলে সেটি কোনো উত্তর হলো না। কারণ প্রথম আগুন বজ্রপাত, শর্ট সার্কিট, রান্নাঘরের চুলা, অথবা কারও অবহেলা, যেকোনো কারণে লাগতে পারে। কিন্তু প্রথম আগুন কীভাবে শুরু হলো, সেটি আলাদা প্রশ্ন; আগুন এক গুদাম থেকে পাশের গুদামে ছড়িয়েছে কি না, ছড়াতে পারে কিনা, সেটি আরেক প্রশ্ন। প্রথম আগুনের উৎস জানাতে না পারলেও আগুনের ছড়িয়ে পড়া অস্বীকার করা যায় না। ঠিক একইভাবে বেদুইনের প্রশ্ন ছিল সংক্রমণ নিয়ে: একটি অসুস্থ উট সুস্থ পালের মধ্যে ঢুকলে অন্য উটগুলো অসুস্থ হয় কেন? এটি ছিল বাস্তব পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রশ্ন। কিন্তু জবাবে “প্রথম উটটিকে কে অসুস্থ করল?” বলা হলো। এটি সংক্রমণের জবাব নয়; এটি আলোচনাকে রোগের উৎসের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। প্রথম উট কীভাবে অসুস্থ হলো, তা জানা না থাকলেও পরবর্তী উটগুলো তার সংস্পর্শে অসুস্থ হতে পারে। তাই এই উত্তরটি যুক্তি নয়, প্রসঙ্গান্তর; বাস্তব পর্যবেক্ষণকে এড়িয়ে নিজের আগের দাবি বাঁচানোর দুর্বল চেষ্টা।
একটি ঘটনার প্রাথমিক কারণ অজানা থাকলে তার পরবর্তী বিস্তার অস্তিত্বহীন হয়ে যায় না। রোগের ক্ষেত্রেও একটি ব্যাখ্যা সত্য হতে হলে তাকে পর্যবেক্ষিত সময়ক্রম এবং প্রতিরোধের ফল বোঝাতে হবে। বেদুইনের প্রশ্ন অনুসন্ধানের পথ খুলেছিল। প্রথম উটের পাল্টা প্রশ্ন সেই অনুসন্ধান সম্পন্ন করেনি। রোগ কোথা থেকে শুরু হলো এবং কীভাবে ছড়াল, একটির উত্তর অজানা বলে অন্যটির প্রমাণ নাকচ করা যায় না।
সংক্রমণ ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য মানদণ্ড
রোগের সংক্রমণ স্বীকার করা জনস্বাস্থ্যের কার্যকর ব্যবস্থার ভিত্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকে প্রমাণভিত্তিক ব্যবহারিক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করে। এর উদ্দেশ্য রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রতিরোধযোগ্য সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। হাসপাতালের হাত পরিষ্কার রাখা, নিরাপদ ইনজেকশন, জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি এবং সংক্রমণপথ অনুযায়ী সুরক্ষার ব্যবস্থা এই ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে। [36]
a practical, evidence-based approach preventing patients and health workers from being harmed by avoidable infections.
বাংলা অনুবাদ: প্রতিরোধযোগ্য সংক্রমণে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঠেকানোর একটি ব্যবহারিক, প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি।
রোগ ও সংক্রমণপথ অনুযায়ী ব্যবস্থা
সব রোগীর জন্য একই ধরনের বিচ্ছিন্নতা বা একই মাত্রার সতর্কতা প্রয়োজন হয় না। রোগের সংক্রমণপথ, আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা এবং আশপাশের মানুষের ঝুঁকি অনুযায়ী ব্যবস্থা নির্ধারিত হয়। স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োজনমতো অতিরিক্ত সতর্কতা যুক্ত করা হয়। [37]
Transmission-Based Precautions are the second tier of basic infection control
বাংলা অনুবাদ: সংক্রমণপথভিত্তিক সতর্কতা মৌলিক সংক্রমণনিয়ন্ত্রণের দ্বিতীয় স্তর।
| ব্যবস্থা | উদ্দেশ্য ও প্রয়োগের ভিত্তি |
|---|---|
| আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রয়োজনমতো পৃথক রাখা | যে রোগ ও পর্যায়ে অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে সংস্পর্শ কমানো |
| সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির পর্যবেক্ষণ | সম্ভাব্য সংক্রমণ শনাক্ত এবং রোগভেদে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা সাময়িক চলাচল নিয়ন্ত্রণ |
| টিকাদান | সংশ্লিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি এবং রোগভেদে অসুস্থতা, গুরুতর পরিণতি বা সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো |
| বাতাস চলাচল ও শ্বাসরক্ষা | শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণুর সংস্পর্শ কমানো |
| হাত পরিষ্কার ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা | সংস্পর্শ এবং দূষিত বস্তু থেকে জীবাণু স্থানান্তরের পথ কমানো |
| নিরাপদ পানি, খাদ্য ও স্যানিটেশন | খাদ্য ও পানিবাহিত সংক্রমণের পথ বন্ধ করা |
| উপযুক্ত চিকিৎসা ও সংস্পর্শ অনুসন্ধান | রোগীর চিকিৎসা, প্রয়োজনমতো সংক্রমণক্ষমতা কমানো এবং ঝুঁকিতে থাকা অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করা |
টিকা দেহকে নির্দিষ্ট রোগজীবাণু চিনে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কোন টিকা কোন ফল কতটা কমাবে, তা রোগ ও টিকাভেদে পরীক্ষা করা হয়। প্রতিরোধের ব্যবস্থা কাজ করছে কি না, তা নির্ধারণ করতে আক্রান্তের হার, গুরুতর অসুস্থতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ফল তুলনা করা হয়। এই ব্যবস্থাগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও রোগীর কাছে যেতে পারেন, তাঁকে চিকিৎসা দিতে পারেন এবং সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। রোগীকে দেখামাত্র পালিয়ে যাওয়ার সাধারণ নির্দেশের বদলে এখানে রয়েছে নির্দিষ্ট কারণের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। মানুষের সেবা এবং রোগ প্রতিরোধ একই কাঠামোর অংশ।
জনস্বাস্থ্য একটি যাচাইযোগ্য দায়িত্ব
সতর্কতা গ্রহণের পরে রোগ কমলে তার ফল পর্যালোচনা করা যায়। কোনো ব্যবস্থা অকার্যকর হলে তা বদলানো যায়। নতুন প্রমাণ এলে নিয়ম সংশোধন করা যায়। এই সংশোধনের ক্ষমতা জনস্বাস্থ্যের শক্তি, কারণ উদ্দেশ্য হলো বাস্তবে ক্ষতি কমানো। “আল্লাহ চাইলে হবে, না চাইলে হবে না” কথাটি থেকে এই ব্যবস্থাগুলোর কোনটি কখন প্রয়োজন, তা জানা যায় না। সেই সিদ্ধান্তের জন্য জীবাণু, সংস্পর্শ ও মানুষের দেহ সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন হয়। রোগ প্রতিরোধে ব্যবহারযোগ্য জ্ঞানকে ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন করলে মানুষের জীবনরক্ষার সিদ্ধান্ত প্রমাণের বদলে ব্যাখ্যাকারীর পছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ইসলামিস্টদের জোড়াতালি: সাতটি প্রচলিত ব্যাখ্যার বিচার
সংক্রমণসংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় একটি প্রবণতা বারবার দেখা যায়: মূল বক্তব্যকে ভুল প্রমাণিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে তার অর্থ এমনভাবে নির্ধারণ করা, যাতে বিপরীত প্রমাণও তার সঙ্গে মেলানো যায়। রোগ ছড়ানোর ঘটনা সামনে এলে সংক্রমণের ওপর দৈব অনুমতির শর্ত বসানো হয়। রোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ সামনে এলে কখনো রোগ প্রতিরোধ, কখনো ঈমান রক্ষা, কখনো অস্বস্তি এড়ানোর কথা বলা হয়। এই ব্যাখ্যাগুলোর কয়েকটির প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। আধুনিক প্রচারে সেগুলোকে নতুন বৈজ্ঞানিক ভাষায় উপস্থাপন করা হয়। এই ভাষা মূল বক্তব্যের অর্থ বদলায়; হাদিসকে অভ্রান্ত রাখার শর্ত থেকে রোগ সম্পর্কে নতুন কোনো যাচাইযোগ্য জ্ঞান তৈরি হয় না।

প্রথম জোড়াতালি: সংক্রমণ আছে, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ঘটে না
এই ব্যাখ্যায় রোগ ছড়ানোর ঘটনাটি গ্রহণ করা হয়। তারপর বলা হয়, আল্লাহর ইচ্ছাই তার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক। বিন বাযের মূল বক্তব্যের একটি অংশে রয়েছে: [38]
قد ينتقل المرض من المريض إلى الصحيح
বাংলা অনুবাদ: অসুস্থের রোগ সুস্থের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে পারে।
অন্য একটি ফতোয়ায় তিনি রোগী ও সুস্থের মেলামেশার কারণে কখনো কখনো আল্লাহর ইচ্ছায় রোগ স্থানান্তরিত হতে পারে বলে আরও স্পষ্ট করেছেন। এখানে বাস্তব সংক্রমণ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং তার সঙ্গে একটি ধর্মতাত্ত্বিক শর্ত যুক্ত হচ্ছে। [39]
بل ينتقل بإذن الله عند المخالطة؛ قد ينتقل عند المخالطة
বাংলা অনুবাদ: বরং মেলামেশার সময় আল্লাহর অনুমতিতে তা স্থানান্তরিত হয়; মেলামেশার সময় তা স্থানান্তরিত হতে পারে।
কিন্তু দৈব অনুমতির শর্ত জীবাণুর উপস্থিতি, সংস্পর্শের মাত্রা কিংবা প্রতিরোধের কার্যকারিতা সম্পর্কে আলাদা কোনো তথ্য দেয় না। সংক্রমণ হলে অনুমতি ছিল এবং না হলে অনুমতি ছিল না বললে যেকোনো ফলকেই একই বাক্যের সঙ্গে মেলানো যায়। রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন হয় কোন কারণ পরিবর্তন করলে ফল বদলায়, তার নির্দিষ্ট জ্ঞান। আগুন, গুলি, বিষ, সড়ক দুর্ঘটনা বা রোগের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য একইভাবে প্রযোজ্য। প্রতিটি ঘটনার পেছনে দৈব ইচ্ছা আছে বলা হলেও ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নিতে তার ভৌত কারণ জানতে হয়।
| প্রসঙ্গ | যে বাস্তব কারণটি পরীক্ষা করা যায় | যে সিদ্ধান্তে কারণের জ্ঞান প্রয়োজন |
|---|---|---|
| আগুনে পোড়া | তাপের মাত্রা ও দেহের সংস্পর্শ | আগুন থেকে দূরত্ব ও তাপরোধী সুরক্ষা |
| গুলির আঘাত | গতিশক্তি, আঘাতের স্থান ও দেহের ক্ষতি | আঘাত এড়ানোর ব্যবস্থা ও উপযুক্ত সুরক্ষা |
| বিষক্রিয়া | পদার্থের ধরন, মাত্রা ও দেহে প্রবেশ | বিষাক্ত পদার্থ এড়ানো এবং চিকিৎসা |
| উঁচু স্থান থেকে পতন | উচ্চতা, পতনের গতি ও আঘাত | নিরাপদ স্থাপনা ও পতনরোধের ব্যবস্থা |
| ভাইরাসের সংক্রমণ | জীবাণুর উৎস, প্রবেশপথ ও সংস্পর্শ | রোগভেদে কার্যকর প্রতিরোধ |
| সড়ক দুর্ঘটনা | গতি, নিয়ন্ত্রণ ও সংঘর্ষ | নিরাপদ চালনা ও যানবাহনের সুরক্ষা |
| বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া | বৈদ্যুতিক প্রবাহ ও দেহের মধ্য দিয়ে তার পথ | নিরোধক ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা |
| পানিতে ডুবে যাওয়া | শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হওয়া | জলাশয়ের নিরাপত্তা ও উদ্ধারব্যবস্থা |
| ধূমপানের স্বাস্থ্যঝুঁকি | ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শ | তামাকের ব্যবহার ও সংস্পর্শ কমানো |
| সিটবেল্টের সুরক্ষা | সংঘর্ষে দেহের গতি ও আঘাতের বণ্টন | পরীক্ষিত সুরক্ষা ব্যবহার |
কোনো অস্বীকৃতি ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরে তার সঙ্গে “আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া” জুড়ে দিলে বাক্যের অর্থ বদলে যায়। নিচের উদাহরণগুলোতে বক্তব্য দেওয়ার পরে বিপরীত ফল দেখা গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। বিশ্বকাপের উদাহরণে স্পেনের জয়ও এই কাল্পনিক পরিস্থিতির অংশ।
| মূল বক্তব্য | উদাহরণে ধরে নেওয়া বিপরীত ফল | পরে তৈরি করা ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| পৃথিবী ঘোরে না। | পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রমাণ পাওয়া গেল। | পৃথিবী ঘোরে না, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া। |
| ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে স্পেন চ্যাম্পিয়ন হবে না। | ধরে নেওয়া হলো, স্পেন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। | স্পেন চ্যাম্পিয়ন হবে না, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া। |
| আগামীকাল বৃষ্টি হবে না। | পরদিন বৃষ্টি হলো। | আগামীকাল বৃষ্টি হবে না, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া। |
| এই বীজ থেকে চারা হবে না। | বীজটি থেকে চারা বের হলো। | এই বীজ থেকে চারা হবে না, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া। |
স্পেনের উদাহরণে মূল পূর্বাভাস ছিল, দলটি চ্যাম্পিয়ন হবে না। স্পেন চ্যাম্পিয়ন হলে সেই পূর্বাভাস ভুল। পরে “আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া” যোগ করে বলা সম্ভব, স্পেন জিতেছে কারণ আল্লাহ চেয়েছেন। স্পেন না জিতলেও সংশোধিত বাক্যের সঙ্গে কোনো বিরোধ তৈরি হয় না। আল্লাহর ইচ্ছা ছিল কি না, তা ফল জানার আগে নির্ধারণের কোনো স্বাধীন, যাচাইযোগ্য মানদণ্ড এখানে দেওয়া হয়নি। ফলে আগের ভুল পূর্বাভাসের জায়গায় এমন একটি ভিন্ন দাবি বসানো হচ্ছে, যার মধ্যে জয় ও জয় না হওয়া—উভয় ফলই গ্রহণ করা যায়।
সংক্রমণের ক্ষেত্রেও “রোগ ছড়ায় না” এবং “রোগ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ছড়ায় না” একই দাবি নয়। প্রথমটির বিরুদ্ধে রোগ ছড়ানোর প্রমাণ হাজির করা যায়। দ্বিতীয়টির পক্ষে সংক্রমণ ঘটার পরে বলা যায়, অনুমতি ছিল বলেই ঘটেছে। সংক্রমণ না ঘটলেও বাক্যটির সঙ্গে বিরোধ হয় না। এই শর্ত থেকে জানা যায় না কোন জীবাণু কোন পথে ছড়াবে, কার ঝুঁকি বাড়বে কিংবা কোন ব্যবস্থা সংক্রমণ কমাবে। রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় তথ্য তখনও পরীক্ষিত জ্ঞান থেকেই নিতে হয়।
যেকোনো ফলের পরে যে বক্তব্যকে সেই ফলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়, সেটি কোন ফল ঘটবে আর কোনটি ঘটবে না—এই পরীক্ষাযোগ্য পার্থক্য নির্ধারণ করে না। এই ব্যবহারে বাক্যটি বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষমতা হারায়। “আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া” সংযোজন তাই মূল দাবির সত্যতার প্রমাণ নয়; পাল্টাপ্রমাণের মুখে তার অর্থ বদলে দেওয়ার পদ্ধতি। ভুল বক্তব্যের পিঠরক্ষা এবং বক্তব্যটিকে প্রমাণের পরীক্ষায় সত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ।
দ্বিতীয় জোড়াতালি: প্রথম রোগীর প্রশ্ন দিয়ে সংক্রমণ অস্বীকার
বেদুইনকে করা পাল্টা প্রশ্নকে কখনো এমন যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়, যেন প্রথম রোগীর উৎসের উত্তর না থাকলে পরবর্তী সংক্রমণও গ্রহণ করা যায় না। এই যুক্তি রোগের সূচনা এবং বিস্তারকে গুলিয়ে ফেলে। প্রথম শনাক্ত হওয়া উটের আগে আরও অচিহ্নিত আক্রান্ত প্রাণী থাকতে পারে। পরিবেশ বা অন্য উৎস থেকেও সংক্রমণ আসতে পারে। এগুলো অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু সেই অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থাকলেও একটি আক্রান্ত প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে রোগ ছড়ানোর প্রমাণ গ্রহণ করা যায়। “আগেরটি কোথা থেকে পেল?” প্রশ্নটি পরেরটির সংক্রমণ বাতিল করে না। আরও মৌলিক সমস্যা হলো, কোনো রোগের প্রতিটি ঘটনা একই পথে ঘটতেই হবে, এমন শর্ত বিজ্ঞান দেয় না। একটি জীবাণুর উৎস এবং মানুষের মধ্যে তার বিস্তারের পথ একাধিক হতে পারে। তাই প্রথম রোগীর প্রশ্ন থেকে সব সংক্রমণ অস্বীকারের সিদ্ধান্তে যাওয়া যুক্তিগত লাফ।
তৃতীয় জোড়াতালি: রোগীর কাছে গেলে সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মাতে পারে
এই ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক রূপ আবু উবাইদ ও ইবন খুজাইমার আলোচনায় পাওয়া গেছে। রোগীর কাছে যাওয়ার পরে কেউ অসুস্থ হলে তিনি সংস্পর্শকে কারণ ভাবতে পারেন। সেই বিশ্বাস থেকে বাঁচাতেই রোগীকে এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়। এখানে সমস্যাটি রোগীর কাছে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকি যাচাই করার আগে ফল সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া। কেউ অসুস্থ হলে সংক্রমণ ঘটেছে কি না, তা পরীক্ষা করার পরিবর্তে সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানোকে বিপজ্জনক মনে করা হচ্ছে। ফলে অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জনের বদলে অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
ঈমানের শক্তিকে সংক্রমণনিয়ন্ত্রণের ভিত্তি করার ব্যাখ্যাও ইবন হাজারের আলোচনায় সংরক্ষিত আছে। সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানোর আশঙ্কাকে দুর্বল ঈমানের সমস্যা এবং আল্লাহর ওপর দৃঢ় ভরসাকে মেলামেশার অবকাশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ঈমানের মাত্রা দিয়ে জীবাণুর প্রবেশপথ বা সংস্পর্শের ঝুঁকি পরিমাপ করা যায় না; রোগীর সঙ্গে আচরণ নির্ধারিত হয় রোগের অবস্থা ও প্রতিরোধের প্রমাণে। [40]
وحيث جاء فر من المجذوم كان المخاطب بذلك من ضعف يقينه ، ولم يتمكن من تمام التوكل فلا يكون له قوة على دفع اعتقاد العدوى ، فأريد بذلك سد باب اعتقاد العدوى عنه بأن لا يباشر ما يكون سببا لإثباتها .
বাংলা অনুবাদ: যেখানে “কুষ্ঠরোগী থেকে পালাও” বলা হয়েছে, সেখানে সম্বোধিত ব্যক্তি এমন, যার বিশ্বাস দুর্বল এবং যে পূর্ণ তাওয়াক্কুল অর্জন করেনি; ফলে সংক্রমণের বিশ্বাস ঠেকানোর শক্তি তার নেই। তাই এমন কিছুর কাছে না গিয়ে, যা সংক্রমণের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার কারণ হতে পারে, তার জন্য সেই বিশ্বাসের দরজা বন্ধ করাই উদ্দেশ্য।
চতুর্থ জোড়াতালি: সংক্রমণের নিজস্ব ক্ষমতা নেই
“নিজস্ব ক্ষমতা” দিয়ে জীবাণুর ভৌত কার্যকারণ বোঝালে তা পরীক্ষার বিষয়; আল্লাহ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা বোঝালে তা ধর্মতত্ত্ব। জীবাণুর মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় জীবাণুকে স্বাধীন দেবতা বা অলৌকিক সত্তা ধরে নেওয়া হয় না। এই অস্পষ্টতাকে ব্যবহার করে মূল হাদিসের সাধারণ অস্বীকৃতিকে কখনো ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে সীমিত করা হয়। তখন রোগ ছড়ানোর বাস্তবতা গ্রহণ করেও সংক্রমণ অস্বীকারকারী ভাষা বজায় রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সেই ভাষা সাধারণ মানুষের কাছে রোগ ছড়ায় না বলে পৌঁছালে তার ব্যবহারিক ফল ভিন্ন হয়।
আবদুল্লাহ আল-গুনাইমানের শরহ ফতহুল মাজিদের আলোচনায় এই পুনর্ব্যাখ্যার পদ্ধতি বিশেষভাবে স্পষ্ট। তিনি উল্লেখ করেছেন, বহু রোগ জীবাণুর কারণে হয় এবং জীবাণু রোগী থেকে সুস্থের মধ্যে যায়, এটি জানা গেলে হাদিসের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। তাঁর আরেক আলোচনায় ‘লা আদওয়া’কে নিষেধার্থেও পড়া হয়েছে, অর্থাৎ কেউ যেন অন্যকে রোগাক্রান্ত করার কারণ না হন। [41]
أما إذا علم ذلك فيتبين مراد الرسول صلى الله عليه وسلم، وأنه لا يخالف الواقع.
বাংলা অনুবাদ: এটি জানা গেলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয় এবং তিনি যে বাস্তবতার বিরোধিতা করেন না, তা বোঝা যায়।
এই পদ্ধতিতে বাস্তব জ্ঞান হাদিসের অর্থ নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগে থেকেই স্থির করা হয়েছে, মুহাম্মদের বক্তব্য বাস্তবতার বিরোধী হতে পারে না; এরপর সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানানসই অর্থ নির্বাচন করা হচ্ছে। এমন পদ্ধতি দিয়ে বক্তব্যের অভ্রান্ততা পরীক্ষা করা যায় না, কারণ ভুল হওয়ার সম্ভাবনাটিই শুরুতে বাদ দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চম জোড়াতালি: পালানোর নির্দেশ শুধু মানসিক স্বস্তির জন্য
কুষ্ঠরোগীর কাছে না যাওয়াকে শুধু অস্বস্তি, ভয় বা মানসিক স্বস্তির বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করলে রোগ প্রতিরোধের দাবি দুর্বল হয়ে যায়। রোগীর দুর্গন্ধ বা চেহারা সুস্থ মানুষের কাছে অস্বস্তিকর বলে তাঁকে এড়িয়ে চলা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংক্রমণনিয়ন্ত্রণ নয়। এটি রোগীর সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদার প্রশ্নও তৈরি করে। রোগীর সান্নিধ্যে বাস্তব সংক্রমণের ঝুঁকিকে দূরে থাকার কারণ বললে সংক্রমণের অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয়। কুষ্ঠের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি কী ধরনের সংস্পর্শে হয় এবং চিকিৎসার ফলে কী বদলায়, তা জানা প্রয়োজন। সিংহের কাছ থেকে পালানোর মতো সাধারণ ভাষা রোগের প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করে না।
ষষ্ঠ জোড়াতালি: সফর ও পেঁচার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়নি, তাই সংক্রমণও অস্বীকার করা হয়নি
এই তুলনায় বলা হয়, ‘লা সফর’ মানে সফর মাসের অস্তিত্ব নেই নয় এবং ‘লা হামাহ’ মানে পেঁচা নেই নয়। তাই ‘লা আদওয়া’ও সংক্রমণের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। এই তুলনায় ভিন্ন শব্দের ব্যাখ্যা দিয়ে সংক্রমণসংক্রান্ত নির্দিষ্ট ঘটনাটিকে পাশ কাটানো হয়।
সফর সম্পর্কে প্রাচীন ব্যাখ্যাকারীরা একাধিক অর্থ দিয়েছেন। কেউ মাসসংক্রান্ত বিশ্বাস, কেউ উদরে থাকা কোনো প্রাণী বা রোগসংক্রান্ত বিশ্বাসের কথা বলেছেন। হামাহ সম্পর্কে পেঁচার অমঙ্গল এবং মৃতের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বাসের ব্যাখ্যা রয়েছে। নববীর আলোচনাতেই এসব ভিন্ন অর্থ পাওয়া যায়। [42]
قوله صلى الله عليه وسلم : ( ولا صفر ) فيه تأويلان : أحدهما المراد تأخيرهم تحريم المحرم إلى صفر ، وهو النسيء الذي كانوا يفعلونه ، وبهذا قال مالك وأبو عبيدة .
والثاني أن الصفر دواب في البطن ، وهي دود
বাংলা অনুবাদ: তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের “সফর নেই” কথাটির দুটি ব্যাখ্যা আছে। একটি হলো, মুহররমের নিষেধাজ্ঞা সফরে পিছিয়ে দেওয়া; তারা যে নাসি করত, সেটিই বোঝানো হয়েছে। মালিক ও আবু উবাইদা এ কথা বলেছেন।
দ্বিতীয়টি হলো, সফর পেটের মধ্যে থাকা প্রাণী, অর্থাৎ কৃমি।
কিন্তু সংক্রমণের বর্ণনায় বেদুইনের প্রশ্ন একটি নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ তৈরি করেছে। তিনি কোনো পাখির ডাক বা মাসের অমঙ্গলের কথা বলেননি। তিনি অসুস্থ উটের সঙ্গে মেলামেশার পরে অন্য উটের অসুস্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলেছেন। সেই প্রশ্নের উত্তরও রোগের প্রথম ঘটনার দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই তালিকায় পাশের শব্দগুলোর ব্যাখ্যা দেখিয়ে রোগ ছড়ানোর এই বাস্তব প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
সপ্তম জোড়াতালি: প্লেগের নির্দেশ থেকেই আধুনিক সংক্রমণজ্ঞান প্রমাণিত
প্লেগ এলাকা এড়ানো কিংবা অসুস্থ পশুকে আলাদা রাখার নির্দেশে ব্যবহারিক সতর্কতা আছে। কিন্তু তার ভিত্তিতে মূল অস্বীকৃতির অর্থ, সংক্রমণ সম্পর্কে জ্ঞান এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমতুল্যতা একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এই নির্দেশগুলোকে রোগের বিস্তার ঠেকানোর ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করলে সংক্রমণের কার্যকারণ স্বীকার করতে হয়। তখন মূল অস্বীকৃতির জন্য আলাদা অর্থ নির্ধারণের প্রয়োজন হয়। আবার নির্দেশগুলোকে তাকদির থেকে পালানো ঠেকানো বা সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানো বন্ধ করার ব্যবস্থা বললে আধুনিক জনস্বাস্থ্যের জ্ঞান উপস্থিত ছিল বলে দাবি করা যায় না। ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুযায়ী একই নির্দেশকে কখনো সংক্রমণের প্রমাণ, কখনো সংক্রমণ অস্বীকারের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করাই এই পিঠরক্ষার কেন্দ্রীয় সমস্যা।
কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে একই পাত্রে খাওয়ার বর্ণনাটির মান
সংক্রমণ অস্বীকারের পক্ষে জাবিরের সূত্রে বর্ণিত কুষ্ঠরোগীর হাত খাবারের পাত্রে রাখার ঘটনাও আনা হয়। তিরমিজির বর্ণনায় মুহাম্মদ রোগীর হাত পাত্রে রেখে আল্লাহর ওপর আস্থা ও ভরসা করে খেতে বলছেন। ইসলামি হাদিসশাস্ত্রের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এই বর্ণনার সনদ নিয়েও আপত্তি রয়েছে। তিরমিজি বিকল্প বর্ণনাপথ উল্লেখ করে ইবন উমরের ঘটনা হিসেবে সংরক্ষিত পথকে অধিক প্রতিষ্ঠিত ও সঠিক বলেছেন। Sunnah.com-এ প্রকাশিত দারুসসালাম মূল্যায়নে বর্ণনাটি দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত। [43]
وَقَدْ رَوَى شُعْبَةُ هَذَا الْحَدِيثَ عَنْ حَبِيبِ بْنِ الشَّهِيدِ عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ أَخَذَ بِيَدِ مَجْذُومٍ وَحَدِيثُ شُعْبَةَ أَثْبَتُ عِنْدِي وَأَصَحُّ .
বাংলা অনুবাদ: শু‘বা হাবিব ইবনুশ শাহিদের সূত্রে ইবন বুরাইদা থেকে এই বর্ণনা করেছেন যে ইবন উমর একজন কুষ্ঠরোগীর হাত ধরেছিলেন। শু‘বার বর্ণনাটি আমার কাছে অধিক প্রতিষ্ঠিত ও অধিক সঠিক।
একটি খাবারের ঘটনায় কারও অসুস্থ না হওয়া দিয়েও রোগ অসংক্রামক প্রমাণিত হয় না। সংক্রমণের ঝুঁকি ও সংস্পর্শের মাত্রা বিবেচনা করতে হয়। দুর্বল সনদ একাই ঘটনাটিকে ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব করে না; একইভাবে ঘটনাটি সত্য হলেও সংক্রমণ অস্বীকারের চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ হয় না।
সংক্রমণের বাস্তবতা মেনে নিলে প্রতিরোধের উপায়ও তার কার্যকারণ অনুসারে নির্ধারিত হয়। হাদিসকে অভ্রান্ত ধরে রেখে বিজ্ঞানের কার্যকারণের ভাষা গ্রহণ করা মূল হাদিসের সংক্রমণ অস্বীকারকে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রমাণ করে না। ভুলকে বাঁচাতে অর্থ পাল্টানোই এই পিঠরক্ষার কৌশল।
কুষ্ঠরোগ: ইসলামি বক্তব্য বনাম বৈজ্ঞানিক তথ্য
কুষ্ঠ একটি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রামক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্যাখ্যা অনুযায়ী এর প্রধান কারণ মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি নামের ব্যাকটেরিয়া। রোগটি ত্বক, প্রান্তীয় স্নায়ু, চোখ এবং শ্বাসনালির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সিডিসি মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রোম্যাটোসিসের ভূমিকাও উল্লেখ করেছে। [44]
a chronic infectious disease
বাংলা অনুবাদ: একটি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রামক রোগ।
সংক্রমণ আছে, কিন্তু সহজে ছড়ায় না
চিকিৎসা না পাওয়া রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে কুষ্ঠের জীবাণু ছড়ায় বলে মনে করা হয়। নাক-মুখ থেকে নির্গত জীবাণুবাহী কণা দীর্ঘ সময় ধরে অন্যের শরীরে প্রবেশ করা এর প্রধান ব্যাখ্যা। সিডিসি বহু মাস ধরে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের কথা বলেছে। সাধারণ করমর্দন, পাশে বসা বা একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মতো দৈনন্দিন যোগাযোগে রোগটি ছড়ায় না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। এই তথ্য দুটি সিদ্ধান্তকে একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে। কুষ্ঠকে সম্পূর্ণ অসংক্রামক বলা ভুল। আবার কুষ্ঠরোগীকে দেখামাত্র বিপজ্জনক প্রাণীর মতো ভয় করা রোগের প্রকৃত ঝুঁকির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সতর্কতা নির্ধারণ করতে হয় সংস্পর্শের ধরন ও চিকিৎসার অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে। [45]
The disease does not spread through casual contact
বাংলা অনুবাদ: সাধারণ দৈনন্দিন সংস্পর্শে রোগটি ছড়ায় না।
চিকিৎসা ও রোগীর স্বাভাবিক জীবন
কুষ্ঠ চিকিৎসাযোগ্য। একাধিক ওষুধের সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, চিকিৎসা শুরু হলে রোগীর মাধ্যমে রোগ ছড়ানো বন্ধ হয়। আগে শনাক্ত করে চিকিৎসা দিলে অক্ষমতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা মানুষের পরীক্ষা এবং প্রয়োজনমতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও রোগনিয়ন্ত্রণের অংশ। [46]
The patient stops transmitting the disease upon initiation of treatment.
বাংলা অনুবাদ: চিকিৎসা শুরু হলে রোগীর মাধ্যমে রোগ ছড়ানো বন্ধ হয়।
রোগীকে সিংহের সঙ্গে তুলনা করার সামাজিক অর্থ
সিংহ থেকে পালানোর উপমা রোগীকে তাৎক্ষণিক ও ভয়ংকর বিপদের প্রতীকে পরিণত করতে পারে। অথচ এই রোগে আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসা ও সহায়তার প্রয়োজনীয় একজন ব্যক্তি। তাঁকে নিয়ে আতঙ্ক ছড়ালে রোগ শনাক্ত করতে দেরি হওয়া, অসুস্থতা গোপন রাখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সিডিসি উভয়েই কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষের বিরুদ্ধে অপবাদ, কুসংস্কার ও বৈষম্যের সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে। রোগনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাই রোগীর মর্যাদা রক্ষাও যুক্ত। চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং সামাজিক সহায়তা একই দায়িত্বের অংশ। সংক্রমণ অস্বীকার এবং রোগীকে ভয়ংকর প্রাণীর মতো এড়িয়ে চলা দুটিই রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে। প্রথমটি বাস্তব ঝুঁকি মুছে দেয়। দ্বিতীয়টি ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা ও চিকিৎসার ফল আড়াল করে রোগীকে সামাজিক শাস্তির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
‘সংক্রমণ নেই’ এবং ‘রোগী থেকে পালাও’: বিরোধটি কোথায়
রোগীকে এড়িয়ে চলার কারণ হিসেবে সংক্রমণরোধকে গ্রহণ করলেই “সংক্রমণ নেই” কথাটির সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। সংস্পর্শে রোগ ছড়াতে পারে বলেই দূরত্ব প্রয়োজন—এই যুক্তি সংক্রমণের বাস্তবতা স্বীকার করে। একই অর্থে সব ধরনের সংক্রমণ অস্বীকার এবং সংক্রমণ ঠেকাতে রোগীকে এড়িয়ে চলার নির্দেশ সত্য হতে পারে না। একটি সংক্রমণকে অস্তিত্বহীন বলে, অন্যটি তা প্রতিরোধের প্রয়োজন স্বীকার করে। দূরে থাকার কারণ হিসেবে যদি দুর্গন্ধ, চেহারাজনিত অস্বস্তি বা সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানোর আশঙ্কা গ্রহণ করা হয়, তাহলে নির্দেশটি রোগের বিস্তার প্রতিরোধের বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। সেই ব্যাখ্যায় উদ্দেশ্য দাঁড়ায় রোগীর গন্ধ, চেহারা বা অভিজ্ঞতা থেকে জন্মানো বিশ্বাস এড়ানো; রোগের সংক্রমণ ঠেকানো নয়। [47]
لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ، وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الأَسَدِ
বাংলা অনুবাদ: সংক্রমণ নেই, অশুভ লক্ষণ নেই, হামাহ নেই, সফর নেই। আর কুষ্ঠরোগীর কাছ থেকে সিংহের কাছ থেকে পালানোর মতো পালাও।
| গ্রহণ করা ব্যাখ্যা | তার ফল |
|---|---|
| সংক্রমণ একেবারেই নেই | সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য রোগীকে এড়ানোর ভিত্তি থাকে না |
| রোগীর কাছ থেকে রোগ ছড়াতে পারে বলে দূরে থাকতে হবে | সংক্রমণের বাস্তবতা স্বীকার করা হয় |
| দূরে থাকার কারণ দুর্গন্ধ বা চেহারার অস্বস্তি | রোগ প্রতিরোধের বদলে রোগীর প্রতি বিরূপতার প্রশ্ন সামনে আসে |
| দূরে থাকার কারণ সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানো ঠেকানো | অভিজ্ঞতা থেকে সংক্রমণের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পথ নিয়ন্ত্রণ করা হয় |
| সংক্রমণ আছে, তবে আল্লাহর অনুমতিতে | সাধারণ অস্বীকৃতিকে শর্তযুক্ত ধর্মতাত্ত্বিক দাবিতে পরিবর্তন করা হয় |
এখানে অর্থ অপরিবর্তিত রাখার প্রশ্নটি কেন্দ্রীয়। প্রথমে সংক্রমণ অস্বীকার করে পরে সংক্রমণকে দৈব অনুমতির শর্তে স্বীকার করলে একটি নতুন অবস্থান নেওয়া হয়। সেই অবস্থান ধর্মতাত্ত্বিকভাবে গ্রহণ করা হলেও আগের সাধারণ অস্বীকৃতি বৈজ্ঞানিক সত্য প্রমাণিত হয় না। পরীক্ষাযোগ্য প্রশ্ন হলো, নির্দিষ্ট ধরনের সংস্পর্শে রোগের ঝুঁকি বাড়ে কি না এবং সেই সংস্পর্শের পথ বদলালে ঝুঁকি কমে কি না। গবেষণা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। “আল্লাহ চাইলে হবে” বাক্যটি উভয় ফলের সঙ্গেই মিলিয়ে নেওয়া যায়। তাই সেটি পরীক্ষাযোগ্য কার্যকারণের বিকল্প হয় না। একই অর্থে সংক্রমণকে অস্বীকার করা এবং সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য রোগীকে এড়িয়ে চলার যৌক্তিকতা দাবি করা স্ববিরোধী। অর্থ বদলে ধর্মতাত্ত্বিক সমন্বয় তৈরি করা মূল অস্বীকৃতির সত্যতার প্রমাণ নয়। দুর্গন্ধ, চেহারা বা ঈমান রক্ষার ব্যাখ্যাও সংক্রমণ সম্পর্কে আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করে না।
জনস্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও মানবাধিকার
সংক্রমণ অস্বীকারকারী প্রচারের প্রভাব বক্তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকে না। রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলালে অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকিও বদলাতে পারে। একটি পরিবারের সিদ্ধান্ত শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ সদস্য এবং প্রতিবেশীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে রোগসংক্রান্ত বক্তব্যের সামাজিক দায় রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকে মানবাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, বৈষম্যহীন আচরণ এবং স্বাস্থ্যরক্ষার উপযোগী সামাজিক ব্যবস্থার দাবি এই অধিকারের অংশ। মানুষকে ভুল তথ্যের কারণে প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া এই দায়িত্বের বিরুদ্ধে যায়। [48]
Every human being has the right to the highest attainable standard of physical and mental health.
বাংলা অনুবাদ: প্রত্যেক মানুষের অর্জনযোগ্য সর্বোচ্চ মানের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকার রয়েছে।
ভুল তথ্য মানুষের সিদ্ধান্ত বদলায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় অতিরিক্ত ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তারকে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমন তথ্য বিভ্রান্তি, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। এর ফলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা পড়ে। [49]
It causes confusion and risk-taking behaviours that can harm health.
বাংলা অনুবাদ: এটি বিভ্রান্তি এবং এমন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ সৃষ্টি করে, যা স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
এই প্রভাব পরীক্ষামূলক গবেষণাতেও দেখা গেছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের কোভিডের টিকা সম্পর্কে সঠিক তথ্য অথবা ভুল তথ্য দেখানো হয়। আগে নিশ্চিতভাবে টিকা নিতে ইচ্ছুক ছিলেন এমন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে, সঠিক তথ্যপ্রাপ্ত দলের তুলনায় ভুল তথ্যপ্রাপ্ত দলে টিকা নেওয়ার ইচ্ছা যুক্তরাজ্যে ৬.২ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে। [50]
recent misinformation induced a decline in intent of 6.2 percentage points
বাংলা অনুবাদ: সাম্প্রতিক ভুল তথ্য টিকা নেওয়ার ইচ্ছা ৬.২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়েছে।
এই ফল ভুল তথ্যের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বদলানোর একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ। ধর্মীয় বক্তৃতায় রোগ প্রতিরোধকে অপ্রয়োজনীয় বলা হলে একই ধরনের সিদ্ধান্তগত ঝুঁকি তৈরি হয়। একজন শ্রোতা সতর্কতা অবহেলা করতে পারেন, চিকিৎসার প্রয়োজন কম মনে করতে পারেন অথবা টিকার প্রতি আস্থা হারাতে পারেন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের জোরে স্বাস্থ্যবিষয়ক ভুল তথ্য ছড়ালে তার বিপদ কেবল বক্তার বিশ্বাসের মধ্যে আটকে থাকে না।
ধর্মীয় স্থান সংক্রমণের পথ বন্ধ করে না
জনসমাবেশে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি নির্ভর করে উপস্থিত মানুষের মধ্যে জীবাণুর উৎস, স্থানটির বাতাস, ভিড় এবং সংস্পর্শের মতো বিষয়ের ওপর। সমাবেশের ধর্মীয় পরিচয় এসব ভৌত শর্ত পরিবর্তন করে না। একই শর্তে সংঘটিত ধর্মীয় ও অন্য সমাবেশের ঝুঁকি বিচারেও একই প্রমাণভিত্তিক মানদণ্ড প্রযোজ্য। কোনো স্থানকে ধর্মীয় মর্যাদার কারণে রোগ থেকে সুরক্ষিত ঘোষণা করলে মানুষ প্রয়োজনীয় সতর্কতা বাদ দিতে পারেন। এমন নিশ্চয়তার পক্ষে রোগ ও পরিবেশসংক্রান্ত প্রমাণ প্রয়োজন। বক্তার ধর্মীয় পদমর্যাদা সেই প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
রোগ প্রতিরোধ এবং রোগীর মর্যাদা
রোগের সংক্রমণ স্বীকারের অর্থ রোগীকে অপমান করা নয়। সঠিক জ্ঞানই নির্ধারণ করে কোন যোগাযোগে ঝুঁকি আছে এবং কোন যোগাযোগ নিরাপদ। অজ্ঞতা একই সঙ্গে অযথা আতঙ্ক ও বিপজ্জনক উদাসীনতা তৈরি করতে পারে। কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ নিয়ে অযৌক্তিক ভয় এবং বাস্তব সংক্রমণপথ সম্পর্কে অস্বীকৃতি এই দুই বিপদের উদাহরণ। জনস্বাস্থ্যের নৈতিক দায়িত্ব হলো রোগীর চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং বৈষম্যহীন আচরণ নিশ্চিত করা। কোনো রোগকে ঈমানের দুর্বলতা বা ব্যক্তিগত অমঙ্গলের সঙ্গে জুড়ে দিলে রোগীকে চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক অপমানের বোঝাও বহন করতে হয়। কোনো মতবাদ মানুষের জীবনরক্ষার পথে বাধা হলে তার সমালোচনা করা নৈতিক দায়িত্ব। ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় নেতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা সেই সমালোচনা থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে প্রমাণ, ব্যবহারিক ফল এবং মানুষের মর্যাদার ভিত্তিতে।
উপসংহার
সংক্রমণসংক্রান্ত হাদিসে স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে সংক্রমণ অস্বীকারের বক্তব্য রয়েছে; অন্যদিকে অসুস্থ পশুকে আলাদা রাখা, কুষ্ঠরোগী থেকে পালানো এবং প্লেগ আক্রান্ত এলাকার চলাচল নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ রয়েছে। এর সঙ্গে আবু হুরায়রার আগের বর্ণনা অস্বীকারের ঘটনাও যুক্ত হয়েছে। এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা দিতে প্রাচীনকাল থেকেই নানা সমাধান তৈরি হয়েছে। ইবন কুতাইবার দুর্গন্ধ ও ক্ষতের ব্যাখ্যা, নববীর সমন্বয়, রহিত হওয়ার মত এবং সংক্রমণে বিশ্বাস জন্মানো ঠেকানোর ব্যাখ্যা একই অবস্থান নয়। এগুলো দেখায়, মূল বক্তব্যের অর্থ ও ব্যবহারিক পরিণতি নিয়ে ঐতিহ্যের মধ্যেই মতভেদ ছিল। পরবর্তী একটি ব্যাখ্যাকে বেছে নিয়ে শুরু থেকেই সেটিই একমাত্র সুস্পষ্ট অর্থ ছিল বলে দাবি করলে এই ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়।
আধুনিক বিজ্ঞানের সামনে রোগের সংক্রমণ একটি পরীক্ষাযোগ্য বাস্তবতা। জীবাণু শনাক্ত করা যায়, বিস্তারের পথ অনুসন্ধান করা যায় এবং প্রতিরোধের ফল পরিমাপ করা যায়। প্রথম রোগীর উৎস সম্পর্কে সব তথ্য জানা না থাকলেও পরবর্তী সংক্রমণ প্রমাণ করা সম্ভব। সবাই সমানভাবে আক্রান্ত না হলেও সংক্রমণের ঝুঁকি বাস্তব থাকে। “সংক্রমণ নেই” থেকে “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া সংক্রমণ নেই” অবস্থানে গেলে দাবির অর্থ বদলে যায়। সংক্রমণের ঘটনাটি তখন গ্রহণ করা হয় এবং তার সঙ্গে একটি ধর্মতাত্ত্বিক শর্ত যুক্ত করা হয়। এই পুনর্ব্যাখ্যা মূল সাধারণ অস্বীকৃতিকে বৈজ্ঞানিক সত্যে পরিণত করে না। দৈব অনুমতির দাবি রোগের উৎস, সংক্রমণপথ কিংবা প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানও দেয় না।
কুষ্ঠরোগের মতো চিকিৎসাযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে সংক্রমণ অস্বীকার এবং রোগীকে দেখামাত্র পালানোর ভাষা দুটোই সমস্যাযুক্ত। প্রয়োজন প্রকৃত ঝুঁকি বোঝা, চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং রোগীর মর্যাদা রক্ষা করা। অসুস্থ মানুষকে ভয় ও ঘৃণার প্রতীকে পরিণত করে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা যায় না। মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও প্রমাণিত জ্ঞানের চেয়ে কোনো ধর্মীয় বক্তব্যের মর্যাদা বেশি হতে পারে না। রোগ সম্পর্কে ভুল বক্তব্যকে ধর্মের নামে অভ্রান্ত ঘোষণা করা হলে তার সমালোচনা আরও জরুরি হয়ে ওঠে। সংক্রমণ প্রতিরোধের ভিত্তি বাস্তব প্রমাণ। মানুষের জীবনরক্ষার দায়িত্ব হাদিসের পিঠরক্ষার অধীন হতে পারে না।
তথ্যসূত্রঃ
- মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল আল-বুখারি, সহিহ আল-বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশনের বাংলা সংস্করণ, চিকিৎসা অধ্যায়, পরিচ্ছেদ ৭৬/২৫, হাদিস ৫৭১৭। আরবি মূলের পরিচিতি: গ্রন্থ ৭৬, হাদিস ৩৪। বর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা। বাংলা সংস্করণের পূর্ণ উদ্ধৃতির সঙ্গে তুলনীয় আরবি পাঠ: সহিহ বুখারি ৫৭১৭। ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক অধ্যায়, শুভ ও অশুভ লক্ষণ পরিচ্ছেদ, হাদিস ৪৫৭৭; মিশকাতের আরবি পাঠ, গ্রন্থ ২৩, হাদিস ৬১। মূল বুখারি বর্ণনা: চিকিৎসা অধ্যায়, কুষ্ঠরোগ পরিচ্ছেদ, সহিহ বুখারি ৫৭০৭, গ্রন্থ ৭৬, হাদিস ২৭। ↩︎
- মিশকাতুল মাসাবীহ, চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক অধ্যায়, শুভ ও অশুভ লক্ষণ পরিচ্ছেদ, হাদিস ৪৫৮০, গ্রন্থ ২৩, হাদিস ৬৪। জাবিরের সূত্রে সংক্রমণ, গুল ও সফর অস্বীকারের বর্ণনা: সহিহ মুসলিম ২২২২খ, সালাম অধ্যায়, গ্রন্থ ৩৯, হাদিস ১৪৮। ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, তাহকিককৃত বাংলা সংস্করণ, চিকিৎসা অধ্যায়, অশুভ লক্ষণ পরিচ্ছেদ, হাদিস ৩৯১২। আরবি মূলের পরিচিতি: গ্রন্থ ৩০, হাদিস ৯; বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা; আলবানির মূল্যায়ন সহিহ। আরবি পাঠ: সুনান আবু দাউদ ৩৯১২। ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, চিকিৎসা অধ্যায়, পশু-পাখি তাড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয় পরিচ্ছেদ, হাদিস ৫৭৫৩। আরবি মূলের পরিচিতি: গ্রন্থ ৭৬, হাদিস ৬৮; বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবন উমর। সহিহ বুখারি ৫৭৫৩। ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, তাহকিককৃত বাংলা সংস্করণ, চিকিৎসা অধ্যায়, অশুভ লক্ষণ পরিচ্ছেদ, হাদিস ৩৯২১। আরবি মূলের পরিচিতি: গ্রন্থ ৩০, হাদিস ১৮; বর্ণনাকারী সা‘দ ইবনু মালিক; আলবানির মূল্যায়ন সহিহ। সুনান আবু দাউদ ৩৯২১। ↩︎
- সুনান আবূ দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলা সংস্করণ, ভাগ্য গণনা ও ফাল নেওয়া অধ্যায়, পাখীর দ্বারা শুভাশুভের ফাল নির্ধারণ সম্পর্কে পরিচ্ছেদ, হাদিস ৩৮৭২। একই সনদ ও আরবি বর্ণনার প্রচলিত নম্বর ৩৯১২। বাংলা ও আরবি পাশাপাশি: হাদিসবিডির ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণ; মূল আরবি তুলনা: সুনান আবু দাউদ ৩৯১২। ↩︎
- মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল আল-বুখারি, সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুত তিব্ব বা চিকিৎসা অধ্যায়; পরিচ্ছেদ ২৫, সফরসংক্রান্ত আলোচনা; হাদিস ৫৭১৭। বর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা। সংকলনের অভ্যন্তরীণ পরিচিতি: গ্রন্থ ৭৬, হাদিস ৩৪; পুরোনো ইংরেজি পরিচিতি: খণ্ড ৭, গ্রন্থ ৭১, হাদিস ৬১৫। সম্পূর্ণ আরবি বর্ণনা ও প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদ: সহিহ বুখারি ৫৭১৭। ↩︎
- সহিহ আল-বুখারি, চিকিৎসা অধ্যায়, হাদিস ৫৭১৭; আবু হুরায়রা বর্ণিত সংক্রমণ অস্বীকার এবং বেদুইনের উটসংক্রান্ত প্রশ্নের বিবরণ। উদ্ধৃত ইংরেজি অংশটি একই পাতায় প্রকাশিত অনুবাদের ব্যাখ্যামূলক বন্ধনী থেকে নেওয়া। আরবি মূল ও ইংরেজি অনুবাদ পাশাপাশি পাওয়া যায়: সহিহ বুখারি ৫৭১৭, মূল পাঠ ও অনুবাদ। ↩︎
- আবদুল আজিজ ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায, “লা আদওয়া ওয়া লা তিয়ারাহ” হাদিসের অর্থসংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর, ফতোয়া ১৬১৪০। আলোচনায় সংস্পর্শের মাধ্যমে অসুস্থ থেকে সুস্থের মধ্যে রোগ স্থানান্তর, আল্লাহর অনুমতি ও তাকদির এবং রোগ প্রতিরোধের উপায় গ্রহণের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মূল আরবি বক্তব্য: বিন বাযের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ব্যাখ্যা। ↩︎
- মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল আল-বুখারি, সহিহ আল-বুখারি, চিকিৎসা অধ্যায়; পরিচ্ছেদ ৫৩, হামাহ অস্বীকারসংক্রান্ত আলোচনা; হাদিস ৫৭৭১। বর্ণনায় আবু সালামা আবু হুরায়রার বক্তব্য ও পরবর্তী অস্বীকারের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সংকলনের অভ্যন্তরীণ পরিচিতি: গ্রন্থ ৭৬, হাদিস ৮৫; পুরোনো ইংরেজি পরিচিতি: খণ্ড ৭, গ্রন্থ ৭১, হাদিস ৬৬৫। আরবি মূল: সহিহ বুখারি ৫৭৭১। ↩︎
- মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ, সহিহ মুসলিম, সালাম অধ্যায়; পরিচ্ছেদ ৩৩, সংক্রমণ, অশুভ লক্ষণ, হামাহ ও সফর অস্বীকার এবং অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না নেওয়াসংক্রান্ত আলোচনা; হাদিস ২২২১ক। বর্ণনার সূত্র: ইউনুস, ইবন শিহাব ও আবু সালামা ইবন আবদুর রহমান ইবন আওফ। সংকলনের অভ্যন্তরীণ পরিচিতি: গ্রন্থ ৩৯, হাদিস ১৪৩; পুরোনো ইংরেজি পরিচিতি: গ্রন্থ ২৬, হাদিস ৫৫১০। সম্পূর্ণ আরবি বর্ণনা: সহিহ মুসলিম ২২২১ক। ↩︎
- আবু দাউদ সুলায়মান ইবন আল-আশআস, সুনান আবু দাউদ, গণনা ও অশুভ লক্ষণসংক্রান্ত অধ্যায়; অশুভ লক্ষণ পরিচ্ছেদ; হাদিস ৩৯১১। বর্ণনায় বেদুইনের রোগাক্রান্ত উটসংক্রান্ত প্রশ্ন, অসুস্থ ও সুস্থ পশুকে না মেশানোর নির্দেশ এবং আবু হুরায়রার আগের বর্ণনা অস্বীকারের ঘটনা রয়েছে। আলবানির মূল্যায়ন: সহিহ। সংকলনের অভ্যন্তরীণ পরিচিতি: গ্রন্থ ৩০, হাদিস ৮। মূল আরবি বর্ণনা: সুনান আবু দাউদ ৩৯১১। ↩︎
- মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ, সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাম বা সালাম অধ্যায়; পরিচ্ছেদ ৩৬, কুষ্ঠরোগী ও অনুরূপ রোগীকে এড়িয়ে চলা; হাদিস ২২৩১। বর্ণনাকারী: আমর ইবনুশ শারিদ, তাঁর পিতা শারিদের সূত্রে। অভ্যন্তরীণ পরিচিতি: গ্রন্থ ৩৯, হাদিস ১৭৪; পুরোনো ইংরেজি পরিচিতি: গ্রন্থ ২৬, হাদিস ৫৫৪১। সম্পূর্ণ আরবি ও বর্ণনার পরিচিতি: সহিহ মুসলিম ২২৩১। ↩︎
- মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল আল-বুখারি, সহিহ আল-বুখারি, চিকিৎসা অধ্যায়; পরিচ্ছেদ ৩০, প্লেগ সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে; হাদিস ৫৭২৮। সনদে ইবরাহিম ইবন সা‘দ উসামা ইবন যায়দকে সা‘দের কাছে বর্ণনা করতে শোনার কথা বলেছেন। অভ্যন্তরীণ পরিচিতি: গ্রন্থ ৭৬, হাদিস ৪৩; পুরোনো ইংরেজি পরিচিতি: খণ্ড ৭, গ্রন্থ ৭১, হাদিস ৬২৪। আরবি মূল: সহিহ বুখারি ৫৭২৮। ↩︎
- সহিহ আল-বুখারি, চিকিৎসা অধ্যায়, প্লেগসংক্রান্ত পরিচ্ছেদ, হাদিস ৫৭২৯। বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস। উমরের পরামর্শ গ্রহণ, সাহাবিদের মতভেদ, আবু উবাইদার প্রশ্ন এবং আবদুর রহমান ইবন আওফের হাদিস বর্ণনার সম্পূর্ণ বিবরণ: সহিহ বুখারি ৫৭২৯। ↩︎
- আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম ইবন কুতাইবা, তাওয়িল মুখতালিফুল হাদিস, “আল-আদওয়া ওয়াত তিয়ারাহ” আলোচনা, খণ্ড ১, অনলাইন সংস্করণে পৃষ্ঠা ১৬৯। প্লেগ এলাকায় প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়ার নিষেধের ব্যাখ্যা: গ্রন্থের মূল আরবি আলোচনা। ↩︎
- আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম ইবন কুতাইবা, তাওয়িল মুখতালিফুল হাদিস, যেসব হাদিসের বিরুদ্ধে পরস্পরবিরোধিতার অভিযোগ তোলা হয়েছে সেই আলোচনা; “আল-আদওয়া ওয়াত তিয়ারাহ”, খণ্ড ১, অনলাইন সংস্করণে পৃষ্ঠা ১৬৭–১৬৮। প্রথম উদ্ধৃতিতে আপত্তিকারীদের বক্তব্য, দ্বিতীয়টিতে গ্রন্থকারের উত্তর রয়েছে। মূল আরবি পাঠ: সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণসংক্রান্ত পরিচ্ছেদ। ↩︎
- ইবন কুতাইবা, তাওয়িল মুখতালিফুল হাদিস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৮; মূল আরবি পাঠ। ↩︎
- ইবন কুতাইবা, তাওয়িল মুখতালিফুল হাদিস, “আল-আদওয়া ওয়াত তিয়ারাহ”, খণ্ড ১, অনলাইন সংস্করণে পৃষ্ঠা ১৬৮–১৬৯। কুষ্ঠ, দীর্ঘ সান্নিধ্য, দুর্গন্ধ এবং উটের ভেজা চর্মক্ষত থেকে নিঃসৃত পদার্থের প্রভাবসংক্রান্ত অনুচ্ছেদ। এখানে গ্রন্থকারের তৎকালীন চিকিৎসাধারণার বাংলা অনুবাদ দেওয়া হয়েছে। মূল আরবি: ইবন কুতাইবার বিস্তারিত ব্যাখ্যা। ↩︎
- ইয়াহইয়া ইবন শরফ আন-নববী, আল-মিনহাজ শরহ সহিহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ, সালাম অধ্যায়, সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণসংক্রান্ত পরিচ্ছেদ; সহিহ মুসলিম ২২২০–২২২১-এর ব্যাখ্যা। ইসলামওয়েবের প্রদর্শিত সংস্করণে সংশ্লিষ্ট আলোচনা পৃষ্ঠা ৩৭৮–৩৭৯। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমন্বয় এবং নববীর নির্বাচিত অবস্থান: শরহ সহিহ মুসলিমের মূল আরবি আলোচনা। ↩︎
- নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, সালাম অধ্যায়, সংক্রমণসংক্রান্ত পরিচ্ছেদ, সহিহ মুসলিম ২২২০–২২২১-এর ব্যাখ্যা। উদ্ধৃত অনুচ্ছেদে নববী অন্যদের আক্ষরিক অস্বীকৃতির মতটি বর্ণনা করে নিজের পূর্বোক্ত সমন্বয়কে সঠিক বলেছেন। রহিত হওয়ার মত প্রত্যাখ্যানের যুক্তিও একই আলোচনায় রয়েছে। সম্পূর্ণ মূল পাঠ। ↩︎
- আহমদ ইবন আলি ইবন হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি শরহ সহিহ আল-বুখারি, চিকিৎসা অধ্যায়, কুষ্ঠরোগসংক্রান্ত হাদিস ৫৭০৭-এর ব্যাখ্যা; খণ্ড ১০, সংশ্লিষ্ট আলোচনা পৃষ্ঠা ১৬৮–১৭২। উদ্ধৃত অংশে ইবন হাজার বাইহাকির ব্যাখ্যা এবং ইবনুস সালাহসহ অন্যদের অনুসরণের কথা উল্লেখ করেছেন। ইসলামওয়েবের পাতাটিতে পরের পরিচ্ছেদের শিরোনামের আগে এই আলোচনা সংরক্ষিত: ফাতহুল বারির মূল পাঠ। ↩︎
- বদরুদ্দিন মাহমুদ ইবন আহমদ আল-আইনী, উমদাতুল কারি শরহ সহিহ আল-বুখারি, চিকিৎসা অধ্যায়, “লা হামাহ” পরিচ্ছেদ; সহিহ বুখারি ৫৭৭১-এর ব্যাখ্যা। অনলাইন সংস্করণে খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ২৮৮। উদ্ধৃত অনুচ্ছেদে ইবন বত্তাল, নববী এবং আরেকটি ব্যাখ্যার কথা পৃথকভাবে বর্ণিত হয়েছে। উমদাতুল কারির আরবি পাঠ। ↩︎
- ইবন হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি, চিকিৎসা অধ্যায়, কুষ্ঠরোগসংক্রান্ত বর্ণনার ব্যাখ্যা, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৭০–১৭১-এর আলোচনা। উদ্ধৃতিটি সমন্বয়ের ষষ্ঠ পদ্ধতি এবং সেখানে বর্ণিত আবু উবাইদের মত। ফাতহুল বারির মূল আরবি পাঠ। ↩︎
- ইবন হাজার, ফাতহুল বারি, চিকিৎসা অধ্যায়, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৭১। এখানে ইবন খুজাইমার কিতাবুত তাওয়াক্কুল থেকে তাঁর অবস্থান বর্ণিত হয়েছে। উদ্ধৃতিটির উৎস ইবন হাজারের সংরক্ষিত বিবরণ। মূল আরবি আলোচনা। ↩︎
- কৃষকদের সাথে পাকনামি করতে গিয়ে নবীর ধরা খাওয়া ↩︎
- মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ, সহিহ মুসলিম, ফজিলত অধ্যায়; হাদিস ২৩৬২; হাদিস ২৩৬৩। নিচের উদ্ধৃতি ২৩৬৩ নম্বর বর্ণনার মূল বক্তব্য। ↩︎
- মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ, সহিহ মুসলিম, ফজিলত অধ্যায়, তালহার সূত্রে বর্ণিত খেজুরের পরাগায়নের ঘটনা; হাদিস ২৩৬১। ↩︎
- সিডিসি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মৌলিক তথ্য; সংক্রমণের উৎস, প্রবেশ, বংশবৃদ্ধি ও দেহের প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা। ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক নির্দেশনাসমূহ; সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ। সিডিসি, স্বাস্থ্যসেবায় সংক্রমণপথ অনুযায়ী অতিরিক্ত সতর্কতা; সংস্পর্শ, শ্বাসকণা ও বায়ুবাহিত সংক্রমণের সতর্কতা। ↩︎
- যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন, Global Infectious Disease Surveillance and Detection: Assessing the Challenges, Finding Solutions, “Detection and Diagnostics” অধ্যায়। কখের শর্ত, ভাইরাসের জন্য রিভার্সের সংশোধন এবং আণবিক কার্যকারণ নির্ণয়ের আলোচনা: এনসিবিআইয়ের সংস্করণ; প্রকাশকের মূল অধ্যায়। ↩︎
- জেনিফার কে কেটজিস, “Overview of Mange in Animals”, MSD Veterinary Manual; পর্যালোচনা মার্চ ২০২৩, হালনাগাদ সেপ্টেম্বর ২০২৪। পরজীবী মাইট, সরাসরি সংস্পর্শ, দূষিত বস্তুর মাধ্যমে বিস্তার এবং আক্রান্ত ও সংস্পর্শে আসা পশুর ব্যবস্থাপনা: পশুচিকিৎসার মূল আলোচনা। ↩︎
- “Epidemiological investigations in Sarcoptic mange in camels with special reference in treatment”, Journal of Parasitic Diseases, ২০২১; গবেষণার সময় আগস্ট ২০১৯ থেকে আগস্ট ২০২০, সৌদি আরব। পরজীবী শনাক্তকরণ ও উটের চর্মরোগসংক্রান্ত অনুসন্ধান; DOI: 10.1007/s12639-020-01346-x; গবেষণার সারসংক্ষেপ ও গ্রন্থপরিচিতি। ↩︎
- হেবেল ও সহকর্মীরা, “One Health alert: zoonotic scabies from dromedary camels-A case report and call for vigilance”, Frontiers in Veterinary Science, ২০২৫, খণ্ড ১২, নিবন্ধ 1500916; DOI: 10.3389/fvets.2025.1500916। একটি উট থেকে অন্য উট ও মানুষের মধ্যে রোগ ছড়ানোর ঘটনাভিত্তিক বিবরণ: মূল গবেষণার পরিচিতি ও সারসংক্ষেপ। ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ; সিডিসি, সংক্রমণের মৌলিক ব্যাখ্যা; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের পরিচিতি; সিডিসির সংক্রমণের মৌলিক ব্যাখ্যা। ↩︎
- সিডিসি, সংক্রমণপথ অনুযায়ী সতর্কতা; সংক্রমণপথভিত্তিক অতিরিক্ত সতর্কতা, সংস্পর্শ, শ্বাসকণা এবং বায়ুবাহিত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা: মূল নির্দেশনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রোগপ্রতিরোধক্ষমতা ও টিকার ভূমিকা: টিকা কীভাবে কাজ করে। ↩︎
- আবদুল আজিজ ইবন বায, “معنى حديث لا عدوى ولا طيرة”, ফতোয়া ১৬১৪০। উদ্ধৃত বাক্যাংশের পরবর্তী ব্যাখ্যায় তিনি মেলামেশাকে রোগ স্থানান্তরের কারণ এবং ঘটনাটিকে আল্লাহর অনুমতিতে সংঘটিত বলে বর্ণনা করেছেন। বিন বাযের সরকারি ওয়েবসাইটে সম্পূর্ণ বক্তব্য। একই বিষয়ে তাঁর “الجمع بين لا عدوى ولا طيرة و فر من المجذوم”, ফতোয়া ১৫৫৩, মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৭: দুটি হাদিসের সমন্বয়সংক্রান্ত ফতোয়া। ↩︎
- ইবন বায, সংক্রমণ ও অশুভ লক্ষণসংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যা, ফতোয়া ১৮৪০৮; মূল আরবি বক্তব্য। ↩︎
- ইবন হাজার, ফাতহুল বারি, চিকিৎসা অধ্যায়, কুষ্ঠরোগসংক্রান্ত ব্যাখ্যায় সমন্বয়ের দ্বিতীয় পদ্ধতি; মূল আরবি আলোচনা। ↩︎
- আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আল-গুনাইমান, شرح فتح المجيد للغنيمان, المكتبة الشاملة; একই বক্তৃতামালার ইসলামওয়েবের লিখিত প্রতিলিপি, “শরহ ফতহুল মাজিদ শরহ কিতাবিত তাওহিদ”, পাঠ ৭৯। জীবাণুবিষয়ক জ্ঞান ও হাদিসের উদ্দেশ্যসংক্রান্ত আলোচনা: প্রথম প্রতিলিপি; ‘লা আদওয়া’কে নিষেধার্থে ব্যাখ্যার আলোচনা: দ্বিতীয় প্রতিলিপি। ↩︎
- নববী, শরহ সহিহ মুসলিম, সালাম অধ্যায়, ‘লা সফর’ ও ‘লা হামাহ’ বাক্যাংশের ব্যাখ্যা; মূল আরবি আলোচনা। ↩︎
- মুহাম্মদ ইবন ঈসা আত-তিরমিজি, জামে আত-তিরমিজি, খাদ্য অধ্যায়, কুষ্ঠরোগীর সঙ্গে খাওয়া সম্পর্কে পরিচ্ছেদ ১৯, হাদিস ১৮১৭। জাবির ইবন আবদুল্লাহর সূত্রে বর্ণিত পাঠ, তিরমিজির সনদসংক্রান্ত মন্তব্য এবং দারুসসালামের দুর্বল মূল্যায়ন: মূল আরবি ও পূর্ণ আলোচনা, অভ্যন্তরীণ পরিচিতি গ্রন্থ ২৫, হাদিস ৩১। ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, কুষ্ঠরোগবিষয়ক তথ্যপত্র; সিডিসি, কুষ্ঠরোগের পরিচিতি; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কুষ্ঠরোগবিষয়ক তথ্যপত্র; সিডিসির কুষ্ঠরোগের পরিচিতি। ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, কুষ্ঠরোগের সংক্রমণপথ; মূল তথ্যপত্র; সিডিসির ব্যাখ্যা। ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, কুষ্ঠরোগ; কুষ্ঠের সংক্রমণ, চিকিৎসা, সংস্পর্শে আসা মানুষের পরীক্ষা এবং রোগীর মর্যাদাসংক্রান্ত তথ্য: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল তথ্যপত্র। সিডিসি জানিয়েছে, চিকিৎসাধীন মানুষ পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন, কাজ ও শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেন: কুষ্ঠ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণার আলোচনা। ↩︎
- সংক্রমণ অস্বীকার ও কুষ্ঠরোগী থেকে পালানোর নির্দেশ একই বর্ণনায়: সহিহ বুখারি ৫৭০৭, চিকিৎসা অধ্যায়, কুষ্ঠরোগ পরিচ্ছেদ। অসুস্থ পশুকে সুস্থ পশুর কাছে না নেওয়ার নির্দেশ: সহিহ বুখারি ৫৭৭১। ভিন্ন ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক বিবরণ: নববীর শরহ সহিহ মুসলিম। ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার; স্বাস্থ্যকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব। ↩︎
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইনফোডেমিক বা ভুল তথ্যের ব্যাপক বিস্তার; রোগের প্রাদুর্ভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এবং জনস্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলোচনা। ↩︎
- সাহিল লুম্বা, আলেক্সান্দ্রে দে ফিগেইরেদো, সাইমন জে পিয়াতেক, ক্রিস্টেন দে গ্রাফ ও হাইডি জে লারসন, “Measuring the impact of COVID-19 vaccine misinformation on vaccination intent in the UK and USA”, Nature Human Behaviour, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৩৭–৩৪৮, ২০২১। গবেষণায় সেপ্টেম্বর ২০২০-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে; পরীক্ষার ফল টিকা গ্রহণের ইচ্ছার পরিবর্তন সম্পর্কে। DOI: 10.1038/s41562-021-01056-1। মূল গবেষণাপত্র; গবেষণার সারসংক্ষেপ। ↩︎

