জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে মানুষের মেরুদণ্ডের একটি হাড় অনন্তকাল অক্ষত থাকে

প্রকাশিত: এপ্রিল 27, 2024লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন38 মিনিট পড়া

ভূমিকা: অবিনশ্বরতার মিথ ও যুক্তিবাদী ব্যবচ্ছেদ

মানুষের অস্তিত্বের নশ্বরতা এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত আখ্যান। এর মধ্যে অন্যতম হলো মানবদেহের একটি নির্দিষ্ট হাড়ের অবিনশ্বরতার দাবি। ধর্মীয় আখ্যানে বলা হয়েছে, দেহের বাকি অংশ পচে গেলেও একটি ক্ষুদ্র অস্থিখণ্ড অক্ষত থাকে এবং সেই অংশকে ভিত্তি করে মৃত মানুষ আবার দেহ ফিরে পাবে। মানুষের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পরিবর্তে শরীরের মধ্যে একটি স্থায়ী ‘বীজ’ সংরক্ষিত থাকার এই ধারণা মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু আশ্বাসের আকর্ষণ এবং বক্তব্যের সত্যতা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো হাড় থেকে ভবিষ্যতে পুনরুত্থান ঘটবে—এই বিশ্বাস প্রচার করার আগে সেই হাড়টি সত্যিই পচে না, ক্ষয় হয় না এবং অন্য হাড় থেকে মৌলিকভাবে আলাদা—এই দাবিগুলোর প্রমাণ প্রয়োজন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের নামে একটি অস্থিখণ্ডকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করলেই তার রাসায়নিক ধর্ম বদলে যায় না।

দাবিটির মধ্যে অন্তত দুটি পৃথক বক্তব্য রয়েছে। প্রথমটি মৃতদেহের একটি নির্দিষ্ট অংশের বর্তমান ভৌত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে: মাটি সেটিকে ক্ষয় করতে পারে না। দ্বিতীয়টি ভবিষ্যৎ পুনরুত্থান সম্পর্কে: সেই অংশ থেকে মানুষকে আবার গঠন করা হবে। প্রথম বক্তব্যটি হাড়ের সংরক্ষণ, গঠন ও ক্ষয় সম্পর্কে অনুসন্ধানের বিষয়। একটি অস্থিখণ্ড কোন উপাদানে তৈরি, তার ওপর অম্লীয় পরিবেশ কী প্রভাব ফেলে, অণুজীব তার জৈব অংশ ভাঙতে পারে কি না এবং প্রত্নতাত্ত্বিক দেহাবশেষে তার সংরক্ষণ কেমন—এসব প্রশ্নের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পরকালের উল্লেখ থাকলেই বর্তমান পৃথিবীর হাড় সম্পর্কে করা দাবিটি পরীক্ষার বাইরে চলে যায় না। মৃতদেহের একটি অংশ মাটিতে অবিনষ্ট থাকে—এটি দেহাবশেষের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বক্তব্য, এবং সেই বাস্তবতার ভিত্তিতেই তার বিচার হবে।

হাড় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়িত্ব অবিনশ্বরতার প্রমাণ নয়। সংরক্ষণে অনুকূল পরিবেশে কোনো অস্থিখণ্ডের টিকে থাকা এবং সব অবস্থায় তার ক্ষয়মুক্ত থাকা এক দাবি নয়। প্রাচীন সমাধিতে হাড় পাওয়া গেলে সেটি কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, তার মূল জৈব ও খনিজ উপাদানের কতটুকু অবশিষ্ট আছে এবং আশপাশের পরিবেশ তাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে—এসব প্রশ্ন বাদ দিয়ে শুধু ‘হাড় পাওয়া গেছে’ বললে অমরত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। একইভাবে অন্য হাড়ের মতো দেখতে একটি অংশকে ‘অলৌকিক বীজ’ নাম দেওয়াও তার বিশেষ ক্ষমতার প্রমাণ নয়। অবিনশ্বরতার দাবির পক্ষে প্রয়োজন সেই নির্দিষ্ট অস্থির শনাক্তযোগ্য, পরীক্ষাযোগ্য ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য; ধর্মীয় বর্ণনার পুনরাবৃত্তি তার বিকল্প নয়।

এই বিশ্বাসের সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রমাণের সেই অনুপস্থিতি। মানবদেহের পরিচিত অস্থির ওপর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা আরোপ করে তাকে পুনরুত্থানের যন্ত্রাংশ বানানো হয়েছে। এরপর সেই ধর্মীয় বর্ণনাকেই আবার অস্থিটির বিশেষত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে বিশ্বাস এবং তার সমর্থন একই বৃত্তে ঘোরে: হাড়টি অবিনশ্বর, কারণ ধর্মীয় বর্ণনায় তা বলা হয়েছে; বর্ণনাটি সত্য, কারণ ওই হাড় নাকি অবিনশ্বর। এই বৃত্ত ভাঙার উপায় হলো অস্থিটির বাস্তব বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা। শারীরস্থান, জৈব-রসায়ন, প্রত্নতত্ত্ব ও ভ্রূণতত্ত্বের প্রশ্নগুলোর উত্তর ধর্মীয় মর্যাদা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। হাড়ের গঠন ও ক্ষয়ের প্রমাণই নির্ধারণ করবে ‘অবিনশ্বর অস্থি’ একটি আবিষ্কার, নাকি পরিচিত দেহাংশের ওপর চাপানো প্রাক-বৈজ্ঞানিক কল্পনা।

মেরুদণ্ডে

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পুনরুত্থানের বীজ ও শারীরতাত্ত্বিক ভ্রান্তির বিবর্তন

মানবদেহের একটি বিশেষ অস্থি থেকে পুনরুত্থানের ধারণা সপ্তম শতাব্দীর আরবে প্রথম দেখা দেয়নি। ইসলামের আগের রাব্বিনিক সাহিত্যে মেরুদণ্ডের ‘লুজ’ নামের একটি অংশকে পুনরুত্থানের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আনুমানিক পঞ্চম শতকে সংকলিত ‘বেরেশিত রাব্বা’ বা ‘জেনেসিস রাব্বা’র ২৮:৩ অনুচ্ছেদে এর উল্লেখ রয়েছে। ফলে মানুষের শরীরের মধ্যে পুনর্গঠনের একটি স্থায়ী ভিত্তি লুকিয়ে আছে—এই ধারণার লিখিত নজির ইসলামি হাদিসসংকলনের আগেই পাওয়া যায়। [1] [2]

Bereshit Rabbah is a talmudic-era midrash on the book of Genesis.

বাংলা অনুবাদ: বেরেশিত রাব্বা হলো আদিপুস্তকের ওপর তালমুদীয় যুগে রচিত একটি মিদরাশ।


হাদ্রিয়ান ও রাব্বির সংলাপ: পরীক্ষার গল্প দিয়ে অবিনশ্বরতা প্রতিষ্ঠা

‘বেরেশিত রাব্বা’র বর্ণনায় হাদ্রিয়ান ও রাব্বি ইয়েহোশুয়ার কথোপকথনের মধ্যে ‘লুজ’ থেকে মানুষকে আবার গঠনের দাবি এবং হাড়টি ধ্বংস করার কথিত পরীক্ষাগুলো এসেছে। [3]

אַדְרִיָּאנוֹס שְׁחִיק עֲצָמוֹת שָׁאַל אֶת רַבִּי יְהוֹשֻׁעַ בֶּן חֲנַנְיָא אָמַר לוֹ מֵהֵיכָן הַקָּדוֹשׁ בָּרוּךְ הוּא מֵצִיץ אֶת הָאָדָם לֶעָתִיד לָבוֹא, אָמַר לוֹ מִלּוּז שֶׁל שִׁדְרָה, אָמַר לוֹ מִנַּיִן אַתָּה יוֹדֵעַ, אֲמַר לֵיהּ אַיְתִיתֵיהּ לְיָדִי וַאֲנָא מוֹדַע לָךְ, טָחֲנוֹ בָּרֵחַיִם וְלֹא נִטְחַן, שְׂרָפוֹ בָּאֵשׁ וְלֹא נִשְׂרַף, נְתָנוֹ בְּמַיִם וְלֹא נִמְחֶה, נְתָנוֹ עַל הַסַּדָּן וְהִתְחִיל מַכֶּה עָלָיו בְּפַטִּישׁ, נֶחְלַק הַסַּדָּן וְנִבְקַע הַפַּטִּישׁ וְלֹא חָסַר כְּלוּם.

বাংলা অনুবাদ: হাদ্রিয়ান—তার হাড় চূর্ণ হোক—রাব্বি ইয়েহোশুয়া বেন হানানিয়াকে জিজ্ঞাসা করল: ভবিষ্যতে পবিত্রজন, যিনি আশীর্বাদধন্য, কোথা থেকে মানুষকে অঙ্কুরিত করবেন? তিনি বললেন: মেরুদণ্ডের লুজ থেকে। সে বলল: তুমি কীভাবে জানো? তিনি বললেন: আমার কাছে সেটি আনো, আমি দেখাব। সেটিকে যাঁতায় পেষা হলো, কিন্তু তা গুঁড়া হলো না; আগুনে পোড়ানো হলো, কিন্তু পুড়ল না; পানিতে রাখা হলো, কিন্তু গলে গেল না; নেহাইয়ের ওপর রেখে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হলো—নেহাই ফেটে গেল, হাতুড়ি ভেঙে গেল, অথচ সেটির কিছুই ক্ষয় হলো না।

গল্পটির বর্ণনাকৌশল লক্ষণীয়। একটি ধর্মীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পেষণ, দহন, পানিতে ডোবানো এবং আঘাত করার দৃশ্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্বাসটি এমন চেহারা পায় যেন তার সত্যতা আগেই হাতে-কলমে দেখানো হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার গল্প লেখা এবং পরীক্ষার ফল পাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনা। এখানে যাচাইয়ের জন্য কোনো নমুনা উপস্থিত নেই; নমুনাটির শারীরস্থানগত পরিচয় নির্ধারণের উপায় নেই; পরীক্ষার শর্ত, পরিমাপ ও ফল অন্য কেউ পুনরুৎপাদন করতে পারে কি না, তারও তথ্য নেই। হাতুড়ি ও নেহাই ভেঙে গেল অথচ হাড়ের কিছুই হলো না—এই নাটকীয় বিবরণ দাবি যত বড় করে, স্বাধীন প্রমাণের প্রয়োজনও তত বাড়ায়। ধর্মীয় আখ্যানের মধ্যে সংশয়ী প্রশ্নকারীকে পরাজিত দেখানো বাস্তব পরীক্ষার ঘাটতি পূরণ করে না।

পুনরুত্থানের প্রতিশ্রুতিকে দৃশ্যমান দেহের সঙ্গে যুক্ত করার একটি সুবিধা এখানে স্পষ্ট। মৃত মানুষকে আবার জীবিত করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা না করেও বলা যায়, তার সূচনার জন্য প্রয়োজনীয় অংশটি রয়ে গেছে। সেই অংশকে অবিনশ্বর ঘোষণা করলে শরীরের ক্ষয়ও বিশ্বাসটির বিরুদ্ধে আপত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে না: ক্ষয় যতই ঘটুক, একটি অদৃশ্য বা অনাবিষ্কৃত ভিত্তি বেঁচে আছে বলে দাবি করা যায়। অথচ কোন অংশটি রয়ে গেল এবং তার অক্ষয়তা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে আবার একই আখ্যানের কাছে ফিরে যেতে হয়। ফলে গল্পের মধ্যে প্রমাণের দৃশ্য নির্মিত হলেও গল্পের বাইরে প্রমাণের ব্যবস্থা দাঁড়ায় না।


লুজ হাড়ের অবস্থান: মেরুদণ্ডের নিচ থেকে করোটির পেছন পর্যন্ত

ইহুদি ঐতিহ্যে ‘লুজ’-এর শারীরস্থানগত পরিচয়ও অভিন্ন নয়। নিশান ডেভিড দুবভের পুনরুত্থানসংক্রান্ত আলোচনায় একটি পরিচয় হিসেবে মেরুদণ্ডের নিচের ককসিক্স এবং আরেকটি হিসেবে মাথার পেছনে তেফিলিনের গিঁটের অবস্থানসংলগ্ন হাড়ের কথা এসেছে। একই ‘পুনরুত্থানের অস্থি’ শরীরের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই স্থানে চিহ্নিত হচ্ছে। গ্রন্থটিতে ককসিক্স-পরিচয়টির ভাষা হলো: [4]

some say that it is the coccyx, a small bone at the base of the spine;

বাংলা অনুবাদ: কারও মতে, এটি ককসিক্স—মেরুদণ্ডের গোড়ায় অবস্থিত একটি ছোট হাড়;

ককসিক্স একটি বাস্তব অস্থি; কাল্পনিক বিষয়টি তার ওপর আরোপিত অবিনশ্বরতা এবং পুনরুত্থানের ক্ষমতা। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিচিত হাড়ের নাম ব্যবহার করলে অলৌকিক বৈশিষ্ট্যটিও পরিচিত বিজ্ঞানের অংশ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ‘এই অংশটি আছে’ থেকে ‘এই অংশটি পচে না’ অনুসৃত হয় না। ককসিক্সের অস্তিত্ব দেখিয়ে তার অক্ষয়তা প্রমাণ করা যায় না, যেমন করোটির পেছনের হাড় শনাক্ত করেও তার মধ্যে পুনরুত্থানের বীজ আবিষ্কার করা যায় না। পরিচিত দেহাংশের সঙ্গে অপরীক্ষিত ক্ষমতা জুড়ে দেওয়াই এখানে মূল সমস্যা।

অবস্থানসংক্রান্ত মতভেদটিও দাবিটির প্রকৃতি প্রকাশ করে। যদি বিশেষ অস্থিটির পরিচয় প্রতিষ্ঠিত শারীরস্থানগত অনুসন্ধানের ফল হতো, তাহলে তার অবস্থান ও গঠন নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দিয়ে শনাক্ত করা যেত। এখানে স্থায়ী বিষয়টি হলো ধর্মীয় ভূমিকা—মৃতকে আবার গঠনের ভিত্তি; সেই ভূমিকার জন্য নির্বাচিত অস্থিটির পরিচয় বদলেছে। অর্থাৎ কোনো বিশেষ ভৌত ধর্ম আবিষ্কার করে তার ভিত্তিতে পুনরুত্থানের তত্ত্ব গড়ে ওঠার বদলে, পুনরুত্থানের বিশ্বাসের জন্য একটি দেহগত আশ্রয় নির্ধারণ করা হয়েছে বলে এই বর্ণনাগুলো ইঙ্গিত করে। একই প্রতিশ্রুতির অধীনে ভিন্ন অস্থিকে বসানো যায়, কিন্তু সেই স্থানান্তর কোনো অস্থির অবিনশ্বরতা প্রতিষ্ঠা করে না।


প্রাচীন নজির ও পরবর্তী সংকলন: গ্রন্থগুলোর কালানুক্রম

‘মিদরাশ হা-গাদোল’ এবং ‘যোহার’-এর নাম এই ঐতিহ্যের পরবর্তী বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হলেও গ্রন্থদুটিকে সপ্তম শতাব্দীর আগের সংকলন হিসেবে দাঁড় করানো ভুল। ‘মিদরাশ হা-গাদোল’ মধ্যযুগের ইয়েমেনি সংকলন; গ্রন্থটির সঙ্গে ত্রয়োদশ শতকের ডেভিড আদানির নাম যুক্ত করা হয়। ফলে এই গ্রন্থে পুরোনো উপাদান সংরক্ষিত থাকলেও গ্রন্থটির নিজের সংকলনকালকে ইসলামের আগের যুগে নিয়ে যাওয়া যায় না। [5]

The Midrash ha-Gadol is atributed to a scholar of thirteenth-century Yemen, R. David Adani.

বাংলা অনুবাদ: মিদরাশ হা-গাদোলকে ত্রয়োদশ শতকের ইয়েমেনের পণ্ডিত রাব্বি ডেভিড আদানির রচনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

‘যোহার’-এর ক্ষেত্রেও প্রাচীন কোনো ব্যক্তির নামে প্রচলিত হওয়া এবং গ্রন্থটির ঐতিহাসিক আবির্ভাব এক বিষয় নয়। সেফারিয়ার গ্রন্থপরিচিতিতে এর আবির্ভাব ত্রয়োদশ শতকের স্পেনে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বেরেশিত রাব্বা’র মতো আগের উৎস এবং ‘যোহার’-এর মতো পরবর্তী উৎস একত্রে একটি ধারণার দীর্ঘ প্রচলন দেখায়; তাদের সংকলনকাল গুলিয়ে দিলে সেই ইতিহাসই বিকৃত হয়। [6]

Canonical text of Kabbalah that emerged in 13th-century Spain, traditionally attributed to Rabbi Shimon bar Yochai.

বাংলা অনুবাদ: কাব্বালার স্বীকৃত প্রধান গ্রন্থ, যা ত্রয়োদশ শতকের স্পেনে আবির্ভূত হয় এবং ঐতিহ্যগতভাবে রাব্বি শিমন বার ইয়োহাইয়ের নামে প্রচলিত।

এই কালানুক্রমে মূল ঐতিহাসিক বিষয়টি স্পষ্ট থাকে: বিশেষ অস্থিকে পুনরুত্থানের ভিত্তি ভাবার ধারণার প্রাক্‌-ইসলামি নজির রয়েছে, এবং পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্যেও তার বিস্তার ঘটেছে। এটি কোনো অজানা মানবদেহগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সপ্তম শতকে প্রথম ঘোষিত আবিষ্কার নয়। ইসলামি বর্ণনার সঙ্গে আগের রাব্বিনিক আখ্যানের তুলনা তাই একটি পরিচিত ধর্মীয় ধারণার পুনরাবির্ভাবকে সামনে আনে। ধারণাটির পূর্ববর্তী উপস্থিতি, মেরুদণ্ডের বিশেষ অংশ নির্বাচন এবং সেই অংশকে পুনরুত্থানের ভিত্তি করার ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য—এই তিনটি বিষয় ঐতিহাসিক তুলনাটিকে নির্দিষ্ট ভিত্তি দেয়। মানবদেহে নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য আবিষ্কারের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলার জন্য এই পূর্বনজিরই যথেষ্ট।


পুনরুত্থানের বীজ: রাব্বিনিক লুজ ও ইসলামি আজব আল-ধানাব

ইসলামি বর্ণনায় ‘আজব আল-ধানাব’ বা মেরুদণ্ডের শেষাংশের অস্থি একই ধরনের ভূমিকা পায়: দেহের অন্য অংশ মাটিতে ক্ষয় হবে, কিন্তু এই অংশ থেকে যাবে এবং তা থেকে মানুষকে আবার গঠন করা হবে। সহিহ মুসলিমের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় মানুষের প্রথম সৃষ্টি এবং পুনর্গঠন—উভয়ের সঙ্গেই এই অংশকে যুক্ত করা হয়েছে। [7]

كُلُّ ابْنِ آدَمَ يَأْكُلُهُ التُّرَابُ إِلاَّ عَجْبَ الذَّنَبِ مِنْهُ خُلِقَ وَفِيهِ يُرَكَّبُ

বাংলা অনুবাদ: আদমসন্তানের সমস্ত অংশ মাটি খেয়ে ফেলবে, আজব আল-ধানাব ছাড়া। তা থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তার মধ্যেই তাকে আবার গঠন করা হবে।

তুলনার বিষয়রাব্বিনিক লুজ আখ্যানইসলামি আজব আল-ধানাব বর্ণনা
দেহগত ভিত্তিমেরুদণ্ডের ‘লুজ’; পরবর্তী পরিচয়গুলোতে অবস্থান নিয়ে মতভেদমেরুদণ্ডের শেষাংশের ‘আজব আল-ধানাব’
বিশেষ বৈশিষ্ট্যপেষণ, দহন, পানি ও আঘাতেও অক্ষত থাকার আখ্যানদেহের অন্য অংশ ক্ষয় হলেও মাটি এই অংশটি খাবে না
পরকালতাত্ত্বিক ভূমিকাএটি থেকে মানুষকে আবার অঙ্কুরিত বা পুনর্গঠিত করা হবেএটি থেকে মানুষের পুনর্গঠন ঘটবে
প্রমাণের ধরনরাব্বিনিক বর্ণনা ও ধর্মীয় ব্যাখ্যামুহাম্মদের নামে সংরক্ষিত হাদিস

দুটি ঐতিহ্যেই ক্ষয়প্রাপ্ত মানুষের সঙ্গে পুনরুত্থিত মানুষের দেহগত যোগসূত্র হিসেবে একটি ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ কাজ করছে। বীজ থেকে গাছ জন্মানোর পরিচিত দৃশ্যের মতো, মৃতদেহের অবশিষ্ট অংশ থেকে সম্পূর্ণ মানুষ ফিরে আসার ছবি তৈরি করা হয়েছে। এই ছবি কল্পনায় সহজ হলেও মানুষের বিকাশ ও দেহের পুনর্গঠনের বাস্তব প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে না। উপমার দৃশ্যমানতা তার জৈবিক সত্যতার প্রমাণ নয়। একটি বীজ কেন অঙ্কুরিত হয় তা নির্দিষ্ট জীবন্ত কোষ, গঠন ও বিকাশক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত; কোনো অস্থিখণ্ডকে ‘বীজ’ বললে তার মধ্যে সেই ক্ষমতা সৃষ্টি হয় না। শরীরের কোন অংশ থেকে প্রথম বিকাশ শুরু হয় এবং মৃত্যুর পর সেই অংশ কী অবস্থায় থাকে—এসব প্রশ্নের জায়গায় একটি সহজ ধর্মীয় চিত্র বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই আখ্যানের সান্ত্বনামূলক কাজও স্পষ্ট: মৃত মানুষ সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি, তার ফিরে আসার ভিত্তি কোনো না কোনোভাবে রয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের বিলুপ্তি মেনে নিতে কষ্ট হয় বলেই শরীরে একটি অক্ষয় অংশ থেকে যেতে হবে—এমন কোনো যুক্তি নেই। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের আকাঙ্ক্ষা একটি বিশ্বাসকে আকর্ষণীয় করতে পারে; তা হাড়ের নতুন ভৌত বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে পারে না। নরম দেহাংশের তুলনায় হাড়ের দীর্ঘস্থায়িত্বকে চিরস্থায়িত্বের প্রমাণ ধরে নেওয়া পর্যবেক্ষণের ওপর অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্ত চাপানো। ধর্মীয় সাহিত্যে সেই সিদ্ধান্ত যতবার পুনরাবৃত্ত হোক, তা স্বাধীন শারীরস্থানগত সাক্ষ্যে পরিণত হয় না। একটি মিথের দীর্ঘ ইতিহাস তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেখায়; তার সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সেই মিথের বাইরে থাকা প্রমাণ।


ইসলামি বিশ্বাস: মেরুদণ্ডের টেলবোন অক্ষত

ইসলামি হাদিসে মানুষের মেরুদণ্ডের শেষাংশের একটি অস্থিকে দেহের অন্য অংশ থেকে ব্যতিক্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দেহের বাকি অংশ মাটিতে ক্ষয় হবে, অথচ এই অংশটি অক্ষত থেকে যাবে এবং তাকে ভিত্তি করেই মানুষকে পুনরায় গঠন করা হবে। এখানে অস্থির নাম, তার ক্ষয়মুক্ত বৈশিষ্ট্য এবং পুনরুত্থানে তার ভূমিকা—তিনটিই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। মৃতদেহের কোন অংশ পচবে এবং কোন অংশ পচবে না, সেই বিষয়ে একটি সরাসরি দাবি করা হচ্ছে। এই দাবির সঙ্গে বাস্তব অস্থির রাসায়নিক গঠন ও মৃত্যুর পর তার পরিণতির সম্পর্ক রয়েছে। শরীরের ভেতর একটি পরিচিত হাড়কে বেছে নিয়ে তার ওপর অবিনশ্বরতা আরোপ করার ফলে বক্তব্যটি শারীরস্থান ও মৃতদেহের ক্ষয় সম্পর্কে পরীক্ষাযোগ্য প্রশ্ন তৈরি করে। [8] [9] [10] [11]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৪. দুই ফুঁৎকারের মাঝে ব্যবধান
৭১৪৬। আবূ কুরায়ব মুহাম্মাদ ইবনুল আলা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দুইবার ফুঁৎকারের মাঝে চল্লিশ হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আবূ হুরায়রা! চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারা বললেন, এ কি চল্লিশ মাস? তিনি বললেন, আমি অস্বীকার করলাম।তারা বললেন, এ কি চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, অস্বীকার করলাম (অর্থাৎ আমারও জানা নেই)। অতঃপর আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হবে, এতে তারা উদগত হবে যেমন সবজি উদগত হয়। অতঃপরতিনি বললেন, তখন একটি হাড় ব্যতীত মানুষের সমস্ত শরীর পঁচে যাবে। আর সে হাড়টি হল, মেরুদণ্ডের (সর্বনিম্নভাগের এবং নিতম্বের উপরের) হাড়। কিয়ামতের দিন এ হাড় থেকেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এই বর্ণনায় পুনরুত্থানের ছবিটি কৃষিজ অঙ্কুরোদ্গমের মতো: আকাশ থেকে পানি বর্ষিত হবে, তারপর মৃত মানুষ উদ্ভিদের মতো উঠে আসবে। সেই ছবির মধ্যে নির্দিষ্ট অস্থিখণ্ডটি সংরক্ষিত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ফলে অস্থিটির ক্ষয়মুক্ততা পুরো ঘটনাক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। মৃতদেহ পচে যাওয়ার পরিচিত বাস্তবতার সঙ্গে দেহ ফিরে পাওয়ার ধর্মীয় প্রতিশ্রুতিকে যুক্ত করতে একটি অবশিষ্ট অংশের ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ওই অংশ কেন অন্য সব হাড় থেকে আলাদা, তার গঠনে কী বিশেষ উপাদান আছে এবং মাটির প্রভাবে সেটি কেন পরিবর্তিত হবে না—এসবের কোনো রাসায়নিক ব্যাখ্যা এই বর্ণনায় নেই। পুনরুত্থানের দৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে; দৃশ্যটির ভিত্তি হিসেবে নির্বাচিত অস্থির ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


“মাটি কখনো খাবে না”: ক্ষয়মুক্ততার নিরঙ্কুশ ঘোষণা

সহিহ মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় প্রশ্ন করে অস্থিটির পরিচয় জানতে চাওয়া হয়েছে এবং উত্তরে ‘আজব আল-ধানাব’ বলা হয়েছে। মূল আরবিতে ‘لَا تَأْكُلُهُ الْأَرْضُ أَبَدًا’—মাটি একে কখনো খাবে না—এই নিরঙ্কুশ ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। সাময়িক সংরক্ষণ বা অন্য হাড়ের তুলনায় ধীরে ক্ষয় হওয়ার কথা এখানে বলা হয়নি। ‘কখনো’ শব্দটি দাবিটিকে সীমিত স্থায়িত্ব থেকে সরাসরি ক্ষয়মুক্ততার দাবিতে পরিণত করেছে। [12] [13]

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ৫৪। বিভিন্ন ফিতনাহ ও কিয়ামাতের লক্ষনসমূহ
২৮. উভয় ফুঁৎকারের মধ্যে ব্যবধান
৭৩০৬-(১৪৩/…) মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কতিপয় হাদীস উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হাদীস হচ্ছে এই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের শরীরে এমন একটি হাড় আছে, যা জমিন কখনো ভক্ষণ করবে না। কিয়ামাতের দিন এর দ্বারাই পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হবে। সহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এ আবার কোন হাড্ডি? তিনি বললেন, এ হলো, মেরুদণ্ডের হাড্ডি। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭১৪৮, ইসলামিক সেন্টার ৭২০০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

দীর্ঘকাল টিকে থাকা কোনো নমুনা দিয়ে এই নিরঙ্কুশ ঘোষণা প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি হাড় নির্দিষ্ট মাটিতে কয়েকশ বছর সংরক্ষিত থাকলে তার থেকে জানা যায় সেই পরিবেশে তার সংরক্ষণের ইতিহাস। অন্য পরিবেশে তার খনিজ দ্রবীভূত হয় কি না, জৈব উপাদান ভাঙে কি না অথবা অস্থির সূক্ষ্ম কাঠামো পরিবর্তিত হয় কি না—এসব প্রশ্ন তখনও থাকে। একটি ধর্মীয় ব্যতিক্রমকে প্রমাণ করতে শুধু টিকে থাকা হাড় দেখালে চলে না; সংশ্লিষ্ট ক্ষয়প্রক্রিয়াগুলোর বিরুদ্ধে তার বাস্তব প্রতিরোধক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ‘আজব আল-ধানাব’ নামটি সেই পরীক্ষার ফল সরবরাহ করে না।

আরবি পাঠসহ বাংলা সংস্করণের ধারাবাহিক বর্ণনাগুলোতে একই অস্থির সঙ্গে প্রথম সৃষ্টি ও পুনর্গঠন—উভয় বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। [9]

أَرْبَعُونَ شَهْرًا قَالَ أَبَيْتُ . قَالُوا أَرْبَعُونَ سَنَةً قَالَ أَبَيْتُ ” ثُمَّ يُنْزِلُ اللهُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيَنْبُتُونَ كَمَا يَنْبُتُ الْبَقْلُ”. قَالَ ” وَلَيْسَ مِنَ الإِنْسَانِ شَيْءٌ إِلَّا يَبْلَى إِلَّا عَظْمًا وَاحِدًا وَهُوَ عَجْبُ الذَّنَبِ وَمِنْهُ يُرَكَبُ الْخَلْقُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ”.
(৭২৬৭) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন আবু কুরায়ব মুহাম্মদ বিন আ’লা (রহ.) তিনি… আবু হুরায়রা (রাযি.) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, উভয় ফুঁৎকারের মাঝে চল্লিশ হইবে। সাহাবীগণ বলিলেন, হে আবু হুরায়রা! চল্লিশ দিন? তিনি বলিলেন, আমি অস্বীকার করি। তাহারা আবারও জিজ্ঞাসা করিলেন, এ কি চল্লিশ মাস? এইবারও তিনি বলিলেন, ইহা অস্বীকার করি। অতঃপর আকাশ হইতে বৃষ্টি বর্ষিত হইবে, ইহাতে মানুষের শরীর পরিবর্ধিত হইবে যেমন সবজী
উদগত হয়। অতঃপর তিনি বলিলেন, তখন একটি হাড় ব্যতীত মানুষের সমস্ত শরীর পঁচিয়া যাইবে। আর সেই হাড়টি হইল, মেরুদণ্ডের হাড়। কিয়ামতের দিন এই হাড় হইতেই আবার মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা হইবে।
(9266) وَحَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ حَدَّثَنَا الْمُغِيرَةُ يَعْنِي الْحِزَامِيَّ عَنْ أَبِي الزِّنَادِ عَنِ الْأَعْرَجِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ” كُلُّ ابْنِ آدَمَ يَأْكُلُهُ التُّرَابُ إِلَّا عَجْبَ الذَّنَبِ مِنْهُ خُلِقَ وَفِيهِ يُرَكَّبُ”.
(৭২৬৮) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আর আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন কুতায়বা বিন
সাঈদ (রহ.) তিনি… আবু হুরায়রা (রাযি.) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মানুষের সব কিছুই মাটি খাইয়া ফেলিবে। কেবল মেরুদণ্ডের হাড় বাকী থাকিবে। ইহার দ্বারাই প্রথমতঃ মানুষ সৃষ্টি করা হইয়াছে এবং ইহার দ্বারাই আবার তাহাদেরকে সৃষ্টি করা হইবে।
( 92) حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ حَدَّثَنَا مَعْمَرٌ عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّةٍ قَالَ هَذَا مَا حَدَّثَنَا أَبُو
هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَذَكَرَ أَحَادِيثَ مِنْهَا وَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم ” إِنَّ فِي
الإِنْسَانِ عَظْمًا لَا تَأْكُلُهُ الأَرْضُ أَبَدًا فِيهِ يُرَكَبُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ” . قَالُوا أَيُّ عَظْمٍ هُوَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ” عَجْبُ الذَّنَبِ” .
(৭২৬৯) হাদীছ (ইমাম মুসলিম (রহ.) বলেন) আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করেন মুহাম্মদ বিন রাফি’
(রহ.) তিনি… আবূ হুরায়রা (রাযি.) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। তন্মধ্যে একটি হাদীছ হইতেছে এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করিয়াছেন, মানুষের শরীরে এমন একটি হাড় আছে, যাহা যমীন কখনও ভক্ষণ করিবে না। কিয়ামতের দিন ইহার দ্বারাই পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হইবে। সাহাবীগণ বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইহা আবার কোন হাড়? তিনি বলিলেন, ইহা হইল, মেরুদণ্ডের হাড়।

মেরুদণ্ডে 1

ধ্রুপদি ব্যাখ্যায় অস্থির পরিচয় ও সৃষ্টির ভিত্তি

ইসলামওয়েবের ব্যাখ্যায় ‘আজব আল-ধানাব’কে মেরুদণ্ডের নিচের প্রান্তের ক্ষুদ্র অস্থি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সেখানে নববীর ‘শরহে মুসলিম’ থেকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এটিই মানুষের প্রথম সৃষ্ট অংশ এবং পুনর্গঠনের জন্য এই অংশ অবশিষ্ট থাকবে। অর্থাৎ ধর্মীয় ব্যাখ্যাটি একটি নির্দিষ্ট দেহাংশের ওপর সৃষ্টি ও পুনঃসৃষ্টির কেন্দ্রীয় ভূমিকা আরোপ করছে। [14]

وهو أول ما يخلق من الآدمي، وهو الذي يبقى منه ليعاد تركيب الخلق عليه.

বাংলা অনুবাদ: এটিই মানুষের প্রথম সৃষ্ট অংশ, এবং মানুষের যে অংশটি অবশিষ্ট থাকে, এটিই তা—যাতে এর ওপর তার দেহকে আবার গঠন করা হয়।

এই ব্যাখ্যা অস্থিটির বিশেষত্বের পক্ষে নতুন পর্যবেক্ষণ যোগ করে না; হাদিসে আরোপিত ভূমিকাটিকে আরও স্পষ্ট করে। একটি দেহাংশকে প্রথম সৃষ্টি এবং পুনর্গঠনের ভিত্তি বলা থেকে তার জৈবিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। একইভাবে ব্যাখ্যাকারীর নাম বা ধর্মীয় মর্যাদা অস্থিটির ভেতরে অতিরিক্ত প্রতিরোধক্ষমতা সৃষ্টি করে না। বক্তব্যের সত্যতা নির্ভর করে অস্থিটির বৈশিষ্ট্যের ওপর। ক্ষয়মুক্ততার কারণ যদি তার গঠনের মধ্যে থাকে, তবে সেই গঠন অনুসন্ধানযোগ্য; আর তার গঠন অন্য অস্থির পরিচিত উপাদানেই তৈরি হলে ওই উপাদানের আচরণের সঙ্গে ধর্মীয় দাবিটির হিসাব মেলাতে হবে।

ইবন আবদিল বার ‘আত-তামহিদ’-এ এই বিষয় জানার ভিত্তি হিসেবে বর্ণিত সংবাদকেই উল্লেখ করেছেন। ইসলামকিউএ তাঁর বক্তব্যটি উদ্ধৃত করেছে। [15]

وهَذا لا يُدْرَكُ إلّا بِخَبَرٍ، ولا خَبَرَ فِيهِ عِنْدَنا مُفَسَّرٌ، وإنَّما هِيَ جُمْلَةُ ما جاءَ فِي هَذا الخَبَرِ

বাংলা অনুবাদ: এটি কেবল বর্ণিত সংবাদের মাধ্যমেই জানা যায়। আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা নেই; এই সংবাদে যা এসেছে, সেটুকুই এর মোট বিবরণ।

এখানে জ্ঞানের ভিত্তি পরিষ্কার: নির্দিষ্ট অস্থির ওপর পরিচালিত পরীক্ষা বা মৃতদেহের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা হয়নি; একটি ধর্মীয় বর্ণনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই ভিত্তিতে তৈরি বক্তব্যকে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার হিসেবে প্রচার করলে প্রমাণের ধরন বদলে দেওয়া হয়। বর্ণনার প্রতি বিশ্বাসকে পরীক্ষালব্ধ ফলের মর্যাদা দেওয়া হয়, অথচ সংশ্লিষ্ট অস্থির গঠন, ক্ষয় এবং অবশিষ্ট থাকার প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য অনুপস্থিত থাকে। ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে একটি রাসায়নিক দাবির সত্যতা নির্ধারণ করা জ্ঞানের দুই ভিন্ন মানদণ্ড গুলিয়ে ফেলা।


তাফসিরে বৃষ্টি, অঙ্কুরোদ্গম ও দেহের পুনর্গঠন

তাফসীরে মাযহারীতে বৃষ্টির মাধ্যমে মৃত ভূমি সজীব হওয়ার বর্ণনার সঙ্গে কবর থেকে মানুষকে আবার ওঠানোর আখ্যান যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে সংরক্ষিত অস্থির সঙ্গে নতুন শরীর জোড়া দেওয়ার কথাও রয়েছে। পুনরুত্থানের ধর্মীয় প্রতিশ্রুতিকে কীভাবে একটি নির্দিষ্ট অস্থি ও বৃষ্টির দৃশ্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তার বিস্তারিত উদাহরণ এই পরিচ্ছেদ। [10]

এরপরের আয়াতে (১১) বলা হয়েছে- ‘এবং যিনি আকাশ থেকে বারিবর্ষণ করেন পরিমিতভাবে অতঃপর আমি তদ্দারা সঞ্জীবিত করি নির্জীব জনপদকে। এভাবে তোমাদেরকে বের করা হবে’।
এখানে ‘বিকুদ্ধরিন’ অর্থ পরিমিতভাবে। আর এখানকার ‘বের করা হবে’ অর্থ বের করা হবে কবর থেকে। অর্থাৎ পুনরুত্থান দিবসে যখন হজরত ইসরাফিল শিঙ্গায় ফৎকার দিবেন, তখন প্রত্যেককে জীবিত করে বের করা হবে তাদের আপনাপন কবর থেকে।
হজরত আবু হোরায়রা থেকে বোখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ইস্রাফিলের প্রথম ও দ্বিতীয় শিঙ্গাধ্বনির মধ্যেকার ব্যবধান হবে চল্লিশ। হাদিসটি শুনে লোকেরা হজরত আবু হোরায়রাকে জিজ্ঞেস করলো, হে রসুল-সহচর! ‘চল্লিশ’ মানে কী চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমি তা বলতে পারবো না। তারা পুনঃ জিজ্ঞেস করলো, তাহলে কী চল্লিশ মাস? তিনি বললেন, তা-ও জানি না। তারা আবার বললো, তাহলে কী চল্লিশ বৎসর? তিনি জবাব দিলেন, সে কথা বলার ক্ষমতাও আমার নেই। তবে রসুল স. বলেছেন, ওই সময় আল্লাহ্ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করবেন। তার ফলে কবরবাসীরা তাদের নিজ নিজ কবরে এমনভাবে উত্থিত হতে থাকবে, যেমনভাবে মাটিতে উদ্‌গত হয়ে থাকে শাক-সবজী। কেবল একটি হাড় ছাড়া মানুষের শরীরের অন্যান্য অংশ বিলীন হয়ে যায়। ওই হাড় হচ্ছে মেরুদণ্ডের হাড়। ওই হাড়ের সঙ্গেই নতুন শরীরকে জোড়া দেওয়া হবে পুনরুত্থানকালে।
হজরত ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে আবী হাতেম ও সাঈদ ইবনে যোবায়েরের মাধ্যমে ইবনে জারীর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, তখন আরশের তলদেশ থেকে বের হয়ে আসবে এক উত্তম মরুদ্যান, ফলে মাটিতে মাথা তুলে দাঁড়াবে সকল বিচরণশীল প্রাণী, যেভাবে তরুশ্রেণী উদগত হয় মৃত্তিকাপৃষ্ঠে। তারপর আত্মাসমূহকে আদেশ করা হবে, দৃষ্টির অগোচরে নিজ
নিজ দেহে অভ্যন্তরস্থিত হও। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন ‘হে প্রশান্ত প্রবৃত্তি! তুমি তোমার প্রতিপালনকর্তার দিকে ফিরে যাও পরিতুষ্ট ও পরিতোষভাজন হয়ে’। হজরত আনাস থেকে আহমদ ও আবুল আলীয়া বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, পুনরুত্থান পর্বে সকলকে কবর থেকে ওঠানো হবে এবং আকাশ থেকে তাদের উপর বর্ষিত হবে হালকা বৃষ্টি।
এরপরের আয়াতে (১২) বলা হয়েছে- ‘আর যিনি সকল প্রকারের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও আনআ’ম যাতে তোমরা আরোহণ করো’। এখানে ‘আযওয়াজ্বা’ অর্থ যুগল সৃষ্টি। বিভিন্ন প্রজাতির জোড়া।
এরপরের আয়াতে (১৩) বলা হয়েছে- ‘যাতে তোমরা তাদের পিঠে স্থির হয়ে বসতে পারো, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা তার উপর স্থির হয়ে বসো এবং বলো, পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এদেরকে বশীভূত করতে’।
তাফসীরে মাযহারী/৪৭২

মেরুদণ্ডে 3

এই বর্ণনায় পানি দেহ পুনর্গঠনের সূচনাকারী উপাদান হিসেবে হাজির হয়, আর অস্থিখণ্ডটি নতুন দেহের অবলম্বন। কিন্তু বৃষ্টি পড়া থেকে মৃত মানুষের অঙ্গ, স্নায়ু, মস্তিষ্ক ও ব্যক্তিগত স্মৃতি ফিরে আসার কোনো জীববৈজ্ঞানিক কার্যক্রম এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উদ্ভিদের অঙ্কুরোদ্গমের সঙ্গে তুলনা দৃশ্যটি সহজ করে; তুলনাটি মানুষের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া সরবরাহ করে না। বীজের বিকাশক্ষমতা নির্ভর করে তার নির্দিষ্ট কোষীয় অবস্থার ওপর। মৃত অস্থির জন্য একই ক্ষমতা দাবি করতে হলে অস্থিটির মধ্যে সেই ক্ষমতার বাস্তব ভিত্তি দেখাতে হবে। একই পরিচিত শব্দ—পানি, হাড়, বৃদ্ধি—ব্যবহার করলেই ঘটনাক্রমটি জীববিজ্ঞানের অংশ হয়ে যায় না।


ইবনু হিব্বানের অধ্যায়বিন্যাসে দেহের অবশিষ্টাংশের দাবি

সহিহ ইবনু হিব্বানের বাংলা সংস্করণে এই বর্ণনার অধ্যায়শিরোনামেও টেলবোন ছাড়া দেহের বিলুপ্তি এবং সম্পূর্ণ দেহ নিঃশেষ হওয়ার ধারণার বিরোধিতা এসেছে। ফলে ব্যাখ্যার বিষয়টি নির্দিষ্ট: মৃত্যুর পর মানবদেহের একটি অংশ থেকে যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। [16]

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
১০. কিতাবুল জানাইয এবং জানাযার পুর্বাপর সংশ্লিষ্ট বিষয়
পরিচ্ছেদঃ মেরুদন্ডের নিম্নাংশের টেলবোন ব্যতিত মানব দেহের পুরো শরীর সত্তা নিঃশেষ হয়ে যাবে মর্মে বর্ণনা
৩১২৮. আবূ হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আদম সন্তানের পুরো শরীর সত্তা মাটি খেয়ে ফেলবে মেরুদন্ডের নিম্নাংশের টেলবোন ব্যতিত। এখান থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এখান থেকেই তাকে (পুনরায়) বিন্যস্ত করা হবে।”[1]
[1] মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ১/২৩৯; নাসাঈ: ৪/১১১-১১২; আবূ দাঊদ: ৪৭৪৩; মুসনাদ আহমাদ: ২/৩২২; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৫; সহীহুল বুখারী: ৪৮১৪; ইবনু মাজাহ: ৪২৬৬।
আল্লামা শুআইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (সহীহ ইবনু মাজাহ: ৪২৬৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

পরের অধ্যায়ের শিরোনামেই পুরো শরীর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার বক্তব্য খণ্ডনের কথা রয়েছে। [17]

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
১০. কিতাবুল জানাইয এবং জানাযার পুর্বাপর সংশ্লিষ্ট বিষয়
পরিচ্ছেদঃ যে ব্যক্তি মনে করে যে, মানুষ মরে গেলে তার পুরো শরীর সত্তা নিঃশেষ হয়ে যায়, তার কথা অপনোদনকারী হাদীস
৩১২৯. আবূ হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আদম সন্তানের পুরো শরীর সত্তা মাটি খেয়ে ফেলবে মেরুদন্ডের নিম্নাংশের টেলবোন ব্যতিত। এখান থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এখান থেকেই তাকে (পুনরায়) বিন্যস্ত করা হবে।”[1]
[1] মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ১/২৩৯; নাসাঈ: ৪/১১১-১১২; আবূ দাঊদ: ৪৭৪৩; মুসনাদ আহমাদ: ২/৩২২; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৫; সহীহুল বুখারী: ৪৮১৪; ইবনু মাজাহ: ৪২৬৬।
আল্লামা শুআইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (সহীহ ইবনু মাজাহ: ৪২৬৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

হাড়ের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধানকে এই ঘোষণার অধীন করে ফেললে সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে যায়। ক্ষয়ের ফল যাই পাওয়া যাক, একটি অবিনষ্ট অংশ রয়েছে বলেই ধরে নিতে হয়। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে তার বিপরীত শর্ত কাজ করে: নমুনার গঠন, পরিবর্তন ও সংরক্ষণের অবস্থা থেকে সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। শিক্ষায় এই পার্থক্য মুছে দিয়ে ধর্মীয় সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত বিজ্ঞান হিসেবে শেখানো হলে শিক্ষার্থী প্রমাণের ভিত্তিতে মত সংশোধনের বদলে কর্তৃত্বের সঙ্গে তথ্য মেলাতে শেখে। অক্ষয় অস্থির বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত জীববিজ্ঞান হিসেবে প্রচারের ক্ষতি এখানেই: পরীক্ষার ফলের ওপর বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ বসানো হয়।


জৈব-রাসায়নিক বিশ্লেষণ: হাড়ের পচনশীলতা ও ডায়াজেনেসিস প্রক্রিয়া

হাড় একটি জৈব-খনিজ যৌগিক কাঠামো। এর প্রধান জৈব উপাদান কোলাজেন প্রোটিন এবং প্রধান খনিজ উপাদান ক্যালসিয়াম ফসফেটভিত্তিক বায়োঅ্যাপাটাইট, যার গঠন হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইটের সঙ্গে সম্পর্কিত। খনিজ অংশ অস্থিকে দৃঢ়তা দেয়, আর কোলাজেন তার যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দুই উপাদানের রাসায়নিক স্থায়িত্ব এবং পারস্পরিক বিন্যাসের ওপর অস্থির সংরক্ষণ নির্ভর করে। মৃত্যুর পর জৈব অংশের ভাঙন, খনিজের পরিবর্তন এবং অণুজীবের আক্রমণ—এই প্রক্রিয়াগুলো অস্থির মূল কাঠামো বদলে দিতে পারে। কলিন্স ও সহলেখকদের গবেষণা-পর্যালোচনায় ক্ষয়ের এই তিনটি পথ আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে। [18]

In most environments, bones are not in thermodynamic equilibrium with the soil solution, and undergo chemical deterioration (path 2).

বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ পরিবেশে হাড় মাটির দ্রবণের সঙ্গে তাপগতীয় সাম্যাবস্থায় থাকে না এবং রাসায়নিক অবক্ষয়ের শিকার হয়—দ্বিতীয় পথ।

এই ক্ষয়প্রক্রিয়ায় হাড়কে শুধু বাইরে থেকে গুঁড়া হতে হয় না। অস্থিটি দেখতে চেনা আকারে থেকে গেলেও তার জৈব অণু ভাঙতে পারে, খনিজের স্ফটিকবিন্যাস বদলাতে পারে এবং ভেতরের সূক্ষ্ম ফাঁক ও নালিকার প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই হাতে একটি হাড় তুলে দেখানো এবং তার মূল জৈব-রাসায়নিক অবস্থা অক্ষত দেখানো একই কাজ নয়। বাহ্যিক আকৃতি টিকে থাকা দিয়ে অণু ও কাঠামোর অপরিবর্তনীয়তা প্রমাণ করা যায় না। ‘অবিনশ্বর’ কথাটি বাস্তব অর্থে ব্যবহার করলে এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনগুলোকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হয়।


ককসিক্সের গঠন: পরিচিত অস্থি, অপরিচিত অলৌকিক পদার্থ নয়

মানুষের ককসিক্স সাধারণত তিন থেকে পাঁচটি ক্ষুদ্র কশেরুকাংশ নিয়ে গঠিত; চারটি সবচেয়ে প্রচলিত। অংশগুলোর সংযুক্তি ও আকৃতিতেও ব্যক্তিভেদে পার্থক্য থাকে। উন ও সহলেখকদের ১১২ জন প্রাপ্তবয়স্কের সিটি-স্ক্যান বিশ্লেষণে ৭৬ শতাংশ ক্ষেত্রে চারটি অংশ পাওয়া গেছে। বাস্তব মানুষের ওপর পরিচালিত এই পর্যবেক্ষণ ককসিক্সকে নির্দিষ্ট গঠন ও বৈচিত্র্যসম্পন্ন অস্থি হিসেবে বর্ণনা করে। [19]

Four coccygeal segments were present in 76 % of scans.

বাংলা অনুবাদ: ৭৬ শতাংশ স্ক্যানে ককসিক্সের চারটি অংশ উপস্থিত ছিল।

ককসিক্সের পরিচয় নিয়ে শারীরস্থানগত তথ্য পাওয়া যায় ছবি, পরিমাপ ও অস্থির গঠন পরীক্ষা করে। এর জৈব-খনিজ প্রকৃতির সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অস্থির মৌলিক মিল রয়েছে। মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে অবস্থান করা তার রাসায়নিক বন্ধনকে মাটির দ্রবণ, অম্লতা বা জৈব ভাঙনের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন করে না। ক্ষুদ্র আকার, সংযুক্ত কশেরুকাংশ কিংবা বিশেষ অবস্থান—কোনোটিই নিজে থেকে ক্ষয়মুক্ততার কারণ নয়। ককসিক্সকে অবিনশ্বর বলতে হলে সাধারণ অস্থি থেকে তাকে ব্যতিক্রম করে এমন বৈশিষ্ট্য দেখাতে হবে। ধর্মীয় নামকরণ অস্থির গঠনে সেই ব্যতিক্রম সংযোজন করে না।


অম্লতা ও খনিজের দ্রবীভবন: অস্থির কঠিনত্বের রাসায়নিক সীমা

অস্থির খনিজ অংশের স্থায়িত্ব আশপাশের দ্রবণের রাসায়নিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত। অম্লীয় পরিবেশে ফসফেট ও হাইড্রক্সিলের সঙ্গে হাইড্রোজেন আয়নের বিক্রিয়া খনিজের দ্রবীভবনকে এগিয়ে নিতে পারে। অস্থি কঠিন বলেই তার উপাদান দ্রবণে যেতে পারবে না—এ ধারণা রাসায়নিকভাবে ভুল। হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইটের একটি আদর্শীকৃত অম্লীয় দ্রবীভবন বিক্রিয়া হলো:

Ca10(PO4)6(OH)2 + 14H+ → 10Ca2+ + 6H2PO4− + 2H2O

এই সমীকরণে কঠিন খনিজের উপাদান দ্রবণীয় আয়নে পরিণত হচ্ছে। বাস্তব অস্থির খনিজে বিভিন্ন প্রতিস্থাপন ও জৈব উপাদান থাকে, আর কবরের পরিবেশেও পানি, আয়ন ও অণুজীব একসঙ্গে কাজ করে। ফলে ক্ষয়ের গতি নির্ধারণে মাটির অম্লতার পাশাপাশি পানির প্রবাহ, তাপমাত্রা এবং স্থানীয় রাসায়নিক অবস্থার ভূমিকা রয়েছে। একটি মাত্র অম্লতার মান দিয়ে সব কবরের হাড় কত বছরে বিলীন হবে তা নির্ধারণ করা যায় না। এখানে নির্ণায়ক বিষয়টি হলো, হাড়ের খনিজ রাসায়নিক পরিবর্তনের অধীন; ‘মাটি কখনো খাবে না’ ঘোষণা তাকে সেই বিক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেয় না।

খনিজের ক্ষয় জৈব অংশকেও বেশি উন্মুক্ত করতে পারে। খনিজ ও কোলাজেন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় একটি অংশের পরিবর্তন অন্য অংশের সংরক্ষণে প্রভাব ফেলে। আবার দ্রবীভবনের পরে নতুন খনিজ জমা বা পুনঃস্ফটিকায়ন ঘটতে পারে। তখন কোনো কঠিন অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেলেও তার গঠন আগের মতো আছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। অস্থির অবস্থার বিবরণ দিতে তার খনিজ, জৈব অণু এবং সূক্ষ্ম কাঠামো আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়। ধর্মীয় অবিনশ্বরতার ধারণা এই পরিবর্তনশীল ব্যবস্থাকে একটি স্থির, অপরিবর্তিত অস্থিখণ্ড হিসেবে কল্পনা করে।


কোলাজেনের ভাঙন: দৃশ্যমান হাড়ের ভেতরে অণুগত ক্ষয়

কোলাজেন প্রোটিনের দীর্ঘ শৃঙ্খল ও তন্তুবিন্যাস অস্থির গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। পানির অংশগ্রহণে রাসায়নিক বন্ধন ভাঙার প্রক্রিয়া—জলবিশ্লেষণ—এই কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে। তন্তুগুলোর পারস্পরিক সংযোগ দুর্বল হলে অস্থির জৈব কাঠামোও বদলে যায়। বাইরে থেকে একটি অস্থি অক্ষত মনে হলেও তার ভেতরে এই পরিবর্তন চলতে পারে। ফলে ‘চোখে হাড় দেখা যাচ্ছে’ পর্যবেক্ষণটি কোলাজেনের অক্ষত থাকার সাক্ষ্য নয়। অণুগত পরীক্ষায় প্রোটিনের ভাঙন ও খনিজের পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব।

ফালগাইরাক ও সহলেখকদের ২০২২ সালের পরীক্ষায় ছয়জন মানুষের পাঁজরের অস্থি মাটিতে রেখে ১২ মাস ধরে রামান অণুবর্ণালিবীক্ষণের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়। মাসভিত্তিক পর্যবেক্ষণে খনিজ অংশে দ্রবীভবন–পুনঃস্ফটিকায়ন এবং কোলাজেন কাঠামোয় জলবিশ্লেষণের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন পাওয়া যায়। পরীক্ষাটিতে মানুষের অস্থির গঠনগত পরিবর্তন মাপা হয়েছে। [20]

The results showed that the mineral undergoes the dissolution–recrystallization mechanism. The collagen matrix of bone undergoes the hydrolysis mechanism.

বাংলা অনুবাদ: ফলে দেখা গেছে, খনিজ অংশ দ্রবীভবন–পুনঃস্ফটিকায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। অস্থির কোলাজেন কাঠামো জলবিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।

এই পরীক্ষার গুরুত্ব তার পরিমাপযোগ্যতায়। অস্থির নমুনা, পর্যবেক্ষণের সময়কাল এবং পরিবর্তন শনাক্ত করার পদ্ধতি নির্দিষ্ট রয়েছে। ধর্মীয় অক্ষয়তার দাবিতে ঠিক এই ধরনের উপাদান অনুপস্থিত: কোন নমুনায় ক্ষয় থেমেছে, কী পদ্ধতিতে তা মাপা হয়েছে এবং অন্য পরীক্ষায় একই ফল পাওয়া গেছে কি না—এসবের তথ্য দেওয়া হয় না। একটি প্রাচীন বর্ণনায় ‘কখনো’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে; গবেষণায় নির্দিষ্ট সময় ধরে নির্দিষ্ট নমুনার পরিবর্তন পরীক্ষা করা হয়েছে। অস্থির বাস্তব আচরণ সম্পর্কে সিদ্ধান্তের উপাদান দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই সরবরাহ করে।


অণুজীবের আক্রমণ ও অস্থির সূক্ষ্ম কাঠামোর ধ্বংস

মৃত্যুর পর অস্থি দেহের স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্গঠনের ব্যবস্থা হারায়। পরিবেশের সঙ্গে তার রাসায়নিক ও অণুজীবগত সম্পর্ক তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অণুজীবজনিত ক্ষয় অস্থির ভেতরে সূক্ষ্ম গহ্বর ও কাঠামোগত পরিবর্তন তৈরি করতে পারে। এর উপস্থিতি অণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং অস্থির ছিদ্রবিন্যাস বিশ্লেষণের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়। ২০০৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পাঁচটি দেশের চার ধরনের জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত ৪১টি প্রত্নস্থানের ২৫০টির বেশি অস্থি পরীক্ষা করা হয়েছিল; নমুনাগুলোর ৬৮ শতাংশে অণুজীবের আক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায়। [21]

Microscopic and physical (mercury intrusion porosimetry) analyses of these bones revealed that the majority (68%) had suffered microbial attack.

বাংলা অনুবাদ: এই অস্থিগুলোর অণুবীক্ষণিক ও ভৌত বিশ্লেষণে—পারদ প্রবেশ করিয়ে ছিদ্রবিন্যাস পরিমাপের পদ্ধতিতে—দেখা গেছে, অধিকাংশ নমুনা, অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ, অণুজীবের আক্রমণের শিকার হয়েছিল।

অণুজীবের আক্রমণ মানে শুধু হাড়ের ওপর ময়লা জমা নয়; অস্থির মূল কাঠামোর ভেতরে পরিবর্তন ঘটে। খনিজের সঙ্গে যুক্ত জৈব অংশ উন্মুক্ত হলে প্রোটিন ভাঙনের সুযোগ তৈরি হয় এবং অস্থির অখণ্ডতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ক্ষয়প্রক্রিয়াকে শুধু বড় হাড় ভেঙে ছোট টুকরা হওয়ার দৃশ্য দিয়ে বিচার করলে অণুগত ও অণুবীক্ষণিক ক্ষতি বাদ পড়ে। ‘মাটি খাওয়া’ কথাটিকে বাস্তব ক্ষয়ের অর্থে বিচার করলে মাটির দ্রবণ, পানি ও অণুজীবের এই সম্মিলিত প্রভাবই প্রাসঙ্গিক। অস্থির ওপর কাজ করা প্রক্রিয়াগুলো বাস্তব এবং শনাক্তযোগ্য; ধর্মীয় ঘোষণায় ব্যতিক্রম হিসেবে নির্বাচিত হাড়টির জন্য আলাদা ক্ষয়মুক্ত উপাদান দেখানো হয়নি।


রাসায়নিক পরিবর্তনের দলিল ও অক্ষয় অস্থির প্রমাণশূন্যতা

হাড়ের ক্ষয় সম্পর্কে জৈব-রাসায়নিক তথ্য একটি সুসংগত ছবি দেয়: খনিজ দ্রবীভূত বা পুনর্গঠিত হতে পারে, কোলাজেনের বন্ধন ভাঙতে পারে এবং অণুজীব অস্থির সূক্ষ্ম কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। স্থানীয় পরিবেশ এই প্রক্রিয়াগুলোর গতি ও ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এই তথ্যের বিপরীতে ককসিক্সকে ক্ষয়মুক্ত বলার জন্য তার মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন, যা সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক ও অণুজীবগত প্রভাবকে বাস্তবে প্রতিহত করে। হাদিসে একটি অংশকে ব্যতিক্রম বলা হয়েছে; তার জন্য কোনো ব্যতিক্রমী রাসায়নিক গঠন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বর্ণনার দৃঢ় উচ্চারণ এবং অস্থির ভৌত প্রতিরোধক্ষমতা এক বিষয় নয়।

প্রাচীন ধর্মীয় ঘোষণাকে বিজ্ঞানের আগে জানা তথ্য হিসেবে প্রচারের জন্য এই ঘাটতিটিই আড়াল করা হয়। মানুষের দেহে ককসিক্স আছে—শারীরস্থানের এই তথ্যের সঙ্গে হাড়টি কখনো ক্ষয় হয় না—ধর্মীয় এই দাবিকে জুড়ে দেওয়া হয়। প্রথম তথ্যের সত্যতা দ্বিতীয় দাবির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অথচ ককসিক্সের পরিচয় নির্ধারণ এবং তার অবিনশ্বরতা প্রতিষ্ঠা দুটি পৃথক কাজ। প্রথমটির পক্ষে শারীরস্থানগত পর্যবেক্ষণ রয়েছে; দ্বিতীয়টির পক্ষে ধর্মীয় বর্ণনা হাজির করা হচ্ছে। পরিচিত অস্থির নাম ধার করে অলৌকিক বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ তৈরি করা যায় না। অক্ষয় টেলবোনের তত্ত্বকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রচার তাই প্রমাণের বদলে ধর্মীয় কর্তৃত্বের ব্যবহার।


প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্ত ও ট্যাফোনমি: ‘অবিনশ্বর’ হাড়ের অনুপস্থিতি

মৃত্যুর পর দেহাবশেষের পরিবর্তন, স্থানান্তর ও সংরক্ষণ নিয়ে ট্যাফোনমির গবেষণা। একটি কঙ্কাল উদ্ধার হওয়ার সময়ে তার সব অংশ একই অবস্থায় থাকে না। কোনো হাড় ভাঙে, কোনো অংশ দ্রবীভূত হয়, কোনোটি প্রাণী বা পানির প্রবাহে স্থানান্তরিত হয়; আবার কোনো অংশ অনুকূল পরিবেশে দীর্ঘকাল টিকে থাকে। প্রত্নতাত্ত্বিক দেহাবশেষে এই অসম সংরক্ষণ একটি বাস্তব সমস্যা। সেখান থেকে কোনো একটি অংশকে অবিনশ্বর ঘোষণা করার জন্য সেই অংশের পরিচয়, উপাদান ও পরিবর্তনের ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করতে হয়। হাড় পাওয়া গেছে—এই তথ্য দিয়ে হাড়টি কখনো ক্ষয় হয় না, এমন সিদ্ধান্ত আসে না। বহু বছর টিকে থাকার পর্যবেক্ষণ এবং কোনো অবস্থাতেই ক্ষয় না হওয়ার দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন শক্তির বক্তব্য।


কঙ্কালের অসম সংরক্ষণ: অস্থির ঘনত্ব ও পরিবেশের ভূমিকা

উইলি, গ্যালোওয়ে ও স্নাইডার ক্রো ক্রিক হত্যাকাণ্ডের চতুর্দশ শতকের দেহাবশেষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হাড় ও তাদের বিভিন্ন অংশের সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা করেন। আধুনিক অস্থির খনিজঘনত্বের সঙ্গে ওই প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনার টিকে থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়। গবেষণাটির বিষয় ককসিক্সের অবিনশ্বরতা নয়; এর ফল হলো, অস্থির ভিন্ন অংশের সংরক্ষণ বস্তুগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘনত্ব, গঠন ও সমাধির পরিবেশ বাদ দিয়ে সব হাড়ের পরিণতি একরকম ধরে নেওয়া ভুল। একইভাবে দীর্ঘস্থায়ী কোনো নমুনাকে দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট হাড়ের সর্বজনীন ক্ষয়মুক্ততা প্রতিষ্ঠা করাও ভুল। [22]

density values are positively correlated

বাংলা অনুবাদ: ঘনত্বের মানগুলোর সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।

ককসিক্সের অনুপস্থিতিকে অর্থবহ করতে সমাধির পূর্ণতা, খননপদ্ধতি, হাড়ের স্থানান্তর এবং অন্য অস্থির অবস্থাও বিবেচনায় আসে। কিন্তু অবিনশ্বরতার দাবির পক্ষে ইতিবাচক প্রমাণ দিতে এসবের আড়ালে লুকানোর সুযোগ নেই। দাবিটি একটি নির্দিষ্ট অস্থির বিশেষ ধর্ম সম্পর্কে; তার পক্ষে সেই অস্থির পরিবর্তনমুক্ত গঠন দেখাতে হবে। কঙ্কালের অন্য অংশের মতো দেখতে বা রাসায়নিক পরিবর্তনের শিকার একটি ককসিক্স পাওয়া গেলে সেটিকে অবিনশ্বর বলা যায় না। আর অনুপস্থিত ককসিক্সের জায়গায় পরীক্ষায় শনাক্ত হয়নি এমন কণার অস্তিত্ব ঘোষণা করলেও নতুন কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য যোগ হয় না। তখন দৃশ্যমান অস্থির দাবি সরে গিয়ে অদৃশ্য অবশিষ্টাংশের অনুমান সামনে আসে।


জীবাশ্ম: দীর্ঘ সংরক্ষণ ও অপরিবর্তিত থাকার পার্থক্য

জীবাশ্ম গঠনের ক্ষেত্রে মূল পদার্থের ছিদ্রে নতুন খনিজ জমা হতে পারে; আবার মূল পদার্থ দ্রবীভূত হয়ে তার জায়গায় অন্য খনিজও বসতে পারে। প্রথম প্রক্রিয়াটি খনিজে ছিদ্রপূরণ, দ্বিতীয়টি প্রতিস্থাপন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস এই দুই প্রক্রিয়াকে পৃথক করেছে। এদের কোনোটি ঘটলে দেহাংশের বাহ্যিক আকৃতি দীর্ঘকাল সংরক্ষিত হতে পারে, কিন্তু সেই আকৃতি দিয়ে মূল উপাদানের অপরিবর্তনীয়তা প্রমাণ হয় না। আবার প্রত্যেক জীবাশ্মের সমস্ত মূল উপাদান সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপিত হয়েছে—এ কথাও ভুল। সংরক্ষণ ও রূপান্তরের প্রকৃতি নমুনাভেদে নির্ধারিত হয়। [23]

Permineralization is the infilling of natural pores in original organic material by minerals.

বাংলা অনুবাদ: খনিজে ছিদ্রপূরণ হলো মূল জৈব পদার্থের স্বাভাবিক ছিদ্রগুলো খনিজ দিয়ে পূর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়া।

জীবাশ্মের দীর্ঘ আয়ু দেখিয়ে অবিনশ্বর হাড়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করালে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনকেই পরিবর্তনহীনতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কোনো দেহাংশের আকৃতি টিকে থাকা, তার খনিজের আংশিক সংরক্ষণ, জৈব অণুর ক্ষুদ্র অংশ উদ্ধার এবং জীবন্ত কোষ অক্ষত থাকা—এসব আলাদা ঘটনা। একটি থেকে আরেকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণ করে না। একই ধরনের সংরক্ষণ দাঁত, দীর্ঘ অস্থি কিংবা অন্য প্রাণীর দেহাবশেষেও ঘটতে পারে। ফলে জীবাশ্মের অস্তিত্ব মানব ককসিক্সের জন্য স্বতন্ত্র কোনো অলৌকিক সুবিধা দেখায় না; দেখায় পদার্থ ও পরিবেশের নির্দিষ্ট সম্পর্ক।


ইসলামওয়েবের ফতোয়া: বাস্তবতা অগ্রাহ্য করার সরাসরি নির্দেশ

ইসলামওয়েবের ২০১৫ সালের ২৮০৬২৭ নম্বর ফতোয়ার প্রশ্নকারী সমস্যাটি স্পষ্টভাবেই তুলেছেন। ইসলামি ওয়েবসাইটে ককসিক্স ক্ষয় না হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণের কথা পড়লেও অন্যত্র সেই প্রমাণ খুঁজে পাননি; বরং বিপরীত বক্তব্য পেয়েছেন। একই লেখা বিভিন্ন ইসলামি সাইটে পুনঃপ্রকাশের উল্লেখ করে তিনি স্বতন্ত্র তথ্য চেয়েছেন। উত্তরে কোনো পরীক্ষাগারের গবেষণা, অস্থির রাসায়নিক পরীক্ষার ফল বা সংরক্ষিত নমুনার প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। হাদিস ও তার ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র একটি অংশ ক্ষয় হয় না এবং কবরে সেটি খুঁজে না পাওয়া তার অস্তিত্বের বিরুদ্ধে প্রমাণ নয়। ফতোয়াটিতে উদ্ধৃত মিরকাতুল মাফাতিহের ব্যাখ্যায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার কথাও স্পষ্ট আছে। [24]

The tangible reality should be ignored in this case.

বাংলা অনুবাদ: এ ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করতে হবে।

একই ব্যাখ্যার মূল আরবি বক্তব্য ইসলামওয়েবের আরেকটি ফতোয়ায় আলী আল-কারীর উদ্ধৃতি হিসেবে সংরক্ষিত আছে। সেখানে শেষ পর্যন্ত ক্ষয় হওয়ার কথা বলেও সম্পূর্ণ ক্ষয় অস্বীকার করা হয়েছে; এরপর মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ক্ষুদ্র অংশকে ইন্দ্রিয় দিয়ে পৃথক করা যায় না বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। কথাগুলোর ভিত্তি অস্থির পরীক্ষালব্ধ কোনো বিশেষ ধর্ম নয়, বর্ণনার কর্তৃত্ব। [25]

أَقُولُ: التَّحْقِيقُ -وَاللَّهُ وَلِيُّ التَّوْفِيقِ- أَنَّ عَجْبَ الذَّنَبِ يَبْلَى آخِرًا، كَمَا شَهِدَ بِهِ حَدِيثٌ، لَكِنْ لَا بِالْكُلِّيَّةِ، كَمَا يَدُلُّ عَلَيْهِ هَذَا الْحَدِيثُ، وَهُوَ الْحَدِيثُ الْمُتَّفَقُ عَلَيْهِ، وَلَا عِبْرَةَ بِالْمَحْسُوسِ، كَمَا حُقِّقَ فِي بَابِ عَذَابِ الْقَبْرِ، عَلَى أَنَّ الْجُزْءَ الْقَلِيلَ مِنْهُ الْمَخْلُوطَ بِالتُّرَابِ غَيْرُ قَابِلٍ لِأَنْ يَتَمَيَّزَ بِالْحِسِّ، كَمَا لَا يَخْفَى عَلَى أَرْبَابِ الْحِسِّ.

বাংলা অনুবাদ: আমি বলি: অনুসন্ধানলব্ধ কথা—আর আল্লাহই সফলতার সহায়—হলো, আজব আল-ধানাব সবার শেষে ক্ষয় হয়, যেমন একটি হাদিস সাক্ষ্য দেয়; কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নয়, যেমন এই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হাদিস নির্দেশ করে। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় এখানে ধর্তব্য নয়, যেমন কবরের আজাবের অধ্যায়ে নিরূপিত হয়েছে। তা ছাড়া এর ক্ষুদ্র অংশ মাটির সঙ্গে মিশে থাকায় ইন্দ্রিয় দিয়ে পৃথক করা যায় না; ইন্দ্রিয়বোধসম্পন্ন মানুষের কাছে বিষয়টি অস্পষ্ট নয়।

এই পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত আগে স্থির করা হয়েছে, তারপর বিপরীত অভিজ্ঞতাকে বাতিল করা হয়েছে। হাড় অক্ষত পাওয়া গেলে হাদিসের সত্যতা ঘোষণা করা হবে, ক্ষয় হলে অশনাক্ত অবশিষ্টাংশের কথা বলা হবে, আর সেই অংশের প্রমাণ চাইলে বাস্তবতাকেই অগ্রাহ্য করতে বলা হবে। এভাবে বিশ্বাসকে খণ্ডনের বাইরে রাখা যায়; অস্থির ক্ষয়মুক্ততা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ফতোয়ার শেষ নির্দেশও একই পথে চলে: বিশ্বাসীকে নবীর হাদিস বিশ্বাস করতে এবং তার বিরোধী বিষয় উপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এটি অনুসন্ধানের ফল নয়, ধর্মীয় আনুগত্যের বিধান। প্রকৃতির কোনো তথ্যের সঙ্গে বক্তব্যের সংঘাত ঘটলে তথ্যকে সরিয়ে দেওয়ার এই নির্দেশ বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের দাবিকেই ধ্বংস করে।


প্রকাশিত বাংলা অনুবাদ ও মূল নির্দেশের অর্থ

এই ফতোয়ার বাংলা অনুবাদ মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনারের নামে ২০১৯ সালের ১৯ মে প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদের ভেতরে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশটি রয়েছে। সমাপ্তির বাক্যে হাদিসের বিরোধী বিষয় উপেক্ষা করার নির্দেশকে অসংগতির অভিযোগ পাত্তা না দেওয়ার ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকাশিত বাংলা বাক্যটি হলো: [26]

মুমিনদের উচিত নবী(ﷺ) এর হাদিসের উপর ঈমান রাখা এবং এর অসঙ্গতির অভিযোগগুলোকে পাত্তা না দেয়া।

মূল ইংরেজির সমাপ্তির যথাযথ অর্থ হলো: বিশ্বাসীকে নবীর হাদিসগুলো বিশ্বাস করতে এবং সেগুলোর বিরোধী যা কিছু আছে তা উপেক্ষা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলা অনুবাদের শেষ বাক্যে “অভিযোগ” শব্দ যোগ হওয়ায় বক্তব্যের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। মূল নির্দেশের বিষয় কেবল কারও আপত্তি নয়; হাদিসের বিরোধী বিষয়ও তার অন্তর্ভুক্ত। আর মূল ফতোয়ায় উদ্ধৃত ধ্রুপদি ব্যাখ্যা সরাসরিই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতাকে ধর্তব্য না বলেছে। ফলে বিরোধটি নিছক নাস্তিকের অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে একটি প্রকাশিত ধর্মীয় নির্দেশ বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর বর্ণনার কর্তৃত্ব বসিয়েছে। ককসিক্সের অবিনশ্বরতার পক্ষে পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়ে বাস্তবতা উপেক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া বিশ্বাসের অনুশাসনকে প্রকাশ করে; অস্থির কোনো অজানা বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যকে নয়।


ভ্রূণতত্ত্ব ও জেনেটিক্স সংক্রান্ত ভ্রান্তি: ‘জৈবিক বীজ’ তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ

অবিনশ্বর হাড়ের প্রচারকে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষা দিতে ভ্রূণের আদি রেখা, কোষের বহুবিধ টিস্যু তৈরির ক্ষমতা, টেরাটোমা এবং ডিএনএকে এক সূত্রে গেঁথে দেওয়া হয়। অথচ এগুলোর প্রত্যেকটির পরিচয় ও ভূমিকা আলাদা। ভ্রূণ বিকাশে কোনো গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা থেকে সেই গঠন মৃত্যুর পরে ক্ষয়মুক্ত থাকবে—এই সিদ্ধান্ত আসে না। একইভাবে বহু ধরনের টিস্যু তৈরিতে সক্ষম কোষ থাকা থেকে পূর্ণাঙ্গ মৃত মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসবে—এই সিদ্ধান্তও আসে না। বিকাশের ক্ষমতা, অস্থির গঠন, মৃত্যুর পর সংরক্ষণ এবং পুনরুত্থানকে এক ঘটনা ধরে নেওয়ার মধ্যেই যুক্তির প্রথম বড় ভাঙন।


প্রথম সৃষ্টি ককসিক্স: ইসলামওয়েবের প্রকাশিত দাবি

ইসলামওয়েবের ৪২২৫১৫ নম্বর ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ভ্রূণের প্রথম সৃষ্ট অংশ আজব আল-ধানাব এবং তা থেকে হাড় ও অন্য টিস্যু তৈরি হয়। এটি শরীরের বিকাশের ক্রম সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দাবি। ফলে বক্তব্যটি কেবল ভবিষ্যৎ পুনরুত্থানের বিশ্বাসে সীমিত নেই; মাতৃগর্ভে মানুষের দেহ কীভাবে গড়ে ওঠে, সেই প্রশ্নেও উত্তর দিচ্ছে। কিন্তু নিষিক্ত কোষ, তার বিভাজন, ভ্রূণের প্রাথমিক স্তর এবং পরবর্তী অস্থিগঠনের ধারাবাহিকতায় একটি আগে থেকে তৈরি ককসিক্সকে সব টিস্যুর উৎস হিসেবে পাওয়া যায় না। [27]

ومنه تتكون العظام وبقية أنسجته

বাংলা অনুবাদ: তা থেকে হাড় ও তার অন্য টিস্যু গঠিত হয়।

হাড়ের মধ্যে কোষ থাকে—এই সত্য এবং সব কোষ একটি হাড় থেকে তৈরি হয়—এই দাবি এক নয়। মাতৃগর্ভে বিকাশমান ভ্রূণকে আগে একটি ক্ষুদ্র টেলবোন হিসেবে কল্পনা করে সেখান থেকে বাকি দেহ প্রসারিত করার ছবি বাস্তব ভ্রূণতত্ত্বের সঙ্গে মেলে না। প্রাপ্তবয়স্ক অস্থির নামকে ভ্রূণের প্রাথমিক কোনো অঞ্চলের ওপর বসিয়ে দিলেও তাদের গঠনগত অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। এখানে প্রমাণের প্রয়োজন ঠিক সেই সংযোগস্থলে: আদি রেখা কখন একটি নির্দিষ্ট অস্থিতে পরিণত হলো, আর সেই অস্থি কেন মৃত্যুর পর রাসায়নিক পরিবর্তন থেকে মুক্ত হবে? কোনো পরিচিত শব্দের পাশে ধর্মীয় নাম লিখে দেওয়া এই দুই প্রশ্নের উত্তর নয়।


আদি রেখা: ক্ষণস্থায়ী বিকাশগত গঠন

আদি রেখা গঠিত হয় নিষেকের পর তৃতীয় সপ্তাহের বিকাশপর্বে। তারও আগে নিষিক্ত কোষের বিভাজন ও ভ্রূণের প্রাথমিক বিন্যাস ঘটে। আদি রেখা ভ্রূণের কোষের চলাচল ও স্তরবিন্যাসের একটি অঞ্চল; গ্যাস্ট্রুলেশনের মাধ্যমে বহিঃস্তর, মধ্যস্তর ও অন্তঃস্তর গড়ে ওঠে। টাইসার ও সহকর্মীদের মানবভ্রূণ নিয়ে একক-কোষভিত্তিক গবেষণায় এই বিকাশপর্বের বিভিন্ন কোষগোষ্ঠী শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণার ভ্রূণটির বয়স নিষেকের পর আনুমানিক ১৬–১৯ দিন। ভ্রূণের কোষীয় বৈচিত্র্য ও বিকাশের দলিলকে একটি সম্পূর্ণ গঠিত অস্থির বীজতত্ত্বে রূপান্তর করা যায় না। [28]

In humans, gastrulation occurs in the third week after fertilization.

বাংলা অনুবাদ: মানুষের গ্যাস্ট্রুলেশন নিষেকের পর তৃতীয় সপ্তাহে ঘটে।

আদি রেখার কোষ থেকে বিভিন্ন টিস্যুর পূর্বসূরি তৈরি হওয়া মানে সেই রেখাটি অস্থি হয়ে অপরিবর্তিত অবস্থায় শরীরে রয়ে যাওয়া নয়। কোষের বংশধারা এবং একটি অঙ্গের স্থায়ী পরিচয় পৃথক বিষয়। কোনো প্রাথমিক কোষের বংশধর পরে দেহের নানা অংশে পাওয়া গেলে সেই সব অংশকে প্রাথমিক কোষটিরই অপরিবর্তিত অবস্থা বলা যায় না। আদি রেখা সাধারণত পশ্চাদপসরণ করে চতুর্থ সপ্তাহের শেষে বিলুপ্ত হয়; সংশ্লিষ্ট বিকাশগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যে তৈরি কোষ ও টিস্যু নিজেদের পরবর্তী বিকাশ চালায়। এই ক্রমে একটি ককসিক্সকে সমগ্র দেহের পূর্বস্থিত নির্মাণকেন্দ্র ধরে নেওয়া ভ্রূণ বিকাশের ঘটনাক্রম উল্টে দেয়।


টেরাটোমা: টিস্যুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, পুনরুত্থানের বীজ নয়

আদি রেখা ও দেহের অক্ষ গঠন নিয়ে আবাস ও সহকর্মীদের পর্যালোচনায় আদি রেখার বিলোপ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার অবশিষ্ট কোষের সঙ্গে স্যাক্রোককসিজিয়াল টেরাটোমার সম্পর্ক আলোচনা করা হয়েছে। এমন টিউমারে বিভিন্ন ভ্রূণস্তরের টিস্যু থাকতে পারে। এই বহুবিধ টিস্যু গঠনকে অবিনশ্বর হাড়ের প্রমাণ হিসেবে চালালে রোগগত কোষবৃদ্ধি ও স্বাভাবিক দেহগঠন গুলিয়ে ফেলা হয়। কোনো কোষসমষ্টি চুল, তরুণাস্থি বা অন্য টিস্যু তৈরি করতে পারা থেকে মৃত ব্যক্তির পূর্ণ দেহ, স্নায়ুতন্ত্র ও ব্যক্তিগত স্মৃতি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত আসে না। [29]

In most cases, the primitive streak vanishes completely.

বাংলা অনুবাদ: অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদি রেখা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়।

টেরাটোমাকে সরাসরি ক্যানসার বলাও ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের সংজ্ঞায় পরিণত টেরাটোমা অ-ক্যানসারজনিত টিউমার; এতে বিভিন্ন ধরনের টিস্যু থাকতে পারে এবং অপসারণের পরও কখনো ফিরে আসতে পারে। টেরাটোমার ধরন ও অবস্থাভেদে তার প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। টিউমারটির অস্তিত্ব যে বিষয়টি দেখায় তা হলো, কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে একাধিক টিস্যু তৈরি করতে পারে। এটি ককসিক্সের খনিজ বা কোলাজেন ক্ষয় হয় না—এমন কোনো পরীক্ষা নয়; দেহের মৃত্যুর পর ওই কোষ অমর থাকে—এমন পরীক্ষাও নয়। [30]

They are benign (not cancer) but may come back after being removed by surgery.

বাংলা অনুবাদ: এগুলো বিনাইন—ক্যানসার নয়—তবে অস্ত্রোপচারে সরানোর পর আবার দেখা দিতে পারে।


নামহীন চীনা বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা: প্রকাশিত গবেষণা কোথায়?

ইসলামওয়েবের ২০০৩ সালের একটি লেখায় আদি রেখার সঙ্গে ককসিক্সের পরিচয় মিলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দাবি করা হয়েছে, চীনের একদল বিজ্ঞানী শক্তিশালী অম্ল, আগুন, পেষণ ও বিকিরণ প্রয়োগ করেও সংশ্লিষ্ট অংশ ধ্বংস করতে পারেননি। অথচ লেখাটিতে বিজ্ঞানীদের নাম, গবেষণাপত্রের শিরোনাম, সাময়িকী, পরীক্ষাগারের পরিচয় কিংবা পরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি। নমুনাটি কী ছিল, কোন অম্ল কত ঘনত্বে ব্যবহার করা হয়েছিল, কত তাপমাত্রায় কতক্ষণ উত্তপ্ত করা হয়েছিল এবং কোন পরীক্ষায় অপরিবর্তিত থাকা নির্ধারিত হয়েছিল—এসব তথ্যও অনুপস্থিত। [31]

مجموعة من علماء الصين

বাংলা অনুবাদ: চীনের একদল বিজ্ঞানী।

দাবির এই বিবরণে “বিজ্ঞানী” শব্দটি আছে, যাচাইযোগ্য গবেষণা নেই। আগুনে পোড়ানোর পরে খনিজ অবশিষ্ট থাকা এবং আগের হাড় অক্ষত থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন ফল। অম্ল প্রয়োগের পর কোনো অবশিষ্টাংশ থাকা থেকেও মূল জৈব-খনিজ কাঠামো অপরিবর্তিত থাকার সিদ্ধান্ত আসে না। আর পেষণ করে গুঁড়া তৈরি হওয়া অস্থির স্থূল কাঠামো ভেঙে যাওয়ারই ঘটনা। পরীক্ষার শুরুতে কী ছিল এবং শেষে কী পাওয়া গেল, সেই তুলনা ছাড়াই সব ফলকে “ধ্বংস হয়নি” বলা শব্দের খেলা। এই নামহীন গবেষণার গল্প আধুনিক পরীক্ষার মর্যাদা দাবি করে, অথচ আধুনিক গবেষণা যাচাইয়ের মৌলিক তথ্যগুলোই সরবরাহ করে না।


ডিএনএ-র ক্ষয়: ৫২১ বছরের সংখ্যাটির প্রকৃত অর্থ

ডিএনএ-র স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে বহুল উদ্ধৃত ৫২১ বছরের অর্ধায়ু একটি নির্দিষ্ট গবেষণার ফল। অ্যালেনটফট ও সহকর্মীরা নিউজিল্যান্ডের বিলুপ্ত মোয়া পাখির ১৫৮টি তারিখনির্ধারিত অস্থির নমুনা বিশ্লেষণ করেন। নির্দিষ্ট সমাধি-পরিবেশে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-র ২৪২ বেস-জোড়া দীর্ঘ একটি খণ্ডের ভাঙনের মডেল থেকে এই অর্ধায়ু নির্ণীত হয়; কার্যকর সমাধি-তাপমাত্রা হিসাব করা হয়েছিল ১৩.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গবেষণাটি Proceedings of the Royal Society B-তে প্রকাশিত, Nature-এ নয়। সংখ্যাটিকে সমস্ত পরিবেশে সব ধরনের ডিএনএ-র সর্বজনীন মেয়াদ হিসেবে ব্যবহার করা ভুল। [32]

a molecular half-life of 521 years

বাংলা অনুবাদ: ৫২১ বছরের একটি আণবিক অর্ধায়ু।

অর্ধায়ু বলতে ওই মডেলের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের অক্ষত খণ্ডের পরিমাণ অর্ধেকে নামার সময় বোঝানো হয়েছে। তার মানে নির্দিষ্ট বছর পেরোলেই সব ডিএনএ এবং তার প্রতিটি তথ্য একযোগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, এমন নয়। তাপমাত্রা, পানি, রাসায়নিক পরিবেশ ও খণ্ডের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সংরক্ষণের সম্ভাবনা বদলায়। কিন্তু এই ভিন্নতাকে কাজে লাগিয়ে ডিএনএ অবিনশ্বর বলাও চলে না। খণ্ডিত ও রাসায়নিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অণু থেকে কিছু তথ্য উদ্ধার করা, সম্পূর্ণ অক্ষত জিনসমষ্টি পাওয়া এবং পুনরায় বিকাশে সক্ষম জীবন্ত কোষ পাওয়া—তিনটি আলাদা ফল। অস্থিতে কিছু জিনগত তথ্য টিকে থাকলেই সে অস্থি জীবন্ত বীজে পরিণত হয় না।


দশ লক্ষ বছরের প্রাচীন ডিএনএও অমর কোষের প্রমাণ নয়

২০২১ সালে ভ্যান ডার ভাল্ক ও সহকর্মীরা প্রাচীন ম্যামথের তিনটি নমুনা থেকে জিনসমষ্টিজুড়ে তথ্য উদ্ধারের গবেষণা প্রকাশ করেন; দুটি নমুনার বয়স দশ লক্ষ বছরের বেশি। প্রাচীন ডিএনএ-র ভাঙা খণ্ড বিশ্লেষণ করে জিনগত ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়েছে। ফলে কয়েক হাজার বছর পর কোনো অর্থপূর্ণ জিনগত তথ্য উদ্ধার করাই অসম্ভব—এমন নিরঙ্কুশ দাবি তথ্যগতভাবে ভুল। এই গবেষণা একই সঙ্গে প্রাচীন তথ্য উদ্ধারের প্রকৃতি স্পষ্ট করে: গবেষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত অণুর খণ্ড থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করছেন, অক্ষত জীবন্ত ম্যামথের কোষ উদ্ধার করে স্বতঃস্ফূর্ত পুনর্জন্ম দেখাচ্ছেন না। [33]

the recovery of genome-wide data

বাংলা অনুবাদ: জিনসমষ্টিজুড়ে তথ্য উদ্ধার।

ককসিক্সকে জৈবিক বীজ বলার জন্য অস্থির মধ্যে সামান্য পদার্থ বা কিছু আণবিক তথ্য রয়ে যাওয়ার কথা যথেষ্ট নয়। বীজের মতো জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার দাবি করলে কার্যকর কোষ, উপযুক্ত জিনগত তথ্য এবং সংগঠিত বিকাশের ব্যবস্থা দেখাতে হয়। একটি মৃত অস্থিখণ্ড নিজে থেকে এই শর্তগুলো পূরণ করে না। ব্যক্তির জিনগত তথ্য দেহের বহু কোষে থাকে; সেই তথ্য থাকা ককসিক্সের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্যও নয়। অতএব ডিএনএ-র নাম উল্লেখ করে বিশেষ একটি অস্থিকে পুনরুত্থানের অনন্য ভিত্তি ঘোষণা করলে তার স্বাতন্ত্র্যই প্রতিষ্ঠিত হয় না। আর অশনাক্ত কোনো কণার মধ্যে সব ব্যবস্থা অলৌকিকভাবে নিহিত আছে বললে সেটি নতুন ধর্মীয় ঘোষণা হয়; জীববিজ্ঞানের প্রমাণ হয় না।

যে বিষয়টি দেখানো হচ্ছেবাস্তবে তার অর্থযে সিদ্ধান্তটি অনুসরণ করে না
কোনো অস্থি দীর্ঘকাল টিকে থাকানির্দিষ্ট পরিবেশে তার কিছু কাঠামো বা উপাদান সংরক্ষিত হয়েছে।অস্থিটি কোনো অবস্থাতেই ক্ষয় হয় না।
জীবাশ্মের আকৃতি সংরক্ষিত থাকাখনিজে ছিদ্রপূরণ বা প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আকৃতি টিকে থাকতে পারে।মূল জৈব কাঠামো সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত আছে।
আদি রেখা থেকে টিস্যুর পূর্বসূরি গঠনভ্রূণের একটি বিকাশপর্বে কোষের চলাচল ও স্তরবিন্যাস ঘটেছে।একটি পূর্বস্থিত ককসিক্স থেকে সমগ্র ভ্রূণ তৈরি হয়েছে।
টেরাটোমায় বিভিন্ন ধরনের টিস্যু থাকাঅস্বাভাবিক কোষবৃদ্ধিতে বহুবিধ টিস্যু গঠিত হতে পারে।মৃত ব্যক্তির দেহ ও ব্যক্তিসত্তা পুনর্গঠিত হয়েছে।
প্রাচীন ডিএনএ থেকে তথ্য উদ্ধারসংরক্ষিত আণবিক খণ্ডের ভিত্তিতে জিনগত বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে।পূর্ণ জিনসমষ্টি ও জীবন্ত কোষ অবিকৃত আছে।
হাড় পুড়িয়ে খনিজ অবশিষ্ট পাওয়াদহনের পরে কিছু অজৈব উপাদান রয়ে গেছে।হাড়ের আগের কাঠামো ও জৈব উপাদান অক্ষত আছে।
মাটিতে অশনাক্ত ক্ষুদ্র অংশের অস্তিত্ব ঘোষণাপরীক্ষায় পৃথক করা হয়নি এমন অবশিষ্টাংশ অনুমান করা হয়েছে।অবিনশ্বর অস্থির উপস্থিতি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

উপসংহার: অবিনশ্বরতার অবসান ও যুক্তিবাদের জয়

আজব আল-ধানাবের ক্ষয়মুক্ততার দাবি একটি পরিচিত দেহাংশের ওপর অলৌকিক বৈশিষ্ট্য আরোপ করে। ককসিক্সের বাস্তব গঠন, অস্থির খনিজ ও জৈব উপাদানের পরিবর্তন, মৃতদেহের সংরক্ষণ এবং ভ্রূণ বিকাশের পর্যায়—কোনোটিই ওই অস্থিকে চিরস্থায়ী বীজের মর্যাদা দেয় না। দীর্ঘকাল টিকে থাকা কোনো হাড়, জীবাশ্ম কিংবা প্রাচীন ডিএনএ-র খণ্ডকে দেখিয়ে অপরিবর্তিত ও অবিনশ্বর ককসিক্সের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিগত লাফ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংরক্ষণের শর্ত ও পরিবর্তনের প্রকৃতি রয়েছে; হাদিসে ঘোষিত ব্যতিক্রমী ক্ষয়মুক্ততার পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ নেই।

অবিনশ্বর অস্থি থেকে দেহ ফিরে পাওয়ার কল্পনা ইসলামি বর্ণনার আগেও রাব্বিনিক সাহিত্যে পাওয়া যায়। সেখানে পেষণ, আগুন ও পানির মুখেও অক্ষত থাকার গল্প দিয়ে লুজ অস্থির বিশেষত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরবর্তী ধর্মীয় প্রচারে অম্ল, বিকিরণ ও নামহীন বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা যুক্ত হয়েছে। পরীক্ষার ভাষা বদলেছে; দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য যাচাইযোগ্য নমুনা ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য ফলের প্রয়োজন পূরণ হয়নি। প্রাচীন আখ্যানের পরীক্ষার গল্পকে আধুনিক পরীক্ষাগারের গল্পে সাজিয়ে দিলে বিজ্ঞান জন্মায় না।

ভ্রূণের আদি রেখাকে প্রাপ্তবয়স্ক ককসিক্সের সঙ্গে এক করে দেখা, টিউমারের টিস্যুবৃদ্ধিকে পুনরুত্থানের ক্ষমতা বলা এবং প্রাচীন ডিএনএ-র তথ্য উদ্ধারকে অমর জৈব বীজের সাক্ষ্য বানানো—এসব বিজ্ঞানের অপব্যবহার। বৈজ্ঞানিক শব্দের উপস্থিতি বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিক করে না। কোন বস্তু নিয়ে পরীক্ষা হয়েছে, কী পরিবর্তন ঘটেছে এবং ফল থেকে কতটুকু সিদ্ধান্ত আসে—এই সম্পর্ক ভাঙলে গবেষণার বদলে প্রচার তৈরি হয়। টেলবোনের কথিত অবিনশ্বরতার পক্ষে উপস্থাপিত এসব যুক্তিতে সেই ভাঙন স্পষ্ট।

ইসলামওয়েবের ফতোয়ায় সংঘাতের নিষ্পত্তি আরও সরাসরি: হাদিসের পক্ষে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতা অগ্রাহ্য করতে বলা হয়েছে। এখানে আনুগত্যকে তথ্যের ওপরে বসানো হয়েছে। দৃশ্যমান অস্থি ক্ষয় হওয়ার পর অশনাক্ত কণার আশ্রয় নেওয়া এবং সেই কণা দেখানো না গেলেও বিশ্বাস বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া দাবিটিকে যাচাইয়ের বাইরে সরিয়ে রাখে। যে পদ্ধতি বিপরীত ফলকে আগেই বাতিল করে, তার সাহায্যে যেকোনো কল্পনাকেই অক্ষত রাখা সম্ভব। তার মাধ্যমে প্রকৃতির কোনো নতুন সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।

ধর্মীয় কর্তৃত্ব কোনো অস্থির রাসায়নিক গঠন বদলায় না। ককসিক্সকে পবিত্র নাম দেওয়া, তার সঙ্গে পুনরুত্থানের প্রতিশ্রুতি জুড়ে দেওয়া কিংবা সমালোচনাকে উপেক্ষার নির্দেশ দেওয়া তার ক্ষয়মুক্ততার প্রমাণ নয়। অবিনশ্বর হাড়ের প্রচলিত দাবি প্রমাণহীন; তাকে আধুনিক বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর। বস্তুর বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হবে সেই বস্তুর পরীক্ষালব্ধ তথ্য দিয়ে। প্রাচীন আখ্যান ও বিশ্বাসের অনুশাসন সেই তথ্যের বিকল্প নয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. বেরেশিত রাব্বা, ২৮:৩ ↩︎
  2. সেফারিয়ার গ্রন্থপরিচিতি: সংকলনকাল ও উৎসের বিবরণ ↩︎
  3. বেরেশিত রাব্বা, ২৮:৩—হাদ্রিয়ান ও রাব্বি ইয়েহোশুয়া বেন হানানিয়ার সংলাপ ↩︎
  4. নিশান ডেভিড দুবভ, পুনরুত্থান কোন পদ্ধতিতে ঘটবে?, নবম অধ্যায় ↩︎
  5. কেস্টেনবমের পাণ্ডুলিপি-বিবরণ: মিদরাশ হা-গাদোল, ডেভিড আদানি ↩︎
  6. সেফারিয়া: কাব্বালা গ্রন্থতালিকা, যোহারের পরিচিতি ↩︎
  7. সহিহ মুসলিম, ২৯৫৫খ—উভয় শিঙ্গাধ্বনির মধ্যবর্তী সময়সংক্রান্ত অধ্যায় ↩︎
  8. সহীহ মুসলিম, হাঃ একাডেমী, হাদিসঃ ৭৩০৬ ↩︎
  9. সহিহ মুসলিম শরীফ, মাকতাবাতুল হাদীছ প্রকাশনী, ২১ ও ২২ তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৫২ 1 2
  10. তাফসীরে মাযহারী, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৪৭২ 1 2
  11. সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদিসঃ ৩১২৮ ↩︎
  12. সহিহ মুসলিম, ২৯৫৫গ ↩︎
  13. সহীহ মুসলিম, হাঃ একাডেমী, ৭৩০৬ ↩︎
  14. ইসলামওয়েব, ফতোয়া ৩৮৩৮৭: আজব আল-ধানাবের পরিচয়; নববীর ব্যাখ্যা থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  15. ইসলামকিউএ, প্রশ্ন ৩২১২১৩; ইবন আবদিল বার, আত-তামহিদ, ১৮/১৭৪ থেকে উদ্ধৃতি ↩︎
  16. সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদিসবিডি, ৩১২৮ ↩︎
  17. সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদিসবিডি, ৩১২৯ ↩︎
  18. কলিন্স ও সহলেখক, The Survival of Organic Matter in Bone: A Review, Archaeometry, ৪৪(৩), ২০০২, পৃষ্ঠা ৩৮৩–৩৯৪ ↩︎
  19. উন ও সহলেখক, CT Morphology and Morphometry of the Normal Adult Coccyx, European Spine Journal, ২২, ২০১৩, পৃষ্ঠা ৮৬৩–৮৭০ ↩︎
  20. ফালগাইরাক ও সহলেখক, Bone Molecular Modifications Induced by Diagenesis Followed-Up for 12 Months, Biology, ১১(১০), ২০২২, ১৫৪২ ↩︎
  21. ইয়ান্স ও সহলেখক, Characterisation of Microbial Attack on Archaeological Bone, Journal of Archaeological Science, ৩১(১), ২০০৪, পৃষ্ঠা ৮৭–৯৫ ↩︎
  22. Willey, Galloway & Snyder, ১৯৯৭: Bone mineral density and survival of elements and element portions in the bones of the Crow Creek massacre victims ↩︎
  23. National Park Service: Permineralization and Replacement ↩︎
  24. Islamweb, ফতোয়া ২৮০৬২৭: The decomposition of the coccyx bone, ১৭ এপ্রিল ২০১৫ ↩︎
  25. Islamweb, ফতোয়া ৪৬০৭৯২: মিরকাতুল মাফাতিহ থেকে আলী আল-কারীর বক্তব্য ↩︎
  26. ইসলামবিরোধীদের জবাব: “পশ্চাদ্দেশের হাড় (Coccyx / Tailbone) ব্যতিত গোটা মানবদেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে” — এই হাদিসের ব্যাখ্যা ↩︎
  27. Islamweb, ফতোয়া ৪২২৫১৫: আজব আল-ধানাব থেকে ভ্রূণের হাড় ও টিস্যু গঠনের দাবি ↩︎
  28. Tyser et al., Nature, ২০২১: Single-cell transcriptomic characterization of a gastrulating human embryo ↩︎
  29. Abas et al., ২০২২: Gastrulation and Body Axes Formation: A Molecular Concept and Its Clinical Correlates ↩︎
  30. National Cancer Institute, SEER Glossary: Mature teratoma ↩︎
  31. Islamweb, ২৬ জুলাই ২০০৩: আজব আল-ধানাব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার দাবি ↩︎
  32. Allentoft et al., ২০১২: The half-life of DNA in bone: measuring decay kinetics in 158 dated fossils ↩︎
  33. van der Valk et al., Nature, ২০২১: Million-year-old DNA sheds light on the genomic history of mammoths ↩︎

About This Article

Genre: Hadith Criticism, Anatomy, Forensic Taphonomy, Archaeology, Embryology, and Scientific Review of Resurrection-Related Bone Myths

Epistemic Position: Scientific Skepticism, Secular Humanism, Evidence-Based Biology, Forensic Science, Archaeological Reasoning, Embryological Accuracy, and Anti-Pseudoscientific Critique

This article examines the Islamic claim that a specific bone at the end of the human spine remains indestructible and will serve as the basis for bodily resurrection.

The central argument is that the tailbone or coccyx is not biologically immortal; like every other organic structure, it is subject to decomposition, microbial activity, chemical erosion, diagenesis, fragmentation, and environmental decay.

The article also compares the Islamic “ajb al-dhanab” claim with earlier Jewish “Luz bone” traditions, archaeological evidence, bone chemistry, fossilization, primitive-streak apologetics, DNA degradation, and modern embryology.

This article should be evaluated through anatomy, forensic archaeology, taphonomy, biochemistry, embryology, genetics, and falsifiable evidence—not through resurrection mythology, inherited religious fear, apologetic misuse of embryology, devotional certainty, or the demand that pre-scientific afterlife claims be protected from scientific scrutiny.

Leave a comment

Your email will not be published.