নবী মুহাম্মদের পেশাঃ হিজরত উত্তর পেশা ছিল ডাকাতি

ভূমিকা: “জীবিকা” প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

নবী মুহাম্মদের জীবনকে “আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব” হিসেবে দেখা হয়—এটি একদিকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিষয়, অন্যদিকে একটি ঐতিহাসিক-সামাজিক বাস্তবতাও। যেকোনো ঐতিহাসিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: নেতৃত্ব, পরিবার, অনুসারী-ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন চালাতে অর্থনৈতিক ভিত্তি কী ছিল? বিশেষ করে হিজরতের (মক্কা থেকে মদিনায় স্থানান্তর) আগে ও পরে মুহাম্মদের সামাজিক অবস্থান ও আয়ের সম্ভাব্য উৎস কীভাবে বদলেছে—এটি বিশ্লেষণ করলে “ধর্মীয় দাবির” পাশাপাশি “প্রাত্যহিক জীবন-ব্যবস্থাপনা”ও স্পষ্ট হয়।

এই লেখাটি সেই অর্থনৈতিক ভিত্তিটিকে দুই পর্যায়ে—(ক) হিজরতের আগে, (খ) হিজরতের পরে—ভাগ করে দেখবে। এখানে কোরআনের “বিনা পারিশ্রমিকে বার্তা পৌঁছানো”র ভাষ্য এবং একই সঙ্গে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত/ফাই) ও খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) সংক্রান্ত বিধান—দুই ধরনের পাঠ্যকে পাশাপাশি রেখে একটি কাঠামোগত ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হবে।

একজন সাধারণ মানুষের একটি নির্দিষ্ট পেশা থাকে, কেউ কৃষক, কেউ নাপিত, কেউ পোশাক বানায়, কেউবা ব্যবসা করে। যারা যেই পেশায় যুক্ত, যার যেমন যোগ্যতা ও মেধা, সেই পেশা দিয়েই সমাজের অন্য মানুষদের নানা ধরণের উপকার করে, বিনিময়ে তারাও খেয়েপড়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু নবীর সেরকম কোন যোগ্যতা বা মেধা আসলে ছিল না। মদিনার লোকজন হয়তো সামান্য কিছু হাদিয়া দিতো, সেটি দিয়ে তো এত বিশাল পরিবারের চলবে না। তাই নবীর আয়ের প্রধান উৎস ছিল কাফেরদের আক্রমণ করে তাদের মালামাল লুট করে তার থেকে ভাগ নেয়া। অনেক মুমিনই আজকাল বলার চেষ্টা করেন, নবী খুবই দরিদ্র ছিল, এমনকি দুই বেলা খেতেও পেতেন না। প্রশ্ন হচ্ছে, এত দরিদ্র নবী তাহলে গণ্ডায় গণ্ডায় বিয়ে করতেন, দাসীও রাখতেন, হেরেমে রক্ষিতা ভর্তি করতেন, এত নারীর ভরণপোষণ চালাবার জন্য অর্থ কী আসমান থেকে নাজিল হতো? আসমান থেকে জিবরাইলের মাধ্যমে সেই খরচ নাজিল না হলে, নিশ্চিতভাবেই নবীর আয়ের প্রধান উৎস ছিল কাফেরদের কতল করে তাদের বিষয় সম্পত্তি লুটের মাল থেকে খুমুসের অংশ। সেই বিষয়টিই এখানে আমরা খতিয়ে দেখবো।


হিজরত পূর্ব – মক্কা পর্বঃ সীমিত আয়ের বাস্তবতা

মক্কা পর্বে মুহাম্মদের “নিজস্ব নিয়মিত পেশা/আয়ের ধারা” বিষয়ে ইসলামী হাদিস-সাহিত্যে সরাসরি একটি তথ্য আছে: তিনি মক্কার লোকদের ভেড়া চরিয়েছেন “কিছু কিরাত” মজুরির বিনিময়ে—অর্থাৎ রাখাল হিসেবে শ্রম দিয়ে উপার্জনের উল্লেখ পাওয়া যায়। [1]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৩৭/ ইজারা
পরিচ্ছেদঃ ৩৭/২. কয়েক কিরাআতের বদলে ছাগল-ভেড়া চরানো।
২২৬২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি, যিনি বকরী না চরিয়েছেন। তখন তাঁর সাহাবীগণ বলেন, আপনিও? তিনি বলেন, হ্যাঁ; আমি কয়েক কীরাতের (মুদ্রা) বিনিময়ে মক্কা্বাসীদের ছাগল চরাতাম। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১০২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২১১৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এছাড়া খাদিজার ব্যবসায়িক কাঠামো ও বিয়ের আগের সম্পর্ককে অনেক ঐতিহাসিক উৎস “ব্যবসায়িক এজেন্ট/কারাভান পরিচালনা” হিসেবে বর্ণনা করেঃ খাদিজা ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী, এবং তিনি তরুণ মুহাম্মদকে সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন—এর পরেই তাদের বিবাহের ঘটনা উল্লেখিত। এই বর্ণনা আধুনিক বিশ্বকোষীয় সারসংক্ষেপেও আছে। কোরআনের একটি আয়াতে মুহাম্মদের পূর্বাবস্থাকে “অভাবগ্রস্ত/নিঃস্ব” হিসেবে উল্লেখ করে পরে “অভাবমুক্ত” হওয়ার কথা বলা হয়েছে। [2]

তিনি তোমাকে পেলেন নিঃস্ব, অতঃপর করলেন অভাবমুক্ত।
— Taisirul Quran
তিনি তোমাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাবমুক্ত করলেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব। অতঃপর তিনি সমৃদ্ধ করেছেন।
— Rawai Al-bayan
আর তিনি আপনাকে পেলেন নিঃস্ব অবস্থায়, অতঃপর অভাব মুক্ত করলেন [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

এই পর্যায়ে সারসংক্ষেপ দাঁড়ায়: (১) শ্রমভিত্তিক সীমিত উপার্জনের উল্লেখ, (২) খাদিজার ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে আয়/সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, (৩) কোরআনিক ভাষ্যে আর্থিক সংকট থেকে “অভাবমুক্ত” হওয়ার ইঙ্গিত—এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে মক্কা পর্বে “বৃহৎ পরিবারের স্থায়ী ব্যয় বহনের মতো” স্বাধীন-স্থায়ী আয়ের একটি শক্ত কাঠামো দেখা যায় না; বরং আয়ের ধারা ছিল ব্যক্তিগত শ্রম/কমিশন/পারিবারিক সহায়তা-নির্ভর।

অর্থাৎ, নবী মুহাম্মদ প্রাথমিক জীবনে ছিলেন নিঃস্ব, যিনি ভেড়া আর উট চড়াতেন। তার নির্দিষ্ট কোন সম্মানজনক পেশাও ছিল না, তিনি ছাগল চড়াবার বিনিময়ে খুব অল্প উপার্জন করতেন। সেই আমলে আরব দেশের একজন রাখালের আয় রোজগার হওয়ার কথা অতি সামান্য, শুধুমাত্র পেট চালাবার মত। মক্কার ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী খাদিজা যখন তাকে চাকরি দেয় এবং বিবাহ করেন, তখন তার সৌভাগ্যের সূচনা হয়। অর্থাৎ খাদিজার পৈত্রিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত এবং ব্যবসায়ে উপার্জিত সম্পদে ধনী হয়ে যায় নবী মুহাম্মদ।

মুহাম্মদের নবীগিরির শুরুতে কিন্তু তিনি কোন পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করছিলেন। পরবর্তী সময়ে যখন বেশকিছু গনিমতের মাল পাওয়া গেল, তখনই মুহাম্মদ গনিমতের মালের থেকে এক পঞ্চমাংশ দাবী করতে শুরু করলেন, এবং এই বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশনাও নাজিল হয়ে গেল। আসুন দেখি, কোরআনেই বলা ছিল, নবী বিনা পারিশ্রমিকে নবীগিরি করছে কিনা। আল্লাহর বানী প্রচারের জন্য অর্থাৎ নবীগিরির জন্য কোন পারিশ্রমিক রয়েছে কিনা [3], যা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধলব্ধ মালের এক পঞ্চমাংশ ভাগ নেয়াতে পরিবর্তিত হবে।

ওরা হল তারা যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেছিলেন, তুমি তাদের পথ অনুসরণ কর; বল, এর জন্য (অর্থাৎ বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য) আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। এটা সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য উপদেশ বাণী।
— Taisirul Quran
এরা হচ্ছে ওরাই, যাদেরকে আল্লাহ সুপথ প্রদর্শন করেছিলেন। সুতরাং তুমি তাদের পথ অনুসরণ করে চল। তুমি বলে দাওঃ আমি কুরআন ও দীনের তাবলীগের বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাইনা। এই কুরআন সমগ্র জগতবাসীর জন্য উপদেশের ভান্ডার ছাড়া কিছুই নয়।
— Sheikh Mujibur Rahman
এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত করেছেন। অতএব তাদের হিদায়াত তুমি অনুসরণ কর। বল, ‘আমি তোমাদের কাছে এর উপর কোন বিনিময় চাই না। এটা তো সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশমাত্র।
— Rawai Al-bayan
এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ্‌ হিদায়াত করেছেন, কাজেই আপনি তাদের পথের অনুসরণ করুন [১]। বলুন, ‘এর জন্য আমি তোমাদের কাছে পারিশ্রমিক চাই না, এ তো শুধু সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশ [২]।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


হিজরত পরবর্তী – মদিনা পর্বঃ গনিমতের মালের অবাধ প্রবাহ

হিজরতের পর মদিনায় মুহাম্মদের নেতৃত্ব শুধু “ধর্মীয় প্রচারক” অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তিনি কার্যত একটি রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কেন্দ্রের প্রধান হয়ে ওঠেন। এই পর্যায়ে সম্পদের প্রধান প্রবাহ যে যুদ্ধ/অভিযান/সংঘাত-সম্পর্কিত ঘটনাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—কোরআনের আনফাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) অধ্যায় ও সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। [4]

তারা তোমাকে যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। বল, ‘যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের; কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর নিজেদের সম্পর্ককে সুষ্ঠু সুন্দর ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কর। তোমরা যদি মু’মিন হয়ে থাক তবে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর।’
— Taisirul Quran
হে নাবী! লোকেরা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। তুমি বলঃ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য। অতএব তোমরা এ ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সঠিক রূপে গড়ে নাও, আর যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাক তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
লোকেরা তোমাকে গনীমতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বল, গনীমতের মাল আল্লাহ ও রাসূলের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং পরস্পরের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।
— Rawai Al-bayan
লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে [১] আনফাল [২] (যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ) সম্বদ্ধে। বলুন, ‘যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ্‌ এবং রাসূলের [৩]; সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌র তাকওয়া অবলম্বন কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর আর আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

একই সঙ্গে খুমুস বা এক-পঞ্চমাংশের বিধান আসে: “যুদ্ধে যা কিছু গনীমত হিসেবে পাওয়া যায় তার এক-পঞ্চমাংশ”—আল্লাহ/রসূল/নিকটাত্মীয়/ইয়াতীম/অভাবগ্রস্ত/মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। [5]

তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে যা তোমরা লাভ কর তার এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রসূল, রসূলের আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য যদি তোমরা আল্লাহর উপর আর চূড়ান্ত ফায়সালার দিন অর্থাৎ দু’পক্ষের (মুসলমান ও কাফের বাহিনীর) মিলিত হওয়ার দিন আমি যা আমার বান্দাহর উপর অবতীর্ণ করেছিলাম তার উপর বিশ্বাস করে থাক। আর আল্লাহ হলেন সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।
— Taisirul Quran
আর তোমরা জেনে রেখ যে, যুদ্ধে তোমরা যা কিছু গাণীমাতের মাল লাভ করেছ ওর এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ, তাঁর রাসূল, (রাসূলের) নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন এবং মূসাফিরের জন্য – যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং যা আমি অবতীর্ণ করেছি আমার বান্দার উপর সেই চুড়ান্ত ফাইসালার দিন, যেদিন দু‘দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তোমরা জেনে রাখ, তোমরা যা কিছু গনীমতরূপে পেয়েছ, নিশ্চয় আল্লাহর জন্যই তার এক পঞ্চমাংশ ও রাসূলের জন্য, নিকট আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরের জন্য, যদি তোমরা ঈমান এনে থাক আল্লাহর প্রতি এবং হক ও বাতিলের ফয়সালার দিন আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি তার প্রতি, যেদিন* দু’টি দল মুখোমুখি হয়েছে, আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। * অর্থাৎ বদর যুদ্ধের দিন।
— Rawai Al-bayan
আর জেনে রাখ, যুদ্ধে যা তোমরা গনীমত হিসেবে লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চামাংশ আল্লাহ্‌র [১], রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং সফরকারীদের [২] যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহ্‌তে এবং তাতে যা মীমাংসার দিন আমরা আমাদের বান্দার প্রতি নাযিল করেছিলাম [৩], যে দিন দু দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল। আর আল্লাহ্‌ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

হাদিসেও একটি খুব সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়—“আমার জীবিকা রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে”—এবং অবাধ্যদের জন্য অপমান/জিজিয়া প্রসঙ্গও একই বর্ণনায় থাকে। [6]

হাদীস সম্ভার
২০/ (আল্লাহর পথে) জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ জিহাদ ওয়াজেব এবং তাতে সকাল-সন্ধ্যার মাহাত্ম্য
(১৯০০) ইবনে উমার (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি (কিয়ামতের পূর্বে) তরবারি-সহ প্রেরিত হয়েছি, যাতে শরীকবিহীনভাবে আল্লাহর ইবাদত হয়। আমার জীবিকা রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে। অপমান ও লাঞ্ছনা রাখা হয়েছে আমার আদেশের বিরোধীদের জন্য। আর যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত।
(আহমাদ ৫১১৪-৫১১৫, ৫৬৬৭, শুআবুল ঈমান ৯৮, সহীহুল জামে’ ২৮৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

আরেকটি বিখ্যাত বর্ণনা: “জান্নাত তরবারির ছায়াতলে”—যা অন্তত যুদ্ধকে ধর্মীয় পুরস্কারের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে [7]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার ব্যবহার
পরিচ্ছদঃ ৫৬/২২. জান্নাত হল তলোয়ারের ঝলকানির তলে।
মুগীরাহ ইবনু শু‘বা (রাঃ) বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের জানিয়েছেন, আমাদের ও প্রতিপালকের পয়গাম। আমাদের মধ্যে যে শহীদ হলো সে জান্নাতে পৌঁছে গেল।
‘উমার (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলেন, আমাদের শহীদগণ জান্নাতবাসী আর তাদের নিহতরা কি জাহান্নামবাসী নয়? আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, হ্যাঁ।
২৮১৮. ‘উমার ইবনু ‘উবায়দুল্লাহ্ (রহ.)-এর আযাদকৃত গোলাম ও তার কাতিব সালিম আবূন নাযর (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) তাঁকে লিখেছিলেন যে,আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা জেনে রাখ, তরবারির ছায়া-তলেই জান্নাত।
উয়াইসী (রহ.) ইবনু আবূ যিনাদ (রহ.)-এর মাধ্যমে মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রহ.) থেকে হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে মু‘আবিয়াহ ইবনু ‘আমর (রহ.) আবূ ইসহাক (রহ.)-এর মাধ্যমে মূসা ইবনু ‘উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসের অনুসরণ করেছেন। (২৮৩৩, ২৯৬৬, ৩০২৪, ৭২৩৭) (মুসলিম ৩২/৬ হাঃ ১৭৪২, আহমাদ ১৯১৩৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৬০৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৬২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

উল্লেখ্য, সূরা আনফাল শব্দটির অর্থই হচ্ছে, যুদ্ধে লুট করা মাল। এই লুটের মাল নামক সূরাতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, লুটের মালের এক পঞ্চমাংশ নেবে নবী মুহাম্মদ। [8]

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৭/ খুমুস (এক পঞ্চমাংশ)
পরিচ্ছেদঃ ৫৭/৭. আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘নিশ্চয় এক পঞ্চমাংশ আল্লাহর ও রসূলের’’ (আনফাল ৪১)। তা বণ্টনের অধিকার রসূলেরই। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি বণ্টনকারী ও সংরক্ষণকারী আর আল্লাহ তা‘আলাই প্রদান করেন।
৩১১৭. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি তোমাদের দানও করি না এবং তোমাদের বঞ্চিতও করি না। আমি তো মাত্র বণ্টনকারী, যেভাবে নির্দেশিত হই, সেভাবে ব্যয় করি।’ (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৮৮৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২৮৯৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

গনিমতের মাল হিসেবে নবী মুহাম্মদ কাফেরদের থেকে কী পরিমাণ লুটপাট করতেন, তার একটি নমুনা হিসেবে একটি হিসেব উল্লেখ করছি। পাঠক লক্ষ্য করুন, একটি যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমতের মালের পরিমাণ কী হতে পারে। উল্লেখ্য, এরকম যুদ্ধ নবী অনেকগুলো চালিয়েছেন। [9]

পেশা 1

কোরআনে “ফাই” সম্পর্কিত আয়াতে বলা হয়—এই সম্পদের জন্য “ঘোড়া/উট দৌড়াতে হয়নি” (অর্থাৎ সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের বাইরে অর্জিত সম্পদ), তবুও তা রসূলের অধীনে আসে [10]

আল্লাহ তাঁর রসূলকে তাদের কাছ থেকে যে ফায় (বিনা যুদ্ধে পাওয়া সম্পদ) দিয়েছেন তার জন্য তোমরা ঘোড়াও দৌড়াওনি, আর উটেও চড়নি, বরং আল্লাহ তাঁর রসূলগণকে যার উপর ইচ্ছে আধিপত্য দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।
— Taisirul Quran
আল্লাহ তাদের (ইয়াহুদীদের) নিকট হতে যে ‘ফাই’ তাঁর রাসূলকে দিয়েছেন, উহার জন্য তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি; আল্লাহতো যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদের কর্তৃত্ব দান করেন; আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ ইয়াহুদীদের নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফায়* হিসেবে যা দিয়েছেন তোমরা তার জন্য কোন ঘোড়া বা উটে আরোহণ করে অভিযান পরিচালনা করনি। বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলগণকে যাদের ওপর ইচ্ছা কতৃত্ব প্রদান করেন। আল্লাহ সকল কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। *যুদ্ধ ছাড়াই যে ধন-সম্পদ অর্জিত হয় তাকে في বলে। এটি সাধারণত বায়তুল মালে জমা রাখা হয় এবং রাসূল স্বীয় তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতেন। আর যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জিত হয় তাকে গনিমত غنيمت বলা হয়।
— Rawai Al-bayan
আর আল্লাহ ইয়াহুদীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যে “ফায়” দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি [১]; বরং আল্লাহ যার উপর ইচ্ছে তাঁর রাসূলগণকে কর্তৃত্ব দান করেন; আর আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

যে ধন-সম্পদ আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে নিয়ে তাঁর রসূলকে দিলেন তা আল্লাহর জন্য তাঁর রসূলের জন্য আর রসূলের আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন ও পথিকদের জন্য যাতে তা তোমাদের মধ্যকার সম্পদশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। রসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর তোমাদেরকে যাত্থেকে নিষেধ করে তাত্থেকে বিরত থাক, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ কঠিন শাস্তিদাতা।
— Taisirul Quran
আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রাসূলকে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহর, তাঁর রাসূলের, রাসূলের স্বজনগণের এবং ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। অতএব রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট থেকে তাঁর রাসূলকে ফায় হিসেবে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসূলের, আত্মীয়-স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীন ও মুসাফিরদের এটি এ জন্য যে, যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে। রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।
— Rawai Al-bayan
আল্লাহ্‌ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে ‘ফায়’ হিসেবে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহ্‌র, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীন ও পথচারীদের [১], যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ কর তা থেকে বিরত থাক [২] এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্‌ শাস্তি দানে কঠোর।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria


গনিমত, ফাই, খুমুস: আয়ের ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ মডেল

মদিনা পর্বে সম্পদের প্রবাহকে তিনটি বড় শিরোনামে সাজানো যায়—

(১) গনিমত (যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ): আনফাল ৮:১ ও ৮:৪১-এর ভাষ্য থেকে দেখা যায়—যুদ্ধলব্ধ সম্পদ “আল্লাহ ও রসূলের সিদ্ধান্তাধীন”, এবং তার বণ্টনে খুমুস নির্ধারিত।

(২) ফাই (যুদ্ধ ছাড়াই/সরাসরি সংঘর্ষ ছাড়াই অর্জিত সম্পদ): কোরআনের হাশর অধ্যায়ে “ফাই” সম্পর্কিত আয়াতে বলা হয়—এই সম্পদের জন্য “ঘোড়া/উট দৌড়াতে হয়নি” (অর্থাৎ সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের বাইরে অর্জিত সম্পদ), তবুও তা রসূলের অধীনে আসে এবং নির্দিষ্ট খাতে ব্যয়ের কথা বলা হয়। [10]

(৩) প্রশাসনিক বণ্টন-ক্ষমতা: সহীহ বুখারীতে “আমি দানও করি না, বঞ্চিতও করি না; আমি তো বণ্টনকারী—যেভাবে নির্দেশিত হই সেভাবে ব্যয় করি”—এই বক্তব্য আসলে “সম্পদ প্রবাহ → কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান → বণ্টন” ধরনের রাষ্ট্রীয়/প্রশাসনিক কাঠামোর ভাষ্য। [11]

এই তিনটি মিলিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি দাঁড়ায়: সম্পদের বড় অংশ যুদ্ধ/রাজনৈতিক আধিপত্য-সম্পর্কিত ঘটনা থেকে আসে; তারপর নেতৃত্ব-কেন্দ্র (মুহাম্মদ) বণ্টনের কর্তৃত্ব ও নিয়ম নির্ধারণ করে। ইসলাম ধর্মে অন্ধবিশ্বাসীর কাছেএটি “রাষ্ট্র-কল্যাণ ও পুনর্বণ্টন” হতে পারে, কিন্তু যুক্তি প্রমাণের আলোকে এগুলো পরিষ্কারভাবেই “যুদ্ধ-অভিযাননির্ভর আয়ের কাঠামো”—এই দুই ব্যাখ্যাই মূলত একই পাঠ্য উপাদানের ভিন্ন ফ্রেমিং। (উদাহরণ হিসেবে কোরআন ৮:১-এর তাফসিরে “বণ্টন সম্পূর্ণ রসূলের সিদ্ধান্তাধীন”—এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।)

গনিমত, ফাই, খুমুস: আয়ের ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ মডেল
মদিনা পর্বে সম্পদের উৎসকে তিন ভাগে দেখানো হয়েছে—যুদ্ধের গনিমত, যুদ্ধ ছাড়াই ফাই, এবং কেন্দ্রীয় বণ্টন-ক্ষমতা। এগুলো মিলিয়ে “সম্পদ প্রবাহ → কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান → বণ্টন” কাঠামো দাঁড়ায়।
গনিমত ফাই বণ্টন ক্ষমতা
(১) গনিমত — যুদ্ধলব্ধ সম্পদ
উৎস: সামরিক সংঘর্ষ/যুদ্ধ

আনফাল ৮:১ ও ৮:৪১-এর কাঠামোতে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সিদ্ধান্ত ও বণ্টন “আল্লাহ/রসূলের অধীন” দেখানো হয়, এবং বণ্টনে খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) নির্ধারিত।

আনফাল ৮:১ আনফাল ৮:৪১ খুমুস
(২) ফাই — যুদ্ধ ছাড়াই অর্জিত সম্পদ
উৎস: সরাসরি সংঘর্ষ ছাড়াই অধিগ্রহণ

হাশর অধ্যায়ের ৫৯:৬–৭-এ “ঘোড়া/উট দৌড়াতে হয়নি”—এভাবে বোঝানো হয় যে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই সম্পদ এসেছে; তবুও তা কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বে আসে এবং নির্দিষ্ট খাতে ব্যয়ের নির্দেশনা থাকে।

কোরআন ৫৯:৬–৭ ফাই বণ্টন খাত
(৩) প্রশাসনিক বণ্টন-ক্ষমতা
উৎস: কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও তত্ত্বাবধান

সহীহ বুখারী ৩১১৭-এ “আমি দানও করি না, বঞ্চিতও করি না; আমি তো বণ্টনকারী”—এই বক্তব্য কার্যত “সম্পদ আসে → কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান হয় → তারপর বণ্টন”—ধরনের প্রশাসনিক কাঠামোর ভাষ্য।

সহীহ বুখারী ৩১১৭ কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধান বণ্টন কর্তৃত্ব
নেতৃত্ব-কেন্দ্র: বণ্টনের কর্তৃত্ব
নিয়ম/নীতিমালা নির্ধারণ
“প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি” কীভাবে দাঁড়ায়
সম্পদের বড় অংশ যুদ্ধ/রাজনৈতিক আধিপত্য-সম্পর্কিত ঘটনা থেকে আসে, এরপর নেতৃত্ব-কেন্দ্র বণ্টনের নীতি ও নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করে। ফলে একই ডেটাকে দুইভাবে ফ্রেম করা যায়—একদিকে “রাষ্ট্র-কল্যাণ ও পুনর্বণ্টন”, অন্যদিকে “যুদ্ধ-অভিযাননির্ভর আয়ের কাঠামো”।
ফ্রেমিং A: রাষ্ট্র-কল্যাণ / পুনর্বণ্টন
  • সম্পদ আসে কেন্দ্রীয় তহবিলে
  • নীতিমালা অনুযায়ী খাতভিত্তিক ব্যয়
  • অভাবগ্রস্ত/সামাজিক খাতে বণ্টনের যুক্তি
ফ্রেমিং B: যুদ্ধ-অভিযাননির্ভর আয়ের কাঠামো
  • আয়ের প্রধান উৎস সংঘর্ষ/আধিপত্য-সম্পর্কিত
  • বণ্টনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে কেন্দ্রীভূত
  • অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হয়

নোট: একই পাঠ্য-উপাদান (গনিমত/ফাই/খুমুস ও বণ্টন কর্তৃত্ব) থেকে—ভিন্ন মূল্যায়ন-ফ্রেমে ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড়াতে পারে। আপনার লেখায় আপনি এই “দুটি ফ্রেমিং” পাশাপাশি রেখে কাঠামোটা পরিষ্কার দেখাতে পারবেন।

ডায়াগ্রাম টাইপ: Sources → Authority → Distribution framing আনফাল ৮:১ আনফাল ৮:৪১ হাশর ৫৯:৬–৭ বুখারী ৩১১৭

“পারিশ্রমিক চাই না”—বাক্যটির সাথে খুমুস বিধানের টানাপোড়েন

কোরআনের একটি জায়গায় “বল, আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না”—এ ধরনের বক্তব্য আছে। [12]। কিন্তু একই কোরআনেই যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও ফাই সম্পদের বণ্টন-নীতি এবং খুমুস নির্ধারণ করা হয়েছে। [13]

এখানে বিশ্লেষণগত প্রশ্ন দাঁড়ায়: “পারিশ্রমিক” (বার্তা পৌঁছানোর মজুরি) আর “রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে সম্পদ বণ্টনের অংশ” (খুমুস/ফাই তত্ত্বাবধান) কি একই জিনিস—নাকি আলাদা? ধর্মীয় ব্যাখ্যায় সাধারণত এগুলোকে আলাদা করা হয়: নবুয়তের জন্য ব্যক্তিগত মজুরি নয়, বরং রাষ্ট্রীয়/সামাজিক খাতে ব্যয়-যোগ্য একটি তহবিল ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে সমালোচনামূলক পাঠে বলা হয়: ফলাফল হিসেবে নেতৃত্ব-কেন্দ্রের হাতে বড় সম্পদ-প্রবাহ ও বণ্টনক্ষমতা জমা হয়—এটি কার্যত “আর্থিক ক্ষমতা”। উভয় ক্ষেত্রেই টেক্সট-ভিত্তিক বাস্তবতা হলো: মদিনা পর্বে সম্পদ প্রবাহ ও বণ্টন নিয়ে বিস্তারিত বিধান-ভাষ্য তৈরি হয়েছে।


উপসংহার: হিজরতের আগে-পরের “অর্থনৈতিক রূপান্তর”

হিজরতের আগে (মক্কা পর্ব) মুহাম্মদের ক্ষেত্রে শ্রমভিত্তিক উপার্জন (রাখালি) ও খাদিজার বাণিজ্য কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়ে আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির বর্ণনা পাওয়া যায়। হিজরতের পরে (মদিনা পর্ব) কোরআন-হাদিসে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত), যুদ্ধ ছাড়াই অর্জিত সম্পদ (ফাই) এবং এগুলোর বণ্টননীতি (খুমুস) নিয়ে একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেখা যায়—যেখানে নেতৃত্ব-কেন্দ্র বণ্টনের কর্তৃত্বে থাকে, এবং “জীবিকা বর্শার ছায়াতলে” ধরনের বক্তব্য সেই কাঠামোকে নৈতিক-ধর্মীয় ভাষায়ও যুক্ত করে।

ফলে, এই লেখার মূল সিদ্ধান্ত হলো: মুহাম্মদের জীবনের অর্থনৈতিক ভিত্তি—পাঠ্যসূত্রের আলোকে—একটি ধারাবাহিক রূপান্তর দেখায়: ব্যক্তিগত-পরিবারিক অর্থনীতি → রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে গনিমতের মাল ও হাদিয়া থেকে প্রাপ্ত সম্পদ-প্রবাহ ও বণ্টনভিত্তিক অর্থনীতি। আপনি এটিকে “রাষ্ট্র গঠন” হিসেবে দেখুন বা “যুদ্ধ-অভিযাননির্ভর আয়ের ব্যবস্থা” হিসেবে দেখুন—দুই ব্যাখ্যাই টেক্সট-ভিত্তিক একই কাঠামোর ভিন্ন পাঠ; এবং সেই কারণেই বিষয়টি বিশ্লেষণযোগ্য ও বিতর্কযোগ্য।


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন, হাদিসঃ ২২৬২ ↩︎
  2. কোরআন ৯৩ঃ৮ ↩︎
  3. সূরা আনআম, আয়াত ৯০ ↩︎
  4. কোরআন ৮:১ ↩︎
  5. কোরআন ৮:৪১ ↩︎
  6. হাদীস সম্ভার, হাদিসঃ ১৯০০ ↩︎
  7. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ২৮১৮ ↩︎
  8. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৩১১৭ ↩︎
  9. সহজ নসরুল বারী, শরহে সহীহ বুখারী, ৮ম খণ্ড, আরবি-বাংলা, সহজ তরজমা ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ উসমান গনী, আল কাউসার প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪১১ ↩︎
  10. কোরআন ৫৯:৬–৭ 1 2
  11. সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ৩১১৭ ↩︎
  12. কোরআন ৬:৯০ ↩︎
  13. কোরআন ৮:১, ৮:৪১, ৫৯:৬–৭ ↩︎