Table of Contents
ভূমিকা
নবী মুহাম্মদ যে শুধু বহু নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করেছিলেন, বেসামরিক নারী ও শিশুদের মালে গনিমত হিসেবে দাসদাসী বানিয়েছেন তাই নয়, নিরীহ প্রাণী হত্যা করেও তিনি ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন—এ কথাটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। অনেক সময় আমরা অনেকেই ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা করি বটে, কিন্তু আমাদের সবসময় চেষ্টা থাকে নিরীহ অবলা কোন প্রাণী যেন আমরা ভুলবশত হলেও মেরে না ফেলি। আধুনিক নৈতিকতার দৃষ্টিতে মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা এবং হত্যাকে অনৈতিক কর্মকান্ড হিসেবেই গণ্য করা হয়।
কিন্তু নবী মুহাম্মদ বিশেষভাবে ক্ষতিকর প্রাণী বাদেও গণহারে কিছু প্রাণীকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আবার কখনো শুধুমাত্র গায়ের রঙ এর ওপর ভিত্তি করে প্রাণী হত্যা করতে বলেছেন। এই প্রাণীগুলোকে হত্যা যে একদমই অহেতুক এবং অপ্রয়োজনীয় ছিল, তা একটু পরেই প্রমাণ করা হবে। এই আচরণ আজকের দিনে স্পষ্টভাবে ভয়াবহ অনৈতিক এবং অমানবিক আচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এই প্রাণীগুলোকে হত্যা করা যে একদমই অহেতুক এবং অপ্রয়োজনীয় ছিল, তা নিচের বর্ণনাগুলো থেকে সহজেই বোঝা যায়। প্রথমে আমরা সেই সব হাদিসগুলো দেখব, যা থেকে জানা যায় নবী মুহাম্মদ কিছু প্রাণীকে সরাসরি গণহারে মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন।
কুকুর ও অন্যান্য প্রাণী নিধনের নির্দেশ
আপাতত সেই হাদিসগুলো দেখি, যা থেকে বোঝা যায়, নবী মুহাম্মদ কিছু প্রাণীকে একদম গণহারে মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] [10] [11] [12] [13] –
সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছদঃ ১৯৯৯. তোমাদের কারো পানীয় দ্রব্যে মাছি পড়লে ডুবিয়ে দেবে । কেননা তার এক ডানায় রোগ জীবানু থাকে, আর অপরটিতে থাকে আরোগ্যে
৩০৮৯। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন।’
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১১/ শিকার প্রসঙ্গে
পরিচ্ছদঃ ৯৯. শিকারে উদ্দেশ্যে বা অন্য কোন প্রয়োজনে কুকুর পোষা।
২৮৩৬. মুসাদ্দআদ (রহঃ) ……….. ‘আবদুল্লাহ্ ইবন মুগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কুকুর আল্লাহ্ তা‘আলার বহুজাতিক সৃষ্টজীবের মাঝে এক জাতীয় সৃষ্টি না হত, তবে আমি তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। এখন তোমরা তাদের থেকে কেবল কালবর্ণের কুকুরকেই হত্যা করবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছদঃ ৫৯/১৭. পানীয় দ্রব্যে মাছি পড়লে ডুবিয়ে দেবে। কারণ তার এক ডানায় থাকে রোগ, অন্যটিতে থাকে আরোগ্যের উপায়।
৩৩২৩. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। ‘রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর মেরে ফেলতে আদেশ করেছেন।’ (মুসলিম ২২/১০ হাঃ ১৫৭০, আহমাদ ৫৯৩২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৭৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৮৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছদঃ ৫৯/১৭. পানীয় দ্রব্যে মাছি পড়লে ডুবিয়ে দেবে। কারণ তার এক ডানায় থাকে রোগ, অন্যটিতে থাকে আরোগ্যের উপায়।
৩৩২২. আবূ ত্বলহা (রাঃ) সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘যে বাড়িতে কুকুর এবং প্রাণীর ছবি থাকে তাতে ফেরেশতামন্ডলী প্রবেশ করেন না।’ (২৩২৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৭৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৮৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২১/ বিবিধ বিধান ও তার উপকারিতা
পরিচ্ছদঃ কুকুর রাখলে কি পরিমান ছাওয়াব হ্রাস পাবে।
১৪৯৫। উবায়দ ইবনু আসবাত ইবনু মুহাম্মদ কুরাশী (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন খুতবা প্রদানের সময় তাঁর চেহারা থেকে খেজুর গাছের ডাল যারা সরাচ্ছিলেন আমি তাদের একজন ছিলাম। তিনি বলেছিলেন, কুকুর যদিও আল্লাহর সৃষ্ট জাত-গুলোর একটি জাতি না হত তবে আমি তা হত্যা করার হুকুম দিয়ে দিতাম। সুতরাং তোমরা যেগুলা ঘোর কালো বর্ণের সেগুলোকে হত্যা করবে। শিকারের বা শস্যক্ষেত্রের বা চারণের কুকুর ছাড়া অন্য কোন কুকুর যদি কেউ বেঁধে রাখে তবে অবশ্যই তার নেক আমল থেকে প্রতিদিন এক কিরাত করে হ্রাস পাবে। সহীহ, ইবনু মাজাহ ৩২০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৪৮৯ (আল মাদানী প্রকাশনী)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৩। মুসাকাহ (পানি সেচের বিনিময়ে ফসলের একটি অংশ প্রদান)
পরিচ্ছদঃ ১০. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা বা এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশে ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৯০৯-(৪৪/…) আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ্ (রহঃ) ….. ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে মাদীনার চারপাশে লোক পাঠালেন যাতে কুকুর হত্যা করা হয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ৩৮৭২, ইসলামিক সেন্টার ৩৮৭১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৩/ মুসাকাত ও মুযারাত (বর্গাচাষ)
পরিচ্ছদঃ ৯. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা ও এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৮৭২। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি মদিনার চারপাশে লোক প্রেরণ করলেন যে, কুকুর হত্যা করা হোক।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৩/ মুসাকাত ও মুযারাত (বর্গাচাষ)
পরিচ্ছদঃ ৯. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা ও এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৮৭৩। হুমায়দ ইবনু মাসআদা (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করার জন্য হুকুম দিতেন। অতঃপর আমি মদিনার অভ্যন্তরে ও তার চারপাশের কুকুর ধাওয়া করাতাম। আর কোন কুকুরই আমরা না মেরে ছেড়ে দিতাম না। এমন কি বেদুইনদের দুগ্ধবতী উষ্ট্রীর সাথে যে কুকুর থাকত তাও আমরা হত্যা করতাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৩। মুসাকাহ (পানি সেচের বিনিময়ে ফসলের একটি অংশ প্রদান)
পরিচ্ছদঃ ১০. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা বা এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশে ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৯১১-(৪৬/১৫৭১) ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ….. ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করতে হুকুম দিয়েছেন। তবে শিকারী কুকুর, বকরী পাহারা দানের কুকুর অথবা অন্য জীবজন্তু পাহারা দেয়া কুকুর ব্যতীত। অতঃপর ইবনু উমারের নিকট বলা হলো যে, আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) তো ক্ষেত পাহারার কুকুরের কথাও বলে থাকেন। ইবনু উমর (রাযিঃ) বললেনঃ আবূ হুরাইরার ক্ষেত আছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৮৭৪, ইসলামিক সেন্টার ৩৮৭৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৩/ মুসাকাত ও মুযারাত (বর্গাচাষ)
পরিচ্ছদঃ ৯. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা ও এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৮৭৪। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে শিকারী কুকুর, বকরী (পাহারা দানের কুকুর) অথবা অন্য জীবজন্তু পাহারা দেওয়া কুকুর ব্যতীত। এখন ইবনু উমর (রাঃ) কে বলা হল যে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) তো ক্ষেত পাহারার কুকুরের কথাও বলে থাকেন। ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, আবূ হুরায়রার ক্ষেত আছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪১/ সাপ ইত্যাদি নিধন
পরিচ্ছদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৫৬৩২। হাজিব ইবনু ওয়ালীদ (রহঃ) … ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি কুকুর নিধনের হুকুম জারী করতে শুনেছি, তিনি বলতেন, সাপগুলি আর কুকুরগুলি মেরে ফেল। আর (বিশেষত) পিঠে দু’সাদা রেখাবিশিষ্ট ও লেজবিহীন সাপ মেরে ফেল। কেননা এ দুটি মানুষের দূষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেয় এবং গর্ভবতীদের গর্ভপাত ঘটায়। (সনদের মধ্যবর্তী) রাবী যুহরী (রহঃ) বলেন, আমাদের ধারণায় তা এদের বিষের কারণে; তবে আল্লাহ তাআলাই সমধিক অবগত। রাবী সালিম (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেছেন, এরপরে আমার অবস্থা দাঁড়াল এই যে, কোন সাপ দেখতে পেলে তাকে আমি না মেরে ছেড়ে দিতাম না।
একদিনের ঘটনা, আমি বাড়ি-ঘরে অবস্থানকারী ধরনের একটি সাপ তাড়া করছিলাম। সে সময় যায়দ ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বা আবূ লূবাবা (রাঃ) আমার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর আমি তাড়া করে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, থামো! হে আবদুল্লাহ! তখন আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এদের মেরে ফেলার হুকুম দিয়েছেন। তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর-দুয়ারে বসবাসকারী সাপ নিধন করতে নিষেধও করেছেন।
হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া, আবদ ইবনু হুমায়দ ও হাসান হুলওয়ানী (রহঃ) … যুহরী (রহঃ) থেকে উল্লেখিত সনদে হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। তবে (শেষ সনদের) রাবী সালিহ (রহঃ) বলেছেন, অবশেষে আবূ লূবাবা ইবনু আবদুল মুনযির (রাঃ) এবং যায়দ ইবনু খাত্তাব (রাঃ) আমাকে দেখলেন …… এবং তাঁরা দুাজন বললেন যে, ঘর-দুয়ারে বসবাসকারী সাপ নিধন করতে নিষেধ করেছেন। আর (প্রথম সনদের) রাবী ইউনূস (রহঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে- ‘সব সাপ মেরে ফেল’। তিনি (বিশেষ করে) ‘পিঠে দু’সাদারেখা বিশিষ্ট ও লেজবিহীন সাপ’ কথাটি বলেন নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২/ তাহারাত (পবিত্রতা)
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২৭. কুকুরের উচ্ছিষ্ট সম্পর্কে বিধান
৫৪৬। উবায়দুল্লাহ ইবনু মু’আয (রহঃ) … ইবনুল মুগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে বললেন, তাদের কী হয়েছে যে, তারা কুকুরের পিছনে পড়লো? তারপর শিকারী কুকুর এবং বকরীর (পাহারা দেয়ার) কুকুর রাখার অনুমতি দেন এবং বলেন, কুকুর যখন পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করবে তখন তা সাতবার ধুইয়ে ফেলবে এবং অষ্টমবার মাটি দিয়ে ঘষে ফেলবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
কুকুর গণহত্যার কারণ
ইদানীংকালের অনেক লজ্জিত মুসলিম লাজলজ্জার মাথা খেয়ে দাবী করেন, নবী মুহাম্মদ নাকি পাগলা কুকুরের উপদ্রব থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে এরকম নির্দেশ দিয়েছিলেন! জলাতঙ্ক রোগের কুকুর কিংবা অন্যান্য কারণে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত কুকুরগুলোকেই নাকি নবী হত্যা করতে বলেছে। অথচ হাদিস থেকে জানা যায় একদমই ভিন্ন কথা। নবীর এই কুকুর গণহত্যার পেছনে কোন পাগলা কুকুরের পাগলামি কিংবা অসুখ ছড়ানো কিংবা মানুষের জন্য মহা বিপদজনক কোন বিষয়ই ছিল না। বরঞ্চ কারণ ছিল খুবই উদ্ভট এবং ফালতু। কারণটি হচ্ছে, ফেরেশতা জিবরাইল নাকি একদিন আসার কথা বলেও কুকুরের কারণে নবীর সাথে দেখা করতে আসতে পারেনি। সকালে উঠে রেগেমেগে মুহাম্মদ বাগানের প্রশিক্ষিত বড় কুকুর বাদে সব কুকুর নিধনের হুকুম দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এতবড় ক্ষমতাবান ফেরেশতা, এক কুকুরেই তার প্যান্ট ভিজে গেল? এই বলদা ফেরেশতা দিয়ে শয়তানের সাথে যুদ্ধ কীভাবে হবে? শয়তান তো কুকুর লেলিয়ে দিলেই আল্লাহর ফেরেশতারা প্যান্ট খুলে রেখে পালিয়ে যাবে। আর আল্লাহর ওহী তো মহাবিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়, যা আল্লাহ ফেরেশতা জিবরাইলের মাধ্যমে নবীকে পাঠাতেন। তাহলে, এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে যখন জিবরাইল আসবেন, তিনি ঘরের বাইরে থেকে নবীকে ডাকাডাকি করতে পারতেন, বা দরজার সামনেই অপেক্ষা তো করতে পারতেন। সেগুলো না করেই এই বেকুব জিবরাইল ফেরত চলে গেছে! চিন্তা করুন তো, রমজানের সময় ইবলিশ শেকল দিয়ে বাধা থাকার পরেও, সারা পৃথিবী ব্যাপী তার কার্যক্রম চলতে থাকে। অথচ এই বেকুব আর অলস জিবরাইলকে একটা কাজ দিলেও সে ঠিক মত করতে পারে না। কুকুরের ভয়ে পালিয়ে চলে আসে। জিবরাইল ফেরেশতা হিসেবে চাকরি পেলো কীভাবে সেটি একটি জরুরি প্রশ্ন! [14]
সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ পোশাক ও সাজসজ্জা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২১. জীব-জন্তুর ছবি অংকন করা নিষিদ্ধ হওয়া এবং চাদর ইত্যাদিতে সুস্পষ্ট ও অবজ্ঞাপূর্ণ নয় এমন ছবি থাকলে তা ব্যবহার করা হারাম হওয়া এবং যে ঘরে কুকুর ও ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না
৫৩৩৫। হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মায়মুনা (রাঃ) আমাকে (হাদীস) অবহিত করেছেন যে, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোরে বিষণ্ণ অবস্থায় উঠলেন। তখন মায়মুনা (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আজ আপনার চেহারা বিমর্ষ দেখছি! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আজ রাতে আমার সঙ্গে মুলাকাত করার ওয়াদা করেছিলেন, কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে মুলাকাত করেননি। জেনে রাখ, আল্লাহর কসম! তিনি (কখনো) আমার সঙ্গে ওয়াদা খেলাফ করেননি। পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সে দিনটি এভাবেই কাটালেন।
এরপর আমাদের পর্দা (ঘেরা খাট) এর নিচে একটি কুকুর ছানার কথা তাঁর মনে পড়ল। তিনি হুকুম দিলে সেটিকে বের করে দেয়া হল। তারপর তিনি তাঁর হাতে সামান্য পানি নিয়ে তা ঐ (কুকুর ছানার বসার) স্থানে ছিঁটিয়ে দিলেন। পরে সন্ধ্যা হলে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁর সঙ্গে মুলাকাত করলেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, আপনি তো গতরাতে আমার সাথে মুলাকাতের ওয়াদা করেছিলেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। তবে আমরা (ফিরিশতারা) এমন কোন ঘরে প্রবেশ করিনা, যে ঘরে কোন কুকুর থাকে কিংবা কোন (প্রানীর) ছবি থাকে।
পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন ভোরবেলায় কুকুর নিধনের আদেশ দিলেন, এমনকি তিনি ছোট বাগানের পাহারাদার কুকুরও মেরে ফেলার হুকুম দিয়েছিলেন এবং বড় বড় বাগানের কুকুরগুলোকে রেহাই দিয়েছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

নৈতিক ও মানবিক মূল্যায়ন
উপরের হাদিসগুলো একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, এখানে কুকুর বা সাপ মারার নির্দেশ কোনো বৈজ্ঞানিক রোগতত্ত্ব, জনস্বাস্থ্য গবেষণা কিংবা প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়নি। বরং কুসংস্কারপূর্ণ ধারণা (ফেরেশতা ঘরে প্রবেশ করবে না, সব সাপ মারো, কালো কুকুর বিশেষভাবে মেরে ফেল ইত্যাদি), অলৌকিক ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে এই নির্দেশগুলোর নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিক মানবাধিকার ও প্রাণী অধিকার–সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে এগুলোকে মিলিয়ে দেখলে গভীর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় যে, পরমকরুনাময় আল্লাহর নবী কীভাবে এই প্রাণীগুলোকে মেরে ফেলতে বলতে পারেন? আর যদি মেরে ফেলতেই হয়, আল্লাহ এইসব প্রাণীকে সৃষ্টিই বা কেন করলেন? সৃষ্টি করে কষ্ট দিয়ে মারার জন্য?
একদিকে ইসলামী বক্তারা প্রচার করেন, ইসলাম নাকি অত্যন্ত ‘দয়ালু’ ও ‘প্রাণী-বন্ধু’ ধর্ম; অন্যদিকে সহীহ বলে গণ্য মূলধারার হাদিসগুলোতেই দেখা যায়, কুকুর যেমন-তেমন কারণেই গণহারে নিধনের শিকার হয়েছে, সাপকে ‘দেখলে মেরে ফেল’ ধরনের নির্দেশ এসেছে, এমনকি নির্দিষ্ট রঙের কুকুরকে টার্গেট করতে বলা হয়েছে। কোনো প্রাণীর প্রতি অযৌক্তিক ভয় বা ঘৃণা থেকে যদি এই ধরনের নির্দেশ আসে, তবে তা মানবিক নীতির সঙ্গে এবং ন্যূনতম যুক্তির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
এছাড়া যে যুক্তি দেখানো হয়—“শুধু ক্ষতিকর কুকুরই মারা হয়েছে”—তা উপরের উদ্ধৃত হাদিসগুলোর সঙ্গেও যায় না। সেখানে স্পষ্টভাবে কালো কুকুরকে, সাধারণ কুকুরকে, এমনকি দুগ্ধবতী উষ্ট্রীর সঙ্গে থাকা পাহারাদার কুকুর পর্যন্ত হত্যা করার বর্ণনা আছে। অর্থাৎ বাস্তবে এখানে ‘প্রাণীর স্বাস্থ্যঝুঁকি’ নয়, বরং ধর্মীয় কুসংস্কার ও ফেরেশতা-সংক্রান্ত ভীতিই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
উপসংহার
এই প্রবন্ধে আমরা দেখলাম, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, তিরমিজী ও আবু দাউদের মতো স্বীকৃত হাদিসগ্রন্থগুলোতে নবী মুহাম্মদের নামে এমন সব বক্তব্য ও ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে কুকুর ও সাপসহ বিভিন্ন প্রাণীর ওপর সরাসরি গণহারে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এগুলোর পেছনে কোনো প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বা বৈজ্ঞানিক যুক্তি উপস্থাপন করা হয়নি; বরং ফেরেশতা-ভীতি, ছবি ও কুকুর-বিরোধী কুসংস্কার এবং “কালো কুকুর”–এর মতো বৈষম্যমূলক ধারণা ব্যবহার করে এসব নির্দেশকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হয়েছে।
নৈতিকতার দৃষ্টিতে, অপ্রয়োজনীয় প্রাণীহত্যা—তা মানুষ হোক বা অন্য প্রাণী—দু’ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। আধুনিক মানবাধিকার, প্রাণী অধিকার এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই হাদিসগুলোর সঙ্গে নিজেদের মূল্যবোধ মেলাতে গিয়ে অনেক মুসলিম অস্বস্তি বোধ করেন, এবং ফলাফল হিসেবে নানা ধরনের এপোলোজেটিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মূল টেক্সটে যা আছে, সেগুলোকে সরাসরি পড়লে দেখা যায়, এখানে করুণা নয়, বরং কুসংস্কার, ভয় এবং ক্ষমতার নামে বৈধতা দেওয়া একটি নির্মম প্রাণী-নিধনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে।
সুতরাং, ধর্মকে যদি সত্যি সত্যি মানবিকতা ও যুক্তির মানদণ্ডে বিচার করতে চাই, তবে এসব হাদিস ও এর পরিণত বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। বরং খোলামেলা আলোচনায় আনতে হবে—এ ধরনের শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক নৈতিকতা, বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ও প্রাণীর প্রতি ন্যূনতম সহমর্মিতা একসঙ্গে টিকতে পারে কি না, এবং আমরা কোন মূল্যবোধ বেছে নিতে চাই।
তথ্যসূত্রঃ
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৮৯ ↩︎
- সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১৯ ↩︎
- সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৮৩৬ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৩৩২৩ ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৩৩২২ ↩︎
- সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৪৯৫ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৯০৯ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭৩ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৯১১ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৬৩২ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৬ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৩৩৫ ↩︎
