
Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 পরিভাষা ও বিশ্লেষণ-পদ্ধতি
- 3 কোরআনঃ “বাড়ি থেকে বের করে দিও না” এবং “ব্যবস্থা/মাতাআ”
- 4 হাদিসঃ ফাতিমাহ বিনতে কায়সের বর্ণনা এবং ‘আয়িশাহর আপত্তি
- 5 ফিকহঃ বায়িন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী খোরপোষ পায় না
- 6 গৃহস্থালি শ্রমের অবমূল্যায়ন: অর্থনৈতিক বাস্তবতা বনাম বিধান-রীতি
- 7 প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও “সেফটি নেট” প্রশ্ন
- 8 আধুনিক তুলনামূলক আইন: ইদ্দত-সীমাবদ্ধতা বনাম পুনর্বাসন-ভিত্তিক সহায়তা
- 9 কোরআন-হাদিসঃ সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগত “রেসকিউ” এবং তার সীমা
- 10 উপসংহার
ভূমিকা
তালাক-পরবর্তী খোরপোষ (maintenance) ও আবাসন (lodging)–এর প্রশ্নটি ইসলামি আইনশাস্ত্রে শুধুমাত্র একটি পারিবারিক বিধান নয়; এটি ক্ষমতার অসম সম্পর্ক, নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং গৃহস্থালি শ্রমের সামাজিক অবমূল্যায়নের সাথে গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে “বায়িন” বা অপরিবর্তনীয় তালাকের (যেমন তিন তালাক বা রুজুর সুযোগহীন তালাক) ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শরীয়ত ব্যাখ্যাগুলো তালাকপ্রাপ্ত নারীর আবাসন ও খোরপোষ উভয়ই সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দেয়। ফাতিমাহ বিনতে কায়সের সূত্রে বর্ণিত সহিহ হাদিসে (সহিহ বুখারী ৫৩২৩-৫৩২৪; সহিহ মুসলিম ৩৬০০) মুহাম্মদের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায় যে, অপরিবর্তনীয় তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য বাসস্থান বা খোরপোষ কোনোটাই প্রাপ্য নয়। উল্লেখ্য, ইসলামি শরিয়তে তালাক দেয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র স্বামীর হ্যাটেই ন্যস্ত করা হয়েছে [1]।
এই প্রবন্ধে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে: (১) উৎস-টেক্সটগুলোর (কুরআন ও হাদিস) মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েন এবং সম্ভাব্য সমন্বয়ের চেষ্টা, (২) ক্লাসিক্যাল ফিকহের মধ্যে অবস্থানগত বিভাজন, এবং (৩) আধুনিক নীতিশাস্ত্র ও তুলনামূলক আইনি যুক্তির আলোকে এই বিধানের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাবের মূল্যায়ন।
পরিভাষা ও বিশ্লেষণ-পদ্ধতি
রেভোকেবল বনাম ইররেভোকেবল তালাক: ইসলামি ফিকহে রেভোকেবল (রাজ‘ঈ) তালাক বলতে এমন তালাক বোঝায় যাতে ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামীর রুজু (পুনর্বিবাহ ছাড়াই ফিরে আসা) করার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, ইররেভোকেবল (বায়িন বা তালাক-ই-মুগাল্লাযা) তালাকে এই রুজুর সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। অনেক ফকিহ ইদ্দতকালীন ভরণপোষণকে বৈবাহিক সম্পর্কের অবশিষ্ট প্রভাবের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন, কিন্তু ইররেভোকেবল তালাকের ক্ষেত্রে এই ভরণপোষণের অধিকারও পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়া হয়—এটিই প্রভাবশালী মত।
বিশ্লেষণ-পদ্ধতি: এই প্রবন্ধে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে: (ক) টেক্সচুয়াল রিডিং—কুরআনের তালাক-সংক্রান্ত আয়াতসমূহ এবং ফাতিমাহ বিনতে কায়স-সংক্রান্ত হাদিসগুলোর সরাসরি বক্তব্যের সমালোচনামূলক পাঠ; (খ) ফিকহি ম্যাপিং—বিভিন্ন ইমাম ও মাযহাবের মধ্যে আবাসন ও খোরপোষ বিষয়ে অবস্থানের তুলনামূলক মানচিত্র; (গ) নর্মেটিভ এনালাইসিস—ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণের যৌক্তিকতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বাস্তব মানদণ্ডে এই বিধানগুলোর প্রভাবের মূল্যায়ন।
কোরআনঃ “বাড়ি থেকে বের করে দিও না” এবং “ব্যবস্থা/মাতাআ”
কোরআনের সূরা আত-তালাক (৬৫)-এর শুরুতেই (৬৫:১) একটি স্পষ্ট নির্দেশ আছে: তালাকের পর ইদ্দতকালীন সময়ে নারীদের “তাদের ঘর থেকে বের করে দিও না” এবং তারাও যেন স্বেচ্ছায় না বের হয়। এই নির্দেশ অন্তত ইদ্দতকালীন আবাসনের অধিকারকে নীতিগতভাবে স্বীকৃতি দেয়। একই সূরার ৬ নম্বর আয়াতে (৬৫:৬) আরও বলা হয়েছে: “তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের বাসস্থান দাও… যদি তারা গর্ভবতী হয় তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করো… এবং যদি তারা তোমাদের সন্তানদের দুধ পান করায় তবে তাদের পারিশ্রমিক দাও।” এই কাঠামো (আবাসন + ব্যয়ভার + মাতৃত্ব-সংক্রান্ত পারিশ্রমিক) তালাক-পরবর্তী অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি প্রাথমিক রূপরেখা উপস্থাপন করে। তবে যুক্তি ও ন্যায়ের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এই নির্দেশগুলো মূলত স্বামীর ইচ্ছা ও সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল দয়া বা অনুগ্রহের ধরন ধারণ করে—যা নারীর স্বাধীন অধিকারের পরিবর্তে তার আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য যথেষ্ট।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত (২:২৪১) তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য “মাতাআ” বা “যুক্তিসংগত ব্যবস্থা” (reasonable provision)-এর ধারণা প্রবর্তন করে। এই ব্যবস্থা কি শুধু ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণে সীমাবদ্ধ, নাকি তার বাইরেও প্রসারিত—এ নিয়ে ব্যাখ্যাগত বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু ফাতিমাহ বিনতে কায়স-সংক্রান্ত সহিহ হাদিসগুলোর (সহিহ বুখারী ৫৩২৩-৫৩২৪; সহিহ মুসলিম ৩৬০০) সাথে সমন্বয় করলে দেখা যায় যে, অপরিবর্তনীয় তালাকের ক্ষেত্রে তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য কোনো স্থায়ী বা অতিরিক্ত ভরণপোষণের অধিকার অবশিষ্ট থাকে না।
হাদিসঃ ফাতিমাহ বিনতে কায়সের বর্ণনা এবং ‘আয়িশাহর আপত্তি
ফাতিমাহ বিনতে কায়সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপরিবর্তনীয় তালাক–প্রাপ্তা নারীর “বাসস্থান ও খোরপোষ নেই”—এমন বক্তব্য সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণনাই বহু ফিকহি আলোচনায় একটি প্রধান ভিত্তি। একই সাথে –তে ‘আয়িশাহ (রাঃ)–এর মন্তব্য আসে: তিনি ফাতিমাহকে ভর্ৎসনা করেন এই বক্তব্যের জন্য যে “তালাকপ্রাপ্তা নারী বাসস্থান ও খোরপোষ পাবে না।” এমনকি, নবী নিজেও যখন তার সকল স্ত্রীদের তালাক দেয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, সেই সময়ে কাউকেই কোন ভরনপোষণ দেবেন না বলেই মনস্থির করেছিলেন, যা একটু পরে আলোচিত হবে। [2] [3]
সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৬৮/ ত্বলাক
পরিচ্ছদঃ ৬৮/৪১. ফাতিমাহ বিন্ত কায়সের ঘটনা
৫৩২৩-৫৩২৪. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ফাতিমার কী হল? সে কেন আল্লাহকে ভয় করছে না অর্থাৎ তার এ কথায় যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী (তার স্বামীর থেকে) খাদ্য ও বাসস্থান কিছুই পাবে না। (৫৩২১, ৫৩২২) আধুনিক প্রকাশনী- ৪৯৩২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮২৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ১৯। ত্বলাক্ব (তালাক)
পরিচ্ছদঃ ৬. বায়িন ত্বলাকপ্রাপ্তা* স্ত্রীর জন্য খোরপোষ নেই
৩৬০০-(৪৪/…) মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না ও ইবনু বাশশার (রহিমাহুমাল্লাহ) ….. ফাত্বিমাহ বিনতু কায়স (রাযিঃ) এর সূত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তিন ত্বলাক (তালাক) প্রাপ্ত মহিলা সম্পর্কে বর্ণিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোষ কোনটাই নেই। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৫৭০, ইসলামীক সেন্টার ৩৫৭০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
নবী মুহাম্মদের জীবন থেকে এটিও পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে, নবী একবার সকল স্ত্রীদের তালাক দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে, আয়িশা খোরপোষ চাওয়ায় আয়িশাকে তার পিতা আবু বকর নবীর সামনেই মারধোর করে, এবং এই দৃশ্য দেখে নবী মুহাম্মদ হেসে ওঠেন। অর্থাৎ সেই মারপিটকে সমর্থন দেন। [4]
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ তালাক
পরিচ্ছেদঃ ৪. ইখতিয়ার প্রদান করলে তালাকের নিয়্যাত ছাড়া তালাক হবে না
৩৫৫৭। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ) এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উপস্থিতির অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তিনি তার দরজায় অনেক লোককে উপবিষ্ট দেখতে পেলেন। তবে তাদের কাউকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় নি। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, এরপর তিনি আবূ বকর (রাঃ) কে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে তিনি প্রবেশ করলেন। এরপর উমর (রাঃ) এলেন এবং তিনি অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তখন তাকেও প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা হল। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে চিন্তিত ও নীরব বসে থাকতে দেখলেন আর তখন তার চতুষ্পার্শ্বে তাঁর সহধর্মিনীগণ উপবিষ্টা ছিলেন।
তিনি (বর্ণানাকারী জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ)) বলেন, উমর (রাঃ) বললেনঃ নিশ্চয়ই আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে এমন কথা বলব যা তাঁকে হাসাবে। এপরতিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি যদি দেখতেন খারিজার কন্যা (উমর (রাঃ) এর স্ত্রী) আমার কাছে খোরপোষ তলব করছিল। আমি তার দিকে উঠে গেলাম এবং তার ঘাড়ে ঘুষি মারলাম।তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে উঠলেন এবং বললেন, আমার চতুষ্পার্শ্বে তোমরা যাদের দেখতে পাচ্ছ তারা আমার কাছে খোরপোষ দাবী করছে।
অমনি আবূ বকর (রাঃ) আয়িশা (রাঃ) এর দিকে ছুটলেন এবং তাঁর গর্দানে ঘুষি মারলেন। উমর (রাঃ)ও দাঁড়িয়ে গেলেন এবং হাফসা (রাঃ) এর দিকে অগ্রসর হয়ে তাঁর ঘাড়ে ঘুষি মারলেন। তাঁরা উভয়ে বললেন, তোমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এমন জিনিস দাবী করছে যা তাঁর কাছে নেই। তখন তাঁরা (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিনীগণ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা আর কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এমন জিনিস চাইব না যা তাঁর কাছে নেই।
এরপরতিনি তাঁদের (তাঁর সহধর্মিনীগণের) থেকে একমাস কিংবা ঊনত্রিশ দিন পৃথক রইলেন। এপর তাঁর প্রতি এই আয়াত নাযিল হলঃ (অর্থ) “হে নবী! আপনি আপনার সহধর্মিনীদের বলে দিন, তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও এর বিলাসিতা কামনা কর, তাহলে এসো আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসে ব্যবস্থা করে দেই এবং সৌজন্যের সাথে তোমাদের বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও পরকালকে কামনা কর তাহলে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ন আল্লাহ তাদের জন্য মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন।” (আহযাবঃ ২৮ ২৯)
তিনি [জাবির (রা)] বলেন, তিনি (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আয়িশা (রাঃ) কে দিয়ে (আয়াতের নির্দেশ তামীল করতে) শুরু করলেন। তখন তিনি বললেন, হে আয়িশা! আমি তোমার কাছে একটি (গুরত্বপূর্ণ) বিষয়ে আলাপ করতে চাই। তবে সে বিষয়ে তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে পরামর্শ না করে তোমার ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করাই আমি পছন্দ করি।
তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে বিষয়টা কি (আমি জানতে পারি)? তখন তিনি তার কাছে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার ব্যাপারে আমি কি আমার পিতা-মাতার কাছে পরামর্শ নিতে যাব? (এর কোন প্রয়োজন নেই)। না, বরং আমি আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখিরাতকেই বেছে নিয়েছি। তবে আপনার সকাশে আমার একান্ত নিবেদন, আমি যা বলেছি সে সম্পর্কে আপনি আপনার অন্যান্য সহধর্মিনীগণের কারো কাছে ব্যক্ত করবেন না। তিনি বললেন, তাদের যে কেউ সে বিষয় আমাকে জিজ্ঞাসা করলে আমি অবশ্যই তাঁকে তা বলে দিব। কারণ আল্লাহ আমাকে কঠোরতা আরোপকারী ও হঠকারীরূপে নয় বরং সহজ পন্থায় (শিক্ষাদানকারী) হিসাবে প্রেরণ করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)
ফিকহঃ বায়িন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী খোরপোষ পায় না
ক্লাসিক্যাল ফিকহের প্রভাবশালী ধারায় (বিশেষ করে শাফিঈ, মালিকি এবং হাম্বলি মাযহাবে) ইররেভোকেবল তালাকের (যেমন তিন তালাক বা বায়িন) ক্ষেত্রে তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য খোরপোষের অধিকার সম্পূর্ণ নাকচ করা হয়—এই মতটি ফাতিমাহ বিনতে কায়সের হাদিসের [5] উপর ভিত্তি করে গৃহীত। কিছু বর্ণনায় মধ্যবর্তী অবস্থানও দেখা যায়, যেখানে অন্তত ইদ্দতকালীন আবাসনের অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু খোরপোষ নয়—যদিও এটি সংখ্যালঘু মত।
অন্যদিকে, হানাফি মাযহাবের একটি ধারা কোরআনের ৬৫:৬ আয়াতকে প্রাধান্য দিয়ে যুক্তি দেয় যে, ইদ্দতকালীন বাসস্থানের স্পষ্ট নির্দেশ থাকায় এবং জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা বাসস্থানের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত থাকায়—ইদ্দতকালে খোরপোষও প্রাপ্য, এমনকি ইররেভোকেবল তালাকের ক্ষেত্রেও। এই মতে ফাতিমাহ বিনতে কায়সের বর্ণনাকে একক (আহাদ) হাদিস হিসেবে বিবেচনা করে কোরআনের সাধারণ নির্দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত বলে মনে করা হয় [6] । তবে বাস্তব জগতে এই ধারাটি সংখ্যালঘু এবং দালিলিকভাবে শক্তিশালী নয়।
ফলাফল: ফিকহি ঐতিহ্যে “তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য শূন্য-সহায়তা” (ইদ্দত-পরবর্তী কোনো বাধ্যতামূলক দায় ছাড়া)—এই কঠোর অবস্থানটি ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত, যা প্রায়শই দরিদ্র ও অসহায় নারীদের উপর অর্থনৈতিক সংকট চাপিয়ে দেয়। কিছু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় এই নারীদের জন্য ওয়াকফ বা দাতব্য তহবিল থেকে স্বেচ্ছাচারিত দয়াদাক্ষিণ্যের কথা উল্লেখ আছে, যা মূলত বাধ্যতামূলক অধিকার নয় বরং অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল।
গৃহস্থালি শ্রমের অবমূল্যায়ন: অর্থনৈতিক বাস্তবতা বনাম বিধান-রীতি
আধুনিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে unpaid domestic and care work—রান্না, ঘর পরিচর্যা, সন্তান লালন-পালন এবং মানসিক শ্রম—কে স্পষ্টভাবে উৎপাদনশীল শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যদিও এটি বাজারে মজুরি হিসেবে গণনা হয় না। ILO-এর হিসাব অনুযায়ী, এই অবৈতনিক শ্রমের মূল্য বিশ্ব GDP-এর 9% বা প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান, যার মধ্যে নারীদের অবদান ৬.৬% (ILO, 2018; UN Women, 2025)। কিছু দেশে এটি GDP-এর ৪০%-এর বেশি হতে পারে। ইররেভোকেবল তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল পর্যন্ত (বা কিছু ব্যাখ্যায় সেটিও না) সীমিত খোরপোষ-আবাসন দিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানে দীর্ঘ বছরের এই শ্রম-অবদানকে সম্পূর্ণ “শূন্যমূল্য” ধরে নেওয়া। প্রথাগত ফিকহি যুক্তি এটিকে “বিবাহ একটি চুক্তি—শেষ হলে দায় শেষ” হিসেবে উপস্থাপন করে, কিন্তু নৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অসমতুল: সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত নির্ভরশীলতা ও অবদানের বোঝা কেন শুধু দুর্বল পক্ষের (সাধারণত নারীর) কাঁধে চাপবে?
আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো, গৃহস্থালি শ্রমের কারণে অনেক নারী শিক্ষা বা কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা হারান, ফলে তালাক-পরবর্তী তাৎক্ষণিক স্বনির্ভরতার প্রত্যাশা প্রায়শই অবাস্তব (NIH study, 2025)। এই প্রেক্ষিতে “খোরপোষ নেই/বাসস্থান নেই”—এই ইসলামিক আইন বাস্তবে নারীর জন্য গৃহহীনতা, দারিদ্র্য এবং সামাজিক ঝুঁকি বাড়ায়—যা কোরআনের ন্যূনতম নিরাপত্তা-নির্দেশ (ইদ্দতকালীন বাসস্থানে জুলুম না করা, গর্ভাবস্থায় ব্যয়ভার, দুধপানের পারিশ্রমিক) এর সাথেও সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে, কারণ এগুলো অত্যন্ত সীমিত এবং প্রায়শই অপর্যাপ্ত।
প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও “সেফটি নেট” প্রশ্ন
আধুনিক আইনি দর্শনে “social safety net” দুই স্তরে কাজ করে: (ক) রাষ্ট্রীয় সহায়তা (ভাতা, আশ্রয়, আইনি সুরক্ষা) এবং (খ) ব্যক্তিগত দায় (দীর্ঘমেয়াদি spousal support বা alimony)। শরীয়াহর কঠোর ব্যাখ্যায় ইদ্দত শেষে স্বামীর কোনো দায় না থাকার ফলে নারীকে নতুন জীবন শুরুর সম্পূর্ণ ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ব্যয় একতরফাভাবে বহন করতে হয়—যা তালাকের ক্ষমতা-অসমতা (প্রায়শই পুরুষ-কেন্দ্রিক) কে সরাসরি অর্থনৈতিক বৈষম্যে রূপান্তরিত করে (ResearchGate studies on Indonesian and global Muslim contexts, 2025)।
নীতিগত প্রশ্নটি স্পষ্ট: বিবাহকালে সৃষ্ট নির্ভরশীলতা (আর্থিক নিরাপত্তা, কর্মজীবন ত্যাগ) তালাকের পরও কি ন্যূনতমভাবে ভাগ করে নেওয়া উচিত নয়? যদি না হয়, তাহলে এই বিধান কার্যত দুর্বল পক্ষকে শাস্তি-সদৃশ অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়—যদিও তালাক শরীয়তে অনুমোদিত একটি প্রক্রিয়া। এই ব্যবস্থা নারীর অর্থনৈতিক displacement-এর বোঝা পুরোপুরি তাদের উপর চাপিয়ে দেয়, যা আধুনিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য।
আধুনিক তুলনামূলক আইন: ইদ্দত-সীমাবদ্ধতা বনাম পুনর্বাসন-ভিত্তিক সহায়তা
আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থায় তালাক-পরবর্তী সহায়তা ইদ্দতের মতো স্বল্প ও নির্দিষ্ট সময়সীমায় আবদ্ধ থাকে না। বরং এটি নারীর অর্থনৈতিক অক্ষমতা, পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় সময়কাল, বিবাহের দৈর্ঘ্য, এবং স্বামীর সামর্থ্যের মতো বাস্তব মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০২৪ সালের Mohd. Abdul Samad v. State of Telangana মামলায় (2024 INSC 426) স্পষ্টভাবে রায় দেওয়া হয়েছে যে, তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীও CrPC-এর ধারা ১২৫-এর অধীনে দীর্ঘমেয়াদি খোরপোষ দাবি করতে পারেন এবং ১৯৮৬ সালের Muslim Women (Protection of Rights on Divorce) Act-এর কোনো ব্যাখ্যা এই সেকুলার অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করতে পারে না।
এই ধরনের তুলনামূলক আইনি যুক্তি একটি মৌলিক নীতিগত সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করে: তালাক-পরবর্তী সহায়তার উদ্দেশ্য কেবল ইদ্দত পূরণ বা গর্ভাবস্থা যাচাই নয়, বরং অর্থনৈতিক পতন রোধ করে নারীর বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে এর সামঞ্জস্যতা আলাদা প্রশ্ন; কিন্তু ন্যায়বিচার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মানদণ্ডে এই পুনর্বাসন-ভিত্তিক মডেলটি পরীক্ষিত এবং কার্যকর বলে প্রমাণিত।
কোরআন-হাদিসঃ সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগত “রেসকিউ” এবং তার সীমা
কিছু ব্যাখ্যাকার ফাতিমাহ বিনতে কায়সের হাদিসে বর্ণিত “লজিং ও মেইনটেন্যান্স নেই”-এর বক্তব্যকে ঘটনাগত ব্যতিক্রম বা বিশেষ প্রেক্ষিত-নির্ভর বলে উপস্থাপন করতে চান, যাতে কোরআনের সাধারণ নির্দেশসমূহ (ইদ্দতকালীন বাসস্থান, ক্ষতি না করা, গর্ভাবস্থায় ব্যয়ভার) অক্ষুণ্ণ থাকে। অন্য একটি ধারা কুরআনের আয়াতগুলোকে শুধু রেভোকেবল তালাক বা ইদ্দতকালীন অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ইররেভোকেবল তালাকে “শূন্য-দায়”-এর কঠোর অবস্থান টিকিয়ে রাখে।
সমস্যা হলো, দ্বিতীয় পদ্ধতিতে কোরআনের বাসস্থান-সংক্রান্ত স্পষ্ট ভাষা (৬৫:১, ৬৫:৬) এবং ২:২৪১-এর “মাতাআ” বা যুক্তিসংগত ব্যবস্থার ধারণাকে অত্যন্ত সংকুচিত ও কৃত্রিমভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। আরও বড় সমস্যা হচ্ছে, খোদ নবী মুহাম্মদ নিজেই তার স্ত্রীদের তালাক দেয়ার ব্যাপারে মনঃস্থির যখন করেছিলেন, তখন খোরপোষ না দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, “no lodging + no maintenance”-এটিই আসলে ইসলামের শরিয়তের সবচাইতে গ্রহণযোগ্য মত, যা সরাসরি নারীর অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে।
উপসংহার
ফাতিমাহ বিনতে কায়স এবং নবীর হাদিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রথাগত ফিকহি ধারা—যা ইররেভোকেবল তালাকপ্রাপ্ত নারীর আবাসন ও খোরপোষ সম্পূর্ণ নাকচ করে—তিনটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে: (ক) কুরআনের বাসস্থান-সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশ ও “মাতাআ” ধারণার সাথে ব্যাখ্যাগত সংঘাত, (খ) গৃহস্থালি শ্রমের বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্যকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, এবং (গ) তালাক-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি একতরফাভাবে নারীর উপর চাপিয়ে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ানো।
যুক্তি ও ন্যায়ের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, তালাক-পরবর্তী আর্থিক সহায়তাকে কেবল “দয়া” বা স্বেচ্ছাচারিত অনুগ্রহ হিসেবে নয়, বরং বিবাহকালে সৃষ্ট নির্ভরশীলতা, নারীর অবদান এবং মৌলিক মানবিক নিরাপত্তার যৌক্তিক ফল হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে প্রথাগত ব্যাখ্যা নারীকে শূন্য-সুরক্ষায় ফেলে দেয়, সেখানে আধুনিক আইনি দৃষ্টান্ত (যেমন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০২৪ সালের Mohd. Abdul Samad রায়) প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ইদ্দতের সীমা অতিক্রম করে পুনর্বাসন-ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সহায়তাকে বৈধ এবং প্রয়োজনীয় হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলামি শরিয়তে তালাক দেয়ার অধিকার একমাত্র স্বামীর ↩︎
- সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৫৩২৩-৫৩২৪ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৬০০ ↩︎
- সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৫৫৭ ↩︎
- Maintenance after Divorce in Islam ↩︎
- Husband providing for wife during iddah ↩︎
