
Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামি শরিয়তের তালাক-সংক্রান্ত বিধানে তিন তালাকের পর পূর্বের স্বামীর সাথে পুনর্বিবাহের জন্য যে প্রক্রিয়া বর্ণিত আছে, তা নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতার উপর চরম আঘাত। এই বিধান অনুসারে, তিন তালাকপ্রাপ্ত নারীকে পূর্বের স্বামীর কাছে ফিরে যেতে হলে অবশ্যই অন্য একজন পুরুষের সাথে বিবাহ করতে হবে, সেই পুরুষের সাথে পূর্ণ যৌন সঙ্গম করতে হবে, এবং তারপর সেই দ্বিতীয় স্বামী যদি স্বেচ্ছায় তালাক দেন, তবেই নারীটি প্রথম স্বামীর জন্য পুনরায় ‘হালাল’ হয়। এই প্রক্রিয়াকে ‘তাহলিল’ বলা হয়। যদিও পরিকল্পিত ‘হিল্লা’ বিবাহ (অর্থাৎ আগে থেকে চুক্তি করে দ্বিতীয় বিবাহ) হারাম ঘোষিত, তবুও মূল বিধানটিই নারীকে যৌন বস্তুতে পরিণত করে। নারী এখানে কোনো স্বাধীন মানুষ নন—তিনি একটি বস্তু, যাকে এক পুরুষ ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, অন্য পুরুষ ব্যবহার করার পর ফেরত দিলে তবেই পূর্বের মালিকের জন্য পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হয়। এই বিধান নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বায়ত্তশাসনের সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এবং পুরুষকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার চরম উদাহরণ।
শরিয়তে তালাক দেয়ার অধিকার শুধু স্বামীর
ইসলামি শরিয়তে তালাকের একতরফা অধিকার শুধুমাত্র স্বামীর। নারী তালাক চাইলে তাকে ‘খুলা’র জন্য আদালত বা স্বামীর সম্মতির উপর নির্ভর করতে হয়, যা প্রায়শই অসম্ভব বা অত্যন্ত কঠিন। এই অসমতা থেকেই তিন তালাকের সমস্যা শুরু হয়। পুরুষের আবেগের বশে বা ক্ষণিকের রাগে উচ্চারিত তিন তালাকের ফলে নারী চিরকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং তার পুনর্বিবাহের পথে এই অমানবিক বাধা আরোপিত হয়। এটি স্পষ্ট যে, বিধানটি পুরুষের সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, নারীর মর্যাদা বা স্বাধীনতাকে নয়। [1]
কোরআনঃ অবমাননাকর হিল্লা বিবাহ
কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবেই এই সম্পর্কে বলা হয়েছে [2]
অতঃপর যদি সে তাকে (চূড়ান্ত) তালাক দেয়, তবে এরপর সেই পুরুষের পক্ষে সেই স্ত্রী (বিবাহ) হালাল হবে না, যে পর্যন্ত না সে অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে। অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয়, তবে উভয়ের পুনরায় মিলিত হওয়াতে গুনাহ নেই, যদি উভয়ের আস্থা জন্মে যে উভয়ে আল্লাহর আইনসমূহ ঠিক রাখতে পারবে। এসব আল্লাহর (আইন) সীমাসমূহ, এগুলোকে সেই লোকদের জন্য তিনি বর্ণনা করেন যারা জ্ঞানী।
— Taisirul Quran
অতঃপর যদি সে তালাক প্রদান করে তাহলে এরপরে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহিতা না হওয়া পর্যন্ত সে তার জন্য বৈধ হবেনা, অতঃপর সে তাকে তালাক প্রদান করলে যদি উভয়ে পরস্পর প্রত্যাবর্তিত হয় তাতে উভয়ের পক্ষে কোনই দোষ নেই, যদি আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। এবং এগুলিই আল্লাহর সীমাসমূহ, তিনি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য এগুলি ব্যক্ত করে থাকেন।
— Sheikh Mujibur Rahman
অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর যদি সে স্ত্রীকে তালাক দেয় তবে সে স্ত্রী তার জন্য হালাল হবে না, যে পর্যন্ত সে অন্য স্বামীর সাথে সংগত না হবে [১]। অতঃপর সে (দ্বিতীয় স্বামী) যদি তালাক দেয় আর তারা উভয়ে (স্ত্রী ও প্রথম স্বামী) মনে করে যে, তারা আল্লাহ্র সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে, তবে তাদের পুনর্মিলনে কারো কোনো অপরাধ হবে না [২]। এগুলো আল্লাহ্র সীমারেখা যা তিনি স্পষ্টভাবে এমন কওমের জন্য বর্ণনা করেন যারা জানে।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আয়াতটি স্পষ্ট যে, দ্বিতীয় বিবাহ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি পূর্ণাঙ্গ বিবাহ হতে হবে। ক্লাসিক্যাল তাফসীর ও হাদিস থেকে প্রমাণিত যে, এর মধ্যে যৌন সঙ্গম অপরিহার্য। এটি নারীকে বাধ্য করে তার শরীরকে অন্য পুরুষের কাছে সমর্পণ করতে, শুধুমাত্র পূর্বের স্বামীর ভুলের জন্য। এই বিধান নারীর যৌন স্বায়ত্তশাসনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
দ্বিতীয় স্বামীর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে
হাদিসে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। সহিহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আয়িশা (রা.)-এর হাদিসে এটি ভালভাবে বর্ণিত আছে। এখানে “স্বাদ আস্বাদন” বলতে স্পষ্টভাবে যৌন সঙ্গম বোঝানো হয়েছে (ক্লাসিক্যাল তাফসীর ও ফিকহ গ্রন্থে একমত)। অর্থাৎ কেবল বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা যথেষ্ট নয়—নারীর শরীরকে দ্বিতীয় পুরুষের দ্বারা “ব্যবহার” করতে হবে। এটি নারীকে যৌন বস্তু হিসেবে হ্রাস করে এবং তার সম্মতি বা মানসিক অবস্থাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১৩: বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ – তিন তালাকপ্রাপ্তা রমণীর বর্ণনা
৩২৯৫-[১] ’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রিফা’আহ্ আল কুরাযী নামে এক সাহাবীর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি রিফা’আহ্-এর বিবাহিতা স্ত্রী ছিলাম, সে আমাকে তিন তালাক দিয়ে সম্পূর্ণ সম্পর্ক নিঃশেষ করে দিয়েছে। অতঃপর ’আব্দুর রহমান ইবনুয্ যাবীর -এর সাথে আমার বিবাহ হয়, কিন্তু তাঁর কাছে এই কাপড়ের আঁচলের মতো ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রিফা’আহ্-এর নিকট ফিরে যেতে চাও? সে বলল, জি, হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, না, যে পর্যন্ত না তুমি তার স্বাদ আস্বাদন (সহবাস) কর এবং সে তোমার স্বাদ আস্বাদন করে। (বুখারী ও মুসলিম)[1]
[1] সহীহ : বুখারী ২৬৩৯, মুসলিম ১৪৩৩, নাসায়ী ৩২৮৩, তিরমিযী ১১১৮, ইবনু মাজাহ ১৯৩২, আহমাদ ২৪০৯৮, ইরওয়া ১৮৮৭।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)
চুক্তি বা ভাড়া করে দ্বিতীয় স্বামী হারাম
ইসলামে পরিকল্পিত হিল্লা বিবাহ (চুক্তি করে দ্বিতীয় বিবাহ) হারাম। এ সম্পর্কে সহিহ হাদিস রয়েছে (বুলুগুল মারাম ৯৯৮, তিরমিযী ১১১৯-১১২০, নাসায়ী ৩৪১৬):
বুলুগুল মারাম
পর্ব – ৮ঃ বিবাহ
পরিচ্ছেদঃ ‘হিল্লা’ বিবাহ করা হারাম
৯৯৮। ইবনু মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তিন তালাক প্রাপ্ত) হালালাকারী ও যার জন্য হালাল করা হয় উভয়ের উপর লানত করেছেন। —তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।[1]
[1] নাসায়ী ৩৪১৬, তিরমিযী ১১১৯, ১১২০, আবূ দাউদ২০৭৬, ইবনু মাজাহ ১৯৩৫, আহমাদ ৪২৭১, ৪২৯৬, দারেমী ২২৫৮।
হিলা বিবাহ ইসলামে নিষিদ্ধ। তালাকদাতা স্বামীর নিকট পুনরায় স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যৌন মিলনের পর তালাক দেয়ার শর্তে কোন ব্যক্তির নিকট সাময়িক বিবাহ দেয়াকে হিলা বিবাহ বলা হয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিবাহকারী ও প্রদানকারী উভয়কে অভিসম্পাত করেছেন। অথচ আমাদের দেশের কিছু মৌলবী আল্লাহর রাসূলের এ অভিসম্পতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে, ঢালাওভাবে এ অনৈতিক বিবাহের প্রচলন বহাল রেখেছে। আল্লাহর রাসূলের ভাষায় এদেরকে ভাড়াটিয়া পাঠা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মূলতঃ সহীহ হাদীসকে অগ্রাহ্য করে এক তহুরে বা এক বৈঠকে তিন তালাককে এক তালাক গণ্য না করে তিন তালাক ধরে নেয়ার কারণে আমাদের দেশে এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড অধিক পরিমাণে সংঘটিত হয়ে থাকে। হানাফী মাযহাবের আলিমদের হাদীস বিরোধী ফাতোয়াও অনেকটা এর জন্য দায়ী। আল্লাহ আমাদের হাদীস অমান্য করা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেছেন- হালালা নামক অভিশপ্ত বিবাহ দ্বারা ঐ স্ত্রী, হালালাকারী ও পূর্বস্বামী কারো জন্য হালাল হবে না। (মিশরীয় টীকা)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রাঃ)
কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা মূল সমস্যার সমাধান করে না। যদি দ্বিতীয় বিবাহ সত্যিকারের হয় এবং দ্বিতীয় স্বামী স্বেচ্ছায় তালাক দেন, তবেই প্রক্রিয়া বৈধ। অর্থাৎ নারীকে বাস্তবিকই অন্য পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে হবে। এটি কোনোভাবেই নারীর মর্যাদা রক্ষা করে না—বরং এটি স্পষ্ট করে যে, নারীর শরীরকে পুরুষের মধ্যে ‘হস্তান্তর’ করার মাধ্যমে তার ‘পবিত্রতা’ বা ‘হালাল’ অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এই ধারণা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চরম রূপ।
উপসংহার
ইসলামের তাহলিল বিধান নারীকে কোনো স্বাধীন মানুষ হিসেবে স্বীকার করে না—বরং তাকে পুরুষের সম্পত্তি ও যৌন বস্তুতে পরিণত করে। পুরুষের ক্ষণিকের রাগ বা আবেগের ফলে উচ্চারিত তিন তালাকের শাস্তি নারীকেই ভোগ করতে হয়: তাকে তার শরীরকে অন্য পুরুষের কাছে সমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়, যাতে সে পূর্বের স্বামীর জন্য পুনরায় ‘ব্যবহারযোগ্য’ হয়। এটি নারীর শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, যৌন সম্মতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবজ্ঞা। কোরআন (২:২৩০) ও সহিহ হাদিসে স্পষ্ট এই বাধ্যবাধকতা থাকা সপ্তম শতাব্দীর পিতৃতান্ত্রিক সমাজের একটি সেকেলে, লিঙ্গবৈষম্যমূলক ও অমানবিক নিয়মকে নির্দেশ করে, যা আধুনিক মানবাধিকার, সম্মতি-ভিত্তিক নৈতিকতা এবং লিঙ্গসমতার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এই বিধান নারীকে চিরকালের জন্য একটি পুরুষনির্ভর ব্যবস্থায় আটকে রাখে এবং তার মর্যাদাকে পদদলিত করে।
