Table of Contents
- 1 পরিচয় ও সংজ্ঞা
- 2 কার্ল সেগানের গ্যারেজের ড্রাগন
- 3 কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট ও ঈশ্বরের ‘অকালিক’ বৈশিষ্ট্য
- 4 এটি কেন একটি যৌক্তিক কুযুক্তি (Fallacy)?
- 5 বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস বনাম এড হক হাইপোথিসিস
- 6 ওকামের ক্ষুর (Occam’s Razor) এবং এড হক
- 7 এড হক হাইপোথিসিস চেনার উপায়
- 8 উপসংহার
পরিচয় ও সংজ্ঞা
‘এড হক’ (Ad Hoc) একটি ল্যাটিন শব্দবন্ধ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো— “এই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে”। জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology) ও বিজ্ঞান দর্শনে ‘এড হক হাইপোথিসিস’ বলতে সাধারণত এমন এক ধরনের কৌশলকে বোঝায়, যেখানে কোনো তত্ত্ব বা দাবি যখন পাল্টা যুক্তি/প্রমাণের মুখে সমস্যায় পড়ে, তখন সেটিকে তৎক্ষণাৎ রক্ষা করার জন্য স্বাধীন প্রমাণ ছাড়াই একটি নতুন শর্ত বা উপকল্প জুড়ে দেওয়া হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য আছে: সব নতুন সহায়ক উপকল্প (Auxiliary Hypothesis) এড হক নয়। বিজ্ঞানে অনেক সময় ব্যাখ্যা উন্নত করতে নতুন সহায়ক উপকল্প যোগ হয়—কিন্তু সেটি তখনই এড হক হয়ে যায়, যখন (ক) সেটির কোনো স্বতন্ত্র/স্বাধীন সমর্থন থাকে না, (খ) সেটি কোনো নতুন টেস্টযোগ্য পূর্বাভাস (testable prediction) তৈরি করে না, এবং (গ) মূল দাবিটিকে খণ্ডন থেকে বাঁচানো ছাড়া আর কার্যকর ভূমিকা রাখে না।
এড হক কৌশলের মূল সমস্যা হলো, এটি অনেক সময় বাস্তব সমস্যা সমাধান না করে সমস্যাটিকে আড়াল করার জন্য একটি নতুন ‘অপ্রমাণিত রহস্য’ তৈরি করে। ফলে তত্ত্বটি বাস্তব যাচাইয়ের (testing) সামনে দাঁড়ানোর বদলে যাচাই-প্রক্রিয়া থেকে পালিয়ে যায়—যা যুক্তির বিচারে একটি গুরুতর যুক্তিগত ত্রুটি বা কুযুক্তির দিকে ঠেলে দেয়।
কার্ল সেগানের গ্যারেজের ড্রাগন
এড হক হাইপোথিসিস বোঝার জন্য বিজ্ঞানী কার্ল সেগানের ‘দ্য ডেমন-হান্টেড ওয়ার্ল্ড’ বইয়ের “গ্যারেজের ড্রাগন” (The Dragon in My Garage) উদাহরণটি দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্রে একটি আকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি মূলত দেখায় যে, কোনো দাবির সত্যতা যাচাই করার প্রক্রিয়ার ভেতরেই যদি নতুন নতুন অপ্রমাণিত শর্ত যুক্ত করা হয়, তবে তা কীভাবে যুক্তিকে কুযুক্তিতে পরিণত করতে পারে।
উদাহরণটি নিম্নরূপ:
ধরা যাক, কেউ দাবি করল— “আমার গ্যারেজে একটি আগুন-মুখো ড্রাগন বাস করে।” আপনি সেই দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে চাইলেন। কিন্তু আপনি গ্যারেজে গিয়ে কোনো ড্রাগন দেখতে পেলেন না।
তখন সেই ব্যক্তি দাবি করল— “আসলে এটি একটি অদৃশ্য ড্রাগন।” (প্রথম এড হক শর্ত)।
আপনি তখন বললেন, “ঠিক আছে, আমরা মেঝেতে ময়দা ছিটিয়ে দিই, ড্রাগনটি হাঁটলে তার পায়ের ছাপ পড়বে।” ব্যক্তিটি পাল্টা যুক্তি দিল, “কোনো লাভ নেই, ড্রাগনটি বাতাসে ভাসমান থাকে।” (দ্বিতীয় এড হক শর্ত)।
আপনি বললেন, “তাহলে ইনফ্রারেড ক্যামেরা দিয়ে তার শরীরের তাপ মাপি।” ব্যক্তিটি উত্তরে বলল, “এই ড্রাগনটি তাপহীন আগুন নির্গত করে, যা কোনো যন্ত্রে ধরা পড়ে না।” (তৃতীয় এড হক শর্ত)।
এই উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে কেন কোনো কিছুর সত্যতা যাচাই/আর্গুমেন্ট/তদন্তের মাঝপথে নতুন অপ্রমাণিত বৈশিষ্ট্য আরোপ করা যুক্তিগতভাবে সমস্যা তৈরি করে:
১. যাচাই প্রক্রিয়া চলাকালীন শর্ত পরিবর্তনের অবৈধতা: আমরা এখানে যাচাই করছি— “ড্রাগনটি আসলেই আছে কি নেই?”। কিন্তু যাচাইয়ের প্রতিটি ধাপে যখনই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তখনই ব্যক্তিটি ড্রাগনের এমন কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য আরোপ করছে (অদৃশ্য হওয়া, ভাসমান থাকা, তাপহীন হওয়া), যেগুলো আগে থেকে প্রমাণিত নয়। অস্তিত্ব প্রমাণের আগেই যদি অস্তিত্বের স্বপক্ষে একের পর এক অপ্রমাণিত শর্ত যোগ করা যায়, তবে কার্যত যে কোনো গালগল্প বা আজগুবি দাবিকেই ‘সত্য’ বলে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়ে যায়।
২. প্রমাণিত বনাম অপ্রমাণিত শর্ত: যুক্তিবিদ্যার একটি মৌলিক নিয়ম হলো— কোনো বিষয় প্রমাণ করতে হলে সেই প্রমাণের প্রতিটি ধাপ বা শর্তকে প্রমাণিত বা যাচাইযোগ্য হতে হবে। কিন্তু এখানে ড্রাগনটি যে ‘অদৃশ্য’ বা ‘তাপহীন’—এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই। এগুলো কেবল মূল দাবিটিকে (ড্রাগন আছে) খণ্ডন হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে তৈরি করা হয়েছে।
৩. খণ্ডনযোগ্যতার অভাব (Lack of Falsifiability): এই পদ্ধতিতে আপনি কখনোই দেখাতে পারবেন না যে ড্রাগনটি সেখানে নেই—কারণ আপনি যখনই তাকে ভুল প্রমাণ করার কোনো পরীক্ষা করবেন, দাবিদার নতুন একটি ‘এড হক’ শর্ত দিয়ে সেই পরীক্ষার পথ বন্ধ করে দেবে। দর্শন ও বিজ্ঞানদর্শনের ভাষায়, যে দাবি কোনো বাস্তব অবস্থাতেই ভুল প্রমাণিত হওয়ার সুযোগ রাখে না, সেটি বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে (falsifiability-র মানদণ্ডে) দাঁড়ায় না—এবং অনেকেই এটিকে অপবিজ্ঞানের (Pseudo-science) বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেন।
৪. সবকিছু প্রমাণের অসারতা: যদি আমরা এই এড হক পদ্ধতিকে বৈধ বলে মেনে নিই, তবে কেউ যদি দাবি করে যে তার মাথায় একটি অদৃশ্য ‘ইউনিকর্ন’ বসে আছে যেটি কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রে ধরা পড়ে না—তবে তাকেও সত্য বলে মানতে হবে। কারণ সেও একইভাবে প্রতিবার আপনার যুক্তিকে এড হক শর্ত দিয়ে আটকে দেবে। অর্থাৎ, এই পদ্ধতিতে যুক্তি দিলে যেকোনো কিছুই প্রমাণ করা সম্ভব, যা যুক্তিশাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্যকেই পরাজিত করে।
কী বদলাল? শুরুতে দাবি ছিল— “ড্রাগন আছে” (যা পরীক্ষা করা যায়)। কিন্তু প্রতিবার পরীক্ষা ব্যর্থ হলে নতুন নতুন শর্ত যোগ করে দাবিটিকে এমন পর্যায়ে নেওয়া হলো, যেখানে দাবিটি কার্যত “পরীক্ষার বাইরে” চলে গেল। এটাই এড হক কৌশলের কেন্দ্রীয় সমস্যা—এটি প্রমাণের পথে না গিয়ে প্রমাণ থেকে পালানোর পথ বানায়।
এই উদাহরণটি আমাদের শেখায় যে, কোনো সত্তার (যেমন: ড্রাগন বা অন্য যেকোনো প্রস্তাবিত সত্তা) অস্তিত্ব প্রমাণের দায়িত্ব দাবিদারের। সেই প্রমাণের ভিত্তি হতে হবে বস্তুগত এবং যাচাইযোগ্য। প্রমাণের অভাবে যখনই ‘রহস্যময়’ বা ‘অপ্রমাণিত’ নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, তখনই সেটি একটি এড হক ফ্যালাসিতে রূপ নেয়। কোনো কিছুকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকে অবশ্যই এড হক অজুহাতের সাহায্য ছাড়া নিজের যৌক্তিক ও প্রমাণিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট ও ঈশ্বরের ‘অকালিক’ বৈশিষ্ট্য
আস্তিক্যবাদী দার্শনিকরা (যেমন: আল-গাজ্জালি বা আধুনিককালে উইলিয়াম লেন ক্রেগ) যখন মহাবিশ্বের উৎপত্তির ব্যাখ্যায় কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট বা কন্টিঞ্জেন্সি আর্গুমেন্ট ব্যবহার করেন, তখন একটি পরিচিত সমস্যা সামনে আসে: অসীম অতীত/অসীম কার্যকারণ-শৃঙ্খলকে তারা সমস্যাজনক মনে করেন। এই জায়গায় সমাধান দিতে গিয়ে প্রায়ই এমন কিছু অতিরিক্ত শর্ত যোগ করা হয়, যা যুক্তিবিদ্যার ভাষায় এড হক হয়ে উঠতে পারে—বিশেষত যদি ওই শর্তগুলোর স্বতন্ত্র প্রমাণ না থাকে বা নতুন টেস্টযোগ্য পূর্বাভাস না দেয়।
যুক্তির স্ববিরোধিতা (The Logical Contradiction)
এই যুক্তির একটি জনপ্রিয় কাঠামো হলো:
- দাবি (একটি প্রচলিত কালামপন্থী দাবি): বাস্তব অসীম (Actual Infinite) সমস্যাজনক/অসম্ভব; যদি অতীতের ঘটনাক্রম বা কার্যকারণ অসীম হয়, তবে সেই অসীম পথ অতিক্রম করে ‘বর্তমান’ মুহূর্তে পৌঁছানো অসম্ভব। সুতরাং, মহাবিশ্বের একটি শুরু বা ‘আদি কারণ’ থাকতেই হবে। (এখানে উল্লেখ্য: “Actual infinite” নিয়ে দর্শন ও গণিত-দর্শনে বিতর্ক আছে; এটি সর্বসম্মত প্রমাণিত সত্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক অবস্থান।)
- বিপরীত প্রশ্ন: যদি ‘অসীম অতিক্রান্ত হওয়া’ অসম্ভব হয়, তবে যাকে ‘আদি কারণ’ বা ঈশ্বর বলা হচ্ছে, তিনিও তো অনাদি বা অসীম বলে ধরা হয়। যদি ঈশ্বর সৃষ্টির আগে অসীম সময় ধরে বিদ্যমান থাকেন, তবে তিনিও তো সেই অসীম পথ পাড়ি দিয়ে ‘সৃষ্টির মুহূর্ত’ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতেন না—একই সমস্যাটি কি এখানে ফিরে আসে না?
ডায়াগ্রামঃ ভৌত অসীম রিগ্রেস (Infinite Regress of Causes)
এই ডায়াগ্রামটি দেখায় যে, বাম দিকে অসীম সংখ্যক কারণ থাকলে তা ‘০’ বিন্দুতে পৌঁছাতে বাধা দেয়—এভাবেই যুক্তিটি উপস্থাপিত হয়।
ডায়াগ্রামঃ অসীম স্রষ্টার কূটাভাস (The Paradox of an Eternal Creator)
এই ডায়াগ্রামটি বিপরীত সমস্যাটি দেখায়—যদি স্রষ্টাও অনাদি বা অসীম হন, তবে একই “অসীম পথ” অতিক্রমের প্রশ্ন তার ক্ষেত্রেও উঠতে পারে।
এড হক সমাধান: ঈশ্বর ‘সময়ের ঊর্ধ্বে’
এই “বুমেরাং” সমস্যার জবাবে অনেক আস্তিক্যবাদী দাবি করেন— “ঈশ্বর সময়ের ভেতরে নেই, তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে বা অকালিক (Timeless)।” অর্থাৎ, মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে যে “সময়/অতীত”–সম্পর্কিত শর্ত আরোপ করা হয়, ঈশ্বরের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়—এটাই তাদের প্রস্তাবিত সমাধান। এখন প্রশ্ন হলো—এই দাবিটি কেন এরকম ক্ষেত্রে এড হক হাইপোথিসিস হিসেবে দেখা যায়, এবং যুক্তিগতভাবে এটি কোথায় সমস্যায় পড়ে? আসুন বিশ্লেষণ করিঃ
ক) প্রমাণের পরিবর্তে নতুন রহস্য (Mystery as a Solution)
আমরা এখানে যাচাই করছি যে, মহাবিশ্বের আদি কারণ হিসেবে কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি না। এই যাচাইয়ের মাঝপথে যখন ‘অসীমতা’ বা ‘সময় অতিক্রম’-এর সমস্যা সামনে আসে, তখন স্বাধীন প্রমাণ ছাড়াই “ঈশ্বর সময়ের বাইরে” নামক একটি নতুন শর্ত আরোপ করা হলো। এটি কার্ল সেগানের ড্রাগন উদাহরণের মতো—যখনই সত্তাটিকে ধরতে/টেস্ট করতে যাচ্ছেন, তখনই তাকে এমনভাবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে যাতে টেস্ট অকার্যকর হয়ে যায়। যুক্তিবিদ্যায়, যা প্রমাণ করতে চাওয়া হচ্ছে, সেই প্রমাণের মধ্যেই অপ্রমাণিত শর্ত ঢুকিয়ে দেওয়া যুক্তিকে দুর্বল করে। কারণ এটি দাবী করতে হলে তো ঈশ্বর সময়ের উর্ধ্বে, এটির প্রমাণও দিতে হবে। যেখানে এখনো ঈশ্বরী প্রমাণ হয়নি, সেখানে ঈশ্বর যে সময়ের উর্ধ্বে তা কীভাবে কেউ প্রমাণ করবে?
খ) বিশেষ পক্ষপাত বা স্পেশাল প্লিডিং (Special Pleading)
এখানে একই যুক্তিতে দুই ধরনের মানদণ্ড ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে নিয়ম করা হচ্ছে—“অসীম অতীত/অসীম কার্যকারণ অতিক্রম করা অসম্ভব”, কিন্তু ঈশ্বরের ক্ষেত্রে একই নিয়ম তুলে নেওয়া হচ্ছে এই দাবি করে যে— “তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে”। যদি এই ব্যতিক্রমের পক্ষে স্বতন্ত্র যুক্তি/প্রমাণ না থাকে, তবে এটিকে স্পেশাল প্লিডিং ফ্যালাসি হিসেবে দেখা যায়।
গ) ক্রিয়াশীলতার কূটাভাস (The Paradox of Action)
ধরা যাক, আমরা মেনে নিলাম যে ঈশ্বর ‘সময়-সম্পর্কহীন’। তাহলে আরেকটি প্রশ্ন আসে: “সৃষ্টি করা” বা “ইচ্ছা করে কোনো নতুন অবস্থা তৈরি করা”—এগুলোকে সাধারণত পরিবর্তন/প্রক্রিয়া (Process) হিসেবে ধরা হয়, যার সাথে “আগে-পরে” বা ধারাবাহিকতার ধারণা জড়িয়ে থাকে। সময়-সম্পর্কহীন কোনো সত্তা কীভাবে সময়ের মধ্যে কোনো কাজ শুরু করে?
- সৃষ্টি করার আগে ঈশ্বর কি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
- ‘আগে’ এবং ‘পরে’ শব্দগুলোই সময়-ধারণার ওপর নির্ভর করে।
- যদি ঈশ্বর সময়ের বাইরে স্থির/অপরিবর্তনীয় (Static) হন, তবে “শুরু করা” অর্থাৎ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর—কীভাবে ঘটবে?
এই কারণে সমালোচকেরা বলেন, “সময়-সম্পর্কহীন ঈশ্বর” ধারণাটি অসীমতার সমস্যা এড়াতে গিয়ে নতুন একটি গভীর সমস্যা তৈরি করে—যার সমাধান আবার নতুন শর্ত যোগ না করে করা কঠিন।
ঘ) সম্ভাব্য আস্তিক্যবাদী জবাব এবং তার জটিলতা
এখানে একটি প্রচলিত জবাব হলো: “ঈশ্বর সৃষ্টি-হীন অবস্থায় timeless ছিলেন; সৃষ্টি করার সাথে সাথে তিনি সময়ের সাথে সম্পর্কিত (temporal) হলেন।” এই জবাবটি শুনতে সমাধান মনে হলেও সমালোচকেরা সাধারণত দুইটি প্রশ্ন তোলেন: (১) timeless অবস্থা থেকে temporal অবস্থায় যাওয়া নিজেই কি একটি পরিবর্তন নয়? (২) যদি পরিবর্তন ঘটে, তবে “পরিবর্তনহীন/সময়-সম্পর্কহীন” শর্তটি কি আবারও সংশোধন করতে হচ্ছে না?—এখানেই এড হক সংশোধনের অভিযোগ ফিরে আসে।
কেন এটি গ্রহণ করা যাবে না?
যুক্তিবিদ্যার বিচারে কোনো কিছু প্রমাণ করতে হলে সেই প্রমাণের প্রতিটি উপাদানকে প্রমাণিত বা যুক্তিসংগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। ঈশ্বর আছেন কি না তা যাচাই করার সময় যদি আমরা এমন সব শর্ত (যেমন: সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা, অনাদিত্ব) ব্যবহার করি যা নিজেরাই অপ্রমাণিত—এবং যা মূল যুক্তিকে বাঁচাতে কেবল যুক্ত হচ্ছে—তবে সমালোচকের দৃষ্টিতে যুক্তিটি বৃত্তীয় যুক্তি (Circular Reasoning) বা অন্তত দুর্বল ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।
এড হক হাইপোথিসিস ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো দাবিকে “টেস্টের বাইরে” সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু দর্শন ও বিজ্ঞানদর্শনের ভাষায়, যদি কোনো দাবির পক্ষে বারবার এমন অজুহাতই যোগ করতে হয় যা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নয়, তবে সেই দাবির ব্যাখ্যামূল্য (explanatory value) কমে যায়। কন্টিঞ্জেন্সি/কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টে ঈশ্বরকে সময়ের ঊর্ধ্বে স্থাপন করা অনেক সময় তাই “সমাধান” না হয়ে “সমস্যা এড়ানোর কৌশল”—এমন অভিযোগের মুখে পড়ে।
এটি কেন একটি যৌক্তিক কুযুক্তি (Fallacy)?
একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক তত্ত্বকে ফ্যালসিফিয়েবল (Falsifiable) বা ‘ভুল প্রমাণযোগ্য’ হওয়ার দিকে এগোতে হয়—অর্থাৎ বাস্তবে কোন পর্যবেক্ষণ/পরীক্ষা হলে সেটি ভুল হতে পারে, এমন শর্ত অন্তত কল্পনা করা যায়। কিন্তু এড হক হাইপোথিসিস যুক্ত করার মাধ্যমে একটি দাবিকে এমনভাবে বদলে ফেলা হয়, যেন সেটিকে আর কোনোভাবেই ভুল প্রমাণ করা না যায়। এতে প্রমাণের দায়ভার (Burden of Proof) কার্যত এড়িয়ে যাওয়া হয়, এবং কোনো নতুন তথ্য যোগ না করেই পুরনো দাবিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়।
বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস বনাম এড হক হাইপোথিসিস
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, বিজ্ঞানে তো নতুন নতুন শর্ত যোগ করা হয়—তবে সেটি কেন ফ্যালাসি নয়? পার্থক্যটি হলো— বিজ্ঞানে যখন কোনো নতুন সহায়ক শর্ত (Auxiliary Hypothesis) যোগ করা হয়, আদর্শভাবে সেটি এমনভাবে যোগ হয় যেন সেটি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা যায় এবং প্রায়ই নতুন পূর্বাভাসও দেয়। যেমন: নেপচুন গ্রহটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ইউরেনাসের কক্ষপথের বিচ্যুতি ব্যাখ্যা করার জন্য—এটি “শুধু বাঁচানোর অজুহাত” ছিল না, কারণ গাণিতিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়া গিয়েছিল এবং পরে দূরবীন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেও তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু ‘এড হক হাইপোথিসিস’ অনেক সময় এমনভাবে সাজানো হয় যাতে তা কোনোভাবেই পরীক্ষা বা খণ্ডন (Falsify) করা সম্ভব নয়—এবং কোনো নতুন, স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য পূর্বাভাসও দেয় না। ফলে যুক্তি একটি বদ্ধ বৃত্তের মধ্যে আটকে যায়।
ওকামের ক্ষুর (Occam’s Razor) এবং এড হক
এড হক হাইপোথিসিসের একটি বড় সমালোচনামূলক মানদণ্ড হলো ‘ওকামের ক্ষুর’ নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো ঘটনার ব্যাখ্যায় যদি একাধিক বিকল্প থাকে, তবে (অন্যান্য শর্ত সমান হলে) সবচেয়ে কম অপ্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত ও সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যাটিই তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য ধরা হয়।
একটি এড হক যুক্তি কোনো তত্ত্বকে রক্ষা করতে গিয়ে অসংখ্য অপ্রমাণিত পূর্বশর্ত তৈরি করতে পারে (যেমন: সময়ের বাইরে থাকা, বিশেষ ব্যতিক্রম, ধরা না পড়ার বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি)। এতে ব্যাখ্যা ক্রমশ জটিল হয়, কিন্তু টেস্টযোগ্যতা/স্বাধীন প্রমাণ বাড়ে না—ফলে তত্ত্বটি তার গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
এড হক হাইপোথিসিস চেনার উপায়
কোনো যুক্তি এড হক কিনা তা বোঝার জন্য নিচের প্রশ্নগুলো করা যেতে পারে:
- প্রমাণের অভাব: নতুন যে শর্তটি দেওয়া হলো, তার কি আলাদা কোনো স্বাধীন প্রমাণ আছে? নাকি এটি কেবল মূল দাবিটিকে বাঁচাতে ব্যবহৃত হচ্ছে?
- অখণ্ডনযোগ্যতা (Unfalsifiability): এই নতুন শর্তটি যুক্ত করার ফলে কি দাবিটিকে আর কোনোভাবেই ভুল প্রমাণ করার সুযোগ থাকছে না? (যেমন: “আমার ঘরে একটি ড্রাগন আছে কিন্তু সেটি অদৃশ্য ও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে”—এটি এড হক হওয়ার শক্ত লক্ষণ)।
- ওকামের ক্ষুর (Occam’s Razor) লঙ্ঘন: ব্যাখ্যাটি কি অযথা জটিল হয়ে পড়ছে? সরল ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও কি অতিরিক্ত অপ্রমাণিত শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে?
- নতুন টেস্টযোগ্য পূর্বাভাস: যোগ করা শর্তটি কি নতুন কোনো পরীক্ষাযোগ্য পূর্বাভাস তৈরি করছে—যেটি আলাদাভাবে যাচাই করা যায়? যদি না করে, এবং কেবল “খণ্ডন আটকাতে” কাজ করে, তবে সেটি এড হক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
উপসংহার
এড হক হাইপোথিসিস অনেক সময় বুদ্ধিদীপ্ত “অস্থায়ী প্যাঁচ” হিসেবে কাজ করে—কিন্তু যুক্তিগতভাবে এটি সতর্কভাবে না দেখলে সহজেই তত্ত্বকে টেস্টের বাইরে সরিয়ে দিতে পারে। এর ফলে প্রমাণের দায়ভার (Burden of Proof) এড়ানো, খণ্ডনযোগ্যতা কমে যাওয়া, এবং ব্যাখ্যাকে অযথা জটিল করে তোলার ঝুঁকি তৈরি হয়। যখনই আমরা দেখব কোনো একটি তত্ত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য একের পর এক এমন সব বৈশিষ্ট্য বা শর্ত আরোপ করা হচ্ছে যার কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই এবং যা নতুন টেস্টযোগ্য পূর্বাভাসও দিচ্ছে না—তখনই বোঝা যায়, আমরা একটি সম্ভাব্য ‘এড হক’ কুযুক্তির সম্মুখীন। মহাবিশ্বের উৎপত্তি-আলোচনায় “সময়-সম্পর্কহীন/অকালিক ঈশ্বর” ধারণাটি এই আলোচনার একটি পরিচিত উদাহরণ—কারণ এটি সমাধান দিতে গিয়ে প্রায়ই নতুন জটিল প্রশ্ন সামনে আনে, যা আবার অতিরিক্ত শর্ত যোগ করে সামাল দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
