নবীর ভুল ভবিষ্যদ্বাণীঃ বালকের বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে কিয়ামত হবে

Table of Contents

ভূমিকা

ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী—বিশেষ করে “কিয়ামতের সময়” নিয়ে করা বক্তব্য—মূলত এক ধরনের জ্ঞান-দাবি (knowledge claim): এগুলো বাস্তব জগতের সময়, ঘটনা, মানবসমাজ এবং ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উপস্থাপিত হয়। তাই এগুলোকে জ্বীন-ফেরেশতা, জান্নাত-জাহান্নামের মতো “অধরা আধ্যাত্মিক” বলে পাশ কাটিয়ে দেওয়া যুক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। যখন কোনো বক্তব্যে নির্দিষ্ট ইঙ্গিত থাকে—“কিয়ামত কখন”, “কিয়ামত ঘনিয়ে এসেছে”, “অমুক ঘটনার আগে”—তখন সেটি স্বভাবতই যাচাইযোগ্য দাবির দিকে চলে যায়।

এই ধরনের দাবির যাচাইয়ের মৌলিক মানদণ্ড খুব সরল: বক্তব্যটি কি তার স্বাভাবিক অর্থে (plain reading) পরে বাস্তবে মিলেছে, নাকি ব্যর্থতা দেখা দিলে অর্থকে নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে সরিয়ে, শব্দের মানে বদলে, বা ভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট টেনে এনে দাবিটিকে ধীরে ধীরে প্রমাণ-অযোগ্য (unfalsifiable) করে তোলা হয়েছে? অর্থাৎ বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার মানসিক চাপে ভবিষ্যদ্বাণীর শাব্দিক অর্থে “রেসকিউ-শিফট” ঘটিয়ে নবীদের উদ্ধার করা হয়েছে কি না—এটাই এখানে মূল প্রশ্ন।

এই অংশে আমরা কিছু প্রসিদ্ধ হাদিসের ভাষা ও বর্ণনা ধরে বিশ্লেষণ করব—“কিয়ামত” ঘনিয়ে আসার দাবি, যুদ্ধের রূপকল্প, এবং সময়-অ্যাঙ্করযুক্ত বাক্য (যেমন “বালক বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগে”)—এসবের মধ্যে আসলে কতটা ভবিষ্যতজ্ঞান রয়েছে, আর কতটা সমকালীন কল্পনা ও পরবর্তীকালের প্রতিরক্ষামূলক ব্যাখ্যা।


অ্যাপোক্যালিপ্টিক ধারণার সামাজিক-রাজনৈতিক কার্যকারিতা

ধর্মীয় ইতিহাসে “শেষ যুগ”, “জগতের অবসান”, “মহাবিপর্যয়” বা “শেষ বিচারের দিন”—এই জাতীয় ধারণা (শেষকালের তত্ত্ব/ইস্কাতোলজি — eschatology) অস্বাভাবিক কিছু নয়; বরং বারবার ফিরে আসা একটি পুনরাবৃত্ত কাঠামো। নানা ধর্মে “শেষ সময়” সম্পর্কে বিভিন্ন ভাষা, প্রতীক, দেবতা বা নৈতিক বিধানের পার্থক্য থাকলেও, কাঠামোটি প্রায় একই থাকে: (ক) বর্তমান যুগ নৈতিকভাবে অধঃপতিত, (খ) শিগগিরই এক আকস্মিক ও ভয়াবহ হস্তক্ষেপ/ধ্বংস/বিচার আসবে, (গ) যারা “সঠিক দল/বিশ্বাসে” আছে তারা রক্ষা পাবে, বাকিরা শাস্তি পাবে বা ধ্বংস হবে। [1] [2]

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয়—এই “কিয়ামত আসন্ন” কল্পনা কেবল আব্রাহামিক ধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়, বেশিরভাগ ধর্মেরই মৌলিক ধারনা। জরথ্রুস্ট্রবাদে (Zoroastrianism) ফ্রাশোকেরেতি (Frashokereti) নামে “বিশ্বের চূড়ান্ত পুনর্নবীকরণ/চূড়ান্ত পুনরুদ্ধার” ধারণা আছে, যেখানে অশুভ শক্তির পরাজয় ও সৃষ্টির পুনর্গঠনকে শেষ অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। [3] [4] নর্স পুরাণে (Norse mythology) র‍্যাগনারক (Ragnarök)—দেবতা-দানব-দৈত্যদের চূড়ান্ত যুদ্ধ, বিশ্বধ্বংস এবং তারপর নতুন করে বিশ্ব “পুনর্জন্ম” নেয়—এটিও একই ধরনের “শেষ/পুনর্গঠন” কাঠামো। [5] আর আব্রাহামিক ধর্মগুলোতে (ইহুদি, খ্রিস্টান, ইসলাম) “শেষ সময়” আরও কেন্দ্রীয়: বিচার, পুনরুত্থান, ন্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা, এবং “সঠিক পথ”–এর অনুসারীদের মুক্তি—এগুলো প্রায়ই একসাথে জুড়ে যায়। [6]

এই সার্বজনীন পুনরাবৃত্তি একটা গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে কার্যকর এক মনস্তাত্ত্বিক প্রযুক্তি (psychological technology) হিসেবে কাজ করে। কারণ “ভয়” আর “জরুরিত্ব” (urgency) মানুষের সিদ্ধান্তকে দ্রুত এবং দল-কেন্দ্রিক করে তোলে:

  • মানুষ “দূর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা” কম করে; “এখনই বাঁচো/এখনই মানো”—এই মানসিকতা বাড়ে।
  • গোষ্ঠীর ভেতরে সংহতি (group cohesion) বাড়ে, বাইরের লোকদের প্রতি সন্দেহও বাড়তে পারে।
  • নেতার নির্দেশ “জরুরি সত্য” হয়ে ওঠে—কারণ সময় নাকি খুব কম।

এজন্যই সমাজবিজ্ঞানে ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, ক্ষমতা-বৈধতা (power legitimation) ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের (social control) একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবেও আলোচনা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে Annual Review of Sociology–এর “Religion and Political Legitimation” প্রবন্ধে দেখানো হয়—ধর্ম ক্ষমতা ও সুবিধাভোগী কাঠামোকে বৈধতা দিতে পারে, আবার প্রতিবাদও তৈরি করতে পারে; অর্থাৎ ধর্মের “দ্বৈত ভূমিকা” (double function) আছে। [7] এই প্রক্রিয়াকে “শেষ-যুগবাদ/অ্যাপোক্যালিপ্টিকতা (apocalypticism)” আরও তীব্র করে। কারণ এখানে ভয় কেবল নৈতিক ভয় নয়—এটা “এই বুঝি সব শেষ”–জাতীয় অস্তিত্বগত আতঙ্ক। ইতিহাসে “হাজার-বছরবাদী/মিলেনারিয়ান (millenarian)” আন্দোলনগুলো প্রায়ই সংকট, অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতার সময়ে জোরালো হয়; এবং “শেষ সময়”–এর ভাষা দিয়ে তারা দ্রুত গণসমর্থন, শৃঙ্খলা, এমনকি সহিংসতাও উসকে দিতে সক্ষম হয়েছে—এটা নরম্যান কোনের The Pursuit of the Millennium–এ মধ্যযুগীয় ইউরোপের নানা আন্দোলনের আলোচনায় ধরা পড়ে। [8]

আর আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে কার্ল মার্কসের বিখ্যাত বাক্য “ধর্ম হলো জনগণের আফিম” (opium of the people)–ও এই কার্যকারিতার কথাই বলে—ধর্ম মানুষের বাস্তব কষ্টের মাঝে একধরনের মানসিক “মলম/ব্যথানাশক” (painkiller) হতে পারে, কিন্তু একই সাথে তা ক্ষমতার কাঠামোকে ঢেকে দিতে পারে। [9] [10]

সব মিলিয়ে যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, “এই বুঝি শেষ এসে গেল”—জাতীয় বার্তা যুগে যুগে টিকে আছে শুধু ধর্মতাত্ত্বিক সত্য-দাবির কারণে নয়, বরং কারণ এটি মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা, এবং গোষ্ঠীগত আনুগত্যকে দ্রুত সংগঠিত করতে পারে। এ ধরনের বয়ান যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে পরীক্ষা করলে অনেক সময় দেখা যায়—প্রাথমিক “সময়ঘনিষ্ঠ” দাবিগুলো টিকিয়ে রাখতে পরে পুনঃব্যাখ্যা, প্রতীকীকরণ, বা অর্থ-সরানো দরকার হয়।


নবী মুহাম্মদের ভুল ভবিষ্যদ্বাণী

কিয়ামতের পূর্বের যুদ্ধে অশ্বারোহী?

আমরা যারা নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখি, তারা সবাই বুঝি যে, ভবিষ্যতের পৃথিবী এবং যুদ্ধবিগ্রহগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হবে ভারী অস্ত্রশস্ত্র, রোবট, বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বারা। মজার বিষয় হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ কিয়ামতের পূর্বে যেই যুদ্ধ হবে তার ভবিষ্যতবাণী করতে গিয়ে বহুস্থানেই ঘোড়ায় চড়ে, বর্শা এবং তরবারির সাহায্যে যুদ্ধের কথা বলা আছে। অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ কখনো ভাবতেও পারেনি, পৃথিবী এতদিন পর্যন্ত টিকবে, জ্ঞান বিজ্ঞানের এত প্রসার ঘটবে এবং মানুষ এত এত আবিষ্কার করবে। নইলে ঘোড়ায় চড়ে, বর্শা ঢাল আর তরবারি নিয়ে যুদ্ধের কথা বলতেন না। আসুন অতীতের যুদ্ধ বনাম ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেমন হবে তার দুইটি AI দ্বারা তৈরি কাল্পনিক ছবি দেখি,

ভুল
ছবি: ৭ম শতকের আরব যুদ্ধের কাল্পনিক চিত্র (হাদিসের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)
ভুল 1
ছবি: আধুনিক/ভবিষ্যত যুদ্ধের কাল্পনিক চিত্র (হাদিসের বিবরণের সাথে কোন মিল নেই)

এবারে আসুন একটি হাদিস পড়ি,

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ১০. রোমনদের সংখ্যাধিক্যের অবস্থায় কিয়ামত সংঘটিত হবে
৭০১৭। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা ও আলী ইবনু হুজর (রহঃ) … উসায়র ইবনু জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার কুফা নগরীতে লাল (উত্তপ্ত) ঝঞ্ঝা বায়ু প্রবাহিত হল। এ সময় এক ব্যক্তি কুফায় আসল। তার কথার ’মুদ্রাদোষ’ ছিল ’আলা’ হে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ! কিয়ামত এসে গেছে। তিনি (আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ) যেভাবে বসে ছিলেন সেভাবেই বসে রইলেন এবং বললেন কিয়ামত কায়িম হবে না, যতক্ষন না উত্তরাধিকার সম্পদ অবণ্টিত থাকবে এবং যতক্ষন না লোক গনীমতে আনন্দিত হবে না। অতঃপর তিনি তার হস্ত দ্বারা সিরিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, আল্লাহর শত্রুরা সমবেত হবে মুসলিমদের সাথে লড়াই করার জন্য এবং মুসলিমগণও তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হবে।
(এ কথা শুনে) আমি বললাম, আল্লাহর শত্রু বলে আপনাদের উদ্দেশ্য হল রোমীয় খ্রীষ্টান সম্প্রদায়। তিনি বললেন, হ্যাঁ এবং তখন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তখন মুসলিম সম্প্রদায় একটি দল অগ্রে প্রেরণ করবে, তারা মৃত্যুর জন্য সামনে অগ্রসর হবে। জয়লাভ করা ব্যতিরেকে তারা পেছনে ফিরবে না। এরপর পরস্পর তাদের মাঝে যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ করতে করতে রাত হয়ে যাবে। অতঃপর উভয় পক্ষের সৈন্য জয়লাভ করা ব্যতিরেকেই ফিরে চলে যাবে। যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের যে দলটি অগ্রে এগিয়ে গিয়েছিল তারা সকলেই মরে যাবে। অতঃপর পূর্ববর্তী দিন মুসলিমগণ মৃত্যুর জন্য অপর একটি দল অগ্রে প্রেরণ করবে। তারা বিজয়ী না হয়ে প্রত্যাবর্তন করবে না। এদিনও পরস্পরের মাঝে মারাত্মক যুদ্ধ হবে। অবশেষে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। উভয় বাহিনী জয়লাভ করা ব্যতীতই নিজ নিজ শিবিরে ফিরে আসবে। দলটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। অতঃপর তৃতীয় দিন পুনঃরায় মুসলিমগণ মৃত্যুর জন্য একটি বাহিনী পাঠাবে। যারা বিজয়ী না হয়ে ফিরবে না। সে দিন পৃথিবীর সর্বোত্তম অশ্বারোহী দলের অন্তর্ভুক্ত হবে তারা।
এ যুদ্ধ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকবে। অবশেষে জয়লাভ করা ব্যতিরেকেই এ দল ও ঐ দল ফিরে যাবে। (তবে মুসলিম বাহিনীর সামনের) সেনাদলটি শেষ হয়ে যাবে। এরপর যুদ্ধের চতুর্থ দিবসে অবশিষ্ট মুসলিমগণ সকলেই যুদ্ধের জন্য সম্মুখ পানে এগিয়ে যাবে। সেদিন কাফিরদের উপর আল্লাহ তায়ালা অমঙ্গল চক্র চাপিয়ে দিবেন। অতঃপর এমন যুদ্ধ হবে যা জীবনে কেউ দেখবেনা অথবা যা জীবনে কেউ দেখেনি। অবশেষে তাদের শরীরের উপর পাখী উড়তে থাকবে। পাখী তাদেরকে অতিক্রম করবে না; এমতাবস্থায় তা মাটিতে পড়ে মরে যাবে। একশ মানুষ বিশিষ্ট পূর্ন পুরুষদের একটি গোত্র, এদের থেকে মাত্র এক ব্যক্তি বেঁচে থাকবে। এমতাবস্থায় কেমন করে গনীমতের সম্পদ নিয়ে লোকেরা আনন্দ উৎসব করবে এবং কেমন করে উত্তরাধিকার সম্পদ বন্টন করা হবে।
মুসলিমগণ এ সময় আরেকটি ভয়াবহ বিপদের সংবাদ শুনতে পাবে এবং এ মর্মে একটি আওয়াজ তাদের নিকট পৌছবে যে, দাজ্জাল তাদের পেছনে তাদের পরিবার পরিজনের মধ্যে চলে এসেছে। এ সংবাদ শুনতেই তারা হাতের সমস্ত কিছু ফেলে দিয়ে রওয়ানা হয়ে যাবে এবং দশজন অশ্বারোহী ব্যক্তিকে সংবাদ সংগ্রাহক দল হিসাবে প্রেরণ করবে।রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দাজ্জালের সংবাদ সংগ্রাহক দলের প্রতিটি ব্যক্তির নাম, তাদের বাপ-দাদার নাম এবং তাদের অশ্বের রং সম্পর্কেও আমি অবগত আছি। এ পৃথিবীর সর্বোত্তম অশ্বারোহী দল সেদিন তারাই হবে। অথবা (বলেছেন) ইবন আবু শায়বা (তার) রিওয়ায়াতের মধ্যে يُسَيْرِ بْنِ جَابِرٍ এর পরিবর্তে أُسَيْرِ بْنِ جَابِرٍ বর্ণনা করে ছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উসায়র ইবনু জাবির (রাঃ)

উপরের এই হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, মুহাম্মদের ধারণা ছিল, ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করার সময়কালের মধ্যেই কিয়ামত হয়ে যাবে। তার এই বিষয়টি বোধগম্য হয়নি যে, ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের যুগ একদিন শেষ হয়ে যাবে, আর কেউ ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধে যাবে না।


কিয়ামতের পুর্বে তরবারির যুদ্ধ?

এবারে আসুন কিয়ামতের পূর্বের যুদ্ধে অস্ত্রও হিসেবে তরবারির ব্যবহার সম্পর্কে একটি হাদিস পড়ি। উল্লেখ্য, এরকম হাদিসের সংখ্যা অনেক [11]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ৯. ইস্তাম্বুল বিজয়, দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ এবং ঈসা ইবন মারয়াম (আঃ) এর অবতরণ
৭০১৪। যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত কায়েম হবে না যতক্ষন পর্যন্ত না রোমান সেনাবাহিনী ’আমাক’ অথবা ’দাবিক’ নগরীতে অবতরণ করবে। তখন তাদের মুকাবিলায় মদীনা হতে এ পৃথিবীর সর্বোত্তম মানুষের এক দল সৈন্য বের হবে। অতঃপর উভয় দল সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান হবার পর রোমানরা বলবে, তোমরা ঐ সমস্ত লোকদের পৃথক করে দাও, যারা আমাদের লোকদের মধ্যে যাদের বন্দী করেছে। আমরা তাদের সাথে লড়াই করবো।
তখন মুসলিমগণ বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরা আমাদের ভাইদের থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হবো না। অবশেষে তাদের পরস্পর যুদ্ধ হবে। এ যুদ্ধে মুসলিমদের এক তৃতীয়াংশ সৈন্য পালিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা কখনো তাদের তাওবা কবুল করবেন না। সৈন্যদের এক তৃতীয়াংশ নিহত হবে এবং তারা হবে আল্লাহর নিকট শহীদানের মাঝে সর্বোত্তম শহীদ। আর সৈন্যদের অপর তৃতীয়াংশ বিজিয়ী হবে। জীবনে আর কখনো তারা ফিতনায় আক্রান্ত হবে না। তারাই ইস্তাম্বুল জয় করবে। তারা নিজেদের তরবারী যায়তুন বৃক্ষে লটকিয়ে যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ বন্টন করতে থাকবে। এমতাবস্থায় তাদের মধ্যে শয়তান চিৎকার করে বলতে থাকবে- দাজ্জাল তোমাদের পেছনে তোমাদের পরিবার-পরিজনের মধ্যে চলে এসেছে।
এ কথা শুনে মুসলিমরা সেখান থেকে বের হবে। অথচ এটি মিথ্যা খবর। তারা যখন সিরিয়া পৌছবে তখন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। যখন মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে এবং সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হতে শুরু করবে তখন সালাতের সময় হবে। অতঃপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) অবতরণ করবেন এবং সালাতে তাদের ইমামত করবেন। আল্লাহর শত্রু তাকে দেখামাত্রই বিগলিত হয়ে যাবে যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি ঈসা (আলাইহিস সালাম) কাউকে এমনিই ছেড়ে দেন তবে সেও নিজে নিজেই বিগলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশ্য আল্লাহ তাআলা ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর হাতে তাকে হত্যা করবেন এবং তার রক্ত ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর বর্শাতে তিনি তাদেরকে দেখিয়ে দিবেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)


কিয়ামত অতি সন্নিকটেঃ এই বুঝি এসে গেল

কোরআনে খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত অতি সন্নিকটে [12]

ক্বিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চন্দ্র খন্ডিত হয়েছে,
— Taisirul Quran
কিয়ামাত আসন্ন, চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে,
— Sheikh Mujibur Rahman
কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে।
— Rawai Al-bayan
কিয়ামত কাছাকাছি হয়েছে [১], আর চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে [২],
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

বিভিন্ন হাদিস থেকেও নবী মুহাম্মদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, কিয়ামত খুবই সন্নিকটে। নবী মুহাম্মদ বলেছিলেন, কিয়ামত খুবই কাছে [13]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪০। আবূ গাসসান মিসমাঈ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি এবং কিয়ামত প্রেরিত হয়েছি এ দুটির মত। রাবী বলেন (এ সময়) তিনি তার শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুলিকে একত্রিত করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আবার, নবী মুহাম্মদই একবার সূর্যগ্রহণ দেখে এমন ভয় পেয়েছিল যে, সে ভেবেছিল কিয়ামত বুঝি হয়েই যাচ্ছে। আজকালকার বাচ্চা ছেলেপেলেরাও সূর্যগ্রহণ কী তা জানে এবং বোঝে। তারা সূর্যগ্রহণের সময় কোন ভয় পায় না। সূর্যগ্রহণ দেখে তাকে কিয়ামত ভেবে নবীর এরকম আতঙ্কে অস্থির হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, সেই তার জীবদ্দশাতেই কিয়ামত হয়ে যাবে এরকম ভয় করছিলেন। কেন, সেই সময়ে জিবরাইল কোথায় ছিল? তার তো এসে বলা উচিত ছিল, হে নবী, এটি একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা, ভয়ের কিছু নেই। আসুন হাদিসটি পড়ি, [14] [15]

মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী
১৬. কিতাবুল কুসুফ (সূর্যগ্রহণের বর্ণনা)
পরিচ্ছেদঃ সূর্যগ্রহণের সময় যিকির করা
আলোকিত প্রকাশনী নাম্বারঃ ৫৬০, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ১০৫৯
৫৬০: আবু মুসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃএকদা সূর্যগ্রহণ হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দন্ডায়মান হলেন। তিনি কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাওয়ার ভয় করছিলেন। তিনি মসজিদে আগমণ করলেন। তিনি এত লম্বা কিয়াম, রুকূ এবং সিজদা করলেন যা আমি তাঁকে আর কখনও এরূপ করতে দেখিনি। তিনি বললেনঃ এ সমস্ত নিদর্শন কারো জন্ম গ্রহণ বা মৃত্যু বরণ করার কারণে প্রেরিত হয় না; বরং আল্লাহ তাআলা এগুলোর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদেরকে ভয় দেখিয়ে থাকেন। তোমরা যখন কোন নিদর্শন দেখতে পাবে তখন তোমরা আল্লাহর যিকির, তাঁর নিকট দু’আ করা এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার দিকে ধাবিত হও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)

ভুল 3

এবারে আসুন আরেকটি হাদিস দেখি। এই হাদিসের শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব চোখে পড়ে: নবী সকালে দাজ্জালের কথা বলার সময় কখনও তাকে তুচ্ছ করে দেখান, আবার কখনও অত্যন্ত বড় বিপদ হিসেবে তুলে ধরেন। এই “উঠা–নামা” বর্ণনার ফলে শ্রোতাদের মনে বার্তাটা এমনভাবে গেঁথে যায়—দাজ্জালের আবির্ভাব যেন খুব দূরের কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং নিকট ভবিষ্যতেই ঘটতে পারে এমন বাস্তব আশঙ্কা। দাজ্জালকে তারা এতটাই কাছাকাছি মনে করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত ধারণা করতে শুরু করে—দাজ্জাল বুঝি এই খেজুরবাগানের মধ্যেই কোথাও আছে। অর্থাৎ বর্ণনাটি তাদের মনে “এটা সামনে, খুব কাছে” ধরনের বাস্তব উপস্থিতির অনুভূতি তৈরি করেছিল।

এটা এক ধরনের রেটোরিকাল কৌশল: হুমকিকে কখনও ছোট, কখনও বড় করে দেখিয়ে শ্রোতার ভেতরে অনিশ্চয়তাজনিত আতঙ্ক (uncertainty-driven fear) তৈরি করা। ফলে দাজ্জাল “দূরের গল্প” হয়ে থাকে না; বরং “এখনই/শিগগিরই ঘটতে পারে”—এমন সম্ভাব্য আসন্ন বাস্তবতা হিসেবে অনুভূত হয়। একই ধারার মধ্যে নবীর বক্তব্য—“আমি তোমাদের মাঝে থাকলে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করবো”—এটাও ইঙ্গিত করে যে তিনি দাজ্জালের আবির্ভাবকে নিছক তাত্ত্বিকভাবে নয়, বরং নিজের জীবদ্দশায়ও সম্ভাব্য বলে কল্পনা করেছিলেন; কমপক্ষে এই সম্ভাবনাটিকে তিনি শ্রোতাদের সামনে বাস্তবসম্মত আশঙ্কা হিসেবে উপস্থিত করেছিলেন। [16]

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
৫৪। বিভিন্ন ফিতনাহ ও কিয়ামতের লক্ষনসমূহ
পরিচ্ছেদঃ ২০. দাজ্জাল এর বর্ণনা, তার পরিচয় এবং তার সাথে যা থাকবে
হাদিস একাডেমি নাম্বারঃ ৭২৬৩ , আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ২৯৩৭
৭২৬৩-(১১০/২৯৩৭) আবু খাইসামাহ, যুহায়র ইবনু হারব, মুহাম্মাদ ইবনু মিহরান আর রাযী (রহঃ) ….. নাওওয়াস ইবনু সাম’আন (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সকালে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। আলোচনার সময় তিনি তার ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেন। পরে অনেক গুরুত্ব সহকারে উপস্থিত করেন যাতে তাকে আমরা ঐ বৃক্ষরাজির নির্দিষ্ট এলাকায় (আবাসস্থল সম্পর্কে) ধারণা করতে লাগলাম। এরপর আমরা সন্ধ্যায় আবার তার কাছে গেলাম। তিনি আমাদের মধ্যে এর প্রভাব দেখতে পেয়ে বললেন, তোমাদের ব্যাপার কি?আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আপনি সকালে দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং এতে আপনি কখনো ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেছেন, আবার কখনো তার ব্যক্তিত্বকে বড় করে তুলে ধরেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি যে, দাজ্জাল বুঝি এ বাগার মধ্যেই বিদ্যমান। এ কথা শুনে তিনি বললেন, দাজ্জাল নয়, বরং তোমাদের ব্যাপারে অন্য কিছুর আমি অধিক ভয় করছি। তবে শোন, আমি তোমাদের) মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয় তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব। তোমাদের প্রয়োজন হবে না। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকাবস্থায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে প্রত্যেক মুমিন লোক নিজের পক্ষ হতে তাকে প্রতিহত করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তা’আলাই হলেন আমার পক্ষ হতে তত্ত্বাবধানকারী।
দাজ্জাল যুবক এবং ঘন চুল বিশিষ্ট হবে, চোখ আঙ্গুরের ন্যায় হবে। আমি তাকে কাফির ’আবদুল উয্যা ইবনু কাতান এর মতো মনে করছি। তোমাদের যে কেউ দাজ্জালের সময়কাল পাবে সে যেন সূরা আল-কাহফ-এর প্রথমোক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করে। সে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যপথ হতে আবির্ভূত হবে। সে ডানে-বামে দুর্যোগ সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা অটল থাকবে। আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে পৃথিবীতে কয়দিন অবস্থান করবে? উত্তরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চল্লিশদিন পর্যন্ত। এর প্রথম দিনটি এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান হবে। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতই হবে।
আমরা প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! যেদিন এক বছরের সমান হবে, সেটাতে এক দিনের সালাতই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না, বরং তোমরা এদিন হিসাব করে তোমাদের দিনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নিবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দুনিয়াতে দাজ্জালের অগ্রসরতা কি রকম বৃদ্ধি পাবে? তিনি বললেন, বাতাসের প্রবাহ মেঘমালাকে যে রকম হাকিয়ে নিয়ে যায়। সে এক কাওমের কাছে এসে তাদেরকে কুফুরীর দিকে ডাকবে। তারা তার উপর ঈমান আনবে এবং তার আহ্বানে সাড়া দিবে। অতঃপর সে আকাশমণ্ডলীকে আদেশ করবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে এবং ভূমিকে নির্দেশ দিবে, ফলে ভূমি গাছ-পালা ও শস্য উৎপন্ন করবে। তারপর সন্ধ্যায় তাদের গবাদি পশুগুলো পূর্বের চেয়ে বেশি লম্বা কুজ, প্রশস্ত স্তন এবং পেটভর্তি অবস্থায় তাদের কাছে ফিরে আসবে।
তারপর দাজ্জাল অপর এক কাওমেরর কাছে আসবে এবং তাদেরকে কুফুরীর প্রতি ডাকবে। তারা তার কথাকে উপেক্ষা করবে। ফলে সে তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করবে। আমনি তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ ও পানির অনটন দেখা দিবে এবং তাদের হাতে তাদের ধন-সম্পদ কিছুই থাকবে না। তখন দাজ্জাল এক পতিত স্থান অতিক্রমকালে সেটাকে সম্বোধন করে বলবে, তুমি তোমার গুপ্তধন বের করে দাও। তখন জমিনের ধন-ভাণ্ডার বের হয়ে তার চতুষ্পার্শে একত্রিত হতে থাকবে, যেমন মধু মক্ষিকা তাদের সর্দারের চারপাশে সমবেত হয়।
অতঃপর দাজ্জাল এক যুবক ব্যক্তিকে ডেকে আনবে এবং তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করে তীরের লক্ষ্যস্থলের ন্যায় দুটুকরো করে ফেলবে। তারপর সে আবার তাকে আহবান করবে। যুবক আলোকময় হাস্যোজ্জল চেহারায় তার সম্মুখে এগিয়ে আসবে। এ সময় আল্লাহ রববুল আলামীন ঈসা ইবনু মারইয়াম (আঃ) কে প্রেরণ করবেন। তিনি দু’ ফেরেশতার কাঁধের উপর ভর করে ওয়ারস ও জাফরান রং এর জোড়া কাপড় পরিহিত অবস্থায় দামেশক নগরীর পূর্ব দিকের উজ্জ্বল মিনারে অবতরণ করবেন। যখন তিনি তার মাথা ঝুঁকবেন তখন ফোটা ফোটা ঘাম তার শরীর থেকে গড়িয়ে পড়বে। তিনি যে কোন কফিরের কাছে যাবেন সে তার শ্বাসের বাতাসে ধ্বংস হয়ে যাবে। তার দৃষ্টি যতদূর পর্যন্ত যাবে তাঁর শ্বাসও ততদূর পর্যন্ত পৌছবে। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করতে থাকবেন। অবশেষে তাকে বাবে লুদ নামক স্থানে গিয়ে পাকড়াও করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন।
অতঃপর ঈসা (আঃ) ঐ সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তা’আলা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আঃ) তাদের কাছে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তা’আলা ঈসা (আঃ) এর প্রতি এ মর্মে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটেয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তা’আলা ইয়াজুজ-মাজুজ কাওমকে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি “বুহাইরায়ে তাবরিয়া”র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?
তারা আল্লাহর নবী ঈসা (আঃ) এবং তার সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দীনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তা’আলা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আযাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে জমিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যথায় তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ’ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তা’আলা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবে।
এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে জমিন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় জমিনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে জমিন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নীচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বারাকাত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভী একগোত্রীয় মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরী এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তা’আলা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৭১০৬. ইসলামিক সেন্টার ৭১৬০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


কিয়ামত কবে হবেঃ সময় নির্দিষ্টকরণ

এবারে আসুন দেখি সেই হাদিসটি, যেখানে নবীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কিয়ামত কবে হবে। উত্তরে একজন বালককে দেখিয়ে নবী বলেছিলেন, এই বালকের বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই কিয়ামত হবে। কিন্তু সেই বালক মরে ভুত হয়ে গেল, এখনো কিয়ামত হলো না [17] [18] [19] [20]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ওকিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩.কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪২। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদাএক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামত কবে হবে? তখন তাঁর নিকট মুহাম্মাদ নামক এক আনসারী বালক উপিস্থিত ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বালক যদি বেঁচে থাকে তবে সে বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বেই কিয়ামত সংগঠিত হয়ে যাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪৩। হাজ্জাজ ইবনু শাঈর (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,একদা জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন যে, কিয়ামত কবে হবে? এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ পর্যন্ত চুপ করে থাকেন। অতঃপর তিনি সম্মুখস্থ আয্দ-শানু’আ গোত্রের এক বালকের প্রতি তাকালেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ এ বালক যদি দীর্ঘ হায়াত পায় তবে তার বার্ধক্যে পদার্পণ করার পূর্বেই কিয়ামত সংগঠিত হয়ে যাবে। আনাস (রাঃ) বলেন, তখন এ বালক আমার সমবয়স্ক ছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৫/ ফিতনা সমূহ ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলী
পরিচ্ছেদঃ ২৩. কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়া
৭১৪৪। হারুন ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) এর এক গোলাম একদা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, সে ছিল আমার সমবয়স্কা। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যদি তার হায়াত দীর্ঘায়িত হয় তবে সে বার্ধক্যে পৌছার পূর্বেই কিয়ামত কায়িম সংগঠিত হবে।
হাদিসের মানঃ সহih (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ভুল 5

এবারে আসুন হাদিসটির বিস্তারিত ভার্শনটি পড়ি। সম্পূর্ণ বিবরণ পড়লে খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এখানে নবী আসলে মহাপ্রলয়ের কিয়ামতের কথাই বলেছেন [21]

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৬. সদাচারণ ও ন্যায়নিষ্ঠতা সংশ্লিষ্ট কিতাব
পরিচ্ছেদঃ বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে
৫৬৬. আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন: “হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” এসময় সালাতের ইকামত দেওয়া হয়েছিল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেনতখন বলেন: “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়?” তখন সেই ব্যক্তি বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি এখানেই আছি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “জেনে রাখো, কিয়ামত সংঘটিত হবেই। কিন্তু তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো?” তিনি বলেন: “আমি কিয়ামতের জন্য খুব বেশি আমল প্রস্তুত করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি যাকে ভালবাসো, কিয়ামতের দিন তুমি তার সাথেই থাকবে।” রাবী বলেন: “এসময় তাঁর কাছে একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর নাম মুহাম্মাদ। অতঃপর তিনি বলেন: “যদি এই ব্যক্তি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।”
হুদবা আরেকটু বেশি বর্ণনা করেছেন, আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।”[1]
قَالَ أَبُو حَاتِمٍ: هَذَا الْخَبَرُ مِنَ الْأَلْفَاظِ الَّتِي أُطْلِقَتْ بِتَعْيِينِ خِطَابٍ مُرَادُهُ التَّحْذِيرُ وَذَاكَ أَنَّ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَادَ تَحْذِيرَ النَّاسِ عَنِ الرُّكُونِ إِلَى هَذِهِ الدُّنْيَا بِتَعْرِيفِهِمُ الشَّيْءَ الَّذِي يَكُونُ بِخَلَدِهِمْ تَقَبُّلُ حَقِيقَتِهِ مِنْ قُرْبِ السَّاعَةِ عَلَيْهِمْ دُونَ اعْتِمَادِهِمْ عَلَى ما يسمعون.
আবু হাতিম ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন: “হাদীসে সম্বোধনের ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সতর্কীকরণ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি মানুষের ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি তাদের সামনে এমন জিনিসের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যা তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান হবে। কাজেই এটি এই বাস্তবতাকে কবুল করে যে, কিয়ামত তাদের অতি নিকটে। এক্ষেত্রে তারা যেন সচরাচর শোনা কথার উপর নির্ভর না করেন।”
[1] মুসনাদ আহমাদ: ৩/১৫৯; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৩; সহীহ আল বুখারী: ৬৫১১।
হাদীসটিকে আল্লামা শু‘আইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন। (আস সহীহাহ: ৩২৫৩।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

ذِكْرُ خَبَرٍ شنَّع بِهِ بَعْضُ الْمُعَطِّلَةِ عَلَى أَهْلِ الْحَدِيثِ حَيْثُ حُرِمُوا تَوْفِيقَ الْإِصَابَةِ لِمَعْنَاهُ أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفْيَانَ الشَّيْبَانِيُّ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْأَعْلَى بْنُ حَمَّادٍ وَهُدْبَةُ بْنُ خَالِدٍ قَالَا: حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ: أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ؟ – وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ – فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاتَهُ قَالَ: (أَيْنَ السَّائِلُ عَنِ السَّاعَةِ؟ ) قَالَ: هَا أَنَا ذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: (إِنَّهَا قَائِمَةٌ فَمَا أَعْدَدْتَ لَهَا؟ ) قَالَ: مَا أَعْدَدْتُ لَهَا كَبِيرَ عَمَلٍ غَيْرَ أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عليه وَسَلَّمَ: (أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ) قَالَ: وَعِنْدَهُ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ يُقَالُ لَهُ مُحَمَّدٌ فقَالَ: (إِنْ يَعِشْ هَذَا فَلَا يُدْرِكُهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ.) زَادَ هُدْبَةُ: قَالَ أَنَسٌ: فَنَحْنُ نحب الله ورسوله. الراوي : أَنَس | المحدث : العلامة ناصر الدين الألباني | المصدر : التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان الصفحة أو الرقم: 566 | خلاصة حكم المحدث: صحيح

ইবনে হিব্বানের এই হাদিসটির শব্দচয়ন এবং আরবী ব্যাকরণগত গঠন বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, এখানে ‘কিয়ামত’ বলতে মহাপ্রলয় বা জগত ধ্বংসের চূড়ান্ত মুহূর্তকেই (The Great Resurrection) বোঝানো হয়েছে। নিচে এর ভাষাগত ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলোঃ

হাদিসের পরিচ্ছেদঃ হাদীসের সঠিক মর্মার্থ

খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে আমরা ইবনু হিব্বানের দীর্ঘ বর্ণনামূলক সহিহ হাদিসটি পড়লে দেখতে পাই, এই হাদিসের পরিচ্ছেদ হিসেবে ইবনু হিব্বান লিখেছেন, “বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে।” অর্থাৎ ইবনু হিব্বান এই হাদিসের আসল মর্মার্থ অনুধাবন করার তাগিদ দিচ্ছেন, বাতিলপন্থীদের এক ধরনের তিরস্কার করছেন। এর অর্থ কিন্তু এটি যে, এই হাদিস নিয়ে তার সময়কালেই নানা ধরনের সমালোচনা এবং বিভিন্ন অবিশ্বাসের জন্ম নিয়েছিল। ইবনু হিব্বান সেইসব বাতিল পন্থীদের জবাব দিয়েই কথাটি লিখেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কী নিয়ে এই এই বাতিল পন্থীদের তথাকথিত বাতিল মতের উদ্ভব ঘটলো?


“প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” – অনুবাদ করলে

আসুন আমরা ইবনু হিব্বানের দীর্ঘ বর্ণনামূলক হাদিসটির শব্দের অর্থ বদলে প্রজন্মের মৃত্যু বা ব্যক্তির মৃত্যু করে দিয়ে পড়ি, দেখা যাক, এটি কোন অর্থ তৈরি করে কিনা।

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৬. সদাচারণ ও ন্যায়নিষ্ঠতা সংশ্লিষ্ট কিতাব
পরিচ্ছেদঃ বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে
৫৬৬. আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন: “হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” কখন সংঘটিত হবে?” এসময় সালাতের ইকামত দেওয়া হয়েছিল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেনতখন বলেন: “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়?” তখন সেই ব্যক্তি বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি এখানেই আছি।”রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “জেনে রাখো, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” সংঘটিত হবেই। কিন্তু তুমি “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু”-র জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো?” তিনি বলেন: “আমি “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু”-র জন্য খুব বেশি আমল প্রস্তুত করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি যাকে ভালবাসো, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু”-র দিন তুমি তার সাথেই থাকবে।” রাবী বলেন: “এসময় তাঁর কাছে একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর নাম মুহাম্মাদ। অতঃপর তিনি বলেন: “যদি এই ব্যক্তি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” সংঘটিত হয়ে যাবে।”
হুদবা আরেকটু বেশি বর্ণনা করেছেন, আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।”[1]
قَالَ أَبُو حَاتِمٍ: هَذَا الْخَبَرُ مِنَ الْأَلْفَاظِ الَّتِي أُطْلِقَتْ بِتَعْيِينِ خِطَابٍ مُرَادُهُ التَّحْذِيرُ وَذَاكَ أَنَّ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَادَ تَحْذِيرَ النَّاسِ عَنِ الرُّكُونِ إِلَى هَذِهِ الدُّنْيَا بِتَعْرِيفِهِمُ الشَّيْءَ الَّذِي يَكُونُ بِخَلَدِهِمْ تَقَبُّلُ حَقِيقَتِهِ مِنْ قُرْبِ السَّاعَةِ عَلَيْهِمْ دُونَ اعْتِمَادِهِمْ عَلَى ما يسمعون.
আবু হাতিম ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন: “হাদীসে সম্বোধনের ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সতর্কীকরণ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি মানুষের ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি তাদের সামনে এমন জিনিসের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যা তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান হবে। কাজেই এটি এই বাস্তবতাকে কবুল করে যে, “প্রজন্মের মৃত্যু/ব্যক্তির মৃত্যু” তাদের অতি নিকটে। এক্ষেত্রে তারা যেন সচরাচর শোনা কথার উপর নির্ভর না করেন।”
[1] মুসনাদ আহমাদ: ৩/১৫৯; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৩; সহীহ আল বুখারী: ৬৫১১।
হাদীসটিকে আল্লামা শু‘আইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন। (আস সহীহাহ: ৩২৫৩।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

উপরের বর্ণনাটি পড়ে দেখুন, এটি আসলেই কোন অর্থবোধক হাদিস হিসেবে গণ্য হতে পারে কিনা। প্রজন্মের মৃত্যুর জন্য কে কী প্রস্তুতি নেয় তা তো মোটে বোধগম্য হয় না। একইসাথে, ভালবাসার মানুষের সাথে প্রজন্মের মৃত্যু বা ব্যক্তির মৃত্যু কীভাবে হবে, তাও বোধগম্য হয় না।


‘আস-সায়াহ’ (السَّاعَةُ) শব্দের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার

আরবী ভাষায় ‘সায়াহ’ মানে সময় বা ঘণ্টা হলেও, যখন এতে ‘আলিফ-লাম’ (ال) যুক্ত হয়ে ‘আস-সায়াহ’ (السَّاعَةُ) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন এটি একটি পারিভাষিক শব্দ (Terminological Noun) হয়ে দাঁড়ায়। কুরআন এবং সুন্নাহর পরিভাষায় এটি দ্বারা কেবল এবং কেবল ‘কেয়ামত’ বা মহাপ্রলয়কেই বোঝানো হয়।

  • প্রশ্নকারী প্রশ্ন করেছিলেন: “মাতা তাকুমুস সায়াহ?” (কেয়ামত কবে হবে?)।
  • উত্তরে নবী যখন ওই বালকটির দিকে ইশারা করে বললেন, “হাত্তা তাকুমুস সায়াহ” (যতক্ষণ না কেয়ামত সংঘটিত হয়), তখন তিনি প্রশ্নকারীর ব্যবহৃত শব্দটিরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। যদি নবী এর দ্বারা প্রশ্নকারীর উদ্দিষ্ট ‘মহাপ্রলয়’ না বুঝিয়ে কেবল ‘মৃত্যু’ বোঝাতে চাইতেন, তবে আরবী অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী তিনি ‘মাউতুকা’ (তোমার মৃত্যু) বা ‘সায়াতুকা’ (তোমার সময়) শব্দ ব্যবহার করতেন।

‘তাকুমু’ (تَقُومُ) ক্রিয়াপদ ও ‘কিয়াম’ (قِيَامُ)

হাদিসটিতে ‘তাকুমু’ (تَقُومُ) শব্দটি ‘ক্বিয়ামা’ (قِيَامَة) ধাতু থেকে এসেছে। আরবী ভাষায় মহাপ্রলয় বা শেষ বিচারের দিনকে ‘ক্বিয়ামত’ বলা হয় কারণ সেদিন মানুষ আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে।

  • তাকুমুস সায়াহ (تَقُومُ السَّاعَةُ) একটি নির্দিষ্ট বাক্যবন্ধ (Idiomatic expression), যা আরবী সাহিত্যে জগত ধ্বংসের প্রাক্কাল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যুর জন্য সাধারণত ‘মাত’ (মৃত্যু) বা ‘হিন’ (শেষ সময়) ব্যবহৃত হয়, ‘তাকুমু’ নয়।

সময়সীমার সীমাবদ্ধতা (Al-Haram vs As-Sa’ah)

বাক্যটির গঠন লক্ষ্য করুন: “সে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কেয়ামত হয়ে যাবে” (لَا يُدْرِكُهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ)। এখানে দু’টি ঘটনার তুলনা করা হয়েছে: ১. ওই বালকের বার্ধক্যে পৌঁছানো। ২. কেয়ামত সংঘটিত হওয়া। ভাষাগতভাবে যখন বলা হয় “ক হওয়ার আগেই খ হবে”, তখন ‘খ’ একটি বিশাল ও সুনির্দিষ্ট ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। যদি এখানে কেয়ামত মানে কেবল মৃত্যু হতো, তবে বাক্যটি নিরর্থক হয়ে যায়। কারণ বার্ধক্যের আগেই মৃত্যু হওয়া একটি সাধারণ বিষয়, কিন্তু নবী এখানে একটি বিস্ময়কর তথ্য বা ‘খবর’ দিচ্ছিলেন। এই সংবাদের গুরুত্ব তখনই তৈরি হয় যখন ‘আস-সায়াহ’ দ্বারা মহাপ্রলয়কে উদ্দেশ্য করা হয়।


বর্ণনাকারীর শিরোনাম ও ঐতিহাসিক বিতর্ক

হাদিসটির শুরুতে ইবনে হিব্বান (রহ.) একটি গুরুত্বপূর্ণ টীকা যোগ করেছেন:

“যাদের সঠিক অর্থ বোঝার তৌফিক হয়নি, এমন কিছু বাতিলপন্থী (المعطلة) এই হাদিসের মাধ্যমে আহলে হাদিসদের বিদ্রূপ করে।”

ইবনু হিব্বান যেভাবে এই বর্ণনাটি উপস্থাপন করেছেন—এবং বিশেষভাবে যাদের তিনি “বিরোধী/সমালোচক” হিসেবে ইঙ্গিত করেন—তা থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে এই হাদিসটি নিয়ে এক পর্যায়ে অর্থগত বিতর্ক বা আপত্তি তৈরি হয়েছিল, এবং আপত্তির কেন্দ্র ছিল “السّاعة/কিয়ামত” শব্দটির স্বাভাবিক (plain) অর্থ। যদি শুরু থেকেই এটি সর্বজনস্বীকৃতভাবে কেবল “ব্যক্তিগত মৃত্যু/ছোট কিয়ামত” অর্থে ব্যবহৃত হতো, তাহলে এমন বিতর্কের জোর বা বিষয়টিকে “নিন্দা/বিদ্রূপ”-এর উপাদান বানানোর প্রেরণাও তুলনামূলকভাবে কম থাকত। বরং যে ধরনের আপত্তি উঠেছে বলে বোঝা যায়, তা হলো—বর্ণনায় সময়-ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে “মহাকিয়ামত” ঘটেনি; ফলে টেক্সটের সরল পাঠকে ধরে রেখেই সমালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটটি ইঙ্গিত করে যে, অন্তত বিতর্কের এক পক্ষের কাছে “السّاعة” শব্দটি এখানে মহাকিয়ামত/মহাপ্রলয় হিসেবেই স্বাভাবিকভাবে ধরা হয়েছিল, এবং পরে সেটিকে “মৃত্যু/লোকাল আওয়ার” হিসেবে পুনর্ব্যাখ্যা করার প্রবণতা মূলত সেই চাপ মোকাবিলার একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে ধরে নেয়া যায়।


‘আনতা মা’আ মান আহবাবতা’ এর প্রসঙ্গের সাথে সংগতি

হাদিসের প্রথমাংশে নবী বলেছেন, “কেয়ামত তো সংঘটিত হবেই (إِنَّهَا قَائِمَةٌ), তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?” এখানে ‘কায়েমাহ’ (সংঘটিত হওয়া) শব্দটি দিয়ে কেয়ামতের অনিবার্যতার কথা বলা হয়েছে। এরপরই ওই বালকের উদাহরণ দিয়ে এর নিকটবর্তিতা বোঝানো হয়েছে। প্রশ্নকারী যেখানে পরকাল ও বিচার দিবস নিয়ে চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করছেন, সেখানে উত্তরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে ‘আস-সায়াহ’ শব্দটিকে মহাপ্রলয় হিসেবেই গ্রহণ করতে হয়।


একই প্রশ্ন, একই শব্দ—তবু “মৃত্যু” ব্যাখ্যার এড-হক সমস্যা

আসুন দুইটি হাদিস পড়ি, পাশাপাশি রেখে। একই ঘটনা/একই কথোপকথনের দুইটি ভিন্ন রেওয়ায়েত, কারণ এগুলোকে আলাদা ঘটনা বলা কঠিন, কারণ দুটো রেওয়ায়েতেই একই রাবি (আনাস), একই প্রশ্ন (السّاعة), একই পাল্টা প্রশ্ন (মاذا أعددت لها), একই উত্তর (ভালোবাসা), এবং একই সিদ্ধান্তবাক্য (أنت مع من أحببت)—একই কথোপকথনের ভিন্ন বর্ণনাই স্বাভাবিক ব্যাখ্যা।

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬২/ সাহাবীগণ [রাযিয়াল্লাহ ‘আনহুম]-এর মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৬২/৬. পরিচ্ছেদ নাই।
৩৬৮৮. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত।এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন হবে? তিনি বললেন, তুমি কিয়ামতের জন্য কী জোগাড় করেছ? সে বলল, কোনো কিছুই জোগাড় করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি। তখন তিনি বললেন, তুমি তাঁদের সঙ্গেই থাকবে যাঁদেরকে তুমি ভালবাস। আনাস (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা দ্বারা আমরা এত আনন্দিত হয়েছি যে, অন্য কোনো কথায় এত আনন্দিত হইনি। আনাস (রাঃ) বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালবাসি এবং আবূ বকর ও ‘উমার (রাঃ)-কেও। আশা করি তাঁদেরকে আমার ভালবাসার কারণে তাঁদের সঙ্গে জান্নাতে বসবাস করতে পারব; যদিও তাঁদের ‘আমলের মত ‘আমল আমি করতে পারিনি। (৬১৬৭, ৬১৭১, ৬১৫৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৪১৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৪২০)
بَاب
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَنْ السَّاعَةِ فَقَالَ مَتَى السَّاعَةُ قَالَ وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا قَالَ لَا شَيْءَ إِلَّا أَنِّيْ أُحِبُّ اللهَ وَرَسُوْلَهُ فَقَالَ أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ قَالَ أَنَسٌ فَمَا فَرِحْنَا بِشَيْءٍ فَرَحَنَا بِقَوْلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ قَالَ أَنَسٌ فَأَنَا أُحِبُّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَأَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ وَأَرْجُوْ أَنْ أَكُوْنَ مَعَهُمْ بِحُبِّيْ إِيَّاهُمْ وَإِنْ لَمْ أَعْمَلْ بِمِثْلِ أَعْمَالِهِمْ
حدثنا سليمان بن حرب حدثنا حماد بن زيد عن ثابت عن انس ان رجلا سال النبي صلى الله عليه وسلم عن الساعة فقال متى الساعة قال وماذا اعددت لها قال لا شيء الا اني احب الله ورسوله فقال انت مع من احببت قال انس فما فرحنا بشيء فرحنا بقول النبي صلى الله عليه وسلم انت مع من احببت قال انس فانا احب النبي صلى الله عليه وسلم وابا بكر وعمر وارجو ان اكون معهم بحبي اياهم وان لم اعمل بمثل اعمالهم
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

আসুন এর ইংরেজি অনুবাদটি দেখি,

Narrated Anas: A man asked the Prophet (ﷺ) about the Hour (i.e. Day of Judgment) saying, “When will the Hour be?” The Prophet (ﷺ) said, “What have you prepared for it?” The man said, “Nothing, except that I love Allah and His Apostle.” The Prophet (ﷺ) said, “You will be with those whom you love.” We had never been so glad as we were on hearing that saying of the Prophet (i.e., “You will be with those whom you love.”) Therefore, I love the Prophet, Abu Bakr and `Umar, and I hope that I will be with them because of my love for them though my deeds are not similar to theirs.

সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি)
৬. সদাচারণ ও ন্যায়নিষ্ঠতা সংশ্লিষ্ট কিতাব
পরিচ্ছেদঃ বাতিলপন্থীরা যে হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বুঝতে না পেরে মুহাদ্দিসগণের নিন্দা করে থাকে
৫৬৬. আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন: “হে আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?” এসময় সালাতের ইকামত দেওয়া হয়েছিল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করলেন তখন বলেন: “কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়?” তখন সেই ব্যক্তি বলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি এখানেই আছি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “জেনে রাখো, কিয়ামত সংঘটিত হবেই। কিন্তু তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো?” তিনি বলেন: “আমি কিয়ামতের জন্য খুব বেশি আমল প্রস্তুত করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তুমি যাকে ভালবাসো, কিয়ামতের দিন তুমি তার সাথেই থাকবে।” রাবী বলেন: “এসময় তাঁর কাছে একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন, তাঁর নাম মুহাম্মাদ। অতঃপর তিনি বলেন: “যদি এই ব্যক্তি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” হুদবা আরেকটু বেশি বর্ণনা করেছেন, আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি।”[1]
قَالَ أَبُو حَاتِمٍ: هَذَا الْخَبَرُ مِنَ الْأَلْفَاظِ الَّتِي أُطْلِقَتْ بِتَعْيِينِ خِطَابٍ مُرَادُهُ التَّحْذِيرُ وَذَاكَ أَنَّ الْمُصْطَفَى صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرَادَ تَحْذِيرَ النَّاسِ عَنِ الرُّكُونِ إِلَى هَذِهِ الدُّنْيَا بِتَعْرِيفِهِمُ الشَّيْءَ الَّذِي يَكُونُ بِخَلَدِهِمْ تَقَبُّلُ حَقِيقَتِهِ مِنْ قُرْبِ السَّاعَةِ عَلَيْهِمْ دُونَ اعْتِمَادِهِمْ عَلَى ما يسمعون.
আবু হাতিম ইবনু হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন: “হাদীসে সম্বোধনের ক্ষেত্রে এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সতর্কীকরণ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি মানুষের ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি তাদের সামনে এমন জিনিসের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যা তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান হবে। কাজেই এটি এই বাস্তবতাকে কবুল করে যে, কিয়ামত তাদের অতি নিকটে। এক্ষেত্রে তারা যেন সচরাচর শোনা কথার উপর নির্ভর না করেন।”
ذِكْرُ خَبَرٍ شنَّع بِهِ بَعْضُ الْمُعَطِّلَةِ عَلَى أَهْلِ الْحَدِيثِ حَيْثُ حُرِمُوا تَوْفِيقَ الْإِصَابَةِ لِمَعْنَاهُ أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفْيَانَ الشَّيْبَانِيُّ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْأَعْلَى بْنُ حَمَّادٍ وَهُدْبَةُ بْنُ خَالِدٍ قَالَا: حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ: أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ؟ – وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ – فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاتَهُ قَالَ: (أَيْنَ السَّائِلُ عَنِ السَّاعَةِ؟ ) قَالَ: هَا أَنَا ذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: (إِنَّهَا قَائِمَةٌ فَمَا أَعْدَدْتَ لَهَا? ) قَالَ: مَا أَعْدَدْتُ لَهَا كَبِيرَ عَمَلٍ غَيْرَ أَنِّي أُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عليه وَسَلَّمَ: (أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ) قَالَ: وَعِنْدَهُ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ يُقَالُ لَهُ مُحَمَّدٌ فقَالَ: (إِنْ يَعِشْ هَذَا فَلَا يُدْرِكُهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ.) زَادَ هُدْبَةُ: قَالَ أَنَسٌ: فَنَحْنُ نحب الله ورسوله. الراوي : أَنَس | المحدث : العلامة ناصر الدين الألباني | المصدر : التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان الصفحة أو الرقم: 566 | خلاصة حكم المحدث: صحيح. اخبرنا الحسن بن سفيان الشيباني حدثنا عبد الاعلى بن حماد وهدبة بن خالد قالا: حدثنا حماد بن سلمة عن ثابت عن انس: ان رجلا قال: يا رسول الله متى تقوم الساعة؟ – واقيمت الصلاة – فلما قضى رسول الله صلى الله عليه وسلم صلاته قال: (اين الساىل عن الساعة? ) قال: ها انا ذا يا رسول الله قال: (انها قاىمة فما اعددت لها? ) قال: ما اعددت لها كبير عمل غير اني احب الله ورسوله فقال النبي صلى الله عليه وسلم: (انت مع من احببت) قال: وعنده رجل من الانصار يقال له محمد فقال: (ان يعش هذا فلا يدركه الهرم حتى تقوم الساعة.) زاد هدبة: قال انس: فنحن نحب الله ورسوله. الراوي : انس | المحدث : العلامة ناصر الدين الالباني | المصدر : التعليقات الحسان على صحيح ابن حبان الصفحة او الرقم: 566 | خلاصة حكم المحدث: صحيح. [1]
মুসনাদ আহমাদ: ৩/১৫৯; সহীহ মুসলিম: ২৯৫৩; সহীহ আল বুখারী: ৬৫১১। হাদীসটিকে আল্লামা শু‘আইব আল আরনাঊত রহিমাহুল্লাহ মুসলিমের শর্তে সহীহ বলেছেন। আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ লিগাইরিহী বলেছেন। (আস সহীহাহ: ৩২৫৩।)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

উপরে উদ্ধৃত দুইটি হাদিসেই প্রশ্নের মূল “টার্গেট” এক—السّاعة (আস-সা’আহ), অর্থাৎ “কিয়ামত/Hour”। প্রশ্নের ভাষা একদম হুবহু না হলেও ফর্মুলা কার্যত একই: একটিতে বলা হয়েছে مَتَى السَّاعَةُ (“সা’আহ কখন?”), আরেকটিতে مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ (“সা’আহ কখন কায়েম/সংঘটিত হবে?”)। অর্থাৎ, দুটোই একই প্রশ্ন—কিয়ামত কখন হবে—শুধু দ্বিতীয় বর্ণনায় تقوم (কায়েম/ঘটবে) ক্রিয়াটি যুক্ত হওয়ায় বাক্য-গঠন সামান্য বিস্তৃত হয়েছে। একইভাবে বুখারির বর্ণনায় (আনাস থেকে) নবী পাল্টা প্রশ্ন করেন: وَمَاذَا أَعْدَدْتَ لَهَا؟—অর্থাৎ “তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?”—যা কথোপকথনটিকে স্পষ্টভাবে এস্কাটোলজিক্যাল/নৈতিক কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখে।

হাদিস উৎসআরবি প্রশ্ন (যেমন আছে)মূল শব্দবাক্যগত পার্থক্যঅর্থ (সারকথা)
সহীহ বুখারী ৩৬৮৮مَتَى السَّاعَةُالسّاعةসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন-ফর্ম“কিয়ামত/Hour কখন?”
সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৬৬مَتَى تَقُومُ السَّاعَةُ؟السّاعةتقوم (কায়েম/ঘটবে) যোগ হওয়ায় প্রশ্নটা একটু বিস্তৃত“কিয়ামত/Hour কখন সংঘটিত/কায়েম হবে?”

সারসংক্ষেপ:

  • (১) একই শব্দ—হ্যাঁ: দুটোতেই কেন্দ্রীয় শব্দ السّاعة
  • (২) একই প্রশ্ন (অর্থে)—হ্যাঁ: দুটোই “কিয়ামত/Hour কখন হবে?”।
  • (৩) একই বাক্য (হুবহু)—না: বুখারীতে متى الساعة, আর ইবনু হিব্বানে متى تقوم الساعة—দ্বিতীয়টিতে تقوم ক্রিয়াটি যুক্ত, কিন্তু প্রশ্নের লক্ষ্য ও অর্থ একই থাকে।

এবং উত্তর-প্রতিউত্তর শেষ হয় নৈতিক/এস্কাটোলজিক্যাল ফ্রেমে: أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ। এখানে “السّاعة” শব্দটি যে মহাকিয়ামত/বিচার দিবস বোঝাচ্ছে, সেটাই স্বাভাবিক পাঠ (plain reading): কিয়ামতের প্রস্তুতি, কিয়ামতের দিন সঙ্গ—সবকিছুই সেই বৃহৎ পরকালীন কাঠামোর সাথে ফিট করে। ফলে একই প্রশ্ন-ভাষা ও একই শব্দ “السّاعة”–কে এখানে “মৃত্যু” বলে সরিয়ে নেওয়া কেবল শব্দের অভিধানগত সম্ভাবনার ওপর দাঁড়ায়, কনটেক্সটের ওপর নয়।

এরপর যখন একই প্রশ্ন (متى تقوم الساعة) আরেক বর্ণনায় এসে যোগ হয় অতিরিক্ত বাক্য—إن يعش هذا فلا يدركه الهرم حتى تقوم الساعة (“এই ব্যক্তি বাঁচলে বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগেই ‘সা’আহ’ কায়েম হবে”)—তখন সমস্যাটা শুরু হয়। কারণ এই বাক্যে “السّاعة”-কে “মৃত্যু/প্রজন্মের শেষ” বানাতে চাইলে টেক্সটের ভেতরে সাধারণত যে সংকেত দরকার (যেমন “عليكم ساعتكم”—‘তোমাদের আওয়ার’) সেটা এখানে নেই; বরং একই السّاعة শব্দটি প্রশ্নে যেমন আছে, উত্তরে তেমনই পুনরাবৃত্ত। তাই “এটা আসলে ‘তোমাদের মৃত্যু’” বলে ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে গেলে অনেক সময় অন্য ভ্যারিয়েন্ট/পরবর্তী ব্যাখ্যা/শরহ টেনে এনে অর্থ বদলাতে হয়। যুক্তিগতভাবে এটাকেই বলা যায় harmonization-driven reading: ঝুঁকিপূর্ণ/বিপজ্জনক পাঠ (যেখানে ‘কিয়ামত’ মানবজীবনের সময়সীমার সাথে বাঁধা) থেকে পালাতে গিয়ে শব্দের অর্থকে নিরাপদ দিকে সরিয়ে নেওয়া।

সুতরাং এখানে আসল আপত্তি “একই শব্দ দুই অর্থে ব্যবহার হওয়া” নয়—ভাষায় তা সম্ভব। আপত্তি হলো, যেখানে “মহাকিয়ামত” অর্থে পড়া প্রেক্ষিতগতভাবে স্বাভাবিক, সেখানে শুধু বাঁচানোর জন্য (বিশেষ করে “বার্ধক্যের আগে” টাইপ সময়-সীমা দাঁড়িয়ে গেলে) হঠাৎ করে একই শব্দকে “মৃত্যু/লোকাল আওয়ার” বানানো—এটা উচ্চারিত শব্দ থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে তৈরি হওয়া ব্যাখ্যা নয়, বরং জোরপূর্বক তৈরি ব্যাখ্যা যা ফলাফলের চাপে অর্থ-শিফট। এই ধরনের রেসকিউ-রিডিং ভবিষ্যদ্বাণীমূলক দাবিকে কার্যত অপরীক্ষণীয় (unfalsifiable) করে তোলে—কারণ কোনো সময়ই ভুল প্রমাণ করা যাবে না; ব্যর্থ হলে অর্থ বদলে দেওয়া হবে।


অর্থাৎ, ভাষাগত গঠন (Linguistic structure), আরবী ব্যাকরণ (Grammar) এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—সবদিক থেকেই এই হাদিসে ‘আস-সায়াহ’ বলতে মহাপ্রলয় বা জগত ধ্বংসের চূড়ান্ত সময়কে নির্দেশ করা হয়েছে। সাহাবীরা এবং তৎকালীন বিরোধীরাও এই শব্দ থেকে এটিই বুঝেছিলেন, যার কারণে এটি একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।


হিশামের বক্তব্য সম্পর্কে

এই হাদিসটির আরেকটি ভার্শন আসুন লক্ষ্য করি [22]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৬৮/ কোমল হওয়া
পরিচ্ছেদঃ ২৭২৩. মৃত্যুযন্ত্রনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৬০৬৭, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৬৫১১
৬০৬৭। সাদাকা (রহঃ) … আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কিছু সংখ্যক কঠিন মেজাজের গ্রাম্য লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করতো কিয়ামত কবে হবে? তখন তিনি তাদের সর্ব-কনিষ্ঠ ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বলতেনঃ যদি এ ব্যাক্তি কিছু দিন বেঁচে থাকে তবে তার বুড়ো হওয়ার আগেই তোমাদের কিয়ামত এসে যাবে। হিশাম বলেন যে, এ কিয়ামতের অর্থ হলো, তাদের মৃত্যু।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা বিনত আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ)

জেনে রাখা জরুরি যে, হিশাম নামে যার কথা এখানে বলা হচ্ছে, হিশাম ইবনে উরওয়াহ ৬৮০–৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন সাহাবী যুবাইর ইবনুল আওয়াম এর নাতি, তার দাদি ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর এর কন্যা আসমা বিনতে আবি বকর। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ৬১ হিজরি সনে (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৪৬ হিজরিতে (৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ)। অর্থাৎ মুহাম্মদের মৃত্যুর প্রায় ৫০ বছর পরে তার জন্ম। স্বাভাবিকভাবেই, তিনি এই বিষয়টি জানতেন যে, ঐ বালকটি ততদিনে মারা গেছে, কিয়ামতও সংঘটিত হয়নি। তাই তার জন্য খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, হাদিসটিকে তিনি অন্য একটি ব্যাখ্যা দেবেন, যুক্তিবিদ্যার ভাষায় যাকে বলে এড হক ফ্যালাসি এবং পোস্ট হক এরগো প্রপটার হক (পরবর্তীকালীন অপ্রমাণিত উদ্ধার-যুক্তি যোগ)। তার ব্যাখ্যাটি ছিল, এখানে কিয়ামত বলতে নাকি তাদের মৃত্যু বোঝানো হয়েছে। অথচ হাদিসে কিন্তু কিয়ামতের কথাই বলা হয়েছিল। এই ব্যাখ্যাটিই যে ইসলামের মান সম্মান রক্ষার্থে একজন ইসলামপন্থীর ডিফেন্স হবে, সেটি বলাই বাহুল্য। এ কারণে হিশামের পক্ষে তো এই ব্যাখ্যাটি তৈরি করা ছাড়া আর কোন উপায়ই ছিল না। নইলে নবীর বক্তব্য তো ভুল প্রমাণিত হবে।


এড হক ফ্যালাসি / পোস্ট হক এরগো প্রপটার হক

নবীর প্রশ্নোত্তরে কিয়ামত নাকি প্রজন্মের মৃত্যু

ইসলামি বর্ণনাগুলতে “কিয়ামত/আস-সা‘আহ (ٱلسَّاعَةُ)”–কে প্রায়ই কোনো নিকট ভবিষ্যৎ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ হিসেবে নয়। এসব টেক্সটে নবীর যুগের মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সময়গতভাবে ঘনিষ্ঠ এক আসন্ন বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর সবচেয়ে পরিচিত দৃষ্টান্ত হলো নবীর উক্তি— “আমাকে এবং কিয়ামতকে একসাথে পাঠানো হয়েছে—এই দুই আঙুলের মতো”, এবং তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি করে দেখান। এই বক্তব্যে “উপমা” আছে ঠিকই, কিন্তু উপমাটির কেন্দ্রীয় কাজ হলো সময়-দূরত্বকে দৃশ্যমানভাবে সংকুচিত করা: দুই আঙুলের ফাঁক খুব সামান্য—এটা শ্রোতার চোখে “নিকটতা”কে জোরালোভাবে ইঙ্গিত করে। তাই হাদিসটি পর্যালোচনায় এটিকে কেবল নৈতিক সতর্কবার্তা নয়, বরং সময়ের ঘনিষ্ঠতার সংকেত বলেই বোঝা যায়।

এই নিকটতার ভাষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে সেই বর্ণনায়, যেখানে কিছু প্রশ্নকারী (কিছু রেওয়ায়েতে বেদুইন) জিজ্ঞেস করে—“কিয়ামত কবে হবে?” উত্তরে নবী একটি বালকের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন: “এই বালক যদি বেঁচে থাকে, তবে বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।” এখানে লক্ষ্য করুন, প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিগত মৃত্যু, কারও শেষ সময়, বা “আমাদের প্রজন্ম কবে শেষ হবে”—এই জাতীয় কিছু নয়; প্রশ্নটি সরাসরি কিয়ামতের সময় নিয়েই। আর উত্তরটি দেওয়া হচ্ছে একটি মানবজীবনের স্বাভাবিক টাইমলাইনের ভেতরে—“বার্ধক্যের আগে”—অর্থাৎ কয়েক দশকের স্কেলে। ভাষাগতভাবে এটি খুব সরল: “ঘটনা X ঘটবে—সময়সীমা Y–এর ভেতরে।”

এখান থেকেই মূল দ্বন্দ্ব শুরুঃ প্রশ্নকারী কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইছে, উত্তরদাতা কি সত্যিই কিয়ামত বোঝাচ্ছেন—না কি অন্য কিছু? পরবর্তীকালের হাদিসের ব্যাখ্যাগুলোতে প্রায়ই বলা হয়, এখানে “কিয়ামত” বলতে “ছোট কিয়ামত”—অর্থাৎ ব্যক্তিগত মৃত্যু বা সে প্রজন্মের বিলুপ্তি বোঝানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যার পেছনে ক্লাসিক্যাল শরাহরও একটি লাইন আছে: ইমাম নববীর শরহ মুসলিম–এ বিভিন্ন রেওয়ায়েত (“তোমাদের ঘন্টা/সা‘আহ” ইত্যাদি) একত্র করে বলা হয়, “তোমাদের সা‘আহ” বলতে উদ্দেশ্য তাদের মৃত্যু, অর্থাৎ সে যুগ/সে শ্রোতাগোষ্ঠীর শেষ হওয়া—এটা কিয়ামতের বৃহৎ অর্থ নয়। কিন্তু এই “লোকাল কিয়ামত/ব্যক্তিগত মৃত্যু” ব্যাখ্যা টিকিয়ে রাখতে গেলে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন এড়ানো যায় না:

(১) প্রশ্ন-উত্তরের বাস্তববাদিতা (pragmatics):
মানুষ “কিয়ামত কবে?” জিজ্ঞেস করলে স্বাভাবিকভাবে সে মহাপ্রলয় বা মহাকিয়ামতই বুঝিয়ে জিজ্ঞেস করছে—এটাই সেই সময়ের মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং কোআন-হাদিসের প্রচলিত ভাষা। কুরআনে ٱلسَّاعَةُ (আস-সা‘আহ) শব্দটি বারবার পুনরুত্থান/কবর থেকে ওঠা/বিচার–এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এসেছে—যেমন, “ঘন্টা আসবেই… এবং আল্লাহ কবরগুলোতে যারা আছে তাদের উঠাবেন”—এটা ব্যক্তিগত মৃত্যুর প্রতিশব্দ নয়; বরং মৃত্যুর পরের মহাবিচারের ইঙ্গিত।

এখানে লক্ষ্যণীয়—বেদুইনরা নবীকে কী প্রশ্ন করেছিল, আর মুহাম্মদ কী উত্তর দিয়েছিল। বেদুইনদের যদি জানার ইচ্ছা থাকতো “আমাদের সকলের মৃত্যু কবে হবে”, এবং নবী যদি সেই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর দিতেন যে, “ঐ শিশুটির বার্ধক্যে পৌঁছাবার আগেই তোমাদের মৃত্যু হবে”—তাহলে এটি কোনো বোধগম্য বা অর্থবহ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দাঁড়ায় না। কারণ তখনকার যুগে হোক বা যেকোন যুগেই হোক, এটুকু সবাই জানে—মানুষ মরবেই, এবং অনেকেই এক প্রজন্মের মধ্যেই মারা যাবে। এই ধরনের “তথ্য” জানার জন্য কেউ নবীর কাছে প্রশ্ন করতে আসবে না, এটি যেকোনো মানুষেরই জানা কথা। নবীকে এই প্রশ্ন করার অর্থই ছিল মহাপ্রলয়/মহাকিয়ামত কবে হবে—আসলে বেদুইনদের প্রশ্ন সেটাই ছিল, এবং উত্তরও মুহাম্মদ দিয়েছিল সেই প্রশ্নের ভিত্তিতেই।

আর যদি কেউ দাবী করে—বেদুইনরা মহাপ্রলয় কবে হবে সেটাই জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু নবী তাদের “মৃত্যু কবে হবে” সেটা বোঝাতে উত্তর দিয়েছিল—তাহলে নবীকে প্রশ্ন এড়িয়ে বিভ্রান্তিকর উত্তরদাতা হিসেবে দেখাতে হয়, মিথ্যাবাদী বা প্রতারণামূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগেও অভিযুক্ত করা যায়। কারণ সে ক্ষেত্রে নবীর স্পষ্ট করে বলা উচিত ছিল: “মহাপ্রলয় কবে হবে—আমি জানি না।”

(২) “বার্ধক্যের আগে”—এই টাইমফ্রেমের দাগ:
যদি উদ্দেশ্য হয় “তোমাদের মৃত্যু কাছেই”—তাহলে সেটি একটি সাধারণ সত্য (মানুষ মরে), কিন্তু “এই বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগে”–এর মতো কংক্রিট টাইম-মাপকাঠি যোগ করা বক্তব্যকে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক করে তোলে। তাছাড়া, “তোমরা তো মরবেই” ধরনের উত্তর প্রশ্নকারীকে তথ্য দেয় না—বরং প্রশ্নের গুরুত্বকে পাশ কাটিয়ে যায়। পরবর্তীকালের ব্যাখ্যাগুলো তাই প্রায়ই রিডাইরেকশন থিওরি নেয়: নবী নাকি শেখাতে চেয়েছেন “কিয়ামতের সময় জানার দরকার নেই; নিজের শেষের জন্য প্রস্তুত হও।” এই নৈতিক পাঠ সম্ভব হলেও, সমস্যা হলো—এই পাঠ দাঁড় করাতে গিয়ে মূল বাক্যের স্বাভাবিক অর্থ (কিয়ামত বনাম মৃত্যু) পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে হয়।

(৩) ব্যাখ্যার সময়-রাজনীতি (after-the-fact pressure):
“কিয়ামত নিকটবর্তী” ধরনের বাক্য কুরআনেও আছে—“ঘন্টা নিকটবর্তী হয়েছে”—এ জাতীয় ভাষা একটি সাময়িক প্রত্যাশা তৈরি করে, বিশেষত যখন সেটি নবীর যুগের শ্রোতাদের কাছেই উচ্চারিত। যখন শতাব্দী পেরিয়ে যায় এবং “মহাকিয়ামত” ঘটে না, তখন একই বাক্যগুলোর ওপর ব্যাখ্যামূলক চাপ পড়ে—এটা ঐতিহাসিকভাবে স্বাভাবিক। ফলে একটি প্রবণতা তৈরি হয়: প্রথমে যে শব্দটি মহাকিয়ামত বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছিল, পরে তাকে “ব্যক্তিগত মৃত্যু/প্রজন্মের শেষ” হিসেবে পাঠ করা। শরাহ-গ্রন্থে এই পথটি দেখা যায়—কিন্তু যুক্তিবাদের দৃষ্টিতে প্রশ্ন থাকে: এটি কি শুরু থেকেই বক্তার উদ্দেশ্য ছিল, নাকি ব্যর্থ সময়-প্রত্যাশার পরে অর্থকে নিরাপদ করার এক ধরনের “ড্যামেজ-কন্ট্রোল”?

সারকথা, এখানে সমস্যাটি শুধু “শব্দের বহুঅর্থ” নয়; সমস্যা হলো একই শব্দ (ٱلسَّاعَةُ) কোরআনি ব্যবহারে যে মহাবিচার-সংকেত বহন করে, হাদিসের প্রশ্নোত্তরে সেটিকে যদি “ব্যক্তিগত মৃত্যু” বানানো হয়—তাহলে সেটি পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবে পলায়নধর্মী পুনঃপাঠ (escape-reading) মনে হবে। আর যদি স্বাভাবিক পাঠ বজায় রাখা হয়, তাহলে “এই বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগেই কিয়ামত”—জাতীয় বক্তব্যগুলো ঐতিহাসিক বাস্তবতার সাথে সরাসরি সংঘর্ষে পড়ে। এই দ্বিধাটাই এই অংশের মূল: ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নিলে সমস্যা, আর রূপক/লোকাল-মৃত্যু হিসেবে নিলে ভাষা ও প্রশ্নের সাথে অস্বস্তিকর অসামঞ্জস্য।


সাহাবীদের মধ্যেও কিয়ামত ভীতি

যদি মুহাম্মদের “কিয়ামত-নিকটতা” সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোকে তাঁর সমসাময়িক শ্রোতারা নিছক রূপক, নৈতিক উপদেশ বা “অনির্দিষ্ট দূর ভবিষ্যতের সতর্কতা” হিসেবে শুনে নিত—তাহলে সেগুলোর প্রভাবও থাকত তুলনামূলকভাবে ধীরনৈতিক: মানুষ অনুপ্রাণিত হবে, কিছু আমল বাড়াবে, কিন্তু দৈনন্দিন অনুভূতির ভেতরে জরুরি-চাপ (urgency) নেমে আসত না। অথচ প্রাথমিক যুগের বর্ণনাগুলোতে যে আবহ তৈরি হয়, তা অনেক বেশি “এটা এখনই ঘটতে পারে”—এই ধরনের। কিয়ামত/প্রকম্পন/শেষ মুহূর্তের কথা উঠলেই অনেক সাহাবীর প্রতিক্রিয়া শুধু ভাবগম্ভীর নয়; বরং দেহে-মনেই কাঁপিয়ে দেওয়া—চুপসে যাওয়া, ভেঙে পড়া, কান্নায় ডুবে যাওয়া, এবং কথার পর কথা জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে চাওয়া—এসবের মধ্য দিয়ে বোঝায় যে, তারা কিয়ামতকে “দূরের তত্ত্ব” নয়, বরং সমসাময়িক আশঙ্কা হিসেবে কল্পনা করত।

এই ভয়টা এখানে “জান্নাত-জাহান্নামের বিমূর্ত নৈতিক ভয়” নয়; বরং একটি কসমিক বিপর্যয়—মহাপ্রলয়, প্রকম্পন, সময়ের পর্দা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো এক মহা-ঘটনা—এর আতঙ্ক। ফলে ভাষার ভেতরেই তৈরি হয় একধরনের present-tense apocalypse (বর্তমান-কালীন প্রলয়-আবহ): মনে হয়, ঘটনাটা কেবল “একদিন হবে” না—বরং খুব শিগগিরই হয়ে যেতে পারে। এই মানসিক কাঠামোতে মানুষ ভবিষ্যৎকে দীর্ঘ খোলা সময় হিসেবে দেখে না; বরং সামনে রয়েছে “সামান্য সময়”—এমন অনুভূতি। তাই কিয়ামতের কথা শুনে প্রশ্ন আসে—কবে হবে, কী লক্ষণ, কীভাবে সামলাবো—এগুলো নেহাত কৌতূহল নয়; এটা আতঙ্ক-চালিত প্রস্তুতি (fear-driven readiness)।

সমাজতাত্ত্বিকভাবে এটিই এপোক্যালিপ্টিক মানসিকতা (apocalyptic mindset)-র পরিচিত প্যাটার্ন: কোনো গোষ্ঠী যদি সত্যিই বিশ্বাস করে তারা “শেষ সময়ের কিনারায়” দাঁড়িয়ে আছে, তাহলে তাদের ভেতরে (ক) তাৎক্ষণিকতা বাড়ে, (খ) অনিশ্চয়তা-জন্মানো ভয় (uncertainty-driven fear) বাড়ে, এবং (গ) “এখনই প্রস্তুত হও”—এই মনস্তত্ত্ব দৈনন্দিন জীবনের ওপর ছাপ ফেলে। প্রথম মুসলিম সমাজের বর্ণনাগুলোতে এই ছাপটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইঙ্গিত করে—তারা নবীর ভাষাকে কেবল “নৈতিক বক্তব্য” হিসেবে নয়, বরং সময়ঘনিষ্ঠ বাস্তব সতর্কতা হিসেবে নিয়েছিল। আর এখানেই পরবর্তী যুগের ব্যাখ্যাগত টানাপোড়েন শুরু হয়: কিয়ামত যখন ঐ সময়-স্কেলে ঘটেনি, তখন সেই একই বাক্য/ইঙ্গিতকে পরে নিরাপদ করতে অর্থ-সরানোপুনর্ব্যাখ্যা ঢুকতে থাকে—যা মূল অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক “নিকট-প্রলয়” আবহের সাথে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।


রূপকের মানসিক কসরত ও এড হক ফ্যালাসি

এখানে “রূপক” বা “এলেগরি” ঢুকিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা সাধারণত করা হয়। বলা হয়—“কিয়ামত” বলতে নাকি “ব্যক্তির মৃত্যু” বোঝানো হয়েছে, বা “ছোট কিয়ামত” বোঝানো হয়েছে, বা প্রশ্নকারীর “শেষ সময়” বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো—হাদিসে প্রশ্নটা কিয়ামতই, আর উত্তরটাও কিয়ামতই; উপরন্তু “বালক বৃদ্ধ হওয়ার আগে”—এটা সময়-সীমা নির্ধারণ। এগুলো যে খুব স্পষ্টভাবেই এড হক ফ্যালাসি (Ad Hoc Fallacy), তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এড হক ফ্যালাসি হলো এমন একটি কুযুক্তি যেখানে কোনো একটি দাবিকে রক্ষা করার জন্য বা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নতুন ব্যাখ্যা, অপ্রমাণিত বা রহস্যময় শর্ত জুড়ে দেওয়া; এটি মূলত ‘পোস্ট হক এরগো প্রপটার হক’ (Post Hoc Ergo Propter Hoc) বা ‘এরপরে, তাই এর কারণে’ – এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণার উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়, যা দুটি ঘটনার ক্রমকে ভুলবশত কার্যকারণ সম্পর্কে পরিণত করে।

এড হক ফ্যালাসি কীভাবে কাজ করে:

অতিরিক্ত ব্যাখ্যা: যখন কোনো তত্ত্ব বা ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকে না, তখন সেটিকে বাঁচাতে ‘বিশেষ’ বা ‘অতিরিক্ত’ কিছু শর্ত যোগ করা হয়, বা শব্দগুলোর কিছু নতুন ব্যাখ্যা সৃষ্টি করা হয়, যার উদ্দেশ্য থাকে যেভাবেই হোক শুরুর দাবীটিকে রক্ষা করা।

‘এরপরে, তাই এর কারণে’ (Post Hoc): একটি ঘটনা ঘটার ঠিক পরে আরেকটি ঘটনা ঘটলে, প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যদিও তাদের মধ্যে কোনো প্রকৃত কার্যকারণ সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।

উদাহরণঃ ধরুন আমি বললাম, আগামী বছর বন্যায় পুরো পৃথিবী ডুবে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, সেই বছর পুরো পৃথিবী জুড়ে কোন বন্যা হলো না, শুধুমাত্র বাংলাদেশের নোয়াখালীতে বন্যা হলো। তখন আমি আমার ভবিষ্যতবাণীকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করলাম। বললাম, আমি আগে যেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলাম, সেখানে আমি পুরো পৃথিবী বলতে পুরো পৃথিবী নয়, নোয়াখালীকে বুঝিয়েছিলাম। কারণ নোয়াখালী জেলার অনেক মানুষ আছে যারা নোয়াখালী জেলাটিকেই পুরো পৃথিবী মনে করে। আমি সেই মানুষদের সাপেক্ষে বলেছিলাম।

অর্থাৎ, আমি আমার ভবিষ্যতবাণীর অর্থ পরিবর্তন করলাম, পরবর্তী ঘটনার সাপেক্ষে। এটি হবে একটি ফ্যালাসি, যাকে বলা হয় এড হক ফ্যালাসি (Ad Hoc Fallacy)। মূল বিষয় হচ্ছে, এই ধরনের ভবিষ্যৎবাণী যদি সত্যিই “ঐশী জ্ঞান” থেকে আসে, তাহলে এত বড় টাইমলাইন ভুল হওয়ার কথা না, নতুন ব্যাখ্যা- শব্দের নতুন অর্থ তৈরি করে বিষয়টি শুদ্ধ করার মানসিক কসরত করতে হতো না। আর যদি ভুল হয়—তাহলে পরের প্রশ্ন আসে: ভবিষ্যৎবাণীকে “ঐশী প্রমাণ” হিসেবে কেন দেখানো হবে? আসুন বোঝার সুবিধার্থে এই টাইমলাইনটি দেখি,


টাইমলাইন ডায়াগ্রাম: নিকট-কিয়ামত পাঠ → না ঘটার পর → এড হক ব্যাখ্যা
নোট: এটি একটি বিশ্লেষণী মডেল—কোন যুগে কী ধরনের “পাঠ/প্রতিক্রিয়া/ব্যাখ্যা” তৈরি হতে পারে তা বোঝাতে। এই ডায়াগ্রামে আক্ষরিক সময়কাল বোঝানো হয়নি, অনুমানিক সময় ধরা হয়েছে।
প্রাথমিক বয়ান/প্রতিক্রিয়া সময় গড়ানো/ঘটনা সংকলন-যুগ পরে ব্যাখ্যা (এড হক)
পর্ব ১ ৬১০–৬৩২ খ্রি. / ১–১১ হিজরি
নবীর সময়: “কিয়ামত নিকট” আবহ + কিছু বয়ানে সময়-ইঙ্গিত
কিয়ামত নিকটবর্তী – এই বক্তব্য “প্রজন্ম/লাইফটাইম”–সদৃশ ইঙ্গিত—যা স্বাভাবিক পাঠে নিকট ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। উপরে এই সম্পর্কিত রেফারেন্সগুলো দেয়া হয়েছে
পর্ব ২ ৬৩২–৭০০+ খ্রি. (সাহাবী → প্রাথমিক তাবেয়ী)
প্রাথমিক শ্রোতা: আক্ষরিক গ্রহণ/উৎকণ্ঠা (সম্ভাব্য)
কিছু ঐতিহ্যবর্ণনায় নবী ও তার সাহাবীদের মধ্যে কিয়ামত ঘটে যাওয়ার ভয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—যা দেখায়, সেই সময়ের মানুষের মধ্যে কিয়ামত ঘতে যাওয়ার আশংকা ছিল। নবী নিজেই কিয়ামতের আতঙ্কে আতঙ্কিত ছিলেন, এই না বুঝি হয়ে যায়।
পর্ব ৩ ৭০০–৮০০+ খ্রি. (তাবেয়ী → তাবেঈ-তাবেয়ীন)
সময় গড়ায়: প্রত্যাশিত “মহা-কিয়ামত” দৃশ্যমানভাবে ঘটে না
প্রজন্ম বদলায়, শতাব্দী পার হয়—কিন্তু “মহা-কিয়ামত” বাস্তবে সংঘটিত হয় না। ফলে পুরোনো বাক্যগুলোর অর্থ নিয়ে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু নবীর কথাকে তো আর ভুল বলা যায় না, ভুল হলে তো ইমান থাকে না।
পর্ব ৪ ৮ম–৯ম শতক খ্রি. (সংকলন/ক্যানোনাইজেশন)
হাদিস সংকলন: ভিন্ন ভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট একইসাথে “স্থির” হয়ে যায়
সনদ-ভিত্তিক সংগ্রহ, শ্রেণিবিন্যাস, মান্যতা—এসব শক্ত হয়। ফলে একই বক্তব্যের একাধিক রেওয়ায়েত পাশাপাশি টিকে যায়, ব্যাখ্যার মাঠও বড় হয়।
পর্ব ৫ ৯ম শতক → পরবর্তী ব্যাখ্যাকার যুগ
পরে ব্যাখ্যা: “কিয়ামত” → “মৃত্যু/ছোট কিয়ামত/প্রজন্মের শেষ”
না ঘটাকে সামাল দিতে “সা’আহ/আওয়ার/কিয়ামত” শব্দকে মৃত্যু বা প্রজন্ম-সমাপ্তি অর্থে পড়া হয়—এভাবে বক্তব্যকে পুনঃব্যাখ্যা করা হয়। নবীর বক্তব্য অভ্রান্ত প্রমাণ করতে শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা বদলে যায়, এড হক হারমোনাইজেশন—শুরু হয়, যা আসলে পরবর্তী সংযোজন।
পর্ব ৬ ফলাফল: ব্যাখ্যা-নীতির স্থিরীকরণ
নীতিগত শিফট: “হাদিস মিথ্যা নয় → বোঝা ভুল → নতুন অর্থই উদ্দেশ্য”
একটি স্থায়ী ব্যাখ্যা-নীতি দাঁড়ায়: নবীর কথা ভুল হতে পারে না—তাই সময়-ইঙ্গিতগুলোর আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে নতুন অর্থকে “আসল উদ্দেশ্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “কিয়ামত” বা মহাবিশ্বের ধ্বংস

বিজ্ঞান সাধারণত “কিয়ামত” শব্দটি ব্যবহার করে না; কিন্তু পৃথিবীমহাবিশ্ব—দুই স্তরেই “শেষ/ধ্বংস” বা সম্ভাব্য পরিণতি (end scenarios) নিয়ে বাস্তবসম্মত মডেল, পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক সীমা (constraints), এবং অনিশ্চয়তার পরিসরসহ ব্যাখ্যা দেয়। এখানে “একটা নির্দিষ্ট দিন-তারিখ” ঘোষণা নেই; আছে দীর্ঘ সময়-স্কেলে কী কী ঘটতে পারে—তার সম্ভাব্য ধারাবাহিকতা।

১) পৃথিবীর “শেষ” মানে আগে বাসযোগ্যতা হারানো: পৃথিবীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্ত ভিত্তির দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস সূর্যের ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হওয়া। সূর্যের বিকিরণ শক্তি সময়ের সাথে বাড়তে থাকলে, পৃথিবীর জলবায়ু এমন দিকে যেতে পারে যেখানে গ্রিনহাউস প্রভাব চরমে ওঠা, মহাসাগরীয় জল বাষ্পীভবন বেড়ে যাওয়া, এবং দীর্ঘমেয়াদে পানির স্থায়ী ক্ষয় (যেমন, উপরের স্তরে জলীয়বাষ্প ভেঙে হাইড্রোজেন মহাশূন্যে পালিয়ে যাওয়া)—এ ধরনের প্রক্রিয়ায় জীবন টিকে থাকার শর্ত নষ্ট হতে পারে। কিছু মডেলিং ফলাফল অনুযায়ী, “লাল দানব” (red giant) পর্যায়ে যাওয়ার বহু আগেই পৃথিবী বাসযোগ্যতা হারাতে পারে; আনুমানিক সময়-স্কেল হিসেবে প্রায় ১–১.৫ বিলিয়ন বছর প্রায়ই আলোচিত হয়। [23]

২) সূর্যের বিবর্তনে পৃথিবীর ভাগ্য: এর পরের ধাপে সূর্য তার জীবচক্রে “লাল দানব” পর্যায়ে (red giant phase) প্রবেশ করবে—এ সময় সূর্যের আকার ও শক্তি-নিঃসরণ নাটকীয়ভাবে বদলাবে। NASA–র ব্যাখ্যায় সূর্যের এই পর্যায়ে পৌঁছানোকে সাধারণত প্রায় ৬ বিলিয়ন বছর পরের ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। এই রূপান্তরের সময় পৃথিবী “গিলে ফেলা হবে কি না”—এ নিয়ে সূক্ষ্ম গতিবিদ্যাগত অনিশ্চয়তা থাকলেও, পৃথিবীর বর্তমান বাসযোগ্য অবস্থা যে টিকবে না—এটা প্রায় নিশ্চিত দিকেই ইঙ্গিত করে (তীব্র তাপ, বিকিরণ, বায়ুমণ্ডলীয় ভাঙন ইত্যাদি কারণে)। [24]

৩) মহাবিশ্বের “শেষ”: সবচেয়ে সম্ভাব্য—অন্তহীন প্রসারণ ও ‘মহাশীতল/তাপ-মৃত্যু’ (Big Freeze / heat death)। আধুনিক কসমোলজির মানক কাঠামোতে (ΛCDM) যদি অন্ধকার শক্তি (dark energy) সত্যিই প্রায় ধ্রুব “কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট” (cosmological constant, Λ) ধরনের হয়, তবে মহাবিশ্ব দীর্ঘকাল ধরে প্রসারিত হতে পারে। তখন সময়ের সাথে পদার্থ-শক্তি আরও ছড়িয়ে পড়ে, গঠন (structure) তৈরি ও টিকিয়ে রাখার মতো “ফ্রি এনার্জি” কমতে থাকে—ফলে শেষ পরিণতি হিসেবে “মহাশীতল/তাপ-মৃত্যু” (heat death) ধরনের দৃশ্যপটকে বহু আলোচনায় সবচেয়ে সম্ভাব্য ধারার মধ্যে ধরা হয়। প্ল্যাঙ্ক (Planck) মিশনের চূড়ান্ত ফলাফলগুলো ΛCDM–এর সাথে শক্ত সামঞ্জস্য দেখায় এবং dark energy–র equation of state (w) ধ্রুবক Λ–এর কাছাকাছি (w≈−1) হওয়ার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। [25]

৪) তবে “শেষ” একটাই নয়—অন্ধকার শক্তি বদলালে ভাগ্যও বদলাতে পারে: সাম্প্রতিক DESI (Dark Energy Spectroscopic Instrument) ডেটা রিলিজগুলোর বিশ্লেষণে কিছু ক্ষেত্রে ইঙ্গিত এসেছে যে অন্ধকার শক্তি সময়ের সাথে পরিবর্তিত (time-evolving / dynamical) হতে পারে—অর্থাৎ w(z) স্থির নয়। DESI–র DR2 ফলাফল-সারাংশে “time-evolving dark energy”–র দিকে ইঙ্গিত আরও শক্ত হয়েছে—এমন বক্তব্যও আছে। [26] একই ধারার একটি Nature Astronomy গবেষণায় DR1+DR2 BAO, সুপারনোভা, এবং CMB prior মিলিয়ে w(z)–এর পরিবর্তনের দিকে ঝোঁক এবং কিছু ডেটাসেট-সমন্বয়ে ΛCDM–এর সাথে প্রায় ~3σ স্তরের টানাপোড়েনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে—যদিও সম্ভাব্য systematics এখনো পরীক্ষাাধীন এবং ভবিষ্যৎ ডেটা “decisive tests” দেবে বলে তারা স্পষ্ট করেছে। [27]

সার কথা: বিজ্ঞান “কিয়ামতের নির্দিষ্ট তারিখ” দেয় না। বরং (ক) পৃথিবীর ক্ষেত্রে—দীর্ঘ সময়ে বাসযোগ্যতা নষ্ট হওয়া, (খ) সূর্যের বিবর্তনে—গ্রহগুলোর পরিবেশগত ধ্বংস/রূপান্তর, এবং (গ) মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে—dark energy/কসমোলজির প্রকৃতি অনুযায়ী একাধিক সম্ভাব্য শেষ (বিগ ফ্রিজ/বিগ ক্রাঞ্চ/বিগ রিপ ইত্যাদি)—এসবকে মডেল + পর্যবেক্ষণ + অনিশ্চয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করে। তাই এখানে “ভবিষ্যদ্বাণীমূলক নিশ্চিত ঘোষণা” নয়; আছে প্রমাণ-নির্ভর সম্ভাব্যতা ও সীমা নির্ধারণ। এই বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর কোনোটিই মহাবিশ্বের “চূড়ান্ত ধ্বংস” আগামী কয়েক বিলিয়ন বছরের মধ্যে ঘটবে—এমন কোনো আভাস দেয় না; বরং মানুষের সময়-স্কেলে (মানব ইতিহাস/সভ্যতার টাইমলাইন) এগুলো যে সময়-সংখ্যা দেখায়, তা কল্পনাতীতভাবে বহু-বড়।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “কিয়ামত/শেষ” — আনুমানিক টাইমলাইন
সময়গুলো আনুমানিক (approx.) এবং মডেল-নির্ভর। এখানে “পৃথিবীর বাসযোগ্যতা” → “সূর্যের বিবর্তন” → “মহাবিশ্বের সম্ভাব্য ভাগ্য” ধারাবাহিকভাবে দেখানো হয়েছে।
  1. এখন
    পৃথিবী এখনো বাসযোগ্য
    মানব-সভ্যতা-স্কেলে বিজ্ঞান “একটা নির্দিষ্ট শেষের তারিখ” দেয় না; দীর্ঘমেয়াদে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনগুলোর কারণে কী হতে পারে তা সম্ভাব্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করে।
  2. ~ ১–১.৫ বিলিয়ন বছর পরে
    সূর্য ধীরে ধীরে বেশি উজ্জ্বল → পৃথিবীর বাসযোগ্যতা কমে
    সূর্যের আলো/তাপ বাড়ার সাথে সাথে জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বদলাতে পারে। ফলে পানির স্থায়ী ক্ষয়, মহাসাগরের বাষ্পীভবন, জলচক্র ভেঙে পড়া, এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে—অর্থাৎ “পৃথিবীর বাসযোগ্যতা” আগে কমতে পারে।
  3. ~ ৫–৭ বিলিয়ন বছর পরে
    সূর্য “লাল দানব” (Red Giant) পর্যায়ে
    সূর্যের অভ্যন্তরীণ বিবর্তনে এর আকার ও বিকিরণ বড়ভাবে বদলাবে। এই পর্যায়ে পৃথিবীর বর্তমান অবস্থায় টিকে থাকা অত্যন্ত অনিশ্চিত— অতিরিক্ত তাপ, বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয়, কক্ষপথের পরিবর্তন—সবই সম্ভাব্য।
  4. এর পরে: “কসমিক স্কেল”
    মহাবিশ্বের শেষ-পরিণতি: অন্ধকার শক্তি (Dark Energy) কেমন আচরণ করে তার ওপর নির্ভরশীল
    পৃথিবী/সূর্যের সময়রেখা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। কিন্তু “মহাবিশ্বের শেষ” (ultimate fate) বিষয়ে প্রধান অনিশ্চয়তা— অন্ধকার শক্তি ধ্রুব (constant) নাকি সময়ের সাথে পরিবর্তিত (dynamical)।
    সম্ভাব্য পথ–A: ধ্রুব (≈ constant)
    মহাশীতল/তাপ-মৃত্যু (Big Freeze / Heat Death): মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে; নক্ষত্র-জ্বালানি শেষ; শক্তি ছড়িয়ে গিয়ে কাজ করার মতো “ফ্রি এনার্জি” কমে—ফলে দীর্ঘ সময় পরে গঠন/ক্রিয়া নিস্তেজ হয়।
    সময়: অত্যন্ত দীর্ঘ (trillions+ years scale), নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়
    সম্ভাব্য পথ–B: পরিবর্তিত (dynamical)
    বিগ রিপ (Big Rip) বা বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch)–এর মতো বিকল্প দৃশ্যপট তাত্ত্বিকভাবে আলোচনায় আসে—কিন্তু এগুলো ডেটা/মডেল-নির্ভর; নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়।
    সময়: মডেল অনুযায়ী ব্যাপকভাবে বদলায়

উপসংহার

উপরের বর্ণনাগুলো একসাথে ধরলে একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়: কিয়ামতের “সন্নিকটতা” বারবার উচ্চারিত, যুদ্ধের কল্পচিত্র ঘোড়া–তরবারি–অশ্বারোহী যুগের ফ্রেমেই আবদ্ধ, এবং “বালক বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগে” জাতীয় বাক্যে বাস্তব সময়-ইঙ্গিতও হাজির। কিন্তু বাস্তব ইতিহাসে সেই “মহাকিয়ামত” ঘটেনি—ফলে পরবর্তীকালে অনেক ব্যাখ্যায় “এটা মহাকিয়ামত নয়, ব্যক্তির মৃত্যু/ছোট কিয়ামত”—এই ধরনের অর্থ-স্খলন (meaning-shift) দেখা যায়। সমস্যা এখানে শুধু শব্দের একাধিক অর্থ সম্ভব—এটা নয়; সমস্যা হলো, ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সামনে এলেই অর্থকে নিরাপদ দিকে সরিয়ে নেওয়া। যুক্তির ভাষায় এটি প্রায়ই ফলাফল-নির্ভর রেসকিউ-রিডিং: দাবি মেলাতে না পারলে মানে বদলে দাবিকে প্রমাণ-অযোগ্য করে তোলা।

যদি কোনো বক্তব্যকে “ঐশী জ্ঞান”-এর নমুনা হিসেবে হাজির করা হয়, তাহলে তার ভাষা ও সময়-সংকেত এমন হওয়া উচিত যা ব্যর্থ হলে সহজে “অন্য অর্থ ছিল” বলে সরে যাওয়া যায় না। কারণ সেই ক্ষেত্রে ভবিষ্যদ্বাণী কার্যত পরীক্ষাযোগ্য থাকে না—ব্যর্থতা দেখা দিলেই জাদুকরদের হাত সাফাইয়ের মত অর্থের বদল কিংবা ব্যাখ্যার দরজা খুলে দিয়ে তাকে অনির্ণেয় করে ফেলা হয়। এখানেই মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়: যে দাবি সময়-ইঙ্গিত সৃষ্টি করে, পরে বাস্তবতার সঙ্গে না মিলে অর্থ-স্খলনের মাধ্যমে বাঁচানো হয়—তাকে কী যুক্তিতে অলৌকিক প্রমাণ বলা হবে? সত্যিকারের অতিপ্রাকৃত জ্ঞানের দাবি হলে, তার ভাষা এমনভাবে নির্মিত হওয়ার কথা নয় যাতে ভুল ঢাকতে বারবার শব্দের মানে পাল্টানোর প্রয়োজন পড়ে।


তথ্যসূত্রঃ
  1. Britannica: Eschatology—“last things”, end of time, resurrection, judgment ↩︎
  2. Britannica: Apocalypticism ↩︎
  3. Encyclopaedia Iranica: FRAŠŌ.KƎRƎTI—final renovation/transfiguration after evil defeated ↩︎
  4. Encyclopaedia Iranica: ESCHATOLOGY—“final things”, savior defeating evil, end of world; Zoroastrian influence ↩︎
  5. Britannica: Ragnarök—final battle, catastrophe, world reborn ↩︎
  6. Britannica: Eschatology—historical eschatologies in Judaism/Christianity; apocalyptic tradition ↩︎
  7. Billings 1994, Annual Review of Sociology: Religion and Political Legitimation—religion legitimates power/privilege and can also support protest ↩︎
  8. Norman Cohn, The Pursuit of the Millennium—OUP ক্যাটালগ পৃষ্ঠা ↩︎
  9. Marx, A Contribution to the Critique of Hegel’s Philosophy of Right: Introduction ↩︎
  10. Stanford Encyclopedia of Philosophy: Marx—opium remark ↩︎
  11. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭০১৪ ↩︎
  12. সূরা কামার, আয়াত ১ ↩︎
  13. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪০ ↩︎
  14. মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী, হাদিসঃ ৫৬০ ↩︎
  15. মুখতাসার সহীহ আল-বুখারী, ইসলামী দাওয়া সেন্টার উম্মুল হামাম রিয়াদ সৌদি আরব, পৃষ্ঠা ২৩১ ↩︎
  16. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৭২৬৩ ↩︎
  17. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪২ ↩︎
  18. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪৩ ↩︎
  19. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৭১৪৪ ↩︎
  20. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠাঃ ৪৩৫ ↩︎
  21. সহীহ ইবনু হিব্বান (হাদিসবিডি), হাদিসঃ ৫৬৬ ↩︎
  22. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬০৬৭ ↩︎
  23. Science (AAAS), “Earth Won’t Die as Soon as Thought” ↩︎
  24. NASA Science, “Chapter 6: Aging Into Gianthood” — “Sun approaches its red giant phase some 6 billion years from now” ↩︎
  25. Planck 2018 results VI: Cosmological parameters — A&A 641, A6 (2020) PDF ↩︎
  26. DESI DR2 Results: March 19 Guide — 2025-03-19 ↩︎
  27. Nature Astronomy — “Dynamical dark energy in light of the DESI DR2…” (2025) ↩︎