
Table of Contents
ভূমিকা
খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসে ত্রিত্ববাদ (Trinity) একটি কেন্দ্রীয়—এবং একই সঙ্গে জটিল—ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা। মূলধারার (বিশেষ করে নিকিয়ান/অর্থডক্স) বর্ণনায় ঈশ্বর একজন, কিন্তু সেই এক ঈশ্বরত্ব তিন “ব্যক্তিত্বে” প্রকাশিত—পিতা, পুত্র (যিশু খ্রিস্ট), এবং পবিত্র আত্মা; তিনজনই ঈশ্বর, কিন্তু তিনজন “তিন ঈশ্বর” নন। এই ধারণাটি নূতন নিয়মে সরাসরি একটি মৌলিক বিশ্বাস হিসেবে উপস্থিত—এমন দাবি আধুনিক গবেষণায় ঐতিহাসিকভাবে টেকসই বলে ধরা হয় না; বরং বহু স্কলার দেখান যে, যিশুর পরিচয় ও ঈশ্বরত্ব-ধারণা নিয়ে প্রাথমিক খ্রিস্টান সমাজে বিভিন্ন স্তরের ভাষ্য ছিল, এবং দীর্ঘ তাত্ত্বিক-দার্শনিক ও প্রতিষ্ঠানিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে “ক্লাসিক ট্রিনিটি” ধীরে ধীরে একটি আনুষ্ঠানিক গির্জা-ডগমায় রূপ নেয়। [1] [2] [3]
এই প্রেক্ষাপটে কোরআনের কিছু আয়াতে খ্রিস্টধর্মের ঈশ্বর-ধারণা ও “ত্রিত্ব” প্রসঙ্গে সমালোচনামূলক বক্তব্য দেখা যায়—যার মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত একটি আয়াত হলো মায়িদা ৫:১১৬। সেখানে ঈসা (যিশু)-কে প্রশ্ন করার একটি দৃশ্যের মাধ্যমে এমন এক ধারণার সমালোচনা উঠে আসে, যা বহু পাঠকের কাছে “আল্লাহ—ঈসা—মরিয়ম”–কে একটি ত্রয়ী বা ঈশ্বরত্ব-সম্পর্কিত কাঠামোর অংশ হিসেবে ধরে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মূলধারার নিকিয়ান/ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টধর্মে মরিয়মকে ট্রিনিটির অংশ হিসেবে ধরা হয় না। [4]
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো—(ক) মূলধারার খ্রিস্টান ট্রিনিটি আসলে কী বলে, তার বাইবেলীয় সূত্রগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হয়; (খ) ঐতিহাসিকভাবে ট্রিনিটি কীভাবে ডগমায় রূপ নেয়; এবং (গ) কোরআনের বক্তব্য সেই মূলধারার ধারণার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এই প্রশ্নগুলোকে টেক্সট-ক্রিটিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতের আলোকে দেখা। বিশেষ করে, যদি কোরআন যে “ত্রিত্ব” খণ্ডন করছে তা বাস্তবে মূলধারার ট্রিনিটি না হয়ে অন্য কোনো আঞ্চলিক বা স্থানীয়/ফ্রিঞ্জ ধারণা (যেমন মরিয়মকে অতিরঞ্জিতভাবে দেবীসদৃশ সম্মান দেওয়া কোনো গোষ্ঠী) হয়ে থাকে, তবে তা কোরআনের বর্ণনার “টার্গেট” ও যথার্থতা—উভয় ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন তোলে।
ট্রিনিটি কী?
খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ বা ট্রিনিটি হলো (বিশেষত নিকিয়ান/অর্থডক্স ধারায়) ঈশ্বরের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার একটি কেন্দ্রীয় ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ। এর মূল বক্তব্য—ঈশ্বর এক (এক সত্তা/এক ঈশ্বরত্ব), কিন্তু সেই এক ঈশ্বরত্ব তিন “ব্যক্তিত্বে” প্রকাশিত: পিতা, পুত্র (যিশু খ্রিস্ট), এবং পবিত্র আত্মা। তিনজনই ঈশ্বর, তবে তারা তিনটি আলাদা ঈশ্বর নন। একই সঙ্গে ব্যক্তিত্ব হিসেবে তারা একে অপরের সঙ্গে অভিন্ন নন—পিতা পুত্র নন, পুত্র পবিত্র আত্মা নন, পিতা পবিত্র আত্মা নন।
যদিও আধুনিক ত্রিত্ববাদের বিকশিত মতবাদটি নূতন নিয়মের বইগুলোতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয় নি, তথাপি নূতন নিয়মে ঈশ্বরের একটি ত্রয়ী ধারণা রয়েছে এবং এতে বেশ কয়েকটি ত্রিত্ববাদী সূত্র রয়েছে। ত্রিত্বের মতবাদটি প্রথম প্রণীত হয়েছিল প্রাথমিক যুগের খ্রিস্টান ও গির্জার ফাদারদের মধ্যে যখন তাঁরা তাঁদের শাস্ত্রীয় নথিপত্র ও পূর্ববর্তী ঐতিহ্যে যিশু ও ঈশ্বরের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রিত্ব সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা রয়েছে: ফিলিওকুই, শাশ্বত কার্যকরী অধীনতাবাদ, অধীনতাবাদ ও সামাজিক ত্রিত্ববাদ।

উল্লেখ্য, ত্রিত্ববাদ/ত্রয়ী ধারণা শুধু খ্রিস্টধর্মেই সীমাবদ্ধ নয়—হিন্দুধর্মসহ বহু ধর্ম-সংস্কৃতিতে “তিনের সমষ্টি” বা “ত্রয়ী দেবতা/ত্রয়ী নীতি” দেখা যায়। তবে এগুলোর বেশিরভাগই ধারণাগতভাবে খ্রিস্টান ‘Trinity’ (ট্রিনিটি)–র সঙ্গে এক নয়। খ্রিস্টধর্মের ট্রিনিটি বলতে সাধারণত বোঝানো হয়: এক ঈশ্বর (one God), কিন্তু সেই এক ঈশ্বরত্ব তিন “ব্যক্তিত্বে/পারসনে” প্রকাশিত—পিতা, পুত্র (যিশু খ্রিস্ট), এবং পবিত্র আত্মা। মূলধারার ট্রিনিটারিয়ান খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে এই তিন ব্যক্তি সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সহ-চিরন্তন, এবং তারা “তিনটি আলাদা ঈশ্বর” বা “তিনটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সত্তা” নয়; বরং একই ঈশ্বরত্ব ভাগাভাগি করেন—যদিও ব্যক্তিত্ব হিসেবে একে অপরের সঙ্গে অভিন্ন নন (পিতা পুত্র নন, পুত্র পবিত্র আত্মা নন, পিতা পবিত্র আত্মা নন)।
বাইবেলে ট্রিনিটির ধারণা
“ত্রয়ী” বা “তিনের সমষ্টি” ধরনের ধারণা বহু ধর্ম-সংস্কৃতিতে দেখা গেলেও, খ্রিস্টধর্মের Trinity একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক সংজ্ঞা বহন করে: এক ঈশ্বরত্ব (one essence/being), কিন্তু তিন ব্যক্তিত্ব (three persons)—পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। অর্থাৎ পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর, পবিত্র আত্মা ঈশ্বর—তবু তারা তিনটি আলাদা ঈশ্বর নন। ব্যক্তিত্ব হিসেবে তারা পৃথক (পিতা পুত্র নন, পুত্র পবিত্র আত্মা নন, পিতা পবিত্র আত্মা নন), কিন্তু ঈশ্বরত্বের দিক থেকে এক। এই ধরনের ত্রয়ী-ভাষা বা সূত্র নূতন নিয়মের কিছু স্থানে দেখা যায়—যেমন “পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে” বাপ্তিস্মের নির্দেশ। [5]
18 তখন যীশু কাছে এসে তাদের বললেন, ‘স্বর্গে ও পৃথিবীতে পূর্ণ ক্ষমতা ও কর্ত্তৃত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে৷
19 তাই তোমরা যাও, তোমরা গিয়ে সকল জাতির মানুষকে আমার শিষ্য কর৷ পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে বাপ্তিস্ম দাও৷
20 আমি তোমাদের যেসব আদেশ দিয়েছি, সেসব তাদের পালন করতে শেখাও আর দেখ যুগান্ত পর্যন্ত প্রতিদিন আমি সর্বদাই তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি৷’
এই বিষয়ে আরও বলা হয়েছে, [6]
16 আমি পিতার কাছে চাইব, আর তিনি তোমাদের আর একজন সাহায্যকারী দেবেন, যেন তিনি চিরকাল তোমাদের সঙ্গে থাকেন৷
17 তিনি সত্যের আত্মা, যাঁকে এই জগত সংসার মেনে নিতে পারে না, কারণ জগত তাঁকে দেখে না বা তাঁকে জানে না৷ তোমরা তাঁকে জান, কারণ তিনি তোমাদের সঙ্গে সঙ্গেই থাকেন, আর তিনি তোমাদের মধ্যেই থাকবেন৷
প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ Bart D. Ehrman, James D. G. Dunn, এবং Raymond E. Brown একমত যে, যিশুর ঈশ্বরত্ব ও ট্রিনিটির ধারণা নূতন নিয়মের গ্রন্থগুলোতে সম্পূর্ণরূপে বিকশিত আকারে উপস্থিত নয়, বরং এটি ছিল ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি মতবাদ। Ehrman দেখিয়েছেন যে প্রাথমিক খ্রিস্টধর্মে যিশুকে প্রথমে একজন মহিমান্বিত মানব মশীহ হিসেবে দেখা হতো এবং পরে ধীরে ধীরে উচ্চতর, দ্যৈবিক মর্যাদায় উন্নীত করা হয় (Ehrman, How Jesus Became God)। Dunn-এর মতে, প্রাথমিক খ্রিস্টানদের “উচ্চখ্রিস্টতত্ত্ব” (High Christology) গঠিত হয়েছিল যিশুর কর্মকাণ্ডের ধর্মীয় ব্যাখ্যা থেকে, কিন্তু তাঁকে “সহ-সমান অনন্ত ঈশ্বর” হিসেবে দেখা ছিল পরবর্তী তাত্ত্বিক বিকাশ (Dunn, Christology in the Making)। অন্যদিকে Brown যুক্তি দেন যে যিশুর ঈশ্বরত্বের ধারণা যোহনের সুসমাচারে শক্তিশালী হলেও, ট্রিনিটির ত্রয়ী কাঠামো—পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা—একক মতবাদ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপ পায় মূলত দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর গির্জা-পরিসরে, বিশেষ করে নিকেয়া কাউন্সিলের পূর্বাপর বিতর্কগুলোর সময় (Brown, The Birth of the Messiah; An Introduction to New Testament Christology)। তাদের গবেষণা একসঙ্গে ইঙ্গিত করে যে, আজকের প্রচলিত ট্রিনিটি মতবাদটি যিশুর জীবদ্দশায় বা নূতন নিয়ম রচনাকালে বিদ্যমান কোনো “স্পষ্ট ঘোষিত মতবাদ” ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘ শতাব্দীব্যাপী তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও প্রতিষ্ঠানিক বিবর্তনের ফল।
যিশুর ক্রুশবিদ্ধতা ও তথাকথিত পুনরুত্থানের অভিজ্ঞতার পর প্রথম অনুসারীরা তাঁকে মূলত একজন ইহুদি মশীহ ও প্রেরিত হিসেবে প্রচার করছিলেন; এখানে এখনো সুস্পষ্ট ট্রিনিটি মতবাদ নেই।
পল তাঁর পত্রগুলোতে যিশুকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায় (প্রভু, প্রাক-অস্তিত্বশীল সত্তা) উপস্থাপন করেন, কিন্তু এখনো “এক ঈশ্বর, তিন ব্যক্তিত্ব” হিসেবে গঠিত ট্রিনিটি মতবাদ দেখা যায় না (Dunn-এর ভাষায় ক্রিস্টোলজি “তৈরি হচ্ছে”).
মার্ক, মথি, লূক ও বিশেষ করে যোহনের সুসমাচারে যিশুর দ্যৈবিক মর্যাদা আরও জোরালোভাবে উঠে আসে (“বাক্য ঈশ্বর ছিলেন” ইত্যাদি), তবে আনুষ্ঠানিক ট্রিনিটি মতবাদ এখনো গঠিত হয়নি — এটিকে Ehrman ও Brown দু’জনই “প্রক্রিয়াধীন” বিকাশ হিসেবে দেখান।
ইরিনিউস, টারতুলিয়ান, ওরিজেন প্রমুখ গির্জা–ফাদারগণ “লোগোস” তত্ত্বের মাধ্যমে পিতা–পুত্র–আত্মার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। এখানে ট্রিনিটির দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ভাষা তৈরি হতে থাকে, যা Dunn বিশ্লেষণ করেন Christology in the Making গ্রন্থে।
নিকেয়া কাউন্সিলে যিশুকে পিতার সঙ্গে “একই সত্তা” (homoousios) ঘোষণা করা হয়। Brown-এর ব্যাখ্যায়, এটি যিশুর পূর্ণ ঈশ্বরত্বকে গির্জার আনুষ্ঠানিক ডগমা হিসেবে স্থির করে, যদিও পবিত্র আত্মার বিষয়ে এখনও পূর্ণ ঐকমত্য হয়নি।
এই কাউন্সিলে পবিত্র আত্মার ঈশ্বরত্বও স্বীকৃত হয় এবং “এক সত্তা, তিন ব্যক্তিত্ব” – ক্লাসিক ট্রিনিটি মতবাদ গির্জা–ডগমা হিসেবে সম্পূর্ণ রূপ পায়। Ehrman সহ আধুনিক গবেষকেরা এটিকে দীর্ঘ তাত্ত্বিক বিবর্তনের শেষ ধাপ হিসেবে দেখেন।
Epiphanius-এর বর্ণনায় কিছু অঞ্চলভিত্তিক গোষ্ঠী (Collyridians) মরিয়মকে অতিরঞ্জিত সম্মান বা উপাসনার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল; তবে এটি মূলধারার ট্রিনিটির অংশ নয়, বরং fringe আন্দোলন — যা পরবর্তীকালে কিছু ভুল ধারণার উৎস হতে পারে।
Raymond E. Brown দেখান, নূতন নিয়মে যিশুর ঈশ্বরত্বের নানা স্তর থাকলেও পূর্ণ গঠিত ট্রিনিটি নেই; James D. G. Dunn দেখান কিভাবে ক্রিস্টোলজি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে; আর Bart D. Ehrman জনপ্রিয়ভাবে যুক্তি দেন যে, যিশু থেকে নিকেয়া পর্যন্ত যাত্রায় “মানব মশীহ” ধীরে ধীরে “সহ-অনন্ত ঈশ্বর”–এ রূপান্তরিত হন — অর্থাৎ আজকের ট্রিনিটি মতবাদটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল, যিশুর জীবদ্দশায় বিদ্যমান কোনো প্রস্তুত ডগমা নয়।
কোরআনে ট্রিনিটি সম্পর্কিত ভুল
নবী মুহাম্মদের কাছে খ্রিস্টানদের “ত্রিত্ব” ধারণাটি যে পথে পৌঁছেছিল, তা ছিল মূলত লোকমুখে প্রচলিত বর্ণনা, স্থানীয় বিতর্ক, এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর নানা রকম ধর্মীয় ভাষ্য—এর মিশ্রণ। সেই প্রেক্ষাপটে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে আসে।
প্রথমত, তিনি যে “ট্রিনিটি” ধারণাটি শুনেছিলেন, সেটিকে তিনি ভুলভাবে এমন একটি ত্রয়ী হিসেবে বুঝেছিলেন—ঈশ্বর, ঈশ্বরের পুত্র (ঈসা/যিশু), এবং যিশুর মাতা মরিয়ম। দ্বিতীয়ত, তিনি হয়তো এমন কোনো উৎস থেকে “ট্রিনিটি” সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন, যারা মূলধারার খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের প্রতিনিধি ছিল না—বরং স্থানীয়ভাবে বিকৃত, লোকবিশ্বাস-প্রভাবিত, বা কোনো ফ্রিঞ্জ/সংকর ধর্মীয় প্রচারকের বক্তব্য ছিল; যেখানে মরিয়মকে ঈশ্বরত্বের অংশ হিসেবে অতিরঞ্জিতভাবে টেনে আনা হয়েছিল।
যে কারণেই হোক, কোরআনের কিছু আয়াত পাঠ করলে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সেখানে “ত্রিত্ব” বিষয়ে যে সমালোচনা উপস্থিত, তা মূলধারার খ্রিস্টান ট্রিনিটি—পিতা, পুত্র, পবিত্র আত্মা—এই কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি মেলে না। বরং সমালোচনার লক্ষ্য যেন এমন এক ত্রয়ী, যেখানে পবিত্র আত্মার জায়গায় মরিয়মকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ ট্রিনিটারিয়ান খ্রিস্টানই মরিয়মকে ট্রিনিটির অংশ মনে করেন না; ট্রিনিটির তৃতীয় “ব্যক্তিত্ব” হলো পবিত্র আত্মা, মরিয়ম নয়।
এই বিভ্রান্তি ব্যাখ্যা করতে আলোচনায় প্রায়ই একটি “ফ্রিঞ্জ” উদাহরণ টানা হয়—Collyridian নামে কথিত এক নারীকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ, যাদের সম্পর্কে প্রাচীন লেখক Epiphanius উল্লেখ করেন। বর্ণনা অনুযায়ী তারা মরিয়মকে অতিরঞ্জিত সম্মান, এমনকি উপাসনার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। তবে এখানে দুটি সতর্কতা জরুরি: (ক) তাদের অস্তিত্ব ও ব্যাপ্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সন্দেহ/দ্বিধা রয়েছে, এবং (খ) থাকলেও তারা ছিল অত্যন্ত সংখ্যালঘু ও মূলধারার খ্রিস্টধর্মের বাইরে—অতএব তাদের বিশ্বাসকে “খ্রিস্টান ট্রিনিটি” হিসেবে উপস্থাপন করা নির্ভুল নয়।
এখন দেখা যাক, কোরআনের কোন আয়াতে এই ত্রয়ী-ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়—আয়াতটি পড়লে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। [7] –
স্মরণ কর, যখন আল্লাহ ঈসা ইবনু মারইয়ামকে বললেন, তুমি কি লোকেদেরকে বলেছিলে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে আর আমার মাতাকে ইলাহ বানিয়ে নাও।’ (উত্তরে) সে বলেছিল, ‘পবিত্র মহান তুমি, এমন কথা বলা আমার শোভা পায় না যে কথা বলার কোন অধিকার আমার নেই, আমি যদি তা বলতাম, সেটা তো তুমি জানতেই; আমার অন্তরে কী আছে তা তুমি জান কিন্তু তোমার অন্তরে কী আছে তা আমি জানি না, তুমি অবশ্যই যাবতীয় গোপনীয় তত্ত্ব সম্পর্কে পূর্ণরূপে ওয়াকেফহাল।
— Taisirul Quran
আর যখন আল্লাহ বলবেনঃ হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলেঃ তোমরা আল্লাহর সাথে আমার ও আমার মায়েরও ইবাদাত কর? ঈসা নিবেদন করবেঃ আপনি পবিত্র! আমার পক্ষে কোনক্রমেই শোভনীয় ছিলনা যে, আমি এমন কথা বলি যা বলার আমার কোন অধিকার নেই; যদি আমি বলে থাকি তাহলে অবশ্যই আপনার জানা থাকবে; আপনিতো আমার অন্তরে যা আছে তাও জানেন, পক্ষান্তরে আপনার জ্ঞানে যা কিছু রয়েছে আমি তা জানিনা; সমস্ত গাইবের বিষয় আপনিই জ্ঞাত।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?’ সে বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, যার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য সম্ভব নয়। যদি আমি তা বলতাম তাহলে অবশ্যই আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরে যা আছে তা আপনি জানেন, আর আপনার অন্তরে যা আছে তা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি গায়েবী বিষয়সমূহে সর্বজ্ঞাত’।
— Rawai Al-bayan
আরও স্মরণ করুন, আল্লাহ্ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়াম –তনয় ‘ঈসা! আপনি কি লোকদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া আমাকে আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ কর? ‘তিনি বলবেন, ‘আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তো তা জানতেন। আমার অন্তরের কথাতো আপনি জানেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি অদৃশ্য সম্বদ্ধে সবচেয়ে ভালো জানেন।’
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
উপসংহার
উপরের আলোচনার সারসংক্ষেপ দাঁড়ায় তিনটি মূল পর্যবেক্ষণে। প্রথমত, ঐতিহাসিক ও একাডেমিক গবেষণা থেকে বোঝা যায়—ক্লাসিক ট্রিনিটি (পিতা–পুত্র–পবিত্র আত্মা) কোনো “একদিনে নাজিল হওয়া” প্রস্তুত সূত্র নয়; এটি দীর্ঘ সময়ের ধর্মতাত্ত্বিক নির্মাণ—যার পেছনে নূতন নিয়মের নানা স্তরের বক্তব্য, প্রাথমিক গির্জা-ফাদারদের ব্যাখ্যা, এবং শেষ পর্যন্ত নিকিয়া ও কনস্টান্টিনোপল কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রেখেছে। এই বিকাশ-ইতিহাসটি বোঝা জরুরি, কারণ কোনো টেক্সট (যেমন কোরআন) যদি ৭ম শতকের আরব পরিবেশে খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানায়, সে প্রতিক্রিয়া অনেক সময় “তৎকালীন লোকমুখে প্রচলিত ধারণা”, “স্থানীয় গোষ্ঠীর বিশ্বাস”, বা “বিতর্কিত ব্যাখ্যা”–কে লক্ষ্য করে হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কোরআনের যে ভাষ্য (বিশেষ করে ৫:১১৬) আলোচনায় আসে, তা পাঠ করলে অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়—সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু যেন মূলধারার ট্রিনিটির তৃতীয় সত্তা ‘পবিত্র আত্মা’ নয়; বরং মরিয়ম-কেন্দ্রিক কোনো ত্রয়ীধারণার দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অথচ ঐতিহাসিকভাবে অধিকাংশ ট্রিনিটারিয়ান খ্রিস্টানই মরিয়মকে ট্রিনিটির অংশ মনে করেন না। ফলে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: কোরআন কি সত্যিই মূলধারার ট্রিনিটি-কেই লক্ষ্য করেছে, নাকি কোনো ফ্রিঞ্জ/অস্থানীয় ধারণা অথবা ভুল-বোঝাবুঝি–কে লক্ষ্য করে সমালোচনা দাঁড় করিয়েছে? এই দ্বিধা প্রবন্ধটির থিসিসকে কেন্দ্রে এনে দাঁড় করায়।
তৃতীয়ত, এই টেক্সট-সংঘাতকে ব্যাখ্যা করার সম্ভাব্য পথ একাধিক—এবং প্রতিটি পথেরই আলাদা পরিণতি আছে। একদিকে বলা যেতে পারে, কোরআন স্থানীয় কোনো গোষ্ঠীর বাস্তব আচরণ/বিশ্বাস (যেমন মরিয়মকে দেবীসদৃশ সম্মান)–কে খণ্ডন করেছে—তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, সেটিকে “খ্রিস্টধর্মের কেন্দ্রীয় ট্রিনিটি” হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা যথাযথ। অন্যদিকে যদি বলা হয়, কোরআন মূলধারাকেই খণ্ডন করতে গিয়ে ধারণাগতভাবে বিভ্রান্ত হয়েছে, তবে তা ধর্মগ্রন্থের “ধর্মতাত্ত্বিক নির্ভুলতা” বিষয়ে সংশয় তৈরি করে। আবার কেউ চাইলে এটিকে “রেটোরিক্যাল” বা বিতর্কমূলক ভাষা বলেও ব্যাখ্যা করতে পারেন—যেখানে প্রতিপক্ষের ধারণাকে সহজ করে, কখনও বিকৃত করে দেখানো হয়; কিন্তু তখনও প্রশ্ন থাকে—এ ধরনের রেটোরিক কি ন্যায্য বর্ণনা, নাকি বিতর্কের কৌশল? [8]
সব মিলিয়ে, এই আলোচনার শেষ কথা হলো: “কোরআনে ট্রিনিটির সমালোচনা”–কে এক বাক্যে নিষ্পত্তি করা যায় না। বিষয়টি বোঝার জন্য (১) মূলধারার ট্রিনিটির সংজ্ঞা, (২) ট্রিনিটির ঐতিহাসিক বিকাশ, এবং (৩) কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতের টেক্সট ও ব্যাখ্যা-ঐতিহ্য—এই তিনটিকে একসাথে ধরে বিচার করতে হয়। এই প্রবন্ধের বিশ্লেষণ পাঠককে অন্তত একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে: কোরআনের বর্ণিত “ত্রয়ী” ধারণা এবং খ্রিস্টান মূলধারার “ত্রয়ী” ডগমা—দুইটি এক জিনিস ধরে নেওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ অনুমান নয়; বরং এখানে টেক্সট, ইতিহাস ও মতাদর্শ—তিন স্তরেই সতর্ক তুলনা প্রয়োজন।
