
Table of Contents
ভূমিকা
ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনি কাঠামোর একটি অত্যন্ত আপত্তিকর এবং সাম্প্রদায়িক দিক হলো অমুসলিম বা ‘জিম্মি’দের সাথে সামাজিক আচরণের নীতিমালা। বিভিন্ন ধ্রুপদী উৎস এবং নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ অনুসারে, অমুসলিমদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমমর্যাদার পরিবর্তে এক ধরনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অধস্তনতা বজায় রাখার নির্দেশনা পাওয়া যায়। এই বিধানগুলোর মূল লক্ষ্য হলো অমুসলিমদের মধ্যে এক প্রকার হীনম্মন্যতা বা ‘লাঞ্ছনা’র অনুভূতি তৈরি করা, যাতে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। আধুনিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও, ধ্রুপদী তাফসীর ও শরিয়াহর ব্যাখ্যায় অমুসলিমদের প্রতি এই ধরনের অবমাননাকর আচরণকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদা সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি, সেখানে ধর্মীয় টেক্সটের এই নির্দেশনাবলী অমুসলিমদের জন্য ঠিক কতটা অবমাননাকর হতে পারে, তা তথ্যপ্রমাণের আলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র
ব্রিটেনে আরব ইসলাম প্রচারক
আসুন শুরুতেই আরবের একজন আলেমের বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,
বাংলা টিভি চ্যানেলে অমুসলিমদের সম্পর্কে
এবারে আসুন বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলে একটি ইসলামিক প্রশ্নোত্তর শুনে নেয়া যাক,
অমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব নিষিদ্ধঃ দেশের আলেমগণ
আসুন আরও কিছু বক্তব্য শুনি,
অমুসলিমদের ঘৃণা করতে হবে
অমুসলিমদের রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিতে হবে
এবারে আসুন এই তথ্যগুলোর দলিল যাচাই করে দেখি। বাদবাকি দলিল অন্য পাতাগুলোতে দেয়া আছে [1]
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী
অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছদঃ ৪১. আহলে কিতাবদের সালাম প্রদান প্রসঙ্গে
১৬০২। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ইয়াহুদী-নাসারাদের প্রথমে সালাম প্রদান করো না। তোমরা রাস্তায় চলাচলের সময় তাদের কারো সাথে দেখা হলে তাকে রাস্তার কিনারায় ঠেলে দিও।
সহীহ, সহীহা (৭০৪), ইরওয়া (১২৭১), মুসলিম, বুখারী আদাবুল মুফরাদ, ২৮৫৫ নং হাদীসটির আলোচনা আসবে।
ইবনু উমার, আনাস ও আবূ বাসরা আল-গিফারী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
এই হাদিসটির বর্ণনায় এটিও বলা হয়েছে যে, মুসলিমদের প্রতি নির্দেশনাই হচ্ছে অমুসলিমদের লাঞ্ছিত করার [2] [3]
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২৪/ অভিযান
পরিচ্ছেদঃ কিতাবীদের সালাম দেওয়া।
১৬০৮। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইয়াহূদী খ্রিষ্টানকে প্রথমেই সালাম দিবে না। এদের কাউকে যদি পথে পাও তবে এর কিনারায় তাদের ঠেলে দেবে। সহীহ, সহীহাহ ৭০৪, ইরওয়া ১২৭১, মুসলিম, আদাবুল মুফরাদ, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৬০২ [আল মাদানী প্রকাশনী]
এই বিষয়ে ইবনু উমার, আনাস, সাহাবী আবূ বাসরা গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, এই হাদীসটি হাসান-সহীহ। হাদীসটির তাৎপর্য হলো, ইয়াহূদী খৃষ্টানকে প্রথমেই তুমি সালাম দিবে না। কতক আলিম বলেন, এটা অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ হলো এতে এদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়, অথচ মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ হল এদেরকে লাঞ্ছিত করার। এমনিভাবে পথে এদের কারো পাওয়া গেলে তার জন্য পথ ছাড়া হবে না কেননা, এতে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এই বিষয়টি তাফসীরে ইবনে কাসীরেও বলা আছে, [4] –
حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَّدٍ وَهُمْ صَاغَرُونَ অর্থাৎ যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে
তাহারা যতক্ষণ না মুসলমানদের বিজয়ী অবস্থায় এবং নিজেদের লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অবদমিত অবস্থায় স্বহস্তে জিযিয়া প্রদান করিবে …। উক্ত কারণেই কোন যিম্মীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা বা তাহাকে কোন ভাবে মুসলমানের ঊর্ধ্বে রাখা মুসলমানের জন্যে নিষিদ্ধ ও নাজায়েয। তাহারা সর্বদা লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় থাকিবে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে মুসলিম শরীফে বর্ণিত রহিয়াছে যে, আবূ হুরায়রা (রা) বলেন: নবী করীম (সা) বলিয়াছেন: তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারা জাতিদ্বয়ের লোকদিগকে আগ বাড়িয়া সালাম দিও না; আর তাহাদের কাহারো সহিত রাস্তায় তোমাদের সাক্ষাৎ হইলে তাহাকে রাস্তার সংকীর্ণতম অংশ দিয়া চলিতে বাধ্য করিও।

উপসংহার
উপরে উল্লিখিত তথ্যসূত্র এবং সমকালীন আলেমদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ধ্রুপদী ইসলামী বিধানে অমুসলিমদের সাথে সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি সমমর্যাদা নয়, বরং অসমতা ও লাঞ্ছনা। প্রধান হাদিস গ্রন্থগুলোতে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন অমুসলিমদের প্রথমে সালাম না দেওয়া হয় এবং জনপথে চলাচলের সময় তাদের রাস্তার সংকীর্ণতম অংশে ঠেলে দেওয়া হয়। এই বিধানগুলোর উদ্দেশ্য কেবল নিছক ধর্মের ভিন্নতা নয়, বরং অমুসলিমদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা। তাদের পরিবার পরিজনের সামনে অপমান অপদস্থ করা এবং এই অপমানের চাপ সহ্য করতে না পেরে তারা যেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হয় তার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
তাফসীর গ্রন্থগুলোতে ইবনে কাসীরের মতো প্রভাবশালী মুফাসসিরগণ স্পষ্ট করেছেন যে, জিজিয়া প্রদানের সময় অমুসলিমদের ‘লাঞ্ছিত’ (Saghirun) ও ‘অপমানিত’ অবস্থায় থাকতে হবে। আধুনিক যুগের অনেক ইসলাম প্রচারক এই বিধানগুলোকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও, ধ্রুপদী দলিল ও হাদিসের আক্ষরিক প্রয়োগ অমুসলিমদের মানবিক মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে খর্ব করে। সংক্ষেপে, উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ এবং ঐতিহাসিক নজিরগুলো এই দাবিকেই জোরালোভাবে সমর্থন করে যে, ইসলামী আইনি ব্যবস্থায় অমুসলিমদের জন্য নির্ধারিত সামাজিক অবস্থানটি ছিল কাঠামোগতভাবে অবমাননাকর এবং বৈষম্যমূলক। যা আধুনিক বিশ্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (Universal Declaration of Human Rights) সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
