Table of Contents
- 1 ভূমিকা
- 2 হাদিসের বিবরণঃ আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবরতণ
- 3 যুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাঃ শুনবেন এবং মানবেন
- 4 আলেমদের বক্তব্যঃ এই নিয়ে চিন্তা করা নিষেধ
- 5 মিথোলজিক্যাল ধারাবাহিকতা: “দেবতা-অবতরণ”-এর ছায়া
- 6 অসীমতা বনাম সীমাবদ্ধতা
- 7 বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণঃ পৃথিবীর ঘূর্ণন ও সময়ের আপেক্ষিকতা
- 8 ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভূ-কেন্দ্রিক ধারণা (Geocentrism)
- 9 ধর্মীয় চিন্তায় যুক্তিবাদের অভাব ও সামাজিক প্রভাব
- 10 উপসংহার
ভূমিকা
ইসলামি ধর্মতত্ত্বে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী এবং “কোথায়/কীভাবে” তিনি আছেন—এই প্রশ্নে কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা ও ব্যাখ্যা হাজির করা হয়। এই ধারার মধ্যেই সবচেয়ে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি বিবরণ হলো “নজুল-এ-ইলাহি”: প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ এবং বান্দাদের আহ্বান জানানো। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিমসহ প্রধান প্রধান হাদিসগ্রন্থে এই বর্ণনা “সহীহ” হিসেবে প্রচলিত থাকায় তা বহু মুসলিম সমাজে প্রশ্নাতীত সত্যের মর্যাদা পেয়েছে।
কিন্তু এই বর্ণনাকে সরল অর্থে (plain reading) নিলে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, পৃথিবীর গোলাকৃতি ও ঘূর্ণন-গতির বাস্তবতা, এবং সময়ভেদ (time zones)–এর সঙ্গে তা তীব্র যুক্তিগত সংঘর্ষে পড়ে। কারণ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সবসময়ই “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” চলমান—ফলে “অবতরণ”কে নির্দিষ্ট সময়-নির্ভর ঘটনা হিসেবে ধরলে আল্লাহর অবস্থান, গতি, এবং “আরশে সমাসীন” ধারণার সঙ্গে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য অনিবার্যভাবে তৈরি হয়। এই প্রবন্ধে আমরা ঠিক এই জায়গাটিকেই—অসীম সত্তার ধারণা বনাম স্থান-কাল-নির্ভর বর্ণনা—যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার আলোকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করব।
হাদিসের বিবরণঃ আল্লাহর নিকটবর্তী আসমানে অবরতণ
আসুন হাদিসটি বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে পড়ি [1] [2] [3] [4] [5] –
সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
১৯/ তাহাজ্জুদ বা রাতের সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৭২৮. রাতের শেষভাগে দু’আ করা ও সালাত আদায় করা। আল্লাহ্পাক ইরশাদ করেছেনঃ রাতের সামান্য পরিমাণ (সময়) তাঁরা নিদ্রারত থাকেন, শেষ রাতে তাঁরা ইসতিগ্ফর করেন। (সূরা আয্-যারিয়াতঃ ১৮)।
১০৭৯। আবদুল্লাহ ইবনু মাসলামা (রহঃ) … আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছ এমন যে, আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছ এমনে, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
আল-লুলু ওয়াল মারজান
৬/ মুসাফির ব্যক্তির সালাত ও তা ক্বসর করার বর্ণনা
পরিচ্ছেদঃ ৬/২৪. শেষ রাতে দুআ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং সে সময় কবূল হওয়া।
৪৩৪. আবূ হুরায়রাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ১৯ ; তাহাজ্জুদ, অধ্যায় ১৪, হাঃ ১১৪৫; মুসলিম, পর্ব ৬; মুসাফির ব্যক্তির সালাত ও তা কসর করার বর্ণনা, অধ্যায় ২৩, হাঃ ৭৫৮
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
সূনান তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
২/ সালাত (নামায)
পরিচ্ছেদঃ প্রত্যেক রাতেই আল্লাহ্ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন।
৪৪৬. কুতায়বা (রহঃ) …. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হলে প্রত্যেক রাতেই আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেনঃ আমিই রাজধিরাক, যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাককে কবূল করি, যে আমার কাছে যাঞ্ছা করে আমি তাকে দেই, যে আমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে আমি তাকে ক্ষমা করে দেই। ফজরের আলো উদ্ভাসিত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে। – ইবনু মাজাহ ১৩৬৬, বুখারি ও মুসলিম, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৪৪৬ (আল মাদানী প্রকাশনী)
এই বিষয়ে আলী ইবনু আবূ তালিব, আবূ সাঈদ, রিফাআ আল-জুহানী, জুবায়র ইবনু মুতঈম, ইবনু মাসঊদ, আবূদ্ দারদা এবং উসমান ইবনু আবিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী (রহঃ) বলেনঃ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বহু সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ রাতের শেষ তৃতীয়াংশ যখন অবশিষ্ট থাকে, তখন আল্লাহ তা’আলা নেমে আসেন এই রিওয়ায়াতটই সবচেয়ে সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)
মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-৪ঃ সালাত
পরিচ্ছেদঃ ৩৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – ক্বিয়ামুল লায়ল-এর প্রতি উৎসাহ দান
১২২৩-(৫) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ প্রতি রাত্রে শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বারাকাতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব।’ (বুখারী, মুসলিম)(1)
মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, কে আছে যে এমন লোককে করয দেবে যিনি ফকীর নন, না অত্যাচারী এবং সকাল পর্যন্ত এ কথা বলতে থাকেন।
(1) সহীহ : বুখারী ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
আল-আদাবুল মুফরাদ
মেহমানদারি
পরিচ্ছেদঃ ৩২০- রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দোয়া করা।
৭৫৮। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমাদের বরকতময় মহামহিম প্রভু রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে প্রতি রাতে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দিবো? (কে আছে এমন, যে আমার কাছে দোয়া করবে এবং আমি তার দোয়া কবুল করবো)? কে আছে এমন, যে আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করবে এবং আমি তা দান করবো? কে আছে এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে এবং আমি তাকে ক্ষমা করবো। -(বুখারী, মুসলিম, দারিমী)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
যুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাঃ শুনবেন এবং মানবেন
আসুন মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমিন এর বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থে ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম গ্রন্থ থেকে পড়ি, [6]
“শেষ রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন’ এ কথার ব্যাখ্যা ।
প্রশ্নঃ (৪) আমরা জানি যে, রাত ভূপৃষ্ঠের উপরে ঘুর্ণায়মান। আর আল্লাহ রাতের তিন ভাগের এক ভাগ অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। এ হিসাবে আল্লাহ তাআ’লা রাতভর দুনিয়ার আকাশেই থাকেন। এর উত্তর কি?
…
উত্তরে আমরা বলব যে, এই প্রশ্নটি কোন ছাহাবী করেন নি। যদি প্রশ্নটি কোন মুসলিমের অন্তরে হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো, তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল অবশ্যই তা বর্ণনা করতেন। আমরা বলব পৃথিবীর কোন অংশে যতক্ষণ রাতের এক তৃতীয়াংশ থাকবে, ততক্ষণ সেখানে আল্লাহর অবতরণের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে। রাত শেষ হয়ে গেলে তা শেষ হয়ে যাবে। তবে আল্লাহর অবতরণের ধরণ আমরা জানিনা। তার সঠিক জ্ঞানও আমাদের কাছে নেই। আর আমরা জানি আল্লাহর মত আর কেউ নেই। আমাদের উচিৎ হবে আল্লাহর কিতাবের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং এ কথা বলা যে, আমরা শুনলাম এবং ঈমান আনয়ন করলাম ও অনুসরণ করলাম। এটাই আমাদের করণীয়।


আলেমদের বক্তব্যঃ এই নিয়ে চিন্তা করা নিষেধ
এবারে আসুন এই হাদিসটি সম্পর্কে বিশিষ্ট আলেম মতিউর রহমান মাদানি, আহমদুল্লাহ এবং মঞ্জুরে ইলাহীর বক্তব্য শুনে নিই,
মিথোলজিক্যাল ধারাবাহিকতা: “দেবতা-অবতরণ”-এর ছায়া
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখা যায়, “ঈশ্বর/দেবতা নির্দিষ্ট সময়ে আকাশ থেকে নেমে মানুষের নিকটবর্তী হন”—এটি শুধুই ইসলামী বয়ান নয়; প্রাচীন নিকটপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় নানা ধর্ম-পুরাণে (পৌত্তলিক মিথোলজি সহ) দেবতা-অবতরণ/আগত হওয়ার মোটিফ খুব পরিচিত। কোথাও দেবতারা পৃথিবীতে “নেমে” মানুষের সঙ্গে মিশে যান, কোথাও দেবতার “আবির্ভাব” বা মানুষের দুনিয়ায় “নিকটবর্তী হওয়া”—এমন কল্পচিত্র বারবার এসেছে। একই ধরনের “উপরে-নিচে” ভাষা ও স্থানিক কল্পনা—আসলে এক ধরনের প্রাচীন কসমোলজিক্যাল মানস-মানচিত্রের ফল, যেখানে আসমান স্তরভাগে সাজানো, আর দেবতা/ঈশ্বর “উর্ধ্বলোকে” অবস্থান করেন।
সেই সূত্রগুলো একত্রিত করলে বোঝা যায়, ইসলামের আল্লাহ-ধারণা যে ঐতিহাসিকভাবে হঠাৎ জন্মায়নি—বরং প্রাচীন-মধ্য যুগের ধর্মীয় পরিবেশ, ভাষা, কসমোলজি, এবং পূর্ববর্তী আব্রাহামিক ও স্থানীয় আরবীয় ধারণার ভেতর দিয়েই নির্মিত, এক ধরণের সমন্বয়—এ কথা বিভিন্ন গবেষণায় ব্যাপকভাবে আলোচিত। ফলে “নজুল-এ-ইলাহি”–র মতো হাদিসে যখন বলা হয় আল্লাহ প্রতি রাতে “নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন” —যুক্তিবাদীরা এটাকে কেবল ধর্মীয় বিধান নয়, বরং পুরনো ‘দেবতা-নিকটে-আসা’ মোটিফের একটি ধারাবাহিকতা এবং সেগুলোর ইসলামিক ভার্শন বলেও মনে করেন।
কিন্তু সমস্যা হলো—এই ধরনের মোটিফ (অবতরণ/আরোহণ/দিকনির্ভর নড়াচড়া) ঈশ্বরকে স্থানিক ও সময়-নির্ভর ক্রিয়াকলাপের মধ্যে বসিয়ে দেয়, যা “অসীম, অতীন্দ্রিয়, স্থান-কাল-অতীত” সত্তার দাবির সঙ্গে মেলে না। ফলে যা বোঝা যায়, বর্ণনাটি হয়তো তার যুগের মহাবিশ্বের ধারণা ও ভাষার কাঠামো বহন করে—কিন্তু সেই কাঠামোকে “সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী আল্লাহর বৈশিষ্ট্য” হিসেবে ধরলে ভিতরে প্রবল কন্ট্রাডিকশন তৈরি হয়।
অসীমতা বনাম সীমাবদ্ধতা
ইসলামি আকীদার একটি প্রচলিত বয়ান হলো—আল্লাহ ‘আরশ’-এ সমাসীন, তিনি সৃষ্টিজগতের ঊর্ধ্বে এবং তাঁর সত্তা স্থান-কাল দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু একই সঙ্গে যখন হাদিসে বলা হয়, তিনি “নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন” কিংবা “উপরে আরোহণ করেন”—তখন ভাষার ভেতরেই একটি মৌলিক দার্শনিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। কারণ অসীম, অতীন্দ্রিয়, স্থান-কাল-অতীত সত্তার ক্ষেত্রে “যাওয়া-আসা”, “উপরে-নিচে”, “নিকটবর্তী-দূরবর্তী”—এই ধরনের ক্রিয়াপদ ও দিকনির্দেশক শব্দগুলো সাধারণত সসীম, অবস্থানধারী, গতিশীল সত্তার সাথে মানানসই। ফলে “নজুল”-এর বর্ণনাকে সরল অর্থে গ্রহণ করলে ঈশ্বর-ধারণার ভেতরেই সীমাবদ্ধতার ছাপ পড়ে।
- স্থানিক সীমাবদ্ধতা (Localization):
এক স্থান থেকে অন্য স্থানে “অবতরণ” মানে হলো—আগে তিনি একটি “স্থান”-এ ছিলেন, পরে আরেকটি “স্থান”-এ এলেন। এতে অন্তত দুটি সমস্যা দাঁড়ায়: (১) তিনি যে স্থানে গেলেন, সেখানে “আগে ছিলেন না”—অর্থাৎ উপস্থিতি সময়-নির্ভর হয়ে গেল; (২) তাঁর উপস্থিতিকে তখন কোনো না কোনোভাবে লোকেশন-নির্দিষ্ট ধরে নিতে হয়। অথচ ঈশ্বরকে যদি সর্বব্যাপী/সর্বত্র-অবধারিত ধরা হয়, তবে “লোকেশন বদল” ধারণাটিই তার সাথে সংঘর্ষে পড়ে। সংক্ষেপে, স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন—একটি সীমাবদ্ধ সত্তার বৈশিষ্ট্য; অসীম সত্তাকে তা আরোপ করলে ঈশ্বর-ধারণা বস্তুজগতের নিয়মে নেমে আসে। - মানবিকীকরণ (Anthropomorphism):
“আসমানে অবতরণ”কে যদি বাস্তব/শারীরিক অর্থে ধরা হয়, তাহলে আল্লাহকে অনিবার্যভাবে এমন এক কাঠামোতে কল্পনা করতে হয় যেখানে “দিক”, “উচ্চতা”, “দূরত্ব”, “নিকটতা” বাস্তব অর্থবহ—এগুলো মূলত জাগতিক অস্তিত্বের ভাষা। আরও বড় প্রশ্ন হলো: যদি আল্লাহ সর্বশ্রোতা (As-Sami) এবং সর্বজ্ঞ হন, তবে বান্দার ডাকে সাড়া দিতে তাঁর “নিকটবর্তী” হতে হবে কেন? প্রার্থনা শোনা/জানা যদি দূরত্ব-নির্ভর না হয়, তাহলে “নেমে আসা”—একটি অপ্রয়োজনীয় শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এই বর্ণনা ঈশ্বরকে কার্যত এমন এক সত্তার মতো দেখায়, যাঁর কাজকর্মে স্থানিক নিকটতা প্রভাব ফেলে—যা সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞতার দাবির সাথে সহজে মেলে না।
বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণঃ পৃথিবীর ঘূর্ণন ও সময়ের আপেক্ষিকতা
হাদিসে “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ”–কে একটি নির্দিষ্ট, বিশেষ সময়-খণ্ড হিসেবে দেখানো হয়—যে সময় আল্লাহ “নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ” করেন এবং ফজর/সূর্যোদয় পর্যন্ত আহ্বান অব্যাহত থাকে। কিন্তু এই সময়-নির্ভর কাঠামোকে আধুনিক ভূ-বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বাস্তবতার সামনে রাখলে একটি মৌলিক অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়: পৃথিবীতে ‘একটি একক রাত’ বা ‘একই সাথে একটাই শেষ তৃতীয়াংশ’ বলে কিছু নেই।
দার্শনিক টানাপোড়েন: স্রষ্টা কি ‘গতিশীল’ সত্তা?
এখানে মূল সমস্যা শুধু জ্যোতির্বিদ্যার নয়; এটি ধারণাগতও। স্থান পরিবর্তন মানে আগে এক জায়গায় থাকা, পরে অন্য জায়গায় থাকা—অর্থাৎ সত্তার উপস্থিতি স্থান-কাল-নির্ভর হয়ে যাওয়া। আর “গতিশীলতা” (movement) সাধারণত বস্তুজগতের ধর্ম—কারণ গতি মানে পরিবর্তন, পরিবর্তন মানে সময়ের অধীনতা, এবং সময়ের অধীনতা মানে সীমাবদ্ধতা। স্রষ্টাকে যদি এমন নড়াচড়া-নির্ভর কাঠামোর মধ্যে ভাবতে হয়, তাহলে ঈশ্বর-ধারণা নিজেই বস্তুগত শর্তের সাথে জড়িয়ে পড়ে—যা “অসীম, অতীন্দ্রিয়, স্থান-কাল-অতীত” দাবির সঙ্গে একটি মৌলিক কন্ট্রাডিকশন তৈরি করে।
গোলকীয় পৃথিবী ও সময়ভেদ (Time zones):
পৃথিবী সমতল নয়; এটি নিজ অক্ষে ঘূর্ণনশীল গোলক। ফলে একই মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে দিন-রাত ভিন্ন ভিন্ন থাকে। উদাহরণ হিসেবে—একই সময়ে লন্ডনে যদি রাতের শেষ প্রহর হয়, টোকিওতে তখন দুপুর, আর মক্কায় হয়তো সকাল বা ভিন্ন কোনো প্রহর। অর্থাৎ “শেষ তৃতীয়াংশ” নিজেই স্থানভেদে আলাদা সময়-উইন্ডো।
অবিরাম ‘শেষ তৃতীয়াংশ’ বাস্তবতা:
পৃথিবী যেহেতু অবিরাম ঘুরছে, তাই বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত—পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সর্বদাই “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” চলমান থাকে। এর মানে “শেষ তৃতীয়াংশ” কোনো একক সময় নয়, বরং পৃথিবীর মানচিত্রে চলমান একটি ঘূর্ণায়মান সময়-খণ্ড।
যৌক্তিক পরিণতি: অবতরণের টাইমিং সমস্যা:
এখন, যদি হাদিসকে আক্ষরিক অর্থে ধরা হয়—আল্লাহ প্রতিরাতে “শেষ তৃতীয়াংশে” নিম্ন আকাশে নামেন এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত থাকেন—তাহলে দুটি সম্ভাবনা দাঁড়ায়:
- আল্লাহকে কার্যত চব্বিশ ঘণ্টা-ই “নিম্ন আকাশে” থাকতে হবে, কারণ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রতিমুহূর্তে শেষ তৃতীয়াংশ চলছে; অথবাআল্লাহকে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর চারপাশে ‘সময়-জোনের সাথে সাথে’ অবস্থান বদলাতে হবে—যেন যেখানে যেখানে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হচ্ছে সেখানে সেখানে তিনি “নেমে” যাচ্ছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভূ-কেন্দ্রিক ধারণা (Geocentrism)
এই হাদিসগুলোর ভাষা ও কল্পচিত্র—“নিকটবর্তী আসমান”, “নেমে আসা”, “উপরে ওঠা”, “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ”—মূলত এমন এক মহাবিশ্ব-ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে, যা সপ্তম শতাব্দীর মানুষের সাধারণ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সে সময়কার প্রচলিত কসমোলজিতে পৃথিবীকে প্রায়শই স্থির কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করা হতো; আকাশকে ভাবা হতো স্তরভাগে সাজানো এক ধরনের গম্বুজ/স্তরিত “উর্ধ্বলোকে”, যেখানে “নিচের আসমান” থেকে “উচ্চতর আসমান”—এভাবে একটি উল্লম্ব বিন্যাস স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। এই ভূ-কেন্দ্রিক কল্পনায় “রাতের শেষ প্রহর” মানে ছিল একটি নির্দিষ্ট জনপদের একই ধরনের স্থির সময়-অভিজ্ঞতা, যেখানে আকাশের “উপরে” ও পৃথিবীর “নিচে” সম্পর্কে এক ধরনের স্বজ্ঞাত (intuitive) ধারণা কাজ করত।
কিন্তু আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞান ও ভূ-বিজ্ঞানের আলোকে এই ভাষা ও ধারণাগত কাঠামো একাধিক জায়গায় সমস্যায় পড়ে। প্রথমত, সময় অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত; ফলে “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” কোনো একক বৈশ্বিক সময় নয়। দ্বিতীয়ত, “উপরে-নিচে” বা “নেমে আসা-উঠে যাওয়া”—এগুলো পৃথিবী-কেন্দ্রিক দিকবোধের ফল; মহাজাগতিক পরিসরে “নিচে” বা “উপরে” বলে কোনো সর্বজনীন ধ্রুব দিক নেই—দিক নির্ধারিত হয় পর্যবেক্ষকের অবস্থান, মহাকর্ষক্ষেত্র, এবং স্থানীয় ফ্রেম অব রেফারেন্সের ভিত্তিতে। ফলে হাদিসের বর্ণনাটি ঐতিহাসিকভাবে বোধগম্য হলেও, আধুনিক বিশ্বচিত্রে সেটাকে আক্ষরিক ও সার্বজনীন ভৌত ঘটনা হিসেবে দাঁড় করাতে গেলে ব্যাখ্যার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে—এবং সেই চাপই বহু ক্ষেত্রে বর্ণনাটিকে যুক্তিগতভাবে টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তোলে।
ধর্মীয় চিন্তায় যুক্তিবাদের অভাব ও সামাজিক প্রভাব
এই হাদিসের মতো বর্ণনায় যখন আধুনিক বিজ্ঞান ও সাধারণ যুক্তির সঙ্গে খোলা অসামঞ্জস্য সামনে আসে, তখন বহু ধর্মীয় স্কলার সাধারণত একটি পরিচিত আশ্রয়ে যান—“কীভাবে হয়, আমরা জানি না”, “আল্লাহর ধরণ অজানা”, বা “এগুলো নিয়ে চিন্তা করা ঠিক নয়” ধরনের জবাব। ফতোওয়া আরকানুল ইসলামের উদ্ধৃতিতেও এই মানসিক কাঠামো স্পষ্ট: প্রশ্নকে বৈধ অনুসন্ধান হিসেবে না দেখে, তাকে প্রায় “অপ্রয়োজনীয়/অবাঞ্ছিত” কৌতূহল হিসেবে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই উত্তরগুলো বাস্তবে কোনো যুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়—এগুলো মূলত একটি এপিস্টেমিক এক্সিট: সমস্যার সমাধান নয়, সমস্যাটিকে চিন্তার বাইরে সরিয়ে রাখা।
এর সামাজিক পরিণতি গুরুত্বপূর্ণ। যখন শিক্ষিত সমাজও স্পষ্ট অসংগতিকে “অলৌকিকতা” বলে নির্বিচারে অনুমোদন করে, তখন সমালোচনামূলক চিন্তা (critical thinking) ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ এখানে শেখানো হয়—বিরোধ, ফাঁকফোকর, বা প্রশ্ন দেখা দিলেই অনুসন্ধান নয়; বরং “মেনে নেওয়া”ই নৈতিক কর্তব্য। ফলাফল হিসেবে গড়ে ওঠে এমন এক সংস্কৃতি যেখানে প্রমাণ, যুক্তি, ও যাচাই নয়—আবেগ, কর্তৃত্ব, ও আনুগত্য বেশি শক্তিশালী মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে; বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার সাথে ধর্মীয় চিন্তার মধ্যে একটি স্থায়ী ফাটল তৈরি করে—যেখানে প্রশ্ন করা “শিক্ষা” নয়, বরং “অপরাধ” হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।
উপসংহার
পরিণামে দেখা যায়, “প্রতি রাতে আল্লাহ নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন” — এই বর্ণনাকে যদি সরল ও আক্ষরিক অর্থে ধরা হয়, তবে তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূ-বিজ্ঞান এবং দর্শনগত ঈশ্বর-ধারণার সঙ্গে একাধিক স্তরে সংঘর্ষে পড়ে। পৃথিবীর গোলাকৃতি, নিজ অক্ষে ঘূর্ণন, সময় অঞ্চলের বৈচিত্র্য, এবং একই মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন “রাতের শেষ তৃতীয়াংশ” বিদ্যমান থাকার বাস্তবতা—সব মিলিয়ে এই হাদিসের সময়-নির্ভর কাঠামোকে ভৌত-বাস্তব ঘটনা হিসেবে দাঁড় করানো কঠিন হয়ে যায়। উপরন্তু, “অবতরণ/আরোহণ” ধরনের স্থানগত ক্রিয়া ঈশ্বরকে লোকেশন-নির্ভর ও গতিশীল সত্তায় নামিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করে—যা “অসীম, অতীন্দ্রিয়, স্থান-কাল-অতীত” সত্তার দাবির সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
তাই এখানে মূল প্রশ্নটি ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদণ্ডের: কোনো দাবি “নির্ভরযোগ্য” বলে প্রচলিত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তিসঙ্গত হয়ে যায় না। সত্য অনুসন্ধান মানে কেবল বিশ্বাসকে রক্ষা করা নয়; বরং বিশ্বাসের দাবিগুলোকে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, প্রমাণ, এবং অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য—এইসব মানদণ্ডে যাচাই করা। বিজ্ঞানের যুগে প্রাচীন কসমোলজি ও ভূ-কেন্দ্রিক কল্পনার উপর দাঁড়ানো ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করা, তাদের ব্যাখ্যাকে পরীক্ষার মুখে দাঁড় করানো, এবং প্রয়োজন হলে পুনর্মূল্যায়ন করা—এটাই জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক দাবি।
