ইসলামে রক্তসম্পর্কীয় ফার্স্টব্লাড কাজিন বিবাহ হালাল

ভূমিকা

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, আপন চাচাতো মামাতো খালাতো ফুফাতো ভাইবোন অর্থাৎ রক্তসম্পর্কীয় বিবাহ বৈধ। ঐতিহ্যগতভাবে আরব সমাজে এটি ছিল অত্যন্ত প্রচলিত একটি প্রথা, যা নবী মুহাম্মদের পরিবারে এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের পরিবারের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষভাবে পাকিস্তান, সুদান, সৌদি আরব, ইউএই, আফগানিস্তানসহ বহু দেশে ফার্স্ট-কাজিন বিবাহের হার অত্যন্ত বেশি। আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে, এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, একইসাথে জন্ম হওয়া শিশুদের মধ্যে নানা ধরণের ভয়াবহ রোগ ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। রক্তসম্পর্কীয় বিবাহে জন্ম নেওয়া সন্তানদের মধ্যে বিশেষ করে জেনেটিক বিকলাঙ্গতা, জন্মগত ত্রুটি, বিরল রিসেসিভ রোগ, শিশুমৃত্যু, বুদ্ধিবিকাশজনিত সমস্যা, হৃদরোগ এবং ইমিউন সিস্টেম দুর্বলতার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এই বিষয়টি ভালভাবে বোঝার জন্য এই লেখাটি পড়তে পারেন [1]। সেইসাথে, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এই খবরগুলো পড়তে পারেন [2] [3]


রক্তসম্পর্কীয় (Consanguineous) বিবাহে জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এইসব কারণে ফার্স্টব্লাড কাজিনের সাথে বিবাহকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়, অনাগত সন্তানদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে। আধুনিক জেনেটিক বিজ্ঞান রক্তসম্পর্কীয় বিবাহ নিয়ে শতাধিক গবেষণা করেছে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য টেবিলে দেখানো হলোঃ

দেশ/অঞ্চলউৎস (গবেষণা/প্রতিবেদন)Consanguineous Marriage RateBirth Defect Rate (সাধারণ জনসংখ্যা বনাম রক্তসম্পর্কীয়)মূল ঝুঁকি/পর্যবেক্ষণ
ইংল্যান্ড (UK)Born in Bradford Study (BMJ, 2013) [4]Bradford Pakistani origin families: 63%Consanguineous births: 6% থেকে 13% defect rate (baseline UK defect rate: 3–4%)অটিজম, হার্ট ডিফেক্ট, নিউরাল টিউব ডিফেক্ট ২–৩ গুণ বেশি
ইংল্যান্ড – NHS Genetic ServicesNHS Clinical Genetics Report (2018) [5]UK overall: ~3.5%, কিন্তু British-Pakistani সম্প্রদায়ে 55–65%Defect risk: সাধারণ থেকে 2.5–3 গুণ বেশিRecessive disorders যেমন β-thalassemia, SMA-এর হার উচ্চ
UK – Cambridge Genetic EpidemiologyCambridge University, 2019 [6]High-risk populations onlySevere pediatric genetic disorder risk: 10× higherরক্তের রোগ, metabolic disorders ব্যাপক
পাকিস্তানBMJ, Demographic Health Survey, WHO [7]50–62%Birth Defect: 11%–14% (global average ≈ 3%)Infant mortality: 2.3× higher, congenital heart disease ৩ গুণ বেশি
বাংলাদেশICDDR,B (2016), BDHS [8]~11–14%Birth defect rate: consanguineous families(7–9% (baseline ≈ 3%)Hydrocephalus, congenital blindness noticeably higher
ভারতIndian Council of Medical Research (ICMR) [9]South India (Tamil Nadu, Karnataka): 20–28%Birth defect: 8–10% (non-consanguineous: 2–3%)Genetic deafness & skeletal deformity double
সৌদি আরবSaudi Genome Project (2018) [10]~42% (first-cousin marriages)Recessive genetic disorder rate: 11× higherRare genetic diseases in KSA account for 20% infant mortality
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE)Dubai Health Authority (2017) [11]~29%Birth defects: 6–9%জিনগত হৃদরোগ, metabolic disorders high
কাতারQatar Genome Project [12]~35%Childhood genetic diseases: 8–12%Autosomal recessive disease prevalence strongest in GCC
সুদানSudanese Medical Journal (2015) [13]~44%Birth defect: 12–13%Neural tube defects ৩ গুণ বেশি
নাইজেরিয়াAfrican Medical Science Journal [14]~19%Birth defect: 7–9%Sickle-cell disease clusters strongly linked
তুরস্কAnkara University Genetic Survey [15]~20–25%Birth defect: 6–10%Autosomal disorders heavily clustered family groupsে
ইরানIranian Journal of Pediatrics [16]~28–38%Birth defect rate: 7–11%Intellectual disability & rare neurological disorders ২–৪ গুণ বেশি
ওমানGCC Genetic Research Council [17]~36%Birth defect: 10%Metabolic disorders & hemoglobinopathies elevated
বিশ্বব্যাপীWHO, Lancet, BMJ Global Health [18] [19]Global avg: ~8% of world population practices consanguinityDefect risk: 4–8% (baseline 2–3%)WHO: “Consanguinity doubles genetic disorder risk”

ইসলামে রক্তসম্পর্কীয় বিবাহ

জয়নব বিনতে জাহশ (জন্ম আনুমানিক ৫৯০– মৃত্যু ৬৪১) ছিলেন মুহাম্মদ এর ফুফাতো বোন এবং একইসাথে তার স্ত্রী। তার মা ছিলেন উমামা বিনতে আবদুল মুত্তালিব, কুরাইশ গোত্রের হাশিম বংশের সদস্য এবং মুহাম্মদের পিতা আবদুল্লাহর আপন বোন। যয়নব ও তার পাঁচ ভাইবোন ছিলেন মুহাম্মদের ফার্স্ট ব্লাড কাজিন বা আপন চাচাত ভাই বা বোন। একটি হাদিস এখানে প্রাসঙ্গিক,

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
হাদিস নম্বরঃ (3298)
অধ্যায়ঃ ১৭। বিবাহ
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ২. কোন মহিলাকে দেখে কোন পুরুষের মনে যৌন কামনা জাগ্রত হলে সে যেন তার স্ত্রীর সাথে অথবা ক্রীতদাসীর সাথে গিয়ে মিলিত হয়
৩২৯৮-(৯/১৪০৩) আমর ইবনু আলী (রহঃ) ….. জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলাকে দেখলেন। তখন তিনি তার স্ত্রী যায়নাব এর নিকট আসলেন। তিনি তখন তার একটি চামড়া পাকা করায় ব্যস্ত ছিলেন এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের প্রয়োজন পূরণ করলেন। অতঃপর বের হয়ে সাহাবীগণের নিকট এসে তিনি বললেনঃ স্ত্রীলোক সামনে আসে শয়ত্বানের বেশে এবং ফিরে যায় শায়ত্বানের বেশে। অতএব তোমাদের কেউ কোন স্ত্রীলোক দেখতে পেলে সে যেন তার স্ত্রীর নিকট আসে। কারণ তা তার মনের ভেতর যা রয়েছে তা দূর করে দেয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ৩২৭৩, ইসলামীক সেন্টার ৩২৭১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ছিলেন নবী মুহাম্মদের আপন চাচাতো ভাই। নবী মুহাম্মদ তার সাথে তার আপন মেয়েকে বিবাহ দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদের কন্যা জয়নব বিনতে মুহাম্মাদ এর কন্যা ছিলেন উমামা, পুরো নাম উমামা বিনতে আবিল আস মুহাম্মাদ। মুহাম্মদের চাচাতো ভাই এবং একইসাথে মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমার স্বামী হযরত আলী তাকে বিয়ে করেছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে, হযরত আলী একই সাথে নবী মুহাম্মদের আপন চাচাতো ভাই, মেয়ের জামাই এবং নাতনীর জামাই। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরও বিবাহ করেন তার চাচাতো বোন আতিকা বিনতে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইলকে। তিনি দেখতে অনেক সুন্দরী ছিলেন। [20]


রক্তসম্পর্কীয় বিবাহ সম্পর্কে ইসলামিক ফতোয়া

ইসলামে ফার্স্ট ব্লাড এবং সেকেন্ড ব্লাড কাজিন বিবাহ বৈধ এবং আইনগতভাবে একে নিষিদ্ধ করা কিংবা নিরুৎসাহিত করা কোন ইসলামিক শরীয়া চালিত দেশে সম্ভব নয়। এই বিষয়ে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আলেমদের দ্বারা পরিচালিত প্রখ্যাত ইসলাম বিষয়ক ওয়েবসাইট ইসলামকিউএ থেকে একটি প্রশ্নোত্তর দেখে নিই [21],

Ruling on marrying cousins
Publication : 23-07-1997
Question
Is it correct,that our Rusul , discouraged marrying cousins. You, see marrying cousins should be the last resort.
Jazakallah.
Answer
Praise be to Allah.
Al-hamdu lillah (All praise be to Allah). There is no objection whatsoever in the Islamic religion for a man to marry any of his relatives except al-maharim (those forbidden for marriage) whom Allah mentioned in surat al-nisaa’, 4:23 (interpretation of the meaning):
Prohibited to you (for marriage) are: your mothers, daughters, sisters; father’s sisters, mother’s sisters; brother’s daughters, sister’s daughters; foster-mothers (who breast-fed you), foster-sisters (who breast-fed from the same woman as you); your wives’ mothers; your step-daughters under your guardianship, born of your wives with whom you have consummated marriage, no prohibition if ye have not consummated; (those who have been) wives of your sons proceeding from your loins; and two sisters in wedlock at one and the same time, except for what is past; for Allah is Oft-Forgiving, Most Merciful.
Thus, when Allah mentioned for us the relatives to whom marriage is forbidden, we then come to know that there is no objection for the remainder of the family relations. Furthermore, there is no condition that it be the last resort as indicated in the question. Among the most prominent evidence of this fact is that the Prophet (peace be upon him) married his daughter Fatima to Ali (may Allah be pleased with them) and he is the son of her father’s uncle, as well as the marriage of the Prophet himself to Zainab bint Jahsh (may Allah be please with her) and she is his aunt’s daughter (i.e. his cousin); and there are many other such examples.
However, a different question may be asked, namely: “Is it better or preferable for a Muslim to marry someone he is not related to rather than a relative?”
The answer to this question varies from case to case, and perhaps it may be preferable to marry people who are non-relations, for example if one aspires to form new social ties or bonds, and regards the existence of a marriage relationship with a different family as constructive in widening the circle of social bonds.


কাজিনকে বিয়ে করার শরয়ি বিধান (বাংলা অনুবাদ)
প্রকাশনা : ২৩-০৭-১৯৯৭
প্রশ্ন:
রাসূল (ﷺ) কি কাজিন বিবাহ নিরুৎসাহিত করেছিলেন? কাজিনকে বিয়ে করা কি শেষ বিকল্প হিসেবে রাখা উচিত?
উত্তর:
আল্লাহকে সকল প্রশংসা।
ইসলামে রক্তসম্পর্কের এমন কাউকেও বিয়ে করতে কোনো আপত্তি নেই যাদেরকে শারইভাবে ‘মাহারিম’ হিসাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা আন-নিসা ৪:২৩-এ নিষিদ্ধ আত্মীয়দের তালিকা উল্লেখ আছে:
“তোমাদের জন্য হারাম হলো: তোমাদের মায়েরা, কন্যারা, বোনেরা; পিতার বোনেরা, মাতার বোনেরা; ভ্রাতুষ্পুত্রীরা, ভগ্নীপুত্রীরা; দুধমা, দুধবোন; স্ত্রীর মায়েরা; সেসব সৎসন্তান যারা তোমাদের অধীনে, স্ত্রীদের গর্ভজাত—স্ত্রীর সাথে সহবাস না করলে তারা হারাম নয়; তোমাদের প্রকৃত পুত্রদের স্ত্রীগণ; এবং দু’বোনকে একই সময়ে বিবাহ করা…”
এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে নিষিদ্ধ আত্মীয় ব্যতীত অন্য আত্মীয়দের সাথে বিবাহে শরয়ি কোনো বাধা নেই। প্রশ্নের মতো “শেষ বিকল্প” হিসেবে রাখারও কোনো নির্দেশ নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো—নবী (ﷺ) তাঁর কন্যা ফাতিমাকে তাঁর চাচাতো ভাই আলীর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন; এবং নবী নিজেও তাঁর ফুফাতো বোন যয়নব বিনতে জাহশকে বিবাহ করেছিলেন।
হ্যাঁ, আলাদা প্রশ্ন হতে পারে—অপরিচিত কাউকে বিয়ে করা কি বেশি উত্তম? এর উত্তর পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। অনেক সময় অপরিচিত পরিবারে বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি পায়, যা উপকারী হতে পারে।


উপসংহার

বৈজ্ঞানিক গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখায় যে রক্তসম্পর্কীয় বিবাহ আধুনিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য নীতির দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ এ ধরনের বিবাহকে বৈধ ঘোষণা করেছে এবং নবী মুহাম্মদ ও সাহাবীদের জীবনে এ ধরনের বিবাহ বহুবার ঘটেছে। এই প্রবন্ধে তাই ধর্মীয় অনুমতি, ঐতিহাসিক উদাহরণ এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা—এই তিনটি বিষয়ই পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে। অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আশাকরি আমাদের পাঠকগণ এই ধরনের বিবাহ এবং রক্ত সম্পর্কিত যৌনাচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়া থেকে বিরত থাকবেন, এবং একটি সুস্থ স্বাভাবিক সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে মানবজাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।



তথ্যসূত্রঃ
  1. ধর্ম ও অজাচার- রক্ত সম্পর্কীয় বিবাহ এবং যৌনতা প্রসঙ্গে ↩︎
  2. Inside the incestuous family that was so inbred their skin turned blue ↩︎
  3. America’s most inbred family who speak in grunts started with identical twin brothers ↩︎
  4. BMJ, Born in Bradford Study ↩︎
  5. NHS Genomics England Report ↩︎
  6. Cambridge Genetic Research ↩︎
  7. WHO Bulletin – Pakistan Consanguinity ↩︎
  8. ICDDR,B Genetic Studies ↩︎
  9. ICMR Genetic Disorders Study ↩︎
  10. Saudi Human Genome Program ↩︎
  11. Dubai Health Genetics Report ↩︎
  12. Qatar Genome Program ↩︎
  13. Sudanese Medical Journal ↩︎
  14. African Journal of Medicine ↩︎
  15. Ankara University – Genetic Research ↩︎
  16. IJP Genetic Disorders Study ↩︎
  17. GCC Genetic Research ↩︎
  18. WHO Global Consanguinity ↩︎
  19. Lancet Genetics ↩︎
  20. al-Bidayah wa al-Nihayah 6/352 by ibn Kathir ↩︎
  21. Ruling on marrying cousins ↩︎