জ্ঞানকোষ প্রবন্ধ

ইসলামি ধ্রুপদী আকীদা গ্রন্থে তাকদীর: আল্লাহর ইচ্ছা, মানুষের কর্ম ও নৈতিক দায়

প্রকাশিত: অক্টোবর 1, 2026লেখক: আসিফ মহিউদ্দীন31 মিনিট পড়া

ভূমিকা

ইসলামে তাকদীর শুধু এই বিশ্বাস নয় যে আল্লাহ ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা আগে থেকেই জানেন। ধ্রুপদী সুন্নি আকীদা-গ্রন্থগুলোতে তাকদীরের পরিসর তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। সেখানে ভালো-মন্দ, আনুগত্য-অবাধ্যতা, ঈমান-কুফর, হেদায়াত-পথভ্রষ্টতা, জীবন-মৃত্যু, রিজিক, পাপ, এমনকি মানুষের ইচ্ছা ও কর্মও আল্লাহর ফয়সালা, ইচ্ছা ও সৃষ্টির অধীন হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। কিছু গ্রন্থে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মানুষ সেই কাজই করে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সে শেষ পর্যন্ত সেই পরিণতির দিকেই যায় যা তার জন্য পূর্বেই নির্ধারিত।

এই আকীদাগত কাঠামো মানুষের নৈতিক দায়ের একটি মৌলিক সমস্যা সৃষ্টি করে। মানুষ যদি এমন কোনো কাজের জন্য শাস্তি পায় যার অস্তিত্ব, সম্ভাবনা, ইচ্ছাশক্তি, কার্যকর হওয়া এবং চূড়ান্ত ফল সবই আল্লাহর পূর্বনির্ধারণের অধীন, তাহলে মানুষকে সেই কাজের পূর্ণ স্বাধীন উৎস বলা যায় কীভাবে? বিশেষ করে যখন একই আকীদা-গ্রন্থ একদিকে বলে পাপ, কুফর ও অবাধ্যতা আল্লাহর তাকদীর ও ইচ্ছার বাইরে নয়, অন্যদিকে আবার ঘোষণা করে পাপী ব্যক্তিই তার কাজের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী।

এই দ্বন্দ্ব ধ্রুপদী মুসলিম আলেমদের অজানা ছিল না। আকীদা-সাহিত্যে বারবার এমন ভাষা দেখা যায় যেখানে একদিকে তাকদীরের সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, অন্যদিকে সেই নিয়ন্ত্রণ এবং মানবীয় দায়ের সম্পর্ক নিয়ে গভীর অনুসন্ধান, “কেন?” ও “কীভাবে?” প্রশ্ন, তর্ক বা যুক্তিগত বিশ্লেষণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কোনো কোনো গ্রন্থে তাকদীরকে সরাসরি “আল্লাহর রহস্য” বলা হয়েছে এবং মানববুদ্ধির সীমার বাইরে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

ফলে ধ্রুপদী আকীদা-সাহিত্যে তাকদীরের প্রশ্নটি দুটি স্তরে উপস্থিত: প্রথমত, আল্লাহ কী কী পূর্বনির্ধারণ ও সৃষ্টি করেন; দ্বিতীয়ত, সেই সর্বব্যাপী নির্ধারণের মধ্যেও মানুষকে কীভাবে নৈতিকভাবে দায়ী বলা হবে। প্রথম প্রশ্নের উত্তর এসব গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্ট। দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে একই দৃঢ়তা পাওয়া যায় না; বরং বহু জায়গায় বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ এবং প্রশ্ন না করার নির্দেশই শেষ উত্তর হয়ে দাঁড়ায়।


প্রাথমিক সুন্নি আকীদায় তাকদীর: প্রশ্ন নয়, বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ

তাকদীরকে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ না করে বর্ণিত হাদিস ও পূর্ববর্তী মত মেনে নেওয়ার প্রবণতা প্রাথমিক সুন্নি আকীদা-সাহিত্যেই পাওয়া যায়। আহমদ ইবন হাম্বলের নামে সংরক্ষিত উসূলুস সুন্নাহ-তে তাকদীরের ভালো-মন্দে বিশ্বাসকে সুন্নাহর অপরিহার্য অংশ বলা হয়েছে। তাকদীরসংক্রান্ত হাদিস সম্পর্কে তাঁর নামে সংরক্ষিত বক্তব্য হলো—এসব বিশ্বাস করতে হবে; “কেন?” বা “কীভাবে?” প্রশ্ন করা যাবে না। কোনো হাদিসের ব্যাখ্যা মানুষের বুদ্ধিতে না পৌঁছালেও তাকে প্রত্যাখ্যান না করে মেনে নিতে হবে। [1]

الْإِيمَانُ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ، وَالتَّصْدِيقُ بِالْأَحَادِيثِ فِيهِ، وَالْإِيمَانُ بِهَا، لَا يُقَالُ: لِمَ؟ وَلَا كَيْفَ؟ إِنَّمَا هُوَ التَّصْدِيقُ بِهَا وَالْإِيمَانُ بِهَا، وَمَنْ لَمْ يَعْرِفْ تَفْسِيرَ الْحَدِيثِ وَيَبْلُغْهُ عَقْلُهُ فَقَدْ كُفِيَ ذَلِكَ وَأُحْكِمَ لَهُ، فَعَلَيْهِ الْإِيمَانُ بِهِ وَالتَّسْلِيمُ لَهُ، مِثْلُ حَدِيثِ الصَّادِقِ وَالْمَصْدُوقِ، وَمَا كَانَ مِثْلَهُ فِي الْقَدَرِ، وَمِثْلُ أَحَادِيثِ الرُّؤْيَةِ كُلِّهَا، وَإِنْ نَبَتْ عَنِ الْأَسْمَاعِ وَاسْتَوْحَشَ مِنْهَا الْمُسْتَمِعُ فَإِنَّمَا عَلَيْهِ الْإِيمَانُ بِهَا، وَأَنْ لَا يَرُدَّ مِنْهَا جُزْءًا وَاحِدًا وَغَيْرَهَا مِنَ الْأَحَادِيثِ الْمَأْثُورَاتِ عَنِ الثِّقَاتِ، لَا يُخَاصِمُ أَحَدًا وَلَا يُنَاظِرُهُ وَلَا يَتَعَلَّمُ الْجَدَلَ، فَإِنَّ الْكَلَامَ فِي الْقَدَرِ وَالرُّؤْيَةِ وَالْقُرْآنِ وَغَيْرِهَا مِنَ السُّنَنِ مَكْرُوهٌ مَنْهِيٌّ عَنْهُ، وَلَا يَكُونُ صَاحِبُهُ – إِنْ أَصَابَ بِكَلَامِهِ السُّنَّةَ – مِنْ أَهْلِ السُّنَّةِ حَتَّى يَدَعَ الْجَدَلَ وَيُسَلِّمَ وَيُؤْمِنَ بِالْآثَارِ.

বাংলা অনুবাদ:“তাকদীরের ভালো ও মন্দে বিশ্বাস করতে হবে, এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোকে সত্য বলে মেনে নিতে হবে এবং সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। ‘কেন?’ এবং ‘কীভাবে?’ বলা যাবে না; বরং সেগুলোকে সত্য বলে মেনে নেওয়া ও বিশ্বাস করাই কর্তব্য। কেউ যদি কোনো হাদিসের ব্যাখ্যা না জানে এবং তার বুদ্ধি সেই ব্যাখ্যায় পৌঁছাতে না পারে, তবুও তার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট; তার কর্তব্য হলো হাদিসটির প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং তার কাছে আত্মসমর্পণ করা। যেমন ‘আস-সাদিক আল-মাসদুক’-এর হাদিস এবং তাকদীরসংক্রান্ত অনুরূপ অন্যান্য হাদিস, আর আল্লাহকে দেখাসংক্রান্ত সমস্ত হাদিস। এগুলো শুনতে কারও অস্বস্তি হলেও তার কর্তব্য সেগুলোতে বিশ্বাস করা এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত এসব হাদিসের কোনো অংশই প্রত্যাখ্যান না করা। এ নিয়ে কারও সঙ্গে বিবাদ করবে না, বিতর্ক করবে না এবং তর্কশাস্ত্র শিখবে না। তাকদীর, আল্লাহকে দেখা, কোরআন এবং সুন্নাহর অন্যান্য বিষয়ে বিতর্ক অপছন্দনীয় ও নিষিদ্ধ। এমনকি কেউ তার বক্তব্যে সুন্নাহ অনুযায়ী সঠিক কথায় পৌঁছালেও তর্ক পরিত্যাগ করে, আত্মসমর্পণ করে এবং বর্ণিত বক্তব্যে বিশ্বাস না করা পর্যন্ত তাকে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে না।”

এখানে পদ্ধতিটি গুরুত্বপূর্ণ। তাকদীরের বক্তব্যের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য প্রথমে প্রমাণ করে তারপর বিশ্বাস করতে বলা হয়নি; বরং বিশ্বাসকে পূর্বশর্ত হিসেবে স্থাপন করে অনুসন্ধানের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো বক্তব্য মানুষের বুদ্ধিতে পুরোপুরি না পৌঁছালেও তার কাজ হলো বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ। অর্থাৎ তাকদীরের ক্ষেত্রে যুক্তিগত উপলব্ধি আকীদার বৈধতার শর্ত নয়।

আহমদের নামে সংরক্ষিত একই বক্তব্যে তাকদীর নিয়ে তর্ক-বিতর্ককেও নিন্দা করা হয়েছে। এমনকি কেউ তর্ক করে সঠিক সুন্নি সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও তর্ক না ছাড়া পর্যন্ত তাকে সুন্নাহর অনুসারী হিসেবে গণ্য না করার কঠোর ভাষা সেখানে পাওয়া যায়। ফলে প্রশ্নটি শুধু ভুল মত গ্রহণ করা নয়; তাকদীরকে যুক্তিগত বিতর্কের বিষয় বানানোই সন্দেহজনক হিসেবে দেখা হয়েছে।


তাকদীরের ওপর রহস্যারোপ এবং যুক্তির নিষেধাজ্ঞা

আসুন এবারে তাকদীর নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করা সাধারণ মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ, সে সম্পর্কে ড. আবু বকর যাকারিয়ার বক্তব্য শুনি,


বান্দা ভবিষ্যতে করবে বলে আল্লাহ শুধু লিখে রেখেছে?

ইদানীং বহু ইসলামিক দাঈ ও বক্তা নিয়মিতভাবে একটি জনপ্রিয় দাবি করে থাকেন—“আল্লাহ লিখে রাখেন বান্দা কোনো কাজ করতে চাইবে বা করবে; তার ওপর ভিত্তি করে। আল্লাহ আগে থেকে ভবিষ্যৎ জানেন বিধায় তিনি নাকি শুধুমাত্র সেটি লিখে রেখেছেন।” তারা এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝাতে চান যে, মানুষ মন্দ কাজ করলে এতে আসলে আল্লাহর কোনো দায় নেই, মানুষেরই দায়। আল্লাহ শুধুমাত্র লিখে রেখেছে, এই কাজের জন্য তো আল্লাহকে দায়ী করা যায় না। তাদের এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায়, তাদের দাবি অনুসারে “আল্লাহর লেখা মানুষের কাজের ওপর নির্ভরশীল।” এই বক্তব্যকে তারা নিয়ত ও স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে একটি যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন, যেন আল্লাহ কেবল মানুষের কর্মের ওপর ভিত্তি করে লিখেছেন। কর্মটি মানুষই করে, আল্লাহ শুধু আগেভাগে সেটি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন!

কিন্তু ইসলামি আক্বীদার (বিশ্বাসব্যবস্থা) প্রথাগত, প্রামাণ্য এবং শাস্ত্রীয় অবস্থান এর সম্পূর্ণ বিপরীত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূলধারার আকীদাবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—আল্লাহর লেখা, জ্ঞান, সিদ্ধান্ত বা তাকদীর কোনও কিছুই মানুষের কাজ, সিদ্ধান্ত বা ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং মানুষের কাজই নির্ভরশীল আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত লেখার ওপর। আল্লাহর ইলম (জ্ঞান), মাশিয়াত (ইচ্ছা), কিতাবাহ (লেখা) ও খালক (সৃষ্টি) —এই চারটি স্তম্ভের ভিত্তিতেই কদর বা তাকদীরের সম্পূর্ণ কাঠামো গঠিত, এবং এগুলোর কোনোটিই মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে না। বিশিষ্ট ইসলামি আলেম, আকীদার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাকার এবং হাদিস–তাফসিরের স্বনামধন্য পণ্ডিতদের বর্ণনা অনুযায়ী এটি ধ্রুপদী সুন্নী ইসলামে খুব শক্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন মতামত নয়।

এই কারণে আধুনিক কিছু দাঈ যে দাবি করেন—“আল্লাহ লিখেন মানুষের কাজের ওপর নির্ভর করে”—তা ধ্রুপদী সুন্নি আকীদা ও সালাফি আকীদা-গ্রন্থগুলোর বর্ণনার সঙ্গে সরাসরি অসঙ্গত এবং তাকদীরের প্রথাগত মতকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করে। কারণ ধ্রুপদী আকীদায় মানুষের স্বাধীন কাজকে আল্লাহর লিখনের কারণ হিসেবে স্থাপন করা হয়নি; বরং আল্লাহর পূর্বজ্ঞান, লিখন, ইচ্ছা ও নির্ধারণকে মানুষের কাজের পূর্ববর্তী এবং মানুষের ওপর নির্ভরশীল নয় বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে আল্লাহ শুধু মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত আগে থেকে দেখে সেটি লিখে রেখেছেন—এভাবে তাকদীরকে কেবল পূর্বজ্ঞান ও পূর্বলিখনে সীমাবদ্ধ করা ধ্রুপদী সুন্নি অবস্থানের পূর্ণ বর্ণনা নয়। বরঞ্চ আল্লাহই মানুষকে দিয়ে ভালমন্দ বিভিন্ন কাজ করিয়ে নেন, এটি সরাসরি সহিহ হাদিসেরই বক্তব্য।

সুতরাং, শাস্ত্রীয় ইসলামে আল্লাহর লেখাই নির্ধারণ করে মানুষের কাজ; মানুষের কাজ নির্ধারণ করে না আল্লাহর লেখা। মানুষ যেসব কাজ করবে, সেগুলো তাঁর ইচ্ছা, জ্ঞান এবং পূর্বলিখিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ঘটে—এটাই শতাব্দীব্যাপী ইসলামি আকীদার প্রধান অবস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আসুন এই বিষয়ে বাংলাদেশের কয়েকজন সালাফী আলেমের বক্তব্য শুনি। এখানে তারা খুব পরিষ্কারভাবেই বলছেন, মানুষ করবে তাই আল্লাহ শুধু লিখেছে, এরকম ধারণা স্পষ্টভাবেই কুফরি। সালাফদের শিক্ষা হচ্ছে, আল্লাহ কোনো কাজে কারো ওপর নির্ভরশীল নয়, তিনি স্বাধীনভাবেই লেখেন, বান্দা সেই লিখিত তাকদীর অনুসারেই কাজ করে।


প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ই লিখিত এবং পূর্বনির্ধারিত

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হচ্ছে, তাকদীরে প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ই লিখিত এবং পূর্বনির্ধারিত। শুরুতেই আসুন ড. আবু বকর যাকারিয়ার একটি বক্তব্য শুনে নেয়া যাক,


এবারে আসুন শায়েখ আহমদুল্লাহর একটি বক্তব্য শুনি,


আসুন আরও একটি আলোচনা শুনি,


তাকদীর আল্লাহর গোপন রহস্য: প্রশ্ন, কুফর ও মানবীয় দায়

শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া সুন্নি আকীদার অন্যতম প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ। মূল আকীদাহ আত-ত্বহাবিয়্যাহ-র তাকদীরসংক্রান্ত বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবন আবিল ইয আল-হানাফি এমন একটি অবস্থান উপস্থাপন করেন যেখানে তাকদীরকে শুধু মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে রাখা হয়নি; বরং এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান, চিন্তা এবং “আল্লাহ কেন এমন করলেন?” ধরনের প্রশ্নকেই বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। একই আলোচনায় আবার বলা হয়েছে, মানুষের কাজ আল্লাহর সৃষ্টি, কাফেরের কুফরও আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে, এবং কাদরিয়া-মু‘তাযিলাদের আপত্তি প্রত্যাখ্যান করার প্রধান যুক্তি হলো—মানুষ যদি আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত কাজ স্বাধীনভাবে ঘটাতে পারে, তাহলে মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছাকে পরাজিত করেছে বলে ধরে নিতে হবে [2]

(৪৯) ইমাম ত্বহাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন,
وأَصلُ الْقَدَرِ سِرُّ اللَّهِ تَعَالَى فِي خَلْقِهِ، لَمْ يَطَّلِعْ عَلَى ذَلِكَ مَلَكٌ مُقَرَّبٌ، وَلَا نَبِيُّ مُرْسَلٌ، وَالتَّعَمُّقُ وَالنَّظَرُ فِي ذَلِكَ ذَرِيعَةُ الْخِذْلانِ، وَسُلَّمُ الْحِرْمَانِ، وَدَرَجَةُ الطَّغْيَانِ، فَالْحَذَرَ كُلَّ الْحَذَرِ مِنْ ذَلِكَ نَظَرًا وَفِكْرًا وَوَسْوَسَةً، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى طَوَى عِلْمَ الْقَدَرِ عَنْ أَنَامِهِ، وَفَاهُمْ عَنْ مَرَامِهِ، كَمَا قَالَ تَعَالَى فِي كِتَابِهِ: لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ} [الْأَنْبِيَاءِ : ۲۳] . فَمَنْ سَأَلَ : لِمَ فَعَلَ فَقَدْ رَدَّ حُكْمَ الْكِتَابِ وَمَنْ رَدَّ حُكْمَ الْكِتَابِ، كَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ”
তাক্বদীর সম্পর্কে আসল কথা হলো, এটি সৃষ্টিকুলের ব্যাপারে আল্লাহর একটি গোপন বিষয়; যা নৈকট্যপ্রাপ্ত কোনো ফেরেশতা কিংবা প্রেরিত কোনো নাবীও অবহিত নন। এ সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা অথবা অনুরূপ আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া ব্যর্থ হওয়ার কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমালংঘনের স্তর। অতএব সাবধান! এ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা এবং কুমন্ত্রণা হতে সতর্ক থাকুন। কারণ, আল্লাহ তা’আলা তাক্বদীর সম্পর্কিত জ্ঞান তার সৃষ্টিকুল থেকে গোপন রেখেছেন এবং তাদেরকে এর উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা’আলা বলেন, لا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ “তিনি যা করেন সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হবে না; বরং তারা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা আম্বিয়া: ২৩) অতএব, যে ব্যক্তি একথা জিজ্ঞাসা করবে তিনি কেন এ কাজ করলেন? সে আল্লাহর কিতাবের হুকুম অমান্য করল। আর যে ব্যক্তি কিতাবের হুকুম অমান্য করল, সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।
ব্যাখ্যা: তাক্বদীর সম্পর্কে আসল কথা হলো, এটি সৃষ্টিকুলের ব্যাপারে আল্লাহর একটি বিষয়। অর্থাৎ তিনিই সৃষ্টি করেন, তিনিই ধ্বংস করেন, তিনিই কাউকে ফকীর বানান, তিনিই ধনী বানান, তিনিই মৃত্যু দান করেন, তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই গোমরাহ করেন এবং তিনিই হিদায়াত দান করেন। আলী (১) বলেন, তাক্বদীর হলো আল্লাহর গোপন রহস্য। সুতরাং আমরা এটি উন্মুক্ত করার চেষ্টা করবো না। এ মাস’আলা সম্পর্কে মানুষের মতভেদ খুবই প্রসিদ্ধ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের মতে সবকিছুই আল্লাহর ফায়ছালা ও নির্ধারণ অনুপাতেই হয়ে থাকে। আল্লাহ তা’আলাই বান্দার কর্মের স্রষ্টা।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ
“প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ”। (সূরা কামার: ৪৯)
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
“এবং তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তার একটি তাক্বদীর বা পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন”। (সূরা আল-ফুরকান: ২)
কাফের যেই কুফুরী করে তা আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাতেই হয়; কিন্তু তিনি কুফুরীকে পছন্দ করেন না। তিনি সৃষ্টিগত দিক থেকে কুফুরী সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু দীন হিসাবে পছন্দ করেন না।
কাদারীয়া ও মুতাযেলা সম্প্রদায়ের লোকেরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের বিরোধিতা করেছে। ২৬৮ তারা ধারণা করে যে, আল্লাহ তা’আলা কাফেরদের থেকে ঈমান সংঘটিত হওয়ার ইচ্ছা করেন। কিন্তু কাফের কুফুরীর ইচ্ছা করে। তারা এমন ধারণা থেকে বাঁচার জন্য এ কথা বলেছে যে, আল্লাহ তা’আলা কুফুরী সৃষ্টির ইচ্ছা করেছেন এবং কুফুরী করার কারণেই শান্তি দিয়ে থাকেন। আসলে তাদের অবস্থা হলো ঐ লোকের মতো যে উত্তপ্ত বালুর উপর দাড়িয়ে থাকার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আগুনে ঝাপ দিয়েছে। কেননা তারা অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর জিনিস থেকে পালিয়ে এসে তার চেয়ে বেশী ক্ষতিকর জিনিসের মধ্যে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ যদি বলা হয়, আল্লাহ তা’আলা বান্দার কর্মের স্রষ্টা, আর বান্দার কর্মের মধ্যে যেহেতু ভালো-মন্দ উভয়ই রয়েছে, তাহলে আল্লাহ তা’আলার দিকে মন্দের সম্বন্ধ হয়ে যায়। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তারা বলেছে বান্দার কর্ম বান্দা নিজেই সৃষ্টি করে। এখন যেই সমস্যাটি হলো, তাদের পূর্বেরটির চেয়ে আরো বেশী ভয়াবহ। এতে করে আল্লাহর ইচ্ছার উপর কাফেরের ইচ্ছা জয়লাভ করা আবশ্যক হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা ইচ্ছা করেছেন যে, কাফের ঈমান আনয়ন করুক। এ ক্ষেত্রে কাফের যদি ঈমান না আনে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছার উপর কাফেরের ইচ্ছা জয়লাভ করেছে। নাউযুবিল্লাহ। কেননা তাদের মতেও আল্লাহ তা’আলা কাফের থেকে ঈমান সংঘটিত হওয়ার ইচ্ছা করেছেন। আর কাফের কুফুরী করার ইচ্ছা করেছে। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা বাস্তবায়ন না হয়ে কাফেরের ইচ্ছাই বাস্তবায়ন হয়েছে!! সে সঙ্গে এরূপ বিশ্বাস থেকে একাধিক স্রষ্টাও সাব্যস্ত হয়ে যায়!! এ আক্বীদাহ হচ্ছে সর্বাধিক নিকৃষ্ট…
২৬৮. ছাহাবীদের যুগের পর থেকেই এ মাস’আলায় মতভেদ শুরু হয়েছে। তারা সকলেই তাকদীরে বিশ্বাসী ছিলেন। তাদের যুগে এ মাসআলাতে কোনো দ্বিমত ছিল না। তাদের যুগের একদম শেষপ্রান্তে এ মাস’আলায় মতভেদ শুরু হয়। তখন কেবল আব্দুল্লাহ ইবনে উমার এবং ইবনে আব্বাসসহ মাত্র কয়েকজন ছাহাবী জীবিত ছিলেন। তারাও তাকদীর অস্বীকার কারীদের কঠোর প্রতিবাদ করেছেন। এ মাস’আলায় মতভেদ করা থেকেই উম্মতের মধ্যে শির্কের সূত্রপাত ঘটেছে।

আকীদা গ্রন্থে তাকদীর
আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 1

এই বক্তব্যে দুটি বিষয় পাশাপাশি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থিত। প্রথমত, আল্লাহই বান্দার কর্মের স্রষ্টা এবং কাফেরের কুফরও আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে। দ্বিতীয়ত, এই অবস্থান থেকে যে নৈতিক সমস্যা তৈরি হয়—আল্লাহ যদি কুফর সংঘটিত হওয়ার ইচ্ছা করেন এবং পরে সেই কুফরের জন্যই মানুষকে শাস্তি দেন—সেই সমস্যাটিও ব্যাখ্যাকারীর অজানা নয়। বরং পাঠের মধ্যেই সরাসরি বলা হয়েছে, কাদরিয়া ও মু‘তাযিলারা ঠিক এই সমস্যাটি এড়ানোর জন্য মানুষের কাজকে মানুষের নিজের সৃষ্টি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। অর্থাৎ আপত্তিটি বাইরের কোনো আধুনিক সমালোচকের তৈরি নয়; ইসলামি ধর্মতত্ত্বের অভ্যন্তরেই সমস্যাটি সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছিল।

কিন্তু শরহে এই আপত্তির উত্তর হিসেবে দেখানো হয়নি কীভাবে আল্লাহ কুফর সৃষ্টি ও ইচ্ছা করেও সেই কুফরের নৈতিক দায় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকেন। বরং যুক্তির দিক পরিবর্তন করা হয়েছে: যদি কাফের আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীতে কুফর বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছাকে পরাজিত করেছে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে আল্লাহর সর্বব্যাপী ইচ্ছা ও সৃষ্টিশক্তি রক্ষা করতে গিয়ে সিদ্ধান্তটি দাঁড়ায়, কাফেরের কুফরও আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছার বাইরে নয়।

এতে মু‘তাযিলাদের উত্থাপিত মূল নৈতিক প্রশ্নের সমাধান হয় না; বরং তাদের প্রস্তাবিত সমাধান প্রত্যাখ্যান করা হয়। প্রশ্নটি থেকেই যায়: আল্লাহ যদি বান্দার কর্মের স্রষ্টা হন, কাফেরের কুফর তাঁর ইচ্ছায় ঘটে এবং তাঁর ইচ্ছার বিপরীত কোনো ফল বাস্তব হতে না পারে, তাহলে সেই কুফরের পূর্ণ নৈতিক দায় শুধু কাফেরের ওপর বর্তাবে কোন যুক্তিতে? “মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছাকে পরাজিত করতে পারে না”—এই বক্তব্য আল্লাহর সর্বশক্তিমানতা প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু মানুষের স্বাধীন দায় প্রতিষ্ঠা করে না। বরং মানুষের স্বাধীনতার পরিসর আরও সংকুচিত করে।

ঠিক এই জায়গাতেই তাহাবিয়ার মূল বক্তব্যের “রহস্য” ও “প্রশ্ন নিষেধ”-এর ভাষা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাকদীরের কার্যকারণ ব্যাখ্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে একই সঙ্গে বলা হচ্ছে আল্লাহই বান্দার কর্মের স্রষ্টা, কুফরও তাঁর ইচ্ছায় ঘটে, অথচ কুফরের জন্য শাস্তি শুধু মানুষের; কিন্তু এই দুই দাবির সামঞ্জস্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে “আল্লাহ কেন এমন করলেন?” জিজ্ঞাসাই নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। ফলে যুক্তিগত সমাধানের বদলে আকীদাগত আত্মসমর্পণকে চূড়ান্ত সীমারেখা হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে।

এখানে “আল্লাহ কুফরকে ধর্ম হিসেবে পছন্দ করেন না, কিন্তু সৃষ্টিগতভাবে তা ইচ্ছা করেন”—এই পার্থক্যও মূল সমস্যাটি দূর করে না। এটি শুধু আল্লাহর নৈতিক পছন্দ এবং তাঁর কার্যকর সৃষ্টিগত ইচ্ছাকে আলাদা করে। কিন্তু যদি কুফরের অস্তিত্ব বাস্তব হওয়ার জন্য সেই সৃষ্টিগত ইচ্ছাই অপরিহার্য হয়, তাহলে কুফরের কার্যকারণগত উৎসের প্রশ্ন থেকেই যায়। আল্লাহ কুফর পছন্দ করেন কি না এবং কুফর তাঁর ইচ্ছা ও সৃষ্টির বাইরে ঘটতে পারে কি না—এ দুটি ভিন্ন প্রশ্ন। শরহের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী দ্বিতীয়টির উত্তর স্পষ্ট: পারে না।

ফলে শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া-র এই আলোচনা ধ্রুপদী সুন্নি তাকদীরের মৌলিক দ্বন্দ্বটি আড়াল করে না; বরং সরাসরি দৃশ্যমান করে। মানুষের কুফর ও কর্ম আল্লাহর ইচ্ছা ও সৃষ্টির অধীন, কিন্তু শাস্তির পূর্ণ দায় মানুষের; আর এই দুই দাবির সম্পর্ক নিয়ে গভীর অনুসন্ধানকে “গোপন রহস্য” বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একটি দাবিকে রহস্য ঘোষণা করা তার যুক্তিগত অসঙ্গতি দূর করে না; কেবল সেই অসঙ্গতির ব্যাখ্যা দাবি করা নিষিদ্ধ করে।


হার্ব আল-কিরমানি: ভালো-মন্দ, পাপ ও অবাধ্যতা—সবই আল্লাহর তাকদীর

নবম শতকের সুন্নি আলেম হার্ব আল-কিরমানির নামে সংরক্ষিত আকীদা-বিবরণ তাকদীরের এই ধারণাকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় প্রকাশ করে। এখানে শুধু সাধারণভাবে “সবকিছু আল্লাহর তাকদীর” বলা হয়নি; ভালো-মন্দ থেকে শুরু করে ব্যভিচার, চুরি, মদ্যপান, হত্যা, হারাম সম্পদ গ্রহণ, শিরক এবং সব ধরনের পাপ ও অবাধ্যতাকে সরাসরি আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, আল্লাহ অবাধ্যদের অবাধ্যতার জন্য এবং আনুগত্যকারীদের আনুগত্যের জন্য সৃষ্টি করেছেন; প্রত্যেকে সেই কাজই করে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্ধারণ অতিক্রম করতে পারে না [3]

তাকদির বিষয়ক আকিদা
١٥- وَالْقَدَرُ خَيْرُهُ وَشَرُّهُ، وَقَلِيلُهُ وَكَثِيرُهُ، وَظَاهِرُهُ وَبَاطِنُهُ، وَحُلْوُهُ وَمُرُّهُ، وَمَحْبُوبُهُ وَمَكْرُوهُهُ، وَحَسَنُهُ وَسَيِّئُهُ، وَأَوَّلُهُ وَآخِرُهُ: مِنَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى قَضَاءٌ قَضَاهُ عَلَى عِبَادِهِ، وَقَدَرٌ قَدَّرَهُ عَلَيْهِمْ، لَا يَعْدُو أَحَدٌ مِنْهُمْ مَشِيئَةَ اللَّهِ، وَلَا يَتَجَاوَزُ قَضَاءَهُ؛ بَلْ هُمْ كُلُّهُمْ صَائِرُونَ إِلَى مَا خَلَقَهُمْ لَهُ، وَوَاقِعُونَ فِيمَا قَدَّرَ عَلَيْهِمْ لَا مَحَالَةَ، وَهُوَ عَدْلٌ مِنْهُ عَزَّ رَبُّنَا وَجَلَّ.
১৫. আল্লাহ নির্ধারিত তাকদিরের ভালো-মন্দ, অল্প-বেশি, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, মিষ্টতা-তিক্ততা, পছন্দনীয়-অপছন্দনীয়, ভালো-খারাপ, প্রথম-শেষ—সবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের জন্য নির্ধারিত ফয়সালা এবং পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য। বান্দাদের কেউই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে যেতে পারে না, তাঁর ফয়সালা অতিক্রম করতে পারে না। বরং সবাই শেষ পর্যন্ত সেই নির্ধারিত ভাগ্যের দিকেই গমনশীল, যার জন্য আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করেছেন; এবং তারা অবশ্যম্ভাবীভাবে সেই তাকদিরের মধ্যেই নিপাতিত হবে, যা আল্লাহ তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির তাঁর (পরিপূর্ণ) ন্যায়পরায়ণতা; যদিও আমাদের রব মহিমান্বিত ও প্রতাপশালী।36
36 অর্থাৎ, তাকদির নির্ধারণ করে মহান আল্লাহ কারও প্রতি জুলুম করেননি। বান্দা যদি জাহান্নামে যায়, সেটা তারই দোষ; তার নিজের পাপের প্রতিদান। আর বান্দা যদি জান্নাতে যায়, সেটা আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ। কারণ আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না।
وَالزِّنَا، وَالسَّرِقَةُ، وَشُرْبُ الْخَمْرِ، وَقَتْلُ النَّفْسِ، وَأَكْلُ الْمَالِ الْحَرَامِ، وَالشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالذُّنُوبُ وَالْمَعَاصِي كُلُّهَا بِقَضَاءٍ وَقَدَرٍ مِنَ اللَّهِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَكُونَ لِأَحَدٍ مِنَ الْخَلْقِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ، بَلِ اللَّهُ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ عَلَى خَلْقِهِ، لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ [الأنبياء: ٢٣].
আর ব্যভিচার, চুরি, মদ্যপান, হত্যাকাণ্ড, হারাম সম্পদ ভক্ষণ, আল্লাহর সাথে শরিক স্থাপন, এবং সকল গুনাহ ও অবাধ্যতার সবই আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরে নির্ধারিত। তবে সৃষ্টির কেউই আল্লাহর কাছে (নিজের কৃতকর্মের ব্যাপারে) কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে পারবে না। বরং আল্লাহর রয়েছে সৃষ্টির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রমাণ।37 “আল্লাহ যা করেন, তার জন্য তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না। বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে (তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে)।”38
37 অর্থাৎ, যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, তাদের এরকম অজুহাত কাজে আসবে না—‘সবই তো আল্লাহর ফয়সালা, আমাদের কোনো দোষ নাই।’ বরং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে চূড়ান্ত প্রমাণ আছে।
38 সূরা আম্বিয়া ২১:২৩।
١٦- وَعِلْمُ اللَّهِ مَاضٍ فِي خَلْقِهِ بِمَشِيئَةٍ مِنْهُ؛ قَدْ عَلِمَ مِنْ إِبْلِيسَ – مِنْ لَدُنْ أَنْ عُصِيَ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى أَنْ تَقُومَ السَّاعَةُ – وَمِنْ غَيْرِهِ مِمَّنْ عَصَاهُ، الْمَعْصِيَةَ، وَخَلَقَهُمْ لَهَا. وَعَلِمَ الطَّاعَةَ مِنْ أَهْلِ طَاعَتِهِ، وَخَلَقَهُمْ لَهَا.
১৬. স্বীয় সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর জ্ঞান তাঁরই ইচ্ছায় কার্যকর হয়। যখন আমাদের মহান রবের অবাধ্যতা করা হয়েছে, সেই সময় থেকে আরম্ভ করে কেয়ামত পর্যন্ত ইবলিস ও অন্যান্য অবাধ্যরা আল্লাহর যত অবাধ্যতা করবে, সে সম্পর্কে তিনি (আগে থেকেই) জানতেন। আর তিনি তাদেরকে সেই অবাধ্যতার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আবার তিনি আনুগত্যকারীদের আনুগত্য সম্পর্কেও জানতেন, এবং তাদেরকেও ওই আনুগত্যের জন্যই তিনি সৃষ্টি করেছেন।
فَكُلٌّ يَعْمَلُ لِمَا خُلِقَ لَهُ، وَصَائِرٌ إِلَى مَا قُضِيَ عَلَيْهِ وَعُلِمَ، لَا يَعْدُو أَحَدٌ مِنْهُمْ قَدَرَ اللَّهِ وَمَشِيئَتَهُ، وَاللَّهُ الْفَعَّالُ لِمَا يُرِيدُ.
সুতরাং প্রত্যেক বান্দা সেই কাজই করে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর সেই পরিণতির দিকেই এগিয়ে যায়, যা তার জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে, এবং (আল্লাহর তরফ থেকে সীমাহীন অতীতেই) জানা হয়ে আছে। তাদের কেউই আল্লাহর তাকদির ও ইচ্ছার বাইরে যেতে পারবে না। বস্তুত আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করে থাকেন।
١٧- فَمَنْ زَعَمَ أَنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى شَاءَ لِعِبَادِهِ الَّذِينَ قَضَاهُمُ الْخَيْرَ وَالطَّاعَةَ، وَأَنَّ الْعِبَادَ شَاءُوا لِأَنْفُسِهِمُ الشَّرَّ وَالْمَعْصِيَةَ فَعَمِلُوا عَلَى مَشِيئَتِهِمْ؛ فَقَدْ زَعَمَ أَنَّ مَشِيئَةَ الْعِبَادِ أَغْلَبُ مِنْ مَشِيئَةِ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى ذِكْرُهُ، فَأَيُّ افْتِرَاءٍ عَلَى اللَّهِ أَكْثَرُ مِنْ هَذَا؟!
১৭. সুতরাং যে দাবি করে, “মহান আল্লাহ তাঁর অবাধ্য বান্দাদের জন্য কল্যাণ ও আনুগত্যের ইচ্ছা করেছেন, কিন্তু বান্দারা নিজেদের জন্য অকল্যাণ ও অবাধ্যতা ইচ্ছা করেছে এবং তারা তাদের ইচ্ছামতো কাজ করেছে,” সে যেন এ বিষয়েরই দাবি করে যে, বান্দাদের ইচ্ছা মহান আল্লাহর ইচ্ছার চেয়ে প্রবল। আল্লাহর বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় মিথ্যারোপ আর কী হতে পারে?!39
39 তাকদির-অস্বীকারকারী মুতাজিলা ফেরকার আকিদা হলো—‘আল্লাহ কাফিরের জন্য ঈমান চেয়েছেন, কিন্তু কাফির নিজের জন্য কুফর চেয়েছে।’ তারা এই মত নিয়েছে, যাতে একথা বলতে না হয় যে, ‘আল্লাহ কুফর চেয়েছেন এবং পরে নিজেই কুফরের জন্য শাস্তি দিয়েছেন।’ কিন্তু তারা এই চিন্তা করতে যেয়ে আসলে বিরাট গোমরাহিতে নিপতিত হয়েছে। কারণ মুতাজিলিদের আকিদার মানে দাঁড়ায়—কাফিরের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর বিজয়ী হয়েছে। আল্লাহ তার জন্য ঈমান চেয়েছেন, কিন্তু সেটা ঘটেনি। বরং সেই কাফির নিজের জন্য কুফর চেয়েছে, আর সেটাই ঘটে গেছে! এটা সবচেয়ে নিকৃষ্ট আকিদাগুলোর অন্যতম, যার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। বরং এই আকিদা শরঈ দলিলের সরাসরি বিরোধী। দ্রষ্টব্য: ইবনু আবিল ইয, শরহুল আকীদাতিত তাহাবিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৩২১।
١٨- وَمَنْ زَعَمَ أَنَّ أَحَدًا مِنَ الْخَلْقِ صَائِرٌ إِلَى غَيْرِ مَا خُلِقَ لَهُ؛ فَقَدْ أَلْغَى قُدْرَةَ اللَّهِ عَنْ خَلْقِهِ، وَهَذَا إِفْكٌ عَلَى اللَّهِ وَكَذِبٌ عَلَيْهِ.
১৮. যেই ব্যক্তি দাবি করে, “সৃষ্টিকুলের কোনো একজন সেই পরিণতির দিকে যাচ্ছে না, যেই পরিণতির জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে,” সেই ব্যক্তি আসলে স্বীয় সৃষ্টির ওপর মহান আল্লাহর যে ক্ষমতা রয়েছে, সেটা অস্বীকার করে। আর এটা আল্লাহর বিরুদ্ধে এক ধরনের অপবাদ ও মিথ্যারোপ।
١٩- وَمَنْ زَعَمَ أَنَّ الزِّنَا لَيْسَ بِقَدَرٍ، قِيلَ لَهُ: أَرَأَيْتَ هَذِهِ الْمَرْأَةَ الَّتِي حَمَلَتْ مِنَ الزِّنَا، وَجَاءَتْ بِوَلَدٍ؛ هَلْ شَاءَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يَخْلُقَ هَذَا الْوَلَدَ؟ وَهَلْ مَضَى هَذَا فِي سَابِقِ عِلْمِهِ؟ فَإِنْ قَالَ: لَا، فَقَدْ زَعَمَ أَنَّ اللَّهَ غَيْرُ خَالِقٍ؛ وَهَذَا قَوْلٌ يُضَارِعُ الشِّرْكَ، بَلْ هُوَ الشِّرْكُ.
১৯. যে ব্যক্তি দাবি করে, “ব্যভিচার তাকদিরে নির্ধারিত নয়,” তাকে বলতে হবে, “তুমি আমাকে বলো দেখি, একজন নারী ব্যভিচারের ফলে গর্ভবতী হয়েছে এবং সন্তান জন্ম দিয়েছে। মহান আল্লাহ কি ইচ্ছা করেছিলেন যে, এই সন্তান সৃষ্টি হবে? বিষয়টি কি তাঁর পূর্বজ্ঞানেই ছিল না?” সে যদি উত্তর দেয়, “না,” তাহলে সে যেন এ বিষয়ের দাবি করল যে, আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা নন। বস্তুত এটা এমন বক্তব্য, যা শিরকের সদৃশ; বরং এটাই শিরক।
٢٠- وَمَنْ زَعَمَ أَنَّ السَّرِقَةَ، وَشُرْبَ الْخَمْرِ، وَأَكْلَ الْمَالِ الْحَرَامِ لَيْسَ بِقَضَاءٍ وَقَدَرٍ مِنَ اللَّهِ؛ فَقَدْ زَعَمَ أَنَّ هَذَا الْإِنْسَانَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يَأْكُلَ رِزْقَ غَيْرِهِ. وَهَذَا الْقَوْلُ يُضَارِعُ قَوْلَ الْمَجُوسِيَّةِ وَالنَّصَارَى. بَلْ أَكَلَ رِزْقَهُ، وَقَضَى اللَّهُ لَهُ أَنْ يَأْكُلَهُ مِنَ الْوَجْهِ الَّذِي أَكَلَهُ.
২০. যে ব্যক্তি দাবি করে, “চুরি, মদ্যপান, হারাম সম্পদ ভক্ষণ আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরে নির্ধারিত নয়,” সে যেন এ বিষয়েরই দাবি করল যে, একজন মানুষ অন্যের জন্য নির্ধারিত রিজিক খাওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই বক্তব্য অগ্নিপূজক ও খ্রিষ্টানদের মতাদর্শের মতো। বরং সে তার নিজের রিজিকই খেয়েছে, এবং আল্লাহই ফয়সালা করেছিলেন যে, উক্ত রিজিক সে ওই উপায়ে খাবে।
٢١- وَمَنْ زَعَمَ أَنَّ قَتْلَ النَّفْسِ لَيْسَ بِقَدَرٍ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ؛ فَقَدْ زَعَمَ أَنَّ الْمَقْتُولَ مَاتَ بِغَيْرِ أَجَلِهِ، فَأَيُّ كُفْرٍ بِاللَّهِ أَوْضَحُ مِنْ هَذَا؟!
২১. যে ব্যক্তি দাবি করে, “হত্যাকাণ্ড মহান আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির নয়,” সে যেন এ বিষয়ের দাবি করল যে, নিহত ব্যক্তি তার নির্ধারিত আয়ুষ্কালের বাইরে মারা গেছে। মহান আল্লাহর প্রতি এর চেয়ে স্পষ্ট কুফরি আর কী হতে পারে?!
بَلْ ذَلِكَ كُلُّهُ بِقَضَاءٍ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَقَدَرٍ، وَكُلُّ ذَلِكَ بِمَشِيئَتِهِ فِي خَلْقِهِ وَتَدْبِيرِهِ فِيهِمْ، وَمَا جَرَى فِي سَابِقِ عِلْمِهِ لَهُمْ، وَهُوَ الْعَدْلُ الْحَقُّ الَّذِي يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ.
বরং এগুলোর সবই মহান আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালা ও তাকদির মোতাবেক সংঘটিত হয়। আর আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবই আল্লাহর ইচ্ছায় ও পরিচালনায় ঘটে থাকে; এবং সবই তাঁর পূর্বজ্ঞান মোতাবেক হয়ে থাকে। (এ সত্ত্বেও) তিনি হলেন ন্যায়পরায়ণ ও মহাসত্য; যিনি যা ইচ্ছা তাই করে থাকেন।
٢٢- وَمَنْ أَقَرَّ بِالْعِلْمِ؛ لَزِمَهُ الْإِقْرَارُ بِالْقَدَرِ وَالْمَشِيئَةِ عَلَى الصِّغَرِ وَالْفَاقَةِ. وَاللَّهُ الضَّارُّ النَّافِعُ، الْمُضِلُّ الْهَادِي، فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ.
২২. যে ব্যক্তি আল্লাহর জ্ঞান স্বীকার করে, তার জন্য ক্ষুদ্রতম ও তুচ্ছতম বিষয়ের ক্ষেত্রেও আল্লাহর তাকদির ও ইচ্ছাকে স্বীকার করা অপরিহার্য হয়ে যায়। আল্লাহই ক্ষতি ও উপকার প্রদানকারী,40 এবং পথভ্রষ্টকারী ও হেদায়েতদাতা।41 সুতরাং সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কতইনা বরকতময়!
40 অর্থাৎ, ক্ষতি ও উপকার করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্ধারিত তাকদিরের বাইরে গিয়ে কেউ সৃষ্টিকুলের কারও সামান্যতম উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে না। (সূরা ইউনুস ১০:১০৭; তিরমিজি, হা. ২৫১৬, বর্ণনার মান: সহীহ)
41 অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দেন, আবার যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন।

আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 3
আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 5
আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 7
আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 9
আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 11
আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 13

এই বক্তব্যকে শুধু “আল্লাহ সব জানেন” বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। হার্বের ভাষায় জ্ঞান, ইচ্ছা, সৃষ্টি, কর্ম এবং পরিণতি একসঙ্গে বাঁধা। অবাধ্যদের অবাধ্যতার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; আনুগত্যকারীদের আনুগত্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; প্রত্যেকে যার জন্য সৃষ্টি সেই কাজই করে; এবং কেউ নির্ধারিত পরিণতি অতিক্রম করতে পারে না।

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, পাপের উদাহরণগুলো বিমূর্ত নয়। ব্যভিচার, চুরি, মদ্যপান, হত্যা, শিরক—এসবকেও সরাসরি আল্লাহর তাকদীর ও ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে, মানুষ এসবের জন্য অজুহাত দিতে পারবে না এবং আল্লাহর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত। অর্থাৎ একই পাঠে দুটি দাবি পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে: পাপ আল্লাহর পূর্বনির্ধারণ ও ইচ্ছার বাইরে নয়, এবং সেই পাপের সম্পূর্ণ দায় পাপীর। কিন্তু দ্বিতীয় দাবিটি প্রথম দাবির সঙ্গে কীভাবে ন্যায়সংগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ—তার কার্যকারণগত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি; ন্যায়পরায়ণতাকে ঘোষণা করা হয়েছে।

আরও কঠোর হলো ১৭ নম্বর বক্তব্য। সেখানে এমন ধারণাও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে যে আল্লাহ মানুষের জন্য শুধু ভালো চেয়েছিলেন, কিন্তু মানুষ স্বাধীনভাবে মন্দ বেছে নিয়েছে। কারণ তা হলে মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছাকে পরাজিত করেছে—এমন ফল দাঁড়ায়। অর্থাৎ আল্লাহর সর্বশক্তিমান ইচ্ছা রক্ষা করতে গিয়ে মানুষের স্বাধীনভাবে বিপরীত ইচ্ছা বাস্তবায়নের সুযোগ সরাসরি সংকুচিত করা হয়েছে।

ফলে হার্বের কাঠামোয় পাপী এমন কোনো স্বাধীন ক্ষেত্রের মধ্যে কাজ করছে না যেখানে আল্লাহ এক ফল চেয়েছিলেন কিন্তু মানুষ অন্য ফল ঘটিয়ে দিয়েছে। বরং পাপটিও সেই ফল যা আল্লাহর ইচ্ছা, তাকদীর ও পরিচালনার অধীন বাস্তবে ঘটেছে। এরপর সেই ফলের জন্য মানুষকে দায়ী করা হচ্ছে। এখানেই তাকদীর ও নৈতিক দায়ের দ্বন্দ্ব সবচেয়ে স্পষ্ট।


ইবন বাট্টা: জান্নাতের জন্য মানুষ, জাহান্নামের জন্য মানুষ

দশম শতকের হাম্বলি আলেম ইবন বাট্টার আল-ইবানাহ আল-কুবরা-র তাকদীর অধ্যায়ে একই অবস্থান আরও পদ্ধতিগতভাবে পাওয়া যায়। তাঁর বক্তব্যে ভালো-মন্দ, আনুগত্য-অবাধ্যতা আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত; আল্লাহ জান্নাত সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্য মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আবার জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন এবং তার জন্যও মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি এমনও বলেন, আল্লাহ মানুষের চলাফেরা, সংকল্প, অন্তরের ভাবনা ও মানসিক প্রবণতা নির্ধারণ করেছেন; কেউ তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো নড়াচড়া বা সংকল্প করতে পারে না। [4]

وَقَدَّرَ حَرَكَاتِ الْعِبَادِ وَهِمَمَهُمْ وَهَوَاجِسَ قُلُوبِهِمْ.
বাংলা অনুবাদ:“তিনি বান্দাদের চলাফেরা, সংকল্প এবং অন্তরের ভাবনাও নির্ধারণ করেছেন।”

ইবন বাট্টার বর্ণনায় নৈতিক পার্থক্যের উৎসও আল্লাহর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। যাদের হেদায়াত চেয়েছেন তাদের অন্তর ঈমানের জন্য খুলে দিয়েছেন, ঈমানকে তাদের কাছে প্রিয় করেছেন; আর যাদের পথভ্রষ্টতা চেয়েছেন তাদের অন্তর সংকীর্ণ করেছেন। মানুষকে আদেশ-নিষেধ দেওয়া হলেও আনুগত্যের জন্য আল্লাহর তৌফিক এবং পাপ থেকে বাঁচার জন্য তাঁর সুরক্ষা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও সরাসরি একটি অধ্যায়ের শিরোনামেই ইবন বাট্টা বলেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা জান্নাতের জন্য এবং যাকে ইচ্ছা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন; এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞান পূর্ববর্তী, তাঁর ফয়সালা কার্যকর এবং কলম তা লিখে ফেলেছে। [5]

فَمَنْ شَاءَ خَلَقَهُ لِلْجَنَّةِ وَمَنْ شَاءَ خَلَقَهُ لِلنَّارِ.
বাংলা অনুবাদ:“যাকে ইচ্ছা তিনি জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং যাকে ইচ্ছা জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”

ইবন বাট্টার আরেকটি বক্তব্য এই সমস্যার কাঠামোকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি তাকদীরের জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করেন: এক অংশ জানা ও বিশ্বাস করা বাধ্যতামূলক, আর অন্য অংশ নিয়ে চিন্তা, প্রশ্ন, বিতর্ক ও তর্ক নিষিদ্ধ। জানা বাধ্যতামূলক অংশের মধ্যেই তিনি বলেন—ভালো ও মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে, আনুগত্য ও অবাধ্যতা আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরের অধীন, জান্নাতের জন্য নির্দিষ্ট মানুষকে আল্লাহ সৎকর্মে সাহায্য করেন এবং জাহান্নামের জন্য নির্দিষ্ট মানুষদের ওপর এমন কাজ নির্ধারণ করেন যা তিনি তাদের জন্য অপছন্দ করেন; এরপর সেই কাজের কারণেই তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। [6]

أَنَّ الْخَيْرَ وَالشَّرَّ مِنَ اللَّهِ، وَأَنَّ الطَّاعَةَ وَالْمَعْصِيَةَ بِقَضَاءِ اللَّهِ وَقَدَرِهِ.
বাংলা অনুবাদ:“ভালো ও মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে; আনুগত্য ও অবাধ্যতা আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীর অনুযায়ী।”

এখানে সমস্যার সীমারেখাটিও আকীদার ভেতরেই নির্ধারিত: বিশ্বাস করো যে পাপ ও অবাধ্যতাও আল্লাহর তাকদীরের মধ্যে, কিন্তু সেই ব্যবস্থার ন্যায়সংগত কার্যকারণ নিয়ে বেশি প্রশ্ন করো না। ফলে নৈতিক দ্বন্দ্বটি ব্যাখ্যা করে মেলানোর বদলে অনুসন্ধানের ওপর সীমা আরোপ করা হয়েছে।


লালাকাঈ: তাকদীর-বিতর্ককে আকীদাগত সীমারেখায় পরিণত করা

আবুল কাসিম আল-লালাকাঈর শারহ উসূল ই‘তিকাদ আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ ধ্রুপদী সুন্নি আকীদা-সংকলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। তিনি তাকদীরের জন্য বিস্তৃত অধ্যায় রাখেন এবং কোরআনের আয়াত, হাদিস, সাহাবি ও পরবর্তী আলেমদের বক্তব্য সংগ্রহ করেন। তাঁর ভূমিকায় প্রাথমিক তাকদীর-বিতর্কের উত্থানকে মারওয়ানি শাসনের শুরুর সময়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। [7]

فِي أَوَّلِ إِمَارَةِ الْمَرْوَانِيَّةِ فِي الْقَدَرِ وَتَكَلَّمَ فِيهِ.
বাংলা অনুবাদ:“মারওয়ানি শাসনের শুরুর দিকেই তাকদীর বিষয়ে নতুন বক্তব্য ও বিতর্ক দেখা দেয়।”

লালাকাঈর সংকলন দেখায়, তাকদীরের প্রশ্নটি দ্রুত শুধু একটি দার্শনিক সমস্যা থাকেনি; কে সুন্নাহর অনুসারী এবং কে বিদআতি—এই পরিচয়ের সীমারেখায় পরিণত হয়েছিল। তাকদীরের নির্ধারণ অস্বীকারকে শুধু ভুল যুক্তি নয়, আকীদাগত বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে পরবর্তী আলোচনা এমন একটি পরিবেশে গড়ে ওঠে যেখানে নির্ধারণের বিরুদ্ধে যুক্তিগত আপত্তি তোলা মানেই নিরপেক্ষ দার্শনিক প্রশ্ন করা ছিল না; তা ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নেও পরিণত হতে পারত।

এই ঐতিহাসিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষের স্বাধীন কর্ম এবং আল্লাহর সর্বব্যাপী নির্ধারণের দ্বন্দ্বের একটি সম্ভাব্য সমাধান ছিল আল্লাহর ইচ্ছাকে সীমিত করা—অর্থাৎ বলা যে মানুষ কিছু কাজ আল্লাহর নির্ধারণের বাইরে স্বাধীনভাবে ঘটাতে পারে। ধ্রুপদী সুন্নি আকীদা এই পথকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে আল্লাহর সর্বব্যাপী ইচ্ছা অক্ষত রেখে মানুষের দায় প্রতিষ্ঠার চাপ থেকেই পরবর্তী সমন্বয়মূলক ভাষা তৈরি হয়।


তাহাবিয়া: তাকদীর “আল্লাহর রহস্য”—গভীর অনুসন্ধান বিপজ্জনক

ইমাম তাহাবির নামে পরিচিত আল-আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ এবং তার প্রসিদ্ধ শরহে তাকদীরের প্রশ্নে আরও স্পষ্ট একটি পদ্ধতি পাওয়া যায়। মূল আকীদা-বক্তব্যে তাকদীরকে “সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর রহস্য” বলা হয়েছে; নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা বা প্রেরিত নবীও এই রহস্য সম্পর্কে অবহিত নয়। এর গভীরে প্রবেশ, অনুসন্ধান ও চিন্তাকে ব্যর্থতা, বঞ্চনা ও সীমালঙ্ঘনের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি “আল্লাহ কেন এটি করলেন?” প্রশ্নকে কোরআনের বিধানের বিরোধিতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। [8]

وأَصلُ الْقَدَرِ سِرُّ اللَّهِ تَعَالَى فِي خَلْقِهِ، لَمْ يَطَّلِعْ عَلَى ذَلِكَ مَلَكٌ مُقَرَّبٌ، وَلَا نَبِيُّ مُرْسَلٌ، وَالتَّعَمُّقُ وَالنَّظَرُ فِي ذَلِكَ ذَرِيعَةُ الْخِذْلانِ، وَسُلَّمُ الْحِرْمَانِ، وَدَرَجَةُ الطَّغْيَانِ، فَالْحَذَرَ كُلَّ الْحَذَرِ مِنْ ذَلِكَ نَظَرًا وَفِكْرًا وَوَسْوَسَةً، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى طَوَى عِلْمَ الْقَدَرِ عَنْ أَنَامِهِ، وَنَهَاهُمْ عَنْ مَرَامِهِ، كَمَا قَالَ تَعَالَى: لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ. فَمَنْ سَأَلَ: لِمَ فَعَلَ؟ فَقَدْ رَدَّ حُكْمَ الْكِتَابِ.
বাংলা অনুবাদ: তাকদীর সম্পর্কে আসল কথা হলো, এটি সৃষ্টিকুলের ব্যাপারে আল্লাহর একটি গোপন বিষয়; যা কোনো নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা কিংবা প্রেরিত নবীও জানেন না। এ সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা ও অনুসন্ধান ব্যর্থতার কারণ, বঞ্চনার সিঁড়ি এবং সীমালঙ্ঘনের স্তর। অতএব এ বিষয়ে চিন্তা, অনুসন্ধান ও কুমন্ত্রণা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহ তাকদীরের জ্ঞান সৃষ্টিকুল থেকে গোপন রেখেছেন এবং এর উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন। “তাঁকে তাঁর কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না; বরং তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।” অতএব যে ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করে, “তিনি কেন এমন করলেন?” সে কিতাবের বিধান প্রত্যাখ্যান করে।

এই বক্তব্যের পরে ইবন আবিল ইযের শরহে সুন্নি অবস্থান আরও পরিষ্কার করা হয়েছে: সবকিছু আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীর অনুযায়ী ঘটে, এবং আল্লাহ বান্দাদের কর্মের স্রষ্টা। কাফেরের কুফরও আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে, যদিও আল্লাহ ধর্মীয়ভাবে কুফরকে পছন্দ করেন না। [9]

وَالَّذِي عَلَيْهِ أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ: أَنَّ كُلَّ شَيْءٍ بِقَضَاءِ اللَّهِ وَقَدَرِهِ، وَأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى خَالِقُ أَفْعَالِ الْعِبَادِ.
বাংলা অনুবাদ:“আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মতে সবকিছু আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীর অনুযায়ী এবং আল্লাহই বান্দাদের কাজের স্রষ্টা।”

ইবন আবিল ইয কাদরিয়া ও মু‘তাযিলাদের আপত্তির প্রকৃত কারণও উল্লেখ করেন: তারা বলতে চায়নি যে আল্লাহ কাফেরের কুফর চেয়েছেন এবং তারপর সেই কুফরের জন্যই তাকে শাস্তি দিয়েছেন। তাই তারা বলেছিল আল্লাহ ঈমান চেয়েছেন, কিন্তু কাফের স্বাধীনভাবে কুফর চেয়েছে। সুন্নি সমালোচনা হলো—এতে কাফেরের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছাকে পরাজিত করেছে বলে ধরে নিতে হয়।

এই যুক্তির ফল পরিষ্কার। দুটি সম্ভাবনার মধ্যে সুন্নি আকীদা দ্বিতীয়টি বেছে নিয়েছে: কাফেরের কুফরও আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছার বাইরে নয়। কারণ অন্যথায় মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছাকে ব্যর্থ করতে পারে। কিন্তু এই সমাধানের মূল্য হলো নৈতিক সমস্যাটিকে আরও তীব্র করা: আল্লাহর ইচ্ছার অধীনেই যে কুফর বাস্তব হলো, সেই কুফরের জন্যই মানুষকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

তাহাবিয়া এই দ্বন্দ্বের কার্যকারণগত সমাধান দেয় না। বরং মূল পাঠ প্রথমেই সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে—তাকদীর আল্লাহর রহস্য; এর গভীরে যাওয়া যাবে না; “কেন?” জিজ্ঞেস করা যাবে না। অর্থাৎ যেখানে যুক্তিগত প্রশ্নটি সবচেয়ে তীব্র, সেখানেই অনুসন্ধানকে আকীদাগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


পাপ আল্লাহর ইচ্ছায়, কিন্তু দায় শুধু মানুষের

ধ্রুপদী আকীদা-গ্রন্থগুলোর বক্তব্য একত্রে রাখলে একটি ধারাবাহিক কাঠামো পাওয়া যায়। প্রথমত, আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো ঘটনা ঘটে না। দ্বিতীয়ত, বান্দাদের কাজও আল্লাহর সৃষ্টি। তৃতীয়ত, ভালো ও মন্দ, আনুগত্য ও অবাধ্যতা তাঁর তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত। চতুর্থত, মানুষকে নির্দিষ্ট কাজ ও পরিণতির জন্য সৃষ্টি করার ভাষাও পাওয়া যায়। পঞ্চমত, মানুষ আল্লাহর নির্ধারিত ফল অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু এর পরেও পূর্ণ নৈতিক দায় মানুষের ওপরই রাখা হয়।

“মানুষ কাজটির কর্তা”—এই বক্তব্য একা এই সমস্যার সমাধান নয়। কাজটির নিকটবর্তী কর্তা এবং কাজটির চূড়ান্ত নির্ধারক একই জিনিস নয়। একজন মানুষের হাত দিয়ে কাজটি ঘটেছে, তার মনে সেই কাজের ইচ্ছাও ছিল—এগুলো সত্য হতে পারে। কিন্তু সেই ইচ্ছা যদি আল্লাহর সৃষ্ট, সেই ইচ্ছার কার্যকারিতা যদি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং অন্য ফল বাস্তবে ঘটার সুযোগ না থাকে, তাহলে মানুষের মধ্যে ইচ্ছার উপস্থিতি তাকে কাজটির চূড়ান্ত স্বাধীন উৎস বানায় না।

হার্ব আল-কিরমানির বক্তব্য এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অস্পষ্ট নয়। তিনি এমন মতকে প্রত্যাখ্যান করেন যেখানে আল্লাহ ভালো চেয়েছিলেন কিন্তু মানুষ স্বাধীনভাবে মন্দ ঘটিয়েছে। তাঁর যুক্তি—এতে মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে যায়। অর্থাৎ মন্দ কাজ বাস্তবে ঘটলে সেটিও আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছার অধীন হতে হবে। ফলে পাপকে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে স্বাধীন মানবীয় সৃষ্টি হিসেবে ব্যবহার করে নৈতিক দায় ব্যাখ্যার পথটিই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এরপর বলা হচ্ছে পাপী নিজেই দায়ী। কিন্তু কেন দায়ী—এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে শুধু “সে কাজটি করেছে” যথেষ্ট নয়। কারণ বিতর্ক কাজটির শারীরিক সম্পাদন নিয়ে নয়; বিতর্ক হলো কাজটির চূড়ান্ত উৎস ও বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে। ব্যক্তি যদি আল্লাহর নির্ধারিত ইচ্ছার বিপরীত ফল বাস্তবায়ন করতে না পারে, তাহলে তার সামনে প্রকৃত অর্থে দুটি সমানভাবে বাস্তব ভবিষ্যৎ ছিল না।


“শরিয়তগত ইচ্ছা” ও “সৃষ্টিগত ইচ্ছা” সমস্যাটি দূর করে না

পরবর্তী সুন্নি ব্যাখ্যায় একটি পরিচিত পার্থক্য তৈরি করা হয়েছে: আল্লাহ কোনো পাপকে ধর্মীয়ভাবে পছন্দ বা অনুমোদন করেন না, কিন্তু সৃষ্টিগত বা তাকদীরগত অর্থে সেই পাপ তাঁর ইচ্ছার মধ্যেই ঘটে। এই পার্থক্য আল্লাহ পাপকে নৈতিকভাবে অনুমোদন করেন—এমন দাবি থেকে আকীদাকে রক্ষা করে; কিন্তু মানুষের স্বাধীন দায়ের সমস্যাটি সমাধান করে না।

কারণ নৈতিক পছন্দ এবং কার্যকারণগত নিয়ন্ত্রণ দুটি আলাদা প্রশ্ন। আল্লাহ পাপকে অপছন্দ করেন—এটি সত্য হলেও যদি পাপটির বাস্তব অস্তিত্ব তাঁর ইচ্ছা ও সৃষ্টি ছাড়া সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি পাপটির নৈতিক অনুমোদনকারী না হলেও কার্যকারণগত ব্যবস্থার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক থাকেন। মানুষের দায়ের প্রশ্নটি এই দ্বিতীয় স্তর নিয়েই।

বিশেষ করে যখন একই আকীদা বলে আল্লাহ চাইলে ফল অন্য হতে পারত, কিন্তু তাঁর ইচ্ছা ছাড়া বিপরীত ফল ঘটতে পারে না, তখন মানুষের স্বাধীনতার পরিসর আরও সংকুচিত হয়। মানুষ এমন কিছু করতে পারে না যা আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছার বাইরে। ফলে তাকে নৈতিকভাবে দায়ী করতে হলে দেখাতে হয় কেন আল্লাহর সৃষ্ট ও নির্ধারিত ইচ্ছার মাধ্যমে সংঘটিত কাজের পূর্ণ দায় শুধু সেই সৃষ্ট ব্যক্তির। ধ্রুপদী আকীদা-গ্রন্থে এই প্রশ্নের বিশদ যুক্তিগত উত্তর পাওয়া যায় না।


“তিনি ন্যায়পরায়ণ”—ঘোষণা কি ন্যায়বিচার প্রমাণ করে?

হার্ব আল-কিরমানি ও ইবন বাট্টার মতো গ্রন্থে তাকদীরের কঠোর নির্ধারণের পরপরই ঘোষণা করা হয়—আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ এবং কারও প্রতি জুলুম করেন না। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাকে “ন্যায়সঙ্গত” ঘোষণা করা এবং সেই ব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গততা দেখানো এক জিনিস নয়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তির অবাধ্যতা আগে থেকেই নির্ধারিত; তাকে সেই অবাধ্যতার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; তার পক্ষে আল্লাহর নির্ধারিত ইচ্ছা অতিক্রম করা অসম্ভব; এবং তার অবাধ্যতাও আল্লাহর তাকদীরের অংশ। এরপর যদি বলা হয় “তবু সে সম্পূর্ণ দায়ী, কারণ আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ”, তাহলে ন্যায়পরায়ণতার দাবিটি যুক্তির উপসংহার নয়—এটি একটি পূর্বধারণা।

একটি ন্যায়সংগত বিচারব্যবস্থায় সাধারণত দায়ের মাত্রা ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কেউ যত কম স্বাধীন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে, তার পূর্ণ দায় তত প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কিন্তু ধ্রুপদী তাকদীরের কাঠামোয় নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ স্তর মানুষের হাতে নয়; আল্লাহর হাতে। মানুষ সেই নির্ধারিত ব্যবস্থার ভেতরে কাজের বাহক ও নিকটবর্তী কর্তা। এই অবস্থায় চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণকারীকে নৈতিক হিসাব থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে শুধু নির্ভরশীল কর্তাকে পূর্ণ দায়ী করা আলাদাভাবে যুক্তিসিদ্ধ করতে হয়।

“আল্লাহকে প্রশ্ন করা যাবে না”—এই নীতি সেই যুক্তিগত ঘাটতি পূরণ করে না। এটি শুধু বিচারকের ওপর প্রশ্নের অধিকার অস্বীকার করে। কোনো কাজ ন্যায়সঙ্গত কেন—তার কারণ দেখানোর বদলে “বিচারককে প্রশ্ন করা যাবে না” বলা ন্যায়বিচারের প্রমাণ নয়।


তাকদীরের সমাধান হিসেবে “রহস্য”

ধ্রুপদী আকীদা-সাহিত্যের একটি ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য হলো, তাকদীরের মৌলিক দ্বন্দ্বের সামনে এসে অনুসন্ধান বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া। আহমদ ইবন হাম্বলের নামে সংরক্ষিত আকীদায় বলা হয়—“কেন” ও “কীভাবে” নয়, বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণ। ইবন বাট্টা তাকদীরের একটি অংশ নিয়ে চিন্তা, প্রশ্ন ও বিতর্ক হারাম বলেন। তাহাবিয়া তাকদীরকে আল্লাহর রহস্য বলে গভীর চিন্তা-ভাবনাকে ব্যর্থতা ও সীমালঙ্ঘনের পথ বলে। বারবাহারির নামেও সংরক্ষিত বক্তব্যে তাকদীর নিয়ে বিতর্ক নিষিদ্ধ এবং আত্মসমর্পণের নির্দেশ পাওয়া যায়। [10]

الْكَلَامُ وَالْجَدَلُ وَالْخُصُومَةُ فِي الْقَدَرِ خَاصَّةً مَنْهِيٌّ عَنْهُ عِنْدَ جَمِيعِ الْفِرَقِ؛ لِأَنَّ الْقَدَرَ سِرُّ اللَّهِ، وَنَهَى الرَّبُّ تَبَارَكَ وَتَعَالَى الْأَنْبِيَاءَ عَنِ الْكَلَامِ فِي الْقَدَرِ، وَنَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْخُصُومَةِ فِي الْقَدَرِ، وَكَرِهَهُ الْعُلَمَاءُ وَأَهْلُ الْوَرَعِ، وَنَهَوْا عَنِ الْجِدَالِ فِي الْقَدَرِ، فَعَلَيْكَ بِالتَّسْلِيمِ وَالْإِقْرَارِ وَالْإِيمَانِ، وَاعْتِقَادِ مَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جُمْلَةِ الْأَشْيَاءِ، وَتَسْكُتُ عَمَّا سِوَى ذَلِكَ.

বাংলা অনুবাদ:“বিশেষ করে তাকদীর নিয়ে কথা, তর্ক ও বিবাদ সকল দলের কাছেই নিষিদ্ধ; কারণ তাকদীর আল্লাহর রহস্য। মহান রব নবীদের তাকদীর নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করেছেন এবং রাসুলও তাকদীর নিয়ে বিবাদ করতে নিষেধ করেছেন। আলেম ও পরহেজগার ব্যক্তিরাও এটি অপছন্দ করেছেন এবং তাকদীর নিয়ে তর্ক করতে নিষেধ করেছেন। অতএব তোমার কর্তব্য হলো আত্মসমর্পণ করা, স্বীকার করা, বিশ্বাস করা এবং এসব বিষয়ে রাসুল যা বলেছেন তা বিশ্বাস করা; এর বাইরে যা আছে সে বিষয়ে নীরব থাকা।”

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আকীদাগত কৌশল। দ্বন্দ্বের একটি পাশ বাদ দেওয়া হয়নি। বলা হয়নি মানুষ পুরোপুরি স্বাধীন, ফলে আল্লাহর পূর্বনির্ধারণ সীমিত। আবার বলা হয়নি মানুষ পুরোপুরি বাধ্য, ফলে শাস্তির নৈতিক ভিত্তি নেই। দুই দাবিই রাখা হয়েছে—আল্লাহর ইচ্ছা সর্বব্যাপী এবং মানুষ দায়ী। তারপর এদের মধ্যকার গভীর সম্পর্ককে মানববুদ্ধির সীমার বাইরে স্থাপন করা হয়েছে।

কিন্তু কোনো সমস্যাকে “রহস্য” বলা সমস্যার সমাধান নয়। দুটি দাবি পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা দেখাতে না পারলে “বুদ্ধি এটি বুঝতে পারে না” বলা শুধু ব্যাখ্যার দাবি থেকে সরে যাওয়া। এতে বিশ্বাস রক্ষা করা সম্ভব, যুক্তিগত দ্বন্দ্ব দূর হয় না।


আধুনিক বাংলা আকীদা গ্রন্থে একই ধ্রুপদী কাঠামো

এই ধ্রুপদী অবস্থান আধুনিক বাংলা সুন্নি আকীদা-সাহিত্যেও প্রায় অপরিবর্তিতভাবে পাওয়া যায়। মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিবের আক্বীদা ইসলামিয়াহ-তে বলা হয়েছে—মানুষের আয়ু, কাজ, রিজিক এবং জান্নাতি বা জাহান্নামি হওয়া আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই লিখিত; একদল মানুষকে জান্নাত এবং অন্যদলকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; তাকদীরের লিখনের বাইরে কেউ কিছু পাবে না। জাবরিয়া ও কাদরিয়া—দুই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে আহলুস সুন্নাহর অবস্থানকে মাঝামাঝি বলে উপস্থাপন করা হয়েছে [11]

(৬) তাক্বদীরে বিশ্বাস (الإيمان بالقدر( : আজাল (হায়াত), আমল, রিযিক, জান্নাতী
বা জাহান্নামী- এই প্রধান চারটি বিষয় সহ বান্দার সমগ্র জীবনের ভাল-মন্দ সকল কাজকর্ম আসমান-যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বৎসর পূর্বে আল্লাহ্র ইল্মে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তাছাড়া একদল মানুষকে আল্লাহ পাক জান্নাতের জন্য ও একদলকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছেন। যার খবর তিনি ব্যতীত অন্য কারু পক্ষে জানা সম্ভব নয়। জানা না থাকার কারণেই জান্নাত পাওয়ার আশায় মুমিন বান্দা তার তাক্বদীরের উপরে আস্থা রেখে পূর্ণ তাদবীর ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। বিপদে সে ধৈর্য হারায় না, আনন্দে সে আত্মহারা হয় না। ইহকালে সে সুষ্ঠু (balanced), নিশ্চিন্ত ও শান্তিময় জীবন যাপন করে। কারণ সে জানে যে, তাক্বদীরের লিখনের বাইরে সে কিছুই প্রাপ্ত হবে না। জাব্রিয়াগণ অদৃষ্টবাদী হয়ে নিজেদেরকে ইচ্ছাশক্তিহীন জড়পদার্থ ভেবেছেন। ক্বাদারিয়াগণ তাক্বদীরকে অস্বীকার করে নিজেদেরকে স্ব স্ব ভাগ্য বিধায়ক মনে করেছেন। প্রকৃত পথ এ দুইয়ের মাঝখানে, যা আহলেসুন্নাত আহলেহাদীছের পথ ও গৃহীত আক্বীদা।

আকীদা গ্রন্থে তাকদীর 15

এখানেও “মাঝামাঝি” অবস্থান ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু সেই মাঝামাঝি অবস্থান কীভাবে কার্যকারণগতভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। যদি ব্যক্তি লিখিত তাকদীরের বাইরে কিছু পেতে না পারে এবং তার চূড়ান্ত গন্তব্যও পূর্বেই নির্ধারিত থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থায় স্বাধীনতার অর্থ কী—এই প্রশ্নটি থেকে যায়।


ধ্রুপদী আকীদা-গ্রন্থগুলোর সম্মিলিত চিত্র

ধ্রুপদী সুন্নি আকীদার বিভিন্ন গ্রন্থের ভাষা ও পদ্ধতিতে পার্থক্য আছে, কিন্তু তাকদীরের কয়েকটি কেন্দ্রীয় দাবি বারবার ফিরে আসে। আল্লাহ সবকিছুর পূর্বজ্ঞান রাখেন; সবকিছু তাঁর লিখিত ফয়সালার অধীন; তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছু ঘটে না; মানুষের কাজও তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত; ভালো-মন্দ, আনুগত্য-অবাধ্যতা তাকদীরের বাইরে নয়; হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতাও তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন; জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য মানুষ সৃষ্টি করার ভাষাও ধ্রুপদী উৎসে পাওয়া যায়।

একই সঙ্গে মানুষকে তার কাজের জন্য দায়ী বলা হয়। কিন্তু এই দায় প্রতিষ্ঠার সময় মানুষের ইচ্ছাকে এমন একটি স্বাধীন শক্তি হিসেবে স্বীকার করা হয় না যা আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত ফল সৃষ্টি করতে পারে। বরং ঠিক বিপরীতটি বলা হয়—মানুষের ইচ্ছা যদি আল্লাহর কার্যকর ইচ্ছাকে পরাজিত করতে পারে, তাহলে আল্লাহর ক্ষমতাই খর্ব হয়।

ফলে ধ্রুপদী সুন্নি আকীদার মধ্যে মানুষের কর্মের একটি দ্বৈত ভাষা তৈরি হয়: মানুষ কাজ করে, কিন্তু কাজের চূড়ান্ত স্রষ্টা আল্লাহ; মানুষ ইচ্ছা করে, কিন্তু সেই ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয়; মানুষ পাপ করে, কিন্তু সেই পাপও আল্লাহর তাকদীরের বাইরে নয়; মানুষ শাস্তি পায়, কিন্তু যে ফলের জন্য সে শাস্তি পাচ্ছে সেটি আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থার মধ্যেই ঘটেছে।

এই দ্বৈততার যুক্তিগত ব্যাখ্যা যত কঠিন হয়েছে, আকীদা-সাহিত্যে তত বেশি আত্মসমর্পণ, প্রশ্ন-নিষেধ এবং “রহস্য”-এর ভাষা সামনে এসেছে। এতে আকীদার দুই দাবিই সংরক্ষিত থাকে—আল্লাহর সর্বব্যাপী ক্ষমতা এবং মানুষের দায়। কিন্তু দুই দাবির পারস্পরিক সামঞ্জস্য প্রমাণিত হয় না।


উপসংহার

ধ্রুপদী ইসলামি আকীদা-গ্রন্থে তাকদীরের ধারণা নিছক পূর্বজ্ঞান নয়। সেখানে আল্লাহ শুধু জানেন না মানুষ কী করবে; তাঁর ফয়সালা, ইচ্ছা ও সৃষ্টি মানুষের কাজ ও পরিণতির ওপর কার্যকর। হার্ব আল-কিরমানির ভাষায় ভালো-মন্দ, পাপ-অবাধ্যতা, ব্যভিচার, হত্যা, শিরক—সবই আল্লাহর তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত; মানুষ সেই কাজই করে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবন বাট্টা জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য পৃথক মানুষ সৃষ্টি, তাদের অন্তরের সংকল্প পর্যন্ত নির্ধারণ এবং হেদায়াত-পথভ্রষ্টতার ঐশ্বরিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন। তাহাবিয়া এই পুরো ক্ষেত্রকে আল্লাহর রহস্য ঘোষণা করে গভীর অনুসন্ধান ও “কেন?” প্রশ্ন থেকে বিরত থাকতে বলে।

এই আকীদাগত ব্যবস্থা আল্লাহর সর্বশক্তিমানতা রক্ষায় অত্যন্ত ধারাবাহিক: মানুষের এমন কোনো স্বাধীন ক্ষমতা স্বীকার করা হয় না যা আল্লাহর ইচ্ছাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। কিন্তু ঠিক এই অবস্থানই নৈতিক দায়ের সমস্যাকে তীব্র করে। যদি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু ঘটে না, মানুষের কাজও তাঁর সৃষ্টি, মানুষ নির্ধারিত ফল অতিক্রম করতে পারে না এবং পাপও তাঁর তাকদীরের বাইরে নয়, তাহলে সেই পাপের পূর্ণ নৈতিক দায় শুধু মানুষের—এই সিদ্ধান্তের জন্য আলাদা যুক্তি প্রয়োজন।

ধ্রুপদী আকীদা-গ্রন্থগুলো সাধারণত সেই যুক্তি দেয় না। তারা দায়কে ঘোষণা করে, আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতাকে ঘোষণা করে এবং যখন প্রশ্নটি আরও গভীরে যায় তখন তাকদীরকে “রহস্য” বলে অনুসন্ধানের সীমা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ দ্বন্দ্বের সমাধান নয়, দ্বন্দ্বের ওপর বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফলে ধ্রুপদী সুন্নি তাকদীরের কেন্দ্রীয় সংকট থেকেই যায়: আল্লাহ এমন একটি ব্যবস্থার চূড়ান্ত নির্ধারক যেখানে মানুষের ইচ্ছা, কাজ, পাপ, হেদায়াত, পথভ্রষ্টতা ও পরিণতি তাঁর ইচ্ছা ও তাকদীরের বাইরে যেতে পারে না; কিন্তু সেই ব্যবস্থার মধ্যেই মানুষকে তার পূর্বনির্ধারিত কাজের পূর্ণ নৈতিক দায় বহন করতে বলা হয়। “আল্লাহ সৃষ্টি করেন, মানুষ কাজ করে”, “আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ”, অথবা “তাকদীর আল্লাহর রহস্য”—এই ঘোষণাগুলোর কোনোটিই নিজে থেকে সেই কার্যকারণগত বিরোধ দূর করে না।


তথ্যসূত্রঃ
  1. شرح أصول اعتقاد أهل السنة والجماعة — اعتقاد أحمد بن حنبل ↩︎
  2. শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া, লেখক: ইমাম ইবনে আবীল ইয আল-হানাফী, প্রকাশনী: মাকতাবাতুস সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৪২৩–৪২৪ ↩︎
  3. ইজমায়ি আকিদা, মূল: ইমাম হার্ব আল-কিরমানি (মৃ. ২৮০ হি .), অনুবাদ ও টীকা: মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ মৃধা, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৮ ↩︎
  4. الإبانة الكبرى لابن بطة — كتاب القدر ↩︎
  5. الإبانة الكبرى — خلق من شاء للجنة ومن شاء للنار ↩︎
  6. الإبانة الكبرى — مقدمة كتاب القدر ↩︎
  7. شرح أصول اعتقاد أهل السنة — بداية ظهور البدع ↩︎
  8. شرح العقيدة الطحاوية — أصل القدر سر الله في خلقه ↩︎
  9. شرح العقيدة الطحاوية — رأي أهل السنة في القدر ↩︎
  10. إسلام ويب — حقيقة القدر والنهي عن الخوض فيه ↩︎
  11. আক্বীদা ইসলামিয়াহ, মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, হাদীছ ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৯ ↩︎

Preferred Sources

About This Article

Genre: Historical-Theological Source Criticism and Philosophical Analysis

Epistemic Position: Source-Based Skeptical Analysis, Logical Criticism and Moral Philosophy

This article examines the doctrine of divine predestination (qadar) as formulated in classical Sunni creed literature rather than reducing it to divine foreknowledge. It draws on creedal and doctrinal texts associated with Ahmad ibn Hanbal, Harb al-Kirmani, al-Tahawi, Ibn Abi al-Izz, Ibn Batta, al-Lalaka'i and other Sunni authorities to examine claims concerning divine decree, divine will, the creation of human acts, guidance and misguidance, obedience and disobedience, belief and unbelief, and the preordination of Paradise and Hell.

A central focus is the distinction between what the sources explicitly state and the philosophical implications that follow from those statements. Several cited texts affirm that nothing escapes divine decree, that human acts fall within divine creation, that unbelief and sinful acts occur within God's effective will, and that human beings cannot produce an outcome contrary to what God has decreed. The article then examines whether simultaneously assigning full moral responsibility to the human agent is logically compatible with that causal structure.

The article also documents an important feature of classical Sunni treatments of predestination: repeated restrictions on speculative inquiry. Statements attributed to Ahmad ibn Hanbal discourage asking “why” and “how”; al-Tahawi describes predestination as a divine secret and warns against probing it; other Sunni texts similarly prescribe submission and belief rather than unrestricted investigation. These statements are examined as part of the historical theological response to the tension between comprehensive divine determination and human accountability.

The analysis does not treat later doctrinal labels such as “acquisition,” “created acts,” “legal will,” “creational will,” or “divine mystery” as explanations merely because they are established theological terminology. Each formulation is evaluated according to whether it actually resolves the underlying causal and moral problem: if a person's will, ability, act and final outcome remain dependent on an infallible divine decree that cannot be resisted, on what basis can that person be regarded as the fully independent moral source of the resulting act?

The article should therefore be evaluated through the accuracy of its citations, fidelity to the wording of the classical sources, distinction between textual evidence and philosophical inference, and the logical validity of its analysis of predestination, human agency and moral responsibility.

Leave a comment

Your email will not be published.