
Table of Contents
ভূমিকা
আস্তিক বা ধার্মিকদের কাছে যখন ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ চাওয়া হয়, তখন প্রায়শই একটি পাল্টা প্রশ্ন বা যুক্তি শোনা যায়— “আপনার বাবা যে আসলেই আপনার জন্মদাতা, তার প্রমাণ কী?” [1]। এই প্রশ্নের আড়ালে মূলত একটি বিভ্রান্তিকর যৌক্তিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝাতে চাওয়া হয় যে, যেহেতু আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে পিতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কোনো ল্যাবরেটরি টেস্ট বা অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই মেনে নিচ্ছি, সেহেতু প্রমাণ ছাড়া ঈশ্বরকে বিশ্বাস করাও একটি স্বাভাবিক ও যৌক্তিক আচরণ।
তবে এই ধরণের তুলনা মূলত ‘প্রমাণের দায়ভার’ (Burden of Proof) নীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল মাত্র [2]। কোনো ব্যক্তি যদি মহাজাগতিক বা অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তার অস্তিত্ব দাবি করেন, তবে সেটি প্রমাণের দায় একান্তই তাঁর; যিনি সেই দাবিতে বিশ্বাস করেন না, তাঁর ওপর সেটি ‘ভুল’ প্রমাণ করার কোনো দায় থাকে না [3]। এমনকি কোনো ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে কাউকে প্রমাণ ছাড়াই পিতা হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন, তবে সেই সীমাবদ্ধতা বা আচরণ কখনোই কোনো অতিপ্রাকৃত অন্ধবিশ্বাসকে যৌক্তিক ভিত্তি দান করে না। এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো পিতৃত্বের এই ছদ্ম-যৌক্তিক উদাহরণটি ব্যবচ্ছেদ করা এবং প্রমাণের অভাব কীভাবে একটি দাবিকে ভিত্তিহীন করে তোলে, তা বিশ্লেষণ করা।
ঈশ্বরবিশ্বাসী বা আস্তিকদের পরিচিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: মহাবিশ্বের স্রষ্টা বা ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক, যৌক্তিক বা পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণ ভিত্তিক প্রমাণ কী আছে?
আস্তিকের সাধারণ পাল্টা প্রশ্ন: আপনার বাবাই যে আসলে আপনার জৈবিক জন্মদাতা, তার প্রমাণ কী? আপনি কি কখনো ডিএনএ টেস্ট করে নিশ্চিত হয়েছেন? যদি প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে বাবা হিসেবে মেনে নিতে পারেন, তাহলে ঈশ্বরকে কেন নয়?
এই পাল্টা প্রশ্নের মাধ্যমে আস্তিক ব্যক্তি মূলত একটি স্পষ্ট মিথ্যা সমতা (False Equivalence) তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি বোঝাতে চান যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোও নাকি “প্রমাণহীন বিশ্বাস”-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সুতরাং ঈশ্বরের অস্তিত্বকেও প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও সমতুল্য।
যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে, নাস্তিক ব্যক্তিটি তার বাবা সম্পর্কে একটি অন্ধবিশ্বাস করছে, যার সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, তাহলেও তো তাতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে কোনো যুক্তি তৈরি হয় না। তখনও তো এই ক্ষেত্রে আস্তিক (যে ঈশ্বর সম্পর্কে অন্ধবিশ্বাসী) এবং নাস্তিক (যে তার জন্মদাতা সম্পর্কে অন্ধবিশ্বাসী) উভয় ব্যক্তির বিশ্বাসই অন্ধবিশ্বাস-ই থেকে যায়। কোনো একজন নাস্তিক কোনো একটি বিষয়ে অন্ধবিশ্বাস করলে, সেটি তো ঈশ্বর সম্পর্কে আস্তিকের অন্ধবিশ্বাসের পক্ষে কোনো যুক্তি বা জাস্টিফিকেশন হতে পারে না।
কিন্তু এই যুক্তির আরও গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের তিনটি মৌলিক শব্দের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরিঃ Believe (সাধারণ বিশ্বাস), Trust (আস্থা বা বিশ্বাসযোগ্যতা-ভিত্তিক নির্ভরতা) এবং Faith (ধর্মীয় বা অন্ধ ধর্মবিশ্বাস)। এই তিনটি ধারণা এক নয়—তাদের ভিত্তি, প্রকৃতি এবং যৌক্তিকতার মানদণ্ড সম্পূর্ণ আলাদা। এই পার্থক্য না বুঝলে আস্তিকের উপরোক্ত যুক্তি দেখে মনে হতে পারে যেন তা খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, অথচ বাস্তবে এটি শুধুমাত্র একটি ভ্রান্ত তুলনা যা যুক্তি ও প্রমাণের মানদণ্ডকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়াশা করে দেয়।
শব্দগুলোর সংজ্ঞা
কোনো তথ্য বা দাবিকে প্রমাণ ছাড়াই সত্য বলে মেনে নেওয়া অথবা স্রেফ ব্যক্তিগত মতামতের ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছুকে সত্য মনে করা। এটি কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের তোয়াক্কা করে না [4]।
পূর্ব অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্যতা এবং যৌক্তিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছুর সত্যতায় ভরসা রাখা। এটি অন্ধ নয়, বরং তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত সম্ভাব্যতা [5]।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বা যৌক্তিক উপাত্ত ছাড়াই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা বা ধর্মীয় মতবাদের ওপর রাখা পরিপূর্ণ বিশ্বাস। এটি প্রমাণ ছাড়াই মেনে নেওয়াকে গুণ হিসেবে বিবেচনা করে [1]।
পিতৃত্ব নির্ধারণ: অন্ধ বিশ্বাস বনাম যৌক্তিক সম্ভাবনা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা অসংখ্য বিষয়কে “সত্য” বলে ধরে নিই, যা আসলে পূর্ব অভিজ্ঞতা, দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণ এবং প্রবল সম্ভাবনার (likelihood) উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে — যেমনটি পিয়ের-সিমোঁ লাপ্লাস ১৮১৪ সালে তাঁর ‘A Philosophical Essay on Probabilities’ গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, আমরা ছোটবেলা থেকে যাদের বাবা-মা হিসেবে দেখে বড় হয়েছি, তাদের সাথে যদি চেহারা, গায়ের রং, চোখের আকৃতি, চুলের ধরন, উচ্চতা বা স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের স্পষ্ট সাদৃশ্য খুঁজে পাই, তাদেরকেই জৈবিক বাবা-মা বলে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নিই। এটি কোনো অন্ধবিশ্বাস নয়। এটি একটি যৌক্তিক অনুমান (reasonable inference), যা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এবং জেনেটিক্সের সাধারণ নিয়মের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
নিচের দুটি ছবিতে এই বিষয়টি খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথম ছবিতে একজন আফ্রিকান পুরুষ ও একজন ভারতীয় নারীর পাশে একজন ইউরোপীয়ান সোনালি চুলের ছেলেকে দেখা যাচ্ছে। চেহারা, গায়ের রং, চুলের রং — কোনো দিক থেকেই সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে এই ছেলেটি তাদের জৈবিক সন্তান বলে মনে হয় না।

দ্বিতীয় ছবিতে ভারতীয়-আফ্রিকান মিশ্রিত বৈশিষ্ট্যের ছেলেটির সাথে বাবা-মায়ের সাদৃশ্য অনেক স্পষ্ট — চোখ মায়ের মতো, গায়ের রং ও চুলের ধরন বাবার দিকে ঝুঁকে আছে। এই ছবিটি তাদের আসল জৈবিক সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি মনে হয়।
কোন নবজাতককে দেখতে গেলেই আমরা সাধারণত এর “চোখ মায়ের মতো”, “চুল বাবার মতো”, “গায়ের রং মিলে গেছে” — এসব কথা আমরা প্রায়শই বলি। এগুলো কোনো আধ্যাত্মিক অনুভূতি নয়, বরং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান ও জেনেটিক্সের অভিজ্ঞতালব্ধ ফলাফল। আমরা জানি, সন্তান সাধারণত বাবা-মায়ের জিনের মিশ্রণ হয়। তাই এই সাদৃশ্য দেখে আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি উচ্চ-সম্ভাবনার অনুমান তৈরি করে।
তবে আমরা এটাও পুরোপুরি স্বীকার করি যে, এই অনুমান সবসময় ১০০% সঠিক নাও হতে পারে। যেমন — কোনো শিশুকে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া, হাসপাতালে সন্তান বদল হয়ে যাওয়া, বা অন্যের সন্তানকে নিজের মতো করে লালন-পালন করার ক্ষেত্রে এই অনুমান ভুল হতে পারে।
সারকথা: পিতৃত্বের এই অনুমান অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি যৌক্তিক সম্ভাবনা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
নিশ্চয়তার সীমাবদ্ধতা ও যৌক্তিক কাঠামো
বাস্তবতা হলো, একজন আস্তিক বা নাস্তিক কেউই নিজের জন্মপ্রক্রিয়ার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে শতভাগ পরম নিশ্চয়তার (Absolute Certainty) সাথে শুধুমাত্র ছোটবেলা থেকে বাবা মা বলে ডেকেছে, এর ভিত্তিতে নিজের জন্মদাতার নাম ঘোষণা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, আমরা যখন কাউকে ‘বাবা’ বলে জানি, তখন আমরা মূলত সমাজ, পরিবার এবং জীবনপ্রবাহের দেওয়া তথ্যের ওপর ‘আস্থা’ (Trust) রাখি। কিন্তু এই আস্থার পেছনে সবসময়ই যুক্তি ও প্রমাণের একটি দরজা খোলা থাকে।
যদি কোনো কারণে সন্দেহ দেখা দেয় যে আমি যাকে বাবা বলে ডাকছি তিনি আমার প্রকৃত জন্মদাতা নন (যেমন: পালক সন্তান হওয়া বা হাসপাতালে সন্তান বদল), তবে আমরা কিন্তু তখন ‘অন্তর দিয়ে অনুভব’ করার পথে হাঁটি না। বরং আমরা তখন বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের আশ্রয় নিই।
একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি: ধরুন, কাল রাস্তায় ‘কলিমুদ্দীন’ নামের একজন অপরিচিত ব্যক্তি আপনাকে জড়িয়ে ধরে দাবি করলেন যে তিনিই আপনার আসল বাবা। তিনি আপনাকে বললেন, “কোনো প্রমাণ চেয়ো না, কোনো প্রশ্ন করো না; শুধু অন্তর দিয়ে অনুভব করো যে আমিই তোমার পিতা।” আপনি কি তা করবেন?
আপনি যত বড় ঈশ্বরবিশ্বাসীই হোন না কেন, এই ক্ষেত্রে আপনি কখনোই প্রমাণ ছাড়া ওই ব্যক্তিকে ‘বাবা’ বলে মেনে নেবেন না। আপনি তাঁর কাছে ছবি, পরিচয়পত্র কিংবা সামাজিক সাক্ষ্য দাবি করবেন। অর্থাৎ, প্রাত্যহিক জীবনের একটি সাধারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আপনি প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
ধরুন, একজন অপরিচিত ব্যক্তি আপনার বাড়িতে এসে দাবি করলেন যে আপনার এই বাড়িটি আসলে তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি। তিনি কোনো দলিল বা আইনি প্রমাণ দেখাতে চাইলেন না, বরং বললেন, “আপনার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন, অন্তর দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করুন যে এই ভিটেমাটি আমার।”
আপনি কি দলিল ছাড়া স্রেফ তাঁর ‘অনুভূতির’ ওপর ভিত্তি করে নিজের বাড়ি ছেড়ে দেবেন? নাকি বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হবেন? [4]
আপনার খুব কাছের একজনের জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি এসে দাবি করলেন তিনি বিশেষজ্ঞ সার্জন। আপনি তাঁর সার্টিফিকেট দেখতে চাইলে তিনি বললেন, “কাগজে-কলমে সার্টিফিকেটের কী দরকার? আমার ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখুন, বিশ্বাসেই মুক্তি।”
আপনার প্রিয়জনের জীবন কি কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁর ‘অন্ধ বিশ্বাসের’ হাতে সঁপে দেবেন? জীবনের কঠিন বাস্তবতায় আমরা সর্বদা অর্জিত জ্ঞান ও সনদের প্রমাণ খুঁজি [5]।
রাস্তায় কেউ আপনাকে আটকে দাবি করল যে আপনি তাঁর কাছে এক লক্ষ টাকা ঋণী। আপনি কোনো রসিদ দেখতে চাইলে তিনি বললেন, “গত রাতে আমার স্বপ্নে দৈববাণী হয়েছে যে আপনি আমার কাছে ঋণী, আপনার আত্মাকে জিজ্ঞেস করুন।”
প্রমাণ ছাড়া কেবল কারো ‘স্বপ্ন’ বা ‘আধ্যাত্মিক উপলব্ধির’ ওপর ভিত্তি করে কি আপনি আপনার কষ্টের টাকা তাঁকে দিয়ে দেবেন? যদি এখানে প্রমাণ জরুরি হয়, তবে স্রষ্টার মতো বিশাল দাবিতে কেন নয়? [1]
আবেগ বনাম বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ (DNA টেস্ট)
পিতৃত্বের বিতর্কে চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য মীমাংসা দেয় শুধুমাত্র বিজ্ঞান। যখন লালন-পালনকারী পিতা এবং অন্য কোনো দাবিকারীর মধ্যে সন্তানের জৈবিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তখন কোনো আবেগীয় অনুভূতি, দীর্ঘদিনের স্মৃতি, “অন্তরের টান” বা “পারিবারিক ঐতিহ্য” কোনো কাজে আসে না। একমাত্র ডিএনএ (DNA) টেস্টের ফলাফলই হয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আধুনিক ফরেনসিক জেনেটিক্সে এই টেস্টের নির্ভুলতা ৯৯.৯৯% এরও বেশি — এটি কোনো মতামত বা বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে শুধুমাত্র বস্তুনিষ্ঠ জেনেটিক প্রমাণের ওপর [6]।
এখানে ব্যক্তিগত আবেগ বা “আমি তো এভাবেই জেনে এসেছি” ধরনের দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাসের কোনো মূল্য নেই। কারণ আবেগ প্রায়শই জ্ঞানতাত্ত্বিক পক্ষপাত বা confirmation bias-এর শিকার হয় — আমরা যা বিশ্বাস করতে চাই, শুধু সেই প্রমাণগুলোকেই দেখতে পাই। কিন্তু বিজ্ঞান ঠিক তার উল্টোটা করে: সে সব প্রমাণকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করে এবং যা ভুল, তাকে নির্মমভাবে বাতিল করে দেয়। যুক্তি, পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য এবং পুনরাবৃত্তিযোগ্য প্রমাণ সবসময়ই ব্যক্তিগত অনুভূতি বা আবেগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য।
ঠিক এই কারণেই পিতৃত্বের উদাহরণ টেনে ঈশ্বরের অস্তিত্বের মতো একটি বিশাল, অতিপ্রাকৃতিক ও সম্পূর্ণ অপ্রমাণিত দাবিকে যৌক্তিক বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা একটি স্পষ্ট ‘শ্রেণীগত ভুল’ (Category Error)। পিতৃত্ব একটি বস্তুনিষ্ঠ, পরীক্ষাযোগ্য, ফালসিফায়েবল (falsifiable) দাবি। আমরা চাইলে ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করতে পারি। কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্বের দাবি এমন কোনো পরীক্ষার আওতায় আসে না। এটি সংজ্ঞাগতভাবেই অপরীক্ষণীয় (unfalsifiable) — কোনো পর্যবেক্ষণ, কোনো পরীক্ষা, কোনো যন্ত্র দিয়ে এটাকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা সম্ভব নয়। আজ পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাসে ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে একটি বস্তুনিষ্ঠ, পুনরাবৃত্তিযোগ্য, স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি।
সুতরাং, যে দাবির প্রমাণ ল্যাবে হাতের নাগালে আছে, আর যে দাবির কোনো প্রমাণই নেই — এই দুটোকে একই শ্রেণীতে ফেলে তুলনা করা যুক্তির দিক থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ। এটি শুধু ভুল তুলনা নয়, এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণা।
অতিপ্রাকৃতিক দাবি ও সাগানের মানদণ্ড
সাধারণ দাবি এবং অতিপ্রাকৃতিক দাবির মধ্যে প্রমাণের মানদণ্ডে আকাশ-পাতাল ফারাক। যদি কেউ বলেন, “আমার পকেটে একটা কলম আছে”, তাহলে আমরা সাধারণত তাঁর কথা বিশ্বাস করে নিতে পারি। কারণ এটি একটি সাধারণ, দৈনন্দিন, সহজে পরীক্ষাযোগ্য এবং খুব কম প্রভাবশালী দাবি। চাইলে আমরা এক সেকেন্ডে পকেট দেখে যাচাই করে নিতে পারি। কোনো বড় যুক্তি বা অতিরিক্ত প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না।
কিন্তু যদি একই ব্যক্তি দাবি করেন, “আমার পকেটে একটা অদৃশ্য ড্রাগন আছে — যা আগুন ছড়ায় না, কোনো শব্দ করে না, কোনো তাপ বা গন্ধ ছড়ায় না, এবং কোনোভাবেই শনাক্ত করা যায় না” — তাহলে আমরা তাঁর কথা একদমই বিশ্বাস করব না। শুধু “বিশ্বাস করো, অন্তর দিয়ে অনুভব করো” বললে চলবে না। এখানে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী, বস্তুনিষ্ঠ, পুনরাবৃত্তিযোগ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ দাবি করবো। প্রমাণ না দিতে পারলে দাবিটি সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে।
ঈশ্বরের অস্তিত্বের দাবিটি ঠিক এই দ্বিতীয় ধরনের — অর্থাৎ অতিপ্রাকৃতিক, অসাধারণ এবং অত্যন্ত উচ্চ-মানদণ্ডের প্রমাণ দাবি করে এমন একটি দাবি। এটি কোনো সাধারণ দৈনন্দিন ঘটনার মতো নয়। এটি একটি অদৃশ্য, অপরীক্ষণীয়, সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ সত্তার অস্তিত্বের দাবি, যা মহাবিশ্বের সৃষ্টি, জীবনের উৎপত্তি এবং নৈতিকতার উৎস বলে দাবি করে।
কার্ল সাগান তাঁর ১৯৮০ সালের বই Cosmos-এ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন: অতিপ্রাকৃতিক বা অসাধারণ কোনো দাবিকে সত্য বলে মেনে নিতে হলে সাধারণ যুক্তি, ব্যক্তিগত অনুভূতি বা “আমি বিশ্বাস করি” ধরনের কথাবার্তা একেবারেই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন অতিমাত্রায় শক্তিশালী, বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ।
সাগানের এই মানদণ্ড (Extraordinary claims require extraordinary evidence) আজও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার একটি মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃত। ঈশ্বরের অস্তিত্বের দাবি যেহেতু সবচেয়ে অসাধারণ দাবিগুলোর মধ্যে একটি, তাই এর জন্যও সবচেয়ে অসাধারণ প্রমাণের প্রয়োজন — যা আজ পর্যন্ত মানবজাতি কেউই উপস্থাপন করতে পারেনি। শুধু “বিশ্বাস করো” বলে এই মানদণ্ডকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
দাবির প্রভাব ও ‘পিতৃযুদ্ধ’ বনাম ধর্মযুদ্ধ
একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়শই উপেক্ষিত পার্থক্য হলো — দাবির বাস্তব পরিণাম ও সমাজীয় প্রভাবের মাত্রা।
আপনার বাবা যে আসলে আপনার জৈবিক জন্মদাতা নন, এই সত্য যদি কখনো প্রমাণিত হয়, তাহলে আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কিছু আবেগীয় আঘাত, পরিচয়ের সংকট বা সম্পত্তির জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এর বাইরে পৃথিবীর আর কারো জীবনে, সমাজে বা ইতিহাসে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে না। কেউ রাস্তায় নেমে যুদ্ধ ঘোষণা করবে না, কোনো দেশ আক্রমণ করবে না, কোনো গণহত্যা হবে না। কেউ কাউকে বাবা বলে স্বীকার না করলে মুরতাদ ঘোষণা করে হত্যাও করা হয় না।
মানব ইতিহাসের কোথাও “কে কার বাবা” নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়নি। কোনো সভ্যতা, কোনো ধর্ম বা কোনো রাষ্ট্র “পিতৃত্বের সত্যতা প্রতিষ্ঠার” নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেনি। এমন কোনো “পিতৃযুদ্ধ” নামক কোনো অধ্যায় পৃথিবীর কোনো ইতিহাস বইয়ে নেই।
কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্বের দাবিটি সম্পূর্ণ আলাদা মাত্রার। এই একটি মাত্র দাবির ভিত্তিতে মানবজাতির ইতিহাস বারবার রক্তে ভেসে গেছে। ধর্মের নামে ক্রুসেড, জিহাদ, ধর্মীয় যুদ্ধ, ইনকুইজিশন, ধর্মীয় গণহত্যা, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা — অগণিত যুদ্ধ, ঘৃণা, বিভাজন এবং নির্যাতন ঘটেছে। মানুষ ঈশ্বরের নামে প্রাণ দিয়েছে, অন্যের প্রাণ নিয়েছে, শিশু-নারী হত্যা করেছে, পুরো সভ্যতা ধ্বংস করেছে।
ঈশ্বরবিশ্বাসের এই দাবি কোনো ব্যক্তিগত বা সীমিত বিষয় নয়। এটি সরাসরি প্রভাব ফেলে আইন, শাসনব্যবস্থা, শিক্ষা, নৈতিকতা, পরিবার, যৌনতা, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির উপর। এই দাবি যদি ভুল হয়, তাহলে তার পরিণাম হয় ভয়াবহ এবং ব্যাপক — লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি মানুষের জীবন ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুতরাং, পিতৃত্বের মতো একটি ব্যক্তিগত, নিম্ন-প্রভাবশালী এবং সহজে পরীক্ষাযোগ্য বিষয়কে ঈশ্বরের অস্তিত্বের মতো একটি উচ্চ-প্রভাবশালী, অতিপ্রাকৃতিক ও ব্যাপকমাত্রায় ক্ষতিকর দাবির সাথে তুলনা করা চরম অযৌক্তিক, যুক্তিহীন এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অসৎ।
যে দাবির সম্ভাব্য ক্ষতি ও প্রভাব যত বেশি, সেই দাবির প্রমাণের মানদণ্ডও ততই কঠোর ও অত্যধিক উঁচু হওয়া উচিত। এটি যুক্তিবিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি [1]।
উপসংহার: যুক্তি ও প্রমাণের শ্রেষ্ঠত্ব
পরিশেষে একটি সোজা ও অনস্বীকার্য প্রশ্ন:
আপনার বাবাই যে আপনার জৈবিক জন্মদাতা — এই তুলনামূলকভাবে ছোট দাবির জন্য আপনি ডিএনএ টেস্টের মতো বস্তুনিষ্ঠ, ল্যাব-ভিত্তিক প্রমাণ দাবি করেন, অথচ মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এক অদৃশ্য সত্তার অস্তিত্বের মতো কোটি কোটি গুণ বড় দাবির ক্ষেত্রে কেন প্রমাণ ছাড়াই “শুধু বিশ্বাস করো” বলে মেনে নেন?
পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক চাপ বা আবেগীয় স্মৃতি আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারে। কিন্তু সেগুলো কখনোই সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না।
মহাবিশ্বের যেকোনো সত্য জানতে হলে আমাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ হলো যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং পুনরাবৃত্তিযোগ্য বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ। প্রমাণের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে কোনো অতিপ্রাকৃতিক দাবিকে সত্য বলে গ্রহণ করা শুধু অন্ধবিশ্বাস নয় — এটি স্পষ্ট, ইচ্ছাকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা এবং যুক্তির প্রতি সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।
যুক্তি ও প্রমাণের কোনো বিকল্প নেই। এটাই চূড়ান্ত সত্য।
তথ্যসূত্রঃ
- হিচেন্স, সি. (২০০৭). ‘গড ইজ নট গ্রেট’ 1 2 3 4
- রাসেল, বি. (১৯৫২). ‘ইজ দেয়ার আ গড?’ ↩︎
- হিউম, ডি. (১৭৪৮). ‘অ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ ↩︎
- হিউম, ডি. (১৭৪৮). ‘অ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ 1 2
- রাসেল, বি. (১৯৫২). ‘ইজ দেয়ার আ গড?’ 1 2
- ডকিন্স, আর. (২০০৬). ‘দ্য গড ডিলিউশন’ ↩︎
